এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হেদুয়ার ধারে - ১১০

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২০ মার্চ ২০২৪ | ১৫৪ বার পঠিত
  • বেলা দুটো থেকে অমল উৎকর্ণ হয়ে বসে আছে। সিঁড়িতে কারো পায়ের আওয়াজ পেলেই তার বুকের ভিতর টুপটাপ বৃষ্টি পড়তে থাকছে। এরকম কয়েকবার হল।
    এইভাবে প্রায় ঘন্টাখানেক কাটল।
    তবে হ্যাঁ, অমলের প্রতীক্ষা শেষ পর্যন্ত সার্থক হল।
    পায়ের আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে দুই বন্ধুর গলার অন্তরঙ্গ অস্পষ্ট কাকলি কানে এল।
    অমল ' কে কে ? ' বলে একটা পরিকল্পিত ভান করে দরজা ফাঁক করে বাইরে এল। তার মা পাশের ঘরে দিবানিদ্রা দিচ্ছে।
    রাত্রির সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেল। রাত্রি বলল, ' কি ভাল ? '
    ----- ' এই আর কি ... তুমি ভাল ? '
    রাত্রি কিছু বলবার আগেই সঞ্চারী বলল, ' তুই আজকে অফিসে যাসনি ? '
    অমল আড়ামোড়া ভেঙে বলল, ' নাঃ ... আ ... শরীরটা ঠিক নেই ... তাই ... '
    ----- ' ও, জ্বর টর আসেনি তো ... সিজন চেঞ্জের সময় ... অনেকেরই শরীর খারাপ হচ্ছে ... '
    ----- ' দেখিস ... আয় রাত্রি ... ' সঞ্চারী ওদের ঘরের দিকে এগোল।
    রাত্রি অমলের দিকে তাকিয়ে সৌজন্যমূলকভাবে হেসে বলল, ' আসছি ... ভাল থাকবেন ... '
    অমলের ইচ্ছা হল সঞ্চারীকে বলে, সে যেন তার বন্ধুকে নিয়ে একবার তাদের ঘরে আসে। কিন্তু এই সাধারণ কথাটা সে কিছুতেই মুখ দিয়ে বার করতে পারল না। আধঘন্টাখানেক পরে ভাবল, সে নিজেই সঞ্চারীদের ঘরে একবার যায়। কাকার ঘরে তো সে যেতেই পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে সহজ জিনিসই জটিল হয়ে দাঁড়াল অমলের কাছে। সে কিছুতেই তার পা দুটোকে ওদিকে নিয়ে যেতে পারল না। মাঝে মাঝে সরল জিনিসই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
    তবে শেষ পর্যন্ত সঞ্চারী কাজটা সহজ করে দিল।
    ঘন্টা দেড়েক বাদে সঞ্চারীর মাকে প্রণাম টনাম করে রাত্রি সঞ্চারীর সঙ্গে ওদের ঘর থেকে বেরল। সঞ্চারী বলল, ' আয় জেঠিমার সঙ্গে একবার দেখা করে যাবি। দুই বন্ধু অমলদের ঘরে ঢুকল। অমল গীটারটা নিয়ে টুং টাং করছিল ---- আনমনা আনমনা ... তোমার কাছে আমার বাণীর মাল্যখানি আনব না ... লগ্ন যদি হয় অনুকূল মৌন মধুর সাঁঝে.... নয়ন তোমার মগ্ন ছিল ম্লান আলোর মাঝে ... দেব তোমায় শান্ত সুরের সান্ত্বনা ....
    তবে লগ্ন কিন্তু অমলের পক্ষে মোটামুটি অনুকূল হল। অমলের মা-ও সেখানে বসে কি একটা সেলাই করছিলেন।
    সঞ্চারী ঘরে ঢুকে বলল, ' জেঠিমা ... আমার বন্ধু রাত্রি ... দাদাভাই আগের দিন দেখেছে ... '
    দাদাভাইয়ের গীটারের 'আনমনা আনমনা ... ' থেমে গেল। সে একটু আগেই ভাবছিল, যাঃ ... একটা সি এল বেকার গচ্ছা গেল। কিন্তু এখন দেখছে একেবারে বেকার যায়নি তার খুড়তুতো বোনের কল্যাণে।
    রাত্রি নম্র ভঙ্গীমায় এগিয়ে গিয়ে শিবাণীদেবীকে প্রণাম করল।
    অমলের বুকের ভিতর একটা নীরব ছোট্ট ঢেউ দোলা দিল। শিবাণীদেবী প্রথাগত দস্তুর অনুযায়ী হাসিমুখে বললেন, ' বেঁচে থাক মা ... ব'স ... '
    অমলের বিবশ মন কিছু উপযুক্ত কথা খুঁজছিল।
    ঠিক খুঁজে পাচ্ছিল না। এই সময়ে রাত্রিই মুশ্কিল আসান হল। সে অমলের দিকে পূর্ণদৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ' আপনি আর্টিস্ট ? আপনি বাজাচ্ছিলেন এক্ষুণি ... বাইরে থেকে শুনলাম ... '
    সঞ্চারী সঙ্গে সঙ্গে বলতে লাগল ' আরে জানিস না ? ... দাদাভাই দুর্দান্ত গীটার বাজায়। শুনলে একেবারে দিওয়ানা হয়ে যাবি ... বিশেষ করে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুরগুলো। তেমন চেষ্টা করলে এতদিনে রেডিও আর্টিস্ট হয়ে যেত ... '
    রাত্রি বলল, ' তা'লে তো শুনতেই হবে ... বাজান না প্লিজ... '
    সঞ্চারী বলল, ' দাদাভাই বাজা না ... বাজা না ... রাত্রি খুব ভাল শ্রোতা ... রবীন্দ্রসঙ্গীতের খুব ভক্ত ... '
    শিবাণীদেবী প্রসন্ন মুখে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
    সুরের মুর্ছনায় মনের আকুতি নিবেদনের এরকম একটা অপ্রত্যাশিত সুযোগ কোলের কাছে এসে পড়ায় সে কাকে ধন্যবাদ জানাবে ভেবে পেল না।
    তার হৃৎস্পন্দনের গতি অবশ্য তাতে কমল না। অগোছালো হাতে গীটারটা তুলে নিয়ে দেখল রাত্রি তার দিকে আগ্রহী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আগ্রহটা যে শুধুমাত্র গীটারবাদন নিয়ে তাতে কোন সন্দেহ নেই। সহজাত বিশ্লেষণী ক্ষমতা থেকে অমলের মনে হল না যে রাত্রির দৃষ্টিতে কোন অনুরাগ লুকিয়ে আছে। যাই হোক, রাত্রি কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল আর অমল চোখ
    নামিয়ে নিল তার কোলে রাখা গীটারের দিকে।
    সুরের গুঞ্জন উঠতে লাগল অমলের আঙুলের ছোঁয়ায় ---- কত কথা ছিল তারে বলিতে ... চোখে চোখে কথা হল পথ চলিতে ...
    নিখুঁত অনুশীলিত স্ট্রোকে সুর ছড়িয়ে দিল গীটারের তার। ।
    রাত্রি অকৃত্রিম উচ্ছ্বাসে হাততালি দিয়ে বলে উঠল, ' সুপার্ব সুপার্ব ... আর একটা ... প্লিজ আর একটা ... '
    অমলের বুঝতে অসুবিধা হল না যে এ উচ্ছ্বাসে তার শিল্প দক্ষতার প্রতি গুণমুগ্ধতা ছাড়া আর কিছু নেই।
    কোন কথা না বলে মাথা নীচু করে নিবিড় মগ্নতায়
    গীটারের তারে আঙুল দিয়ে আঁকিবুকি কাটতে শুরু করল আর একবার। রামকেলী ভৈরবীতে বৃষ্টিভেজা ধুন উঠল ----- কিছু বলব ব'লে এসেছিলেম... রইনু চেয়ে না ব'লে .... দেখিলাম খোলা বাতায়নে.... মালা গাঁথো আপনমনে ... গাও গান গুন গুন গুঞ্জরিয়া ... যূথীকুঁড়ি নিয়ে কোলে ....
    অমল সত্যিই ভাল বাজাল। কিছু বলব বলে এসেছিলেম-এর মর্মরিত বিষাদ গুঞ্জন সারা ঘরময় ভেসে বেড়াতে লাগল।
    রাত্রি এবার আর হাততালি দিল না। মুগ্ধ দৃষ্টিতে
    অমলের তাকিয়ে বলল, ' আপনি সত্যিই অপূর্ব বাজান ... '
    এবারও অমল বুঝতে পারল কথাগুলো তার গীটার বাদনের উৎকর্ষ স্বীকারের প্রকাশ মাত্র। এর বেশি কিছু না। কিন্তু মন তো সবই বোঝে আবার কিছুই বুঝতে চায় না।
    সে শুধু বলল, ' আর একদিন এস। আরও অনেক
    বাজাব... '
    রাত্রি বালিকাসুলভ খুশিতে বলে উঠল, ' উঃ ... থ্যাঙ্ক ইউ থ্যাঙ্ক ইউ ... দারুণ ... সময় পেলেই চলে আসব ... '
    সঞ্চারী আর রাত্রি কথা বলতে বলতে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামতে লাগল আরও মিনিট পনের পরে। ওপরে সিঁড়ির মাথায় অমল সতৃষ্ণ চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল রাত্রির একবার ঘুরে তাকাবার আশায়। কিন্তু তা হল না। দুই বন্ধু কথা বলতে বলতে গেট দিয়ে বেরিয়ে রামধন মিত্র লেনে নেমে গেল। বিকেল পাঁচটা বেজে গেছে। আকাশ এখনও মেঘলা।

    সাগর এসে ঢুকল বটতলা থানায়। কালীকিঙ্করবাবু একটা জাবদা খাতায় কি সব নোট করছিলেন। বোধহয় কেস ডায়েরির ফাইল নম্বরগুলো নোট করছিলেন। পাশে যথারীতি একটা অর্ধেক খাওয়া চায়ের গ্লাস রয়েছে। তিনি সাগরকে দেখে উৎফুল্ল হয়ে হয়ে বললেন, ' আরে ... আসেন আসেন ... কোথায় সিলেন এতদিন ? '
    ----- ' আর বলেন কেন ? বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত, কি বলে ... নিমগ্ন থাকার ফলবশতঃ উপস্থিত হতে পারিনি ... '
    সাগরের এহেন ভাষার বাহার শুনে কালীবাবু বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। এগুলো মাথা খারাপ হওয়ার লক্ষণ কিনা সে ব্যাপারে তার মনে সন্দেহ দেখা দিল। প্রেমে পড়লে এরকমই হয় এটা উপলব্ধি করে তিনি নিজের ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিলেন যে তিনি কখনও প্রেমে পড়েননি।
    যাই হোক তিনি এটাও জানেন যে এইসব প্রেমের চক্করে আসল সাগর মন্ডল হারিয়ে গেলে অনেকের মতো তারও আফশোসের সীমা থাকবে না। সুতরাং সাগরের ঘোর কাটানো তিনি তার আশু কর্ত্তব্য বলে মনে করলেন।

    ( চলবে )

    *******************************************
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন