এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    আমার বই আর মফস্বলের ভোর - স্মৃতি ভদ্র | অলংকরণ: রমিতআশির প্রথমভাগ প্রায় শেষ হবার পথে তখন। বারোয়ারী উঠোনের আমাদের আনন্দবাড়িতে তখনও প্রতিবেলা পাত পড়ে জনা পঁচিশের। নিজেরা বাদেও জমির ফসলে দিনখাটা মানুষ, সংসারের কাজে হাত লাগানো পূর্ণির মা কন্যাসহ, তাঁতঘরের ড্রাম মাষ্টার, ম্যানেজার আর কখনো কখনো মাদলা গ্রামের আইনুল চাচা। বলা যায়, উৎসব ছাড়াও বাড়ির উঠোনে পরবের কমতি ছিল না একটুও। সবদিনই আনন্দের, সবদিনই পরবের। আর আমি পাঁচ পেরিয়ে ছয়। বাড়ির পাশে এক নতুনধারার ইশকুল। কিন্ডারগার্টেন। পাশের বাড়ির বলাকা ফুফু সে ইশকুলের আপা। চেয়ারম্যান দাদুর এক শরিকের পড়ে থাকা খালি বনেদি ভবনে সাইনবোর্ড ওঠলো ‘‘উদয়ন কিন্ডারগার্টেন’। শোনা যায়, সে শরীক আমেরিকায় গিয়ে আর ফেরেননি। কাগজপত্রের জটিলতার কারণে নিজ দেশে তাঁর ফিরে আসাও অনিশ্চিত। কিন্তু দেশের জন্য পরান তো কাঁদে। তাঁর ইচ্ছাতেই সে ভবনের ফাঁকা ঘরগুলো হয়ে উঠেছিলো ক্লাশ রুম। হয়ে উঠেছিলো আমাদের শৈশবের কাগজনৌকা সময়।পাড়ায় প্রথম এমন ইংরেজি ইশকুল। সোরগোলের অতিশয্য। কেউ ফটকে দাঁড়িয়ে উঁকি দেয় তো কেউ জানালার শিক ধরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। যেন সার্কাসের দল এসেছে! আর এসেম্বলিতে যখন ‘ অ্যাটেনশন’ ‘স্ট্যান্ড ইজি’ বলে শারীরিক শিক্ষক গলা চড়াতেন তখন চারপাশের চোখগুলো গোলগাল হয়ে ঘিরে ধরতো ইশকুলের মাঠকে।বিড়ম্বনা। অদ্ভুত বিড়ম্বনা। সে বিড়ম্বনার আড় পেরিয়েই আমি বলাকা ফুফুর হাত ধরে পৌঁছে গিয়েছিলাম জীবনের প্রথম শিক্ষা নিকেতনে। নিজের আড়ষ্টতা আর জড়তা কাটিয়ে একটু একটু অভ্যস্ত হচ্ছিলাম আমি,পুষি ক্যাট পুষি ক্যাট হোয়্যার হ্যাভ ইউ বিনআই হ্যাভ বিন টু লন্ডন টু ভিজিট দ্যা কুইন…ঠিক তখনি এক দুপুরে বাবা বাড়িতে হাজির হলো বদলির আদেশ হাতে নিয়ে। পরের মাসে জয়েন করতে হবে সদ্য জেলা শবরের খেতাব পাওয়া এক শহরে। খুব দূরে নয়, আবার এমন কাছেও নয় যে বাবা দিনে গিয়ে অফিস সেরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে পারবে। তাহলে উপায়?আমাদেরকে চলে যেতে হবে বাবার সঙ্গে শহরে। তল্পিতল্পা নিয়ে অংশিদার হতে হবে উদবাস্তু জীবনের। সেই প্রথম আমাদের বাড়ির বারোয়ারী উঠোনের একচালা আনন্দে ভাঙন ধরলো। লাল বারান্দায় পড়া পাতের সংখ্যা কমলো। উঠোনে রোদে ভেজা তিল তিসির দুপুরে চড়ুই তাড়ানোর মানুষ কমলো। কিন্তু ওই যে, জীবনের গতি একমুখী! সে গতির সঙ্গে হয় পাল্লা দাও নয়তো ছিটকে যাও রেস থেকে!তাই জীবনের নিয়ম মেনেই এক শীতের সকালে বাকশো পেটরা, গুড়ের মেটে হাঁড়ি, মুড়ির টিন, ডানো দুধের কৌটায় কুমড়ো বড়ি আর একটা সোনালী চুলের বিদেশী পুতুল কোলে নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলাম আবার ফিরবো এই প্রতিজ্ঞা করে!তখন অবশ্য ফুলজোড় নদীতে সেতু হয়নি। স্টিমারে নদী পাড় হতে হতো। ভেপু বাজিয়ে যখন নদীর জল কেটে স্টিমার এগোচ্ছিলো তখনও আমার শৈশবসূলভ অস্বীকৃতি একমুখী সেই যাত্রায়,মা কবে ফিরবো আমরা…পূজার ছুটি আসতে কত দেরী…আমার ইশকুলের বন্ধুরা তো কাল থেকে ক্লাসে আমাকে পাবে না…পূজার ছুটিতে ফিরলে ওরা চিনতে পারবে তো আমাকে…সোনালী চুলের পুতুল বুকে জড়িয়ে রাখা মেয়েটিই জানতোই না,একবার পথে নামলে আমরা আসলে আজীবনের পথিক হয়ে যাই।নতুন শহর। মফস্বলি নিরিবিলি শহর। আমাদের মফস্বলি জীবন, নেহাতই সাদামাটা কিন্তু প্রাঞ্জল। সে জীবনে সবকিছু নতুন। নতুন ঘর। নতুন প্রতিবেশী। নতুন পাড়া। নতুন বিদ্যালয়। নতুন স্কুল ইউনিফর্ম। নতুন জুতো। আর নতুন আমি।সবে শহরের গায়ে জেলা সদরের ভারিক্কি নাম ঝোলানো হলেও আচারে আচরণে সে শহর ছিল একদমই সাদামাটা। রাস্তার মোরে কিংবা গলির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা টিনের আটচালা ঘরগুলো তখনও সাক্ষ্য দিতো আড়ম্বরহীন সময়ের। তবে সেসবের মাঝেও বেশকিছু বনেদি বাড়ি এখানেসেখানে ছড়িয়ে থেকে নিভৃতে বয়ান করতো শহরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের কথা। মন খারাপের আকাশভাঙা কান্না নিয়ে যখন বাড়ি আর ঠাকুমাকে ছেড়েছিলাম তখনও কিন্তু জানতাম না নদী পাড়ের সেই শহরের সঙ্গেই হয়ে যাবে আমার আজীবনের বোঝাপড়া! নদীর পাশেই নীচু এক পাড়া, আমলাপাড়া। আমাদের অস্থায়ী ঠিকানার প্রারম্ভ। তখনও যমুনা নদীতে শহর রক্ষা বাঁধ পড়েনি। তাই বাঁধনহারা নদী ইচ্ছে হলেই চলে আসতো বাসার উঠোনে। এজন্য নদী আর জলেই আমার শৈশবের কাগজনৌকা ভেসে বেড়াতে শুরু করলো ইছেমতন যখন তখন। তবে সেসব বাঁধাহীন দুরন্তপনা শেষে আমাকে যথারীতি ফিরতেও হতো বাঁধাধরা জীবনে। দাদুর কাছে হাতেখড়ি আর পন্ডিত স্যারের কাছে শ্লেট চকে স্বরবর্ণ জীবন এরপর আক্ষরিক স্কুলজীবন উদয়ন কিন্ডারগার্টেন হুট করে ফুরিয়ে গেলেও পুস্তকাদি জীবন তো আর উপেক্ষা করা যায় না।তাই ভর্তি করা হলো আমাকে বাসার সবচেয়ে নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে। গন্তব্য গৌরি আরবান প্রাথমিক বিদ্যালয়। একটা চারকোনা নতুন টিনের বাক্স। তার ভেতরে নতুন বই, নতুন রুলটানা খাতা আর নতুন কাঠ পেন্সিল। আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। নিরিবিলি আর নেহাতই আটপৌরে মফস্বলি সে শহরের এক শান্ত ভোরে শুরু হলো আমার পাঠশালা দিন। বাবা ওপার বাজার থেকে কিনে এনে দিয়েছিলো একটা চারকোনা টিনের বাক্স। শুরু হলো বালিকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। মধ্য জানুয়ারী, বাংলায় মাঘ। নদী জল থেকে উঠে আসা কুয়াশায় ঢেকে থাকা মফস্বলি শহরের আলস্য ভেঙে যে দু'একজন রাস্তায় থাকে তারা হয় ফুলের সাজি ভরে সাদা টগরে নয়তো চায়ের টঙ দোকানের উনুনে আগুন দিতো ঘষিতে। বাবার ঠিক করে দেওয়া রিকশা। রহিম চাচা। প্যাডেলে পা। রিকশার টুংটাং বেল। কুয়াশা কেটে আমার প্রথম বিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া।আকাশী রঙের স্কুল ইউনিফর্ম। সাদা কেডস। সাদা স্কার্ফ। চুলে দুই ঝুঁটি। আমার বইয়ের প্রথম ভাগ। এসেম্বলিতে মুষ্টিবদ্ধ হাত সামনে ছড়িয়ে,আমি শপথ করিতেছি যে, দেশের প্রতি অনুগত থাকিবো...জাতীয় পতাকায় স্যালুট, জাতীয় সংগীতে গলা মেলানো। শেষ হলেই বেজে উঠতো দফতরির ঘন্টা। একবার। প্রথম পিরিয়ড। প্রথম শ্রেণির স্কুলবেঞ্চ। রূপা, রনি, রাজিব, সবুজ সবাই এক বেঞ্চে। অশোকা দি'র গম্ভীর মুখ। সবুজ রঙের হাজিরা খাতা। রোল কল। দাঁড়িয়ে উচ্চকন্ঠে 'উপস্থিত আপা'।কালিবাড়ি মন্দিরের গা ঘেঁষা ইটের ওয়ালগাঁথায় ঢেউটিনের দোচালা। ক্লাসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছোট্ট চোখে প্রথমদিনই দেখে নিয়েছিলাম গোল্লাছুট খেলার অবারিত মাঠ আর টলটলে এক টুকরো পুকুরকে। হাতে ধরা আমার বই, প্রাথমিক গণিত আর সামনে শিক্ষকের টেবিলে ঊষা মাসি, মঞ্জু দি, অশোকা দি, আলপনা আপা। হাজিরা খাতায় ভর্তি রোল ২৭।ব্ল্যাকবোর্ড ডাস্টার চক। আমার বইয়ের প্রথম পাতা। আতা গাছে তোতা পাখি। রুলটানা খাতার প্রথম পাতা ভরে নিজের নামের বানান শেখা। আমার উত্তরণ। আমার বড় হওয়ার ভান করা। স্কুলের মাঠ। দাঁড়িয়াবান্ধা। ছুঁয়ে দিয়ে ভোঁ দৌঁড়। কালিবাড়ির গৌরমন্দিরে বাল্যভোগ। আর হলুদ কল্কি ফুলের ডালে একটা দুটো কাঠঠোকরা,ঠক...ঠক...ঠক...দফতরির একটানা ঘন্টা। ছুটি। মাটি জড়ানো পা কেডসে ঢোকানো। স্কুল গেটে হজমির পুরিয়া। লাল সবুজ কাঠি বরফ। আর চার আনায় পাওয়া নারকেল ছড়ানো সাদা বরফ।এরপর প্রতিদিনের একই নির্ঘন্ট…প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বরফপানি দিন। এলান্টিং বেলান্টিং দিন। ওপেন্টি বায়োস্কোপের বিবিয়ানার এঁটে বাঁধা চুলে মুক্তো জড়াতে জড়াতে আমি এগোতে থাকি সাহেববাবুর বৈঠকখানার দিকে। চলবে...
    নজরুল ও তাঁর শ্যামা মা - অনুরাধা কুন্ডা | অলংকরণ: রমিত লীলা মজুমদারের অহি দিদির গল্পে আছে যখনই রান্না করতে বসতেন ন দশটা কচি কচি ছেলে মেয়ে তাকে এসে ঘিরে ধরে বসত। অহি দিদি নানা রকম খাবার করে তাদের খাওয়াতেন কিন্তু তারা কেউ কথা বলত না। গল্পের শেষে গিয়ে জানা গেল যে এই বাচ্চারা এখনকার বাচ্চা নয়। তারা ১০০ বছর আগের বাচ্চা যাদের এক দুষ্টু লোক জিভ কেটে দিয়েছিল খাওয়ার সময় তারা ভারী গন্ডগোল করতে বলে। লীলা মজুমদারের গল্প অথচ এই ভারী নিষ্ঠুর কাহিনীটি গল্পের মূল জায়গাতে রয়েছে। কেন জিভ কেটে দিয়েছিল তারা দুষ্টু বাচ্চা বলে না অন্য জাতের বাচ্চা বলে? লিলু পিসি সেসব কথা বলে যাননি কিন্তু আমরা এখন যে সময় বাস করি সেই সময় বসে এটা মনে হতেই পারে যে বাচ্চাগুলো বোধহয় অন্য জাতের ছিল। তাই তাদের কল কল করা জিভ, কেটে দিয়ে তাদের কচি মুখের সব কথা বন্ধ করে দিতে দুষ্টু লোকদের কোন অসুবিধা হয়নি। যে সময় আমরা বাস করি সেই সময় দলিত হবার অপরাধে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা, উঁচু জাত আর নিচু জাতের কলহ জনিত সংঘাতে জেরবার সমাজ বড় দূষিত হয়ে আছে। আর তাই এই সময় দাঁড়িয়ে, "জাতের নামে বজ্জাতি সব" বলে ওঠা, সমস্বরে বলে ওঠা, চিৎকার করে বলে ওঠা দরকার। সেই চিৎকার, সেই দ্রোহ সেই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম যিনি লেটোর দলে নাম লিখিয়ে নাটক লিখেছিলেন, লিখতে শিখেছিলেন গান, যার ধর্ম ছিল প্রকৃত অর্থেই মানবিকতা। ইদানিংকালে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভিডিও গুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে ঘরে ঘরে ঢুকে কিছু মানুষ প্রশ্ন করছেন আপনার বাড়িতে তুলসী গাছ আছে? তাতে জল দেওয়া হয়নি নিয়মিত? আপনার বাড়িতে ঠাকুর ঘর আছে? আপনি পুজো করেন? তারা মানুষের ঘরের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছেন ঠাকুরঘর দেখবার জন্য এবং রীতিমতো শাসন করছেন যে দেবতার পূজা ভালোভাবে বাড়িতে হচ্ছে না। ২০২৬ সালে বসে আমাদের দেখতে হচ্ছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা বলছেন যে সনাতনপন্থী হয়ে তারা কোনরকম অনাচার সহ্য করবেন না এবং হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের বিবাহ তারা লাভ জিহাদ বলে ঘোষণা করছেন। যে দেশে কাজী নজরুল ইসলাম শ্যামা সংগীত লিখেছেন, লিখেছেন কৃষ্ণ ভজন আর লিখেছেন "বলো বীর বলো উন্নত মম শির", সেই দেশের বীর পুঙ্গবরা গৃহস্থ বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাত রক্ষার জন্য শাসানি-ধমকানি দিচ্ছেন। মৌলবাদ যখন সভ্যতাকে গিলে খাওয়ার জন্য অজগরের মতন হাঁ করে রয়েছে, তখন এ কথা মনে করা আবশ্যক কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় ১০০ টি শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন। সেই সমস্ত শ্যামা সংগীত নিয়ে "রাঙা জবা" নামে একটি আলাদা গানের গ্রন্থ রয়েছে। অধুনা উগ্র মৌলবাদের পাল্লায় পড়লে তাঁকে হয়তো প্রবল হেনস্থা হতে হত জাতে মুসলমান হয়ে শ্যামা সংগীত লিখে ফেলার জন্য। নজরুলের শ্যামা সঙ্গীতে আশ্চর্য ভক্তিভাব। কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন, কথায় আর সুরে বাঙালির মন প্রাণ শীতল করেছে। কোন বাঙালি না "শ্যামা নামের লাগল আগুন "শুনে আপ্লুত হয়েছেন! অসাম্প্রদায়িকতার অপর নাম কাজী নজরুল ইসলাম। পুত্র বুলবুলের মৃত্যুতে তিনি শোকাহত। কি করে শান্ত করবেন নিজেকে দিশা পাচ্ছেন না। আবেগ উথলে ওঠে, নজরুল দিশাহারা হন বারবার আর সেই শোক পারাবার পার হওয়ার জন্য আকুল হয়ে ওঠেন। সান্নিধ্যে এলেন বরদাচরণ মজুমদারের। যোগী বরদাচরণ মজুমদার নজরুলকে শাক্ত সাধনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পুত্র শোকে ক্লান্ত নজরুলের মন কোথাও যেন একটি অবলম্বন খুঁজে পেল। ভয়ংকরী নয়, ধ্বংসকারিনী নয়, কাল রুপিনী নয়। কালিকা মূর্তির মধ্যে নজরুল খুঁজে পেলেন মাতৃমূর্তি। ঠিক যেমন রামপ্রসাদের গান। যেমন কমলাকান্তের শ্যামা সংগীত। দেবী সেখানে দেবী নন। তিনি জননী রুপা। মানুষ যখন মনের মধ্যে হাহাকার করে, তখন অবলম্বন হিসেবে সে বোধহয় মাকে খুঁজে বেড়ায়। বাঙালি হৃদয়ে মাতৃমুর্তির স্থান বড় অপরূপ। সে কখনো মা, কখনো মেয়ে। মা ডাকের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কন্যা। কন্যাকে মা বলে ডেকে শান্ত হয় মন। বাঙালির এই চিরকালীন আকুতি কে যে নজরুল রাগ প্রধানের সুরে বেঁধে ফেললেন, তাকে হিন্দু বা মুসলমান বলে আখ্যা দিয়ে, তার মেধা মনন আর হৃদয়ের বিশালত্বের পরিমাপ করবে কে?বুলবুল অকালে মৃত। কবি লিখেছেন "শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয়।" কিন্তু তার শূন্যতা তাতে পূর্ণ হয়নি। পুত্র শোকে আকুল পিতৃ হৃদয় শান্ত হয়েছে শাক্তসাধনার খোঁজ পেয়ে। একইসঙ্গে ইসলামী গান লেখা এবং শাক্ত সাধনার গান লেখা, এ বড় কঠিন কাজ। দুর্লভ প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম এই অসম্ভব কঠিন কাজ সম্ভব করেছিলেন দরদিয়া মননে। ইসলামী গান যখন লিখেছেন তখন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে" গানে যে আকুতি, সেই একই আকুতি ফুটে উঠেছে যখন এসে শ্যামা সঙ্গীতে লিখেছেন "স্থির হয়ে তুই বোস দেখি মা"। হিন্দু না "ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন, কান্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা'র"। এই অসম্ভব সাহসী উক্তি যাঁর কাব্য ভাষা, তিনি যে একাধারে ইসলামিক গান এবং হিন্দু ভক্তি গীতি রচনা করে সুর পিপাসু বাঙালির মন মাতিয়ে দেবেন তাতে সন্দেহ কিসের! কিন্তু শুধু মন মাতলে তো হবে না।মন শান্ত হবে কীসে। একদিকে স্ত্রী প্রমীলার অসুস্থতা, অন্যদিকে পুত্রশোক। কবি স্থিতধী হতে চাইছেন।তাই কী দেবী কালিকাকে মাতৃরূপে দেখেছেন? আর ঐ ব্যক্তিগত শোক উপশমের জায়গা থেকে উপনীত হয়েছেন মহাকালের কোলে মহাকালীর বন্দনায়? শোকে,প্রবল সন্তাপে মানুষ মাতৃক্রোড় খোঁজে।একমাত্র মা পারেন শোকের ক্ষতে স্নেহের মলমটি লাগাতে। নজরুল তাই কালীর শক্তিময়ী রূপ আর স্নেহময়ী মাতৃরূপকে আরাধনা করেছেন অনির্বচনীয় আকুতিতে...শ্যামা নামের লাগল আগুন আমার দেহ ধূপকাঠিতে,যতো জ্বালাই সুবাস ততো,ছড়িয়ে পড়ে চারিভিতে..। ব্যক্তিজীবনের শোকে যে দেহ, মন পুড়ছে,তাকে তিনি সমর্পণ করেছেন মায়ের পায়ে। আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হচ্ছে দেহ মন...ভক্তি আমার ধূমের মতো,উর্দ্ধে উঠে অবিরত..এই আকুতি তো একেবারে ঘরোয়া গৃহস্থ আজন্ম স্নেহের কাঙাল বাঙালি হৃদয়ের আর্তি। রবি ঠাকুর বলেছেন..আমার এ ধূপ না জ্বালালে,গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে।তাঁর নিঠুরকে সাধারণ মানুষ ততোটা বোঝে না,যতোটা বোঝে নজরুলের কালিকাকে। অ্যাবস্ট্র্যাক্ট নয়। কনক্রিট। মানুষ মূর্তি বোঝে। রবীন্দ্রনাথের নিঠুর তাই অনেকটা দূরের। মা বড় কাছের। তাঁর আরাধনায় অন্তরলোক স্নিগ্ধ, শান্ত হয়, আর পুত্রশোকাহত পিতা অপেক্ষা করেন, কবে তাঁর দেহ ভস্ম হবে..সেই ভস্মে আঁকা হবে মায়ের কপালের তিলক। নিজেকে নিবেদন করার এই আকুলতা, এমন ভক্তি, নিজেকে নিঃশেষ করা নিবেদন, এমন শ্যামা সংগীত কজন লিখতে পেরেছেন? ২০২৬ সালে এসেও আমরা হিন্দু মুসলমানের উর্ধ্বে উঠতে পারলাম না। এখনো আমাদের আলোচ্য বিষয় ওরা হিন্দু না, ওরা মুসলমান? তবে নজরুল কেমন করে লিখলেন এমন গান? কোন অপার সাধনায়, গভীর মেধায় এবং অনন্য ভক্তিতে লিখলেন "মহাকালের কোলে বসে গৌরী হল মহাকালী।"বিশেষ করে এই গানটিতে কালীর যে রূপ নজরুল বর্ণনা করেছেন সেটি আমাদের বিস্মিত করে। দেবী কালিকাকে মূর্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে এই সৌরজগতের এক প্রকাণ্ড অংশ হিসেবে ভাবা, কল্পনার কি বিস্ময়কর প্রকাশ। "তবু মায়ের রূপ কি হারায়, সে যে ছড়িয়ে আছে চন্দ্র তারায় মায়ের রূপের আরতি হয় নিত্য সূর্য প্রদীপ জ্বালি"।এই শ্যামা সংগীতটিতে কিন্তু নজরুল কংক্রিট থেকে একেবারে অ্যাবস্ট্রাক্ট এর দিকে চলে গেছেন এবং সেটিও চূড়ান্ত অ্যাবস্ট্র্যাক্ট। অপরিসীম ক্ষমতা বলে একজন কবি এই কল্পনা করতে পারেন। মহাকালীর যে কৃষ্ণবর্ণ রূপ সেটি তিনি প্রত্যক্ষ করছেন রাত্রির গভীর কালো আকাশের মধ্যে। চন্দ্র তারার গহনা পরা মাতৃ মূর্তি। মহাকাল এবং মহাকালী, উভয়কে এই সৌরজগতের অংশ হিসেবে কল্পনা করে, কালের এবং কালীর সম্পর্কের এক অপূর্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন কবি নজরুল ইসলাম। আবে সেই একই সঙ্গে বজায় রেখেছেন কালির ঘরোয়া অন্য একটি রূপ। "উমা হলো ভৈরবী হয় ভৈরবেরে বরণ করে" হেরি শিবের সিরে জাহন্নবীরে শ্মশানে মশানে ঘোরে।" দুর্গা হোমা এবং কালি যে একই মহাশক্তির বিভিন্ন রূপ তা এই ছোট্ট গানটির মধ্যে দিয়ে অপূর্ব ভাবে প্রকাশিত। অন্ন দিয়ে ত্রি জগতে অন্অনদা মোর বেড়ায় কেঁদে ভিক্ষু শিবের অনুরাগে ভিক্ষা মাগে রাজ দুলারি। একটি গানের মধ্যে মহাশক্তির এমন বিবিধ প্রকাশ আর কোন ভক্তিগীতিতে আছে? মুহূর্তে কালিকা হয়ে গেলেন ঘরের মেয়ে উমা, শিবের প্রেমে মাতোয়ারা উমা তিন ভুবনে অন্ন জুগিয়ে বেড়ান আর তার নিজের সংসারে কিনা অন্নেরর অভাব! অভাবে বাংলার দরিদ্র মানুষ নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ মধ্যবিত্ত মানুষ এই অন্নাভাব বড় ভালো বোঝে। তাই যে দেবী কালিকাকে তারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে প্রত্যক্ষ করতে পারেনা, তাকে দেখে ফেলে ওই ছোট্ট উমার মধ্যে। শিবের ঘরনী হয়ে তার যে গৃহিনীপণা, নজরুলের গানে তার বিশ্বস্ত প্রকাশ। তাই মায়ের কাছে নালিশ জানাচ্ছেন সন্তান। "আমার যারা দেয় মা ব্যথা আমায় জারা আঘাত করে তোরই ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী"। কোথায় যেন কানে বাজে "সকলি তোমারি ইচ্ছা"। কিন্তু নজরুল নিজস্বভাবে স্পষ্ট। "আমার যারা ভালোবাসে বন্ধু বলে বক্ষে ধরে তোরই ইচ্ছা ইচ্ছাময়ী আমায় অপমান করে যে মাগো তোরই ইচ্ছা সে যে।" জীবনের বিভিন্ন ওঠা পড়া কি নজরুলকে এইভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল?" আমায় যারা যায় মা ত্যেজে যারা আমার আসে ঘরে তোর ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী।" ভক্তি ভাবে পরিপূর্ণ, স্ফটিকের মত টলটলে স্বচ্ছ নিবেদন। ব্যথিত শোকাতুর সন্তান যেন নালিশ করছে মা-কে। একমাত্র মা-ই পারেন তার আহত, অপমানিত হৃদয়টিকে শান্ত করতে। একমাত্র বাঙালি ঘরেই দেবীকে মা এবং মেয়ে, এই দুইভাবে আরাধনা করা হয়। নজরুল তাই লিখতে পারেন "আমার ক্ষতি করতে পারে অন্য লোকের সাধ্য কিনা, দুঃখ যা পাই তোরই সে দান মাগো সবই তোর মহিমা।" এ গান যেন স্বগতোক্তি। সমস্ত দুঃখের স্থলনে এই গানের মধ্যে দিয়ে। সুরে, ভাবে, মননে, কোথাও এতোটুকু ঘাটতি নেই "তাই পায়ে কেহ দলে যবে, হেসে সয়ে যাই নীরবে।" সমর্পণের এই দর্শন সাধনার মূল কথা। তাই এই অপূর্ব ভাব সাধনার আরেক প্রকাশ আমরা দেখি "বলরে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণ তল" গানে।কবি বলছেন, "মায়াতরুর বাঁধন টুটে মায়ের পায়ে পড়লি লুটে, মুক্তি পেলি উঠলি ফুটে আনন্দ বিহ্বল, তোর সাধনা আমায় শেখা জীবন হোক সফল।"এ যেন ইংরেজ কবি জন কিটসের negative capability আহরণ করার সাধনা।"কবে তোরই মতো রাঙবে রে মোর মলিন চিত্ত দল"সম্পূর্ণ নিজের সত্তা বিসর্জন দিয়ে, ফুলের মতো নির্বিকারত্ব প্রাপ্তি। মাতৃ সাধনার মূল মন্ত্র। এই ভক্তির কোন জাত নেই। যে ভক্তি নিয়ে তিনি দেবী কালিকাকে মহাবিশ্বের মহাকালী রূপে দেখেন সেই একই ভক্তি নিয়ে তিনি লেখেন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে, মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে যেন উষার কোলে রাঙা রবি দোলে।"এই ভক্তি ভাবে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোন হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব নেই এবং জাত পাতের কোন প্রশ্নই নেই কারণ সন্তান আর মায়ের সম্পর্কের মধ্যে জাত আসেনা। এই সেই কাজী নজরুল যিনি লিখেছেন "বল বীর বল উন্নত মম শির", লিখেছেন "আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন।" লিখেছেন "আমি টর্পেডো আমি ভীম ভাসমান মাইন।" সেই তিনি আবার পরম ভক্তি ভরে মায়ের সঙ্গে সন্তান সম্পর্ক স্থাপন করে জানিয়েছেন তাঁর সমস্ত সুখ,তাঁর বেদনা তাঁর অভিমান তার অপমান। গানের মধ্যে দেবীর সঙ্গে পূজারীর, মায়ের সঙ্গে সন্তানের যে বিভিন্ন রকম সম্পর্ক উঠে আসে তা কিন্তু বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য। কখনো মা, কখনো রাঙা জবার বায়না ধরে কাঁদা কালো মেয়ে...আবার সেই তারার মালা চুলে গাঁথা এলোকেশী কন্যা। মুহূর্তে রূপান্তর। ঘরোয়া ক্রন্দনরত মেয়েটি নিমেষে সৌরজগতের মহাশক্তির প্রকাশ হয়ে ওঠে...তার যুগল আঁখি সূর্য চাঁদ। অনুরাগের রাঙা জবা থাকুক তাঁর মনের বনে,কালো মেয়ের রাগ ভাঙাতে তিনি ফুলের খোঁজে ঘোরেন...রাঙা চরণ দেখতে পেয়ে তাঁর শান্তি। পুত্রশোক কী এইভাবে কিছুটা শান্ত হয়েছিল তাঁর?" আমার আর কোনো গুণ নেই মা তারা"। স্বীকারোক্তি অকপট। "হাত বাড়িয়ে মা তোর কোলে যাব না আর মা মা বলে...মা হয়ে তুই ঘুরে বেড়াস,আমায় ধূলায় ফেলে রেখে..তোর আর ছেলেমেয়ে অনেক আছে..আমার শুধু নাই যে কেহ।" মা বেটার সম্পর্কে অভিমান আর আদর মিশিয়ে দেন কবি। এই সম্পর্কের কোনো দেশ নেই, জাতি নেই, ধর্ম নেই, আবার বাঙালিয়ানায় মোড়া একটি মিষ্টত্ব আছে, দেবী থেকে সে মুহূর্তে হয়ে ওঠে তাঁর 'হাবা মেয়ে'।"কোনো অঙ্ক শেখাও নি তো, তোমার অঙ্ক বিনা তারা।" ভাগের অঙ্ক শেখেননি নজরুল। তাই তাঁর ভক্তি এতো শুদ্ধ। সুর এতো প্রাণবন্ত। জগতজুড়ানি শ্যামার কাছে এক মাতৃহারা,সন্তানহারা প্রাণ। মা ছেলেকে মারে ধরে, কিন্তু কাছছাড়া করে না। চিরমাতৃহারা সন্তান আশ্রয় খুঁজছে ছোট শিশুর সারল্য নিয়ে। শব্দ চয়নে কী বিস্তার। "জুড়ানো" শব্দটি একান্ত বাঙালি। তার থেকে ' জুড়ানি', একেবারে ' জগতজুড়ানি'। তাকে বিদেশী ভাষায় ব্যক্ত করা মুশকিল। নজরুলের আবেগ বড় শক্তিশালী, শবের মাঝে শিবজাগানো শ্মশানকালীতে তাঁর কাছে আনন্দের নন্দিনী। কল্পনার বিস্তারে বিস্মিত হতে হয়। মা'কে পাষাণী বলেছেন, মা যে লুকিয়ে বেড়ান লোকে লোকে। আর মা কে না পেয়ে তাঁর ব্যথা ভরা হৃদয় জবা হয়ে ফোটে। আবার সেই নেগেটিভ কেপেবিলিটি। সেই নিবেদন আর ভক্তি। লেটোর দলে গানবাঁধা নজরুল, বিপ্লবী, বিদ্রোহী, অশান্ত, আবেগমথিত নজরুলের এক অনন্যরূপ খুঁজে পাই তাঁর শ্যামাসংগীতের কথায়, ভাবে, সুরে। তিনি কতোবড় ভক্ত ছিলেন,তা প্রমাণ করার জন্যে নয়,শাক্তসাধনায় কত গভীর ছিল তাঁর জ্ঞান তাও প্রমাণ করার জন্যে নয়...জাত পাতের তফাৎ জলাঞ্জলি দিয়ে তাঁর যে অনাবিল মনখানি ছিল, সেই মনের স্পর্শ পাওয়ার জন্যে। এই তীব্র হানাহানির সঙ্কটকালে, সাম্প্রদায়িকতার বীভৎস আস্ফালনে,পেশীশক্তির আগ্রাসনের সময়ে, একবার অন্তত মনে করা, কাজি নজরুল ইসলাম গান বেঁধেছিলেন, শ্যামা মায়ের গান। তাঁর ইসলামের সঙ্গে ভক্তিগানের কোনো বিরোধ ছিল না, কোথাও রসবিচ্যুতি ঘটেনি, সুরধারায় এক ভক্তিবিপ্লব ঘটে গেছে।নজরুলের সেই প্রবল শক্তিশালী অথচ শিশুর মতো সরল মনটি আজ ভারতবর্ষে বড় দরকার। যে দেশে লাভ জিহাদের নামে মানব হত্যা হয়, দলিত জল খেতে গেলে তাকে পিটিয়ে মারা হয়, দলিত মানুষ জন্মদিনের কেক কাটলে তাকে তথাকথিত উঁচু জাতের লোক হত্যা করে আর লীলা মজুমদারের মতো লেখককে জিভ কাটা ছেলেমেয়েদের গল্প লিখতে হয়, সেই দেশে নজরুল জন্মেছিলেন, যে ভক্তিভাবে ইসলামিক সঙ্গীত লিখেছিলেন, সেই একই ভক্তিভাবে শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন…যে গান আজও মানুষকে জাতপাতের উর্ধে তুলে এক মহাজাগতিক বিশ্বাস আর শরণের সন্ধান দেয়। গান গাওয়া হয়, অনুধাবন হয় কী?
    গুরুচণ্ডা৯-র গল্পপাঠ - গুরুচণ্ডা৯ | ছবি: রমিত‘পিরোবতির নাকছাবি’ গল্পটি শক্তি দত্ত রায়ের ‘পিরোবতি ও মুড়ির টিন’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। ‘হাজবপুরের কেচ্ছা' লেখকের 'অতিনাটকীয়’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। আজকের গল্প এস এস অরুন্ধতীর লেখা 'পাপ হে '। গল্পটি লেখকের 'চাঁপা ফুলের গন্ধে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। সুনাগরিক রঞ্জন দত্তর মৃত্যুর দিন - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পটি লেখকের 'ছয়ে রিপু’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।আজকের গল্প জয়ন্তী অধিকারীর 'না হাঁচিলে যারে'। গল্পটি লেখিকার 'কুমুদির রোমহর্ষক গল্পসমূহ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।অমর মিত্রের লেখা 'কাশী মথুরা বৃন্দাবন '। গল্পটি 'আমার ভয় করছে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।প্রতিভা সরকারের লেখা 'তালাও গ্রামের রূপকথা'। গল্পটি 'হে চিরসারথী’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।দময়ন্তীর লেখা 'দুষ্কালের পদধ্বনি'। গল্পটি 'দুষ্কালের আখ্যানমালা’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।উপল মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'তিলবাড়ি'। গল্পটি 'ম্যাকলাস্কিগঞ্জ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।মহারাজ মিত্রবর্মণের রাজ্যবিজয়, ঘেঁটুফুল ও ব্রহ্মকমলের গল্প, লিখেছেন রমিত চট্টোপাধ্যায়, পাঠ করেছেন অমিতাভ চক্রবর্তী।শক্তি দত্তরায়ের লেখা '৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড' বই থেকে নেওয়া ক্ষীরের পুতুল। গল্পপাঠে কেকে।স্মৃতি ভদ্রর লেখা 'রসুই ঘরের রোয়াক (দ্বিতীয় খণ্ড)' বই থেকে গল্পপাঠে পায়েল চ্যাটার্জী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস 'সীমানা' বই থেকে নেওয়া একটি পর্ব, নাম - দেশের কাজ। ২৫শে বৈশাখ পার হয়ে ১১ই জ্যৈষ্ঠ্যর এই বিশেষ সময়কালে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য, এই পর্বে ধরা হয়েছে সেই সময়ের দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের দেখা হওয়ার গল্প।গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।অ্যাবনর্ম্যাল - লিখেছেন কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পপাঠ - সোহিনী সেনগুপ্ত।ফোটোগ্রাফ - ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক, গ্রাফিক শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।কেকে-র 'ছায়ার পাখি' বই থেকে নেওয়া গল্প - জিহ্ব; পাঠ - পায়েল। চিত্রশিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শারদা মণ্ডলের 'পাকশালার গুরুচণ্ডালি' বই থেকে, পাঠ - পায়েল। চিত্রশিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাসজ্যোতিষ্ক দত্তর লেখা ‘সে ছিল একদিন আমাদের' বই থেকে 'ইস্কুলের গল্প'। পাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।মৃণাল শতপথীর লেখা ‘দিতি ও মহারানি' বই থেকে নেওয়া গল্প - পাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।
  • হরিদাস পালেরা...
    বহ্নি মধুময় অথবা মধু বহ্নিময়: (উপন্যাসিকা ঃ পর্ব ৩)  - রানা সরকার | পূজার ঘর। তাতে মা কালী, ভক্ত রামপ্রসাদ, লোকনাথ এবং আরো বেশ কয়েকটি ছবি টাঙান আছে। চারুবাবু রোজ সকালের একটি ঘন্টা এই ঘরে কাটান। পূজা করেন বেশ ঘটা করে। ক’মাস আগে এলাকার ‘জিভে গজা’ দলের জোনাল সেক্রেটারী হওয়ার পর মা কালীর ছবিটা বেশ ভালো করে বাঁধিয়েছেন।নিজেকে শাক্ত বলেন বটে, তবে সময় সময় রামপ্রসাদভক্ত হয়ে যান। তার সব সময়ের সাথী হল তাদের পুরোনো চাকর, নাম সারদাপ্রসাদ। চারুবাবু অবশ্য তাকে চাকর ভাবেন না; ভাবে ন একজন বাড়ির লোক। গোটা ২০বছর হয়ে গেল সারদাপ্রসাদ তাদের সাথে আছে। আগে সারদাপ্রসাদের বাবা তাদের দোকানে কাজ করত। বড়বাজারের সেই দোকান এখনও আছে, তবে সারদাপ্রসাদকে তিনি বাড়িতেই রেখেছেন, তার খাস কাজের লোক হিসেবে। সারদাপ্রসাদও এখানে এতো স্নেহ-মমতা পেয়েছে যে আর অন্য কোথাও নড়তেই চায় না। মূলত তিনিই বাবুর ফাই-ফরমাশ খাটেন। তবে দোষের মধ্যে সারদা কানে বেশ খাটো। তা আকারে ইঙ্গিতে কাজ চালিয়ে নেন। তবে এর মধ্যে উল্টোপাল্টা কাজও কম করেনি। যেমন, ‘মানপত্র’ আনতে গিয়ে এনেছিল ‘মানকচু’। ‘ঝিঙের’ জায়গায় একবার খানকতক ‘ফিঙে পাখি’ কিনে নিয়ে এসেছিল। সেই থেকে বাজার যাওয়া তার বন্ধ। চারুবাবু কানের যন্ত্র নিতে বলেছিলেন। সারদাপ্রসাদ ভয়ে সে যন্ত্র কানে লাগাতে চায় নি। ভয় ছিল যন্ত্রটা যদি উল্টো কাজ করে তাকে বদ্ধ কালা করে দেয়! এর চেয়ে এই ভালো। জোর করে যন্ত্র পরাবার জন্য চেপে ধরাতে পালিয়ে গেছিল দেশে। ওদিকে চারুবাবু পড়ে গিয়েছিলেন বেজায় মুশকিলে। ২০ বছরের অভ্যেস। কানে ঠিক মতো না শুনলেও কাজের জিনিসগুলো কোথায় আছে জানত, গুছিয়েও রাখত ভালো করে। সাধ করে কতদিন আর খোঁড়া হয়ে থাকবেন? শেষে অনেক অনুনয় বিনয় করে সপ্তাহ তিন আগে দেশ থেকে নিয়ে এসেছেন। কথা দিয়েছেন যে আর কখনও কোনো যন্ত্র লাগানোর কথা বলবেন না।আজ রবিবার। গতকাল রাতে কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় সকালে বেশ ঝলমলে রোদ উঠেছে। মনে মনে বেশ একটা ভক্তিগদগদ ভাব এনে চারুবাবু পূজো সেরেছেন। এবার চা খেতে খেতে সকালের পেপারটা পড়বেন। প্রতিদিনই তিনি এই রুটিন ফলো করেন। না করলে সারাদিন একটা অস্বস্তি হয়। অনেকটা নেশার মতো হয়ে গেছে।লুঙ্গি আর ফতুয়া পড়তে পড়তে নাকে একটা ভাজার গন্ধ এল।বুঝলেন গিন্নী আজ লুচি ভাজছে। গরম গরম লুচির সাথে কালো জিরে কাঁচা লঙ্কা দেওয়া আলুর তরকারী চারুবাবুর খুব প্রিয়। মেয়ে বহ্নি ওদিকে হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছে। গলায় সুর এখনও আসেনি, তবে আসব আসব করছে।গানের মাষ্টারমশাই বলেছেন যদি হঠাৎ মনে হয় সুর চলে এসেছে, জানবেন সেটা অস্থায়ী। অনেকটা নিম্নচাপের ফলে বৃষ্টি হওয়ার মতো; কিন্তু বর্ষা নয়। বর্ষা যখন আসবে তখন যেমন তার রূপ আলাদা হবে, তেমনি বহ্নির গলায়ও যখন সুর আসবে দেখবেন থামতেই চাইছে না। যখন তখন গান গাইবে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও গান গাইবে শুনে চমকে উঠেছিলেন চারুবাবু! ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যদি মেয়ে গান গায় তো অন্যের ঘুমের দফা গয়া। গানের মাষ্টারকে সেই উৎকন্ঠার কথা জানাতে তিনি হেসে বললেন যে ওটা একটা উপমা। আরও বলেছিলেন, “যেমন গাছের সারা শরীর জুড়ে ফুল ফোটে, ঠিক তেমনি বহ্নির গলা জুড়ে সুর ফুটে উঠবে আর তার সৌরভে মন-প্রাণ যাবে ভরে”।চারুবাবু অবশ্য কথা বেশি বাড়ান নি। ভাবছিলেন স্যারের এই গদগদ ভাব কিসের জন্য? মাইনে বাড়াতে চান নাকী অন্য কিছু। যাইহোক এটা বুঝেছিলেন যে মেয়ের প্রতি আরও কড়া হতে হবে। প্রগলভতাকে কোনমতেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।ওদিকে বহ্নি গান ধরেছে, “তুমি যে সুরের আগুণ লাগিয়ে দিলে মোর প্রাণে, মোর প্রাণে, মোর প্রাণে .....”।শুনে চারুবাবু ভাবছিলেন আগুণ লাগতে দেওয়া যাবে না, তাহলেই সব ছাই হয়ে যাবে। তার আগেই করতে হবে জলের বন্দোবস্ত। বুদ্ধিটা অবশ্য চারুশশীবাবুর নয়, বউ প্রমীলাদেবী অনেকদিন ধরেই বলছিলেন মেয়েটার জন্য একটা পাত্র দেখতে।টাকাপয়সা নেহাত কিছু মন্দ নেই তাদের। বড়বাজারে রমরমা দোকান। তাছাড়া এর ওর সালিশী করে বেশ কিছু সুবিধাও পান, যাকে কর্পোরেট ঘরানার লোকেরা বলে ‘পার্কস’। সেই মতো বন্দোবস্তোও করেছিলেন যে পার্টির সৎ একনিষ্ঠ সুন্দর দেখতে ছেলে দেখে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেবেন। বাদ সেধেছেন স্ত্রী।তিনি আবার দু’চক্ষে ঐ পার্টি দেখতে পারেন না। কথায় কথায় স্বামীর সাথে ঝগড়া হয়। প্রমীলাদেবীর বাবা ছিলেন আবার ‘চমচম’ পার্টির লোক। কামিয়ে নেওয়া স্বভাবে ছিল না, তাই পরে দলত্যাগ করেন। বাড়িতে সততা, স্বচ্ছতার একটা ভাব ছিল সদা প্রবহমান।সেটা প্রমীলাদেবীর মজ্জায় মজ্জায় ঢুকে গেছে।কিন্তু কী কুক্ষনে যে জিভে-গজার নেতা চারুবাবুকে ভালো লেগে যায় কে জানে! বলবার মতো আহামরি চেহারা চারুবাবুর ছিল না কোনোদিন। কিন্তু মানুষের দরকারে, অদরকারে চলে আসতেন। কী লাগবে না লাগবে নিতেন জেনে আর ব্যবহারটি ছিল বড় মধুর। এই কারণে বোধহয় ভালো লেগে গিয়েছিল। চারুবাবুর বাবা আর না করেন নি। প্রমীলাও ‘চমচম’ ছিলেন। তাই স্বামীকে পছন্দ করলেও তার সাঙ্গপাঙ্গদের কোনোদিনই ভালো চোখে দেখেননি প্রমীলাদেবী। স্বামী যে সালিশী করে মাঝে মধ্যে এর ওর কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিতেন তাও তার গোচড়ে আছে। কখনও সখনও ঝগড়াও জুড়ে দিতেন এই নিয়ে, কিন্তু যুক্তিতে পেরে ওঠতেন না। কীরকম পাত্র পছন্দ এই নিয়েও তর্কাতর্কি চলত সব সময়।প্রমীলাদেবী চাইতেন ছেলেকে একদম স্মার্ট হতে হবে। ফর্সা বা কাছাকাছি হলেও চলবে তবে লম্বা হওয়া চাই। আর চেহারায় হ্যান্ডসাম হওয়া চাই। স্ত্রীর এই পছন্দকে ঠাট্টা করে চারুবাবু বলতেন যে এর চেয়ে হয় চিড়িয়াখানা থেকে একটা জিরাফ ধরে নিয়ে এসো, নয়তো কুমোরটুলিতে গিয়ে পছন্দমতো অর্ডার দাও। আরে মেয়ের উচ্চতা অনুযায়ী তো বর আনবে।বরঞ্চ চারুবাবুর চাইতেন যে ছেলে শিক্ষিত হোক, নিজের ভাগ্য নিজেই তৈরী করুক। ছেলের ভিতরে যেন থাকে একটা ভরপুর আত্মবিশ্বাস। স্ত্রীর এই আত্মবিশ্বাসীতে আবার অমত। শেষে অতো আত্মবিশ্বাসী ছেলে জামাই করে ঘরে এনে বিপদে পড়ি আর কী! ছেলেকে ভালো রোজগেরে হতে হবে, তবে তার চলার পথের স্টিয়ারিংটা থাকবে প্রমীলাদেবীর হাতে।চারুবাবু বিচক্ষণ ব্যাক্তি।এক্ষেত্রে বেশী তর্কের মধ্যে যান নি।বেশী বোঝাতে গিয়ে যদি হোম ডিপার্টমেন্ট ক্ষেপে যায় তাহলেই হয়েছে। গিন্নীর পীড়াপীড়িতে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। আজ ছেপে বেরোনোর কথা।পুজো শেষ করে জলখাবার খেতে খেতে খবরের কাগজের হেডলাইনগুলো কোনো মতে পড়েই চারুবাবু চলে গেলেন পাত্র-পাত্রী বিজ্ঞাপণের পাতায়। এপাতা ওপাতা খুঁজতে খুঁজতে একটা বড় আশ্চর্যের বিজ্ঞাপণ চোখে পড়ল তার।লিখেছে - ‘উদভ্রান্ত পরিবারের বেলপাতাবাসী নৈবেদ্য কুশ্রী পাত্রীর জন্য অনুপযুক্ত পাত্র চাই! পাত্রী দাঁত কনকনভেন্ট শিক্ষিতা! ঘেমে (পাগল)। গোল্ড স্মাগলিস্ট, গর্ভবতী, মহম্মদ আলী গোত্র! পাত্রের বায়োডাঁটাচচ্চড়ি পোস্ত করে পাঠাবেন’।“ছি! ছি! ছি! কী দিনকাল পড়ল! শেষে কারা সব কাগজে বিজ্ঞাপণ দিচ্ছে? গর্ভবতী!, তার ওপর আবার গোল্ড স্মাগলিস্ট! এতো বুকের পাটা যে.........। আচ্ছা, কেউ ঠাট্টা করেনি তো? ঠিকানাটা দেখি তো, কারা এমন তরো বিজ্ঞাপণ দিয়েছে?”, বলে নীচের ঠিকানাটা দেখেই রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন চারুবাবু। মুখ, নাক, চোখ, কান দিয়ে ধোঁয়া বেরতো লাগল। সারা শরীর কাঁপতে লাগল। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বললেন, “এ্যাই, কে কোথায় আছিস, ব্যাটাকে আজই পুলিশে দেব। ...কোথায় গেল সব? এই পুলিশ, ...., এই দমকল! ...”। বলে উঠতে গিয়েও বসে পড়লেন, “উফ্ফ! কী সব্বনেশে ব্যাপার। আজই তাড়াব ..., আজকেই। এই দমকল!”।হঠাৎ করে হৈ হল্লা শুনে প্রমীলাদেবী রান্না ফেলে ছুটে এলেন। বহ্নি ছুটে এলো গান ফেলে। আরো যত কাজের লোক যে যেখানে ছিল ছুটে এলো তাদের কাজ ফেলে। প্রমীলাদেবী গলায় উৎকন্ঠা নিয়ে চিৎকারের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন।খবরের কাগজটা চারুবাবু বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “দেখো, দেখো। আমার সম্মানের জামানত কীভাবে বাজেয়াপ্ত হয়েছে দেখো। পড়ো। হায়! হায়। মান ইজ্জত সব গেল।.... কোথায় সে, কোথায় ...?”কেউই এখনও গোলমালের সঠিক কারণ সম্পর্কে অবহিত হতে পারে নি। সবাই নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে।বহ্নি মাকে জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে?”উত্তর না দিয়ে পেপারটা পড়ে চললেন প্রমীলাদেবী। পড়া শেষ করে শরীরটা সোফায় এলিয়ে দিয়ে জুড়ে দিলেন কান্না, “ওগো আমার কী হবে গো! আমায় মেরে ফেল গো! এখন আমি কী করে বাঁচব গো ...? কাকে কী জবাব দেব গো!”।অনেকে দুদ্দার করে জল এনে চারুবাবু আর প্রমীলাদেবীকে পান করতে বলল।বহ্নি পেপারটা তুলে পড়তে থাকল। রাগে চারুবাবু ছুড়েঁ ফেললেন গ্লাস, কাকে যেন হিংস্রভাবে খুঁজছিলেন।সারদাপ্রসাদ গোলমাল কিছুটা আঁচ করে থামের আড়ালে ছিল লুকিয়ে।চারুবাবু তাকে দেখতেই হুংকার দিলেন। তারপর হাতে চটিটা তুলে নিয়ে সারদাকে উদ্যত হলেন মারতে। সারদাও দে ছুট। চারুবাবুও ছুটলেন পেছনে পেছনে। দৌড়নোর সময় চারুবাবুর ফতুয়ার পকেট থেকে একটা কাগজ গেল পড়ে। ওদিকে প্রমীলাদেবী বিলাপ করে চলেছেন। বিলাপ করতে করতে অন্য চাকরদের বললেন, “দেখ, লোকটার পেছন পেছন যা। রাগে উন্মত্ত হয়ে কিছু আবার করে না বসে! হায়! হায়! এখন আমার কী হবে গো!”।কয়েকজন সেদিকে দৌড় লাগাল।বহ্নি তার বাবার পকেট থেকে পড়ে যাওয়া কাগজটা তুলে পড়তে থাকল। লেখা আছে - ‘সম্ভ্রান্ত পরিবারের কলকাতা নিবাসী বৈদ্য, সুশ্রী পাত্রীর জন্য উপযুক্ত পাত্র চাই। পাত্রী কনভেন্ট শিক্ষিতা। এম. এ.(ভূগোল)। গোল্ড মেডেলিস্ট, স্বাস্থ্যবতী, আলিম্মান গোত্র। পাত্রের বায়োডাটা পোস্ট করে পাঠাবেন’। নীচে তাদের ঠিকানা ....।(চলবে) 
    বিজেপির শিরে সংক্রান্তি - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | অনেককেই হাহুতাশ করতে দেখছি, যে, আগে বাঙালি চিন্তার জগতে সবার আগে থাকত, আর এখন আন্দোলন হচ্ছে দেশের সর্বত্র, এমনকি বিদেশেও, বাঙালি ভদ্রলোকের একটা বড় অংশই এই সরকারের পক্ষে এখনও ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কথাটা খানিকটা ঠিক, কিন্তু পুরোটা নয়। সত্যিই, বাঙালি সেলিব্রিটিরা যে প্রতিবাদের ঝান্ডা নিয়ে কদিন আগে পর্যন্ত নেমে পড়তেন, তাঁদের অধিকাংশকেই আর দেখা যাচ্ছেনা। বোঝা যাচ্ছে অনেকেই বিজেপির ফোলানো বেলুন ছিলেন। বাংলার মিডিয়া দেখলে কদিন আগে পর্যন্ত বোঝার উপায় ছিলনা, বাংলায়ও কেউ নিট দেয় বা কেন্দ্রীয় বোর্ডে পড়ে। এখন চাপে পড়ে খানিক দেখাচ্ছে, কিন্তু ওরা যে বিকিয়ে গেছে, সে নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পরেও, লিবারাল বাঙালি ভদ্রলোকের মূল সুরটা এখন খানিকটা প্রতিবাদের পক্ষে। ছাত্রদের তো বটেই। যাদবপুরে হঠাৎ করে একটা বিরাট মিছিল হয়েছে। নানা কলেজে প্রতীকী অবস্থান হয়েছে। অন্য রাজ্যের চেয়ে কম, কিন্তু হয়েছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, সমস্যাটা অন্যত্র। এই মূল ইস্যুগুলো কিন্তু বাঙালিই অনেক আগে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছে। নিট বাতিলের দাবী প্রথম ওঠে তামিলনাড়ু এবং বাংলায়। তুলেছিল বাঙালি জাতীয় সংগঠনগুলো। যদিও দাবীটা আরও বড় হবার কথা। স্বাধীনতার জন্মলগ্ন থেকে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার স্বার্থে শিক্ষাকে রাজ্য তালিকায় রাখা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় বোর্ড ব্যাপারটাকেই বাতিল করে সেই জায়গায় আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়াই উচিত। সেই দাবীও তোলা হয়েছে। এই আমিই লিখেছি। তাই সমস্যা আওয়াজ তোলার না। সমস্যা হল, এই আওয়াজের কোনোটাতেই বৌদ্ধিক লোকজন কেউ কান দেননি। যখন দিল্লিতে আওয়াজ উঠবে, তবে তাঁরা তার পিছনে দৌড়বেন, এইটাই হল সমস্যা। এরকম আরও আওয়াজ তোলা হয়েছে। বাঙালিই তুলেছে। বিজেপির সম্ভাব্য পশ্চিমবঙ্গ জয় যে ভারতবর্ষজুড়ে একট বিরাট বিপর্যয়ের সূচনা, বাংলায় বহুবার বলা হয়েছে। এসআইআর স্রেফ এসআইআর না, একটা বড় পরিকল্পনার অংশ, ভোট ক্রমশ প্রহসনে পরিণত হচ্ছে, অবিজেপি শক্তিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত, এও বহুবার বলা হয়েছে। বাঙালি বৌদ্ধিক লোকজন শুধু কান দেননি তাইই না, একদল বলেছেন এই বাঙালি-ঠ্যাঙানো বা এসআইআর আসলে সেটিং। আর আরেকদল আন্দোলনটাকে দানাই বাঁধতে দেননি, পাছে অন্য কেউ ফায়দা লুটে নেয় বলে। অথচ দিল্লি থেকে রবীশ কুমার বা ধ্রুব রাঠি বললে, সেটা এঁরাই সোনা মুখ করে শুনেছেন, দল বেঁধে চটিচাটা বলে আসেননি। খুব সম্ভবত সাহস পাননি বলে। এখানেও সমস্যাটা আওয়াজ তোলার নয়। বৌদ্ধিক বৃত্তে যাঁরা আছেন, তাঁদের অন্ধত্বের। এবং এখনও যেটা বাকি বাকি আছে, সেটা হল বাঙালি জাতির সম্পূর্ণ বিপর্যয়। বেঙ্গল ফাইলস জাতীয় সিনেমা এমনি তৈরি হয়নি। বাঙালি ঠ্যাঙানো এমনি হয়নি। বাংলাকে জেহাদিদের আখড়া হিসেবে চিহ্নিত করে চলা এমনি হয়নি। অনুপ্রবেশ নামক একটি তিলকে বিরাট ফাঁপিয়ে কল্লোলিনী তিলোত্তমা এমনি বানানো হয়নি। এই ছকটাকে অবিলম্বে চিহ্নিত করা উচিত। বাংলা এবং পাঞ্জাব দেশভাগের দুই দগদগে ক্ষত। এর মধ্যে দেশভাগ বাংলার বিপর্যয় ঘটিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের সম্পূর্ণ অধোগতির জন্যই ওই দেশভাগ দায়ী। একদিনে হয়নি, বছর তিরিশ ধরে হয়েছে। সেটাকে ঢাকতে অনুপ্রবেশ নামক একটা ন্যারেটিভ তৈরি। সেটাকে কাজে লাগিয়েই ৩৫ লক্ষ লোক এখনও ট্রাইবুনালে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই তথাকথিত অনুপ্রবেশ নামক ন্যারেটিভটাকে সম্পূর্ণ প্রতিহত না করলে, এবং এদের এই গতিতে এগোতে দিলে, বাঙালির বিপর্যয় আসন্ন। সমস্যা হল, এইগুলো দিল্লির কেউ বলবেন না। ফলে বৌদ্ধিক বাঙালি কানও দেবেন না। বলিউড এবং গোদি মিডিয়ার নেশা তাঁদের মগজে ঘুণ ধরিয়ে দিয়েছে, সমস্যা এটাই। এই আন্দোলনের ধাক্কায় অন্ধত্ব কাটুক, এইটুকুই কামনা করি। আওয়াজ তোলা, বা সূত্রগুলো দেখিয়ে দেওয়াটা সমস্যা না। দিল্লিতে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা এইটুকু অন্তত দেখিয়ে দিয়েছে, যে, তারা গড্ডলিকার উল্টোদিকে রুখে দাঁড়াতে পারে। বাংলার ছেলেমেয়েরাও পারে। বাঙালি বৌদ্ধিক বৃত্তের লোক অন্তত চিন্তাটুকু করার চেষ্টা করলেই চলবে। আপাতত।
    সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে? - যদুবাবু | এই লেখাটা সম্পাদনা করার সময় খবর পাচ্ছি, গতকাল ও আজকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ হচ্ছে। হ্যাঁ স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ-ই। দিল্লির ছবি আর ভিডিও তো দেখছিই, পুলিশের লাঠিচার্জের ভিডিও, রাস্তায় পড়ে থাকা টিয়ার গ্যাসের শেলের ছবি, আর দেখছি একরত্তি ছেলেমেয়েদের সাহস। কিছুদিন আগেই এক বন্ধুর লেখা প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ পড়লাম গুরুর পাতায়। আর অজস্র ভিডিও দেখছি নিতান্ত সাধারণ মানুষের। বোম্বের ছবি দেখলাম, আরও … জয়পুর, যোধপুর, গোয়ালিয়র, ইন্দোর। আজকে যাদবপুরে দেখলাম বিপুল জমায়েত হয়েছে, এবং তারা কেউ কোনো দলের ঝাণ্ডার আশ্রয়ে আসেননি বলেই অনুমান।এদিকে গতকাল আমার এক বাল্যবন্ধু গেছিল টরণ্টোয়, ছবি তুলে পাঠিয়েছে। আমি কিছুই করিনি ও করি না, তাই যাকে বলে ‘লিভিং ভিকারিয়াসলি’। পড়তে পড়তে, দেখতে দেখতে ভাবছি ও ভেবেছি ইশ যদি একবার কোনো একটা জমায়েতে যেতে পারতাম। কিছুই না, ঐ ভিড়ের মধ্যে দাঁড়াতাম। উদ্দীপিত হতাম। সংক্রামিত হতাম। বৃথা হোক না হোক, আশা করতাম।মিছিল থেকে আমি বহুদূরে তাই আমি যেইটুকু পারি সেইটুকুই করছি। দুই একটা তথ্য-উপাত্ত তুলে রাখছি এক জায়গায়। শিক্ষা, শিক্ষার অধিকার ও অবস্থা সংক্রান্ত।স্কুলশিক্ষা নিয়ে নীতি আয়োগের একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন বেরিয়েছে এই মে ২০২৬-এই। প্রতিবেদনের নাম স্কুল এডুকেশন সিস্টেম ইন ইন্ডিয়া – টেম্পোর‍্যাল অ্যানালিসিস অ্যান্ড পলিসি রোডম্যাপ ফর কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট। রিপোর্টের সময়কাল দশ বছর ’১৪-’১৫ থেকে ’২৪-‘২৫, অর্থাৎ কেন্দ্রে বিজেপির শাসনকাল। বিশাল রিপোর্ট, অজস্র সংখ্যা-সারণী এইসব চট করে পড়ে ফেলা কঠিন কাজ। আমিও এক কিস্তিতে সবটুকু লিখবো না। খুব সামগ্রিক দুই-একটা ছবি।প্রথম ছবিটি এই যে, গত দশ বছরে সরকারি স্কুলের সংখ্যা ১১.০৭ লাখ থেকে কমে হয়েছে ১০.১৩ লাখ, আর এই এক-ই সময়ে সরকারি স্কুলে ভর্তির শতকরা ভাগ কমে ৫৪.৩% থেকে হয়েছে ৪৯.২৫%, অর্থাৎ, আমাদের দেশে এখন অর্ধেকের কম ছাত্রছাত্রী পড়ে সরকারি ইস্কুলে। কমার কারণ হিসেবে রিপোর্টে লেখা, “কনসলিডেশন অ্যাণ্ড র‍্যাশনালাইজেশন”, এবং, প্রাইভেট স্কুলিং-এর “চাহিদা”র বৃদ্ধি! চাহিদার নেপথ্যে কী কারণ সে বিস্তারে বলা নেই, অথবা চাহিদা আর বাধ্যতার ফারাক কোথায় সেটাও এক প্রশ্ন। আমার বন্ধুরা বলেন যে এর জন্য দায়ী সাধারণ মানুষের ‘পারসেপশন’। কিন্তু সেই পারসেপশনের নেপথ্যে কারণ আমরা সাধারণতঃ খুঁজি না।এক-ই সঙ্গে এই রিপোর্টের টেবিল ৪.২-এর ডেটা দেখলে চমকে উঠতে হয়। দেশে প্রায় আট হাজার স্কুলে (৭,৯৯৩) একজনও ছাত্র নেই, অথচ শিক্ষক আছেন, সরকারি অর্থও আসছে। এই এক-ই টেবিলের ডেটায় দেখছি, পশ্চিমবঙ্গে ৬,৪৮২টি স্কুলে হাতেগোনা ঠিক এক জন শিক্ষক, আর সেই সিঙ্গল-টিচার স্কুলে পড়ছে ২.৩৫ লক্ষ শিশু, আর উত্তরপ্রদেশে ৯,৫০৮টি এমন স্কুলে ৬.২৪ লক্ষ। এক গ্রামে ছাত্রহীন শিক্ষক; পাশের গ্রামে শিক্ষকহীন ছাত্র। আরও দুশ্চিন্তাজনক প্যাটার্ন স্কুলভর্তির হারের, যার নাম এনরোলমেন্ট ফানেল, অথবা এনরোলমেন্ট পিরামিড। সেটা কেমন দেখা যাক। ভর্তির হার মাপার যে সূচক এই রিপোর্টে মাপা হয় সেটার নাম গ্রোস এনরোলমেন্ট রেট, জি ই আর। সোজা করে বলতে গেলে, জি-ই-আরের মাপতে হলে, কোনো একটি শিক্ষার স্তরে (ধরা যাক প্রাইমারি), মোট যতজন শিক্ষার্থী সেই সংখ্যাকে ভাগ করা হয়, ঐ স্তরের অফিশিয়াল এজ-গ্রুপের জনসংখ্যা দিয়ে। এই রেট কখনও-সখনও ১০০% টপকেও যেতে পারে, বেশি বয়সে যাঁরা পড়াশুনো করছেন, বা পরিযায়ী জনসংখ্যা ধরলে। আমাদের দেশে প্রাইমারি জি-ই-আর বেশ ভালো ৯০.৯%, আপার প্রাইমারিতেও তাই ৯০.৩। সেখান থেকে ঝপ করে কমে মাধ্যমিকে ৭৮.৭, আর উচ্চমাধ্যমিকে মাত্র ৫৮.৪। অর্থাৎ, আমাদের এডুকেশন সিস্টেমে প্রতি দশজন শিশুর মধ্যে চারজন ক্লাস ইলেভেনে পৌঁছায় না।জি-ই-আরের অবনতি সর্বত্র অবশ্যই সব রাজ্যে সমান নয়, এবং আশ্চর্যের কথা সেইসব রাজ্যে অবনতির হার বেশি যেখানে ডবল ইঞ্জিন সরকার, মানে বেশিরভাগ সময় শাসক দল বা তার শরিকদের হাতে রাজ্যের ভার যেখানে। উদাহরণ হিসেবে, মেয়েদের প্রাইমারি জি-ই-আর মধ্যপ্রদেশে ১০৭ থেকে নেমে ৭৬, উত্তরপ্রদেশে ১১৫ থেকে ৮৪, গুজরাটে ১০০ থেকে ৮২, বিহারে ১১০ থেকে ৭৯; বিহারের সেকেন্ডারি জি-ই-আর ৫৯ থেকে কমে ৫১ (বিহার গোটা দেশে সর্বনিম্ন।) তবে সত্যের খাতিরে দুটো কথা সঙ্গে বলতেই হবে। এক, এই আপাত অবনতির একটা অংশ আসলে মাপজোখের ব্যাপার: ২০২২-২৩ থেকে ইউডাইস+ ছাত্রপিছু আলাদা রেকর্ডে চলে গিয়ে ডুপ্লিকেট নাম ছাঁটতে শুরু করে, ফলে যে সংখ্যাগুলো ফুলেফেঁপে ১০০ পেরিয়ে গিয়েছিল সেগুলো কিছুটা চুপসে আসে। তবুও, অবনতির হার তুলনা করা খুবই ন্যায্য।স্কুলশিক্ষা চালানোর দায় মূলত রাজ্যের ধরে নিলেও এইটুকু সম্ভবত সরকারের সমর্থকরাও মেনে নেবেন, যে, যে দশকে একই দল দিল্লি আর এই রাজ্য-রাজধানীগুলো দুই-ই চালিয়েছে, সেই দশকের শেষে তাদেরই স্কুলশিক্ষার সূচক প্রতিটি ম্যাপের একেবারে তলায়। ডবল ইঞ্জিন, অন্তত এই প্রমাণে, উল্টোদিকে চলেছে।এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য সেকেণ্ডারি (মাধ্যমিক) জি-ই-আর দেখলে, গত দশকে পশ্চিমবঙ্গের উন্নতি হয়েছে ৭৫.৩% থেকে ৯৯.৪%। এর পেছনে সেই দশকের রাজ্য সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের কোনো ভূমিকা ছিল কী না সেই নিয়ে অর্থনীতিবিদরা হয়ত একদিন কাজ করবেন। তবে, সেকেণ্ডারি জি-ই-আর যেমন ভালো, পশ্চিমবঙ্গের সেকেণ্ডারি ড্রপ-আউট রেট তেমনই খারাপ, ২০%, এবং, ক্লাস টেন থেকে ইলেভেনে যাওয়ার হার ৫৭.৪%। প্রায় সার্বজনীন জি-ই-আর আর বেশ বেশি ড্রপ-আউটের অর্থ, রাজ্য প্রায় সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের মাধ্যমিক স্তর অব্দি পৌঁছতে সক্ষম, কিন্তু ১০ থেকে ১১-র রাস্তায় তাদের ~৪০% বাদ পড়ে যায়।  এই “অ্যাট্রিশনের” একটা কারণ অবশ্যই ঐ কাঠামোই। ভারতের অর্ধেক স্কুলে পড়ানো হয় শুধু ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ, আর ক্লাস ওয়ান থেকে টুয়েলভ অব্দি টানা এক-ই স্কুলে যাওয়ার বন্দোবস্ত মাত্র ৫.৪ শতাংশ স্কুলে। উঁচু ক্লাসে ওঠা মানে বারবার স্কুল পাল্টানোর ঝক্কি হলে, অথবা প্রাথমিকের তুলনায় মাধ্যমিক শিক্ষা পাওয়ার স্কুল অনেকটাই কম সংখ্যার হলে, কিছুটা সেইখানে বাদ পড়ে যাওয়ার একটা ঝুঁকি থেকে যায়। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের ৭৯% স্কুল প্রাইমারি-ওনলি, আসামে ৬৪.৯%, আর গোটা ভারতের গড় ৪৯.৬%।আর, পিরামিডের দিকে খেয়াল করলে বোঝা যায় আপার-প্রাইমারি আর সেকেণ্ডারির মাঝে বেশ বড় একটা ফাঁক। কেন? হয়ত তার একটা উত্তর এই যে রাইট টু এডুকেশন বা শিক্ষার অধিকার আইনের অধিকার ফুরিয়ে যায় ঠিক ঐ চোদ্দ বছর বয়সে, ক্লাস এইটে, মানে, ঠিক সেই সময় টিউশন, বই আর যাতায়াতের খরচ আবার পরিবারের ঘাড়ে এসে পড়ে। আমি সামান্য বুদ্ধিতে এর মানে বুঝি এই যে ঐ পিরামিড আসলেই আর্থিক-সামাজিক ক্ষমতার-ও পিরামিড!ঐ পিরামিডের চুড়ো অব্দি যে ক'জন পৌঁছয়, তাদের জন্য তারপরের ধাপ ঐসব কম্পিটিটিভ পরীক্ষা - নিট, জেইই, ইত্যাদি। সামাজিক-সাংস্কৃতিক পুঁজি নেই যাদের সেইসব পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের আপওয়ার্ড মোবিলিটির অন্যতম একটা দরজা তো এইগুলোই। নাঃ, এইসব পরীক্ষার মধ্যেও কি একটুও বায়াস নেই? কোচিংয়ের খরচ, শহুরে ইস্কুল, পারিবারিক শিক্ষা বা অন্য রিসোর্স, সব মিলিয়ে খেলতে নামার আগেই মাঠ সবার জন্য সমান না, কেউ কেউ একটু বা অনেকটা এগিয়ে শুরু করছেন রেসের দৌড়। সে তুমি যেই লাইনেই দাঁড়াও না কেন, তোমার আগে দেড়শো খোকার রেজিউমে।সেইসব প্রিভিলেজের গল্প বাদ দিলেও, এও তো সত্যি যে এইসব ছিলো বলেই তো আজ খেয়েপরে বেঁচে আছি। আমি তো বটেই, আমার বেশিরভাগ বন্ধুরাও প্রায় সকলেই আমার-ই মতন, বাপের টাকাপহা বিশাল কিছু ছিল না, কিন্তু তাও ভালো স্কুলেই পড়েছি প্রায় বিনি পয়সায়, সরকারি কিংবা সরকারি-সাহায্যপ্রাপ্ত, শিখেওছি যা যা শেখার ছিল, হাতেগোনা ব্যতিক্রম বাদ দিলে আমাদের ক্লাসে শিক্ষক আসতেন, মন দিয়েই পড়াতেন, আমরাও সেইসব শুনেটুনেই উতরে গেছি, তারপর কলেজে পড়েছি, সেখানেও খরচ শূন্য উল্টে সামান্য স্টাইপেণ্ড ইত্যাদিও পেতাম, সেই কলেজে পাশ দিয়ে চাকরিবাকরি পেয়েছি, আমার মত কেউ কেউ চাকরি করেটরে আরও উচ্চশিক্ষার জগতে এসেছি, সেও আজ এক দশকের বেশি অতিক্রান্ত।আমাদের সময় নীট ছিল না, আমরা জয়েন্ট ইত্যাদি পরীক্ষা দিতাম। আমিও দিয়েছিলাম, দুরন্ত রেজাল্ট করেছিলাম, করেও কোনো কাজে লাগেনি, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে যদুবাবু হয়ে গেলাম। তবে, আমি ও আমার বন্ধুরা জানতাম, মানে একটা এইরকম বিশ্বাস ছিল যে পড়াশুনো করাই আমাদের সোশ্যাল মোবিলিটির একমাত্র উপায়। ছিলো, এই একের-পর-এক নীট কেলেঙ্কারির আগে অব্দি।প্রশ্নপত্র ফাঁস তখনও কী হ’ত না? হত, কিন্তু এই ব্যাপক স্কেলে পরীক্ষাও হ’ত না, কেলেঙ্কারিও না। মনে রাখা দরকার, এই নীট গোছের পরীক্ষাগুলোয় বাছাই হয় একেবারে চুলচেরা হিসেবে। লক্ষ-লক্ষ পরীক্ষার্থী, হাজারকয়েক আসন, দু-চার নম্বরের বেশি-কম সরকারি মেডিকেল সিট আর শূন্যের ফারাক। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কত দামে বিকিয়েছে, জানেন? পার হেড ১৫ লাখ! ধৃত ব্যক্তি জানিয়েছেন তিনি কিনেছিলেন ১০ লাখ টাকায়।  আর সবচেয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়তো প্রতিষ্ঠানের, এবং প্রতিষ্ঠানের উপর বিশ্বাসভঙ্গের। যে ষোলো-সতেরো-আঠেরো বছরের কিশোর বুঝে যায় যে ঐ যাবতীয় যা কিছু তাকে একদিন পেতে হবে, আসলে সেই সব-ই তার নাগালের বাইরেই থেকে যাবে। যে দরজা সত্যি বলে বিশ্বাসই রইল না, সে দরজার দিকে কে-ই বা হাঁটতে চায় বলুন? অথচ, শিক্ষা – প্রধানতঃ শিক্ষা-ই - হওয়ার কথা ছিল এই পোড়া দেশে ক্ষমতাহীন মানুষের প্রথম ও প্রধান সোপান।কিন্তু প্রতিষ্ঠানের উপর বিশ্বাস হারালেই বা আখেরে ক্ষতি কী?অর্থনীতিবিদ ড্যারন আচেমোগলু “হোয়াই নেশনস ফেইল” বইতে একটা তত্ত্ব খাড়া করেছিলেন, প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেই। ওঁর এবং ওঁর সহ-গবেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠান মূলতঃ দুই রকম – ইনক্লুসিভ আর এক্সট্র্যাকটিভ। ইনক্লুসিভ, যাঁরা ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করেন, আইনের শাসন জারি রাখেন, এবং এমন একটা “লেভেল-প্লেয়িং-ফিল্ড” তয়ের করেন যাতে বৃহত্তর জনসমাজ শিক্ষা, বা ইনোভেশন, বা অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশীদার হতে পারেন সহজেই। আর এর উল্টোদিকে, এক্সট্র্যাকটিভ – শোষক। এরা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতাহীন রেখে দিয়ে, মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে ধনসম্পত্তি ও তাবৎ ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। আচেমোগলুরা দেখিয়েছিলেন, কীভাবে মানুষের ইতিহাসে ঐ দীর্ঘস্থায়ী ইনক্লুসিভ অর্থ-রাজনৈতিক কাঠামোই দেশকে উদ্ধার করতে পারে দারিদ্র্যের হাত থেকে। আর অন্যদিকে কী হয়, আন্দাজ করা আশা করি শক্ত না।যে প্রসঙ্গে শুরু করেছিলাম তাতেই ফিরে আসি। আমি আজকাল নৈরাশ্যবাদী হয়ে গেছি। আমি ধরে নিয়েছি যে রাষ্ট্রের বুটজোড়ার সামনে আমাদের পেরেক হওয়ার ক্ষমতাও নেই। আর আমি ধরেই নিয়েছি যে আসলেই সংখ্যাগুরু ক্ষমতাহীন মানুষের জন্য যাবতীয় হতাশার এবং বিশ্বাসভঙ্গের যুক্তিসঙ্গত প্রতিক্রিয়া পুরো সিস্টেমকেই ছুঁড়ে ফেলে ঘৃণাভরে এর থেকে সরে যাওয়া।এই যন্তর-মন্তরের জমায়েতের ভিডিও দেখে মনে হ’ল, কে জানে, হয়তো আমি ভুল। হয়তো হতাশার এক ও একমাত্র যুক্তিসঙ্গত প্রতিক্রিয়া রাগ। বিশ্বাসভঙ্গের একমাত্র যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া হয়তো বিরুদ্ধাচারণ। হয়তো।ভোটের ঠিক পরেপরেই এক দাদাকে ফোনে বলেছিলাম, ভয় করছে। তিনি বলেছিলেন, ভয় করবেন না, সাহস করুন, মনে রাখবেন ভয়ের থেকে সাহস বেশি সংক্রামক। হয়তো তিনিও ঠিক-ই বলেছিলেন। হয়তো?নীতি আয়োগের রিপোর্টের শুরুতেই জনৈক আধিকারিকের একটি ভারি সুন্দর বার্তা ছাপানো আছে, তাতে লেখা যে কর্মসংস্থান শুধু নয়, শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য মুক্তি – “সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে”। সে কার মুক্তি, ক্ষমতাবান না ক্ষমতাহীন না আপামর জনগণের, এর উত্তর আসবে কি না আমার-আপনার কারুর জানা নেই, অথবা সবার-ই আসলেই জানা।সূত্রঃ১) নীতি আয়োগের প্রতিবেদন, স্কুল এডুকেশন সিস্টেম ইন ইন্ডিয়া – টেম্পোর‍্যাল অ্যানালিসিস অ্যান্ড পলিসি রোডম্যাপ ফর কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট। https://niti.gov.in/sites/default/files/2026-05/School-Education-System-in-India.pdf২) https://www.brut.media/in/articles/who-is-shubham-khairnar-the-man-behind-the-neet-ug-paper-leak
  • জনতার খেরোর খাতা...
    বাঙালির খাওয়াদাওয়া - Rajat Das | বাঙালির জীবনে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—এক, খাওয়া; দুই, খাওয়ার পর আবার কী খাওয়া হবে তা নিয়ে আলোচনা। পৃথিবীর অনেক জাতি বেঁচে থাকার জন্য খায়, কিন্তু বাঙালি খাওয়ার জন্যই যেন বেঁচে থাকে!সকালে ঘুম থেকে উঠেই বাঙালির প্রথম চিন্তা, “চা হয়েছে?” চা হাতে পেলেই দ্বিতীয় প্রশ্ন, “আজ জলখাবারে কী?” লুচি-আলুর দম হলে মুখে হাসি, আর ওটস বা কর্নফ্লেক্স দেখলে মনে হয় যেন জীবনের সব আনন্দ এক মুহূর্তে শেষ হয়ে গেল।বাঙালির বাড়িতে অতিথি এলে বিপদ। অতিথি যতই বলুন, “না না, কিছু লাগবে না”, গৃহকর্ত্রী ততই দৃঢ়স্বরে বলবেন, “ওসব হবে না, একটু মুখে দিতেই হবে।” সেই ‘একটু’ বলতে সাধারণত চার-পাঁচ রকমের মিষ্টি, মাছের ঝোল, মাংস, চাটনি এবং শেষে দই বোঝায়। অতিথি যখন হাঁফাতে হাঁফাতে বলেন, “আর পারছি না”, তখন উত্তর আসে, “এই তো না... কিছুই খেলেন না!”মাছ বাঙালির আবেগ। ইলিশের মরসুম এলে সংবাদপত্র, টেলিভিশন, বাজার—সব জায়গায় একটাই আলোচনা। মনে হয় না যেন মাছ এসেছে, মনে হয় কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলন বসেছে। আবার চিংড়িপ্রেমীরাও কম যান না। তাদের মতে, চিংড়ি মাছ নয়। সে এক যেন শিল্পকর্ম। যা পাতে পাতে সেজে ওঠে মালাইকারি রূপে। চিংড়ি যাতেই দাও তার স্বাদ বাড়িয়ে আকাশ ছুঁইয়ে দেবে।বিয়েবাড়িতে বাঙালির আসল প্রতিভা প্রকাশ পায়। নিমন্ত্রণপত্র হাতে পাওয়ার পর থেকেই মেনু নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। অনুষ্ঠানে গিয়ে কেউ কনের গয়না দেখেন, কেউ সাজসজ্জা দেখেন। কিন্তু অধিকাংশ বাঙালির চোখ থাকে ক্যাটারারের দিকে। “মাটনটা কেমন হয়েছে?”, “ফিশ ফ্রাই কয় পিস দিচ্ছে?”, "লুচি না ভাত?”, "ক'রকম মিষ্টি করেছে? পান্তুয়া আছে তো?" "কি আইসক্রিম হয়েছে?" ইত্যাদি ইত্যাদি—এসবই প্রধান আলোচ্য বিষয়।আর মিষ্টি? বাঙালির কাছে মিষ্টি হলো ভোজনের পূর্ণচ্ছেদ। রসগোল্লা, সন্দেশ, মিষ্টি দই—এসব ছাড়া খাবার শেষ হয়েছে বলে মনে হয় না। ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পরেও অনেকে বলেন, “ডাক্তার মিষ্টি খেতে বারণ করেছেন, তবে একটা ছোট রসগোল্লা খেলে কিছু হবে না!” সেই ‘একটা’ যে কবে তিনটে হয়ে যায়, তা কেউ টের পায় না।তবে বাঙালির খাওয়ার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—খাওয়ার সময় খাওয়া নিয়ে আলোচনা, আর খাওয়া শেষ হলে পরের খাওয়ার পরিকল্পনা। তাই বলা যায়, বাঙালির ইতিহাস, ভূগোল, সাহিত্য—সবকিছুর মাঝখানে কোথাও না কোথাও একটা গরম ভাত, মাছের ঝোল আর মিষ্টির প্লেট নিশ্চয়ই লুকিয়ে আছে।শেষ কথা, বাঙালিকে যদি সত্যিই খুশি করতে চান, তাহলে বড় বড় বক্তৃতা নয়—এক প্লেট ভালো খাবার সামনে রাখুন। তারপর দেখুন, কীভাবে তার মুখে ফুটে ওঠে সেই চির চেনা তৃপ্তির হাসি!বাঙালির খাওয়াদাওয়া — এক শিব্রামীয় পর্যবেক্ষণবাঙালির দুটি প্রধান অঙ্গ আছে—একটি মুখ। অন্যটি পেট। মাঝখানে যে শরীরটা রয়েছে, সেটি মূলত এই দুটির যোগাযোগ রক্ষার জন্যই ঈশ্বর তৈরি করেছেন।আমি ছোটবেলা থেকেই লক্ষ্য করেছি, বাঙালি খেতে বসার আগে খাবার নিয়ে আলোচনা করে। খাওয়ার সময় খাবার নিয়ে সমালোচনা করে। আর খাওয়ার পরে পরের বেলার খাবার নিয়ে পরিকল্পনা করে। অর্থাৎ খাওয়া যতক্ষণ না হচ্ছে, ততক্ষণ খাওয়ার চিন্তা; আর খাওয়া হয়ে গেলে খাওয়ার স্মৃতি।একবার এক বাঙালি ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার শখ কী?”তিনি বললেন, “খাওয়া।”আমি বললাম, “আপনার পেশা?”তিনি একটু ভেবে বললেন, “ওটাও মোটামুটি খাওয়াই। একটি অফিসে চাকরি করি, যাতে খেতে পারি।”বাঙালির সঙ্গে মাছের সম্পর্ক খুবই নিবিড়। অনেকের ধারণা, ডারউইনের বিবর্তন তত্ত্বে কোথাও একটা ধাপ বাদ পড়েছে। বাঁদর থেকে মানুষ নয়, বাঙালির ক্ষেত্রে মাছ থেকে মানুষ হয়েছে। নইলে মাছ দেখলে এত আবেগ আসে কী করে?বিশেষত ইলিশ। ইলিশের প্রতি বাঙালির শ্রদ্ধা এমন যে, তাকে মাছ বলা অন্যায়। ইলিশ একটি অনুভূতি। বাড়িতে ইলিশ এলে তার জন্য আলাদা অভ্যর্থনা হওয়া উচিত। আমার তো মনে হয়, অনেক বাঙালি আত্মীয়স্বজনের চেয়েও ইলিশকে বেশি ভালোবাসে। আত্মীয় এলে জিজ্ঞেস করে, “কতদিন থাকবে?” আর ইলিশ এলে বলে, “আর একটু নেব?”মিষ্টির ক্ষেত্রেও বাঙালির আত্মসংযম বিস্ময়কর। চারটে রসগোল্লা খাওয়ার পর সে ঘোষণা করে, “না না, আর পারব না।” তারপর সৌজন্যবশত আরও দুটো খেয়ে নেয়। কারণ, মিষ্টি নষ্ট করা পাপ।বিয়েবাড়িতে বাঙালির প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায়। কনে কে, বর কে, তাদের পরিচয় কী—এসব গৌণ বিষয়। প্রধান প্রশ্ন হলো, ফিশ ফ্রাই কয় পিস? মাটনটা কেমন? আইসক্রিম আছে তো?অনেককে দেখেছি, বিয়ে থেকে ফিরে বলছেন, “ছেলেটা কী করে জানি না, তবে চিংড়ির মালাইকারিটা জাস্ট ফাটাফাটি ছিল।”খাবার নিয়ে বাঙালির স্মৃতিশক্তিও প্রবল। স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক যতই চেষ্টা করুন, পলাশীর যুদ্ধের সাল অনেকেই ভুলে যেতে পারে। কিন্তু ১৯৯৮ সালের এক আত্মীয়ের বিয়েতে পরিবেশিত কাশ্মীরি আলুর দমের স্বাদ আজও মনে আছে।আর বাঙালির রান্নাঘরে আলুর স্থান তো প্রায় মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীর মতো। মাছে আলু, মাংসে আলু, ডিমে আলু, শুধু চায়ে আলু দেওয়া এখনও শুরু হয়নি। তবে সময় বড়ই শক্তিশালী জিনিস—ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কিছু বলা যায় না।সবশেষে বলি, পৃথিবীর বিভিন্ন জাতি নানা কারণে বিখ্যাত কেউ শিল্পে, কেউ বিজ্ঞানে, কেউ বাণিজ্যে। বাঙালিও এসব ক্ষেত্রে কিছু কম নয়, কিন্তু খাওয়াদাওয়ার প্রতি তার নিষ্ঠা একেবারেই অনন্য। তাই যদি কখনও কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা হয়—‘বিশ্ব খাদ্যচিন্তা অলিম্পিক’—তবে বাঙালির সোনার পদক প্রায় নিশ্চিত।কারণ বাঙালি শুধু খায় না, খাওয়াকে ভালোবাসে; শুধু ভালোবাসে না, তাকে নিয়ে আলোচনা করে; আর শুধু আলোচনা করে না, সেই আলোচনা করতে করতেই আবার খেতে বসে যায়।"এসো বসি আহারে"
    মধ‍্যরাতের নাটক - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | আন্দোলন চলছে। আজ মুম্বই, নাসিক ফেটে পড়েছে। কলকাতায় রাত পোহালেই মিছিলের ডাক। ওদিকে মহামতি যশস্বী প্রধানমন্ত্রী একটি সোশাল মিডিয়া পোস্ট করে জানিয়েছেন, যে, প্রশ্ন-ফাঁসের ব্যাপারে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট করবেন। দ্রুত বিচার হবে। সাংবাদিক সম্মেলন করেননি, কারণ, স্ক্রিপ্ট ছাড়া সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে কীরকম তোৎলান, সে তো ভিডিওতেই ধরা আছে। কিন্তু আসল পয়েন্টটাই উনি ফসকে গেছেন। সেটা হল দায়িত্ব, এর আগে বলেছিলেন, প্রশ্নফাঁস মহাপাপ, কিন্তু আটকানোর দায়িত্ব নাকি গোটা দেশের। উল্টোদিকে গোটা দেশ তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করছে, যে, দায়িত্বটা সরকারের। শুধু প্রশ্ন ফাঁসের নয়, দেশ চালানোর। শুধু হিন্দু-মুসলমান আর চিন-পাকিস্তান করে ডিম্মিডিয়াকে বগলে পুরে ওয়েস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির পদলেহন করাটাকে দেশ চালানো বলেনা।ওঁর জন্য বিষয়টা একটু বিশদ করে বলে দেওয়া যাক। ত্রিভাষা নীতি, সিলেবাস, উচ্চশিক্ষায় বরাদ্দ এসব বাদই দিন। শুধু পরীক্ষাই ধরুন। গত ১০ বছরে ১৫২ টা প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। গড়ে মাসে ১ টারও একটারও বেশি। বন্ধ করা যায়নি। কোনটায় কে দোষী সে এক প্রশ্ন, কিন্তু এই পদ্ধতিগত ব্যর্থতার দায় কার? শিক্ষামন্ত্রীর। তাঁকে সেই দায়টা নিতে হবে।এই দায় সরকার শুধু বোঝেনি তা নয়, বরং চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে গেলে কী করেছে? পুলিশ, কেন্দ্রীয় বাহিনী নামিয়েছে। দেশ জুড়ে ধরপাকড় করেছে। লাঠি, কাঁদানে গ্যাস, এবং শোনা যাচ্ছে পেলেট গুলিও চালাতে হয়েছে। নিরস্ত্র সত্যাগ্রহীদের উপর নির্মম হামলা করা হয়েছে। কখনও সভাস্থল ভেঙে দেওয়া হয়েছে, কখনও অনুমতি দেওয়া হয়নি। কার্যত গোটা দেশের ছাত্রযুব এবং তাদের পরিবারকে দেশদ্রোহী বলা হয়েছে। শাসক দলের নেতারা, প্রশাসকরা গুন্ডার ভাষায় হম্বিতম্বি করে গেছেন। এর দায় কার? নিশ্চয়ই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর. তাঁকে দায়টা নিতে হবে।এবং সবার মাথায় যিনি বসে আছেন, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী, তিনি গত পনেরো বছর ধরেই প্রধানমন্ত্রী। তিনি এই পুরোটা হতে দিয়েছেন। শিক্ষায় গড়বড়, ই-২০ তে গোলমাল, টাকার শীঘ্রপতন, নোটবন্দীর চরম ব্যর্থতা, সবকটা তাঁর দায়। উত্থান হয়েছে কেবল ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। দেশজুড়ে কেবল বেড়েছে বিভেদ। এর দায় তাঁকে নিতে হবে। রাজধর্ম পালনে তাঁর অক্ষমতা নিয়ে নিজের দলেরই প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তাঁকে ভরৎ্সনা করেছিলেন। তিনি কানে তোলেননি। তাই দেশবাসী এবার চোঙা ফুঁকে তাঁর কানে ঢোকানোর চেষ্টা করছে। বুঝলে ভালো, না বুঝলে আরও ভালো। কিন্তু ফাস্ট ট্রাক কোর্ট কেউ চায়না, চায় দায় স্বীকার। রাজধর্ম পালনে চূড়ান্ত ব্যর্থতার দায়স্বীকার।নরেন্দ্র মোদি যে কাল মধ্যরাতে সমাজমাধ্যমে এসেছিলেন ২ মিনিট ৫৬ সেকেন্ডের ভিডিও নিয়ে, তাতে আমার কোনো সমস্যা হয়নি। হ্যাঁ, আগে আসতেন অভ্রভেদি রথে চড়ে, গোদি মিডিয়ায়। স্ক্রিপ্ট দেখে দেখে কিছু একটা বলতেন। সব চ্যানেল গমগম করে দেখাত। লোকে থরহরি হয়ে কাঁপত, ওরে বাবা আবার কি একটা নোটবন্দী? এবার সেসব জাঁকজমক নেই। মোদিজি এখন জেন-জি হয়েছেন। একটা মোবাইল ধরা সামনে। কী দেখে পড়ছেন বোঝা যাচ্ছেনা। সময়টা আবার মাঝরাত। যেন এখনই ইনস্টাগ্রাম স্টোরি পোস্ট করা হবে। কিন্তু তাতেও আমার কোনো সমস্যা হয়নি। উনি পাঞ্জাবে গিয়ে শিখ সেজেছেন, চিনে গিয়ে চাইনিজ সেজেছেন, চাপে পড়লে জেন-জিই বা হবেন না কেন। সঙ্গে আরও যেটা বোঝা গেল, সেটা তো আরও ভাল। স্বয়ং নরেন্দ্র মোদিই আর গোদি মিডিয়ার উপরে আস্থা রাখতে পারছেনা। ওখানে প্রাইম-টাইমে বললে অর্ধেক লোক দেখবেনা, যে কজন দেখবে, তারাও বিশ্বাস করবেনা, ভাববে নির্ঘাত আবার কিছু একটা ঘাপলা শুরু হয়েছে। মিডিয়ার কর্নেল-মেজরদের সঙ্গে গুলিয়েও ফেলতে পারে। আর বাজারে তাদের যা ইমেজ, সে তো কহতব্য না। গোদি মিডিয়ার সঙ্গে গুলবাজির একটা সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করে দিতে পেরেছে এই আন্দোলন। এতে আমার কোনো সমস্যা তো নেইই বরং ওটা খুবই আনন্দের ব্যাপার।এর চেয়েও আনন্দের ব্যাপার হল এর পরে। অবিকল জেন-জির ভঙ্গীতে তো সত্তরোর্ধ্ব প্রধানমন্ত্রী এসে মুখ খুলে প্রথমেই বললেন ফ্রেন্ডস। এতদিন শুনতাম, মেরে প্যারি দেশবাসী, কিংব চিরপরিচিত মিত্রোঁওওও, কিন্তু আজকে একদম যাবনিক শব্দ। দেখে ব্যাপক লাগল। নিন্দুকেরা বলবে শিং ভেঙে একটা বয়সের পর আর বাছুরের দলে ঢোকা যায়না, কিন্তু আমার মনে হয় সেটা ঠিক না। যতদিন বাঁচা যায় ততদিনই শেখা যায়। বিশেষ করে ছোটো থেকে হোয়াটস্যাপ ইউনিভার্সিটিতে পড়লে তো আরও বেশি শিখতে হবে।বক্তৃতার শুরুটা শুনেও বোঝা গেল, ওঁর শেখার ইচ্ছে প্রবল। প্রথম বাক্যটাই হল, উনি বুঝতে পেরেছেন, প্রশ্ন-ফাঁস কোনো মামুলি ব্যাপার না। শুনে বলতে ইচ্ছে করছিল, ১০ বছরে ১৫২ টা প্রশ্ন ফাঁস, এতদিনে বুঝলেন মামুলি ব্যাপার না? তাও এত আন্দোলনের গুঁতো খেয়ে? আমরা তো অনেক আগেই বুঝে গেছি। কিন্তু বললাম না, কারণ শিক্ষার্থীদের বুদ্ধিবৃত্তি নিয়ে এসব কটাক্ষ করা ঠিক না। নতুন পাইলট তো, অনেককিছুই নতুন শিখছেন। তার মধ্যে অন্যতম ব্যাপার হল প্রধানমন্ত্রীত্ব। এতদিন বিদেশে ঘুরে নিট- টিটের খবর নেবার সময় পাননি। এখন শিখছেন, ওঁকে উৎসাহ দেওয়া উচিত। এটাতেও কারো কোনো সমস্যা থাকার কথা না।আমার সমস্যাটা শুরু হল এর পরে। যখন উনি বলতে শুরু করলেন, যে, ঠিক কী কী ব্যবস্থা নিয়েছেন নিট নিয়ে। বললেন, দোষীদের গ্রেপ্তার করা হয়ে গেছে। তারা জেলে বসে আছে। তারপর সরকারের ঢাক পিটিয়ে বললেন, খুব দ্রুতগতিতে পরীক্ষা নেওয়া হয়ে গেছে। ফলও বেরিয়ে গেছে। কিন্তু এতেও উনি সন্তুষ্ট না। উনি ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টের নির্দেশ দিয়েছেন। তাতে অনেক কিছু হয়েছে, এরপর সেসব ক্যাবিনেটে যাবে, তারপর সংসদে যাবে, ইত্যাদি প্রভৃতি।এ সবই খুব ভালো ভালো জিনিস। কিন্তু সমস্যাটা হল, এর থেকে বুঝতে পারা গেল, ওঁর শিক্ষার গতি অত্যন্ত ঢিমে। ছাত্রদের দাবীগুলো কী উনি এখনও বোঝেননি। যারা ফাঁসের সঙ্গে জড়িত তাদের ছাতার মাথা কী বিচার হবে, সে নিয়ে কেউ আগ্রহীইই না। লোকে চায় দায়িত্ব। বার বার প্রশ্ন ফাঁস হবে, আর দোষীদের ধরে নাকি শাস্তি দেওয়া হবে, তারপর আবার ফাঁস হবে, এটা কোনো পদ্ধতি না। যে লোক এর দায়িত্বে ছিলেন, তিনি দায় ঘাড়ে নিয়ে পদত্যাগ করুন, এইটাই দাবী। যিনি এই দাবীটা না বুঝে অকাতরে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামিয়ে এনেছেন, সেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরে যান, এটা আরেকটা সম্ভাব্য দাবী। এবং যে প্রধানমন্ত্রী বারো বছর প্রধানমন্ত্রী থেকে এবং একমাসের আন্দোলন চলার পরেও কিছুই বুঝতে পারেননি, তিনিও গদি ছাড়ুন, এটা যৌক্তিক দাবী। এর মধ্যে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ চাওয়ার যথার্থতা তো প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণ থেকেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ভাবুন, শিক্ষাব্যবস্থার এমন হাল, যে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীকেই এখনও দ্রুতগতিতে বিষয়টা সম্পর্কে শিক্ষা দেওয়া যায়নি। এর পরে শিক্ষামন্ত্রীর অযোগ্যতা নিয়ে আর কোনো সন্দেহ থাকে? এমন শিক্ষামন্ত্রী চাই, যিনি নিজে দায় নিতে পারেন, ক্যামেরার সামনে আসতে পারেন। ফেসবুকে বিবৃতি দেবেন প্রধানমন্ত্রী, পুলিশ নামাবেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ডেপুটেশন নেবেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তাহলে শিক্ষামন্ত্রীর কাজটা কী?রাহুল গান্ধি গভীর রাতে এইটাই তিন লাইনে লিখে দিয়েছেন। "মোদিজি, আমাদের ছাত্ররা ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চাইছে। আপনার ওই জঘন্য মাঝরাতের ভিডিও দিয়ে তাদের বুদ্ধিমত্তাকে অপমান করবেন না। ১। প্রধানকে সরান। ২। যারা ছাত্রদের মেরেছে, তাদের শাস্তি দিন। ৩। ক্ষমা চান।"আর হ্যাঁ, এইসব দাবী নিয়েই কলকাতায় মিছিল আজ। মোদিজির অনুপ্রেরণায়, মোদিজির শিক্ষার স্বার্থে। শিয়ালদায় দুপুর আড়াইটেয়। সকল ভক্তদের কাছে অনুরোধ, একটু অনুসরণ করবেন, তাহলেই ব্যাপারটা কী বুঝতে পারবেন। সব কিছুই তো আর হিন্দু-মুসলমান আর পাকিস্তান-বাংলাদেশ না। অন্য শিক্ষাও একটু দরকার। তাই উদ্যোক্তাদের অনুরোধ করব, 'হোয়াটস-অ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে সিলেবাস আমূল বদল করতে হবে', এই দাবীটাও যেন থাকে।
    খাপখোলা তরোয়াল (কবিতা)  - SANKAR HALDER | খাপখোলা তরোয়াললেখক : শংকর হালদার শৈলবালারচনাকাল : ২৪ জুলাই, ২০২৬লেখার স্থান : কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ  অন্যায়ের আঁধারেতে বিপ্লব জাগে,খাপখোলা তরোয়াল দীপ্তিপ্রভায় লাগে।শোষকের চক্রান্তে কাঁপে ধরাতল,সোচ্চার প্রতিবাদে জাগে ভুক্তবল। ভণ্ডামি আর ছলে চেপে রাখে সত্য,শৃঙ্খলে বেঁধে রাখে নিপীড়িত মর্ত্য।পাপের প্রাসাদ আজ কেঁপে ওঠে ডরে,দীপ্ত তরোয়াল জ্বলে চেতনার করে। অত্যাচারী শাসকের অহংকার দিন,অবসানে মুছে যাবে অপমান ঋণ।খাপখোলা ইস্পাত তেজ যে ছড়ায়,পাপীর কলঙ্ক-মুখ নির্ভয়ে কাটায়। আর্তের ক্রন্দনেতে জাগে প্রতিরোধ,নিপীড়িত জনতার পুঞ্জীভূত ক্রোধ।মুক্তির হুঙ্কারেতে থমকায় কাল,উদ্যত ন্যায়ের অসি রুখে শঠতার জাল। আইনের নামে চলা প্রতারণা খেলা,ভেঙে চুরে গুঁড়ো হয় সংগ্রাামী বেলা।জনতার শাণিত এ ধারালো কৃপাণ,অধিকার কেড়ে নিতে দেবে বলিদান। ভয়হীন হৃদয়েতে জাগে নব সুর,বিজয়ের আলো এসে ছড়ায় প্রচুর।খাপখোলা তরোয়াল ন্যায়ের যে বাণী,মুক্তির পথ দেখায় নির্ভয় মানি। “বিক্ষোভের মহাপয়ার” কাব্যগ্রন্থের ১১৯ নম্বর কবিতা
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত