এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    মধুবাতা ঋতায়তে - শারদা মণ্ডল | ছবি - Imagen 3মেয়েদের প্রস্তুতির ফাঁকে বড় মাতাজী জিজ্ঞেস করলেন - ‘তুমি কি উঠবে ভাবছ?’ বললুম - ‘হ্যাঁ মাতাজী।’ কলেজে এমনিতেই সবাই আমাকে ছিনে জোঁক হিসেবে চেনে, কোন সমস্যা সামনে এলে তার শেষ না দেখে ছাড়িনা। তাই এখানে কোন ছাড়ান ছুড়িনের প্রশ্ন নেই। সুযোগের সদব্যবহার করতেই হবে। বড় মাতাজী আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠলেন, ‘তাহলে আমিও উঠবো।’ উঠতে হবে আগের মতই চার হাত পা কাজে লাগিয়ে। পাহাড়ের মাথায় ট্রেনারদের একটি দল দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, দড়ির অন্য প্রান্তটা ধরে আছেন নিচে যে প্রশিক্ষকেরা রয়েছেন, তাঁরা। মাঝখানে সেই হারনেস আর ক্যারাবিনারের গল্প। তবে গল্পটা আগের দিনের জাল বাওয়ার থেকে কিছুটা আলাদা। মুখ্য প্রশিক্ষক বিভুজিৎ মুখোটির কয়েকটি কথা কানে গমগমিয়ে উঠলো আমার। তিনি বললেন, পাহাড়কে তোমরা যতই ভালোবাসো, মনে রাখবে আরোহণের সময়ে ও একটা obstacle and an obstacle should not be negotiated, it should be overcome. শুনে চমকে উঠলাম, মনে মনে কয়েকবার আবৃত্তি করে নিলাম বাক্যটি। সত্যিই তো নেগোশিয়েশন আর কম্প্রোমাইজের কম প্রলোভন তো এলনা জীবনে। একবার পা পিছলে গেলে পতন ও মৃত্যুই ভবিতব্য - সে কথা সব ক্ষেত্রেই খাটে - তা সে পর্বতারোহণ বা জীবন নির্বাহ যাই হোক না কেন। এইরকম জীবনের পরীক্ষা যতবার এসেছে সামনে, ততবার মন্ত্র জপেছি একতানমনে - ‘সত্যের জন্য সব ত্যাগ করা যায়, কিন্তু কোন কিছুর জন্যই সত্যকে ত্যাগ করা যায়না।’ ক্ষণিকের জন্য আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম। সম্বিত ফিরল সম্মিলিত হাঁকডাকে। জীবনে যাই হয়ে থাক, এখন এই মাঠা পাহাড়কে ওভারকাম করি কেমনে।বিভুজিৎ বাবুর নির্দেশগুলি মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করি। চার হাত পায়ে পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠার সময়ে শিরদাঁড়া থাকে ঢালের সমান্তরালে, কিন্তু শরীর ঢালের থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। ভালোবেসে পাহাড়ের দিকে ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করলে, ভারসাম্য হারিয়ে পপাত চ, মমার চ, হতে এক পলও দেরি হবেনা। আবার নামার সময়ে মেরুদন্ড থাকবে ঢালের সঙ্গে উল্লম্ব। মুখ থাকবে শিখরের দিকে। পিছনে হেঁটে নেমে আসতে হবে। তখন ডান হাত থাকবে কোমরের সামনের দিকে - এই হাতই এখন পা-গাড়ির স্টিয়ারিং। বাঁ হাত থাকবে কোমরের পিছনে, সেই হাত ব্রেকের মত কাজ করবে। বাঁ হাত দিয়ে দড়ি টেনে যোগান দিলে তবেই সামনের দড়ির অংশ বাড়বে আর আমি নামতে পারব। বাঁ হাত লক করে দিলে আটকে যাব, আর এগোতে পারবোনা। এই কৌশলের নাম হল র‍্যাপলিং। আসলে ওঠার সময়ে শিরদাঁড়া ঢালের সমান্তরালে রাখলে শরীরের ভরকেন্দ্র (Center of Mass) নিয়ন্ত্রণে থাকবে। শরীর পাহাড়ের কাছাকাছি এলে ভরকেন্দ্র পিছলে গিয়ে ভারসাম্য নষ্ট হবে। আর নামার সময়ে দড়ি, ক্যারাবিনার, কোমর আর হাত ছন্দোবদ্ধ ভাবে ঘর্ষণ বল (Friction force) তৈরি করে। আমরা যদি শুধু হাত দিয়ে দড়ি ধরে নামতে যেতাম, তবে হাতের চামড়া ছড়ে যেত অথবা আমি সোজা নিচে গিয়ে পড়তাম। কিন্তু ক্যারাবিনার, হারনেস, দড়ি এবং দুই হাতের অবস্থান—এই পুরো সিস্টেমটা মিলে একটা হিউম্যান-মেকানিক্যাল ফ্রিকশন ব্রেক (Human-Mechanical Friction Brake) হিসেবে কাজ করে। আমি শেষ পর্যন্ত নিয়ম মেনে উঠে আবার নেমে আসতে সফল হলাম। ওপরে ওঠার পর মনে হচ্ছিল বুকের খাঁচাটা বুঝি ফেটে যাবে। কিছুক্ষণ সেখানে শান্ত হয়ে বসে ধীরে ধীরে চোখ মেললাম। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই বিস্তৃত বনরাজি, মাঝে মাঝে মেঠো পথ, সেই লাল জমিনের প্যাটার্ন, দূরে দূরে বিক্ষিপ্ত গ্রাম, মাঝে কিছু চাষবাস - সব মিলিয়ে পুরুলিয়ার বন্য সৌন্দর্য বিহগ দৃশ্যে আমার চোখের সামনে ঝলমলিয়ে উঠলো। যেন আমি বঙ্কিমের আর এক নবকুমার যে ‘তালতমালীবনরাজিনীলার’ রূপে মুগ্ধ হয়েছে। তবে এই নেমে আসার পর মুহূর্তেই একটা ঘটনা ঘটল। অনেক ছোটবেলায় জুল ভার্নের টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড লীগস আন্ডার দ্য সী এর বাংলা অনুবাদ পড়েছিলাম - সেখানে এক জায়গায় সমুদ্রের গভীরে সাবমেরিন নটিলাস আটকে যাওয়ায় বিজ্ঞানী পিয়ের, ক্যাপ্টেন নিমোকে জিজ্ঞেস করেন - ক্যাপ্টেন, নটিলাসের কি কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে? নিমো উত্তর দেন, না প্রফেসর, নটিলাসকে আপনি চেনেননা, একটা ঘটনা ঘটেছে মাত্র। গল্পটা মনে ভেসে উঠলো, তার কারণ আমাদের ঘটনাটা দুর্ঘটনা হতেই পারতো, কিন্তু হলনা। আসলে আমাদের সঙ্গে দুটি এমন মেয়ে ছিল, যাদের হার্টে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ট্রেনাররা ভরসা দিয়েছিলেন, যে কিচ্ছু সমস্যা হবেনা। হয়ওনি। মাঠার ঐ ঢালে নেমে এসে একটা সংকীর্ণ পথ দিয়ে আবার মেয়েদের জটলার মধ্যে ফিরে আসতে হচ্ছিল। আমি নেমে আসার পর, ঐ সার্জারি হওয়া একটি মেয়ের ওঠার কথা। আমি যখন ঐ অপরিসর পথে সাবধানে হেঁটে ফিরছি, ততক্ষণে ঢালে পা রেখে পজিশন নিয়ে ঐ ছাত্রীটির কোমরে ক্যারাবিনার বাঁধা হয়ে গেছে। কিন্তু মনের টেনশন চাপতে না পেরে ও পিছন ফিরে বন্ধুদের দিকে তাকাতে গেল। ব্যাস, পা ফস্কে ঘুরে আমার পিঠের ওপর পুরো ওজন নিয়ে পড়ল। আমি তো ওর দিকে পিছু ফিরে, কিছু দেখিনি। কিছু বোঝার আগেই সেকেন্ডের ভগ্নাংশে আমি ছিটকে নিচের গর্তে পড়ে গেলাম, মানে অগভীর একটা খাদ, যার জন্য ঐ জায়গাটা অপরিসর। ভিতরে ঝোপ ঝাড় ছিল। শীতের ভোরে রক ক্লাইম্বিং-এ বেরিয়েছি, সোয়েটার, জ্যাকেট, নী গার্ড, কাঁটালো জুতো - হেন তেন প্রোটেকশন সব পরাই ছিল আমার। ঝোপগুলো পুরো গদির মত কাজ করেছে। কিন্তু হাতের পাতা, চোখমুখ এগুলো তো খোলা ছিল। যাই হোক টেনে তোলার পর দেখা গেল, অবিশ্বাস্য ভাবে আমার কোন ইনজুরি হয়নি। কাটা ছড়াটুকুও নেই। হাড়ে ব্যাথা, মচকানোও নেই। আর আমার ওপরে পড়ার ফলে মেয়েটিরও কিচ্ছুটি হয়নি। যেভাবে পড়েছি, দলের কেউ বিশ্বাস করতে পারছেনা যে আমার কিছু হয়নি। একলা বসে ভাবি, যতই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকুক, সব কিছু পজিটিভ ফ্যাক্টর একসঙ্গে কাজ করা - কোন ইনজুরি না হওয়া - এটা এমনই ব্যাপার, সহজ বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলেনা। জীবনে আরও কয়েকবার ফিল্ডে এমন ন্যারো এসকেপ হয়েছিল আমার। না - আসলে আমার না বলে আমাদের বলা ভালো। আর একবার তো বলা যেতে পারে একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল। যদিও গল্প শুনতে শুনতে বেলাইনে যাওয়া মানে ডিসট্র্যাকশন আমি পছন্দ করিনা মোটে, তবুও এই পাকাচুলো বুড়ির মনে যখন কোন কথা উথলে ওঠে, তখন না বললে শান্তি হয়না। অনেক বছর আগের কথা। যৌবন তখনও শরীর ছেড়ে যায়নি। সেবার আমরা হাওড়া থেকে ট্রেনে উঠেছিলাম, গন্তব্য লখনৌ হয়ে কাঠগোদাম স্টেশন। সেখান থেকে নৈনিতাল, রানিক্ষেত, কৌশানি। সবার মনে খুশির হাওয়া। কিন্তু একটি ছাত্র এসে পৌঁছতে পারলোনা। ট্রেন যখন ছেড়ে দিয়েছে, অন্য ছাত্ররা বলে উঠলো, ঐ দেখুন ম্যাডাম, ও পাগলের মত প্ল্যাটফর্মে দৌড়চ্ছে। কী হবে ছেলেটার!! অজানা আশংকায় আমরা যে যেখানে পারলাম চেন টানলাম। কিন্তু আমরা তো আইন জানতাম না, যাত্রাপথের মাঝখানে বিপদ ঘটলে চেন টানা যায়, কিন্তু শুরুতে নয়, ওটা দন্ডনীয় অপরাধ। আর পি এফ এসে, আমাদের এত বড় দল, সহজেই আইডেন্টিফাই করল, কারা করেছে এই কাজ, আর সঙ্গে সঙ্গে বল্লরীদি, আর মধুসূদনকে নামিয়ে নিয়ে চলে গেল। তারপর ঘটনা শুনে মেয়ে বলে বল্লরীদিকে ছেড়ে দিল, কিন্তু মধুসূদনকে ছাড়লোনা। এদিকে বল্লরীদি ট্রেনে ওঠার আগেই ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। তখন আমাদের তরুণ বয়স তো, ও ছুটতে ছুটতে চলন্ত ট্রেনে আমাদের কামরার পা দানিটা ধরে ফেলল। আর আমি সেই দরজায় দাঁড়িয়ে কীকরে যে ওকে টেনে তুলেছি, বা ও উঠতে পেরেছে, ফস্কায়নি - আমরা দুজনেই জানিনা। কারণ ট্রেন ততক্ষণে স্পীড নিয়ে নিয়েছে। আমরা তো আর হিন্দি সিনেমার শাহরুক, কাজল ছিলাম না, বাস্তবটা ভয়াবহ। ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়, কী হয়ে যেত সেদিন। তারপর আর কী - কলেজ থেকে সহকর্মীদের দৌড়, বাড়ি থেকে পরিবারের সদস্যদের দৌড় - অবশেষে সেই রাতেই মধুসূদনের ছাড়া পাওয়া - রেলের কোটায়, রেলের আধিকারিকেরাই টিকিট বুক করে দিলেন। আমরা লখনৌ পৌঁছেছি ভোরে, আর মধুসূদন এসে যোগ দিল বিকেল সন্ধের মুখে। আর একবার হলদিয়া ডকে আমরা ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে জাহাজ দেখছিলাম। ডকে ঘোরার অফিসিয়াল পারমিশন ছিল। তখন কলেজে যোগ দিয়েছি, হয়তো বছর দুয়েক হবে। হঠাৎ দলের এক সদস্য একটা বিদেশি জাহাজের ডেকে দাঁড়ানো কর্মীকে জিজ্ঞেস করল - ভেতরটা দেখা যাবে? সে বলল - অবশ্যই, ওয়েলকাম। এতে যে কোন সমস্যা হতে পারে, আমাদের ধারণায় আসেনি। বয়সটা তিরিশে পৌঁছয়নি তখনও। একটা সরু লোহার সিঁড়ি বেয়ে ছেলেমেয়েরা যেই উঠতে শুরু করেছে, সঙ্গে সঙ্গে আর্মি ছুটে এসে আমাদের নামিয়ে দিল। তারপর টিচার হিসেবে আমরা তাঁদের কাছে খুবই বকুনি খেলাম, নিজেরাও মরমে মরে গেলাম। ঘটনা হচ্ছে, আমরা তো জানিনা যে, ডকে দাঁড়ানো জাহাজের ভেতরে আমাদের দেশের আইন কানুন খাটেনা। যে দেশের জাহাজ - সেই দেশের আইন চলে। ফ্ল্যাগ স্টেট জুরিসডিকশন ও টেরিটোরিয়াল ওয়াটার্স - এই আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের বন্দরে আন্তর্জাতিক জাহাজ দাঁড়িয়ে থাকলেও, জাহাজের ডেভিস বা ভেতরের অংশটি সংশ্লিষ্ট যে দেশের পতাকা বহন করছে, সেই দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ড বলে গণ্য হয়। মাসের পর মাস জলে থাকা নাবিকেরা যদি আমাদের নামতে না দেয়, আমরা তো সরকারের অনুমতি নিইনি - সরকার তো জানবেওনা আমরা কোথায় গেলাম। আর্মিকে আজও আমি মনে মনে ধন্যবাদ জানাই। পাহাড় থেকে নিরাপদে নামার জন্য যেমন বায়োমেকানিক্স বা ‘হিউম্যান-মেকানিক্যাল ফ্রিকশন ব্রেক’-এর কারিগরি দক্ষতা শিখে রাখাটা দরকার, ঠিক তেমনই আমরা যে সমাজে এবং রাষ্ট্রে বাস করছি, করে কম্মে খাচ্ছি, তার আইনগত পরিধি সম্পর্কে সচেতন থাকাটাও ভৌগোলিকের জন্য সমান জরুরি। প্রাকৃতিক নিয়ম বা প্রকৃতির তৈরি আইন মানায় ত্রুটি হলে যেমন প্রকৃতি ক্ষমা করে না, তেমনই রাষ্ট্রের আইন না মানলে সমাজ ক্ষমা করে না। দুটি ক্ষেত্রেই ল্যাটিন প্রবাদটি সত্যি - ‘Ignorantia juris non excusat’ "আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা কোনো অজুহাত নয়"। পরের ঘটনা যেটা বলতে যাচ্ছি, সেটা হল দীঘা ফিল্ডে, আর সেইবারই সাইট সীয়িংয়ে গিয়ে উড়িষ্যার তালসারিতে। তখন সবে আগের বছর আমি আর বল্লরীদি এক মাস আগে পরে কলেজে যোগ দিয়েছি - হরিহর আত্মা। বাংলার বর্ষীয়ান অধ্যাপক শ্যামল বাবু শারদা, বল্লরী আলাদা না বলে একসঙ্গে দুজনকে শাল্লরী বলে ডাকতেন। সেবারে আমাদের সার্ভে গ্রামের নাম ছিল গোবিন্দবসান। নির্ধারিত দিনে মৌজা ম্যাপ দেখে দেখে এগিয়ে চললাম সার্ভে করতে। অর্ধেক রাস্তা গিয়ে দেখি সামনে উত্তুঙ্গ বালির পাহাড় - মানে বেশ বড়সড় একটা বালিয়াড়ি, কিন্তু সেটা ম্যাপে নেই। মানে আছে কিন্তু ঠিক সেই জায়গায় নেই। ব্যাপারটা কী দেখতে হচ্ছে। কিছুক্ষণ চেষ্টা চরিত্র করে সেই ঝুরঝুরে বালির পাহাড়ের মাথায় যেই না চড়েছি, একটা ভেজা দমকা নোনা বাতাসের ধাক্কা লাগল চোখে মুখে। ওমা! সামনে নীল সাগরের ঊর্মিমালা। কিন্তু ম্যাপে দেখাচ্ছে গ্রামের জমি আরও অনেকটা বিস্তৃত, সমুদ্র বেশ দূরে। আসলে ইংরেজ আমলে মানচিত্র তৈরির সময় যেমন ছিল সেটাই আঁকা রয়েছে। কিন্তু এখন ২০০০ সালে সেটা নেই। গ্রাম ছোট হয়ে গেছে। চোখের সামনে সিভিয়ার কোস্টাল ইরোশন দেখে সবাই হতবাক। আমরা তখন যদিওবা টীচার, স্টুডেন্টদের থেকে খুব বেশি বয়সে বড় তো নই - আর সেই আমাদের অত বড় আবিষ্কার! শাল্লরীর মন তখন ডানা মেলে উড়ছে। সী ফেসিংয়ে বালিয়াড়ি ভেঙে ভেঙে জায়গায় জায়গায় ভিতরের গঠন বেরিয়ে পড়েছে। মানে যে সময়ে যেমনভাবে বাতাস বয়েছে, সেভাবে বালি এসে জমেছে। কোথাও প্যারালাল স্ট্রাকচার, কোথাও ক্রিসক্রস বা ক্রস বেডিং দেখা যাচ্ছে। ছেলেমেয়েরা মহানন্দে সেগুলো খুঁজে বেড়াতে লাগলো, আর রিজ লাইন বরাবর আমরা দুজন এগিয়ে গেলাম একটু দূরে। একটা জায়গায় পাথর দিয়ে নিচু দেয়ালের মত সাজানো, মনে হচ্ছে ভিউ পয়েন্ট। সেখানে পৌঁছে দেখি জায়গাটা বেরিয়ে আসা স্পার, ঝুলন্ত বারান্দার মত, তলায় আন্ডারকাট আছে, মানে তলার বালি খেয়ে গেছে। হয়তো যখন পাথর সাজানো হয়েছিল, তখন বালির ঢালটা উল্লম্ব ছিল, এখন নেগেটিভ ঢাল হয়ে গেছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক যেটা, সেটা হল অনেক নিচে সমুদ্রের ঢেউগুলো এত জোরে আছড়াচ্ছে আর ঘুরপাক খাচ্ছে, যে জলের ছিটে আমাদের গায়ে লাগছে। একবার নিচে তাকিয়ে মনে হল - এ যেন যমুনার জলে হওয়া এক অবিরাম যুদ্ধ যাতে কালীয় নাগের ফণাগুলো আক্রোশে ফোঁসফোঁস করে চলেছে। আমরা সেই বালি - ছাদের পাথুরে আলসের পাশে দাঁড়িয়ে অলস গল্প জুড়লাম, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, আমার বামপাশে সমুদ্র, বল্লরীদির ডানপাশে। ক্ষণিকের মধ্যে পলক ফেলার আগেই মনে হল বাঁপাশে একটা বিশাল কালো অন্ধকার ধেয়ে আসছে, মস্তিষ্ক সময় পায়নি, সুষুম্না ক্রিয়া মানে পরিবর্ত ক্রিয়ায় আমি একটা বিশাল লাফ দিলাম ডানপাশে। এর আগে কখনও অমন লাফাইনি, পরে তো প্রশ্নই ওঠেনা। বাঁকাধে যেন একটা ভয়ানক জোরে থাপ্পড় এসে পড়ল, আমি তো পুরো বেসামাল। সম্বিৎ ফিরলে বুঝতে পারলাম, যে বিশাল একটা ঢেউ এসে আমাদের আক্রমণ করেছিল। এত ওপরে যে ঢেউ উঠতে পারবে, সেটা আমরা কল্পনা করতে পারিনি। নিজের সম্বিৎ ফিরে পাবার পর বল্লরীদির কী হল এই ভেবে কেঁপে গেলাম, দেখলাম বল্লরীদি যেখানে ছিল সেখানেই ভিজে চুপচুপে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন একটা মূর্তি - বিশাল ঢেউটা ওর মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে। আমি কোনরকমে ছুটে গিয়ে ওকে দুহাতে ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়েছি। তারপরে দেখি নড়ে উঠলো। আমি বললাম তুমি তখন দাঁড়িয়ে রইলে কেন? সরে যাবে তো! বল্লরীদি বলল, আমি ভেবেছি - আমি তো লম্বা, ঢেউয়ে কিছু হবেনা। আমি তো তাজ্জব, বললাম, তুমি নিজেকে সমুদ্রের চেয়ে লম্বা কীকরে ভাবলে? এইখানে কাহিনী মে কুছ টুইস্ট হ্যায় - মানে কুছ হিস্টোরিকাল ফ্যাক্ট হ্যায়। বল্লরীদি সত্যিই বাঙালি মেয়ের গড় থেকে মাথায় অনেকটাই বেশি উঁচু, এদিকে আমি উল্টো - খর্বকায়। নিজেরাই নিজেদের নাম নিয়েছিলাম পেনসিল - রবার। আর স্টুডেন্টরা আরও এক কাঠি সরেস। তারা হেসে হেসে বলেছিল, ম্যাডাম, আপনাদের আমরা নাম দিয়েছি এল. এম. আর বি. এম. - মানে হচ্ছে বল্লরী ম্যাম হলেন ল্যান্ড মার্ক আর শারদা ম্যাম হলেন বেঞ্চ মার্ক। এক্কেরে সাচ্চা ভূগোলের ছাত্র - আমরা তো হেসে খুন। তবে ফিল্ড উজিয়ে এই গল্প যখন কলেজের স্টাফ রুমে এল, তখন বিপদের আশঙ্কা, আমাদের অবিমৃশ্যকারিতা সব বাদ দিয়ে ‘বল্লরী সমুদ্রের চেয়ে লম্বা’ - এই তথ্যই মুখ্য হয়ে উঠলো। অট্টহাসির ঢেউ উঠতে লাগলো। আজ সিকি শতাব্দী পরেও আর্জি আসে - অ্যাই শারদা - ‘সমুদ্রের চেয়ে লম্বা’ টা প্লিজ বলো। আমার আবার একটু হাত পা নেড়ে, অভিব্যক্তি দিয়ে গল্প বলায় নামডাক আছে। হাজারো বার শোনা গল্প আবার শোনাই। বল্লরীদি রেগে যায়। এবার যে এই গল্পটা আমি স্টাফরুমের বাইরে ফাঁস করলাম, বল্লরীদির সজোর চাঁটি থেকে কেউ আমাকে বাঁচাতে মনে হয় পারবেনা। কিন্তু হাসি মজার আড়ালে একটি গভীর সত্য আছে - যার প্রভাবে দীঘার নোনা জলে ভেজা বালুকাবেলা আর রোদ্দুরে পোড়া মাঠা পাহাড়ের নেড়া ঢাল পাশাপাশি একই মঞ্চে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। গ্রামবাসীরা শুনিয়েছিলেন সেই কাহিনী - মাঠে ঘাটে হাটে বাটে পাওয়া সেইসব জ্ঞান না পেলে, পুঁথির মুক্তো ফেলে ঝিলিক ঝিলিক ঝিনুক না কুড়োলে আজ আমাদের ভৌগোলিক হওয়া হতনা।চলবে...
    আমার বই আর মফস্বলের ভোর - স্মৃতি ভদ্র | অলংকরণ: রমিতআশির প্রথমভাগ প্রায় শেষ হবার পথে তখন। বারোয়ারী উঠোনের আমাদের আনন্দবাড়িতে তখনও প্রতিবেলা পাত পড়ে জনা পঁচিশের। নিজেরা বাদেও জমির ফসলে দিনখাটা মানুষ, সংসারের কাজে হাত লাগানো পূর্ণির মা কন্যাসহ, তাঁতঘরের ড্রাম মাষ্টার, ম্যানেজার আর কখনো কখনো মাদলা গ্রামের আইনুল চাচা। বলা যায়, উৎসব ছাড়াও বাড়ির উঠোনে পরবের কমতি ছিল না একটুও। সবদিনই আনন্দের, সবদিনই পরবের। আর আমি পাঁচ পেরিয়ে ছয়। বাড়ির পাশে এক নতুনধারার ইশকুল। কিন্ডারগার্টেন। পাশের বাড়ির বলাকা ফুফু সে ইশকুলের আপা। চেয়ারম্যান দাদুর এক শরিকের পড়ে থাকা খালি বনেদি ভবনে সাইনবোর্ড ওঠলো ‘‘উদয়ন কিন্ডারগার্টেন’। শোনা যায়, সে শরীক আমেরিকায় গিয়ে আর ফেরেননি। কাগজপত্রের জটিলতার কারণে নিজ দেশে তাঁর ফিরে আসাও অনিশ্চিত। কিন্তু দেশের জন্য পরান তো কাঁদে। তাঁর ইচ্ছাতেই সে ভবনের ফাঁকা ঘরগুলো হয়ে উঠেছিলো ক্লাশ রুম। হয়ে উঠেছিলো আমাদের শৈশবের কাগজনৌকা সময়।পাড়ায় প্রথম এমন ইংরেজি ইশকুল। সোরগোলের অতিশয্য। কেউ ফটকে দাঁড়িয়ে উঁকি দেয় তো কেউ জানালার শিক ধরে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে। যেন সার্কাসের দল এসেছে! আর এসেম্বলিতে যখন ‘ অ্যাটেনশন’ ‘স্ট্যান্ড ইজি’ বলে শারীরিক শিক্ষক গলা চড়াতেন তখন চারপাশের চোখগুলো গোলগাল হয়ে ঘিরে ধরতো ইশকুলের মাঠকে।বিড়ম্বনা। অদ্ভুত বিড়ম্বনা। সে বিড়ম্বনার আড় পেরিয়েই আমি বলাকা ফুফুর হাত ধরে পৌঁছে গিয়েছিলাম জীবনের প্রথম শিক্ষা নিকেতনে। নিজের আড়ষ্টতা আর জড়তা কাটিয়ে একটু একটু অভ্যস্ত হচ্ছিলাম আমি,পুষি ক্যাট পুষি ক্যাট হোয়্যার হ্যাভ ইউ বিনআই হ্যাভ বিন টু লন্ডন টু ভিজিট দ্যা কুইন…ঠিক তখনি এক দুপুরে বাবা বাড়িতে হাজির হলো বদলির আদেশ হাতে নিয়ে। পরের মাসে জয়েন করতে হবে সদ্য জেলা শবরের খেতাব পাওয়া এক শহরে। খুব দূরে নয়, আবার এমন কাছেও নয় যে বাবা দিনে গিয়ে অফিস সেরে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে পারবে। তাহলে উপায়?আমাদেরকে চলে যেতে হবে বাবার সঙ্গে শহরে। তল্পিতল্পা নিয়ে অংশিদার হতে হবে উদবাস্তু জীবনের। সেই প্রথম আমাদের বাড়ির বারোয়ারী উঠোনের একচালা আনন্দে ভাঙন ধরলো। লাল বারান্দায় পড়া পাতের সংখ্যা কমলো। উঠোনে রোদে ভেজা তিল তিসির দুপুরে চড়ুই তাড়ানোর মানুষ কমলো। কিন্তু ওই যে, জীবনের গতি একমুখী! সে গতির সঙ্গে হয় পাল্লা দাও নয়তো ছিটকে যাও রেস থেকে!তাই জীবনের নিয়ম মেনেই এক শীতের সকালে বাকশো পেটরা, গুড়ের মেটে হাঁড়ি, মুড়ির টিন, ডানো দুধের কৌটায় কুমড়ো বড়ি আর একটা সোনালী চুলের বিদেশী পুতুল কোলে নিয়ে বাড়ি ছেড়েছিলাম আবার ফিরবো এই প্রতিজ্ঞা করে!তখন অবশ্য ফুলজোড় নদীতে সেতু হয়নি। স্টিমারে নদী পাড় হতে হতো। ভেপু বাজিয়ে যখন নদীর জল কেটে স্টিমার এগোচ্ছিলো তখনও আমার শৈশবসূলভ অস্বীকৃতি একমুখী সেই যাত্রায়,মা কবে ফিরবো আমরা…পূজার ছুটি আসতে কত দেরী…আমার ইশকুলের বন্ধুরা তো কাল থেকে ক্লাসে আমাকে পাবে না…পূজার ছুটিতে ফিরলে ওরা চিনতে পারবে তো আমাকে…সোনালী চুলের পুতুল বুকে জড়িয়ে রাখা মেয়েটিই জানতোই না,একবার পথে নামলে আমরা আসলে আজীবনের পথিক হয়ে যাই।নতুন শহর। মফস্বলি নিরিবিলি শহর। আমাদের মফস্বলি জীবন, নেহাতই সাদামাটা কিন্তু প্রাঞ্জল। সে জীবনে সবকিছু নতুন। নতুন ঘর। নতুন প্রতিবেশী। নতুন পাড়া। নতুন বিদ্যালয়। নতুন স্কুল ইউনিফর্ম। নতুন জুতো। আর নতুন আমি।সবে শহরের গায়ে জেলা সদরের ভারিক্কি নাম ঝোলানো হলেও আচারে আচরণে সে শহর ছিল একদমই সাদামাটা। রাস্তার মোরে কিংবা গলির মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা টিনের আটচালা ঘরগুলো তখনও সাক্ষ্য দিতো আড়ম্বরহীন সময়ের। তবে সেসবের মাঝেও বেশকিছু বনেদি বাড়ি এখানেসেখানে ছড়িয়ে থেকে নিভৃতে বয়ান করতো শহরের সমৃদ্ধ ইতিহাসের কথা। মন খারাপের আকাশভাঙা কান্না নিয়ে যখন বাড়ি আর ঠাকুমাকে ছেড়েছিলাম তখনও কিন্তু জানতাম না নদী পাড়ের সেই শহরের সঙ্গেই হয়ে যাবে আমার আজীবনের বোঝাপড়া! নদীর পাশেই নীচু এক পাড়া, আমলাপাড়া। আমাদের অস্থায়ী ঠিকানার প্রারম্ভ। তখনও যমুনা নদীতে শহর রক্ষা বাঁধ পড়েনি। তাই বাঁধনহারা নদী ইচ্ছে হলেই চলে আসতো বাসার উঠোনে। এজন্য নদী আর জলেই আমার শৈশবের কাগজনৌকা ভেসে বেড়াতে শুরু করলো ইছেমতন যখন তখন। তবে সেসব বাঁধাহীন দুরন্তপনা শেষে আমাকে যথারীতি ফিরতেও হতো বাঁধাধরা জীবনে। দাদুর কাছে হাতেখড়ি আর পন্ডিত স্যারের কাছে শ্লেট চকে স্বরবর্ণ জীবন এরপর আক্ষরিক স্কুলজীবন উদয়ন কিন্ডারগার্টেন হুট করে ফুরিয়ে গেলেও পুস্তকাদি জীবন তো আর উপেক্ষা করা যায় না।তাই ভর্তি করা হলো আমাকে বাসার সবচেয়ে নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে। গন্তব্য গৌরি আরবান প্রাথমিক বিদ্যালয়। একটা চারকোনা নতুন টিনের বাক্স। তার ভেতরে নতুন বই, নতুন রুলটানা খাতা আর নতুন কাঠ পেন্সিল। আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। নিরিবিলি আর নেহাতই আটপৌরে মফস্বলি সে শহরের এক শান্ত ভোরে শুরু হলো আমার পাঠশালা দিন। বাবা ওপার বাজার থেকে কিনে এনে দিয়েছিলো একটা চারকোনা টিনের বাক্স। শুরু হলো বালিকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। মধ্য জানুয়ারী, বাংলায় মাঘ। নদী জল থেকে উঠে আসা কুয়াশায় ঢেকে থাকা মফস্বলি শহরের আলস্য ভেঙে যে দু'একজন রাস্তায় থাকে তারা হয় ফুলের সাজি ভরে সাদা টগরে নয়তো চায়ের টঙ দোকানের উনুনে আগুন দিতো ঘষিতে। বাবার ঠিক করে দেওয়া রিকশা। রহিম চাচা। প্যাডেলে পা। রিকশার টুংটাং বেল। কুয়াশা কেটে আমার প্রথম বিদ্যালয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া।আকাশী রঙের স্কুল ইউনিফর্ম। সাদা কেডস। সাদা স্কার্ফ। চুলে দুই ঝুঁটি। আমার বইয়ের প্রথম ভাগ। এসেম্বলিতে মুষ্টিবদ্ধ হাত সামনে ছড়িয়ে,আমি শপথ করিতেছি যে, দেশের প্রতি অনুগত থাকিবো...জাতীয় পতাকায় স্যালুট, জাতীয় সংগীতে গলা মেলানো। শেষ হলেই বেজে উঠতো দফতরির ঘন্টা। একবার। প্রথম পিরিয়ড। প্রথম শ্রেণির স্কুলবেঞ্চ। রূপা, রনি, রাজিব, সবুজ সবাই এক বেঞ্চে। অশোকা দি'র গম্ভীর মুখ। সবুজ রঙের হাজিরা খাতা। রোল কল। দাঁড়িয়ে উচ্চকন্ঠে 'উপস্থিত আপা'।কালিবাড়ি মন্দিরের গা ঘেঁষা ইটের ওয়ালগাঁথায় ঢেউটিনের দোচালা। ক্লাসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছোট্ট চোখে প্রথমদিনই দেখে নিয়েছিলাম গোল্লাছুট খেলার অবারিত মাঠ আর টলটলে এক টুকরো পুকুরকে। হাতে ধরা আমার বই, প্রাথমিক গণিত আর সামনে শিক্ষকের টেবিলে ঊষা মাসি, মঞ্জু দি, অশোকা দি, আলপনা আপা। হাজিরা খাতায় ভর্তি রোল ২৭।ব্ল্যাকবোর্ড ডাস্টার চক। আমার বইয়ের প্রথম পাতা। আতা গাছে তোতা পাখি। রুলটানা খাতার প্রথম পাতা ভরে নিজের নামের বানান শেখা। আমার উত্তরণ। আমার বড় হওয়ার ভান করা। স্কুলের মাঠ। দাঁড়িয়াবান্ধা। ছুঁয়ে দিয়ে ভোঁ দৌঁড়। কালিবাড়ির গৌরমন্দিরে বাল্যভোগ। আর হলুদ কল্কি ফুলের ডালে একটা দুটো কাঠঠোকরা,ঠক...ঠক...ঠক...দফতরির একটানা ঘন্টা। ছুটি। মাটি জড়ানো পা কেডসে ঢোকানো। স্কুল গেটে হজমির পুরিয়া। লাল সবুজ কাঠি বরফ। আর চার আনায় পাওয়া নারকেল ছড়ানো সাদা বরফ।এরপর প্রতিদিনের একই নির্ঘন্ট…প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বরফপানি দিন। এলান্টিং বেলান্টিং দিন। ওপেন্টি বায়োস্কোপের বিবিয়ানার এঁটে বাঁধা চুলে মুক্তো জড়াতে জড়াতে আমি এগোতে থাকি সাহেববাবুর বৈঠকখানার দিকে। চলবে...
    নজরুল ও তাঁর শ্যামা মা - অনুরাধা কুন্ডা | অলংকরণ: রমিত লীলা মজুমদারের অহি দিদির গল্পে আছে যখনই রান্না করতে বসতেন ন দশটা কচি কচি ছেলে মেয়ে তাকে এসে ঘিরে ধরে বসত। অহি দিদি নানা রকম খাবার করে তাদের খাওয়াতেন কিন্তু তারা কেউ কথা বলত না। গল্পের শেষে গিয়ে জানা গেল যে এই বাচ্চারা এখনকার বাচ্চা নয়। তারা ১০০ বছর আগের বাচ্চা যাদের এক দুষ্টু লোক জিভ কেটে দিয়েছিল খাওয়ার সময় তারা ভারী গন্ডগোল করতে বলে। লীলা মজুমদারের গল্প অথচ এই ভারী নিষ্ঠুর কাহিনীটি গল্পের মূল জায়গাতে রয়েছে। কেন জিভ কেটে দিয়েছিল তারা দুষ্টু বাচ্চা বলে না অন্য জাতের বাচ্চা বলে? লিলু পিসি সেসব কথা বলে যাননি কিন্তু আমরা এখন যে সময় বাস করি সেই সময় বসে এটা মনে হতেই পারে যে বাচ্চাগুলো বোধহয় অন্য জাতের ছিল। তাই তাদের কল কল করা জিভ, কেটে দিয়ে তাদের কচি মুখের সব কথা বন্ধ করে দিতে দুষ্টু লোকদের কোন অসুবিধা হয়নি। যে সময় আমরা বাস করি সেই সময় দলিত হবার অপরাধে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা, উঁচু জাত আর নিচু জাতের কলহ জনিত সংঘাতে জেরবার সমাজ বড় দূষিত হয়ে আছে। আর তাই এই সময় দাঁড়িয়ে, "জাতের নামে বজ্জাতি সব" বলে ওঠা, সমস্বরে বলে ওঠা, চিৎকার করে বলে ওঠা দরকার। সেই চিৎকার, সেই দ্রোহ সেই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম যিনি লেটোর দলে নাম লিখিয়ে নাটক লিখেছিলেন, লিখতে শিখেছিলেন গান, যার ধর্ম ছিল প্রকৃত অর্থেই মানবিকতা। ইদানিংকালে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভিডিও গুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে ঘরে ঘরে ঢুকে কিছু মানুষ প্রশ্ন করছেন আপনার বাড়িতে তুলসী গাছ আছে? তাতে জল দেওয়া হয়নি নিয়মিত? আপনার বাড়িতে ঠাকুর ঘর আছে? আপনি পুজো করেন? তারা মানুষের ঘরের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছেন ঠাকুরঘর দেখবার জন্য এবং রীতিমতো শাসন করছেন যে দেবতার পূজা ভালোভাবে বাড়িতে হচ্ছে না। ২০২৬ সালে বসে আমাদের দেখতে হচ্ছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা বলছেন যে সনাতনপন্থী হয়ে তারা কোনরকম অনাচার সহ্য করবেন না এবং হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের বিবাহ তারা লাভ জিহাদ বলে ঘোষণা করছেন। যে দেশে কাজী নজরুল ইসলাম শ্যামা সংগীত লিখেছেন, লিখেছেন কৃষ্ণ ভজন আর লিখেছেন "বলো বীর বলো উন্নত মম শির", সেই দেশের বীর পুঙ্গবরা গৃহস্থ বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাত রক্ষার জন্য শাসানি-ধমকানি দিচ্ছেন। মৌলবাদ যখন সভ্যতাকে গিলে খাওয়ার জন্য অজগরের মতন হাঁ করে রয়েছে, তখন এ কথা মনে করা আবশ্যক কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় ১০০ টি শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন। সেই সমস্ত শ্যামা সংগীত নিয়ে "রাঙা জবা" নামে একটি আলাদা গানের গ্রন্থ রয়েছে। অধুনা উগ্র মৌলবাদের পাল্লায় পড়লে তাঁকে হয়তো প্রবল হেনস্থা হতে হত জাতে মুসলমান হয়ে শ্যামা সংগীত লিখে ফেলার জন্য। নজরুলের শ্যামা সঙ্গীতে আশ্চর্য ভক্তিভাব। কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন, কথায় আর সুরে বাঙালির মন প্রাণ শীতল করেছে। কোন বাঙালি না "শ্যামা নামের লাগল আগুন "শুনে আপ্লুত হয়েছেন! অসাম্প্রদায়িকতার অপর নাম কাজী নজরুল ইসলাম। পুত্র বুলবুলের মৃত্যুতে তিনি শোকাহত। কি করে শান্ত করবেন নিজেকে দিশা পাচ্ছেন না। আবেগ উথলে ওঠে, নজরুল দিশাহারা হন বারবার আর সেই শোক পারাবার পার হওয়ার জন্য আকুল হয়ে ওঠেন। সান্নিধ্যে এলেন বরদাচরণ মজুমদারের। যোগী বরদাচরণ মজুমদার নজরুলকে শাক্ত সাধনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পুত্র শোকে ক্লান্ত নজরুলের মন কোথাও যেন একটি অবলম্বন খুঁজে পেল। ভয়ংকরী নয়, ধ্বংসকারিনী নয়, কাল রুপিনী নয়। কালিকা মূর্তির মধ্যে নজরুল খুঁজে পেলেন মাতৃমূর্তি। ঠিক যেমন রামপ্রসাদের গান। যেমন কমলাকান্তের শ্যামা সংগীত। দেবী সেখানে দেবী নন। তিনি জননী রুপা। মানুষ যখন মনের মধ্যে হাহাকার করে, তখন অবলম্বন হিসেবে সে বোধহয় মাকে খুঁজে বেড়ায়। বাঙালি হৃদয়ে মাতৃমুর্তির স্থান বড় অপরূপ। সে কখনো মা, কখনো মেয়ে। মা ডাকের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কন্যা। কন্যাকে মা বলে ডেকে শান্ত হয় মন। বাঙালির এই চিরকালীন আকুতি কে যে নজরুল রাগ প্রধানের সুরে বেঁধে ফেললেন, তাকে হিন্দু বা মুসলমান বলে আখ্যা দিয়ে, তার মেধা মনন আর হৃদয়ের বিশালত্বের পরিমাপ করবে কে?বুলবুল অকালে মৃত। কবি লিখেছেন "শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয়।" কিন্তু তার শূন্যতা তাতে পূর্ণ হয়নি। পুত্র শোকে আকুল পিতৃ হৃদয় শান্ত হয়েছে শাক্তসাধনার খোঁজ পেয়ে। একইসঙ্গে ইসলামী গান লেখা এবং শাক্ত সাধনার গান লেখা, এ বড় কঠিন কাজ। দুর্লভ প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম এই অসম্ভব কঠিন কাজ সম্ভব করেছিলেন দরদিয়া মননে। ইসলামী গান যখন লিখেছেন তখন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে" গানে যে আকুতি, সেই একই আকুতি ফুটে উঠেছে যখন এসে শ্যামা সঙ্গীতে লিখেছেন "স্থির হয়ে তুই বোস দেখি মা"। হিন্দু না "ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন, কান্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা'র"। এই অসম্ভব সাহসী উক্তি যাঁর কাব্য ভাষা, তিনি যে একাধারে ইসলামিক গান এবং হিন্দু ভক্তি গীতি রচনা করে সুর পিপাসু বাঙালির মন মাতিয়ে দেবেন তাতে সন্দেহ কিসের! কিন্তু শুধু মন মাতলে তো হবে না।মন শান্ত হবে কীসে। একদিকে স্ত্রী প্রমীলার অসুস্থতা, অন্যদিকে পুত্রশোক। কবি স্থিতধী হতে চাইছেন।তাই কী দেবী কালিকাকে মাতৃরূপে দেখেছেন? আর ঐ ব্যক্তিগত শোক উপশমের জায়গা থেকে উপনীত হয়েছেন মহাকালের কোলে মহাকালীর বন্দনায়? শোকে,প্রবল সন্তাপে মানুষ মাতৃক্রোড় খোঁজে।একমাত্র মা পারেন শোকের ক্ষতে স্নেহের মলমটি লাগাতে। নজরুল তাই কালীর শক্তিময়ী রূপ আর স্নেহময়ী মাতৃরূপকে আরাধনা করেছেন অনির্বচনীয় আকুতিতে...শ্যামা নামের লাগল আগুন আমার দেহ ধূপকাঠিতে,যতো জ্বালাই সুবাস ততো,ছড়িয়ে পড়ে চারিভিতে..। ব্যক্তিজীবনের শোকে যে দেহ, মন পুড়ছে,তাকে তিনি সমর্পণ করেছেন মায়ের পায়ে। আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হচ্ছে দেহ মন...ভক্তি আমার ধূমের মতো,উর্দ্ধে উঠে অবিরত..এই আকুতি তো একেবারে ঘরোয়া গৃহস্থ আজন্ম স্নেহের কাঙাল বাঙালি হৃদয়ের আর্তি। রবি ঠাকুর বলেছেন..আমার এ ধূপ না জ্বালালে,গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে।তাঁর নিঠুরকে সাধারণ মানুষ ততোটা বোঝে না,যতোটা বোঝে নজরুলের কালিকাকে। অ্যাবস্ট্র্যাক্ট নয়। কনক্রিট। মানুষ মূর্তি বোঝে। রবীন্দ্রনাথের নিঠুর তাই অনেকটা দূরের। মা বড় কাছের। তাঁর আরাধনায় অন্তরলোক স্নিগ্ধ, শান্ত হয়, আর পুত্রশোকাহত পিতা অপেক্ষা করেন, কবে তাঁর দেহ ভস্ম হবে..সেই ভস্মে আঁকা হবে মায়ের কপালের তিলক। নিজেকে নিবেদন করার এই আকুলতা, এমন ভক্তি, নিজেকে নিঃশেষ করা নিবেদন, এমন শ্যামা সংগীত কজন লিখতে পেরেছেন? ২০২৬ সালে এসেও আমরা হিন্দু মুসলমানের উর্ধ্বে উঠতে পারলাম না। এখনো আমাদের আলোচ্য বিষয় ওরা হিন্দু না, ওরা মুসলমান? তবে নজরুল কেমন করে লিখলেন এমন গান? কোন অপার সাধনায়, গভীর মেধায় এবং অনন্য ভক্তিতে লিখলেন "মহাকালের কোলে বসে গৌরী হল মহাকালী।"বিশেষ করে এই গানটিতে কালীর যে রূপ নজরুল বর্ণনা করেছেন সেটি আমাদের বিস্মিত করে। দেবী কালিকাকে মূর্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে এই সৌরজগতের এক প্রকাণ্ড অংশ হিসেবে ভাবা, কল্পনার কি বিস্ময়কর প্রকাশ। "তবু মায়ের রূপ কি হারায়, সে যে ছড়িয়ে আছে চন্দ্র তারায় মায়ের রূপের আরতি হয় নিত্য সূর্য প্রদীপ জ্বালি"।এই শ্যামা সংগীতটিতে কিন্তু নজরুল কংক্রিট থেকে একেবারে অ্যাবস্ট্রাক্ট এর দিকে চলে গেছেন এবং সেটিও চূড়ান্ত অ্যাবস্ট্র্যাক্ট। অপরিসীম ক্ষমতা বলে একজন কবি এই কল্পনা করতে পারেন। মহাকালীর যে কৃষ্ণবর্ণ রূপ সেটি তিনি প্রত্যক্ষ করছেন রাত্রির গভীর কালো আকাশের মধ্যে। চন্দ্র তারার গহনা পরা মাতৃ মূর্তি। মহাকাল এবং মহাকালী, উভয়কে এই সৌরজগতের অংশ হিসেবে কল্পনা করে, কালের এবং কালীর সম্পর্কের এক অপূর্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন কবি নজরুল ইসলাম। আবে সেই একই সঙ্গে বজায় রেখেছেন কালির ঘরোয়া অন্য একটি রূপ। "উমা হলো ভৈরবী হয় ভৈরবেরে বরণ করে" হেরি শিবের সিরে জাহন্নবীরে শ্মশানে মশানে ঘোরে।" দুর্গা হোমা এবং কালি যে একই মহাশক্তির বিভিন্ন রূপ তা এই ছোট্ট গানটির মধ্যে দিয়ে অপূর্ব ভাবে প্রকাশিত। অন্ন দিয়ে ত্রি জগতে অন্অনদা মোর বেড়ায় কেঁদে ভিক্ষু শিবের অনুরাগে ভিক্ষা মাগে রাজ দুলারি। একটি গানের মধ্যে মহাশক্তির এমন বিবিধ প্রকাশ আর কোন ভক্তিগীতিতে আছে? মুহূর্তে কালিকা হয়ে গেলেন ঘরের মেয়ে উমা, শিবের প্রেমে মাতোয়ারা উমা তিন ভুবনে অন্ন জুগিয়ে বেড়ান আর তার নিজের সংসারে কিনা অন্নেরর অভাব! অভাবে বাংলার দরিদ্র মানুষ নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ মধ্যবিত্ত মানুষ এই অন্নাভাব বড় ভালো বোঝে। তাই যে দেবী কালিকাকে তারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে প্রত্যক্ষ করতে পারেনা, তাকে দেখে ফেলে ওই ছোট্ট উমার মধ্যে। শিবের ঘরনী হয়ে তার যে গৃহিনীপণা, নজরুলের গানে তার বিশ্বস্ত প্রকাশ। তাই মায়ের কাছে নালিশ জানাচ্ছেন সন্তান। "আমার যারা দেয় মা ব্যথা আমায় জারা আঘাত করে তোরই ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী"। কোথায় যেন কানে বাজে "সকলি তোমারি ইচ্ছা"। কিন্তু নজরুল নিজস্বভাবে স্পষ্ট। "আমার যারা ভালোবাসে বন্ধু বলে বক্ষে ধরে তোরই ইচ্ছা ইচ্ছাময়ী আমায় অপমান করে যে মাগো তোরই ইচ্ছা সে যে।" জীবনের বিভিন্ন ওঠা পড়া কি নজরুলকে এইভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল?" আমায় যারা যায় মা ত্যেজে যারা আমার আসে ঘরে তোর ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী।" ভক্তি ভাবে পরিপূর্ণ, স্ফটিকের মত টলটলে স্বচ্ছ নিবেদন। ব্যথিত শোকাতুর সন্তান যেন নালিশ করছে মা-কে। একমাত্র মা-ই পারেন তার আহত, অপমানিত হৃদয়টিকে শান্ত করতে। একমাত্র বাঙালি ঘরেই দেবীকে মা এবং মেয়ে, এই দুইভাবে আরাধনা করা হয়। নজরুল তাই লিখতে পারেন "আমার ক্ষতি করতে পারে অন্য লোকের সাধ্য কিনা, দুঃখ যা পাই তোরই সে দান মাগো সবই তোর মহিমা।" এ গান যেন স্বগতোক্তি। সমস্ত দুঃখের স্থলনে এই গানের মধ্যে দিয়ে। সুরে, ভাবে, মননে, কোথাও এতোটুকু ঘাটতি নেই "তাই পায়ে কেহ দলে যবে, হেসে সয়ে যাই নীরবে।" সমর্পণের এই দর্শন সাধনার মূল কথা। তাই এই অপূর্ব ভাব সাধনার আরেক প্রকাশ আমরা দেখি "বলরে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণ তল" গানে।কবি বলছেন, "মায়াতরুর বাঁধন টুটে মায়ের পায়ে পড়লি লুটে, মুক্তি পেলি উঠলি ফুটে আনন্দ বিহ্বল, তোর সাধনা আমায় শেখা জীবন হোক সফল।"এ যেন ইংরেজ কবি জন কিটসের negative capability আহরণ করার সাধনা।"কবে তোরই মতো রাঙবে রে মোর মলিন চিত্ত দল"সম্পূর্ণ নিজের সত্তা বিসর্জন দিয়ে, ফুলের মতো নির্বিকারত্ব প্রাপ্তি। মাতৃ সাধনার মূল মন্ত্র। এই ভক্তির কোন জাত নেই। যে ভক্তি নিয়ে তিনি দেবী কালিকাকে মহাবিশ্বের মহাকালী রূপে দেখেন সেই একই ভক্তি নিয়ে তিনি লেখেন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে, মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে যেন উষার কোলে রাঙা রবি দোলে।"এই ভক্তি ভাবে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোন হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব নেই এবং জাত পাতের কোন প্রশ্নই নেই কারণ সন্তান আর মায়ের সম্পর্কের মধ্যে জাত আসেনা। এই সেই কাজী নজরুল যিনি লিখেছেন "বল বীর বল উন্নত মম শির", লিখেছেন "আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন।" লিখেছেন "আমি টর্পেডো আমি ভীম ভাসমান মাইন।" সেই তিনি আবার পরম ভক্তি ভরে মায়ের সঙ্গে সন্তান সম্পর্ক স্থাপন করে জানিয়েছেন তাঁর সমস্ত সুখ,তাঁর বেদনা তাঁর অভিমান তার অপমান। গানের মধ্যে দেবীর সঙ্গে পূজারীর, মায়ের সঙ্গে সন্তানের যে বিভিন্ন রকম সম্পর্ক উঠে আসে তা কিন্তু বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য। কখনো মা, কখনো রাঙা জবার বায়না ধরে কাঁদা কালো মেয়ে...আবার সেই তারার মালা চুলে গাঁথা এলোকেশী কন্যা। মুহূর্তে রূপান্তর। ঘরোয়া ক্রন্দনরত মেয়েটি নিমেষে সৌরজগতের মহাশক্তির প্রকাশ হয়ে ওঠে...তার যুগল আঁখি সূর্য চাঁদ। অনুরাগের রাঙা জবা থাকুক তাঁর মনের বনে,কালো মেয়ের রাগ ভাঙাতে তিনি ফুলের খোঁজে ঘোরেন...রাঙা চরণ দেখতে পেয়ে তাঁর শান্তি। পুত্রশোক কী এইভাবে কিছুটা শান্ত হয়েছিল তাঁর?" আমার আর কোনো গুণ নেই মা তারা"। স্বীকারোক্তি অকপট। "হাত বাড়িয়ে মা তোর কোলে যাব না আর মা মা বলে...মা হয়ে তুই ঘুরে বেড়াস,আমায় ধূলায় ফেলে রেখে..তোর আর ছেলেমেয়ে অনেক আছে..আমার শুধু নাই যে কেহ।" মা বেটার সম্পর্কে অভিমান আর আদর মিশিয়ে দেন কবি। এই সম্পর্কের কোনো দেশ নেই, জাতি নেই, ধর্ম নেই, আবার বাঙালিয়ানায় মোড়া একটি মিষ্টত্ব আছে, দেবী থেকে সে মুহূর্তে হয়ে ওঠে তাঁর 'হাবা মেয়ে'।"কোনো অঙ্ক শেখাও নি তো, তোমার অঙ্ক বিনা তারা।" ভাগের অঙ্ক শেখেননি নজরুল। তাই তাঁর ভক্তি এতো শুদ্ধ। সুর এতো প্রাণবন্ত। জগতজুড়ানি শ্যামার কাছে এক মাতৃহারা,সন্তানহারা প্রাণ। মা ছেলেকে মারে ধরে, কিন্তু কাছছাড়া করে না। চিরমাতৃহারা সন্তান আশ্রয় খুঁজছে ছোট শিশুর সারল্য নিয়ে। শব্দ চয়নে কী বিস্তার। "জুড়ানো" শব্দটি একান্ত বাঙালি। তার থেকে ' জুড়ানি', একেবারে ' জগতজুড়ানি'। তাকে বিদেশী ভাষায় ব্যক্ত করা মুশকিল। নজরুলের আবেগ বড় শক্তিশালী, শবের মাঝে শিবজাগানো শ্মশানকালীতে তাঁর কাছে আনন্দের নন্দিনী। কল্পনার বিস্তারে বিস্মিত হতে হয়। মা'কে পাষাণী বলেছেন, মা যে লুকিয়ে বেড়ান লোকে লোকে। আর মা কে না পেয়ে তাঁর ব্যথা ভরা হৃদয় জবা হয়ে ফোটে। আবার সেই নেগেটিভ কেপেবিলিটি। সেই নিবেদন আর ভক্তি। লেটোর দলে গানবাঁধা নজরুল, বিপ্লবী, বিদ্রোহী, অশান্ত, আবেগমথিত নজরুলের এক অনন্যরূপ খুঁজে পাই তাঁর শ্যামাসংগীতের কথায়, ভাবে, সুরে। তিনি কতোবড় ভক্ত ছিলেন,তা প্রমাণ করার জন্যে নয়,শাক্তসাধনায় কত গভীর ছিল তাঁর জ্ঞান তাও প্রমাণ করার জন্যে নয়...জাত পাতের তফাৎ জলাঞ্জলি দিয়ে তাঁর যে অনাবিল মনখানি ছিল, সেই মনের স্পর্শ পাওয়ার জন্যে। এই তীব্র হানাহানির সঙ্কটকালে, সাম্প্রদায়িকতার বীভৎস আস্ফালনে,পেশীশক্তির আগ্রাসনের সময়ে, একবার অন্তত মনে করা, কাজি নজরুল ইসলাম গান বেঁধেছিলেন, শ্যামা মায়ের গান। তাঁর ইসলামের সঙ্গে ভক্তিগানের কোনো বিরোধ ছিল না, কোথাও রসবিচ্যুতি ঘটেনি, সুরধারায় এক ভক্তিবিপ্লব ঘটে গেছে।নজরুলের সেই প্রবল শক্তিশালী অথচ শিশুর মতো সরল মনটি আজ ভারতবর্ষে বড় দরকার। যে দেশে লাভ জিহাদের নামে মানব হত্যা হয়, দলিত জল খেতে গেলে তাকে পিটিয়ে মারা হয়, দলিত মানুষ জন্মদিনের কেক কাটলে তাকে তথাকথিত উঁচু জাতের লোক হত্যা করে আর লীলা মজুমদারের মতো লেখককে জিভ কাটা ছেলেমেয়েদের গল্প লিখতে হয়, সেই দেশে নজরুল জন্মেছিলেন, যে ভক্তিভাবে ইসলামিক সঙ্গীত লিখেছিলেন, সেই একই ভক্তিভাবে শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন…যে গান আজও মানুষকে জাতপাতের উর্ধে তুলে এক মহাজাগতিক বিশ্বাস আর শরণের সন্ধান দেয়। গান গাওয়া হয়, অনুধাবন হয় কী?
  • হরিদাস পালেরা...
    বাংলার হিন্দুত্ব এবং শ্যামাপ্রসাদের শিক্ষা-এজেন্ডা: কিভাবে হতে পারে বিকল্প বাম প্রস্তুতি? - Tuhinangshu Mukherjee | রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন শুধু সংসদ বা বিধানসভার আসনের হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রকৃত আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় সুপারস্ট্রাকচার-এর মধ্য দিয়ে: বিশ্ববিদ্যালয়, পাঠ্যপুস্তক, বুদ্ধিজীবী সমাজ, সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান এবং দৈনন্দিন সাধারণ মানুষের চেতনায়। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) দীর্ঘদিন ধরে এই গ্রামশিয়ান কৌশল সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। কেন্দ্রে ক্ষমতায় থেকে তারা আইসিএআর, ইউজিসি, এনসিইআরটি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপাচার্য নিয়োগ পর্যন্ত — প্রতিটি স্তরে একটি সুচিন্তিত সাংস্কৃতিক হেজেমনি প্রতিষ্ঠার প্রকল্প চালিয়ে গেছে এবং সামাজিক গণমাধ্যমে নিজস্ব বয়ান নির্মাণকে একটি অন্য স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।পশ্চিমবঙ্গ যে এতদিন এই প্রকল্পের বাইরে ছিল — এইরকম টা মনে করবার কোন কারণ আর অন্তত আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু,৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসন এবং পরবর্তী তৃণমূল সরকারের আমলে বাংলার সাংস্কৃতিক জমি, চিন্তার জগৎ, বৌদ্ধিক পরিসর বা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডর— সবকিছুতেই একটি বাম-উদারনৈতিক সংস্কৃতির আধিপত্য বজায় ছিল। তৃণমূল ক্ষমতায় থেকে বাম দলগুলির সাথে নানা রকম নিপীড়নমূলক কাজ কারবার করে থাকলেও এই বাম ঘেঁষা সংস্কৃতিকে একপ্রকার নিজের মতন থাকতে দিয়েছিল।সর্বভারতীয় মিডিয়াগুলির একমুখী প্রচার, গণমাধ্যমের এক তরফা উগ্র জাতীয়তাবাদী বয়ান,হিংসানির্ভর সিনেমা, কংগ্রেস মুক্ত রাজনীতি এসব কিছুর ভারেও বাংলার নাগরিক মননে সেই ঝোঁক রয়েই গেছে বেশ কিছুটা। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচন পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, এই চিত্র ক্রমশ বদলাবার আয়োজন চলছে — এবং এই বদলের একটি কেন্দ্রীয় হাতিয়ার হয়ে উঠছেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।শ্যামাপ্রসাদবাবুকে কেন্দ্রে রেখে একটি নতুন শিক্ষা-এজেন্ডা তৈরি হচ্ছে। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী (২৩ জুন) এবং জন্মবার্ষিকী (৬ জুলাই) উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা, তাঁর নামে স্কুল-কলেজে প্রচার, সেমিনার আয়োজন, পাঠ্যক্রমে তাঁর অন্তর্ভুক্তি — এই সমস্তকিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলি একটি সুসংগত হেজেমোনিক প্রকল্পের অংশ। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরাসরি রাজনৈতিক উপস্থিতি — এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা — একটি বহুস্তরীয় শিক্ষা-রাজনীতির নমুনা উপস্থাপন করতে চলেছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইটি, আইআইএম প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে যে ধারণাগত পরিবর্তন হয়েছে বা হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে, তারই ছায়া বাংলার উচ্চশিক্ষায়ও পড়তে চলেছে এ কথা বলাই যায়।কোন একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ একটি প্রতীকী রাজনীতির অংশ। নতুন দিল্লির শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় স্কুল থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণ — এবং সম্প্রতি ফিউচার এডুকেশন সংস্থার মাধ্যমে "২৫ বছরের শিক্ষাগত উৎকর্ষ" উদযাপনে শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুবার্ষিকীর উপর জোর দেওয়া — এই সামগ্রিক প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করে। রাজনৈতিক সমাজতাত্ত্বিক পার্থ চ্যাটার্জি তাঁর The Nation and Its Fragments গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে উপনিবেশোত্তর ভারতে জাতীয়তাবাদ একটি "বাহ্যিক" বা material domain এবং একটি "অভ্যন্তরীণ" বা spiritual domain-এর মধ্যে বিভক্ত। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি সুচতুরভাবে এই দ্বিতীয় ক্ষেত্রটিকে — অর্থাৎ সংস্কৃতি, ধর্ম, শিক্ষা — নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছে বিগত প্রায় এক শতক ধরেই, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাদের এই প্রকল্প একটি নির্দিষ্ট সাংগঠনিক কায়দায় এগিয়েছে। তারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে, গ্রামে গঞ্জে, মফস্বলে মূলত ধর্ম এবং ভারতীয় সংস্কৃতি র মোড়কে একটি নির্দিষ্ট চিন্তাধারার ভেতর সংখ্যাগরিষ্ঠ কে আটকাতে পেরেছে এ কথা স্বীকার না করে উপায় নেই। বর্তমানে বাংলায় শ্যামাপ্রসাদের ব্যক্তিত্বকে সেই প্রকল্পের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, এক্ষেত্রে সুবিধের জায়গাটি হল তিনি একজন শিক্ষাবিদ, প্রাক্তন কংগ্রেস সদস্য এবং মুসলিম লীগের বিরোধী হিসেবে পরিচিত, পশ্চিমবঙ্গীয় বাংলা ভাষা এবং পৃথক রাজ্যের দাবির ক্ষেত্রে তিনি অগ্রগণ্য ছিলেন তাও সত্য— ফলে তাঁকে একটি মধ্যপন্থী ও গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ, এবং কোলকাতা কেন্দ্রিক যে উত্তর ঔপনিবেশিক এলিট মনন সেখানে প্রবেশ করাও খানিকটা সুবিধাজনক প্রতিপন্ন হবার সুযোগ আছে।ইতিমধ্যেই এনসিইআরটি পাঠ্যপুস্তকে যে সমস্ত পরিবর্তনগুলি হয়েছে যেমন, মুঘল ইতিহাসের সংক্ষেপণ, হিন্দু সভ্যতার গৌরবায়ন, দেশভাগের একতরফা বয়ান কিংবা অতি সম্প্রতি রুশ বা ফরাসি বিপ্লবের অপসারণ - এই সমস্তকিছু একটি বৃহত্তর হিস্টোরিওগ্রাফিক প্রকল্পের অংশ। বাংলার প্রেক্ষাপটে, এই প্রকল্পে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকাকে অতিরঞ্জিত ও একমাত্রিক করে উপস্থাপনের প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। পশ্চিমবঙ্গ স্বাধীনতার ইতিহাস এবং দেশভাগের ইতিহাসে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আছে। হিন্দু মহাসভার সাথে তাঁর যোগাযোগ, বাংলা ভাগের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান, এবং পরবর্তীতে জনসংঘ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা — এই প্রতিটি বিষয়ে ঐতিহাসিক গবেষণার বহু সূক্ষ্মতা আছে যা হিন্দুত্ববাদী বয়ানে উপেক্ষিত থাকে। শ্যামাপ্রসাদ এর ভূমিকা অস্বীকার করবার কোন কারণ নেই, তা থাকা উচিতও নয়, কিন্তু তাতে বেশ কিছু অস্বস্থিও সমভাবে উপস্থিত যা এড়িয়ে যাবার কারণ নেই।নতুন হেজেমনিক প্রকল্পের মূল বক্তব্যগুলি নিম্নরূপ:প্রথমত, শ্যামাপ্রসাদকে বাংলার "রক্ষাকর্তা" হিসেবে উপস্থাপন — বিশেষত অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দু স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে।দ্বিতীয়ত, তাঁর শিক্ষাগত অবদানকে — কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণতম উপাচার্য হিসেবে তাঁর কার্যকাল — হিন্দু শিক্ষাদর্শের প্রতীক হিসেবে নির্মাণ করা।তৃতীয়ত, কাশ্মীর প্রশ্নে তাঁর মৃত্যুকে "আত্মবলিদান" হিসেবে উপস্থাপন করে একটি শহীদ-আখ্যান তৈরি করা।চতুর্থত, এই আখ্যানকে বিশ্ববিদ্যালয় সেমিনার, পাঠ্যবই এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকতা দেওয়া।কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহল তথা শিক্ষা প্ৰতিষ্ঠান এবং তৎ সম্পর্কিত যে ডিসকোর্স, সেটিই বলা বাহুল্য হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য। কারণ যতদিন কোলকাতা, যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক চর্চা এবং আনন্দবাজার-এর মতো মিডিয়া প্রতিষ্ঠান বামপন্থী ও উদারনৈতিক বয়ানের পক্ষে থাকবে, ততদিন বাংলায় হেজেমনির লড়াই অসম্পূর্ণ থাকবে। কাজেই একটু একটু করে এই বয়ানকে যত প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো যাবে, ততই হিন্দুত্ব ভাবনাকে শহুরে মননে একটি প্রতি চেতনা হিসেবে দাঁড় করানো যাবে। শ্যামাপ্রসাদ কে সামনে রেখে এই চেতনা নির্মাণের প্রকল্পটিকেই শুরু করা হচ্ছে বলে মানতে অসুবিধা থাকার কথা নয়। সত্যি বলতে, রাজনৈতিক ক্ষমতার যে সোপানে এই মুহূর্তে এই শক্তি দাঁড়িয়ে আছে, তাতে খুব বেশি বাধার সম্মুখীন হওয়াও কল্পনীয় নয়। খুব উল্লেখযোগ্য ভাবে ইতিমিধ্যেই কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলে শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে বই এর চাহিদা কিংবা কোলকাতা বইমেলা কেন্দ্রিক নতুন কিছু প্রস্তাব – সেই দিকেই ইঙ্গিত রাখে। এখন প্রশ্ন হল- এই অবস্থার মোকাবিলা কিভাবে করা যেতে পারে? প্রথমত দীর্ঘ একটি সামাজিক অবস্থানের ফলে আপনা থেকেই কিছু প্ৰতিরোধ এর বিরুদ্ধে তৈরী হচ্ছে বা হবে বলে মনে করা যেতে পারে, কিন্তু কিছু মৌলিক বদল বা চিন্তার অবকাশ অবশ্যই থাকছে।বিনায়ক দামোদর সাভারকার ১৯২৩ সালে তাঁর Hindutva: Who Is a Hindu? পুস্তিকায় "হিন্দুত্ব"-এর যে সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, সেটি মূলত একটি রাজনৈতিক-ভৌগোলিক পরিচয় — ধর্মীয় নয়। সাভারকার নিজে ঘোষিত নাস্তিক ছিলেন। তাঁর "হিন্দু" ধারণায় প্রধান মানদণ্ড ছিল: ভারতকে পিতৃভূমি (fatherland) এবং পুণ্যভূমি (holy land) উভয়ই মনে করা। এই সংজ্ঞানুযায়ী মুসলিম ও খ্রিস্টানরা স্বতঃই বাদ পড়েন কারণ তাদের "পুণ্যভূমি" ভারতের বাইরে। এই ধারণাটি মূলত ইউরোপীয় জাতিবাদী আন্দোলন — বিশেষত জার্মান রাষ্ট্রবাদ এবং ইতালীয় ফ্যাসিবাদ — থেকে অনুপ্রাণিত। এম এস গোলওয়ালকার তাঁর We or Our Nationhood Defined (১৯৩৯) গ্রন্থে নাৎসি জার্মানির "জাতিশুদ্ধি"-র প্রশংসা করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক তথ্য অস্বীকারযোগ্য নয়। হিন্দুত্ব তাই হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধি নয় — এটি একটি আধুনিক রাজনৈতিক আদর্শ যা ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের ছাঁচে ভারতীয় ধর্মীয় পরিচয়কে ঢেলে সাজিয়েছে।ভারতীয় দর্শন-ঐতিহ্যে "হিন্দু ধর্ম" বলে কোনো একক, একশাসিত ধর্মব্যবস্থা কখনো ছিল না। সনাতন ধর্মের যে বহুত্ববাদী কাঠামো, তা মূলত বিভিন্ন দর্শন-সম্প্রদায়ের একটি বিচিত্র সমাহার:সাংখ্য দর্শন — প্রকৃতি ও পুরুষের দ্বৈততা, জগতের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার প্রবণতামীমাংসা — বেদের কর্মকাণ্ডের যুক্তিসিদ্ধ ব্যাখ্যা, ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অপ্রয়োজনীয় মনে করাচার্বাক — ভারতীয় বস্তুবাদ, প্রত্যক্ষকে একমাত্র প্রমাণ বলে মানাবৌদ্ধ ঐতিহ্য — যা বৈদিক কর্তৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছেঅদ্বৈত বেদান্ত — শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ, যেখানে ব্যক্তি ও ব্রহ্মের অভিন্নতাবিশিষ্টাদ্বৈত ও দ্বৈত — রামানুজ ও মধ্বাচার্যের ভিন্ন পথমহাভারতের বিখ্যাত উক্তি: "নাহং জানামি কেবলম্" — "আমি একা জানি না" — এই বাক্যটিই ভারতীয় জ্ঞানঐতিহ্যের মূল মনোভঙ্গির প্রতিফলন। পুরাণগুলি পরস্পরবিরোধী আখ্যানে পরিপূর্ণ। বিষ্ণু পুরাণ, শিব পুরাণ এবং দেবী পুরাণের মধ্যে কোনো একক মতবাদগত ঐক্য নেই — এবং সেটাই এই ঐতিহ্যের শক্তি। হিন্দুত্ব এই বহুত্বকে মুছে দিয়ে একটি একমাত্রিক, একশাসিত ধর্মীয়-রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করতে চায়। এটি হিন্দু সনাতন ধর্মের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতিনিধিত্ব নয়। এই জায়গাটিকে অনুধাবন করে একটি প্রতি আঘাত এই মুহূর্তে ভীষণ জরুরি নাগরিক পরিসর থেকে, বিশেষ করে গৌড় বঙ্গে চৈতন্য দেবের ধারার সাথে যদি এই আলোচনাকে সংযুক্ত করা যায়।পাশাপাশি আরএসএস এবং হিন্দুত্ববাদীরা স্বামী বিবেকানন্দকে তাদের "আদর্শ পুরুষ" হিসেবে দাবি করেন। কিন্তু বিবেকানন্দের প্রকৃত দর্শনের সাথে হিন্দুত্বের মূলগত বিরোধ অনস্বীকার্য। স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৩ সালে শিকাগোর ধর্ম সংসদে বলেছিলেন: "আমি সেই ধর্মের প্রতিনিধি যা বিশ্বকে সহিষ্ণুতা এবং সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা শিখিয়েছে।" তিনি বলেছিলেন: "যে কেউ যেকোনো পথে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছাতে পারে।" তাঁর বিখ্যাত উক্তি: "দরিদ্র নারায়ণের সেবাই ঈশ্বরের সেবা" — এই দৃষ্টিভঙ্গি মূলত একটি সামাজিক ন্যায়বিচারের দর্শন, যা বর্ণ-বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে। তিনি ব্রাহ্মণ্যবাদী কর্তৃত্বকে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং বলেছিলেন ভারতের মুক্তি আসবে নিচের মানুষদের উত্থানের মাধ্যমে। বিবেকানন্দ একজন ব্যাপক ভ্রমণকারী ছিলেন — আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান, শ্রীলঙ্কা — এবং তিনি বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি ও চিন্তার সাথে সংলাপে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর দর্শন ছিল উন্মুক্ত, বিশ্বজনীন এবং সামাজিক পরিবর্তনমুখী। আরএসএসের হিন্দুত্ব যেখানে বিভাজন এবং সংকীর্ণ পরিচয় তৈরি করে, বিবেকানন্দ সেখানে সংযোগ এবং বিশ্বমানবতার কথা বলেছেন। এই দুটি মনোভঙ্গি মূলগতভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া তিনি মূলত শঙ্করের অদ্বৈত বেদান্তের উপর কাজ করেছেন, এবং যে জ্ঞানযোগের ধারণা রেখেছেন তা সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় হিন্দুত্বকে আটকে দেয়, এই বৈপরীত্য কে তুলে আনতে হবে জনসমক্ষে।নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকেও হিন্দুত্ববাদীরা নিজেদের করে নিতে চান। কিন্তু নেতাজির রাজনৈতিক দর্শন হিন্দু মহাসভা বা আরএসএসের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।নেতাজি ছিলেন একজন ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী যিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মিতে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান — সকল ধর্মের মানুষকে একত্রিত করেছিলেন। আইএনএর যুদ্ধ-স্লোগান "জয় হিন্দ" কোনো ধর্মীয় বার্তা বহন করে না — এটি একটি ভারতমাতার প্রতি ধর্মনিরপেক্ষ আবেদন। নেতাজি ১৯৪০ এ ফরোয়ার্ড ব্লকের সাথে মুসলিম লীগের সংযুক্ত ফ্রন্ট তৈরিতে আগ্রহী হন, যা হিন্দু মহাসভার কট্টর বিরোধিতার সম্মুখীন হয়, আব্দুর রহমান সিদ্দিকী মেয়র নির্বাচিত হন এই ফ্রন্টের দ্বারাই, ইতিহাসের সেই মহুর্তে তিনি বুঝতে পারেন যে হিন্দু মুসলিম যৌথ অংশগ্রহন অনেক বেশি জরুরি ব্রিটিশ দের বিপক্ষে। এছাড়া, ১৯৩০ নাগাদ তার নিজের মেয়র থাকাকালীন সময়ে তিনি যে ধরণের কর্মসূচি নিয়েছিলেন তা সরাসরি সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার মডেলের দিকও ইঙ্গিত করে, তাঁর ভবিষ্যৎ ভারতের পরিকল্পনায় সুস্পষ্টভাবে সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনা অর্থনীতির কথা ছিল। নেতাজির ইউরোপ-প্রবাস এবং জার্মানি-জাপানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ককে অনেকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, কিন্তু তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্তি — ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নয়। এই মূলগত পার্থক্যটি স্থাপন করা আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত জরুরি। নেতাজি এবং সাভারকার — উভয়ই ব্রিটিশ বিরোধী ছিলেন, কিন্তু দুজনের ভারত-দর্শন ছিল মৌলিকভাবে ভিন্ন। সাভারকার যেখানে একটি হিন্দু রাষ্ট্র চাইতেন, নেতাজি চাইতেন একটি সার্বভৌম ধর্মনিরপেক্ষ ভারত যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান।বাংলার বামপন্থী রাজনৈতিক পরিসরকে এই ব্যাপারগুলি নিয়ে ভাবতে হবে, তারা দীর্ঘদিন ধরে একটি মৌলিক সংকটে ভুগছে — যাকে আমরা আদর্শগত আউটসোর্সিং বলতে পারি। রাশিয়া, চীন বা পশ্চিম ইউরোপের মার্কসবাদী তত্ত্বকে যান্ত্রিকভাবে ভারতীয় বাস্তবতায় প্রয়োগ করার এই প্রবণতা বামপন্থাকে ভারতীয় সমাজের গভীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, এ সমালোচনা নতুন নয়, আজকেরও নয়। কিন্তু আজকের নিরিখে যে বদল প্রয়োজন তার কতটা কাছাকাছি তারা আসতে পারছেন বলা মুশকিল। বেশ কিছু বদল দেখা যাচ্ছে,কিন্তু গণ কর্মসূচির মধ্যে সেগুলো আসছে না।সমস্যাগুলি নির্দিষ্ট করে বলা যাক:প্রথমত, ধর্মের প্রতি সরলীকৃত দৃষ্টিভঙ্গি- মার্কসের "ধর্ম হল আফিম" উক্তিটির প্রেক্ষাপট ছিল ইউরোপীয় ক্যাথলিক চার্চের শ্রেণিগত ভূমিকা। কিন্তু ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য — ভক্তি আন্দোলন, কবির, রবিদাস, মীরাবাই — বহুক্ষেত্রেই সামাজিক বিদ্রোহের ভাষা হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করেছে। কবির যখন বলেন: "মন না রঙ্গায়ে, রঙ্গায়ে জোগী কপড়া" — তিনি একটি গভীর সামাজিক সমালোচনা করছেন। ভারতীয় বামপন্থা এই সূক্ষ্মতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।তাদের ধর্মের এই ক্ষেত্রটিকে চিহ্নিত করতে হবে এবং লাগাতার প্ৰচার করতে হবে।দ্বিতীয়ত, পরব সংস্কৃতির সাথে সংযোগের অভাব- ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনে পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সংস্কার এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মতো বাস্তব অর্জন থাকলেও, উৎসব সংস্কৃতির প্রশ্নে বামপন্থা প্রায়শই একটি "উপর থেকে আরোপিত" অনুভূতি দিয়েছে। সাধারণ মানুষের দুর্গাপূজা, কালীপূজা, মহরম পালনের সাথে বামদলের সম্পর্ক কখনো পারস্পরিক এবং সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেনি। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন পর্ব পালা অনুষ্ঠান, বিবিধ উৎসব বহু বছর ধরে হয়ে আসছে, এই পরিসরগুলিতে একেবারেই কোন রাজনীতি নেই বা রাজনৈতিক বোধ বা চেতনা নেই এই গোঁড়ামি একান্তভাবে বর্জনীয়, বরং এই পরিসরকে ছদ্ম হিন্দুত্ত্ববাদ থেকে কিকরে আগলানো যায় তা ভাবতে হবে। কেবল পুজোর মণ্ডপের বাইরে স্টলকেন্দ্রিক ভাবনা দিয়ে চলবেনাতৃতীয়ত, শ্রেণি-বিশ্লেষণের একমাত্রিকতা। ভারতীয় সমাজে শ্রেণি ও জাত প্রশ্ন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। কিন্তু বাংলার বামপন্থা জাতের প্রশ্নকে শ্রেণির মধ্যে দ্রবীভূত করে দেখার ভুল করেছে। দলিত আন্দোলন, আদিবাসী অধিকার — এই প্রশ্নগুলিতে বামপন্থার অবস্থান প্রায়ই অস্পষ্ট ছিল। এই নিয়ে একটি সম্পূর্ন দীর্ঘ আলোচনা দরকার- সেই দিকে না গিয়েও বলা যায় যে, একটি সংখ্যালঘু শিক্ষিত চাকরিজীবী বর্গের বাইরে যে বিপুল মধ্যম বর্গ রয়েছে গ্রাম মফস্বলে তাদের সমস্যা নিয়ে ভাবতে হবে, তাদের ভেতর থেকে নেতা তৈরি করতে হবে এবং তাদের মধ্যে দিয়েই দেশীয় চিন্তা চেতনাকে নিম্ন স্তরে নিয়ে যেতে হবে। এই বর্গের মানুষের শহুরে এলিট কালচারের প্রতি যে ক্ষোভ রয়েছে প্রথমত তাকে সম্মানের সাথে বুঝতে হবে। যে ধরণের নেতৃত্ব এই বিভাজনকে উস্কে দিতে পারে তাদের পরিহার করতে হবে।চতুর্থত, তাত্ত্বিক জড়তা। লেনিন, মাও বা গ্রামশির পাঠ গুরুত্বপূর্ণ — কিন্তু ভারতীয় বাস্তবতায় কার্যকর বাম-তত্ত্বের জন্য ভারতীয় চিন্তক ও ঐতিহ্যের সাথে গভীর সংলাপ অপরিহার্য। এমন বহু ব্যক্তিত্ব আছেন যাঁরা একই সাথে গভীরভাবে ভারতীয় এবং সামাজিকভাবে প্রগতিশীল। বাম নাগরিক পরিসরের জরুরি প্রয়োজন এই ব্যক্তিত্বদের নতুনভাবে আবিষ্কার করা এবং তাদের চিন্তাকে বর্তমান প্রাসঙ্গিকতায় উপস্থাপন করা:ভগত সিং — কমিউনিস্ট ছিলেন, কিন্তু একজন ভারতীয় কমিউনিস্ট। তাঁর Why I Am an Atheist প্রবন্ধটি ভারতীয় যুক্তিবাদী ঐতিহ্যের সাথে সংলাপে লেখা। তিনি একই সাথে জালিয়ানওয়ালা বাগের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন এবং বর্ণব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিলেন।আম্বেদকর — বামপন্থা আম্বেদকরের সাথে তার সম্পর্ক নতুনভাবে নির্মাণ না করলে দলিত-বহুজন সমাজের সাথে সংযোগ অসম্ভব। আম্বেদকরের বৌদ্ধ-দর্শনের অনুপ্রেরণা এবং তাঁর সাংবিধানিক প্রজ্ঞা — দুটিই ভারতীয় বামপন্থার জন্য অমূল্য সম্পদ।পেরিয়ার — দক্ষিণ ভারতের এই মহান যুক্তিবাদী ঐতিহ্য বাংলার বামপন্থায় যথেষ্ট চর্চিত নয়।বিরসা মুন্ডা — আদিবাসী মুক্তিসংগ্রামের এই মহান নায়ক "ধরতি আবা" (পৃথিবীর পিতা) হিসেবে পরিচিত। তাঁর আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও জমিদারি উভয়ের বিরুদ্ধে ছিল — এটি বাংলার বাম-আন্দোলনে কতটা উপস্থিত?তিতুমীর এবং সিধো-কানহু — বাংলার নিজস্ব বিদ্রোহের ইতিহাস। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা শুধু ব্রিটিশবিরোধী নয়, জমিদার-বিরোধীও ছিল। সাঁওতাল বিদ্রোহ — (১৮৫৫)— শ্রেণি, জাতি এবং উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে একটি ত্রিমুখী লড়াই।সর্বোপরি, গৌতম বুদ্ধ, যিনি নিজে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিপরীতে হিংসার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন, যার ভারতীয় ঐতিহ্য নিয়ে আজকের হিন্দুত্ববাদীরা শ্লাঘা বোধ করতে চান। এছাড়া রয়েছেন বিংশ শতকেরই অগণিত ভারতীয় চিন্তক, যেমন ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, ক্ষিতিমোহন সেন কিংবা স্বামী লোকেশ্বরানন্দ যারা হিন্দু ধর্মের ওপর সবিস্তার আলোচনা করেছেন একাধিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, যা হিন্দুত্ত্ববাদী চিন্তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষত রবীন্দ্রনাথের নেশন বিরোধী চিন্তা, যা অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এই মুহূর্তে।হিন্দুত্বের নতুন আধিপত্যের মুখে বামপন্থার জন্য কিছু পরিষ্কার সতর্কবার্তা:প্রতিক্রিয়াশীল হওয়া চলবে না- শ্যামাপ্রসাদকে শুধু খারিজ করা বা হিন্দু প্রতীককে আক্রমণ করা বামপন্থাকে "হিন্দু-বিরোধী" তকমা পেতে সাহায্য করবে — যা হিন্দুত্ববাদীরাই চায়। হিন্দু ধর্মকে অন্যভাবে উপস্থাপন করাই এর কার্যকর বিকল্প হতে পারে।অতীতের আদর্শিক কাঠামোর পুনরাবৃত্তি চলবে না- ১৯৬৮-৬৯ সালের প্রেসিডেন্সি কলেজ পত্রিকায় "ইয়াঙ্কি সংস্কৃতি ধ্বংস করো" — এই ভাষা ও মনোভঙ্গি আজকের সমাজে অকার্যকর, আন্তর্জাতিক অবস্থান অবশ্যই জরুরি কিন্তু তার ভাষা এবং উপস্থাপনা নিয়ে ভাবতে হবে। ৯০ পরবর্তী সময়েও যা বাস্তব ছিল, আজকের সমাজমাধ্যম নির্ভরতার দিনে আর তা বাস্তব প্রতিরোধের বয়ান নয়। সাম্প্রতিক ভারতে বেশ কিছু নতুন রেটরিক উঠে আসছে যুব আন্দোলনের ভেতর থেকে, সেগুলিকে নিয়ে ভাবতে হবে গভীরতার সাথে।পরিচয়-রাজনীতির ফাঁদে পড়া চলবে না - হিন্দুত্বের সাথে "মুসলিম পরিচয়"-এর বিপরীত মেরু হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করলে বাংলার হিন্দু কৃষক ও মধ্যবিত্ত থেকে বামপন্থা আরও দূরে সরে যাবে। শহরের ও আধা শহরের একটি বিরাট অংশের মানুষ হিন্দুত্ত্ববাদী প্রচারে ইতিমধ্যেই নিমজ্জিত, কেবল সংখ্যালঘু অধিকারের বয়ান একেবারেই অপ্রয়োজনীয় এবং পরিত্যাজ্য তাদের কাছে। বরং এই মেরুকরণের পরেও হিন্দু সমাজের প্রান্তিক বা মধ্যবিত্তের অবস্থার যে কোন বদলই হচ্ছেনা – এটিকে সামনে আনা কার্যকর হলেও হতে পারে।বাম বুদ্ধিজীবিতার একটি বড় দুর্বলতা হল ভারতীয় দর্শনের সাথে তার দূরত্ব। এই দূরত্ব কমাতে হবে — এবং দেখাতে হবে যে ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যের মধ্যেই এমন উপাদান আছে যা সামাজিক সাম্যের পক্ষে:চার্বাক ও লোকায়ত দর্শন — ভারতের সবচেয়ে পুরনো বস্তুবাদী দার্শনিক ঐতিহ্য। "প্রত্যক্ষমেকং প্রমাণম্" — প্রত্যক্ষই একমাত্র প্রমাণ — এই দার্শনিক অবস্থান আধুনিক বৈজ্ঞানিক মনোভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।ভক্তি আন্দোলন — কবির, রবিদাস, মীরা, নামদেব — এঁরা সবাই বর্ণ-শ্রেণির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন ধর্মের ভাষায়। ভারতীয় বামপন্থা যদি এই ঐতিহ্যকে নিজেদের করে নিতে পারে, তাহলে ধর্মীয় অনুভূতিকে প্রগতিশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা কঠিন হবে।বাউল-ফকির ঐতিহ্য — বাংলার এই অসাধারণ সম্পদ হিন্দু-মুসলিম বিভেদের বাইরে একটি মানবতাবাদী আধ্যাত্মিকতার কথা বলে। লালন ফকির বলেছেন: "সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে" — জাতি-ধর্মের সমস্ত বিভাজনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তিনি।রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ — রবীন্দ্রনাথ না বামপন্থী ছিলেন, না হিন্দুত্ববাদী। তাঁর জাতীয়তাবাদ-সমালোচনা (Nationalism, ১৯১৭), তাঁর গান্ধী-সমালোচনা, তাঁর রাশিয়া-ভ্রমণের অভিজ্ঞতা — এই সবকিছু মিলিয়ে একটি স্বতন্ত্র ভারতীয় মানবতাবাদের প্রকল্প। বামপন্থা রবীন্দ্রনাথকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে।এক্ষেত্রে আর একটি বিরাট ভূমিকা নিতে পারে মহাভারত। বহুস্বরী, বহুমাত্রিক মহাকাব্য এটি— কোনো মনোলিথিক "হিন্দু আদর্শের" পাঠ্যপুস্তক নয়। এতে রয়েছে:শান্তিপর্ব — যেখানে রাজনীতি, নীতি ও ন্যায়বিচার নিয়ে গভীর আলোচনা আছেকর্ণের আখ্যান — বর্ণব্যবস্থার শিকার একজন যোদ্ধার ট্র্যাজেডিদ্রৌপদীর কণ্ঠস্বর — যিনি পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেনএকলব্যের গল্প — বর্ণীয় শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি অসাধারণ সাক্ষ্যইরাবতী কর্ভে তাঁর গ্রন্থে মহাভারতকে একটি মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে পড়েছেন — দেবতার মহিমাগাথা হিসেবে নয়। এই ধরনের পাঠ বামপন্থার জন্য মূল্যবান সম্পদ। বেদ এবং উপনিষদেও এমন উপাদান আছে যা হিন্দুত্বের সংকীর্ণ ব্যাখ্যার বাইরে। "সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ, সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ" — "সকলে সুখী হোক, সকলে নিরোগ হোক" — এই উপনিষদিক উচ্চারণের সাথে সামাজিক ন্যায়বিচারের সংযোগ স্থাপন করা কঠিন নয়।পাশাপাশি, হিন্দুত্ববাদী শিক্ষা-প্রকল্পের মোকাবিলায় বামপন্থাকে নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল তৈরি করতে হবে:পাঠ্যক্রম বিকল্প: মুক্তিসংগ্রামের বহুকণ্ঠস্বর ইতিহাস — হিন্দু, মুসলিম, দলিত, আদিবাসী সবার অংশগ্রহণ — পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলতে হবে। এনসিইআরটি পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একাডেমিক প্রতিরোধ সংগঠিত করতে হবে।গবেষণা অগ্রাধিকার: সাবলটার্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাংলার ইতিহাস পুনর্লিখন — তিতুমীর, সিধো-কানহু, নামশূদ্র আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন — এই বিষয়গুলিতে নতুন গবেষণা জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন, ভারতীয় ধর্ম, বেদান্ত, মীমাংসা, চার্বাক কে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা।সেমিনার ও প্রকাশনা: হিন্দুত্ববাদী সেমিনারের বিরুদ্ধে বিকল্প একাডেমিক পরিসর তৈরি করতে হবে — যেখানে বাংলার বহুত্ববাদী ঐতিহ্য এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূলগত চরিত্র কে সামনে আনতে হবে।কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য — গণনাট্য, কফিহাউসের আলোচনা, লিটল ম্যাগাজিন, রবীন্দ্রসংগীত থেকে বাউল — এই সবকিছুকে পুনরায় সক্রিয় করতে হবে। হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি-প্রকল্প মূলত একটি একঘেয়েমির সংস্কৃতি — সেই একঘেয়েমির বিরুদ্ধে বাংলার বহুবর্ণ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।তবে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা একটি নিশ্চয়ই দিয়ে রাখা প্রয়োজন: ভারতীয়করণের নামে বামপন্থা যেন ধর্মীয় পরিচয়-রাজনীতির দিকে ঝুঁকে না পড়ে। লক্ষ্য হবে ধর্মীয় ঐতিহ্যের মানবতাবাদী ও সামাজিক ন্যায়বিচারের উপাদান গ্রহণ করা — ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি নয়। বাংলার বাম উদারনৈতিক পরিসরের সামনে পরিস্থিতি কঠিন — কিন্তু সম্পদ আছে, ঐতিহ্য আছে, এবং সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের দৈনন্দিন লড়াই আছে। বাংলায় হিন্দুত্বের শিক্ষা-প্রকল্প — শ্যামাপ্রসাদকে কেন্দ্র করে বিনির্মিত — একটি সুচিন্তিত গ্রামশিয়ান কৌশলের অংশ। এই কৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, পাঠ্যপুস্তক, সেমিনার এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি নতুন হেজেমনি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তবে হিন্দু ধর্মের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য হিন্দুত্বের একচেটিয়া দাবির চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ এবং অনেক বেশি প্রগতিশীল। সেই সমৃদ্ধিকে চিনতে পারা এবং তার সাথে সংলাপ করতে পারাই বামপন্থার আজকের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ। যে দ্বিজাতি তত্ত্বর ভুত চাপানোর চেষ্টা চলছে ও চলবে বাঙালির উপর মনে রাখতে হবে যে, তা সুচিন্তিত কিন্তু আর বিরাট মজবুত কিছু নয়। দুটি পৃথক রাষ্ট্রের এতদিনের অভিজ্ঞতার পর নতুন করে এই বিভাজনের উপর একটি জাতিকে প্রভাবিত করা অত সহজও হবেনা, দীর্ঘদিনের যে চিন্তা পরিসর বা জ্ঞানতাত্বিক কাঠামোয় পশ্চিমবাংলা লালিত, তার উপর ভরসা রেখে আরো বেশি দেশীয় এবং নিজস্ব ইতিহাসের চর্চা করলে ইতিবাচক ফল আসবে বলে আশা করাই যায়।
    বিমানের ওভারবুকিং, এক জেদি অর্থনীতিবিদ, আর যাত্রীর মনের গোপন হিসেব - সুকান্ত ঘোষ | সেবারে নিউ ইয়র্ক্কের জে এফ কে এয়ারপোর্ট দিয়ে কানেক্টিং ফ্লাইট ছিল। আমষ্টারডাম থেকে নিউ ইয়র্ক হয়ে নিউ অর্লিন্স যাব। বিকেল প্রায় পাঁচটা বাজছে তখন, বোর্ডিং গেটের সামনে বসে আছি। পাবলিকের অবস্থা যেমন হয়, তেমনি আর কি। লোকজন হাঁটু মুড়ে বসে আছে, কেউ ফোনে মুখ গুঁজে, কেউ ঝিমোচ্ছে, কারও কোলে ঘুমিয়ে পড়া বাচ্চা। এমন সময় গেটের মাইকে ভেসে এল সেই ঘোষণা, যা মার্কিন মুলুকে বেশ পরিচিত - “আজকের এই ফ্লাইটে আসনের তুলনায় যাত্রী কিছু বেশি হয়ে গেছে। কেউ যদি স্বেচ্ছায় পরের ফ্লাইটে যেতে রাজি থাকেন, আমরা তাঁকে দু-শো ডলারের ভাউচার দেব।” একটু থেমে ভদ্রমহিলা যোগ করলেন, রাতটুকু থাকার হোটেল আর খাওয়াও এয়ারলাইন্সের তরফে। আমি একটু দূরে বসে, কফির কাপ হাতে, তামাশা দেখার আশায় নড়েচড়ে বসলাম। নিজে যাচ্ছি অফিসের কাজে, তাই ভাউচারের চক্করে যাবার প্রশ্নই নেই। দু-শো ডলারে কেউ নড়ল না। মিনিট পাঁচেক বাদে সংখ্যাটা হল চারশো। তারপর ছশো, তারপর আটশো। মজার ব্যাপার হল, আটশো ডলারেও গেটের সামনে যেন কারও কিছু এসে গেল না। মনে মনে ভাবি - আটশো ডলার তো কম টাকা নয়, ভারতীয় ছেড়ে দিন, আমেরিকার মতো মধ্যবিত্ত হিসেবি লোকের কাছেও আটশো ডলার অনেকটাই টাকা। অথচ কেউ লাইন দিয়ে দৌড়ে এসে হাত তুলছে না। সংখ্যাটা যখন এক হাজার ছাড়াল, তখন একজন যুবক আলস্য করে হাত তুলল বটে, কিন্তু বাকিরা তখনও নির্বিকার। শেষমেশ পনেরো-শো পেরিয়ে যখন ব্যাপারটা প্রায় দু-হাজারের ঘরে পৌঁছল, তখন গুটিকয় লোক এগিয়ে এল। আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম - এ কেমন বাজার, যেখানে দোকানি দাম বাড়াচ্ছে, আর খদ্দের হাত গুটিয়ে বসে আছে?এই দৃশ্যটা আমাকে বহুদিন ধরে ভাবায়। কারণ সেই প্রথম বার দেখছি এমন ঘটনা এমন নয়। বরং উল্টো – আমি নিজেও সেই ছাত্র অবস্থা থেকে এই ওভারবুকিং এর সুযোগ পেয়েছি বা নিয়েছি অনেকবার যখন ব্যক্তিগত এয়াত ট্রাভেল করতে হত। মনে আছে প্রথম বার লণ্ডনের হিথরো থেকে ব্রিটিশ এয়ারওয়াজের কাছ থেকে চারশো পাউন্ড আর রাতে হোটেলের থাকা পেয়ে সে কি আনন্দ! তখন ছাত্র অবস্থায় চারশো পাউন্ড অনেক টাকা, তার উপর রাতে লন্ডনে হোটেল ফ্রী! আর কি চাই! পরের বার থেকে মনে মনে প্রত্যাশা বেড়ে গিয়েছিল ওভারবুকিং সুবিধা পাব কিনা সেই নিয়ে!তাহলে সেদিন নিউ ইয়র্কে প্রথম থেকেই কেউ এগিয়ে এল না কেন? আসলে ব্যাপারটা যতটা সহজ মনে হয়, ততটা সহজ নয়। এর পিছনে আসলে দুটো আলাদা গল্প লুকিয়ে আছে। এক নম্বর গল্পটা হল অঙ্কের আর অর্থনীতির - এয়ারলাইন্স আদৌ আসনের চেয়ে বেশি টিকিট বেচে কেন, আর সেই ঝুঁকির হিসেবটা তারা কষে কীভাবে। আর দু-নম্বর গল্পটা হল নিটোল মনস্তত্ত্বের - আটশো, হাজার, পনেরো-শো ডলার সামনে ঝোলানো সত্ত্বেও মানুষ কেন হাত গুটিয়ে থাকে, আবার ঠিক কোন জায়গায় গিয়ে তার মন গলে যায়। তো এই দুটো সুতো ধরেই আজ একটু টানাটানি করা যাক - কারণ এর ভিতরে এক জেদি অর্থনীতিবিদ আছেন, গোলাপ ফুল আছে, একজন ডাক্তারের ভাঙা দাঁত আছে, আর আমার-আপনার সময়ের অলিখিত দাম তো আছেই।  খালি আসনের অর্থনীতিপ্রথমে খালি আসনের সমস্যাটা বুঝে নেওয়া দরকার। IATA যখন গম্ভীর মুখে বলে ওভারবুকিং ‘রোজগারের ক্ষতি আটকায়’, কথাটা নমনীয় টিকিটের বেলায় সত্যি, কিন্তু সস্তা ফেরত-না-হওয়া টিকিটের বেলায় খানিকটা কথার কারিকুরি। সোজা বাংলায়, ‘প্রতিটি খালি আসন মানেই হারানো টাকা’ - এই চালু বুলিটা আসলে আধখানা সত্যি, পুরোটা নয়। একটু তাহলে তলিয়ে দেখা যাক ব্যাপারটা।খালি আসন মানেই এয়ারলাইন্সের লোকসান, এই দাবি শুনে অনেকের মনে একটা সোজাসাপ্টা প্রশ্ন জাগে, সেটা হল - বিমানের টিকিট তো লোকে আগেভাগেই পয়সা দিয়ে কেটে রাখে; কেউ শেষমেশ না এলে তার টাকাটা তো এয়ারলাইন্সের ঘরেই থেকে গেল - তাহলে লোকসানটা হল কোথায়? কথাটা ফেলনা নয়। সাধারণ সস্তা টিকিট, যেগুলোর টাকা ফেরত পাওয়া যায় না। সেই টিকিটের যাত্রী যদি প্লেন না ধরেন, ভাড়াটা এয়ারলাইন্সের পকেটেই থেকে যায়। উলটে ওই যাত্রীকে আকাশে বইতে গিয়ে যেটুকু জ্বালানি আর খাবারের খরচ হত, সেটাও বাঁচল। মানে এই ধরনের ‘নো-শো’ এয়ারলাইন্সের কাছে লোকসান তো নয়ই, বরং খানিক বাড়তি লাভ। তাহলে সত্যিকারের টাকা গলে যাবার রাস্তাটা কোথায় এয়ারলাইন্সের হাত থেকে? গোটা রহস্যের চাবি লুকিয়ে টিকিটের ধরনে। মোটা দাগে দু-রকম টিকিট। একরকম হল সস্তা, আগে-কাটা, শর্তে-বাঁধা - যেগুলোয় টাকা ফেরত নেই; যাত্রী না এলে পুরো ভাড়াটাই মাটি প্যাসেঞ্জারের, আরেকরকম হল গিয়ে পুরো দামের, ফ্লেক্সিবল টিকিট, যেগুলোয় বাতিল করলে টাকা ফেরত পাওয়া যায়; এই দলে পড়ে বেশিরভাগ বিজনেস আর ফার্স্ট ক্লাস, আর দামি ইকনমি। এয়ারলাইনের আসল সমস্যা এই দ্বিতীয় দলে যেখানে যাত্রী টিকিটের বেশীর ভাগ দামটা ফেরত নিয়ে চলে যান, অথচ আসনটা খালি উড়ে যায়। কারণ সেই ক্যানসেলেশন গুলো এত শেষ মুহূর্তে এসে পড়ে যে আসনটা আর নতুন করে বেচার সময়টুকুও মেলে না। মজার কথা, খোদ এয়ারলাইন্সদের সংগঠন IATA-ও কিন্তু ঘুরিয়ে এই দুটো ক্ষেত্রকেই ‘আসল’ লোকসান বলে মেনে নেয়। আপনার-আমার কাছে প্রথম ক্ষেত্রের ব্যাপারটা একদমই এয়ারলাইনের লোকসান নয়, কারণ প্যাসেজঙার তো টাকা আগেই মিটিয়ে দিয়েছে। সংখ্যায় ফেললে ব্যাপারটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। ধরুন একশো আসনের প্লেন, প্রতি টিকিট দুশো ডলার, আর অভিজ্ঞতা বলছে গড়ে দশজন আসেন না। প্রথমে সস্তা, ফেরত-না-হওয়া টিকিটের কথা ভাবুন। এয়ারলাইন্স যদি ঠিক একশোটা টিকিটই বেচে, তাহলে দশজন না এলেও ঘরে ঢোকা কুড়ি হাজার ডলার পুরোটাই থাকল - নব্বইজন উড়লেন, দশটা আসন খালি গেল, কিন্তু একটা পয়সাও লোকসান হল না। এবার ধরুন তারা সাহস করে একশো দশটা টিকিট বেচল - ঘরে এল বাইশ হাজার, দশজন এলেন না, একশোজন উড়লেন। বাড়তি দু-হাজার ডলার সোজা লাভ। খেয়াল করুন, এটা কিন্তু লোকসান পুষিয়ে নেওয়া নয় - এটা একই আসন কার্যত দু-বার বেচে বাড়তি রোজগার। এবার উলটোদিকটা দেখুন - ফেরতযোগ্য দামি টিকিট। এয়ারলাইন্স একশোটা বেচল, কিন্তু দশজন শেষ মুহূর্তে বাতিল করে টাকা ফেরত নিয়ে নিলেন (সরল করার জন্য ক্যান্সেলেসন ফি টা ধরছি না)। এবার সত্যি সত্যি দু-হাজার ডলার বেরিয়ে গেল, দশটা আসনও খালি - একমাত্র এইখানেই সবজিওয়ালার গল্পটা অক্ষরে অক্ষরে খাটে। আর তারা যদি এই ক্ষেত্রেও একশো দশটা বেচে রাখত, তাহলে ওই ফেরত-যাওয়া টাকাটা ঠিক পুষিয়ে যেত। মোদ্দা কথা দাঁড়াল - দু-ক্ষেত্রেই ওভারবুকিং আয় বাড়ায়, কিন্তু আক্ষরিক ‘লোকসান’ বলতে যা বোঝায়, তা ঘটে কেবল ওই ফেরতযোগ্য টিকিটের বেলায়। এখানে একটা সূক্ষ্ম কিন্তু জরুরি কথা মনে রাখা দরকার। একটা ফ্লাইট একবার ঠিক হয়ে গেলে তার খরচের প্রায় গোটাটাই বাঁধা - জ্বালানি, পাইলট-ক্রু, ল্যান্ডিং ফি, এসব একজন যাত্রী বেশি না কম হলে বিশেষ বদলায় না। বাড়তি একজনকে বওয়ার খরচ নেহাতই সামান্য। ফলে এই কারবারে ‘লোকসান’ মানে পকেট থেকে বেরিয়ে যাওয়া নগদ নয়; ‘লোকসান’ মানে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া রোজগারের সুযোগ। আর তাই একটা ফেরত-না-হওয়া নো-শো তখনই সত্যিকারের লোকসান, যখন ওই আসনটা অন্য কাউকে বেচা যেত - মানে চাহিদা ছিল, কাউকে হয়তো ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, বা স্ট্যান্ডবাই লাইনে কেউ দাঁড়িয়ে ছিলেন। অর্ধেক ফাঁকা প্লেনে ওই একই নো-শোতে এয়ারলাইন্সের কানাকড়িও যায় না, উলটে সিকি-আধুলি জ্বালানিই বাঁচে।ওভারবুকিং কীসের জন্য - লোকসান, না লোভ?এবার সোজা প্রশ্নের সোজা উত্তর। ওভারবুকিং মূলত বেশি রোজগারের ধান্দা - লোকসান ঠেকানোর কোনও মহানুভবতা নয়। টিকিট বিক্রির গোটা সময়টা জুড়ে একই আসন বারবার বেচে, একটা আন্দাজ-করা অংশ যে শেষমেশ আসবে না সেই বাজি ধরে, এয়ারলাইন্স আয়টাকে যতদূর সম্ভব টেনে তোলে। IATA যখন গম্ভীর মুখে বলে ওভারবুকিং ‘রোজগারের ক্ষতি আটকায়’, কথাটা নমনীয় টিকিটের বেলায় সত্যি, কিন্তু সস্তা ফেরত-না-হওয়া টিকিটের বেলায় খানিকটা কথার কারিকুরি।অর্থাৎ যাঁরা সন্দেহ করেন যে গোটাটা আসলে লোকসানের কান্না নয়, বরং বেশি মুনাফার কৌশল, তাঁরা মোটের উপর ঠিকই ধরেছেন। তবে ব্যাপারটাকে নিছক এয়ারলাইন-বিদ্বেষ দিয়েও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফেরতযোগ্য টিকিটের বাতিলে আর অবিক্রিত-থেকে-যাওয়া শেষ-মুহূর্তের বাতিলে সত্যিই টাকা গলে যায়, ওভারবুকিং সেই গলে যাবার পথটা বন্ধ করে। আবার প্লেন ভরে উড়লে ওই বাঁধা খরচটা বেশি লোকের ঘাড়ে ভাগ হয়ে গড়পড়তা ভাড়াও খানিক কমে আসতে পারে। তাই এ হল মুনাফা-খোঁজা কৌশল, যা ঘুরপথে যাত্রীরও কিছুটা উপকার করে - দুটো কথাই একসঙ্গে সত্যি। সোজা বাংলায়, ‘প্রতিটি খালি আসন মানেই হারানো টাকা’ — এই চালু বুলিটা আসলে আধখানা সত্যি, পুরোটা নয়।বিজনেস ক্লাস বনাম ইকনমি - আসল ফারাকটা এখানেইএবার সেই জায়গা, যেখানে ছবিটা সবচেয়ে চোখে পড়ে। টিকিটের শর্ত ক্লাস অনুযায়ী আকাশ-পাতাল আলাদা। বিজনেস, ফার্স্ট আর পুরো-দামের ইকনমি সাধারণত ফেরতযোগ্য, সহজে বদলানো যায়, কাটাও হয় দেরিতে - আর এঁদের পরিকল্পনাই সবচেয়ে গোলমেলে। মিটিং পিছোয়, ডিল ভাঙে, ফিরতি সূচি ওলটপালট হয়। মানে ঠিক এই টিকিটগুলোর বাতিলই সবচেয়ে বেশি ওই ‘টাকা-ফেরত-দেওয়া খালি আসনের’ লোকসান বানায়। উলটোদিকে ছুটিতে-বেড়াতে-যাওয়া লোকের সস্তা ইকনমি টিকিট ফেরত হয় না, কাটা হয় আগেভাগে - বাতিল করলে ভাড়া মাটি, তাই এয়ারলাইন্সের গায়ে আঁচড়টুকুও লাগে না। ফলে সত্যিকারের রোজগার গলে যাবার ঝুঁকিটা মূলত প্লেনের সামনের সারিতে আর দামি ইকনমিতে জমাট বাঁধে। তবে সাবধান, ছবিটা একমুখী নয়। একজন রোজকার ব্যবসায়ী যাত্রী হয়তো তাঁর সকাল আটটার বাঁধা ফ্লাইটে দিব্যি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ - তিনি হয়তো কমই নো-শো করেন। কিন্তু তাঁর পরিকল্পনা বদলালে ফেরতযোগ্য টিকিট তাঁকে বিনা ঝামেলায় বাতিল বা রিবুক করতে দেয়, আর সেখানেই টাকা গলে - যা একটা বাজেয়াপ্ত সস্তা টিকিটে প্রায় হয়ই না। দুটো আলাদা জিনিস গুলিয়ে ফেললে চলবে না - কে বেশি নো-শো করেন, আর কার নো-শোতে এয়ারলাইন্সের টাকা ফেরত যায়।এই কারণেই রেভিনিউ ম্যানেজমেন্টের গবেষকরা বাতিল, নো-শো আর ফেরতকে ক্লাস ধরে ধরে আলাদা করে হিসেব করেন। সুব্রামানিয়ান, স্টিডহ্যাম আর লাউটেনবাখারের ১৯৯৯ সালের এক নামকরা গবেষণায় তো দেখানো হয়েছে, ফেরতের নিয়ম আলাদা বলে কখনও কখনও কম-দামের একটা টিকিট নিয়ে বেশি-দামের একটা টিকিট ফিরিয়ে দেওয়াও এয়ারলাইন্সের পক্ষে লাভের হতে পারে — শুনতে উলটো ঠেকলেও অঙ্কে ঠিক। তাই ওভারবুকিং কতটা করা হবে, সেটাও এক-এক ক্লাসের জন্য এক-এক রকম, কোনও ঢালাও সংখ্যা নয়। আর একটা হালফিলের কথা: ২০২০ সালের পর মার্কিন বড় এয়ারলাইন্সগুলো সাধারণ ইকনমিতে টিকিট বদলের ফি অনেকটাই তুলে দিয়েছে (তবে একদম তলার ‘বেসিক ইকনমি’-তে নয়)। ফলে সাধারণ ইকনমির নো-শো যাত্রী পরে অন্য ফ্লাইটে রিবুক করলে টাকাটা ক্রেডিট হয়ে এয়ারলাইন্সের ঘরেই থাকে - তবু লোকসান নয়। দুই ধারে পড়ে থাকে কেবল বেসিক ইকনমির পুরো-বাজেয়াপ্ত, আর নমনীয় টিকিটের পুরো-ফেরত।ওভারবুকিং এর সার-কথাসব মিলিয়ে গোড়ার ভিত্তিটা তাহলে এই রকম দাঁড়ায় - ওভারবুকিং আসলে নো-শো-তে হারানো টাকা উদ্ধারের গল্প নয়; কারণ ফেরত-না-হওয়া নো-শোতে এয়ারলাইন্সের কিছুই যায় না, ভাড়া তাদের পকেটেই থাকে, উলটে সামান্য খরচ বাঁচে। এটা আসলে যতটা সম্ভব বেশি আয় তোলার কৌশল। আসন পচনশীল, ফ্লাইটের খরচ বাঁধা, তাই এয়ারলাইন্স একই আসন কার্যত বারবার বেচে দেয় এই বাজি ধরে যে টিকিটধারীদের একটা আন্দাজ-করা অংশ, বিশেষ করে বিজনেস আর প্রিমিয়াম কেবিনে জমে থাকা ওই পরিকল্পনা-নমনীয় ফেরতযোগ্য টিকিটের যাত্রীরা, শেষমেশ আসনটা কাজে লাগাবেন না। সত্যিকারের রোজগার হাতছাড়া আসে ফেরতযোগ্য বাতিল আর অবিক্রিত শেষ-মুহূর্তের বাতিল থেকে। ওভারবুকিং সেই হাতছাড়া বন্ধ করে, আবার বাড়তি বিক্রিও ঘরে তোলে। গোটা ভারসাম্যটা রাখতে হয় সেই খরচের সঙ্গে, যা বেশি লোক এসে পড়লে কাউকে বসিয়ে দিয়ে ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে লাগে, আর সেখান থেকেই তো জন্ম নেয় গেটের সামনের সেই নিলাম।এয়ারলাইন্স যতজ ওভারবুকিং এ থাকা পাবলিককে সেই ফ্লাইটে জায়গা দিতে পারবে না সেই সামলাতে গিয়ে গুনতে হবে মোটা ক্ষতিপূরণ। গোটা খেলাটাই তাই দাঁড়িয়ে আছে একটাই প্রশ্নের উপর - ঝুঁকিটা ঠিক কতখানি নেওয়া নিরাপদ? কোনও নির্দিষ্ট ফ্লাইটে ঠিক কতজন আসবেন না, তা কেউ আগে থেকে নিশ্চিত জানে না - সংখ্যাটা একটা সম্ভাবনার বণ্টন মেনে ওঠানামা করে। ফলে এয়ারলাইন্সকে একটা বেশ ফাইন মার্জিনের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হয়। বেশি রক্ষণশীল হলে আসন খালি যাবে (একে বলে ‘স্পয়েল্ড সিট’), আর বেশি লোভী হলে গেটে গিয়ে যাত্রী উপচে পড়বে। আগে এই হিসেব হত সরল ভাবে - পুরোনো ফ্লাইটের গড় দেখে। এখন প্রতিটি ফ্লাইটের জন্য আলাদা করে নো-শো আঁচ করা হয় মেশিন লার্নিং দিয়ে - কোন রুট, কোন দিন, কোন মরসুম, টিকিটের দাম, যাত্রীর অতীত অভ্যেস, এমনকি আবহাওয়া। কারিগরি যত উন্নত হয়েছে, যাত্রী ফেলে যাওয়ার হারও তত কমেছে। কিন্তু হিসেব উলটে যাওয়ার দিন আজও আসে - আর ঠিক তখনই জন্ম নেয় সেই গেটের সামনের নাটক।দাড়ি কামাতে কামাতে এক আইডিয়াএবার আমাদের গল্পের আসল মানুষটির কথায় আসা যাক। ভদ্রলোকের নাম জুলিয়ান সাইমন - ইনি কিন্তু গোদা, বাঁধা-ছকের অর্থনীতিবিদ ছিলেন না। নিজেকে বলতেন ‘অপ্রথাগত অর্থনীতিবিদ’, আর মজা করে স্বীকার করতেন যে জীবনে ডেমোগ্রাফির একটাও ক্লাস করেননি, আর অর্থনীতির ক্লাস করেছেন সাকুল্যে দুটো! স্নাতক স্তরে তাঁর বিষয় ছিল মনোবিজ্ঞান, ডক্টরেট বিজনেস অ্যাডমিনিষ্ট্রেশনে। নিউ ইয়র্কে খানিকদিন বিজ্ঞাপনের ব্যবসা, তারপর ডাকযোগে জিনিসপত্র বেচার (মেল-অর্ডার) কারবার চালিয়ে শেষে তিনি এসে পড়েছিলেন অধ্যাপনায়। এই এলোমেলো, নানা-লাইনে-ঘোরা জীবনটাই বোধহয় তাঁকে বাঁধা ছকের বাইরে ভাবতে শিখিয়েছিল। বাজার আর মানুষের আচরণ - এই দুটো তিনি বুঝতেন বেশ ভালো ভাবে।সময়টা ষাটের দশকের মাঝামাঝি, ১৯৬৫ কি ১৯৬৬। এক পার্টিতে সাইমন কারও মুখে একটা দুঃখের কাহিনি শুনছিলেন - কীভাবে ভদ্রলোককে হঠাৎ প্লেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আর তার ফলে কী দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল। সেই আমলে ব্যাপারটা এমনই ছিল - প্লেনে বেশি লোক হয়ে গেলে এয়ারলাইন্স নিজের খেয়ালখুশি মতো কিছু যাত্রীকে বেছে নিয়ে বলত, “আপনি আজ যেতে পারবেন না।” কোনও দর-দাম নেই, কোনও রফা নেই - নেহাত কপাল খারাপ। পরদিন সকালে দাড়ি কামাতে কামাতে সাইমনের মাথায় হঠাৎ একটা কথা খেলে গেল - এর চেয়ে ভালো উপায় নিশ্চয়ই আছে। জোর করে কাউকে নামানোর দরকারটাই বা কী? এমন একটা বাজার তো বসানো যায়, যেখানে অপেক্ষা করতে যাঁর সবচেয়ে কম আপত্তি, তিনিই স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়াবেন।সাইমনের সমাধানটা ছিল আশ্চর্য সরল। ধরা যাক প্লেনে দু-জন যাত্রী বেশি হয়ে গেছে। গেটের কর্মী প্রত্যেক যাত্রীর হাতে একটা করে খাম আর কাগজ ধরিয়ে বলবেন - “আপনি লিখুন, ন্যূনতম কত টাকা পেলে আপনি খুশিমনে পরের ফ্লাইটে যেতে রাজি আছেন।” সবাই নিজের নিজের সংখ্যা লিখে দেবেন। যিনি সবচেয়ে কম টাকা চাইলেন, তাঁকে সেই টাকা নগদে দিয়ে পরের ফ্লাইটের টিকিট ধরিয়ে দেওয়া হবে। বাকি সবাই নিশ্চিন্তে প্লেনে উঠে গন্তব্যে পৌঁছবেন। কেউ ঠকল না, সবাই লাভবান হল - যাঁর তাড়া বেশি, তিনি নিজের আসন রাখলেন; আর যাঁর তাড়া কম, তিনি খানিকটা টাকা কামিয়ে নিলেন। এই ধরনের নিলামকে বলা হয় ‘উলটো নিলাম’ বা ‘রিভার্স অকশন’ - সাধারণ নিলামে দাম উপরে ওঠে, এখানে সবচেয়ে কম দর হাঁকা মানুষটিই জেতেন।১৯৬৮ সালে সাইমন এই ভাবনাটা দু-পাতার এক ছোট্ট প্রবন্ধে লিখে ফেললেন - ‘জার্নাল অফ ট্রান্সপোর্ট ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিসি’-তে। প্রবন্ধের নামটাও তাঁর রসবোধের পরিচয় দেয়, ‘অ্যান অলমোস্ট-প্র্যাকটিক্যাল সলিউশন টু এয়ারলাইন ওভারবুকিং’, অর্থাৎ ‘বিমান ওভারবুকিং-এর একটি প্রায়-বাস্তবসম্মত সমাধান’। এবার লক্ষ্য করুন, নামের মধ্যে ওই ‘প্রায়’ শব্দটা কিন্তু সাইমন এমনি এমনি বসাননি। তিনি নিজেই জানতেন, কাগজে-কলমে ঝকঝকে এই আইডিয়াটা বাস্তবে চালাতে গেলে খুচখাচ ঝামেলা আছে - লোকে দর লিখতে গিয়ে ইতস্তত করবে, দু-একজন চালাকির চেষ্টা করবে, গেটে খানিক সময় লাগবে। তাই নির্লজ্জ ভাবে ‘সমাধান’ না বলে তিনি সততার সঙ্গে লিখলেন ‘প্রায়-সমাধান’। এই বিনয় আর আত্ম-পরিহাসটুকুই লোকটার আসল পরিচয়।স্টিগলার, ফ্রিডম্যান আর বারো বছরের গোঁএখন ভাববেন না, এত সুন্দর আইডিয়া, নিশ্চয়ই সবাই লুফে নিল। বাস্তবে হল ঠিক উলটোটা। প্রবন্ধটা ছাপাতেই সাইমনকে কালঘাম ছোটাতে হয়েছিল, বেশ কয়েক জায়গায় প্রত্যাখ্যাত হয়ে শেষমেশ এক অখ্যাত জার্নালে জায়গা পেল। এরপর তিনি বড় বড় এয়ারলাইন্সের দরজায় দরজায় ঘুরলেন, সবাই নাক সিঁটকে ফিরিয়ে দিল, কেউ কেউ রীতিমতো তাচ্ছিল্য করে। শুধু কি এয়ারলাইন্স? খোদ অর্থনীতিবিদদের মহলেও প্রস্তাবটা উড়িয়ে দেওয়া হল। আর যাঁরা উড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাঁরা যে-সে লোক নন। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জর্জ স্টিগলার একে বলেছিলেন ‘প্রশাসনিক ভাবে অসম্ভব’ আর সাবধান করেছিলেন, ভেবে দেখো, চল্লিশজন বেকার লোক যদি দল বেঁধে এসে সিস্টেমটাকে জ্যাম করে দেয়, তখন কী হবে? মানে, লোকে সিস্টেমটা নিয়ে চালাকি করবে, এই ছিল দুশ্চিন্তা। আরেক নোবেলজয়ী মিলটন ফ্রিডম্যান আবার উলটো দিক থেকে খোঁচা দিলেন, প্ল্যানটা যদি সত্যিই এত ভালো হয়, তাহলে একটাও এয়ারলাইন কেন পরীক্ষা করে দেখছে না, সেটাই তো আমার মাথায় ঢুকছে না! দুই দিকপাল দু-রকম সংশয় জানালেন, কিন্তু সাইমন হাল ছাড়লেন না। বছরের পর বছর তিনি লিখে গেলেন, তর্ক করে গেলেন - ১৯৭০, ১৯৭২, ১৯৭৭, প্রবন্ধের পর প্রবন্ধে নিজের যুক্তি শানিয়ে গেলেন।গল্পের মোড় ঘুরল প্রায় বারো-তেরো বছর পর। সত্তরের দশকের শেষে আরেকজন অর্থনীতিবিদ, আলফ্রেড কান, প্রেসিডেন্ট কার্টারের আমলে মার্কিন ‘সিভিল এরোনটিক্স বোর্ড’-এর চেয়ারম্যান হলেন। কান তখন গোটা বিমান শিল্পটাকে সরকারি নিয়ন্ত্রণের জাল থেকে মুক্ত করার কাজে ব্যস্ত, যাকে বলে ‘ডিরেগুলেশন’। সেই সুযোগে সাইমন তাঁর পুরোনো প্রস্তাবটা নিয়ে আরেকবার হত্যে দিলেন। আর এবার এত বছরের প্রত্যাখ্যানের পর কান রাজি হয়ে গেলেন। ১৯৭৮-৭৯ সাল নাগাদ এয়ারলাইন্সকে অনুমতি দেওয়া হল সাইমনের পথ ধরে হাঁটার - জোর করে নয়, স্বেচ্ছাসেবক ডেকে, টাকা দিয়ে আসন ছাড়ানোর ব্যবস্থা।আনন্দে আত্মহারা সাইমন কী করলেন জানেন? আলফ্রেড কানকে এক ডজন গোলাপ পাঠিয়ে দিলেন। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই আইডিয়াটা তিনি বিনি পয়সায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন, এর থেকে একটি টাকাও কামাননি। ১৯৯৮ সালে পঁয়ষট্টি বছর বয়সে সাইমন মারা যান। মজার ব্যাপার, দুনিয়া তাঁকে মনে রেখেছে অন্য একটা কারণে - জনসংখ্যা আর সম্পদ নিয়ে তাঁর আশাবাদী তত্ত্বের জন্য, পৃথিবী ফুরিয়ে যাচ্ছে না বরং সমৃদ্ধ হচ্ছে, এই তর্কের জন্য। কিন্তু আমার-আপনার রোজকার জীবনে তাঁর সবচেয়ে সরাসরি ছোঁয়াটা রয়ে গেছে ওই বিমানবন্দরের গেটে যেখানে আজও একটা দাড়ি কামানোর সময়ের ভাবনা নিঃশব্দে কাজ করে চলেছে।একই সমস্যা, দুই ঘরানাসাইমনের গল্পটা যত রোমাঞ্চকর, ততটাই জরুরি একটা কথা এখানে বলে রাখা - ওভারবুকিং নিয়ে মাথা ঘামানো তিনি একা করেননি, তাঁর আগেও বহু চৌকস লোক করেছেন। কিন্তু আসল মজাটা হল, এই এক সমস্যা নিয়ে দুটো একেবারে আলাদা ঘরানার গবেষণা পাশাপাশি বয়ে চলেছিল, যারা আদতে দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিল। একটাকে বলি অঙ্কের ঘরানা, অন্যটাকে বাজারের ঘরানা।অঙ্কের ঘরানা, অর্থাৎ অপারেশনস রিসার্চের লোকজন, মাথা ঘামাচ্ছিলেন একটাই প্রশ্নে - ঠিক কতগুলো বাড়তি টিকিট বেচা নিরাপদ? এঁদের কাজ সাইমনের অনেক আগে থেকেই শুরু। সেই ১৯৬০ সালে নেদারল্যান্ডসের ডেল্‌ফ্‌ট বিশ্ববিদ্যালয়ের লেন্ডার্ট কোস্টেন প্রথম দিকের একজন, যিনি সমস্যাটাকে গুছিয়ে একটা সাধারণ গাণিতিক মডেলে বাঁধেন। তার আগে, ১৯৫৮ সালে, মার্টিন বেকম্যান বের করেছিলেন ওভারবুকিং-এর প্রথম প্রকাশিত মডেল, খালি আসনের লোকসান আর বাড়তি যাত্রীর ক্ষতিপূরণ, এই দুইয়ের ভারসাম্য কষে। এঁদের হাতেই জন্ম নেয় সেই ধারা, যা আজও চলছে।কিন্তু এই ঘরানার সবচেয়ে রঙিন চরিত্র সম্ভবত মার্ভিন রথস্টাইন। ১৯৬০ সালে তিনি আমেরিকান এয়ারলাইন্সে সিস্টেম অ্যানালিসিসের ম্যানেজার হয়ে যোগ দিয়ে এক মজার জিনিস আবিষ্কার করেন যে কোম্পানির ভিতরেই কর্তাব্যক্তিরা একমত নন যে তাঁরা আদৌ ওভারবুকিং করেন কি না! কেউ কেউ সাফ বলতেন, ‘না না, আমরা এসব করি না’; আবার কেউ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলতেন, ‘আরে, এ তো গোটা সিস্টেম জুড়েই হচ্ছে’। রথস্টাইন প্রমাণ জোগাড় করে দেখালেন, দ্বিতীয় দলই ঠিক। এরপর তিনি ওই সমস্যাকে গণিতের ভাষায় বাঁধলেন, ‘মার্কভ সিকোয়েন্সিয়াল ডিসিশন প্রসেস’ আর ডাইনামিক প্রোগ্রামিং দিয়ে, ১৯৭১ সালে বেরোল তাঁর বিখ্যাত ‘অ্যান এয়ারলাইন ওভারবুকিং মডেল’। পরে ১৯৮৫ সালে তিনি গোটা ইতিহাসটাই লিখে গেছেন এক দীর্ঘ প্রবন্ধে।এই ঘরানারই আরেক মাইলফলক ব্রিটেনের কেন লিটলউড। ১৯৭২ সালে, ব্রিটিশ ওভারসিজ এয়ারওয়েজ কর্পোরেশনের (পরে যা হবে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ) অপারেশনস রিসার্চ দলে বসে তিনি এক মোক্ষম প্রশ্ন তুললেন, এতদিন সবাই ভাবছিল কেমন করে বেশি সংখ্যক যাত্রী বওয়া যায়; কিন্তু লক্ষ্যটা তো নিছক যাত্রীসংখ্যা নয়, লক্ষ্য হওয়া উচিত আয়। সস্তা টিকিটের যাত্রী দিয়ে গোটা প্লেন ভরিয়ে ফেললে, শেষ মুহূর্তের চড়া দামের যাত্রীর জন্য আর আসন থাকবে না - তাহলে তো লাভই কমল। কোন দামের কতগুলো আসন আটকে রাখতে হবে, সেই হিসেব কষে তিনি দিলেন ‘লিটলউডের সূত্র’, যা আজও রেভিনিউ ম্যানেজমেন্টের ভিত।এরপর ১৯৮৭ সালে পিটার বেলোবাবা লিটলউডের সূত্রকে বাড়িয়ে নানা দামের শ্রেণীর জন্য বানালেন ‘EMSR’ কৌশল। আর এই সবকিছু মিলিয়ে আশির দশকে আমেরিকান এয়ারলাইন্স ঘটিয়ে ফেলল যাকে বলা হয় ‘রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট বিপ্লব’ - কম্পিউটারে ঠাসা এক বিশাল ব্যবস্থা, যার মূল কথা ছিল দুটো: আসন হল পচনশীল জিনিস, আর সব খদ্দের সমান নয়। ফল? কোম্পানির নিজের হিসেবেই, মাত্র তিন বছরে এই কৌশল তাদের এনে দিয়েছিল প্রায় একশো চল্লিশ কোটি ডলার বাড়তি আয়। এই ঘরানার হাত ধরেই বিমানযাত্রা সস্তা হয়েছে, সাধারণ মানুষের নাগালে এসেছে - এঁরা বলে দেন, কত বেচব।আর সাইমনের ঘরানা করছিল একেবারে অন্য প্রশ্ন - ধরেই নিলাম বেশি লোক হয়ে গেছে, এবার কাকে নামাব, আর কীভাবে নামালে কারও গায়ে লাগবে না? প্রথম ঘরানা বলে ‘কত’, দ্বিতীয় ঘরানা বলে ‘কাকে ও কীভাবে’। কিন্তু ফারাকটা আরও গভীরে। অঙ্কের ঘরানা গোটা ভিড়টাকে দেখে এক পরিসংখ্যানের স্তূপ হিসেবে, কত শতাংশ নো-শো করবে, কোন শ্রেণীর চাহিদা কেমন আর সেই তথ্য ব্যবহার করে এয়ারলাইন্স নিজের সুবিধেমতো সিদ্ধান্ত নেয়। উপর থেকে, কেন্দ্র থেকে, গোটা জনতাকে একটা গড় হিসেবে দেখে।কিন্তু যে তথ্য এয়ারলাইন্স হাজার কম্পিউটার চালিয়েও কোনোদিন বের করতে পারবে না সেটা হল, আপনি ঠিক কতখানি মূল্য দেন আপনার আজকের এই একটা ঘণ্টাকে। ওই সংখ্যাটা কেবল আপনার মাথার ভিতরেই লেখা আছে, আর কোথাও নেই কোথাও (যদি না আপনি ইন্টারনেটের বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনদিন সেটা টাইপ করে না ফেলেন! তাহলে সেটা জেনে ফেলেছে ওরা)। সাইমনের নিলামের আসল সৌন্দর্য এইখানেই, সে জোর করে ভিড়ের গড় আন্দাজ করার চেষ্টা করে না, বরং একটা দাম সামনে ঝুলিয়ে দিয়ে প্রত্যেককে নিজের ভিতরের ওই গোপন সংখ্যাটা নিজের মুখে বলিয়ে নেয়। অঙ্কের ঘরানা তথ্য জোগাড় করে উপর থেকে; সাইমনের ঘরানা তথ্য টেনে বের করে নীচ থেকে, মানে প্রত্যেকের মন থেকে। একটা কেন্দ্রীভূত, অন্যটা ছড়ানো। তাই এরা প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একই যন্ত্রের দুটো চাকা - একটা ঠিক করে গতি, অন্যটা সামলায় বিপদের বাঁক। মজার ব্যাপার, দুই ঘরানার দুই প্রধান চরিত্রও ছিলেন দুই মেরুর মানুষ। রথস্টাইন ছিলেন খাঁটি ভিতরের লোক, আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ম্যানেজার, যাঁর মডেল কোম্পানি সাদরে গ্রহণ করেছে, যাঁকে পেশার জগৎ সম্মান জানিয়েছে। আর সাইমন ছিলেন বাইরের লোক যাঁকে এয়ারলাইন্স প্রত্যাখান করেছে, নোবেলজয়ীরা উড়িয়ে দিয়েছেন, যাঁকে অখ্যাত জার্নালে ছাপতে হয়েছে। একই শিল্পের এক সমস্যা, অথচ দুই সমাধান এল দুই একেবারে আলাদা স্বভাবের মানুষের হাত ধরে - একজন প্রতিষ্ঠানের ভিতর থেকে অঙ্ক কষে, আরেকজন প্রতিষ্ঠানের দরজায় ধাক্কা মেরে।সাইমনের ওই ‘সবচেয়ে কম দর যিনি হাঁকবেন তিনিই জিতবেন’ ধরনের সিলড-বিড নিলাম অবশ্য একেবারে আকাশ থেকে পড়া নয়। অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম ভিকরে যিনি পরে ১৯৯৬ সালে নোবেল পান, তিনি ঠিক এমন সিলড-বিড নিলামের তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিলেন ষাটের দশকের গোড়াতেই। তাই সাইমনের কৃতিত্ব তত্ত্ব আবিষ্কারে নয়; তাঁর কৃতিত্ব হল, এই বিমূর্ত নিলাম-তত্ত্বকে তিনি টেনে নামিয়ে এনেছিলেন এক্কেবারে মাটির সমস্যায়, বিমানবন্দরের গেটে। অর্থনীতিবিদরা আজকাল যাকে গালভরা নাম দিয়েছেন ‘মার্কেট ডিজাইন’, বাস্তবের সমস্যা মেটাতে নিয়ম-কানুন সমেত আস্ত একটা বাজার নকশা করে দেওয়া - সাইমনের এই আইডিয়াটা ছিল তার এক আদি ও সফল উদাহরণ।এইখানে ইতিহাসের এক মজার প্যাঁচ আছে যা প্রায়ই ইতিহাস থ্রো করে, পরে যাতে ‘ইতিহাসে এই হয়েছিল’ ব্যাপারটা শোনা যায়। এই দুই ঘরানা, যারা এতদিন আলাদা পথে হাঁটছিল, তারা দুজনেই কিন্তু হঠাৎ ডানা মেলল একই দরজা খুলে যাওয়ায়। সেই দরজার নাম ১৯৭৮-এর ডিরেগুলেশন, যার কারিগর সেই আলফ্রেড কান। সরকারি নিয়ন্ত্রণ উঠে যেতেই এয়ারলাইন্স নিজের খুশিমতো নানা দামের টিকিট বানাতে পারল আর ঠিক তখনই লিটলউড-বেলোবাবার রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট বিপ্লব তেড়েফুঁড়ে উঠল। আবার সেই কান-ই সাইমনের বহু-প্রত্যাখ্যাত নিলাম-প্রস্তাবে সিলমোহর দিলেন। মানে, একটাই ঐতিহাসিক মুহূর্ত দুই আলাদা ঘরানাকেই বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে আনল!সাইমন অবশ্য নেহাত কথার কথা বলে থামেননি, ১৯৭৭ সালে সহকর্মী গণেশন বিশ্বভারতীর সঙ্গে লেখা এক প্রবন্ধে তিনি বাস্তবের সংখ্যা দিয়ে দেখিয়েছিলেন, নিলাম-ব্যবস্থা যেখানে পরখ করা হয়েছে, তথ্য সেখানে তত্ত্বের সঙ্গে দিব্যি মিলে গেছে। প্রবন্ধের নামটাই ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরা, ‘দ্য ডেটা ফিট দ্য থিওরি’, তথ্যই তত্ত্বকে সমর্থন করছে। স্টিগলার-ফ্রিডম্যানের সংশয়ের জবাব তিনি দিয়েছিলেন তর্ক দিয়ে নয়, সংখ্যা দিয়ে। মোদ্দা কথায়, দুই ঘরানা মিলেই গড়ে তুলেছে আজকের বিমানযাত্রা। অঙ্কের ঘরানা সস্তা করেছে টিকিট (আসন ভরিয়ে, দাম সাজিয়ে), আর সাইমনের ঘরানা বাড়তি ভিড়টাকে করেছে খানিক মানবিক (জোরাজুরির বদলে দর-কষাকষি)। দুটোই চলে নিঃশব্দে, পর্দার আড়ালে। আপনি যখন মাস তিনেক আগে সস্তায় টিকিট কেটে ফেলেন, সেটা এক ঘরানার নিঃশব্দ কীর্তি; আর গেটে দাঁড়িয়ে যখন ওই বাম্প-অফারের নাটক দেখেন, সেটা অন্য ঘরানার।নিলাম যেভাবে চলেসাইমনের মূল ভাবনাটা আজও নানা রূপে চালু আছে। কোনও কোনও এয়ারলাইন্স, যেমন ধরুণ ডেল্টা, কাজটা করে একদম নিঃশব্দ ‘অন্ধ নিলামে’। আপনি যখন অনলাইনে বা কিয়স্কে চেক-ইন করছেন, স্ক্রিনে হয়তো প্রশ্ন ভেসে উঠবে, “এই ফ্লাইটে বেশি যাত্রী হয়ে গেলে, কত ডলারের ভাউচার পেলে আপনি আসন ছাড়তে রাজি?” সঙ্গে নীচে ছোট করে টিপ দেওয়া থাকে, মনে রাখবেন, কম দর আগে গ্রহণ করা হয়। মানে আপনি একটা সংখ্যা লিখে দিলেন, আর অন্য যাত্রীরা কে কত লিখলেন তা আপনি জানেন না। দরকার পড়লে এয়ারলাইন্স সবচেয়ে কম দর হাঁকা লোকজনকে বেছে নেবে। এতে গেটের সামনে হইচই কমে, আর কোম্পানিরও পয়সা বাঁচে কারণ কিছু সরল লোক হয়তো একশো ডলারেই খুশিমনে আসন ছেড়ে দেন।কিন্তু আসল মজাটা তখনই জমে, যখন গেটের সামনে খোলাখুলি দর হাঁকা শুরু হয় ঠিক আমার দেখা সেই নিউ ইয়র্কের দৃশ্যের মতো। এয়ারলাইন্স কর্মীদের সাধারণত নির্দেশ দেওয়া থাকে কম টাকা থেকে শুরু করো, দরকার হলে আস্তে আস্তে বাড়াও। এতে কোম্পানির সবচেয়ে কম খরচে কাজ হাসিল হয়। কিন্তু যাত্রীরাও তো বোকা নন! তাঁরা টের পান যে দোকানি দাম বাড়িয়েই চলবে, যতক্ষণ না দরকারি সংখ্যক লোক রাজি হচ্ছে। ফলে অনেকেই কৌশল করে অপেক্ষা করেন, দেখা যাক না, আরেকটু বাড়ে কি না! এই ‘দেখি না কতদূর ওঠে’ মনোভাবই সেই রহস্যের চাবিকাঠি কেন আটশো বা হাজার ডলারেও কেউ নড়েন না। একটা বাস্তব ঘটনা বলি, যাতে ব্যাপারটা জলের মতো পরিষ্কার হবে। কিছু বছর আগে সিয়াটেল থেকে পাম স্প্রিংস-গামী ডেল্টার এক ফ্লাইটে আসনের চেয়ে যাত্রী বেশি হয়ে গিয়েছিল, দরকার ছিল পাঁচজন স্বেচ্ছাসেবক। এই রুটে দিনে একটাই মাত্র ফ্লাইট, মানে রাজি হলে পরদিন যেতে হবে। গেটের কর্মী শুরু করলেন এক হাজার ডলার আর হোটেল দিয়ে। কেউ নড়ল না। বাড়িয়ে করা হল পনেরো-শো, তাতেও সাড়া নেই। বোর্ডিং শুরু হয়ে যাওয়ার পরেও দর হেঁকে যাচ্ছেন কর্মী। অবশেষে সংখ্যাটা যখন বাইশ-শো ডলারে পৌঁছল, দু-জন রাজি হলেন। পঁচিশ-শো-তে তৃতীয় জন। আর শেষমেশ আঠাশ-শো ডলারে এক বয়স্ক দম্পতি হাত তুললেন, পাঁচজন পূর্ণ হল। মজার ব্যাপার, শেষ পর্যন্ত পাঁচজনই কিন্তু ওই সর্বোচ্চ আঠাশ-শো ডলার করে পেলেন। সেই বয়স্ক দম্পতি নাকি হেসে বলেছিলেন, এই টাকায় তাঁদের গাড়ির কিস্তি শোধ হয়ে গেল।কেন কেউ আগে হাত তোলে নাএবার আসল প্রশ্নে ফেরা যাক, মানুষ কেন পনেরো-শো ডলারেও হাত গোটায়? এখানে অর্থনীতির শুকনো অঙ্ক দিয়ে পুরোটা বোঝা যায় না, ঢুকে পড়তে হয় মনস্তত্ত্বের গলিতে। প্রথম কারণটা হল আসনটা এই মুহূর্তে আপনার ‘নিজের’। টিকিট কেটে, লাইনে দাঁড়িয়ে, বোর্ডিং পাস হাতে নিয়ে আপনি ইতিমধ্যেই মনে মনে ওই আসনে বসে পড়েছেন, মনে মনে গন্তব্যেও পৌঁছে গেছেন। যে জিনিস একবার ‘আমার’ হয়ে গেছে, তা ছেড়ে দিতে মানুষের ভীষণ কষ্ট - মনস্তত্ত্বে একে বলে ‘এনডাওমেন্ট এফেক্ট’। বিখ্যাত এক পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, একটা কফি-মগ যখন কারও হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলা হয় ‘এটা এখন তোমার’, তখন সেটা বেচতে সে যত দাম চায়, ঠিক সেই মগটাই কিনতে অন্য কেউ তার চেয়ে অনেক কম দাম দিতে রাজি হয়। মালিকানার এই আঠা বড় সাংঘাতিক জিনিস।এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও গভীর একটা প্রবণতা - ‘লস অ্যাভার্সন’ বা ক্ষতির প্রতি আমাদের অস্বাভাবিক ভীতি। মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কানেম্যান আর আমোস টুভার্স্কি তাঁদের বিখ্যাত ‘প্রসপেক্ট থিওরি’-তে দেখিয়েছিলেন, একই পরিমাণ জিনিস পাওয়ার আনন্দের চেয়ে হারানোর যন্ত্রণা মানুষের কাছে প্রায় দ্বিগুণ তীব্র। কথাটা তাঁরা বলেছিলেন সংক্ষেপে, ক্ষতি সবসময় লাভের চেয়ে বড় দেখায়। ফলে আসন ছেড়ে দেওয়াটাকে আমাদের মন নিছক ‘পনেরো-শো ডলার লাভ’ হিসেবে দেখে না; দেখে ‘পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়া, দেরিতে পৌঁছনো, রাতে অচেনা হোটেলে থাকা’ এই সব হারানোর যন্ত্রণা হিসেবে। আর সেই হারানোর পাল্লাটা মনের নিক্তিতে এত ভারী যে, পনেরো-শো ডলার তার সামনে হালকা মনে হয়।তৃতীয় কারণটা সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত, আর এইটেই আমার কাছে সবচেয়ে মজার। প্রত্যেক যাত্রীর মনের গভীরে একটা গোপন সংখ্যা থাকে, অর্থনীতিবিদরা যাকে বলেন ‘রিজার্ভেশন প্রাইস’, অর্থাৎ ঠিক যত টাকা পেলে তিনি রাজি হয়ে যাবেন, তার এক পয়সা কম হলে নয়। মজার কথা, এই সংখ্যাটা একেকজনের একেক রকম, আর তার মূলে আছে সময়ের দাম। যে ব্যবসায়ীর কাল সকালে জরুরি মিটিং, বা যে মায়ের বাড়িতে ছোট বাচ্চা অপেক্ষা করছে, তাঁর কাছে একটা রাত দেরির দাম আকাশছোঁয়া - দশ হাজার ডলারেও হয়ত তিনি নড়বেন না। আবার যে ছাত্রটির হাতে অঢেল সময়, ছুটিতে বাড়ি ফিরছে, তার কাছে একটা রাত মানে সামান্য ব্যাপার, সে চারশো ডলারেই লাফিয়ে উঠবে। গেটের সামনের ওই নিলামটা আসলে চুপিসারে মেপে নেয়, আমরা প্রত্যেকে নিজের একটা ঘণ্টার দাম কত বসাই।এইখানেই ঢুকে পড়ে জুয়ার উপাদান। যিনি অপেক্ষা করছেন, ‘দেখি না, আরেকটু বাড়ে কি না’, তিনি আসলে এক ঝুঁকি নিচ্ছেন। কারণ অন্য কেউ যদি তাঁর আগে হাত তুলে ফেলেন, তাহলে দরকারি সংখ্যক লোক পূর্ণ হয়ে যাবে, আর তাঁর বাড়তি টাকা পাওয়ার সুযোগটাই হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই প্রতিটি যাত্রীকে মনে মনে একটা হিসেব কষতে হয়, এখন হাত তুলব, নাকি আরেকটু অপেক্ষা করে বেশি টাকার আশায় সবটুকু খোয়ানোর ঝুঁকি নেব? এই টানাপোড়েনটাই গেটের সামনের নীরবতার আসল কারণ।এর সঙ্গে জুড়ে আছে আরেকটা মজার মানবিক দুর্বলতা, কেউ প্রথমে হাত তুলতে চায় না! ভিড়ের মধ্যে সবার আগে নড়ে ওঠা মানে যেন নিজের অস্থিরতা, নিজের ‘তাড়া নেই’ ভাবটা সবার সামনে ফাঁস করে দেওয়া। তার উপর মনে একটা খচখচানি, আমি যদি এখনই আটশো-তে রাজি হয়ে যাই, আর পরক্ষণেই দর যদি দু-হাজারে ওঠে, তাহলে তো নিজেকে বোকা মনে হবে! এই ‘পাছে ঠকে যাই’ ভয়টা মানুষকে চুপ করিয়ে রাখে। তাই সবাই আড়চোখে সবাইকে দেখে, কেউ নড়ে না যতক্ষণ না একজন সাহসী হাত তোলেন। আর একজন উঠলেই দেখবেন, যেন বাঁধ ভাঙল, গুটিগুটি আরও কয়েকটা হাত উঠে যায়। ভিড়ের এই নিঃশব্দ ইশারার খেলা যে কোনও বাঙালি বিয়েবাড়ির বুফে-লাইনেও দেখতে পাবেন - কেউ আগে প্লেট হাতে এগোতে চায় না, একজন এগোলেই বাকিরা।যেদিন নিলাম ভেঙে পড়েতবে একটা মোক্ষম প্যাঁচ আছে যা গোটা নিলামটাকে ভেস্তে দিতে পারে, সেটা হল ‘দিনের শেষ ফ্লাইট’। আপনি খেয়াল করবেন, কিছু আগে লেখা সেই সিয়াটল-পাম স্প্রিংস রুটে দিনে একটাই ফ্লাইট ছিল, তাই আসন ছাড়ার মানে ছিল গোটা একটা দিন খোয়ানো, সেইজন্যই দর অত চড়েছিল। যখন পরের ফ্লাইট কয়েক ঘণ্টা পরেই, তখন লোকে সহজে রাজি হয়। কিন্তু আসন ছাড়লে যদি রাতটা অচেনা শহরে কাটাতে হয়, তখন কারও রিজার্ভেশন প্রাইস আর সহজে মেলে না - টাকা যতই বাড়ুক, স্বেচ্ছাসেবক পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আর ঠিক এইখানে গোটা ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়ে, এবং জন্ম নেয় এক দুঃস্বপ্ন - যার নাম, বাধ্যতামূলক ভাবে যাত্রী নামানো।এই দুঃস্বপ্নটাই ২০১৭ সালের এপ্রিলে গোটা পৃথিবীর সামনে বিশ্রী ভাবে দেখা দিয়েছিল। শিকাগোর ও'হেয়ার থেকে কেন্টাকির লুইভিল-গামী ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ৩৪১১ নম্বর ফ্লাইট। আসনের চেয়ে যাত্রী বেশি, তবে এবার নো-শো-র ভুল হিসেবের জন্য নয়, বরং এয়ারলাইন্সের নিজেরই চারজন কর্মীকে জরুরি ভিত্তিতে লুইভিল পৌঁছে দিতে হবে বলে। কর্মী শুরু করলেন চারশো ডলার দিয়ে, তারপর আটশো কিন্তু কেউ রাজি হলেন না, কারণ সেটাই ছিল ওই দিনের শেষ ফ্লাইট। স্বেচ্ছাসেবক না মেলায়, কম্পিউটার এলোমেলো ভাবে চারজন যাত্রীকে বেছে নিয়ে বলল, আপনাদের নামতে হবে।বেছে নেওয়া যাত্রীদের একজন ছিলেন ঊনসত্তর বছরের এক চিকিৎসক, ডেভিড ডাও। পরদিন তাঁর রোগী দেখার কথা, তাই তিনি নামতে অস্বীকার করলেন। এরপর যা ঘটল, তা বিমান-ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। বিমানবন্দরের নিরাপত্তারক্ষীরা এসে ডাক্তারকে টেনেহিঁচড়ে আসন থেকে তুললেন, ধস্তাধস্তিতে তাঁর মুখ আছড়ে পড়ল সামনের আসনের হাতলে, নাক ভাঙল, দাঁত ভাঙল, মাথায় চোট লাগল। রক্তাক্ত, আধা-অচেতন ডাক্তারকে টানতে টানতে প্লেনের করিডর দিয়ে নামিয়ে আনা হল। সহযাত্রীরা গোটাটা ফোনে তুলে রাখলেন, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল দুনিয়াজুড়ে।এরপর কোম্পানির কর্ণধার একটা বিবৃতিতে যাত্রীকে ‘পুনরায় ব্যবস্থা করা’ (re-accommodate) বলে ব্যাপারটা লঘু করতে গিয়ে আগুনে ঘি ঢাললেন। জনরোষে ইউনাইটেডের শেয়ারের দাম হুড়মুড়িয়ে পড়ল, কর্ণধারকে কংগ্রেসের সামনে জবাবদিহি করতে হল। শেষমেশ কোম্পানি ডাক্তারের সঙ্গে এক গোপন রফায় পৌঁছল, দুই নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি গেল। সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা হল এই গোটা কাণ্ডটাই এড়ানো যেত, যদি সাইমনের নিলাম-ব্যবস্থাটা ঠিকঠাক চলতে দেওয়া হত, অর্থাৎ যদি টাকার অঙ্কটা যথেষ্ট বাড়িয়ে স্বেচ্ছাসেবক জোগাড় করা হত। জোর করে টেনে নামানোর দরকারই পড়ত না।এই ঘটনার পর গোটা মার্কিন বিমান শিল্প নড়েচড়ে বসল। ইউনাইটেড স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ এক লাফে বাড়িয়ে দশ হাজার ডলার করল, ডেল্টা করল প্রায় দশ হাজার। সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্স তো ঘোষণাই করে দিল, তারা আর ওভারবুকিং করবে না। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসে একজন জনপ্রতিনিধি একটি বিল আনলেন, যার মোদ্দা কথা বোর্ডিং-এর পর জোর করে কাউকে নামানো চলবে না, আর নামানোর আগে সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ সাধতে হবে স্বেচ্ছাসেবকদের। মজার কথা, এত বড় সংখ্যাগুলো ঝোলানোর মূল উদ্দেশ্য কিন্তু সত্যিই দশ হাজার ডলার বিলিয়ে দেওয়া নয়, উদ্দেশ্য হল, দর এত উঁচুতে তোলার ক্ষমতা কর্মীদের হাতে থাকলে জোর করে কাউকে নামানোর পরিস্থিতিটাই আর তৈরি হবে না। মানে ঘুরেফিরে সেই সাইমনেরই দর্শন - জোরাজুরি নয়, দর-কষাকষি।আজ যেখানে দাঁড়িয়েতাহলে আজকের দিনে ব্যবস্থাটা কেমন চলছে? সংখ্যাগুলো দেখলে বোঝা যায়, সাইমনের সেই দাড়ি কামানোর সময়ের ভাবনাটা মোটের উপর দিব্যি কাজ করছে। মার্কিন পরিবহণ দপ্তরের হিসেব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সব মিলিয়ে প্রায় তিন লক্ষ ষোলো হাজার যাত্রীকে আসন ছাড়তে হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় দু-লক্ষ নব্বই হাজার অর্থাৎ বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বেচ্ছায় টাকা নিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন। জোর করে নামানো হয়েছে মাত্র সাড়ে পঁচিশ হাজার জনকে। মানে দশজন আসন-ছাড়া যাত্রীর মধ্যে ন-জনই খুশিমনে, স্বেচ্ছায় সরেছেন। ওই সাড়ে পঁচিশ হাজার হল সেই দুর্ভাগা সংখ্যালঘু, যাঁদের ক্ষেত্রে নিলামটা কোনও কারণে ভেঙে পড়েছে।স্বেচ্ছায় সরা আর জোর করে নামানোর মধ্যে একটা বড় ফারাক আছে ক্ষতিপূরণের দিক থেকেও। স্বেচ্ছায় সরলে টাকার অঙ্কটা দর-কষাকষির ব্যাপার, যাত্রী আর এয়ারলাইন্স রফা করে ঠিক করেন। কিন্তু জোর করে নামানো হলে সেটা আইনে বাঁধা, টিকিটের দাম আর দেরির পরিমাণ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ছক মেনে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, যার একটা ঊর্ধ্বসীমাও আছে। আর ২০২৪ সালে একটা নতুন নিয়ম চালু হয়েছে যে জোর করে নামানো যাত্রীকে এখন ভাউচার বা পরে-ব্যবহার-করার-ক্রেডিট নয়, নগদ টাকা দিতে হবে। ব্যবস্থাটা যাত্রীর পক্ষে ক্রমশ আরও পোক্ত হচ্ছে।এবার আপনি হয়তো ভাবছেন এ তো সবই সাহেবদের দেশের গপ্পো, আমাদের এখানে তো এমন নিলাম-টিলাম চোখে পড়ে না! কথাটা খানিক সত্যি। ভারতে বা এই উপমহাদেশে ওভারবুকিং হয় বৈকি, কিন্তু গেটের সামনে খোলাখুলি দর হাঁকার সেই নাটক এখানে তেমন দেখা যায় না। এখানে ব্যাপারটা অনেকটাই ঘটে পর্দার আড়ালে, কাউন্টারে চুপিচুপি রফা করে। তার নানা কারণ, আলাদা আইনি কাঠামো, আলাদা যাত্রী-সংস্কৃতি, ক্ষতিপূরণের আলাদা রেওয়াজ। কিন্তু মূল অর্থনীতিটা এক - খালি আসন মানেই লোকসান, তাই বাড়তি টিকিট, তাই কখনও-সখনও গেটে গিয়ে টানাটানি। পরেরবার বিদেশযাত্রার সময় গেটের সামনে ওই ঘোষণাটা কানে এলে, একটু দাঁড়িয়ে নাটকটা উপভোগ করবেন, জানবেন, চোখের সামনে জ্যান্ত অর্থনীতির ক্লাস চলছে, বিনি পয়সায়।শেষ কথাসেই বিকেলে নিউ ইয়র্কের এয়ারপোর্টের গেটে বসে কফির শেষ চুমুকটা দিতে দিতে আমার একটা কথা মনে হয়েছিল। আমরা ভাবি, টাকার অঙ্কটাই বুঝি সব, দু-শো, আটশো, দু-হাজার। কিন্তু ওই নিলামটা আসলে টাকার নয়, সময়ের। ওখানে দাঁড়িয়ে প্রত্যেক যাত্রী নিঃশব্দে ঘোষণা করছিলেন, তাঁর জীবনের একটা রাত, একটা সকাল, একটা অপেক্ষার ঠিক কত দাম। কারও কাছে সেই রাতের দাম চারশো, কারও কাছে দশ হাজারেও অপরিসীম কারণ ওপ্রান্তে হয়তো কেউ পথ চেয়ে আছে। একই সংখ্যা, অথচ একেক মানুষের কাছে তার মানে একেবারে আলাদা।জুলিয়ান সাইমনের কৃতিত্ব শুধু এই নয় যে তিনি এয়ারলাইন্সের কিছু টাকা বাঁচিয়েছিলেন, বা যাত্রীদের হেনস্থা কমিয়েছিলেন। তাঁর আসল কৃতিত্ব হল, জোরাজুরির জায়গায় তিনি বসিয়ে দিয়েছিলেন একটা ভদ্র প্রশ্ন “আপনি কি রাজি? কত পেলে রাজি?” মানুষকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাটুকু ফিরিয়ে দেওয়া, এই তো। স্টিগলার বলেছিলেন অসম্ভব, ফ্রিডম্যান অবাক হয়েছিলেন, এয়ারলাইন্স তাচ্ছিল্য করেছিল কিন্তু এক জেদি লোক বারো বছর ধরে লেগে থেকে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, সরল একটা আইডিয়া কেমন করে কোটি মানুষের যাত্রা একটু সহজ করে দিতে পারে। পরেরবার এয়ারপোর্টে ওই ঘোষণাটা শুনলে, হাত তোলার আগে নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করবেন আপনার আজকের রাতটার দাম ঠিক কত? উত্তরটা ভাবতে গিয়ে দেখবেন, এ শুধু ভাউচারের অঙ্ক নয়; এ আসলে আপনার তাড়া, আপনার দায়, আর ওপ্রান্তে অপেক্ষা করা মুখগুলোর হিসেব। আমরা সবাই রোজই কোনও না কোনও নিলামে বসে আছি, শুধু গেটের সামনে দাঁড়ালে সংখ্যাটা চোখে পড়ে, এই যা!
    বহ্নি মধুময় অথবা মধু বহ্নিময়: (উপন্যাসিকা ঃ পর্ব ৩)  - রানা সরকার | পূজার ঘর। তাতে মা কালী, ভক্ত রামপ্রসাদ, বাবা লোকনাথ এবং আরো বেশ কয়েকটি ছবি টাঙান আছে। চারুবাবু রোজ সকালের একটি ঘন্টা এই ঘরে কাটান। পূজা করেন বেশ ঘটা করে। ক’মাস আগে এলাকার ‘জিভে গজা’ দলের জোনাল সেক্রেটারী হওয়ার পর মা কালীর ছবিটা বেশ ভালো করে বাঁধিয়েছেন।নিজেকে শাক্ত বলেন বটে, তবে সময় সময় রামপ্রসাদভক্ত হয়ে যান। তার সব সময়ের সাথী হল তাদের পুরোনো চাকর, নাম সারদাপ্রসাদ। চারুবাবু অবশ্য তাকে চাকর ভাবেন না; ভাবে ন একজন বাড়ির লোক। গোটা ২০বছর হয়ে গেল সারদাপ্রসাদ তাদের সাথে আছে। আগে সারদাপ্রসাদের বাবা তাদের দোকানে কাজ করত। বড়বাজারের সেই দোকান এখনও আছে, তবে সারদাপ্রসাদকে তিনি বাড়িতেই রেখেছেন, তার খাস কাজের লোক হিসেবে। সারদাপ্রসাদও এখানে এতো স্নেহ-মমতা পেয়েছে যে আর অন্য কোথাও নড়তেই চায় না। মূলত তিনিই বাবুর ফাই-ফরমাশ খাটেন। তবে দোষের মধ্যে সারদা কানে বেশ খাটো। তা আকারে ইঙ্গিতে কাজ চালিয়ে নেন। তবে এর মধ্যে উল্টোপাল্টা কাজও কম করেনি। যেমন, ‘মানপত্র’ আনতে গিয়ে এনেছিল ‘মানকচু’। ‘ঝিঙের’ জায়গায় একবার খানকতক ‘ফিঙে পাখি’ কিনে নিয়ে এসেছিল। সেই থেকে বাজার যাওয়া তার বন্ধ। চারুবাবু কানের যন্ত্র নিতে বলেছিলেন। সারদাপ্রসাদ ভয়ে সে যন্ত্র কানে লাগাতে চায় নি। ভয় ছিল যন্ত্রটা যদি উল্টো কাজ করে তাকে বদ্ধ কালা করে দেয়! এর চেয়ে এই ভালো। জোর করে যন্ত্র পরাবার জন্য চেপে ধরাতে পালিয়ে গেছিল দেশে। ওদিকে চারুবাবু পড়ে গিয়েছিলেন বেজায় মুশকিলে। ২০ বছরের অভ্যেস। কানে ঠিক মতো না শুনলেও কাজের জিনিসগুলো কোথায় আছে জানত, গুছিয়েও রাখত ভালো করে। সাধ করে কতদিন আর খোঁড়া হয়ে থাকবেন? শেষে অনেক অনুনয় বিনয় করে সপ্তাহ তিন আগে দেশ থেকে নিয়ে এসেছেন। কথা দিয়েছেন যে আর কখনও কোনো যন্ত্র লাগানোর কথা বলবেন না।আজ রবিবার। গতকাল রাতে কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়ে যাওয়ায় সকালে বেশ ঝলমলে রোদ উঠেছে। মনে মনে বেশ একটা ভক্তিগদগদ ভাব এনে চারুবাবু পূজো সেরেছেন। এবার চা খেতে খেতে সকালের পেপারটা পড়বেন। প্রতিদিনই তিনি এই রুটিন ফলো করেন। না করলে সারাদিন একটা অস্বস্তি হয়। অনেকটা নেশার মতো হয়ে গেছে।লুঙ্গি আর ফতুয়া পড়তে পড়তে নাকে একটা ভাজার গন্ধ এল।বুঝলেন গিন্নী আজ লুচি ভাজছে। গরম গরম লুচির সাথে কালো জিরে কাঁচা লঙ্কা দেওয়া আলুর তরকারী চারুবাবুর খুব প্রিয়। মেয়ে বহ্নি ওদিকে হারমোনিয়াম নিয়ে বসেছে। গলায় সুর এখনও আসেনি, তবে আসব আসব করছে।গানের মাষ্টারমশাই বলেছেন যদি হঠাৎ মনে হয় সুর চলে এসেছে, জানবেন সেটা অস্থায়ী। অনেকটা নিম্নচাপের ফলে বৃষ্টি হওয়ার মতো; কিন্তু বর্ষা নয়। বর্ষা যখন আসবে তখন যেমন তার রূপ আলাদা হবে, তেমনি বহ্নির গলায়ও যখন সুর আসবে দেখবেন থামতেই চাইছে না। যখন তখন গান গাইবে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়েও গান গাইবে শুনে চমকে উঠেছিলেন চারুবাবু! ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যদি মেয়ে গান গায় তো অন্যের ঘুমের দফা গয়া। গানের মাষ্টারকে সেই উৎকন্ঠার কথা জানাতে তিনি হেসে বললেন যে ওটা একটা উপমা। আরও বলেছিলেন, “যেমন গাছের সারা শরীর জুড়ে ফুল ফোটে, ঠিক তেমনি বহ্নির গলা জুড়ে সুর ফুটে উঠবে আর তার সৌরভে মন-প্রাণ যাবে ভরে”।চারুবাবু অবশ্য কথা বেশি বাড়ান নি। ভাবছিলেন স্যারের এই গদগদ ভাব কিসের জন্য? মাইনে বাড়াতে চান নাকী অন্য কিছু। যাইহোক এটা বুঝেছিলেন যে মেয়ের প্রতি আরও কড়া হতে হবে। প্রগলভতাকে কোনমতেই প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।ওদিকে বহ্নি গান ধরেছে, “তুমি যে সুরের আগুণ লাগিয়ে দিলে মোর প্রাণে, মোর প্রাণে, মোর প্রাণে .....”।শুনে চারুবাবু ভাবছিলেন আগুণ লাগতে দেওয়া যাবে না, তাহলেই সব ছাই হয়ে যাবে। তার আগেই করতে হবে জলের বন্দোবস্ত। বুদ্ধিটা অবশ্য চারুশশীবাবুর নয়, বউ প্রমীলাদেবী অনেকদিন ধরেই বলছিলেন মেয়েটার জন্য একটা পাত্র দেখতে।টাকাপয়সা নেহাত কিছু মন্দ নেই তাদের। বড়বাজারে রমরমা দোকান। তাছাড়া এর ওর সালিশী করে বেশ কিছু সুবিধাও পান, যাকে কর্পোরেট ঘরানার লোকেরা বলে ‘পার্কস’। সেই মতো বন্দোবস্তোও করেছিলেন যে পার্টির সৎ একনিষ্ঠ সুন্দর দেখতে ছেলে দেখে মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দেবেন। বাদ সেধেছেন স্ত্রী।তিনি আবার দু’চক্ষে ঐ পার্টি দেখতে পারেন না। কথায় কথায় স্বামীর সাথে ঝগড়া হয়। প্রমীলাদেবীর বাবা ছিলেন আবার ‘চমচম’ পার্টির লোক। কামিয়ে নেওয়া স্বভাবে ছিল না, তাই পরে দলত্যাগ করেন। বাড়িতে সততা, স্বচ্ছতার একটা ভাব ছিল সদা প্রবহমান।সেটা প্রমীলাদেবীর মজ্জায় মজ্জায় ঢুকে গেছে।কিন্তু কী কুক্ষনে যে জিভে-গজার নেতা চারুবাবুকে ভালো লেগে যায় কে জানে! বলবার মতো আহামরি চেহারা চারুবাবুর ছিল না কোনোদিন। কিন্তু মানুষের দরকারে, অদরকারে চলে আসতেন। কী লাগবে না লাগবে নিতেন জেনে আর ব্যবহারটি ছিল বড় মধুর। এই কারণে বোধহয় ভালো লেগে গিয়েছিল। চারুবাবুর বাবা আর না করেন নি। প্রমীলাও ‘চমচম’ ছিলেন। তাই স্বামীকে পছন্দ করলেও তার সাঙ্গপাঙ্গদের কোনোদিনই ভালো চোখে দেখেননি প্রমীলাদেবী। স্বামী যে সালিশী করে মাঝে মধ্যে এর ওর কাছ থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিতেন তাও তার গোচড়ে আছে। কখনও সখনও ঝগড়াও জুড়ে দিতেন এই নিয়ে, কিন্তু যুক্তিতে পেরে ওঠতেন না। কীরকম পাত্র পছন্দ এই নিয়েও তর্কাতর্কি চলত সব সময়।প্রমীলাদেবী চাইতেন ছেলেকে একদম স্মার্ট হতে হবে। ফর্সা বা কাছাকাছি হলেও চলবে তবে লম্বা হওয়া চাই। আর চেহারায় হ্যান্ডসাম হওয়া চাই। স্ত্রীর এই পছন্দকে ঠাট্টা করে চারুবাবু বলতেন যে এর চেয়ে হয় চিড়িয়াখানা থেকে একটা জিরাফ ধরে নিয়ে এসো, নয়তো কুমোরটুলিতে গিয়ে পছন্দমতো অর্ডার দাও। আরে মেয়ের উচ্চতা অনুযায়ী তো বর আনবে।বরঞ্চ চারুবাবুর চাইতেন যে ছেলে শিক্ষিত হোক, নিজের ভাগ্য নিজেই তৈরী করুক। ছেলের ভিতরে যেন থাকে একটা ভরপুর আত্মবিশ্বাস। স্ত্রীর এই আত্মবিশ্বাসীতে আবার অমত। শেষে অতো আত্মবিশ্বাসী ছেলে জামাই করে ঘরে এনে বিপদে পড়ি আর কী! ছেলেকে ভালো রোজগেরে হতে হবে, তবে তার চলার পথের স্টিয়ারিংটা থাকবে প্রমীলাদেবীর হাতে।চারুবাবু বিচক্ষণ ব্যাক্তি।এক্ষেত্রে বেশী তর্কের মধ্যে যান নি।বেশী বোঝাতে গিয়ে যদি হোম ডিপার্টমেন্ট ক্ষেপে যায় তাহলেই হয়েছে। গিন্নীর পীড়াপীড়িতে কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছেন। আজ ছেপে বেরোনোর কথা।পুজো শেষ করে জলখাবার খেতে খেতে খবরের কাগজের হেডলাইনগুলো কোনো মতে পড়েই চারুবাবু চলে গেলেন পাত্র-পাত্রী বিজ্ঞাপণের পাতায়। এপাতা ওপাতা খুঁজতে খুঁজতে একটা বড় আশ্চর্যের বিজ্ঞাপণ চোখে পড়ল তার।লিখেছে - ‘উদভ্রান্ত পরিবারের বেলপাতাবাসী নৈবেদ্য কুশ্রী পাত্রীর জন্য অনুপযুক্ত পাত্র চাই! পাত্রী দাঁত কনকনভেন্ট শিক্ষিতা! ঘেমে (পাগল)। গোল্ড স্মাগলিস্ট, গর্ভবতী, মহম্মদ আলী গোত্র! পাত্রের বায়োডাঁটাচচ্চড়ি পোস্ত করে পাঠাবেন’।“ছি! ছি! ছি! কী দিনকাল পড়ল! শেষে কারা সব কাগজে বিজ্ঞাপণ দিচ্ছে? গর্ভবতী!, তার ওপর আবার গোল্ড স্মাগলিস্ট! এতো বুকের পাটা যে.........। আচ্ছা, কেউ ঠাট্টা করেনি তো? ঠিকানাটা দেখি তো, কারা এমন তরো বিজ্ঞাপণ দিয়েছে?”, বলে নীচের ঠিকানাটা দেখেই রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেলেন চারুবাবু। মুখ, নাক, চোখ, কান দিয়ে ধোঁয়া বেরতো লাগল। সারা শরীর কাঁপতে লাগল। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বললেন, “এ্যাই, কে কোথায় আছিস, ব্যাটাকে আজই পুলিশে দেব। ...কোথায় গেল সব? এই পুলিশ, ...., এই দমকল! ...”। বলে উঠতে গিয়েও বসে পড়লেন, “উফ্ফ! কী সব্বনেশে ব্যাপার। আজই তাড়াব ..., আজকেই। এই দমকল!”।হঠাৎ করে হৈ হল্লা শুনে প্রমীলাদেবী রান্না ফেলে ছুটে এলেন। বহ্নি ছুটে এলো গান ফেলে। আরো যত কাজের লোক যে যেখানে ছিল ছুটে এলো তাদের কাজ ফেলে। প্রমীলাদেবী গলায় উৎকন্ঠা নিয়ে চিৎকারের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন।খবরের কাগজটা চারুবাবু বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “দেখো, দেখো। আমার সম্মানের জামানত কীভাবে বাজেয়াপ্ত হয়েছে দেখো। পড়ো। হায়! হায়। মান ইজ্জত সব গেল।.... কোথায় সে, কোথায় ...?”কেউই এখনও গোলমালের সঠিক কারণ সম্পর্কে অবহিত হতে পারে নি। সবাই নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে।বহ্নি মাকে জিজ্ঞাসা করল, “কী হয়েছে?”উত্তর না দিয়ে পেপারটা পড়ে চললেন প্রমীলাদেবী। পড়া শেষ করে শরীরটা সোফায় এলিয়ে দিয়ে জুড়ে দিলেন কান্না, “ওগো আমার কী হবে গো! আমায় মেরে ফেল গো! এখন আমি কী করে বাঁচব গো ...? কাকে কী জবাব দেব গো!”।অনেকে দুদ্দার করে জল এনে চারুবাবু আর প্রমীলাদেবীকে পান করতে বলল।বহ্নি পেপারটা তুলে পড়তে থাকল। রাগে চারুবাবু ছুড়েঁ ফেললেন গ্লাস, কাকে যেন হিংস্রভাবে খুঁজছিলেন।সারদাপ্রসাদ গোলমাল কিছুটা আঁচ করে থামের আড়ালে ছিল লুকিয়ে।চারুবাবু তাকে দেখতেই হুংকার দিলেন। তারপর হাতে চটিটা তুলে নিয়ে সারদাকে উদ্যত হলেন মারতে। সারদাও দে ছুট। চারুবাবুও ছুটলেন পেছনে পেছনে। দৌড়নোর সময় চারুবাবুর ফতুয়ার পকেট থেকে একটা কাগজ গেল পড়ে। ওদিকে প্রমীলাদেবী বিলাপ করে চলেছেন। বিলাপ করতে করতে অন্য চাকরদের বললেন, “দেখ, লোকটার পেছন পেছন যা। রাগে উন্মত্ত হয়ে কিছু আবার করে না বসে! হায়! হায়! এখন আমার কী হবে গো!”।কয়েকজন সেদিকে দৌড় লাগাল।বহ্নি তার বাবার পকেট থেকে পড়ে যাওয়া কাগজটা তুলে পড়তে থাকল। লেখা আছে - ‘সম্ভ্রান্ত পরিবারের কলকাতা নিবাসী বৈদ্য, সুশ্রী পাত্রীর জন্য উপযুক্ত পাত্র চাই। পাত্রী কনভেন্ট শিক্ষিতা। এম. এ.(ভূগোল)। গোল্ড মেডেলিস্ট, স্বাস্থ্যবতী, আলিম্মান গোত্র। পাত্রের বায়োডাটা পোস্ট করে পাঠাবেন’। নীচে তাদের ঠিকানা ....।(চলবে) 
  • জনতার খেরোর খাতা...
    যেখানে উত্তর নেই - Pameli Ghosh | আমার মনে হয়, আজকাল আমার চিন্তাভাবনা এক্সিস্টেনশিয়ালিজম এবং অ্যাবসার্ডিজম—এই দুই দর্শনের মাঝখানে কোথাও দাঁড়িয়ে আছে। কখনও মনে হয় এক্সিস্টেনশিয়ালিস্টদের কথাই ঠিক, আবার কখনও মনে হয় অ্যাবসার্ডিস্টদের দৃষ্টিভঙ্গিই বাস্তবতার কাছাকাছি। এই দ্বন্দ্ব থেকেই আমি বারবার ভাবতে বাধ্য হই। যখন প্রথম ইন্টারনেট ব্যবহার করা শুরু করি, তখন আমার মনে হতো—জীবনের উদ্দেশ্য কী? আমি পৃথিবীতে কেন এসেছি? মানুষের অস্তিত্বের কোনো চূড়ান্ত অর্থ কি আছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গিয়ে বিজ্ঞান, দর্শন এবং বিভিন্ন লেখালেখি পড়ে আমার মনে হয়েছে যে, মহাবিশ্বে মানুষের অস্তিত্ব মূলত এক বিশাল কাকতালীয় ঘটনার ফল। জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় অসংখ্য শর্ত পৃথিবীতে একসঙ্গে মিলে গিয়েছিল বলেই এখানে প্রাণের উদ্ভব হয়েছে। এর মধ্যে আগে থেকে নির্ধারিত কোনো উদ্দেশ্য ছিল—এমন কোনো প্রমাণ নেই। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব নিজে আমাদের জীবনের কোনো অন্তর্নিহিত অর্থ দেয় না। এখানেই এক্সিস্টেনশিয়ালিজম আমার কাছে অর্থবহ মনে হয়। তারা বলে, জীবনের আগে থেকে কোনো অর্থ না থাকলেও মানুষ নিজের জীবনকে অর্থ দিতে পারে। একজন মানুষ যদি সারা জীবন নতুন কিছু জানার চেষ্টা করে, শেখে, সত্যের অনুসন্ধান করে, যুক্তি দিয়ে চিন্তা করে, অন্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়, ভালোবাসতে শেখে, সততার সঙ্গে বাঁচে—তবে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে হয়তো ফিরে তাকিয়ে বলতে পারবে, "হ্যাঁ, আমার জীবন অর্থপূর্ণ ছিল।" সেই অর্থ মহাবিশ্ব দেয়নি; সে নিজেই তৈরি করেছে। এই ভাবনাটা আমার কাছে গভীরভাবে আকর্ষণীয়। কিন্তু তারপরই অ্যাবসার্ডিজমের কথা মনে পড়ে, আর তখন আমার মনে হয়, বাস্তবতা বোধহয় আরও কঠিন। ধরো, একজন মানুষ সারা জীবন অবহেলিত হয়েছে। সে ভালোবাসা পায়নি, প্রথাগত শিক্ষা বা নতুন কোনো কিছু শেখার সুযোগ পায়নি, সমাজ তাকে বারবার বঞ্চিত করেছে। তার জীবন কেবলই সংগ্রাম আর কষ্টে কেটেছে। তাহলে তাকে যদি বলা হয়, "নিজের জীবনের অর্থ নিজেই তৈরি করো", তাহলে কথাটা কি তার প্রতি ন্যায়সঙ্গত শোনায়? এই জায়গাতেই অ্যাবসার্ডিজম আমাকে স্পর্শ করে।সব মানুষের কি সমান সুযোগ আছে অর্থ তৈরি করার?কেউ জন্ম থেকেই সুবিধাপ্রাপ্ত, কেউ নয়।তাহলে কি অর্থ তৈরির ধারণাটাও কিছুটা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত মানুষের জন্য সহজ?কারণ জীবন যে কারও প্রতি ন্যায়বিচার করবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কে ভালোবাসা পাবে, কে পাবে না; কে সুযোগ নিয়ে জন্মাবে, আর কে বঞ্চিত হবে—এসবই অনেকটাই কাকতালীয়। জীবন কোনো ব্যাখ্যা দেয় না, কোনো ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতিও দেয় না। তবু জীবন চলতে থাকে।তাই আমার মনে হয়, এক্সিস্টেনশিয়ালিজম এবং অ্যাবসার্ডিজম—দুটোর মধ্যেই সত্যের একটা অংশ রয়েছে। একদিকে আমি বিশ্বাস করি, মানুষ নিজের মূল্যবোধ, ভালোবাসা, কৌতূহল, জ্ঞানচর্চা ও নৈতিকতার মাধ্যমে নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণ করে তুলতে পারে। অন্যদিকে আমি এটাও অস্বীকার করতে পারি না যে, সেই অর্থ তৈরি করার সুযোগও সবার জীবনে সমানভাবে আসে না। মানুষের জীবনের পরিস্থিতি, সৌভাগ্য, বঞ্চনা—এসবের ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। হয়তো এই কারণেই আমি কোনো একটিমাত্র দর্শনের সঙ্গে পুরোপুরি একমত হতে পারি না। আমার মনে হয়, মহাবিশ্বের নিজস্ব কোনো উদ্দেশ্য নেই; কিন্তু মানুষ চাইলে নিজের জীবনে অর্থ খুঁজে নিতে পারে। একই সঙ্গে এটাও সত্য যে, সেই পথ সবার জন্য সমান নয়। এই দুই উপলব্ধিই আমার কাছে সত্য বলে মনে হয়। তাই আজও আমি এক্সিস্টেনশিয়ালিজম এবং অ্যাবসার্ডিজমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি—কোনোটিকেই পুরোপুরি ছেড়ে দিতে পারছি না, আবার কোনোটিকেই সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতেও পারছি না।
    চিত্রকল্প ও মনখারাপ - পাগলা গণেশ | তারপর একদিন মেঘ এল,খুব বৃষ্টি হল সেদিন।প্রলয়ের মতো।বাড়িতে বসে আমি তখন নিজের বুকটাকে খুলে মেলে ধরলাম বৃষ্টিতে,ভেতরের সব আবর্জনা ধুয়ে গেল,আমি আবার ফিরে গেলাম ঘরের ভেতর।এরকম হতেও পারত,এটা চিত্রকল্প না হয়ে বাস্তব হতো যদি?যদি তুমি ছেড়ে গেলে ধুয়ে নেওয়া যেত তোমার স্মৃতি,মা মরে গেলে যদি তার হাসি বারবার মনে পড়ে বুকটা ভার না করত আর?-ধুয়ে নিলে একবার!এমন তো হতেই পারত,শুধু আবছা অবশেষ পড়ে থাকত স্মৃতির,মাঝে মাঝে শেষ পাতের আচারের মতো জিভে দিতাম একটু,তেমন কাতর করত না আমায়।কিন্তু এমন বৃষ্টি হয় না এ ধরায়,যাতে মন ধোয়া যায়।লোকে পাপ ধোয় যদিও,মন ধোয় না কেউ।
    ডিম্মিডিয়া বনাম রিল - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | মোদি আবার রিল বানিয়েছেন। কাগজে পড়লাম, উনি বাকি মন্ত্রীদেরও রিল বানিয়ে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগস্থাপন করতে বলেছেন। ভাবুন, তেলমন্ত্রী নীতিন গদকরি রিল বানিয়ে বলছেন, ফ্রেন্ডস দেখো এই আমার নতুন বিএমডাব্লু। কিংবা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান রিল করে বলছেন, শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব। কী যে কেলোর কীর্তি হবে ভাবা যায়না। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকেই ধরুন। কালকেই মহামিছিল হয়েছে কলকাতায়। সেটা দেখে মাথায় পাগড়ি পরে কালই বিচিত্র হিন্দিতে ক্যামেরার বলেছেন, 'দেশমে আজাদি মিল গিয়া হ্যায় নাইন্টিন ফর্টিসেভেন। আজাদি আজাদি করেগা, উল্টাসিধা করেগা, এ সব নেহি চলেগা।' তারপর আরেক জায়গায় বললেন, গতকাল মিছিলে যা গোলমাল হয়েছে, সে সব শুক্কুরবারী কারবার। ইনি যদি রিল বানান, কী হবে? প্রথমটা তবু ঠিক আছে, ছাত্ররা বুঝতে পারবে ইনি অন্তত কঙ্গনা রানাউত না, যিনি বলেছিলেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে ২০১৪ সালে, অন্তত স্বাধীনতার সালটা জানেন। কিন্তু পরেরটা? ওটা রিল করে বললে তো সেই নিয়ে কমেন্টে খিল্লি হবে, যারা খিল্লি করবে তাদের আবার উনি জেলে পুরবেন, তাতে আবার বিক্ষোভ হবে। এইসব ঝামেলা এড়ানোর জন্যই তো ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অপসারণের দাবী। সেটা না করে এঁদেরকেই রিল বানাতে বলার কী মানে? ব্যান্ডেড লাগিয়ে কি আর পেটের অপারেশন করা যায়? ম্যালেরিয়ার জীবাণুকে রিল বানাতে বললে সে তো ম্যালেরিয়ার পক্ষেই নেচে নেচে বলবে। তার চেয়ে বাপু যার যা কাজ সে তাই করুক না। কচিকাঁচারা রিল করুক, আপনারা হম্বিতম্বি করে একে জেলে পুরছি তাকে দেশবিরোধী বলছি না করে দেশে গণতন্ত্র ফেরানোর একটু চেষ্টা করুন না।ওদিকে ডিম্মিডিয়া পড়েছে ঝামেলায়। মন্ত্রীরা যদি রিল করেন, তাহলে বাইট দেবে কে। এমনিতেই উনি মনকি বাত না করে সামনে মোবাইল ধরে রোজ শর্ট ভিডিও বানাচ্ছেন। সংবাদমাধ্যম হিসেবে তাদের স্বীকৃতি যায় যায়। তাই তারা এখন সংবাদমাধ্যমের গায়ে হাত নিয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। গতকাল মিছিলে কে বা কারা নাকি সাংবাদিকদের ঠেঙিয়েছে। আমি যদিও এদের কোনো কথাই বিশ্বাস করিনা, কিন্তু ঠ্যাঙানো হলে সেটা সমর্থন করার কোনো কারণ নেই। খুবই নিন্দনীয় ব্যাপার। ওটা সমর্থন করতে হলে ডিম মারাও সমর্থন করতে হয়। ডিম্মিডিয়া অবশ্য ডিম-ছোঁড়াকে মোটের উপর সমর্থনই করেছে, কিন্তু উহারা অধম বলিয়া আমরা উত্তম হইব না কেন।কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। এঁদেরকে হঠাৎ সাংবাদিক বলতে হবে কেন বুঝতে পারছিনা। কালকেই রিপাবলিক টিভির ময়ূখরঞ্জন ফেসবুকে লিখেছেন, "এক সপ্তাহ ফেসবুকে মাকু-সেকুদের monetization সাসপেন্ড করিয়ে দিন। বাইট- ইন্টারভিউ দেখানো বন্ধ করুন। ডিবেটে ডাকা- পোর্টাল পডকাস্ট থামিয়ে দিন। দেখবেন সেকু- মাকুরা বাপ বাপ করে পায়ে পড়বে। এটাই এক মাস করলে, খোদ লেলিন চলে আসবে ক্ষমা চাইতে। এদের অক্সিজেন ফুটেজ খাওয়া। বাজারি মিডিয়া বাজার থেকে এদের ঘাড় ধাক্কা দিলেই দেখবেন দম্ভ বেরিয়ে গেছে।" এটা কোনো সাংবাদিকের ভাষা না। ভাষ্যও না। এটা রাজনৈতিক মুখপাত্রের ভাষা। এবং লেনিন বানানটাও ভুল। ওঁরা তো সাংবাদিক না, এইগুলোই করেন, একবার না, বারবার করেন, করেই চলেন, ফলে ওঁদের খামোখা সাংবাদিক বলার কোনো মানে নেই। বিজেপির ফড়েদের বিজেপির ফড়ে নামেই ডাকতে হবে।হ্যাঁ, যাঁরা গ্রাউন্ডে ছিলেন, তাঁরা ময়ূখরঞ্জন না। তাঁরা চ্যানেলের নীতিও ঠিক করেননা। তাঁরা নেহাৎই কর্মী। চ্যানেল খারাপ, ওঁরা ভালো, হতেই পারে। কিন্তু তাই যদি হয়, সেই চ্যানেলই যখন ওঁদের সংবাদের শিরোনাম করছে, সেটা তিলকে বাড়িয়ে হরিপাল করা হচ্ছে কিনা বোঝার কোনো উপায় নেই। তার চেয়েও বড় কথা, এই কর্মীদেরই বহুক্ষেত্রে দেখেছি 'আপনি কি অনুপ্রবেশকারী?' কিংবা 'উত্তর দেবেন না কেন? ভয় পাচ্ছেন?' বলে অনিচ্ছুক মানুষের পিছনে পিছনে বুম হাতে তেড়ে যেতে। এই অসভ্যতা দিনের পর দিন চলেছে, সেটাকে কাজে লাগিয়ে বিষ ছড়ানো হয়েছে। তারপর রাস্তার বুমধারীকে দেখেছি প্রোমোশন পেয়ে সঞ্চালক হয়ে বিষ ছড়াতে। এবং আরও প্রোমোশন পেয়ে তিলক কেটে বিধায়ক হয়ে যেতে। সবই কি নেহাৎই অনিচ্ছায়? এই যে কদিন আগে ইন্ডিপেন্ডেন্ট কিছু সাংবাদিককে জেলে পোরা হল, তখন একজন কর্মীকেও তো মুখ খুলতে দেখলাম না। সেও কি নেহাৎই চাপে? হতেই পারে। কিন্তু এতটাই যদি হয়, তো তাহলে তো তাঁদের নেহাৎই ওই বিরাট যন্ত্রের নাটবল্টু ছাড়া আর কিছু বলার নেই। সংবাদমাধ্যমে তো নিরাপত্তারক্ষী থেকে শুরু করে ঝাড়ুদার পর্যন্ত বহু মানুষ কাজ করেন। সকলেই সম্মাননীয় এবং নাটবল্টু। কিন্তু তাঁরা তো সাংবাদিক না।কিন্তু সাংবাদিক না বললেও গায়ে হাত দেওয়া বেআইনী, অনৈতিক, নিন্দনীয়। যদি হয়ে থাকে। যদি লিখলাম, কারণ, আগেই বলেছি, এদের কোনো 'খবর'ই বিশ্বাস করিনা। কিন্তু সঙ্গে এটাও বিশ্বাস করি, ময়ূখের যা ইচ্ছে উনি বলতেই পারেন, যত আপত্তিকরই হোক, সেটা গণতান্ত্রিক অধিকার। তার জন্য বলপ্রয়োগ করা অগণতান্ত্রিক। আর ডিম্মিডিয়া কর্মীরা তো ময়ূখের মতো কিছু বলেনও নি। এবং শুধু ওঁরা কেন, যদি কোনো নেতাও ভুল করে বিপক্ষের কোনো মিছিলে চলে আসেন, তাঁর সঙ্গেও অসভ্যতা করা যায়না। হ্যাঁ, একটি দল ডিম ছোঁড়ে, অসভ্যতা করে, এইসব হিংস্রতার উদযাপন করে, ডিম্মিডিয়া সোল্লাসে সেসব সমর্থন করে, কিন্তু তার জবাব এগুলো না। এই সংস্কৃতি বদলানোর জন্যই তো এত কথা। অবশ্যই বয়কট করা যেতে পারে, স্লোগানও দেওয়া যেতেই পারে। শুধু পারে, না করা উচিতও। তার চেয়েও ভালো হয়, ময়ূখের চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করলে। সেকু-মাকুরা জাস্ট গোদি মিডিয়ায় যাওয়া বন্ধ করে দিন। খবর শেয়ার করা বন্ধ করে দিন। অন্য ছোটো মিডিয়ায় আসুন। তারপর কার আসলে কত দম বোঝা যাবে। কক্রোচ জনতা পার্টিকে তো এরা দেখায়নি, কিছু ক্ষতি হয়েছে? ব্যক্তিগতভাবে আমিও বলতে পারি, স্বেচ্ছায় গোদি-মিডিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর আমার কিচ্ছু ক্ষতি হয়নি। খবরর কাগজে যখন লিখতাম তখন যত লোক পড়তেন, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি পড়েন। এই সেলিব্রিটি-ডিম্মিডিয়া-গ্ল্যামার এটা একটা গোলচক্কর। একটা ফাঁদ। এবং অবশ্য মনের মধ্যে তৈরি করে দেওয়া আধিপত্য বা হেজিমনি। এদেরকে ছুঁড়ে ফেলুন, নিজের দলের নেতাদের ছুঁড়ে ফেলতে বলুন। ডিম্মিডিয়ার আয়ু এমনিই বেশিদিন নয়। শেষদিনটা একটু উদ্যোগ নিয়ে ত্বরান্বিত করুন। ইতিহাস আপনাদের মনে রাখবে। পুঃ ডিম্মিডিয়ায় ভরসা না রাখা কেন দরকার, তার একাধিক হাতেগরম উদাহরণ আছে। বিহার এখন উত্তাল। বিহার বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছে। আর ঠিক তার আগেই জেহানাবাদে গুলি চলেছে। এবং আইসার নেতাদের রাজ্যজুড়ে ধরপাকড় করা হচ্ছে। এ ছাড়াও আরও একট মিছিল আছে আজ কলকাতায়। পদ্মপুকুর মৌলালিতে। দুপুর দুটোয়। এইসব খবর আপনি ডিম্মিডিয়ায় পাবেন না। তারা ঠিক যা দেখানোর দরকার মনে করবে, সেইটুকুই দেখাবে, বাকি সব বাদ। ঠিক এই জন্যই বয়কট প্রয়োজন।এবং এই খবরটাগুলোও ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
  • ভাট...
    commentsyandi | অ্যালবার্ট যা করেছেন সেটা অতি দুঃসাহসের কাজ! ওখানে কেউ যায় ঐ ক্লাবের মেম্বাররা ছাড়া? তাও আবার একা একা! যাই হোক সুস্থ হয়ে উঠুন তাড়াতাড়ি।
    comment | কাকে একটা শিক্ষামন্ত্রী করেছে, তার হাতে অলরেডি গোটা ৫- এক হ্যানাত্যানা দপ্তর ! কী করবে সে ? এখন তো আবার রিলও বানাতে হবে।
     
    সর্বৈব জালি রেজিম বুঝেই গেছে তারা পুরোই খোরাকে পরিণত হয়েছে।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত