এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    আমার বই আর মফস্বলের ভোর - স্মৃতি ভদ্র | অলংকরণ: রমিতআশির প্রথমভাগ প্রায় শেষ হবার পথে তখন। বারোয়ারী উঠোনের আমাদের আনন্দবাড়িতে তখনও প্রতিবেলা পাত পড়ে জনা পঁচিশের। নিজেরা বাদেও জমির ফসলে দিনখাটা মানুষ, সংসারের কাজে হাত লাগানো পূর্ণির মা কন্যাসহ, তাঁতঘরের ড্রাম মাষ্টার, ম্যানেজার আর কখনো কখনো মাদলা গ্রামের আইনুল চাচা। বলা যায়, উৎসব ছাড়াও বাড়ির উঠোনে পরবের কমতি ছিল না একটুও। সবদিনই আনন্দের, সবদিনই পরবের। আর আমি পাঁচ পেরিয়ে ছয়। বাড়ির পাশে এক নতুনধারার ইশকুল। কিন্ডারগার্টেন। পাশের বাড়ির বলাকা ফুফু সে ইশকুলের আপা। চেয়ারম্যান দাদুর এক শরিকের পড়ে থাকা খালি বনেদি ভবনে সাইনবোর্ড ওঠলো ‘‘উদয়ন কিন্ডারগার্টেন’। শোনা যায়, সে শরীক আমেরিকায় গিয়ে আর ফেরেননি। কাগজপত্রের জটিলতার কারণে নিজ দেশে তাঁর ফিরে আসাও অনিশ্চিত। কিন্তু দেশের জন্য পরান তো কাঁদে। তাঁর ইচ্ছাতেই সে ভবনের ফাঁকা ঘরগুলো হয়ে উঠেছিলো ক্লাশ রুম। হয়ে উঠেছিলো আমাদের শৈশবের কাগজনৌকা সময়।পাড়ায় প্রথম এমন ইংরেজি ইশকুল। সোরগোলের অতিশয্য। কেউ ফটকে দাঁড়িয়ে উঁকি দেয় তো কেউ জানালার শিক ধরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। যেন সার্কাসের দল এসেছে! আর এসেম্বলিতে যখন ‘ অ্যাটেনশন’ ‘স্ট্যান্ড ইজি’ বলে শারীরিক শিক্ষক গলা চড়াতেন তখন চারপাশের চোখগুলো গোলগাল হয়ে ঘিরে ধরতো ইশকুলের মাঠকে।বিড়ম্বনা। অদ্ভুত বিড়ম্বনা। সে বিড়ম্বনার আড় পেরিয়েই আমি বলাকা ফুফুর হাত ধরে পৌঁছে গিয়েছিলাম জীবনের প্রথম শিক্ষা নিকেতনে। নিজের আড়ষ্টতা আর জড়তা কাটিয়ে একটু একটু অভ্যস্ত হচ্ছিলাম আমি,পুষি ক্যাট পুষি ক্যাট হোয়্যার হ্যাভ ইউ বিনআই হ্যাভ বিন টু লন্ডন টু ভিজিট দ্যা কুইন…ঠিক তখনি এক দুপুরে বাবা বাড়িতে হাজির হলো বদলির আদেশ হাতে নিয়ে। পরের মাসে জয়েন করতে হবে সদ্য জেলা শবরের খেতাব পাওয়া এক শহরে। খুব দূরে নয়, আবার এমন কাছেও নয় যে বাবা দিনে গিয়ে অফিস সেরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে পারবে। তাহলে উপায়?আমাদেরকে চলে যেতে হবে বাবার সঙ্গে শহরে। তল্পিতল্পা নিয়ে অংশিদার হতে হবে উদবাস্তু জীবনের। সেই প্রথম আমাদের বাড়ির বারোয়ারী উঠোনের একচালা আনন্দে ভাঙন ধরলো। লাল বারান্দায় পড়া পাতের সংখ্যা কমলো। উঠোনে রোদে ভেজা তিল তিসির দুপুরে চড়ুই তাড়ানোর মানুষ কমলো। কিন্তু ওই যে, জীবনের গতি একমুখী! সে গতির সঙ্গে হয় পাল্লা দাও নয়তো ছিটকে যাও রেস থেকে!তাই জীবনের নিয়ম মেনেই এক শীতের সকালে বাকশো পেটরা, গুড়ের মেটে হাঁড়ি, মুড়ির টিন, ডানো দুধের কৌটায় কুমড়ো বড়ি আর একটা সোনালী চুলের বিদেশী পুতুল কোলে নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলাম আবার ফিরবো এই প্রতিজ্ঞা করে!তখন অবশ্য ফুলজোড় নদীতে সেতু হয়নি। স্টিমারে নদী পাড় হতে হতো। ভেপু বাজিয়ে যখন নদীর জল কেটে স্টিমার এগোচ্ছিলো তখনও আমার শৈশবসূলভ অস্বীকৃতি একমুখী সেই যাত্রায়,মা কবে ফিরবো আমরা…পূজার ছুটি আসতে কত দেরী…আমার ইশকুলের বন্ধুরা তো কাল থেকে ক্লাসে আমাকে পাবে না…পূজার ছুটিতে ফিরলে ওরা চিনতে পারবে তো আমাকে…সোনালী চুলের পুতুল বুকে জড়িয়ে রাখা মেয়েটিই জানতোই না,একবার পথে নামলে আমরা আসলে আজীবনের পথিক হয়ে যাই।নতুন শহর। মফস্বলি নিরিবিলি শহর। আমাদের মফস্বলি জীবন, নেহাতই সাদামাটা কিন্তু প্রাঞ্জল। সে জীবনে সবকিছু নতুন। নতুন ঘর। নতুন প্রতিবেশী। নতুন পাড়া। নতুন বিদ্যালয়। নতুন স্কুল ইউনিফর্ম। নতুন জুতো। আর নতুন আমি।সবে শহরের গায়ে জেলা সদরের ভারিক্কি নাম ঝোলানো হলেও আচারে আচরণে সে শহর ছিল একদমই সাদামাটা। রাস্তার মোরে কিংবা গলির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা টিনের আটচালা ঘরগুলো তখনও সাক্ষ্য দিতো আড়ম্বরহীন সময়ের। তবে সেসবের মাঝেও বেশকিছু বনেদি বাড়ি এখানেসেখানে ছড়িয়ে থেকে নিভৃতে বয়ান করতো শহরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের কথা। মন খারাপের আকাশভাঙা কান্না নিয়ে যখন বাড়ি আর ঠাকুমাকে ছেড়েছিলাম তখনও কিন্তু জানতাম না নদী পাড়ের সেই শহরের সঙ্গেই হয়ে যাবে আমার আজীবনের বোঝাপড়া! নদীর পাশেই নীচু এক পাড়া, আমলাপাড়া। আমাদের অস্থায়ী ঠিকানার প্রারম্ভ। তখনও যমুনা নদীতে শহর রক্ষা বাঁধ পড়েনি। তাই বাঁধনহারা নদী ইচ্ছে হলেই চলে আসতো বাসার উঠোনে। এজন্য নদী আর জলেই আমার শৈশবের কাগজনৌকা ভেসে বেড়াতে শুরু করলো ইছেমতন যখন তখন। তবে সেসব বাঁধাহীন দুরন্তপনা শেষে আমাকে যথারীতি ফিরতেও হতো বাঁধাধরা জীবনে। দাদুর কাছে হাতেখড়ি আর পন্ডিত স্যারের কাছে শ্লেট চকে স্বরবর্ণ জীবন এরপর আক্ষরিক স্কুলজীবন উদয়ন কিন্ডারগার্টেন হুট করে ফুরিয়ে গেলেও পুস্তকাদি জীবন তো আর উপেক্ষা করা যায় না।তাই ভর্তি করা হলো আমাকে বাসার সবচেয়ে নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে। গন্তব্য গৌরি আরবান প্রাথমিক বিদ্যালয়। একটা চারকোনা নতুন টিনের বাক্স। তার ভেতরে নতুন বই, নতুন রুলটানা খাতা আর নতুন কাঠ পেন্সিল। আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। নিরিবিলি আর নেহাতই আটপৌরে মফস্বলি সে শহরের এক শান্ত ভোরে শুরু হলো আমার পাঠশালা দিন। বাবা ওপার বাজার থেকে কিনে এনে দিয়েছিলো একটা চারকোনা টিনের বাক্স। শুরু হলো বালিকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। মধ্য জানুয়ারী, বাংলায় মাঘ। নদী জল থেকে উঠে আসা কুয়াশায় ঢেকে থাকা মফস্বলি শহরের আলস্য ভেঙে যে দু'একজন রাস্তায় থাকে তারা হয় ফুলের সাজি ভরে সাদা টগরে নয়তো চায়ের টঙ দোকানের উনুনে আগুন দিতো ঘষিতে। বাবার ঠিক করে দেওয়া রিকশা। রহিম চাচা। প্যাডেলে পা। রিকশার টুংটাং বেল। কুয়াশা কেটে আমার প্রথম বিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া।আকাশী রঙের স্কুল ইউনিফর্ম। সাদা কেডস। সাদা স্কার্ফ। চুলে দুই ঝুঁটি। আমার বইয়ের প্রথম ভাগ। এসেম্বলিতে মুষ্টিবদ্ধ হাত সামনে ছড়িয়ে,আমি শপথ করিতেছি যে, দেশের প্রতি অনুগত থাকিবো...জাতীয় পতাকায় স্যালুট, জাতীয় সংগীতে গলা মেলানো। শেষ হলেই বেজে উঠতো দফতরির ঘন্টা। একবার। প্রথম পিরিয়ড। প্রথম শ্রেণির স্কুলবেঞ্চ। রূপা, রনি, রাজিব, সবুজ সবাই এক বেঞ্চে। অশোকা দি'র গম্ভীর মুখ। সবুজ রঙের হাজিরা খাতা। রোল কল। দাঁড়িয়ে উচ্চকন্ঠে 'উপস্থিত আপা'।কালিবাড়ি মন্দিরের গা ঘেঁষা ইটের ওয়ালগাঁথায় ঢেউটিনের দোচালা। ক্লাসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছোট্ট চোখে প্রথমদিনই দেখে নিয়েছিলাম গোল্লাছুট খেলার অবারিত মাঠ আর টলটলে এক টুকরো পুকুরকে। হাতে ধরা আমার বই, প্রাথমিক গণিত আর সামনে শিক্ষকের টেবিলে ঊষা মাসি, মঞ্জু দি, অশোকা দি, আলপনা আপা। হাজিরা খাতায় ভর্তি রোল ২৭।ব্ল্যাকবোর্ড ডাস্টার চক। আমার বইয়ের প্রথম পাতা। আতা গাছে তোতা পাখি। রুলটানা খাতার প্রথম পাতা ভরে নিজের নামের বানান শেখা। আমার উত্তরণ। আমার বড় হওয়ার ভান করা। স্কুলের মাঠ। দাঁড়িয়াবান্ধা। ছুঁয়ে দিয়ে ভোঁ দৌঁড়। কালিবাড়ির গৌরমন্দিরে বাল্যভোগ। আর হলুদ কল্কি ফুলের ডালে একটা দুটো কাঠঠোকরা,ঠক...ঠক...ঠক...দফতরির একটানা ঘন্টা। ছুটি। মাটি জড়ানো পা কেডসে ঢোকানো। স্কুল গেটে হজমির পুরিয়া। লাল সবুজ কাঠি বরফ। আর চার আনায় পাওয়া নারকেল ছড়ানো সাদা বরফ।এরপর প্রতিদিনের একই নির্ঘন্ট…প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বরফপানি দিন। এলান্টিং বেলান্টিং দিন। ওপেন্টি বায়োস্কোপের বিবিয়ানার এঁটে বাঁধা চুলে মুক্তো জড়াতে জড়াতে আমি এগোতে থাকি সাহেববাবুর বৈঠকখানার দিকে। চলবে...
    নজরুল ও তাঁর শ্যামা মা - অনুরাধা কুন্ডা | অলংকরণ: রমিত লীলা মজুমদারের অহি দিদির গল্পে আছে যখনই রান্না করতে বসতেন ন দশটা কচি কচি ছেলে মেয়ে তাকে এসে ঘিরে ধরে বসত। অহি দিদি নানা রকম খাবার করে তাদের খাওয়াতেন কিন্তু তারা কেউ কথা বলত না। গল্পের শেষে গিয়ে জানা গেল যে এই বাচ্চারা এখনকার বাচ্চা নয়। তারা ১০০ বছর আগের বাচ্চা যাদের এক দুষ্টু লোক জিভ কেটে দিয়েছিল খাওয়ার সময় তারা ভারী গন্ডগোল করতে বলে। লীলা মজুমদারের গল্প অথচ এই ভারী নিষ্ঠুর কাহিনীটি গল্পের মূল জায়গাতে রয়েছে। কেন জিভ কেটে দিয়েছিল তারা দুষ্টু বাচ্চা বলে না অন্য জাতের বাচ্চা বলে? লিলু পিসি সেসব কথা বলে যাননি কিন্তু আমরা এখন যে সময় বাস করি সেই সময় বসে এটা মনে হতেই পারে যে বাচ্চাগুলো বোধহয় অন্য জাতের ছিল। তাই তাদের কল কল করা জিভ, কেটে দিয়ে তাদের কচি মুখের সব কথা বন্ধ করে দিতে দুষ্টু লোকদের কোন অসুবিধা হয়নি। যে সময় আমরা বাস করি সেই সময় দলিত হবার অপরাধে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা, উঁচু জাত আর নিচু জাতের কলহ জনিত সংঘাতে জেরবার সমাজ বড় দূষিত হয়ে আছে। আর তাই এই সময় দাঁড়িয়ে, "জাতের নামে বজ্জাতি সব" বলে ওঠা, সমস্বরে বলে ওঠা, চিৎকার করে বলে ওঠা দরকার। সেই চিৎকার, সেই দ্রোহ সেই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম যিনি লেটোর দলে নাম লিখিয়ে নাটক লিখেছিলেন, লিখতে শিখেছিলেন গান, যার ধর্ম ছিল প্রকৃত অর্থেই মানবিকতা। ইদানিংকালে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভিডিও গুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে ঘরে ঘরে ঢুকে কিছু মানুষ প্রশ্ন করছেন আপনার বাড়িতে তুলসী গাছ আছে? তাতে জল দেওয়া হয়নি নিয়মিত? আপনার বাড়িতে ঠাকুর ঘর আছে? আপনি পুজো করেন? তারা মানুষের ঘরের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছেন ঠাকুরঘর দেখবার জন্য এবং রীতিমতো শাসন করছেন যে দেবতার পূজা ভালোভাবে বাড়িতে হচ্ছে না। ২০২৬ সালে বসে আমাদের দেখতে হচ্ছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা বলছেন যে সনাতনপন্থী হয়ে তারা কোনরকম অনাচার সহ্য করবেন না এবং হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের বিবাহ তারা লাভ জিহাদ বলে ঘোষণা করছেন। যে দেশে কাজী নজরুল ইসলাম শ্যামা সংগীত লিখেছেন, লিখেছেন কৃষ্ণ ভজন আর লিখেছেন "বলো বীর বলো উন্নত মম শির", সেই দেশের বীর পুঙ্গবরা গৃহস্থ বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাত রক্ষার জন্য শাসানি-ধমকানি দিচ্ছেন। মৌলবাদ যখন সভ্যতাকে গিলে খাওয়ার জন্য অজগরের মতন হাঁ করে রয়েছে, তখন এ কথা মনে করা আবশ্যক কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় ১০০ টি শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন। সেই সমস্ত শ্যামা সংগীত নিয়ে "রাঙা জবা" নামে একটি আলাদা গানের গ্রন্থ রয়েছে। অধুনা উগ্র মৌলবাদের পাল্লায় পড়লে তাঁকে হয়তো প্রবল হেনস্থা হতে হত জাতে মুসলমান হয়ে শ্যামা সংগীত লিখে ফেলার জন্য। নজরুলের শ্যামা সঙ্গীতে আশ্চর্য ভক্তিভাব। কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন, কথায় আর সুরে বাঙালির মন প্রাণ শীতল করেছে। কোন বাঙালি না "শ্যামা নামের লাগল আগুন "শুনে আপ্লুত হয়েছেন! অসাম্প্রদায়িকতার অপর নাম কাজী নজরুল ইসলাম। পুত্র বুলবুলের মৃত্যুতে তিনি শোকাহত। কি করে শান্ত করবেন নিজেকে দিশা পাচ্ছেন না। আবেগ উথলে ওঠে, নজরুল দিশাহারা হন বারবার আর সেই শোক পারাবার পার হওয়ার জন্য আকুল হয়ে ওঠেন। সান্নিধ্যে এলেন বরদাচরণ মজুমদারের। যোগী বরদাচরণ মজুমদার নজরুলকে শাক্ত সাধনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পুত্র শোকে ক্লান্ত নজরুলের মন কোথাও যেন একটি অবলম্বন খুঁজে পেল। ভয়ংকরী নয়, ধ্বংসকারিনী নয়, কাল রুপিনী নয়। কালিকা মূর্তির মধ্যে নজরুল খুঁজে পেলেন মাতৃমূর্তি। ঠিক যেমন রামপ্রসাদের গান। যেমন কমলাকান্তের শ্যামা সংগীত। দেবী সেখানে দেবী নন। তিনি জননী রুপা। মানুষ যখন মনের মধ্যে হাহাকার করে, তখন অবলম্বন হিসেবে সে বোধহয় মাকে খুঁজে বেড়ায়। বাঙালি হৃদয়ে মাতৃমুর্তির স্থান বড় অপরূপ। সে কখনো মা, কখনো মেয়ে। মা ডাকের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কন্যা। কন্যাকে মা বলে ডেকে শান্ত হয় মন। বাঙালির এই চিরকালীন আকুতি কে যে নজরুল রাগ প্রধানের সুরে বেঁধে ফেললেন, তাকে হিন্দু বা মুসলমান বলে আখ্যা দিয়ে, তার মেধা মনন আর হৃদয়ের বিশালত্বের পরিমাপ করবে কে?বুলবুল অকালে মৃত। কবি লিখেছেন "শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয়।" কিন্তু তার শূন্যতা তাতে পূর্ণ হয়নি। পুত্র শোকে আকুল পিতৃ হৃদয় শান্ত হয়েছে শাক্তসাধনার খোঁজ পেয়ে। একইসঙ্গে ইসলামী গান লেখা এবং শাক্ত সাধনার গান লেখা, এ বড় কঠিন কাজ। দুর্লভ প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম এই অসম্ভব কঠিন কাজ সম্ভব করেছিলেন দরদিয়া মননে। ইসলামী গান যখন লিখেছেন তখন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে" গানে যে আকুতি, সেই একই আকুতি ফুটে উঠেছে যখন এসে শ্যামা সঙ্গীতে লিখেছেন "স্থির হয়ে তুই বোস দেখি মা"। হিন্দু না "ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন, কান্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা'র"। এই অসম্ভব সাহসী উক্তি যাঁর কাব্য ভাষা, তিনি যে একাধারে ইসলামিক গান এবং হিন্দু ভক্তি গীতি রচনা করে সুর পিপাসু বাঙালির মন মাতিয়ে দেবেন তাতে সন্দেহ কিসের! কিন্তু শুধু মন মাতলে তো হবে না।মন শান্ত হবে কীসে। একদিকে স্ত্রী প্রমীলার অসুস্থতা, অন্যদিকে পুত্রশোক। কবি স্থিতধী হতে চাইছেন।তাই কী দেবী কালিকাকে মাতৃরূপে দেখেছেন? আর ঐ ব্যক্তিগত শোক উপশমের জায়গা থেকে উপনীত হয়েছেন মহাকালের কোলে মহাকালীর বন্দনায়? শোকে,প্রবল সন্তাপে মানুষ মাতৃক্রোড় খোঁজে।একমাত্র মা পারেন শোকের ক্ষতে স্নেহের মলমটি লাগাতে। নজরুল তাই কালীর শক্তিময়ী রূপ আর স্নেহময়ী মাতৃরূপকে আরাধনা করেছেন অনির্বচনীয় আকুতিতে...শ্যামা নামের লাগল আগুন আমার দেহ ধূপকাঠিতে,যতো জ্বালাই সুবাস ততো,ছড়িয়ে পড়ে চারিভিতে..। ব্যক্তিজীবনের শোকে যে দেহ, মন পুড়ছে,তাকে তিনি সমর্পণ করেছেন মায়ের পায়ে। আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হচ্ছে দেহ মন...ভক্তি আমার ধূমের মতো,উর্দ্ধে উঠে অবিরত..এই আকুতি তো একেবারে ঘরোয়া গৃহস্থ আজন্ম স্নেহের কাঙাল বাঙালি হৃদয়ের আর্তি। রবি ঠাকুর বলেছেন..আমার এ ধূপ না জ্বালালে,গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে।তাঁর নিঠুরকে সাধারণ মানুষ ততোটা বোঝে না,যতোটা বোঝে নজরুলের কালিকাকে। অ্যাবস্ট্র্যাক্ট নয়। কনক্রিট। মানুষ মূর্তি বোঝে। রবীন্দ্রনাথের নিঠুর তাই অনেকটা দূরের। মা বড় কাছের। তাঁর আরাধনায় অন্তরলোক স্নিগ্ধ, শান্ত হয়, আর পুত্রশোকাহত পিতা অপেক্ষা করেন, কবে তাঁর দেহ ভস্ম হবে..সেই ভস্মে আঁকা হবে মায়ের কপালের তিলক। নিজেকে নিবেদন করার এই আকুলতা, এমন ভক্তি, নিজেকে নিঃশেষ করা নিবেদন, এমন শ্যামা সংগীত কজন লিখতে পেরেছেন? ২০২৬ সালে এসেও আমরা হিন্দু মুসলমানের উর্ধ্বে উঠতে পারলাম না। এখনো আমাদের আলোচ্য বিষয় ওরা হিন্দু না, ওরা মুসলমান? তবে নজরুল কেমন করে লিখলেন এমন গান? কোন অপার সাধনায়, গভীর মেধায় এবং অনন্য ভক্তিতে লিখলেন "মহাকালের কোলে বসে গৌরী হল মহাকালী।"বিশেষ করে এই গানটিতে কালীর যে রূপ নজরুল বর্ণনা করেছেন সেটি আমাদের বিস্মিত করে। দেবী কালিকাকে মূর্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে এই সৌরজগতের এক প্রকাণ্ড অংশ হিসেবে ভাবা, কল্পনার কি বিস্ময়কর প্রকাশ। "তবু মায়ের রূপ কি হারায়, সে যে ছড়িয়ে আছে চন্দ্র তারায় মায়ের রূপের আরতি হয় নিত্য সূর্য প্রদীপ জ্বালি"।এই শ্যামা সংগীতটিতে কিন্তু নজরুল কংক্রিট থেকে একেবারে অ্যাবস্ট্রাক্ট এর দিকে চলে গেছেন এবং সেটিও চূড়ান্ত অ্যাবস্ট্র্যাক্ট। অপরিসীম ক্ষমতা বলে একজন কবি এই কল্পনা করতে পারেন। মহাকালীর যে কৃষ্ণবর্ণ রূপ সেটি তিনি প্রত্যক্ষ করছেন রাত্রির গভীর কালো আকাশের মধ্যে। চন্দ্র তারার গহনা পরা মাতৃ মূর্তি। মহাকাল এবং মহাকালী, উভয়কে এই সৌরজগতের অংশ হিসেবে কল্পনা করে, কালের এবং কালীর সম্পর্কের এক অপূর্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন কবি নজরুল ইসলাম। আবে সেই একই সঙ্গে বজায় রেখেছেন কালির ঘরোয়া অন্য একটি রূপ। "উমা হলো ভৈরবী হয় ভৈরবেরে বরণ করে" হেরি শিবের সিরে জাহন্নবীরে শ্মশানে মশানে ঘোরে।" দুর্গা হোমা এবং কালি যে একই মহাশক্তির বিভিন্ন রূপ তা এই ছোট্ট গানটির মধ্যে দিয়ে অপূর্ব ভাবে প্রকাশিত। অন্ন দিয়ে ত্রি জগতে অন্অনদা মোর বেড়ায় কেঁদে ভিক্ষু শিবের অনুরাগে ভিক্ষা মাগে রাজ দুলারি। একটি গানের মধ্যে মহাশক্তির এমন বিবিধ প্রকাশ আর কোন ভক্তিগীতিতে আছে? মুহূর্তে কালিকা হয়ে গেলেন ঘরের মেয়ে উমা, শিবের প্রেমে মাতোয়ারা উমা তিন ভুবনে অন্ন জুগিয়ে বেড়ান আর তার নিজের সংসারে কিনা অন্নেরর অভাব! অভাবে বাংলার দরিদ্র মানুষ নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ মধ্যবিত্ত মানুষ এই অন্নাভাব বড় ভালো বোঝে। তাই যে দেবী কালিকাকে তারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে প্রত্যক্ষ করতে পারেনা, তাকে দেখে ফেলে ওই ছোট্ট উমার মধ্যে। শিবের ঘরনী হয়ে তার যে গৃহিনীপণা, নজরুলের গানে তার বিশ্বস্ত প্রকাশ। তাই মায়ের কাছে নালিশ জানাচ্ছেন সন্তান। "আমার যারা দেয় মা ব্যথা আমায় জারা আঘাত করে তোরই ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী"। কোথায় যেন কানে বাজে "সকলি তোমারি ইচ্ছা"। কিন্তু নজরুল নিজস্বভাবে স্পষ্ট। "আমার যারা ভালোবাসে বন্ধু বলে বক্ষে ধরে তোরই ইচ্ছা ইচ্ছাময়ী আমায় অপমান করে যে মাগো তোরই ইচ্ছা সে যে।" জীবনের বিভিন্ন ওঠা পড়া কি নজরুলকে এইভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল?" আমায় যারা যায় মা ত্যেজে যারা আমার আসে ঘরে তোর ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী।" ভক্তি ভাবে পরিপূর্ণ, স্ফটিকের মত টলটলে স্বচ্ছ নিবেদন। ব্যথিত শোকাতুর সন্তান যেন নালিশ করছে মা-কে। একমাত্র মা-ই পারেন তার আহত, অপমানিত হৃদয়টিকে শান্ত করতে। একমাত্র বাঙালি ঘরেই দেবীকে মা এবং মেয়ে, এই দুইভাবে আরাধনা করা হয়। নজরুল তাই লিখতে পারেন "আমার ক্ষতি করতে পারে অন্য লোকের সাধ্য কিনা, দুঃখ যা পাই তোরই সে দান মাগো সবই তোর মহিমা।" এ গান যেন স্বগতোক্তি। সমস্ত দুঃখের স্থলনে এই গানের মধ্যে দিয়ে। সুরে, ভাবে, মননে, কোথাও এতোটুকু ঘাটতি নেই "তাই পায়ে কেহ দলে যবে, হেসে সয়ে যাই নীরবে।" সমর্পণের এই দর্শন সাধনার মূল কথা। তাই এই অপূর্ব ভাব সাধনার আরেক প্রকাশ আমরা দেখি "বলরে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণ তল" গানে।কবি বলছেন, "মায়াতরুর বাঁধন টুটে মায়ের পায়ে পড়লি লুটে, মুক্তি পেলি উঠলি ফুটে আনন্দ বিহ্বল, তোর সাধনা আমায় শেখা জীবন হোক সফল।"এ যেন ইংরেজ কবি জন কিটসের negative capability আহরণ করার সাধনা।"কবে তোরই মতো রাঙবে রে মোর মলিন চিত্ত দল"সম্পূর্ণ নিজের সত্তা বিসর্জন দিয়ে, ফুলের মতো নির্বিকারত্ব প্রাপ্তি। মাতৃ সাধনার মূল মন্ত্র। এই ভক্তির কোন জাত নেই। যে ভক্তি নিয়ে তিনি দেবী কালিকাকে মহাবিশ্বের মহাকালী রূপে দেখেন সেই একই ভক্তি নিয়ে তিনি লেখেন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে, মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে যেন উষার কোলে রাঙা রবি দোলে।"এই ভক্তি ভাবে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোন হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব নেই এবং জাত পাতের কোন প্রশ্নই নেই কারণ সন্তান আর মায়ের সম্পর্কের মধ্যে জাত আসেনা। এই সেই কাজী নজরুল যিনি লিখেছেন "বল বীর বল উন্নত মম শির", লিখেছেন "আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন।" লিখেছেন "আমি টর্পেডো আমি ভীম ভাসমান মাইন।" সেই তিনি আবার পরম ভক্তি ভরে মায়ের সঙ্গে সন্তান সম্পর্ক স্থাপন করে জানিয়েছেন তাঁর সমস্ত সুখ,তাঁর বেদনা তাঁর অভিমান তার অপমান। গানের মধ্যে দেবীর সঙ্গে পূজারীর, মায়ের সঙ্গে সন্তানের যে বিভিন্ন রকম সম্পর্ক উঠে আসে তা কিন্তু বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য। কখনো মা, কখনো রাঙা জবার বায়না ধরে কাঁদা কালো মেয়ে...আবার সেই তারার মালা চুলে গাঁথা এলোকেশী কন্যা। মুহূর্তে রূপান্তর। ঘরোয়া ক্রন্দনরত মেয়েটি নিমেষে সৌরজগতের মহাশক্তির প্রকাশ হয়ে ওঠে...তার যুগল আঁখি সূর্য চাঁদ। অনুরাগের রাঙা জবা থাকুক তাঁর মনের বনে,কালো মেয়ের রাগ ভাঙাতে তিনি ফুলের খোঁজে ঘোরেন...রাঙা চরণ দেখতে পেয়ে তাঁর শান্তি। পুত্রশোক কী এইভাবে কিছুটা শান্ত হয়েছিল তাঁর?" আমার আর কোনো গুণ নেই মা তারা"। স্বীকারোক্তি অকপট। "হাত বাড়িয়ে মা তোর কোলে যাব না আর মা মা বলে...মা হয়ে তুই ঘুরে বেড়াস,আমায় ধূলায় ফেলে রেখে..তোর আর ছেলেমেয়ে অনেক আছে..আমার শুধু নাই যে কেহ।" মা বেটার সম্পর্কে অভিমান আর আদর মিশিয়ে দেন কবি। এই সম্পর্কের কোনো দেশ নেই, জাতি নেই, ধর্ম নেই, আবার বাঙালিয়ানায় মোড়া একটি মিষ্টত্ব আছে, দেবী থেকে সে মুহূর্তে হয়ে ওঠে তাঁর 'হাবা মেয়ে'।"কোনো অঙ্ক শেখাও নি তো, তোমার অঙ্ক বিনা তারা।" ভাগের অঙ্ক শেখেননি নজরুল। তাই তাঁর ভক্তি এতো শুদ্ধ। সুর এতো প্রাণবন্ত। জগতজুড়ানি শ্যামার কাছে এক মাতৃহারা,সন্তানহারা প্রাণ। মা ছেলেকে মারে ধরে, কিন্তু কাছছাড়া করে না। চিরমাতৃহারা সন্তান আশ্রয় খুঁজছে ছোট শিশুর সারল্য নিয়ে। শব্দ চয়নে কী বিস্তার। "জুড়ানো" শব্দটি একান্ত বাঙালি। তার থেকে ' জুড়ানি', একেবারে ' জগতজুড়ানি'। তাকে বিদেশী ভাষায় ব্যক্ত করা মুশকিল। নজরুলের আবেগ বড় শক্তিশালী, শবের মাঝে শিবজাগানো শ্মশানকালীতে তাঁর কাছে আনন্দের নন্দিনী। কল্পনার বিস্তারে বিস্মিত হতে হয়। মা'কে পাষাণী বলেছেন, মা যে লুকিয়ে বেড়ান লোকে লোকে। আর মা কে না পেয়ে তাঁর ব্যথা ভরা হৃদয় জবা হয়ে ফোটে। আবার সেই নেগেটিভ কেপেবিলিটি। সেই নিবেদন আর ভক্তি। লেটোর দলে গানবাঁধা নজরুল, বিপ্লবী, বিদ্রোহী, অশান্ত, আবেগমথিত নজরুলের এক অনন্যরূপ খুঁজে পাই তাঁর শ্যামাসংগীতের কথায়, ভাবে, সুরে। তিনি কতোবড় ভক্ত ছিলেন,তা প্রমাণ করার জন্যে নয়,শাক্তসাধনায় কত গভীর ছিল তাঁর জ্ঞান তাও প্রমাণ করার জন্যে নয়...জাত পাতের তফাৎ জলাঞ্জলি দিয়ে তাঁর যে অনাবিল মনখানি ছিল, সেই মনের স্পর্শ পাওয়ার জন্যে। এই তীব্র হানাহানির সঙ্কটকালে, সাম্প্রদায়িকতার বীভৎস আস্ফালনে,পেশীশক্তির আগ্রাসনের সময়ে, একবার অন্তত মনে করা, কাজি নজরুল ইসলাম গান বেঁধেছিলেন, শ্যামা মায়ের গান। তাঁর ইসলামের সঙ্গে ভক্তিগানের কোনো বিরোধ ছিল না, কোথাও রসবিচ্যুতি ঘটেনি, সুরধারায় এক ভক্তিবিপ্লব ঘটে গেছে।নজরুলের সেই প্রবল শক্তিশালী অথচ শিশুর মতো সরল মনটি আজ ভারতবর্ষে বড় দরকার। যে দেশে লাভ জিহাদের নামে মানব হত্যা হয়, দলিত জল খেতে গেলে তাকে পিটিয়ে মারা হয়, দলিত মানুষ জন্মদিনের কেক কাটলে তাকে তথাকথিত উঁচু জাতের লোক হত্যা করে আর লীলা মজুমদারের মতো লেখককে জিভ কাটা ছেলেমেয়েদের গল্প লিখতে হয়, সেই দেশে নজরুল জন্মেছিলেন, যে ভক্তিভাবে ইসলামিক সঙ্গীত লিখেছিলেন, সেই একই ভক্তিভাবে শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন…যে গান আজও মানুষকে জাতপাতের উর্ধে তুলে এক মহাজাগতিক বিশ্বাস আর শরণের সন্ধান দেয়। গান গাওয়া হয়, অনুধাবন হয় কী?
    গুরুচণ্ডা৯-র গল্পপাঠ - গুরুচণ্ডা৯ | ছবি: রমিত‘পিরোবতির নাকছাবি’ গল্পটি শক্তি দত্ত রায়ের ‘পিরোবতি ও মুড়ির টিন’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। ‘হাজবপুরের কেচ্ছা' লেখকের 'অতিনাটকীয়’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। আজকের গল্প এস এস অরুন্ধতীর লেখা 'পাপ হে '। গল্পটি লেখকের 'চাঁপা ফুলের গন্ধে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। সুনাগরিক রঞ্জন দত্তর মৃত্যুর দিন - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পটি লেখকের 'ছয়ে রিপু’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।আজকের গল্প জয়ন্তী অধিকারীর 'না হাঁচিলে যারে'। গল্পটি লেখিকার 'কুমুদির রোমহর্ষক গল্পসমূহ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।অমর মিত্রের লেখা 'কাশী মথুরা বৃন্দাবন '। গল্পটি 'আমার ভয় করছে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।প্রতিভা সরকারের লেখা 'তালাও গ্রামের রূপকথা'। গল্পটি 'হে চিরসারথী’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।দময়ন্তীর লেখা 'দুষ্কালের পদধ্বনি'। গল্পটি 'দুষ্কালের আখ্যানমালা’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।উপল মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'তিলবাড়ি'। গল্পটি 'ম্যাকলাস্কিগঞ্জ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।মহারাজ মিত্রবর্মণের রাজ্যবিজয়, ঘেঁটুফুল ও ব্রহ্মকমলের গল্প, লিখেছেন রমিত চট্টোপাধ্যায়, পাঠ করেছেন অমিতাভ চক্রবর্তী।শক্তি দত্তরায়ের লেখা '৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড' বই থেকে নেওয়া ক্ষীরের পুতুল। গল্পপাঠে কেকে।স্মৃতি ভদ্রর লেখা 'রসুই ঘরের রোয়াক (দ্বিতীয় খণ্ড)' বই থেকে গল্পপাঠে পায়েল চ্যাটার্জী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস 'সীমানা' বই থেকে নেওয়া একটি পর্ব, নাম - দেশের কাজ। ২৫শে বৈশাখ পার হয়ে ১১ই জ্যৈষ্ঠ্যর এই বিশেষ সময়কালে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য, এই পর্বে ধরা হয়েছে সেই সময়ের দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের দেখা হওয়ার গল্প।গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।অ্যাবনর্ম্যাল - লিখেছেন কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পপাঠ - সোহিনী সেনগুপ্ত।ফোটোগ্রাফ - ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক, গ্রাফিক শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।কেকে-র 'ছায়ার পাখি' বই থেকে নেওয়া গল্প - জিহ্ব; পাঠ - পায়েল। চিত্রশিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শারদা মণ্ডলের 'পাকশালার গুরুচণ্ডালি' বই থেকে, পাঠ - পায়েল। চিত্রশিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাসজ্যোতিষ্ক দত্তর লেখা ‘সে ছিল একদিন আমাদের' বই থেকে 'ইস্কুলের গল্প'। পাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।মৃণাল শতপথীর লেখা ‘দিতি ও মহারানি' বই থেকে নেওয়া গল্প - পাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।
  • হরিদাস পালেরা...
    বিজেপির শিরে সংক্রান্তি - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | অনেককেই হাহুতাশ করতে দেখছি, যে, আগে বাঙালি চিন্তার জগতে সবার আগে থাকত, আর এখন আন্দোলন হচ্ছে দেশের সর্বত্র, এমনকি বিদেশেও, বাঙালি ভদ্রলোকের একটা বড় অংশই এই সরকারের পক্ষে এখনও ঝাঁপিয়ে পড়ছে। কথাটা খানিকটা ঠিক, কিন্তু পুরোটা নয়। সত্যিই, বাঙালি সেলিব্রিটিরা যে প্রতিবাদের ঝান্ডা নিয়ে কদিন আগে পর্যন্ত নেমে পড়তেন, তাঁদের অধিকাংশকেই আর দেখা যাচ্ছেনা। বোঝা যাচ্ছে অনেকেই বিজেপির ফোলানো বেলুন ছিলেন। বাংলার মিডিয়া দেখলে কদিন আগে পর্যন্ত বোঝার উপায় ছিলনা, বাংলায়ও কেউ নিট দেয় বা কেন্দ্রীয় বোর্ডে পড়ে। এখন চাপে পড়ে খানিক দেখাচ্ছে, কিন্তু ওরা যে বিকিয়ে গেছে, সে নিয়েও কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তার পরেও, লিবারাল বাঙালি ভদ্রলোকের মূল সুরটা এখন খানিকটা প্রতিবাদের পক্ষে। ছাত্রদের তো বটেই। যাদবপুরে হঠাৎ করে একটা বিরাট মিছিল হয়েছে। নানা কলেজে প্রতীকী অবস্থান হয়েছে। অন্য রাজ্যের চেয়ে কম, কিন্তু হয়েছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, সমস্যাটা অন্যত্র। এই মূল ইস্যুগুলো কিন্তু বাঙালিই অনেক আগে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করেছে। নিট বাতিলের দাবী প্রথম ওঠে তামিলনাড়ু এবং বাংলায়। তুলেছিল বাঙালি জাতীয় সংগঠনগুলো। যদিও দাবীটা আরও বড় হবার কথা। স্বাধীনতার জন্মলগ্ন থেকে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার স্বার্থে শিক্ষাকে রাজ্য তালিকায় রাখা হয়েছিল। কেন্দ্রীয় বোর্ড ব্যাপারটাকেই বাতিল করে সেই জায়গায় আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়াই উচিত। সেই দাবীও তোলা হয়েছে। এই আমিই লিখেছি। তাই সমস্যা আওয়াজ তোলার না। সমস্যা হল, এই আওয়াজের কোনোটাতেই বৌদ্ধিক লোকজন কেউ কান দেননি। যখন দিল্লিতে আওয়াজ উঠবে, তবে তাঁরা তার পিছনে দৌড়বেন, এইটাই হল সমস্যা। এরকম আরও আওয়াজ তোলা হয়েছে। বাঙালিই তুলেছে। বিজেপির সম্ভাব্য পশ্চিমবঙ্গ জয় যে ভারতবর্ষজুড়ে একট বিরাট বিপর্যয়ের সূচনা, বাংলায় বহুবার বলা হয়েছে। এসআইআর স্রেফ এসআইআর না, একটা বড় পরিকল্পনার অংশ, ভোট ক্রমশ প্রহসনে পরিণত হচ্ছে, অবিজেপি শক্তিদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত, এও বহুবার বলা হয়েছে। বাঙালি বৌদ্ধিক লোকজন শুধু কান দেননি তাইই না, একদল বলেছেন এই বাঙালি-ঠ্যাঙানো বা এসআইআর আসলে সেটিং। আর আরেকদল আন্দোলনটাকে দানাই বাঁধতে দেননি, পাছে অন্য কেউ ফায়দা লুটে নেয় বলে। অথচ দিল্লি থেকে রবীশ কুমার বা ধ্রুব রাঠি বললে, সেটা এঁরাই সোনা মুখ করে শুনেছেন, দল বেঁধে চটিচাটা বলে আসেননি। খুব সম্ভবত সাহস পাননি বলে। এখানেও সমস্যাটা আওয়াজ তোলার নয়। বৌদ্ধিক বৃত্তে যাঁরা আছেন, তাঁদের অন্ধত্বের। এবং এখনও যেটা বাকি বাকি আছে, সেটা হল বাঙালি জাতির সম্পূর্ণ বিপর্যয়। বেঙ্গল ফাইলস জাতীয় সিনেমা এমনি তৈরি হয়নি। বাঙালি ঠ্যাঙানো এমনি হয়নি। বাংলাকে জেহাদিদের আখড়া হিসেবে চিহ্নিত করে চলা এমনি হয়নি। অনুপ্রবেশ নামক একটি তিলকে বিরাট ফাঁপিয়ে কল্লোলিনী তিলোত্তমা এমনি বানানো হয়নি। এই ছকটাকে অবিলম্বে চিহ্নিত করা উচিত। বাংলা এবং পাঞ্জাব দেশভাগের দুই দগদগে ক্ষত। এর মধ্যে দেশভাগ বাংলার বিপর্যয় ঘটিয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গের সম্পূর্ণ অধোগতির জন্যই ওই দেশভাগ দায়ী। একদিনে হয়নি, বছর তিরিশ ধরে হয়েছে। সেটাকে ঢাকতে অনুপ্রবেশ নামক একটা ন্যারেটিভ তৈরি। সেটাকে কাজে লাগিয়েই ৩৫ লক্ষ লোক এখনও ট্রাইবুনালে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই তথাকথিত অনুপ্রবেশ নামক ন্যারেটিভটাকে সম্পূর্ণ প্রতিহত না করলে, এবং এদের এই গতিতে এগোতে দিলে, বাঙালির বিপর্যয় আসন্ন। সমস্যা হল, এইগুলো দিল্লির কেউ বলবেন না। ফলে বৌদ্ধিক বাঙালি কানও দেবেন না। বলিউড এবং গোদি মিডিয়ার নেশা তাঁদের মগজে ঘুণ ধরিয়ে দিয়েছে, সমস্যা এটাই। এই আন্দোলনের ধাক্কায় অন্ধত্ব কাটুক, এইটুকুই কামনা করি। আওয়াজ তোলা, বা সূত্রগুলো দেখিয়ে দেওয়াটা সমস্যা না। দিল্লিতে বাচ্চা ছেলেমেয়েরা এইটুকু অন্তত দেখিয়ে দিয়েছে, যে, তারা গড্ডলিকার উল্টোদিকে রুখে দাঁড়াতে পারে। বাংলার ছেলেমেয়েরাও পারে। বাঙালি বৌদ্ধিক বৃত্তের লোক অন্তত চিন্তাটুকু করার চেষ্টা করলেই চলবে। আপাতত।
    সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে? - যদুবাবু | এই লেখাটা সম্পাদনা করার সময় খবর পাচ্ছি, গতকাল ও আজকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বিক্ষোভ হচ্ছে। হ্যাঁ স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ-ই। দিল্লির ছবি আর ভিডিও তো দেখছিই, পুলিশের লাঠিচার্জের ভিডিও, রাস্তায় পড়ে থাকা টিয়ার গ্যাসের শেলের ছবি, আর দেখছি একরত্তি ছেলেমেয়েদের সাহস। কিছুদিন আগেই এক বন্ধুর লেখা প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ পড়লাম গুরুর পাতায়। আর অজস্র ভিডিও দেখছি নিতান্ত সাধারণ মানুষের। বোম্বের ছবি দেখলাম, আরও … জয়পুর, যোধপুর, গোয়ালিয়র, ইন্দোর। আজকে যাদবপুরে দেখলাম বিপুল জমায়েত হয়েছে, এবং তারা কেউ কোনো দলের ঝাণ্ডার আশ্রয়ে আসেননি বলেই অনুমান।এদিকে গতকাল আমার এক বাল্যবন্ধু গেছিল টরণ্টোয়, ছবি তুলে পাঠিয়েছে। আমি কিছুই করিনি ও করি না, তাই যাকে বলে ‘লিভিং ভিকারিয়াসলি’। পড়তে পড়তে, দেখতে দেখতে ভাবছি ও ভেবেছি ইশ যদি একবার কোনো একটা জমায়েতে যেতে পারতাম। কিছুই না, ঐ ভিড়ের মধ্যে দাঁড়াতাম। উদ্দীপিত হতাম। সংক্রামিত হতাম। বৃথা হোক না হোক, আশা করতাম।মিছিল থেকে আমি বহুদূরে তাই আমি যেইটুকু পারি সেইটুকুই করছি। দুই একটা তথ্য-উপাত্ত তুলে রাখছি এক জায়গায়। শিক্ষা, শিক্ষার অধিকার ও অবস্থা সংক্রান্ত।স্কুলশিক্ষা নিয়ে নীতি আয়োগের একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন বেরিয়েছে এই মে ২০২৬-এই। প্রতিবেদনের নাম স্কুল এডুকেশন সিস্টেম ইন ইন্ডিয়া – টেম্পোর‍্যাল অ্যানালিসিস অ্যান্ড পলিসি রোডম্যাপ ফর কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট। রিপোর্টের সময়কাল দশ বছর ’১৪-’১৫ থেকে ’২৪-‘২৫, অর্থাৎ কেন্দ্রে বিজেপির শাসনকাল। বিশাল রিপোর্ট, অজস্র সংখ্যা-সারণী এইসব চট করে পড়ে ফেলা কঠিন কাজ। আমিও এক কিস্তিতে সবটুকু লিখবো না। খুব সামগ্রিক দুই-একটা ছবি।প্রথম ছবিটি এই যে, গত দশ বছরে সরকারি স্কুলের সংখ্যা ১১.০৭ লাখ থেকে কমে হয়েছে ১০.১৩ লাখ, আর এই এক-ই সময়ে সরকারি স্কুলে ভর্তির শতকরা ভাগ কমে ৫৪.৩% থেকে হয়েছে ৪৯.২৫%, অর্থাৎ, আমাদের দেশে এখন অর্ধেকের কম ছাত্রছাত্রী পড়ে সরকারি ইস্কুলে। কমার কারণ হিসেবে রিপোর্টে লেখা, “কনসলিডেশন অ্যাণ্ড র‍্যাশনালাইজেশন”, এবং, প্রাইভেট স্কুলিং-এর “চাহিদা”র বৃদ্ধি! চাহিদার নেপথ্যে কী কারণ সে বিস্তারে বলা নেই, অথবা চাহিদা আর বাধ্যতার ফারাক কোথায় সেটাও এক প্রশ্ন। আমার বন্ধুরা বলেন যে এর জন্য দায়ী সাধারণ মানুষের ‘পারসেপশন’। কিন্তু সেই পারসেপশনের নেপথ্যে কারণ আমরা সাধারণতঃ খুঁজি না।এক-ই সঙ্গে এই রিপোর্টের টেবিল ৪.২-এর ডেটা দেখলে চমকে উঠতে হয়। দেশে প্রায় আট হাজার স্কুলে (৭,৯৯৩) একজনও ছাত্র নেই, অথচ শিক্ষক আছেন, সরকারি অর্থও আসছে। এই এক-ই টেবিলের ডেটায় দেখছি, পশ্চিমবঙ্গে ৬,৪৮২টি স্কুলে হাতেগোনা ঠিক এক জন শিক্ষক, আর সেই সিঙ্গল-টিচার স্কুলে পড়ছে ২.৩৫ লক্ষ শিশু, আর উত্তরপ্রদেশে ৯,৫০৮টি এমন স্কুলে ৬.২৪ লক্ষ। এক গ্রামে ছাত্রহীন শিক্ষক; পাশের গ্রামে শিক্ষকহীন ছাত্র। আরও দুশ্চিন্তাজনক প্যাটার্ন স্কুলভর্তির হারের, যার নাম এনরোলমেন্ট ফানেল, অথবা এনরোলমেন্ট পিরামিড। সেটা কেমন দেখা যাক। ভর্তির হার মাপার যে সূচক এই রিপোর্টে মাপা হয় সেটার নাম গ্রোস এনরোলমেন্ট রেট, জি ই আর। সোজা করে বলতে গেলে, জি-ই-আরের মাপতে হলে, কোনো একটি শিক্ষার স্তরে (ধরা যাক প্রাইমারি), মোট যতজন শিক্ষার্থী সেই সংখ্যাকে ভাগ করা হয়, ঐ স্তরের অফিশিয়াল এজ-গ্রুপের জনসংখ্যা দিয়ে। এই রেট কখনও-সখনও ১০০% টপকেও যেতে পারে, বেশি বয়সে যাঁরা পড়াশুনো করছেন, বা পরিযায়ী জনসংখ্যা ধরলে। আমাদের দেশে প্রাইমারি জি-ই-আর বেশ ভালো ৯০.৯%, আপার প্রাইমারিতেও তাই ৯০.৩। সেখান থেকে ঝপ করে কমে মাধ্যমিকে ৭৮.৭, আর উচ্চমাধ্যমিকে মাত্র ৫৮.৪। অর্থাৎ, আমাদের এডুকেশন সিস্টেমে প্রতি দশজন শিশুর মধ্যে চারজন ক্লাস ইলেভেনে পৌঁছায় না।জি-ই-আরের অবনতি সর্বত্র অবশ্যই সব রাজ্যে সমান নয়, এবং আশ্চর্যের কথা সেইসব রাজ্যে অবনতির হার বেশি যেখানে ডবল ইঞ্জিন সরকার, মানে বেশিরভাগ সময় শাসক দল বা তার শরিকদের হাতে রাজ্যের ভার যেখানে। উদাহরণ হিসেবে, মেয়েদের প্রাইমারি জি-ই-আর মধ্যপ্রদেশে ১০৭ থেকে নেমে ৭৬, উত্তরপ্রদেশে ১১৫ থেকে ৮৪, গুজরাটে ১০০ থেকে ৮২, বিহারে ১১০ থেকে ৭৯; বিহারের সেকেন্ডারি জি-ই-আর ৫৯ থেকে কমে ৫১ (বিহার গোটা দেশে সর্বনিম্ন।) তবে সত্যের খাতিরে দুটো কথা সঙ্গে বলতেই হবে। এক, এই আপাত অবনতির একটা অংশ আসলে মাপজোখের ব্যাপার: ২০২২-২৩ থেকে ইউডাইস+ ছাত্রপিছু আলাদা রেকর্ডে চলে গিয়ে ডুপ্লিকেট নাম ছাঁটতে শুরু করে, ফলে যে সংখ্যাগুলো ফুলেফেঁপে ১০০ পেরিয়ে গিয়েছিল সেগুলো কিছুটা চুপসে আসে। তবুও, অবনতির হার তুলনা করা খুবই ন্যায্য।স্কুলশিক্ষা চালানোর দায় মূলত রাজ্যের ধরে নিলেও এইটুকু সম্ভবত সরকারের সমর্থকরাও মেনে নেবেন, যে, যে দশকে একই দল দিল্লি আর এই রাজ্য-রাজধানীগুলো দুই-ই চালিয়েছে, সেই দশকের শেষে তাদেরই স্কুলশিক্ষার সূচক প্রতিটি ম্যাপের একেবারে তলায়। ডবল ইঞ্জিন, অন্তত এই প্রমাণে, উল্টোদিকে চলেছে।এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য সেকেণ্ডারি (মাধ্যমিক) জি-ই-আর দেখলে, গত দশকে পশ্চিমবঙ্গের উন্নতি হয়েছে ৭৫.৩% থেকে ৯৯.৪%। এর পেছনে সেই দশকের রাজ্য সরকারের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের কোনো ভূমিকা ছিল কী না সেই নিয়ে অর্থনীতিবিদরা হয়ত একদিন কাজ করবেন। তবে, সেকেণ্ডারি জি-ই-আর যেমন ভালো, পশ্চিমবঙ্গের সেকেণ্ডারি ড্রপ-আউট রেট তেমনই খারাপ, ২০%, এবং, ক্লাস টেন থেকে ইলেভেনে যাওয়ার হার ৫৭.৪%। প্রায় সার্বজনীন জি-ই-আর আর বেশ বেশি ড্রপ-আউটের অর্থ, রাজ্য প্রায় সমস্ত ছাত্রছাত্রীদের মাধ্যমিক স্তর অব্দি পৌঁছতে সক্ষম, কিন্তু ১০ থেকে ১১-র রাস্তায় তাদের ~৪০% বাদ পড়ে যায়।  এই “অ্যাট্রিশনের” একটা কারণ অবশ্যই ঐ কাঠামোই। ভারতের অর্ধেক স্কুলে পড়ানো হয় শুধু ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ, আর ক্লাস ওয়ান থেকে টুয়েলভ অব্দি টানা এক-ই স্কুলে যাওয়ার বন্দোবস্ত মাত্র ৫.৪ শতাংশ স্কুলে। উঁচু ক্লাসে ওঠা মানে বারবার স্কুল পাল্টানোর ঝক্কি হলে, অথবা প্রাথমিকের তুলনায় মাধ্যমিক শিক্ষা পাওয়ার স্কুল অনেকটাই কম সংখ্যার হলে, কিছুটা সেইখানে বাদ পড়ে যাওয়ার একটা ঝুঁকি থেকে যায়। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গের ৭৯% স্কুল প্রাইমারি-ওনলি, আসামে ৬৪.৯%, আর গোটা ভারতের গড় ৪৯.৬%।আর, পিরামিডের দিকে খেয়াল করলে বোঝা যায় আপার-প্রাইমারি আর সেকেণ্ডারির মাঝে বেশ বড় একটা ফাঁক। কেন? হয়ত তার একটা উত্তর এই যে রাইট টু এডুকেশন বা শিক্ষার অধিকার আইনের অধিকার ফুরিয়ে যায় ঠিক ঐ চোদ্দ বছর বয়সে, ক্লাস এইটে, মানে, ঠিক সেই সময় টিউশন, বই আর যাতায়াতের খরচ আবার পরিবারের ঘাড়ে এসে পড়ে। আমি সামান্য বুদ্ধিতে এর মানে বুঝি এই যে ঐ পিরামিড আসলেই আর্থিক-সামাজিক ক্ষমতার-ও পিরামিড!ঐ পিরামিডের চুড়ো অব্দি যে ক'জন পৌঁছয়, তাদের জন্য তারপরের ধাপ ঐসব কম্পিটিটিভ পরীক্ষা - নিট, জেইই, ইত্যাদি। সামাজিক-সাংস্কৃতিক পুঁজি নেই যাদের সেইসব পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের আপওয়ার্ড মোবিলিটির অন্যতম একটা দরজা তো এইগুলোই। নাঃ, এইসব পরীক্ষার মধ্যেও কি একটুও বায়াস নেই? কোচিংয়ের খরচ, শহুরে ইস্কুল, পারিবারিক শিক্ষা বা অন্য রিসোর্স, সব মিলিয়ে খেলতে নামার আগেই মাঠ সবার জন্য সমান না, কেউ কেউ একটু বা অনেকটা এগিয়ে শুরু করছেন রেসের দৌড়। সে তুমি যেই লাইনেই দাঁড়াও না কেন, তোমার আগে দেড়শো খোকার রেজিউমে।সেইসব প্রিভিলেজের গল্প বাদ দিলেও, এও তো সত্যি যে এইসব ছিলো বলেই তো আজ খেয়েপরে বেঁচে আছি। আমি তো বটেই, আমার বেশিরভাগ বন্ধুরাও প্রায় সকলেই আমার-ই মতন, বাপের টাকাপহা বিশাল কিছু ছিল না, কিন্তু তাও ভালো স্কুলেই পড়েছি প্রায় বিনি পয়সায়, সরকারি কিংবা সরকারি-সাহায্যপ্রাপ্ত, শিখেওছি যা যা শেখার ছিল, হাতেগোনা ব্যতিক্রম বাদ দিলে আমাদের ক্লাসে শিক্ষক আসতেন, মন দিয়েই পড়াতেন, আমরাও সেইসব শুনেটুনেই উতরে গেছি, তারপর কলেজে পড়েছি, সেখানেও খরচ শূন্য উল্টে সামান্য স্টাইপেণ্ড ইত্যাদিও পেতাম, সেই কলেজে পাশ দিয়ে চাকরিবাকরি পেয়েছি, আমার মত কেউ কেউ চাকরি করেটরে আরও উচ্চশিক্ষার জগতে এসেছি, সেও আজ এক দশকের বেশি অতিক্রান্ত।আমাদের সময় নীট ছিল না, আমরা জয়েন্ট ইত্যাদি পরীক্ষা দিতাম। আমিও দিয়েছিলাম, দুরন্ত রেজাল্ট করেছিলাম, করেও কোনো কাজে লাগেনি, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার না হয়ে যদুবাবু হয়ে গেলাম। তবে, আমি ও আমার বন্ধুরা জানতাম, মানে একটা এইরকম বিশ্বাস ছিল যে পড়াশুনো করাই আমাদের সোশ্যাল মোবিলিটির একমাত্র উপায়। ছিলো, এই একের-পর-এক নীট কেলেঙ্কারির আগে অব্দি।প্রশ্নপত্র ফাঁস তখনও কী হ’ত না? হত, কিন্তু এই ব্যাপক স্কেলে পরীক্ষাও হ’ত না, কেলেঙ্কারিও না। মনে রাখা দরকার, এই নীট গোছের পরীক্ষাগুলোয় বাছাই হয় একেবারে চুলচেরা হিসেবে। লক্ষ-লক্ষ পরীক্ষার্থী, হাজারকয়েক আসন, দু-চার নম্বরের বেশি-কম সরকারি মেডিকেল সিট আর শূন্যের ফারাক। ফাঁস হওয়া প্রশ্ন কত দামে বিকিয়েছে, জানেন? পার হেড ১৫ লাখ! ধৃত ব্যক্তি জানিয়েছেন তিনি কিনেছিলেন ১০ লাখ টাকায়।  আর সবচেয়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়তো প্রতিষ্ঠানের, এবং প্রতিষ্ঠানের উপর বিশ্বাসভঙ্গের। যে ষোলো-সতেরো-আঠেরো বছরের কিশোর বুঝে যায় যে ঐ যাবতীয় যা কিছু তাকে একদিন পেতে হবে, আসলে সেই সব-ই তার নাগালের বাইরেই থেকে যাবে। যে দরজা সত্যি বলে বিশ্বাসই রইল না, সে দরজার দিকে কে-ই বা হাঁটতে চায় বলুন? অথচ, শিক্ষা – প্রধানতঃ শিক্ষা-ই - হওয়ার কথা ছিল এই পোড়া দেশে ক্ষমতাহীন মানুষের প্রথম ও প্রধান সোপান।কিন্তু প্রতিষ্ঠানের উপর বিশ্বাস হারালেই বা আখেরে ক্ষতি কী?অর্থনীতিবিদ ড্যারন আচেমোগলু “হোয়াই নেশনস ফেইল” বইতে একটা তত্ত্ব খাড়া করেছিলেন, প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেই। ওঁর এবং ওঁর সহ-গবেষকদের মতে, প্রতিষ্ঠান মূলতঃ দুই রকম – ইনক্লুসিভ আর এক্সট্র্যাকটিভ। ইনক্লুসিভ, যাঁরা ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করেন, আইনের শাসন জারি রাখেন, এবং এমন একটা “লেভেল-প্লেয়িং-ফিল্ড” তয়ের করেন যাতে বৃহত্তর জনসমাজ শিক্ষা, বা ইনোভেশন, বা অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশীদার হতে পারেন সহজেই। আর এর উল্টোদিকে, এক্সট্র্যাকটিভ – শোষক। এরা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতাহীন রেখে দিয়ে, মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে ধনসম্পত্তি ও তাবৎ ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। আচেমোগলুরা দেখিয়েছিলেন, কীভাবে মানুষের ইতিহাসে ঐ দীর্ঘস্থায়ী ইনক্লুসিভ অর্থ-রাজনৈতিক কাঠামোই দেশকে উদ্ধার করতে পারে দারিদ্র্যের হাত থেকে। আর অন্যদিকে কী হয়, আন্দাজ করা আশা করি শক্ত না।যে প্রসঙ্গে শুরু করেছিলাম তাতেই ফিরে আসি। আমি আজকাল নৈরাশ্যবাদী হয়ে গেছি। আমি ধরে নিয়েছি যে রাষ্ট্রের বুটজোড়ার সামনে আমাদের পেরেক হওয়ার ক্ষমতাও নেই। আর আমি ধরেই নিয়েছি যে আসলেই সংখ্যাগুরু ক্ষমতাহীন মানুষের জন্য যাবতীয় হতাশার এবং বিশ্বাসভঙ্গের যুক্তিসঙ্গত প্রতিক্রিয়া পুরো সিস্টেমকেই ছুঁড়ে ফেলে ঘৃণাভরে এর থেকে সরে যাওয়া।এই যন্তর-মন্তরের জমায়েতের ভিডিও দেখে মনে হ’ল, কে জানে, হয়তো আমি ভুল। হয়তো হতাশার এক ও একমাত্র যুক্তিসঙ্গত প্রতিক্রিয়া রাগ। বিশ্বাসভঙ্গের একমাত্র যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া হয়তো বিরুদ্ধাচারণ। হয়তো।ভোটের ঠিক পরেপরেই এক দাদাকে ফোনে বলেছিলাম, ভয় করছে। তিনি বলেছিলেন, ভয় করবেন না, সাহস করুন, মনে রাখবেন ভয়ের থেকে সাহস বেশি সংক্রামক। হয়তো তিনিও ঠিক-ই বলেছিলেন। হয়তো?নীতি আয়োগের রিপোর্টের শুরুতেই জনৈক আধিকারিকের একটি ভারি সুন্দর বার্তা ছাপানো আছে, তাতে লেখা যে কর্মসংস্থান শুধু নয়, শিক্ষার প্রকৃত লক্ষ্য মুক্তি – “সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে”। সে কার মুক্তি, ক্ষমতাবান না ক্ষমতাহীন না আপামর জনগণের, এর উত্তর আসবে কি না আমার-আপনার কারুর জানা নেই, অথবা সবার-ই আসলেই জানা।সূত্রঃ১) নীতি আয়োগের প্রতিবেদন, স্কুল এডুকেশন সিস্টেম ইন ইন্ডিয়া – টেম্পোর‍্যাল অ্যানালিসিস অ্যান্ড পলিসি রোডম্যাপ ফর কোয়ালিটি এনহ্যান্সমেন্ট। https://niti.gov.in/sites/default/files/2026-05/School-Education-System-in-India.pdf২) https://www.brut.media/in/articles/who-is-shubham-khairnar-the-man-behind-the-neet-ug-paper-leak
    বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬!  - মুহাম্মদ সাদেকুজ্জামান শরীফ | ঘটনাবহুল বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ শেষ হচ্ছে আজকে। ফুটবল বিশ্বকাপ সব সময়ই অন্য এক আমেজ। এই ভূগোলকে এর সাথে তুলনা হয় এমন আর কিছুই সম্ভবত নাই। পুরো বিশ্ব এক সময়ে, এক দিকে তাকিয়ে থেকে কাঙ্ক্ষিত দলের জয় কামনা করে। এ এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড না? আমাদের ছোট্ট শহর শেরপুর, এখানে এই মধ্য রাতে খেলা দেখার কত আয়োজন! বিশাল বড় স্ক্রিন লাগানো হয়েছে। যার যার দলের সমর্থকেরা এসে হাজির হচ্ছে। খেলা দেখতে গিয়ে তুমুল ঝগড়াও হচ্ছে। সব কিছু মিলিয়ে এক এক বিশাল আয়োজন। ঢাকার আয়োজন তো ইতিমধ্যেই সারা পৃথিবীর বুকে আলোড়ন তৈরি করেছে। আর্জেন্টিনা থেকে আর্জেন্টিনাবাসি আসছে ঢাকায় খেলা দেখার জন্য! অবিশ্বাস্য না? ব্রাজিলের চ্যানেল লাইভ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির মাঠ থেকে। সবাই অবাক হয়ে দেখছে এ কেমন উম্মাদনা! গতকাল দেখলাম এক আর্জেন্টাইন টুরিস্ট কাপল থাইল্যান্ড ঘুরতে আসছিল। সেখান থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসে গেছে ভিসার জন্য, ফাইনালটা তারা ঢাকায় দেখতে চায়! এই সবই বিশ্বকাপ ফুটবলকে এমন এক মাত্রা দেয় যা অন্য কোনকিছু দ্বারা সম্ভবই না। ৩২ বছর আগে যে বিশ্বকাপ হয়েছিল তার সাথে এবারের বিশ্বকাপ আমেজের মিল হওয়ার কথা না? প্রায় একই ভেনু। কিন্তু কী বিস্তর ফারাক!খুব বেশি কিছু মনে নাই সেই সময়ের খেলার। ঘুম ঘুম চোখের আবছা আবছা যা মনে আছে তা হচ্ছে রাত জেগে খেলা দেখাটাকে একটা উৎসব তৈরি করে ফেলেছিল সবাই। সম্ভবত মেজো মামাদের একটা টিভি ছিল, লাল রঙের সাদাকালো নিপ্পন টিভি, ১৪ ইঞ্চি। এইটাতেই দেখা হয়েছে সব খেলা। মুরুব্বিরা সব খেলা দেখার জন্য সব কাজ শেষ করে হাজির হওয়া শুরু করত। চা, মুড়ি চানাচুর চলত খেলা দেখা উপলক্ষে। হয়ত পুরো শেরপুরে কয়টা টিভি আছে তা তখন গুণে বলে দেওয়া যেত। একটা মহল্লায়, একটা গ্রামে দুই চারজনের বাড়িতেই টিভি ছিল। তাই স্বাভাবিক ভাবেই এক জায়গায় জামায়েত হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না কোনো।আমাদের বাড়িতে সম্ভবত টিভি কেনা হয় ৯৮ বিশ্বকাপে। তখন টিভি বিশ্বকাপ উপলক্ষেই কেনা হত। ততদিনে জ্যোতিরা মানে বকুল খালারা আমাদের এখানে চলে আসছে। খালার উদ্যোগেই কেনা হল ১৪ ইঞ্চি ন্যাশনাল টেলিভিশন! রঙ্গিন টিভি আসার আগ পর্যন্ত এইটাই ছিল আমাদের টিভি!এখন একটা জাম্প দিয়ে বর্তমানে আসি। প্রযুক্তির উৎকর্ষে বাস করছি আমরা। যে রাতে খেলা তখন ছিল আশীর্বাদের মত সেই রাতের খেলা এখন অনেকের জন্য দুঃস্বপ্ন! সকালে অফিস, ব্যবসা, স্কুল, কলেজ, ক্লাস খেলা দেখব কীভাবে? জীবনযাত্রার অভূতপূর্ব পরিবর্তন হয়ে গেছে আমাদের। সবাই মিলে একটা খেলা দেখব এইটা এখন একটু কষ্টসাধ্য ব্যাপারই। আয়োজন করে এক হতে হবে, নাহ হলে সম্ভব না। তখন আয়োজন একটাই, টিভি এখানে, মানে আর কিছুর দরকার নাই!এখন পুরাই ডিজিটাল দুনিয়ায় আমরা। মানুষ মোবাইলে, ল্যাপটপে খেলা দেখছে। আমার ভাইগ্না ডিসকর্ড নামে একটা প্লাটফর্মে খেলা দেখে, ওইখানে সব বন্ধুরা এক সাথে অনলাইনে খেলা দেখে, সবাই অনলাইনে যুক্ত, পাশাপাশি বসে খেলা দেখলে যেমন ভাইব অনেকটা এমনই। আমরা বন্ধুরা আমাদের মত করে একটা ডিসকর্ড বানায় নিছি। সবাই টিভিতে খেলা দেখছি, আবার মেসেঞ্জার গ্রুপে চ্যাট চলছে! একটু হলেও এক সাথে থাকার চেষ্টা! ২ আমি ব্যাক্তিগত ভাবে বেলজিয়াম সমর্থক। ২০১১-১২ সালের দিকে হুট করেই আমার নজরে আসে অদ্ভুত একটা দলের - বেলজিয়াম। নজরে আসে মানে খেয়াল করি মূলত যে ইউরোপের বড় বড় দলগুলোর কী প্লেয়ার গুলো বেলজিয়ামের। দেখলাম আমার মত অনেকেই তা জানে এবং এই দলকে রীতিমত বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্ম বলা শুরু করে দিয়েছে মানুষ। কেভিন ডি ব্রুইনা, ইডেন হ্যাজার্ড, রোমেলু লুকাকু, থিবো কোর্তোয়া, ভিন্সেন্ট কোম্পানি! এরপরের সারিতেই আক্সেল উইটসেল, মারুয়ান ফেলাইনি, জান ভের্টংহেন, টবি অল্ডারউইরেল্ড, টমাস ভার্মেলেন! এর মধ্যে কোম্পানি অধিনায়ক হিসেবে প্রশ্নাতীত ভাবেই অসাধারণ। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম, আমি ১৪ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামকে সমর্থন দেওয়া শুরু করলাম।১৪ সালে কোয়াটার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছ হার। কিন্তু বেলজিয়াম একটা নতুন শক্তি এইটা সবাই তখন বুঝতে পারে। আমার মনে আছে আমি বেলজিয়াম সমর্থন করি এইটা অনেকের মাথাতেই ঢুকত না তখন। ভাবত ইয়ার্কি মারছি না হলে ব্রাজিল আর্জেন্টিনা কিছু একটা করি, ওইটা বলতে চাচ্ছি না বলে এগুলা বলতেছি। বেলজিয়াম তার আসল খেলা খেলে ১৮ সালের বিশ্বকাপে। এইটাই ছিল বেলজিয়ামের কাপ নেওয়ার বছর! এই বিশ্বকাপেই জাপানের সাথে ৩-২ গোলের একটা ম্যাচ হয় যা বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ। ব্রাজিলকে হারিয়ে বেলজিয়াম সেমি খেলে, ১৮ বিশ্বকাপ জয়ী ফ্রান্সের কাছে হেরে, পরে ইংল্যান্ডকে তৃতীয় স্থান নির্ধারণই ম্যাচে হারিয়ে তৃতীয় হয়ে শেষ করে বিশ্বকাপ। ফ্রান্স যদিও সেই ম্যাচে চ্যাম্পিয়ন দলের মত খেলে নাই। ম্যাচ শেষে কর্তোয়া বলছিল এই জঘন্য খেলার চেয়ে ব্রাজিলের কাছে হারলেও তৃপ্তি পাওয়া যেত! যাই হোক, দীর্ঘদিন এক নাম্বার র‍্যাংকিং, তৃতীয় স্থান অর্জন করা এই ছিল এই দলের কাগজে কলমে অর্জন। কিন্তু এইটাই যে শেষ না তা ফুটবল খেলা বুঝে যারা তারা অন্তত জানে। অবিশ্বাস্য প্রতিভা নিয়ে এই দলটা এর চেয়ে বেশি কিছু দিতে পারল না।বেলজিয়াম বড় দল না। এই বড় দল আর ছোট দল কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপে অনেক বড় বিষয়। পুরো দুনিয়া সব সময় ছোট দলের সাথে থাকে। যদি একটা আপনার পছন্দের দল হয় তা হলে ভিন্ন কথা আর তা না হলে মানুষ মনে প্রাণে চায় ছোট দলটা জিতে যাক। নাম না জানা দেশ, তবুও অকুণ্ঠ সমর্থন। ওরা জিতুক, ওরা দেখিয়ে দিক সবাইকে। সবাই এসে পাশে দাঁড়ায় ছোট দলের। বড় দল জিতেও স্বস্তি পায় না এখানে। নানা তর্ক এসে জমা হয়। ছোট দল দেখে রেফারি বাঁশি বাজাল না বা বাজাল! রূপকথার মত ফলাফল চাই আমরা। কাঠুরের ছেলে রাজা হয়ে যাক। জিতে নিক সোনার মুকুক, ছিনিয়ে নিক রাজকন্যাকে। বড় দলের দুর্দান্ত মানসিক জোর কিংবা ফুটবলের অসাধারণ দক্ষতায় রূপকথা কদাচিৎ লেখা হয়। বাকি সব সময়ই বাস্তবতাই জিতে। যে দুই একবার রূপকথা তৈরি হয় সেই কয়বারের গল্প মানুষ বলে বেড়ায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। ১৯৯০ সালের ক্যামেরুন, ৯৮ বিশ্বকাপের ক্রোয়েশিয়া, ২০০২ সালে কোরিয়া মানুষকে এই উত্তেজনা দিয়েছিল। মনে করিয়ে ছিল সম্ভব, ছোটদের পক্ষেও সম্ভব। কিন্তু ফুটবল এক আশ্চর্য খেলা। এখানে শেষ পর্যন্ত কাপ জিতে সেই দলটাই যে সবচেয়ে বেশি যোগ্য। দুই একটা ব্যাতিক্রম না থাকলে বরাবরই এই হয়ে আসছে। অঘটন দুই একটা ম্যাচে ঘটে কিন্তু কাপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ঘটে না। তারপরেও মানুষ সব সময় তার স্বভাবের জন্যই ছোট দলের পক্ষে থাকে। এবার বিশ্বকাপেও তাই হয়েছে। মানুষ অবাক হয়ে কেপ ভার্দের খেলা দেখেছে। আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা ছাড়া পুরো বিশ্ব লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল তাদের পক্ষে। এখানে আর্জেন্টিনার বিরোধী মূল বিষয় না, এখানে ছিল সেই আগের সূত্র, আমরা ছোট দলের পক্ষে থাকব। তাই মনে প্রাণে চাইছে সবাই জিতুক কেপ ভার্দে। ব্রোজিনহা নামক অবিশ্বাস্য গোলকিপারটা মানুষকে বিশ্বাস করিয়েই ফেলেছিল যে সে কোন কিছুতেই পরাজিত হবে না! শুধু এই ম্যাচ না। ব্রাজিল মরক্কোর সাথেও একই রকম হয়েছে। যদিও এখন আর মরক্কোকে ছোট দল বলার সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয় না। সামনের বিশ্বকাপের আয়োজক হতে যাচ্ছে তারা। গত বিশ্বকাপ থেকেই নিজেদের জাত চেনানো শুরু করেছে মরক্কো। এসবের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে ইরান! ইরান যেন কোন কিছুতেই হারবে না বলে জিদ করে এসেছিল। যেখানে বর্তমান সময়ের ফুটবলাররা ঠিকঠাক বিশ্রামের জন্য সব কিছু করতে রাজি। ইংলিশ ক্লাব গুলো চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে স্প্যানিশ দলগুলোর চেয়ে কম ভালো করে, এর পিছনে সবচেয়ে জোরাল যুক্তি হচ্ছে ইংলিশ ক্লাবগুলো বিশ্রাম কম পায়! বিশ্রাম যে কত গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল খেলায় এইটা বুঝানোর জন্য এই উদাহরণটা দিলাম। বিশ্রাম ছাড়া খেলা প্রায় অসম্ভব বলে ধরে নেওয়া হয় সেখানে ইরান প্রতি ম্যাচ বিমান দিয়ে উড়ে এসে খেল আবার ফিরে গেছে মেক্সিকো! এবং কী দারুণই না খেলল তারা। সবার সমর্থন পেয়ে গেছিল ইরান। ইরান টুর্নামেন্টে টিকে থাক, এইটাই চাওয়া ছিল। আমরা তো হাজার মেইল দূরে টেলিভিশনের সামনে ধুর, এই ছোট দল গুলো পারেই না বলে উঠে চলে যাই। কিন্তু খেলোয়াড় গুলো? তারা আমৃত্যু এই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকে। পাসটা যদি দিতে পারতাম। একটু আগে যদি দৌড় দিতাম, একটু জোরে যদি কিক নিতাম এমন শতশত যদি কিন্তু তাদেরকে তাড়া করে ফিরবে না? এইটা অবশ্য ছোট বড় দল না, চ্যাম্পিয়ন দল বাদে সবারই একই রকম হবে। আমৃত্যু অবাক হয়ে ভাববে রবার্তো বেজ্জিও, বলটা জালে রাখা খুব কঠিন ছিল? ইস, উফ করে করেই যায় সবাই। সবাই বললাম কারণ শেষ পর্যন্ত পরাজিতের সংখ্যাই তো বেশি। একশ বছর হতে চলল বিশ্বকাপের, কাপ জিতেছে মাত্র ৮টা দেশ। বাকি সবাইই তো এই ইস আর উফ করে করেই গেছে। পরাজিতের সংখ্যা বেশি বলেই হয়ত আমরা পরাজিতের দলে। নিজেরা নিজেদের জীবনে উঠতে বসতে হারি বলেই মনে হয় এই যে আমাদের পক্ষ থেকে কেউ জিতছে... তুই জিতে যা ভাই, জিতে দেখায় দে! যা রোজার মিলা, যা হাকান শুকুর, গ্রানিত শাকা, জের্দান শাকিরি আরও জোরে ছুট, পাপ বুবা দিওপ কই? গোল দে ভাই! লাফ দে ভোজিনহা, বলটা আটকা...! ৩ বিশ্বকাপ আসলে আরেকটা তর্ক জমে উঠে। এইটা বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে। কে সেরা, কে সর্বকালের সেরা! সেরার তর্ক গুলো আমার কাছে খুব ফালতু লাগে। সর্বকালের সেরা, এইটা আরেক মহা বিতর্ক। সর্ব কাল তো সব সময় এক না, কাল তো প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। তাহলে একজনকে সর্বকালের সেরা আমারা কী দিয়ে হিসাব করব? একটা পর্যায় পর্যন্ত ঠিক আছে, এরপরে আসলে কোন খেলোয়াড়কে নিয়ে বিতর্ক করাটা উল্টা সেই খেলোয়াড়কেই অসম্মান করা হয়। মেসির কথাই ধরেন, ও যদি গোল না করত এবার, হ্যাট্রিক না করত তাহলে মেসির গ্রেটনেস একটুও কমে যেত? আমার কাছে মেসি গতবার বিশ্বকাপ না জিতলেও মেসির গ্রেটনেস একটুও কমত না। ও যা তার প্রমাণ আগেই দিছে, যারা জানার তারা জানে। একই কথা রোনাল্ডোর জন্যও প্রযোজ্য। ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ গোল কয়টা? ৮টা তো? ম্যারাডোনা কোন লেবেলের খেলোয়াড় ছিল কল্পনা করতে পারবেন? ক্লোসা ম্যারাডোনার আশেপাশেও পৌঁছাতে পারবে কোনদিন? মেসি রোনাল্ডোর এই তর্ক সমর্থকদের মধ্যে যত কুৎসিত আমার ধরনা তাদের মধ্যে এত ক্ষুদ্রতা নাই। আমরা টেনে আমাদের মাপে আনতে চাই তাদেরকে। একবার চিন্তা করেন মেসি রোনাল্ডোর এই দ্বৈরথটা যারা আগে দেখেছে তারা বর্তমান সময়ে, এই শেষ মুহূর্তে এসে এই সব তর্কে মজা নিতে পারবে? আমি যদি ভুইল না করে থাকি, ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই দুইজন ফুটবল বিশ্বকে যা দিয়েছে তা আগের আর কারো দ্বারাই সম্ভব হয় নাই। এই দুইজনের অসম্ভব মাত্রার খেলার জন্য, তাদের চেয়ে একটু কম যোগ্যতার, যারা অন্য যুগে জন্ম নিলে হয়ত গ্রেট হিসেবে ইতিহাসে জায়গা নিয়ে নিত তারা এখন আলোচনাতেই নাই। শুধুমাত্র এরা বারটা এত উঁচুতে সেট করেছে যে বাকিদের মামুলি মনে হয়। বিশ্বকাপ জিতে নাই বলে রোনাল্ডোকে ট্রল করে মানুষ, অথচ ২২ সালের আগে মেসিরও কাপ ছিল না। ঘটনা হচ্ছে সব দলের লক্ষ এক না। রোনাল্ডো তার ক্যারিয়ারের শেষ দিকে এসে একটা ভালো মানের দল পেয়েছে। এর আগ পর্যন্ত পর্তুগালকে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়াই ছিল বিশ্বকাপ জয়ের মত। ওইটা রোনাল্ডো করে গেছে। এই দুইজনের যে প্রতিযোগিতা তা দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা বলে আমি মনে করি। লা লিগায় মেসি এক সিজনে গোল করল ৫০টা! অতিমানবীয় কারবার, সেবার রোনাল্ডো করছিল কয়টা? ৪৬ গোল! ( ২০১১-১২ মৌসুমে?) এইটা ফুটবল বিশ্ব আগে পরে কোনদিন দেখেছে? মেসি এ সিজনে গোল করল ৯১টা! রোনাল্ডো চ্যাম্পিয়নস লীগের এক সিজনে গোল করল ১৭টা! দুইটাই এখন পর্যন্ত, এত এত গোল মেশিন আসার পরেও টিকেই আছে। রোনাল্ডোর ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি — তিনটি ভিন্ন লিগে টপ স্কোরার হওয়া, এবং প্রতিটি জায়গায় শিরোপা জেতা, এটা তার অবিশ্বাস্য অভিযোজন ক্ষমতার প্রমাণ না? আর কারো আছে? এ ছাড়া এক ম্যাচে মেসির হ্যাট্রিক অন্য ম্যাচে রোনাল্ডোর হ্যাট্রিক এগুলা ওই সময় যারা দেখছে তারা এক বাক্যে মেনে নিবে যে কেউ কারো চেয়ে কম না। বরং একজন ছিল বলেই আরেকজন এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছে। এখানে একজনকে বড় করতে গিয়ে আরেকজনকে ছোট করতে হবে কেন? তবে আমি সত্যিই মনে করি আগের খেলা আর এখনকার খেলার রেকর্ড আলাদা করে হিসাব করা উচিত। এখন প্রযুক্তির যে সাহায্য তার ছিটেফোঁটাও আগের খেলায় কল্পনা করতে পারবে না কেউ। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি খেলার মজা নষ্ট করছে হয়ত কিন্তু কেউ আউল ফাউল কিছু করে চলে যাবে এইটা হবে না। অনেকেই পেলের সময়ের খেলা নিয়ে দেখি নানান আজাইরা আলাপ করে। আপনে যত পিছনের দিকে যাবেন তত খেলা কঠিন ছিল, এইটা হচ্ছে শেষ কথা। পেলের আমলে কার্ড ছিল না, খেলোয়াড় পরিবর্তন করা যাইত না। এক পেলের মেরে তক্তা বানায় দেওয়ার ইতিহাস আছে। ৬৬ সালের বিশ্বকাপে পেলের হাঁটু লক্ষ করে মেরে তাঁকে ম্যাচের বাহিরে পাঠিয়ে দেয়। ব্যান্ডেজ বেঁধে মাঠে নামেন তিনি। আহত হাঁটু লক্ষ করেই আবার মারা হয়! শুধু পেলে না, ম্যারাডোনা তার সময়ে কম মার খেয়েছে? শেষ ঝলক যে বিশ্বকাপ, ৯০ সালের, সেখানে গোড়ালি দুমড়ে মুচড়ে গেছিল ম্যারাডোনার। অমনেই খেলে গেছে। তাই আগের খেলা সহজ, অমুক নিয়ম নাই, তমুক এগুলা বলার যুক্তি নাই। বিশ্বকাপ দিয়ে সেরা বিচার করতে যাওয়াটা বোকামি না? বিশ্বকাপ তো জিতে নাই অনেকেই আবার জিতেছেও অনেকেই, এতে কী প্রমাণ হয়? পুশকাশ, দি স্তেফানো, ইয়োহান ক্রুইফ, জর্জ বেস্ট, ইউসেবিও, জিকো, ফন বাস্তেন কেউ জিতে নাই কাপ। তো? আবার ফ্রান্সের অলিভিয়ে জিরু কাপ জিতে বসে আছে? তো? এগুলা কেমন খেলো যুক্তি না? যে কোন কিছুতেই আমরা তুলনা করে মজা পাই। তুলনা চলে কি না এইটাও ভাবি না। কত দেখি কে বড় কবি? রবীন্দ্রনাথ না নজরুল? জীবনানন্দ? মানে মনে হয় একটা প্রতিযোগিতা হচ্ছে, কে সেরা, কবিতা লিখে দেখাও! বুঝি না কেন প্রতিটা মানুষের জার্নি আলাদা। তার জার্নিতে, তার হিসেবে তিনিই শ্রেষ্ঠ, এখানে তুলনার কিছু নাই। শেষ পর্যন্ত এইটা একটা বিনোদন ছাড়া কিছু না। তাই শুধুই মজাটা উপভোগ করতে সমস্যা কই? ৪ রাতে ফাইনাল। খোলা মাঠে খেলার দেখার পরিকল্পনা আমার। তাই মনে হল বিশ্বকাপ নিয়ে লেখাটা এখনই লিখে ফেলি। কাপ তো একজন জিতবেই। আর্জেন্টিনা জিতে চারটা করবে না হয় স্পেনের দ্বিতীয় স্টার প্রাপ্তি হবে। দুর্দান্ত একটা খেলা হবে এমনই আশা আমার। গত বিশ্বকাপের ফাইনাল যেমন আমরা, আমাদের প্রজন্ম আমৃত্যু বলে যাব, তেমন একটা ফাইনালই তো দেখতে চাই। ফুটবল দর্শক হিসেবে এইটা তো বেশি কিছু চাওয়া না, তাই না?
  • জনতার খেরোর খাতা...
    আমাকে কেউ কোনোদিন খুব ভালোবাসেনি - পাগলা গণেশ | আমাকে কেউ কোনোদিন খুব ভালোবাসেনি,কেউ আমার নাম বুকে লিখে প্রমাণ করার চেষ্টা করেনি,সে আমাকে কতটা ভালোবাসে।কেউ কেউ আলগোছে একটু অভিনয় করেছিল,কেউ অবেলায় খাবার বাসি হয়ে যাওয়ার ভয়ে যেমন খেয়ে নেয়,সেভাবেই আমাকে বেছে নিয়েছিল।আমি বরাবরই বাহুল্য। এমন নয় আমার বন্ধু নেই,প্রেমিকা নেই।কিন্তু সবাই আমায় ভুলে যায়,প্রেমিকারা অন্যের হাত ধরে চলে যায় নির্দ্বিধায়।আমি শুধু পেছনে ছুটে মরি,জিজ্ঞেস করি,শুধু একবার বলে যাও,"কেন?"কোনো উত্তর আসে না। আমি প্রাণ ঢেলে ভালবেসেছি,আমি উপেক্ষা করে দেখেছি।কিন্তু কিচ্ছু হয়নি। কারো হৃদয়ের ঘরে শুধু আমার মূর্তি থাকেনি,শুধু আমায় ভালোবেসে কেউ শহীদ হতে চায়নি। এখন আমি একা বসে থাকি,পিঁপড়ে এসে দাবি করে স্থান,কখনো কেঁচো,শেয়াল,কুকুর,বর্ষায় উদবিড়াল।আমি ছেড়ে দিয়ে সরে বসি,আবার কেউ দাবি করে,আর একটু সরে বসি। কেউ কেউ লোভ দেখায় ভালোবাসবে খুব,কিন্তু আমি শুধু একবার হেসে ফেলি,ওদের মুখটা দেখি একবার।তারপর বলি পাশে বসো,একটু সহ্য করো। কেউ পারেনি। আমাকে কেউ কোনোদিন খুব ভালোবাসেনি,আমাকে ভালোবেসে কেউ কোনোদিন শহীদ হতে চায়নি।
    যন্তর মন্তর  - Anjan Banerjee | হাঁফ ধরা পাটকিলে আকাশে বৃষ্টির ফোঁটা কোলে নিয়ে দমকা একটা ঝড়ভালবাসার উঠোনে নেমে এলে ভাল লাগে, বড় বড় গাছগুলোকে যখন ঝাঁকায় ধমনীর রক্তস্রোত বেসামাল দোল খায়। বুকের ভিতর গম্ভীর গুরু গুরু মেঘ ডাকে, গোপনে ঝলসায় তরোয়ালের মতো বিদ্যুৎ, ক্রান্তির একটা খর বাসনা ঘুম ভেঙে উঠে বসে উৎসুক। ঈশান কোনে কুন্ডলী পাকিয়ে উঠেছে এক ভীম দ্রোহঝড় বুকের ভিতর তপ্ত ভিসুভিয়াস জাগিয়ে নিয়ে, তপ্ত লাভার মতো দিল্লির জনপথে নেমেছে দু্র্মর তরঙ্গ, ভেঙে গেছে ভীরুতার বাঁধ ধড়িবাজ রাষ্ট্রের নির্লজ্জ ব্যারিকেড। ওৎ পেতে বসে থাকা প্রভুদের মাংসাসি গ্রেহাউন্ড পড়েছে ঝাঁপিয়ে উষ্ণ রক্তের খোঁজে, রক্ত আর লোভ... রক্তেই মিশে থাকে লোভ। ওরা চায়, ধ্বংস হোক সবকিছু, থাকুক শুধু লোভী রাজনীতির উইপোকাদের খাদ্য এক নির্বোধ সংবিধানের ঘুনধরাঝুরঝুরে বিগ্রহ। সংসদভবনের ফুলবাগানের সুরম্য দোলনায় দোল খেতে খেতে মহাপ্রাজ্ঞ মহাপ্রভুরা ডিপ স্টেট তত্ত্বের ঘুড়ি ওড়াচ্ছিলেন। যন্তর মন্তরের আগ্নেয়গিরি উপচে সহসা উত্তপ্ত লাভা উৎসারিত হয়ে গড়িয়ে যেতে লাগল পাঞ্জাব থেকে মারাঠা, বিহার থেকে উৎকল কিংবা বঙ্গ হয়ে দ্রাবিড়প্রদেশ। মহামহিম রাজাধিরাজ হয়ত বিনিদ্র গভীর রাতে মনে মনে ঘুঁটি সাজাচ্ছিলেন চিন না পাকিস্তান নাকি বাংলাদেশ... কোন রঙের একটা তপ্ত ছ্যাঁকার দাগে দাগানো যায় অবাধ্য বদমাশগুলোকে। নাকি জেগে জেগেই হচ্ছিল মধুর রোমন্থনমেলোডি চকোলেটের সুখস্মৃতির। মাঝে দুবার দুঃস্বপ্নের ঘোর লাগল তার, কাড়া নাকাড়া বাজিয়ে প্রকান্ড এক নবীনজাগরণের ঢেউ ছুটে আসছে, খানখান হচ্ছে ডিপ স্টেট গল্প বলবান ধাক্কায় কেঁপে উঠছেনিরাপদ সাতমহলা দূর্গের লৌহকঠিন সিংদরজা। দুয়ার কাঁপছে ঝন ঝন ঝন ঝন... বুকের ভিতর কেমন গুরু গুরু মেঘ ডাকে, গোপনে ঝলসায়তরোয়ালের মতো বিদ্যুৎ, ক্রান্তির একটা খর বাসনা ঘুম ভেঙে উঠে বসে উৎসুক পারবেন কি সোনম ওয়ংচুক ? ******************************************
    অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর বিজ্ঞাপন - অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায় | তাহলে আমি তো ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি। আমাকে লম্বা বলা যাবে?
  • ভাট...
    commentঅরিন |
     
    এক ষাটের কোঠায় পৌঁছন প্রবীণ অনশন ভাঙছেন, তাঁর সন্তানসম এক প্রজন্ম যাতে তাদের স্বপ্ন পূর্ণ করতে পারে সেই আন্দোলনের বীজ বপন করে। গান্ধী আর ড. কিং এর পথে পথ চলা এক অদম‍্য প্রাণ।
    আমাদের দেশে ঘোর শীতকালে যখন কাঠ জ্বলতে চায় না, ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বালাতে আমরা পাইন গাছের cone বা কুচো কাঠ নিয়ে এসে একটি "প্রাথমিক" আগুন ধরাই, আগুন শুরু করতে।
    সোনম ওয়াংচুক সেই অগ্নিশিখা।
    comment | নয়া টাইম পাস। নতুন আইন আসবে। রাত ১২ টায় ভিডিওতে উনীজী উবাচ। আগামীকাল সারা দেশে মিছিলের এফেক্ট। আজ রাতে বিরোধীদের রাস্তায় যাওয়ার এফেক্ট।
    comment | টাইম পাস, সব টাইম পাস।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত