এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানুষদের নিয়ে কথা কে বলবে? - সুমন সেনগুপ্ত | অলংকরণ: রমিতদ্যা টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রাক্তন মুখ্য সম্পাদক রাজাগোপালের বহুদিনের পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণ হয়নি, পুলিশ যে তথ্য যাচাই করে, সেই তথ্য যাচাইতে জানা গেছে যে তাঁর নাম যেহেতু ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না, তাই তিনি ভারতীয় কি না, তার স্বপক্ষে তাঁরা কোনও প্রমাণ নাকি দাখিল করতে পারেনি, তাই তাঁরা বিরূপ রিপোর্ট দিয়েছে। যা বোঝা যাচ্ছে দেশের অন্যতম বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং সম্পাদক রাজাগোপালের নাম গত ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় না থাকার ফলে, তাঁর পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণ হবে কি না, তা প্রশ্নের মুখে।এই বিষয়ে তাঁর নিজস্ব একটি বয়ান সমাজমাধ্যমে ঘুরছে। সেই বক্তব্যের বেশ কিছুটা অনুবাদ করে পড়া প্রয়োজন। আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত তৃণমূলের অপশাসন গিয়ে বিজেপির শাসন ব্যবস্থা আসাতে উল্লসিত, কিন্তু সেই ভোটে কি সত্যিই মানুষের রায় প্রতিফলিত হয়েছে, এই প্রশ্নও টুকটাক উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইভিএম পুড়ে যাওয়ার ঘটনা, সেই প্রশ্নে আরো ঘৃতাহুতি দিয়েছে। তিনি লিখেছেন - “এই বছরের মার্চ মাসে, কলকাতার বালিগঞ্জ নির্বাচনী এলাকার ভোটার তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দেওয়া হয়। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে, ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়ায় ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আমার বা আমার প্রয়াত বাবার কারও নামই খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমার বাবা ছিলেন একজন গান্ধীবাদী ব্যক্তিত্ব, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং কেরালার ‘গান্ধী স্মারক নিধি’র প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক। তিনি ২০১৬ সালে প্রয়াত হন। তাঁর মতো একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল ভোটারের নাম কীভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে, তা আমার বোধগম্য নয়।পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৭ লক্ষ বাসিন্দার মতোই, তথাকথিত ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’র (Logical Discrepancies) কারণে আমার নামও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আমার ম্যাট্রিকুলেশন বা মাধ্যমিক পরীক্ষার নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি; বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলোর একটিতে আমার আপিলটি বিচারাধীন রয়েছে। এর ফলে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে আমি ভোট দিতে পারিনি।আরও হতাশাজনক হলো আমার পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণের আবেদনের বিষয়টি। যদিও ১৯ মার্চ, ২০২৬-এ আমি বায়োমেট্রিক সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিলাম, তবুও পুলিশ ভেরিফিকেশন বা যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়নি কারণ ভোটার তালিকায় আমার নাম আর নেই। বেশ কিছু বিকল্প নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও আমাকে জানানো হয়েছে যে সেগুলো অপর্যাপ্ত। বস্তুত, আজ (২৭ জুন, ২০২৬) পাসপোর্ট নবায়নের জন্য বায়োমেট্রিক দেওয়ার পর ১০০ দিন অতিক্রান্ত হলো। গত সপ্তাহে পাসপোর্ট প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে কলকাতা পুলিশ একটি ‘প্রতিকূল প্রতিবেদন (adverse report) পাঠিয়েছে। আমাকে অবিলম্বে কলকাতার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে (Regional Passport Office) হাজির হতে বলা হয়েছে; কিন্তু আমি যখন সাক্ষাতের জন্য সময় (অ্যাপয়েন্টমেন্ট) চাইলাম—যা ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা কঠিন—তখন আমাকে ১৭ জুলাই, ২০২৬-এর তারিখ দেওয়া হলো।এরই মধ্যে, ক্যালিফোর্নিয়ায় কর্মরত সাংবাদিক আমাদের মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হলো সান ফ্রান্সিসকোতে, ১৭ এপ্রিল। বলাই বাহুল্য, বৈধ দশ-বছরের মার্কিন ভিসা থাকা সত্ত্বেও, একটি সচল পাসপোর্ট ছাড়া সেই বিয়েতে আমার পক্ষে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব ছিল।বাস্তব বিচারে, আমি এখন এক ধরণের নাগরিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি—যদিও সরকার সম্প্রতি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে পাসপোর্ট নাগরিকত্বের কোনো প্রমাণ নয়। আমার সারাদিনের সময়ের বড় একটা অংশ এখন ব্যয় হচ্ছে পারিবারিক নথিপত্র পুনরুদ্ধার এবং কয়েক দশক আগের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করার প্রচেষ্টায়... আমার দিন শুরু হয় ভোটাধিকার সংক্রান্ত আবেদনের বর্তমান অবস্থা এবং পাসপোর্টের আবেদনের গতিবিধি (ট্র্যাকার) যাচাই করার মধ্য দিয়ে। এরপর আমি সেই কলেজে চিঠি লিখি যেখানে আমার মা ১৯৬৫ সালে শিক্ষকতা করেছিলেন এবং সেই স্কুলে যেখান থেকে তিনি ১৯৫৯ সালে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন; উদ্দেশ্য হলো এমন কোনো নথিপত্র জোগাড় করা যা তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়। স্কুলটি এ ব্যাপারে বেশ সহায়তা করেছে, কিন্তু কলেজটি তা করেনি। একইভাবে, আমি কেরালার মদ্যপান-বিরোধী প্রচারণায় যুক্ত কর্মীদের সাথে কথা বলি—একটি অনলাইন গ্রুপে ঘটনাক্রমে এক কর্মীর নাম পাওয়ার পর আমি যে তালিকা তৈরি করেছিলাম, তা ধরেই এগোচ্ছি। আমি তাঁদের কাছে এমন কোনো সংবাদপত্রের কাটিং বা ছবি চাইছি যাতে অবৈধ মদের দোকান ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আমার বাবার প্রচারণার প্রমাণ পাওয়া যায়।আমার এই সব প্রচেষ্টায় কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি সহায়তা করেছেন। তবে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিক সংগঠন বা গিল্ড (যার আমি সদস্য নই) আমার এই পরিস্থিতির প্রতি কোনো আগ্রহ দেখিয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই। একজন প্রবীণ সাংবাদিক আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই ব্যতিক্রমী নয়; কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে নিত্যদিনের বাস্তবতা হিসেবে এই ‘প্রত্যাখ্যান’ এর মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমি সেই যুক্তি মেনে নিয়েছি।নিজেকে ভুক্তভোগী বা ‘ভিক্টিম’ হিসেবে তুলে ধরা আমার উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না। বরং আমি একটি বৃহত্তর বিষয়কে সামনে আনতে চেয়েছি: সাংবাদিকতায় পেশাগত জীবন কাটানো এবং মোটামুটি পরিচিত একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা কোনো ব্যক্তি যদি এমন সব সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন, তবে সমাজের প্রান্তিক মানুষগুলোকে কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা সহজেই অনুমেয়। আমি কি কোনো সংবাদপত্রের দ্বারস্থ হয়েছি? না, কারণ আমি চাই না বিষয়টি কেবল আমাকে কেন্দ্র করেই কোনো ইস্যু হয়ে উঠুক। সম্পাদক ও সাংবাদিকরা কি আমার এই সমস্যার কথা জানেন? অবশ্যই, তাঁদের অনেকেই জানেন। আর যদি না-ই জানেন, তবে তাঁদের এই পেশায় থাকা উচিত নয়—আপনারও কি তাই মনে হয় না?তবুও, এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পূর্ণ নীরবতা আমার সেই সন্দেহকেই নিশ্চিত করেছে—যা এখন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে আরও জোরালো হয়েছে—যে তথাকথিত মূলধারার সাংবাদিকতার সাথে আমার জীবনের খুব একটা সম্পর্ক নেই। আমি এখন আর কোনো সংবাদপত্র ‘পড়ি’ না। কোনো কোনোটির ওপর হয়তো চোখ বুলিয়ে নিই, কিন্তু কদাচিৎ এমন কিছু খুঁজে পাই যা আমার আগ্রহ জাগিয়ে তোলে।’’রাজাগোপালের এই বয়ানটি হয়ত, অনেকেই পড়েছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও নির্লিপ্ত থেকেছেন, ঠিক যেমনটা ভোটের আগে, কিংবা আসামের এনআরসি’র সময়ে ছিলেন। তখন হয়ত বেশীরভাগ মানুষ ভেবেছিলেন, এই সমস্যা শুধু মুসলমানদের বা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের নিয়ে হবে, তাই তখন খুব বেশী শোরগোল করেননি। সেই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোও খুব বেশী সোচ্চার হয়নি, তারা সবাই ব্যস্ত ছিল নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারে। তৃণমূল কংগ্রেসের ধারণা ছিল, যে ঐ ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে বাদ গেলেও মানুষের সমর্থন তাঁদের দিকে থাকবে। সেই জন্যেই তাঁদের শ্লোগান ছিল, ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা’। অথচ তাঁদের জনভিত্তি যে কমছিল, তা তাঁরা এঁচে উঠতে পারেনি। ওদিকে বামেদের একাংশ, বিশেষ করে সিপিআইএম ভেবেছিল এই প্রক্রিয়াতে তৃণমূলের ক্ষতি হবে, সুতরাং খুব বেশী হইচই না করলেও চলবে, তাই তাঁরা দায়সারা ভাবে বিরোধিতা করেছিল। এমনকি আইএসএফের পক্ষ থেকেও নৌশাদ সিদ্দিকি’র একটা বক্তব্য এসেছিল, ‘কোনও নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা নেই মুসলমানদের বেনাগরিক করার, প্রয়োজনে গোরের মাটি এনে প্রমাণ দেওয়া যাবে তাঁরা এই দেশের বাসিন্দা’।যদি ঘটনা পরম্পরা পরপর সাজানো যায়, তাহলে দেখা যাবে, প্রাথমিক যে খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়, সেখানে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ যায়, তার মধ্যে, মৃত, স্থানান্তরিত এবং অন্য ইনিউমারেশন ফর্ম জমা না দেওয়া ব্যক্তিদের নাম ছিল। যদিও সেই তালিকা নিয়েও অনেক প্রশ্ন ছিল তবুও অনেকে এই বিষয়টা মেনে নিয়েছিলেন। এরপর নির্বাচন কমিশন আসরে নামে তাঁদের ব্রহ্মাস্ত্র নিয়ে, নামের বানান, বাবার নাম বা মায়ের নাম বা পরিবারের অন্য কোনও ব্যক্তির নাম যদি ২০০২ সালের তালিকায় না থাকে, তাঁদের শুনানিতে ডাকা হয়। বলা হয়, এই ব্যক্তিদের ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ আছে, এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁদের প্রমাণ করতে হবে, তাঁরা এই দেশের নাগরিক এবং ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে তবেই তাঁরা তাঁদের নাম তুলতে পারবেন।যদি খেয়াল করা যায়, এই শুনানিতে উপস্থিত হতে বলা হয়, সেই সংখ্যাটা ছিল প্রায় ১.৫ কোটি। বিভিন্ন শুনানি কেন্দ্রে তখন যাঁরা উপস্থিত হচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রাদায়ের মানুষ ছিলেন। বৃদ্ধ থেকে আশীতিপর অসুস্থ মানুষজন ও ছিলেন। রাজ্যের প্রথম সারির প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিন এই হয়রানির ছবি প্রথম পাতায় থাকলেও, একমাত্র গণশক্তি পত্রিকা প্রথম ৬ দিন সম্পূর্ণ নীরব ছিল। তাঁরা একটি কথাও বলেনি, বা একটি ছবিও প্রকাশ করেনি। শুধু তাই নয়, নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে চুপ থেকেছে। ততদিনে বিষয়টা আদালতে গেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি চলছে। এই প্রক্রিয়া আদৌ সাংবিধানিক কি না, তা নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠে গেছে। এই হয়রানি নিয়েও কথা হয়েছে, কিন্তু প্রধান বিচারপতি বারংবার বলে গেছেন, কোনওভাবেই এই প্রক্রিয়া বন্ধ করা যাবে না। তিনি মেনে নিয়েছেন মানুষের হয়রানি হচ্ছে, তার জন্য তিনি বেশ কিছু পন্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেন, কিন্তু নির্বাচন কমিশন আদৌ কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব পরীক্ষা করতে পারে কি না সেই রায় তিনি স্থগিত রাখেন। অন্য আরো একজন যে বিচারপতি এই মামলা শুনছিলেন, ঘটনাচক্রে তিনি বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও এবং বাঙালির নামের পদবী সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী স্পষ্ট করলেও, এই ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতি যে একেবারেই অযৌক্তিক তা স্পষ্ট করে বলেননি।ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছে চূড়ান্ত তালিকা থেকে, যাঁরা এবারের বাংলার নির্বাচনে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হল, প্রধান বিচারপতি এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেছেন, এইবার ভোট দিতে না পারলেও পরের বার দিতে পারবেন এই মানুষেরা। সঙ্গে আরো বলেছেন, যে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে নাগরিকত্বের কোনও যোগ নেই। এই ২৭ লক্ষ মানুষকে বলা হয়েছে ট্রাইবুনালে আবেদন করতে। ততদিনে কমিশন নির্বাচন ঘোষণা করে দিয়েছে। দেখা গেছে প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষ ঐ ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন। তারপরে নির্বাচন হয়েছে এবং বিজেপি ২০৫টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে।তারপরে আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙেছে। যে মানুষটি নিজে একটা রাজনৈতিক দল তৈরি করেছিলেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল ধরে রাখতে পারেননি। কিন্তু সেইসব বাদ দেওয়া গেলেও ঐ বাদ যাওয়া মানুষদের কথা সবাই ক্রমশ ভুলতে বসেছে। তারপরে নতুন করে আবার এই বিষয়টা এখন সামনে আসা শুরু হয়েছে। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বাদ যাওয়া মানুষদের আর কোনও সরকারি সুযোগ সুবিধা দেওয়া যাবে না। রেশন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সুবিধা কোনটাই যেন এই ভোটার তালিকা থেকে জোর করে বাদ দেওয়া মানুষেরা না পান, সেই নির্দেশিকা জারি হয়েছে। তার মধ্যে বিদেশ মন্ত্রক থেকে বলা হয়েছে, যে পাশপোর্ট থাকা মানেই সেই ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক তা প্রমাণিত হয় না। হয়ত এই আইন আগেও ছিল, কিন্তু এই সময়ে এই কথা বলা এবং টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদকের সাম্প্রতিক বার্তা দেখিয়ে দেয়, অলিখিত ভাবে হলেও দেশের সরকার ঐ ভোটার তালিকাকেই প্রামাণ্য নথি হিসেবে ধরছেন।হয়ত রাজাগোপাল তাঁর নিজের সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারবেন। তাঁর সেই সামাজিক সুবিধা আছে, কিন্তু যে অসংখ্য মানুষের নাম বাদ গেছে, তাঁদের কী হবে? তাঁদের সম্পর্কে সিপিআইএমএল এবং সিপিআইএম ছাড়া কংগ্রেসও এখনো কোনও জোরালো কিছু বলেনি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের সব ধরনের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। বাংলায় এই প্রক্রিয়াটি চলছে এবং এরপর হিন্দি-বলয়ের বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতেও এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এর ফলে কেবল মুসলিমরাই নয়, বরং বহু দরিদ্র পরিবারও মারাত্মক পরিণতির সম্মুখীন হচ্ছে। এটি কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘাত নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি শ্রেণি বা জাতিগত (বর্ণভিত্তিক) ইস্যু। তাছাড়া, রাষ্ট্র এবং তার মদতপুষ্ট শক্তিগুলো যখন সংখ্যালঘু ও সামাজিকভাবে বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করে, তখন তাকে আর কেবল 'সংঘাত' বলা চলে না। জেনে রাখুন, বৈষম্যের মাত্রা আরও এক ধাপ বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো ছাড়া ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানুষদের নিয়ে কথা কে বলবে? সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতও এই বিষয়ে এখনো অবধি কোনও কথা বলেনি। তাহলে এই মানুষদের কী হবে, এই বাদ যাওয়া মানুষেরা তবে কি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়েই থেকে যাবেন? জনগণনা থেকে তাঁরা বাদ পড়বেন না তো? একটা ‘অযৈক্তিক’ যুক্তি এত মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে, আর রাজনৈতিক দলগুলো কিচ্ছু করবে না?
    মধুবাতা ঋতায়তে - শারদা মণ্ডল | ছবি - Imagen 3ছাঁচনপুরের আত্মবিশ্বাসের কথাই যদি উঠলো তবে আর একটা আত্মবিশ্বাসের গল্প শোনাই। ঘটনাটা আমার ভৌগোলিক জীবনে অনেক দিক থেকেই খুব স্পেশাল। প্রথম ব্যাপার হচ্ছে সেই প্রথম আমি নিজের কলেজের সঙ্গে না গিয়ে অন্য কলেজের ছাত্রীদের সঙ্গে ফিল্ডে গিয়েছিলাম ফিল্ড এক্সপার্ট হয়ে। দ্বিতীয়ত এই যাওয়াটার সঙ্গে আমার শৈশবের আশাপূরণের একটা যোগসূত্র ছিল। ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি। আমি আসলে নিবেদিতা ইস্কুলের ছাত্রী ছিলাম। সেই কবে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হলাম - সনটা ১৯৭৭। শুধু তো আমি নই, আমার বোন, আমার মা, আমার মেজ মাসি, আমার ছোট মাসি - সব্বাই নিবেদিতা ইস্কুলে পড়েছিল। আমাকে ধরে মাতৃকুলে তা সে চার প্রজন্মের সম্পর্ক। আমরা যখন ছাত্রী, সেই সময়ে ক্লাস নাইনে মেয়েদের ইস্কুল থেকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হত। অঙ্কের শিক্ষিকা ছিলেন শুক্লাদি। তাঁর স্বামী বিখ্যাত পর্বতারোহী প্রাণেশ চক্রবর্তী। তিনি নিয়ে যেতেন পুরুলিয়ার মাঠাবুরু ক্যাম্পে। আজও আন্তর্জাল জুড়ে তাঁর অজস্র কীর্তি, বহু রোমহর্ষক পর্বতাভিযানের রিপোর্ট ছড়িয়ে আছে নানান ওয়েবসাইটে। ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজনে তাঁর লেখা একটি বইয়েরও হদিশ পেয়েছিলাম - আড়াইশো পাতার বাংলা বই - হিমালয় ভ্রমণ গাইড - পাবলিশার মিত্র ঘোষ। পড়ার খুব ইচ্ছেও হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশে যা হয় - প্রেজেন্টলি আনঅ্যাভেলেবল। জীবনে সব আশা পূরণ হয়না। আমারও হলনা। আমি যখন নাইনে উঠলাম, কীজানি হয়ত প্রাণেশ স্যার কোন কঠিন অভিযানে বাইরে ছিলেন। তাই আমরা গেলাম শান্তিনিকেতনে। বন্ধুদের সঙ্গে সেই প্রথম বেরোনো, আনন্দ খুবই হয়েছিল - সালটা ১৯৮৫। কিন্তু ৮৭ সালে আমার দুবছরের ছোট বোন মাঠা ক্যাম্পে গেলো। তাঁবুতে থাকল, খড়ের ওপর বাড়ির কম্বল পেতে। ক্লান্ত শরীরে একদিন ফিরে দেখল ওর বিছানায় ধেড়ে কুকুর শুয়ে আছে। তাকে বার করে দিয়ে বোন শুয়ে পড়ল। একটা মাত্র কলাই করা মগ - তাতেই চা খাওয়া, আবার তাতেই প্রাতকৃত্যের পর জল শৌচ। আসলে পাহাড়ে চড়তে গেলে ন্যূনতম লাগেজ দরকার - বাড়তি আরাম চলেনা - বোন সেটাই শিখে এলো। তার ওপরে দড়ি ধরে কেমন করে উঠলো, নামতে গিয়ে কেমন দড়িতে ঝুলে গেলো, বড় বড় চোখ নাচিয়ে তার বর্ণনা দিতে লাগলো ঘুরে ঘুরে। তার বাক্য - ঝর্নার গতি যত প্রবল হোল, তার চেয়ে দুর্বার গতিতে বেড়ে চলল আমার আফশোষ। শ্রুতির স্মৃতি আর আশার কুহক, দুইয়ে মিলে কুয়াশা ঘেরা মাঠাবুরু আমাকে কেবলই তার দিকে টেনে নিয়ে গেলো মনে মনে। সশরীরে যেতে না পারলেও, একবার প্রাণেশ স্যার ইস্কুলে পর্দা টাঙিয়ে পাহাড়ে চড়ার স্লাইড দেখিয়েছিলেন - সেদিন দেখেছিলাম। জল নেই, ইঁট সাজিয়ে তার মধ্যে শুকনো পাতা ভরে আগুন জ্বালিয়ে কেমন করে চট জলদি ডিম সেদ্ধ করা যায়। জল নেই তো কী! ডিমগুলো বালি কাদা ধুলো মাখিয়ে আগুনে ফেলে দিলেই হোল। সেই কবেকার কথা, স্মৃতি এখনও কেমন জ্বলজ্বলে। আসলে আমি এমন পাহাড় পাগল কখনোই হতাম না। দোষ আমার নয়। দুজন ভূগোলের দিদি ছিলেন, কাকলিদি আর মানসীদি। দুজনে মিলে ফাইভ থেকে টেন - ছ বছর ধরে হিমালয়, আল্পস, রকি, আন্দিজ করে করে আমার গোলা মাথা একেবারে তালগোল পাকিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর আর কী! কেরিয়ার, সংসার - নানা কাজের চাপে আর সময়ের খাপে মানাতে মানাতে মাঠাবুরুতে রক ক্লাইম্বিং ক্যাম্প আমার স্বপন থেকে অবচেতনে স্থান নিল। জীবনে কিছু প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি, গড়ন ভাঙনের গল্প না থাকলে জমেনা। ধীরে ধীরে চাকরি জীবন চলে গেলো কুড়ি কুড়ি বছরের পার, উঁহু, কুড়ি তো নয় পঁচিশ। মা বাবা গত হবার পর, আবার আমি শৈশবের স্বাদ পেতে ইস্কুলের দিকে ফিরলাম। প্রাক্তনী সভার সদস্য হলাম। নিবেদিতা হেরিটেজ মিউজিয়ামে যাতায়াত শুরু করলাম। আর সেখানেই ঘটে গেলো এক আশ্চর্য ঘটনা। অশেষপ্রাণা মাতাজী আমাকে বিবেকানন্দ বিদ্যাভবনের তিরিশজন ছাত্রীকে নিয়ে পুরুলিয়ার মাঠাবুরু ক্যাম্পে যাবার অনুরোধ করলেন। চমকে উঠলাম - এও কি সম্ভব? ১৯৮৫ সালে যা নিয়ে আফশোষ ছিল, সেই সুযোগ কি তবে চার দশক পরে মানে ২০২৫ এ সত্যি সত্যি এলো? সুযোগ ছাড়ার কোন প্রশ্নই ছিলনা। আমাদের নিবেদিতা হেরিটেজ মিউজিয়ামের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে ডানা মেলেছে একটি প্রতিষ্ঠান যা হয়তো একদিন মহীরুহ হয়ে উঠবে - নীহার - নিবেদিতা ইন্সটিটিউট অফ হিউম্যান অ্যাডভান্সড রিসার্চ। নীহার একটি প্রকল্প শুরু করেছে - লীডারশিপ কোর্স। আমাদের মেয়েগুলির মধ্যে কাদের সঠিক নেত্রী হয়ে ওঠার দক্ষতা বা মানসিকতা আছে তাদেরকে চিনে নিয়ে সঠিক ভাবে পথ দেখানোই নীহারের এই লীডারশিপ কোর্সের কাজ। এই কোর্সের কতটা সম্ভাবনা আছে, তা খতিয়ে দেখার পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয়েছে বিবেকানন্দ বিদ্যাভবন কলেজে। একদিন আমার মাও ঐ কলেজ থেকেই পাশ করেছিলেন। এই কলেজের পঞ্চম অর্ধবর্ষের তিরিশজন মেয়ে এই কোর্সের প্রথম ছাত্রী। দস্তুরমতো ইন্টারভিউ করে এদের বেছে নেওয়া হয়েছে। এই কোর্সের অঙ্গ হিসেবে মাঠা পাহাড়ে ক্যাম্প হোল দুদিনের। সেই ক্যাম্পেই সঙ্গে চললাম আমি। হাওড়া স্টেশন থেকে রাতে আদ্রা চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার ধরে ভোরে নামলাম বরাভূম স্টেশনে। সেখান থেকে গাড়ি করে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যে। মাঠা পাহাড়ের পাদদেশে এই রিসর্টটির নাম হল পাতালঘর। মেয়েরা রইল তাঁবুতে। আধখানা চাঁদের মত চেনটানা তাঁবুর মধ্যে দুটি করে বিছানা পাতা। কলঘরের জায়গাটি পাশেই, একটুখানি হেঁটে যেতে হয়। আর আমরা দিদিমণিরা রইলাম তাঁবুর মুখোমুখি হবিট হাউসে। এগুলোও দেখতে আধখানা চাঁদেরই মত, তবে কিনা পাকা ঘর, লাগোয়া কলঘর। ঘরে যেটুকু না থাকলে নয়, ততটুকুই পরিকাঠামো রয়েছে। ঘরের চালে মাটির পরত, তার ওপরে ঘাসের চাষ করা হয়েছে। জনপ্রিয় পশ্চিমী শিশু সাহিত্যের কাল্পনিক চরিত্র এই হবিট, যারা মাটির তলায় গর্ত করে থাকে। বিশ্ব জুড়ে ন্যূনতম স্বাচ্ছন্দে গড়া পরিবেশ বান্ধব এই হবিট হাউসগুলি পর্যটনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ বহু মানুষই এখন প্রাচুর্য, বাহুল্য ছেড়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে সাধারণ ভাবে কয়েকটা দিন কাটাতে চায়। শুনলাম, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম হবিট হাউস এই পাতালঘর, বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে। দরকার মত কম বেশি তাঁবু খাটিয়ে দেওয়া হয়, আর হবিট হাউস আছে সাতটা। সেখানেও দুজন বা তিনজন করে আরামসেই থাকা যায়। রান্নাঘর আর খাবার জায়গা আলাদা। কাউন্টার থেকে নিজেকে খাবার নিয়ে আসতে হয়। পরিবেশনের বন্দোবস্ত নেই। পানীয় জল কোন ফিল্টার ছাড়া অবিশ্বাস্য ভাবে স্বাস্থ্যকর, সমস্যা একটাই ঐ জলের গুণে খুব খিদে পেয়ে যায়। যাই হোক চারপাশের বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ইত্যাদি দেখার সময় মিললোনা, কারণ ট্রেনিং শুরু হয়ে গেলো। মেয়েদের দেওয়া হোল পনের মিনিট সময়, যার মধ্যে যে যার তাঁবুতে ঢুকে, ব্যাগ রেখে, আর কিছু বন্দোবস্ত করে লাইনে দাঁড়াতে হবে। তবে জুতো থাকবে তাঁবুর বাইরে। কেবল রাতে জুতোজোড়া তাঁবুতে ঢুকিয়ে নিতে হবে। না না দুষ্টু মানুষের ভয় এখানে নেই, তবে কোন বন্য জন্তু ভালোবেসে যদি মুখে করে এক পাটি বা দুটো পাটিই নিয়ে যায়, তার দায় কর্তৃপক্ষের নয়। পাশে কলঘরে গিয়ে চোখেমুখে জল দিয়ে আসতেই পারে, তবে তাতে সময়ের ছাড় নেই, তাই অতটা ঝুঁকি না নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের মেয়েরা বুদ্ধিমতী, তারা ও পথ মাড়ালোনা। কিন্তু আমরা? মেয়েরা পনের মিনিট হলে তাদের ম্যামেরা কি পনের ঘন্টা সময় নিতে পারে? আমরাও ভুরু কুঁচকে তিরিশ মিনিটে মাঠে পৌঁছলাম। মাঠে ততক্ষণে খাটানো হয়েছে এক খাড়াই দড়ির জাল। নীচ থেকে প্রথমবার ওপরে তাকালে জ্যাকের বীনস্টক গাছে ওঠা মনে পড়ে যায় বটে। আমাদের মেয়েরা সারি দিয়ে দাঁড়িয়েছে একে একে সেই জাল বেয়ে আকাশের কাছে পাড়ি জমানোর জন্য। তাদের কারোর চোখে অভিযাত্রীর আহ্লাদ তো কারোর করুণ দৃষ্টিতে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচির আকুতি। দেখলাম পেল্লাই গাছেদের শরীর আর শক্ত শক্ত খুঁটির সঙ্গে বাঁধা ঐ জাল, দুপাশে দক্ষ ট্রেনারদের বজ্র মুঠি আর তীক্ষ্ণ নজরের আওতায় রয়েছে। পান থেকে চুন খসার জোটি নেই। দর্শক আমরা চারজন - বড় মাতাজী, ছোট মাতাজী, সঙ্গে বৈশাখী আর আমি দুই দিদিজী। বৈশাখীও আমার মতই আর একটি কলেজের ভূগোলের দিদিমণি। সেদিন মাঠা পাহাড়ের আকাশ বড় নীল, পাহাড় বড় সবুজ, কাঁচা হলুদ সর্ষে ফুলের মত রোদ বুঝি সবার কানেই বাঁশি বাজাচ্ছিল। একটা মিঠেকড়া ঠান্ডা বাতাস সোয়েটার চাদরের ভিতর দিয়ে খালি লুকোচুরি খেলছিল। বাতাসে বন তুলসীর ঝাঁজ - এমনি দিনে মানুষের মুখোশ খুলে মুখ বেরিয়ে পড়ে। পাকা চুলের পর্দা সরিয়ে মুখ বাড়ায় কিশোরী মন। ২০২৫ কে সরিয়ে রেখে এতদিন বাদে বেরিয়ে পড়ে ১৯৮৫। মাথার দুপাশে পুঁচু পুঁচু বেণী বেঁধে তাতে অপটু হাতে লাল ফিতে বাঁধা শারদা মেয়েদের লাইনে দাঁড়ায় জাল বাইবে বলে।হলদে রোদের মিশেল দেওয়া হলুদ রঙের মোটা আর শক্ত প্লাস্টিক দড়ির জাল। আমি প্রাণপণ চাইছিলাম সবটুকু শিখে নিতে, আসলে এমন সুযোগ আর কোনদিনও আসবে কিনা জানা নেই, তাই চাইছিলাম যা কিছু ঘটছে তার সব কিছু শুষে নিতে। তিনটি উপকরণ - হেলমেট, হারনেস আর ক্যারাবিনার। আমার মাথায় যখন লেডী ট্রেনার হেলমেট পরিয়ে দিলেন, আমার মনে মনে হাসি পেল। শিক্ষার্থীর পা পিছলে মাথা ছাতু হবার ভয় আছে ওঁদের। কিছু হয়ে গেলে জবাবদিহি করতে হবে যে। তবে নাঃ আমার একটুও ভয় করছেনা। চিরকালই পরীক্ষা সামনে এলে কেমন একটা উল্লাস হয় আমার। হেলমেটের পর হারনেস বাঁধা - মহিলা এতটাই কষে সেটি আমার কোমরে বাঁধলেন যে আমি একেবারে ককিয়ে উঠলাম। পেট - কোমরটি যে আর ১৯৮৫ র নেই, তার চারিদিকে তেল-ঘি-মাখন-চীজ - আরো কতকিছুর থাক থাক মেখলা। কোমর বন্ধনীটির একটি অংশ পাদুটোকে গোল গোল ফাঁসের মত আটকে রেখেছে। অর্থাৎ যদি কিছু ঐ পিছলানো টিছলানো (ভগবান না করুন) - তবে ওই ফাঁসে আটকে মোটামুটি পাখি হয়ে ডানা ঝাপটানো যাবে। তবে মেখলা - বন্ধনী যা কিছুই থাক, দড়ির জালের এপাশ ওপাশ টানা দড়িটি দুপাশের ট্রেনারদের হাতে বন্দী। ঐ দড়িটিই লাইফ লাইন - সেটা আবার আমার বন্ধনীটির সঙ্গে একটি মোক্ষম ক্লিপ দিয়ে আঁটা। আর এই ক্লিপটাই হল ক্যারাবিনার - যার ভরসায় আমি মেঘের দিকে মোর তনু - ক্যারাভান লয়ে পাড়ি দেব। আসলে ছাত্রীরা কেমন করে উঠছে, কী কী ভুল হচ্ছে, কোনভাবে ওঠাটা ঠিক, শিক্ষকরা কী নির্দেশ দিচ্ছেন, এগুলো আমি নিবিষ্ট মনে দেখছিলাম। কিন্তু দেখে শেখা এক, আর ঠেকে শেখা আরেক। দেখে শিখলাম যে, জালের দিকে মুখ করে দাঁড়াও, জালের ঠিক গ্রন্থিগুলোতে পা দিতে হবে, তা নইলে জোর পাবেনা। হাত দিয়ে জাল ধরবে, কিন্তু হাত থাকবে কাঁধের লেভেলের ওপরে - নইলে শরীরের ব্যালেন্স থাকেনা। এবারে উঠতে গিয়ে দেখি জাল থলথল, হাওয়া খলবল, পা টলটল, ঘাম গলগল, বুক ধকধক, হাঁটু ক্যাঁচকোচ, কাঁধ খিঁচমিচ - এমনতরো কত কী? কিন্তু নীচের ঢালু অংশটা পেরোনোর পর খাড়া অংশটায় যেতে যেতে ছন্দটা বুঝে গেলাম। একেবারে টিকটিকির মত - ডান হাত আর ডান হাঁটু তোলো, তারপর বাঁ হাত বাঁ হাটু ডানদিকের চেয়ে উঁচুতে তোল - কেল্লা ফতে। আবার উলটো দিকে একই নিয়মে নেমে এলাম কোন মতে। এদিকে হাঁফানো, ওদিকে আনন্দে লাফানো, সে আমার সসেমিরা অবস্থা। ট্রেন ধরার আগের দিন পর্যন্ত ধুঁকছিলাম - যেতে কী পারবো? এত বড় দায়িত্ব, নেওয়া কি উচিত হবে? এখন দেখছি, আমার শরীরে যত ব্যাথাবুথা সব উধাও। কতদিন পরে আমার আমিকে নিজের করে ফিরে পেলাম! সব চেয়ে বড় হল আমি পেরেছি - আমি পারি - পৃথিবীর যে কোন সমস্যা সামনে আসুক না - লড়কে লেঙ্গে মেরা খোয়াবিস্তান। মেয়েদের মোবাইল ফোন জমা দিয়ে দিতে হয়েছিল। আমরা টীচার বলে ছাড় ছিল। কিন্তু খানিকটা স্বেচ্ছাতেই দিনের বেশিরভাগ সময়ে ও জিনিসটিকে ত্যাগ দিয়েছিলাম। আর দিয়েছিলাম বলেই প্রতি মূহূর্তে ছবিছাপা দিয়ে আপডেট দেওয়া আর আপডেটেড হয়ে থাকার বালাই ছিলনা। প্রকৃতির কোলে সত্যি সত্যি শান্তি আর আরাম উপভোগ করছিলাম। শরীরে যতই পরিশ্রম হোক, এ হল “প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি”। একটা দিনে কত যে কাজ হল, আমরা নিজেরাই অবাক। এই ধরা যাক - দড়ির ব্রিজ পেরোনো। জিপ লাইনিঙের মত হারনেস ক্যারাবিনারের ভরসায় ঝুলে ঝুলে জলা পেরোনো - যার পোষাকী নাম - রিভার ক্রসিং। রাতে ঠান্ডা ঘন হয়ে আসে। অন্ধকারের হাত ধরে আকাশ মাটির সীমানা মুছে বন যেন কাছে আসে, হাওয়ার ঝোঁকে ফিসফিসিয়ে ও কী কিছু বলে যায়? শহরের মত লেট নাইটের সুযোগ এখানে নেই। ঘড়ি ধরে খেতে বসা, নিজেই কাউন্টার থেকে খাবার নিয়ে আসা, আবার খাওয়া শেষে থালা বাটি মেজে রাখা পরের দিনের ব্যবহারের জন্য। কোন দাও, লাও এর ব্যাপার নেই - “আপনা হাত জগন্নাথ, করবে ভাই বাজিমাৎ”। বিছানায় যাবার আগে অভ্যাস মত ডায়রি নিয়ে বসি। এই পাহাড়ে চড়ার ট্রেনিঙের সঙ্গে আমার জীবনে আর একটা জিনিস ঘটে গেছে। আসলে যে কলেজের সঙ্গে এসেছি সেটা তো আমার নিজের চেনা কলেজ নয়, তাই ছাত্রীদের ওপরে শিক্ষক হিসেবে সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছিলনা। যেটা ফিল্ডে খুব দরকার। তাই আমি প্রথম পরিচয়েই বলে নিয়েছিলাম যে যেহেতু আমি এককালের রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের ছাত্রী, তাই তোমাদের মত আমি এই ক্ল্যানেরই সন্তান। এটা বলেছিলাম যাতে ওরা আমাকে অ্যাকসেপ্ট করে নেয়। আসলে ওদের কাছে তো আমি বহিরাগত। তাই স্ট্র্যাটেজিক ইনসাইডার হয়ে ওঠার তাগিদে এই অস্ত্র প্রয়োগ করেছিলাম, আমার আর ছাত্রীদের মাঝখানের প্রাতিষ্ঠানিক ভয়ের আর অচেনার প্রাচীরটা যাতে ভেঙে যায়। দেখলাম এতে আশ্চর্য কাজ দিয়েছে। ওরা আমাকে আর ‘নজরদার’ বা নিয়ন্ত্রক ভাবছে না, বরং ভাবছে নিজেদেরই একজন। মাঠাবুরুতে দেখলাম ওরা আমাকে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর নয়, সিনিয়র দিদি ভেবে নিয়েছে। কাছে আসছে, টীচারদের কাছে যেকথা গোপন করতে হবে সেটারও সাহায্য চাইছে, তুমি তুমি করে কথা বলছে। এটা আমার কাছে একটা সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। আমার নিজের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মনের টান, তথ্য বিনিময় স্বাভাবিক ভাবেই অনেক বেশি। কিন্তু সেই সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ক্লাসরুম, যেখানে ক্ষমতার হায়ারারকি বা ধাপ আছে - শিক্ষক ওপরে, স্টুডেন্ট নিচে। ভূগোলের শিক্ষক হিসেবে আমি হয়তো এতদিন ফিল্ডে ‘কন্ট্রোল’ বা শাসনকেই সবচেয়ে জরুরি মনে করেছি। শাসনের দরকারও আছে। আজকাল যা দিন পড়েছে, ছেলেমেয়েরা প্রকৃতির কাছ থেকে কিছু শিখুক আর না শিখুক, পরিবার বা সমাজের কাছ থেকে একটা মোক্ষম কথা খুব ভালো করে শিখে যায়, যে প্রকৃতির কাছে গেলে মাদক নিয়ে নেশা করতে হয়। এই পিয়ার প্রেশার এতটাই যে যারা এর মধ্যে ছিলনা, তারাও ঢুকতে বাধ্য হয়। মুক্ত প্রকৃতি হয়ে ওঠে একধরণের লিমিনাল স্পেস' - বা ‘সীমান্তবর্তী মুক্ত অঞ্চল’ - যেখানে কেউ চেনেনা, যা খুশি করা যায় - এক ধরণের ছদ্ম স্বাধীনতার জায়গা। মিশনের এই ছাত্রীদের নিয়ে বিশেষ করে পাহাড় চড়া ক্যাম্পে এধরণের কোন আশংকা নেই। তাই ছাত্রীদের সঙ্গে শাসন নয় সখ্যতা - বেশ উপভোগ করছি। এইসব সময়ে মনে আরও আকাশ পাতাল সব চিন্তা আসে। আজকে শিখলাম দড়ির জাল বাওয়া, দড়িতে হাঁটা আর দড়িতে ঝুলে নদী পেরোনো। কোনো দুর্গম জায়গায় সার্ভে করতে গেলে অথবা কোন ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সময়ে এইসব স্কিল খুব কাজে লাগে। একটা সময়ে খুব ভাবতাম যে আমি আমার স্যার মনতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ রঞ্জন বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মত বা তাঁদের স্যার থর্নবারি, উলরিজ মরগ্যান বা ডেভিস, পেঙ্কের মত পাহাড় নদী চষে বেড়াতে পারিনি। নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারিনি। মনে খুব আফশোস হত। কিন্তু ধীরে ধীরে যতই ক্রিটিকাল বা তারও পরে পোস্ট মডার্ন ভূগোলের সংস্পর্শে এলাম তখন আবার ভাবনাটা খানিকটা বদলে গেল। অনুভব করলাম যে এবল বডিড মেল না হয়েও আমি আমার জীবনে এই পৃথিবীকে দেখেছি এক সংবেদনশীল নারীর চোখে। এটাই বা কম কী! আসলে উইলিয়াম মরিস ডেভিস, ওয়াল্টার পেঙ্ক, ডব্লিউ ডি থর্নবারি বা সি ডব্লিউ উলরিজদের মতো ভূবিজ্ঞানীরা—কিংবা আমাদের বাংলার শ্রদ্ধেয় মনতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ রঞ্জন বসু বা সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্যারেরা যে সময়ে ভূগোল চর্চা করেছেন, তখন বিষয়টার মূল ধারাটাই ছিল পজিটিভিসম (প্রত্যক্ষবাদ) এবং জিওমরফোলজি কেন্দ্রিক। তারও আগে উনিশ শতকে ভূগোল ছিল মূলত পুরুষালি অ্যাডভেঞ্চার এবং যেন একটা সাম্রাজ্য বিস্তারের হাতিয়ার। ধরে নেওয়া হতো, ভূগোল মানেই হলো একজন ‘এবল-বডিড মেল’ বা শারীরিকভাবে শক্তিশালী পুরুষ দুর্গম পাহাড়ে চড়বেন, নদী চষে বেড়াবেন, মানচিত্র আঁকবেন আর নতুন জায়গা ‘আবিষ্কার’ বা জয় করবেন। প্রকৃতি তখন যেন ছিল একটা জ্যামিতিক বস্তু। আর আমি যে আফশোষে ভুগছি, তা আসলে আমার ব্যক্তিগত খামতি নয়, শত বছরের তৈরি করা একটি পুরুষতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যার জন্য আমি নিজেই নিজেকে ‘অভিযাত্রী’ আইডেন্টিটি দিতে পারিনা, মানে কুণ্ঠাবোধ করি। হবিট হাউসের বাইরের আকাশ এখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। আকাশে চাঁদ নেই, তাই হাজার তারার আলো। সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। চলবে...
    রুশ টি সেট আর পেয়ারাতলায় মেম বৌমা - স্মৃতি ভদ্র | অলংকরণ: রমিতছায়া দোলানো দুপুর হোক কিংবা নিহার জড়ানো সন্ধ্যা, বড়ঘরের লালবারান্দা আসলে কখনই বিরান হতো না। সাংসারিক কাজের অবসরে খানিক জিরিয়ে নেওয়ার অজুহাতে অথবা উনুনপাড়ের নুনতেলের গন্ধ গা থেকে মুছে নিজেকে একটু পরিপাটি করে তোলার ইচ্ছা---সেই লাল বারান্দাই হয়ে উঠতো সকলের একমাত্র গন্তব্য। নেহাতই লালমেঝের একহারা বারান্দা। তাতে ঐশ্বর্য বলতে দিনের নানাসময়ে নানারকম ছায়ার আল্পনা ছাড়া আর কীইবা ছিল। কখনও বাইরবাড়ির দেবদারু বাগানের নিছিদ্র ছায়া আবার কখনও প্রকান্ড বরইগাছের আড় পেরিয়ে পেয়ারাগাছের মাথাদোলানো ছায়া, ব্যস্ অতটুকুই। তবুও সে বারান্দা নিজ মহিমায় আমাদের বাড়ির সৌখিন স্থান হয়ে উঠেছিলো নির্দ্বিধায় তখন। কিন্তু সৌখিনতা শব্দটির সঙ্গে তখনও পরিচয় হয়নি আমার। সময়ের সরল রৈখিক পথ ধরে চলতে গিয়ে চারপাশে যা কিছু মিলতো সবই তখন আমার কাছে জীবনের নামান্তর। আর সে পাওয়ায় কখনও বাহুল্য ছিল না। তাই নকশা কাটা কাঠের দুটো থাম, দেয়ালে হেলান দিয়ে নির্ভার দাঁড়িয়ে থাকা ক'খানা পিঁড়ি আর পেতলের ঘটি ভরা জল। এতটুকুই। আমাদের বাড়ির লাল বারান্দার এক জীবনঘনিষ্ঠ ছবি। তবুও সেই সাধারণ বারান্দায় জ্বলজ্বল করতো বাড়ির সকল অন্তরঙ্গ আনন্দ। এজন্যই মনে হয় ঠাকুমা সে বারান্দার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিতেই নকশিকাটা কাঠের থামে ঝুলিয়ে দিয়েছিলো রাশিয়ান ডিম্বাকৃতির একটা আয়না।শুধু অতটুকুই সংযুক্তি। তাতেই সেই লাল বারান্দা সাজঘরের গৌরবটুকুও গায়ে জড়িয়ে নিয়েছিলো অক্লেশে। প্রতিদিন সকালে নিত্যপূজা শেষে নাকে-কপালে তিলক আঁকা ঠাকুমা উনুনের আগুনদিনে পা বাড়াবার আগে সে আয়নায় সামনে দঁড়িয়ে চুলের খোঁপায় আরেকপ্রস্ত চিরুনী বুলিয়ে নিতো বেশ যত্ন করেই। আবার আগুন ঘামে তিলক গলানো সময় ফুরালে কলঘর থেকে কসকো সাবানের ঘ্রাণ সারা উঠোন ছড়িয়ে যখন লাল বারান্দায় এসে দাঁড়াতো ঠাকুমা, তখনও ওই রাশিয়ান আয়নাই ঠাকুমার প্রতিচ্ছবি হয়ে হেসে উঠতো সারাদিনের প্রতীক্ষা শেষে। এরপর তিব্বত স্নো...তিব্বত ট্যালকম পাউডার…তর্জনীর ডগায় ভরিয়ে সিঁদুরের টিপ…উঠোনজুড়ে ঠাকুমার ঘ্রাণ। আর লাল বারান্দায় থামে ঝোলানো আয়নায় পরিমিত লাবণ্যময়তার এক টুকরো স্নিগ্ধ সময়। এরপর বারবেলার নিরালা দুপুর। লালবারান্দায় পশ্চিম আকাশের তেজ কমে আসা রোদ। বরইগাছের গায়ে উটকো বাতাস। ভুল করে উড়ে আসা ডালিমগাছের ঘরছাড়া ফুল। লো ভলিউমের রেডিওর অবিছিন্ন বার্তালাপ। আর আমাদের ভাতঘুমের অপরিবর্তনীয় রুটিন। কিন্তু কিছু কিছু দিনে গড়পড়তা হিসেবেও টান পড়তো। নিরালা দুপুরের শ্রান্ত সময়ও হয়ে উঠতো নির্বাক চালচিত্রের স্থির অবকাশ। সেসব দুপুর ঠিক অন্য দুপুরগুলোর থেকে আলাদা হতো। চিরায়ত দুপুর থেকে সময় চুরি করে ঠাকুমা কাঠের বাক্স থেকে টেনে বের করতো বেশ বড়সড় একটা এ্যালবাম। সাদাকালো ছবির এ্যালবাম। তার পাতা উল্টাতেই থেমে যেতো ঠাকুমার সময়। একদৃষ্টি। লুকোনো দীর্ঘশ্বাস। আর আড়ষ্ট আঙুলে ছুঁয়ে থাকা এ্যালবামের পাতা। দুপুরগুলো কেমন যেন নি:স্ব হয়ে উঠতো।সাহেব কাকু। সেই কবে রাশিয়ায় পড়তে গিয়েছিলেন। আর ফেরেননি। ফিরতো পোস্টাকার্ডের চিঠি, ফিরতো এ্যালবামের ছবি। সেই ছবিতে কতগুলো তরুণ তরুণী। কখনো তারা সমুদ্রের পাড়ে রৌদ্রস্নাত। কখনো পরিপাটি ঘরে আনন্দরত। প্রতিটি ছবিতেই সাহেবকাকুর পাশে পুতুলের মতো দেখতে এক তরুণী। আমার মেম বৌমা। সালটা আশির মধ্যভাগ হবে। হঠাৎ করেই পোস্টাকার্ডের কয়েকটা বাক্য আমাদের বাড়ির উৎসবের অজুহাত হয়ে উঠলো। উঠোনের অন্যপাশে সদ্য গড়ে ওঠা ঘরের দেয়াল বারবার ঝেড়েমুছে পরিস্কার রাখা, উপরের ঘর থেকে পেতলের বড় বড় হাঁড়িকুড়ি নামিয়ে সেসব ধুয়ে রোদে শুকিয়ে রাখা, ধুনুরি ডেকে শিমুল তুলায় বালিশ ভরা---সে এক মহাযজ্ঞ। কারো কথা বলার সময় নেই। দু-দন্ড বসে অবসর উৎযাপন নেই। শুধু আয়োজন আর আয়োজন। ঝুনো নারিকেলের তক্তি বয়ামে ওঠে, কুলের আচার রোদে পড়ে, তিলের কটকটি পাথরের থালে জুড়ায়---তবুও কাজ ফুরায় না।অবশেষে কিছু কাজ বাকী রেখেই বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালো সেই দিন। এসে দাঁড়ালো নীলচোখের রাশিয়ান মেম বৌমা। সৌখিনতা শব্দের সঙ্গে আমার পরিচয় ঠিক সেই মুহুর্ত থেকেই। ধানদূর্বায় বরণ আর লালঝালড়ের তালপাখায় আম্রপল্লব ছোঁয়ানো হাওয়ার আশীর্বাদ শেষে মেম বৌমা লাল বারান্দায় উঠতেই উঠোন ভরে গিয়েছিলো মানুষে। পাড়া পেরিয়ে, গ্রাম পেরিয়ে,, নদী পেরিয়ে সবাই দেখতে এসেছিলো মেম বৌকে। লম্বা জার্ণির ক্লান্তি জড়ানো চেহারায় জ্বলজ্বলে নীল চোখের মানুষটির হাসিমুখ বলে দিয়েছিলো অদ্ভুত সেই পরিস্থিতি আগে থেকেই অবগত করা হয়েছিলো তাঁকে। কেউ অকারণে হাসে, কেউ অবাক চোখে তাকায়, কেউ ছুঁয়ে দেখতে চায়, কেউ ইচ্ছে করেই টিপ্পনী কাটে---বুঝে কিংবা না বুঝেও মেম বৌমার সেই একই হাসিমাখা মুখ। কিন্তু তা আর কতক্ষণ! তাই মেম বৌ দেখার লৌকিকতা শেষে বাড়ির বৌ পা রাখলো বড় ঘরে। মধ্যবিত্ত বাঙালী ঘরে প্রবেশ হলো সীমানাহীন আন্তর্জাতিকতা। মিডি স্কার্ট পড়া মেম বৌ যখন নিত্যঠাকুরের সামনে দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে অদ্ভুত বাংলায় উচ্চারণ করে,টাকুর...তখন হেসে গড়িয়ে পড়া নয়, আদর করে সামলে নেওয়া ঠাকুমা নিজের মাথায় ঘোমটা টেনে বলে ওঠে,রাধাগোবিন্দ...কাঁটাচামচ দিয়ে ইলিশমাছ খাবার বায়না দেখে চিতল মাছে কোরা এগিয়ে দিতে দিতে বলে ঠাকুমাই আবার ত্রাণকর্তা,নাতাশা বৌমা...ঝাল ছাড়া রান্না করেছি মিঠা করে...খাও...কিন্তু মেম বৌমা কি শুধুই বসে বসে এসব আপ্যায়ন নেবে? তা কীভাবে হয়। তাই সবার জন্য নিজে হাতে চা বানানোর বায়না ধরতেই মনিপিসি এগিয়ে এসেছিলো বন্ধু হয়ে। লালবারান্দায় কেরোসিনের স্টোভে নীল আঁচ উঠতেই তাতে বসেছিলো পেতলের খাবড়ি। জল ফুঁটে উঠতেই রাশিয়ান বিশেষ চা পাতা ঘ্রাণ ছড়িয়েছিলো বাড়ির সেই আনন্দময় দিনগুলোর গায়ে আরও একটু খুশি ছড়িয়ে দিয়ে।আর লাল বারান্দায় মহাসমারোহে বেরিয়ে এসেছিলো রাশিয়ান টি সেট। ফুলের ছবি আঁকা সেই টি সেট নাকি ছিল মেম বৌমার সৌখিন কালেকশনের একটি অংশ। বারানভকা নামের কোনো এক অচেনা জায়গা থেকে আগত সেই টি সেট আমাদের বাড়ির অন্যতন সৌখিন অনুসঙ্গ হয়ে উঠেছিলো সেদিন থেকে।তবে সত্যিকারের সৌখিনতা তো ছিল নীল চোখের রাশিয়ান মেম বৌ। কখনো লালপেড়ে গরদ শাড়ি আর কপালে সিঁদুরের টিপ পড়িয়ে বাঙালি বানিয়ে দেবার ইচ্ছা, আবার কখনো উঠোনের উনুনে আতপ চালের ঘি ভাতে কিশমিশ ছড়িয়ে দেবার অনুরোধ---সবকিছুতেই বাড়ির সকলের ছিল অন্য সংস্কৃতির মানুষটিকে বাঙালি বানিয়ে দেবার সুপ্ত আকাঙ্খা। আর মেম বৌ?নীল চোখের তারায় হাসি ভাসিয়ে ক'দিনেই হয়ে উঠেছিলো মধ্যবিত্ত বাড়ির সকলের সৌখিন আত্মীয়।
  • হরিদাস পালেরা...
    খোঁজা খুঁজি - Amit Chatterjee | খোঁজাখুঁজিঅমিত চট্টোপাধ্যায়আমার বড়োই খোঁজার বাতিকপিঁপড়ে খুঁজি কম্বলে।ভরদুপুরে ডাকাত খুঁজি হাজির হয়ে চম্বলে।চোরাই জিনিস খোঁজার বেলায় অভিজ্ঞতা বেশ প্রাচীন। পাকড়ে আনি চোরকে খুঁজে,পালাক না সে রুশ বা চিন! কাঠফাটা রোদ করতে আড়াল ফুটো ছাতার খোঁজ রাখি কারুর বাড়ি খুঁজতে গিয়ে ভুল ঠিকানায় নাম ডাকি হারিয়ে যাওয়া গরুর খোঁজেচরকিপাক যে খাচ্ছি রোজখুঁজতে গিয়ে পাচ্ছি না তোহারিয়ে যাওয়া জুতোর খোঁজকত কিছুই খোঁজার বাকি, তবুও খুঁজতে যাচ্ছি না।খুঁজতে যাব, চশমাটা যে,কোথাও খুঁজে পাচ্ছিনা!
    পরিকাঠামো এগিয়েছে, সমাজ এখনও পিছিয়ে (NFHS-6: পশ্চিমবঙ্গের রিপোর্ট কার্ড) - যদুবাবু | স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক NFHS-6, অর্থাৎ, ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভের ফ্যাক্ট-শীট প্রকাশ করেছেন বেশ কিছুদিন আগে। এই বছরের সার্ভেতে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বদল হয়েছে। মোট ইন্ডিকেটরের সংখ্যাই কমেছে, NFHS-5-এর ১৩১টি থেকে NFHS-6-এ দাঁড়িয়েছে ১০১টিতে। বেশ কিছু ইণ্ডিকেটর (সূচক) বাদ পড়েছে, যেমন অ্যানিমিয়া সংক্রান্ত তথ্য, যা ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের মহিলা ও শিশুদের মধ্যে একটি গুরুতর সমস্যা। তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই সার্ভেতে এবারই প্রথম অ্যানিমিয়া সংক্রান্ত গোটা সেকশনটাই বাদ পড়ল। সরকারি সূত্রে প্রকাশ, মেথডোলজি অর্থাৎ পদ্ধতিগত পরিবর্তনের কারণে ঐ তথ্যটি প্রকাশ করার কিছু সমস্যা আছে। আগের পর্বগুলোয় ক্যাপিলারি অর্থাৎ আঙুলের ডগা থেকে রক্ত নিয়ে হিমোগ্লোবিন মাপা হতো, যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল নির্ভুলতার দিক থেকে। সরকারের বক্তব্য, ভবিষ্যতে ভিনাস ব্লাড স্যাম্পলিং পদ্ধতিতে ICMR-এর Diet and Biomarkers Survey-র (এখন যার নাম SAMPADA = Survey for Assessment of Markers of Population Health, Activity, Diet and Anthropometry) মাধ্যমে অ্যানিমিয়ার তথ্য প্রকাশিত হবে, যা অনেক বেশি নির্ভুল বলে গণ্য করা হয়।অ্যানিমিয়া একাই নয়। শিশুমৃত্যুর হার (IMR, NMR ও পাঁচ বছরের নিচে শিশুমৃত্যুর হার), ক্যান্সার স্ক্রিনিং এবং HIV সংক্রান্ত সচেতনতার সূচকও NFHS-6-এর ফ্যাক্টশিট থেকে বাদ পড়েছে। উজ্জ্বলা যোজনার অধীনে পরিষ্কার রান্নার গ্যাসের ব্যবহার সংক্রান্ত তথ্যও এবার অনুপস্থিত, এইটি এর আগে NFHS-5-এ প্রকল্পের দাবি ও বাস্তব পরিস্থিতির ফারাক প্রকাশ্যে এনেছিল। সরকারি ব্যাখ্যা, এই সূচকগুলো এখন অন্য নির্দিষ্ট সার্ভে বা প্রশাসনিক ডেটাবেসের মাধ্যমে নজরে রাখা হচ্ছে, যেমন শিশুমৃত্যুর হারের জন্য Sample Registration System। সমালোচকদের একটি অংশের বক্তব্য, SRS জাতীয় ও রাজ্যস্তরের হিসাব দিলেও, NFHS যেভাবে জেলাস্তরে এবং সামাজিক-আর্থিক বিভাজনে তথ্য দিত, তা এখন অধরা থেকে যাচ্ছে। সরকারি সূত্র অবশ্য এই ব্যাখ্যাও দিয়েছে যে নতুন কিছু সূচকও এই পর্বে যুক্ত হয়েছে, যার মধ্যে আছে জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক গঠন, প্রবীণ জনসংখ্যার অনুপাত, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, অ্যান্টিনেটাল কেয়ারের ব্যবহার, টিকাকরণের হার এবং ডায়ারিয়ার তীব্রতা সংক্রান্ত তথ্য। এই বাদ পড়াগুলোকে দুটো আলাদা ভাবে দেখা যায়। সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এটি তথ্যের মান (ডেটা কোয়ালিটি) বাড়ানোর একটি প্রক্রিয়া (প্রতিটি সূচককে তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎসে সরিয়ে দেওয়া), এবং ফ্যাক্টশিট তথ্য প্রকাশের প্রথম স্তর মাত্র, পূর্ণ জাতীয় রিপোর্ট পরে প্রকাশিত হবে। অন্য একটি ব্যাখ্যায়, কিছু সাংবাদিক ও বিশ্লেষক এই বাদ পড়াগুলোকে একটি পুরনো প্যাটার্নের অংশ বলে মনে করছেন, বিশেষত যেহেতু ঠিক যে দুটি বিষয়ে (অ্যানিমিয়া ও উজ্জ্বলা) আগের সরকারের দাবির সাথে NFHS-5-এর তথ্যের অসঙ্গতি প্রকাশ্যে এসেছিল, সেগুলোই এবার অনুপস্থিত। এই দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি একটি বিতর্কিত অবস্থান, প্রমাণিত সত্য নয়, কিন্তু আলোচনায় উল্লেখযোগ্য। সত্যি যাই হোক, ফলাফল একই: বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ যে সূচক নিয়ে এই মূহুর্তে হাতে কোনো সাম্প্রতিক তথ্য নেই।এই প্রসঙ্গে একটু পুরনো ইতিহাসও মনে করাও জরুরি। The Federal-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাইয়ে সার্ভে পরিচালনাকারী সংস্থা IIPS-এর ডিরেক্টর কে এস জেমসকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, কারণ তিনি অ্যানিমিয়ার তথ্য "রিভাইজ" করার জন্য চাপের সামনে নতি স্বীকার করতে অস্বীকার করেছিলেন বলে অভিযোগ; এই ঘটনার এক মাস পরেই ওঁকে সরানো হয়। (এই নিয়ে গুরুতেই সেই সময় একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম, “হয়েছে ব্যথা, কেটে ফ্যালো মাথা”!)আপাতত, এই সার্ভের অনেকগুলি সূচক থেকে বাছাই করে শুধু স্বাস্থ্য, এবং নারী এবং শিশুকল্যাণের কয়েকটি সূচকের জন্য পশ্চিমবঙ্গ আর গোটা দেশের সার্বিক গড়ের তুলনা করবো। একশো-একটা ইন্ডিকেটর থেকে বেছে গোটা দশেক বের করা কঠিন কাজ, এবং কিছু একদেশদর্শিতা থেকেই যাবে। তার আগে খুব ছোট্ট করে বলতে গেলে, রাজ্য জনকল্যাণমূলক পরিকাঠামো গড়ে তোলায় যতটা দক্ষ হয়ে উঠেছে, সামাজিক পরিবর্তনে ততটাই ধীরে এগিয়েছে। একদিকে যেমন স্বাস্থ্যবিমা, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং অ্যান্টিনেটাল কেয়ার প্রায় সর্বজনীন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, অন্যদিকে চাইল্ড ম্যারেজ, মহিলাদের শিক্ষার নিম্ন হার এবং এনসিডির বর্ধনশীল বোঝা একই গতিতে এগোয়নি। দুটো ধারা পাশাপাশি রাখলে যা বোঝা যায়, তা হলো: কল্যাণ প্রকল্প পৌঁছে দেওয়ার কাঠামো যত দ্রুত তৈরি হয়েছে, সামাজিক পরিবর্তন (অথবা প্রগতি) তার সাথে তাল রাখতে পারেনি।কোথায় এগিয়ে?প্রথমত, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো ও সার্ভিসের ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গ ধারাবাহিকভাবে জাতীয় গড়ের চেয়ে এগিয়ে, এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যবধান অনেক বেশি। প্রায় সর্বজনীন অ্যান্টিনেটাল কেয়ার, ইন্সটিটিউশনাল ডেলিভারির হার-ও বেশি। স্বাস্থ্যবিমার কভারেজ জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় ৩০ পয়েন্ট বেশি। অর্থাৎ, বিগত দশকে রাজ্য সরকার পাবলিক হেলথ পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বের সাথে বিনিয়োগ করেছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্যবিমার কভারেজের হার আলাদাভাবে গুরুত্ব দেওয়ার মতো। ৮৮.২ শতাংশ পরিবার কভারেজের তুলনায় জাতীয় হার ৬০.২ শতাংশ। পুরো এন-এফ-এইচ-এস সার্ভে দেখলে এইটি পশ্চিমবঙ্গ ও গোটা দেশের সবচেয়ে বড় ব্যবধানগুলোর একটি, এবং সম্ভবত এর অন্যতম কারণ রাজ্যের নিজস্ব স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প। নতুন সরকারের আমলে এই কভারেজের মাত্রা বজায় রাখে কি না, সেটি পরের NFHS পর্বেই স্পষ্ট হবে। এই একটি সংখ্যার উপর রাজ্যের আপেক্ষিক সুবিধা কতটা নির্ভরশীল, তা মাথায় রেখে বিষয়টি নজরে রাখা জরুরি।শিশুদের ক্ষেত্রেও কাগজে-কলমে উন্নতি দেখা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে স্টানটিং কমে হয়েছে ২২.৪ শতাংশ, যা জাতীয় ২৯.৩ শতাংশের চেয়ে যথেষ্ট কম, এবং রাজ্যের নিজের NFHS-5-এর ৩৩.৮ শতাংশ থেকেও বড় উন্নতি। আন্ডারওয়েটের হারেও একই রকম, যদিও কিছুটা কম, উন্নতি দেখা যায়। কিন্তু ওয়েস্টিং-এর হার খুব বেশি বদলায়নি। মনে রাখা উচিত, ওয়েস্টিং শিশু পুষ্টির তিনটি সূচকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খাদ্য-সংবেদনশীল, কারণ এটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থাৎ ক্রনিক নয়, বরং অ্যাকিউট অর্থাত তীক্ষ্ণ অভাবের প্রতিফলন। NFHS-5-এ পশ্চিমবঙ্গের ওয়েস্টিং হার ছিল ২০.৩ শতাংশ, NFHS-6-এও ঠিক ২০.৩ শতাংশ, দশমিকের ঘর পর্যন্ত অপরিবর্তিত, ওদিকে স্টানটিং ও আন্ডারওয়েট দুটোই উন্নতি দেখিয়েছে। এটা কেন সেটা ভাববার বিষয়। গার্হস্থ্য হিংসার দিকে তাকালে, রাজ্যের অবস্থা বাকি দেশের থেকে সামান্যই ভালো। ১৮-৪৯ বছর বয়সসীমায় এভার-ম্যারেড মহিলাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের ১৯% মহিলা গার্হস্থ্য হিংসার (স্পাউজাল ভায়োলেন্স) অভিজ্ঞতা আছে, দেশের সার্বিক গড় এখানে ২২.৩%। NFHS-5-এর তুলনায় একটু হলেও উন্নতি, কারণ রাজ্যের হার তখন ছিল ২৬.৯%, জাতীয় গড় ২৯.২%। তবে "সামান্য ভালো" বলার আরেকটি কারণ আছে: গার্হস্থ্য হিংসার ক্ষেত্রে আন্ডার-রিপোর্টিং একটি সুপরিচিত সমস্যা (শুধুমাত্র যাঁরা রিপোর্ট করেছেন তাঁদের তথ্য পাওয়া যায়), তাই বাস্তব ছবিটা সম্ভবত এই সংখ্যার চেয়ে কিছুটা খারাপ হতে পারে রাজ্যে এবং দেশে দুটোতেই। নারী ক্ষমতায়নের অন্য একটি সূচক কতজন মহিলার নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে। রাজ্যের ক্ষেত্রে NFHS-5 থেকে NFHS-6-এর মধ্যে এইটি ৭৬.৫% থেকে বেড়ে হয়েছে ৯৫.৩%। এটা বেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি, বলতে বাধা নেই। গোটা দেশের সার্বিক গড়ের-ও এই এক-ই সময়ে উন্নতি হয়েছে, ৭৮.৬% থেকে ৮৯%। সহজ পাটিগণিত বলে দেবে, এই সূচকে বৃদ্ধির হার রাজ্যে অনেকগুণ বেশি। কোথায় পিছিয়ে?কিন্তু এই কয়েকটি আপাত উন্নতির বাইরে তাকালে বোঝা যায় কোথায় রাজ্য পিছিয়ে - সমাজ কোথায় তাল মেলাতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গে বাল্যবিবাহ (চাইল্ড ম্যারেজের) হার ৩৬.৪ শতাংশ, সার্ভের তথ্য অনুযায়ী ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী মহিলাদের মধ্যে এই অংশের ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে গেছে, যা জাতীয় হার ২০.১ শতাংশের প্রায় দ্বিগুণ। লক্ষণীয়, NFHS-4 (২০১৫-১৬) থেকে NFHS-5 পর্যন্ত এই হার একই জায়গায় থমকে ছিল, ৪১.৬ শতাংশ; সাম্প্রতিক সার্ভেতে একটু উন্নতি হয়েছে, প্রায় ৫% কমে বাল্যবিবাহের হার ৩৬.৪ শতাংশে নেমেছে। বাল্যবিবাহের সরাসরি পরিণতি টিনেজ প্রেগন্যান্সি: পশ্চিমবঙ্গের ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী মহিলাদের ১৬.৬ শতাংশ সমীক্ষার সময় ইতিমধ্যে মা হয়েছেন বা গর্ভবতী ছিলেন, যেখানে জাতীয় হার ৬.৭ শতাংশ। এই সংখ্যাটিও বিগত দশকের, NFHS-4, NFHS-5, ও NFHS-6 তিনটি সার্ভের সময়কালে কার্যত অপরিবর্তিত, NFHS-4-এ ১৮.৩ শতাংশ থেকে নেমে এখন ১৬.৬ শতাংশ। অর্থাৎ, রাজ্যে বাল্যবিবাহের হার সামান্য কমলেও টিনেজ প্রেগন্যান্সি সমান হারে কমেনি। লেখার শেষে সারণীতে তিনটে সার্ভের জন্যই, এই দুটো সূচকের মান দিলাম। সেটা দেখলে ট্রেণ্ডটা একটু স্পষ্ট হতে পারে। মহিলাদের শিক্ষার হারও একই গল্প, একটু অন্যভাবে। পশ্চিমবঙ্গ নিজেকে শিক্ষায় অগ্রণী রাজ্য বলে মনে করলেও, মাত্র ৪০.০ শতাংশ মহিলা ১০ বা তার বেশি বছর শিক্ষাগ্রহণ সম্পূর্ণ করেছেন, যেখানে জাতীয় হার ৪৬.৪ শতাংশ। মহিলাদের ইন্টারনেট ব্যবহারও জাতীয় গড়ের চেয়ে কম, ৫৯.৩ শতাংশ বনাম ৬৪.৩ শতাংশ, যদিও NFHS-5-এর তুলনায় দুটো সূচকেই যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। স্কুলে কখনও না যাওয়া মহিলাদের অনুপাতে (২১.৮%) পশ্চিমবঙ্গ বরং জাতীয় গড়ের (২৬.৩%) চেয়ে ভালো অবস্থানে, যদিও কেরালার (৩.৪%) ধারেকাছেও নেই।এই সূচকগুলোর কোনোটাই চটজলদি বদলানো শক্ত, সমাজকল্যাণ প্রকল্পের কিছু সদর্থক প্রভাব থাকে না তা নয়, তবুও অন্যান্য বাধাবিপত্তি অথবা বিপর্যয় থাকে। কোভিড-১৯-এর পরবর্তী স্কুলছুটের ব্যাপক হার বা লার্নিং গ্যাপ এক্ষেত্রে কতটা দরকারি সেটাও ভাববার বিষয়। এই যেমন নিচের ছবিতে সবকটি রাজ্যের জন্য এই দুটো একসাথে প্লট করেছি। এর থেকে একটা হাল্কা ট্রেণ্ড দেখা যাচ্ছে, যে চাইল্ড ম্যারেজ আর স্কুলছুটের হারের আন্তঃসম্পর্ক আছে (r = 0.51), একটা বাড়লে আরেকটাও বাড়বে। লক্ষণীয়, যে এই প্লটেও পশ্চিমবঙ্গ আর ত্রিপুরা, লাইনের বেশ কিছুটা উপরে, দুটো রাজ্যই কিছুটা 'আউটলায়ার'। এ-ও ভাববার ব্যাপার। চাইল্ড ম্যারেজের নেপথ্যে অজস্র আর্থসামাজিক কারণ থাকে, যেমন দারিদ্র্য, পণপ্রথার চাপ, এবং কিশোরী মেয়েদের জন্য নিরাপদ বিকল্পের অভাবের ধারণা। এমন পরিস্থিতি বছরের পর বছর ধরে সুসংহত সামাজিক বিনিয়োগের মধ্য দিয়েই বদলানো সম্ভব এমন আশা করা অন্যায় নয়, যদি না সেইসব প্রকল্প বহু প্রান্তিক মানুষকে নথিপত্রের অভাব বা অন্য কারণে বাদ দিয়ে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের ৯৫ শতাংশ মহিলার কাছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকলেও, এক-তৃতীয়াংশের বেশি ১৮ বছর বয়সের আগেই বিয়ে হয়ে যায়, এই দ্বন্দ্বই হয়তো আগামী দিনের অন্যতম দরকারি প্রশ্ন হবে।তবে, সমস্যার শেষ এইখানেই নয়। বোঝার উপর শাকের আঁটির মত এই অসম্পূর্ণ পরিবর্তনের উপর চেপে বসেছে এন-সি-ডি অর্থাৎ নন-কমিউনিকেবল ডিজ়িজ়ের সমস্যা, যা ইতিমধ্যে বেশ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের মধ্যে হাই ব্লাড শুগারের হার বেশি (রাজ্যের ২২.৭ শতাংশ বনাম দেশের ১৭.৮ শতাংশ), হাইপারটেনশনও বেশি (২৪.৩ শতাংশ বনাম ১৯.৪ শতাংশ), এবং ওভারওয়েট বা ওবেসিটির হারও জাতীয় গড়ের চেয়ে বেশি (৩৪.৬ শতাংশ বনাম ৩০.৭ শতাংশ)। এই শতাংশগুলো দুশ্চিন্তার ব্যাপার, কারণ, রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়লে, ওজন বাড়লে, ডায়াবিটিস, কিডনির অসুখ, কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ় ইত্যাদিও অবশ্যম্ভাবী।একই সঙ্গে, ঠিক এর উল্টো দিকে, স্বাভাবিকের নিচে BMI-যুক্ত পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের অংশ ১৫.১ শতাংশ, জাতীয় ১৯.৭ শতাংশের চেয়ে সামান্য কম। এই দুটো তথ্য একসাথে রাখলে যে প্যাটার্নটি স্পষ্ট হয়, তাকে পাবলিক হেলথ গবেষকরা বলেন অপুষ্টির দ্বৈত বোঝা: এমন একটি জনগোষ্ঠী যারা অপুষ্টি (ম্যালনিউট্রিশন) থেকে অতিপুষ্টির (ওভারনিউট্রিশন) দিকে সরে যাচ্ছে, প্রথম সমস্যাটি সম্পূর্ণভাবে সমাধান না করেই। এই ‘সরে যাওয়ার হার’ দেখলে পশ্চিমবঙ্গ দেশের সার্বিক গড়ের চেয়ে এগিয়ে আছে বলে মনে হচ্ছে। এর কারণ হতে পারে খাদ্যাভ্যাস, নগরায়ন, এবং রাজ্যের ভাত-নির্ভর খাদ্য-ভিত্তিক কল্যাণ প্রকল্পগুলোর রাজনৈতিক অর্থনীতি (মিড-ডে-মিল থেকে মা ক্যান্টিন)। মিড-ডে মিলের নতুন মেন্যু নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এই অপুষ্টি-অতিপুষ্টির ব্যাপারটাও হয়তো আলাদা পর্যালোচনার দাবি রাখে।এনসিডির এই প্রবণতার পাশাপাশি আরও একটি সম্পর্কিত তথ্য উল্লেখযোগ্য। পশ্চিমবঙ্গের মহিলাদের মধ্যে তামাক ব্যবহারের হার ১১.২ শতাংশ, যা জাতীয় ৮.৪ শতাংশের চেয়ে কিছুটা বেশি। এর পাশাপাশি পুরুষদের মধ্যে এই হার অনেক বেশি, ৪৬.২ শতাংশ, জাতীয় ৩৬.৩ শতাংশের তুলনায়। এনসিডির রিস্ক বা ঝুঁকি যেখানে নারী ও পুরুষ দুই ক্ষেত্রেই বাড়ছে, তামাক ব্যবহারের ধরণ কিছুটা বুঝতে সাহায্য করে সেই ঝুঁকি কার কতটা।লেখার শুরুর প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এই পর্বের তথ্যের কিছু বড় ফাঁক রয়ে গেছে, যার অন্যতম অ্যানিমিয়ার অনুপস্থিতি। প্রজননক্ষম বয়সের মহিলাদের মধ্যে অ্যানিমিয়া ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী পাবলিক হেলথ সমস্যাগুলোর একটি। রক্তাল্পতা মাতৃস্বাস্থ্যের ফলাফল খারাপ করে, শিশু অপুষ্টিকে আরও গুরুতর করে তোলে, এবং খাদ্য-ভিত্তিক কল্যাণ প্রকল্পের গঠন দ্বারা সরাসরি প্রভাবিত হয়। এই ফাঁক পূরণ না হওয়া পর্যন্ত, পশ্চিমবঙ্গের পুষ্টিগত স্বাস্থ্যের যে কোনো মূল্যায়ন, কিছুটা হলেও অসম্পূর্ণ থেকে যাবেই।আগেই লিখেছি, এই সার্ভের মোট সূচকের সংখ্যা ১০১। আমরা তার মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি দেখেছি, মূলত নারী ও শিশুকল্যাণ বিষয়ক। আরও অনেক বাদ রয়ে গেলো, সেইগুলোও আশা করি পরের কোনো কিস্তিতে দেখা হবে, বা অন্য কেউ দেখবেন। এন-এফ-এইচ-এসের এই কটি সূচকের তথ্য-উপাত্ত থেকে যা দাঁড়ায় তা হ’ল এই যে, পশ্চিমবঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছে পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকাঠামো সত্যিই শক্তিশালী (ছিল), কিন্তু বহু প্রজন্মের সঞ্চিত সামাজিক ও জনতাত্ত্বিক সমস্যা তার উপর চেপে বসে আছে, যা শুধু পরিকাঠামো দিয়ে সমাধান করা কঠিন। স্বাস্থ্যবিমা বা ব্যাংকিংয়ের দিক থেকে রাজ্যের ফল প্রশংসার্হ। অন্যদিকে, চাইল্ড ম্যারেজের ব্যবধান কমানো যায় নি, এবং পুষ্টির পরিবর্তন সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই হাজির হয়েছে ব্লাড-শুগার, ওবেসিটির মত এনসিডির বোঝা। এই দিকগুলিতে বিগত দশকে রাজ্যের রিপোর্ট কার্ড ততোটা ভালো নয়। নিঃসন্দেহে এই কাজগুলি অনেক বেশি কঠিন, এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক বিনিয়োগের এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের সদিচ্ছার ফলে কাঁটা হয়তো সামান্য সরতে পারে। আশা করা যায়, এখন থেকে যত্নশীল হলে, আগামী এক দশকে বোঝা যাবে রাজ্য এই ফাঁকগুলো আসলেই কমাচ্ছে, নাকি অবনতিশীল জাতীয় পরিস্থিতির বিপরীতে কেবল স্থিতিশীলতা বজায় রাখছে, না আরও অন্ধকারের দিকে যাত্রাই তার ভবিতব্য? সূত্রঃ সমস্ত পরিসংখ্যান সরাসরি ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক, ভারত সরকার প্রকাশিত পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের কি ইন্ডিকেটরস ফ্যাক্টশিট থেকে নেওয়া: NFHS-6 (২০২৩-২৪) এবং NFHS-5 (২০১৯-২১)। আলাদাভাবে উল্লেখ করা না থাকলে সমস্ত পরিসংখ্যান ১৫-৪৯ বছর বয়সী মহিলাদের জন্য রাজ্য ও জাতীয় সামগ্রিক হার (শহর ও গ্রাম মিলিয়ে)। ১৮২ পাতার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট-টি পাবেন এই লিঙ্কে - https://www.nfhsiips.in/nfhsuser/assets/National%20Family%20Health%20Survey%20(NFHS-6)%202023-2024%20Fact%20Sheets.pdf আমি বিশ্লেষণ করার সুবিধের জন্য পিডিএফ থেকে ক্লডের সাহায্যে এক্সেল স্প্রেডশিট করে, নিজেও যথাসম্ভব যাচাই করে নিয়েছি। তবুও কোথাও ভুল বা অসঙ্গতি থেকে গেলে শুধরে নেব। আর কেউ আরও বিশদে বিশ্লেষণ করতে চাইলে, এইখানে ডেটা, কিছু প্লট, R কোড, GeoJSON ফাইল ইত্যাদি পাবেন https://github.com/DattaHub/NFHS-6-analysis সূচক NFHS-4 (২০১৫-১৬)পশ্চিমবঙ্গ NFHS-4 (২০১৫-১৬)ভারত NFHS-5পশ্চিমবঙ্গ NFHS-5ভারত NFHS-6পশ্চিমবঙ্গ NFHS-6ভারত চাইল্ড ম্যারেজ ৪১.৬% ২৬.৮% ৪১.৬%¹ ২৩.৩% ৩৬.৪% ২০.১% টিনেজ প্রেগন্যান্সি ১৮.৩% ৭.৯% ১৬.৪% ৬.৮% ১৬.৬% ৬.৭% ¹এই হার NFHS-4 থেকে NFHS-5 পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গে অপরিবর্তিত ছিল, যদিও জাতীয় হার এই সময়ে কমতে থাকে।
    এক বিপন্ন প্রজন্ম ও আমাদের ভবিষ্যৎ - Somnath mukhopadhyay | এক বিপন্ন প্রজন্ম ও আমাদের ভবিষ্যৎ। আমার বাড়ির সামনের রাস্তা বেয়ে প্রতিদিন নানান বয়সের শিশু থেকে কিশোর কিশোরী ছাত্রছাত্রীরা স্কুলে যায়। সবার সঙ্গে না হলেও এদের জনাকয়েকের সঙ্গে টুকটাক কথার সূত্রে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। অবশ্য সে সম্পর্ক খুব যে গভীর, সে কথা বলবোনা। পথ চলতি সম্পর্কের সেতু কবে আর দীর্ঘস্থায়ী হয়? টানা গরমের পর্ব মিটিয়ে স্কুলগুলোতে আবার ছেলেপিলেরা যাতায়াত শুরু করেছে দেখে মনটা বেশ চাঙ্গা হয়ে ওঠে। সুতো ছেঁড়া ফেলে আসা দিনের কথা মনে পড়ে যায়। বছরের নানা সময়ে ওদের আসা যাওয়া দেখতে দেখতে কখন যেন পথচলতি ওদের রোদ জল শীতের আমেজ মাখা আনন্দ আর কষ্টের শরিক হয়ে যাই। গরমের কারণে বেলার স্কুল সকালে উঠে আসে, বর্ষার ভেজা দিনগুলো জল থৈ থৈ হয়ে উঠতেই অনেকের বাড়ি থেকে বেরনো হয়না, বন্যার আঁচ পেতেই স্কুলবাড়ি ভরে ওঠে জলভাসি মানুষজনের ভিড়ে, শীতের দাপট খুব বেশি হলে প্রয়োজনীয় শীত পোশাকের অভাবে কুঁকড়ে থাকে নবীন শরীরগুলো। এভাবেই এক আশ্চর্য লড়াই করে বেড়ে ওঠে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চারাগাছেরা। খুব সম্প্রতি ইউনিসেফের এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে পরিবর্তিত জলবায়ু নিয়ে এই দেশের শিশুদের কিছু বাস্তব সমস্যার কথা। তারা সবাই যে পাঠশালায় যায় হয়তো এমন নয়, ( গেলে তার থেকে আনন্দের কিছু হতোইনা ) – এদের মধ্যে কেউ কেউ মাঠে ঘাটে খেলে বেড়ায়, মা বাবার সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করে, গজিয়ে ওঠা দোকানে সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে উদয়াস্ত ঘাম ঝরিয়ে কাজ করে। এরা সবাই পরিবর্তিত বাতাবরণের শিকার – স্বেচ্ছায় নয়, বাধ্য হয়েই। এদের নিরাপত্তার ঝুঁকি ক্রমশই বাড়ছে। সমীক্ষার ফলাফল থেকে জানা গেছে – ১. এই মুহূর্তে আমাদের দেশের ৯৭% শিশু অন্যূন দুটি আবহাওয়া সংক্রান্ত বিপর্যয় বা সংশ্লিষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার। ২. দেশের ১৫৮ মিলিয়ন সংখ্যক শিশু তাপদাহ ও খরা পরিস্থিতির ফলে চরম ভুক্তভোগী। ৩. ভারতের ২৩৪ মিলিয়নেরও বেশি সংখ্যক শিশু কমপক্ষে তিনটি চরম জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আবহিক বিপর্যয়ের সামনে পড়তে বাধ্য হচ্ছে যার ফলে বাড়ছে তাদের শারীরিক সুস্থতার সমস্যা, দেখা দিচ্ছে প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি, পঠনপাঠন ও নিরাপত্তার সংকট। ৪. ইউনিসেফের পক্ষ থেকে অতি সত্বর শিশুদের সুরক্ষার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি তাদের সম্ভাব্য বিপর্যয় সম্পর্কে সচেতন করার সাথে সাথে তাদের সামাজিক প্রয়োজন ও সামাজিক সুরক্ষার বিষয়টিকে সুনিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে বলা হয়েছে।সমীক্ষার বিস্তারিত আলোচনায় বলা হয়েছে যে ভারতের প্রায় প্রতিটি শিশুই কমপক্ষে একটি আবহিক বিপর্যয়ের দ্বারা পীড়িত, অন্যদিকে ৯৭% শিশুকে একাধিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়। গত ১৬ জুন ২০২৬ প্রকাশিত এই রিপোর্টৈ পরিসংখ্যান তুলে বলা হয়েছে যে দেশের ৪১১.৬২ মিলিয়ন শিশু কমপক্ষে দুটি আবহাওয়া সংক্রান্ত অথবা বিপর্যয় সংশ্লিষ্ট বিপন্নতার শিকার হয়। এরমধ্যে রয়েছে প্রবল দাবদাহ, তীব্র খরা পরিস্থিতি, নদী ও সামুদ্রিক বন্যা, ক্রান্তীয় ঝড়, তাপপ্রবাহ, দাবানল, ধুলিঝড় ও বালি ঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ।তালিকা যেন শেষ হতে চায় না। ভারতের মতো একটি সুবিশাল দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের বিভিন্নতার কারণে এক একটি অঞ্চল এক এক বিপর্যয়ের মুখে পড়ে বছরের নানা সময়ে। সেই অনুযায়ী বাড়তে থাকে বিপন্নতার বহর।দেশের ২৩৪ মিলিয়ন শিশু বা দেশের মোট শিশু জনসংখ্যার ৫৫% ন্যূনতম তিনটি বিপর্যয়ের মুখে পড়তে বাধ্য হয়। এরফলে তাদের সর্বতোমুখী বিকাশের প্রক্রিয়া বারবার ব্যাহত হয়ে থাকে যা পরিপূর্ণ বিকাশকে বিলম্বিত তথা বিঘ্নিত করে। ইউনিসেফের মতে তথাকথিত বিপর্যয়ের মধ্যে সবথেকে জোরালো ভূমিকা নেয় বৃষ্টিহীন শুখা পরিস্থিতি এবং প্রবল তাপদাহ। পরিসংখ্যান বলছে যে এই দুয়ের প্রভাবে ১৫৮. ৮ মিলিয়ন শিশু বর্ণনাতীত কষ্টের মুখে পড়েছে। এদের মধ্যে ৮৪.১ মিলিয়ন শিশু খরা, তাপপ্রবাহের সঙ্গে প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত হতে বাধ্য হয়। এছাড়া ৩৮. ৫ মিলিয়ন শিশুকে রীতিমতো খরা, তাপপ্রবাহ ও প্রবল বন্যার সঙ্গে যুঝতে হয়েছে কেবলমাত্র প্রাণ টুকুকে টিকিয়ে রাখতে। লড়াই এখানেই শেষ হয়ে যায়না। ওলটপালট হয়ে যাওয়া সবকিছুকে একটু স্বাভাবিক করে তুলতে না তুলতেই নতুন বিপর্যয়ের মুখে পড়ার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। কি করুণ অথচ অনিবার্য পরিণতি! মৌসুমী বায়ুর খামখেয়ালিপনার কারণে গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের জলবায়ুর চরিত্রে বদল এসেছে বিগত কয়েক বছরে। খরার দাপট প্রথাগত এলাকার পরিধিকে অতিক্রম করে হাত বাড়িয়েই চলেছে অন্যতর পরিসরে। বৃষ্টিপাতের স্বল্পতার ফলে দাবদাহের দাপট বাড়লে তা শিশুদের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। ভারতের ৪১০.২ মিলিয়ন শিশু,যা মোট শিশু জনসংখ্যার ৯৬%, আজ ভয়ঙ্কর খরা আর গরমের দাপট সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছে। এই দাপটের শিকার দেশের গ্রামীণ এলাকায় বসবাসরত শিশুরা। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যাহত হ‌ওয়ায় খাদ্যের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে তারা, পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টির অভাব কমিয়ে দিচ্ছে তাদের পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হবার সম্ভাবনাকে। জীবনের চেনা ছন্দটাকেই পাল্টে দিতে চলেছে এই অকল্পনীয় তাপীয় পরিবেশ। সমীক্ষা সূত্রে জানা গিয়েছে প্রায় ১৫৫.৭ মিলিয়ন শিশু প্রবল ঘূর্ণিঝড় প্রবণ অঞ্চলে বসবাস করে। উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সারা পৃথিবীতেই ঝড়ের তীব্রতা বেড়ে চলেছে। বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে জীবনের মূল ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার ফলে বিঘ্নিত হচ্ছে স্কুলের পঠনপাঠন, স্বাস্থ্য পরিষেবা। বলা হয়ে থাকে যে বিপদ নাকি কখনো একা আসেনা। একের পর এক বিপর্যয়ের অভিঘাতে জীবনে সুস্থিত হবার সম্ভাবনা অঙ্কুরিত হবার আগেই নষ্ট হয়ে যায়।ভারতের প্রতি ৫ জন পিছু ১জন তাপপ্রবাহের দ্বারা প্রভাবিত হয় অর্থাৎ ৮৯. ৩ মিলিয়ন শিশু তাপ দগ্ধ হচ্ছে যা তাদের শরীরের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে প্রায় নিয়মিতভাবে বর্ষার জলে উপচে পড়া নদীর বন্যায় বানভাসি হতে হয় ৬৬.৯ মিলিয়ন শিশুকে যা মোট শিশু জনসংখ্যার ১৬%। একের পর এক প্রাকৃতিক ঘটনায় বিঘ্নিত হয় শিশুদের সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি। প্রকৃতির রাজ্যের যা স্বাভাবিক বিশৃঙ্খলা তা অনেক ক্ষেত্রেই উপযুক্ত পরিকাঠামোর অভাবে বিপর্যয়ের চেহারা নেয়, আর তখনই, বিপন্নতার হাহাকার ধ্বনিত হয় চারিদিকে। ইউনিসেফের মতে এই ক্রমিক প্রাকৃতিক ঘটনায় শিশুরা ৬ ধরনের পরিষেবা ব্যবস্থা থেকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত হয় – স্বাস্থ্যসেবা বিকাশের জন্য অপরিহার্য পুষ্টি, পরিশুদ্ধ পানীয় জল ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা, শিক্ষা, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামাজিক সুরক্ষা। মাথায় রাখতে হবে যে শৈশবকাল হলো দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুবিকাশের পক্ষে সবথেকে উপযুক্ত সময়। এই সময় শিশুর বিকাশ ব্যাহত হলে মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রক্রিয়াই পথভ্রষ্টতার শিকার হয়। এমনটা কখনোই কাম্য হতে পারে না। এখানেই বিপর্যয়ের খতিয়ান শেষ হয়ে গেল এমন নয়। আমাদের কৃতকর্মের ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল আজ বিষিয়ে গিয়ে প্রাণহর হয়ে উঠেছে। পরিশুদ্ধ জলের জোগান আজ আর সুনিশ্চিত নয়। উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে বিভিন্ন ধরনের vector borne disease এর প্রকোপ বাড়ছে, বাড়ছে ভাইরাস ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস ঘটিত শারীরিক সমস্যার দাপট। এই সব অচেনা অজানা শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সামর্থ্য শিশুদের মধ্যে কম, সুতরাং আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা শিশুদের মধ্যে অনেক বেশি। বলাবাহুল্য এসব‌ই সমস্যা বাড়িয়েছে। এই সময়ের ভারতবর্ষের মহানগরগুলোতে বায়ুদূষণের মাত্রা সহনীয়তার সীমার অনেক ওপরে অবস্থান করছে। এমন পরিবেশে থাকতে বাধ্য হচ্ছে আমাদের আগামী প্রজন্ম। দেশের ৯৯% শিশু অস্বাস্থ্যকর বাতাসে শ্বাস নিতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে শ্বাসকষ্টসহ নানান রকম জটিলতায় ভুগতে হচ্ছে তাদের। এই মুহূর্তে ভারতের ভারতের air pollution risk score এর মান ১০ এর মধ্যে ৯.৯৪। বলতে দ্বিধা নেই যে আমাদের দেশের শিশুরা বিশেষ করে বৃহত্তর গ্রাম সমাজের শিশুরা এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রতিপালিত হচ্ছে। শৈশব অনিশ্চিত হলে ভাবী জীবনের অনেকটাই ধোঁয়াশায় ঢাকা পড়ে যায়। প্রহেলিকাময় হয়ে ওঠে দেশের ভবিষ্যৎ।ইউনিসেফের তরফে বাস্তব পরিস্থিতির সাপেক্ষে ভারতের বর্তমান স্থিতির বিষয়ে যে সূচক মানের কথা বলা হয়েছে তাতে করে বলা যায় যে আমাদের দেশের ভাবী প্রজন্ম খুব ভালো অবস্থানে নেই। ভারতের শিশুদের ফুড পভার্টি স্কোর ৬.৩১, নিউট্রিশন রিস্ক স্কোর ৬.৪১ এবং স্টার্টিং স্কোর ৬.৫১।পরিস্থিতি মোটেই নিরাপদ নয়। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে আমাদের দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।আর এরফলে আমাদের শিশুরা প্রয়োজনীয় পরিমাণে খাবার খেতে পায়না যাতে করে বাড়ন্ত বয়সের খাদ্যের চাহিদা মেটে।খাদ্য নিরাপত্তার অভাবে পুষ্টিকর খাবার মেলেনা, আর পুষ্টির অভাবে শরীরের বৃদ্ধি যথাযথ না হ‌ওয়ায় তারা বয়সের তুলনায় অনেক বেঁটে খাটো হয়ে থাকে। এও এক দুষ্ট চক্র যা একের অভাবে অন্যতর অভাব বা অপূর্ণতার হেতু হয়ে দাঁড়ায়। অথচ এসবের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের দেশের ভাবী নাগরিকদের ভবিষ্যৎ। দেশের শ্রীবৃদ্ধি। আলোচনার এমন অংশে পৌঁছে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে যে কীভাবে আমরা আমাদের দেশের শিশুদের এক নিরাপদ, সুস্থিত পরিবেশ পরিকাঠামোর মধ্যে বিকশিত হবার সুযোগ করে দিতে পারবো? পরিস্থিতি এতোটাই সংকটময় যে চটজলদি কোনো সমাধান সূত্র বের করে ফেলা হয়তো সম্ভব নয়। তবে হাল ছাড়লে চলবে না। আমাদের সকলকে এই বৈশ্বিক সমস্যার বাস্তবতার বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে, খুঁজতে হবে এর থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাব্যতা বিষয়ে। মাত্র কয়েক বছর আগে আমরা এক মহামারীর বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে এলাম। ওই বিচ্ছিন্ন সময়ে আমাদের শিশুদের শিক্ষা দারুণভাবে ব্যাহত হয়েছে। এই কয়েক বছরে শিক্ষা অবকাঠামোর সামান্য কিছু পরিবর্তন হলেও তার সিন্ধুতে বিন্দুসম। বলতে দ্বিধা নেই যে আমরা এক বৈষম্যমূলক সমাজে বাস করি। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের শিশুরাও জীবনের একেবারে সূচনা পর্ব থেকেই এই বৈষম্যের বাতাবরণের মধ্যে প্রতিপালিত হচ্ছে। যতদিন না এই অবস্থাকে আমরা বদলাতে পারবো ততদিন পর্যন্ত আমাদের শিশুরা এটাকে বিধিলিপি বলে মনে করেই অসম্ভব কিছু হয়ে ওঠার কষ্টকর প্রয়াস করে যাবে। আরও ক্ষতি হয়ে যাবার আগে এই অবস্থা থেকে আমাদের শিশুদের উদ্ধার করতে উদ্যোগী হতে হবে। মনে রাখতে হবে – এই প্রজন্মের শিশুরাই আমাদের নিরাপত্তা, আমাদের সোনালী ভবিষ্যৎ।
  • জনতার খেরোর খাতা...
    শাসকদলের দোলনায়  - কালের নৌকা | মে মাসের চার তারিখের আগেও যাঁরা তৃণজীবী শিল্পী সাহিত্যিক গায়ক বাদক সেলেব্রিটি হিসাবে সমাজে মান্য এবং গণ্য হয়ে বিরাজ করছিলেন। তাঁদের ভিতরে অনেকেই গুটি গুটি এক পা দুই পা করে জুন মাস থেকেই পদ্মজীবী শ্রীমুখে নতুন করে আত্মপ্রকাশ করতে শুরু করেছেন। এ যেন অনেকটা সেই বাবা মায়ের হাত ধরে ‘হাঁটি হাঁটি পা পা, খোকন হাঁটে দেখে যা’। অর্থাৎ এই শ্রেণীর কলাকুশলীদের শৈশবস্থা আজীবনেও ঘোঁচে না। শৈশবে বাবা মায়ের হাত। আর সেলেব্রিটি হয়ে শাসকদলের হাত না ধরে এঁরা নিজের পায়ে হাঁটতে অপরাগ। অবশ্য তাতে দল বদল করা বিধায়ক সাংসদদের মতোই এঁরাও ন্যূনতম লজ্জাটুকুও বোধ করেন না। এবং জনারণ্যে তাতে তাঁদের কান কাটাও যায় না বোধহয়। যাক বা না যাক। মানুষ তাঁদের চেনে। মানুষ জানে, শাসকদলের দোলনার বাইরে এই শ্রেণীর শিল্পী সাহিত্যিক কবি নাট্যকার গায়ক বাদক ইত্যাদি, কেউই নিরাপদ বোধ করেন না। এখন ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণ যদি হয়, তবে অন্য কথা। কেউ যদি ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়ে শাসকদলের বৃত্তে নিজেকে বন্ধক রাখতে বাধ্য হন, সে অন্য কথা। আত্মরক্ষার অধিকার প্রত্যেকের মৌলিক অধিকার। সেই বিষয়ে কারুর কিছু বলার থাকতে পারে না। কিন্তু এই যে শাসকদলের দোলনা। সেই দোলনায় চড়ার জন্য যদি কেউ সত্যিই বায়না ধরেন। যদি কেউ মরিয়া হয়ে ওঠেন। যদি কেউ বিশ্বাস করতেই শুরু করে দেন, শাসকদলের দোলনায় না চড়তে পারলে জীবন বৃথা। রাজনৈতিক অনৈতিক সুযোগ এবং সুবিধেগুলির প্রতিই যদি কোন কোন শিল্পী সাহিত্যিক কবি লেখক গায়ক বাদক অভিনেতা অভিনেত্রীরা লোভাতুর হয়ে ওঠেন, তবে জনতারও কিছু কথা বলার হক রয়েছে বইকি।শাসকদলের দোলনা ছাড়া যাদের মন মানে না, শাসকদলের হাত না ধরে যাঁরা এক পাও হাঁটতে পারেন না। যাঁরা মনে করেন, শাসকদলের দোলনায় চড়ে, শাসকদলের হাত ধরে হাঁটি হাঁটি পা পা করে নিজের এবং নিজের উত্তরাধিকারীদের কয়েক পুরুষের আখের গুছিয়ে দিয়ে যেতে পারলে তবেই শিল্পী সাহিত্যিক কবি গায়ক বাদক অভিনেতা ইত্যাদি হওয়া সার্থক। তাদের বিরুদ্ধে কিছু কথা বলার হক তো জনতারও থাকা উচিত। অবশ্য জনতা যদি শুধুমাত্র ভোটার না হয়, তবেই। শুধুমাত্র ভোটার যাঁরা, তাঁদের কিন্তু নিজের কোন কথাই থাকে না। তাঁদের কথা আলাদা। কিন্তু জনতার চোখ কিন্তু পরিস্কার। মে মাসের চার তারিখের আগের চিত্র। আর সেই চার তারিখের পরের চলমান চালচিত্র দেখতে দেখতে জনতা যদি বিরক্ত হয়ে ওঠে, তবে তার জন্য জনতাকে দোষ দিই কি করে। কয়দিন আগে অব্দিও যে সব তৃণজীবীদের ঘাসফুলের মঞ্চ আলোকিত করে ঝিঙ্ককুরাকুর নৃত্য করতে দেখা যেত, মাননীয়ার চেয়ার মুছে দেওয়ার লাইনে যাঁদেরকে সদা তৎপর থাকতে দেখা যেত। আজ যদি তাঁরাই এপাং ওপাং ঝপাং করে পদ্মজীবী হয়ে ওঠার লাইনে দাঁড়িয়ে যেতে থাকেন একের পর এক। তবে তো কিছু কথা বলতেই হয়।একটি সমাজের পক্ষে এই শ্রেণীর লোকজন শুধুই বোঝা নয়, অনেক সময়েই বিপদজনকও বটে। এইসব মোসাহেবদের মোসাহেবিই শাসকদলগুলিকে আরও বেশি স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে উঠতে সাহায্য করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে ইতালি জার্মানী সহ বিভিন্ন দেশেই এই শ্রেণীর মোসাহেবদের কারণেই স্বৈরতান্ত্রিক শক্তিগুলি রীতিমত ফুলেফেঁপে উঠেছিল। এবং এদের পরিবৃত হয়েই সেইসব স্বৈরতান্ত্রিক শক্তি সর্বশক্তিমান হয়ে ওঠার খেলায় মেতে উঠেছিল। আমাদের দেশেও তেমনই ঘটনা যে ঘটতে চলছে না, নিশ্চিত করে কে বলবে? বিশেষ করে ঈশ্বরপ্রেরিত যে ‘ননবায়োলজিক্যাল’ থিওরির আমদানি হয়েছে সম্প্রতি, তাতে সিঁদুরে মেঘ দেখলে সেটি চোখের দোষ নাও হতে পারে। স্বৈরতান্ত্রিক শক্তি সবসময়েই দোলনায় চড়া শিল্পী সাহিত্যিক লেখক কবি গায়ক বাদক অভিনেতাদের মাধ্যমেই সাধারণ জনতাকে অন্ধভক্ত ভোটারে পরিণত করে ফেলে। এই কারণেই বলছিলাম। এই যে শাসকদলের দোলনা। সেই দোলনায় চড়া শিল্পী সাহিত্যিক লেখক কবি গায়ক বাদক অভিনেতারা শুধুই জনতার পক্ষে বোঝা নয়। তাঁরা জনতার পক্ষেই চরম বিপদজনক। জনতা টেরও পাবে না। কখন সে অন্ধভক্ত ভোটারে পরিণত হয়ে গিয়েছে। স্বৈরতন্ত্র যদি নির্বাচন প্রক্রিয়া বাদও দিয়ে দেয়, তবুও সেই অন্ধভক্তদের কারণেই স্বৈরতন্ত্র অধিকতর সময়ের জন্য দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে। তখন সেই শক্তির মোকাবিলা খুবই কঠিন কিন্তু। তাই আজকে যাঁরা পদ্মজীবী হয়ে ওঠার লাইনে দাঁড়িয়ে। আজকে যাঁরা নিজেদের তৃণজীবী পরিচয় পল্টিয়ে পদ্মজীবী পরিচয়ে শ্রীমুখ প্রকাশে অধিকতর তৎপর। তাঁরা কিন্তু জনতার পক্ষে সত্যিই বিপদজনক। এঁদের একটিই কাজ। শাসকদলের দোলনায় চড়ে জনতাকে অন্ধভক্তে পরিণত করা। আর তার পারিশ্রমিক বাবাদ নিজের চৌদ্দো পুরুষের আখের গুছিয়ে নেওয়া। শাসকদলের হাত ধরে হাঁটি হাঁটি পা পা করা নিছক শৈশবাস্থার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তও নয়। ওটাই জনতাকে বশে আনা ও বশীভুত করে বশে রাখার খেলা।©কা:নৌ ২৮শে জুন ২০২৬ 
    গুন্ডাদমন - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | দলীয় রাজনীতি বা কচকচি ছাড়ুন, ভারতীয় নাগরিকদের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গীর একটা বিরাট পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। আগেই ছিল, কিন্তু গতি ক্রমশ বাড়ছে। একটা সময়, ঢিলেঢালা ভারতীয় ইউনিয়নে দুটো জিনিস প্রায় ধ্রুবসত্য ছিল, ১। কেউ কোনো অভিযোগ আনলে প্রমাণের দায় তার। ২। দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত, সব্বাই নির্দোষ। এই দুটো জিনিসই ক্রমশ উবে যেতে বসেছে। শুধু অপরাধের ক্ষেত্রে নয়, সর্বত্র। মিডিয়ায় দেখুন, কে দোষী আর কে নয়, খাপ পঞ্চায়েতে আগেই ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে, তথ্য প্রমাণ যুক্তি, এসবের আর জায়গা থাকছেনা। আইনে দেখুন, ইউএপিএ বা অর্থনৈতিক অপরাধ সংক্রান্ত আইনগুলো এমনভাবেই তৈরি হয়েছে, যে, অভিযোগ এলেই কিছু বছর জেল খেটে নিতে হবে, প্রমাণ-টমান পরের কথা। আর সঙ্গে মিডিয়া ঢাক পেটাবে, যে, ওই দেখো অপরাধী। আদালতের এখানে কিছুই করার নেই, তারা আইন বানায়না। যেখানে আদালতের কিছু করার আছে, সেখানেও দেখা যাচ্ছে এই প্রবণতা। ২৬০০০ চাকরি বাতিলের কথা মনে করুন, সেখানে নিশ্চয়ই কিছু দুর্নীতি ছিল, কিন্তু নিজেকে নির্দোষ প্রমাণিত না করতে পারায় সব্বাই শাস্তি পেয়ে গেলেন।নাগরিকত্বের কথায় আসুন। ২০০৩ এ বা আরও আগে ১৯৮৬ সালে যখন নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী হয়, তখনই একটা ব্যাপার চালু হয়েছিল, যে, একবার ভারতে জন্মে গেলেন মানেই আপনি নাগরিক তা নয়। কিন্তু তখন সুদূরপ্রসারী কল্পনাতেও কেউ এর ফলাফল ভাবেননি। ক্রমশ ব্যাপারটা দাঁড়াল এনআরসি হয়ে এসআইআরে। নাগরিকত্বের মাপকাঠি কী আর জানা যাচ্ছেনা। এমনকি পাসপোর্টও নাকি প্রামাণ্য না। ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে এই, যে, রাষ্ট্র আপনাকে কাঠগড়ায় তুলেই রেখেছে। কেউ একবার লজিকাল বা অন্য ডিসক্রিপেন্সির অভিযোগ করে দিলেই আপনি অপরাধী। এবার বিচারে গিয়ে প্রমাণ করুন আপনি অপরাধী নন।জনকল্যাণের ক্ষেত্রেও দেখুন। ১০০ দিনের কাজ ইত্যাদি যখন শুরু হয়, আইডিয়াটা ছিল, যে কেউ এই সুবিধা পেতে পারেন। তারপরে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এক এক করে এল স্বাস্থ্যসাথী বা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প। সবকটাই সার্বজনীন। কেউ জালি করে কিছু টাকা পেতেই পারেন, কিন্তু একজন যোগ্যও যেন বাদ না যায়, সেটাই ছিল লক্ষ্য। নতুন জমানা এসে সেটা উল্টে গেল। আয়ুষ্মান ভারত সার্বজনীন না, সে জানাই ছিল। অন্নপূর্ণার ব্যাপারটা জানা ছিলনা। কিন্তু মন্ত্রী ঘোষণাই করে দিলেন, ওটা সার্বজনীন না। বহু পাতার ফর্ম তৈরি হল, কিন্তু মজাটা হল পাবার মাপকাঠিটা কী এখনও কেউ জানেনা। কোনো একদিন জানা যেতেই পারে, কিন্তু কথাটা হল, নীতিগতভাবে ব্যাপারটা একই। বলে দিলেই হল, আপনি যোগ্য না। কিংবা জালি করেছেন। এবার আপনি প্রমাণ করতে দৌড়ন, যে, আপনি দুষ্ট না।এরপর শুনছি, কিছু একটা গুন্ডা বিল আসছে। বিশদটা জানিনা, কিন্তু আন্দাজ করা যায়, যাকে খুশি গুন্ডা আখ্যা দিয়ে অপরাধী বলে দেওয়া যাবে, যতক্ষণ না সে ব্যাটা প্রমাণ করতে পারছে সে গুন্ডা না। এবার একটা লোক নিজেকে কীকরে 'গুন্ডা-নয়' প্রমাণ করবে কেউ জানেনা। কোন কাগজ দেখাবে, ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট? অবশ্য কাগজের আর কী মূল্য। কোন কাগজে নাগরিক প্রমাণ করা যাবে তাইই কেউ জানেনা, তো গুন্ডা।কথা হল, রাজনীতি-টিতি বাদ দিলেও রাষ্ট্রের চরিত্রে এই তফাতটা হচ্ছে, খালি চোখেই দেখা যাচ্ছে। নাগরিককে সামগ্রিকভাবেই দেখা হচ্ছে সন্দেহের চোখে। এবং বিচারেও দায়টা নাগরিকেরই। পুরোটাই কীরকম ডিমের ন্যায়বিচার ধরণের। আগে তো ডিম ছুঁড়ে নিই। মিডিয়ায় বলে দিই জনরোষ। ধরে নিই। তারপর সে ব্যাটা এসে প্রমাণ করুক, সে অপরাধী নয়। এবং এই পদ্ধতির গতিটা ক্রমশ বাড়ছে, কমছে না।বিখ্যাত গুন্ডাদমন আইনের খসড়াটা দেখার সৌভাগ্য হল। পশ্চিমবঙ্গে দুটো জমানা দেখেছি, এর ধারেকাছেও কিছু দেখিনি। এবার অবশ্য অনেক কিছুই নতুন। বাম জমানায় কিছু হলেই শুনতাম ৭২-৭৭ এর সন্ত্রাসের কথা। তৃণ জমানার লব্জ ছিল ৩৪ বছরের অপশাসন। এই বারই প্রথম দেখছি, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করতে। ডিম ছুঁড়ছেন কেন? জিজ্ঞাসা করলে শোনা যাচ্ছে, জানেন ওরা এলে ক্ষেপনাস্ত্র ছুঁড়ত? কোমরে দড়ি দিয়ে ঘোরানো হচ্ছে কেন? না, ওরা এলে তো গলায় দড়ি দিয়ে দিত। এর পুরোটাই চলছে বীরবিক্রমে, মিডিয়ার সম্পূর্ণ সমর্থন সহ, যেটা আগের কোনো জমানায় দেখিনি।এই পুরো যে জিনিসটা চলছে, সেটাকে সারসংক্ষেপ করে সরকারি করে দিলেই পাবেন গুন্ডাদমন বিল, যার পোশাকি নাম হবে 'পশ্চিমবঙ্গ জনসুরক্ষা সমাজবিরোধী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ বিল আইন, ২০২৬'। এতে সমাজবিরোধী কার্যকলাপ কাকে বলা হয়েছে? সাতটা জিনিসকে, তার মধ্যে প্রথমটাই হল, "সমাজবিরোধী কার্যকলাপ মানে হল সমাজবিরোধীদের এমন কাজ, যা সরাসরি অথবা ঘুরিয়ে জনসাধারণ বা তার কোনো অংশের মধ্যে সতর্কতা, বিপদ, ভয়, নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে, বা তার সম্ভাবনা থাকে'। ভাবুন। একে তো সমাজবিরোধীতার সংজ্ঞার মধ্যেই সমাজবিরোধী ঢুকে বসে আছে। জ্যান্ত জিনিসের কার্যকলাপকেই বলে জীবন - ধরণের ব্যাপার। কিন্তু তার চেয়েও বড় ব্যাপার হল, জনতার কোনো অংশ, ধরুন জনতার একাংশ, ধরুন শাসক দলের মধ্যে আপনার কার্যকলাপে সতর্কতা তৈরি হল, বা হবার সম্ভাবনা হল। ব্যস, আপনি সমাজবিরোধী কার্যকলাপে যুক্ত হয়ে গেলেন। অতএব সমাজবিরোধীও।"গুন্ডা"রও একটা সংজ্ঞা আছে প্রস্তাবিত বিলে। গুন্ডা চার রকম ভাবে হওয়া যেতে পারে। তার মধ্যে একটা হল, "সাধারণভাবে জনসমাজে মরীয়া এবং বিপজ্জনক বলে সুপরিচিত"। মরীয়া হওয়ায় কী সমস্যা বুঝিনি। কিন্তু তার চেয়েও বড় হল, শুনে মনে হবে, টিভির "জনরোষ"এর খবর দেখছেন।এই দুটো যোগ করলেই আপনি পেয়ে যাবেন, ভবিষ্যৎকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করার আইন। তিনটি ছেলে কারো বাড়িতে চড়াও হলে টিভিতে এখন কী বলে? "অমুক খুব বিপজ্জনক হতে পারে, ছাড়া থাকলে কী করবে বল মুশকিল, তাই জনরোষ আছড়ে পড়েছে", এই তো মোটামুটি। এখন আইনেই পাচ্ছেন, অমুক মরীয়া এবং বিপজ্জনক হিসেবে এলাকায় সুপরিচিত, তাই গুন্ডা। আর অমুককে দেখে অমুকের আতঙ্ক হচ্ছে, তাই অমুক সমাজবিরোধী।কিন্তু এ তো শুধু চিহ্নিত করা। তারপর কী হবে? অনেক লম্বা লম্বা ক্লজ আছে। কে কাকে চিহ্নিত করতে পারবেন, কে কী করতে পারবেন। কিন্তু মোদ্দা কথাটা হল, রাজ্য সরকার চাইলে একজন ডিএম বা এসপির নির্দেশানুসারে এই ধরণের লোকজনকে সংশোধনাগারে "ডিটেন" করে রাখা যেতে পারে। সেটা এক বছর অবধি হতে পারে। যেহেতু গ্রেপ্তার নয়, তাই কোর্ট-টোর্টের কোনো উল্লেখ দেখলামনা। একটা অ্যাডভাইসারি বোর্ড তৈরি করবে সরকার, সিদ্ধান্ত খতিয়ে দেখার জন্য তাদের কাছে যেতে পারে। এছাড়াও, গুন্ডা সন্দেহ হলেই, যেকোনো জায়গায় ঢোকা, সার্চ করা, সিজার, এসবও করা যাবে, ওয়ারেন্ট টোয়ারেন্টের কোনো উল্লেখ নেই। কোনো এলাকা থেকে এলাকাছাড়াও করা যেতে পারে। ফলে মোদ্দা ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, জনতার একাংশ, ধরুন, শাসক দলের মনে হল আপনি বিপজ্জনক। তারপর সরকার চাইলেই, আপনাকে গুন্ডা আখ্যা দিয়ে যেখানে খুশি সার্চ করতে পারে, যেকোনো এলাকায় ঢোকা নিষিদ্ধ করতে পারে। এবং ১ বছর অবধি জেলে ভরে রাখতে পারে। বিচারের ব্যাপারই নেই, কারণ, জেলে থাকলেও আপনি গ্রেপ্তার তো হননি। ভাবুন, কী অসাধারণ উদ্ভাবন। জঙ্গলের রাজত্বকে আইনে পরিণত করার এর থেকে সুবন্দোবস্তো পাওয়া কঠিন।
    গুণ্ডা আইন, মিড ডে মিলে ইস্কন, হকার উচ্ছেদ - হাতে রইল ডিম  - Bhutanoya | বৃটিশ রাজের সময়ে রাওলাট আইন যখন নেমেছিল, ভারতে ব্যাপক প্রতিবাদ হয়, এবং পুলিশি সন্ত্রাস নেমে আসে। জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড হয়। কিন্তু তার পরেও প্রতিবাদ থামানো যায়নি। শেষমেষ রাওলাট আইন তুলে নিতে বাধ্য হয় বৃটিশরা। এখন ওই আইনেরই বিজেপি ভার্শন নেমেছে বিধানসভায়। তবে এখন বাঙালী ডিম খাওয়ার অপকারিতা এবং ডিম ছোঁড়ার উপকারিতা নিয়ে রচনা লিখছে। গুণ্ডা আইনের উপকারিতা নিয়েও রচনা শুরু হবে, এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত