এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    শ্রী শ্রী উনিজি কথামৃত - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় ও কণিষ্ক | প্রকাশিত হলো দুই মলাটে বৈদ্যুতিন উনিজি কথামৃত।লিখেছেন সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়, এঁকেছেন নবীন শিল্পী কণিষ্ক। শিল্পীর সম্পর্কে বেশি জানা যায়নি, তিনি রাতের অন্ধকারে মেলবক্সে ছবির বান্ডিল ফেলে দিয়ে গেছেন। জানিয়েছেন উনিজির প্রতি অনুগত থাকতে চাইলে মাথা বর্জন করা ভালো, আর অনুগত থাকতে না চাইলে গর্দান যাওয়ার সম্ভাবনা, সুতরাং আগে থেকে মুন্ডু বিসর্জন দেওয়াই বিধেয়। নামিয়ে নিন, ছড়িয়ে দিন - উনিজি কথামৃত - পিডিএফ সংস্করণ।আরও নতুন ছবি ও গল্প এতে যোগ হয়েছে।
    ভক্স পপুলি - যদুবাবু | “In general, a law which has not been voted unanimously involves subjecting men to an opinion which is not their own, or to a decision they believe contrary to their interest. It follows that a very great probability of the truth of this decision is the only reasonable and just grounds according to which one can demand such submission.”        - Marie-Jean-Antoine-Nicolas de Caritat, Marquis de Condorcet (September 17, 1743–March 28, 1794)এই লেখাটা যখন লিখছি, অর্থাৎ এই ২০২৪-এর এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে, আমাদের চারদিকে ভোটের দামামা বেজে গেছে। সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে সমস্তরকম খবরের চ্যানেল ভরে গেছে ভোট-সংক্রান্ত খবরে, হয় দলবদলের অলীক কুনাট্যরঙ্গ, না হলে অপদার্থ রাজনীতি-ব্যাবসায়ীদের তামাশা, অথবা কাদা-ছোঁড়াছুঁড়ির মহড়া। ভোট যত এগিয়ে আসবে, নিউজ়-ফিড ভরে যাবে বিচিত্র-বিবিধ সব “ফলিবেই ফলিবে” গোছের ভবিষ্যদ্বাণীতে, আর সেই নিয়ে নিত্যি তুফান উঠবে চায়ের কাপে আর আড্ডায়-তর্কে।ভোটের ফলের পূর্বাভাস অথবা প্রেডিকশন কিন্তু সেই সমস্ত জটিল ধাঁধার মত—পরীক্ষায় যেসব প্রশ্নের উত্তর মাথা খাটিয়ে হোক কিংবা হল-কালেক্ট করে বা স্রেফ আন্দাজে ঢিল মেরে একবার মিলিয়ে দিতে পারেন, কেউ খুব বেশি মাথা ঘামাবে না ঠিক কেমন করে, কোন মেথডে মিলিয়েছেন। আমাদের ভাষায়, ইন্টারপ্রিটেবিলিটির (“কী করে?”) চাইতে অ্যাকিউরেসির (“কতটা মিলেছে”) দর ও কদর অনেক বেশি। আবার এও ঠিক, যে এই প্রতিযোগিতার পুরস্কার-তিরস্কার দুইই একটু বেশির দিকে। মিলিয়ে দিতে পারলে রাতারাতি সেলিব্রিটি, সবাই এসে থানে গড় করবে—যেমনটা হয়েছে বাবু নেট সিলভারের বেলায়—আর ফস্কে গেলে পাড়ার লোকে এসে বলে যাবে ‘সব ঢপ!’ সেই সঙ্গে, শুধু আপনার না, আপনার গোটা ফিল্ডের পাৎলুন ধরে টানামানি ব্যাপার।সে যাই হোক, আপনাদের যদুবাবু সেফোলজিস্ট নন, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ অর্থাৎ পোলিটিক্যাল পানডিট (পন্ডিত) – সেও নন। তবে নেট সিলভারের নামে ধন্যধন্য হয়েছিল যে বছর, যদুবাবুও সেই সময় কিঞ্চিৎ গৌরবে বহুবচ্চন হননি এ কথা বললে ডাহা মিথ্যে বলা হবে। তবে, আজ সে সব না। আজকে প্রেডিকশনের ধারকাছ দিয়েও যাবো না আমরা। বরং আমরা উত্তর খুঁজবো আরও গভীর, কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে অতিসাধারণ একটি প্রশ্নের – গণতন্ত্র যে নির্বাচনের ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে, সেই জনমত কি সবসময়েই অভ্রান্ত? Is the vox populi always correct? সহজ করে বললে, একদল মানুষ অর্থাৎ ভোটদাতা কি সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সবসময়েই ঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারেন? আরেকভাবে বললে, যে মেজরিটি ভোটিং-এর উপর আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোটিই দাঁড়িয়ে, সেই মেজরিটি কি সবসময়েই একটি অবজেক্টিভ (অর্থাৎ নৈর্ব্যক্তিক) সত্যতে পৌঁছুতে পারে? যদি পারে, তাহলে কখন পারে? আর যদি না পারে, তাহলে ঠিক কেমন ব্যাপার হয় সেটা? সামান্য এদিক-ওদিক দিয়ে কান ঘেঁষে না একেবারে বিচ্ছিরিভাবে ভুল? (এখানে ধরে নেওয়াই হচ্ছে যে একটি অবজেক্টিভ (অর্থাৎ বস্তুনিষ্ঠ বা নৈর্ব্যক্তিক) সত্যি আছে, অথবা, নির্বাচনের দিক থেকে ভাবলে সবার জন্যই (তর্কাতীতভাবে) মঙ্গলদায়ক এমন নীতি আছে।এই যে সকলে মিলে ঠিক উত্তরে বা ঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর ফেনোমেনন বা ঘটনা, এর-ই পোশাকি নাম “উইজ়ডম অফ ক্রাউড”, বাংলায় “সমষ্টিগত প্রজ্ঞা”। দর্শনে বা বিজ্ঞানের ইতিহাসে উইজ়ডম অফ ক্রাউডকে ব্যাখ্যা করার অথবা সংজ্ঞায় বা সূত্রে ধরার চেষ্টা বহুদিনের। আরও বহু জিনিসের মতোই, এর-ও সুতো ধরে টানতে টানতে পৌঁছে যাই সেই প্রাচীনকালের দার্শনিক অ্যারিস্টোটলের কাছে। ইনফর্মেশন এগ্রিগেশনের, বা তথ্য একত্র করার উপযোগিতার কথা সেই যুগে যারা ভাবতেন, তাঁদের মধ্যে সম্ভবত উনিই প্রথম। তবে, রাশিবিজ্ঞানের ছাত্রের কাছে “উইজ়ডম অফ ক্রাউডের” অতিপরিচিত গল্প অবশ্যই স্যার ফ্রান্সিস গ্যালটনের সেই বিখ্যাত এক্সপেরিমেন্ট, যেটি ছাপা হয়েছিল নেচার পত্রিকার মার্চ ১৯৪৯ সালের একটি নিবন্ধে, শিরোনাম “ভক্স পপুলি”। কীরকম ছিল সেই এক্সপেরিমেন্ট? গ্যালটন বর্ণনা দিয়েছেন প্লাইমাউথের একটি মেলার। সেখানে গেলে দেখা যেত একটি হৃষ্টপুষ্ট দুর্ভাগা ষাঁড় (ফ্যাটেনড অক্স) দাঁড়িয়ে আছে মেলার ঠিক মধ্যিখানে। দাঁড়িয়ে থাকার উদ্দেশ্য দর্শকদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতা – এই ষাঁড়টিকে কেটেকুটে পরিষ্কার করার পর সেই মাংসের ওজন কত হবে আন্দাজ করার। প্রতিযোগিতার প্রবেশমূল্য ধার্য করা হল ছয় পেনি, আর সবথেকে কাছাকাছি উত্তরের জন্য একটি পুরস্কার। গ্যালটন লিখছেন, ঐ ছয় পেনি মূল্যের উদ্দেশ্য—যাতে কেউ ইয়ার্কি মেরে ভুলভাল আন্দাজ না করেন (‘prevent from practical joking’), আর পুরস্কার পাওয়ার আশায় যারা আন্দাজ করছেন, তাঁরাও যথাসম্ভব সেরা আন্দাজ-ই করবেন (‘put the best bet’)। আর লিখেছেন, প্রতিযোগীদের বেশিরভাগ হয় চাষি, না হলে পশুপালক বা কসাই – কাজেই একেবারেই অন্ধকারে ঢিল ছোঁড়ার মত ব্যাপার নয়। ফল কী হল? গ্যালটনের পেপারে পাই, সেইদিনের ৮০০খানা উত্তরের মধ্যে ১৩টি অসম্পূর্ণ উত্তর বাদ দিয়ে যা পড়ে থাকে, তার মধ্যমা (মিডিয়ান) নিলে দাঁড়ায় ১২০৮ পাউন্ড, আসল ওজন—১১৯৭ পাউণ্ডের—এক শতাংশের মধ্যেই, আর গড় (অর্থাৎ মিন) নিলে উত্তর একেবারেই মিলে যাচ্ছে খাপে-খাপ, যাকে বলে নিখুঁত লক্ষ্যভেদ [Wallis, 2014]। উপসংহারে গ্যালটন মন্তব্য করছেন, “This result is, I think, more creditable to the trustworthiness of a democratic judgment than might have been expected.” …শুধু আন্দাজ-মেলানো বা খেলা নয়, সমষ্টিগত প্রজ্ঞার বিভিন্ন ও বিচিত্র উদাহরণ কিন্তু দেখা যায় আমাদের প্রায় সমস্ত উদ্যোগেই, যেখানেই সিদ্ধান্ত নেওয়া (ডিসিশন-মেকিং) আর কিঞ্চিৎ অনিশ্চয়তা (আনসার্টনটি) মিশে আছে এমন সব ক্ষেত্রেই। যদি সত্য ধ্রুবক হয়, আর সমস্ত ভ্রান্তি যদ্দৃচ্ছ, অর্থাৎ এক-একটি ভুল এক-একদিকে টানছে (অর্থাৎ এররগুলো র‍্যান্ডম, সিস্টেমিক নয়), তাহলে গড় নিলে সেই সব ভুলগুলি কাটাকুটি করে ফলাফলের খুঁতশূন্যতা বা অ্যাকিউরেসি বাড়তে বাধ্য। এই নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্য পাঠকদের “The Wisdom of the Crowds” [Surowiecki, 2005] বইটি সুপারিশ করে যাই।কিন্তু আজকের গল্প আরও পুরোনো – এরও প্রায় দেড়শো বছর আগের ফ্রান্স যার পটভূমি। ইতিহাস বলে উইজ়ডম অফ ক্রাউডের প্রথম যথাযথ অঙ্কের সূত্র এসেছিল সেই ‘এজ অফ এনলাইটেনমেন্টের’ সময়, ফরাসি বিপ্লবের ঢেউ আছড়ে পড়ার অব্যবহিত আগে। সেই গল্পের নায়ক কনডরসে, পুরো নাম Marie Jean Antoine Nicolas de Caritat, Marquis de Condorcet! কনডরসে-কে বলা হয় “দি লাস্ট অফ দ্য ফিলোজ়ফস”, সেই “আলোকিত যুগের শেষ সাক্ষী” – ফরাসী বিপ্লবের ইতিহাসের একজন অতিমানবিক এবং অবশ্যই ট্র্যাজিক হিরো। তার গপ্পো করতে গেলে গোটা একটা বই-ই লিখে ফেলা যায়, তবু ছোট্ট করে বলি। কনডরসে মানবাধিকার ও সাম্যবাদে বিশ্বাস করতেন – সাম্যবাদ শুধু সব বর্ণের মধ্যেই নয়, সমস্ত অর্থনৈতিক শ্রেণির, এবং পুরুষ ও নারীর মধ্যেও। স্বল্প জীবনকালেই তিনি ওকালতি করেছিলেন শিক্ষাগত সংস্কার, প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার, ঔপনিবেশিক দাসত্বের বিলুপ্তি এবং নারীর সমানাধিকার, বিশেষ করে সব জাতির সমতার জন্য এবং নারীদের ভোটাধিকার (উইমেন্স’ সাফ্রেজ) প্রশ্নের। এবং এই শেষতম প্রশ্নে, কনডরসে সেই আলোকিত যুগেও যেন উজ্জ্বল ব্যতিক্রম [Landes, 2009]।  শেষ জীবনে, সেই কুখ্যাত রেইন অফ টেররের রোবস্পিয়েরের ভয়ে আত্মগোপন করা অবস্থাতেও তিনি লিখে চলেছেন তার সেরা কাজ Esquisse — লিখছেন সমাজের অগ্রগতির (“উন্নয়ন” বা “বিকাশ” আজকাল ব্যাঙ্গাত্মক শোনায়) কাঠামো, যার মূল স্তম্ভ মানুষের অসীম পরিপূর্ণতা (indefinite perfectibility of humankind and society)। কনডরসে-র আরও এক অন্যতম অবদান, “সোশ্যাল অ্যারিথমেটিক” – আজকে দাঁড়িয়ে মনে হয় সমাজের বিভিন্ন জটিল সমস্যায়, আর্থিক পরিকল্পনা থেকে জুরি-র সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অথবা জনস্বাস্থ্য, সর্বব্যাপী রাশিবিজ্ঞান বা সম্ভাব্যতা-তত্ত্বের প্রয়োগের এক্কেবারে শুরুর দিকে চিন্তক ও দার্শনিক উনিই।উইজ়ডম অফ ক্রাউডের গল্পে ফিরে আসি আবার। গ্যালটনের ১৬৪ বছর আগে, এই কনডরসে-ই, প্রথম অঙ্কের সূত্রে বেঁধেছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠের ব্যবহার – সমষ্টিগত প্রজ্ঞা অথবা মূর্খামি, দুইই। সেই বিখ্যাত উপপাদ্যটিই আজকে পরিচিত কনডরসে জুরি থিওরেম নামে, সংক্ষেপে CJT [Condorcet, 1785]। সেই উপপাদ্যটিই এখানে ছোট্ট করে, এবং সহজতম ভার্সনটিই, লেখার চেষ্টা করি। এই নিয়েও অবশ্য আস্ত বই আছে - Goodin and Spiekermann [2018], যদি পাঠকদের কারুর বিশদে পড়তে ইচ্ছে করে।আবারও, ধরে নেওয়া যাক একটি অবজেক্টিভ অর্থাৎ বস্তুনিষ্ঠ সত্যি বা সেরা বিকল্প আছে, সেটা কী—না জানলেও চলবে, কিন্তু সে আছে, সেইটির জন্যেই ভোটাভুটি হচ্ছে। আর ধরা যাক আমাদের n-সংখ্যক ভোটার আছে, n বিজোড় সংখ্যা (অর্থাৎ “টাই” অসম্ভব)। প্রত্যেক ভোটারের ঠিক বিকল্পে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা ধরা যাক pc, এবং সবার ভোট পড়ে গেলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে “মেজরিটি রুল” অনুযায়ী, অর্থাৎ যে সবথেকে বেশি ভোট পাবেন, সেটিই আমাদের গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত। কনডরসে-র উপপাদ্যে এও ধরে নেওয়া হয়, যে, প্রত্যেক ভোটার ‘স্বতন্ত্র’, ‘দক্ষ’ এবং ‘আন্তরিক’। ‘স্বতন্ত্র’ – অর্থাৎ যে যার নিজের ভোট দিচ্ছেন বা একজনের পছন্দ আরেকজনকে প্রভাবিত করে না। ‘দক্ষ’ – অর্থাৎ, প্রত্যেকের ঠিক বিকল্প খুঁজে নেওয়ার সম্ভাবনা অর্ধেকের থেকে বেশি, যত সামান্যই হোক, এক্কেবারে র‍্যান্ডম গ্যেস অর্থাৎ ইকির-মিকির-চামচিকির করে আন্দাজে যা-ইচ্ছে-তাই একটা বোতাম টিপে দেওয়ার থেকে তার প্রজ্ঞা বা দক্ষতা একচুল হলেও বেশি। আর শেষ অ্যাজ়াম্পশনের কথা আগেও লিখেছি, ভোটার-রা ‘আন্তরিক’, সিরিয়াস-ও বলা যায়—কেউ ইচ্ছে করে ভুলভাল ভোট দিয়ে নষ্ট করছেন না।কনডরসে-র উপপাদ্য বলে, এই সমস্ত অ্যাজ়াম্পশন সত্যি হলে, দুটো জিনিস হবেই – প্রথমত, মেজরিটি ভোটিং-এর মাধ্যমে ঠিক বিকল্প খুঁজে নেওয়ার সম্ভাব্যতা যেকোনো একজন ভোটারের ঐ এক-ই সম্ভাব্যতার থেকে বেশি হবে, আর যত ভোটারের সংখ্যা বাড়বে, ততই ঐ ঠিক উত্তরে পৌঁছনোর সম্ভাব্যতা ১-এর কাছাকাছি (অর্থাৎ ১০০%-এর কাছাকাছি) পৌঁছবে। সোজা বাংলায়, প্রচুর প্রচুর লোকে ভোট দিলে একেবারে ঠিক উত্তরে বা সেরা বিকল্পে পৌঁছনোর গ্যারান্টি দিচ্ছে CJT!অঙ্কের ফর্মুলা এই নিবন্ধে না দিলেও চলে, এবং ইচ্ছে করলেই এই সূত্রটি সোজা টপকে পরের প্যারায় লাফিয়ে চলে যেতেই পারেন, তবে এত সুন্দর ফর্মুলা, যে না দিয়ে থাকতে পারছি না। CJT বলছে, যদি মেজরিটি ভোটিং-এর সিদ্ধান্ত “ঠিক” হওয়ার সম্ভাব্যতা হয় Pn আর এক-একজন ভোটারের “ঠিক” ভোট দেওয়ার সম্ভাব্যতা হয় pc, তাহলে অল্প অঙ্ক করলেই যে সূত্রটি পাওয়া যায় সেটা এইরকম: অর্থাৎ, CJT বলছে pc >1/2 হলে, অর্থাৎ দক্ষ ভোটার হলেই,১) Pn+2 > Pn (মানে একজনের থেকে তিনজনের গড় নিলে ঠিক উত্তরে পৌঁছনোর সম্ভাবনা বেশি) আর২) Pn → 1 as n → ∞  (মানে যত বেশি দক্ষ ভোটার ভোট দেবেন, তত ১-এর দিকে ক্রমাগত এগিয়ে যাব, নিচের ছবির উপরের ভাগে যেমন দেখা যাচ্ছে।) বলাই বাহুল্য, যে এইটি একটু থেঁতো করে লেখা। এই উপপাদ্য একটু এদিক-ওদিক করলেও টেঁকে, যেমন সবার ঠিক উত্তর দেওয়ার সম্ভাবনা সমান নয়, না হলেও চলে, প্রত্যেকের সম্ভাবনা “আধা সে জ্যায়াদা” হলেই কেল্লা ফতেহ। আরো কিছু খোল ও নলচে পাল্টানো যায়, তবে কিনা, সে রাস্তায় আমরা আজকে যাবো না।এই আশ্চর্য সুন্দর অথচ সহজ আবিষ্কারটি কিন্তু বহুদিন হারিয়ে গেছিল ইতিহাসের গর্ভে। তাকে খুঁজে পাওয়া যায় দীর্ঘ সময় পরে, ডানকান ব্ল্যাক ও অন্যান্যদের ১৯৫৮ সালের একটি গবেষণাপত্রে। শুধু জুরি থিওরেম-ই নয়, কনডরসে-র বিখ্যাত ভোটিং প্যারাডক্সটিও। সেটা আবার আরেক আশ্চর্য জিনিস – ধরা যাক তিনটে পার্টি আছে, ক, খ আর গ। তাহলে, মেজরিটি ভোটিং-এর ফলে এমন হতেই পারে, যে মানুষ ক-র থেকে বেশি পছন্দ করে খ-কে, আবার খয়ের থেকে বেশি গ-কে, অর্থাৎ গ > খ, এবং খ > ক, কিন্তু অঙ্কের মত এর মানেই গ > ক ভোট পাবে তার গ্রান্টি নেই, সবাই ভোট দেওয়ার পর হয়তো দেখা গেল ক, গ-কে হারিয়ে দিয়েছে। খটোমটো করে বললে, ব্যক্তিবিশেষের পছন্দ চক্রাকার নয়।এই যেমন নিচের টেবিলটি দেখুন, আপনি যদি বলেন “গ”-ই সেরা, তক্ষুণি রাম আর শ্যাম বলবে – কেন, আমরা তো “গ”-এর থেকে “খ”-কে বেশি ভালোবাসি। আবার যেই বললেন – ঠিক আছে, তাহলে “খ”-কে জয়ী ঘোষণা করে দাও, তখন রাম আর মধু বলবে – সে কী! আমাদের চোখে তো “ক” অবশ্যই “খ”-এর থেকে ভালো। তাহলে কি “ক”-ই প্রধান-সেবক? নাঃ, শ্যাম আর মধু বলছে তাদের চোখে “গ”>”ক”! এ তো মহা মুশকিল! (উপরের টেবিলে যদু কেন মিসিং সে প্রশ্ন প্লিজ করবেন না।)এই ধাঁধার জট ছাড়াতেও আরেকটা গোটা লেখা দরকার, তবে কিনা, এই ছোট্ট ধাঁধার মধ্যেই লুকিয়ে আছে নোবেলজয়ী অ্যারো’জ় ইম্পসিবিলিটি থিওরেমের মূল সুর। যার মোদ্দা কথা – যে একদম সুষ্ঠুতম (ফেয়ারেস্ট) ভোটাভুটি হলেও এতোল-বেতোল লোকে জিতে যেতে পারে, মানে যাকে বলে ডেমোক্রেসির ফুটুরে একাধিক ডুমাডুম, অবশ্যই কিছু কিছু শর্ত সাপেক্ষে।আবার লাইনে ফিরে আসি। এই যে উইজ়ডম অফ ক্রাউডের গপ্পো করে যাচ্ছি, এর প্রভাব বলুন বা প্রয়োগ – তা কিন্তু শুদ্ধু ভোটাভুটির ফলেই নয়, আরও অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়। যেমন, আমাদের এই মেশিন লার্নিং-এর লাইনের আনসাম্বল লার্নার, উদাহরণ র‍্যান্ডম ফরেস্ট, যার আসল কথা এই, যে অনেকগুলো মডেলের প্রেডিকশন নিয়ে গড় করলে অ্যাকিউরেসি হু-হু করে বেড়ে যায়, যদি সেই মডেলগুলোর প্রত্যেকে মোটামুটি কিছুটা স্বতন্ত্র (“কিছুটা” মানে আমাদের লবজ়ে একেবারে ইন্ডিপেন্ডেন্ট না হলেও ডি-কোরিলেটেড, হুবহু টুকলি নয়), আর ‘দক্ষ’ হয় (প্রত্যেকেটা মডেল-ই আন্দাজে ঢিল মারার থেকে ভালো।)আরো একটা অঙ্কের ফর্মুলা দিয়ে যাই, এ-ও স্বচ্ছন্দে রাস্তায় জমে থাকা জলের মত ডিঙিয়ে যেতে পারেন, ক্ষতি নেই। এটা রোমান ভার্শিনিনের বইয়ের অঙ্ক। (রাশিবিজ্ঞানের ছাত্র হলে প্রমাণ করার চেষ্টা করতেই পারো, দুই লাইনের প্রুফ।)Consider a randomized algorithm for decision-making (e.g., determining if a number is prime) that gives correct answers with probability 1/2 + δ, where δ > 0 (i.e., assuming ‘competence’). By running the algorithm n times and taking the majority vote, the probability of obtaining the correct answer would be at least 1 − ε for any ε > 0, as long as, এ তো গেল সব ভালো ভালো কথা, “আমরা চলব আপন মতে, শেষে মিলব তাঁরি পথে” বলে কোরাসে গান গাওয়ার মত জায়গায় পৌঁছে গেছি প্রায়। কিন্তু তাহলে এই যে চাদ্দিকে বিভিন্ন সব অদ্ভুত ঘটনা দেখি – এই যেমন ব্রেক্সিট দেখলাম, ট্রাম্প-ও দেখলাম, আর আমাগো দ্যাশে তো আর কথাই নেই। এরা তো মেজরিটির-ই পছন্দ, তাহলে কোথায় গেলো সেই উইজ়ডম? এই যদি সেই বেড়াল, তবে মাংস কই? আর এই যদি সেই মাংস, তবে বেড়াল কই? তাহলে কি ঐ কনডরসে-র জুরি থিওরেম বাস্তব জগতে আর খাটে না?এবার তাহলে আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক কনডরসে-র উপপাদ্যের অ্যাজাম্পশনগুলো। ভোটার-দের হতে হবে “স্বতন্ত্র”, “দক্ষ”, এবং “আন্তরিক”। এর সবকটিই বিভিন্ন গবেষকের, বিভিন্ন মহলের প্রশ্নের মুখে পড়েছে বারংবার, যাদের কেউ-কেউ সত্যিই মনে করেন, যে এগুলো একসাথে সত্যি হওয়া প্রায় সোনার পাথরবাটির মত ব্যাপার।এই যেমন ধরুন “দক্ষতা”! যদি সত্যিই এমন হয়, যে বেশির ভাগ লোকের-ই পছন্দ ভুল বিকল্পটিকে, অর্থাৎ অঙ্কের ফর্মুলায় ঐ pc < 1/2  হয়ে যায়? উপরের ছবিটির নিচের অর্ধেক দেখুন এইবার। হুহু করে কেমন গ্রাফ শূন্যের দিকে ছুটছে? অস্যার্থ, “ইনডিভিজুয়াল কম্পিটেন্স” অর্ধেকের কম হলে যত ভোটার বাড়বে তত বিপর্যয়, তত ভুল দিকে যাওয়ার রাস্তা মসৃণতর, সেইরকম কেসে শ্রেষ্ঠ জুরির সাইজ় মাত্র ১!আর, “স্বাতন্ত্র্য”? ঐটিকে পলিটিক্যাল সায়েন্টিস্ট ও অন্যান্য সমাজবিজ্ঞানীরা আক্রমণ করেছেন মুহুর্মুহু। তাদের বক্তব্য, যদি সবার-ই এক-ই দিকে ‘সিস্টেম্যাটিক বায়াস’ থাকে, অথবা সবার কানে এক-ই প্রোপাগান্ডা পৌঁছয়? অথবা, সব ভোটারের খবরের সবটুকু অধিকার করে নেয় এক-ই উৎস থেকে আসা ফেক নিউজ বা মিসইনফর্মেশন? যদি সব্বার মধ্যেই এক-ই দিকে ধাবমান পক্ষপাত, একদেশদর্শিতা, এক-ই অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার? সংখ্যাগরিষ্ঠর মধ্যে বিষক্রিয়ার মতই যদি ছড়িয়ে পড়ে এক-ই বিদ্বেষ? তারা কি সকলে, প্রত্যেকে একা, না পুরোটাই কোনো একটা মতবাদের একটিই অঙ্গমাত্র? এ ভয় কনডরসে-রও ছিল, তিনি লিখেছিলেন গণতন্ত্রের রোগ এই, যে ‘masses suffer from great ignorance with many prejudices’! আজ থেকে আড়াইশো বছর পরেও সে কথা অশ্লীল রকমের সত্যি বলে মনে হয়। তবুও, সেই ‘শেষ সত্য’ নয়!আগেই লিখেছি, আবার-ও মনে করাই। কনডরসে-র জীবনের শ্রেষ্ঠ কাজ Esquisse যখন লিখছেন, তখন তিনি শাসকের চোখে দেশদ্রোহী। আত্মগোপন করে আছেন পরিবারের থেকে বহু দূরে কোথাও, মাথার উপর সাক্ষাৎ গিলোটিন। ভেবে আশ্চর্য লাগে, যে সেই অকল্পনীয় অবস্থায় নিশ্চিত মৃত্যুর অপেক্ষায় বসেও তিনি বলে যাচ্ছেন মানব সভ্যতার সামনে একটিই রাস্তা, সে রাস্তায় সাময়িক বাধাবিঘ্ন থাকলেও রাস্তাটার মুখ সোজা উপরের দিকে, যার শেষে আল্টিমেট পারফেকশন, অন্তিম পূর্ণতা, সে যেন এক ‘অন্তহীন নক্ষত্রের আলো’। এবং সেই শেষ সোপানে পৌঁছলে দেখা যাবে সেই বিশ্বে কোনো অসাম্য নেই, দেশে-দেশে, জাতিতে-জাতিতে মারামারি নেই, কারণ সেই সব-ই তো আসলে সভ্যতার প্রগতির পরিপন্থী! এই আকালেও তাই, আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়, ‘এই পথে আলো জ্বেলে—এ-পথেই পৃথিবীর ক্রমমুক্তি হবে’।১৭৯৪ সালের ২৯শে মার্চ, ঠিক আজ থেকে ২৩০ বছর আগে, কনডরসের মৃত্যু হয় কারারুদ্ধ অবস্থায়, মৃত্যুর কারণ আজও অজানা, কেউ বলেন আত্মহত্যা, কেউ রাজনৈতিক খুন।এই লেখাটার আর কোথাও যাওয়ার নেই আপাতত, অতএব এখানেই ইতি টানছি। শেষ করবো কনডরসে-র একটি অসামান্য উক্তি দিয়ে, এই লেখকের ঘিঞ্জি আপিসের ঘিঞ্জি বোর্ডের এক কোণে যেটি জ্বলজ্বল করে অজস্র আঁকিবুকি আর ভুল থিওরেমের মাঝে। অন্ধকার ও ক্লান্ত রাত্রে নির্জন হাইওয়ে ধরে একলা বাড়ি ফেরার রাস্তায় বহুদূর দিগন্তের জনপদের টিমটিমে আলোর মত সে যেন আমাকে পথ দেখায়।“The truth belongs to those who seek it, not to those who claim to own it.”সূত্রঃDuncan Black et al. The theory of committees and elections. 1958.Marie Jean Antoine Nicolas De Marquis De Caritat Condorcet. Essai sur l’application de l’analyse `a la probabilit ́e des d ́ecisions rendues `a la pluralit ́e des voix. 1785.Francis Galton. Vox populi (1907) nature, n. 1949, vol. 75, pp. 450-451 (traduzione di romolo giovanni capuano©). Nature, 75:450–451, 1949.Robert E Goodin and Kai Spiekermann. An epistemic theory of democracy. Oxford University Press, 2018.Scott Hill and Renaud-Philippe Garner. Virtue signaling and the Condorcet jury theorem. Synthese, 199(5):14821–14841, 2021.Joan Landes. The history of feminism: Marie-jean-antoine-nicolas de caritat, marquis de condorcet. 2009.James Surowiecki. The wisdom of crowds. Anchor, 2005.Roman Vershynin. High-dimensional probability: An introduction with applications in data science, volume 47. Cambridge University Press, 2018.Kenneth F Wallis. Revisiting Francis Galton’s forecasting competition. Statistical Science, pages 420–424, 2014.
    গালুডি - নরেশ জানা | ছবি: রমিত চট্টোপাধ্যায়গালুডিএই সব ভাবতে ভাবতেই কখন যেন ১৮ নম্বর জাতীয় সড়কের ওপর মহুলিয়া বুকে গেছিলাম আমরা। সন্ধ্যা পৌনে সাতটা। গোটা এলাকা নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ঢেকে রয়েছে। ঝম ঝম করে বৃষ্টি পড়ছে, জাতীয় সড়কের আলো গুলো অবধি জ্বলছে না। বুকটা ধক করে উঠল। আজকের মত ঘোরা শেষ। হলদিয়ায় সকাল ন'টায় গাড়িতে চেপছিলাম, প্রায় দশ ঘন্টার জার্নি। মাঝে সব মিলিয়ে হয়ত ঘন্টা দুয়েক গাড়ির বাইরে ছিলাম আমরা। শরীরের কলকব্জা নড়ে যেন ঝনঝন করছে, এই সময় হোটেলের কথা মনে পড়ল আর মনে পড়তেই বুকটা ধক করে উঠল। পাওয়ার আছে তো! ভোর ৫টায় ফোন করেছিলেন দেব কুমার সোনি, আমাদের গালুডি হোটেলের ম্যানেজার, স্যার আপনরা কী আসবেন? কেন? প্রশ্ন করেছিলাম। গত দুদিন ধরে প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে স্যার, কাল সন্ধ্যা থেকে পুরো এলাকা বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে। আমাদের ডিজি আছে কিন্তু চালাতে সমস্যা হবে স্যার। যদি দু'একদিন পিছিয়ে দেন। পেছানোর কোনও প্রশ্নই ছিলনা। এমনিতেই আমার ভুলেই বাংরিপোষি ট্যুর ক্যানসেল হয়েছে । এই কুড়ি একুশ আমাদের বাংরিপোষি প্রোগ্রাম ঠিক হয়েছিল। সঙ্গে থাকা খুদে দুটোর স্কুলের ছুটির কথা ভেবেই। কিন্তু আমি হোটেল বুক করে বসলাম উনিশ কুড়ি। ভুল যখন ধরা পড়ল তখন আর কিছুই করার নেই, ওই দিন হোটেলে আর রুম পাওয়া গেলনা। বুকিংয়ের টাকাও ফেরত হওয়ার নয় তবে অন্য কোনোও সময় গেলে টাকাটা আ্যডজাস্ট করে দেবে ওরা। ওই টাকা ভুলে যাব এমন ক্ষমতা নেই সুতরাং ওই টাকা আ্যডজাস্ট করার জন্যই এবারের মত বাংরিপোষি স্থগিত রাখা হল। গত দু 'বছর বাচ্চারা কোথাও যেতে পারেনি, বাংরিপোষি প্রোগ্রাম ক্যানসেল হতেই মুষড়ে পড়েছিল বেচারারা তাই এই প্রোগ্রামটা সাজিয়েছিলাম। এখন কোনোও অবস্থাতেই এই প্রোগ্রাম ক্যানসেল করতে পারবনা। সোনি কে বললাম, ফ্যান চলবে তো? সোনি বললেন, 'বে-সক্'! ঝাড়খন্ডের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গও তুলকালাম হয়ে চলেছে। আমি বাকিদের কাছেও বিষয়টা চেপে গেলাম। শতদলের শ্যালিকা রুষতির স্বামী শুভাশিষও বললেন, দুনিয়া রসাতলে গেলেও বেড়াতে যাবই। সাহস পেয়ে গেলাম! কিন্তু হোটেলে যাওয়ার পথে আতংকটা চেপে বসল। যদি হোটেলেও পাওয়ার না থাকে খুবই সমস্যা হয়ে যাবে। কারন প্রচন্ড গরম অনুভূত হচ্ছে, প্যাচপ্যাচে গরম, ফ্যানে এই গরম কাটার নয়! হোটেলের গেটে গিয়ে যখন গাড়ি থামল তখন ঝেড়ে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সোনি নিজেই এগিয়ে এলেন অভ্যর্থনা করতে। অমায়িক মানুষ। একেবারে নতুন হোটেল। ঝাঁ চকচকে রুম গুলো। মনে হল আমরাই প্রথম উদ্বোধন করলাম। এই অভিনন্দন অবশ্য পাওয়ার যোগ্য আনন্দবাজারের হলদিয়ার সংবাদদাতা সৌমেন মন্ডল ভাইয়ের। বাংরিপোষি প্ল্যান বাতিল হতে ওই বলেছিল ঘাটশিলা আসতে। আমার প্রথমটা ইচ্ছা ছিলনা। আগে একবার এসেছি। ওকে বলেছিলাম যেতে পারি যদি ঘাটশিলা ছাড়া অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দাও। আমার আরও আবদার ছিল গালুডিতে থাকার। ওই অনেক খুঁজে পেতে এই হোটেলের ব্যবস্থা করে দিল এবং অবিশ্বাস্য কম দামে। এসি রুম মাত্র চোদ্দশ টাকায়! যদিও বিস্ময় আরো কিছু অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। বৃষ্টি চলল আরও প্রায় ঘন্টা খানেক। বলা বাহুল্য পাওয়ার নেই, ডিজি চলছে। কিন্তু সোনি আমাদের বলল বিদ্যুৎ দপ্তরের লোকেরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। হোটেলে ক্যান্টিন নেই কিন্তু খুচ পারোয়া নেই। সোনি বলতেই চা চলে এল পাশের দোকান থেকে। ডিনারের মেনু আর রেট চার্ট হোয়াটস অ্যাপ করলেন সোনি। সেই মত কোনও এক রেস্তোরাঁয় ফোন করে খাবার অর্ডার দেওয়া হল। ওরা ঠিক সাড়ে নটায় খাবার পাঠাবেন বললেন। ততক্ষণে চান টান করে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছিলাম। পায়ের তলা সুড় সুড় করে উঠল। বৃষ্টি থেমে গেছে, যদিও পাওয়ার আসেনি। বাইরেটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। উঁচু নিচু পাথুরে পথে কাদার কোনও ভয় নেই। টর্চটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। শতদলও সঙ্গী হল। হোটেলের সামনেই একটি দোকানে মিটমিট করে আলো জ্বলছিল। দোকানি কে জিজ্ঞাসা করলাম স্টেশনটা কোন দিকে। সে বাঁ দিক দেখিয়ে দেয়। আমি খড়গপুরের ছেলে। জানি যে স্টেশন মানেই নিদেন পক্ষে চা আর পান টা জুটে যাবে। একটা পান খাওয়ায় জন্য মনটা ছটপট করছিল। এখানে পান কিংবা চা পেলাম না, কিন্তু স্টেশনটাকে পেলাম। আর সেটাই আমাদের চমকে দিল!গাঢ় অন্ধকারে ডুবে রয়েছে ভারতের আদিতম রেল স্টেশন। জরুরি কোনও বিদ্যুৎ সংযোগে ছোট্ট স্টেশনটার বাইরে একটা সোডিয়াম ভেপারের আলো পড়েছে টিকিট ঘরের বাইরে টালির চালে বসানো বোর্ডের ওপর। পলিমারের নীল বোর্ডের ওপর সাদা রঙে দেবনাগরী হরফে লেখা গালুডিহি! সেই আলোর এক চিলতে পড়েছে সামনের রেল লাইনের ওপর। অনায়াসে পায়ে হেঁটেই লাইন টপকে আমরা ঢুকে পড়লাম টিকিট ঘরের ভেতর। আমরা দাঁড়িয়ে আছি ১৩৩ বছর আগে তৈরি হওয়া একটি প্রাচীন রেল স্টেশনে! ১৮৮৭ সালে নাগপুর থেকে ছত্তিশগড় রেল লাইন পাততে শুরু করলো বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে কোম্পানী যা শেষ অবধি বিলাসপুর হয়ে আসানসোল অবধি এগিয়ে গেল। আর তার অব্যবহিত পরেই শুরু হল মুম্বাই থেকে কলকাতা অবধি রেললাইন পাতার কাজ ভায়া এলাহবাদ! ১৮৮৭ সাল ধরলে অবশ্য বছরটা ১৩৫ হওয়া উচিৎ কিন্তু আরও ২ বছর কমিয়ে বললাম এই কারনে যে প্ল্যাটফর্মের সেই আদি অকৃত্তিম ওজন মাপার যন্ত্রটা দেখলাম মরছে ধরা দেহ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এই ওজন তখন মাপা হত স্কেলে। সমস্ত রেল স্টেশনেই এই যন্ত্র সরবরাহ করার মনোপলি ব্যবসা ছিল আ্যভরে ওয়ে ট্রোনিক্স কোম্পানি লিমিটেডের। ইংল্যান্ডের বাকিংহামে তাদের সদর দপ্তর। যন্ত্রটির গায়ে ডব্লু এন্ড টি আ্যভরে লেখার পাশাপাশি বিএনআর বা বেঙ্গল নাগপুর রেলওয়ে কথাটি ঢালাই করা ছাপ দেওয়া রয়েছে আর প্রতিস্থাপনের বছর উল্লেখ করা হয়েছে ১৮৮৯ সাল! শেষবারের মত পন্যের ওজন মাপক এই যন্ত্রটির যথার্থ ক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে ১১৮ বছর আগে ২৫ নভেম্বর ১৯০৪ সালে! এই সময় খুব মনে পড়ছিল আমার আরেক ভাতৃপ্রতিম বন্ধু বর্তমান পত্রিকার হলদিয়ার প্রতিবেদক শ্যামল সেনের কথা। আমি নিশ্চিত ওকে আর হোটেলে ফেরত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হতনা, আমাদেরও না। গোটা রাত স্টেশনেই থেকে ও গবেষণা চালিয়ে যেত। স্টেশনটা আমাদের হোটেল গায়ত্রী গেস্ট হাউস থেকে জাস্ট দেড় মিনিট! সিদ্ধান্ত নিলাম কাল সকালে উঠেই দিনের আলোতে স্টেশনটাকে দেখব আর এসি চলুক আর নাই চলুক ১৪০০ টাকা করেই রুম প্রতি ভাড়া দেব, কোনোও দরদাম করবনা। অন্ধকার এই স্টেশন চত্বরে পান অবশ্য জুটলো না। কিন্তু পান না চিবুলে বুঝি এই অনাদিকাল ধরে একই রকম দাঁড়িয়ে থাকার স্বাদ পানসে হয়ে যায়। সুতরাং ফের উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করলাম। হোটেলটার সামনে দিয়েই যেতে হবে। রিসেপশন থেকে রাস্তাটা নজরে পড়ে। সোনি আমাদের স্বল্প আলোতেও চিনলেন, মৃদু হাসলেন। হয়ত বা ভাবলেন, সুরা সন্ধানী আমরা। অচেনা জায়গায় সুরার খোঁজে এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমরা জাতীয় সড়কের দিকে অর্থাৎ মহুলিয়ার দিকটায় হাঁটছিলাম। একটা মোড় পেরিয়ে জাতীয় সড়কের দিকে বাঁকতেই মিলে গেল দোকান। মুদি আর রকমারি দ্রব্যের সাথে পানও রয়েছে। ঝাড়খন্ড হলেও পান কিন্তু সেই আমাদের এগরা রামনগরের। একটা মুখে পুরে আরও কয়েকটা মুড়ে পকেটে ভরে ফিরলাম। অপূর্ব স্বাদ, হোটেলে ঢোকার আগেই মুখেই মিলিয়ে গেল! হোটেলে ঢুকে দেখলাম পাওয়ার চলে এসেছে, এসি চলছে । মনে মনে বললাম, জয় ঝাড়খন্ড!এক রাত পার। আজই ফেরার দিন। প্রোগ্রাম ছকে ফেলেছি। সকাল ৯টায় গাড়িতে ওঠা তারপর গালুডি ড্যাম ঘুরে সোজা চলে যাব দুয়ারসিনি। সেখান থেকে... না সেকথা এখন থাক। সব থেকে বড় কথা সকাল ৯টার আগেই আরেকবার চক্কর মারতে হবে স্টেশনটায়। আমি আর শতদল ফের স্টেশনের পথে। সকাল ৭টা, মাত্র দেড় মিনিট। এবার স্টেশনের সামনেটাকে স্টেশনের মত মনে হয়। ডালায় করে ভাজা হচ্ছে পুরি, চপ, ফুলুরি, জিলিপি। লুচি দশ টাকায় পাঁচটা, চপ তিন টাকা! ড্যাম থেকে ধরে আনা কুচো চিংড়ি, চারাপোনা, চেড়ি বাটা বিকোচ্ছে। কাছের কোনও গাঁ থেকে আসা লাউ, ঝিঙে, শাক ইত্যাদি সবজি । আমাদের সেই পায়ে হেঁটে পের হওয়া টিকিট ঘরের সামনে থাকা নিচু লাইনটায় একটা মালগাড়ি দাঁড়িয়ে। আমরা সেই আদ্যিকালের আরওবি দিয়ে প্ল্যাটফর্মে নেমে যাই। ওপাশে অনেক দুরে একটা পাহাড় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। স্টেশনে ঢোকার মুখেই সেটা নজরে পড়ে। পুরানো নুড়ি বেছানো প্ল্যাটফর্মে আমরা হাঁটি। এখনও আগের মতই প্ল্যাটফর্মে লোহার ডিম্বাকার ঢালাই করা চাকতিতে গালুডিহি লেখা। না এখন এধরনের লেখা স্টেশনগুলোতে নজরে পড়ে বলে মনে হয়না। টিকিট ঘরের সামনে এখনও সাবেক কালের লালরঙা বালতি গুলো লোহার আংটা থেকে সার দিয়ে দুলছে, অগ্নি নির্বাপনের প্রাচীন ব্যবস্থা। টিকিট ঘরে সেই ওজন মাপার স্কেল যন্ত্রটা তো আছেই কিন্তু তার সাথে আরও আছে লাল ডাকবাক্স আর ট্রেনের ' খবর' হলে যাত্রীদের জানানোর জন্য মাঝখানে কেটে রেল পাতের টুকরো অংশটা! সব আজ প্রাণহীন, নিস্পদ। হৃৎপিণ্ড থেমে যাওয়া যন্ত্র ফসিল। হাত নিশপিশ করে, মনে হয় বাজিয়ে দেই একবার। হুটোপুটি অনাসৃষ্টি বেধে যাক! টিকিট জানলার দিকে তাকাই, জানলাটা কাল রাতের মতই বন্ধ, একটা নোটিশ লটকানো। ঝুঁকে পড়ে লেখাটা পড়ি, টিকিট ঘর স্থানান্তরিত হয়েছে। অনতিদূরেই নজরে পড়ে ঝাঁ চকচকে সাদা ঘরটা। ওদিকে যাইনা, যেতে ইচ্ছা করেনা। আরও দেখতে পাই নতুন একটা ফুট ওভার ব্রিজ গড়ে উঠছে। বড় হচ্ছে গালুডি, নাকি বুড়ি হচ্ছে? মন খারাপ হয়ে যায়। মালগাড়িটা তখনও দাঁড়িয়ে। পুরানো ফুট ওভার ব্রিজ দিয়েই নেমে আসি। আমার আর শতদলের ক্যামেরায় ধরা থাকে কুমারী, অনুঢ়া, গালুডি। আজ রোদ উঠেছে ঝলমলিয়ে, রোদ চশমা হৈ হৈ করে স্টেশন চত্বরে নেমে এসেছে রিয়ান, রুষতি, ঝিলমিল, রাগিণীরা। পেছনে পেছনে শুভাশিসও। ওরা স্টেশনের দিকটায় নেমে যায়। আমি ফিরে তাকাই। স্টেশনের সেই প্রবেশমুখ টালির দোচালার ওপর দিয়ে পাহাড়টা দেখা যাচ্ছে, যেন রোদ থেকে আড়াল করছে লজ্জাবনতা গালুডিকে। ও পাহাড়টা আমার চেনা। ওটাই বড়াপাহাড়। পাহাড়টা যেন আমায় ডাকে। আমি আস্তে করে বলি, আসছি।ঘড়ির কাঁটায় ৯টা। কাল ফেরার পথে গাড়ির স্টেপনি বদল করতে হয়েছিল কিন্তু ঝড় জল আর বিদ্যুৎ বিহীন পথে কেউ পাংচার সারাতে রাজি হয়নি। 'সুবা আও' বলে সবাই হাঁকিয়ে দিয়েছে। মৃত্যুঞ্জয় গাড়িটা নিয়ে সকাল সকাল গ্যারেজে গিয়েছে, এখনও ফেরেনি। আমরা পাক্কা মিদনাপুরিয়া। সঙ্গে আনা মুড়ি, শশা আর বাদাম মেলে দেওয়া হল বিছানার ওপর পেপার পেতে। কিনে আনা তিন টাকাওয়ালা কয়েকটা চপ। গতকাল রাতে রেস্তোরাঁর অর্ডার করা আটার তন্দুরি রুটি, চিকেন কষা আর পনির মশলার হ্যাংওভার দিব্যি হাপিশ করে দিল খাঁটি মিদনাপুরিয়া ব্রেকফাস্ট। ব্যাগেজ করাই ছিল। হোটেলের টাকাও মেটানো হয়ে গিয়েছিল। মৃত্যুঞ্জয় হাজির হতেই একে একে সবাই উঠে পড়ল। ৫ লিটারের দুটো জলের বোতল গাড়িতে তোলার আগে দেখা গেল একটা পুরো খালি, অন্যটা অর্ধেক। সোনিকে বললাম, মিনারেল ওয়াটার কোথায় পাব? সোনি বললেন, বোতল দিজিয়ে। ফাঁকা বোতলটা বাড়িয়ে দিলাম। মিনিট খানেকের মধ্যেই বোতলটা ভরে এনে বললেন, 'বে-ফিকর পিয়ে, গালুডি কি পানি, মিনারেল উনারেল ফেইল হো যায়গা।' গাড়ি ছুটল দু'কিলোমিটার দুরে গালুডি ড্যাম। গাড়ি এসে যখন ড্যামের গায়ে দাঁড়ালো তখন জলের মাতন তুঙ্গে উঠেছে। জলের সেই প্রবল গর্জনে পাশের মানুষের কথাও শোনা যাচ্ছেনা। সুবর্ণরেখার সে কী রূপ! ২১টি স্লুইস গেটের মধ্যে দিয়ে জল আছড়ে পড়েছে। কী সুন্দর, কী অপরূপ সেই দৃশ্য! কিন্তু ভয়ংকর তো কম নয়! দিনটা ২১শে আগস্ট, রবিবার। জল ছেড়েছে গালুডি। আমরা যখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই জল দেখছি তখন পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতন, কেশিয়াড়ীতে বিডিও অফিস থেকে মাইক ফোঁকা হচ্ছে, "হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার, গালুডি থেকে এত হাজার কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে। নদী তীরবর্তী মানুষরা সাবধান থাকুন। আরও জল বাড়লে নিরাপদ দূরত্বে সরে আসুন। প্রশাসন সবরকম পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৈরি রয়েছে..... ।" আমাদের কানে অবশ্য সেই ঘোষনা আসার প্রশ্নই নেই, আমাদের সব্বাই তখন ব্যস্ত দাঁতন থেকে ১৫০ কিলোমিটার দুরে গলুডি ব্যারেজের ওপর দাঁড়িয়ে জলের সেই প্রবল তোলপাড় দেখতে। এই সময় আমার নজরে পড়ল দুটি অদ্ভুত ধরনের মৎস্য শিকার। একদল মানুষ ওই অত উঁচু থেকে দড়ির সাহায্যে বাঁশের বাতায় বাঁধা জাল নামিয়ে দিচ্ছেন, তুলে আনছেন। মাছ উঠছে, রামশোল, কালবাউস, বাটা আরও কত কী! ওখানেই বিক্রি হচ্ছে সেই সব মাছ! এই সব মাছ ধরা জালগুলো অনেকটটা ঠিক আমাদের গাঁ ঘরের চাবি জালের মত। যাঁদের চাবি জাল সম্পর্কে ধারনা নেই তাঁদের জন্য বলা যে, একটি বাঁশের বাতার দুটি প্রান্তকে টেনে এনে মুখোমুখি বাঁধলে একটি বৃত্তাকার ক্ষেত্র বা রিং তৈরি হয়। সেই রিং বরাবর বাঁধা হয় জালটি। এমন ভাবে জালটি বাঁধা হয় যাতে ভেতরের অংশটি টানটান না হয়ে একটু ঝুলে থাকে অর্থাৎ বাতার তৈরি রিংয়ের চাইতে গোলাকার জলটি একটু বড় হতে হয়। বস্তুটি একটি ছাঁকনির আকার ধারন করে। এরপর তিনটি বাঁশের খন্ড ওই রিংয়ের তিন প্রান্তে সমান দূরত্বে বাঁধা হয়। এরপর ওই তিনটি বাঁশের মাথা এক জায়গায় টেনে এনে বাঁধা হয়। সব মিলিয়ে ওপরের অংশটি ত্রিভুজাকৃতি গ্রহন করে। সাধারণত জলের কম গভীরতায় দাঁড়িয়ে মাথার ওপর কিংবা বুক বরাবর তুলে রেখে মৎস্য শিকারি দাঁড়িয়ে থাকেন এরপর শোল মাগুর কিংবা ওই জাতীয় মাছের অস্থিত্ব টের পেলে ওই জাল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এলাকা বিশেষে ওই জালের বিভিন্ন নাম হয়। কোথাও চাবি জাল কোথাও আবার ঝাঁপা জাল ইত্যাদি। গালুডি ব্যারেজের ওপর দিয়ে যাওয়া আসার রাস্তা বা যেখান থেকে আমরা নিচের জল দেখছি তার মধ্যখানের ব্যবধান প্রায় তিরিশ ফুট। ওই রকম জালের ত্রিকোণ বাতার শীর্ষে বাঁধা দড়ির সাহায্যে শিকারিরা ওপর থেকে নিচে জলের মধ্যে ওই জাল নামিয়ে দিচ্ছিলেন এবং ছেঁকে ছেঁকে মাছ ধরছিলেন। আরেক প্রকার মৎস্য শিকারও আমার নজর কেড়ে নিল যদিও তা মানুষ নয়, সেই শিকার করছিল দুরন্ত পানকৌড়ির দল। সংখ্যায় তারা গোটা আট দশেক ছিল। ব্যারেজের এই অংশে সুবর্ণরেখা পূর্ব থেকে হঠাৎ করেই ঈষৎ দক্ষিণ পশ্চিমে বাঁক নিয়েছে। তোলপাড় জলের রাশি পূর্ব থেকে ২১টি স্লুইস গেটের ফাঁক গলে আছড়ে পড়ছে। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড সব ঘূর্ণি তৈরি উথাল পাথাল হতে হতে জল নামছে খর বেগে। কী পরিমাণ সেই বেগ তা দেখলে কল্পনা করাই মুশকিল। তারই মধ্যে উজানে ঠোঁট বাড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে পানকৌড়ি গুলো, জলের গভীরে ঢুকে যাচ্ছে আর প্রায় আধ মিনিট পরে উঠে আসছে। সমস্যাটা বাড়ছে এরপরই, ওই উথাল পাথাল জলে ভর দিয়ে ফের আকাশে ডানা মেলতে রীতিমত নাকানি চোবানি খেতে হচ্ছে পাখিগুলোকে। কখনও কখনও সেই দোমড়ানো মোচড়ানো উথাল পাথাল দুরন্ত কুন্ডলি পাকিয়ে ওঠা জলের ভেতরে একেকটি পাখি এত বেশি সময় ধরে থেকে যাচ্ছিল যে আমার মনে হচ্ছিল সে বোধহয় চিরতরেই তলিয়ে গেল, আর উঠতে পারবেনা। অনন্ত শক্তিধর ওই পাক খেতে থাকা জলস্রোতের বিপরীতে দক্ষ সাঁতারু তো দুরের কথা একটা প্রমাণ সাইজের হাতিকেও হ্যাঁচোড় প্যাঁচোড় করতে হবে কিন্তু পাখি গুলো শেষ অবধি উঠে আসছে, আবার ঝাঁপাচ্ছে। আমি ঘড়ি মিলিয়ে দেখলাম সব চাইতে বেশি সময় নেওয়া পাখিটি প্রায় পঁচাত্তর সেকেন্ড ধরে লড়াই চালিয়ে ফের ডানা মেলল। তারপর সে বেশ খানিকটা দূরে গিয়ে নদীর বাঁধানো কিনারায় বসে ডানা দুটি সটান মেলে রোদে শুকাতে লাগল। হয়ত বৃদ্ধ হয়ে এসেছে সে, শক্তি কমে এসেছে। বাকি গুলো তখনও লুটোপুটি খাচ্ছে জলে। মাছ ধরছে, গিলছে, আবার ঝাঁপাচ্ছে। বড় অদ্ভুত সেই শিকার।আগেই বলেছি সুবর্ণরেখা এখানটায় ঈষৎ দক্ষিন পশ্চিমে বাঁক নিয়েছে। পরে তা ক্রমশঃ দক্ষিণ বাহিনী হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ভেতর দিয়ে ওড়িশা প্রবেশ করে বঙ্গোপসাগরে মিলেছে। গালুডির উপরিভাগে নদী খাড়া হয়ে উত্তর থেকে দক্ষিণে নামছে অর্থাৎ নদী এখানে উচ্চ গতি সম্পন্ন। আর এই স্তরে ব্যারেজের ঠিক উপরেই নারোয়া পাহাড় ছুঁয়ে নেমে আসা সেই গুডরু নদী মিলিত হয়েছে। ওখানটায় যেতে হলে ব্যারেজ পেরিয়ে দিগরি আর বড়াপাহাড়কে বাঁয়ে রেখে এগুতে হয়। গালুডি রেল স্টেশনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় এই পাহাড়টাই আমাকে ডাকছিল। এখন আমি তাকে হাই করে দিলাম। শীতের সময় কিংবা গরমের শুখা মরশুমে যদি গালুডি ব্যারেজে আসেন তবে গুডরু আর সুবর্ণরেখার মিলনস্থলে নেমে পড়তে পারেন। নদীর শুকনো স্রোতে হরেক রকমের পাথর পাবেন। মাইলের পর মাইল জুড়ে নদী তাদের ঠেলতে ঠেলতে এনেছে আসতে আসতে তারা ক্ষয়েছে। হাজার হাজার বছর ধরে ক্ষয়ে ক্ষয়ে তারা নুড়ি পাথর। তাদের কোনওটা গোল, কোনোওটা ডিম্বাকৃতি। সাদা কালো হলদেটে সবুজাভ সেই পাথর কুড়িয়ে নিতে পারেন। কানের কাছে নিয়ে একবার নাড়িয়ে দেখে নিন তো, ভেতরটা ফাঁকা আর ভেতরে কিছু নড়ছে কিনা? যদি নড়ে আপনি পেয়ে গেছেন কোনোও অমুল্য রতন। জানেনই তো চুনী পান্না ক্যাটসআই গোমেদ ইত্যাদি রত্নগুলি বিভিন্ন খনিজ ধাতুর সংমিশ্রণে তৈরি। সেই খনিজ পদার্থ সমূহ যেমন আ্যলুমেনিয়াম, সিলিকন, ম্যাগনেসিয়াম, বেরিলিয়াম, সালফার, কপার ইত্যাদি। আগেই বলেছি জাদুগড়া ও তার লাগোয়া পাহাড় সমূহ বিভিন্ন খনিজ সম্পদের ভান্ডার। আগ্নেয়শিলা অধ্যুষিত এই এলাকা একসময় অগ্নুপ্যাত ও অন্যান্য কারনে ভূগর্ভস্থ মৌলিক খনিজগুলি লাভার সঙ্গে মিলে মিশে ভূপৃষ্ঠের ওপরে সঞ্চিত হয়েছে। নদী সেই পথ কেটে কেটে এসেছে হাজার হাজার বছর ধরে আর বয়ে এনেছে কাটা পাথরের খন্ড থেকে নুড়ি। কখনও কখনও তাই ওই সব নুড়ি থেকে রত্ন পাওয়া যায়। সুবর্ণরেখা যেমন নিজেও সেই রত্ন বাহিনী, গুডরুও তাই। রাঁচির পিস্কা থেকে উৎপত্তি হয়ে ওড়িশা অবধি সুবর্ণরেখার দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৭৫ কিলোমিটার এরমধ্যে গালুডি অবধি সুবর্ণরেখার দৈর্ঘ্য প্রায় অর্ধেক এবং পুরোটাই রত্নখচিত পথ। আর গুডরুর যাত্রা খনিজ সমৃদ্ধ জাদুগড়ার ভেতর দিয়ে। সুতরাং এই দুই নদীর মিলনস্থলও যে রত্নগর্ভ হবে বলাই বাহুল্য। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের নিয়মিত ভ্রমন তালিকায় গালুডি ছিল। শুনেছি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর গালুডি বেড়াতে এসে সাতসকালেই ছুটে আসতেন সেই অমূল্য রতনের খোঁজে। কিন্তু এইবেলা আমাদের সেই খোঁজ সম্ভব হয়নি। আমাদের এবারের যাত্রা সুন্দরী দুয়ারসিনির পথে। আমরা গাড়ি ঘোরালাম উত্তরে মহুলিয়ার পথে। ক্রমশ...
  • হরিদাস পালেরা...
    দ্য নজরুল ফাইলস - সৈয়দ তৌশিফ আহমেদ | নজরুলের অবশ্য সাপের ছুঁচো গেলা কেত্তন।অগ্রজরা নাক কুঁচকে বলল, কোথাকার কোন পল্টনফেরত হাবিল, বাংলার মনোজ্ঞ মহলে ওঠাবসা নেই, রবীন্দ্রবলয়ে ঘোরাফেরা নেই, প্রকাশকের দোরে দোরে হাত কচলানিও নেই, নেই বন্ধুমহলে নিরলস অধ্যবসায়ের দীর্ঘ বিজ্ঞাপন —এত ‘নেই’ নিয়েও কিনা উড়ে এসে জুড়ে বসে জনপ্রিয়তায় সবাইকে টেক্কা দেবে — না না, এ লোক কবিতার কিস্যু বুঝতেই পারে না! ব্যাটা আস্ত চাঁড়াল একটা।শনিবারের চিঠিতে সজনীকান্ত ঘোমটা-ঠোঁটে খেমটা নাচতেই ঘরের দুয়োর দিয়ে তাবৎ কবিদের সে কী হর্ষধ্বনি! বেলাভর নেচেকুদে হেদিয়ে গেলেন সক্কলে। কবিতা মাথায় উঠল, চড়া পড়ল দোয়াতে, আগে হোক নিকেশ নজরুল, তারপর না হয় কাব্যকুল।অনুজরা অনেক ভেবে মাথা নাড়ল, — ঠিকই তো! কবিতা কুস্তির আখড়া, নাকি আতশবাজির সলতে, কাব্যের সুর এত উঁচু তারে বাঁধবে কেন, চলনই বা হবে কেন সর্বক্ষণ দ্রুতলয়ে, তাছাড়া ভাবাবেগ কি ফুটন্ত দুধ যে কথায় কথায় উথলে উঠল, আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানে এ লোক অনাগ্রহী, জীবন জিজ্ঞাসায় অনুৎসাহী, কোথায় সেই ঋষিসুলভ ব্যক্তিত্ব, ভাবনা মদির চাউনি। এ লোক বড়জোর ‘আধলা’ কবি হতে পারে, তবে ‘গোটা’ কবি নয়।বন্ধুবৎসলরাও সুযোগ পেয়ে আওয়াজ দিল, — হক কথা। জ্ঞানপিপাসার হাতছানিটাই নেই। তাছাড়া, এ লোক গভীর দর্শনে বিকলাঙ্গ, অন্তরের প্রেম থেকে মুখ ফেরানো, গুরুচণ্ডালীতে আক্রান্ত।প্রকাশক চোখে চশমা আঁটলেন, — হুম, কথাটার সারবত্তা আছে। লোকটার নান্দনিকতা তলানিতে, শিল্পবেত্তা পাতালে, আর বোধ-বুদ্ধি তো চিরকালই রসাতলে। সবেতেই গলাবাজি আর গর্জন, কবিতা কি স্লোগান নাকি! কোথায় দেখতে পাবো নান্দনিক সুষমা, পেলব লাবণ্য, তা না কেবল হট্টগোল! ছন্দ নিয়ে কারসাজি। কবিতা তো আর পাটিগণিত নয় রে বাবা! না! এ লোক খাঁটি কবি হিসেবে উৎরোয় না, এ ছিল নেহাতই যুগের হুজুগ, ইদানীং যা তামাদি। অভিজাত ঘরের বৈঠকখানায় রাখা যায় না এঁর কাব্যগ্রন্থ, তবে ছাপাব আরও হাজার পাঁচেক। লোকটা ব্যবসা দেয় না মন্দ।বাঙালি মুসলমান অতশত জানে না। সে খায় ঘুমোয়, স্বপ্ন দেখে বখতিয়ার খলজির, জাবর কাটে আরব্য রজনীর। দিগ্বিদিকে কবির নামটা শোনে, কপালে কোঁচ ফেলে নামাজে উপুড় হয়ে নিত্য গজরায়, — কবি! হুঁ! দিনরাত জিভে শুধু দেব আর দেবী। আবার ঘরে তুলেছে প্রমীলা — ইম্পোরটেড ফ্রম সুদূর কুমিল্লা। আল্লাহ এক, কেউ শেখায়নি নাকি! আজাব নামল বলে। ধ্বংস তোমার অনিবার্য।হিন্দু বাঙালিও কাতরায়, —ঘোর কলি ! প্রমীলা নাকি ঘর করছে কবির। এ কী অনাসৃষ্টি। আরবি-ফার্সি-তুর্কি শব্দের ছড়াছড়ি। প্রমীলা রে, ও যে নেড়ে কবি!ইংরেজ তলায় তলায় সব খবরই রাখে , তক্কে তক্কে থাকে। রাগে গোঁফ মুচড়ে তাকায়,— এ লোক ঘোড়েল , আস্ত এক শয়তান। কবিতার নামে লোক খ্যাপায়। ব্যাটাকে জেলের ভাত এবার না খাওয়ালেই নয়। বলা মাত্রই দিশি আর্দালি জানায়, — সে নাকি কবিতা ছেড়েছে নতুন। শুনেই সাহেব সিং উঁচিয়ে দৌড় লাগায়।নজরুলের বুকের কলিজা প্রমীলা রাঁধে, ভাত বাড়ে, কবির অপেক্ষায় সাজানো থালার দিকে চেয়ে চোখের জল মোছে। না চাইতেও দীর্ঘশ্বাস উঠে আসে, — কবি, জানি তুমি ছিন্ন শিকড়, পিছুটানহীন, মুক্তবিহঙ্গ। কিন্তু চাল যে বাড়ন্ত।অহিংস আন্দোলনের ঝাণ্ডা জানায়, — গোপন সূত্রে খবর এসেছে, সহিংসদের সাথে কবির একেবারে হরিহর আত্মা, ইয়ারবকশি, তুই-তোকারি অতি প্রাচীন। এ লোককে আর যাই হোক, বিশ্বাস করা নয় সমীচীন।শুনেই সশস্ত্র বন্দুকের নল উঁচিয়ে ধমকায়, —ছাড়ো তো! আছে কি ওর ওই ফাঁকা আওয়াজ ছাড়া। অকর্মার ঢেঁকি, একটি নির্বিষ অষ্টরম্ভা। এই মানুষ অহিংস না হয়ে যায় কোথা।গ্রামোফোন বলে , - ওসব তর্কে কাজ কী ! লোকে যখন খাচ্ছে, দাও না যদু মধুর গান ওঁর নামে চালিয়ে। তাতে কবির মান পড়ে পড়ুক। আমরা অত ভাবব কেন, নিই না দু হাতে কামিয়ে!কবি নির্বাক হতেই বঙ্গীয় বিশারদ আক্ষেপের সুরে কোঁত পাড়ে, —লোকটার আবেগ ছিল সন্দেহ নেই। তবে কোথায় থামতে হবে জানল না। কেবলই হৈ চৈ। সম্পদ ছিল, তবে তার ব্যবহারটাই শিখল না। অতি ভাবালুতার মলাটে, অনর্গল অবচেতন বাক্য-বিন্যাসে ঘোলাটে।শিক্ষামন্ত্রক শোনে, নোটিশ জারি করে, —বাতিল করো একে। উঁচু ক্লাসের সিলেবাস থেকে হটাও তো বাবরি চুলকে। থাকুক ব্যাটা বালখিল্যের ফাইভে আর সেভেন এইটের কিশোরসুলভ নাইভে।শুনেটুনে ফের মুষড়ে পড়ে পশ্চিমের মুসলমান বাঙালি। এ অত্যন্ত অন্যায়। উপুড় হয়ে সে নামাজে কাঁদে, — হুজুর কাণ্ড দেখেছেন! নজরুলকে করেছে বাতিল। কিছু একটা বাতলে দিন উপায়।হুজুর তাজ্জব, — যাব্বাবা! তোরাই তো এককালে চেল্লালি, এ লোক আমাদের স্বজাতি নয়। দেবদেবীদের নাম এনেছে মুখে। করেছে হিন্দু বিয়ে। তবে এখন কিসের এত ইয়ে ?পশ্চিমের মুসলমান বাঙালি আলজিভ কাটে, — জাহাঁপনা, সে তো আগে। ভেবেছিলাম আরও দু চারটে খাঁটি মুসলমান উঠবে লম্ফ দিয়ে। তারপর সব পগারপাড় করল পূবে। রইল পড়ে সব খুদকুঁড়ো আর নেহাতই এলেবেলে।বাংলাদেশ ভাবে, — এই সেই সুবর্ণ সুযোগ। এবার নিতে হয় কবিকে দত্তক। মানুষকে সান্ত্বনা দেব আর কাঁহাতক। এপারে আইকনের যা আকাল, তাতে ওই আধেক হিঁদু আধেক মুসলমানও পার না করলে বৈতরণী, হতে হবে নাকাল।নির্বাচন আসে নির্বাচন যায়। রাজ্য পরের বারের ঘুঁটি সাজায়, — কবির নামে একটি সরণি করে যুক্ত, পাঁচ খণ্ডের সমগ্র, তাহলেই আমাদের দায়িত্ব খালাস, ঝামেলা থেকে মুক্ত।কেন্দ্র আঁতকে উঠে পাল্টা চালে, খ্যালখ্যাল হাসে, — হ্যাহ! শেষকালে এই - সরণি। ওই দ্যাখো বিমানবন্দরে, কবির নাম আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হতে হতে টেক অফ করবে বিদেশবিভূঁইয়ের অন্দরে ।বাংলা ক্যালেন্ডার হাঁকে, — মনে রেখো! তারিখটা কিন্তু ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দে। কবিকে ভুললেও ক্ষতি কিছু নেই, মাঝেমধ্যে যদি লাগে শব্দজব্দে।রাগে গ্রেগরিয়ানের শক্ত হয় চোয়াল, — রাখো তোমার কাওতাল। ডেটটা ২৪ শে মে, ইয়ার 1899। এটাই ফুল এন্ড ফাইনাল।জেন-জেড হাই তোলে , — খামোখা সময় নষ্ট। ও লোক তো এমনিতেই ফসিলস। কী লাভ বিলুপ্তের জন্মবৃত্তান্ত। মিছামিছি এই কষ্ট।চুরুলিয়া এই ফাঁকে হাত তোলে, কবির জন্ম কিন্তু এদিকেই। এদিকের জল মাটি পেয়েই … কাজেই আমরাই খাঁটি নজরুলী — দাবি শুধু এই ।ঢাকা সশব্দে হেসে ওঠে, — বোকা! জীবন মিথ্যা, মৃত্যু সত্যি। মৃত্যুই জীবনের একমাত্র সত্য, এবং তা অবধারিত। কাজেই কবির আত্মা এদিকেই ঘোরে ফেরে আজও।দিন যায়। গড় বাঙালির মনে কবি একটু করে বিস্মৃত হয়। নজরুল সন্ধ্যায় স্রোতারা শুনতে এসে নাগাড়ে ঢোলে। অবহেলার আস্তাকুঁড় থেকে কবিকে উঠিয়ে আনা হোক - এই মর্মে তাও দু একজন মুখ খোলে। অবশ্য নজরুল প্রেমীরাও একে একে ধরাধামের পাঠ চুকিয়ে আলবিদা জানাবে। কবির সমগ্র কেটে পোকামাকড়ের আত্মীয়রা জোর পিকনিক মানাবে।তারপর একদিন এ-আর রহমান খবরে আসেন। তিনি বরাত পেয়ে কাশেন, — কারার ঐ লৌহকপাট! মন্দ নয়, তবে লোহার জায়গায় এলুমিনিয়াম, আর কপাটের জায়গায় জানালা করতে কী বাধা। কারাগার বদলে পাঠাগার করলেও খুব কি অসুবিধা!শুনেই খলবলিয়ে ওঠে খোরাকসর্বস্ব বাঙালি ফেসবুক। পুরনো একটা লাইন ঝেড়ে দেয়াল লেখে, — কবিতা তো নয়, যেন আস্ত এক একটা বন্দুক।দেখেশুনে আসরে নামে সাংবাদিক আস্তিন গুটিয়ে। এডিটর বলে, — যাবার আগে তিনটে কবিতা আর পাঁচটা গানের প্রথম লাইন কিন্তু টুকে নিও, হিড়িক যা পড়েছে তাতে ভুলভাল বললে লাল করে দেবে শুঁটিয়ে ।কাওতালি জমেছে দেখে প্রকাশক বলে, — বাজার গরম, মস্তি চরম। অন্তত হাজার দুয়েক ছাপতেই হয় এক ঝাঁকিতে ,নইলে দিনের শেষে আবার না হয় পড়তে হবে ফাঁকিতে।কবি তখন স্বর্গীয় নরকের দ্বারে বসে ভাঁজছেন মুগুর, কথাটা শুনে থমকে যান, ভাবনা আসে স্মৃতি-মেদুর। পরক্ষণেই অবশ্য মুগুরখানা হাতের কব্জিতে , শক্ত করে চেপে ধরেন চটজলদিতে — ফাঁকিতে! ব্যাটা এদিক পানে আসিস। ফাঁকিতে ! এইটা দিয়ে আ্যইসা দাবনা দেব না, বুঝবি তখন যন্ত্রণা শুধু আমার বুকেই নয়, লুকিয়ে থাকে তোরও মালায় চাকিতে। ফাঁকিতে !
    কিষেণজি মৃত্যু রহস্য - পর্ব ১০  - বিতনু চট্টোপাধ্যায় | ঝাড়গ্রাম থানা, কেস নম্বর ৬২/০৩  সন্ধে প্রায় সাড়ে সাতটা। মোটামুটি নির্বিঘ্নে নির্বাচন শেষ হয়েছে ঝাড়গ্রাম মহকুমায়। কঠিন পরীক্ষায় পাশ করা ছাত্রের মতোই পুলিশ এবং প্রশাসন খানিকটা স্বস্তির শ্বাস ফেলেছে। পুলিশের ভাষায়, সারাদিন মেজর ইনসিডেন্ট ফ্রি। এমনই সময় ঝনঝন শব্দে ফোন বাজল জামবনি থানায়। সারাদিন কত কারণেই তো ফোন বেজে উঠেছে! এসডিপিও ঝাড়গ্রাম বাস্তব বৈদ্য তখন থানায় বসে হিসেব মেলাচ্ছেন সমস্ত বুথ থেকে ঠিকমতো ব্যালট বাক্স ঝাড়গ্রাম শহরে পৌঁছেছে কিনা। ‘স্যার, বড়ো সাহেব।’ ফোনটা তুলেই বাস্তব বৈদ্যর দিকে এগিয়ে দিলেন থানার এক অফিসার। পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পুলিশ সুপার কে সি মিনা ফোন করেছেন। ‘স্যার...’‘বাসু ভকত মিসিং?’‘এমন খবর তো আমাদের কাছে নেই স্যার।’‘দেখ তো। খোঁজ নাও এখনই। সিপিআইএমের লোকেরা বলছে। ডুলুং নদীর পাশে পাঁচামি গ্রামের কাছাকাছি নাকি বাসু ভকতকে তুলে নিয়ে গিয়েছে ঝাড়খন্ডিরা।’‘স্যার...’‘ভালো করে দেখ। আমি আসছি।’‘স্যার...’ পুলিশ সুপার কে সি মিনার ফোন ছেড়েই বেরনোর জন্য রেডি হলেন এসডিপিও ঝাড়গ্রাম বাস্তব বৈদ্য। সারাটা দিন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ থাকার পর সন্ধ্যায় সিপিআইএমের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা বাসু ভকত মিসিং? এর থেকে তো সারাদিন গণ্ডগোল হলে ভালো হোত। বাসু ভকতের অপহৃত হওয়ার খবরের গুরুত্ব বোঝার মতো বয়স এবং অভিজ্ঞতা দুইই তখন হয়েছে ঝাড়গ্রাম মহকুমার পুলিশের।বাসু ভকত সিপিআইএমের জামবনি লোকাল কমিটির সম্পাদক। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়, জেলা সম্পাদক দীপক সরকারের বিশেষ অনুগত এবং ডান হাত বাসু ভকত তখন ঝাড়গ্রামের জঙ্গল ঘেরা এলাকায় সিপিআইএমের মুখ। জামবনির চুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা বাসু ভকত সেই সময় ওই এলাকায় শেষ কথা। আজ একে ধরছেন, তো কাল তাকে মারছেন। ঝাড়খন্ডিদের এক নম্বর টার্গেটের নাম বাসু ভকত। আবার এর মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন, ওর ছেলের পড়ার খরচ দিচ্ছেন। সিপিআইএম কর্মীদের কাছে লার্জার দ্যান লাইফ ইমেজ তাঁর। ওই এলাকার আদিবাসীদের ওপর সিপিআইএমের যে নেতার প্রভাব তখন সর্বাত্মক, গোপীবল্লভপুর, বেলপাহাড়ি, জামবনির গ্রামে গ্রামে যাঁর পায়ে হেঁটে অবাধ বিচরণ সেই ডহরেশ্বর সেনের মতো গ্রামে রাত কাটানো মানুষ তখন মেদিনীপুরের জেলা সম্পাদক দীপক সরকারের ইচ্ছেয় দলে একেবারেই কোণঠাসা। ঝাড়খন্ডি, সিপিআইএম, কংগ্রেস নির্বিশেষে আদিবাসী এবং গরিব মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় ডহরেশ্বর সেন নন, বিহার সংলগ্ন মেদিনীপুরের জঙ্গল ঘেরা এলাকায় শাসক দলের মুখ তখন বাসু ভকত।  সিপিআইএমের নির্বাচনী লাইন নিদান দিয়েছে, ঝাড়খন্ডিরা বড্ড বেয়াড়া। বাম জমানাতেও প্রবল পরাক্রান্ত সিপিআইএমের বিরোধিতা করে কথায় কথায়। তাই তাদের সবক শেখাতে দরকার বাসু ভকতের মতো দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতার। দীর্ঘ বছর সরকার চালিয়ে সিপিআইএমের তখন চাই নিঃশর্ত আনুগত্য। চাই সমস্ত এলাকায় দখলদারি। রাজনৈতিক একাধিপত্য। দলের ভিতরে এবং বাইরে সামান্য বিরোধিতা মানেই, না, তখনও মাওবাদী নন আপনি, কিন্তু অবশ্যই শত্রু শিবিরের লোক। মেদিনীপুর জেলার সিপিআইএমের ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর কাছে তখন নিজের দলেরই নেতা ডহরেশ্বর সেন এবং ঝাড়খন্ড পার্টির নেতা নরেন হাঁসদা প্রায় একই ব্র্যাকেটের বাসিন্দা। দুজনকেই মোকাবিলার জন্য দরকার বাসু ভকতদের। বিরোধীদের দমন করতে হবে পেশি শক্তি দিয়ে, আর নিজের দলের মধ্যে ভিন্ন মতটাকে দমন করতে হবে তাঁকে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে। দলের ভেতরে এবং বাইরে গণতন্ত্র কি সত্যিই ছিল সিপিআইএমে তখন? বিশেষ করে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায়। গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত যদি হয় বিরোধী এবং দুর্বল মতকে শোনা এবং তাকে উপযুক্ত সম্মানজনক অগ্রাধিকার দেওয়া, তবে এ’রাজ্যে দীর্ঘ সিপিআইএম জমানায় তার লঙ্ঘিত হওয়ার অন্যতম পরীক্ষাগার ডুলুং, কংসাবতী নদীর পারের রুক্ষ লাল মাটির একের পর এক গ্রামে। সব মিলিয়ে ঝাড়গ্রাম মহকুমা। মূলত আদিবাসী অধ্যুষিত ঝাড়গ্রাম এলাকায় ঝাড়খন্ড পার্টির প্রভাব, প্রতিপত্তি দমন করাই আটের দশক থেকে অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলায় সিপিআইএমের প্রধান এবং একমাত্র রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পর্যবসিত হল। আদিবাসীদের সমর্থন আদায় করা কিংবা তাদের মন জয় করা দীর্ঘমেয়াদি এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় সাফল্যের জন্য যে ধৈর্য, ত্যাগ, রাজনৈতিক কর্মসূচি দরকার, সংসদীয় গণতন্ত্রে তাৎক্ষনিক সাফল্য তত সময় অনুমোদন করে না। ভোটটা তো জিততে হবে! সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হৃদয় না জিতেই যদি একের পর এক নির্বাচনে সাফল্য করায়ত্ত্ব হয়, তবে এত সমুদ্রমন্থনের প্রয়োজন কী? সেই সময় নিজের দলের মধ্যেও ভিন্ন মতটা শোনার মতো ধৈর্য দেখাননি প্রথমে অবিভক্ত ও পরে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সিপিআইএম নেতৃত্ব। আর রাজ্য নেতৃত্বের কাছে জেলা নেতাদের যোগ্যতার একটা গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি নির্বাচনী সাফল্য। সেই সাফল্য কোন পথে আসছে, কীভাবে আসছে তা মামুলি ব্যাপার। কিন্তু পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় সিপিআইএমের গণতন্ত্রের অনুশীলন ২০০৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটের সন্ধ্যায় প্রশাসনের কাছে বড় প্রশ্ন ছিল না। একমাত্র প্রশ্ন ছিল, বাসু ভকত মিসিং! এমনই খবর পৌঁছেছিল জেলার পুলিশ সুপার কে সি মিনা মারফত জামবনি থানায়। দু’গাড়ি ফোর্স নিয়ে ঝাড়গ্রামের এসডিপিও বেরলেন জামবনি থানা থেকে। এরই মধ্যে বেলপাহাড়ি থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অপারেশন রাজেশ সুবর্ণকে ডেকে পাঠানো হয়েছে জামবনিতে। এসপি’র কথা মতো জামবনি থানা থেকে সাপধরা, পাঁচামির দিকে রওনা দিল দু’গাড়ি ফোর্স। থানা থেকে বেশি দূর নয়, কিন্তু চারদিকে ঘন অন্ধকার। অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে জঙ্গলে বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করলেন পুলিশ অফিসাররা। জনপ্রাণী নেই কোথাও। বেশ কিছু সময় রাস্তা এবং জঙ্গলে ঘোরাঘুরি করে কিছু দেখতে না পেয়ে জামবনি থানায় ফিরলেন অফিসাররা। ততক্ষণে থানায় পৌঁছে গিয়েছেন জেলার এসপি কে সি মিনা।রাত সাড়ে আটটা-ন’টা হবে। বাসু ভকতের নিরুদ্দেশের খবর ততক্ষণে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে জামবনিজুড়ে। আর সেই খবর যত ছড়াচ্ছে, জামবনি থানার সামনে তত ভিড় বাড়ছে সিপিআইএমের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের। পুলিশ অফিসাররা আবার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন তল্লাশিতে যাওয়ার। বাসু ভকত মিসিং সামান্য কোনও ব্যাপার নয়। এসডিপিও এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দুজনেই বেরলেন থানা থেকে। সঙ্গে ফোর্স এবং তাঁদের পেছনে প্রচুর সিপিআইএম নেতা-কর্মী। তাঁরাও সব যাবেন পুলিশের সঙ্গে বাসু ভকতের খোঁজে। পুলিশ অফিসাররা বুঝলেন শাসক দলের ক্যাডারদের সঙ্গে নিয়ে নেতার তল্লাশিতে যাওয়া ঠিক হবে না। তাঁরা জানিয়েও দিলেন সিপিআইএমের ভিড়টাকে সে কথা, যাওয়া যাবে না পুলিশের সঙ্গে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। সিপিআইএমের লোকজন যাবেনই। তাঁদের প্রিয় নেতা নিরুদ্দেশ! সামান্য দূরত্ব রেখে পুলিশকে অনুসরণ করল সিপিআইএমের ভিড়টা। গাড়িতে চেপে আশপাশের আরও নানা জায়গা থেকে শাসক দলের লোকজন তখন হাজির হয়েছে জামবনি থানায়।রাত প্রায় সাড়ে নটা। ঝাড়গ্রাম এবং জামবনি পঞ্চায়েত সমিতির সীমানায় পাঁচামির জঙ্গলে পৌঁছোল পুলিশের কনভয়। কনভয় মানে চার-পাঁচ গাড়ি পুলিশ। বড় রাস্তায় গাড়ি রেখে আস্তে আস্তে দুটো-তিনটে দলে ভাগ হয়ে পুলিশ ঢুকল জঙ্গলের ভেতরে। সিপিআইএমেরও কিছু ছেলে পুলিশের পেছনে। হাতে বড় টর্চ, এসডিপিও ঝাড়গ্রাম একটা টিম নিয়ে আগে আগে চলেছেন। পেছনে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী। অন্য একটা টিম নিয়ে রাস্তার অন্যদিকে জঙ্গলে ঢুকলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজেশ সুবর্ণ। দুটো দলেরই পিছু নিল শাসক দলের অল্প কিছু যুবক। বাকি সিপিআইএমের লোকজন দাঁড়িয়ে থাকলেন বড় রাস্তায়। পুলিশের দুটো দল অন্ধকার জঙ্গলে টর্চ হাতে শুরু করল সার্চ অপারেশন। বড়ো রাস্তা থেকে জঙ্গলের ভেতর ৩০০-৩৫০ মিটার এগোতেই মাটিতে পড়ে থাকা পাতা একটু এলোমেলো দেখলেন বাস্তব বৈদ্য। এদিক-ওদিক টর্চ ঘোরাতেই দেখলেন মাটিতে টাটকা রক্ত। থিকথিক করছে। তার থেকে কুড়ি ফুট এগোতেই মাটিতে পড়ে আছে বাসু ভকতের মৃতদেহ। বুকে ভয়ঙ্করভাবে বিঁধে রয়েছে লম্বা তীর। পুরো শরীর ক্ষতবিক্ষত। আর কিছু না দেখে মুহূর্তের মধ্যে টর্চ নিভিয়ে দিলেন বাস্তব বৈদ্য। সঙ্গে সঙ্গে নিলেন ইউ টার্ন। ফোর্স এবং সিপিআইএম বাহিনীটাকে নিয়ে সরে গেলেন অন্যদিকে। সেকেন্ডের মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন, এই পরিস্থিতিতে মৃতদেহ উদ্ধার করা যাবে না। তাঁর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলছে, বাসু ভকতের মৃতদেহ উদ্ধার হলেই সিপিআইএমের লোকজন তা নেওয়ার চেষ্টা করবে। তারপর সেই মৃতদেহ নিয়ে শাসক দলের মিছিল থেকে শুরু করে গোটা এলাকায় যে পরিস্থিতি তৈরি হবে পরদিন থেকে, তা আর সামলানো যাবে না। আগুন জ্বলবে পুরো ঝাড়গ্রাম মহকুমায়। বাসু ভকতের মতো দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতার খুনের বদলা এবং তাকে কেন্দ্র করে শুরু হবে চূড়ান্ত অরাজকতা, নৈরাজ্য। নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।কিছুক্ষণ জঙ্গলের মধ্যে এদিক ওদিক ঘুরে বড় রাস্তায় গিয়ে উঠলেন ঝাড়গ্রামের এসডিপিও। সিপিআইএম ক্যাডারদের আগে এখান থেকে সরানো দরকার। নয়তো মৃতদেহ উদ্ধার করা অসম্ভব। কিন্তু বুঝতে পারছেন, বললেই সিপিআইএম বাহিনীটা এলাকা ছেড়ে যাবে না। এদিকে যা করার করতে হবে রাতের অন্ধকারেই। ভোর হয়ে গেলে মুশকিল। সিপিআইএমের ভিড়টাকে বললেন, ‘এই রাতের অন্ধকারে জঙ্গলে খোঁজাখুজি করা যাবে না। যা করার করতে হবে কাল সকালে। আপনারা সব চলে যান। কাল সকালে আসবেন। আমরাও থানায় যাচ্ছি। এখানে পিকেটিং থাকুক।’ এই বলে এসডিপিও গাড়িতে উঠলেন। গাড়িতে উঠেই জেলার পুলিশ সুপারকে ওয়্যারলেসে জানালেন, ‘স্যার, হি ইজ নো মোর।’ রাত প্রায় সাড়ে ১১টা। জামবনি থানায় ফিরল পুলিশের টিমটা। থানায় এসপি, ডিআইজি বসে। ‘স্যার, বডি দেখে এসেছি।’‘শিওর? মারা গেছে?’‘হ্যাঁ স্যার। বুকে তীর। পুরো শরীরে রক্ত। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মেরেছে। রাতেই বডি তুলে আনতে হবে। কাল বড়ো ঝামেলা হতে পারে।’জামবনি লোকাল কমিটির সম্পাদক বাসু ভকতের মৃত্যুর খবর মাঝরাতেই পাঠানো হল কলকাতায়। মহাকরণের প্রশাসনিক কর্তাদের কাছে চাওয়া হল অতিরিক্ত ফোর্স। যত দ্রুত সম্ভব। ঝাড়গ্রাম মহকুমায় প্রায় সমস্ত এলাকায় ফোর্স মোতায়েন করতে হবে হিংসা-প্রতিহিংসা ঠেকাতে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, এসডিপিও ভেবেছিলেন, অত রাতে সিপিআইএমের ছেলেরা বাড়ি ফিরে যাবে। কিন্তু কোথায় কী? কয়েক’শো ছেলে মাঝরাতেও থানার বাইরে দাঁড়িয়ে। রাত প্রায় দেড়টা। জামবনি থানার অফিসাররা ততক্ষণে বুঝে গিয়েছেন, সিপিআইএমের বাহিনীটাকে আর সরানো যাবে না। কিন্তু সময়ও নেই বেশি। দিনের আলো একবার ফুটে গেলে এই জমায়েতটাই কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। এখনই করতে হবে যা করার। ফের থানা থেকে বেরলেন কয়েকজন অফিয়ার। এবং যথারীতি আবারও তাঁদের পিছু নিলেন সিপিআইএমের লোকজন। বাসু ভকতের অনুগামীরা।রাত প্রায় দুটো। আবার পাঁচামির জঙ্গলের ধারে আগের জায়গায় ফিরল পুলিশের লম্বা কনভয়। টর্চ হাতে জঙ্গলে ঢুকলেন এসডিপিও। ঝাড়গ্রাম থানার ওসিকে বলাই ছিল, পিও’তে (প্লেস অফ অকারেন্স) পৌঁছেই ৩-৪ জন পুলিশ কর্মী মুহূর্তের মধ্যে বাসু ভকতের মৃতদেহ তুলে অন্ধকারে নিঃশব্দে গাড়িতে গিয়ে রাখবেন। বাস্তব বৈদ্য টর্চ নিয়ে আগে গিয়ে মৃতদেহ দেখিয়ে দিয়েই একটু পাশে সরে যাবেন। তাঁর পেছন পেছন সিপিআইএম বাহিনীটা সরে গেলেই পুলিশের ৩-৪ জন অন্ধকারে মৃতদেহ নিয়ে বড় রাস্তায় গিয়ে গাড়িতে রাখবে। বড় রাস্তা থেকে জঙ্গলে ঢুকে এগোচ্ছেন বাস্তব বৈদ্য। সঙ্গে ৮-১০ জন পুলিশ অফিসার এবং সিপিআইএম বাহিনী। ১০ মিনিট, ১৫ মিনিট, আধ ঘন্টা টর্চ জ্বালিয়ে জঙ্গলে ঘুরছেন এদিক ওদিক। কিন্তু মৃতদেহ নেই। কোত্থাও দেখা যাচ্ছে না বাসু ভকতের মৃতদেহ। অথচ কিছুক্ষণ আগেও নিজের চোখে দেখে গিয়েছেন। মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে পুলিশ অফিসারদের। মৃতদেহ গায়েব? কীভাবে সম্ভব? কে নিয়ে গেল বাসু ভকতের মৃতদেহ? মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে হাজারো চিন্তা। কলকাতা থেকে ফোর্স রওনা দিয়েছে। সিনিয়র অফিসাররা সবাই জেনে গিয়েছেন সিপিআইএমের জামবনি লোকাল কমিটির সম্পাদকের খুনের কথা। এই অবস্থায় মৃতদেহ উধাও? প্রায় মিনিট চল্লিশেক জঙ্গলের মধ্যে এলোমেলো ঘোরাঘুরি করে বড় রাস্তায় গিয়ে উঠল এসডিপিওর নেতৃত্বে পুলিশ বাহিনী। এবং বড় রাস্তায় উঠেই বাস্তব বৈদ্য বুঝলেন, অন্ধকারে ভুল রাস্তা দিয়ে জঙ্গলে ঢুকেছিলেন।  বড়ো রাস্তা থেকে আবার জঙ্গলে ঢুকলেন সিঙ্গল লাইন ফর্মেশন করে। প্রথমবার যে জায়গা দিয়ে ঢুকেছিলেন সেখান থেকে। এবং পাঁচ মিনিটের মধ্যেই পেয়ে গেলেন বাসু ভকতের মৃতদেহ। একইভাবে মাটিতে পড়ে রয়েছে। ঝাড়গ্রাম থানার ওসি দীপক সরকারকে বোঝানোই ছিল সব কিছু। তাঁকে ইশারায় মৃতদেহ দেখিয়েই ঘুরে অন্যদিকে এগোলেন এসডিপিও। তাঁর পেছনে পেছনে চলেছে সিপিআইএমের ৪০-৫০ জন। এসডিপিও সিপিআইএম বাহিনীটাকে নিয়ে অন্যদিকে কয়েক পা এগোতেই অন্ধকারে বাসু ভকতের মৃতদেহ চার পুলিশ কর্মী সন্তর্পনে তুলে নিয়ে গিয়ে রাখলেন গাড়িতে। এক মুহূর্তের মধ্যে সেই গাড়ি সিপিআইএমের জামবনি লোকাল কমিটির সম্পাদকের মৃতদেহ নিয়ে রওনা দিল ঝাড়গ্রাম শহরের দিকে। ঝাড়গ্রাম পুলিশ ফাঁড়ি হয়ে ভোরের আলো ফোটার আগেই বাসু ভকতের দেহ পাঠিয়ে দেওয়া হল ঝাড়গ্রাম হাসপাতালের মর্গে। জামবনির দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিপিআইএম নেতা বাসু ভকতের মৃতদেহ নিয়ে পুলিশের গাড়ি ঝাড়গ্রাম শহরের দিকে রওনা দেওয়ার পর অন্তত প্রথম চিন্তাটা কাটল পুলিশের সিনিয়র অফিসারদের। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভোর হবে। এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটা বাকি। এই খুনকে কেন্দ্র করে হিংসা-প্রতিহিংসা যেন শুরু না হয়ে যায় সিপিআইএম এবং ঝাড়খন্ড পার্টির মধ্যে। তার প্রস্তুতি নিতে হবে। পাঁচামির জঙ্গল থেকে বেরিয়ে ঘন অন্ধকারে বড় রাস্তায় নিজের গাড়ির সামনে দিয়ে দাঁড়ালেন ঝাড়গ্রামের এসডিপিও। সিপিআইএম নেতা-কর্মীরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে। তাঁদেরই একজন, এলাকায় পরিচিত ভাই নামে, তাঁকে আলাদা করে ডেকে নিলেন বাস্তব বৈদ্য। জানিয়ে দিলেন বাসু ভকতকে খুনের কথা। বললেন, বাসু ভকতের মৃতদেহ এই মাত্র পাঠানো হয়েছে ঝাড়গ্রাম শহরে। ‘এটা স্যার হওয়ারই ছিল। একদিন না একদিন তো মরার কথাই ছিল।’ বিশ সেকেন্ড নীরবতার পর স্বগোতক্তির মতো উত্তর দিলেন ভাই। যেন জানতেন বাসু ভকতের জীবনের অনিবার্য পরিণতির কথা।পুলিশ অফিসাররা বুঝলেন, বাসু ভকতের ব্যাপারে তাঁরই অনুগামীদের ঠিক কী মূল্যায়ন!  কিন্তু কীভাবে ঘটল এই ঘটনা? মেদিনীপুরে জঙ্গল এলাকায় সিপিআইএমের সবচেয়ে শক্তিশালী মুখ তখন বাসু ভকত। সব সময় সঙ্গে সশস্ত্র বাহিনী, নিজের কাছে রিভলভার! সেই সময় জামবনির প্রতিটা বাচ্চা-বুড়ো থেকে শুরু করে গোটা ঝাড়গ্রাম মহকুমা জানে, অস্ত্র এই এলাকার রাজনীতিতে শেষ কথা। আর অস্ত্র উঁচিয়ে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের যে রাজনীতি, তার শেষ কথা বাসু ভকত। রাজ্যের অত্যন্ত পিছিয়ে পড়া এবং বিহার লাগোয়া এক ব্লকে বাসু ভকতের উত্থান সাতের দশকে। আদিবাসী অধ্যুষিত হতদরিদ্র মানুষের বসবাস যে এলাকায় সেই এলাকার নেতা বাসু ভকত। কিন্তু কেন নৃশংসভাবে খুন হতে হল তাঁকে?গরিব প্রান্তিক মানুষের স্বাভাবিক সমর্থন যে পার্টির সেরা সম্পদ তার নেতাকে কেন দরিদ্র, আদিবাসী মানুষের সমর্থন আদায়ের জন্য অস্ত্র ধরতে হয়, সেই প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে রয়েছে এর জবাব। কেন বাড়ি ছেড়ে লোকাল কমিটির অফিসে জীবন কাটানো নেতা বাসু ভকতকে গরিব, আদিবাসী মানুষের হাতে নৃশংসভাবে খুন হতে হয় একুশ শতকের গোঁড়ায়, তারও উত্তর মিলবে একই প্রশ্নে। গণতন্ত্রের উৎসব নির্বাচনের দিন কেন এই হত্যার রাজনীতি? কেন অগণতান্ত্রিক এবং অসংসদীয় রাজনীতির অনুশীলন? বাসু ভকতের খুন কি রাজনৈতিক হিংসা না প্রতিহিংসা? নির্বাচনের দিন অস্ত্রের আধিপত্য, বুথ দখল, বিরোধী শূন্য বুথের পরম্পরা, খুনোখুনির যে ঐতিহ্য এ’রাজ্যের গণতান্ত্রিক পরিবেশে যুক্ত হয়েছিল, তার সঙ্গে কি কোনও যোগ রয়েছে ২০০৩ পঞ্চায়েত নির্বাচনের সন্ধ্যায় সিপিআইএমের জামবনি লোকাল কমিটির সম্পাদককে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনার!  এই সমস্ত প্রশ্নের হদিস করার আগে দেখে নেওয়া জরুরি, কীভাবে সেদিন ঝাড়খন্ড পার্টির সমর্থকদের হাতে খুন হয়েছিলেন বাসু ভকত?এক অচেনা ব্যক্তির ফোনে যে খবরটা সকালে জামবনি থানায় এসেছিল, তার সূত্র ধরে দুবরা গ্রাম থেকে একটা গাড়িকে দুপুরেই ধরেছিল পুলিশ। কিন্তু হদিশ পাওয়া যাচ্ছিল না দ্বিতীয় গাড়িটার। এরই মধ্যে বিকেল থেকে সেই গাড়িটার কথা আর মাথায়ও আসেনি পুলিশ অফিসারদের। নির্বিঘ্নে ভোট শেষ করানো, সমস্ত বুথ থেকে ব্যালট বাক্স আনানো এবং সেই পর্ব মিটতে না মিটতেই বাসু ভকতের নিরুদ্দেশের খবর। আর সন্ধে থেকে ভোর রাত হয়ে গেল বাসু ভকতের মৃতদেহ উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠাতে। ভোটের পরদিন বাসু ভকতের খুনের তদন্তে নামল ঝাড়গ্রাম পুলিশ। তদন্তে উঠে এল চমকপ্রদ তথ্য। তদন্তে অফিসাররা জানতে পারলেন, গড়বেতার দ্বিতীয় গাড়িটা ছিল বাসু ভকতের সঙ্গে। সকাল থেকেই জামবনির নানা বুথে ঘুরে ভোটের তদারকি করছিলেন তিনি। তাঁর সঙ্গে ছিল গড়বেতার একটা গাড়ি, তাতে সশস্ত্র ৫-৬ জন। দুপুরের পর তাদের নিয়ে গিধনির দিকে যান বাসু ভকত। বিকেলে তিনি আবার পরিহাটি হয়ে চলে যান চিঁচিড়ার দিকে। মাঝখানে বম্বে রোড়ের ধারে চিঁচিড়াতে এক জায়গায় তাঁরা খাওয়াদাওয়া করেন। তারপরই দুপুর ৩টে নাগাদ গড়বেতার দ্বিতীয় গাড়ির লোকজনের কাছে অন্য গাড়িটি ধরা পড়ার খবর পৌঁছয়। প্রায় একই সময় জেলার এক সিপিআইএম নেতা ফোন করেন বাসু ভকতকে। তাঁকে বলেন, একটা গাড়ি ধরা পড়েছে, পুলিশ ব্যাপক ধরপাকড় করছে গড়বেতার অন্য গাড়িটার খোঁজে। তিনি যেন গড়বেতার গাড়িটাকে সঙ্গে নিয়ে না ঘোরাফেরা করেন। আর তাদের সঙ্গে থাকা বন্দুকও সরিয়ে ফেলার জন্য বাসু ভকতকে নির্দেশ দেন জেলার ওই নেতা। বন্দুকসহ বাইরের ছেলে জামবনিতে ধরা পড়ে গেলে খারাপ হবে। সঙ্গে সঙ্গে সতর্ক হয়ে যান বাসু ভকত। খাওয়াদাওয়ার পর গাড়িতে থাকা বন্দুকগুলো চিঁচিড়াতেই এক নিরাপদ জায়গায় রেখে দেন তিনি। ঠিক হয়, ভোট মিটে গেলে দু’একদিন বাদে সেগুলো গড়বেতায় পাঠিয়ে দেওয়া হবে। পুলিশের কাছে যখন একবার খবর পৌঁছে গিয়েছে, এত বন্দুক গাড়িতে রাখা ঠিক হবে না। তাছাড়া ভোটও প্রায় শেষ লগ্নে। লম্বা বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামছে। গড়বেতার ছেলেদের ছেড়ে দিলেন বাসু ভকত। গড়বেতার গাড়ি জামবনি ছেড়ে বেরিয়ে গেল।গড়বেতা বাহিনীকে ছেড়ে নিজের গাড়িতে ড্রাইভারের পাশে সামনের সিটে বসলেন বাসু ভকত। ড্রাইভার আর নিজের মাঝে রাখা তাঁর নিজস্ব রিভলভার। পুলিশও জানত, নিজের নিরাপত্তার জন্য সব সব সময় রিভলভার নিয়ে ঘোরেন তিনি। গাড়ির পেছনের সিটে দু’তিনজন স্থানীয় সিপিআইএম কর্মী। যাঁরা তাঁর একদম নিজস্ব লোক। এরপর বাসু ভকতের গাড়ি রওনা দিল জামবনির দিকে। ভোট তো প্রায় শেষ। এবার জামবনি পার্টি অফিসে বসে সমস্ত বুথের ভোটের খবর নিতে হবে। ব্যালট পেপার বেরতে শুরু করবে বুথ থেকে। অনেক কাজ বাকি এখনও।   ঝুপ করে অন্ধকার নামল জঙ্গলমহলে। সাপধরা বুথ পেরিয়ে বাসু ভকতের গাড়ি এগোচ্ছে পিচ রাস্তা ধরে, জামবনির দিকে। জঙ্গলে আবছা অন্ধকারে বাসু ভকত কিংবা চালক গাড়ির দূর থেকে দেখতেও পেলেন না, গাছের গুঁড়ি ফেলে রাস্তা আটকে রেখেছে ঝাড়খন্ড পার্টির লোকজন। বিকেল থেকেই রাস্তার ধারে গাছের আড়ালে অপেক্ষা করছিল প্রচুর মহিলা-পুরষ এবং তীর, ধনুক নিয়ে সশস্ত্র ঝাড়খন্ডি বাহিনী। সরকারি গাড়ি গাছের গুঁড়ির সামনে থামলেই জঙ্গল থেকে বেরিয়ে ব্যালট বাক্স নিয়ে চম্পট দেবে তারা। কিন্তু পঞ্চায়েত ভোটের সন্ধ্যায় ব্যালট বাক্সের গাড়ি নয়, পাঁচামির জঙ্গলের ধারে ঝাড়খন্ডিদের তৈরি করা ব্যারিকেডের সামনে এসে থামল বাসুদেব ভকতের গাড়ি। আটের দশকের প্রায় মাঝামাঝি থেকেই বেলপাহাড়ি, বিনপুর, জামবনির গ্রামে গ্রামে যে ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক হিংসা এবং সংঘর্ষের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল ঝাড়খন্ড পার্টি এবং সিপিআইএমের মধ্যে, তাতে সেই সন্ধ্যায় একশো বুথের ব্যালট বাক্স পেয়ে গেলেও ওই জমায়েতটা এত খুশি হোত না, যতটা তারা হয়েছিল শাসক দলের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতাকে হাতের কাছে পেয়ে। ব্যালট বাক্সের গাড়ি ভেবে মহিলা এবং পুরুষদের ভিড়টা মুহূর্তের মধ্যে ঘিরে ফেলল সিপিআইএম নেতার গাড়ি। আর সেকেন্ডের মধ্যে একজন অন্ধকারেই চিনে নিলেন বাসু ভকতকে। এমন একজন বাসু ভকতকে চিনে ফেললেন, ঝাড়খন্ড পার্টি করার অপরাধে যাঁর বাড়ি কয়েকদিন আগে পুড়িয়ে দিয়েছিল সিপিআইএম বাহিনী। তিনি বাসু ভকতকে চিনতেন। তাঁকে দেখেই তিনি চিৎকার করতে শুরু করেন। কেন তাঁর বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছিল, কৈফিয়ত দাবি করেন বাসু ভকতের কাছে। হতভম্ব বাসু ভকত কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁকে টেনে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিল সশস্ত্র ঝাড়খন্ডি বাহিনী। সিটের পাশে রাখা রিভলভার হাতে তোলার সময়ই পেলেন না তিনি। এক’দু মিনিটের মামলা, গাড়ির চালক এবং পেছনের সিটে বসে থাকা দুই দলীয় কর্মী কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাসু ভকতকে মারতে মারতে পাঁচামির জঙ্গলের ভেতরে টেনে নিয়ে গেল ঝাড়খন্ডিরা। হিংস্র নেকড়ের দল যেভাবে বড় শিকার পেলে আর তুচ্ছ প্রাণীর দিকে ফিরেও তাকায় না, সেই মানসিকতা থেকেই হয়তো কিংবা মুহূর্তের উত্তেজনায় গাড়ির বাকিদের গায়ে হাতও দিল না তারা। গাছের গুঁড়ি সরিয়ে বাসু ভকতকে ছাড়াই তাঁর গাড়ি রওনা দিল জামবনির দিকে। এর পরের ঘটনা ভয়ঙ্কর। বল্লম, তির দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হল বাসু ভকতকে। তারপর মাত্র কয়েক ফুট দূর থেকে তির ছোড়া হল তাঁর বুকে। ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত বাসু ভকতের মৃতদেহ পড়ে রইল পাঁচামির জঙ্গলে। বাসু ভকতের মৃতদেহে সর্বত্র প্রতিশোধের চিহ্ন স্পষ্ট। জঙ্গলমহলে হিংসা-প্রতিহিংসার রাজনীতিতে একটা ছোট্ট বৃত্ত সম্পুর্ণ হল! কিন্তু বৃহত্তর কিছু প্রশ্ন তুলে দিল ২০০৩ সালের পঞ্চায়েত ভোট এবং বাসু ভকতের হত্যা। জামবনির একইসঙ্গে জনপ্রিয় এবং দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিপিআইএম নেতার খুন ক্রিয়া না প্রতিক্রিয়া?  সিপিআইএম নেতা এবং জামবনি লোকাল কমিটির সম্পাদক বাসুদেব ভকতের মৃত্যু সামান্য একটা খুন ছিল না ২০০৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটের দিন। আসলে ২০০৩ এর পঞ্চায়েত ভোটের দিন রাজ্যের তিনটে জেলায় সকাল থেকে পৃথক পৃথক বিরোধী দলের সঙ্গে নিরবিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ হচ্ছিল শাসক দলের। দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর, কুলতলি, ক্যানিং এলাকায় সিপিআইএমের সঙ্গে মারাত্মক সংঘর্ষ হয় এসইউসিআইয়ের। মুর্শিদাবাদের ডোমকলসহ বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ হয় সিপিআইএমের সঙ্গে কংগ্রেসের এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের ঝাড়গ্রামে সিপিআইএমের সঙ্গে ঝাড়খন্ড পার্টির। গ্রাম পঞ্চায়েত এবং জেলা পরিষদের আসনে বিরোধী দলের অস্তিত্ব থাকবে না এবং রাজ্যজুড়ে নিজেদের এক দলীয় শাসন ব্যাবস্থা কায়েম করাই তখন সিপিআইএমের একমাত্র রাজনৈতিক লক্ষ্য। জ্যোতি বসু তখন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। দলে এবং সরকারে মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রভাব সেই সময় দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক অনিল বিশ্বাস। ১৯৯৮ সালে তৃণমূল কংগ্রসে তৈরির পর আচমকা একটা রাজনৈতিক ধাক্কার মুখোমুখি হয়েছিল বটে ৩১ আলিমুদ্দিন স্ট্রিট। সরকার থাকবে কিনা সেই প্রশ্নও উঠে গিয়েছিল সিপিআইএম নেতৃত্বের একটা বড় অংশের মধ্যে। কিন্তু ২০০১ বিধানসভা ভোটে তা সামলে ওঠা গেছে। আর সেই বিধানসভা ভোটে ‘হয় এবার, নয় নেভার’ স্লোগান তুলে বিপর্যস্ত হওয়ার পর তৃণমূল কংগ্রেসের তখন এমনই ৩০ রানে আট উইকেট অবস্থা, ২০০৩ পঞ্চায়েত ভোটে রাজ্যের বহু গ্রামে তারা প্রার্থীই দিতে পারেনি। প্রায় বিরোধীহীন দক্ষিণবঙ্গে সিপিআইএমের অশ্বমেধের ঘোড়াকে যে দু’তিনটে পয়েন্টে এসইউসিআই, কংগ্রেস কিংবা ঝাড়খন্ড পার্টি থামানোর চেষ্টা করেছে, সেই এলাকাই রক্তাক্ত হয়েছে। কিন্তু ওই পঞ্চায়েত ভোটের দিন মুর্শিদাবাদের ডোমকল কিংবা দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগর, কুলতলিতে কংগ্রেস এবং এসইউসিআইএমের সঙ্গে লড়াইয়ের থেকেও ঝাড়গ্রামে ঝাড়খন্ডিদের সঙ্গে সিপিআইএমের লড়াইয়ের একটা মৌলিক ফারাক ছিল। ডোমকল, জয়নগর কিংবা কুলতলিতে বিরোধীদের কাছে লড়াইটা ছিল কয়েকটা মাত্র গ্রাম পঞ্চায়েত দখলের, আর ঝাড়গ্রামের লড়াইটা ছিল শাসক দল সিপিআইএমকে নিকেষ করার। তাই সেদিন সিপিআইএমের জামবনি লোকাল কমিটির সম্পাদক বাসু ভকতের নৃশংস খুন মামুলি একটা ব্যাপার ছিল না। বরং বিরোধী মতকে খতম করে গণতন্ত্র-বিপরীত যে পরম্পরা, ঐতিহ্য সিপিআইএম উত্তর বাংলা বহন করছে একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকেও, তার সূত্রপাত হয়েছিল বহু বছর আগে সিপিআইএম জমানাতেই, যা শত পুষ্পে বিকশিত হল ২০০১ এর বিধানসভা নির্বাচন থেকে শুরু করে দু’বছর পরের পঞ্চায়েত ভোট পর্যন্ত। এই গাছের চারা এমন একটা সময় অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার ঝাড়গ্রামে পোঁতা হয়েছিল, যখন উদার অর্থনীতি চালু হয়নি দেশে, বাবরি মসজিদও ভেঙে পড়েনি উত্তরপ্রদেশের ফৈজাবাদ জেলায়। বাসু ভকতের মৃত্যু কারণ সন্ধানে এবার আমার ডেস্টিনেশন ঝাড়গ্রামের জামবনি ব্লক।কারণ, কিষেণজি মৃত্যু রহস্যের সন্ধান করতে হলে সিপিআইএম নেতা বাসুদেব ভকতের হত্যার কারণও জানা জরুরি। পৃথক রাজ্যের দাবি নিয়ে আটের দশকের গোড়া থেকে তীব্র আন্দোলন শুরু না হলে যেমনভাবে ঝাড়গ্রামে বাসু ভকতের নেতৃত্বে সিপিআইএমের আধিপত্যবাদের রাজনীতির দরকার পড়ে না, তেমনই বাসু ভকত না থাকলে কিষেণজির নির্বিচারে ব্যক্তি হত্যার রাজনীতিও জঙ্গলমহলে সামাজিক স্বীকৃতি পায় না একটা সময় পর্যন্ত। আর কিষেণজির নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই ব্যক্তি হত্যার রাজনীতি যে কতটা কাউন্টার প্রোডাকটিভ হতে পারে, তা জঙ্গলহল সুদে-আসলে তাঁকে ফেরত দিয়েছে ২৪ নভেম্বর ২০১১। সেই জামবনি, যেখানে দোর্দণ্ডপ্রতাপ সিপিআইএম নেতা বাসু ভকতকে ২০০৩ সালে খুন হতে হয়, সেই জামবনিই সাক্ষী থাকে ২০১১র নভেম্বরে আরও এক মৃত্যুর! মাঝে মাত্র আট বছরের ব্যবধান। ক্রমশ।..             
    সাম্রাজ্যবাদ: যুদ্ধই ইতিহাস, বর্তমান, ভবিষ্যৎ - Bhattacharjyo Debjit | সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে ছিলেন লেনিন ১৯১৫-১৬ সাল নাগাদ। সেসময় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের নেতা কাউটস্কি দেখিয়েছিলেন, বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা 'অতি-সাম্রাজ্যবাদ'-এর দিকে এগিয়ে চলেছে, যে অবস্থায় বিশ্বে একটি স্থায়ীত্ব আসবে এবং যুদ্ধের কোন ঝুঁকি থাকবে না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরিণাম তা বাস্তবে ভুল প্রমাণিত করলো। মার্ক্সবাদী অর্থনীতিবিদ লেনিন কাউটস্কির তত্ত্বকে সমালোচনা করে দেখালেন, সাম্রাজ্যবাদ হল, একচেটিয়া পরজীবী মৃতপ্রায়-পুঁজিবাদ অর্থাৎ পুঁজিবাদ যখন মৃত্যুশয্যায়। সাম্রাজ্যবাদের প্রাথমিক অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য হল, মুক্ত প্রতিযোগিতাকে একচেটিয়া কারবারের সাহায্যে স্থান চ্যুত করা। আর এর স্বার্থেই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় বারেবারে ফিরে আসে যুদ্ধ। পুঁজির উৎস এবং বিকাশ পর্ব-কার্ল মার্ক্সের পুঁজির ধারনাটি ছিল ধ্রুপদী অর্থনীতির থেকে সম্পূর্ন আলাদা। তিনি 'পুঁজির আদিম লুণ্ঠন' পর্বে দেখিয়েছিলেন, উৎপাদককে উগ্র বল প্রয়োগের দ্বারা উৎপাদনের উপকরণ থেকে বিযুক্ত করার মধ্য দিয়ে পুঁজির সৃষ্টি হয়েছিল। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে তৈরি হল নতুন দ্বন্দ্ব; একদিকে পুঁজি অপরদিকে শ্রম; লুণ্ঠিত উৎপাদনের উপকরণ সৃষ্টি করলো পুঁজির যা উৎপাদনের উপকরণ থেকে বিযুক্ত নিঃস্ব মানুষকে শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য করলো। ইউরোপের সমাজ বিকাশের ধারায় যোগ হল নতুন পর্ব, পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক। এর থেকে এলো পণ্য, দাম, মুনাফা, বাজার, বর্ধিত পুনরুৎপাদন ইত্যাদি। পণ্য উৎপাদনের সার্বিক প্রয়োজনীয়তা এবং শ্রমশক্তির পণ্যে রূপান্তর হল পুঁজিবাদী সম্পর্কের দুটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য। প্রথমে বণিক-পুঁজির পণ্য থেকে শুরু করে হস্তশিল্পের গিল্ড পর্ব তার পর ম্যানুফ্যাকচারিং পার হয়ে পুঁজিবাদ পৌঁছালো কলকারখানা ভিত্তিক বৃহৎ শিল্পে। জন্ম নিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতৃত্ব প্রদানকারী সর্বহারাশ্রেনী। এই শ্রেনীকে গোড়া থেকে খতম করতে পুঁজিপতিশ্রেনী দায়িত্ব সহকারে জন্ম দিল সংশোধনবাদের। তখন পুঁজির একাধিপত্যের স্বার্থে পুঁজিবাদ ছুটলো সরল পুনরুৎপাদন থেকে বর্ধিত পুনরুৎপাদনের দিকে। প্রতিষ্ঠিত হল পুঁজিপতিশ্রেনীর অতি-মুনাফার খেলা, বাজার দখলের প্রতিযোগিতা ও পুঁজির উপরে একচেটিয়া কেন্দ্রীভবন। এ ধরনের শিল্পোন্নত, শক্তিশালী পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের ভেতরে ব্যাংক ও শিল্প পুঁজির মেলবন্ধনে তৈরি হয় বিপুল পরিমাণে লগ্নি পুঁজি। যার নিয়ন্ত্রক মূলত শিল্পোন্নত রাষ্ট্রের কিছু মুষ্টিমেয় বৃহৎ পুঁজিপতিশ্রেনী। সূচনা হল সাম্রাজ্যবাদের। তাই লগ্নি পুঁজির গর্ভে বেড়ে ওঠলো ফ্যাসিবাদও। সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠন-অসম বিকাশের সুযোগে সাম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া বৃহৎ পুঁজিপতিশ্রেনীর বাজার দখল ও অতি-মুনাফার খেলায় লগ্নি পুঁজির বিপুল রপ্তানির প্রয়োজন হয়ে পড়ে অন্যান্য পিছিয়ে পড়া দেশগুলিতে। ফলে রোধের মুখে পড়ে সেই দেশগুলির দেশীয়-পুঁজির বিকাশ এবং এই সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির লুণ্ঠনের স্বার্থে লগ্নি পুঁজি এবং সেই দেশগুলির সামন্তশ্রেনীর মিলিত বন্ধনে পিছিয়ে পড়া দেশ তথা উপনিবেশ, আধা উপনিবেশগুলিতে জন্মালো এক নতুন ধরনের দালাল বুর্জোয়া, আমলাতান্ত্রিক মুৎসুদ্দী পুঁজিপতিশ্রেনী(যারা সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত)। এর পর সাম্রাজ্যবাদী একচেটিয়া বৃহৎ পুঁজিপতিশ্রেনীর অতি-মুনাফা ও বাজার দখলের খেলায় বাঁধলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, বিকশিত হল ফ্যাসিবাদের প্রয়োজনীয়তা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তার পরেও পুঁজিবাদ ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টায় বর্ধিত পুনরুৎপাদনের মধ্যে দিয়ে আরো এক নতুন অধ্যায় সূচিত হল, বিশ্বায়নের। বিশ্বয়ন-পরবর্তী সাম্রাজ্যবাদ-এ পর্বে সারা বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজি বৃহৎ গোষ্ঠীগুলির বিভিন্ন ধরনের একচেটিয়া জোট ও তার দ্বারা নিয়ন্ত্রণের মধ্যমে ফুলে-ফলে বিকশিত হওয়ার ফলে সাম্রাজ্যবাদী লুণ্ঠন চূড়ান্ত পর্যায় ধাবিত হল। এ পর্বের শুরুতেই একচেটিয়া লগ্নি পুঁজির কারবারিরা ঝুঁকে পড়লো কম বিনিয়োগকারী লগ্নির মাধ্যমে স্বল্প মেয়াদী সময়ে অতিরিক্ত মুনাফা লুটের নেশায়। বাজারে এলো 'শেয়ার-হোল্ডার পুঁজিবাদ'। এই সময় থেকে একচেটিয়া পুঁজিপতিশ্রেনীর 'পুঁজির আদিম লুণ্ঠন' প্রক্রিয়ার নয়াপর্ব চালু হল। এবারে কেবল উৎপাদনের উপকরণ বা শ্রম লুট নয়, লুট হতে থাকলো মানুষের সঞ্চিত টাকা, ছোট-মাঝারি ব্যবসাদারদের পুঁজি, শেয়ারে মাধ্যমে। ফলত, বৃহৎ লগ্নি পুঁজি গোষ্ঠীগুলি গ্রাস করতে থাকলো সর্বত্র একচ্ছত্র, একচেটিয়া ভাবে। এর ফলে পুঁজিবাদের বুনিয়াদি সংকট ও দ্বন্দ্বগুলি আরোও প্রকট আকার ধারণ করলো। লগ্নি পুঁজি বৃহৎ গোষ্ঠীগুলি গ্রাস করতে শুরু করলো ছোট, মাঝারি পুঁজিকেও। তাই এখনো লেনিনের সংজ্ঞাই যথার্থ,  “সাম্রাজ্যবাদ হচ্ছে পুঁজিবাদী বিকাশের সেই স্তর, যেখানে একচেটিয়া কারবার ও লগ্নি পুঁজির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত, যেখানে পুঁজি রপ্তানি একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক ট্রাস্টগুলির মধ্যে বিশ্বে ভাগবাটোয়ারা শুরু হয়েছে এবং বৃহত্তম পুঁজিবাদী শক্তিগুলির মধ্যে ভূগোলকের সমস্ত অঞ্চলের বাটোয়ারা সমাপ্ত হয়েছে।” এই পর্বকে পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ রূপ সাম্রাজ্যবাদ তথা সাম্রাজ্যবাদের সব থেকে কুৎসিত, লগ্নি পুঁজির-নয়া উদারবাদী পর্যায় বলা যেতেই পারে। যেখানে লগ্নি পুঁজির প্রসারের স্বার্থে ফাটকা মাধ্যমগুলি সারা বিশ্বে ব্যাপক আকারে খুলে যায়। এই সময় যে কোন সমষ্টি গত মালিকানা, রাষ্ট্রের অধীনে থাকা দেশীয় সম্পদ সব পরিণত হয় সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির বৃহৎ গোষ্ঠীগুলির কারবারিদের ব্যক্তি মালিকানায়। ফলে রাষ্ট্রের অধিকার ক্রমশই সংকুচিত হয়ে ঠেকে কেবলই, লগ্নি পুঁজির স্বার্থ রক্ষার্থে। তাই উত্তর-আধুনিক তাত্ত্বিকেরা বলেন, লগ্নি পুঁজির এই প্রসারের পথ বিস্তৃত আকারে খুলে যাওয়ার ফলেই সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। আগে সাম্রাজ্যবাদ যে কাজটি করতো যুদ্ধের মাধ্যমে এখন সে করে, বহুজাতিক কোম্পানি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও তার নীতিমালা, বিধিবিধান, চুক্তি এবং বিজ্ঞান–প্রযুক্তিকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। অর্থাৎ তারা বোঝাতে চান এই যে, সাম্রাজ্যবাদ আগে যে কাজটি করতে ব্যবহার করতো কামান–বন্দুক, এখন সে কাজটি করে জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা, ব্রিকস, এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাংক প্রভৃতির মাধ্যমে। কিন্তু এই কারণে কী সাম্রাজ্যবাদের যুদ্ধে প্রয়োজনীয়তা কখনোই ফুরাতে পারে!বর্তমানের যুদ্ধের পরিবেশ-বিশ্বায়নের সময় জুড়ে পিছিয়ে পড়া দেশগুলিতে লগ্নি পুঁজির ফাটকা প্রসারের হাত ধরে এবং সামন্তশ্রেনীর অংশের মিলিত বন্ধনে গড়ে উঠেছে নব্য আমলাতান্ত্রিক মুৎসুদ্দী পুঁজিপতিশ্রেনী। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে, এদেশের আম্বানি-আদানি গোষ্ঠীদের। যাঁদের দ্বারাই আজ মূলত তৃতীয় বিশ্বে(এ দেশে) সাম্রাজ্যবাদীদের একচেটিয়া লগ্নি পুঁজির লুণ্ঠন অব্যাহত। তবে যেহেতু এই সময় সাম্রাজ্যবাদ স্বল্পমেয়াদি সময়ে একচেটিয়া ফাটকা মুনাফার উপরে বেশি ঝুঁকে পড়ে সেহেতু উৎপাদন - উৎপাদনশীলতা বিশ্বব্যাপী ব্যাপকভাবে কমতে থাকে যা পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কে মূলে ধাক্কা দেয়(যা নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বহু পুঁজিবাদী অর্থনীতিবিদেরা)। ফলে অতি-মুনাফার লোভ, বাজার দখলের প্রয়োজনে পুঁজির বর্ধিত পুনরুৎপাদনের স্বার্থে যুদ্ধ প্রায়শই প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তবে এ পর্বে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলি সবসময়ই তৃতীয় বিশ্বের ঘাড়ের উপরে বন্দুক রেখে যুদ্ধ চালাতে চায় এবং নিজেরা সরাসরি সেই যুদ্ধে যুক্ত না হয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অন্যান্য পিছিয়ে পড়া দেশের 'পুতুল' সরকারের মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনা করতেই তদপর হয়ে উঠে। তাই আমরা দেখতে পাই, এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকায় প্রায় সময়ই যুদ্ধ চলে। লগ্নি পুঁজি প্রসারে স্বার্থে এ যুদ্ধ কখনো রাষ্ট্র জনগণের উপরে নামিয়ে আনে, আবার কখনো সাম্রাজ্যবাদীদের বাজার দখলের প্রতিযোগিতার খেলায় দুই পড়শী দেশের মধ্যেও চলে। তাই সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বব্যবস্থায় ইউরোপে যুদ্ধ বাঁধলে তা বন্ধ করবার যতটা তৎপরতা দেখা যায় তেমনটা দেখা যায় না মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে। প্রধান বিপদ সংশোধনবাদ ও ফ্যাসিবাদ-সংশোধনবাদকে পুঁজিবাদ শুরুর সময় থেকেই লালন-পালন করেছিল, সর্বহারাশ্রেণীর বিপ্লবকে গোড়া থেকে ধ্বংস করবার জন্যে। আর লগ্নি পুঁজি গর্ভে বেড়ে উঠেছিল ফ্যাসিবাদ যা লগ্নি পুঁজির পথ প্রসারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে প্রধান ভূমিকা পালন করছে, বিশেষত নব্বইয়ের দশক থেকে। এখন আমরা দেখতে পাই যে, নয়া ঔপনিবেশিক বিশ্বব্যবস্থায় পরিচালিত নানান দেশেই ফ্যাসিবাদী ও সংশোধনবাদী শাসকের উদ্ভব হয়েছে। এই দুই শক্তির মধ্যেকার দ্বন্দ্ব ও বোঝাপড়ার ঠেকনার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির পথ-প্রসার বিস্তৃত আকারে চলছে, কখনো তা চরম ভাবে আবার কখনো তা নরম ভাবে কিছু আর্থিক সংস্কার, সামাজিক প্রকল্পের মাধ্যমে। মূলত এই দুই শক্তি যুগল বন্দী হয়ে সাম্রাজ্যবাদের অস্তিত্বকে আগলে রেখেছে। সংশোধনবাদ যদি হয় পুঁজিবাদের নিকৃষ্টতম-আদি রূপ, তবে ফ্যাসিবাদকে সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির একচেটিয়া গোষ্ঠীগুলির লুণ্ঠনের সব থেকে হিংস্রতম-ভয়ংকর ও চূড়ান্ত পর্যায় বলা যেতে পারে।যুদ্ধই ভবিষ্যৎ-বিশ্বায়ন পরবর্তী পৃথিবীতে, সাম্রাজ্যবাদের এই কুৎসিত পর্বে যুদ্ধের শেষ নেই। কিন্তু তাতে সাম্রাজ্যবাদী দুই শক্তির সরাসরি যোগাযোগ খুব কম লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু অতি-মুনাফার ঝোঁকে সাম্রাজ্যবাদের মূলগত সমস্যা দেখা দেয়, উৎপাদন-উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ার ফলে(নেট ওয়ার্থ অনুযায়ী অ্যাপল, অ্যামাজন, গুগল, মাইক্রোসফট, ফেসবুক, টেনসেন্ট এবং আলিবাবা বর্তমান পুঁজিবাদের নিয়ন্ত্রক, যাঁদের উৎপাদনের সাথে তেমন কোন সংযোগ নেই।)। এর ফলে পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কে মূলগত ভীতে ধাক্কা লাগে, যা বিশ্ব-পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থার বুনিয়াদের মূলগত জায়গায় সপাটে আঘাত করে। তাই সাম্রাজ্যবাদী লগ্নি পুঁজির একচেটিয়া গোষ্ঠীগুলির নতুন করে বৃহৎ শিল্পকে ক্ষুদ্র আকারে ভেঙে-ভেঙে পুঁজির পুনরুৎপাদনের মধ্যেমে নতুন উৎপাদন প্রক্রিয়া চালু করবার স্বার্থে শ্রমের বাজার একচেটিয়া দখলের তোড়জোড় পুনরায় জোরকদমে শুরু হয়েছে। যার ফলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির মধ্যেকার বোঝাপড়া ক্ষয়ের দিকে এবং সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বার আশঙ্কা ক্রমাগত বাড়ছে। তাই এখন পিছিয়ে পড়া দেশে আর সস্তার শ্রমিক-বাহিনী মজুত রাখা নয়, নানা সাম্রাজ্যবাদী জোটের মাধ্যমে অস্ত্র-শস্ত্র সহ যুদ্ধের চুক্তিভিত্তিক ভাড়াটে সেনাবাহিনী-ও মজুত রাখা ভালো মাত্রায় শুরু হয়েছে।
  • জনতার খেরোর খাতা...
    বিশে-র ফ্যাসাদ  - PIJUS SARKAR | বিশে-র ফ্যাসাদ-----------------পীযূষ কান্তি সরকারপাখা চালিয়ে ঠান্ডা ঘরে /পান্তা খাবে বিশে /সামনে রাখা ভাতের থালা /তেঁতুল টক ডিশ-এ।/কাঁচালঙ্কা, কাঁচা পেঁয়াজ /সঙ্গে তেলেভাজা /গরম ঠেকাতে আরাম করে /লুটবে খাওয়ার মজা। এমন সময় জানলা দিয়ে/হাত বাড়ালো কে ?/তাকিয়ে বিশের ভিরমি খাওয়ার /যোগাড় হল যে !/হাত বাড়িয়ে বলল ভূত /"আমি সুপ্রভাত -- /চাকরি তখন খেয়েছিলে /এবার দাও পান্তাভাত।--------
    কবিতা- এসো হে মহান প্রাণ - Supriya Choudhury | এসো হে মহান প্রাণ——————সুপ্রিয়া চৌধুরী——————তুমি ই কি সেই ক্ষণজন্মা           তুমিই কি সেই কবি?শব্দে তুমি আগুন ঝরাও       আঁকো মানবতার ই ছবি !তুমি অগ্নিবীণার সুর ঝংকারে              লিখেছো রক্ত লিখামরমী কণ্ঠে ‘মানুষেরে’ তুমি              পরালে যে জয়টীকা !মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই           নেই কোনো ভেদাভেদহৃদয়ে রেখেছো সকল ধর্ম            কোরান-বাইবেল-বেদ ।তুমি সংগ্রামী বিদ্রোহী কবি           গাইলে সাম্যবাদের জয় !মানবতা আজ পথের ধূলায়           চাইছে যে আশ্রয় !প্রার্থনা করি আর একবার      এসো এ ধরায় শোনাও দ্রোহের গান‘মানুষেরা’ আছে তব প্রতীক্ষায়        কবে আসবে সে মহান প্রাণ !——————
    আপনি কি আঁতেল? - girija sankar kundu | একে তো অবক্ষয়ী বিবর পছন্দ করেনতার উপর গানবাজনা পছন্দ করেননা, অসুর প্রকৃতিরএমনকি বোকার হদ্দgirija sankar kundu আঁতেল হতে পারলেননা। তাঁর পড়ার উপযুক্ত বইঃ নরলোকের শয়তাননির্ঘাত গুরুর বইও পড়েন। আপনিও দেখে নিন আপনার কপালে কী নাচছে
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত