এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    গুরুচণ্ডা৯-র পাঠ: স্বকন্ঠে - গুরুচণ্ডা৯ | ছবি: রমিত'নিমো গ্রামের গল্প' থেকে পাঠে লেখক সুকান্ত ঘোষ। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।
    মধুবাতা ঋতায়তে - শারদা মণ্ডল | ছবি - Imagen 3ঝাড়বাগদায় ফিল্ড করার সময় আমরা ছিলাম মুকুটমণিপুর বাঁধ-এর কাছে। এই জায়গাটায় যতবার আসি, ততবারই নতুন করে ভালো লাগে, মন্দও লাগে। কংসাবতী নদীর ওপর তৈরি বিশাল জলাধারের নীলচে বিস্তার, দূরে মুকুটের মতো জেগে থাকা পরেশনাথ পাহাড়—সব মিলিয়ে যেন শান্ত সমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়ানোর অনুভূতি হয়। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বাস্তবতা। গত শতকের পাঁচের দশকে জলাধার তৈরির সময় বিশাল বনভূমি, গ্রাম ও মানুষের বসতি জলের নীচে তলিয়ে গিয়েছিল।বিংশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে নির্মিত এই বাঁধ ভারতের দ্বিতীয় দীর্ঘতম মাটির বাঁধ। মূল উদ্দেশ্য ছিল পশ্চিমাঞ্চলের শুষ্ক জেলাগুলিতে সেচের জল পৌঁছে দেওয়া। আজও বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও হুগলি জেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি এই জলাধারের জলের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জলাধারে পলি জমে এর গভীরতা ও প্রকৃত ধারণক্ষমতা কমে যাচ্ছে। কারণ গতিশীল নদীর জল পলি বয়ে নিয়ে যায় সমুদ্রের দিকে। কিন্তু সেই দুরন্ত জলকে ধরে রেখে যদি শান্ত অবস্থায় রাখা হয় তবে জলের সঙ্গে বয়ে আসা বালি, পলি, কাদা সব কিছু জলাধারের মেঝেতে থিতিয়ে পড়ে। আবার বর্ষাকালে পলিতে ভারি আর ঘোলা হয়ে যাওয়া সেচের জল যখন খাল দিয়ে কৃষিজমির দিকে বয়ে যায়, তখন খালগুলোর মেঝেতেও কিছু কিছু জমা হতে থাকে। প্রায় সাত দশক ধরে পলি জমতে জমতে এই মুহূর্তে পুরো সেচের জল সরবরাহের ব্যবস্থাপনাটাই ক্ষতিগ্রস্ত। কারণ জল ধারণ ক্ষমতা এতটাই কমে গেছে যে প্রয়োজনমতো জল কৃষিজমিতে পৌঁছাতে পারছে না। পাশাপাশি কচুরিপানা ও অন্যান্য জলজ আগাছা জলাধারের বাস্তুতন্ত্রের ওপরেও প্রভাব ফেলছে।আসলে এই সংকট শুধু মুকুটমণিপুরের নয়। ভারতের অধিকাংশ বড় বাঁধই আজ একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি। সারা দেশ জুড়ে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়াতে মাছের প্রজনন ও পরিযান ব্যাহত হয়েছে। স্থানীয় মাছের উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে জলের বাস্তুতন্ত্র তো নষ্ট হয়, তার সঙ্গে এলাকার মানুষের সহজ, সস্তা পুষ্টির পথটাও বন্ধ হয়। সার্বিক চিকিৎসা খরচ বাড়ে, আর সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বনভূমি ধ্বংস, বিপুল মানুষের বাস্তুচ্যুতি। আর একটা খুব বড় বিপদ হল পুরোনো বাঁধের নিরাপত্তার ঝুঁকি— ভারতবর্ষের অধিকাংশ নদী বাঁধের বয়স অর্ধ শতাব্দীর বেশি, কয়েকটা শতবর্ষও পেরিয়ে গেছে। এমনিতেই ভারতে ক্রান্তীয় মৌসুমী জলবায়ু থাকার জন্য সারা বছরের বৃষ্টি মাত্র চার মাসের মধ্যে ঝরে পড়ে। বৃষ্টি আবার সারা দেশে সমান ভাবে বন্টিত নয়। সেখানে কম বেশি আছে। কোথায় কম কোথায় বেশি তার একটা সাধারণ নকশা আছে বটে, তবে সেই অনুযায়ী যে চলবেই এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। বর্ষার এই চারটে মাস আবার রোজ বৃষ্টি হয়না। মাঝে মাঝে বেশ কিছু দিনের ড্রাই স্পেল চলে। ঝড়, নিম্ন চাপ, সব মিলিয়ে দেখা যায় মুষলধারে বর্ষণের অধিকাংশ মোটামুটি দুশো ঘন্টার মধ্যে সীমিত। মৌসুমী বায়ুর এই অনিশ্চিত প্রকৃতির জন্য এমনিতেই দেশে খরা বন্যা পাশাপাশি চলে। এদিকে বিশ্ব উষ্ণায়নের জন্য বাতাস গরম, যত গরম তত প্রসারিত, যত বায়ু কণাগুলো ফাঁকা ফাঁকা, তত সেই সেই ফাঁকে জলীয় বাষ্প উঠে বসে পড়ছে। যত বাষ্প তত শ্রাবণ ধারার জোর। যত বর্ষার তোড়, তত পাহাড়ী নদী পাড় ভেঙে দামাল। চারপাশের ক্যাচমেন্টের এই ভয়াবহ জলস্রোত যখন বুড়ো বাঁধে আছড়ায়, বাঁধ থরথর করে। বিজ্ঞানীরা বলেন এই বাঁধগুলো যেন টাইম বোমা। কেউ জানেনা, কোন অসতর্ক মুহূর্তে এরা ভেঙে পড়ে চারপাশ ধ্বংশ করে দেবে। তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে— ভারত জুড়ে এত বড় বাঁধ তৈরি না করেও কি জলসংকটের সমাধান করা যেত? অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, বিকল্প পথ ছিল। দক্ষিণ ভারতে বহু শতাব্দী ধরে প্রচলিত ছিল একাধিক পুকুর নিয়ন্ত্রিত সেচ ব্যবস্থা। আমাদের বিষ্ণুপুর, বর্ধমান, পুরুলিয়ার রাজারাও এমন অসংখ্য পুকুর তৈরি করে জলের সংকট মিটিয়েছেন। সেখানে ছোট ছোট কৃত্রিম জলাধারে বর্ষার জল ধরে রাখা হত। একেকটি জলাধার আবার খাল দিয়ে অন্যটির সঙ্গে যুক্ত থাকত, ফলে অতিরিক্ত জল ধাপে ধাপে নীচের দিকে নেমে যেত। এতে একদিকে সেচের জল পাওয়া যেত, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ জলও পুনরায় পূরণ হত। সবচেয়ে বড় কথা, একটি বিশাল বাঁধের মতো বিপুল বনভূমি বা গ্রাম ডুবে যেত না।রাজস্থানে আবার প্রচলিত ছিল জোহাড় ব্যবস্থা—ছোট মাটির বাঁধ বা জলধারণ কাঠামো, যা বৃষ্টির জল আটকে রাখত। মরু অঞ্চলে অল্প বৃষ্টির জল যাতে নষ্ট না হয়, সেই উদ্দেশ্যেই এই ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। ধীরে ধীরে সেই জল মাটির নীচে ঢুকে ভূগর্ভস্থ জলস্তর বাড়াত। এছাড়া ধাপ কাটা কুয়ো, বা খাদিনের মতো স্থানীয় জলসংরক্ষণ ব্যবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে জলসংকট মোকাবিলায় সাহায্য করেছে।এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থাগুলোর মূল দর্শন ছিল—“স্থানীয় জল নিজের জায়গাতেই ধরে রাখা”। অর্থাৎ এক বিশাল প্রকল্পের ওপর পুরো অঞ্চলকে নির্ভরশীল না করে ছোট ছোট বিকেন্দ্রীভূত জলব্যবস্থা তৈরি করা। এতে পরিবেশের ক্ষতি কম হয়, মানুষের বাস্তুচ্যুতিও তুলনামূলকভাবে অনেক কম হয়।সায়েন্স কলেজে টোপোশীটে (ভূসংস্থানিক মানচিত্র) নদীর ম্যাপ বোঝাতে গিয়ে সুভাষ রঞ্জন বসু স্যার আমাদের বাঁধের আর জলাধারের সিম্বল চিনিয়ে দিতেন। নদীর খাত রেখার ওপরে আড়াআড়ি সোজা দাঁড়ি হল বাঁধ, উল্টোনো থার্ড ব্র্যাকেটের মত নকশা আর তার মাঝে ডবল লাইন যদি থাকে, আর সেই লাইন যদি মাঠ ঘাট পেরিয়ে চলে তবে পাকা বাঁধের ওপরে রাস্তা। সোজা দাঁড়ির পিছনে মানে নদী যেদিকে গেছে তার উলটো পিঠে যদি হাতের পাতার মত নকশা থাকে তবে সেটাই জলাধার। এতো আর চৌকো বা গোল করে কাটা পুকুর নয়, যে একটা নির্দিষ্ট আকৃতি থাকবে। উঁচু নিচু ভূমিতে জল আটকে রাখা। তাই জল উঁচুতে বেশি ছড়াতে পারেনা, নিচু জায়গায় ছড়িয়ে যায়। বিহগ দৃষ্টিতে আঙুলের মত লাগে। স্যার বলতেন গড় পড়তা মানুষ চায় অমর হতে। দেশের সরকারও ব্যতিক্রম নয়। তাই তারা বিজ্ঞানীদের কথা শোনেনা। আরও বড়, আরও বেশি, আরও উঁচু কীর্তির পিছনে ছোটে। প্রকৃতিও তুল্য মূল্য দাম বুঝে নেয়, আর সেইমত প্রতিশোধ নেয়। ছোট ছোট অনেক গুলি বাঁধ, মানুষ আর প্রকৃতি বাঁচিয়ে ডিজাইন, বার বার পরীক্ষা, ভুল সংশোধন - সেকি মুখের কথা, কত সময়ের ব্যাপার, পাঁচ বছরে কুলোয়না। কোন মুখে সরকার পরের বার ভোট চাইবে? তাই চটজলদি ব্যবস্থা হয়। আর শান্তি কল্যাণের চাইতে যশোলাভের নীল নকশা প্রধান হয়ে ওঠে। সেদিন তো আর জেরক্স, স্মার্ট ফোন, স্ক্যান - এসব ছিলনা। স্যার যা বলতেন তাই আমরা প্রাণপণে খাতায় লিখতাম, পরীক্ষা পাশের জন্য। স্যার বলতেন, আরও একটা বড় ব্যাপার আছে বড় বাঁধ তৈরির পিছনে। আমরা উৎসুক হতাম, আরও একটা পয়েন্টের জন্য। স্যার হেসে বলতেন, বড় বাঁধ, প্রকান্ড কীর্তি, সুবিশাল বাজেট। দশ বিশ এদিক ওদিক - কথা শেষ হতনা। নাঃ ওই পয়েন্টটার যতই গুরুত্ব থাকুক, ওটা খাতায় লেখা যেতনা। মুকুটমণিপুরের নীল জলের দিগন্তে কোথাও মেঘের ছায়া, কোথাও রুপোলি রোদ চিক চিক করে। সেদিকে তাকিয়ে আমার স্যারের কথা মনে পড়ে। যেকোন এমন বাঁধের সামনে দাঁড়িয়ে আমার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে শোনা - ‘কোন এক গাঁয়ের বধূর কথা তোমায় শোনাই শোন’ - গানটার কথা মনে পড়ে। সেই যে শেষের দিকে আছে না - আজও যদি কোন গাঁয়ে দেখো - ভাঙা কুটিরের সারি, জেনো - সে গাঁয়েরও বধূর আশা স্বপনেরও সমাধি। ভারতের নানা রাজ্যে, পাহাড়ে, মালভূমিতে, রাঢ় ভূমিতে কম বাঁধ তো দেখলামনা এ জীবনে। সব জায়গাতেই নদীর উৎসে ক্যাচমেন্ট এলাকার সবুজ বন, শ্যামল চাষের ক্ষেত, ছায়া সুনিবিড় গ্রাম, সরল আদিবাসী মানুষের স্বপ্ন দিয়ে গড়া ঘর বলি দিয়ে নিচের সমভূমির দিকে কম্যান্ড এলাকার সুবিধে করা হয়েছে। কারণ সেদিকে রয়েছে শহুরে ধনী কনজিউমার। মাঠে ময়দানে ঘুরতে ঘুরতে এদেশ আমায় অনেক কিছু শিখিয়েছে। আমার মায়ের ভীষণ চায়ের নেশা ছিল। গ্যাস্ট্রিক আলসার হবার পরেও চায়ের সঙ্গে নো কম্প্রোমাইজ। সেই থেকে চায়ের প্রতি আমার একটা বিরূপ মনোভাব ছিল। চাকরি জীবনের প্রথম দিকে কচি উৎসাহী দিদিমণি হয়ে যখন নর্থ বেঙ্গলের অফিসগুলো চষে বেড়াচ্ছি, তখন অনেক সময়ে স্থানীয় মানুষ বলেছেন, বসুন, চা আনাই। আমি স্বভাব মত বলে ফেলেছি - না না আমি চা খাইনা। এই কথাটা কলকাতায় বলা কিছুই নয়, কিন্তু উত্তরবঙ্গে ভয়ঙ্কর। মুহূর্তে ওখানকার মানুষের চোয়াল কঠিন হয়ে যায়। আমাকে শুনতে হল, হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে, কলকাতার লোক, চা আপনারা খাবেন কেন? খেলে যে আমরা বেঁচে যাবো। আপনারা কোক পেপসি খান। চমকে উঠেছিলাম। চা সেন্টিমেন্ট ওখানে জাতিসত্তার সূচক। আবার যখন বালুচরী শাড়ি নিয়ে ডক্টরেট করতে শুরু করেছি, সায়েন্স কলেজ থেকে বেরিয়ে প্রথম একাকী সার্ভে শুরু করেছিলাম ম্যাডক্স স্কোয়ারে খাদি মেলায়। এ জেলা, ও জেলা - নানা স্টল ঘুরতে ঘুরতে মুর্শিদাবাদের একটা বড় স্টলে থিতু হলুম। মধ্য বয়সী বেশ সম্ভ্রান্ত উদ্যোগপতির সঙ্গে নানা বিষয়ে যখন আলোচনায় মত্ত, তিনি বললেন দাঁড়ান দুটো চা দিতে বলি। সেই এক গেরো - চা আমি খাইনা। বলতে বলতে দু ভাঁড় দুধ চা রেডি। ভদ্রলোক থমকে গেলেন। সম্ভবত ভেবেছিলেন তিনি ধর্মে মুসলমান বলে আমি তাঁর সঙ্গে চা খাবোনা। কিন্তু অত নিচু মানুষ আমি নই। চায়ের ভাঁড়টা তাঁর হাত থেকেই নিয়ে খেলাম। অনেকেই ভাবতে পারেন, হচ্ছিল বাঁধের কথা, হঠাৎ চা এল কেন? আসলে যা বলতে চাইছি, সেটা হল, - যেখানে সম্ভব, নিজের তুচ্ছ পছন্দটা শিকেয় তুলে একটু মানিয়ে নিলে পাশের মানুষটাকে আরও বড় বড় দুঃখ পাওয়ার হাত থেকে বাঁচানো যায়, নিজেরও পাপের বোঝা কমে। এই সহজ কথাটা দেশের সরকারগুলোরও বোঝা দরকার। পরিবেশ বিদ্যার চর্চা যাঁরা করেন, তাঁদের কাছে একটা কথা শুনেছি। পরিবেশ বাঁচাতে গ্রীন টেকনোলজি বলে যেসব প্রযুক্তি তৈরি হচ্ছে সেগুলি আয়ত্ত করে চাকরি করতে গেলে মামুলি ইস্কুল কলেজ পাশ দিলে হয়না। অনেক উচ্চতর সূক্ষ্ম বিদ্যার তালিম প্রয়োজন। উঠতি ছেলেমেয়েদের সেই তালিম পেতে গেলে অনেক অনেক টাকা খরচ। বিশ্বজুড়ে সরকারগুলি উচ্চ শিক্ষা ও সংলগ্ন গবেষণা থেকে হাত গুটিয়ে নিচ্ছে। তাই সাধারণ বাবা মায়ের পক্ষে সন্তানের জন্য সেই উচ্চতর তালিম কেনা দুঃসাধ্য। লোকসংখ্যার অনুপাতে সম্পদ যে কম, সেটা পেশাদার ভাবে না বুঝলেও সাধারণ মানুষ এটা বুঝতে পারে ছেলেমেয়েদের সামনে দিনটা খুবই কঠিন। কিছু একটা ব্যবস্থা করে যেতে না পারলে বেচারারা খেতে পাবেনা, বাবা মায়েদের থেকেও গরীব হবে। এই অবস্থায়, একদল লোক এসে যদি বলে, বৃষ্টি অরণ্য কেটে মাটির তলার তেল বের করে তোমার সন্তানকে চাকরি দেবো, অথবা বলে ওপেন কাস্ট কয়লাখনি যেগুলো দুষ্টু লোক দূষণের নাম করে বন্ধ করে দিয়েছে - সবগুলো খুলে দেবো, তোমার সন্তান আবার মজুর হতে পারবে - লোকে অন্ধ বিশ্বাসে তাদের বেছে নেয়। কেউ যখন অতীতের গল্প শোনায়, খেটে খাওয়া মানুষের বাপ ঠাকুর্দার স্মৃতি ভেসে আসে, অবচেতনে কোথাও কমফর্টেবল মনে হয়, ভবিষ্যতের অনিশ্চিতের ভয়টা তারা সাময়িক ভুলে থাকতে পারে। এই ভাবে বিশ্বজুড়ে একধরণের পরিবেশ বিরোধী বৈশ্য তন্ত্র চলছে। বাণিজ্য হোক না হোক, বাণিজ্যিক ভাবনা যখন বড় হয়ে ওঠে, তার হাত ধরে আমি তুমির প্রতিযোগিতাও বাড়ে। সবাই জানে জ্বালানী তেল চিরকাল থাকবেনা, ওটা বাঁচাতে হবে। কিন্তু তার ওপর নিরঙ্কুশ অধিকার পাবার জন্য আমি তেলের খনিতেই বোম মারি। তেল জ্বলে, নীল আকাশ আরও কালো হয়। অশান্তির আগুন আমাকেও পোড়ায়, আমি যদি না পাই, তবে তুমি পাবে কেন? আমার তিনবার নেট পাশ করা ছেলেটা বাইকে করে বাড়ি বাড়ি জিনিস পৌঁছে দেয়। ইউনিভার্সিটিতে গবেষণার তালিকায় তার নাম ওঠেনা, জায়গা খালি নেই। অধ্যাপিকা হবে - এমন স্বপ্ন দেখা মেয়েটা আমাকে গলায় টাই বাঁধা ছবি পাঠায়, আমি লাইক দিই। আমি জানি লোনের প্রস্তাব নিয়ে ও অজানা মানুষকে ফোন করে গালি খেয়ে মরে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে উদারবাদের পতনের কারণ পরিবেশ, মানে পরিবেশের রিসোর্স ক্রাইসিস। তবে ছোট ছোট বিপরীত চিত্র কি নেই? না থাকলে ঝাড়বাগদা থাকতো? কিংবা এই মুকুটমণিপুর? প্রথমেই একটা কথা বলেছিলাম, মুকুটমণিপুরের বাঁধ হল মাটির বাঁধ। লোহা সিমেন্ট এত কিছু থাকতে এত বড় বাঁধ মাটি দিয়ে তৈরি হল - এতো শুনেই অবাক লাগে। এরকম বোকামি সম্ভব? কিন্তু না বোকামি নয় - কারণ সিদ্ধান্তের পিছনে ছিলেন প্রবাদ প্রতিম বিধান রায়। সিমেন্ট-লোহা ব্যবহার না করে সম্পূর্ণ স্থানীয় মাটি দিয়ে তৈরির পেছনে প্রধান কারণ ছিল নদী উপত্যকার বিশাল বিস্তার আর অর্থনৈতিক সাশ্রয়। কংসাবতী ও কুমারী নদীর মিলনস্থলের প্রায় ১১ কিলোমিটার চওড়া উপত্যকায় কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ হতো। এই প্রকল্পে স্থানীয় লাল ও এঁটেল মাটির জলধারণ ক্ষমতাকে কাজে লাগানো হয়েছিল। মাটির বাঁধের সবচেয়ে বড় সুবিধে হলো এটা সস্তা, কারণ স্থানীয় উপকরণ ব্যবহার হয়; নরম মাটিতেও সহজে নির্মাণযোগ্য; এবং নমনীয় প্রকৃতির হওয়ায় ভূমিকম্প প্রতিরোধী। সিমেন্টের মত ফেটে যায়না। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদানে তৈরি হওয়ায় এই বাঁধ অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব। আশা তো করতেই পারি সদ্য স্বাধীন দেশে স্যারের বলা শেষ পয়েন্টটার অস্তিত্ব ছিলনা। তবে অনেকগুলো ছোট ছোট বাঁধ না করে, দানব জলাধারে সবুজ বন ডুবিয়ে মারা হল কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে সময়ের খামে। ঐ সময়ে নদী ব্যবস্থাপনায় সরকার ও প্রকৌশলীরা প্রধানত "বৃহৎ বাঁধ" (Big Dams) এবং নদীতীরবর্তী কৃত্রিম বাঁধের দেওয়াল তোলার (Embankments) মতো কঠিন প্রকৌশল কাঠামোর ওপর নির্ভর করতেন। তখন প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রকে অক্ষুণ্ণ রেখে ছোট ছোট অনেকগুলো বাঁধ নির্মাণ বা অববাহিকাভিত্তিক (Watershed management) নদী ব্যবস্থাপনার আধুনিক ও সমন্বিত ধারণাগুলি সেভাবে গড়ে ওঠেনি। বরং জাতীয়তাবাদী মনোভাব নিয়ে ১৯৫০-এর দশকে ভারতের দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (DVC) এবং হিরাকুদ বাঁধের মতো বৃহদাকার প্রকল্পগুলো নির্মিত হয়েছিল। ভারত একা নয়, আমেরিকার টেনেসি ভ্যালি বাঁধ বহুমুখী পরিকল্পনাটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের আমলে তৈরি হয়েছিল ১৯৩৩ সালে। মিশরের নীলনদে আসোয়ান বাঁধ তৈরি হয়েছে ১৯৬০-৭০ এর মধ্যে। তখন বন্যা খরা এইসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে চালু ছিল বৃহৎ প্রকৌশল প্যারাডাইম। এবারে এই ব্যবস্থার খারাপ দিকগুলো পরিস্ফুট হতে হতে নয়ের দশক চলে আসে। কাজেই এখানে বিধান রায়ের ভূমিকা ছিলনা। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন যুগের হাতে বন্দী। বাণিজ্য চলছে, সে তো চলতেই হবে। পিছনে পিছনে চলে মানবতা আর কল্যাণকামী ভাবনা। আমি আশাবাদী এক পথিক - তাই লিখে চলি নদী - বন - পাথরের কাহিনী - বাসযোগ্য পৃথিবীর ভবিষ্যৎ ভৌগোলিকদের জন্য। চলবে...
    কেউ ভোলে না, কেউ ভোলে - রঞ্জন রায় | অলংকরণ: রমিত পঞ্চাশের দশক। প্রাইমারি ক্লাসে পড়ছি। নজরুলের নাম শুনেছি শুধু, কবিতা টবিতা পড়া হয় নি। গান? নাঃ। একটা চূণের ডাব্বামার্কা রেডিও। তাতে ভক্তিমূলক গান, পল্লীগীতি, রবীন্দ্রসঙ্গীত এই সব শোনা হয়। বেশিরভাগ সময় ওটা দাদু ঠাকুমার দখলে। আমরা শুনতাম শনি-রোববারে অনুরোধের আসর। ওই গানগুলো বিভিন্ন উৎসবের সময় চারদিকে ঝমঝমিয়ে বাজে। লাইনগুলো মুখস্থ হয়ে যায়। নজরুলগীতিকে ভীড়ের মধ্যে আলাদা করে চেনার মত সুযোগ ও কান তৈরি হয় নি। তবে কাকাদের ব্যাচেলর্স ডেনের দেয়ালে অনেক ফটো টাঙানো। প্রথমে চুলদাড়িওলা কজন—দেখলে কীরকম সাধুবাবা সাধুবাবা ফীলিং হয়। এঁদের মধ্যে শুধু রবি ঠাকুরকে চিনি। দেখলেই গড় হয়ে ‘ঠাকুর নম’ বলতে ইচ্ছে হয়। তারপরে লেনিন দাদু, স্তালিন দাদু, পাগড়ি মাথায় ঋষি বঙ্কিমের পর আলাদা করে দু’জন। একজন গালে হাত দিয়ে ঘুম ঘুম চোখে কিছু ভাবছেন। ঠিক করে গোঁফ ওঠেনি। দেখলে একডাকে কবি বলে চেনা যায়। উনি রানার বলে হেমন্তের গাওয়া হিট গানটার পদ্য লিখেছেন। পাশে আরেকজনের গোঁফদাড়ি নেই, কিন্তু মাথায় বাবরি চুল। বড় বড় টানা টানা চোখ, কেমন গল্পের রঘু ডাকাতের মত। কাকাদের ধমক খাই। উনিও বড় কবি। ছোটকা একটা সুন্দরমত বই ধরিয়ে দেয়—গাঢ় সবুজ ডাঁটি ও পাতার উপর রক্তলাল পপি ফুল। বইটির নাম সঞ্চিতা। মায়ের বিয়েতে পাওয়া কালো রঙে বাঁধানো ‘সঞ্চয়িতা’ থেকে দাদু অনেক কবিতা পড়ে শোনায়। ওটা রবি ঠাকুরের বই। তা ইনি সঞ্চিতা নাম রাখলেন কেন? রবি ঠাকুরের নকল করে কবিতা লেখেন? ফের কানমলা। --বোকার মত কথা না বলে পড়ে দেখ।হুঁ, পাতা ওল্টালাম—“বাতায়ন পথে গুবাক তরুর সারি”! বাতায়ন মানে জানি, কিন্তু গুবাক? শব্দটা বিচ্ছিরি। বইটা রেখে দিলাম। দেখি ছোটকা কড়া চোখে তাকিয়ে আছে। ফের তুলে নিলাম।“সেদিন দেখিনু রেলেকুলি বলে এক বাবুসাব তারে ঠেলে দিল নীচে ফেলে। চোখ ফেটে এল জল।এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল”? আরে, এ তো সত্যি কথা! আরো ছোট বয়সে কাকাদের কোলে উঠে হাওড়া স্টেশনে গিয়েছিলাম। ঠিক এমন ঘটনা দেখেছি। লাল কুর্তা ও ময়লা ধুতি পরা, হাতে নম্বর লেখা পেতলের চাকতি বাঁধা হিন্দি বলা কুলিকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দেওয়া হোল। যা কানে এল—চার আনায় রফা হয়েছিল। কিন্তু মাল তোলার পর বাবুসাহেব একটা হলদেটে দু’আনি ছুঁড়ে দিলেন। কুলি নেবে না।প্ল্যাটফর্মে উঠে দাঁড়িয়ে মানুষটা গায়ের ধূলো ঝেড়ে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে কু--ঝিক ঝিক করে এগোতে থাকা রেলগাড়ির দিকে তাকিয়ে ছিল। ওর চোখে জল ছিল না, আগুনও না। কেমন যেন গরুর মত বোবা দৃষ্টি।নজরুল যেন আমার মনের কথা, ওর বোবা চোখের ভাষা নিয়ে লাইনটি লিখেছেন-- এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল? কিন্তু তারপরে ঘ্যান ঘ্যান করেন নি। গর্জে উঠেছেন—“বেতন দিয়াছ? চোপরও যত মিথ্যাবাদীর দল!     কত পাই দিয়ে কুলিদের তুই কত ক্রোড় পেলি বল”!আহা, বুকের মধ্যে দুর্গাপুজোর ঢাক বেজে উঠল। আকাশে গুর গুর করে মেঘ ডাকল।খোলাখুলি বাবুসাহেবদের মিথ্যেবাদী বলা! চোপরও বলে ধমক দেয়া! এমন তো দেখিনি শুনিনি। আর “এমনি করে কি জগত জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল”? এই লাইনটা উনি লিখেছেন আমার জন্যে। আমি একা নই, আমার মত দুর্বলদের জন্যে। মানে যারা গায়ে গতরে রোগা প্যাংলা, খ্যাংরাকাঠি আলুর দম গোছের। যারা হাতাহাতিতে কখনই পেরে ওঠে না। শুধু মার খায়। মার খায় স্কুলে, মার খায় খেলার মাঠে। আমাদের দেখলেই অন্যেরা চিনতে পারে—সহজ শিকার। এদের পেটানো যায়। এরা মাস্টারমশাইয়ের কাছে নালিশ করবে না। বাড়ি গিয়ে কেঁদে কেটে বাবা কাকাদের ডেকে আনবে না। মুখ বুজে মার খাবে। কোন কোন টিম যেমনি ওপেনিং জুড়ি আউট হলেই দান ছেড়ে দেয়। ব্যাট বগলে প্যাভিলিয়ন থেকে এক এক করে আসে আর ফিরে যায়। তেমনই এরা মারামারি শুরু হলেই অপেক্ষা করে কখন মার খেয়ে মাটিতে পড়ে যাবে।কিন্তু ভগবান আছেন। উনি কি একদিন এইসব অন্যায়ের বিচার করবেন না? নজরুল কিছু বলেন নি? ‘সঞ্চিতা’ ‘সঞ্চয়িতা’র কবিতার বৈচিত্র্যের ঢেউয়ে কয়েক বছর চাপা পড়ে গেল।কিন্তু কয়েক বছর পরে ক্লাসের পাঠ্য বইয়ের সংকলনে পেলাম মনের মত উত্তর—“ফরিয়াদ”। শব্দটা আগে কখনও শুনিনি। উকিল দাদু বললেন—আসামী ও ফরিয়াদী। এখানে ফরিয়াদ মানে নালিশ। কার কাছে? ভগবানের কাছে।বুকের পাটা আছে নজরুলের। সোজা ভগবানের কাছে নালিশ! কোন “ও অনাথের নাথ, ও অগতির গতি” বলে কান্নাকাটি, ভালভাবে বললে করুণ আর্তি, করা নয়। সোজা নালিশ।“মাগে প্রতিকার, উত্তর দাও, আদিপিতা ভগবান”।দারুণ লাগল। এই হোল কবিতা। হ্যাঁ, আগে রবি ঠাকুরের ‘প্রশ্ন’ কবিতা পড়েছি। সেটা অসাধারণ। কিন্তু উনি ভগবানকে প্রশ্ন করেছেন –তুমি কি তাদের ক্ষমা করিয়াছ, তুমি কি বেসেছ ভালো”? কিন্তু নজরুল করেছেন নালিশ। সে নালিশের বিশাল ফিরিস্তি, পাতার পর পাতা জুড়ে। ভগবানের রাজ্যে কত অবিচার, কত অন্যায়। তো ভগবান করেন কি! নিজের ডিউটি ঠিকমত করেন না? পড়তে লাগলামঃ“শ্বেত-পীত-কালো করিয়া সৃজিলে মানবে সে তব সাধ,আমরা যে কালো তুমি ভালো জান নহে তাহা অপরাধ”। আরে! এটাও আমার কথা। হরদম কালো বলে ব্যঙ্গবিদ্রূপ শুনি, --কালোভূত! কেলটে। জন্মেছি কালো হয়ে যদিও মা ফরসা—কিন্তু সেটা কি আমার দোষ! কিন্তু নজরুল কী করে টের পেলেন আমার কষ্ট? উনিও কি কালো? কিন্তু শেষের দিকে এসে থমকে যাই। খানিক ভাবি, তারপর উল্লাসে ফেটে পড়ি। “ওই দিকে দিকে বেজেছে ডংকা, শংকা নাহিক আর,মরিয়ার মুখে মরণের বাণী উঠিতেছে মার! মার!” নজরুল খোলাখুলি মারতে বলেছেন। উদোম ক্যালাতে বলছেন, কাদের? ওই যারা এতদিন ধরে তোমাদের মারছে তাদের। শুনতে বেশ ভাল লাগে। মারের পালটা মার! তারপর ঘাবড়ে যাই। না, আমি কাউকে মারতে পারব না। তাহলে কী করব? পালিয়ে যাব, টেনে দৌড়? ওসব কিছু নয়। দলবেঁধে মার মার করে পকেটমারকে ক্যালাও? না, ওর মধ্যে আমি নেই। ভগবান ফরিয়াদ শুনছেন। একদিন তাঁর ন্যায়ের দণ্ড নেমে আসবে। সব ধর্মই এই আশ্বাস দেয়। আপাত আশ্বস্ত হওয়া যাক। আচ্ছা, নজরুল নিজে কখনও কাউকে মেরেছেন? মারামারি করেছেন? মনে পড়ল দেশ পত্রিকায় শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায় ধারাবাহিক লিখতেন “কেউ ভোলে না কেউ ভোলে”। বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামের ছেলেবেলার স্মৃতি, বিশেষ করে বাল্যবন্ধু কোন এক দুখু মিঞার কথা। -- ছোটকা উনি কে? -- উনি কল্লোল যুগের তিন মহারথী। কল্লোল পত্রিকার থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের অন্যতম—শৈলজানন্দ, প্রেমেন্দ্র মিত্র ও অচিন্ত্যকুমার। -- মানে ঘনাদা ও পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ?-- দূর গাধা! তোর কথাটা ভুল নয়, আদ্দেক সত্যি। -- আর দুখু মিঞা?-- আরে উনিই তো বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলাম।-- বিদ্রোহী কবি কেন?-- উনি একটা কান্ড করেছিলেন। সারারাত জেগে লিখলেন একটা অন্যরকম কবিতা –বিদ্রোহী। তারপর সাত সকালে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সামনে গিয়ে রাস্তা থেকে পাড়াজাগানো চিৎকার। রবি ঠাকুর অবাক হয়ে দোতলার বারান্দা থেকে জিজ্ঞেস করলেন—কী ব্যাপার কাজী? “গুরুদেব! আমি তোমায় হত্যা করব”! -- সে কী! উনি পুলিশ ডাকেন নি? -- আরে বোকারাম! এ হত্যা সে হত্যা নয়। উনি চেয়েছিলেন বাংলা কবিতার ধারা বদলে দিতে। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা সেই কাজটা করেছিল। ছন্দে, মাত্রা বদলে, শব্দ চয়নে ও পুরাণকথার রূপক মিলে সে এক কাণ্ড। বাংলা কবিতায় বাঁধা পথের বাইরে পা ফেলা। প্রথম লাইনেই চমকঃ“বল বীরচির উন্নত মম শির। শির নেহারি আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রীর”। আরও শোনঃ“আমি পিণাকপাণির ডমরুত্রিশূল ধর্মরাজের দণ্ডআমি চক্র, মহাশংখ, প্রলয়নাদ প্রচণ্ড। আমি বেদুঈন, আমি চেঙ্গিস,আমি আপনারে ছাড়া করি না কাহারে কুর্ণিশ। আমি বজ্র, আমি ঈশান-বিষাণে ওঙ্কার,আমি ইস্রাফিলের শিঙ্গার মহা হুংকার”। ছোটকার আবৃত্তি চলতে থাকে। আমি ভেসে যাই অনুপ্রাসের ঝংকার আর নতুন ধরণের শব্দের ছবির সারি দেখতে দেখতে। সাইক্লোন, ধ্বংস, পেরিয়ে সমস্ত নিয়মের শৃংখল ভেঙে টর্পেডো ভাসমান মাইন সব হয়ে বিদ্রোহী হঠাৎ মহর্ষি ভৃগু হয়ে ভগবান বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিচ্ছেন। কিন্তু আচমকা একি? “আমি চিত-চুম্বন-চোর কম্পন আমি থর-থর-থর প্রথম পরশ কুমারীর!আমি যৌবন-ভীতু পল্লীবালার আঁচর কাঁচলি নিচোর”! এবার কেমন কেমন লাগছে। উনি কোন কুমারী মেয়েকে স্পর্শ করেছেন! মরেছে! আর গ্রামের মেয়ের কাঁচলি নিয়ে চিন্তা করা, কল্পনা করা! এই কবি নির্ঘাৎ--ছোটকাকে কবিতার নেশায় পেয়েছে। আবৃত্তি চলছেঃ--“একি উন্মাদ ! আমি উন্মাদ! আমি সহসা আমারে চিনেছি আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ”।বুঝেছি, এমন অকপট সত্যি বলতে উনিই পারেন। কিন্তু দুর্বলের পক্ষ নিয়ে কথা বলা সেই কবি কোথায় গেলেন? না, না। এই তো উনি পরশুরামের কুঠার হতে চাইছেন। কেন রে বাবা!“যবে উৎপীড়িতের ক্রন্দন-রোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না-অত্যাচারীর খড়গকৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না,বিদ্রোহী রণক্লান্ত আমি সেই দিন হব শান্ত”। ভাল লাগে। একটা অন্যরকম অনুভূতি। যেমন শরতের ভোরে মহালয়ার পাঠে মহিষাসুর বধের পর বুকের ভেতরে হয়। ‘আমি সেইদিন হব শান্ত’। বাঃ, কিন্তু উনিই কি শৈলজানন্দের বাল্যবন্ধু দুখু মিঞা। অবাক লাগে। আরে ছোটবেলায় কিছু না কিছু টের পাওয়া যায়। যেমন সাভারকর ছোটবেলায় তাঁর জন্মভূমি ভাগুর গাঁয়ে বাচ্চাদের দলবল জুটিয়ে রাতের অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়ে একটা পুরনো মসজিদের কাঁচ ভেঙে ছিলেন। কিন্তু দুখু মিঞার বিদ্রোহ কোথায়? বরং বেশ কোমল কবি কবি ভাব। একটা চড়াই পাখির ছানা ওড়ার চেষ্টা করে পড়ে যাওয়ায় মা-চড়াইয়ের কষ্ট নিয়ে কবিতা লিখলেন। ওদিকে রবি ঠাকুরকে ছোটবেলায় দেখুন। “আমসত্ত্ব দুধে ফেলি তাহাতে কদলী দলি সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে। হাপুস হুপুস শব্দ, চারিদিক নিস্তব্ধ পিঁপড়া কাঁদিয়া যায় পাতে”। বেশ, বামুন বাড়ির ফলার খাওয়া পেটুক ছেলের ছবি। ভুল ভেঙে গেল। দুখু মিঞা কোন ব্যতিক্রম নন। ছোটবেলা থেকেই রোমান্টিক। বন্ধু শৈলজানন্দের সংগে পাল্লা দিয়ে লিখে ফেললেন কোন রাণীমার গড় নিয়ে আবেগঘন কবিতাঃ “ওই ঝাউয়ের পাহাড়ে নীরব চিতাটি রাণীমার, ও যে দপদপ জ্বলে লোকে বলে আলো আঁধিয়ার। এই নিভে যায়, ওই জ্বলে ওঠেথমকি চমকি পছি দিকে ছোটেমিশে যায় শেষে রাজগড়ে উঠেআবার তেমনই আঁধিয়ার।”বাচ্চা দুখু মিঞার শব্দচয়নে রবি ঠাকুরের প্রভাব স্পষ্ট। আহা, তাতে কী? বড় কবি অচিন্ত্য কুমারের রচনায় নেই? করুণানিধান বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতায়? কিন্তু আবেগ ও ছন্দের হাত? ওটা সবার হয় না, যার হয় তার হয়। যেমন গলায় সুর ও কানে তালের বোধ--সবার থাকে না, যার আছে তার আছে। দুখু মিঞা বড় হয়ে যখন নজরুল হলেন, তাঁর ছন্দ, অন্ত্যমিল এবং অনুপ্রাস অলংকার নিয়ে মারকাটারি নৈপুণ্যে ঘায়েল হয়ে কবিশেখর কালিদাস রায় লিখলেন –“নজরুল আমাদের কবিতা লিখতে দেবে না দেখছি। ও ‘অলস বৈশাখে’র সংগে ‘কলস কই কাঁখে’ মিলিয়েছে”। বটেই তো। “জল আনতে চললি যে তুই অলস বৈশাখে,-----কলস কই কাঁখে”। কিন্তু দুখু মিঞা যে মহা আড্ডাবাজ, ইয়ার্কিদেনেওয়ালা। এক বন্ধুর পাঠশালা পেরোনো হয় নি, কিন্তু বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা সফল ব্যবসায়ী। কনেবৌ বাপের বাড়ি থেকে স্বামীকে চিঠি লিখেছে। ভাষাটা এইরকমঃ“তুমি ভাল আছ। আমি কেমন আছি। ইতি-“। সেই চিঠি পড়ে বন্ধুটি প্রেমে উলুত পুলুত। চিঠির জবাব লিখলেন শৈলজানন্দ। গোলাপি রঙের দামি কাগজের উপর বাঁদিকে ছোট করে ঠোঁটে চিঠি বয়ে নিয়ে যাওয়া পাখির মনোগ্রাম ছাপা। দুখু মিঞা খুব হাসল। দেখল পাখির ছবির নীচে ছাপা রয়েছেঃ“যাও পাখি, বোল তারেসে যেন ভোলে না মোরে”। বলল—“আর বোল এ চিঠিটি    লিখে দেছে শৈল।   বোল না বোল না যেন,   এ দিব্যি রইল”। তো দুখু যে নজরুল হয়ে ঢাকায় আশু সোমের বাড়িতে কিশোরী রাণু সোমের (প্রতিভা বসু) পরিবেশন করা চা দেখে গেয়ে উঠবে “এত চা ওইটুকু কাপে, পাষাণী আনলে বল কে”—সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দুখু যে নজরুল হয়ে গেছে। তাই দু’লাইনের চটজলদি ছড়ার রূপান্তর ঘটল চমৎকার এক গানে—“ এত জল ওই কালো চোখে, পাষাণী আনলে বল কে”। আর ফক্কুড়ি? হো হো করে হাসির সংগে “দে গরুর গা ধুইয়ে”! কিন্তু দুখু বিদ্রোহী নজরুল হলেন কী করে? বা ঠিক করে বললে কবে? সেই যে পেটের দায়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া ফৌজে যোগ দিয়ে আফগানিস্তান ঘুরে এলেন, তখন উনি হাবিলদার দুখু মিঞা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে অটোমান সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ছে। অটোমানের সুলতানের বা খলিফার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত শাসন তথা ধার্মিক নিদানের অধিকার টলটলায়মান। কারণ, ব্রিটিশ সরকারের হুকুম এবং তুরস্কে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্কের ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আধুনিকতার জয়গান। উনি আইন করে খলিফাগিরি বন্ধ করে দিলেন। কিন্তু সহজে কেউ ক্ষমতা ছাড়ে? তার আগে ভারতে মুসলমানদের মধ্যে শুরু হোল খিলাফত আন্দোলন, যার উদ্দেশ্য অটোমান সুলতানের খলিফাগিরি বহাল রাখা। গান্ধীজি ভাবলেন—ইংরেজের বিরুদ্ধে হিন্দুদের সংগে মুসলিমদের একসাথে আনার সুবর্ণ সুযোগ। উনি খিলাফতের সমর্থন করলেন। কিন্তু ভারতীয় মুসলিম, কাজী পরিবারের নজরুল ইসলাম, উলটোপথে হাঁটলেন। সংস্কারের সমর্থনে লিখে ফেললেন—“কামাল তুনে কামাল কিয়া ভাই”! তাহলে কি উনি মুসলিম নন? কে বলল নন? তাহলে “মোহম্মদী” পত্রিকায় কেন প্রবন্ধ লিখতেন? কী করে লিখলেন ঈদের গান, আর এই গানটাঃ “সাহারাতে ফুটল যে ফুল,সেই ফুলেরই জ্বালা।কেউ বলে হজরত মোহম্মদকেউ বা কমলিওয়ালা”। আর কী প্রমাণ চাই? বেশ, কিন্তু এদিকে মালকোষে এইরকম গান লিখেছেন যে! “গরজে গম্ভীর গগনে কম্বুনাচে শংকর নাচে স্বয়ম্ভু”। আবার “মহাকালের কোলে এসে গৌরী হল মহাকালী”। থামো, থামো; আরও আছে।কতগুলো আগমনী গান আর দেবী দুর্গাকে নিয়ে বন্দনা গান বল দিকি?গুনতে শুরু করঃ“এলো রে শ্রীদুর্গা শ্রী আদ্যাশক্তি”, “জয় দুর্গা দুর্গতিনাশিনী”, “আয় মা উমা রাখো এবার”---ব্যস্‌ ব্যস, এতেই হবে। তাহলে নজরুল কী? হিন্দু না মুসলমান? প্রতিমা পূজা বা ‘বুত-পরস্তি’ ইসলামে নিষিদ্ধ নয়? নজরুল নিজেই উত্তর দিয়ে গেছেনঃ“হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?কাণ্ডারী বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার”। তবু লোকের জিভ নড়ে, আজও নড়ে। তাই লিখতে হয়ঃ “সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন ‘আড়ি চাচা’!যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা”। খেয়াল করি, নজরুলের কবিতা ও গানে দুর্গা আনন্দময়ী দেশমাতৃকা হয়ে যান। যুদ্ধ থেকে ফিরে ইংরেজ তাড়ানোর ইচ্ছে ওর মনে প্রবল। ওঁর আগুন ঝরানো সম্পাদকীয়ের চোটে একের পর এক পত্রিকা নিষিদ্ধ হচ্ছে। আর নামগুলো কী—লাঙল, ধূমকেতু, নবযুগ আরও অনেক। মিনার্ভা থিয়েটারে মহাষষ্ঠীর দিন অভিনীত “দেবী দুর্গা” নাটকের জন্যে গান লিখলেন নজরুল। মন্মথ রায়ের “কারাগার” নাটকের জন্যেও। “আগমনী” কবিতায় উনি দুর্গার বন্দনা করলেন ‘রণরঙ্গিনী’ রূপে। “দশদিকে তাঁর দশ হাতে বাজে     বাজে দশ প্রহরণ”। দুর্গাকে ‘বেটি’ বলে আদর করে ডেকে আহ্বান করছেন লড়াইয়ের ময়দানে নামতে-- ‘ঢাল-তরবার’ নিয়ে ধ্বংস করতে ‘অত্যাচারী শক্ত চাঁড়াল’—স্পষ্টতই ইংরেজদের। এরপর কারাগারে যেতেই হয়। তাতে কি! গেয়ে উঠলেনঃ“কারারই লৌহকপাট ভেঙে ফেল কররে লোপাট”। আর একটি লাইনে ধরা পড়ল শুধু বঙ্গ বা ভারত নয়, গোটা বিশ্বের মুক্তি আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা—“আমরা ধরি মৃত্যুরাজার যজ্ঞ ঘোড়ার রাশ”। উনি কোন একটি দলের সমর্থনে বদ্ধ ছিলেন না। দেশ স্বাধীন করতে হবে—যিনিই করুন, নেতাজি বা গান্ধীজি—সবাই তাঁর শ্রদ্ধেয়। “আনকোরা যত নন-ভায়োলেন্ট নন্‌-কো’র দলও নন খুশি,‘ভায়োলেন্সের ভায়োলিন’ নাকি আমি বিপ্লবী -মন-তুষি। ‘এটা অহিংস’ বিপ্লবী ভাবেনয় চরকার গান কেন গাবে?গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতিরাম ভাবে কন্‌ফুসি”। কিন্তু হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি কখনই আমাদের বঙ্গে স্থায়ী হয় নি। আপাত শান্তির তলায় বিদ্বেষের তুষের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে, আজও নেভেনি। তাতে ধুনো দেয়ার লোকের অভাব কোন কালেই ছিল না। দাঙ্গার আগুনে মানবিক বোধ পুড়তে দেখে ব্যথিত নজরুল লেখেন—“খালেদ আবার ধরিয়াছে অসি, অর্জুন ছোঁড়ে বাণ”। জাতের নামে বজ্জাতি সব তাঁর কাছে গোপন ছিল না। তবে মুজফফর আহমেদের সংগে ৩২ নং কলেজ স্ট্রিটে থাকা ও বন্ধুত্ব তাঁকে আগ্রহী করে সাম্যবাদী আন্দোলনে। (এখন সেই বাড়ির সামনে একগাদা দোকানপাট, পেছনে সরকার পরিবারের পুরনো বাড়ি)। ‘গাহি সাম্যের গান” শুধু একটি বিচ্ছিন্ন কবিতা নয়, শুধু কুলি-মজুরের কথা নয়—তিনি চেয়েছিলেন সার্বিক সাম্য। বিশেষ করে পুরুষ ও নারীর সাম্য। বলেছেন সৃষ্টির যা কিছু তার অর্ধেক নারীর সৃষ্টি। নজরুল বললে কী হবে? আমরা সংসদে নারীর জন্যে অর্ধেক আসন বরাদ্দ করার কথা এখনও ভাবতে পারিনি। এক-তৃতীয়াংশ দেব কিনা, কবে দেব—সেই নিয়ে কামড়াকামড়ি চলছে। “মিথ্যে শুনিনি ভাই,এই হৃদয়ের থেকে বড় কোন মন্দির-কাবা নাই”। তারপরেও নজরুল কতখানি হিন্দু বা কতখানি মুসলিম—আদৌ কোনটা কিনা, সে নিয়ে আজও তরজা চলে। আজ জীবিত থাকলে লাভ-জিহাদের অপবাদ শুনতে হত হিন্দু মেয়ে বিয়ে করার অপরাধে।এক ফাঁকে টুক করে বলে দিই—বিশ্বে সাম্যবাদী আন্দোলনের বিখ্যাত গান, পারি কমিউনের শ্রমিকের লেখা দ্য ইন্টারন্যাশনালের লিরিক রাশিয়া থেকে গোপনে ভারতে এনেছিলেন সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা অনুবাদ নজরুলের-‘অন্তর-ন্যাশনাল সঙ্গীত’ নামে। একজন সত্যিকারের কবির কলমে ধরা পড়েছে গানটির আত্মা।“যত অত্যাচারের শিরে বজ্র হানি, হাঁকে লাঞ্ছিত-জনমন-মথিত বাণীঃনব জনম লভি অভিনব ধরণী ওরে ওই আগত”।কিন্তু এতসব বিদ্রোহ-বিপ্লবের ভীড়ে হারিয়ে যায় নি দুখু মিঞা নামের নটখট ছেলেটা। ছোটদের জন্যে লিখেছে একগাদা কবিতা! দেখুন, বর্ণপরিচয়ে কোন রস নেই। খালি এটা করিও না। ওটা করিও না। খালি পড়তে বস, নো খেলাধূলো, নো হৈ -হুল্লোড়। রবি ঠাকুরের সহজ পাঠ? শিশু? শিশু ভোলানাথ? দারুণ সব কবিতা। আমাদের অন্য জগতে নিয়ে যায়। কিন্তু “ আমি আজ কানাই মাস্টার” বা “খুকি তোমার কিচ্ছু বোঝে না মা” গোছের তিন চারটে ব্যতিক্রম বাদ দিলে সবগুলো আসলে বড়দের জন্য। বাচ্চার বাবা-মায়ের জন্য। সবচেয়ে ভাল মদনমোহন তর্কালংকারের “রাত পোহালো ফর্সা হোলো, ফুটলো কত ফুল”। কিন্তু যাকে বলে মজা বা Fun, তার দেখা পাওয়া গেল নজরুলের লিচুচোর, খাঁদুদাদু, কাঠবেড়ালিতে।“ওমা তোমার বাবার নাকে কে মেরেছে ল্যাং” দুখু মিঞা ছাড়া কে লিখতে পারতেন? রবি ঠাকুরের প্রেমের গান ধূপের ধোঁয়ার মত, পূজা ও প্রেম মিশে যায়। নজরুল অনেক মাটির কাছাকাছি, অগুরু নয় দেহের গন্ধ পাই তাঁর প্রেমের গানে। পসন্দ আপনি আপনি! তবে মিনমিনে গলায় রবীন্দ্রসঙ্গীত যদি বা বান্ধবীকে শোনাতে পারেন, নজরুলের গান গাইতে একটু গলার চর্চা দরকার। এটা আমার মত হরিদাস পালের ব্যক্তিগত মত; রে রে করে উঠবেন না প্লীজ! রবি ঠাকুর লিখলেন—“আজি হতে শতবর্ষ পরে,    কে তুমি পড়িছ আজি আমার কবিতাখানি    কৌতুহল ভরে”? নজরুল অন্য ধাতুর। কোন কালজয়ী কবি হবার অমর হবার লোভ নেই।“পরোয়া করিনা বাঁচি বা না বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,মাথার উপর জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।প্রার্থনা কর যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটি মুখের গ্রাস,যেন লেখা হয় মোর রক্তলেখায় তাদের সর্বনাশ”।। উনি বললে কী হবে? একশ সাতাশ বছর হয়ে গেল। তবু নজরুলের গান কবিতা কিছুই আমরা ভুলি নি। কারণ, অনেক কিছু এখনও সেইরকম রয়ে গেছে। যেমনটি ছিল নজরুল বেঁচে থাকতে।
  • হরিদাস পালেরা...
    আরবিআই কি সোনা বিক্রি করেছে? তথ্য, ফাঁক, এবং প্রশ্ন - উদ্দালক | কী ঘটেছে?২ জুন ২০২৬ - ব্লুমবার্গ ইকোনমিক্সের সিনিয়র ইন্ডিয়া ইকোনমিস্ট অভিষেক গুপ্ত একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেন। তাঁর অনুমান মে মাসের শেষ দুই সপ্তাহে রিজার্ভ ব্যাংক অফ ইন্ডিয়া প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সোনা বিক্রি করেছে, একই সাথে প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা সম্পদ কিনেছে। কারণ হিসেবে বলেছেন পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতজনিত চাপে টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকানো। [1]৩ জুন, আরবিআই পাল্টা বিবৃতি দেয় যে এই প্রতিবেদন সঠিক নয়। সোনার "physical stock" ৮৮০.৫২ টনে অপরিবর্তিত। সরকারের তরফেও পিআইবি ফ্যাক্ট চেক এই খবর "মিথ্যা" বলে চিহ্নিত করে। আরবিআই-এর দাবি বৈদেশিক মুদ্রা মজুতে সোনার অনুপাত বরং বেড়েছে: সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ ১৩.৯২%, মার্চ ২০২৬-এ ১৬.৭০%, মে ২০২৬-এ ১৬.৮৫%। [2]যেখানে প্রশ্ন থেকে যায়আরবিআই-এর মাসিক বুলেটিনে বৈদেশিক মুদ্রা মজুতের তথ্য আছে ২৪ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত। ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণ ৮ থেকে ২২ মে পর্যন্ত। মাঝখানে প্রায় একমাসের তথ্যগত ফাঁক।[3]আরবিআই অবশ্য বলেছে ৮৮০.৫২ টন "as on date" — অর্থাৎ আজকের তারিখেও অপরিবর্তিত। কিন্তু এটি একটি বিবৃতি, প্রকাশিত ডেটা নয়। পাশাপাশি, আরবিআই-এর ২৯ মে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২২ মে সপ্তাহে মোট বৈদেশিক মুদ্রা মজুত ৭.৫১ বিলিয়ন ডলার কমে ৬৮১.৩৮ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে।[3]আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় - আরবিআই সুনির্দিষ্টভাবে "physical stock" শব্দবন্ধ ব্যবহার করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সোনা "physically" না বিক্রি করেও গোল্ড সোয়াপ, গোল্ড লেন্ডিং বা ডেরিভেটিভের মাধ্যমে ডলার লিকুইডিটি জোগাড় করতে পারে। ফিজিক্যাল টন অপরিবর্তিত থাকা আর সোনা দিয়ে কোনো আর্থিক লেনদেন না হওয়া এই দুটি এক কথা নয়।যদি সত্যি হয়, তাহলে এর তাৎপর্য কী?সোনা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শেষ আশ্রয়। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মুদ্রা রক্ষায় আগে বৈদেশিক মুদ্রা সম্পদ বিক্রি হয়। সোনায় হাত পড়া মানে ডলারের বাফার আর যথেষ্ট নয়।গত কয়েক বছরে ভারত ডলার-নির্ভরতা কমাতে ধারাবাহিকভাবে সোনা কিনে মজুত বাড়িয়েছে। সেই প্রবণতা উলটে গেলে বার্তাটি গুরুতর। অর্থনীতি যতটা স্বাভাবিক দেখানো হচ্ছে, বাস্তব ততটা স্বাভাবিক নয়।লক্ষণীয়, আরবিআই এবং অর্থ মন্ত্রণালয় উভয়েই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে।আরবিআই এর মে মাসের বুলেটিন প্রকাশিত হলে ছবি স্পষ্ট হবে।সূত্রনির্দেশ[1] Bloomberg — "RBI May Have Sold Gold to Save FX Reserves" (২ জুন ২০২৬) — https://www.bloomberg.com/news/articles/2026-06-02/rbi-may-have-sold-gold-to-save-foreign-reserves-be-report-shows[2]Business Standard — "RBI dismisses gold sale rumours" (৩ জুন ২০২৬) — https://www.business-standard.com/economy/news/rbi-dismisses-gold-sale-rumours-physical-reserves-steady-at-880-52-tonnes-126060300452_1.html[3] Upstox News — "RBI rejects reports of gold reserve sale" (৩ জুন ২০২৬) — https://upstox.com/news/business-news/financial-regulations/rbi-rejects-reports-of-gold-reserve-sale-says-physical-stock-unchanged-at-880-52-tonnes/article-194723/
    রটন্তী কুমার এবং ভারতীয় ও পাশ্চাত্য দর্শনে প্রমাণঃ পর্ব ৫  - রানা সরকার | প্রথমেই দুটি বাক্য লিখছি –‘পড়লে কথা সবার মাঝে / যার কথা তার বুকে বাজে’।এই ধরুন যারা যারাই নানা দেশে বহুদিন ধরে সাহিত্য রচনা করেছেন, তাঁরা তারাই সেই সাহিত্যের উপাদান সংগ্রহ করেছেন জীবন থেকে। সাহিত্য জীবনেরই প্রতিফলন। কিন্তু সাহিত্য জীবনের ১০০% প্রতিফলন নয়।ইদানীং নানান এলাকায় একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এই ব্যাপারটা আগে ছিল না। নেটে লেখা বা অডিও স্টোরি শুরু হতেই কিন্তু ব্যাপারটা পরিলক্ষিত হচ্ছে।কারণ মানুষ টাকা দিয়ে সাহিত্যের বই কেনেন না। তাঁরা মনে করেন সাহিত্যের বই হল আবর্জনা। এমনিতেই বেশিরভাগ বাড়িতে কোনোরকমে পড়াশোনা শেষ করে সেই বইগুলো বেচে দিতে পারলে অনেকেই বেঁচে যান। আর বাড়ির জায়গায় তো আজকাল ফ্ল্যাট। স্থান সংকুলান হয় না। ফলে কারুর বই রাখবার ইচ্ছে থাকলেও তিনি বা তাঁরা রাখতে পারেন না।একসময় মানুষ এর বই তার বই নিয়ে, নোটস নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। বাড়িতে বাড়িতে স্কুলের বাংলা ও ইংরেজি গ্রামার, অভিধান ইত্যাদি মানুষ রেখে দিতেন। আজ নেট, কম্পিউটার তদুপরি এ.আই. এসে সেসব ভাসিয়ে নিয়ে গেছে।সারাজীবনের নামে সামান্য ৫০টাকা দিয়ে স্থানীয় গ্রন্থাগারেও মানুষ যান না। কেন? না, সময় নষ্ট! হায় রে! সেই মানুষদের যখন দেখি বাড়িতে বসে গোগ্রাসে হাড় হাভাতের মতো রদ্দি সিরিয়াল গিলতে বা ইন্সটা বা ফেবুতে রীল গিলতে তখন মনে হয় যে নেতাদের আর দোষ কী?ওপরে যে ব্যাপারটার কথা বললাম, সেটা কী?নেটে, ফেসবুকে বা অডিও স্টোরি হিসেবে কোনও গল্প বা উপন্যাস রিলিজ হলে সেইসব বই না পড়া মানুষজন কিন্তু আবার সেসব পড়ে বা শুনে নেন। কারণ সময় অঢেল আর বাড়তি টাকা লাগছে না। বাড়ি বয়ে বই আনতে হচ্ছে না বা বই পড়তেই হচ্ছে না; খালি শুনতে হচ্ছে।এখন, বেশিরভাগ উপন্যাস বা গল্পে চরিত্র থাকে। চরিত্রহীন উপন্যাস আছে, তবে সেসব আবার সাধারণ মানুষ বোঝেন না। সাধারণ মানুষ এমনকি প্রতীকী বা সংকেতমূলক উপন্যাসও বোঝেন না। কারণ তাঁরা অতো মাথা খাটাতে চান না। খাটাতেই চান না।এখন ধরুন, সুকান্তদা, আমাদের এখানকার স্বনামধন্য লেখক শ্রী সুকান্ত গঙ্গোপাধ্যায় উপন্যাস লিখবেন। তা, তিনি কি উপন্যাসে কোনও চরিত্র বা সেই চরিত্রের কোনও নাম দেবেন না? নিশ্চয়ই দেবেন।এখন, পরে সেই উপন্যাসের অডিও স্টোরি শুনে সুকান্তদা যে এলাকায় বসবাস করেন সেখানকার লোক যদি দুম করে মনে করেন বা করতে থাকেন যে ওমা! দেখো সুকান্তদা আমাদের নিয়ে লিখছেন? বা তাদের মতো কাউকে নিয়ে লিখছেন? দেখা গেল, এলাকায় কেউ হয়তো রটিয়ে দিল। বলল, শুনেছেন? সুকান্তদা তো অমুকের তমুককে নিয়ে লিখেছে। এহ! ঠিক করে নি!এই কথা যারা রটিয়েছেন তারা তো হারামী বটেই, আর যারা যারা অডিও শুনে শুধু কিছু চরিত্রের নাম তাদের নামের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে বলে এটা ভেবে ফেলছেন যে লেখক তাদের কথাই লিখছেন, তাঁরা হলেন খাঁটি উপহাসাস্পদ। এমনকী লেজ বিশিষ্ট প্রাণীদের বুদ্ধি তাঁদের থেকে বেশি। যদিও মানুষেরও লেজ আছে; তবে সেটা অপ্রকাশ্য!!! ওদিকে সারাটা ভারতবর্ষ জুড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেলে, খেলার মাঠে ফ্ল্যাট হয়ে গেলে, জলাশয় ভরাট করা হলে, জঙ্গল পাহাড় সাফ হয়ে গেলে, ওষুধের দাম বেড়ে গেলে, নেতা ক্ষনে ক্ষনে মিথ্যা কথা বললেও কিন্তু দেশের বহু মানুষ চুপ করে থাকেন। আর দূর্নীতি তো হরদম চলছেই। বিরোধী থাকাকালীন রাজনৈতিক দল গুলোর এক রকম কথা আর শাসক হলেই আরেকরকম। এখন, তাহলে কি উপন্যাস বা গল্প লেখবার আগে সুকান্তদাকে ভোটার লিস্ট চেক করে জেনে নিতে হবে, কোন কোন নামের কোন কোন লোক এলাকায় বসবাস করছেন, আর কোন কোনও নামের লোক এলাকায় বসবাস করছেন না! তারপর তাকে জানতে হবে যে কোন কোন নামের লোক এলাকা ছেড়ে চলে গেলেন, মারা গেলেন আর কোন কোন নামের লোক এলাকায় আসতে পারেন। তারপর এইসব হিসেব নিকেস করে যখন লিখতে বসলেন, তখন আবার কিছু লোক এলাকায় বসবাস করতে এলেন। সুকান্তদা লেখা ফেলে তাঁদের নাম জানতে দৌড়ে গেলেন।আর এইভাবে, হ্যাঁ, আর লেখাই হল না।দারুণ! গল্প না? (গল্পটা আমার লেখা আছে। পরে প্রকাশ করবো) অনেক লেখক আছেন যারা ‘গল্পে গরুকে গাছে তুলে দেন’। এই যেমন, সমরেন্দ্রনাথ পাণ্ডে ওরফে স্বপন কুমার লিখিত দীপক চ্যাটার্জী পড়লে এরকম মনে হয়। আবার এলাকায় এলাকায় অনেক ততোধিক নির্বোধ পাঠক বা শ্রোতা আছেন যারা যারা কোনও উপন্যাসের কয়েকটা নামের সঙ্গে তাঁদের নাম মিলে গেলে বা তাঁদের চেহারার বর্ণনার সঙ্গে তাঁদের চেহারার বর্ণনা মিলে গেলেই ভাবতে থাকেন যে লেখক মনে হয় তাঁদের নিয়েই লিখচ্ছেন। ফলে তাঁদের কাজের মাধ্যমে তাঁরা গরুকে গাছে না তুলে, গাছকে গরুর ওপর তুলে দেন! এলাকায় এলাকায় কত রকমের যে ইয়ে আছে সেটা না অনুভব করলে বোঝাই যায় না। আর যারা যারা তার পরেও মনে করবেন যে সুকান্তদা তাঁদের নিয়েই লিখেছেন, তাঁদের জন্য বলতে হয়, ‘পড়লে কথা সবার মাঝে / যার কথা তার বুকে বাজে’।সুকান্তদা যদি এই লেখাটা পড়ে থাকো বা পড়ো, তোমার নাম ব্যবহার করার জন্য তোমার কাছ থেকেই আগাম জামিন নিয়ে রাখছি (হা হা হা)। কারণ আমরা জানি যে ‘মাঝেরপাড়া’ জায়গাটা কোথায়? আর একজন লেখক কোন সমস্যায় পড়লে তিনি এইসব নাম ব্যবহার করতে বাধ্য হন। এই প্রসঙ্গে, শ্রী সুবোধ ঘোষের একটা গল্পের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। যাই হোক, আমরা অনেক সময় বলি, নিরপেক্ষ মতামত দিন। আবার অনেকেই বলেন যে রাজনীতিতে নিরপেক্ষ থাকাই যায় না।যেমন ডেসমন্ড টুটু একবার বলেছিলেন – হাতির পা ইঁদুরের লেজে থাকলে আর আপনি নিরপেক্ষ থাকলে, ইঁদুর কিন্তু আপনার শংসা করবে না। অথবা মার্টিং লুথার কিং বলেছেন – নরকের সবচেয়ে উচ্চতম স্থান তাঁদের জন্য সংরক্ষিত, যারা নৈতিক দ্বন্দ্বের সময়ে নিরপেক্ষ থাকেন।আবার কেউ মজা করে বলেন – দুজন ঝগড়া করলে, যে নিরপেক্ষ থাকে, সে সাধারণত পপকর্ণ খায়! গত কোনও একটি পর্বে প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, দলবদলুদের অন্তত ১০ বছরের জন্য নতুন কোনও রাজনৈতিক দলে প্রার্থী করা থেকে বিরত রাখা আর বিধায়ক ও সাংসদ নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থানাধিকারিদেরও শেষ দেড় বছর যথাক্রমে বিধায়ক ও সাংসদ রূপে কাজ করবার আইনি অধিকারের কথা বলেছিলাম।আজ আর একটা গল্প বলছি। এই গল্পটাও আপনারা পড়েছেন। কিন্তু ভুলে গেছেন।একজন জাদুক্ষমতা সম্পন্ন মানুষের কাছে একদিন একটি ইঁদুর গিয়ে বলল যে তাকে কিছু কুকুর খুব ডিস্টার্ব করছে; তাড়া করছে। সে ইঁদুর হয়ে অনেক কিছু কাজও করতে পারছে না। তাই তাকে কুকুর করে দেওয়া হোক। জাদুকর হেসে বললেন, তথাস্তু। এর কয়েক মাস পর সেই ইঁদুর থেকে কুকুর হওয়া সেই কুকুরটা আবার সেই জাদুকরের কাছে এসে হাজির হল। এবার বলল, তাকে এখন শেয়ালেরা খুব ডিস্টার্ব করছে; তাড়া করছে। সে কুকুর হয়ে অনেক কিছু কাজও করতে পারছে না। তাই তাকে শেয়াল করে দেওয়া হোক। জাদুকর হেসে বললেন, তথাস্তু। এর কয়েক মাস পর সেই কুকুর থেকে শেয়াল হওয়া শেয়ালটা আবার সেই জাদুকরের কাছে এসে হাজির হল। এবার বলল, তাকে এখন বাঘেরা খুব ডিস্টার্ব করছে; তাড়া করছে। সে শেয়াল হয়ে অনেক কিছু কাজও করতে পারছে না। তাই তাকে বাঘ করে দেওয়া হোক। জাদুকর হেসে বললেন, তথাস্তু।এবার সেই বাঘ প্রথমেই জাদুরকরকে খেতে এলে জাদুকর তার জাদুর সাহায্যে তাকে আবার ইঁদুরে রূপান্তরিত করে দিল।আমরা, জনগণ আমাদের ভোটের মাধ্যমে প্রার্থীদেরকে চলতি আইন মোতাবেক নির্বাচিত করে নানান ক্ষমতা প্রদান করি। কিন্তু যদি দেখা যায় তাঁদের মধ্যে নির্বাচিত অনেক নেতা (সবাই নন) জনগণের ভালো করার বদলে, খারাপ করতে থাকেন, তখন যেন জনগণের হাতে সেই সেই ক্ষমতা থাকে (ঐ ৫ বছর পরে নয়; তার আগেই), যাতে সেই নির্বাচিত নেতাকে তৎক্ষণাৎ পুনরায় ক্ষমতাহীন করে ফেলা যায়। সেটিই হবে কিন্তু আসল গণতন্ত্র। জনগণের ভোটে জিতে কোনও নেতা বা দল যদি তৎক্ষণাৎ জনবিরোধি কাজ করেন তাহলে দেশের সংবিধান ও আইন মোতাবেক যেন সেই নেতা বা সেই দলকে যেন সেই সেই জনবিরোধি কাজ তৎক্ষণাৎ রদ করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং সবার সঙ্গে কথা বলে সকল বা বেশিরভাগ মানুষের সহমতের ভিত্তিকে অন্য কোনও যুক্তিযুক্ত উপায় অবলম্বন করা হয়, যাতে সবাই বাঁচে। নয়তো সেই নেতাকে যেন জনগণের বহিষ্কার করার অধিকার সংবিধান দেয়। কারণ জনগণের কল্যানই হল শেষ কথা। জনগণের অকল্যাণ করার জন্য নিশ্চয়ই জনগণ কাউকে নির্বাচিত করেন না। ফিরে আসি দর্শনে। এখন, পাশ্চাত্য যুক্তিতে নিরপেক্ষ বা শর্তহীন বচন কেমন?যখন কোনও উক্তি কোনও শর্তের উপর নির্ভর করে না, তখন সেই বচনকে নিরপেক্ষ বা শর্তহীন বচন বলে।এইসব বচনের ৪টি অংশ।পরিমানক – উদ্দেশ্য – সংযোজক – বিধেয়।সকল – মানুষ – হয় – মরণশীল জীব।এখন এই উদ্দেশ্য আর বিধেয়ের স্বরূপ কী?এক্ষেত্রে আবার ৪টি মতবাদ আছে-১) ব্যক্তর্থ ভিত্তিক বা শ্রেণিভিত্তিক মতবাদ। - উদ্দেশ্য ও বিধেয় দুটিকেই গ্রহণ করতে হবে ব্যক্তর্থ-এর দিক দিয়ে। উদাঃ কোনও কোনও ফুল হয় লাল। রাসেল একজন বড় দার্শনিক ছিলেন। ২) ব্যক্তর্থ-ভাবার্থভিত্তিক মতবাদ। - একটি বচনের উদ্দেশ্য কোনও ব্যাক্তি বা বস্তুকে বোঝায় আর বিধেয় বলতে বোঝায় তাঁর গুণ বা ধর্মকে। উদাঃ সমস্ত তরলের গতি হয় নিম্নগামী।৩) ভাবার্থভিত্তিক মতবাদ - উদ্দেশ্য ও বিধেয় দুটিকেই গ্রহণ করতে হবে ভাবার্থ-এর দিক দিয়ে। উদাঃ- ক্ষমা হল পরম ধর্ম।৪) সমন্বয় ভিত্তিক বা ব্যপক মতবাদ। - এক্ষেত্রে উদ্দেশ্য ও বিধেয়কে ব্যক্তর্থ ও ভাবার্থ – দুদিক দিয়েই গ্রহণ করা যেতে পারে। উদাঃ- বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানী আমাদের সকলকে নতুন দৃষ্টি প্রদান করে। এই নিরপেক্ষ বচন আবার দুই প্রকার। সদর্থক ও নঞর্থক। নিরপেক্ষ বচনের চতুর্বর্গের পরিকল্পনা –অ্যারিষ্টটল সমস্ত বচনকে সাপেক্ষ ও নিরপেক্ষ এই দুইর শ্রেনীতে ভাগ করেছেন। আবার গুণ অনুসারে সদর্থক ও নঞর্থক। আর পরিমাণ অনুসারে সার্বিক ও বিশেষ।সামান্য সদর্থক – সকল মানুষ হয় মরণশীল। (A)সামান্য নঞর্থক – কোনও মানুষ নয় অমর। (E)বিশেষ সদর্থক – কোনও কোনও লোক হন জ্ঞানী। (I)বিশেষ নঞর্থক – কোনও কোনও লোক নয় শিক্ষিত। (O)ল্যাটিনে Affirmo এবং Nego - এই শব্দ দুটি থেকে যথাক্রমে A,I ও E,O নেওয়া হয়েছে।এখন এই ৪টি বচনের উদ্দেশ্য ও বিধেয় পদের ব্যাপ্যতার জন্য একটি ফর্মুলা আছে। - AsEbInOp (s- সাবজেক্ট ব্যাপ্য। b- দুটোই ব্যাপ্য। n – কোনটাই ব্যাপ্য নয়। আর p- বিধেয় ব্যাপ্য)AsEbInOp মানে?As Ebony Opposes Indigo. অনুমান নিয়ে আমি আগেই লিখেছি; তবে সেটা ভারতীয় দর্শনের কথা। এখানে পাশ্চাত্য দর্শনের অনুমান ব্যাপারটা সংক্ষেপে অনুধাবন করার চেষ্টা করবো।দামী জামা জুতো পরে কেউ সামনে এলেন। আমরা অনুমান করলাম যে উনি দারুণ কেতাদুরস্ত। সঙ্গে ভাবলাম বুঝি এলেমও আছে। কিন্তু কথা বলতেই বুঝলাম ভুটভাট! একেবারে অশিক্ষিত!! আবার, কোনও বিশেষ রাজনীতির লোকের সঙ্গে কেউ তার বাড়িতে গিয়ে কথা বললেই আমরা ধরে নিই, ও তার মানে…। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললে কি ধরে নিই যে আমরা ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার হয়ে গেছি? না।তাহলে উপরের অনুমান গুলো হল আসলে গেরিমান! গেরিলা আর হনুমান মিলিয়ে গেরিমান! (কৃতিত্ব – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়)কোনও জানা বিষয় থেকে সাধারণত অজানা বিষয়ে পৌঁছানোর মানসিক প্রক্রিয়ার নাম হন অনুমান।এই অনুমান আবার দু’ভাগে ভাগ করা হয়। আরোহ আর অবরোহ।অবরোহে সিদ্ধান্ত কখনো হেতুবাক্যকে অতিক্রম করে না। অর্থাৎ বেশি ব্যাপক হয় না।আর আরোহে কিন্তু সিদ্ধান্ত সর্বদাই হেতুবাক্যের থেকে বেশি ব্যাপক হয়।দুটি অনুমান পদ্ধতিই কিন্তু আমরা প্রত্যহ ব্যবহার করি।এখন অবরোহ অনুমানকে আবার দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। অমাধ্যম ও মাধ্যম।অমাধ্যম অবরোহ অনুমান – সকল মানুষ হয় প্রাণী। অতএব, কোনও কোনও প্রাণী হয় মানুষ।মাধ্যম অবরোহ অনুমান – সকল দার্শনিক হন পণ্ডিত ব্যাক্তি। লক হন একজন দার্শনিক। অতএব, লক হন একজন পণ্ডিত ব্যাক্তি।এই মাধ্যম অবরোহ অনুমানে বহু সংখ্যক হেতুবাক্য ব্যবহার করা যায়। আর তাকে বলে ন্যায় শৃঙ্খল (Train of Syllogism)যদি ক হয় খ, খ হয় গ, গ হয় ঘ, আর ঘ হয় ঙ, তবে, ক হয় ঙ। অনেক দার্শনিক কিন্তু আবার অমাধ্যম অনুমানকে প্রকৃত অনুমান হবেন না। মিল এবং বেইন এই মতের প্রবক্তা। কারণ এখানে কোনও নতুন বক্তব্য বা তথ্য পরিবেশিত হয় না। যেমন – সব গোলাপ হয় সুগন্ধী। অতএব, কোনও কোনও সুগন্ধী বস্তু হয় গোলাপ। এই অমাধ্যম অনুমানকে আবার সূত্রের সাহায্যে একধরণের থেকে অন্য ধরণ করে ফেলা যায়।১) আবর্তন২) ব্যাবর্তন৩) সমবিবর্তন৪) অন্তরাবর্তন (চলবে)
  • জনতার খেরোর খাতা...
    এক নবীন সাহিত্য প্রতিভার আত্মপ্রকাশ  - Sandipan Majumder | THE SNOW OF THE DYING century still lay on the edge of the dark forest when Lajos von Lázár, the translucent child with water-blue eyes, first glimpsed the man he would believe to be his father for his whole life and beyond.ভাতের হাঁড়ি থেকে একটা ভাত টিপেই যেমন হাঁড়ির খবর পাওয়া যায়, তেমনই ভালো উপন্যাসের মণিমুক্তোর মত ছড়িয়ে থাকা এক আধটা লাইন কিংবা অনুচ্ছেদ থেকেই বোঝা যায় তার গুণমান। অনেক সময় উপন্যাসের প্রথম লাইনেই তার ঈঙ্গিত থাকে।যেমন ওপরের লাইনটি।নেলিও বিডেরম্যান। বয়স মাত্র বাইশ। সুইজারল্যান্ডের বাসিন্দা। জন্মসূত্রে হাঙ্গেরিয়ান। উপন্যাসটি লিখেছেন জার্মান ভাষায়। না,প্রথম নয়। জানা যাচ্ছে এর আগেও তিনি একটি উপন্যাস লিখেছেন যেটি এখন ইংরেজিতে অনুবাদ হচ্ছে। উপরের উদ্ধৃতিটি যে বইয়ের প্রথম লাইন, সেই ‘লাজার' উপন্যাসটি প্রকাশের পর ৩১টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। শতিনেক পাতার উপন্যাসে আছে হাঙ্গেরির এক ধনাঢ্য অভিজাত পরিবারের তিন প্রজন্মের কাহিনী। দু দুটি বিশ্বযুদ্ধ, হলোকাস্ট ও অভিজাতদের দায়,কম্যুনিস্ট শাসন,অভিজাতদের সম্পত্তিহানি,সোভিয়েত হস্তক্ষেপ, লাজার পরিবারের দেশত্যাগ —- বিস্তারিত বর্ণনা ছাড়াই শুধু তাদের ঘনীভূত উপস্থাপনে আমরা যেন সহযাত্রী হয়ে পড়ি এই পরিভ্রমণের। না, শুধু বড় ঐতিহাসিক পরিপ্রেক্ষিতের জন্য নয়, জীবনবোধের গভীরতায় সমৃদ্ধ এত পরিণত লেখা এই বয়সে কী করে লিখেছেন নেলিও,ভাবলে অবাক হতে হয়। ভাবনার গভীরতায়,যাদু বাস্তবতার মায়াঞ্জন মাখানো ভাষার নিপুণ কারিগরিতে নেলিও আবিষ্ট করে রাখেন। এইরকম ধ্রুপদী ও গথিক ধাঁচার উপন্যাস লিখছেন জেন জি প্রজন্মের এক লেখক– এটাই অনেককে বিস্মিত করেছে। বইটির একমাস আগেও কোনো পেপারব্যাক সংস্করণ ভারতে প্রাপ্তব্য ছিল না। সুখের কথা,সেটি এখন এসেছে।পড়লে ঠকবেন না,আমার বোধবুদ্ধি অনুসারে এটুকু সুনিশ্চিত করেই বলতে পারি।
    অ-কবিতা  - Srimallar Speaks | কেন, কারণকঠিননালিশ কাজল দিলিকাজল দিলি বান্ধবীকেহতে পারিস পছন্দঝোঁকআমাকে নে নিজের কোরে।জব্দহন্যে মেঘ মোছালিমেঘ মোছালি বৈঋণীকেযেমনভাবে আহাদারুণবলিস চ’লে যাওয়ার পরে।গতিশীতল চোট লেখালিচোট লেখালি নবীনফাঁদেকারণ জানা উচিত ছিল,‘কেন’ হওয়ার অনেক আগেই... চলো, এক্ষুনিদাওদরিদ্র, পাওদরিদ্রসাধ্য মতোই ভরিয়ে দাওনাওআনন্দ, যাওআনন্দশিক্ষা দেওয়ার সাহস নাওখাওঅপূর্ব, চাওঅপূর্বসময় মতোই খাবার খাওদাওদরিদ্র, যাওআনন্দ—রোদের মধ্যে লাইন দাও
    ‘কেন্দ্রীয়’ শিক্ষার হাল - ফুটকড়াই | ১৯৫২ সালে কেন্দ্রীয় বোর্ড CBSE তৈরী হয়েছিল বাকি রাজ্যের বোর্ডগুলির মতোই, যার এক্তিয়ারে ছিল শুধুমাত্র কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল। ১৯৬২ সালে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের ছেলেমেয়েদের এর আওতায় আনা হয়। ভারতের সংবিধানে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত শিক্ষা কেবল রাজ্যের বিষয় থাকলেও অন্য আরো অনেক কিছুর মত ৪২তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে একে যৌথ তালিকাভুক্ত করা হয় এবং রাজ্যগুলির শিক্ষায় কেন্দ্রের নাক গলানোর শুরু। এক রাষ্ট্র এক শিক্ষার প্রকল্প আরো গতি পায় ২০১৪ সালের পর থেকে। ২০১৭ সালে তৈরি হয় NTA - যাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় - 'সর্বভারতীয়' ডাক্তারি স্নাতক, ইঞ্জিনিয়ারিং স্নাতক এবং UGC CSIR NET এইসব পরীক্ষা নেবার ভার। এই এনটিএ একটি 'সোসাইটি' !![১] UGCর মত স্ট্যাচুটরি সংস্থা [আইনসভায় আইন পাশ করে তৈরী] বা UPSC র মত সাংবিধানিক সংস্থা নয়।  ২০২০ সালে চালু হওয়া কেন্দ্রীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী ২০২৪ সাল থেকে ৪৫ টি কেন্দ্রীয় ইউনিতে [বিশ্বভারতী, BHU, AMU, দিল্লি, JNU ইত্যাদি] স্নাতক, স্নাতকোত্তর ইত্যাদিতে ভর্তি হতে গেলে এনটিএর CUET পাশ করা বাধ্যতামূলক। এনটিএর ইঞ্জিনিয়ারিং স্নাতক পরীক্ষায় [JEE mains] উত্তীর্ণ হলে তবেই আইআইটির প্রধান পরীক্ষায় [JEE Advanced] বসা যায়। যা নেয় স্বায়ত্ত্বশাসিত আইআইটি কাউন্সিল। JAM বা GATEর মত আইআইটিতে স্নাতকোত্তর পরীক্ষাও নেয় আইআইটি কাউন্সিল। ক্যাট নেয় আইআইএম কাউন্সিল। অর্থাৎ এনটিএকে এরা নিজেদের জায়গায় নাক গলাতে দেয়নি।    ২০১৬ থেকে পশ্চিমবঙ্গ ইত্যাদি যাদের নিজেদের রাজ্যের ডাক্তারিতে ভর্তির পরীক্ষা ছিল সেসব বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওদিকে শুরু থেকেই এনটিএর বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ। বাকি পরীক্ষাগুলি বছর বছর খুচখাচ বাতিল হতে থাকে, প্রযুক্তিগত গ্লিচ ইত্যাদি কারণে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ডাক্তারের স্নাতক পরীক্ষা NEET নিয়েই, কারণ বাকি পরীক্ষাগুলি অনলাইনে হলেও নিট কাগজ কলমে হয়। ২০২৪ সালে নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের পরেই ইসরোর চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গড়া কমিটি অনলাইন পরীক্ষা নিতে সুপারিশ করেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালেও নিটের প্রশ্নপত্র পুনরায় ফাঁস হয়ে যায়। 'গেস পেপার' যা বাজারে ঘুরে বেড়াচ্ছিল[২] সেখান থেকে প্রশ্ন মিলে গেছে। পরীক্ষার্থীদের একাংশ এই অভিযোগ আনার পর এনটিএ পরীক্ষা বাতিল করে। তদন্তে দেখা যায় বিপুল টাকার বিনিময়ে ফাঁসগুলি করেছেন পেপার সেটাররাই। এনটিএ বলেছে - বাইশ লাখ পরীক্ষার্থীর অনলাইন পরীক্ষা নিতে গেলে ২০ দিন ধরে পরীক্ষা নিতে হবে[৩] অর্থাৎ এবছরও রি-নিট অনলাইন করা সম্ভব না। শোনা যাচ্ছে ফাঁস আটকাতে বায়ুসেনা উড়িয়ে নিয়ে যাবে প্রশ্নপত্র। এর সঙ্গেই ২০২৬ সালে কেন্দ্রীয় বোর্ড চালু করেছে OSM - এই প্রকল্পে পড়ুয়াদের জমা দেওয়া খাতা স্ক্যান করে পোর্টালে তোলা হয়। তারপর দেশের অন্য কোনো প্রান্তে বসে কেউ সে খাতা দেখে নম্বর দেন। আগে ২০১৩তে ক্লাস টেনের জন্য এরকম ব্যবস্থার পাইলট করা হয়েছিল। কিন্তু সেক্ষেত্রে পাইলটের পর সারা দেশে চালু করার সীমাবদ্ধতা, বিপুল খাতা স্ক্যান ইত্যাদি প্রযুক্তিগত সমস্যার কথা ভেবে কেন্দ্রীয় বোর্ড পিছিয়ে আসে। বর্তমানে কেন্দ্রীয় বোর্ডের অধীনে আছে প্রায় ৩০ হাজার স্কুল। ২০২৬ এ সারে তাড়াহুড়ো করা লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির মতই, পরীক্ষার মাত্র একমাস আগে তাড়াহুড়ো করে ওএসএম অল্প কয়েকবার দিল্লির মাত্র পাঁচটি স্কুলের মাধ্যমে ড্ৰাই রান করা হয়। সেখানে খাতা দেখিয়েরা সমস্যার কথা কর্তৃপক্ষকে জানান কিন্তু বোর্ড কর্ণপাত করেনি। ফল বেরোনোর পর দেখা গেল এই ব্যবস্থায় বিপুল গরমিল। এবছর পাশের হার কমে গেছে ৩ শতাংশ এবং ৯০ শতাংশের ওপর পাওয়া পড়ুয়ার সংখ্যাও কমেছে। কিছু পড়ুয়া খাতা দেখতে চেয়ে অভিযোগ করেন এবং দেখা যায় স্ক্যানের পাতা ঝাপসা বা নিজের খাতার সঙ্গে অন্য কারুর খাতার পাতা জুড়ে গেছে, কারণ হাতের লেখা আলাদা। উনিশ বছরের এথিকাল হ্যাকার নিসর্গ অধিকারী কেন্দ্রীয় বোর্ডের খাতা দেখার এই OnMark পোর্টালটির অসংখ্য ভুল বার করে ফেলেন। যেমন খাতা দেখিয়ে ছাড়া যে কারুরই সেই পোর্টালে লগইন করে উত্তরপত্র বা নাম্বার বদলে দিতে পারার সুযোগ ছিল।[৪] পড়ুয়াদের অভিযোগ সামনে আসার পর সিবিএসই চেয়ারম্যান এবং সেক্রেটারিকে বলির পাঁঠা করা হল। কেন্দ্রের শিক্ষা মন্ত্রকে আগুন দফতরে আগুন লেগে নথিপত্র পুড়ে যাবার অভিযোগ উঠল। টিসিএস ইতিমধ্যেই অনেক অনলাইন পরীক্ষা করায়, অথচ তাদের এড়িয়ে ৩৮৪ কোটির টেন্ডারের বিনিময়ে OSM বানানোর বরাত দেওয়া হয় কোয়েম্প্ট বলে হায়দ্রাবাদের এক কোম্পানিকে। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে আগেই কেরালায় কান্নুর ইউনিতে ফৌজদারি মামলার ইতিহাস লুকিয়ে যাবার অপরাধে টেন্ডার দেওয়া হয়নি।[৫] উঠছে নাম ভাঁড়িয়ে টেন্ডারে যোগ দেবার অভিযোগ।[৬] এর পরেও কেন্দ্রীয় বোর্ডের খাতা পুনর্বিবেচনার পোর্টালে ৩৮ লাখ অসফল সাইবার হানার চেষ্টা হয়েছে। ৫৬ হাজার পড়ুয়া নিজেদের খাতা আবার পরীক্ষা করার দাবি জানিয়েছেন।[৭] ইতিমধ্যে ৬ জুন দেশে ফিরছেন আরশোলা জনতা দলের অভিজিৎ দীপকে। তিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করে বিমানবন্দর থেকে সোজা যন্তর মন্তর যাবেন। অভিজিৎের আশঙ্কা তাকে বিমানবন্দর থেকেই গ্রেফতার করা হবে, কিন্তু ওসব আশঙ্কা অমূলক। কারণ কেন্দ্রীয় হলে সবই ভাল হবে।
  • ভাট...
    commentalbert banerjee | বুধবার মালভিয়া নগরের একটি রেস্তোরাঁয় অগ্নিকাণ্ডে ২০ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে দিল্লি পুলিশ।
    ভারতে কোন রাজ্যের আইনে এই রকম আবাসিক স্থল বানানোর অনুমতি আছে? এই গুলো বুলডোজার দিয়ে ভাঙা হবে তো?
    commentalbert banerjee | গণবন্টন ব্যবস্থার জন্য দেশে শস্য সংরক্ষণের সর্বোত্তম উপায় বের করার লক্ষ্যে ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার (এফসিআই) ২০,০০০ কোটি টাকার সাইলো কর্মসূচি [২০২২ সালের এপ্রিল ২৬ থেকে প্রথম ফেজের টেন্ডার *] চালু করা হয়েছিল।কিন্তু এই উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হাজার হাজার কোটি টাকার চুক্তিগুলো এখন মাত্র দুটি কোম্পানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এফসিআই-এর 'হাব অ্যান্ড স্পোক' সাইলো কর্মসূচির দুই পর্যায়ের ১৩৪টি সাইলোর মধ্যে ১১০টির জন্য আদানি এগ্রি লজিস্টিকস লিমিটেড এবং লিপ ইন্ডিয়া ফুড অ্যান্ড লজিস্টিকস প্রাইভেট লিমিটেড চুক্তি পেয়েছে। এগুলোর মোট মূল্য ১৬,৫০০ কোটি টাকারও বেশি। মোট ৬০ লক্ষ মেট্রিক টন শস্য সংরক্ষণের ক্ষমতার মধ্যে প্রায় ৪৬.৫ লক্ষ মেট্রিক টন শস্য এই দুটি কোম্পানির সাইলোতে সংরক্ষণ করা হবে। মজার ব্যাপার হলো, এফসিআই নিজেই প্রথমে একটি একক কোম্পানির সমস্ত প্রকল্প অধিগ্রহণ করা ঠেকাতে একটি 'একচেটিয়া বিরোধী' ধারা প্রস্তাব করেছিল। তবে, ২০২২* সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে নীতি আয়োগ এবং অর্থনৈতিক বিষয়ক বিভাগ এই শর্তের বিরোধিতা করে যুক্তি দেয় যে, বাজারকে তার স্বাভাবিক গতিতে চলতে দেওয়া উচিত এবং এই ধারাটি বাতিল করা হয়। এর পরপরই আদানি প্রথম পর্বের দ্বিতীয় রাউন্ডের সমস্ত টেন্ডার জিতে নেয়। দ্বিতীয় পর্ব শুরু হতে হতে চিত্রটি প্রায় স্পষ্ট হয়ে যায় যে আদানি এবং লিপ ইন্ডিয়া ভারতের বৃহত্তম আধুনিক শস্য সংরক্ষণ প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে ফেলেছে। Newslaundry 29/05/2026  
    commentX | দারুণ @ :।: দিলীপ'দা কে গিয়ে বললে হয় - মহোৎসব চালু করতে - কিন্তু বিদেশি গোরু তো আবার অ‍্যান্টি ;)
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত