এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    বৈশাখের লেখাপত্তর - গুরুচণ্ডা৯ | অলংকরণ: রমিত চট্টোপাধ্যায়শীতকাল বইমেলা হইচইএর দিনকাল ফুরিয়ে এসে গেল শান্ত হয়ে বসে লেখালেখির কাল। বাইরে তাপমাত্রা বাড়ছে রোদ্দুরের জন্য, নির্বাচনের জন্য। সাথে কোথাও প্যাচপ্যাচে ঘাম তো কোথাও ঝরঝর বৃষ্টি। সন্ধ্যের আবছায়ায় দোকানে ভীড় জমায় সারাদিন রোজা রাখা ক্লান্ত মানুষ, গাজনের প্রস্তুতি নেওয়া শ্রান্ত মানুষ, চৈত্রসেলের হাতছানিতে মুগ্ধ মানুষ। টুপটাপ জমে ওঠে গল্পেরা, কবিতারা। নির্বাচনী জনসভার কোণাকাঞ্চিতে, ইফতারির থালার পাশে, গাজনের সন্ন্যাসীর ঝোলায় চুপটি করে অপেক্ষা করে তারা মানুষের জন্য। আমরা আপনাদের কাছে ডাক পাঠিয়েছিলাম তাদের খপ করে ধরে ফেলে, ঝপ করে লিখে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিতে। এসে গেছে তারা। আগামী কয়েকদিন ধরে রোজ দুটি-তিনটি করে তারা এসে হাজির হবে বুলবুলভাজার পাতায় - টাটকা ভাজা, গরমাগরম। পড়তে থাকুন। ভাল লাগলে বা না লাগলে দুই বা আরো অনেক লাইন মন্তব্য লিখে জানিয়ে দিন সে কথা। মন চাইলে, গ্রাহক হয়ে যান লেখকের। আর হ্যাঁ, আপনিও লেখা নিয়ে চলে আসুন গুরু আর চন্ডালের আড্ডা গুরুচন্ডা৯র পাতায়।সূচীপত্রঃকাব্যজলের সমাধি: জগন্নাথ দেব মন্ডলগিরগিটি ও অন্যান্য কবিতা: ফরিদাগপ্পোখুচরো: সুমন মুখার্জীসুফি: আফতাব হোসেন রতন, দ্য ব্যাকবেঞ্চার: নরেশ জানাডাক দিয়ে যায়: এস এস অরুন্ধতীকূটকচালিসে নহি, সে নহি: অনুরাধা কুন্ডানভেলাফকির ফয়জুল্লাহ: মুরাদুল ইসলাম
    গিরগিটি ও অন্যান্য কবিতা - ফরিদা | ছবি: রমিত চট্টোপাধ্যায়একলা যেতে যেতে রাস্তায় একলা কেউ যেতে যেতেঅন্য রাস্তা নিল — ঘর এলোমেলোঅথবা চৈত্র বিকেলে তেতেপুড়ে থাকা মাটি থেকে ঘুর্ণি উঠছিল।তা সে নিক, যেখানে যাচ্ছে যাকভিতরে ভিতরে। হয়ত নির্জনতর কোথাওঅথবা জমজমাট সান্ধ্য পানশালা, নাকি স্কুলে বা স্কুল পালিয়ে শহরে শহরেকোথাও সে গিয়েছে হয়ত একা একারাস্তায় একলা যেতে যেতে।গিরগিটিসংখ্যার ভিতরেও অজস্র সংখ্যারা থাকেযেন বাসাবাড়ি, বৃক্ষকোটরে অরণ্য প্রয়াস দরজা জানলা ডালপালা, ফুলফল পাতায়মানুষ বা কীটের বসবাস, যাতায়াত বারোমাস।আলো জ্বলে উৎসবে সমৃদ্ধির জয়গানে মুখরকখনও বা মহামারী অগ্নুৎপাত বন্যায় উজাড় আস্ত জনপদ অথবা প্রাচীন শিরীষটি — রঙ ঢং ঠিকানা বদলেছে সেই অনুযায়ী ক্রমশ সংখ্যার ভিতর জীয়ন্ত অগুন্তি গিরগিটি।আমিএমনও তো হতে পারেযা আমি চাইতেই শিখিনি এযাবৎনাগালে আসবে মন্ত্র বা তুকতাক অ্যাপযার ব্যবহারে স্পর্শমাত্র অপ্রার্থিত সমূহেরা স্পষ্ট হবে মুহূর্তে।অথবা সামনে এসে দাঁড়াবে অন্য আমি টা — যে জানে ঠিক কোনটা চাইলে বা পেলেষোলকলা পূর্ণ হয় নিমেষে।মাইরি বলছি, সে হতভাগাকেসান্ত্বনা দেব মৃদু হেসে। আশ্চর্য কবিতাআশ্চর্য কবিতাটির ভিতর পৌঁছতেই দেখিদ্বিতীয় লাইনেই প্রচুর ফুল ফুটে আছেবারান্দার রেলিঙে মুখ বের করে একটি পুডল শ্রেণীসচেতন ভাবে আওয়াজ ছাড়েমনে হয় ট্রেনের বাঁশি বাজলেই ছুটি শুরুপ্রিয় ঝালমুড়ি ওলা উঠবে কাঁচড়াপাড়ায়।কিন্তু যাব টা কোথায়?ঠিকানা স্বস্থানে রেখে মানুষেরা পাড়ি দিল দূরেআশ্চর্য কবিতাটি আচমকা হাত দিল ছেড়ে।
    ডাক দিয়ে যায় - এস এস অরুন্ধতী | ছবি: রমিত চট্টোপাধ্যায়“কি দেব গো আজ? ঘুগনি পাঁউরুটি না ডিম টোস্ট? “ঘুগনিই কেবল দাও একটু। আর পাউরুটি খেতে ইচ্ছে করছে না।” কানুদার কথার উত্তর দিল মল্লিকা। ঐ ডিভাইন টাওয়ারের চার তলায় ফেলুনি বৌদির কাজটা করেই নর্মদা এপার্টমেনটে খেঁচোবুড়ির বাড়ি দৌড়বে মল্লিকা। তারপরে এসে ঢুকবে বেভুল বৌদির ঘরে।বেভুল বৌদির কথাটা মনে পড়তেই ও ফিক করে হেসে ফেলল। বেভুল বৌদি আসলে সব ভুলে যায়। এইমাত্র আদা ফ্রিজে রেখে বাসনের ঝুড়িতে খুঁজছে; আবার পরক্ষণেই দুধ জ্বাল দেওয়ার বাটিতে তরকারি ফুটিয়ে ফেলছে।আশেপাশের বড় টাওয়ারগুলোয় ঘরের কাজ করে মল্লিকারা। ওরা কাজের বাড়ির মালকিনদের এইসব নাম দিয়েছে।মল্লিকার মত অনেকেই, রুমা, পাপিয়া, শান্তিমাসী, বীথিদি। ওরা কাজের মাঝে মাঝে এসে বসে এই কানুদার দোকানের মত চা, ঘুগনি পাঁউরুটির মতো দোকানগুলোয়। এর মধ্যেই অনিমা এসে গেছে। অনিমার আবার চা রুটি না হলেও চলবে কিন্তু গুটকা চাই। গুটকার প্যাকেটটা মুখে ফেলে বলল, “টামাকে এট্টা টা ডাও।”কানুদা বুঝে যায় এই সব ইঙ্গিত। একটা চা এর কাপ এগিয়ে দেয়।হাঁসফাঁস করতে করতে বীথিও এসে গেছে। বীথি নিজের প্লাস্টিকের ব্যাগ থেকে ছোট গোল টিফিনবাটিতে রুটি নিয়ে আসে। গুটিয়ে গুটিয়ে রুটিগুলোকে কেন্নোর কুণ্ডলীর মত ছোট্ট বাক্সতে ঢুকিয়ে আনে বীথিদি। দোকান থেকে চা নিয়ে তাতে রুটি খুলে নিয়ে ডুবিয়ে খায়।"তুই কি এবার ভুলোর বাড়ি যাবি নাকি রে মলি?" বীথির কথায় চায়ের গ্লাস থেকে মুখ তোলে মল্লিকা।“হ্যাঁ গো। যাই গে এবার।” মল্লিকা উঠে পড়ে।এখানকার ফ্ল্যাটগুলোয় লিফট ব্যবহার করতে দেয়। কোথাও কোথাও আবার মল্লিকাদের মত কাজের মেয়েদের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়।কিন্তু এই লিফটে উঠলেও মল্লিকার দম বন্ধ হয়ে যায়। তবু উঠতে হয়। আজকাল এতো সিঁড়ি ভাঙা আর সহ্য হয়না। হাঁটুদুটো মাঝেমাঝেই জানান দেয় বয়সের ভার।একদিন আবার লিফটে উঠে একটা সমস্যা হল মল্লিকার।তিন আর চার তলার মধ্যে লিফটের ভিতরের আলোটা দপদপিয়ে নিভে গেল। একাই ছিল মল্লিকা। ওর মাথাটা কেমন যেন দুলে উঠল। যেন এক গভীর থেকে নিবিড় জলের গন্ধ ওর স্নায়ুতন্ত্রী ছুঁয়ে গেল। ঘোর লেগে গেল। এ গন্ধ অজানা, নিষ্পাপ। আদিগন্ত খোলা প্রান্তর বা অনিঃশেষ জলের সামনে দাঁড়িয়ে যে ধরণের ঘোর লেগে যায় অনেকটা সেরকম মনে হল।এই গন্ধের সঙ্গে হাজার বছর পথ হেঁটেছে সে। আর এখন সেই পথের বাঁকের টিলা, সেই পথের জমাট কাদায় যেন ওরই পায়ের ছাপ এঁকে দেওয়ার জন্য কোমরের নিচে থেকে শরীরের নীচের ভাগ তলিয়ে যাচ্ছে ঊর্ধগামী এই লোহার বদ্ধ খাঁচার নীচতলা ভেদ করে। অথচ মাথাটা একেবারে হালকা। দীর্ঘ লড়াইয়ের ভারী জীবন, এপার্টমেন্টের খোপে, খোপে প্রতিদিনের কাজের গ্লানির ছিটের ফোঁটাও নেই সেই চেতনায়। একেবারে নিষ্কলুষ, নির্ভার সেই বোধ। অথচ অজ্ঞান হয়নি ও।মিনিট এক-দুয়ের মধ্যেই লাইট জ্বলে গেল। ধড়ফড় করে সামনে যে তলা পেল তাতেই নেমে পড়ল মল্লিকা। তখনও আসেনি ওর কাজের ঘরের দরজা, তবু লিফটের ভিতরে থাকতে আর সাহস হয়নি। দু এক তলা সিঁড়ি বেয়ে উঠে কাজের ঘরের ঢুকে পাখার হাওয়ায় বসে হাঁপাতে থাকে।বৌদি জল দিল। বলল, “একটু বসে জল খাও। চোখে মুখে জল দাও মল্লিকাদি। লিফটের ভিতরে অনেকের এরকম হয়। নিশ্বাস নিতে পারে না। আমার একটা বন্ধুরই এই রোগ ছিল।”মল্লিকা তর্ক করে না। তবে ওর শ্বাস আটকে আসেনি মোটেই। ও যে একেবারে অন্য একটা জগতে গিয়ে পড়েছিল, সেটা বললে বৌদি বিশ্বাস করবে? ও নিজেই কি ছাই ঠিকঠাক বুঝেছে? হবে হয়তো, বৌদি যা বলেছে তাই ঠিক।একটু বসে ঝাড়ু-মোছার কাজে লেগে পড়ে মল্লিকা।একটা নতুন মেয়ে কদিন কাজে আসছে ওদের সঙ্গে।রিঙ্কু বৌদির বোনের মেয়ে। অনিমাদের পাশের ঘরেই নতুন এসেছে। অনিমাই বলল, “মা টা মরেচে মেয়েলি রোগে। বাপটা নেশা ভাং করে। মেয়েটার চারিদিকে শ্যাল-কুত্তার ছুঁকছুঁকুনি শুরু হয়েছিল। তাই রিঙ্কু নে এসেছে। দ্যাক এখেনে কদিন ঠিকঠাক থাকে। রজনীগন্দার কটা রজনী কাটে এখানে। মাসিই না বেচে দেয়।”“ছি, ছি কি যে বল? রিঙ্কুরা এমন নয়।” অনিমার কথায় সায় দেয়না মল্লিকা। কিন্তু এই মেয়েটার নাম তো পলি, ওকে রজনীগন্ধা বলছে কেন অনিমা?বিশ্রী মাড়ি বের করে হাসে অনিমা। “তুমি কোন জগতে থাকো গো মল্লিকাদি? কুমারী মেয়েগুলোই তো বেশি খেপ খাটে এখন। এখন সবাই ফোলোটিং। কেউ আর বাজারে ঘর নিয়ে বসতে যায়না। এইসব মেয়েগুলো মানে পোডাকটগুলোর আলাদা আলাদা নাম রয়েছে। রজনীগন্দাগুলো পুরুষ্টু হয়েছে, সেয়ানাও হয়েছে কিছুটা। বেলকুঁড়িগুলোর সবে কুঁড়ি ফুটেছে এই ন দশ বচর হবে; এইগুলোর দামই সবচে বেশি। একেবারে টাটকা, বায়নাক্কা কম। বেলুন টেলুন ছাড়াই কাজ মিটে যায়।”“বেলুন ছাড়া মানে?” অন্য কিছু খেলনা টেলনা দিয়ে ডাকে নাকি কচি মেয়েগুলোকে? মুখ দিয়ে অবশ্য এত কথা বেরল না। ঘেন্নায় মুখটা তেঁতো তেঁতো লাগে মল্লিকার।অনিমা এবারে একটু বিরক্তিতে ঝাঁঝি দিয়ে উঠল। শ্লেষে মুখ বেঁকিয়ে বলল, “নেকি নাকি রে এটা! বেলুন মানে কনডুম তাও জানো না? ওগুলোর তো মাসকে হয়নি না, তাই কনডুম ছাড়াই দে দনাদন।”শরীরে ঢেউ তুলে দুলে দুলে হাসে।মল্লিকা এবার অনিমার দিকে পিছন ফিরে বসল, গোটা গা জ্বলছে ওর রাগে। মনে হচ্ছে ঠাস করে একটা চড় বসিয়ে দেয় অনিমার গালে। অনিমা নিজেও তো একটা মেয়েই। কিন্তু এখন ওর চোখে মুখে যেন রেপিস্টের তৃপ্তি। খুব মজা পাচ্ছে।মল্লিকার চোখ মুখ দেখে ওর রাগ হয়েছে বুঝতে পারে অনিমা। একটু সরে বসে তুতলে বলে, "পয়সা দেয়, পয়সা দেয় তো কাজ করিয়ে। অনেক সময় বাপমায়ে মেয়েগুলোকে ভিড়িয়ে দিয়ে ভালোই মাল্লু বুঝে নেয়। আমাদের মত গায়ে খেটে আর ক’টাকাই বা হয়?"এবার রাগের থেকেও বেশি ঘেন্না করে মল্লিকার। অনিমার মনটাই হয়তো এরকমই। দয়ামায়াহীন। না হলে ওই ছোট ছোট মেয়েগুলোর যন্ত্রণা নিয়ে অমন মজা করতে পারে? মজাও কি বলা যায় একে নাকি মনের রোগ?এইরকম মা বলেই কি অনিমাদির ছেলেটাও কেমন যেন বখাটে হয়ে যাচ্ছে? শুকনো, প্যাঁকাটে মতন শরীর, চোখেমুখে বেপরোয়া একটা ভাব।মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে উঠে পড়ে মল্লিকা। ওর ছেলে মেয়ে দুটোই ভালো। কারো সাতে পাঁচে থাকে না। এত দুঃখের মধ্যেও ঐটুকু আশার আলো।এই যে জীবন এতো তাগবাগ করে ওর দিকে দুঃখের যন্ত্রণার কামানবন্দুক বাগিয়ে ধরেছে, তার মধ্যেও ও ছেলেমেয়ে দুটোকে আলোর দিকে এগিয়ে দিয়েছে।মোহনাটা পনেরোতে পড়ল। সব ক্লাসে পাশ করেনি কিন্তু পড়া ছাড়েওনি। ভাইটাকে আগলে রাখে আদরে, শাসনে। পলাশের বয়স বারো। মাস্টাররা বলে, দারুণ অঙ্কের মাথা। বয়স বারো হলে কি হবে এখনো মায়ের কোল আঁকড়ে পড়ে থাকে ছেলেটা।এই সন্তান সুখটুকুই যা বিধাতা লিখেছেন, নাহলে তো মল্লিকার ভাগ্য লিখতে গিয়ে খানিকটা বেভুল বৌদির মতই তাঁরও ভুলের ছড়াছড়ি।মল্লিকার বাবা লজেন্স ফেরি করত ট্রেনের চলন্ত কামরায়। কাঁচের বয়ামে লাল নীল কালো সবজে মিষ্টি গুলিগুলোর উচ্চতার ওঠা নামার সঙ্গে ওদের সেদিনের খাওয়ার মেনু ঠিক হত। লাল নীল লজেন্স একটু বেশী বিক্রি হলে সেদিন শেষ বাজারের মাছের টুকরো জুটে যেত পাতে।তবু ওর মধ্যেই পড়াশোনা করছিল মল্লিকা। কিন্তু হঠাতই তাল কেটে গেল । মল্লিকার খুব বন্ধু ছিল ওদের পাড়ার শোভনা। শোভনা বিহারী একটি ছেলের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেছিল। ছেলেটার নামটা এখনো মনে রয়েছে মল্লিকার। বাবুলাল।শোভনার বাপ মা মেনে নেয়নি প্রথম দিকটায়। পাড়ার লোকে ঠোঁট মুখ বেঁকিয়ে নানান কথা বলেছিল। তারপর আস্তে আসস্তে শোভনা বাপের বাড়ি এল।মল্লিকার বেশ ভালোও লাগত শোভনাকে। শোভনার নতুন শাড়িতে কেমন যেন একটা আমোদী গন্ধ। মাথার মাঝখান চিরে অনেকটা চলে যাওয়া সিঁদুরে পথ। হাতে কাঁচ আর গালার চুড়ির রংবাহার।শোভনা ওর বাবার কাছ থেকে বাবুলালের জন্য একটা সস্তা স্কুটার চেয়ে নিয়েছিল। সেই স্কুটার চড়েই আসত ওরা।তারপর আবার বেশ কয়েকদিন এলনা। বুধি পিসিরা বলল, “পেট খসিয়েছে।” একদিন মল্লিকার সঙ্গে স্কুলের পিছনে বেকারির রাস্তাটায় দেখা হয়ে গিয়েছিল শোভনার। মাথাচেরা সিঁদুরের পিছনে কেমন যেন সাদাটে রক্তশূন্য দেখাচ্ছিল ওর মুখটা। ম্লান হেসে বলল, “বাচ্চা এসে গেছিলো। বাবুলাল রাখলো না। ধুয়ে এলাম।”মল্লিকা তো তখন বেশ বড়, তারও মাসিক শুরু হয়ে গেছে বছর দুয়েক আগে। বিবাহিত বন্ধুর সন্তান আসার বিষয়টা তার কাছে অজানা নয়। আবার খুব একটা ভাবনা চিন্তা করেছে বিষয়টা নিয়ে এমনও নয়। তবু “ধুয়ে এলাম” শব্দটা তার কানের মধ্যে দিয়ে গিয়ে বুকে ধাক্কা দিল।খুব বেশী গভীরে ভাববার মত বড় ছিলনা মল্লিকা। তবু পেটের সন্তানকে ধুয়ে ফেলে দেওয়া যায় এটা আগে কখনো ভেবে দেখেনি বলেই হয়তো কিশোরী মনে অতটা ধাক্কা খেয়েছিল সেদিন।এরপর ওরা চলে গেল।মানে বাবুলাল চলে গেল ওর বাইক আর বৌকে নিয়ে বিহারের কোন গ্রামে।সেখান থেকে তিন চার মাস বাদে যে ফিরল তাকে দেখে আর আগের শোভনা বলে চেনা যায় না। কানে চুড়ির মত বড় বড় দুল, সকালবেলাই মুখেচোখে ফ্যাটফেটে মেকাপ, লো কাট সালোয়ার পরে এসে শোভনা ওর মাকে একটা স্ট্যান্ড ফ্যান, আর ঝকমকে শাড়ি কিনে দিয়ে গেল।শোভনা এখন নিজে রোজগার করে। বাবুলাল ওকে গ্রামে রেখে দিয়ে কোথায় চলে গেছিল।শ্বশুরবাড়ীর লোক ওকে তারপরের দিনই বের করে দেবে বলেছিল। কিন্তু ঐ গণ্ডগ্রাম থেকে কোন পথে যে বাড়ি ফিরে আসবে ভেবে আকুল হয়ে ওদেরই হাতে পায়ে ধরেছিল শোভনা।তখন ওরা বলেছিল যে ওদের একটা গানের দল আছে। বিয়ে বাড়ি, ফাংশান, এসব জায়গায় ওরা গিয়ে নাচে। নাচ মানে হিন্দি, ভোজপুরি গানের সঙ্গে শরীর দোলানো।ওদের কিছু টাকা থাকে, কিছু ঐ শোভনাদের মত মেয়েদের হাতে দিয়ে দেয়। কিন্তু পুলিশের সামনে বলতে হবে ওকে কেউ জোর করেনি।শোভনা বলেছিল মল্লিকাকে, সত্যি ওকে কেউ জোর করেওনি।কিন্তু ও ভেবেছিল বিয়ে করে, বাচ্চা ধুয়ে চলে গিয়ে কোন মুখেই বা ফিরে আসবে?মা আর শোভনার সঙ্গে কথা বলা পছন্দ করছিল না। তবুও শোভনা ডেকে ডেকে ওর সঙ্গে কথা বলত। মল্লিকাকে বলেছিল, ওদের গ্রামে সব ছেলের নামই বাবুলাল।তাদের সকলের বাবার নাম শিওচরণ। ওরা সবাই একই নামে ঘুরে বেড়ায় দেশের ছোট, ছোট গ্রামে, মফস্বলে। শোভনার মত মেয়েদের বিয়ে করে আনে। কখনো কখনো দহেজও আনে। তারপর আবার অন্য বাবুলাল হয়ে চলে যায় অন্য কোন জায়গায়।ওর বর বাবুলাল বেশ কয়েকদিন পরে আরও একটি মেয়েকে বিয়ে করে ফিরে এসেছিল গ্রামে। শোভনা ততদিনে বেশ কয়েকটা নাচের জলসায় চলে গেছে।ওর সঙ্গে শুতেও এসেছিল একদিন বাবুলাল। শোভনা শোয়নি। ওর বেশ নাম হয়েছে নাচের জলসায়। আবার পেট বাঁধাবার মত ঝামেলায় জড়াতে চায়নি।তবে এখান থেকেও তাড়াতাড়িই চলে গেল শোভনা।রোজ ওদের ঘর থেকে ওর বাবার সঙ্গে কথা কাটাকাটির আওয়াজ পেত মল্লিকারা।তারপরেও নাকি ওর মাকে টাকা পাঠাতো মেয়েটা। সেই আজব শ্বশুরবাড়ি থেকে শোভনা নাকি বম্বের মদের বারে নাচতে চলে গেছে।শোভনার ঘটনাটায় বাবা কিরকম দুশ্চিন্তা করতে শুরু করল। মল্লিকার বিয়ে দেবার জন্য উঠে পড়ে লাগল। না হলে তাপসের মত ছেলের সঙ্গে বাবা কি ওর বিয়ে দিত?বাবা আর কিছু দেখল না, কেবল পালটি ঘর দেখে বিয়ে ঠিক করে ফেলল।তাপসের মা ছিল না আর বাবা ছিলেন মুদির দোকানের কর্মচারী। তাপসের কোন বাঁধা রোজগার ছিলনা। কিন্তু বাজারে মদের দরুন একটি বাঁধা খরচা ছিল।সংসারটা বাবার আয়েই চলত। তাই দুটো সন্তান রেখে তাপস মরে যেতেও মল্লিকাকে ঘরের বাইরে রোজগার করতে বেরতে হয়নি। কিন্তু শ্বশুরমশাই মারা যেতে পাকাপাকি ভাবে ঝাড়ু-মোছা-বাসন করতে নেমে পড়েছিল।এতদিনে যেন আসল সংসার শুরু হয়েছে পলাশ আর মোহনার মায়ের। নিয়মিত আয় আর পরিমিত ব্যয়ে শ্রী ফিরিয়ে এনেছে সংসারে।সেদিন সকাল থেকেই মাথা টিপ টিপ করছিল মল্লিকার। আজ আর কাজে যায়নি ও। বরং ছেলেমেয়ে দুটোর জন্য একটু রান্না করতে বসেছিল।টগবগ করে কড়ায় ফুটছিল মাছের ঝোল। গরম ভাতে ফুট ধরে ফ্যান গড়িয়ে পড়ছিল। ভরপেট খাবারের সুখী গন্ধ ঘুরে বেড়াচ্ছিল ঘরে দুয়ারে।কিন্তু উনুনের সামনে বসে থাকতে থাকতে কেমন মাথা ঘুরে গেল মল্লিকার। মোহনাকে ডেকে বাকিটা সামলে নিতে বলে ভর সন্ধ্যেতেই শুয়ে পড়লো ও।শুলেও প্রথমে ঘুম আসেনি। চোখে ভাসছিল কত রকমের এলোমেলো নক্সা।চোখ বুজতেই নাকে আবার সেই দিগন্ত বিস্তৃত জলের গন্ধ। কিন্তু এই জলে সমুদ্রের ঢেউ নেই, আসা যাওয়া নেই। স্থির, নিষ্কম্প, বৃহৎ।এইরকম জলকেই বোধ হয় ভূগোল বইতে হ্রদ বলে। এই হ্রদ অঞ্চল ভারী মনোরম।এখানে আশেপাশে পাহাড়ের গুহাগুলোতে থাকে মানুষগুলো। সকালে খোপ থেকে বেরিয়ে আসে দলে দলে। কেউ কেউ পাহাড়ের দিকে চলে যায়। জ্যান্ত বা মরা পশু ধরে আনে। কেউ তুলে আনে মাটির নীচের কন্দ মূল। কেউ কেউ বাচ্চাগুলোকে নিয়ে বসে থাকে।ওর পেটে বাচ্চা আসে, বাচ্চা হবার পর বুকে দুধও আসে। বাচ্চাগুলো অনেকগুলো ‘সূর্য ওঠাপড়া’য় ওর সঙ্গে লেপটে থাকে। যে কটা বাচ্চা হয়েছিল, সবাইকে ওর মনে পড়েনা আর। এখন ওর গুহার চারজনের মধ্যে বড় বাচ্চাদুটো ছেলে। আর সব থেকে ছোটটা মেয়ে। আরও দু একটা ছেলে আর মেয়ে ছিল ওর। কটা মরে গেছে, কেউ বড় হয়ে জোড় বেঁধে চলে গেছে।ছোট মেয়েটা এখনো ওর কাছ ঘেঁসে থাকে, বাচ্চাটার সবে পাঁচটা শীত কেটেছে। ছেলেগুলো খাবার জোগাড় করে এনে খেতে শিখে গেছে। মেয়েটাকে এখনো খুঁজে পেতে এনে খাইয়ে দিতে হয়।ঠিক যেন নিজের শরীরের কাছে বাচ্চাটার শরীরের ওম নিতে নিতে ঘুমিয়ে পড়েছিল মল্লিকা।একটা খুব সাবধানী শব্দে ঘুম ভেঙে গেল।পলাশ উঠে বাইরে যাচ্ছে, কিন্তু যেন অতি সন্তর্পণে ওর পিছু নিল মোহনা।আদিম মানবীর মত টিঁকে থাকার বা টিঁকিয়ে রাখার ইচ্ছায় লঘু অথচ ক্ষিপ্র পদে ওদের পিছু নিল মল্লিকা। ভাঙ্গা দরজার কলঘরটার বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল মোহনা। বেঁটে বামনের মাথায় ঝাঁকড়া চুলের বাহারের মত ঝুঁজকো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকা জবা গাছটার ছায়ায় ছায়া মিশিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা।মোহনা কেন ওভাবে ওখানে দাঁড়িয়ে আছে?ভাবে মল্লিকা। মল্লিকা নাকি হ্রদের পাশ থেকে উঠে আসা কোন প্রাচীন জীবন?আসলে এখন মল্লিকার চেতনায় কোন ধন্দ ছিলনা। শরীরে, মনে, পূর্ণ সত্ত্বায় ও সেই আদিম মানবীকে ধারণ করেছে । কোন এক অজানা যাত্রা থেকে সে আসে, সেদিনও এসেছিল?কিন্তু মোহনা কি করছে অন্ধকারে? অপেক্ষা করছে কী? পলাশ কলঘর থেকে বেরিয়ে আসলে ও ঢুকবে বলে? না, ও তো কাউকে ইশারায় ডাকছে মনে হয়। ছায়ামানুষের মত কে যেন এসে দাঁড়াচ্ছে মোহনার পিছনে।বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে মল্লিকার। মেয়েটার বিপদ নাকি? কে এ?অনিমাদির বলা রজনীগন্ধা, বেলকুঁড়িদের বিপদের কথা মনে পড়ে যায়।কিন্তু ঘর থেকে দৌড়ে বেরতে যেতে গিয়েও পা দুটো ভারী হয়ে আসে।মোহনার বিপদ হলে ও চিৎকার করে উঠছে না কেন? ও কেন গভীর ষড়যন্ত্রের ভঙ্গীতে ঐ ছায়ার সঙ্গে কানাকানি করছে? কি বলছে ওরা?ধীরে, ধীরে ঘর থেকে অন্ধকারের মধ্যেই বের হয়ে আসে ও। মোহনা বা লোকগুলো কেউ খেয়ালই করেনা ঘরের অন্ধকার দরজার দিকে। মল্লিকা সামনের দিকে খানিকটা ঝুঁকে পড়ে এগিয়ে আসে। মোহনা নিজে পিছিয়ে গিয়ে ঐ ছায়ার মত লোকটাকে এগিয়ে দিয়েছে।এবার পাথরের মত স্থির হয়ে যায় মল্লিকা।“আজ দশ দিলাম। কাল বাকি তিরিশ নিয়ে যাস। মালটা ফেরেশ হলেও ছোট নয়। তা হলে আরও বেশি পেতিস। যত ছোট, পেছন মারার দাম তত বেশি।”মোহনা বলল, “বেঁচে থাকবে তো?”ছায়া ফিসফিসিয়ে বলল, “সেসব তুমি আগে ভাবলে না কেন মামুনি? তুমি তোমার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে বিয়ে করে পালাবে বলে ভাইকে বেচে দিচ্ছ। তো এখন আবার ধ্যাস্টামো কিসের? আর মরবে কেন? খুব ত্যাণ্ডাই-ম্যান্ডাই না করলে কেউ মরে না। ওসব ফালতু ঝামেলা। কাল সকালে মোড়ে ছেড়ে দিয়ে যাব। ও ঠিক নিজেই বাড়ি চলে আসবে। পার্টি বড় আছে, মাল পছন্দ হলে আবার ডাকবে। তুমি কেবল মুখ বুজে নিজের মাল বুঝে নাও। আর একবার পেছন মারা গেলে কেউ মুখ খোলেনা। ব্যস।”মল্লিকা স্থানুর মত দাঁড়িয়ে আছে।ছায়া বলছে, “ও দুদিন বাচ্চাটা ঘ্যান ঘ্যান করতে পারে। কিন্তু মাকে যদি পয়সার ভাগ দিতিস, দুদিন পর সেই আবার পাঠাতো। এখুন হিস্যার ব্যাপারটা তোদের ফ্যামিলির লাফরা। তোরা বুঝে নিবি।”ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। মল্লিকার অস্তিত্ব জুড়ে বসছে প্রাগৈতিহাসিক চেতনা।আজ সারাদিন খাবার জোটেনি মা আর মেয়ের। বড় ছেলেটা ফিরে এসেছে সূর্য ডুবতেই।ক্লান্তিতে একটু চোখ বুজে এসেছিল। হঠাৎ বিদ্যুতের আলোয় দেখল বড় ছেলেটা ঝুঁকে পড়েছে মেয়েটার মুখের ওপর। মেয়েটার শিশু শরীরটাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে ওর নখওলা লোমশ হাতটা। ও ধাক্কা দিয়ে ছেলেটাকে সরিয়ে দিতে চাইল, সাবধান করতে চাইল মুখে জান্তব আওয়াজ তুলে।কিন্তু ছেলেটা শুনল না, সেও গর্জন করে উঠল। আবারও ঘেঁসে এগিয়ে আসতে থাকল ছোট্ট মেয়েটার নিম্নাঙ্গ লক্ষ্য করে।আর অপেক্ষা করেনা ও। পশু তাড়ানোর জন্য হাতের কছে রাখা গাছের ডালটা নিয়ে সজোরে বসিয়ে দেয় ছেলেটার ঘাড়ে। ছেলেটা ঘাড় ধরে বসে পড়ে তীক্ষ্ণ স্বরে চিৎকার করতে থাকে। হামাগুড়ি দিয়ে আবারও এগিয়ে আসতে থাকে ওদের দিকে।ও মেয়েটাকে বাঁচানোর জন্য দৌড়তে শুরু করে। সেই ভয়ঙ্কর ঝড় বৃষ্টির মধ্যে। আশেপাশে আর কোন পশু আছে কিনা লক্ষ্যও করে না ওরা। কোথায় দৌড়ে যাবে তারও ঠিক নেই। হয়তো দূরের অন্য কোন গুহায়। বা গুহা ফেলে আরও দূরে। পাথুরে মাটি ছেড়ে হ্রদের দিকেই ছোটে ওরা।ছুটতে থাকে ওরা। মা ও শিশু, পৃথিবীর প্রথম দল।হ্রদের পাশের নরম কাদায় গেঁথে যেতে থাকে আদিম মানবীর পায়ের দাগ। নরম ভূত্বকে ইতিহাস আঁকা হতে থাকে ইভের পদচিহ্নে।কড় কড় করে বাজ পড়ে, সঙ্গে ঝুম বৃষ্টি।মল্লিকা দেখে ছায়াটা পলাশকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলেছে। মুখে গুঁজে দিয়েছে একটা কাপড়ের টুকরো। মোহনা লোকটার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে।ওরাও এবার বিদ্যুতের আলোয় দেখতে পেয়েছে মল্লিকাকে।কিন্তু একটু দেরিই হয়ে গেছে ওদের। মল্লিকার হাতের লাঠি নিপুণ লক্ষ্যে নেমে এসেছে ছায়া ছায়া লোকটার মাথায়। লোকটার মাথার আশেপাশেও। একবার, দুবার, বারবার।লোকটা নিঃশব্দে পড়ে যায়। ভয়ে সাদা হয়ে আসা মুখে, মাথায় রক্ত মেখে মোহনা তাকিয়ে থাকে মল্লিকার দিকে।****************************অনিমা বলল, “যে গেছে, সে তো গেছেই। এখুন ছেলেটার মুখ চ্যায়া তোকে তো বাঁচতে হবে বুন। খাবার না খাস একটু জল অন্তত খা।”পলাশের ধুম জ্বর। জলপটি পালটে পালটে দিচ্ছে অনিমা।মল্লিকা একটা কথাও বলছে না। এতটুকু কাঁদছেও না। বসে আছে একেবারে স্থির, নিষ্কম্প। অনিমারা অনেকে মিলে ওকে একটু কাঁদাবার চেষ্টা করেও পারেনি।সকাল বেলায় কাজে যাবার সময় একটা লোক আর মোহনার মৃতদেহ দেখতে পায় প্লতু মিস্তিরি। মল্লিকাদের ঘরের পেছনে, জলে কাদায় মিশে শরীরদুটো পড়েছিল। প্লতুই হাঁকডাক করে লোকজন ডাকে।ঘরে মল্লিকা অজ্ঞানের মত ঘুমিয়ে ছিল, পলাশের তখন থেকেই জ্বর।পুলিশ বলছে, লোকটা একটা আড়কাঠী। গরিবির সুযোগে মেয়েদের দেহব্যবসায় নামানোই ওর কাজ। হয়তো, মোহনার সঙ্গেও সেরকম একটা কিছু করতে গেছিল। মোহনা উল্টে মার দেয়।অবশ্য মার বা পাল্টা মার দেওয়ার কোন অস্ত্র খুঁজে পাওয়া যায়নি।পুলিশ অফিসার পাড়ার কাউন্সিলারকে নিয়ে তদন্তে এসেছিল। মল্লিকাকে বলে গেল, তদন্ত হবে।তবে এসব কেসে সবাইয়েরই টুকটাক ভাগ থাকে। কতদূর তদন্ত হবে ভগবানই জানে।প্লতু অবশ্য মড়া দুটো দেখে হাঁকুপাঁকু করে মল্লিকার দরজায় আসতে গিয়ে দুয়ারে একটা অদ্ভুত পায়ের ছাপ দেখেছিল। একটু বেশিই থ্যাবড়া মত, বুড়ো আঙ্গুলটা বেশ বড়।পরে আড়চোখে মল্লিকা বৌদির পায়ের দিকে তাকিয়েছিল ও। মল্লিকার পা ওরকম নয়। অবশ্য সে ছাপ আর খুঁজে পাওয়া যাবেনা। গোটা বস্তিটাই ভেঙে পড়েছিল কিনা ডবল মার্ডার দেখতে। কাউকে কিছু বলেনি সে। পুলিশকে তো নয়ই। এমনিতেই সে বডি প্রথম দেখেছে বলে তিন চার বার থানায় ডেকে ফেলেছে ওকে। আর ঐসব পায়ের ছাপের গপ্পো ঘেঁটে ঘ করতে চায়না প্লতু মিস্ত্রি।আর বস্তির লোকজনকে তো মোটেই বলা যাবেনা, তারা আবার ভূত প্রেতের গল্প ছড়াবে।সদিবুড়ী কাঠকুটো কুড়িয়ে বেড়ায়। উঠোনে কাঠের উনুন জ্বালিয়ে মাঝে সাঝে এটা সেটা জ্বাল দেয়। সকালে জোড়া খুনের বাড়ীটার আশেপাশে ঘুরছিল। তখনও ওখানে জোড়া খুন হয়েছে জানতোনা। বাড়ীটার খানিকটা দূর থেকে একটা বেশ মোটা কাঠ কুড়িয়ে এনেছে ।অনেকদিন ওরকম ভালো কাঠ দেখেনি ও। টুকরো টুকরো করে কেটে রেখেছে। রাতে উনুন ধরাবে।
  • হরিদাস পালেরা...
    বৈঠকি আড্ডায় ১১  - হীরেন সিংহরায় | ভোটাভুটি খরচাপাতিপর্ব ৫ভোটের সময় এলেই দেওয়াল লিখনে প্লাবন , পাইকপাড়ায় আমাদের বাড়ির উলটো দিকের মাঠে জনসভা, গান , নাটক – দিন বদলের পালা সেখানেই দেখেছি- বাতাসে উন্মাদনা  ।  সাতের দশকের শেষে  স্লোগান  বদলেছে  ‘ বন্দুকের নলই   ক্ষমতার উৎস’  অথবা  ‘ বিপ্লব কোন ভোজসভা নয় ‘ অমিল  ;   তিমির ( তিমু )  গাঙ্গুলি অমর রহে লেখা সাদা শহিদ বেদির পাশ দিয়ে কাস্তে হাতুড়ি তারার মিছিল, স্বৈরাচার নিপাত যাক । ১৯৭৭ সালে দেশ ছাড়ার আগে পাইকপাড়া কুমার আশুতোষ স্কুলে মায়ের সঙ্গে যখন ভোট দিতে যাই,  জানতাম না পরের দেড় দশকে পাসপোর্টের রঙ বদলে যাবে, জন্মভূমিতে ভোট দেওয়ার অধিকার হারাবো চিরতরে । দেশে সেটাই আমার শেষ মতদান ।ভাষা শিক্ষা ও ব্যাংকিং ট্রেনিং সম্পূর্ণ হলে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ায় যোগ দিয়েছি -এবার ফ্রাঙ্কফুর্টে স্থিতু , কাজের ঠিকানা গোয়েথস্ত্রাসে ২৬-২৮,  বাড়ির ঠিকানা হার্টমান-ই-বাখস্ত্রাসে ২৩।  এমন সময়ে জানা গেলো আমাদের হেসেন প্রদেশে নির্বাচন হবে। কিন্তু নগরীতে কোন  উত্তাপ  নেই কেন ? জার্মান টেলিভিশনের তিনটে চ্যানেল,  দুটো দেশব্যাপী , একটি প্রাদেশিক - হেসেন দ্রাই ; সেগুলো চালু হয় সন্ধ্যে ছটায় , রাত সাড়ে এগারোটায় টি ভি পর্দা অন্ধকার।  ব্রিটেনে মর্নিং টেলিভিশন শুরু হওয়ার খবরে প্রচুর ব্যঙ্গ হয়েছিল – ব্রিটিশরা সকালে উঠে কাজে যাবেন না টি ভি দেখবেন !টেলিভিশন সরকারি । কেবলমাত্র  সন্ধ্যে সাতটা থেকে পনেরো মিনিট কার্টুন সহযোগে বিজ্ঞাপন দেখানো হয়। আর কোন  কমার্শিয়াল ব্রেক নেই , কেউ বলে না এখুনি ফিরছি, সঙ্গে থাকুন । কলগেট  টুথপেস্ট বা ভারস্টাইনার বিয়ারের গুণের কোন প্রচার হয় না সেখানে। জার্মান টেলিভিশনে অন্য ভাষার ছবির সাব টাইটেল নেই, সবই ডাব করা ; জেমস বন্ড রূপী শন কনারি , মেরিলিন মনরো সব্বাই কি চমৎকার সাধু জার্মান বলেন ( এ ব্যাপারে অবশ্য জার্মানরা একা নন, ফ্রেঞ্চ ইতালিয়ান স্প্যানিশ টি ভি ডাব করায় সিদ্ধহস্ত ) । সন্ধ্যে বেলা প্রাইম টাইমে কার্ল নভোতনি বনার রুনডে ( রাজধানী বনের পরিক্রমা ) নামক সাময়িক বিষয়ের এক ক্লান্তিকর আলোচনা অনুষ্ঠান করতেন।  ইংরেজি টি ভি দেখার একমাত্র উপায় ছিল আমেরিকান ফোরসেস নেটওয়ার্ক – সেটা ফ্রাঙ্কফুর্ট অঞ্চলে পাওয়া যেতো । ডাচ এবং জার্মান টি ভি সেকালে ইউরোপে  সবচেয়ে বোরিং বলে পরিচিত , এমনকি বেলজিয়ান টি ভিতে সাব টাইটেলওলা ছবি দেখায় তখন ! ইংরেজি সংলাপ শোনা যায়।  বেলজিয়ান টি ভির সাব টাইটেল কখনো তিন ধাপে – ইংরেজি ফ্লেমিশ ফরাসি !বনার রুনডে : এ্যাংকর নভোতনি ১৯৮০জার্মান বেতার তরঙ্গ সরকারি - যেমন কমন মার্কেটের অন্য দেশেও। সে সময়ে  লন্ডনের কাছে টেমস নদীর বজরায় বসে কিছু উদ্যোগী যুবক নিয়ন্ত্রণকে কলা দেখিয়ে প্রথম প্রাইভেট রেডিও  স্টেশন চালান, তার নাম রেডিও ক্যারোলাইন।  জার্মান টেলিভিশনে ( ফার্নসেহেন – আক্ষরিক অর্থে দূরদর্শন !) দু বার খবর পড়া হয়,  সন্ধ্যে সাতটা ও রাত দশটায় । এর মধ্যে দুনিয়া উলটে গেলেও সে সংবাদ জানানোর কোন ব্যবস্থা নেই । রেডিও অবশ্যই আছে তবে সেখানেও ঐ কয়েক দফা সমাচার পরিবেশিত হয় , সেটা তাদের আপন মরজিমাফিক,  আপনার নয় ।তাহলে দীন দুনিয়ার খবর মেলে কোথা থেকে ? দৈনিক  কাগজের কৃপায়  – সেটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মালিকানার অধীন। ফ্রাঙ্কফুরটার আলগেমাইনে , মিউনিকের সুদ ডয়েচে তসাইতুং,  হামবুর্গের ডি ভেলট , বারলিনার মরগেনপোস্ট ইত্যাদি  দৈনিক এবং ইউরোপের সবচেয়ে বিক্রীত সাপ্তাহিক ডের স্পিগেল – আয়না ( তাদের সঙ্গে ব্যবসা করার সুযোগ হয়েছিল , আমার জার্মানি বইতে সে গল্প আছে ) অথবা স্ট্যারন ।ভাষা শিক্ষার স্কুল থেকে স্টেট ব্যাঙ্কের অফিসে আসামাত্র বুঝেছি সৌজন্য মূলক বারতালাপ করতে পারি কিন্তু  বিজনেস জার্মান অথবা ফ্রাঙ্কফুরটার আলগেমাইনে পড়ার মতন উচ্চমার্গের সংবাদ পত্র পড়ে বোঝার ক্ষমতা অর্জন করি নি। এমন সময় সাক্ষাৎ হলো যে পরিত্রাতার সঙ্গে সেটি হামবুর্গের আক্সেল স্প্রিঙ্গার গ্রুপের বহুল বিক্রীত বিলড নামক দৈনিক পত্রিকা  ( পনেরো লক্ষ বিক্রি , পাঠক পঁচাত্তর লক্ষ, পাঁচ জনে সে কাগজ  ভাগাভাগি করে থাকেন )  আট পাতার কাগজ ; যেটিকে আজকের হিসেবে ট্যাবলয়েড বলা যায় ,  রগরগে খবরে পাতা ভরানো, কিছু চাঞ্চল্যকর  ছবি। ছাপার ফন্ট বড়ো।  কোনো  খবর দুশ  শব্দের বেশি নয়। অত্যন্ত অবাক হয়ে লক্ষ করলাম পড়ে বুঝতে পারছি ! ইউরেকা মুহূর্ত ! আমার মা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বর্ণ পরিচয়ের দ্বিতীয় ভাগ অবধি বিদ্যাশিক্ষা করে আনন্দবাজার পত্রিকার  মাস্তুলে পয়লা মাঘ  থেকে আরম্ভ করে কাগজ যে ৬ নম্বর সুতারকিন স্ট্রিট ( পরে প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট) ছাপা হয়েছে সে অবধি পড়তে পারতেন। জার্মান বর্ণ পরিচয়ের প্রথম ভাগের সমতুল্য বিদ্যায় বিলড পত্রিকা গড়গড় করে পড়া ও তার চেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, বোঝা যায় । ইউরোপে এর  তুলনা  লন্ডনের সান । প্রসঙ্গত বলি একান্ত অজ্ঞাত কারণে লন্ডনের কোথাও আপনি বিলড কিনতে পাবেন না, জার্মানিতে সান মেলে না।  অথচ এ দুটো কাগজ স্পেনের যে কোন বিচে নিউজ স্ট্যান্ডে পাশাপাশি দেখা যায় ।দু মাসের ভেতরে হেসেন রাজ্যে প্রাদেশিক নির্বাচন।  কোথাও কোন সাড়াশব্দ নেই।  ‘ ভোট দিন’  বলে কোন জুলুস বেরোয় না, দলে দলে কোন জনসভায় যোগ দেওয়ার আবেদন জানিয়ে পোস্টার বা দেওয়াল লিখন চোখে পড়ে না । শহর বাজারে বড়ো দোকানের সামনে ফুটপাথে একটু বিশাল আকৃতির ফোটো ফ্রেমে কোন প্রার্থীর হাসিমুখের ছবি – উপরে লেখা এঁকে ভোট দিন!  আমাদের হিসেবে জনসভা হয় না । পুরনো ফ্রাঙ্কফুর্টের রোয়েমারে বড়জোর শ দুই মানুষ দাঁড়িয়ে  বিদেশ মন্ত্রী হান্স- দিয়েতরিখ গেনশারের ভাষণ শোনেন ।ফ্রাঙ্কফুর্ট - পুরনো শহর- রোয়েমার ছয়ের ও ষাটের দশকের ভোট রঙ্গে উত্তাল কলকাতা দেখেছি।  এখানে  এসে মনে হচ্ছে এ কি ব্যাপার ? অফিসে দোকানে কোন গরম হিটেড তর্ক হচ্ছে না,  যার বিয়ে তার হুঁশ নেই । এ কেমন নির্বাচন? আপিসে খোঁজ করি । আমার ভোটের অধিকার নেই তবু একটু জানতে ইচ্ছে করে বিশেষ করে ঐ যে প্রার্থীর ছবির ওপরে তার দল এবং পাশে একটি চৌকো বাক্সে পার্টির নামে টিক দেওয়া থাকে কেন ? শ্রীধরের সহকর্মী  ক্লাউস নিহুস বুক কিপিঙের গুরু , ভালো ইংরেজি বলতেন । একদিন  তাঁর কাছে হাজির হলাম । নিহুস তাঁর কাজের ফাঁকে বললেন,  জার্মানিতে  পোলিং বুথে গিয়ে কেবল স্থানীয় প্রার্থী নির্বাচন করা হয় না । সেখানে আপনি একটি দলের প্রতি আপনার সমর্থন ব্যক্ত করেন।  আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ( প্রপরশনাল রিপ্রেসেনটেশন ) পদ্ধতির এই নিয়ম। ধরুন কোন কেন্দ্রে চারজন প্রার্থী ; সেখানে যিনি বেশি ভোট পাবেন তিনি নির্বাচিত হবেন – ইংরেজিতে যাকে আপনারা বলেন  ফার্স্ট পাসট দি পোস্ট । একজন পেলেন পাঁচ হাজার, কেউ চার হাজার একজন ছ হাজার কিন্তু সাড়ে ছ হাজার ভোটে পেয়ে একজন জিতলেন ( ঠিক আমাদের দেশে যা হয়ে থাকে) ।  পনেরো হাজার ভোট মাঠে মারা গেলো , সাড়ে ছ হাজার পেয়ে কেউ জিতলেন । মনে রাখতে হবে হেসেনের বিধান সভায় আছে সত্তরটি আসন কিন্তু সরাসরি নির্বাচনে তার অর্ধেক সিট নির্ধারিত হয়।মূর্খের মতন প্রশ্ন করলাম, বাকি পঁয়ত্রিশ জন কিভাবে বাছা হবে ?নিহুস বললেন,  ব্যালট পত্রে টিক দেবার জায়গা দুটো -প্রার্থীর নাম এবং তার পাশে দলের নাম।  সে দল ঐ প্রার্থীরই  হতে হবে এমন মানে নেই;  ধরুন আপনি ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়নের প্রার্থীকে ভোট দিলেন । তাঁকে  আপনার পছন্দ কিন্তু আপনি রাজনীতিতে রাস্তার বাঁ দিকে হাঁটতে ভালবাসেন , তাই সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক দল আপনার বেশি পেয়ারের । অর্থাৎ সরাসরি ভোটটা দিলেন ক্রিস্টিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন পার্টির কাউকে কিন্তু বৃহত্তর অর্থে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক দলকে ভালবেসে স্বচ্ছন্দে সেখানে টিক মেরে দিলেন।সরাসরি প্রার্থীর বাইরে প্রত্যেক পার্টির একটা লিস্ট তৈরি করা থাকে, যে দল যত বেশি পারসেন্ট ভোট পাবে তাদের  অধিকার তত বেশি বিধায়ক পাঠানোর।  কিন্তু হিসেবটা এখানেই শেষ নয়;  ঐ যে সরাসরি যারা নির্বাচিত হয়েছেন তাঁদের ভোট সংখ্যার সঙ্গে জোড়া হবে পার্টি যে ভোট পেয়েছে ( ছবিতে দেখুন, দ্বিতীয় লিস্ট ) এই দুটো মিলিয়ে যে দল ৫০.১ % ভোট পেয়েছে সে দল সরকার গঠন করতে পারে । তাদের একার মুরোদে না কুললে কোয়ালিশনের গাঁটছড়া ।পাঠক!  জানি এ অবধি পড়ে আপনার মাথা ঝিমঝিম করছে । সেদিন আমার মনে হয়েছিল কি মরতে ক্লাউস নিহুসের কাছে এ প্রসঙ্গ পেড়েছিলাম ! শ্রীধর ( পরে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার ম্যানেজিং ডিরেক্টর ) একটু ভ্রুভঙ্গিতে ক্লাউসকে বিড়ম্বিত না করার অনুরোধ জানাল। সে আমলে গুগল নেই, জার্মান লাইব্রেরিতে গিয়ে দেশের নির্বাচন পদ্ধতি বোঝার মতন ভাষার দৌড় নেই । অতএব লোকমুখে জ্ঞান আহরণ করাটাই একমাত্র পথ ; আমার প্রিয় বন্ধু , চিফ এবং পথ প্রদর্শক ( ফ্রয়েনড ফুয়েরার উনড ফিলসফ ) অরটউইন কোন প্রকারের রাজনৈতিক আলোচনা থেকে শত হস্ত দূরে থাকে । এমন সময়ে পেলাম দিয়েতরিখ  লেমানকে;  তাঁদের আদি বাড়ি এককালের শ্লেজিয়েন  /সাইলেশিয়া ; বর্তমান পোল্যান্ডের ভ্রতস্লাভ ( পুরনো জার্মান নাম ব্রেসলাউ)।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সাইলেসিয়া থেকে বিতাড়িত হাজার হাজার জার্মানদের মতন লেমান পরিবার পদব্রজে  প্রথমে যুদ্ধ বিধ্বস্ত পশ্চিম জার্মানিতে এসেছিলেন।  দিয়েতরিখের  পিতা মাতা দশ বছরের ছেলেকে নিয়ে  শান্তির নীড়ের সন্ধানে চলে যান অনেক দূরে, আফ্রিকায় পর্তুগিজ কলোনি মোজাম্বিকে, সেখানে দিয়েতরিখের স্কুল পর্ব । প্রথম কয়েক বছর ভালো কাটলে কি হবে, কপাল গেছে  সঙ্গে! সেখানে প্রথমে শুরু হলো কলোনিয়াল পর্তুগিজের সঙ্গে  সংঘর্ষ ,  তার পরে গৃহযুদ্ধ।  অগত্যা তাঁরা গেলেন দক্ষিণ আফ্রিকা;  ছয়ের দশকে সাদা কালোর সংঘাত সেখানে তুঙ্গে । ততদিনে পিতা বিগত , মাতা বললেন যা থাকে কপালে, জার্মানি যাই , দেশটা তেমন  চিনি না তবু তারা অন্তত ভাষাটা বলে! দিয়েতরিখ এলেন ফ্রাঙ্কফুর্ট । বিয়ে করেন নি।  বাড়িতে অজস্র বই।   প্রচুর পড়াশোনা করেছেন , করেন। স্কুলে  পর্তুগিজ স্প্যানিশ শিখেছেন , ভালো আফ্রিকানস জানতেন ( মোজাম্বিক ও দক্ষিণ আফ্রিকা বাসের কারণে )। নানা দেশ ঘুরে , নানান যুদ্ধ দেখে,  এতবার ঘা খেয়ে হারিয়েছেন বিশ্বাস।  তিনি পলিটিকালি কারেক্ট কথাবার্তার ধার ধারতেন না।  একদিন বললেন, আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির স্টাইলে আমাদের উচিত একটা সাইলেসিয়ান রিপাবলিকান আর্মি বানিয়ে সাইলেসিয়া উদ্ধার করা । নুরমেবেরগে আদালত খুলে ভিয়েতনামে আমেরিকানদের ওয়ার ক্রাইমের বিচার হোক।তাঁর সঙ্গে এই আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনা করছিলাম একদিন আমাদের  ওঙ্কেল মাক্স পাবে বসে। দিয়েতরিখ বললেন এই সিস্টেমটা জটিল মনে হতে পারে আপনার কাছে কারণ আপনারা ব্রিটেনের ওয়েস্ট মিনসটার স্টাইলে দশজনের মধ্যে যে বেশি ভোট পেল তাকেই নির্বাচন করেন।  সে ব্যবস্থা আমাদেরও আছে, কিন্তু ভাইমার সংবিধান স্থির করেছিল দেশ সেই দলই শাসন করবে যারা দেশের ভোটারদের অন্তত অর্ধেকের বেশিজনের  মত পেয়েছে । ব্রিটিশ সিস্টেমে ৩২% ভোট পেয়ে কোন দল নিরঙ্কুশ সংখ্যা গরিষ্ঠতা পেতে পারে – ভাইমার সংবিধান সেটির রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছিল।কিন্তু সমস্যা দেখা দিলো  অন্যত্র –সংখ্যা গরিষ্ঠ না হলে বৃহত্তম দলকেও কোয়ালিশনে যেতে হয় । সে কোয়ালিশন হবে কাদের সঙ্গে? আর যদি ঠিক বনিবনা না হয় তাহলে? আবার নির্বাচন ? এই অনিশ্চয়তার দরোজা দিয়েই তো ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টি ক্ষমতা দখল করেছিল , সেটি আর ফেরত দেয় নি !জার্মানিতে আসার পর এই প্রথম কোন জার্মান হিটলার প্রসঙ্গ তুললেন ।অয়মারম্ভ।  সে ইতিহাস জানতে গেলে আরও গভীরে যেতে হবে।  যাবো। ক্রমশ 
    কিষেণজি মৃত্যু রহস্য - পর্ব ৪  - বিতনু চট্টোপাধ্যায় | সুনীল কুমারের ডায়েরিঃ কিষেণজিসুনীল কুমার আইপিএস অফিসার। ২০১৬ সালের শেষে তাঁর সঙ্গে দেখা করলাম। তাঁর কলকাতার অফিসে। লালগড় আন্দোলন শুরু হল ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসে। সেই সময় থেকে ২০১১ সালের নভেম্বরে কিষেণজির মৃত্যু পর্যন্ত পাক্কা তিন বছর, এই সময়জুড়ে একাধিক পুলিশ অফিসার কাজ করেছেন পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রামে। আবার রাজ্য পুলিশের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) কিংবা কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সও (এসটিএফ) বিভিন্ন সময় লালগড়ের মাওবাদী কার্যকলাপ নিয়ে একই সঙ্গে অফিশিয়ালি এবং আনফিশিয়ালি তদন্ত করেছে। লালগড়ের মাওবাদী মুভমেন্ট নিয়ে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে কাজ করেছেন এমন দু’-তিনজন অফিসারের সঙ্গে কথা বলি আমি। যেহেতু তাঁরা সকলেই এখনও চাকরি করছেন, তাই আমার সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁদের একটাই শর্ত ছিল, লেখায় তাঁদের নাম ব্যবহার করা যাবে না। এই দু’তিনজন পুলিশ অফিসার আমাকে যা বলেছেন হুবহু তাঁদের নামেই লেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তা সম্ভব না হওয়ায় কাল্পনিক একটা নাম বাছতে হল। ধরা যাক সেই কাল্পনিক নাম সুনীল কুমার। আসলে যে দু’তিনজন অফিসারের সঙ্গে আমি কথা বলেছি তাঁদের বক্তব্যই আমি লিখব সুনীল কুমারের নামে। নাম পরিবর্তিত, ঘটনা নয়। আমি যখন সুনীল কুমারের সঙ্গে কথা বললাম তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের বয়স পাঁচ বছরের বেশি।  ‘২০০৯ সালের মোটামুটি শুরু থেকেই আমরা বুঝতে পারছিলাম, লালগড় আন্দোলনের নেতৃত্বে বড়সড় কেউ আছে। শালবনিতে চিফ মিনিস্টারের কনভয়ে ব্লাস্ট হল। পুলিশ গ্রামে গেল তল্লাশি চালাতে, কয়েজনকে মারধোর করল, আর স্পন্টেনিয়াস মুভমেন্ট শুরু হয়ে গেল, ইটস নট সো ইজি। তাছাড়া গ্রামের কয়েকজন মানুষ মিলে পুলিশ, সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখাতেই পারেন, কিন্তু সেটাকে একটা মাস মুভমেন্টে কনভার্ট করা সোজা নেই। শালবনি ব্লাস্টের কয়েক দিন বাদেই যখন পুলিশ সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণের কমিটি তৈরি হল এবং তারা থানায় গেল ডেপুটেশন দিতে, তখনই তাদের ডিমান্ডের প্যাটার্ন দেখে বোঝা গিয়েছিল মাওয়িস্টরা এর পেছনে আছে। কিন্তু বোঝা যায়নি এর লিডারশিপ কে দিচ্ছে। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম শশধর মাহাতোর কথা। শশধর তখন লালগড়ে মাওয়িস্টদের প্রমিনেন্ট লিডার। কিন্তু দু’এক মাসের মধ্যেই মুভমেন্টের ক্যারেক্টার দেখে আমাদের মনে হচ্ছিল, আরও ম্যাচিওরড ব্রেন আছে এই লালগড় মুভমেন্টের পেছনে। এটা শুধুমাত্র শশধর মাহাতো, তাঁর স্ত্রী সূচিত্রা বা স্থানীয় মাওয়িস্টদের ব্যাপার নয়। মুভমেন্টের কিছু কিছু সিম্পটম দেখে মনে হচ্ছিল, এর সঙ্গে ছত্তিসগঢ়, ঝাড়খন্ডের লিবারেটেড জোনের মাওয়িস্ট অ্যাক্টিভিটির মিল আছে। কিন্তু মাওয়িস্টদের কোন লেভেলের লিডারশিপ এখানে অপারেট করছে বোঝা যায়নি। ইন ফ্যাক্ট শুরুতে আমরা জানতে পারিনি, মাওয়িস্ট পলিটব্যুরো মেম্বার কোটেশ্বর রাও ওরফে কিষেণজি ঝাড়গ্রামে এসেছেন এবং এই মুভমেন্টের প্ল্যানিং তাঁরই। এখানে কিষেণজির থাকার কোনও নিশ্চিত প্রমাণ আমরা প্রথম হাতে পেলাম মার্চের শেষে বা এপ্রিলের শুরুতে। সময়টা একটু এদিক-ওদিক হতে পারে, তবে লোকসভা ভোটের আগে।’‘কীভাবে?’‘বেলপাহাড়ি এলাকার চাকাডোবার কাছাকাছি প্রায় পাশাপাশি দুটো গ্রাম লালজল এবং মাজুগাড়া। পিচ রাস্তার দু’দিকে। ২০০৯ এর লোকসভা ভোটের বেশ কিছুদিন আগে এক দুপুরে ওই এলাকা থেকে সিপিআইএমের দুজন সাধারণ লিডারকে অপহরণ করল মাওবাদীরা। তখন বেলপাহাড়ি, বিনপুর, লালগড়ে মাওয়িস্টদের প্রভাব প্রচণ্ড বেড়ে গেছে। অপহরণের কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা খবর পেলাম এবং সঙ্গে সঙ্গে প্রচুর ফোর্স পাঠালাম। জঙ্গলে সার্চ অপারেশন শুরু হল। এক দেড় ঘন্টার মধ্যে ফোর্স জঙ্গলের অনেকটাই ঘিরে ফেলল। তখন দুপুর। তাছাড়া তখনও বর্ষা নামেনি, জঙ্গল ছিল অনেকটাই ফাঁকা। ক্লিয়ার ভিসিবিলিটি ছিল। মাওবাদী অপহরণকারী দলটার প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছিল ফোর্স। মাওয়িস্টরাও আইডিয়া করতে পারেনি এক-দেড় ঘন্টার মধ্যে আমরা হিউজ ফোর্স জঙ্গলে মোবিলাইজ করতে পারব। যখন ওরা ফোর্সের মুভমেন্ট টের পেল তখন আমরা ওদের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। এক্সচেঞ্জ অফ ফায়ার হল। টানা প্রায় দু’ঘন্টা চলল গুলির লড়াই। বাধ্য হয়ে অপহৃত দুজন সিপিআইএম লিডারকে জঙ্গলে ফেলে আরও ভেতর দিকে মুভ করে গেল মাওয়িস্ট গ্রুপটা। বিকেল নাগাদ অপহৃত দুজনকেই জখম অবস্থায় উদ্ধার করলাম আমরা। মাওবাদীরা ওদের ফেলে পালাতে বাধ্য হয়। কিন্তু পালানোর সময় ওরা দুটো ছোট দলে ভাগ হয়ে গেল। সেটা অবশ্য আমরা সেই মুহূর্তে বুঝতে পারিনি, বুঝেছিলাম কিছুক্ষণ বাদে মোবাইল ফোন ইন্টারসেপ্ট করে।  জঙ্গলের ভেতরে যখন আমাদের ফোর্সের সঙ্গে মাওবাদীদের গুলির লড়াই চলছে, সেদিনই বিকেলে তার থেকে মাত্র দু-তিন কিলোমিটার দূরে বেলপাহাড়ি বাঁকুড়া হাইওয়েতে জনসাধারণের কমিটির (পুলিশি সন্ত্রাস বিরোধী জনসাধারণের কমিটি, যা ২০০৮ সালের নভেম্বরে লালগড়ে তৈরি হয়) একটা মিছিল ছিল। তখন লোকসভা ভোট আসছে। ঝাড়গ্রামের নানা জায়গায় প্রায় রোজ জনসাধারণের কমিটির মিছিল লেগেই থাকত। সেদিনের ওই মিছিলের জন্য বেলপাহাড়ি-বাঁকুড়া মেন রোডে প্রচুর পুলিশ মোতায়েন ছিল। এর জন্য আমাদের একটা সুবিধে হয়েছিল সেদিন। জঙ্গলের ভেতরে মাওয়িস্টদের সঙ্গে এনকাউন্টার শুরু হওয়া মাত্রই মিছিলের জন্য ডেপ্লয় করা রাস্তার ফোর্সকেও আমরা অ্যালার্ট করলাম। কারণ, জঙ্গলে মাওবাদীদের সঙ্গে গুলির লড়াইয়ের সময়ই আমাদের মনে হচ্ছিল, কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ স্কোয়াড মেম্বারকে গ্রেফতার করা সম্ভব। অপহৃত দু’জন সিপিআইএম লিডারকে উদ্ধার করার পরে জঙ্গলে সার্চ অপারেশন শুরু হয়। যেহেতু জঙ্গলে ফোর্স ঢুকে গিয়েছিল এবং রাস্তাতেও পুলিশ ছিল ওরাও বুঝতে পারছিল না কোনদিকে পালাবে। কারণ, রাস্তার ফোর্সও আস্তে আস্তে জঙ্গলে ঢুকতে শুরু করছে তখন। আমাদের টার্গেট ছিল, যা করার দিনের আলোতেই করতে হবে। একবার সন্ধে নেমে গেলে মাওয়িস্টরা ফেভারেবল সিচুয়েশনে চলে যাবে। আরও ঘন্টাখানেক পর, বিকেল প্রায় চারটে। মেদিনীপুর শহরে পুলিশের মোবাইল ট্র্যাকিং সিস্টেমে আমরা প্রথম ফোন কল ইন্টারসেপ্ট করলাম। সেই সময় গ্রামের ভেতরে আমাদের হিউম্যান সোর্স সেভাবে ডেভেলপ না করলেও নানা সূত্র থেকে পাওয়া কিছু ফোন নম্বর ধরে আমাদের মোবাইল ট্র্যাকিং চলত। ওই এলাকার এমনই সন্দেহজনক কিছু নম্বর আমরা ট্র্যাক করতে শুরু করেছিলাম এনকাউন্টার শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। হঠাৎই একটা ফোন কল হল ওই অপারেশন স্পটের টাওয়ার লোকেশন থেকে। একজন ফোন করল। দু’তিনবার রিং হওয়ার পর ফোনটা ধরল এক মহিলা। ‘দিদি, আমরা মাজুগাড়া জঙ্গলে আটকে গিয়েছি। পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। এনকাউন্টার হয়েছে। এখন কী করব?’‘কোথায় তোমরা? ক’জন আছ? ‘পাঁচজন আছি। পুলিশ জঙ্গলে ঢুকে পড়েছে। একদম কাছাকাছি আছে কোথাও। রাস্তার দিকে গিয়েছিলাম, ওদিকেও পুলিশ আছে।’ ‘রাস্তার দিকে যাওয়ার দরকার নেই, ফোর্স আছে। পারলে আস্তে আস্তে কাঁকড়াঝোড়ের দিকে যাও। আর সাবধানে। বিকাশরা কোথায়।’‘ওরা ঠিক আছে দিদি। আমরা দুটো গ্রুপে ভাগ করে আলাদা হয়ে গেছি। ফোর্সটা আমাদের দিকে চলে এসেছে।’‘আচ্ছা। পুলিশ ফায়ারিং করলেও, একদম মুখোমুখি না হলে গুলি চালাবে না।’জাস্ট ৩০-৪০ সেকেন্ডের কথার পর ফোন কেটে গেল। আমরাও বুঝে গেলাম ফোর্স ঠিক জায়গায় আছে। সঙ্গে সঙ্গে খবর পাঠানো হল ফোর্সের কাছে। রাস্তার আরও ফোর্সকে জঙ্গলে ঢোকানোর ডিসিশন হল। তখনও কিছু সময় আছে হাতে। দিন তখন অনেকটাই বড়। জঙ্গলে অপারেশনের এটা একটা বড় সুবিধে। আধ ঘন্টা বাদে আবার ফোন। একই লোক আগের নম্বর থেকেই ফোন করল ওই মহিলাকে।‘দিদি, এদিকেও পুলিশ আছে। আমরা গুলি চালাইনি। কিন্তু পুলিশ গুলি চালাচ্ছে। কী করব?’বুঝতে পারলাম, পাঁচজনের দলটা আটকে পড়েছে। বারবার ফোন করে জানতে চাইছে কী করবে? এই ফোনটা আসার পর দু’পাঁচ সেকেন্ড মহিলার দিক থেকে কোনও সাড়া শব্দ নেই। আমরা বুঝতে পারছি না, ওই মহিলা কে, যাকে ওরা বারবার ফোন করে জানতে চাইছে কী করতে হবে। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম, ইমপরটেন্ট কেউ হবে। ফোন ট্র্যাকিং মনিটরিং সিস্টেমে দু’জনেরই এক টাওয়ার লোকেশন দেখাচ্ছে।পাঁচজনের দলটাকে মহিলা কী নির্দেশ দেয় জানার জন্য অপেক্ষা করছি, হঠাৎ ওদিক থেকে এক পুরুষ কণ্ঠ। মহিলার বদলে ভারী গলায় একজন লোক কথা শুরু করল পাঁচজনের ওই দলটার সঙ্গে। বুঝলাম, কী করবে বুঝতে না পেরে তার সঙ্গে থাকা সিনিয়ার কোনও নেতাকে ফোনটা দিয়েছে ওই মহিলা। মোটামুটি স্পষ্ট বাংলা, ভারী গলায় কথা শুরু করল লোকটা। বলল, ‘অন্ধকার হয়ে গেছে, জঙ্গলে বেশি মুভ করার দরকার নেই। কিছুক্ষণ পরে পুলিশ এমনিই বেরিয়ে যাবে। আরও দেড়-দু’ঘন্টা ওখানেই ওয়েট কর, তারপর সাবধানে কাঁকড়াঝোড়ের দিকে চলে যাবে। খুব দরকার না হলে গুলি চালাবে না।’ লোকটা সবকটা শব্দ বাংলায় বললেও গলায় একটা টান স্পষ্ট। পরে বুঝেছিলাম, ওই লোকটাই কিষেণজি, কোটেশ্বর রাও। ওদের লোকেশন দেখাল নিগুড়িয়া মোবাইল টাওয়ার। ঝাড়গ্রামে কিষেণজির থাকার প্রথম প্রমাণ আমরা সেদিন রাতে নিশ্চিতভাবে পেলাম। যে মহিলা মোবাইল ফোনটা কিষেণজিকে দিয়েছিল কথা বলতে তার পরিচয় আমরা বুঝতে পারিনি। কিন্তু ভারী গলার ওই লোকটাই যে কিষেণজি তা নিয়ে কোনও সন্দেহ ছিল না। আমাদের এক স্পেসিফিক সোর্সকে ওই টেলিফোনের গলা শোনানো হল, সে কনফার্ম করল। তারপর আপনাদের এবং অন্য চ্যানেলে ইন্টারভিউ দেওয়ার সময় এই গলাই আমরা শুনেছি বারবার।’ ‘তারপর কী হল?’  ‘সেদিন মাওবাদীদের কাউকেই আমরা ধরতে পারিনি। রাত বেড়ে যাওয়ায় ফোর্স বেরিয়ে আসতে বাধ্য হয় জঙ্গল থেকে। পাঁচজনের দলটা কাছাকাছির মধ্যেই আছে, রাত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে, বোঝার পরও আমরা ঝুঁকি নিতে পারিনি। প্রথমত, জঙ্গলের ভেতরের রাস্তা পুলিশের জানা ছিল না। ফোর্স ট্র্যাপড হয়ে যেতে পারত। তাছাড়া ওদের দু’জন, তিনজনকে ধরতে গিয়ে আমাদের বেশি ক্যাজুয়ালটি হতে পারত। আর সেই পরিস্থিতিতে ভোটের আগে সেটা পুরো ফোর্সের মনোবলের পক্ষে খারাপ হোত। তাই আরও কিছুক্ষণ দেখে আমরা ফোর্সকে জঙ্গল থেকে বের করে আনার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু সেদিনই শুরু হয়ে গেল কিষেণজিকে গ্রেফতারের ব্লু-প্রিন্ট তৈরির কাজ।ইন ফ্যাক্ট কিষেণজি এবং তার বাহিনীর হাতে আমরা জঙ্গলের ভেতরে ট্র্যাপড হয়েও গিয়েছিলাম তার কয়েক মাস বাদেই। লোকসভা ভোটের পরে। তখন সেন্ট্রাল ফোর্সও পৌঁছে গিয়েছে এলাকায়।  ২০০৯ সালের জুলাই কিংবা অগাস্ট হবে। ততদিনে স্পষ্ট হয়ে গেছে, কিষেণজিই লালাগড় মুভমেন্টের নেতৃত্বে। কয়েকবার প্রেস কনফারেন্সও করে ফেলেছেন। একদিন সকাল ১০টা-সাড়ে ১০টা নাগাদ অনেক সাংবাদিক মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রাম থেকে লালগড়ের দিকে মুভ করতে শুরু করে। কেন এতজন সাংবাদিক যাচ্ছে একসঙ্গে? কিছুক্ষণের মধ্যেই সোর্স মারফত খবর পেলাম, কিষেণজি ইন্টারভিউ দেবেন। তাই মিডিয়াকে ফোন করে ডাকা হয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ফোর্স রেডি করা হল। সাংবাদিকদের মুভমেন্ট ট্র্যাক করলেই কিষেণজি এবং মাওবাদীদের কোর গ্রুপকে লোকেট করা যাবে। কোন কোন সাংবাদিকের সঙ্গে কিষেণজি কিংবা অন্য মাওয়িস্ট লিডাররা প্রায় রোজ কথা বলতেন তাও আমরা জানতাম। কিন্তু সেদিন কিষেণজির ইন্টারভিউ দেওয়ার কথা জানতে পেরে আমরা প্ল্যান করলাম, সাংবাদিকরা যেদিকে যাবে তার কাছাকাছিও কোথাও ফোর্স পাঠানো হবে না। সাংবাদিকদের ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই ফোর্সের মুভমেন্ট শুরু হলে কিষেণজির কাছে তার খবর ঠিক পৌঁছে যাবে। ওরা সতর্ক হয়ে যাবে। মাওবাদীরা ভাবতে পারে, কোনও সাংবাদিক পুলিশকে খবর দিয়েছে। সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে তারা আর সাংবাদিকদের বিশ্বাস করবে না। আমরা চাইছিলাম, সাংবাদিকদের সঙ্গে মাওবাদীদের ভালো সম্পর্কটা বজায় থাকুক। সাংবাদিকদের সঙ্গে মাওবাদীদের ভালো সম্পর্ক পরে আমাদের অনেক কাজে দিয়েছে। সেদিন দুপুর সাড়ে ১২টা-একটা নাগাদ আমরা কিষেণজির লোকেশন বুঝে ফেলেছিলাম। যে জায়গায় কিষেণজি সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা করেন তা চিহ্নিত করার পর আমরা ম্যাপ নিয়ে বসি। সেদিন বড়পেলিয়া (লালগড় থানা-কাঁটাপাহাড়ি রাস্তার মাঝামাঝি বড়পেলিয়া মোড়) দিয়ে সাংবাদিকরা জঙ্গলে ঢুকেছিল কিষেণজির সঙ্গে দেখা করতে। বড়পেলিয়া মোড় থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে জঙ্গলের ভেতরে একটা জায়গায় সাংবাদিকদের মোটরসাইকেলে করে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন দুপুর ১২টা। সাংবাদিকরা পৌঁছানোর আধ ঘন্টার মধ্যে ওই লোকেশন চিহ্নিত করে ফেলি আমরা। আর সঙ্গে সঙ্গে ফোর্সকে মুভ করানো হয় ঠিক উল্টোদিকের লালগড় থেকে ধেড়ুয়া যাওয়ার রাস্তায়। আমরা নিশ্চিত জানতাম, ইন্টারভিউ দিয়ে কিষেণজি দলবল নিয়ে আর লালগড়ের দিকে যাবে না। কারণ, বড়পেলিয়া, কাঁটাপাহাড়ি এলাকায় সাংবাদিকদের অনেক গাড়ি রয়েছে। বাইরের লোক রয়েছে। মাওবাদীদের পক্ষে এটা ভাবা খুব স্বাভাবিক ছিল, যেহেতু লালগড়ের দিকে এত সাংবাদিক এবং বাইরের লোকের মুভমেন্ট হচ্ছে, ফোর্সও কিছু সন্দেহ করে সেদিকে চলে আসতে পারে। মাওবাদীরা এমনটা ভাবতে পারে আন্দাজ করে আমরা ফোর্স পাঠালাম পুরো উল্টোদিকে। লালগড়-ধেড়ুয়া রাস্তার দিকের জঙ্গলে। পুরোপুরি চান্স নেওয়া। মিলে গেলে ভাল, নয়তো কিছু করার নেই। সেদিনই বিকেলে কিষেণজির নেতৃত্বে মাওবাদীদের সঙ্গে আমাদের প্রথম এনকাউন্টার। বিকেল ৫টা নাগাদ। জঙ্গলে যে ফোর্স লুকিয়ে অপেক্ষা করছে তা কিষেণজি আন্দাজ করতে পারেননি। দূর থেকে মাওয়িস্টদের মুভমেন্ট আন্দাজ করে পুলিশ গুলি চালায়, প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ওরাও পালটা গুলি চালায়। কিষেণজিদের বেশ কিছুটা পেছনে মাওবাদীদের আরও একটা দল ছিল। সেটা আমাদের জানা ছিল না। কিষেণজি পেছনের দলটাকে নির্দেশ দেন, পুলিশকে অ্যাটাক করতে। কিছুক্ষণের মধ্যে মাওবাদীদের অন্য দলটা পেছন থেকে আমাদের অ্যাটাক করে। দু’দিকে মাওবাদী স্কোয়াড, মাঝখানে পড়ে যায় ফোর্স। এটাও মাওয়িস্টদের জঙ্গলে মুভ করার একটা ট্যাকটিক্স। সব সময় ছোট ছোট দলে মুভ করা। লালজল, মাজুগাড়াতেও আমাদের একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। কিন্তু সেখানে মাওয়িস্টরা কাউন্টার অ্যাটাক না করলেও এদিন ওরা তাই করল। কিষেণজির মতো লিডার রয়েছে বলেই ওরা হয়তো কোনও ঝুঁকি নিতে চায়নি।   আস্তে আস্তে অন্ধকার হয়ে আসছে। কিষেণজিকে ধরার একটা চান্স ছিল। কিন্তু পেছন থেকে কাউন্টার অ্যাটাক হওয়ায় পুলিশ অন্য দলটাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ইন ফ্যাক্ট প্রথমে বোঝাও যায়নি কোন দলটায় কিষেণজি নিজে রয়েছেন। একসঙ্গে দুটো দলের সঙ্গে লড়াই করা ওই জঙ্গলে সম্ভব ছিল না। সাময়িকভাবে ফোর্স একটু কনফিউজডও হয়ে যায়। পুলিশ ব্যস্ত হয়ে পড়ে পেছনের দলটাকে নিয়ে। যখন মাওবাদীদের পেছনের দলটার সঙ্গে ফোর্সের এক্সচেঞ্জ অফ ফায়ার চলছে, ততক্ষণে সামনের দলটা পালিয়ে যায়। পরে আমরা বুঝতে পারি, সামনের দলটাকে পালানোর সুযোগ করে দিতেই পেছনের দলটা পুলিশকে এমন ডেসপারেট অ্যাটাক করেছে। সন্ধে প্রায় সাড়ে ৬টা-৭টা নাগাদ গুলির লড়াই থামে সেদিন। সেদিনও কাউকে ধরা গেল না। দুটো দলই অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে গেল নাগালের বাইরে। শূন্য হাতে ফিরতে হল আমাদের। কিন্তু আমরা বুঝতে পারছিলাম, ধৈর্য ধরে জঙ্গলে পড়ে থাকলে সাফল্য আসবেই। একটা কনফিডেন্স সেদিন পেয়েছিলাম আমরা, কিষেণজির কাছাকাছি যখন একবার পৌঁছনো গিয়েছে, তার মানে এটা সম্ভব আছে। শুধু লেগে থাকতে হবে।কিন্তু সেই সময় কিষেণজিকে গ্রেফতার করা কিংবা মাওয়িস্টদের বিরুদ্ধে অপারেশন করা ছাড়াও অন্য একটা ব্যাপার নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবছিলাম আমরা। সেটা হচ্ছে, মাওয়িস্টদের এলাকা বিস্তার। বেলপাহাড়ি, বিনপুরে মাওয়িস্টদের একটা বেস অনেক দিন ধরেই ছিল। কিন্তু লালগড় কোনওদিনই সেভাবে ওদের শক্ত ঘাঁটি ছিল না। বরং লালগড় ছিল অনেক শান্ত এলাকা। সেই লালগড়েরই একটা বড় অংশকে ওরা প্রায় লিবারেটেড জোনে কনভার্ট করার চেষ্টা করছিল। ইন ফ্যাক্ট লালগড়ের একটা বড় এলাকাকে লিবারেটেড জোন করেই ফেলেছিল ওরা। যে জিনিস কোনওদিনই বেলপাহাড়ি কিংবা বিনপুরে করে উঠতে পারেনি। কীভাবে হঠাৎই মাওয়িস্টদের এই জনভিত্তি লালগড়া পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল সেটাও তখন চিন্তার ব্যাপার ছিল প্রশাসনের কাছে।’সুনীল কুমারের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই ভাবছিলাম, সত্যিই, এ’রাজ্যে মাওবাদী কার্যকলাপের এপিসেন্টার হিসেবে বারবারই উঠে এসেছে বেলপাহাড়ি, জামবনির কথা। লালগড়েও যে মানুষের মনে সরকার বিরোধিতার এমন তীব্র বারুদ জমা হচ্ছিল তার হদিস তো তেমনভাবে পাইনি আগে। ঝাড়গ্রাম ১৯৯৫-৯৬নয়ের দশকের মাঝামাঝি। তখনও না ভেঙেছে মেদিনীপুর জেলা, না ভেঙেছে রাজ্য কংগ্রেস। সেই সময় এপার বাংলায় সিপিআইএম এবং সরকারের নিরঙ্কুশ আধিপত্য। একাধিপত্য বলাই যথার্থ। কিন্তু কোচবিহার থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনা, রাজ্যজুড়ে সিপিআইএমের একাধিপত্য বিস্তারের এই মসৃণ সড়কে একমাত্র গলার কাঁটা তখন ঝাড়গ্রাম মহকুমা। এই মহকুমার আদিবাসী মানুষের আস্থা কিছুতেই অর্জন করতে পারছে না সিপিআইএম। বরং দিন দিন পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে। তফশিলি জাতি এবং আদিবাসী মানুষেরা যেন দিন দিনই আরও সরে যাচ্ছে সিপিআইএমের থেকে। দ্রুত সমর্থন বাড়ছে ঝাড়খন্ড পার্টির। মাওবাদী সমস্যা তখনও সেভাবে সামনে আসেনি। কিন্তু প্রায় পুরো ঝাড়গ্রাম মহকুমায় ঝাড়খন্ড পার্টির সঙ্গে রাজ্যে শাসক দলের সংঘর্ষ তখন চরমে। সংঘর্ষ, খুনোখুনি লেগেই রয়েছে দু’দলের। বিশেষ করে জামবনি, বিনপুর এবং বেলপাহাড়িতে তখন একেবারে যুদ্ধের পরিস্থিতি। ঝাড়গ্রাম মহকুমার বাইরে আরও একটা এলাকা ছিল, কেশপুর। মেদিনীপুর শহর থেকে ২০-২২ কিলোমিটার দূরে। এই কেশপুরেও সিপিআইএমের সঙ্গে ঝাড়খন্ড পার্টির সংঘর্ষ নিয়ে তখন নাজেহাল অবস্থা পুলিশ-প্রশাসনের। ঝাড়খন্ডিদের সঙ্গে লাগাতার এই রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং আইন-শৃঙ্খলার অবনতি যে কত সুদূরপ্রসারী হতে পারে, কীভাবে একটা শান্ত এলাকাকে মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় পরিণত করতে পারে, তার বিন্দুমাত্র আঁচও তখন পাননি রাজ্যের সিপিআইএম নেতারা। ঝাড়খন্ডিদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার রাস্তা খোঁজার দায়িত্ব মেদিনীপুর জেলা পার্টির হাতে ছেড়ে নিশ্চিন্তে বসেছিলেন ৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের নেতারা। তলিয়ে ভাবেননি, যে আদিবাসীরা ঝাড়খন্ডিদের হয়ে অস্ত্র ধরছেন, আর যে আদিবাসীরা সিপিআইএমের হয়ে অস্ত্র হাতে তার মোকাবিলা করছেন, দু’দলেরই শ্রেণি চরিত্রে এক ছটাকও ফারাক নেই। নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে, জান-মালের মায়া ত্যাগ করে গরিবতর একদল মানুষ নাগাড়ে কেন নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করছে, এই যুদ্ধে কার লাভ হচ্ছে, তা তখন ভাবেনইনি মুজফফর আহমেদ ভবনের নেতারা।  ২০০৬ সালে সেই যে বেলপাহাড়ি গেলাম পুলিশ কনভয়ে মাওবাদী ব্লাস্টের খবর করতে, তারপর থেকে ২০১১ সালের নভেম্বরে কিষেণজির মৃত্যু পর্যন্ত বহুবার অ্যাসাইনমেন্টে গিয়েছি ঝাড়গ্রাম মহকুমায়। যতবার গিয়েছি বারবার বোঝার চেষ্টা করেছি, ঠিক কী কারণে, কোন প্রেক্ষাপটে এবং কোন সময় থেকে মাওবাদীদের এই প্রভাব বিস্তার শুরু হল ঝাড়গ্রাম মহকুমায়। শুধুই কি দারিদ্র, শুধুই পাশের রাজ্যে পালিয়ে যাওয়ার ভৌগলিক সুবিধে, শুধুমাত্র ‘অত্যাচারী’ সিপিআইএম নেতৃত্ব? শুধুই কি বঞ্চনা কিংবা পুলিশি দমনপীড়ন? মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়ার মাওবাদী সমস্যা নিয়ে অধিকাংশ আলোচনায় এই কথাগুলোই বারবার শুনেছি। যতবার শুনেছি, ভেবেছি, এই কারণগুলো কি বড্ড একমাত্রিক হয়ে যাচ্ছে না? দারিদ্র, ভৌগলিক সুবিধে, অত্যাচারী শাসক দল কিংবা বঞ্চনা, এই সমস্ত ফ্যাক্টর কি রাজ্য কিংবা দেশে আর কোথাও ছিল না? তাছাড়া এই ফ্যাক্টরগুলো যদি গুরুত্বপূর্ণ হয়ও, তবেও তো একটা সূচনা লগ্ন থাকবে। একটা সূচনাকাল তো থাকবে সিপিআইএম নেতৃত্বাধীন সরকার পরিচালিত রাজ্যের এই প্রান্তিক মহকুমায় অতি বামপন্থী এক রাজনৈতিক দলের সশস্ত্র কার্যকলাপ অনুশীলনের। বারবার মনে হয়েছে, উপযুক্ত রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক কোনও কারণ ছাড়া কি সত্যিই মাওবাদীদের এই প্রভাব বিস্তার সম্ভব?অনেকে এমনও বলেছেন, ‘১৯৬৭ সালে নকশালবাড়ি আন্দোলন শুরুর সময় তা দক্ষিণবঙ্গের আরও কয়েকটা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল। তার মধ্যে অন্যতম মেদিনীপুর জেলার ডেবরা এবং গোপীবল্লভপুর। সশস্ত্র জমি আন্দোলন হয়েছিল জোতদার, জমিদারদের বিরুদ্ধে। ফলে অতিবাম আন্দোলনের একটা বেস এই জেলায় ছিলই।’ তাছাড়া নকশালবাড়ির ধাঁচে শুধু ডেবরা, গোপীবল্লভপুর কেন, জমি দখলের আন্দোলন হয়েছিল বর্ধমানের কাঁকসা, আউসগ্রাম এবং বীরভূমেও। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরেও। তাছাড়া ছয়ের দশকের শেষে এক-দেড় বছরের যে আন্দোলন হয়েছিল ডেবরা, গোপীবল্লভপুরে, তার সঙ্গে একুশ শতকের শুরুতে বিনপুর, বেলপাহাড়ি, জামবনি কিংবা লালগড় মাওবাদী কার্যকলাপের এপিসেন্টার হয়ে ওঠার প্রত্যক্ষ সম্পর্ক কী, তার কোনও যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা পাইনি বারবার অ্যাসাইনমেন্টে জঙ্গলমহলে গিয়ে।              বরং একুশ শতকের প্রথম দশকের মাঝামাঝি থেকে পশ্চিমবঙ্গের মাওবাদী অধ্যুষিত এলাকায় বারবার গিয়ে শুনেছি, ঝাড়খন্ড পার্টির সঙ্গে সিপিআইএমের সশস্ত্র লড়াইয়ের কথা। কেমন পরিস্থিতি ছিল বছর দশেক আগে এই সব এলাকায়, তা জানা না গেলে কিষেণজির মৃত্যু রহস্যের সন্ধান করা অসম্ভব। ইন ফ্যাক্ট, কিষেণজির মৃত্যু রহস্যের উপাদান ছড়িয়ে রয়েছে অতীতের ছোটখাট বহু জানা-অজানা ঘটনার মধ্যেই।  তাই, ব্যাক টু ১৯৯৫-৯৬। অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার পুলিশ সুপার তখন দেবকুমার বসু। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অপারেশন প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়। ২০১৫ সালের শেষ দিকে প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করতে গেলাম কলকাতা পুলিশের সদর দফতর লালবাজারে তাঁর অফিসে। জানতে গেলাম জঙ্গলমহলে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতার কথা। জঙ্গলমহলে ঝাড়খন্ড পার্টির সঙ্গে সিপিআইএমের সশস্ত্র লড়াই, মাওবাদের বিস্তার, ২০০৯ সালে প্রায় লিবারেটেড জোন হয়ে ওঠা লালগড়ের ইতিহাস সন্ধান। যে ঘটনা পরম্পরার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত মাওবাদীদের পলিটব্যুরো সদস্য কিষেণজির এ’রাজ্যে পা রাখা। শেষ পর্যন্ত যার পরিণাম, ২০১১ সালের ২৪ নভেম্বর জামবনিতে মাত্র কয়েক মিনিটের এনকাউন্টার। কিষেণজি মৃত্যু রহস্যে আমার প্রথম সাক্ষী আইপিএস অফিসার প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়।   ‘সেটা নয়ের দশকের মাঝামাঝি। আমার পোস্টিং হল মেদিনীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অপারেশন পদে। সবে পোস্টটা তৈরি করা হয়েছে। অফিস মেদিনীপুর শহরে। মাওবাদী সমস্যা তখনও সেভাবে শুরু হয়নি। কিন্তু জয়েন করে দেখলাম, ঝাড়খন্ড পার্টির সঙ্গে সিপিআইএমের রোজ মারপিট আর সংঘর্ষ। লড়াইটা হোত মূলত জামবনি, বিনপুর, বেলপাহাড়ি এবং কেশপুরে। প্রায় রোজই দুপুরে মেদিনীপুর থেকে বেরিয়ে ঝাড়গ্রাম চলে যেতাম, গভীর রাতে ফিরতাম। কয়েকদিন ঝাড়গ্রাম যাওয়ার পর বুঝতে পারলাম, আদিবাসীরা পুলিশকে একদমই পছন্দ করে না। গ্রামেও ঢুকতে দেয় না। কিন্তু কেন এমন হবে? পুলিশ কেন আদিবাসীদের গ্রামে ঢুকতে পারবে না? বসলাম জামবনি থানার ওসি অপূর্ব নাগকে নিয়ে। খোঁজ নিতে গিয়ে কয়েকটা অদ্ভুত জিনিস জানা গেল। ক্রমশ...।  
    দোলজ‍্যোৎস্নায় শুশুনিয়া‌য় - ৩ - সমরেশ মুখার্জী | আত্মপরিচয় পর্বসন্ধ‍্যার আগে‌ ওরা ফিরে আসে বাংলোয়। বলাইদার কিশোর সহকারী বাবলু ধামায় করে মুড়ি আর থালায় পিঁয়াজি কাঁচা লঙ্কা নিয়ে আসে। এরপর চা আসবে। এবার দলে দুটি নতুন ছেলে এসেছে। মলয়দা বললেন, "একটা সেল্ফ ইন্ট্রোডাকশন হলে কেমন হয়?  আমরা কয়েকজন তো একে অপরকে চিনি। তাহলে নতুন যারা এসেছে তারা আমাদের, আমরাও তাদের জানতে পারি। অপরিচয়ের বরফ না গললে তো বেড়াতে এসে আনন্দ নেই, তাই না।" ওরা  সবাই সায় দেয় মলয়দার প্রস্তাবে।ইনস্ট্রাক্টরদের মধ্যে মলয়দা যাদবপুরে‌র‌ই চাকরি করেন। ছেলেমেয়েরা পড়তে আসে, পাশ করে চলে যায় কিন্তু উনি JUMAHC এর সাথে অনেকদিন ধরে যুক্ত। শান্ত, স্বল্পভাষী, মৃদুহাস‍্যময় মানুষ‌টিকে দেখলেই ভালো লাগে। মধ‍্যতিরিশের অমিয়দা ও সুশীল‌দা গেস্ট ইনস্ট্রাক্টর। ওরা দুজনে অনেকদিন ধরে হিমালয়ে যাচ্ছেন একসাথে। মলয়দা‌র সাথে‌‌ও পূর্ব‌পরিচিত। মলয়দার অনুরোধে‌ই এসেছেন এখানে। সদ‍্য বেসিক কোর্স করা কটা ছেলেমেয়ে  প্রথমবার শুশুনিয়ায় প্র‍্যাক্টিসে আসছে। নতুন জায়গায় রকফেস, রুট কিছুই ওদের জানা নেই। অনভিজ্ঞ‌তায় বা উৎসাহের আতিশয‍্যে যাতে কোনো দূর্ঘটনা না হয়ে যায় সেই জন‍্য এসেছেন তাঁরা‌।  অমিয়দা হাসিখুশি মানুষ। ওদের সাথে এর মধ্যেই বন্ধু‌র মতো মিশে গেছেন। নামের মতোই সুশীল‌দা‌ও মলয়দার মতো শান্ত, স্থিতধী। পাহাড়ে এমন মানুষ পাশে থাকলে ভরসা হয়।পূর্বপরিচিতদের মধ‍্যে বরুণ ও চিন্ময় মেকানিক্যাল ইঞ্জিয়ারিং দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বরুণ  শান্ত, চুপচাপ। চিন্ময় ঠিক উল্টো। প্রাণশক্তি‌তে ভরপুর। দোহারা চেহারা। চুলটা বক্সারদের মতো কদমছাঁট। সাজপোষাক এ্যালবেলে। মুখে সর্বদাই লেগে আছে অমলিন হাসি। বন্ধুরা ওর নাম দিয়ে‌ছে চিতা। চিন্ময় তালুকদার থেকে আদ‍্যক্ষরী চিতা সবার খুব প্রিয়। তাই "এ্যাই চিতা জলটা দে না", "এই চিতা ওটা নিয়ে আয় না" বন্ধুদের এমন ফরমাশ লেগেই থাকে। কখনো বা শীতের ভোরে স্লিপিং ব‍্যাগের উষ্ণতা ছেড়ে বেরোতে অনিচ্ছুক কোনো মেয়ে নেকুপুষুমুনুর মতো শরীর মুচড়ে, চোখ সরু করে আদিখ্যেতা করে বলে "চিতাআআআ চা টা নিয়ে আয় না রে।" ফরমাশের শেষে আবার আদুরে মেনী‌র মতো যোগ করে "প্লিইইইজ"। সব বোঝে চিতা। তবু মুখে সামূদ্রিক বাতাসের মতো মন ভালো ক‍রা হাসি মেখে দুহাতে থালায় করে দু চারটে চায়ের কাপ নিয়ে টেন্টে এসে বলে, "নাও মামণি‌রা, চা খেয়ে উদ্ধার করো"।  বোঝাই যায় এমন ফরমাশ শুনে চিতা তো কিছু মনে করেই না বরং উপভোগ করে মেয়েদের আদুরেপনা। তবে শুধু মেয়েদের নয়, সবাই‌কে সাহায্য করায় ও যেন সদাই উন্মুখ। তাই মালের ব‍্যাগ বাসের ছাদে তোলা, জল আনা বা বন্ধুদের ফাইমরমাশ খাটায় ওর কোনো হেলদোল নেই। এমন নিঃস্বার্থ, উদার মনের ছেলে যে কোনো টিমের প্রাণ। ও একা‌ই অনেকটা জড়িয়ে ধরে রাখে সবাই‌কে। সবাই তাই চিতা বলতে অজ্ঞান। এসব‌ই দলে ঘোরার মজা। কতদিন এ দল থাকবে জানা নেই। কলেজ ছাড়লেই হয়তো ছানা কেটে যাবে। সবাই ছড়িয়ে যাবে যে যার  পথে।গৌরব তৃতীয় বর্ষ ইলেকট্রিক‍্যাল। সুন্দর স্বাস্থ্য। দলে বেড়াতে এসেও সে একটা মোটা ব‌ই নিয়ে এসেছে। সময় পেলেই দলের হৈচৈ থেকে একটু দুরে বসে ও ব‌ই পড়ে। আড্ডায় তার বিশেষ উৎসাহ নেই। তবে এজন‍্য ওকে কেউ আঁতেল ভাবে না। পেছনেও লাগে না। সবাই জানে ও মিতভাষী, ভাবুক টাইপের ছেলে। তবে ক্লাইম্বিংটা ও সিরিয়াসলি করে। বেশ ভালো‌ পারেও। বরুণ, চিন্ময়ের সাথে‌ই এক ক্লাসে পড়ে চন্দ্রিমা বা চুনি‌। মাজা রঙ, ছোটোখাটো, কমনীয় চেহারা, শান্ত স্বভাব। রিনরিন করে উইন্ড চাইমের মতো আলতো গলায় ওর কথা বলার ভঙ্গি‌টা খুব শ্রুতিমধুর। চুনি হচ্ছে সেই ধরনের মানুষ যার সাথে কারুর ব‍্যক্তিত্বের সংঘাত হবার কোনো সম্ভাবনা‌‌ই নেই। মুখের থেকে ওর চোখ‌‌ই বেশি কথা বলে।  চুনিকে দেখে ভবিষ্যতে‌র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বা বর্তমানে পাহাড়ে যাওয়া রাফ-টাফ মেয়ে বলে মনে‌ই হয় না। কিন্তু চিতার মতো চুনি‌ও দলের কাজে হাত লাগাতে সদা তৎপর। ওর সাথে বরুণের একটা মাখো মাখো ভাব ডিসেম্বরে কোর্সে‌ই লক্ষ্য করেছে সবাই। তা বলে দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে, দুরে দুরে ব‍্যাঙ্গমা ব‍্যাঙ্গমীর মতো জোড়ে ওদের দেখা‌ই যায় না প্রায়। দলের মধ‍্যে থেকে‌ই ওরা দুজনে কখনো একসাথে একা হয়ে যায়। তখন ওদের নীরব দৃষ্টি‌র মধ‍্যে ফুটে ওঠে বাঙ্ময় রসায়ন। এসব খেয়াল করলে বোঝা যায়। তবে ওদের দুজনকে কখনো একসাথে একটু একান্তে দেখলে সবাই ইচ্ছে করে এড়িয়ে যায়। থাকুক ওরা খানিক নিজেদের মধ্যে একাত্ম হয়ে। তিলোত্তমা বা তুলি ফর্সা, সুন্দরী, খুব প্রাণবন্ত মেয়ে। হাসলে গালে টোল পড়ে। তখন আরো মিষ্টি লাগে ওকে দেখতে। ও হাসেও খুব। গোলগাল আদুরে চেহারা হলে কী হয়, দারুণ ফিটনেস। শরীরে যৌবনের ঐশ্বর্য কিন্তু স্বভাবে কৈশরের চঞ্চলতা এখনো যায় নি ওর। তুলি হচ্ছে সেই ধরণের মেয়ে যাকে বন্ধু হিসেবে খুব ভালো লাগে, কিন্তু একান্তে গাঢ় চোখে তাকিয়ে "আমি তোকে ভালোবাসি" বলা যায় না। হয়তো সরল হেসে বলবে, "সে তো আমি‌ও বাসি তোদের, খুউউউব, তোকে, চিন্ময়কে, বরুণকে,..।'তখন কি বলা যায়, "না রে, অমন ভালোবাসার কথা বলছি না?" বিশ্বাস নেই, ও হয়তো বলবে, "তবে?" তখন থতমত খেয়ে "না, মানে, ইয়ে, তোকে আমার একটু অন‍্যরকম ভালো লাগে, মানে...।" - বাস্তবে বলার আগেই এমন সব কাল্পনিক কথোপকথনের সম্ভাবনা মাথায় এলে অন‍্যরকম ভালো লাগার ভাবনা উপে যেতে পারে। তাই কারুর মনে এলেও এমন কথা হয়তো ওকে বলে না কেউ।  জীবনে প্রেম, বিশেষতঃ প্রথম প্রেম সাধারণত ভেবে চিন্তে হয় না। তা প্রায়শই আচমকা হোঁচট খেয়ে পড়ার মতো ঘটনা। তাই তো বলে প্রেমে পড়া। কেউ বলে না, অমুকের প্রেমে উঠেছি। তুলি কোনোরকম চোখইশারায় ডাক দেওয়া বা বিশেষ নৈকট্য খোঁজায় নেই। তাই সবার সাথেই ও হৈ হৈ করে মেশে। যেমন চিতা, তেমন তুলির মতো‌ মেয়েরা‌ও দলের প্রাণ। ও পড়ে ইংলিশে অনার্স। দলের মধ‍্যে সুমনকে সব থেকে ভাবিয়েছে ঈশিতা বা ঈশু। এই নিয়ে তিনবার জেঠু ওদের সাথে এলো। প্রথমটা বেসিক কোর্স আর দুটো প্র‍্যাকটিস। তবু ওকে ঠিক বোঝা যায় না। ও তুলির সাথেই পড়ে ইংলিশে অনার্স। ঈশুও বেশ ফর্সা। পানের মতো ধারালো মুখ, টিকোলো নাক। চিবুকের পেলব ডৌল। হঠাৎ উচ্ছ্বসিত হাসলে জমাট ভুট্টাদানার মতো সুন্দর দাঁতের সারিতে চোখ আটকে যায়। তবে সে এক দূর্লভ ঘটনা। কালাহারিতে বৃষ্টির মতো।  ওর সুন্দর মুখশ্রী, দীঘল অঙ্গসৌষ্ঠবের জন‍্য ওকে খুব আকর্ষণীয় লাগার কথা। কিন্তু ওর দিঘির মতো শান্ত চোখে গ্ৰীষ্মের মধ‍্যাহ্নের নির্জনতা, মাপা কথা, মার্জিত আচরণ এসব মিলিয়ে এমন একটা আভিজাত্য‌ময় ব্যক্তিত্ব ওকে ঘিরে থাকে যে বয়সের তুলনায় ওকে বেশ প্রাজ্ঞ মনে হয়। পড়াশোনা‌তেও দারুণ ভালো ও। তাই হয়তো ছেলেরা ওর কাছে ঘেঁষতে একটু অস্বস্তি বোধ করে। তাছাড়া বয়কাট চুল ও দিদিমণি মার্কা চশমায় - ‘আমি ফেমিনিস্ট' - এহেন একটা বিজ্ঞাপন যেন ও ইচ্ছে করে ঝুলিয়ে রাখে। মনে হোতো, কারণ যাই হোক, কখনো ও ইচ্ছে করে একটা খাঁচায় ঢুকে এখন আর বেরোবার দরজা খুঁজে পাচ্ছে না।  ঈশু সর্টশ পরলে ইউক‍্যালিপটাসের পেলবতা লজ্জা পায়। বডি হাগিং টপ পরলে কোমরের বালি ঘড়ির বাঁকে দৃষ্টি পড়লে থমকে যায় দ্রষ্টা‌র সময়। অন‍্যমনস্ক টি শার্টের ফাঁক দিয়ে স্নিগ্ধ বালিয়াড়ি‌র আভাস মায়া ছড়ায়। এই সব মিলিয়ে ওকে ঘিরে সৃষ্টি হয় এমন এক মোহময় আবেশ যার ফলে ওর হাবভাব একটু নরম, সহজগম‍্য হলে‌ ওর আশপাশে ভ্রমরের ভীড়‌ অনিবার্য। তাই হয়তো ওর আরোপিত মুখোশের সাথে স্বেচ্ছারোপিত সখ‍্যতা। এসব‌ ছিল জেঠু‌র অনুমান।দলের বাকি দুটি নতুন ছেলে‌ও ভালো কিন্তু ওদের ভীড়ে হারিয়ে যাওয়ার মতো বৈশিষ্ট্য‌হীনতা মনে দাগ‌ কাটে না। যেন সাগরবেলায় আঙুল দিয়ে লেখা নাম। তাই দীর্ঘ সময়ের ব‍্যবধানে‌ও চিতা, তুলি, চুনি, ঈশু, অমিয়দা - নানা কারণে থেকে যায় স্মৃতি‌তে, বাকিরা হয়ে যায় ধূসর।
  • জনতার খেরোর খাতা...
    হেদুয়ার ধারে - ১১৯ - Anjan Banerjee | বেথুন কলেজের সামনে সেদিন বেলা দশটা নাগাদ দীনবন্ধুর সঙ্গে জন্মেজয়বাবুর দেখা হয়ে গেল। সেদিন রবিবার ছিল। দীনবন্ধু আজ কাটোয়ায় ফেরেনি।জন্মেজয়বাবু বললেন, ' তুমি নিতাইবাবুর শালার ছেলে না ? '----- ' আজ্ঞে হ্যাঁ ... ভাল আছেন তো ? '----- ' আমারে চিনেন তো ... ওই বাড়ির দোতলায় থাকি ... '----- ' হ্যাঁ হ্যাঁ ... ভালমতো চিনি। আমাকে দয়া করে আপনি বলবেন না জেঠু ... ' দীনবন্ধু জানায়।----- ' আচ্ছা আচ্ছা ... তাই হবে ... আমি আবার চট করে কাউকে তুমি বলতে পারিনা, বোঝলা না ... অসুবিধা হয় ... হ্যাঃ হ্যাঃ ... '----- ' হুঁ ... ঠিক আছে। অসুবিধে নেই। তা, আপনি ভাল আছেন তো ... শরীর ঠিক আছে তো ... '----- ' এই চলছে আর কি। এখনও থাইম্যা যায় নাই। ওপরওয়ালা যত দিন সালান ... মানুষের আর করার কি বা আসে ... তা আপনে ... কি বলে তুমি তো মেসে থাক নাকি ? '----- ' হ্যাঁ ... শ্যামবাজারে। বাজারের ওপর ... '----- ' অ ... তা ভাল। মেসবাড়িতে আমি কখনও থাকি নাই। কেমন লাগত্যাসে ওখানে ? বেশ মিলমিশ আসে তো সবার মইদ্যে ? '----- ' হ্যাঁ তা আছে। সব মিলিয়ে বেশ ভালই লাগে। তবে সব ধরণের লোক আছে তো ... একটু মানিয়ে চলতে হয় বুঝলেন ? '----- ' হ, মানায়ে চলার তো লাগবই। সংসারের মইদ্যেও তে মানায়ে চলতে হয়। এদিক ওদিক হইলেই মুশ্কিল হ্যাঃ হ্যাঃ ... '----- ' আপনাকে একদিন নিয়ে যাব। দেখে আসবেন আমরা কেমনভাবে থাকি ... '----- ' হ ... আচ্ছা ... হইব একদিন। চল বাড়ির দিকে যাইবা তো ... চল ... 'দুজনে মিলে বাড়ির দিকে হাঁটতে লাগল। বাড়ির কাছাকাছি আসতে গঙ্গার গলা শোনা গেল তার দোকানের ভিতর থেকে।------ ' ও জ্যাঠামশাই ... কোথায় গিয়েছিলেন ? আসুন আসুন ... 'জন্মেজয়বাবু বললেন, ' দাঁড়াও আসছি। চল দীনবন্ধু এখানে একটু বসবা নাকি ? গঙ্গাপদ বড় ভাল লোক।----- ' হ্যাঁ ... তা বসলে হয় ... 'দুজনে গঙ্গার দোকানের পাশে পাতা বেঞ্চে গিয়ে বসল। গঙ্গা যথারীতি দু গ্লাস চা আনাল।জন্মেজয়বাবু বললেন, ' এরে চিনো তো ? নিতাইবাবুর শালার ...ইয়ে ... '----- ' হ্যাঁ হ্যাঁ ... জানি জানি। শ্যামবাজারে মেসে আছেন বোধহয়। নিতাইদা বলছিলেন সেদিন ... '------ ' ও আচ্ছা ... হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন ... ' দীনবন্ধু জানাল।গঙ্গাপদ এরপর খদ্দের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এক খদ্দের বলল, ' হ্যারে গঙ্গা ... সাগর মন্ডল নাকি বিয়ে করেছে ? কিছু জানিস নাকি ? 'গঙ্গা তেল মাপতে মাপতে বলল, ' না না ... আমি ওসব খবর রাখি না। আমার অত সময় নেই... 'সেই খদ্দের অবশ্য তাতে দমল না। বলল, ' বিশ্বনাথরা দেখেছে পরশুদিন ... '----- ' কি দেখেছে ? '----- ' এক মহিলার সঙ্গে এখান দিয়ে যাচ্ছে হাতিবাগানের দিকে ... '----- ' আরে ... কারো সঙ্গে যাওয়া মানেই কি সে তার বৌ নাকি ! ' তেলের বোতলের ছিপি ঘোরাতে ঘোরাতে গঙ্গাপদ বলল।----- ' না, তা না ... কিন্তু হাবভাব দেখে বিশ্বনাথদের মনে হয়েছে ... যাকগে ... মুগের ডাল দে আধ সের ... 'খদ্দেরের ভিড় একটু পাতলা হলে জন্মেজয়বাবু গঙ্গাপদকে জিজ্ঞাসা করলেন, ' আচ্ছা ... সাগর মন্ডলটা কে ? 'দীনবন্ধুর দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বললেন, ' চিনেন নাকি ? 'দীনবন্ধু নেতিবাচকভাবে ঘাড় নাড়ল।গঙ্গাপদ বলল, ' সাগর মন্ডলের নাম শোনেননি ?এখানে সবাই চেনে ... এমনিতে গুন্ডা, তবে কেউ বিপদে পড়লে খুব সাহায্য করে। বদমাশরা খুব ভয় পায় ওকে। গুন্ডা হলেও অনেক ভক্ত আছে ওর। ওর দলবল আছে ভালরকম ... '----- ' তাই নাকি ? আমাদের দ্যাশেও একজন ছিল এইরকম। শফিরুল মোল্লা ... কারও জাত ধর্ম দেখত না ... মানুষ বিপদে পড়লেই দলবল নিয়া ঝাঁপায়ে পড়ত। ভীষণ সাহসী সিল। পলিটিক্স একেবারেই বুঝত না। শয়তানদের যম সিল। অনেক লোক ঠিক একইভাবে শফিরুলকে ভগবান বা পয়গম্বর মানত। কিন্তু ... 'গঙ্গা বলল, ' কিন্তু ... কি ? '------ ' হ্যারে বাঁচতে দিল না ... খুন হয়্যা গেল... '----- ' অ্যাঁ ... ওঃ ! ' গঙ্গা অস্ফুটে বলল।দীনবন্ধু বলল, ' ইশশ্ ... এরা এই ভাবেই মারা যায় ... '---- ' কারা মারল ? ' গঙ্গা জিজ্ঞাসা না করে পারল না।জন্মেজয়বাবু চায়ের গ্লাসে শেষ চুমুক দিয়ে গ্লাসটা নামিয়ে রাখলেন। তারপর বললেন, ' ভাল কথা জিগাইস... কারা মারল ! সেটা কি কোনদিন জানা যায় ? তা'ইলে তো কোন সমিস্যাই থাকত না। যাদের কাজ হাসিল করতে সমিস্যা হইতেসিল তারাই মারছে। সেই বেলায় ধর্ম বা জাতি বা পার্টি টার্টির কোন ভেদাভেদ নাই। মিলেমিশে সব একাকার ... স্বার্থে ঘা লাগলেই হইল ... 'গঙ্গা একদৃষ্টে রাস্তার দিকে তাকিয়ে কি ভাবছিল।সে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল, ' হমম্ ... '।দীর্ঘশ্বাসটা কি ভেবে ফেলল কে জানে।প্রায় পনের মিনিট ধরে সাগর সম্পর্কিত নানা তথ্য আহরণের পর জন্মেজয়বাবু গঙ্গার দোকানের বেঞ্চি থেকে গা তুললেন।বললেন, ' চল ... দীনবন্ধু বাড়ির দিকে আগাই। বেলা বাড়ত্যাসে ... পূজা পাঠ বাকি ... 'অঞ্জলির কিন্তু রাত্রির ওপর রাগ যায়নি। দীনবন্ধু কি ফেলনা ছেলে নাকি। অত নাক উঁচু কিসের ? নয় একটু বেশি লেখাপড়া করেছিস। তার জন্য এত গোমর... অতি দর্পে হতা লঙ্কা .... এক মাঘে শীত পালায় না ... দীনবন্ধুর মতো সোনার চাঁদ ছেলে আর পাবি ? উঁ... উঃ ... বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বীচি ... এইরকম নানা চিড়বিড়ে চিন্তা অঞ্জলির মাথার মধ্যে ঠোক্কর মারতে থাকে থেকে থেকে।অঞ্জলি কার কাছে যেন খবর পেয়েছে পরশুদিন বিকেলের দিকে রাত্রি নাকি কার সঙ্গে চাচার হোটেলে ঢুকেছিল। কি বিশ্রী কান্ড ... ছ্যা ছ্যা !আরও চোখ কপালে ওঠার মতো খবর হল যে, সেটা নাকি ওই গুন্ডা সাগর মন্ডল ছিল। খবরটা অঞ্জলি এখনও পুরোপুরি হজম করে উঠতে পারেনি।শিবুদার মেয়ের শেষ পর্যন্ত এমন অধঃপতন ... ছ্যাঃ ...।অঞ্জলি ঠিক করল তার মেয়ের ব্যাপার স্যাপার শিবুদার নজরে আনার দরকার। একজন জ্ঞাতি হিসেবে এটা তার অবশ্য পালনীয় কর্ত্তব্য বলে মনে করল অঞ্জলি। সে ঠিক করল, কাল সন্ধের দিকে ওদের বাড়িতে যাবে সে।কাবেরীর মন আজ খুশি খুশি। সুমনা আজ তার সঙ্গে যাবে নিখিল স্যারের কোচিং এ ভর্তি হতে। সে বাড়ির অনুমতি আদায় করতে পেরেছে। এর পিছনে অবশ্য তার বাবার অবদান আছে ষোল আনা। শেষ পর্যন্ত বাসন্তীদেবী বুঝতে পারলেন যে এই স্যারের কাছে পড়লে মেয়ের পরীক্ষায় ভাল ফল অবশ্যম্ভাবী। তার প্রতীক্ষা অবশ্য এখন গন্ধরাজ ফুল জোড়া ঘিরে। কবে আসবে সে সুমনার জুড়ি হয়ে।সে যাই হোক, কাবেরী সুমনাকে নিয়ে সন্ধেবেলায় যথাসময়ে পৌঁছল নিখিল ব্যানার্জীর কোচিং ক্লাসে। নিখিলবাবু ঘরে ঢোকার পর কাবেরী বলল, ' স্যার, এই যে আমার বন্ধু ... বেথুনে আমরা একই সঙ্গে ... '------ ' ও আচ্ছা ... বস বস ... গার্জেনের পারমিশান নিয়ে এসেছ তো ? ছেলেমানুষ সব ... দিনকাল ভাল না। সাগর মন্ডল আর ক'জনকে গার্ড দেবে ? বড় কঠিন সময় ... বড় কঠিন সময় ... নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস ... 'কাবেরী স্যারের এই ধরণের জটিল বাক্যবিন্যাসের সঙ্গে পরিচিত। সে চুপ করে রইল কিছু বুঝে বা না বুঝে। সুমনা তাকিয়ে রইল স্যারের মুখের দিকে। কিছু বোঝার চেষ্টা করতে লাগল। ( চলবে )********************************************
    উড়ো চিঠি - ০৩ - Katha Haldar | যে চিঠি পৌঁছবে না কোনওদিন, কোনও ঠিকানায়।এরপর একদিন আয়ুহীন পরিমাপে দূরত্ব বাড়িয়ে নেয় অবুঝ হৃদয়। নাছোড়বান্দা ভরসা আস্তে আস্তে লুকিয়ে পরে ওই পাহাড়ি ঝর্ণার নীচে, লোকগাথায়। মানুষের মতো মানুষ। প্রথম দুই মানুষের মধ্যে আলোকবর্ষ ফারাক। একটা নিস্তরঙ্গ জীবনের মধ্যে হঠাৎ সেদিন কতগুলো পাতা ঝরেছিল একটা, দুটো করে। তাতে প্রত্যেক স্তর কেঁপে ওঠে ভয়ে, ওরা লুকিয়ে পড়তে পারলে বাঁচে। ম্লান আলো ভরসা।অথচ মহাসমারোহে আসা প্রেম থেকে বন্ধুত্বের মাঝে এই মরতে বসা আলো বড় বেমানান। একদিকে আশ্রয় খোঁজা ভীতু জীবন, অন্যদিকে চিলেকোঠার জাফরীতে চোখ রাখা ভোর। এসবের মাঝে শুধু তুমি নেই। কোনওদিন ছিলেনা।মোহন বাঁশি সুরে এ জীবনে জোয়ার আসে। সে বোঝায় মুহূর্ত, বোঝায় উদযাপন। অবাধ্য জটিল ধাঁধায় জড়িয়ে পড়া সপ্তদশীকে বোঝায় আবেগের স্তর। এক মাত্রা থেকে অন্য মাত্রায় উত্তরণের আগেই মুখ থুবড়ে পড়ে সাঁঝবাতি। একটু একটু করে গাঢ় হয়ে আসা অন্ধকারে ভালোবাসা মৃদু পায়ে আসে। নানা রূপ নানা বর্ণ পেরিয়ে একক অনুভূতি হয়ে সে ছড়িয়ে পড়তে থাকে ইউক্যালিপটাসের বন, কাকভিজে হয়ে বাঁক নেওয়া পাহাড়ি রাস্তায়, অর্কিডের নীলে, তিস্তার স্রোতে। সংকীর্ণ একমাত্রায় চার অক্ষর ধরে না। সে ছড়িয়ে পড়ে তার বহু অস্তিত্বের অধিকার নিয়ে। পুরোনো অঙ্কের পাতা আমাদের কাগজের নৌকা। ভেসে যায় ভুল হিসেবের জলে। অগোচরে যতসম্ভব তত ত্রুটি ক্ষমাহীন হয়। অপ্রতিরোধ্য।সংশোধনে দুই মানুষের স্থান বদল হয়, অপরিবর্তিত দূরত্ব অসুখের মত। ছড়িয়ে পড়ে অস্থি-মজ্জায়, শিরায়-উপশিরায়।মৃতদেহের সাথে দূরত্বও কি পোড়ে? পুড়ে যায় অবুঝ হৃদয়? কিম্বা দুর্বোধ্য চতুর্মাত্রিক অনুভূতি?প্রবণতা থেকে অভিঘাত একে একে জ্বলে ওঠে আরাত্রিক হয়ে। আমারা আবার তাকে সাঁঝবাতি বলে ডাকি।
    আমাদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা - বকলম -এ অরিত্র | আমাদের জীবন যাপনে দুই ধরণের জিনিস দরকার হয় – পণ্য ও পরিষেবা। প্রতিটি পণ্যের জন্য আমরা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর (জল, স্থল, বাতাস) নির্ভরশীল। যেমন কাঠ, জ্বালানি বা ফসলের মতন সরাসরি ব্যবহার করার জিনিস আর নাহলে নানান খনিজ দ্রব্য যার থেকে তৈরী হয় আমাদের প্রয়োজনের জিনিস যেমন সিমেন্ট থেকে সেমিকন্ডাক্টর। প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার না করে কোনো পণ্য উৎপাদন সম্ভব নয়। পরিষেবার জন্যে আমরা নির্ভর করে থাকি অন্যান্য মানুষের (বা প্রাণীর) ওপর, যাদের জীবনধারণ নির্ভর করে প্রাকৃতিক সম্পদের ওপরে, ফলে পরিষেবার ক্ষেত্রেও একটা পরোক্ষ নির্ভরশীলতা থাকে।অর্থাৎ আমরা বেঁচে থাকার জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ করে ব্যবহার বা ভোগ করি, আর প্রকৃতি ক্রমাগত এইসব প্রাকৃতিক সম্পদের উৎপাদন বা সৃষ্টি করে চলে। কিন্তু প্রাকৃতিক সম্পদ কি অঢেল? না নয়, তবে প্রকৃতির সম্পদ সৃষ্টির একটা নির্দিষ্ট হার (বা গতি) আছে, কোনো একটি বছরে পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে একটি নির্দিষ্ট পরিমান সম্পদ সৃষ্টি করে।  সেই সম্পদ সৃষ্টির হারের কথা মাথায় রেখে যদি আমরা তার সমান বা তার থেকে থেকে কম সম্পদ ব্যবহার করি তাহলে সেই মানব জীবন হবে 'বহনীয়' (sustainable)। এর একটা পরিমাপ হলো Earth Overshoot Day (EOD) বাংলায় হয়তো "বিশ্ব লক্ষ্য-অতিক্রম দিবস", (তবে  অনেকে আবার EOD এর পরিসংখ্যানগুলো মানেন না)। যাই হোক, EOD হলো বছরে সেই দিনটি, যেই দিনে কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষ ওই ভূখণ্ডে সারা বছরে সৃষ্ট সম্পদের সমপরিমান সম্পদ ব্যবহার বা ভোগ করে শেষ করে। এই EOD প্রতিটা দেশ ও সমগ্র বিশ্বের জন্য গণনা করা হয়। আরো জানতে দেখুন – www.overshootday.org। এখন এটা পরিষ্কার যে পৃথিবী যে গতিতে সম্পদ সৃষ্টি করে আমরা যদি তার থেকে বেশি গতিতে সম্পদ নিঃশেষ করতে থাকি তাহলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। তাই আদর্শ অবস্থায় এই EOD দিনটি হওয়া উচিত ৩১শে ডিসেম্বর বা তারও পরে। কিন্তু আমরা যদি সারা বিশ্বের নিরিখে EOD দেখি তাহলে দেখতে পাচ্ছি এই ২০২৩ সালে সেটা ২রা আগস্ট পড়েছে। বোঝাই যাচ্ছে যে আমরা প্রাকৃতিক সম্পদ উৎপাদনের হারের প্রায় দ্বিগুন হারে  সম্পদ নিঃশেষ করে চলেছি। যদিও এই গতি বা হারটা সারা বিশ্বে একই রকম নয়। উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো যেমন আরো অনেক আগেই তাদের নিজের নিজের EOD অতিক্রম করে, তেমনি আফ্রিকা মহাদেশ ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের (বিস্তৃত অরণ্য ভূমির আশীর্বাদে) কোনো কোনো দেশ তাদের দেশের EOD অতিক্রম করেই না, অর্থাৎ প্রকৃতির উৎপাদনশীলতার হারের থেকে তাদের আহরণের হার কম।ফলে কিছু চিন্তাভাবনা উঠে আসছে বিশ্বজুড়ে যাতে করে আমাদের জীবনযাত্রার ধরণ পাল্টে পরিবেশগতভাবে বহনীয় সভ্যতা তৈরী করা যায়।১) অযথা অপচয় বন্ধ করা। এর একটি ভালো উদাহরণ ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমানো, গণপরিবহন ও কম দূরত্বের জন্য পায়ে হাঁটা বা সাইকেলের মতন ন্যূনতম শক্তি ও সম্পদ অপচয়কারী পরিবহন বিকল্প গ্রহণ করা যেখানে যতটা সম্ভব। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্যে পরিকাঠামো বাবদ অনেক সম্পদ নষ্ট হয়, গাড়ি নির্মাণের পেছনের প্রভূত সম্পদ ও শক্তি ব্যয় হয় আর গাড়ি চালানোর জন্য জ্বালানির খরচ তো আছেই, সেটি আবার পরিবেশ দূষণও করে। অন্যান্য ক্ষেত্রেও এইভাবে ভাবা যেতে পারে, যেখানে জীবনযাত্রার মানে বিরাট কোনো আপস না করেও অপচয় উল্লেখযোগ্য ভাবে কমানো যায় এমন বিকল্প গ্রহণ করা যায় সেখানে ভাবা হচ্ছে।২) পুনর্ব্যবহারযোগ্য জিনিসপত্র তৈরী করা এবং অভ্যাস করা। একটি পণ্য তৈরীতে যে সম্পদ ব্যবহৃত হয়, যদি তার একটা অংশ খারাপ হয়ে পরে তাহলে পুরোটা পণ্যটিকে বাতিল করার (use and throw) পরিবর্তে সেটার খারাপ হয়ে পড়া অংশ পাল্টে বা মেরামত করে যদি চালানো যায় তাহলে অনেক সম্পদ ও শক্তির সাশ্রয় হয়। ইউরোপের অনেক অংশে পুরোনো বাড়ি, অব্যবহৃত বাড়িকেই নতুন কাজে ব্যবহার করে নেওয়ার চল ছিল এবং সেই প্রবণতা অন্যত্রও বাড়ছে। জামা কাপড় ও অন্যান্য পণ্যের ক্ষেত্রেও তাই। অবশ্য এই বাতিল করে ভেঙে ফেলে আবার নতুন তৈরী করার ব্যবস্থা স্বাভাবিক ভাবে আসেনি হয়তো, এই ভিডিও রিপোর্টটি[১] দাবি করেছে আমাদের এই "অতি উৎপাদন নির্ভর" আর্থিক বৃদ্ধির মডেলের কারণেই এই use & throiw অভ্যেস তৈরী করা হয়েছিল।৩) স্থানীয় জিনিসের প্রতি জোর। পণ্য বা পরিষেবার জন্য স্থানীয় জিনিস/উপাদান ব্যবহার করার দিকে ঝোঁক দেওয়ার অন্যতম কারণ হলো 'পণ্য পরিবহন' বাবদ যে সম্পদ ও শক্তির খরচ হয় তা কমানো। স্থানীয়, সহজলভ্য, উপাদান দিয়ে কিভাবে উৎকৃষ্ট বাড়ি, জামাকাপড় বা অন্যান্য পণ্য তৈরী করা যায় সেই নিয়ে গবেষণার প্রতি ঝোঁক দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে।অর্থাৎ উন্নয়ন বৃদ্ধি বা অর্থনীতিকে উৎপাদননির্ভর না করে অন্যভাবে চিন্তা করার চেষ্টা। পোশাকি নাম বোধহয় post-growth economics (বৃদ্ধি-উত্তর অর্থনীতি) বা degrowth (বাংলায় কি অববৃদ্ধি?)। আরও হয়তো কিছু চিন্তাভাবনা আছে, এখন আমার এইটুকুই মাথায় এলো। যাই হোক এখানে আমার একটি ব্যক্তিগত প্রশ্ন আছে। আজকে যে কৃবু (AI) নির্ভর ভবিষ্যৎ আমরা কল্পনা করছি, তাতে যে পরিমান গণন-শক্তির প্রয়োজন হবে, সেইটা কি প্রচুর পরিমানে প্রাকৃতিক শক্তির ব্যয় ছাড়া সম্ভব? যদি ধরা যাক পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার করে তার প্রয়োজন মেটানো গেলো, কিন্তু এই প্রভূত পরিমানে শক্তির উৎপাদনে পৃথিবীর ওপর পরিবেশের ওপর প্রভাব কী হবে?[১] – ভিডিও 
  • ভাট...
    commentযদুবাবু | আমার প্রিয় কবি A E Housman এর একটা কবিতার প্রথম স্তবক। আজকের প্রোটাগনিস্ট ক অথবা খ এর জন্য। 
     
    "Shake hands, we shall never be friends, all's over;
      I only vex you the more I try.
    All's wrong that ever I've done or said,
    And nought to help it in this dull head:
      Shake hands, here's luck, good-bye.
     
    But if you come to a road where danger
      Or guilt or anguish or shame's to share,
    Be good to the lad that loves you true
    And the soul that was born to die for you,
      And whistle and I'll be there"
     
    ওনার লেখা A Shropshire Lad (and other poems) আমার পড়া বিষণ্ণতম কবিতার বইগুলির মধ্যে একটা। 
    commentkk | লসাগুদা, না না,আমি কাউন্সেলিং করিনা। কিন্তু কমপ্লেক্স পিটিএসডি আর ক্লিনিকাল ডিপ্রেশনের কারণে থেরাপিতে আছি একাধিক বছর ধরে। সেখানে যা শিখেছি সেই থেকেই বললাম আর কী। আপনার সাথে আমি একমত যে প্রোফেশন্যাল পরামর্শ খুব কার্যকর। আর সত্যি, ঐ জর্জ যেমন বলেছেন, নিজের সাথে থাকাটা আসলেই খুব কঠিন কাজ!
    comment&/ | মহাশ্বেতা আর ঋত্বিক প্রায় সমবয়সী ছিলেন। ছোটোবেলা এক বইয়ে তাঁরা পড়েছিলেন এক রাজকন্যা একরকম সাদা কন্দ খেলেন ও অনন্ত যৌবন লাভ করলেন। ওদের বাগানে কদিন পরে ওরকম সাদা কন্দ উঠল। দুজনে মিলে খেলেন। অনন্ত যৌবন পাবার জন্য। কিন্তু ওগুলো ছিল ছায়ায় হওয়া মানকচু। সাংঘাতিক গলা চুলকানোর কচু। তারপরে যা হইল -
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত