এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    আমার বই আর মফস্বলের ভোর - স্মৃতি ভদ্র | অলংকরণ: রমিতআশির প্রথমভাগ প্রায় শেষ হবার পথে তখন। বারোয়ারী উঠোনের আমাদের আনন্দবাড়িতে তখনও প্রতিবেলা পাত পড়ে জনা পঁচিশের। নিজেরা বাদেও জমির ফসলে দিনখাটা মানুষ, সংসারের কাজে হাত লাগানো পূর্ণির মা কন্যাসহ, তাঁতঘরের ড্রাম মাষ্টার, ম্যানেজার আর কখনো কখনো মাদলা গ্রামের আইনুল চাচা। বলা যায়, উৎসব ছাড়াও বাড়ির উঠোনে পরবের কমতি ছিল না একটুও। সবদিনই আনন্দের, সবদিনই পরবের। আর আমি পাঁচ পেরিয়ে ছয়। বাড়ির পাশে এক নতুনধারার ইশকুল। কিন্ডারগার্টেন। পাশের বাড়ির বলাকা ফুফু সে ইশকুলের আপা। চেয়ারম্যান দাদুর এক শরিকের পড়ে থাকা খালি বনেদি ভবনে সাইনবোর্ড ওঠলো ‘‘উদয়ন কিন্ডারগার্টেন’। শোনা যায়, সে শরীক আমেরিকায় গিয়ে আর ফেরেননি। কাগজপত্রের জটিলতার কারণে নিজ দেশে তাঁর ফিরে আসাও অনিশ্চিত। কিন্তু দেশের জন্য পরান তো কাঁদে। তাঁর ইচ্ছাতেই সে ভবনের ফাঁকা ঘরগুলো হয়ে উঠেছিলো ক্লাশ রুম। হয়ে উঠেছিলো আমাদের শৈশবের কাগজনৌকা সময়।পাড়ায় প্রথম এমন ইংরেজি ইশকুল। সোরগোলের অতিশয্য। কেউ ফটকে দাঁড়িয়ে উঁকি দেয় তো কেউ জানালার শিক ধরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। যেন সার্কাসের দল এসেছে! আর এসেম্বলিতে যখন ‘ অ্যাটেনশন’ ‘স্ট্যান্ড ইজি’ বলে শারীরিক শিক্ষক গলা চড়াতেন তখন চারপাশের চোখগুলো গোলগাল হয়ে ঘিরে ধরতো ইশকুলের মাঠকে।বিড়ম্বনা। অদ্ভুত বিড়ম্বনা। সে বিড়ম্বনার আড় পেরিয়েই আমি বলাকা ফুফুর হাত ধরে পৌঁছে গিয়েছিলাম জীবনের প্রথম শিক্ষা নিকেতনে। নিজের আড়ষ্টতা আর জড়তা কাটিয়ে একটু একটু অভ্যস্ত হচ্ছিলাম আমি,পুষি ক্যাট পুষি ক্যাট হোয়্যার হ্যাভ ইউ বিনআই হ্যাভ বিন টু লন্ডন টু ভিজিট দ্যা কুইন…ঠিক তখনি এক দুপুরে বাবা বাড়িতে হাজির হলো বদলির আদেশ হাতে নিয়ে। পরের মাসে জয়েন করতে হবে সদ্য জেলা শবরের খেতাব পাওয়া এক শহরে। খুব দূরে নয়, আবার এমন কাছেও নয় যে বাবা দিনে গিয়ে অফিস সেরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে পারবে। তাহলে উপায়?আমাদেরকে চলে যেতে হবে বাবার সঙ্গে শহরে। তল্পিতল্পা নিয়ে অংশিদার হতে হবে উদবাস্তু জীবনের। সেই প্রথম আমাদের বাড়ির বারোয়ারী উঠোনের একচালা আনন্দে ভাঙন ধরলো। লাল বারান্দায় পড়া পাতের সংখ্যা কমলো। উঠোনে রোদে ভেজা তিল তিসির দুপুরে চড়ুই তাড়ানোর মানুষ কমলো। কিন্তু ওই যে, জীবনের গতি একমুখী! সে গতির সঙ্গে হয় পাল্লা দাও নয়তো ছিটকে যাও রেস থেকে!তাই জীবনের নিয়ম মেনেই এক শীতের সকালে বাকশো পেটরা, গুড়ের মেটে হাঁড়ি, মুড়ির টিন, ডানো দুধের কৌটায় কুমড়ো বড়ি আর একটা সোনালী চুলের বিদেশী পুতুল কোলে নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলাম আবার ফিরবো এই প্রতিজ্ঞা করে!তখন অবশ্য ফুলজোড় নদীতে সেতু হয়নি। স্টিমারে নদী পাড় হতে হতো। ভেপু বাজিয়ে যখন নদীর জল কেটে স্টিমার এগোচ্ছিলো তখনও আমার শৈশবসূলভ অস্বীকৃতি একমুখী সেই যাত্রায়,মা কবে ফিরবো আমরা…পূজার ছুটি আসতে কত দেরী…আমার ইশকুলের বন্ধুরা তো কাল থেকে ক্লাসে আমাকে পাবে না…পূজার ছুটিতে ফিরলে ওরা চিনতে পারবে তো আমাকে…সোনালী চুলের পুতুল বুকে জড়িয়ে রাখা মেয়েটিই জানতোই না,একবার পথে নামলে আমরা আসলে আজীবনের পথিক হয়ে যাই।নতুন শহর। মফস্বলি নিরিবিলি শহর। আমাদের মফস্বলি জীবন, নেহাতই সাদামাটা কিন্তু প্রাঞ্জল। সে জীবনে সবকিছু নতুন। নতুন ঘর। নতুন প্রতিবেশী। নতুন পাড়া। নতুন বিদ্যালয়। নতুন স্কুল ইউনিফর্ম। নতুন জুতো। আর নতুন আমি।সবে শহরের গায়ে জেলা সদরের ভারিক্কি নাম ঝোলানো হলেও আচারে আচরণে সে শহর ছিল একদমই সাদামাটা। রাস্তার মোরে কিংবা গলির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা টিনের আটচালা ঘরগুলো তখনও সাক্ষ্য দিতো আড়ম্বরহীন সময়ের। তবে সেসবের মাঝেও বেশকিছু বনেদি বাড়ি এখানেসেখানে ছড়িয়ে থেকে নিভৃতে বয়ান করতো শহরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের কথা। মন খারাপের আকাশভাঙা কান্না নিয়ে যখন বাড়ি আর ঠাকুমাকে ছেড়েছিলাম তখনও কিন্তু জানতাম না নদী পাড়ের সেই শহরের সঙ্গেই হয়ে যাবে আমার আজীবনের বোঝাপড়া! নদীর পাশেই নীচু এক পাড়া, আমলাপাড়া। আমাদের অস্থায়ী ঠিকানার প্রারম্ভ। তখনও যমুনা নদীতে শহর রক্ষা বাঁধ পড়েনি। তাই বাঁধনহারা নদী ইচ্ছে হলেই চলে আসতো বাসার উঠোনে। এজন্য নদী আর জলেই আমার শৈশবের কাগজনৌকা ভেসে বেড়াতে শুরু করলো ইছেমতন যখন তখন। তবে সেসব বাঁধাহীন দুরন্তপনা শেষে আমাকে যথারীতি ফিরতেও হতো বাঁধাধরা জীবনে। দাদুর কাছে হাতেখড়ি আর পন্ডিত স্যারের কাছে শ্লেট চকে স্বরবর্ণ জীবন এরপর আক্ষরিক স্কুলজীবন উদয়ন কিন্ডারগার্টেন হুট করে ফুরিয়ে গেলেও পুস্তকাদি জীবন তো আর উপেক্ষা করা যায় না।তাই ভর্তি করা হলো আমাকে বাসার সবচেয়ে নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে। গন্তব্য গৌরি আরবান প্রাথমিক বিদ্যালয়। একটা চারকোনা নতুন টিনের বাক্স। তার ভেতরে নতুন বই, নতুন রুলটানা খাতা আর নতুন কাঠ পেন্সিল। আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। নিরিবিলি আর নেহাতই আটপৌরে মফস্বলি সে শহরের এক শান্ত ভোরে শুরু হলো আমার পাঠশালা দিন। বাবা ওপার বাজার থেকে কিনে এনে দিয়েছিলো একটা চারকোনা টিনের বাক্স। শুরু হলো বালিকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। মধ্য জানুয়ারী, বাংলায় মাঘ। নদী জল থেকে উঠে আসা কুয়াশায় ঢেকে থাকা মফস্বলি শহরের আলস্য ভেঙে যে দু'একজন রাস্তায় থাকে তারা হয় ফুলের সাজি ভরে সাদা টগরে নয়তো চায়ের টঙ দোকানের উনুনে আগুন দিতো ঘষিতে। বাবার ঠিক করে দেওয়া রিকশা। রহিম চাচা। প্যাডেলে পা। রিকশার টুংটাং বেল। কুয়াশা কেটে আমার প্রথম বিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া।আকাশী রঙের স্কুল ইউনিফর্ম। সাদা কেডস। সাদা স্কার্ফ। চুলে দুই ঝুঁটি। আমার বইয়ের প্রথম ভাগ। এসেম্বলিতে মুষ্টিবদ্ধ হাত সামনে ছড়িয়ে,আমি শপথ করিতেছি যে, দেশের প্রতি অনুগত থাকিবো...জাতীয় পতাকায় স্যালুট, জাতীয় সংগীতে গলা মেলানো। শেষ হলেই বেজে উঠতো দফতরির ঘন্টা। একবার। প্রথম পিরিয়ড। প্রথম শ্রেণির স্কুলবেঞ্চ। রূপা, রনি, রাজিব, সবুজ সবাই এক বেঞ্চে। অশোকা দি'র গম্ভীর মুখ। সবুজ রঙের হাজিরা খাতা। রোল কল। দাঁড়িয়ে উচ্চকন্ঠে 'উপস্থিত আপা'।কালিবাড়ি মন্দিরের গা ঘেঁষা ইটের ওয়ালগাঁথায় ঢেউটিনের দোচালা। ক্লাসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছোট্ট চোখে প্রথমদিনই দেখে নিয়েছিলাম গোল্লাছুট খেলার অবারিত মাঠ আর টলটলে এক টুকরো পুকুরকে। হাতে ধরা আমার বই, প্রাথমিক গণিত আর সামনে শিক্ষকের টেবিলে ঊষা মাসি, মঞ্জু দি, অশোকা দি, আলপনা আপা। হাজিরা খাতায় ভর্তি রোল ২৭।ব্ল্যাকবোর্ড ডাস্টার চক। আমার বইয়ের প্রথম পাতা। আতা গাছে তোতা পাখি। রুলটানা খাতার প্রথম পাতা ভরে নিজের নামের বানান শেখা। আমার উত্তরণ। আমার বড় হওয়ার ভান করা। স্কুলের মাঠ। দাঁড়িয়াবান্ধা। ছুঁয়ে দিয়ে ভোঁ দৌঁড়। কালিবাড়ির গৌরমন্দিরে বাল্যভোগ। আর হলুদ কল্কি ফুলের ডালে একটা দুটো কাঠঠোকরা,ঠক...ঠক...ঠক...দফতরির একটানা ঘন্টা। ছুটি। মাটি জড়ানো পা কেডসে ঢোকানো। স্কুল গেটে হজমির পুরিয়া। লাল সবুজ কাঠি বরফ। আর চার আনায় পাওয়া নারকেল ছড়ানো সাদা বরফ।এরপর প্রতিদিনের একই নির্ঘন্ট…প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বরফপানি দিন। এলান্টিং বেলান্টিং দিন। ওপেন্টি বায়োস্কোপের বিবিয়ানার এঁটে বাঁধা চুলে মুক্তো জড়াতে জড়াতে আমি এগোতে থাকি সাহেববাবুর বৈঠকখানার দিকে। চলবে...
    নজরুল ও তাঁর শ্যামা মা - অনুরাধা কুন্ডা | অলংকরণ: রমিত লীলা মজুমদারের অহি দিদির গল্পে আছে যখনই রান্না করতে বসতেন ন দশটা কচি কচি ছেলে মেয়ে তাকে এসে ঘিরে ধরে বসত। অহি দিদি নানা রকম খাবার করে তাদের খাওয়াতেন কিন্তু তারা কেউ কথা বলত না। গল্পের শেষে গিয়ে জানা গেল যে এই বাচ্চারা এখনকার বাচ্চা নয়। তারা ১০০ বছর আগের বাচ্চা যাদের এক দুষ্টু লোক জিভ কেটে দিয়েছিল খাওয়ার সময় তারা ভারী গন্ডগোল করতে বলে। লীলা মজুমদারের গল্প অথচ এই ভারী নিষ্ঠুর কাহিনীটি গল্পের মূল জায়গাতে রয়েছে। কেন জিভ কেটে দিয়েছিল তারা দুষ্টু বাচ্চা বলে না অন্য জাতের বাচ্চা বলে? লিলু পিসি সেসব কথা বলে যাননি কিন্তু আমরা এখন যে সময় বাস করি সেই সময় বসে এটা মনে হতেই পারে যে বাচ্চাগুলো বোধহয় অন্য জাতের ছিল। তাই তাদের কল কল করা জিভ, কেটে দিয়ে তাদের কচি মুখের সব কথা বন্ধ করে দিতে দুষ্টু লোকদের কোন অসুবিধা হয়নি। যে সময় আমরা বাস করি সেই সময় দলিত হবার অপরাধে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা, উঁচু জাত আর নিচু জাতের কলহ জনিত সংঘাতে জেরবার সমাজ বড় দূষিত হয়ে আছে। আর তাই এই সময় দাঁড়িয়ে, "জাতের নামে বজ্জাতি সব" বলে ওঠা, সমস্বরে বলে ওঠা, চিৎকার করে বলে ওঠা দরকার। সেই চিৎকার, সেই দ্রোহ সেই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম যিনি লেটোর দলে নাম লিখিয়ে নাটক লিখেছিলেন, লিখতে শিখেছিলেন গান, যার ধর্ম ছিল প্রকৃত অর্থেই মানবিকতা। ইদানিংকালে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভিডিও গুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে ঘরে ঘরে ঢুকে কিছু মানুষ প্রশ্ন করছেন আপনার বাড়িতে তুলসী গাছ আছে? তাতে জল দেওয়া হয়নি নিয়মিত? আপনার বাড়িতে ঠাকুর ঘর আছে? আপনি পুজো করেন? তারা মানুষের ঘরের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছেন ঠাকুরঘর দেখবার জন্য এবং রীতিমতো শাসন করছেন যে দেবতার পূজা ভালোভাবে বাড়িতে হচ্ছে না। ২০২৬ সালে বসে আমাদের দেখতে হচ্ছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা বলছেন যে সনাতনপন্থী হয়ে তারা কোনরকম অনাচার সহ্য করবেন না এবং হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের বিবাহ তারা লাভ জিহাদ বলে ঘোষণা করছেন। যে দেশে কাজী নজরুল ইসলাম শ্যামা সংগীত লিখেছেন, লিখেছেন কৃষ্ণ ভজন আর লিখেছেন "বলো বীর বলো উন্নত মম শির", সেই দেশের বীর পুঙ্গবরা গৃহস্থ বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাত রক্ষার জন্য শাসানি-ধমকানি দিচ্ছেন। মৌলবাদ যখন সভ্যতাকে গিলে খাওয়ার জন্য অজগরের মতন হাঁ করে রয়েছে, তখন এ কথা মনে করা আবশ্যক কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় ১০০ টি শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন। সেই সমস্ত শ্যামা সংগীত নিয়ে "রাঙা জবা" নামে একটি আলাদা গানের গ্রন্থ রয়েছে। অধুনা উগ্র মৌলবাদের পাল্লায় পড়লে তাঁকে হয়তো প্রবল হেনস্থা হতে হত জাতে মুসলমান হয়ে শ্যামা সংগীত লিখে ফেলার জন্য। নজরুলের শ্যামা সঙ্গীতে আশ্চর্য ভক্তিভাব। কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন, কথায় আর সুরে বাঙালির মন প্রাণ শীতল করেছে। কোন বাঙালি না "শ্যামা নামের লাগল আগুন "শুনে আপ্লুত হয়েছেন! অসাম্প্রদায়িকতার অপর নাম কাজী নজরুল ইসলাম। পুত্র বুলবুলের মৃত্যুতে তিনি শোকাহত। কি করে শান্ত করবেন নিজেকে দিশা পাচ্ছেন না। আবেগ উথলে ওঠে, নজরুল দিশাহারা হন বারবার আর সেই শোক পারাবার পার হওয়ার জন্য আকুল হয়ে ওঠেন। সান্নিধ্যে এলেন বরদাচরণ মজুমদারের। যোগী বরদাচরণ মজুমদার নজরুলকে শাক্ত সাধনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পুত্র শোকে ক্লান্ত নজরুলের মন কোথাও যেন একটি অবলম্বন খুঁজে পেল। ভয়ংকরী নয়, ধ্বংসকারিনী নয়, কাল রুপিনী নয়। কালিকা মূর্তির মধ্যে নজরুল খুঁজে পেলেন মাতৃমূর্তি। ঠিক যেমন রামপ্রসাদের গান। যেমন কমলাকান্তের শ্যামা সংগীত। দেবী সেখানে দেবী নন। তিনি জননী রুপা। মানুষ যখন মনের মধ্যে হাহাকার করে, তখন অবলম্বন হিসেবে সে বোধহয় মাকে খুঁজে বেড়ায়। বাঙালি হৃদয়ে মাতৃমুর্তির স্থান বড় অপরূপ। সে কখনো মা, কখনো মেয়ে। মা ডাকের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কন্যা। কন্যাকে মা বলে ডেকে শান্ত হয় মন। বাঙালির এই চিরকালীন আকুতি কে যে নজরুল রাগ প্রধানের সুরে বেঁধে ফেললেন, তাকে হিন্দু বা মুসলমান বলে আখ্যা দিয়ে, তার মেধা মনন আর হৃদয়ের বিশালত্বের পরিমাপ করবে কে?বুলবুল অকালে মৃত। কবি লিখেছেন "শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয়।" কিন্তু তার শূন্যতা তাতে পূর্ণ হয়নি। পুত্র শোকে আকুল পিতৃ হৃদয় শান্ত হয়েছে শাক্তসাধনার খোঁজ পেয়ে। একইসঙ্গে ইসলামী গান লেখা এবং শাক্ত সাধনার গান লেখা, এ বড় কঠিন কাজ। দুর্লভ প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম এই অসম্ভব কঠিন কাজ সম্ভব করেছিলেন দরদিয়া মননে। ইসলামী গান যখন লিখেছেন তখন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে" গানে যে আকুতি, সেই একই আকুতি ফুটে উঠেছে যখন এসে শ্যামা সঙ্গীতে লিখেছেন "স্থির হয়ে তুই বোস দেখি মা"। হিন্দু না "ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন, কান্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা'র"। এই অসম্ভব সাহসী উক্তি যাঁর কাব্য ভাষা, তিনি যে একাধারে ইসলামিক গান এবং হিন্দু ভক্তি গীতি রচনা করে সুর পিপাসু বাঙালির মন মাতিয়ে দেবেন তাতে সন্দেহ কিসের! কিন্তু শুধু মন মাতলে তো হবে না।মন শান্ত হবে কীসে। একদিকে স্ত্রী প্রমীলার অসুস্থতা, অন্যদিকে পুত্রশোক। কবি স্থিতধী হতে চাইছেন।তাই কী দেবী কালিকাকে মাতৃরূপে দেখেছেন? আর ঐ ব্যক্তিগত শোক উপশমের জায়গা থেকে উপনীত হয়েছেন মহাকালের কোলে মহাকালীর বন্দনায়? শোকে,প্রবল সন্তাপে মানুষ মাতৃক্রোড় খোঁজে।একমাত্র মা পারেন শোকের ক্ষতে স্নেহের মলমটি লাগাতে। নজরুল তাই কালীর শক্তিময়ী রূপ আর স্নেহময়ী মাতৃরূপকে আরাধনা করেছেন অনির্বচনীয় আকুতিতে...শ্যামা নামের লাগল আগুন আমার দেহ ধূপকাঠিতে,যতো জ্বালাই সুবাস ততো,ছড়িয়ে পড়ে চারিভিতে..। ব্যক্তিজীবনের শোকে যে দেহ, মন পুড়ছে,তাকে তিনি সমর্পণ করেছেন মায়ের পায়ে। আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হচ্ছে দেহ মন...ভক্তি আমার ধূমের মতো,উর্দ্ধে উঠে অবিরত..এই আকুতি তো একেবারে ঘরোয়া গৃহস্থ আজন্ম স্নেহের কাঙাল বাঙালি হৃদয়ের আর্তি। রবি ঠাকুর বলেছেন..আমার এ ধূপ না জ্বালালে,গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে।তাঁর নিঠুরকে সাধারণ মানুষ ততোটা বোঝে না,যতোটা বোঝে নজরুলের কালিকাকে। অ্যাবস্ট্র্যাক্ট নয়। কনক্রিট। মানুষ মূর্তি বোঝে। রবীন্দ্রনাথের নিঠুর তাই অনেকটা দূরের। মা বড় কাছের। তাঁর আরাধনায় অন্তরলোক স্নিগ্ধ, শান্ত হয়, আর পুত্রশোকাহত পিতা অপেক্ষা করেন, কবে তাঁর দেহ ভস্ম হবে..সেই ভস্মে আঁকা হবে মায়ের কপালের তিলক। নিজেকে নিবেদন করার এই আকুলতা, এমন ভক্তি, নিজেকে নিঃশেষ করা নিবেদন, এমন শ্যামা সংগীত কজন লিখতে পেরেছেন? ২০২৬ সালে এসেও আমরা হিন্দু মুসলমানের উর্ধ্বে উঠতে পারলাম না। এখনো আমাদের আলোচ্য বিষয় ওরা হিন্দু না, ওরা মুসলমান? তবে নজরুল কেমন করে লিখলেন এমন গান? কোন অপার সাধনায়, গভীর মেধায় এবং অনন্য ভক্তিতে লিখলেন "মহাকালের কোলে বসে গৌরী হল মহাকালী।"বিশেষ করে এই গানটিতে কালীর যে রূপ নজরুল বর্ণনা করেছেন সেটি আমাদের বিস্মিত করে। দেবী কালিকাকে মূর্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে এই সৌরজগতের এক প্রকাণ্ড অংশ হিসেবে ভাবা, কল্পনার কি বিস্ময়কর প্রকাশ। "তবু মায়ের রূপ কি হারায়, সে যে ছড়িয়ে আছে চন্দ্র তারায় মায়ের রূপের আরতি হয় নিত্য সূর্য প্রদীপ জ্বালি"।এই শ্যামা সংগীতটিতে কিন্তু নজরুল কংক্রিট থেকে একেবারে অ্যাবস্ট্রাক্ট এর দিকে চলে গেছেন এবং সেটিও চূড়ান্ত অ্যাবস্ট্র্যাক্ট। অপরিসীম ক্ষমতা বলে একজন কবি এই কল্পনা করতে পারেন। মহাকালীর যে কৃষ্ণবর্ণ রূপ সেটি তিনি প্রত্যক্ষ করছেন রাত্রির গভীর কালো আকাশের মধ্যে। চন্দ্র তারার গহনা পরা মাতৃ মূর্তি। মহাকাল এবং মহাকালী, উভয়কে এই সৌরজগতের অংশ হিসেবে কল্পনা করে, কালের এবং কালীর সম্পর্কের এক অপূর্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন কবি নজরুল ইসলাম। আবে সেই একই সঙ্গে বজায় রেখেছেন কালির ঘরোয়া অন্য একটি রূপ। "উমা হলো ভৈরবী হয় ভৈরবেরে বরণ করে" হেরি শিবের সিরে জাহন্নবীরে শ্মশানে মশানে ঘোরে।" দুর্গা হোমা এবং কালি যে একই মহাশক্তির বিভিন্ন রূপ তা এই ছোট্ট গানটির মধ্যে দিয়ে অপূর্ব ভাবে প্রকাশিত। অন্ন দিয়ে ত্রি জগতে অন্অনদা মোর বেড়ায় কেঁদে ভিক্ষু শিবের অনুরাগে ভিক্ষা মাগে রাজ দুলারি। একটি গানের মধ্যে মহাশক্তির এমন বিবিধ প্রকাশ আর কোন ভক্তিগীতিতে আছে? মুহূর্তে কালিকা হয়ে গেলেন ঘরের মেয়ে উমা, শিবের প্রেমে মাতোয়ারা উমা তিন ভুবনে অন্ন জুগিয়ে বেড়ান আর তার নিজের সংসারে কিনা অন্নেরর অভাব! অভাবে বাংলার দরিদ্র মানুষ নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ মধ্যবিত্ত মানুষ এই অন্নাভাব বড় ভালো বোঝে। তাই যে দেবী কালিকাকে তারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে প্রত্যক্ষ করতে পারেনা, তাকে দেখে ফেলে ওই ছোট্ট উমার মধ্যে। শিবের ঘরনী হয়ে তার যে গৃহিনীপণা, নজরুলের গানে তার বিশ্বস্ত প্রকাশ। তাই মায়ের কাছে নালিশ জানাচ্ছেন সন্তান। "আমার যারা দেয় মা ব্যথা আমায় জারা আঘাত করে তোরই ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী"। কোথায় যেন কানে বাজে "সকলি তোমারি ইচ্ছা"। কিন্তু নজরুল নিজস্বভাবে স্পষ্ট। "আমার যারা ভালোবাসে বন্ধু বলে বক্ষে ধরে তোরই ইচ্ছা ইচ্ছাময়ী আমায় অপমান করে যে মাগো তোরই ইচ্ছা সে যে।" জীবনের বিভিন্ন ওঠা পড়া কি নজরুলকে এইভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল?" আমায় যারা যায় মা ত্যেজে যারা আমার আসে ঘরে তোর ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী।" ভক্তি ভাবে পরিপূর্ণ, স্ফটিকের মত টলটলে স্বচ্ছ নিবেদন। ব্যথিত শোকাতুর সন্তান যেন নালিশ করছে মা-কে। একমাত্র মা-ই পারেন তার আহত, অপমানিত হৃদয়টিকে শান্ত করতে। একমাত্র বাঙালি ঘরেই দেবীকে মা এবং মেয়ে, এই দুইভাবে আরাধনা করা হয়। নজরুল তাই লিখতে পারেন "আমার ক্ষতি করতে পারে অন্য লোকের সাধ্য কিনা, দুঃখ যা পাই তোরই সে দান মাগো সবই তোর মহিমা।" এ গান যেন স্বগতোক্তি। সমস্ত দুঃখের স্থলনে এই গানের মধ্যে দিয়ে। সুরে, ভাবে, মননে, কোথাও এতোটুকু ঘাটতি নেই "তাই পায়ে কেহ দলে যবে, হেসে সয়ে যাই নীরবে।" সমর্পণের এই দর্শন সাধনার মূল কথা। তাই এই অপূর্ব ভাব সাধনার আরেক প্রকাশ আমরা দেখি "বলরে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণ তল" গানে।কবি বলছেন, "মায়াতরুর বাঁধন টুটে মায়ের পায়ে পড়লি লুটে, মুক্তি পেলি উঠলি ফুটে আনন্দ বিহ্বল, তোর সাধনা আমায় শেখা জীবন হোক সফল।"এ যেন ইংরেজ কবি জন কিটসের negative capability আহরণ করার সাধনা।"কবে তোরই মতো রাঙবে রে মোর মলিন চিত্ত দল"সম্পূর্ণ নিজের সত্তা বিসর্জন দিয়ে, ফুলের মতো নির্বিকারত্ব প্রাপ্তি। মাতৃ সাধনার মূল মন্ত্র। এই ভক্তির কোন জাত নেই। যে ভক্তি নিয়ে তিনি দেবী কালিকাকে মহাবিশ্বের মহাকালী রূপে দেখেন সেই একই ভক্তি নিয়ে তিনি লেখেন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে, মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে যেন উষার কোলে রাঙা রবি দোলে।"এই ভক্তি ভাবে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোন হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব নেই এবং জাত পাতের কোন প্রশ্নই নেই কারণ সন্তান আর মায়ের সম্পর্কের মধ্যে জাত আসেনা। এই সেই কাজী নজরুল যিনি লিখেছেন "বল বীর বল উন্নত মম শির", লিখেছেন "আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন।" লিখেছেন "আমি টর্পেডো আমি ভীম ভাসমান মাইন।" সেই তিনি আবার পরম ভক্তি ভরে মায়ের সঙ্গে সন্তান সম্পর্ক স্থাপন করে জানিয়েছেন তাঁর সমস্ত সুখ,তাঁর বেদনা তাঁর অভিমান তার অপমান। গানের মধ্যে দেবীর সঙ্গে পূজারীর, মায়ের সঙ্গে সন্তানের যে বিভিন্ন রকম সম্পর্ক উঠে আসে তা কিন্তু বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য। কখনো মা, কখনো রাঙা জবার বায়না ধরে কাঁদা কালো মেয়ে...আবার সেই তারার মালা চুলে গাঁথা এলোকেশী কন্যা। মুহূর্তে রূপান্তর। ঘরোয়া ক্রন্দনরত মেয়েটি নিমেষে সৌরজগতের মহাশক্তির প্রকাশ হয়ে ওঠে...তার যুগল আঁখি সূর্য চাঁদ। অনুরাগের রাঙা জবা থাকুক তাঁর মনের বনে,কালো মেয়ের রাগ ভাঙাতে তিনি ফুলের খোঁজে ঘোরেন...রাঙা চরণ দেখতে পেয়ে তাঁর শান্তি। পুত্রশোক কী এইভাবে কিছুটা শান্ত হয়েছিল তাঁর?" আমার আর কোনো গুণ নেই মা তারা"। স্বীকারোক্তি অকপট। "হাত বাড়িয়ে মা তোর কোলে যাব না আর মা মা বলে...মা হয়ে তুই ঘুরে বেড়াস,আমায় ধূলায় ফেলে রেখে..তোর আর ছেলেমেয়ে অনেক আছে..আমার শুধু নাই যে কেহ।" মা বেটার সম্পর্কে অভিমান আর আদর মিশিয়ে দেন কবি। এই সম্পর্কের কোনো দেশ নেই, জাতি নেই, ধর্ম নেই, আবার বাঙালিয়ানায় মোড়া একটি মিষ্টত্ব আছে, দেবী থেকে সে মুহূর্তে হয়ে ওঠে তাঁর 'হাবা মেয়ে'।"কোনো অঙ্ক শেখাও নি তো, তোমার অঙ্ক বিনা তারা।" ভাগের অঙ্ক শেখেননি নজরুল। তাই তাঁর ভক্তি এতো শুদ্ধ। সুর এতো প্রাণবন্ত। জগতজুড়ানি শ্যামার কাছে এক মাতৃহারা,সন্তানহারা প্রাণ। মা ছেলেকে মারে ধরে, কিন্তু কাছছাড়া করে না। চিরমাতৃহারা সন্তান আশ্রয় খুঁজছে ছোট শিশুর সারল্য নিয়ে। শব্দ চয়নে কী বিস্তার। "জুড়ানো" শব্দটি একান্ত বাঙালি। তার থেকে ' জুড়ানি', একেবারে ' জগতজুড়ানি'। তাকে বিদেশী ভাষায় ব্যক্ত করা মুশকিল। নজরুলের আবেগ বড় শক্তিশালী, শবের মাঝে শিবজাগানো শ্মশানকালীতে তাঁর কাছে আনন্দের নন্দিনী। কল্পনার বিস্তারে বিস্মিত হতে হয়। মা'কে পাষাণী বলেছেন, মা যে লুকিয়ে বেড়ান লোকে লোকে। আর মা কে না পেয়ে তাঁর ব্যথা ভরা হৃদয় জবা হয়ে ফোটে। আবার সেই নেগেটিভ কেপেবিলিটি। সেই নিবেদন আর ভক্তি। লেটোর দলে গানবাঁধা নজরুল, বিপ্লবী, বিদ্রোহী, অশান্ত, আবেগমথিত নজরুলের এক অনন্যরূপ খুঁজে পাই তাঁর শ্যামাসংগীতের কথায়, ভাবে, সুরে। তিনি কতোবড় ভক্ত ছিলেন,তা প্রমাণ করার জন্যে নয়,শাক্তসাধনায় কত গভীর ছিল তাঁর জ্ঞান তাও প্রমাণ করার জন্যে নয়...জাত পাতের তফাৎ জলাঞ্জলি দিয়ে তাঁর যে অনাবিল মনখানি ছিল, সেই মনের স্পর্শ পাওয়ার জন্যে। এই তীব্র হানাহানির সঙ্কটকালে, সাম্প্রদায়িকতার বীভৎস আস্ফালনে,পেশীশক্তির আগ্রাসনের সময়ে, একবার অন্তত মনে করা, কাজি নজরুল ইসলাম গান বেঁধেছিলেন, শ্যামা মায়ের গান। তাঁর ইসলামের সঙ্গে ভক্তিগানের কোনো বিরোধ ছিল না, কোথাও রসবিচ্যুতি ঘটেনি, সুরধারায় এক ভক্তিবিপ্লব ঘটে গেছে।নজরুলের সেই প্রবল শক্তিশালী অথচ শিশুর মতো সরল মনটি আজ ভারতবর্ষে বড় দরকার। যে দেশে লাভ জিহাদের নামে মানব হত্যা হয়, দলিত জল খেতে গেলে তাকে পিটিয়ে মারা হয়, দলিত মানুষ জন্মদিনের কেক কাটলে তাকে তথাকথিত উঁচু জাতের লোক হত্যা করে আর লীলা মজুমদারের মতো লেখককে জিভ কাটা ছেলেমেয়েদের গল্প লিখতে হয়, সেই দেশে নজরুল জন্মেছিলেন, যে ভক্তিভাবে ইসলামিক সঙ্গীত লিখেছিলেন, সেই একই ভক্তিভাবে শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন…যে গান আজও মানুষকে জাতপাতের উর্ধে তুলে এক মহাজাগতিক বিশ্বাস আর শরণের সন্ধান দেয়। গান গাওয়া হয়, অনুধাবন হয় কী?
    গুরুচণ্ডা৯-র গল্পপাঠ - গুরুচণ্ডা৯ | ছবি: রমিত‘পিরোবতির নাকছাবি’ গল্পটি শক্তি দত্ত রায়ের ‘পিরোবতি ও মুড়ির টিন’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। ‘হাজবপুরের কেচ্ছা' লেখকের 'অতিনাটকীয়’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। আজকের গল্প এস এস অরুন্ধতীর লেখা 'পাপ হে '। গল্পটি লেখকের 'চাঁপা ফুলের গন্ধে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। সুনাগরিক রঞ্জন দত্তর মৃত্যুর দিন - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পটি লেখকের 'ছয়ে রিপু’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।আজকের গল্প জয়ন্তী অধিকারীর 'না হাঁচিলে যারে'। গল্পটি লেখিকার 'কুমুদির রোমহর্ষক গল্পসমূহ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।অমর মিত্রের লেখা 'কাশী মথুরা বৃন্দাবন '। গল্পটি 'আমার ভয় করছে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।প্রতিভা সরকারের লেখা 'তালাও গ্রামের রূপকথা'। গল্পটি 'হে চিরসারথী’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।দময়ন্তীর লেখা 'দুষ্কালের পদধ্বনি'। গল্পটি 'দুষ্কালের আখ্যানমালা’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।উপল মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'তিলবাড়ি'। গল্পটি 'ম্যাকলাস্কিগঞ্জ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।মহারাজ মিত্রবর্মণের রাজ্যবিজয়, ঘেঁটুফুল ও ব্রহ্মকমলের গল্প, লিখেছেন রমিত চট্টোপাধ্যায়, পাঠ করেছেন অমিতাভ চক্রবর্তী।শক্তি দত্তরায়ের লেখা '৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড' বই থেকে নেওয়া ক্ষীরের পুতুল। গল্পপাঠে কেকে।স্মৃতি ভদ্রর লেখা 'রসুই ঘরের রোয়াক (দ্বিতীয় খণ্ড)' বই থেকে গল্পপাঠে পায়েল চ্যাটার্জী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস 'সীমানা' বই থেকে নেওয়া একটি পর্ব, নাম - দেশের কাজ। ২৫শে বৈশাখ পার হয়ে ১১ই জ্যৈষ্ঠ্যর এই বিশেষ সময়কালে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য, এই পর্বে ধরা হয়েছে সেই সময়ের দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের দেখা হওয়ার গল্প।গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।অ্যাবনর্ম্যাল - লিখেছেন কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পপাঠ - সোহিনী সেনগুপ্ত।ফোটোগ্রাফ - ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক, গ্রাফিক শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।কেকে-র 'ছায়ার পাখি' বই থেকে নেওয়া গল্প - জিহ্ব; পাঠ - পায়েল। চিত্রশিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শারদা মণ্ডলের 'পাকশালার গুরুচণ্ডালি' বই থেকে, পাঠ - পায়েল। চিত্রশিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাসজ্যোতিষ্ক দত্তর লেখা ‘সে ছিল একদিন আমাদের' বই থেকে 'ইস্কুলের গল্প'। পাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।মৃণাল শতপথীর লেখা ‘দিতি ও মহারানি' বই থেকে নেওয়া গল্প - পাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।
  • হরিদাস পালেরা...
    বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬!  - মুহাম্মদ সাদেকুজ্জামান শরীফ | ঘটনাবহুল বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ শেষ হচ্ছে আজকে। ফুটবল বিশ্বকাপ সব সময়ই অন্য এক আমেজ। এই ভূগোলকে এর সাথে তুলনা হয় এমন আর কিছুই সম্ভবত নাই। পুরো বিশ্ব এক সময়ে, এক দিকে তাকিয়ে থেকে কাঙ্ক্ষিত দলের জয় কামনা করে। এ এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড না? আমাদের ছোট্ট শহর শেরপুর, এখানে এই মধ্য রাতে খেলা দেখার কত আয়োজন! বিশাল বড় স্ক্রিন লাগানো হয়েছে। যার যার দলের সমর্থকেরা এসে হাজির হচ্ছে। খেলা দেখতে গিয়ে তুমুল ঝগড়াও হচ্ছে। সব কিছু মিলিয়ে এক এক বিশাল আয়োজন। ঢাকার আয়োজন তো ইতিমধ্যেই সারা পৃথিবীর বুকে আলোড়ন তৈরি করেছে। আর্জেন্টিনা থেকে আর্জেন্টিনাবাসি আসছে ঢাকায় খেলা দেখার জন্য! অবিশ্বাস্য না? ব্রাজিলের চ্যানেল লাইভ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির মাঠ থেকে। সবাই অবাক হয়ে দেখছে এ কেমন উম্মাদনা! গতকাল দেখলাম এক আর্জেন্টাইন টুরিস্ট কাপল থাইল্যান্ড ঘুরতে আসছিল। সেখান থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসে গেছে ভিসার জন্য, ফাইনালটা তারা ঢাকায় দেখতে চায়!  এই সবই বিশ্বকাপ ফুটবলকে এমন এক মাত্রা দেয় যা অন্য কোনকিছু দ্বারা সম্ভবই না। ৩২ বছর আগে যে বিশ্বকাপ হয়েছিল তার সাথে এবারের বিশ্বকাপ আমেজের মিল হওয়ার কথা না? প্রায় একই ভেনু।  কিন্তু কী বিস্তর ফারাক!খুব বেশি কিছু মনে নাই সেই সময়ের খেলার। ঘুম ঘুম চোখের আবছা আবছা যা মনে আছে তা হচ্ছে রাত জেগে খেলা দেখাটাকে একটা উৎসব তৈরি করে ফেলেছিল সবাই। সম্ভবত মেজো মামাদের একটা টিভি ছিল, লাল রঙের সাদাকালো নিপ্পন টিভি, ১৪ ইঞ্চি। এইটাতেই দেখা হয়েছে সব খেলা। মুরুব্বিরা সব খেলা দেখার জন্য সব কাজ শেষ করে হাজির হওয়া শুরু করত। চা, মুড়ি চানাচুর চলত খেলা দেখা উপলক্ষে। হয়ত পুরো শেরপুরে কয়টা টিভি আছে তা তখন গুণে বলে দেওয়া যেত। একটা মহল্লায়, একটা গ্রামে দুই চারজনের বাড়িতেই টিভি ছিল। তাই স্বাভাবিক ভাবেই এক জায়গায় জামায়েত হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না কোনো।আমাদের বাড়িতে সম্ভবত টিভি কেনা হয় ৯৮ বিশ্বকাপে। তখন টিভি বিশ্বকাপ উপলক্ষেই কেনা হত। ততদিনে জ্যোতিরা মানে বকুল খালারা আমাদের এখানে চলে আসছে। খালার উদ্যোগেই কেনা হল ১৪ ইঞ্চি ন্যাশনাল টেলিভিশন! রঙ্গিন টিভি আসার আগ পর্যন্ত এইটাই ছিল আমাদের টিভি!এখন একটা জাম্প দিয়ে বর্তমানে আসি। প্রযুক্তির উৎকর্ষে বাস করছি আমরা। যে রাতে খেলা তখন ছিল আশীর্বাদের মত সেই রাতের খেলা এখন অনেকের জন্য দুঃস্বপ্ন! সকালে অফিস, ব্যবসা, স্কুল, কলেজ, ক্লাস খেলা দেখব কীভাবে? জীবনযাত্রার অভূতপূর্ব পরিবর্তন হয়ে গেছে আমাদের। সবাই মিলে একটা খেলা দেখব এইটা এখন একটু কষ্টসাধ্য ব্যাপারই। আয়োজন করে এক হতে হবে, নাহ হলে সম্ভব না। তখন আয়োজন একটাই, টিভি এখানে, মানে আর কিছুর দরকার নাই!এখন পুরাই ডিজিটাল দুনিয়ায় আমরা। মানুষ মোবাইলে, ল্যাপটপে খেলা দেখছে। আমার ভাইগ্না ডিসকর্ড নামে একটা প্লাটফর্মে খেলা দেখে, ওইখানে সব বন্ধুরা এক সাথে অনলাইনে খেলা দেখে, সবাই অনলাইনে যুক্ত, পাশাপাশি বসে খেলা দেখলে যেমন ভাইব অনেকটা এমনই। আমরা বন্ধুরা আমাদের মত করে একটা ডিসকর্ড বানায় নিছি। সবাই টিভিতে খেলা দেখছি, আবার মেসেঞ্জার গ্রুপে চ্যাট চলছে! একটু হলেও এক সাথে থাকার চেষ্টা! ২ আমি ব্যাক্তিগত ভাবে বেলজিয়াম সমর্থক। ২০১১-১২ সালের দিকে হুট করেই আমার নজরে আসে অদ্ভুত একটা দলের - বেলজিয়াম। নজরে আসে মানে খেয়াল করি মূলত যে ইউরোপের বড় বড় দলগুলোর কী প্লেয়ার গুলো বেলজিয়ামের। দেখলাম আমার মত অনেকেই তা জানে এবং এই দলকে রীতিমত বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্ম বলা শুরু করে দিয়েছে মানুষ। কেভিন ডি ব্রুইনা, ইডেন হ্যাজার্ড, রোমেলু লুকাকু, থিবো কোর্তোয়া, ভিন্সেন্ট কোম্পানি! এরপরের সারিতেই আক্সেল উইটসেল, মারুয়ান ফেলাইনি, জান ভের্টংহেন, টবি অল্ডারউইরেল্ড, টমাস ভার্মেলেন! এর মধ্যে কোম্পানি অধিনায়ক হিসেবে প্রশ্নাতীত ভাবেই অসাধারণ। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম, আমি ১৪ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামকে সমর্থন দেওয়া শুরু করলাম।১৪ সালে কোয়াটার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছ হার। কিন্তু বেলজিয়াম একটা নতুন শক্তি এইটা সবাই তখন বুঝতে পারে। আমার মনে আছে আমি বেলজিয়াম সমর্থন করি এইটা অনেকের মাথাতেই ঢুকত না তখন। ভাবত ইয়ার্কি মারছি না হলে ব্রাজিল আর্জেন্টিনা কিছু একটা করি, ওইটা বলতে চাচ্ছি না বলে এগুলা বলতেছি। বেলজিয়াম তার আসল খেলা খেলে ১৮ সালের বিশ্বকাপে। এইটাই ছিল বেলজিয়ামের কাপ নেওয়ার বছর! এই বিশ্বকাপেই জাপানের সাথে ৩-২ গোলের একটা ম্যাচ হয় যা বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ। ব্রাজিলকে হারিয়ে বেলজিয়াম সেমি খেলে, ১৮ বিশ্বকাপ জয়ী ফ্রান্সের কাছে হেরে, পরে ইংল্যান্ডকে তৃতীয় স্থান নির্ধারণই ম্যাচে হারিয়ে তৃতীয় হয়ে শেষ করে বিশ্বকাপ। ফ্রান্স যদিও সেই ম্যাচে চ্যাম্পিয়ন দলের মত খেলে নাই। ম্যাচ শেষে কর্তোয়া বলছিল এই জঘন্য খেলার চেয়ে ব্রাজিলের কাছে হারলেও তৃপ্তি পাওয়া যেত! যাই হোক, দীর্ঘদিন এক নাম্বার র‍্যাংকিং, তৃতীয় স্থান অর্জন করা এই ছিল এই দলের কাগজে কলমে অর্জন। কিন্তু এইটাই যে শেষ না তা ফুটবল খেলা বুঝে যারা তারা অন্তত জানে। অবিশ্বাস্য প্রতিভা নিয়ে এই দলটা এর চেয়ে বেশি কিছু দিতে পারল না।বেলজিয়াম বড় দল না। এই বড় দল আর ছোট দল কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপে অনেক বড় বিষয়। পুরো দুনিয়া সব সময় ছোট দলের সাথে থাকে। যদি একটা আপনার পছন্দের দল হয় তা হলে ভিন্ন কথা আর তা না হলে  মানুষ মনে প্রাণে চায় ছোট দলটা জিতে যাক। নাম না জানা দেশ, তবুও অকুণ্ঠ সমর্থন। ওরা জিতুক, ওরা দেখিয়ে দিক সবাইকে। সবাই এসে পাশে দাঁড়ায় ছোট দলের। বড় দল জিতেও স্বস্তি পায় না এখানে। নানা তর্ক এসে জমা হয়। ছোট দল দেখে রেফারি বাঁশি বাজাল না বা বাজাল! রূপকথার মত ফলাফল চাই আমরা। কাঠুরের ছেলে রাজা হয়ে যাক। জিতে নিক সোনার মুকুক, ছিনিয়ে নিক রাজকন্যাকে। বড় দলের দুর্দান্ত মানসিক জোর কিংবা ফুটবলের অসাধারণ দক্ষতায় রূপকথা কদাচিৎ লেখা হয়। বাকি সব সময়ই বাস্তবতাই জিতে। যে দুই একবার রূপকথা তৈরি হয় সেই কয়বারের গল্প মানুষ বলে বেড়ায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। ১৯৯০ সালের ক্যামেরুন, ৯৮ বিশ্বকাপের ক্রোয়েশিয়া, ২০০২ সালে কোরিয়া মানুষকে এই উত্তেজনা দিয়েছিল। মনে করিয়ে ছিল সম্ভব, ছোটদের পক্ষেও সম্ভব।  কিন্তু ফুটবল এক আশ্চর্য খেলা। এখানে শেষ পর্যন্ত কাপ জিতে সেই দলটাই যে সবচেয়ে বেশি যোগ্য। দুই একটা ব্যাতিক্রম না থাকলে বরাবরই এই হয়ে আসছে। অঘটন দুই একটা ম্যাচে ঘটে কিন্তু কাপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ঘটে না। তারপরেও মানুষ সব সময় তার স্বভাবের জন্যই ছোট দলের পক্ষে থাকে। এবার বিশ্বকাপেও তাই হয়েছে। মানুষ অবাক হয়ে কেপ ভার্দের খেলা দেখেছে। আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা ছাড়া পুরো বিশ্ব লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল তাদের পক্ষে। এখানে আর্জেন্টিনার বিরোধী মূল বিষয় না, এখানে ছিল সেই আগের সূত্র, আমরা ছোট দলের পক্ষে থাকব। তাই মনে প্রাণে চাইছে সবাই জিতুক কেপ ভার্দে। ব্রোজিনহা নামক অবিশ্বাস্য গোলকিপারটা মানুষকে বিশ্বাস করিয়েই ফেলেছিল যে সে কোন কিছুতেই পরাজিত হবে না! শুধু এই ম্যাচ না। ব্রাজিল মরক্কোর সাথেও একই রকম হয়েছে। যদিও এখন আর মরক্কোকে ছোট দল বলার সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয় না। সামনের বিশ্বকাপের আয়োজক হতে যাচ্ছে তারা। গত বিশ্বকাপ থেকেই নিজেদের জাত চেনানো শুরু করেছে মরক্কো। এসবের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে ইরান! ইরান যেন কোন কিছুতেই হারবে না বলে জিদ করে এসেছিল। যেখানে বর্তমান সময়ের ফুটবলাররা ঠিকঠাক বিশ্রামের জন্য সব কিছু করতে রাজি। ইংলিশ ক্লাব গুলো চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে স্প্যানিশ দলগুলোর চেয়ে কম ভালো করে, এর পিছনে সবচেয়ে জোরাল যুক্তি হচ্ছে ইংলিশ ক্লাবগুলো বিশ্রাম কম পায়! বিশ্রাম যে কত গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল খেলায় এইটা বুঝানোর জন্য এই উদাহরণটা দিলাম। বিশ্রাম ছাড়া খেলা প্রায় অসম্ভব বলে ধরে নেওয়া হয় সেখানে ইরান প্রতি ম্যাচ বিমান দিয়ে উড়ে এসে খেল আবার ফিরে গেছে মেক্সিকো! এবং কী দারুণই না খেলল তারা। সবার সমর্থন পেয়ে গেছিল ইরান। ইরান টুর্নামেন্টে টিকে থাক, এইটাই চাওয়া ছিল। আমরা তো হাজার মেইল দূরে টেলিভিশনের সামনে ধুর, এই ছোট দল গুলো পারেই না বলে উঠে চলে যাই। কিন্তু খেলোয়াড় গুলো? তারা আমৃত্যু এই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকে। পাসটা যদি দিতে পারতাম। একটু আগে যদি দৌড় দিতাম, একটু জোরে যদি কিক নিতাম এমন শতশত যদি কিন্তু তাদেরকে তাড়া করে ফিরবে না? এইটা অবশ্য ছোট বড় দল না, চ্যাম্পিয়ন দল বাদে সবারই একই রকম হবে। আমৃত্যু অবাক হয়ে ভাববে রবার্তো বেজ্জিও, বলটা জালে রাখা খুব কঠিন ছিল? ইস, উফ করে করেই যায় সবাই। সবাই বললাম কারণ শেষ পর্যন্ত পরাজিতের সংখ্যাই তো বেশি। একশ বছর হতে চলল বিশ্বকাপের, কাপ জিতেছে মাত্র ৮টা দেশ। বাকি সবাইই তো এই ইস আর উফ করে করেই গেছে। পরাজিতের সংখ্যা বেশি বলেই হয়ত আমরা পরাজিতের দলে। নিজেরা নিজেদের জীবনে উঠতে বসতে হারি বলেই মনে হয় এই যে আমাদের পক্ষ থেকে কেউ জিতছে...  তুই জিতে যা ভাই, জিতে দেখায় দে! যা রোজার মিলা, যা হাকান শুকুর, গ্রানিত শাকা, জের্দান শাকিরি আরও জোরে ছুট, পাপ বুবা দিওপ কই? গোল দে ভাই! লাফ দে ব্রোজিনহা, বলটা আটকা...! ৩ বিশ্বকাপ আসলে আরেকটা তর্ক জমে উঠে। এইটা বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে। কে সেরা, কে সর্বকালের সেরা!  সেরার তর্ক গুলো আমার কাছে খুব ফালতু লাগে। সর্বকালের সেরা, এইটা আরেক মহা বিতর্ক। সর্ব কাল তো সব সময় এক না, কাল তো প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। তাহলে একজনকে সর্বকালের সেরা আমারা কী দিয়ে হিসাব করব? একটা পর্যায় পর্যন্ত ঠিক আছে, এরপরে আসলে কোন খেলোয়াড়কে নিয়ে বিতর্ক করাটা উল্টা সেই খেলোয়াড়কেই অসম্মান করা হয়। মেসির কথাই ধরেন, ও যদি গোল না করত এবার, হ্যাট্রিক না করত তাহলে মেসির গ্রেটনেস একটুও কমে যেত? আমার কাছে মেসি গতবার বিশ্বকাপ না জিতলেও মেসির গ্রেটনেস একটুও কমত না। ও যা তার প্রমাণ আগেই দিছে, যারা জানার তারা জানে। একই কথা রোনাল্ডোর জন্যও প্রযোজ্য। ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ গোল কয়টা? ৮টা তো? ম্যারাডোনা কোন লেবেলের খেলোয়াড় ছিল কল্পনা করতে পারবেন? ক্লোসা ম্যারাডোনার আশেপাশেও পৌঁছাতে পারবে কোনদিন? মেসি রোনাল্ডোর এই তর্ক সমর্থকদের মধ্যে যত কুৎসিত আমার ধরনা তাদের মধ্যে এত ক্ষুদ্রতা নাই। আমরা টেনে আমাদের মাপে আনতে চাই তাদেরকে। একবার চিন্তা করেন মেসি রোনাল্ডোর এই দ্বৈরথটা যারা আগে দেখেছে তারা বর্তমান সময়ে, এই শেষ মুহূর্তে এসে এই সব তর্কে মজা নিতে পারবে? আমি যদি ভুইল না করে থাকি, ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই দুইজন ফুটবল বিশ্বকে যা দিয়েছে তা আগের আর কারো দ্বারাই সম্ভব হয় নাই। এই দুইজনের অসম্ভব মাত্রার খেলার জন্য, তাদের চেয়ে একটু কম যোগ্যতার, যারা অন্য যুগে জন্ম নিলে হয়ত গ্রেট হিসেবে ইতিহাসে জায়গা নিয়ে নিত তারা এখন আলোচনাতেই নাই। শুধুমাত্র এরা বারটা এত উঁচুতে সেট করেছে যে বাকিদের মামুলি মনে হয়। বিশ্বকাপ জিতে নাই বলে রোনাল্ডোকে ট্রল করে মানুষ, অথচ ২২ সালের  আগে মেসিরও কাপ ছিল না। ঘটনা হচ্ছে সব দলের লক্ষ এক না। রোনাল্ডো তার ক্যারিয়ারের শেষ দিকে এসে একটা ভালো মানের দল পেয়েছে। এর আগ পর্যন্ত পর্তুগালকে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়াই ছিল বিশ্বকাপ জয়ের মত। ওইটা রোনাল্ডো করে গেছে। এই দুইজনের যে প্রতিযোগিতা তা দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা বলে আমি মনে করি। লা লিগায় মেসি এক সিজনে গোল করল ৫০টা! অতিমানবীয় কারবার, সেবার রোনাল্ডো করছিল কয়টা? ৪৬ গোল! ( ২০১১-১২ মৌসুমে?) এইটা ফুটবল বিশ্ব আগে পরে কোনদিন দেখেছে? মেসি এ সিজনে গোল করল ৯১টা! রোনাল্ডো চ্যাম্পিয়নস লীগের এক সিজনে গোল করল ১৭টা! দুইটাই এখন পর্যন্ত, এত এত গোল মেশিন আসার পরেও টিকেই আছে। রোনাল্ডোর ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি — তিনটি ভিন্ন লিগে টপ স্কোরার হওয়া, এবং প্রতিটি জায়গায় শিরোপা জেতা, এটা তার অবিশ্বাস্য অভিযোজন ক্ষমতার প্রমাণ না? আর কারো আছে? এ ছাড়া এক ম্যাচে মেসির হ্যাট্রিক অন্য ম্যাচে রোনাল্ডোর হ্যাট্রিক এগুলা ওই সময় যারা দেখছে তারা এক বাক্যে মেনে নিবে যে কেউ কারো চেয়ে কম না। বরং একজন ছিল বলেই আরেকজন এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছে। এখানে একজনকে বড় করতে গিয়ে আরেকজনকে ছোট করতে হবে কেন?   তবে আমি সত্যিই মনে করি আগের খেলা আর এখনকার খেলার রেকর্ড আলাদা করে হিসাব করা উচিত। এখন প্রযুক্তির যে সাহায্য তার ছিটেফোঁটাও আগের খেলায় কল্পনা করতে পারবে না কেউ। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি খেলার মজা নষ্ট করছে হয়ত কিন্তু কেউ আউল ফাউল কিছু করে চলে যাবে এইটা হবে না। অনেকেই পেলের সময়ের খেলা নিয়ে দেখি নানান আজাইরা আলাপ করে। আপনে যত পিছনের দিকে যাবেন তত খেলা কঠিন ছিল, এইটা হচ্ছে শেষ কথা। পেলের আমলে কার্ড ছিল না, খেলোয়াড় পরিবর্তন করা যাইত না। এক পেলের মেরে তক্তা বানায় দেওয়ার ইতিহাস আছে। ৬৬ সালের বিশ্বকাপে পেলের হাঁটু লক্ষ করে মেরে তাঁকে ম্যাচের বাহিরে পাঠিয়ে দেয়। ব্যান্ডেজ বেঁধে মাঠে নামেন তিনি। আহত হাঁটু লক্ষ করেই আবার মারা হয়! শুধু পেলে না, ম্যারাডোনা তার সময়ে কম মার খেয়েছে? শেষ ঝলক যে বিশ্বকাপ, ৯০ সালের, সেখানে গোড়ালি দুমড়ে মুচড়ে গেছিল ম্যারাডোনার। অমনেই খেলে গেছে। তাই আগের খেলা সহজ, অমুক নিয়ম নাই, তমুক এগুলা বলার যুক্তি নাই। বিশ্বকাপ দিয়ে সেরা বিচার করতে যাওয়াটা বোকামি না? বিশ্বকাপ তো জিতে নাই অনেকেই আবার জিতেছেও অনেকেই, এতে কী প্রমাণ হয়? পুশকাশ, দি স্তেফানো, ইয়োহান ক্রুইফ, জর্জ বেস্ট, ইউসেবিও, জিকো, ফন বাস্তেন কেউ জিতে নাই কাপ। তো? আবার ফ্রান্সের অলিভিয়ে জিরু কাপ জিতে বসে আছে? তো? এগুলা কেমন খেলো যুক্তি না? যে কোন কিছুতেই আমরা তুলনা করে মজা পাই। তুলনা চলে কি না এইটাও ভাবি না। কত দেখি কে বড় কবি? রবীন্দ্রনাথ না নজরুল? জীবনানন্দ? মানে মনে হয় একটা প্রতিযোগিতা হচ্ছে, কে সেরা, কবিতা লিখে দেখাও! বুঝি না কেন প্রতিটা মানুষের জার্নি আলাদা। তার জার্নিতে, তার হিসেবে তিনিই শ্রেষ্ঠ, এখানে তুলনার কিছু নাই। শেষ পর্যন্ত এইটা একটা বিনোদন ছাড়া কিছু না। তাই শুধুই মজাটা উপভোগ করতে সমস্যা কই? ৪ রাতে ফাইনাল। খোলা মাঠে খেলার দেখার পরিকল্পনা আমার। তাই মনে হল বিশ্বকাপ নিয়ে লেখাটা এখনই লিখে ফেলি। কাপ তো একজন জিতবেই। আর্জেন্টিনা জিতে চারটা করবে না হয় স্পেনের দ্বিতীয় স্টার প্রাপ্তি হবে। দুর্দান্ত একটা খেলা হবে এমনই আশা আমার। গত বিশ্বকাপের ফাইনাল যেমন আমরা, আমাদের প্রজন্ম আমৃত্যু বলে যাব, তেমন একটা ফাইনালই তো দেখতে চাই। ফুটবল দর্শক হিসেবে এইটা তো বেশি কিছু চাওয়া না, তাই না?
    সেক্সি, অতএব অযোগ্য? - সুকান্ত ঘোষ | আচ্ছা আপনারা কেউ কি এমন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন যেখানে, মানে সে ইন্টারভিউ হোক বা ওই জাতীয় কিছু যেখানে আপনাকে একটি মেয়ের যোগ্যতা বিচার করতে হবে, সেখানে মেয়েটির খুব ভালো ইন্টারভিউ দেবার সত্ত্বেও সবশেষে ইন্টারভিউ প্যানেলের কেউ একজন ফট করে বললেন, "মেয়েটি ভালো, কিন্তু ঠিক... ঠিক সিরিয়াস লাগল না, তাই নয় কি?"যদি বলেন হন নি, তাহলে খুব ভালো কথা – পজিটিভ দিকে এগুচ্ছি আমরা। কিন্তু অনেক মানুষ আছেন যাঁরা এমন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন, অন্তত এক দশক আগে পর্যন্ত। হ্যাঁ, কোথায়, কি পরিস্থিতিতে, সেই সবের পার্থক্য ছিল – অর্থাৎ ‘ওয়ান সাইজ ফিটস অল’ এমন ব্যাপার নয়, কিন্তু একজনও যদি এটার সম্মুখীন হয়ে থাকেন তাহলে সেটা সমাজ হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা। বিশেষ করে “কিভাবে আপনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে মেয়েটি সিরিয়াস নয়?” এই প্রশ্নের ব্যাখ্যার সাথে যখন জড়িয়ে থাকে মেয়েটি কি পরে ইন্টারভিউ দিচ্ছিল তার যোগসূত্র। এবার আপনি ভাবতে পারেন এতে খুব বেশী অস্বাভাবিক কি আছে, এটা অনেকটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। এমনটা আমিও ভাবতাম অনেকদিন আগে – কিন্তু পরে এই নিয়ে পড়াশুনা করে জানতে পারি যে পোষাকের সাথে যোগ্যতা মিশিয়ে দেখার ব্যাপারটা ব্যক্তিগত নয়। ওটা প্রায় একটা ল্যাবরেটরি-প্রমাণিত ফেনোমেনন। গত পঞ্চাশ বছর ধরে দুনিয়ার নানা প্রান্তের সমাজ-মনস্তত্ত্ববিদরা এই জিনিসটা বারবার মেপে দেখেছেন, আর প্রতিবারই কাঁটা প্রায় একই জায়গায় গিয়ে থেমেছে। যা সুন্দর, তা-ই ভালো - এবং তার বাজারদরএকটু পিছনের দিকে গল্পটা শুরু করা যাক তাহলে। ১৯৭২ সালে ক্যারেন ডিওন, এলেন বার্শাইড আর ইলেন ওয়ালস্টার একটা গবেষণাপত্র লিখলেন, যার শিরোনামটাই পরের অর্ধশতাব্দীর জন্য একটা প্রবাদ হয়ে গেল, "হোয়াট ইজ বিউটিফুল ইজ গুড"। মানে যা সুন্দর, তা-ই ভালো। ছবি দেখিয়ে অচেনা মানুষ সম্পর্কে মতামত চাইলে আমরা সুন্দর মুখের মানুষটিকে বেশি বুদ্ধিমান, বেশি সৎ, বেশি সফল, এমনকি বেশি সুখী বলে ধরে নিই। মনস্তত্ত্বের পরিভাষায় একে বলে 'হ্যালো এফেক্ট' - একটা ভালো গুণ দেখলে বাকি সব গুণ আমরা বিনা প্রমাণে ধার দিয়ে দিই বলতে গেলে তেমন ভাবে দেখতে গেলে। জুডিথ ল্যাংলোয়া আর তাঁর সহকর্মীরা ২০০০ সালে শ'খানেক গবেষণার মেটা-অ্যানালিসিস করে দেখালেন, ব্যাপারটা কোনো ছোটখাটো ল্যাবের কারিকুরি নয় - শিশু থেকে বৃদ্ধ, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুন্দর মানুষ বাড়তি সুবিধে পান। আর অর্থনীতিবিদরা তো একেবারে টাকার অঙ্কে হিসেব কষে ফেললেন। ড্যানিয়েল হ্যামারমেশ আর জেফ বিডল ১৯৯৪ সালে আমেরিকান ইকনমিক রিভিউ-তে "বিউটি অ্যান্ড দ্য লেবার মার্কেট" নামে যে কাজটি ছাপালেন, সেখানে তাঁরা দেখালেন যে শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, সব ধরে-বেঁধে সমান করার পরেও যাঁদের চেহারা 'সাদামাটা' বলে চিহ্নিত, তাঁদের রোজগার গড়পড়তা চেহারার লোকের চেয়ে পাঁচ থেকে দশ শতাংশ কম। উল্টো দিকে সুন্দরদের জন্য একটা 'বিউটি প্রিমিয়াম'। এবার বলতে পারেন অতি সরলীকরণ করে, তাহলে তো ভাই ল্যাঠা চুকেই গেল! সুন্দর হও (যদিও বললেই কি আর সুন্দর হওয়া যায়!), সাজো, চাকরি পাবে, মাইনে বাড়বে। ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপনওয়ালারা তো ঠিক এই কথাটাই তিরিশ বছর ধরে আমাদের কানে ঢেলে যাচ্ছেন।কিন্তু গল্পের এখানেই একটা হলকা মোচড় এসে যাবে আশির দশকের হিন্দী সিনেমার মত। যখন সৌন্দর্যই হিংস্র হয়ে ওঠে১৯৭৯ সালে ম্যাডেলিন হেইলম্যান আর লোইস সারুওয়াতারি একটা কাজ করলেন যার ফলাফল দেখে অনেকেরই চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল! তাঁরা দেখলেন, ম্যানেজারিয়াল পদের জন্য দরখাস্ত করলে সুন্দরী মহিলা প্রার্থীরা কম সুন্দরী প্রার্থীদের চেয়ে খারাপ মূল্যায়ন পাচ্ছেন। পুরুষদের বেলায় ঠিক উল্টো - সুন্দর পুরুষ সব পদেই সুবিধে পাচ্ছেন। এই ব্যাপারটার নাম হয়ে গেল 'বিউটি ইজ বিস্টলি', সৌন্দর্যই হিংস্র! পরে স্টেফানি জনসন আর তাঁর সহকর্মীরা আরও পরিষ্কার করে দেখালেন, সুন্দরী মহিলারা বিপদে পড়েন বিশেষত সেইসব চাকরির ক্ষেত্রে যেগুলো সমাজের চোখে 'পুরুষালি' এবং তখন তাঁদের ঘাড়ে চাপানো হয় একগুচ্ছ বিদঘুটে বিশেষণ: ধূর্ত, স্বার্থপর, ঝগড়াটে, ছলনাময়ী। তাহলে দাঁড়ালো গিয়ে সৌন্দর্য একই সঙ্গে কোথাও ঢোকার টিকিট আবার ফাঁদ! কোন দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন, তার ওপর নির্ভর করে ঠিক হবে ওটা আপনাকে ঢুকতে দেবে নাকি ঠেলে বার করে দেবে। কিন্তু এখানে একটা ‘ফাইনার ডিটেলস’ এর ব্যাপার আছে যেটা বুঝতে গবেষকদের আরও পঁচিশ বছর লেগেছিল। 'সুন্দর' আর 'সেক্সি' - এই দুটো এক জিনিস নয়। বেশির ভাগ পুরনো পরীক্ষায় ব্যবহার করা হত মুখ আর কাঁধের ছবি, পাসপোর্ট সাইজ। ওতে সৌন্দর্য মাপা যায়, কিন্তু যৌনতা প্রকাশের ভঙ্গিটা মাপা যায় না। জামার গলা কতটা নামানো, স্কার্টের ঝুল কতটা উঠেছে, ঠোঁটের লিপস্টিক কতটা গাঢ়, ওসব ছবির বাইরে থেকে যায়।  একই মেয়ে, দুই পোশাক, দুই রায়২০০৫ সালে পিটার গ্লিক এবং তাঁর তিন সহকর্মী সাডি লার্সেন, ক্যাথরিন জনসন আর হেদার ব্র্যানস্টিটার, লরেন্স ইউনিভার্সিটিতে এমন একটা পরীক্ষা করলেন যা এই বিষয়ের গবেষণার মেরুদন্ডের মত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁরা একজন মহিলাকে ভিডিওতে রেকর্ড করলেন, একই মহিলা, একই কথা বলছেন, একই ভঙ্গিতে। শুধু দু'রকম সাজে। একবার ব্যবসায়িক পোশাকে, মানে কালো ট্রাউজার, ব্লেজার, মানে মাপা সাজ যাকে বলে। আরেকবার 'সেক্সি' সাজে - ছোট স্কার্ট, গলা-কাটা টপ, উঁচু হিল, গাঢ় মেকআপ। খেয়াল রাখা হয়েছিল যাতে তাঁকে দু'ক্ষেত্রেই সমান সুন্দরী দেখায় এবং ম্যানিপুলেশন চেক করে দেখা গেল সেটা হয়েছেও। দর্শকরা দ্বিতীয় ভিডিওর মহিলাকে বেশি 'সেক্সি' বলেছেন, কিন্তু বেশি 'সুন্দরী' বলেননি! এবার দেওয়া হল আসল চাল। ভিডিও দেখানোর আগে অংশগ্রহণকারীদের হাতে এক টুকরো কাগজ ধরানো হল, যাতে লেখা মহিলাটির পেশা। অর্ধেককে বলা হল তিনি একজন ম্যানেজার। বাকি অর্ধেককে বলা হল তিনি একজন রিসেপশনিস্ট। ফল যা দাঁড়াল, তা রীতিমতো বিস্ময়কর।রিসেপশনিস্ট বলে পরিচয় দেওয়া হলে দেখা গেল পোশাক বদলে কিস্যু আসে-যায় না। সেক্সি সাজেও তিনি যতটা যোগ্য, ব্যবসায়িক সাজেও ততটাই। সাত-পয়েন্টের স্কেলে যোগ্যতার নম্বর ঘোরাফেরা করছে চার দশমিক আট আর পাঁচ দশমিক দুইয়ের আশেপাশে — পার্থক্য নগণ্য। কিন্তু ঠিক একই মহিলাকে যখন ম্যানেজার বলা হল? ব্যবসায়িক পোশাকে তাঁর যোগ্যতার নম্বর পাঁচ দশমিক চার দুই। আর সেক্সি পোশাকে? চার দশমিক এক তিন। মানে দেড় পয়েন্টের কাছাকাছি কম নম্বর। শুধু তা-ই নয়, তাঁর অনুমিত বুদ্ধিমত্তাও কমে গেল। অংশগ্রহণকারীদের আন্দাজ করতে বলা হয়েছিল, ইনি কলেজে কেমন গ্রেড পেতেন, কতটা ভালো কলেজে পড়তেন। সেক্সি ম্যানেজারের গ্রেড আন্দাজ করা হল স্পষ্টতই কম। একই মুখ, একই কথা, একই বুদ্ধি - শুধু পোশাক বদলে গেছে বলে তাঁর কলেজের রেজাল্টও নাকি খারাপ ছিল!গ্লিক ও সহকর্মীরা আরও এক ধাপ এগিয়ে দেখলেন, এই যোগ্যতা-হারানোর ব্যাপারটা কীসের মধ্যে দিয়ে ঘটছে। দেখা গেল এর মূলে আছে আবেগ। সেক্সি ম্যানেজারকে দেখে মানুষের মনে বিরক্তি, বিতৃষ্ণা, এমনকি এক ধরনের লজ্জা জাগছে আর সেই নেতিবাচক আবেগটাই যোগ্যতার নম্বরকে টেনে নামাচ্ছে। পরিসংখ্যানের ভাষায়, আবেগের প্রভাবটা হিসেবে ধরে নিলে পোশাকের প্রভাব শূন্য হয়ে যায়। অর্থাৎ মানুষ ভেবেচিন্তে বিচার করছে না, প্রথমে চটে যাচ্ছে আর তারপর সেই চটে যাওয়াটাকে "ও তো অযোগ্য" বলে ব্যাখ্যা দিচ্ছে।এবার দিলেন গবেষকরা একটা খোঁচা টাইপের। তাঁরা আলাদা করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ওই সেক্সি পোশাকটা চাকরির পক্ষে কতটা মানানসই? সবাই বলেছেন একদমই মানানসই নয়। ম্যানেজারের জন্যও নয়, রিসেপশনিস্টের জন্যও নয়। দুটো ক্ষেত্রেই সমান বেমানান। তবু শাস্তি পেলেন কেবল ম্যানেজার। কারণটা "পোশাক অফিসের উপযুক্ত নয়" এই ভদ্রলোকি যুক্তি নয়। কারণটা হল, আমাদের মাথার ভেতর 'সেক্সি মেয়ে' আর 'কেরিয়ার মেয়ে' দুটো আলাদা খোপ, এবং সেই খোপ দুটো একসঙ্গে বসতে চায় না!  মাথার ভেতরের খোপগুলোএই 'খোপ' ব্যাপারটা নিয়ে এবার দু'কথা বলা দরকার, কারণ সেক্সি-যোগ্যতা এগুলো মিশিয়ে ফেলে কেস ভজকট করে তোলার পিছনে ‘খোপ’ এর অবদান বিশাল। এমনকি অনেকে বলে থাকেন পিকচার নাকি ওখানে থেকেই শুরু! কেট ডো এবং তাঁর সহকর্মীরা আশির দশকে দেখিয়েছিলেন, আমরা 'নারী' বলে কোনো একটামাত্র ছাঁচ মাথায় রাখি না। রাখি কয়েকটা উপ-ছাঁচ। মোটামুটি তিনটে ভাব যার, সাবেকি (গৃহিণী), অ-সাবেকি (কেরিয়ার-মহিলা), আর সেক্সি। মজার ব্যাপার এটাই যে মাথার ভেতরে 'সেক্সি মহিলা' আর 'কেরিয়ার-মহিলা' খোপ দুটোর মধ্যে যতটা দূরত্ব, 'গৃহিণী' আর 'কেরিয়ার-মহিলা'-র মধ্যেও প্রায় ততটাই। মানে অফিসের বসের চেয়ারে বসার যোগ্য বলে যাঁকে ভাবা হয়, তাঁর থেকে সেক্সি মহিলা মানসিক মানচিত্রে যোজন যোজন দূরে।আর পুরুষদের বেলায়? পুরুষদের বেলায় এই খোপগুলোই নেই। একজন পুরুষ একই সঙ্গে বাবা, ক্রিকেট-পাগল, ভালো বন্ধু এবং কোম্পানির সিইও হতে পারেন - কোনো বিরোধ নেই। কেউ তাঁর টাইট জিনস দেখে বলে না, "ছেলেটা ঠিক ম্যানেজার মেটিরিয়াল নয়"। সৌন্দর্য পুরুষের ক্ষেত্রে একটা অলঙ্কার; আর মেয়ের ক্ষেত্রে সেটা একটা শ্রেণীবিন্যাস। এটা আমি আবেগ থেকে বলছি না, বলছে রিসার্চ!  একটা বোতাম, পাঁচটি সেকেন্ডএমন একটা চমকপ্রদ ফল বেরোলে বিজ্ঞানের নিয়ম হচ্ছে অন্য কেউ সেটা আবার করে দেখবে। ২০০৯ সালে মেলিসা উকি, নেল গ্রেভস আর জে. কোরি বাটলার ঠিক তা-ই করলেন। বড় নমুনা, ভিডিওর বদলে ছবি, অন্য চাকরির নাম, অন্য প্রশ্নপত্র। ফল সেই একই, উঁচু পদের সেক্সি পোশাক পরা মহিলাদের যোগ্যতার নম্বর কম। তবে তাঁরা একটা ইঙ্গিতও পেলেন যে নিচু পদের সেক্সি পোশাক পরা মহিলাকে বরং বেশি 'সামাজিক দক্ষতা'সম্পন্ন মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ ক্ষমতাহীন জায়গায় যৌনতা একটা 'গুণ', ক্ষমতার জায়গায় সেটাই 'দোষ'। এবার আপনি বলতেই পারেন, ঠিক আছে, মিনি স্কার্ট আর গলাকাটা টপ পরে বোর্ডরুমে গেলে লোকে তো একটু ভুরু কোঁচকাবেই। ওরকম চরম উদাহরণ দিয়ে কী প্রমাণ হয়?উত্তরটা দিয়েছেন নীল হাউলেট, ক্যারেন পাইন আর তাঁদের সহযোগীরা, ২০১৫ সালে, সেক্স রোলস পত্রিকায়। তাঁদের পরীক্ষায় কোনো মিনি স্কার্ট ছিল না, ছিল সাধারণ, রক্ষণশীল অফিস-পোশাক। শুধু দু'টো জিনিস অল্প অল্প করে বদলানো হয়েছিল, স্কার্টের ঝুল হাঁটুর একটু ওপরে না একটু নিচে, আর ব্লাউজের ওপরের বোতাম একটা খোলা না দুটো খোলা। ছবিগুলোতে মুখই ছিল না, ছিল মুণ্ডুহীন ধড়। দর্শকদের ছবি দেখতে দেওয়া হয়েছিল সর্বোচ্চ পাঁচ সেকেন্ড।তাহলে দাঁড়ালো কি? পাঁচ সেকেন্ড - একটা মুখহীন ছবি - আর একটা বোতাম।তাতেই সিনিয়র ম্যানেজার বলে পরিচয় দেওয়া মহিলার বুদ্ধি, আত্মবিশ্বাস, বিশ্বাসযোগ্যতা, দায়িত্ববোধ সব কিছুর নম্বর নেমে গেল। রিসেপশনিস্টের বেলায় নামল না। আর হ্যাঁ, একটা কথা ভুললে চলবে না যে এই বিচারকরা সবাই ছিলেন মহিলা। শুধু তাই নয় যাঁরা চাকরি করেন, তাঁরা ছাত্রীদের চেয়েও কড়া নম্বর দিয়েছিলেন। পরে অন্যেরাও আমেরিকায় এই কাজটা আবার করে একই জিনিস পেয়েছেন। অর্থাৎ এটা কোনো "পুরুষরা মেয়েদের দেখলে ভুলে যায়" জাতীয় সরল গল্প নয়। মেয়েরা মেয়েদের বিচার করছেন এবং একই মাপকাঠিতে।  চোখ কোথায় গেল, রায় কি হলতাহলে ঠিক কী ঘটছে মাথার ভেতরে? এই প্রশ্নের সবচেয়ে অস্বস্তিকর উত্তরটা এসেছে ২০১৮ সালে, জুলিয়া স্মিথ, মিরিয়াম লিস, মিন্ডি এরচাল আর তাঁদের সহকর্মীদের কাজ থেকে। তাঁরা একটা কলেজের ছাত্র-সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বানালেন। একজন মহিলা প্রার্থী, তাঁর নির্বাচনী ইস্তাহার, তাঁর যোগ্যতার বিবরণ - সব এক। শুধু ছবিতে তাঁর পোশাক দু'রকম, রক্ষণশীল, আর খানিকটা খোলামেলা। ১৯১ জন ছাত্রছাত্রীকে বসানো হল আই-ট্র্যাকার মেশিনের সামনে, যা মিলিসেকেন্ডের হিসেবে বলে দেয় চোখ ঠিক কোথায় কতক্ষণ আটকে থাকল।ফল কি হল? নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন? খোলামেলা পোশাকের ছবিতে দর্শকদের চোখ প্রার্থীর বুকে আর স্কার্টের ঝুলে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশিক্ষণ আটকে থাকল। লেখার তুলনায় শরীরের দিকে তাকানোর অনুপাত বেড়ে গেল কয়েক গুণ। এবং সেই একই প্রার্থীকে তখন মনে করা হল কম সৎ, কম বিশ্বাসযোগ্য, কম যোগ্য, এবং কম নির্বাচনযোগ্য।কিন্তু এখানে গবেষকরা একটা চতুর পরীক্ষা করেছিলেন। তাঁরা পরে জিজ্ঞেস করলেন, প্রার্থীর ইস্তাহারে কী কী লেখা ছিল, মনে আছে? দুই দলই সমানভাবে মনে রাখতে পেরেছিল। মানে দর্শকরা 'অন্যমনস্ক' হয়ে পড়েননি, তথ্য মিস করেননি। তথ্য তাঁরা ঠিকই পড়েছেন। তারপর সেই তথ্য জেনেশুনেই তাঁকে কম যোগ্য বলে রায় দিয়েছেন। তহলে মধ্যিখানের সেতুটা কী? গবেষকদের মিডিয়েশন বিশ্লেষণ বলছে, সততা। খোলামেলা পোশাক → শরীরের দিকে তাকানো → "এই মহিলা তেমন সৎ বা বিশ্বাসযোগ্য নন" → "অতএব ইনি অযোগ্য"। ভেবে দেখুন ব্যাপারটা। ব্লাউজের গলার মাপ থেকে কেউ চরিত্রের সার্টিফিকেট বার করে ফেলছে। আর করছে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে, সমানভাবে। পোশাকেরও দরকার নেই, নজরটাই যথেষ্টতাহলে কি পোশাকই একমাত্র অপরাধী? না। নেথান হেফলিক আর জেমি গোল্ডেনবার্গ ২০০৯ সালে দেখালেন, পোশাকেরও দরকার নেই, শুধু মনোযোগটা চেহারার দিকে ঘুরিয়ে দিলেই যথেষ্ট। ২০০৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগে তাঁরা ১৩৩ জন ছাত্রছাত্রীকে দু'ভাগে ভাগ করলেন। একদলকে বলা হল, রিপাবলিকান ভাইস-প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সারা পেলিন সম্পর্কে যা মনে আসে লিখতে। অন্য দলকে বলা হল, তাঁর চেহারা সম্পর্কে লিখতে। ব্যস, এইটুকুই।যাঁরা চেহারা নিয়ে লিখলেন, তাঁরা পেলিনকে কম যোগ্য মনে করলেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা তাঁকে খানিকটা কম 'হিউম্যান নেচার'-এর বলেও মনে করলেন। এটাই সবচেয়ে চমকপ্রদ দেখা গেল যে ম্যাককেইন-পেলিন টিকিটে ভোট দেওয়ার ইচ্ছেটাও তাঁদের কমে গেল। একই পরীক্ষা অ্যাঞ্জেলিনা জোলিকে নিয়ে করেও একই ফল। মানে, একটি মহিলার চেহারার দিকে আপনার নজর ঘুরিয়ে দিলে আপনি তাঁকে খানিকটা বস্তু বানিয়ে ফেলেন, আর বস্তুর তো বুদ্ধি থাকে না।  নার্সিং পড়লে নিয়ম আরও কড়াএবার আর একটা মোচড়। ২০০৮ সালে উইসকনসিন-লা ক্রস বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই স্নাতক ছাত্রী, টিফানি জিল-নাউফ আর রেচেল মিটাগ, ১৭১ জন ছাত্রছাত্রীকে দিয়ে একটি মহিলার ছবি বিচার করালেন। এবার পোশাকের সঙ্গে আরেকটা জিনিস বদলানো হল, মেয়েটির বিষয় কী। কখনো বলা হল তিনি এমন বিষয়ে পড়েন যেখানে ছেলেরাই বেশি (ধরুন ইঞ্জিনিয়ারিং), কখনো বলা হল যেখানে মেয়েরাই বেশি (ধরুন নার্সিং বা শিক্ষকতা)।সবাই ভেবেছিলেন 'পুরুষালি' বিষয়ে খোলামেলা পোশাক পরলেই বেশি মার খাবেন। ফল হল উল্টো। মেয়েলি বিষয়ে খোলামেলা পোশাক পরা মেয়েটিকেই সবচেয়ে কম বুদ্ধিমতী মনে করা হল। গবেষকরা ব্যাখ্যা দিলেন যে মেয়েলি পেশাগুলোতে 'ভালো মেয়ে' হয়ে থাকার চাপটা আরও বেশি, ওখানে নিয়ম ভাঙলে ছাড় নেই। যেন প্রতিটা পেশার নিজস্ব একটা অলিখিত ড্রেস কোড আছে, আর সেটা কোথাও লেখা নেই, কিন্তু ভাঙলে জরিমানা আছে। শুধু অযোগ্য নয়, অসৎওস্পেনের আলমেরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসাবেল কুয়াদ্রাদো আর তাঁর দল ২০২১ সালে এই গল্পে আরেকটা স্তর যোগ করলেন, সেই স্তরটাই বোধহয় ভারতীয় প্রক্ষাপটে সবচেয়ে চেনা লাগবে আমাদের কাছে। তাঁরা ২০১ জন অংশগ্রহণকারীকে দিয়ে দু'ধরনের মহিলার মূল্যায়ন করালেন, একজন 'পেশাদার', একজন 'সেক্সি'। মাপা হল তিনটে জিনিস - যোগ্যতা, সামাজিকতা, আর নৈতিকতা। পেশাদার মহিলার সবচেয়ে বড় গুণ হিসেবে উঠে এল যোগ্যতা। আর সেক্সি মহিলার সবচেয়ে বড় 'অভাব' হিসেবে উঠে এল নৈতিকতা। ইনি নাকি কম সৎ, কম বিশ্বাসযোগ্য, কম আন্তরিক! শুধু বিচার করেই তাঁরা থামেননি। গবেষকরা মেপেছেন 'সাহায্য করার প্রবণতা' - অফিসে আপনি কাকে সুপারিশ করবেন, কাকে প্রোমোশনের জন্য এগিয়ে দেবেন, কার হয়ে ভালো কথা বলবেন। ফলাফলে দেখা গেল সেক্সি বলে চিহ্নিত মহিলার জন্য মানুষ কম হাত বাড়ান। গবেষকরা নিজেরাই লিখেছেন, এর ফলে এই মহিলারা নিচু পদে, কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে আটকে থেকে যান এবং সেখানে থেকে নিজের যোগ্যতা দেখানোর সুযোগটাই তাঁরা পান না।এইখানে আমাদের সাইকোলজিক্যাল চক্রটা লক্ষ্য করুন। আপনাকে অযোগ্য ভাবা হল, তাই আপনাকে বড় কাজ দেওয়া হল না, তাই আপনি যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ পেলেন না, তাই আপনাকে অযোগ্য ভাবাটা 'প্রমাণিত' হয়ে গেল। একে দুষ্টচক্র বলবেন না তো কাকে বলবেন! একই স্পেনীয় গবেষকদের আরেকটা কাজ, ক্রিস্টিনা গার্সিয়া-আয়েল, কুয়াদ্রাদো আর ফের্নান্দো মোলেরো-র ২০১৮ সালে, এবার আর ছাত্রছাত্রী নয়, ১০৯৮ জন সত্যিকারের কর্মী নিয়ে। তাঁ রা দেখালেন, অফিসে কাউকে সাহায্য করব কি করব না, সেটা ঠিক করে দেয় আমাদের আবেগ - প্রশংসা না ঈর্ষা, শ্রদ্ধা না বিরক্তি। যুক্তি অনেক পরে এসে দাঁড়ায় লাইনে।ইতালির স্তেফানো তার্তাল্লিয়া আর কিয়ারা রোল্লেরো (২০১৫) ৪৭৬ জনকে দিয়ে ব্যক্তিত্বের 'বিগ ফাইভ' (বহির্মুখিতা, অমায়িকতা, আবেগীয় অস্থিরতা, বিবেকবুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার প্রতি উন্মুক্ততা) মাপিয়ে দেখলেন 'সুন্দর মানেই ভালো' নিয়মটা কাজ করছে ঠিকই, কিন্তু পুরুষদের ক্ষেত্রে জোরালোভাবে বেশি। তাঁদের ব্যাখ্যা ছিল মোটামুটি সোজাসাপ্টা, পশ্চিমা সমাজে মেয়েদের সৌন্দর্য খুব সহজেই যৌনতায় গিয়ে ঠেকে, পুরুষদেরটা ঠেকে না। পুরুষের সৌন্দর্য একটা বাড়তি সুবিধে; মেয়ের সৌন্দর্য একটা বাড়তি ঝুঁকি।সুন্দরী হওয়ার বিপদ-তালিকাস্টেফানি জনসন, ক্সেনিয়া কেপলিঙ্গার আর তাঁদের সহলেখকরা ২০১৮-তে "দ্য পেরিলস অফ প্রিটি" নামে একটা প্রবন্ধে গোটা কেরিয়ারের রেখচিত্র ধরে এই ঝুঁকির তালিকা বানিয়েছেন। যা সংক্ষেপে তালিকা করতে গেলে এমন দাঁড়াবেঃ এক, সুন্দরী মহিলারা 'পুরুষালি' চাকরির জন্য আবেদন করলে একটু পিছিনে থাকেন। দুই, সুন্দরী মহিলারা অন্য মহিলাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার লক্ষ্য হন। গবেষণা বলছে, মানুষ সমলিঙ্গের সুন্দর প্রতিদ্বন্দ্বীর সাফল্যকে যোগ্যতার বদলে ভাগ্যের ঘাড়ে চাপাতে বেশি পছন্দ করে।তিন, সুন্দরী মহিলারা বেশি 'অবজেক্টিফাই' হন এবং ক্রমশ নিজেরাই নিজেদের চেহারার আয়নায় বিচার করতে শুরু করেন, যাকে বলে 'সেল্ফ-অবজেক্টিফিকেশন'।চার, যৌন হয়রানির ঝুঁকি বেশি।আর তাঁদের সুপারিশগুলোর মধ্যে একটা খুবই সরল, চাকরির আবেদনপত্রে ছবি লাগানো বন্ধ করে দিন। ব্যস। কেলসি ইয়ন্স তাঁর স্মিথ কলেজের গবেষণা-প্রবন্ধে (২০১৪) ব্যাপারটাকে অন্য নাম দিয়েছেন, 'অ্যাট্রাক্টিভনেস প্রিভিলেজ'। মানে সৌন্দর্য একটা 'বিশেষাধিকার', যেমন জাতি বা শ্রেণী বা বর্ণের বিশেষাধিকার, অর্জিত নয়, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া, এবং সেটা যাঁর আছে তিনি টেরই পান না যে আছে। ইয়ন্সের যুক্তিটা আরও একটু এগিয়ে যায়, সৌন্দর্যের এই মাপকাঠিটা কে ঠিক করে? বেশ খানিকটা ঠিক করে সেই শিল্প, যার লাভ হয় মাপকাঠিটা টিকে থাকলে। বিজ্ঞাপন আপনাকে বলে আপনি যথেষ্ট সুন্দর নন, তারপর সেই ঘাটতি মেটানোর ক্রিমটাও সে-ই বিক্রি করে। ব্যবসাটা বেশ নিখুঁত ছকে - চাহিদা আর জোগান একই কারখানায় তৈরি।  উল্টো দিকের কথাটাও শোনা যাকএবার একটু ব্যালেন্স করা যাক অন্যদিকের গবেষণা কিছু আছে কিনা দেখে। মানে এটা দেখার চেষ্টা যে সব গবেষণাই কি এক সুরে গায়? নাকি আমি সেগুলিকেই বেছে নিচ্ছে যেগুলো আমার খাড়া করতে চাওয়ার থিওরিকে সমর্থনে করছে? ক্যাথরিন হ্যাকিম নামে লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স-এর এক সমাজবিজ্ঞানী ২০১১ সালে "ইরোটিক ক্যাপিটাল" নামে একটা বই লিখে রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। এই বইয়ের মাধ্যমে সমাজবিজ্ঞানে একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং তুমুল বিতর্কিত ধারণার জন্ম দেন তিনি, যা হলো ‘ইরোটিক ক্যাপিটাল’ বা ‘যৌন পুঁজি’। অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক পুঁজির ধারণাকে আরও প্রসারিত করে হ্যাকিম যুক্তি দেন যে, মানুষের জীবনে সাফল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে চতুর্থ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পুঁজি রয়েছে, যা এতদিন সমাজবিজ্ঞানীরা উপেক্ষা করে গেছেন। তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী, ইরোটিক ক্যাপিটাল হলো মূলত ছয়টি উপাদানের একটি সমন্বিত রূপ, ১) শারীরিক সৌন্দর্য, ২) যৌন আবেদন, ৩) সামাজিক দক্ষতা, ৪) প্রাণবন্ততা, ৫) উপস্থাপনা বা স্টাইল এবং ৬) যৌন সক্ষমতা ও কল্পনাহ্যাকিমের মূল যুক্তি হচ্ছে সৌন্দর্য, আকর্ষণ, সামাজিক লাবণ্য - এগুলো টাকা বা ডিগ্রির মতোই একরকম পুঁজি, এবং মেয়েদের উচিত এই পুঁজি খাটানো, লজ্জা পাওয়া নয়। তাঁর মতে, পুরুষরা এই পুঁজির অস্তিত্বই অস্বীকার করে, কারণ এই একটা জায়গায় মেয়েদের হাতে বেশি তাস আছে। বইটা প্রচুর গালাগাল খেয়েছে, এবং বেশ কিছু জায়গায় ন্যায্যভাবেই হয়ত! হ্যাকিমের 'ইরোটিক ক্যাপিটাল' ধারণাটা এত টেনে-বাড়ানো যে কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ বোঝা মুশকিল, শ্রেণী-বর্ণ-বয়সের প্রশ্নগুলো তিনি প্রায় ছুঁয়েও দেখেননি, আর তাঁর বইয়ে অভিজ্ঞতালব্ধ তথ্যের চেয়ে জোরালো দাবির পরিমাণই বেশি। তবু কথাটা একেবারে ফেলনা নয় যদি আবেগহীন ভাবে রেগে না গিয়ে দেখেন - বাস্তবে বহু জায়গায় বহু মেয়ে চেহারাকে সম্পদ হিসেবেই ব্যবহার করেন, এবং লাভও পান। এই লেখাগুলোর সঙ্গে গ্লিক-হাউলেটদের গবেষণার বিরোধ ততটা নেই যতটা মনে হয়, কারণ সবটাই নির্ভর করছে জায়গার ওপর। বিক্রয়কর্মীর টেবিলে যা সম্পদ, বোর্ডরুমের টেবিলে সেটাই দায়। আরেকটা কথা বলা দরকার। ল্যাবরেটরিতে পাঁচ সেকেন্ডে একটা ছবি দেখে যে বিচার মানুষ করে, বাস্তব অফিসে তিন বছর একসঙ্গে কাজ করার পর সেই বিচার টেকে না। সানিয়া উসমানি ২০২০ সালে করাচির ব্যাঙ্ক আর কোম্পানিগুলোতে নিয়োগকর্তাদের নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন, সাক্ষাৎকারে তাঁরা যা বলেছেন, এবং পরীক্ষায় তাঁরা যা করেছেন, দু'ক্ষেত্রেই আত্মবিশ্বাস, যোগ্যতা, যোগাযোগের দক্ষতা আর সিভির স্বচ্ছতাই বেশি ওজন পেয়েছে; নিছক মুখশ্রী নয়।ভারতের ক্ষেত্রে একটা আরও কৌতূহলোদ্দীপক ফলাফল আছে। রম্যা বিজয়া আর তাঁর সহযোগীরা একটা পরীক্ষা করেছিলেন - একই সিভির সঙ্গে ছবি জুড়ে দেওয়া হল, শুধু ছবিতে গায়ের রং বদলে দেওয়া হল ফোটোশপে। তাঁরা ভেবেছিলেন ফর্সা প্রার্থীরা বেশি নম্বর পাবেন। কিন্তু পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো পক্ষপাত তাঁরা পাননি। তাঁদের সিদ্ধান্ত এই ছিল যে ভারতে গায়ের রঙের বৈষম্য অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু সেটা নিয়োগের টেবিলে সরাসরি ধরা পড়ে না - সেটা কাজ করে আরও অনেক আগে, আরও অনেক গভীরে। মেয়েটি সেই চাকরিতে আবেদনই করেন না! এই কথাটা মনে রাখা জরুরি যে বৈষম্য সবসময় শেষ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে না। অনেক সময় সে বহু আগেই রাস্তা ঘুরিয়ে দিয়েছে!  শাড়ি, বিএমআই আর ফেয়ারনেস ক্রিমের দেশলেখা শেষের দিকে এসে যাচ্ছে, একটু ঘরের কথা হয়ে যাক তাহলে এবার। ভারতে এই গোটা আলোচনাটা আরও একটা জটিল প্যাঁচে ঢুকে যায়, কারণ এখানে মেয়েদের পোশাক কেবল রুচির প্রশ্ন নয়, চরিত্রের সার্টিফিকেটও বটে! স্মিথ ও সহকর্মীরা আই-ট্র্যাকার দিয়ে যে জিনিসটা কষ্ট করে প্রমাণ করলেন - খোলামেলা পোশাক থেকে মানুষ 'কম সৎ' সিদ্ধান্তে পৌঁছয়, সেটা ভারতীয় সমাজে প্রমাণ করার দরকারই পড়ে না। ওটা এখানে বিনা প্রমাণে স্বতঃসিদ্ধ।উদাহরণ চাই? বিমান সংস্থার কথাই ধরুন। ২০১৫ সালে এয়ার ইন্ডিয়া ১২৫ জনের বেশি কেবিন ক্রু-কে ওজন বেশি হওয়ার কারণে বিমান থেকে নামিয়ে দিয়েছিল। নিয়ামক সংস্থা ডিজিসিএ-র নির্দেশিকা অনুযায়ী মহিলা ক্রু-দের বিএমআই থাকতে হবে ১৮ থেকে ২২-এর মধ্যে, পুরুষদের ১৮ থেকে ২৫। খেয়াল করুন, পুরুষদের ছাড় বেশি - একই বিমান, একই জরুরি নির্গমন দরজা, কিন্তু ওজনের মাপকাঠি আলাদা।তার আগে-পরে আরও আছে। ২০০৮-এ কয়েকজন এয়ার হোস্টেসকে ছাঁটাই, আদালতে দীর্ঘ লড়াই। সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় বিচারপতি এয়ার ইন্ডিয়ার আইনজীবীদের বলেছিলেন, ওজন যোগ্যতা নির্ধারণের মাপকাঠি হতে পারে না। কথাটা সোনার অক্ষরে বাঁধিয়ে রাখার মতো, কিন্তু বাস্তবে নিয়ম বদলায়নি।আর ২০১৫ সালেই এয়ার ইন্ডিয়ার শাখা সংস্থা অ্যালায়েন্স এয়ার কেবিন ক্রু নিয়োগের যে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, তাতে শর্ত ছিল অবিবাহিত হতে হবে, ত্বক পরিষ্কার হতে হবে, কোনো দাগ, জড়ুল, ট্যাটু বা বড়সড় ব্রণর দাগ চলবে না, দাঁত হতে হবে সমান, আর কথা বলার সময় জিভ জড়ালে হবে না। একটা প্লেনের এয়ারহোষ্টেস হতে হলে নাকি এইসব লাগে।২০২২ সালে আরেক কাণ্ড। এয়ার ইন্ডিয়া ঠিক করল, ফ্লাইটে ওঠার আগে 'গ্রুমিং অ্যাসোসিয়েট' নামে কিছু কর্মী ক্রু-দের ওজন আর বিএমআই দেখে নেবেন। ক্রু ইউনিয়ন প্রতিবাদ করে চিঠি দিল - ডাক্তারি পরীক্ষা ডাক্তারই করুন, ক্লিনিকের গোপনীয়তার মধ্যে; এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে ওজন মাপার এই ব্যাপারটা অসম্মানজনক, এবং উড়ানের ঠিক আগে ক্রু-দের মানসিক প্রস্তুতি নষ্ট করে দেয় - যেটা আদতে নিরাপত্তার প্রশ্ন।তারপর ধরুন গায়ের রং। ফেয়ারনেস ক্রিমের বাজারটা ভারতে কত বড়, সেটা আপনারা জানেন। সিন্থিয়া সিমস আর মালার হিরুদয়রাজ ২০১৬ সালে দেখিয়েছেন, ভারতে কালো মেয়েরা কেবল বৈষম্যের শিকারই হন না, তাঁরা নিজেরাই কিছু কিছু পেশায়, বিশেষত যেখানে খদ্দেরের সামনে যেতে হয়, আবেদন করতেই ভয় পান। ২০২০ সালে বিশ্বজোড়া প্রতিবাদের চাপে হিন্দুস্তান ইউনিলিভার তাদের বিখ্যাত ক্রিমটির নাম থেকে 'ফেয়ার' শব্দটা তুলে দিল। নাম বদলাল। বাজার বদলাল কি?আর নিছক শাড়ি-সালোয়ারের ঝগড়া? আমাদের বাংলাতেই তার নমুনা ভুরি ভুরি। ১৯৯৯ সালে বহরমপুর গার্লস কলেজের ফটকে বোর্ড ঝুলল - শাড়ি ছাড়া ঢোকা নিষেধ; কর্তৃপক্ষের যুক্তি, ১৯৪৭ সাল থেকে এই নিয়ম চলে আসছে। ২০০৬ সালে বাখরাহাট গার্লস হাই স্কুলের পরিচালন সমিতি ঠিক করল, শিক্ষিকাদের শাড়ি পরে আসতেই হবে - যদিও রাজ্য সরকার বা কলকাতা হাইকোর্ট কেউই সালোয়ার-কামিজে আপত্তি করেনি। ত্রিশজন শিক্ষিকার মধ্যে আটজন অনড় রইলেন, এবং শেষ পর্যন্ত জিতলেন। আর ১৯৯৭ সালে ব্যাঙ্গালোরের ক্রাইস্ট কলেজ মেয়েদের জিনস আর ছোট স্কার্ট নিষিদ্ধ করল 'অশালীন' বলে - ছেলেদের জিনসে কোনো আপত্তি ছিল না, তা সে যত আঁটোসাঁটোই হোক।ভারতীয় মেয়েদের সমস্যাটা তাই দ্বিমুখী। খুব সাবেকি সাজলে আপনি 'ব্যাকডেটেড', প্রোমোশনের যোগ্য নন, ক্লায়েন্টের সামনে পাঠানো যাবে না। আর একটু পশ্চিমী সাজলে আপনি 'ফাস্ট', 'সিরিয়াস নন', 'ক্যারেক্টার ঠিক নেই'। মাঝখানের সরু রেখাটা কোথায়, সেটা কেউ কোনোদিন লিখে দেয়নি - কিন্তু সবাই জানে আপনি সেটা পেরিয়ে গেলে।পুরুষদের এই ঝামেলা নেই। একটা ফরমাল শার্ট, একটা ট্রাউজার, দরকার হলে একটা ব্লেজার - ব্যস, ইউনিফর্ম রেডি। স্মিথ ও সহকর্মীরা তাঁদের গবেষণাপত্রের একেবারে প্রথম বাক্যেই কথাটা বলেছেন, মেয়েদের কোনো নির্দিষ্ট 'স্যুট' নেই। তাই প্রতিদিন সকালে আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের একটা করে ঝুঁকির হিসেব কষতে হয়, যেটা পুরুষ সহকর্মীটিকে কখনো কষতে হয় না।আমার এক চেনা কথাচ্ছলে বলেও ছিলেন ক্লায়েন্ট মিটিং থাকলে তিনি আগের রাতে কুড়ি মিনিট ধরে ঠিক করেন কী পরবেন। কারণ কুর্তা পরলে "ও তো ব্যাক-অফিসের মেয়ে", ট্রাউজার-শার্ট পরলে "একটু বেশি আঁটোসাঁটো হয়ে গেল না?", শাড়ি পরলে "বাব্বা, আজ কী ব্যাপার!" — কোনো একটা মন্তব্য আসবেই। আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কতক্ষণ ভাবি। আমি সত্যি কথাই বলেছিলাম — শূন্য মিনিট। যেটা মনে হয় এবং সামনে আসে সেটাই পরি।সেই কুড়ি মিনিট বনাম শূন্য মিনিট - এটাই সম্ভবত এই যে গোটা গবেষণা ভিত্তিক প্রবন্ধটা লেখার চেষ্টা করলাম তার সারাংশ। এই কুড়ি মিনিট প্রতিদিন, তিরিশ বছর ধরে। যোগ করলে দাঁড়ায় প্রায় চার মাস - যে চার মাস সহকর্মীটি অন্য কিছু ভাবতে পারতেন। তাহলে দোষটা আসলে কার?তাহলে উপসংহারটা কী দাঁড়াল? "মেয়েরা, ঢেকেঢুকে অফিসে যান, প্রোমোশন পাবেন" – এমন কি? অবশ্যই না! এবং এইখানেই আসল কথাটা।স্মিথ আর তাঁর সহলেখকরা তাঁদের গবেষণাপত্রে একটা লাইন লিখেছিলেন যেটা আমার বেশ জুতসই লেগেছে, তাঁরা বলেছেন, এই গভীরে ঢুকে তলিয়ে দেখার উদ্দেশ্য মেয়েদের পোশাক নিয়ে লজ্জা দেওয়া বা দোষ চাপানো নয়। উদ্দেশ্য হল, আমাদের পছন্দগুলো অন্যের মাথায় কী ছবি আঁকছে, সেটা জানা।আর সেখানেই ধাক্কাটা। কারণ এই সমস্ত গবেষণার আসল আবিষ্কারটা কিন্তু ওই মেয়েটিকে নিয়ে নয় – আবিষ্কার আমাদের নিয়ে। মানে আমরা যাঁরা বিচার করছি, তাঁদের নিয়ে। খেয়াল করুন গ্লিকের ফলাফলটা আরেকবার। যোগ্যতার নম্বর কমেছে আবেগের কারণে। আমরা প্রথমে বিরক্ত হয়েছি, তারপর সেই বিরক্তির একটা সম্মানজনক নাম খুঁজেছি - "ইনি অযোগ্য" নামটা হাতের কাছে তো ছিলই। খেয়াল করুন স্মিথের ফলাফল, দর্শকরা ইস্তাহারটা ঠিকই পড়েছিলেন, তথ্য ঠিকই মনে রেখেছিলেন, তবু রায় দিয়েছেন উল্টো। মানে আমাদের 'যুক্তি' জিনিসটা আসলে অনেক সময় পূর্বনির্ধারিত রায়ের জন্য বানানো ওকালতনামা।আরও খেয়াল করুন হাউলেটের ফলাফল, বিচারকরা সবাই মহিলা ছিলেন, এবং কর্মরত মহিলারাই সবচেয়ে কড়া ছিলেন। এটা "পুরুষতন্ত্র বনাম নারী" নামের সোজাসাপ্টা গল্প নয়। এটা এমন একটা মাপকাঠি যেটা আমরা সবাই - ছেলে, মেয়ে, বাবা, মেয়ের বাবা, বসের বস - শৈশব থেকে গিলে ফেলেছি, আর এখন নিরপেক্ষ বিচারবুদ্ধি বলে চালাচ্ছি! তাহলে কি আমাদের কিছুই করার নেই? গবেষকদের পরামর্শগুলো আশ্চর্যরকম সাদামাটা, হয়ত সেটাই সবচেয়ে ভালো খবর - সিভি থেকে ছবি তুলে দিন। ইন্টারভিউয়ে গঠনবদ্ধ, আগে থেকে ঠিক করা প্রশ্ন রাখুন, যাতে "মেয়েটাকে ঠিক সিরিয়াস লাগল না" জাতীয় কথা লেখার জায়গাটাই কমে আসে। মূল্যায়ন কমিটিতে একাধিক মানুষ রাখুন, নম্বর দেওয়ার আগে প্রত্যেককে আলাদা করে লিখতে বলুন। প্রোমোশনের সময় কে কাকে 'সুপারিশ' করছেন, সেই অদৃশ্য সুতোটার দিকে নজর দিন – কারণ কুয়াদ্রাদোর গবেষণা বলছে, ওখানেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়।আর নিজের জন্য? পরের বার যখন কারও সম্পর্কে "ঠিক সিরিয়াস লাগল না" গোছের একটা অনুভূতি হবে, তখন দশ সেকেন্ড থেমে নিজেকে জিজ্ঞেস করবেন - ঠিক কোন উত্তরটা, কোন কাজটা, কোন সংখ্যাটা দেখে এই কথাটা মনে হল? যদি উত্তর খুঁজে না পান, তাহলে সম্ভবত আপনার মাথার ভেতরে সেই সব ধারণা এখনো গেঁথে আছে যাদের কথা আমি এতক্ষণ শোনালাম। মানে আপনার মাথার মধ্যে যিনি “... ঠিক সিরিয়াস লাগল না” বলার জন্য চেয়ার গেড়ে বসে আছেন তাঁকে চেয়ার থেকে তুলুন। যদি কারো মাথার মধ্যে “... ঠিক সিরিয়াস লাগল না” বলার জন্য চেয়ার গেড়ে কেউ বসে থাকে আর সেই ব্যক্তি যদি একাই ইন্টারভিউ নেন বা শেষ কথা বলার এক্তিয়ার রাখেন, তাহলে সেদিন কী হয়? সেদিন তো কেউ প্রশ্নটাই করে না! আর ঠিক সেই কারণেই ব্লাউজের একটা খোলা বোতাম নিয়ে এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের এতগুলো গবেষণাগারে এত পরীক্ষা হয়েছে। বোতামটা আসলে কারও জামার নয়। বোতামটা আমাদের মাথায়, বোতামটা আমাদের মাথার।  
    সামসুর ভাইয়ের সব্জির ভ্যান ও কৃষির টুকিটাকি। - Somnath mukhopadhyay | সামসুর ভাইয়ের সব্জির ভ্যান ও কৃষির টুকিটাকি  রোজ সকালে সবজি কিনতে গিয়ে বেশ খানিকটা সময় গপ্পো করি সবজিওয়ালা সামসুর ভাইয়ের সঙ্গে। সামসুর ভাইয়ের বিশেষতা হলো -তার বিঘা দুই জমি রয়েছে পারিবারিকভাবে। সেই জমিতে সে সম্বৎসর নানান ধরনের সবজির চাষ করে। ফলনের একটা বড়ো ভাগ পাইকারি দরে মাঠ থেকেই বিক্রি করে দেয় ; এতে চাষের খরচের একটা বড়োসড়ো অংশ থোক টাকায় ঘরে ঢুকে পড়ে,আর ক্ষেতে পড়ে থাকা বাকিটুকু ভ্যান রিক্সায় নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে খুচরো দরে, এতে তার জনসংযোগ হয়, পরিচিতি বাড়ে, বুঝতে পারে পাবলিক ঠিক কী কিনছে এবং খাচ্ছে। মুনাফাটাকে নিজের মতো করে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে পারে।অবশ্য সব ধরনের সবজি তো আর নিজের ক্ষেতে হয়না, আর সাতসকালে পাঁচ রকম সবজি গাড়িতে না দেখলে খদ্দেরের মন টানবে কেন? তাই সকালের পাইকারি হাট থেকেও অন্যান্য সবজি কিনে গাড়ি ভরে নিয়ে আসে। আমরা হামলে পড়ি। ফুটন্ত হাঁড়ির একটা দুটো ভাত দুই আঙ্গুলের মাঝে নিয়ে টিপলেই যেমন মা টের পেয়ে যেতেন গোটা হাঁড়ির খবর, ঠিক তেমনি সামসুর ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেই আমি বেশ টের পেয়ে যাই অন্তত আমার রাজ্যের ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের হাল হকিকত। সামসুরের সঙ্গে কথায় কথায় জানতে পারি আমাদের আগামী দিনের খাবার দাবারের খাস খবর। সামসুর ভাইয়ের কথা শুনে মাঝে মাঝে রীতিমতো অবাক হ‌ই, ধাঁধায় পড়ে যাই। বলে কি! সেদিন সামসুর ভাই আমাকে যা বললো তা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতেই আজ কলম বাগিয়ে বসেছি। তার কথায় –  – “আমরা খাই কেন বলো দিকি ? আমাদের খাওয়ার মূল মতলব হলো বেঁচে থাকা। আবার যেমন তেমন খেলে তো চলবে না, ভেবে চিন্তে খেতে হবে যাতে করে যা খাচ্ছি তা যেন আমাদের পেটের খোল ভরার সঙ্গে সঙ্গে শরীলের পুষ্টি করে, আমরা খেটে খাবার বল পাই। এর আরও একটা বিষয় আছে আর তা হলো বিশ্ব পকিতির সঙ্গে সম্পক্কের সেতু বাঁধা। আমি সবজি বেঁচতে গিয়ে দেখি অনেক হালফিলের বাবু- বিবি আছেন যাঁরা সব সব্জির সঠিক নাম ধাম‌ই জানেনা, চেনেনা। উচ্ছে আর করলার,লাউ আর চালকুমড়োর ফারাক‌ধরতে পারে না। আরে বাপু!খাবার আগে জানতেতো হবে যা খাচ্ছ তার পেছনের সত্যটা।  সামসুর ভাইয়ের কথা শুনে রীতিমতো চমকে উঠি! বলে কি পাগল! খাবার সামনে সাজিয়ে দিলে গপাগপ গলপথে উদরে চালান করতে ব্যস্ত হয়ে পড়াটাই দস্তুর বলে জানি ও মানি। সেখানে এসব কথা ভাবার সময় কোথায়? আমার ভ্যাবাচ্যাকা পানা মুখ দেখে সামসুর ভাই হাসতে হাসতে বলে – “এই যে খাচ্ছো তাতে পৃথিবীর তাত বাড়েনা? নাঙল দে জমি চষলেই মাটির ফাঁক ফোকরে ঘাপটি মেরে থাকা তাপ বাইরে বেইরে পড়ে। এতেই কি আর কাম খতম হলো ভেবেছো?ভাবো ভাবো মন দিয়ে ভাবতে শেখো। দাও দিকি পয়সা কড়ি তাড়াতাড়ি, মেলা সবজিতে গাড়ি বোঝাই। এগুলো বেচে ঝটপট ঘরে ফিরবো। বিকেলে আবার জমিতে পানি দিতে হবে।” সামসুর ভাই সবজির সাথে সাথে একরাশ ভাবনা ফেলে রেখে গেছে আমার জন্য। সেগুলোকে এবার সামলাতে হবে।  বিশ্ব উষ্ণায়নের বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই এই সময়ের কৃষি বিজ্ঞানীরা আরও টেকস‌ই, আরও পরিবেশের সাথে মানানসই করে গড়ে তুলতে চাইছেন আমাদের কৃষিকে। এই চাওয়াটার মধ্যে হয়তো ঠেকে শেখার তাগিদ আছে, তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই ইচ্ছেটাকে সম্মান জানাতে হবে বৈকি। কী হবে সেই কৃষির মডেল যা সামসুর ভাইয়ের কথা মতো আমাদের জীবন - পুষ্টি - প্রকৃতি পরিবেশকে এক নিয়মের তন্ত্রে বেঁধে রাখবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলাফলকে যথাসম্ভব খাটো করে উন্নীত করবে সকলের বেঁচে থাকার আনন্দকে ? কাজটা মোটেই সহজসাধ্য নয়, কেননা যেদিন আমাদের আদি পূর্বপুরুষরা জঙ্গল সাফ করে চাষের উপযোগী জমির পত্তন করলো সেদিন থেকেই যে পৃথিবীর তাপীয় সাম্যের ভঙ্গ হলো।  আজ এই অবস্থায় পৌঁছে আমাদের দেখতে হবে যে ভাবী কৃষিতে নিবেশ যেন সঠিক মাত্রায় হয় যাতে সাধারণ কৃষিজীবী মানুষেরা কৃষির বহুমুখী ঝুঁকির হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। তাঁদের হাতে আরো বেশি অর্থ আসার সম্ভাবনা তৈরি করতে হবে। মাথায় রাখতে হবে যে নিবেশের পরিমাণ বাড়লে বাড়তি আয়ের জন্য বাড়বে দাম যা বহু মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। প্রশ্ন উঠবে, ইনপুটের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনা হলে আউটপুট বা উৎপাদনের পরিমাণ কমে যাবে না তো? মনে রাখতে হবে যে নিবেশের পরিমাণ কম হলে কৃষির উৎপাদন কমে যাবে - এমনটা কখনোই ঠিক নয়। উৎপাদনশীলতা কেবলমাত্র বিনিয়োগের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না,তা নিয়ন্ত্রণ হয়পরিকাঠামোর দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে। গাদাগুচ্ছের বিনিয়োগ করলেই ফসলের বন্যায় ক্ষেত ভরে উঠবে এমন কিন্তু নয়। বিনিয়োগ বাড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়ে কৃষকদের প্রলুব্ধ করাটার মধ্যেও এক আশঙ্কা রয়েছে। মনে রাখতে হবে যে আমাদের দেশের এক বড়ো সংখ্যক কৃষক হলেন মাঝারি ও ক্ষুদ্র জোতের কৃষক। তাদের পক্ষে চট করে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। সামসুর ভাইয়ের কথায় - এতে করে লাভের গুড় পিঁপড়ে খেয়ে নেবার ভয় রয়েছে। সবদিক দেখে নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাহলে উৎপাদন বাড়বে কী করে? কৃষি বিজ্ঞানীরা বলছেন বহু কর্ষণের ফলে এমনিতেই আমাদের কৃষি জমির স্বাস্থ্য দুর্বল হয়ে পড়েছে। যথেচ্ছভাবে রাসায়নিক সারের ব্যবহার নষ্ট করে ফেলেছে জমির একান্ত বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্যের বুনিয়াদ। ফসলের বৃদ্ধির জন্য চাই জল। অথচ জলের প্রধান জোগানদার মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমেছে, বাড়ছে অনিয়মিতি। একালে ক্রপ ম্যানেজমেন্টের সাথে জলের সুষ্ঠু ও যথাযথ ব্যাবহারের ওপরেই জোর দেবার কথা বলা হচ্ছে। প্রতিটি বৃষ্টি বিন্দু তাই আগামী দিনে মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠতে চলেছে। আগামী দিনে প্রতি ফোঁটা জলের জন্য আমাদের লড়াই করতে হবে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে নতুন নতুন রোগপোকার আক্রমণ বাড়ছে। সামসুর ভাইয়ের ঝিঙের ফসলের ৮০% নষ্ট হয়ে গেছে অজানা সমস্যার কারণে। প্রায় আট কাঠা জমির মুখী কচু নষ্ট হয়ে গেছে অসময়ের বৃষ্টিতে। এরফলে বিপন্ন হয়ে গেছে তার কৃষিকর্মের স্থিতিশীলতা। সামসুর ভাইয়ের মতো কৃষকেরা উপলব্ধি করতে পারছেন যে এবার তাদের আবহমানকালের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় খানিকটা রদবদল করতে হবে যাতে তাদের কৃষির ভবিষ্যৎ সুস্থিত হয়, কীটনাশক আর রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণে এনে উৎপাদনকে সত্যিকারের স্থিতিশীল করে তোলা সম্ভব হয়। সামসুর ভাইদের কাছে কৃষির স্থিতিশীলতার অর্থ হলো বাতাবরণের বদলে যাওয়া অবস্থার সঙ্গে সর্বতোভাবে মানানসই হয়ে ওঠা। যতটুকু তারা বিনিয়োগ করছেন তার সুদে মূলে ফেরত পাওয়া। দ্বিতীয়ত, আগামীর কৃষিতে ঝুঁকির মাত্রা কমিয়ে ফেলতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে ঝুঁকির আশঙ্কায় নিয়ত আশঙ্কিত থাকতে হয়। অনেকক্ষেত্রেই এক ফসলী কৃষি ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তবে মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের কৃষিতে একাধিক বসল উৎপাদনের প্রবণতা রয়েছে। এর প্রতি অধিকাংশ কৃষককে উৎসাহিত করতে হবে আরও বেশি করে যাতে করে ফসলের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয় আরও গভীর ভাবে। কৃষির মধ্য দিয়ে মানুষ আর প্রকৃতির কাঙ্ক্ষিত সেতুবন্ধ রচিত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এর প্রয়োজনে পশুদের আরও অর্থকরীভাবে বৃহত্তর কৃষি ব্যবস্থার অধীনে আনতে হবে। মনে রাখতে হবে যে কৃষকদের আয়ের উৎসের যত বেশি করে বিকেন্দ্রীকরণ করা সম্ভব হবে তত‌ই কমবে কৃষক তথা কৃষি ব্যবস্থার ঝুঁকির মাত্রা। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তালমিলিয়ে খাপ খাইয়ে নিতে না পারলে কৃষির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।  সাথে সাথে নতুন অবস্থায় ফসল নির্বাচনে আরও সতর্ক হতে হবে কৃষকদের। একদিকে বাজারে ফসলের চাহিদা, অন্যদিকে আবহাওয়ার বদল - এই দুয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে কৃষকদের। সামসুর ভাই আগাম জানিয়ে দিয়েছে যে এবার শীতে সে শুঁটি ফসল বীনসের চাষ করতে চায় কেননা এর বাজার দর ভালোজলের চাহিদা কম, তেমন পরিচর্যার প্রয়োজন নেই, কেবল মাচায় তুলে দেওয়া ছাড়া। কথায় বলে ঠেকে শেখা। সামসুর ভাইয়ের এখন সেই দশা। ইদানিং কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রক স্বল্প বৃষ্টিপাত যুক্ত অঞ্চলে মিলেট বা ক্ষুদ্র দানাশস্যের চাষকে জনপ্রিয় করতে উৎসাহিত করছে কৃষকদের। এই প্রচেষ্টা পরিবেশানুগ ভাবনার সংযোজন। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে ফসলের উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে জমির স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের ওপর। আর সেই স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য ফসলের বৈচিত্র্য আনতেই হবে। এক‌ই জমিতে লাগাতার এক‌ই ফসলের উৎপাদন না করে আনতে হবে ফসলের বৈচিত্র্য। সামসুর ভাইয়েরা এ তথ্য জানেন না এমন নয় তবে তাকে আরও প্রয়োগমুখী করে তুলতে হবে কৃষির স্থিতিশীল ভবিষ্যতের জন্য। সবশেষে যেটা বলার তা হলো জমির জন্য সঠিক ফসলের নির্বাচন। ভ্যান রিক্সায় সব্জির পসরা সাজিয়ে প্রতিদিন সকালে সামসুর ভাইয়ের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়িয়ে জনসংযোগ করার মুখ্য উদ্দেশ্য‌ই হলো খদ্দেরদের পছন্দের যাচাই করা। কোন ফসলের চাহিদা বাড়ছে, কোন ফসলের চাহিদা কমছে সেই গুরুত্বপূর্ণ খবর জানতে এই পদ্ধতি খুব উপযোগী তার কাছে। একালে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বেড়েছে।কোন্ ফসল, কোন্ সব্জি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজে লাগবে তা মেনে চলতে চাইছেন এই প্রজন্মের অনেকেই। এই পছন্দ - অপছন্দের তালিকা থেকে কৃষকরা সংকেত পান। ইদানিং শরীরের gut microbiome নিয়ে চর্চা চলছে জোরকদমে। এরফলে খাদ্য নিয়ে আমাদের সচেতনতার মাত্রা বেড়েছে। ডাক্তারবাবুরা রোগীদের শরীরের হালহকিকত যাচাই করে জানিয়ে দিচ্ছেন শরীরের পক্ষে উপযুক্ত খাদ্য তালিকা। কোন্ কোন্ ফসলে ডায়েটারি ফাইবার বেশি,এন্টি অক্সিডেন্টে ভরপুর কোন্ সব্জি, ফলিক অ্যাসিড কী থেকে পাওয়া যাবে – এসব তথ্য এখন আমাদের ভাবনা থেকে সামসুর ভাইয়ের চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে। এই জানকারির প্রয়োগ হচ্ছে কৃষিজমিতে। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারছে যত বেশি ফসলের বৈচিত্র্য তত বেশি প্রসারিত বাজার, বিপণন; তত বেশি ভালো মাটির সুস্থতা,সরসতা।এ সবই এক স্থিতিশীল কৃষি ভবিষ্যতের জন্য উপযোগী। এসব আমাদের মা ঠাকুমা দিদিমাদের খাদ্য ভাবনায় সুরক্ষিত ছিল বহু বহু কাল। সাবেকি বলে সেই প্রজ্ঞার বড়ো অংশকেই আমরা বাতিল করেছি অথবা সরিয়ে রেখেছি। অথচ তার মধ্যেই নিহিত আছে বহু বহু বছরের অভিজ্ঞতা ও প্রমা। তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে নিজেদের স্বাস্থ্যের জন্য এবং এক সুস্থিত, সুন্দর, বৈচিত্র্যময় ভবিষ্যতের জন্য।   সোমনাথ মুখোপাধ্যায় জুলাই ১৮.২০২৬.
  • জনতার খেরোর খাতা...
    গান শোনায় শৌখিনতা  - Tania Basu Dutta | গান শোনার বিষয়ে আমরা প্রত্যেকেই খুব স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল। কোনো কোনো সময় এমন হয় খুব প্রিয় গানগুলোই যেনো শুনতে মন চায় না। কারণ চারপাশ টা সেই গানগুলোর একেবারেই প্রতিকূলে সেই মুহূর্তে। তখন খুব না প্রিয় কোনো গান অদ্ভুত ভাবে মানিয়ে যায় চারপাশের সঙ্গে। তার মানে কি গান মন ঠিক করে নাকি মন গান ঠিক করে ? এ এক অদ্ভুত হেঁয়ালী, এক অদ্ভুত ধাঁধা।  আমার আজকের বিষয়বস্তু এই ; কোনো আঘাত বা অভিযোগ নয় ; একান্ত ব্যক্তিগত কিছু ভালো লাগা সকলের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া - বরং হয়ে যাক না এক নির্ভেজাল আড্ডা, আমার এই লেখার হাত ধরেই, আমার বড় ভালো লাগবে অমন যদি হয়। লেখাটি আমি ভাগে ভাগে উপস্থাপন করবো। একেবারে সম্ভব নয় কারণ আমি লুকিয়ে মোবাইল ঘাঁটি কারণ তারা জানে মা মোবাইল দিনে আধঘণ্টার বেশি দেখে না,, তাই তারাও দিনে আধঘণ্টার সময়সীমা বজায় রাখে আর বাকি সময় গল্পের বই, রঙ পেন্সিল, আর খেলাধুলা করে সময় অতিবাহিত করে। লেখাপড়া বিশেষ করে না। লেখার শেষে আপনারাও আপনাদের প্রিয় সময়ে প্রিয় গান ভালোলাগা জানান। আসুন সকলে সুন্দর এক গল্প করি।   আজ বলবো কোহেনের গান নিয়ে। আর থাকবে ডেনভার। আমার ভীষণ ভালোলাগার, ভালোবাসার ডেনভার। বাবা যখন কোহেনের গান শুনত, আমার কলেজবেলা তখন, ট্রেন, বাস, মেট্রোর ভীড়ে কোনোদিন কান থেকে মাথায় পৌঁছতে দিইনি Suzanne বা hallelujah কিংবা dance me to the end of love অথবা bird on the wire এর মতো অসাধারণ গানগুলো কে . ইউনিভার্সিটি তে ম্যাগাজিন চালানোর সময় হাসনুহেনা ' Bird on the wire ' এর প্রথম তিন লাইন নিজের নাম করে লিখে দিয়েছিলো . সে যাই হোক . ম্যাগাজিন টা চলেনি . কোহেনের গান ভালো লাগতে শুরু করে অনেক পরে . রাতের ঘুম তখন খোরাকে পরিণত হয়েছে . অতো খাদে কণ্ঠস্বর গিয়ে অমন সুরে অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে গান অন্য কোথাও শুনেছি বলে মনে পড়ে না . রাতে গান শোনা মানেই কোহেনের গান শোনা . মাঝরাত, ভোররাত যাইহোক না কেনো নিঃস্তব্ধতা আর লিওনার্ড কোহেনের কণ্ঠস্বর ব্যাস ওই কি যেনো ইংরিজি তে বলে । ....হ্যাঁ, sorted ..... কিন্তু যেই না ভোরের আলো আমার পুবদিকের জানালা জুড়ে সুপ্রভাত জানায় আমায়, ওই বিছানার উপর আমার সোনা মানিকের চোখে মুখে ঝলমল করে ওঠে, কোহেনের গানের প্রতি অত প্রেম আমার কোথায় যেনো এক নিমেষে বিলীন হয়ে যায় . সেই সময় জোর করেও কোহেনের গান শুনতে চায় না মন ; বরং ডেনভারের গিটারের মিষ্টি সুর ধীরে ধীরে দূর থেকে আমার মনের কাছে এসে পৌঁছয় . .... Rocky Mountain high কিংবা country roads, sunshine on my shoulder অথবা Anne's song . এতো মিষ্টি গিটার আর কে বাজায় বলুন তো ?  কোনো কোনোদিন বারান্দার মুখোমুখি যে নীমগাছ টা রয়েছে তাতে বুলবুলি পাখি রা ধীরে ধীরে আসর জমায় . অমন মিঠে স্বাদের মুহূর্ত আর হয় না . আমার ছোট্টো কন্যা মাঝে মাঝে সেই সময় চুপ করে আমার কোলে বসে বসে আমার সঙ্গে বাঁশি শোনে . মন কোনো শব্দ চায় না তখন - শুধু সুর - বাঁশি বড়ো ভালো লাগে সেই সময় - পন্ডিত হরিপ্রসাদের রাগ ভৈরব কিংবা ললিত - সঙ্গী তখন শুধু কাঁচের পেয়ালায় এক কাপ সুগন্ধি লিকার চা .  ক্রমশ:
    কালবেলার রৌদ্রছায়া  - ২৮  - Anjan Banerjee | ( ২৮ ) মেঘলা দিন। সকাল থেকেই নিবিড় ছায়ায় ঢাকা। অনুমিতের মনটা যেন গাছতলায় পড়ে থাকা শুকনো পাতার মতো এলোমেলো উড়ে বেড়াচ্ছে। পবন, সিরাজ, শৌর্যরা নিশ্চয়ই এমন ছায়া মাখা দিনে মস্তি নিতে বসে গেছে কোন একটা ঠেকে বোতল খুলে। অনুমিত ভাবল ওদের কাউকে একটা ফোন করে। কিন্তু তেমন চাড় বোধ করল না। মনটা কেমন মেঘলা মেঘলা লাগছে। বাবাও অনেকদিন কাজ টাজের ব্যাপারে কিছু বলছে না। বোধহয় নতুন গভর্নমেন্টকে বুঝে নিতে চাইছে একটু। পলিটিক্সের ছানবিন করতে ব্যস্ত। বাড়িতে থাকতে ভাল লাগছে না। কারও একজনের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। না না পার্ক স্ট্রিটের কোন আলো আঁধারি বারে মদের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে নয়। মেঘলা আকাশের নীচে কোন নির্জন একটা গাছতলায় দাঁড়িয়ে একজনের সঙ্গে কিছু কথা বলা। অনুমিত ভাবল, কি সব ক্যালাস ন্যাকা ন্যাকা চিন্তা করছে সে। কোন মানেই হয় না। তবে বাড়িতে থাকা গেল না। ভাবল, বেরিয়ে পড়া যাক। কাউকে না কাউকে পেয়ে যাবে। বেলা তিনটে বাজে। মেঘলা দিনে লেকের উল্টোদিকে সাদার্ন এভিনিউ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবল কার কাছে যাওয়া যায়। এই ভরা দুপুরে বন্ধুরা এখন সকলেই কোন না কোন কাজে ব্যস্ত। আর যে কোন কাজে নেই সে মস্তিতে আছে নিশ্চয়ই। ওসব ভাবতেই ভাল লাগছে না অনুমিতের। ভাবতে ভাবতে হাঁটতে লাগল রাস্তায় অন্য কারও সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে ভাল হয়। লেকের ওদিকেই তো ওদের বাড়ি। হাঁটতে হাঁটতে ওদের বাড়ির কাছে গেলে কেমন হয়। বাবা তাকে সঙ্গে নিয়ে একদিন হাজির হয়ে গিয়েছিল ওদের বাড়ি। কী হ্যারাসমেন্ট... ওঃ। এখান থেকে বেশি দূর তো নয়। ওই তো ওই ডানদিকে টার্ন নিয়ে খানিকটা গেলে তিনতলা বাড়িটা। বাড়ির কালারটা কী যেন, ঠিক খেয়াল নেই। একদিনই তো গেছে। অত কি আর মনে রাখা যায় নাকি। ওরকম একটা সিচুয়েশান... সঙ্গে জাস্টিস অনিন্দ্য বসু। কিন্তু এখন যাওয়াটা কি ঠিক হবে বাড়িটার কাছে। কেউ যদি দেখে ফেলে কী মনে করবে। এমনিতেই তো তার অনেক বদনাম। অনুমিত ধীর গতিতেই হাঁটছিল। তার গতি আরও শ্লথ হয়ে এল। মেঘলা বাতাস পাক খাচ্ছে লেকের মধ্যে। তার মনে হল, এমনও তো হতে পারে তাকে হঠাৎ উল্টোদিক দিয়ে আসতে দেখা গেল। আসতেই পারে। এটা তো তার পাড়া বলা যায়। সাদার্ন এভিনিউ ধরে লেকের মোড়ের দিকে হেঁটে আসাটা খুব অসম্ভব কিছু না। কিন্তু এই অসময়ে সে এখান দিয়ে যাবেই বা কেন। তবু এরকম কিছু তো ঘটতেই পারে। বলা তো যায় না। কিন্তু যদি ঘটেই তাহলে সে কী করবে। অনুমিত কিছুই ভেবে রাখেনি। আগে যা বলত তা আর এখন বলা যাবে না। এত সব ভেবে লাভ কী, অনুমিত ভাবল। সে চাইলেই কি এই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার দেখা পেয়ে যাবে নাকি। এরকম কখনও হয় না। কিন্তু হল। কখন কোথায় কিভাবে যে কারও ইচ্ছা পূরণ হয়ে যায় কেউ বলতে পারে না। অনুমিত আচমকা দেখল প্রায় তিরিশ মিটার দূরে ভেসে উঠল গোলাপি শার্ট আর কালো প্যান্ট পরা একটা ফর্সা মতো মেয়ে। কাঁধে একটা ঝোলা। মাথা নীচু করে কী ভাবতে ভাবতে উল্টোদিক থেকে এদিকে হেঁটে আসছে। অনুমিতের বুকের রক্ত দোল খেয়ে গেল এক লহমায়। তার নিজের কাছে নিজেকে অচেনা লাগল। তার মনে হল দেখা না পেলেই ভাল হত। কী যে বলবে ওকে সেটাই তো ঠিক করতে পারেনি এখনও। অনুমিত দাঁড়িয়ে পড়ল। অদ্ভুত ব্যাপার। তার মনে হল পিছন ফিরে হাঁটতে থাকি। তারপর ভাবল, দূর... এরকম করতে যাবে কেন, পাগল নাকি। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই মনোমিতা দশ মিটারের মধ্যে এসে পড়ল এবং সামনে অনুমিতকে দেখতে পেল। কোন অল্প পরিচিত কাউকে দেখতে পেলে কেউ যেমন ভাবে তাকিয়ে থাকে মনোমিতা তেমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে অনুমিতের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। দুজনে সামনাসামনি এসে গেল। মনোমিতা সহজ স্বাভাবিক স্বরে বলল, ' আপনি এখানে ? 'অনুমিত ঠিক কী বলা উচিৎ ভেবে না পেয়ে বলল, ' ওদিকে যাচ্ছি একটু ... কাজ আছে... ' ----- ' ও। আমার বাড়ি তো ওদিকে... 'অনুমিত বলে ফেলল, ' হ্যাঁ জানি... ' মনোমিতা অবাক হয়ে বলল, ' তাই ? 'অনুমিত দ্রুত সামলে নিল, ' মানে, গেস করে নিলাম। ওদিক থেকে আসছেন যখন... '----- ' ও আচ্ছা ... ঠিক আছে... 'বলে মনোমিতা এগোবার জন্য পা বাড়াল। অনুমিতের স্বভাব চরিত্র গত মাস দুয়েকে ভালোরকম জানা হয়ে গেছে তার। জায়গাটায় লোকজন নেই বললেই চলে। বেশিক্ষণ দাঁড়ানোটা নিরাপদ না। এসব লোককে কিছু বিশ্বাস নেই। নিশ্চয়ই বাবার ভয়ে এখন একটু মিইয়ে আছে। কিন্তু আবার বদমায়েসি শুরু করতে কতক্ষণ। এরা কখনও বদলায় না। এর মধ্যেও তো একদিন... যাকগে... সে অনুমিতের পাশ কাটিয়ে সামনে পা বাড়াতে অনুৃমিত বলল, ' দেখলাম... 'মনোমিতা ভদ্রতাবশত দাঁড়িয়ে গেল। ----- ' কী ? '----- ' ফেসবুকে আপনার রিলটা দেখলাম। সি জে পি -র ক্যাম্পেনিংয়ের ব্যাপারে... খুব গাটসি স্পিরিটেড প্রেজেন্টেশান হয়েছে... আই লাইকড ইট... ' মনোমিতার একটা স্বস্তির শ্বাস পড়ল। বলল, ' দিল্লী গিয়েছিলাম, যন্তর মন্তরের প্রোগ্রামে। কাল ফিরেছি। আবার যাবার কথা আছে নেক্সট উইকে যদি ক্যাম্পেনটা কন্টিনিউড হয় ... ' মনোমিতার মুখে যেন একটা অদ্ভুত আলো এসে পড়ল। অনুমিত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মনোমিতার কেমন একটা অস্বস্তি হতে লাগল। জায়গাটায় লোকজন কম। সে বলল, ' আচ্ছা... আসি তা'লে। আন্টিকে বলবেন আমার কথা। আসি ... ' কিন্তু মনোমিতা পা বাড়াবার আগেই অনুমিত বলল, ' ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, একটা কথা বলব ? 'মনোমিতার মনে এক ফালি উদ্বেগ জমা হল। কিন্তু কোন উপায় নেই। বলল, ' হ্যাঁ, বলুন না... ' ----- ' আমার একটা রিকোয়েস্ট আছে। আগে যেগুলো হয়েছে সেগুলো ভুলে যান, আর ইয়ে... 'অন্যদিকে তাকিয়ে ঝট করে বলল, ' ফরগিভ মি। জাস্ট ফরগেট অ্যান্ড ফরগিভ... ' মনোমিতা বেশ ফাঁপরে পড়ে গেল। ভাবল, এ তো বেশ ঝামেলায় পড়া গেল। এই ধরনের লোকজনকে একেবারেই বিশ্বাস করা যায় না। নতুন কোন মতলব আঁটছে কে জানে। অবশ্য, তেমন উদ্ভাবনী দক্ষতা এর আছে বলে মনে হয় না। ভাবল, এরা বেসিক্যালি ডাল হেডেড হয়। সে আর কী বলবে, মৃদুস্বরে দায়সারা ভঙ্গীতে বলল, ' ঠিক আছে ঠিক আছে। আসলাম... 'আসলাম বলল বটে কিন্তু আসা গেল না। অনুমিত তাড়াতাড়ি বলল, ' আর একটা কথা ছিল... ' ----- ' হুঁ... বলুন... ', মনোমিতা বেশ বিড়ম্বিত বোধ করছে। অনুমিত এর পর যেটা বলল সেটা মনোমিতার অনুমানের বাইরে ছিল। অনুমিত কিছুটা লাজুক মুখে বলল, ' কক্রোচের ব্যাপারটা ডিটেলে জানতে চাই। এখন যেটা হচ্ছে... মিস্টার ওয়াংচুকের ইস্যুটাও বুঝতে চাই ... 'মনোমিতা অনুমিতের মুখে এসব কথা শুনলেও মোটেই আবেগে গলে গেল না। সে বলল, ' সোশ্যাল মিডিয়ায় তো প্রচুর এক্সপোজার হচ্ছে। ওখানে সব পাবেন... '----- ' হ্যাঁ কিছুটা দেখেছি। আপনারা যারা ডায়রেক্টলি ইনভলভড আছেন তাদের কাছে শুনতে চাই। আমি এসব নিয়ে ভাবিনি আগে... ' ----- ' আচ্ছা ঠিক আছে। শিঞ্জিনী ম্যাডামকে বলবেন। যাব একদিন। ওখানেই ডিসকাস করব... আচ্ছা আসি এখন। লেট হয়ে যাচ্ছে... ' ----- ' ইয়েস... অফ কোর্স। আসুন আসুন। ওহ্ ইয়েস... আর একটা লাস্ট কথা... আমি দিল্লী যেতে চাই প্রোগ্রামটা জয়েন করতে। আপনি আবার কবে যাবেন ? ' ----- ' আমি ডেট ফিক্স করিনি এখনও। আপনি যে কোনদিন যেতে পারেন। যে কেউ যেতে পারে যন্তর মন্তরে। এখন সোনম স্যার কেমন থাকেন তার ওপর ডিপেন্ড করছে... ' কথাটা অনুমিতের পছন্দ হল কিনা ঠিক বোঝা গেল না। সে বলল, ' হুঁ... তা ঠিক। দেখি কী করা যায়... ওখানে হয়ত দেখা হবে... ' মনোমিতা আর দাঁড়াল না। হাঁটতে শুরু করল জোর পায়ে। ( ক্রমশ ) ********************************************
    দেওয়া-নেওয়া  - Srimallar | মন যদি কাল শুকনো স্রোতে আরাম নামায়, কী করবে? হয়তো তখন ঘোরের মধ্যে নিজের ভেতর খুঁজবে প্রেম!  প্রশংসাশোক বাসলে ভালো, ঠোঁটের কাছে অন্তরাল... বাতাস তোমার মাঙ্গলিক আর জয়ের ঊর্ধ্বে সাম্য লাল!  আহত সাত ঘোড়ার প্রতি তোমার মায়ের বিতৃষ্ণায়—ঘাসের রঙে ঘটছে বদল, নতুনশাসক ব্যবস্থায়...  ছন্দে তুমি মন রাখোনি, অগত্যা কাল কী করবে? তোমায় দিচ্ছি দ্বন্দ্ব সমাস। আমাকে দাও সান্ধ্যমেঘ...
  • ভাট...
    commentManali Moulik | আহা, আটকে তো রাখা যাবে।
    commentক‍্যালিপসো | তাতে কি লাভ? মায়ায় ভুলিয়্ তো আর সত‍্যিকীরের ভালোবাসা হয় না। মোটামুটি একই গল্প সালিম সিনাই এরও - যখন জঙ্গলের মধ্যে আস্তে আস্তে তিন সৈনিক তিন সুন্দরীর সঙ্গে থাকতে থাকতে হঠাৎ একদিন দেখে য ট্রান্সপারেন্ট হয়ে যাচ্ছে
    commentহেঁয়ালি | নোলানের ছবির ক্যারিয়ার গ্রাফ উত্তরোত্তর খারাপ হয়েছে। এটা দেখার কোনো আগ্রহই নেই।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত