এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    শিল্পের পণ্যায়ন - নিরমাল্লো | আর্ট কাকে বলে এই প্রশ্নটা করলে, যুগে যুগে নানান রকম উত্তর পাওয়া যায়। রেনেসাঁ-পূর্ববর্তী যুগে একরকম, পরবর্তী যুগে আরেক রকম, উনিশ শতকে আগে এক, পরে এক। কিন্তু প্রতি যুগেই নতুন কোন আর্ট মুভমেন্টের পেছনে একটা প্রতিবাদী সত্ত্বা বা যুগ পালটে দেওয়ার মত জেদ কাজ করেছে। শুরুর দিকে তা হয়তো টেকনোলজি বা রঙের রসায়নভিত্তিক ছিল। রঙের মিডিয়াম, ছবির পার্স্পেক্টিভ, বিষয়ের বৈচিত্র্য ইত্যাদি নিয়ে রেনেসাঁ ও তার পরবর্তী যুগে বহু শিল্পী তাদের শৈলী তৈরী করেছেন। কিন্তু সেই শিল্পের উদ্দেশ্য মূলত প্রকাশভঙ্গিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং সমাজকে, যুগকে পালটে দেবার এক আগ্রাসনও তার মধ্যে ছিল। শুধু আগ্রাসনই ছিল না, সমাজকে সে পাল্টেও দিয়েছে রীতিমতো। ইউজিন ডেলাক্যোয়ার "Liberty Leading the People" ছবিটাই ভাবুন (ছবি ১) ছবি ১: ইউজিন ডেলাক্যোয়ার - লিবার্টি লিডিং দ্য পিপলফ্রেঞ্চ রেভোলুশান শেষ হয়ে নেপোলিয়ন হয়ে ফ্রান্সে তখন জুলাই রেভোলুশান চলছে। ফ্রান্সে তখনো হিরো ওয়ারশিপিং চলছে। লিবার্টি শব্দটা মানুষের কানে নিত্যই বাজছে। একই সময় আর্ট চলেছে তার রোমান্টিসিজম নিয়ে। ডেলাক্যোয়ার তুলিতে উঠে এল এই লিবার্টি, যে কোন দেবী নয়, বরং সাধারণ মানুষ। যুদ্ধে তার কাপড় এলোমেলো হয়ে যায়, কিন্তু সে পতাকা উঁচিয়ে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে। ছবিটার মধ্যে স্বাধীনতা, ধনীদের দমন পীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এতটা মূর্ত - যে একে অনেকে ভুল করে ফ্রেঞ্চ রেভোলুশান (১৭৮৯) এর প্রতীকি ছবি বলেও মনে করেন। লিবার্টি তখনকার আর্ট রেভোলুশানের সাথে এতটাই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছিল যে বহু ছবিতেই তার আবির্ভাব ঘটে। এমনকি লিবার্টি আইল্যান্ডের স্ট্যাচু অব লিবার্টিও তারই পথ ধরে এসেছে।ফ্রেঞ্চ রেভোলুশানেও কিন্তু ছিলেন জাক লুই ডেভিস, যার তুলিতে উঠে এসেছিল "মারোর মৃত্যু" (ছবি ২) বা "গিলেটিনের পথে মারি আঁতানোয়েত" (ছবি ৩)। বিদ্রোহের আঁচ এসে পড়েছিল ছবিতে শিল্পীর মননে। ছবি ২: মারোর মৃত্যু - জাক লুই ডেভিস (১৭৯৩)ছবি ৩: গিলেটিনের পথে মারি আঁতানোয়েত (১৬ অক্টোবর ১৭৯৩)পরবর্তীতে উনিশ শতকে আরো নতুন নতুন প্রতিবাদ এসেছে চিত্রজগতে। পিকাসো প্রতিবাদ করেছেন গ্যেরনিকা, বুলস হেডের মধ্যে দিয়ে। নর্মান রকওয়েল এঁকেছেন পলিটিক্যাল আর্ট, হেলমুট হার্জফেল্ড, যিনি জন হার্টফেল্ড বলে বেশি পরিচিত, আঁকলেন এন্টি-ফ্যাশিস্ট আর্ট (ছবি ৪)। প্রতিবাদ ছবির ভাষা হয়ে উঠল বিশ শতকে। নানারকম ফর্ম ও চিত্রভাষ্য নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হতে লাগল সর্বত্র। শাসক যত আঘাত হানল, চিত্রকর ততই নিজেকে পালটে পালটে প্রতিবাদ করে চলল। ছবি ৪: The Problem We All Live With by Norman Rockwell (1964) & Never again! by John Heartfield (1932)আমরাও কি ছিলাম তার বাইরে? "অদ্ভুত লোক"-এ গগনেন্দ্রনাথের কার্টুন (ছবি ৫) সাক্ষ্য দেয় সমাজের বীভৎস রসের, যা তখনকার লেখার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এলেও, ছবি হয়ে আমাদের চোখে ধরা দেয় নি আগে। ছবির নাম প্রচণ্ড মমতা - যা তৎকালীন ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার নামক সোনার পাথরবাটিকে ব্যঙ্গ করে আঁকা।ছবি ৪: "প্রচণ্ড মমতা" -অদ্ভুত লোক, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৯১৭)একটু খেয়াল করলে দেখবো, বিশ-শতকে বা আরো স্পেসিফিক করে বললে বিশ্বযুদ্ধের পরে বেশিরভাগ ছবি হয় বিমূর্ত অথবা এইরকম প্রতিবাদী চিত্রকলায় ভরে ওঠে। প্রতিবাদ আর শিল্প যেন সমর্থক হয়ে ওঠে। সমাজের কাঠামোগত পরিবর্তন ও হচ্ছিল সাথে সাথে। উপনিবেশের সময় ফুরলো বেশিরভাগ যায়গাতেই। কিন্তু উপনিবেশের পতনের সাথে সাথে একটা জিনিস ক্রমেই মাথা চাড়া দিয়ে উঠল তা হল কনজিউমারিজম। এমন নয় যে পণ্যায়ন এর আগে ছিল না, বা উপনিবেশ তাকে চেপে রেখেছিল। বরং সবকিছুই যে পণ্য ও এবং বিশ্বব্যাপী পণ্যায়নের শুরু সেই উপনিবেশের পত্তনের শুরু থেকেই। কিন্তু আর্টকে তার মধ্যে সেভাবে ফেলা হয় নি। যদিও রাজারাজড়াদের দেয়ালে দামী পেইন্টিং শোভা পেত, কিন্তু তারা সাধারণের নাগালের বাইরে গিয়ে পড়ে নি।কিন্তু বিশ শতকের গোড়ার দিকেই আর্টিস্টরা ক্রমশ এবস্ট্রাক্টের দিকে ঝুঁকে পড়ে। দাদাইজম, কিউবিজম, সাররিয়ালিজম, এবস্ট্রাকট এক্সপ্রেশানিজম ইত্যাদি পোস্টমডার্ন শৈলী ক্রমশ যায়গা করে নেয় ছবির দুনিয়ায়। একটু খেয়াল করলে দেখব বিশশতকের পর ইন্ডিভিজুয়ালিজম ক্রমশ বাড়তে শুরু করে। সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা সবেতেই এর প্রভাব দেখা যায়। যত দিন গেছে আর্টের শৈলী বা ফর্ম বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, অন্তর্নিহিত অর্থ হয়েছে বেশি রহস্যময়, ক্রিপ্টিক। আর্টের ইতিহাসের গোড়ার দিকে থেকেই আর্ট ছিল অস্তিত্ব জানান দেবার তাগিদ। পরবর্তীতে সে ধর্মীয় আচারের সাথে যুক্ত হয়ে তার নিজের পথ পাল্টেছিল। রেনেসাঁর পর বিজ্ঞান আর টেকনোলজির ব্যবহার তাকে দিয়েছিল নতুন দিশা। কিন্তু ফোটোগ্রাফি আবিষ্কারের পর বাস্তবসম্মত চিত্রায়নের চাহিদা ক্রমশ কমে আসে। আর্টিস্টরা তাই ক্রমশ তাদের অস্তিত্বের নতুন মানে খুঁজতে শুরু করেন।এইখানে এসেই আর্টিস্টদের সাথে সাধারণের দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে। ছবির জগত যত দুর্বোধ্য হতে শুরু করে, সাধারণ ততই তাকে পাশ কাটিয়ে চলে। ২০১৬ তে এক ব্রিটিশ সমীক্ষায় দেখা গেছিল বেশির ভাগ লোকই মডার্ন আর্ট পছন্দ করেন না। এর দুটো কারণ মোটামুটিভাবে ধরা যায়। প্রথমত যে সব ক্ল্যাসিকাল ছবি বা মূর্তি বা রিলিফ আমরা দেখে অভ্যস্ত ছিলাম এর আগে অব্দি, তা মূলতঃ সৌন্দর্যের বর্ণনা দেয়। বীভৎসতা সেভাবে ছবির মূল বিষয় হয়ে ওঠে নি। ট্রাজেডি অবশ্যই বলা হয়েছে, নাটকীয়তা অবশ্যই দেখানো হয়েছে, কিন্তু তা সেভাবে ভয়াল হয়ে ওঠে নি। সেই এক্সপ্রেশানিজম শুরু হয়েছে আঠেরোশ শতকের শেষ থেকে। এক্সপ্রেশানিজমও সাধারণ মানুষ মেনে নিয়েছে, কিছুটা তার রোমান্টিসিজম-এর সাথে যোগাযোগের জন্য, কিছুটা রঙের ব্যবহারের নতুনত্বে জন্য যা পুরোনো ক্লাসিক রেনেসাঁকে পুরোপুরি ত্যাগ করে নি। কিন্তু বিশ শতক যখন অ্যাবস্ট্রাক্ট দাদাইজিমের জন্ম দিল, সাধারণ মানুষ স্বভাবতই তাকে তার আজন্মলালিত সৌন্দর্যবোধ ও স্বাভাবিক রোমান্টিসিজমএর সাথে মেলাতে পারল না। এবং এর উপরে শুরু হল, কিছু ছবির অসম্ভব দামে বিক্রি হওয়া।অস্বাভাবিক দামি জিনিসের উপরে সাধারণ মানুষের একটা স্বভাবসিদ্ধ বৈরিতা কাজ করে। এ অস্বাভাবিক কিছু নয়, আমরা আমাদের দৈনিক জীবনেই বুঝতে পারি। যা আমাদের সাধ্যাতীত তাকে দূরে রেখে জীবনের কঠোর পথে তৈলনিষিক্ত করার নাম স্বাভাবিক জীবন৷ যা সাধ্যাতীত তাকে দূরে রাখবার জন্যেই এই মানসিক দমন প্রক্রিয়া, ডিফেন্স মেকানিজম, আমাদের শিখতেই হয়েছে। মিউজিয়ামে রাখা আকবরের সোনার গ্লাস দেখে আমাদের চিত্ত চাঞ্চল্য হয় না, কারন সেটা সরকারের প্রপার্টি, কিন্তু পাশের বাড়ির হরিপদ যদি অডি গাড়ি কেনে তবে আমরা মনে মনে চটে উঠি। তাই একটা ক্যানভাসে এলোমেলো কটা দাগ, যা হয়তো আমার পাঁচ বছরের বাচ্চাও করে দিত, তাকে কেউ কোটি কোটি টাকা দিয়ে কিনছে, এমনটা ভাবলে একধরণের বিতৃষ্ণা জন্মানো কিছু অস্বাভাবিক নয়।ছবি যতক্ষণ তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যকে বজায় রেখেছিল, ততদিন সাধারণ মানুষ তাকে একেবারে দুচ্ছাই করে নি। আজও যদি লেওনার্দো বা রেমব্রান্টের কোন হারিয়ে যাওয়া ছবি ফিরে এসে অকশানে হৈচৈ ফেলে দেয়, তবে সবাই ভুরু কোঁচকাবে না। কিন্তু একটা লোক তার ক্যানভাসে কালো রঙ করে দিল, আর তার দাম ধার্য হল ৬ কোটি ডলার এমনটা হলে আমরা খুব চমকে উঠব (ছবি ৫)।ছবি ৫. Malevich's Black Square (1923)এইখানে আর্ট ক্রিটিক হয়তো বলবেন, এই ছবি কেবল সাধারণভাবে দেখলে চলবে না, এই ছবির পেছনের ইতিহাসও জানা দরকার। মালিয়েভিচ কিসের যন্ত্রণা থেকেই এই ব্ল্যাক স্কোয়ার আঁকলেন, কেন তার ছবিতে এত নেগেটিভ স্পেস, কিভাবে ১৯৩০ সালে স্ট্যালিনের ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় মালিয়েভিচের সব ছবি, ম্যানুস্ক্রিপ্ট বাজেয়াপ্ত করা হয়, দু-মাস জেলে থাকা অবস্থায় তার চিন্তার কি গতিপ্রকৃতি ছিল, কিভাবে তার চিন্তা ঐভাবেই ক্যানভাসে বেরিয়ে আসে, এমনটা বোঝাও দরকার। এইখানেই আর্ট সমঝদার ও সাধারণ মানুষের চিন্তা দুটি আলাদা পথ ধরল। শিল্পী আর তার শিল্প সাধারণের নাগাল থেকে বেরিয়ে একটু আলাদা স্পেসে বসল। তাতে ছবি ভালো হল কিনা সেটা ক্ষেত্রবিশেষে পালটে যাবে। কিন্তু সাধারণের চিন্তায় এমন জিনিস ততটা সাড়া দেয় না, যা সরাসরি তার ইমোশানকে ধাক্কা দেয় না। দ্বিতীয়ত, ছবির অর্থ যাই হোক, যতই গভীর হোক না কেন, তা কি কোটি টাকার অঙ্কে হিসেব করা যায়?ইকোনমিস্ট হয়তো বলবেন, কোনোকিছুর মূল্য বাজারে ততখানিই যতটা বাজার তাকে দিতে পারে, উচ্চমূল্য বলে কিছু নেই। কিন্তু সত্যিই কি তাই? এই সব পেইন্টিং বা আর্টওয়ার্ক কি সত্যিই এমন অর্থ দাবী করে? যদি তাই করে, তবে এর কতটাই বা চিত্রকর নিজে পাচ্ছেন, বা কতটা দাম তিনি নিজে আশা করেন? এসব প্রশ্ন করলে দেখব, এর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চিত্রকর বা ভাস্কর এইসব মূল্যের কিছুমাত্র পান না। যে কোন শিল্পকে পণ্যে রূপান্তরিত করে তার থেকে লাভ করার যে পন্থা, তা বেশিরভাগ শিল্পীরই হাতের বাইরে। একটু খেয়াল করলে আমাদের সাধারণ বুদ্ধিতেই বোঝা যায় যে, আর্টের পণ্যায়ন ও তার এই অদ্ভুত মূল্যবৃদ্ধি অন্তত শিল্পের তাগিদে নয়, তার অন্য কারণ আছে। মূলত এই শিল্পের বাজারকে দুইভাগে ভাগ করা যায়। প্রাথমিক ভাগে চিত্রকর/ভাস্কর স্বয়ং ছবি বিক্রি করেন, এবং এর থেকে যা অর্থাগম হয় তা চিত্রকরের লাভ। প্রথম শ্রেণীর ক্রেতা মূলত ছোট আর্ট গ্যালারি, সাধারণ মানুষ। কিছু ক্ষেত্রে অর্থবান ক্রেতার সাথেও চিত্রকরের সরাসরি যোগাযোগ থাকে। স্বাভাবিকভাবেই এই ভাগে ছবির দাম কমই থাকে। অতি সামান্য থেকে শুরু করে এই দাম বাড়তে বাড়তে লক্ষ ডলারেও যেতে পারে অবশ্য, কিছু কিছু ক্ষেত্রে, কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণীর বাজারের তুলনায় তা কিছুই নয়। এই দ্বিতীয় শ্রেণীর বাজার মূলতঃ কালেকটারদের জন্য। এই দ্বিতীয় শ্রেণীর বাজারে দর চড়ার জন্যে শিল্পীর কিছু মার্কেট ভ্যালু থাকা চাই। যখন তার ছবির জগতে কিছু নাম বাড়ল, তখন তার প্রাথমিকভাবে বিক্রি করা যে ছবি তার দর বাড়তে থাকে। এবং সেই ছবির প্রথম কালেক্টর ছবি বিক্রি করেন লাভের প্রত্যাশায়। ফলে ছবির দাম ক্রমশ বাড়তে থাকে। আর্ট অকশান হাউসগুলি এই আর্ট মার্কেটের খবর রাখে ও বিক্রি হতে সাহায্য করে। কোটি টাকার বিনিময়ে এই সব আর্ট ওয়ার্ক কোনো কালেক্টরের ঘরে এ্যাসেট হয়ে শোভাবর্ধন করে। সে যখন আবার এই আর্ট বিক্রি করে তখন তার দাম আরো বাড়ে। অর্থাৎ এই দাম বাড়া কমার মধ্যে আর্ট এপ্রিসিয়েশান থাকলেও তা এই দামের মূল সূচক নয়। বরং তার সোশাল ও ডেকোরেটিভ ভ্যালুই তার দাম নিয়ন্ত্রণ করে।এদ্দুর পড়ে পাঠক হয়তো ভুরু কোঁচকাবেন, যে বেশ করে দাম বাড়ে, কিছু লোক মুনাফা করছে তাতে আমার এত গাত্রদাহ কেন? বিশ্বাস করুন আমার এতটা গাত্রদাহ হত না যদি আর্ট এর থেকে বেরিয়ে আসতে পারত। যত দিন যাচ্ছে, আমার ধারণা দৃঢ় হচ্ছে যে এই অদ্ভুত অচ্ছেদ্য চক্র থেকে শিল্প আর কখনোই বেরিয়ে আসতে পারবে না। আসুন এইবারে সেই কথাটাই বলি।যারা এই বোরিং লেখা এদ্দূর পড়েছেন, আমি ধরে নিচ্ছি তাঁরা আধুনিক ছবিটবি দেখেন ও ব্যাঙ্কসির নাম শুনেছেন। যদিও শুনে না থাকলেও বিশেষ কিছু যায় আসে না, কারণ এই ব্যাঙ্কসি কে তা কেউই সঠিকভাবে জানে না, একেবারে তার ইনার সার্কেলের লোকেরা ছাড়া। কিন্তু নাম শুনুন বা না শুনুন, তার আঁকা ছবি আশা করি ঠিকই দেখেছেন। ১৯৯৭ সালে ব্যাঙ্কসির আঁকা প্রথম ম্যুরালটার নাম ছিল The mild mild west (ছবি ৬ক)। ছবিটা ব্রিস্টলের এক সলিসিটরের দেয়ালের সামনের এডভার্টাইজসমেন্ট কে ঢেকে দিয়ে বানানো। ব্যাঙ্কসির ছবি মূলত স্টেনসিলে আঁকা এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একটা ক্যাচি স্লোগান থাকে তার সাথে। ছবিগুলো দেখলে (ছবি ৬খ: The girl with Balloon, ছবি ৬গ: Flower Bomber, ছবি ৬ঘ: Can't Beat That Feeling or, Napalm) বোঝা যায় ছবির সাবজেক্ট ব্যঙ্গাত্মক ও পোলিটিক্যাল। বেশিরভাগ ছবিতেই যুদ্ধবিরোধী, এন্টিক্যাপিটালিস্ট, প্রতিষ্ঠান-বিরোধী বার্তা থাকে। ছবিগুলি দ্রুত প্রশংসিত হতে থাকে এবং আর্টক্রিটিকদের আগ্রহ বাড়ায়। ছবি ৬. ব্যাঙ্কসির আঁকা ছবি ক) The mild mild west, 1999, mural, No. 80 Stokes Croft, Bristol খ) Girl with balloon, mural on Waterloo Bridge in South Bank in 2004 গ) Flower thrower, mural in Beit Sahour in 2003, ঘ) Napalm, screenprint, 2006ছবিগুলো খেয়াল করলে দেখবেন তার তীব্র অভিঘাত। নাপাম ছবিটাই ধরুন। ছবির সেন্ট্রাল ক্যারেক্টর হল একটি নয় বছরের শিশু কিম ফুক্, যে দক্ষিন ভিয়েতনামের এক গ্রামে থাকত, যে গ্রাম তখন উত্তর ভিয়েতনামের দখলে। ১৯৭২ সালের ৮ই জুন, সেই গ্রামে দক্ষিন ভিয়েতনাম এয়ার রেইড করে নাপাম বোমা ফেলে। কিম ফুক্ তখন তার গ্রামবাসীদের সাথে পালাচ্ছিল। রিপাবলিক অব ভিয়েতনামের বোমারু পাইলট তাদের বিপক্ষের সৈন্য মনে করে তাদের উপরে বোমা ফেলে। কিমের চার সাথী সেখানেই মারা পড়ে, ও কিমের সমস্ত জামাকাপড় পুড়ে গিয়ে থার্ড ডিগ্রি বার্ন হয় ঐ আগুনে-বোমায়। সকলের সাথে কিম যখন প্রাণভয়ে পালাচ্ছিল আর চিৎকার করে খুব গরম, খুব গরম ("Nóng quá, nóng quá")বলে কাঁদছিল, Nick Ut বলে এক প্রেস ফোটোগ্রাফার কিমের ঐ ছবিটা তোলে; নাম দেয় "the girl in the picture"। নিচের ভিডিওটা দেখে নিতে পারেন এই লিঙ্কেপরবর্তীতে এই ছবিকে পুলিৎজার পুরষ্কারে ভূষিত করা হয়। যুদ্ধের বীভৎসতার সাথে এই ছবিটা প্রায় সমার্থক হয়ে ওঠে। ব্যাঙ্কসি সেই ছবিটাকেই তার নাপাম ছবির সেন্ট্রাল ক্যারেক্টর করে তুলেছে৷ কিন্তু তার দুই পাশে আছে মিকি মাউস আর রোনাল্ড ম্যাকডোনাল্ড (ম্যাকডোনাল্ডের ম্যাসকট)। তারা যেন হাত ধরে কিমকে খোলা মার্কেটে নিয়ে আসছে। যুদ্ধপীড়িত শিশুর অসহায়তা, নগ্নতা, সভ্যতার ব্যর্থতা সবই যেন পণ্য। তাই তাকে খোলা বাজারেও বেচা যায়। ক্যাপিটালিজম ও যুদ্ধ এর বিরুদ্ধে ছবিটা যেন একটা খোলা জেহাদ। অনেকে মনে করেন এই ছবিটা ব্যাঙ্কসির সবচেয়ে মর্মভেদী ছবিগুলির মধ্যে একটি। ব্যাঙ্কসি এই ছবির প্রায় শতাধিক প্রিন্ট বানায়। এই ছবিগুলির এক একটি বিক্রি হয় প্রায় ২৫-৩০ হাজার পাউন্ডে। এইখানেই আবার বাজার জিতে যায়। যে বাজারের বিরোধ করে এমন প্রচার, এমন তীব্র ব্যঙ্গ তা শিল্পী নিজেই বাজারজাত করলেন। বিরোধীতাকেও বাজার তার পণ্যে রূপান্তরিত করে নিল। বাজার, বাজারের সমালোচনা থেকেও অর্থপার্জন করে যদি তবে সেই সমালোচনার অর্থ খানিক ঘোলাটে হয়ে পড়ে।আর একটা এনেকডোটাল ঘটনা বলে শেষ করি। ২০১৮ সালে ব্যাঙ্কসি তার পুরোনো একটা ছবি ফ্রেম করে নিলামে তোলে। ছবিটা আমাদের পূর্বপরিচিত Girl with balloon এর পেপার প্রিন্ট, যা একটা দামী সোনালী ফ্রেমে বেঁধে পাঠানো হয়েছিল সাদাবির নিলাম ঘরে। যথারীতি ব্যাঙ্কসির নাম মাহাত্ম্য এখানেও কাজ করল - এবং ছবিটা দাম উঠল ১৪ লক্ষ ডলার। নিলামের হাতুড়ি পড়া মাত্রই ক্রেতা আর বিক্রেতাদের অবাক করে দিয়ে চড় চড় শব্দ করে ছবিটা ছিঁড়ে নিচের দিকে পড়তে শুরু করে। ব্যাঙ্কসি ঐ ফ্রেমের মধ্যে একটা শ্রেডার ফিট করে রেখেছিল, যা সঠিক সময়ে ছবিটা ছিঁড়ে ফেলার জন্যে তৈরী ছিল। মুহূর্তের মধ্যে ইতিহাস তৈরী হয়, বর্তমান বাজারে একটা বিক্রি হওয়া জিনিসকে নষ্ট করার মত ক্ষমতা কজনের আছে, হোক না সে যতই নামী শিল্পী। দূর্ভাগ্যবশত ছবিটা পুরোপুরি ছেঁড়া যায় নি। যান্ত্রিক গোলযোগেই হোক বা পূর্বপরিকল্পিত হোক, প্রায় অর্ধেক ছবি ছেঁড়ার পরে শ্রেডিং মেশিন বন্ধ হয়ে যায় (ভিডিও দেখুন লিঙ্কে)অনেকে ভেবেছিল হয়তো এটা মিথ্যে গিমিক তৈরী করার একটা প্রচেষ্টা, সত্যিকারে ছবিটা নষ্ট হয়নি। কিন্তু তা নয়। ব্যাঙ্কসি তার সোশাল মিডিয়া হ্যাণ্ডেলে স্বীকার করে নেয়, যে এটা তারই করা, সে তার ছবির মধ্যে নিজেই এই শ্রেডার ফিট করে রেখেছিল, যদি ছবি নিলামে ওঠে সেক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য। সমগ্র আর্ট ক্রিটিক, এমনকি নিলাম কর্তাদেরও নিশ্চই দুরবস্থা হয়েছিল তাদের অত দামের ছবির ঐ হাল দেখে।এদ্দুর পড়ে যারা ভাবছেন, তবে তো আর্টের জয় হল, বিরোধীতার নতুন মাত্রা এল, তারা ভুল ভাবছেন। এত বড় এক সিম্বলিক বিপ্লবও কোন কাজে এল না, কারন সাদাবি তার ক্রেতাকে আস্বস্ত করাতে সক্ষম হল যে এই ছেঁড়া অবস্থাতেও তার দাম কিছু কম হল না। বরং ঐ ইউনিকনেস তাকে ইতিহাসে একটা বিশেষ যায়গা করে দিল। ঐ ছবিকেই অন্য নাম দিয়ে তাকে ঐ দামেই বিক্রি করে দেওয়া হল আগের ক্রেতার কাছেই (ছবি ৭)। ছবি ৭. Love is in the bin, Banksy 2018অর্থাৎ শিল্পী ও শিল্প যতই প্রতিবাদ করুক না কেন, যতই তার বাজারধর্মীতার বিরুদ্ধে আওয়াজ ওঠাক না কেন, সে বাজারের কাছে নত হতে বাধ্য। বাজার তার বিরোধিতা থেকেও মুনাফা কামাতে পারে। সফলতা আর মুনাফা হয়তো প্রায় সমর্থক হয়ে উঠেছে আজকে। আজ আর কবিকে বলতে হয় না - "ভারতীরে ছাড়ি ধর এই বেলা লক্ষ্মীর উপাসনা!" কারণ ভারতীর উপাসনা সফল হলেই লক্ষ্মীর আগমন হয়। প্রতিবাদ যাই হোক না কেন বাজার নিঃশর্তে জেতে। সমগ্র শিল্পের ইতিহাসে এইটেই সম্ভবত শিল্পের সবথেকে বড় হার।
    কাদামাটির হাফলাইফ - ইট পাথরের জীবন - ইমানুল হক | নামাঙ্কনঃ ইমানুল হক। ছবিঃ র২হকথা - ১৮আমাকে যাঁরা রাতদিন ছুটতে দেখেন, তাঁরা বিশ্বাস করতেই চাইবেন না, বর্ধমান জীবনে আমি একজন চির অসুস্থ মানুষ বলেই পরিচিত ছিলাম। ১৯৯১ পর্যন্ত বছরে ১৫ দিন থেকে দু মাস হাসপাতাল বাস আমার জন্য ছিল বাঁধা।একাধিকবার স্যালাইন এবং রক্ত নিতে হয়েছে।একবার আট বোতল। একবার দশ বোতল।‌ আলসারের জন্য। আলসার ধরল কলেজ জীবনে তার আগে ছিল ম্যালেরিয়া টাইফয়েড ঘুষ ঘুষে জ্বর নিত্য মাথার যন্ত্রণা নিত্য সঙ্গী।আমি জন্ম থেকেই রোগভোগে ভোগা মানুষ। খুব ছোটবেলায় হয়েছিল কালাজ্বর। যমে মানুষে টানাটানি। আমাকে যখন আমার গায়ের রঙ কালো বলে, সবাই কাল্টা বলে ডাকতো, আমার দাদি, জহুরা বিবি, আমার বাবার সৎ মা আতখাই করে বলতেন, আহা রে পুতির আমার সোনার বরন রঙ ছিল, কালা জ্বরে খেয়ে নিল।'কাল্টা' বলে ডাকাতে আমারও রাগ হতো, কারণ আমি দেখেছি ফর্সা ছেলের আদর বেশি। আমি আর আমার মামাতো ভাই ছিলাম রাম লক্ষ্মণ জুটি। লোকে বলতো, মানিকজোড়। তাকে সবাই আদর করতো। ফর্সা। সাজগোজ করা। চোখে সুরমা দেওয়া। আমার কোনও অস্তিত্বই লোকের চোখে পড়তো না, রবীন্দ্রনাথের গল্পের চরিত্রের দশা আমার। কোনও পাত্তা দেয় না লোকে। বড়দি আর মেজদি এবং আমার প্রাণপ্রিয় দাদির কাছে ছাড়া আদর নাই তেমন।'কেমুন একটা ছ্যালে বনেবাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। সাপ ইঁদুর খেয়ে বেড়ায় গো। গায়ে খড়ির দাগ। পা ফাটা। মুখ শীতকালে কালচে হয়ে ফাটা। ঠোঁট ফাটা। জামার বোতাম নাই। জামার তলা গরমকালে আইসক্রিম গোল্লা করে খাওয়ার দরুন চেবানো। ছেঁড়াছাঁড়া।একটা গান আমি বেসুরো গলায় মাধ্যমিক পর্যন্ত খুব গেয়েছি--ছেঁড়া জামায় দেখে কে আমায়!মাস্টারমশাইদের চোখে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত, পাক ছেলে। আর এই বয়সেই পেকে উঠেছে এত, লুকিয়ে লুকিয়ে সিনেমার পত্রিকা 'নব কল্লোল' আর 'প্রসাদ' পড়ে। ক্লাসের পড়ার নাম নাই।সুযোগ পেলেই শিক্ষক ক্লাস থেকে বের হলেই গাছে ওঠে।বসন্তের টিকা দিতে এলে বাঁশের কঞ্চির জানালা ভেঙ্গে পালায়।তারপর জ্বর সর্দি কাশি পেট খারাপ লেগেই আছে।'ছুটি' গল্পের ফটিকের সঙ্গে আমি এখনও একাত্ম বোধ করি। যতবার ক্লাসে পড়াতে যাই কেঁদে ফেলি।চোখ দিয়ে জল গড়াতে থাকে। গলা বুজে আসে।আমাকে এই দশা থেকে উদ্ধার করেন শম্ভুনাথ থান্দার মশাই। যিনি কাষ্ঠকুড়ুম্বা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। আমাদের গ্রাম থেকে ৩৫-৪০ কিলোমিটার দূরে।নতুন চাকরি পেয়ে এলেন, আমাদের দলিজ ( খানকাঘর/ বৈঠকখানা ঘরে) থাকতে লাগলেন।তিনজন নতুন চাকরি পেয়ে যোগ দেন।১৯৭৩-এ।দুজন থাকলেন আমাদের বৈঠকখানায়। একজন দূরে দিঘির পাড়া ( সেকালের নাম চাঁড়ালপাড়া)য় অনাথকামারের বাড়ি।গ্রামের একমাত্র কামার অনাথ কামারের সঙ্গে আমি পরে 'গণদেবতা'র অনিরুদ্ধ কামারের কিছুটা মিল পাই। বড় তেজি মানুষ। অনাথ কাকার মেয়ে উমা আমাদের সঙ্গে কিছুদিন পেরাইমারিতে পড়েছিল।চমৎকার ঘাস কাটার হাত ছিল উমার। ছাগলের জন্য বেছে বেছে কালচে ঘন নরম ঘাস কাটতো। আমিও আমাদের ছাগলের ঘাসের জন্য উমার সাগরেদি করেছি। তালপুকুরের পাড় থেকে শুরু করে আশপাশের ধান কাটা জমিতে ভালো ভালো ঘাস কেটেছি। এছাড়া উমার একটা গুণ ছিল, এক ধরনের লম্বা ঘাস হতো। তাকে বলা হতো, ব্যাঙের বাড়ির ঘাস। ভিতরটা ফাঁপা । হাত দিয়ে টিপলে পটপট করে আওয়াজ হতো।আমাদের গ্রামীণ জীবনে ওইগুলোই তো ছিল আনন্দের উৎস।সেই ঘাস দিয়ে উমা দারুণ ঘর বানাতো। দোতলা তিনতলা।তিনতলার বেশি বাড়ি হয়, এ আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।এমনকী বর্ধমান শহরে ১৯৯২-৯৩ পর্যন্ত বাড়ির নিশানি বা পথনির্দেশ দিতো এইভাবে, সেই তিনতলা বাড়ির চারটে বাড়ি পরে।বর্ধমান শহরে হাতে গোনা তিনতলা বাড়ি ছিল।চারতলা বাড়ি? মনে পড়ছে না।আটের দশকের শুরুতে পূর্ত ভবন হল । আটতলা।‌ লোকে দেখতে যেত। বাব্বা আটতলা বাড়ি। এবং তার কোনও লিফট ছিল বলে মনে পড়ছে না।থাকলেও আমাদের চড়ার অধিকার ছিল না।সিঁড়ি বেয়েই উঠতে হয়েছে। কলেজে পড়ার সময় একবার ভালো করে সাহিত্য ও পত্রিকা করবো বলে ৩৫ হাজার টাকা ঋণের আবেদন করেছিলাম। আমি তখন ছাত্র নেতা। কিন্তু কাউকে দিয়ে বলাইনি। পাইওনি।আমাকে কালাজ্বর থেকে বাঁচান দুজন অদ্ভুত মানুষ। একজন এল এম এফ পাশ শশধর পান। আর একজন হিটু মুন্সি। দ্বিতীয় জন ডবল এমএ।‌শশধর পান করেন অ্যালোপ্যাথি। হিটু মামা হোমিওপ্যাথি। একালের মতো সেকালেও দুই পদ্ধতিতে বিরাট ঝামেলা।হোমিওপ্যাথি মনে করে, অ্যালোপ্যাথিতে রোগীও মরে, রোগীর পরিবারও খরচের জন্য ডোবে।আর অ্যালোপ্যাথি ভাবে, হোমিওপ্যাথি তো ছদ্মবিজ্ঞান।ওতে কিস্যু হয় না।শশধর পান নাকি পয়সা ছাড়া চিকিৎসায় অনাগ্রহী। এমন একটা কথা নিন্দুকরা বলতেন। আমার ক্ষেত্রে সে-কথা খাটে না। সারাদিন নিজের চেম্বার, এ গ্রাম সে গ্রাম ঘুরে রাত জাগতেন আমার শিয়রে।দুজনে নাকি সমানে তর্ক করতেন। এটা দেওয়া ভুল হচ্ছে ওটা দেওয়া ভুল হচ্ছে।তারপর বলতেন, দাও খাইয়ে। বাঁচার আশা তো নাই।আমি চিরকৃতজ্ঞ এই দুই মানুষের কাছে । আমি যে এখনও অসুস্থতা নিয়েই হেঁটে চলে বেড়াচ্ছি, বাবা মা পরিবার ছাড়া এঁদের অবদান সমধিক।শশধর পান ঘোড়ায় চড়তেন।মাথায় ছিল বিরাট টমবয় মার্কা টুপি।‌তখন বৃষ্টি হয়েছিল। শীতকালের বৃষ্টি। এক পৌষে জন্ম। আরেক পৌষে কালাজ্বর।এঁটেল মাটি ঠেলে ঘোড়া পারতো না।হেঁটেই আসতেন শশধর পান।শুনেছি এক পয়সাও নেননি।তিনি ছিলেন কংগ্রেসি। বাবা কমিউনিস্ট। মতের কোনও মিল নাই।বাবা পয়সা দিতে গেলে বলেন, কেন সকালে তোদের ঘরে খাঁটি খেজুর গুড় দিয়ে কতরকমের পিঠে আর খেজুর রস খেয়েছি। খুব ইচ্ছে করলে, দু সেরা খেজুর গুড় পাঠিয়ে দিবি।আর একদিন হাঁসের মাংস দিয়ে চালের আটার রুটি খাওয়াস।সে তো আপনিই পাবেন!ওরে ন্না, মানুষের প্রাণ বাঁচানো ডাক্তারের কাজ।এ যে পেরেছি দুজনে অনেক ভাগ্যি রে।ছেলের চোখ দুটো দেখেছিস।একটু নিয়ম শৃঙ্খলায় রাখিস বাবা। তোর মতো উড়নচণ্ডী পার্টি করা লোক যেন না হয়। তোর মতোই তো দেখতে।তারপরই বলেন, তোদের পার্টিটাকে দু চোখে দেখতে পারি না। কিন্তু তোদের মতো ছেলেগুলো কংগ্রেসে কেন এলো না বলদিনি। তোরা ঘরের পয়সা উড়িয়ে পার্টি করিস। কারও টাকা মারিস না।আমাদের দলের লোকগুলো... কী যে বলি।গান্ধী কী বললেন, আর এঁরা কী করছে। ছ্যা ছ্যা রে।হিটুমামার জমিতে বাবা লালঝান্ডা উড়িয়ে জমি খাস করেছিলেন বলে, প্রায়ই বলতেন, ব্যাটাকে দেখলেই গুলি করে মারবো। আমাদের বাড়ির সামনে বহুদিন সিআরপি বা কেন্দ্রীয় বাহিনী ছিল, কমিউনিস্ট বাবাকে ধরার জন্য।বাবাকে ধরতে চান, কিন্তু তাঁর ছেলেকে বাঁচাতে ওই শৌখিন মানুষটি দিনের পর দিন রাত জাগছেন। নিজের হাতে জ্বর মাপছেন। শশধর পানের সঙ্গে তর্ক করছেন। জলপটি দিচ্ছেন।আর ফ্লাস্ক থেকে চা বের করে ডাক্তার পানকে দিচ্ছেন।খাও খাও, মানুষ মারা বিদ্যে তোমাদের। চা খেয়ে আরও তাগদ করো।দুজনে চলতো খুনসুটি।আর শশধর পান নাকি বলতেন, তোমাদের বিদ্যে তো এই, যত তরল হবে তত কাজের। যাও গঙ্গার উৎসে গোমুখে এক ফোঁটা হোমিওপ্যাথি ফেলে বঙ্গোপসাগরে এক চামচ তুলে খাইয়ে দাও।হিটু মামা জন্মসূত্রে 'মুসলিম'। শশধর পান জন্মসূত্রে 'হিন্দু'।আমাদের এলাকায় রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব রেষারেষি ছিল প্রবল কিন্তু হিন্দু মুসলমানে প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। শোনা যেত, পলাশন বাজারে মুসলমানদের জায়গা কিনতে দেওয়া হয় না। তবে এহিয়া চাচা কিন্তু দিনের পর দিন হোমিওপ্যাথি চেম্বার করেছেন আরেক পানের দোকানে।পান পদবি।হিটু মামা খুব শিক্ষিত এবং শৌখিন মানুষ।সঙ্গে থাকতো দোনলা বন্দুক। আর একাধিক শাগরেদ। কারও হাতে টেপ। কারও হাতে রেডিও। কারও হাতে মাছ ধরার চার। আর চায়ের ফ্লাস্ক।তার ডিম খাওয়া নিয়ে বহু কিংবদন্তি আছে। সত্য মিথ্যা জানি না। তবে তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী রাম সাঁওতাল মামাকে আমি মামার পেটে হাঁটতে দেখেছি।আমরাও অবশ্য ছোটরা বাবাদের পায়ে পিঠে হাঁটতাম।এতে নাকি ব্যথা কমে‌।হিটু মামা খেতেন ও খাওয়াতেন।বিশাল একটা চায়ের পেটির মতো কাঠের পেটি ছিল। পেটি নামেই আসলে সিন্দুকের মতো।তাতে থাকতো হরেকরকম শহুরে বিস্কুট।বড়দের বোকামি নিয়ে মামা মজা করতেন, ছোটদের দিতেন প্রশ্রয়।তাঁকে ঘিরে এত সত্যি মিথ্যে গল্প ছিল আমরা ভাবতাম, এই বুঝি সেই সেলফিস জায়েন্টের বাগান। বিরাট জায়গা জুড়ে চার কামরা মাটির বাড়ি।সেখানে বাইরে বিরাট বিস্কুটের পেটি।‌আমাদের উঁকিঝুঁকি মারতে দেখলেই ডাকতেন, কে রে?আমাদের ভয়ে প্রাণ উড়ে যেত।কাকে নাকি বন্দুক দিয়ে ভয় দেখিয়ে বলেছেন, শ্লা আর মিথ্যে বলছিস শুনলে খুলি উড়িয়ে দেবো। লোককে টেপ রেকর্ডে তার গলা শুনিয়ে চমকে দিতেন।নানা ধরনের বিস্কুট থাকতো।হাতি ঘোড়া জোকার পুতুল বিস্কুট। আর কমলা রঙের ক্রিম বিস্কুট -- কী যে স্বাদ।দানশীল ছিলেন।খাওয়াতেন এবং খেতেন --এই করে করে বহু জমি চলে গেল। অকালে মারা যান।স্কুল শিক্ষিকা স্ত্রী, তিনি বর্ধমান শহরেই থাকতেন। বিদ্যালয়ে পড়াতেন। খুব অভিজাত সুন্দরী। মেয়েগুলো প্রত্যেকেই খুব গুণী ও উচ্চশিক্ষিতা। এক মেয়ে আমাদের সঙ্গে বিজ্ঞান পড়তো। এখন প্রধান শিক্ষিকা। মেজমেয়ে বিজ্ঞানী। আমেরিকায় থাকেন।হিটু মামিমা অসাধারণ গুলি কাবাব বানাতেন।‌নরম জীবনের সেরা খাওয়া কয়েকটি কাবাবের মধ্যে এটি একটি।তা হচ্ছিল অসুস্থতার কথা।কালাজ্বরে বাঁচলাম কিন্তু অসুস্থতা চিরসঙ্গী হয়ে গেল।অল্পেই নাক ফ্যাঁচফ্যাঁচ। জ্বর। আমি মায়ের দুধ খুব বেশি খেতে পারিনি। আমুলের বড় বড় ফাঁকা কৌটো ছিল বাড়িতে। রাতের বেলায় লুকিয়ে যে-সব পার্টি আসতেন, তাঁদের ছোলা ভাজা আর মুড়ি ভরে দিতেন। সঙ্গে গুলগুল বাতাসা বা নকুল দানা।মা দেখিয়ে বলতেন, ফাঁকা কৌটো দেখিয়ে বলতেন, এগুলো সব তোর ।মায়ের দুধ বা গোরুর দুধ দুটোই তেমন না খেয়ে কৃত্রিম দুধ খাওয়ার ফলে আমার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা খুব কম। মনের জোরে লড়া।কবে থেমে যাবো, কে জানে!তবে এই সূত্রেই আমি একটা বড় রাজনীতির কথা শুনে ফেলি। স্কুলে যাওয়ার আগেই।আমার জন্ম ১৯৬৬।যুক্তফ্রন্ট সরকার এল ১৯৬৭ তে। কালাজ্বর ওই বছরেই।যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বিপদে ফেলতে বর্ধমান শহরের সবচেয়ে দোকানদার ও স্টকিস্ট দামোদরের জলে সব বেবিফুড নাকি ফেলে দেন।আর ফেলে দেওয়া হয় গমের বস্তা।বস্তা গম।যাতে খাদ্য আন্দোলন করে উঠে আসা যুক্তফ্রন্ট খাদ্য সংকটে পড়ে নাজেহাল হয়।হিটু মামার কিছু গল্প তোলা থাক। পরে বলি।এই যে অসুস্থতা তার জের চলতেই থাকলো।কম জোরি। দুবলা। গোরুর দুধ সহ্য হয় না।বসন্ত (১৯৭৭) ম্যালেরিয়া (১৯৮১ ও ১৯৮২ দুবার) প্যারাটাইফয়েড ও টাইফয়েড (১৯৮৪-৮৫), কুকুরের কামড়ের প্রতিক্রিয়া, পরে নিউরোলজিক্যাল সমস্যা। বহুদিন পিজিতে এন সারেঙ্গিকে দেখিয়েছি।এরপর ১৯৮৫ থেকে কলেজে ছাত্ররাজনীতির সুবাদে এল আলসার।‌ কালো পায়খানা হতে লাগল।‌ ঠিক মতো হাঁটতে পারি না। পেটের জ্বালায় ঘুমোতে পারি না।আমাদের স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র হরিমোহন দে তখন বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের জুনিয়র ডাক্তার।জোর করে ভর্তি করে দিলেন অনার্স পরীক্ষার আগে।স্যালাইন ও রক্ত দেওয়া চলছে।হাতে স্যালাইন নিয়ে পরীক্ষার হলে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে। আমি অজ্ঞান হয়ে গেলাম।(ক্রমশঃ)
    ইজরায়েল সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র, আমেরিকা তার দোসর - প্রথম পর্ব - প্রদীপ দত্ত | প্রথম পর্ব অতীতে ইহুদিরা ইউরোপে যে জাতিবৈষম্য ও অত্যাচারের শিকার হয়েছে, অনেককাল ধরে তারা প্যালেস্টাইনের আরবদের উপর তাই করছে। কম সময় নয়, অন্তত ৭৫ বছর ধরে এই চলছে। উত্তোরত্তর অত্যাচার বেড়েছে। আমেরিকা চিরকাল তাদের সংগত দিয়েছে। সাম্প্রতিক হামাস-ইজরায়েল যুদ্ধে অত্যাচার চরমে পৌঁছেছে। এখন যা চলছে তার চেয়ে বেশি কিছু হওয়া সম্ভবই নয়। ব্রিটিশ শাসনাধীন প্যালেস্টাইনে উপনিবেশ গড়ার ছাড়পত্র পেয়ে ইজরায়েল তৈরি হওয়ার সময় থেকে ইহুদিরা প্যালেস্টাইনের গাজা ও জর্ডন নদীর পশ্চিম তীরের মানুষের উপর প্রবল অত্যাচারি হয়ে ওঠে। কয়েক লাখ প্যালেস্টাইনি নাগরিক তাদের শত শত বছরের বাড়ি-ঘর ছেড়ে উদ্বাস্তু হয়ে জর্ডন, লেবানন, সিরিয়া, মিশরে ছড়িয়ে পড়ে। জর্ডন নদীর পশ্চিম পাড়ের সিংহভাগই রয়েছে এখন ইজরায়েলের কব্জায়। জেরুজালেম, গাজাতেও রয়েছে তাদের নিয়ন্ত্রণ। অত্যাচার থাকলে প্রতিবাদ হবেই। এক সময় ইয়াসের আরাফতের প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাজেশন (পিএলও) সেই প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিয়েছে। তারপর আশীর দশকে পিএলও-র কাজকর্মে অসন্তুষ্টি থেকে হামাসের জন্ম হয়। সেই সময় হামাসকে পিএলও বিরোধী শক্তি হিসাবে দাঁড় করাতে ইজরায়েলে ক্ষমতাসীন বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সরকার (১৯৯৬-১৯৯৯) এবং তাঁর লেকোয়েড পার্টি (দক্ষিণপন্থী দল) আর্থিক সাহায্য করেছিল। মতলব ছিল প্যালেস্টাইনিদের মধ্যে বিভাজন করা। সেক্ষেত্রে বলা যাবে, শান্তির জন্য কথা বলব কার সঙ্গে। আবার সেই বিভাজনের সুযোগে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা জর্ডন নদীর পশ্চিম তীরের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়বে। ১৯৯৩ সালে অসলো চুক্তির মাধ্যমে আরাফাত ইজরায়েলের সঙ্গে শান্তি স্থাপন করেছিলেন। ২০০৬ সালে গাজার সাধারণ নির্বাচনে হামাস সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে শান্তি প্রক্রিয়া প্রত্যাখ্যান করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন সহ পশ্চিমের বেশিরভাগ দেশই হামাস বিরোধী। তবে মিত্র দেশও আছে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সহযোগী কাতার। তুরস্কেরও সমর্থন রয়েছে। আর রয়েছে অসহায় নিপীড়িত প্যালেস্টাইনিদের স্বাভাবিক সমর্থন। দীর্ঘদিন ধরে তারা অস্ত্র হিসাবে রকেটের জন্য ইরানের উপর নির্ভরশীল ছিল। সুদান ও মিশরের মধ্য দিয়ে গোপনে সেই অস্ত্র চালান হতো। পরে গাজাতেই তারা রকেট বানিয়েছে বলে মনে করা হয়। প্যালেস্টাইনের সর্বত্র ইহুদিরা বসতি গড়েছে। অনেককাল ধরেই সেখানকার পরিকাঠামো, সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ির উপর চলছে ইজরায়েলের নিয়ন্ত্রণ। প্যালেস্টাইনের মানুষের চলাফেরা, বিনোদন—সবই ইজরায়েলি সেনারা (আইডিএফ বা ইজরায়েল ডিফেন্স ফোর্সেস) নিয়ন্ত্রণ করে। ২০০৪ সাল থেকে তারা স্থলপথে গাজায় ঢোকা-বেরোনো নিয়ন্ত্রণ করছে। আইডিএফ প্যালেস্টাইনে কোনও বিক্ষোভ, সমাবেশ করতে দেয় না। ১৯৬৭ সালে ইজরায়েল পূর্ব জেরুজালেম দখল করে। ওদিকে এই যুদ্ধের আগে থেকেই গাজার এক-পঞ্চমাংশ ইজরায়েলের দখলে। ২০০৪ সালের পর থেকে গাজাও যেন জেলখানায় পরিণত হয়েছে। ইজরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা ইচ্ছেমত প্যালেস্টাইনিদের পশ্চিম তীরের বাসস্থান থেকে হঠিয়ে দিয়েছে। আরবরা যখনই প্রতিবাদ করেছে, তাদের বা আইডিএফের হিংসার শিকার হয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে আরবরা বসতি দখল ও নির্যাতন সইছে। ইজরায়েলিরা পশ্চিম তীরের ৫৯ শতাংশ দখল করে নিয়েছে, ইজরায়েলি বসতি বানিয়ে দেওয়াল তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন পৃথিবীর নজর যখন গাজার উপর, সেই অবকাশে ইজরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা পশ্চিম তীরে আরবদের বাড়িতে ঢুকে বাসিন্দাদের মারছে, গাড়ি, ফলের বাগান জ্বালিয়ে দিচ্ছে। বসতিতে ঢুকে এমন সন্ত্রাস করছে যে ভয়ে সবাই বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে। অত্যাচারিত প্যালেস্টাইনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথা কেউ বলে না। ৭ অক্টোবরের (২০২৩) হামাসের ক্ষেপণাস্ত্র হানার আগের ৯ বছরে (২০২১ ব্যাতিক্রম) গাজায় যা ঘটেছে ইজরায়েলের খবরের কাগজেও তা কদাচিৎ হেডলাইন হয়েছে। হামাস বিক্ষিপ্ত ভাবে বার বার ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছে, ইজরায়েলের বোমারু বিমান বোমা ফেলে বহুগুণ বেশি ধ্বংস করেছে। ২০০৬ সাল থেকে আট দফায় বোমা ফেলেছে। ইজরায়েলের মিত্র দেশ আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স বা জার্মানি—কেউই এইসব ঘটনাকে আমল দেয়নি। ইদানীং ইউক্রেনের যুদ্ধই ছিল বড় ঘটনা, প্যালেস্টাইনের কথা পৃথিবী যেন ভুলে গিয়েছিল। তবে ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণ ইজরায়েলের কাছেও ছিল অভাবনীয়। আমেরিকার ৯/১১ যেন ইজরায়েলের ১০/৭। হামাসের আক্রমণে বারোশো ইজরায়েলির মৃত্যু ছাড়া ‘মসাদ’ (ইন্সটিটিউট ফর ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড স্পেশাল অপারেশনস, হিব্রুতে মসাদের অর্থ ইনস্টিটিউট), ‘শিন ব্যাট’ (আমেরিকার এফবিআই-এর মত ইজরায়েলের আভ্যন্তরিন নিরাপত্তা সংস্থা) এবং সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ ‘আমান’-এর সুনামেরও ক্ষতি হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রে ৭ অক্টোবরের আক্রমণের খবর যদি আগাম জানা যেত তাহলে ইজরায়েল তা রুখতেও পারত। প্যালেস্টাইনের মানুষ হামাসের সঙ্গে আছে বলে তারা গোপনে ১০/৭-এর হানা ঘটাতে পেরেছে। তারপর থেকে চার মাসের বেশি গাজায় ইজরায়েলি হানা চলছে। উত্তর গাজার সর্বত্র বোমা ফেলছে। বোমা-গুলিগোলা বর্ষণে কাতারে কাতারে সাধারণ মানুষ মারা গেছে। জানুয়ারি পর্যন্ত নিহত হয়েছে ২৭ হাজার ৭০০-র বেশি। তারপরও অগুন্তি মৃতদেহ ধ্বংসস্তুপের মধ্যে পড়ে রয়েছে। জখম ৬০ হাজারের বেশি। রাষ্ট্রপুঞ্জের মহাসচিব বলেছেন, গাজা শিশুদের কবরস্থান হয়ে গেছে। ‘সেভ দ্য চিল্ড্রেন’ জানিয়েছে, প্রতিদিন ১০০-র বেশি বাচ্চার মৃত্যু হচ্ছে, এরইমধ্যে অন্তত ১০ হাজার শিশু মারা গেছে। সাংবাদিক ইউভাল আব্রাহাম জানিয়েছেন, এত প্যালেস্টাইনি নাগরিকের মৃত্যুর বড় কারণ হল, আইডিএফ আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স চালিত সিস্টেম হ্যাসব্রো ব্যবহার করছে। এই সিস্টেমে লক্ষ্যস্থল অনেক দ্রুত নির্দ্ধারণ করা যায়। তবে সেখানে কতজন নাগরিক রয়েছে তা দেখা হয় না। সে কারণেই গাজায় এত বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।১০ ডিসেম্বর আইডিএফের মুখপাত্র বলেছিলেন, নিপুণতা নয়, কতটা ক্ষতি হল তাতেই আমরা জোর দিচ্ছি। একই দিনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেন, “আমি সংযম আরও কমিয়েছি, যাদের বিরুদ্ধে লড়ছি তাদের সবাইকে মারব, তার জন্য সব পন্থাই নেব।” বোঝা যায় সাধারণ মানুষকে হত্যা করাও ইজরায়েলের লক্ষ্য। তাই লক্ষ্যস্থলে আঘাত হানতে ইজরায়েল সেনার নিপুন হওয়ার প্রয়োজন নেই। আগে একটি হামাস জঙ্গিকে মারতে লক্ষ্যস্থলে হয়তো দশজন নাগরিকের মৃত্যু হত, এখন হয় তার দশ থেকে কুড়িগুণ বেশি।অক্টোবরের ৯ তারখে ইজরায়েল জানিয়েছিল, গাজা সম্পূর্ণ অবরোধ করা হয়েছে। সেদেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউয়াভ গ্যালান্ট ৯ অক্টোবর বলেছিলেন যে, তাঁদের “বাহিনী গাজা সম্পূর্ণ দখল করছে। বিদ্যুৎ, খাবার, পানীয় জল ও জ্বালানি—সবকিছুর সরবরাহই একেবারে বন্ধ। আমরা জন্তুর মত মানুষদের বিরুদ্ধে লড়ছি, সেই মত পদক্ষেপ নিচ্ছি”। ইজরায়েল হাসপাতাল ধ্বংস করেছে, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙ্গে ফেলেছে। ২৩ লক্ষ প্যালেস্টাইনবাসীর বেঁচে থাকার জন্য পানীয় জল, খাবার, জ্বালানি, ওষুধ, শীতের বস্ত্র, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট যোগ—কিছুই নেই। ছোঁয়াচে রোগ দ্রুত ছড়াচ্ছে। এই যুদ্ধের আগে ১৭ বছর ধরে ইজরায়েল প্যালেস্টাইন অবরোধ করে রেখেছিল। তাই অনেকদিন ধরেই গাজার অর্ধেক মানুষের খাদ্য সরবরাহ ছিল অনিশ্চিত। মানুষ মানবিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল ছিল। এখন তাও বন্ধ। আইডিএফের নজর এড়িয়ে বহু মানুষ উত্তর গাজায় লুকিয়ে চুরিয়ে যেমন তেমন করে বেঁচে রয়েছে। তবে ২৩ লক্ষ মানুষের মধ্যে ১৯ লক্ষকে ঘর ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। জনসংখ্যার ৮৫ শতাংশ নিজের দেশেই বাস্তুচ্যুত। দেশের ৮৫ শতাংশ ধ্বংস হয়ে গেছে। রাষ্ট্রপুঞ্জের মতে, গাজার প্রতিটি মানুষ ক্ষুধার্ত হয়ে রয়েছে। পৃথিবীর যত মানুষ দুর্ভিক্ষ বা ভয়ঙ্কর ক্ষুধার সম্মুখীন তার শতকরা ৮০ ভাগই গাজার বাসিন্দা। মানুষ পানীয় জল ও খাবারের সন্ধানে মাথা কুটছে। বাচ্চারা খালি পেটে দিন কাটাচ্ছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩ লক্ষ ৩৫ হাজার শিশু মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। ইজরায়েলি সেনা গাজার খাদ্য ব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে, ত্রাণ সরবরাহ আইডিএফের বাধায় সীমান্ত পেরতে পারছে না। ইজরায়েলের আক্রমণে ত্রাণ দিতে আসা রাষ্ট্রসংঘের ১৩৬ জন কর্মী নিহত হয়েছে। উদ্দেশ পরিস্কার, প্যালেস্টাইনিদের জন্য কোনও ত্রাণ নয়। অর্থাৎ প্যালেস্টাইনের সাধারণ মানুষকে মারার জন্য অস্ত্র হিসাবে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। মানুষ গৃহপালিত জন্তুর শস্যদানা পেষাই করে খাচ্ছে, এখন তাও আর নেই। কম করে ৩ লক্ষ মানুষ মৃত্যুর দোরগোড়ায়। ২৭ অক্টোবর আইডিএফ স্থলভাগে আক্রমণ শুরু করার পর থেকে সেনারা উত্তর গাজার ২০ শতাংশের বেশি চাষের জমি, বাগান, গ্রিনহাউস, ৭০ শতাংশ মাছ ধরার নৌবহর ধ্বংস করেছে। চাষিরা কৃষিজমিতে, মৎস্যজীবীরা সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে পারে না। বেকারির জন্য জ্বালানি, জল, আটা-ময়দা নেই। বেকারির কাজের জায়গাও ধংস করেছে। গাজায় রুটি, বিস্কুট, কেক-- কিছুই তৈরি হয় না। ইজরায়েল শুধু বোমা ফেলেই প্যালেস্টাইনের মানুষকে হত্যা এবং পরিকাঠামো ধ্বংস করেনি, পরিকল্পিত ভাবে জরুরী সরবরাহ বন্ধ রেখে, অনাহার, অসুখ, অপুষ্টি ও জলশূন্যতার মধ্যে রেখে মানুষকে তিলে তিলে হত্যা করছে। সেখানে গণহত্যা একটি ঘটনা নয়, একটি চালু প্রক্রিয়া। এই ভাবে ধীরে ধীরে মেরে ফেলাটা গণহত্যারই প্রক্রিয়া। ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন সহ যেসব আন্তর্জাতিক সংগঠন প্যালেস্টাইনিদের ত্রাণ দিতে গিয়েছে তারা প্রবল বৃষ্টিতে গাজার রাস্তা ডুবে গেলে কলেরা সহ নানা রোগের প্রাদুর্ভাবের ভয় পাচ্ছিল। কিন্তু ইজরায়েলের প্রাক্তণ জেনারেল এবং নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান গিওরা এইল্যান্ডের মতে, তা ইজরায়েলের জয়ে সাহায্য করবে। এক প্রবন্ধে তিনি লেখেন, “আন্তর্জাতিক সমাজ আমাদের সতর্ক করছে যে, ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ও মহামারী লাগবে। তাতে আমাদের পিছিয়ে আসার কিছু নেই। গাজার দক্ষিণে ভয়াবহ মহামারী দেখা দিলে আমরা জয়ের কাছে চলে আসব।” আইডিএফ উত্তরের বাসিন্দাদের বন্দুক দেখিয়ে ঘর থেকে বার করে ঠেলে দক্ষিণে মিশরের সীমান্ত লাগোয়া ছোট শহর রাফায় আসতে বাধ্য করেছে। তারপর বসতি ঘন হলে সেখানেও বোমা ফেলেছে। দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষকে-- অসুস্থ বা আহত হলেও রাফায় যেতে বাধ্য করেছে। নানা ত্রাণ সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সমাজ বলছে যে, ইজরায়েল রাফায় আক্রমণ হানলে তা ভয়ানক বিপর্যয় ডেকে আনবে। কারণ ২ লক্ষ ৮০ হাজার মানুষের সেই শহরে এখন ২৩ লক্ষ মানুষের দেশের অর্ধেক আশ্রয় নিয়েছে। মাথা গুঁজবার জন্য কবরস্থানেও তাঁবু খাঁটাতে হয়েছে। এক ত্রাণকর্মীরা কথায়, তারা যেন হাতাশার প্রেশার কুকার। অনেকে জানিয়েছেন, ইজরায়েলি সেনাদের হানার ভয়ে বাচ্চারা রাতে জেগে থাকছে, ঘুমচ্ছে না। ইজরায়েলি স্থলবাহিনী শহরের খুব কাছে চলে এসেছে। ওদিকে মিশর সীমান্ত বন্ধ। উদ্বাস্তুদের সামনে এখন দুটি রাস্তা— হয় ভিড়ে ঠাসা সেই শহরে কোনওমতে মাথা গুঁজে ইজরায়েলের আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করা, অথবা যেখানে লড়াই চলছে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সেই উত্তরে ফিরে যাওয়া। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউয়াভ গ্যালান্ট সহ ইজরায়েলের মন্ত্রী ও সামরিক কর্তারা বারবার রাফা আক্রমণের কথা বলছেন। নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, “সেনারা রাফায় এগিয়ে গেলে যুদ্ধ বন্ধের জন্য পণবন্দিদের ফেরানোর আলোচনা হাওয়া হয়ে যাবে। আমরা রাফায় আশ্রয় নেওয়া বাকি হামাস সন্ত্রাসবাদীদের পেয়ে যাব। তাই করতে চলেছি, ওটাই তাদের শেষ দুর্গ।” গ্যালান্ট বলেছেন, “রাফায় লুকিয়ে থাকা সন্ত্রাসবাদীদের বোঝা উচিৎ যে তাদের পরিণতি হবে খান ইউনিস এবং গাজার মত।” অবশ্য রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, বর্তমানে ১৩ লক্ষ নাগরিকের ওই ছোট শহরে আক্রমণের ফল হবে ভয়াবহ। উদ্বাস্তুদের কেউ কেউ বলছেন, কোথায় যেতে হবে তা নিয়ে ইজরায়েলের নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছি। রাফাই আমাদের শেষ জায়গা। গাজা স্ট্রিপ ছেড়ে অন্য কোথাও যাব না। হয় বাসস্থানে ফিরে যাব, নয়তো এখানেই মরব। গাজায় বাড়িঘর পরিকাঠামো ধ্বংস হলেও হামাসের লড়াইও জারি রয়েছে, ইজরায়েল আকাঙ্খিত জয় পায়নি। মাত্র একজন পণবন্দিকে মুক্ত করতে পেরেছে, বাকিরা মুক্ত হয়েছে হামাসের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সূত্রে। ইজরায়েল বারবার দাবি করেছে যে, গাজায় হামাস ধ্বস্ত হয়েছে। ওদিকে হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনোয়ার বা তাদের সামরিক বিভাগের সর্বোচ্চ নেতা মহম্মদ ডেইফ যে নিহত হয়েছে ইজরায়েল তার প্রমাণ দেয়নি। এখন বলছে, সিনোয়ার সহ হামাসের বাকি বড় নেতারা রাফার আশপাশেই লুকিয়ে রয়েছে। তবে ইজরায়েলের রাফা দখলের অন্য একটি উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। সে দেশের কর্তারা ইদানীংকালে বলেছেন, ইজরায়েল ফিলাডেলফি রুটের নিয়ন্ত্রণ চায়। ওই রুট হল মিশরের সীমান্তে সংকীর্ণ বালুময় ১৪ কিলোমিটার রাস্তা। ১৯৭৯ সালের মিশর-ইজরায়েল শান্তি চুক্তির সময় থেকে ইজরায়েল ওই রুটে টহল দিত। ২০০৫ সালের ফিলেডেলফি চুক্তি অনুযায়ী ওই রুট নিরস্ত্রীকৃত অঞ্চল। ইজরায়েলি সেনার মতে, ওই রুটে মিশর থেকে সুরঙ্গ দিয়ে গাজায় অস্ত্র চালান করা হয়। হামাসের কব্জা থেকে পালিয়ে আসার পর আইডিএফ তিনজন পণবন্দিকে গুলি করে মেরেছে। তাদের গায়ে জামা ছিল না, তারা যে হামাসের লোক নয় তা বোঝাতে সাদা কাপড় নেড়েছিল। তারপরও এক সেনা ‘টেররিস্ট’ বলে চেঁচিয়ে ওঠে। সেনারা তখনই দুজনকে গুলি করে মারে। তৃতীয়জন কাছের এক বাড়িতে পালিয়ে গেলে সেখান থেকে তাকে বার করে আনার পর সে হিব্রু ভাষায় জীবন ভিক্ষা করলেও তাকে গুলি করা হয়। এই ঘটনা আইডিএফ-এর অপরাধীমূলক অযোগ্যতার চরম দৃষ্টান্ত। গাজায় আক্রমণের খবর করতে যারা গেছেন সেই সাংবাদিকরাও আক্রমণের শিকার হয়েছেন। ৮৫জন সাংবাদিকের মৃত্যু হয়েছে। এরমধ্যে প্যালেস্টাইনি ৭৮জন, ৩জন লেবানিজ, ৪জন ইজরায়েলি। আহত ১৬জন, ৪জন নিখোঁজ। উদ্দেশ্য পরিস্কার-- প্যালেস্টাইনের দুর্দশার কথা প্রাচার করা যাবে না। দেড় বছর আগে (২০২২ সালের মে মাসে) আইডিএফ-এর হাতে প্যালেস্টাইনি-আমেরিকান সাংবাদিক শিরিন আবু আখলের হত্যাই প্রমাণ করে যে ইজরায়েলের আক্রমণ নিয়ে লেখা বা খবর বন্ধ করতে সাংবাদিক হত্যায় তাদের কোনও দ্বিধা নেই। পশ্চিম তীরের জেনিনে হানা দেওয়ার সময় আইডিএফ-এর স্নাইপার আবু আখলেকে মাথায় গুলি করে মেরেছে। পরে ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্ট সহ কয়েকটি অ-ইজরাইয়েলি আন্তর্জাতিক সংস্থা তদন্ত করে দেখেছে, তাঁকে লক্ষ্য করেই গুলি করা হয়েছিল। হত্যাকারীদের আজও শাস্তি হয়নি। আমেরিকার বাইডেন প্রশাসন এই যুদ্ধে যেন চিয়ার লিডার বা উল্লাস নেতার ভূমিকায় রয়েছেন। মার্কিন স্বরাষ্ট্রসচিব অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন যুদ্ধের প্রথম তিন মাসে ইজরায়েলকে সমর্থন জানাতে পাঁচবার সে দেশে গেছেন। আমেরিকা ইজরায়েলকে ১,৪০০ কোটি ডলারের বিশেষ সাহায্যের প্যাকেজ সহ ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ২৩০টি যুদ্ধবিমান এবং ২০টি জাহাজ ভর্তি অস্ত্র ও যুদ্ধোপকরণ দিয়েছে। ওদিকে সিআইএ গাজার খবরাখবর সরবরাহ করছে। গাজার চলমান গণহত্যায় রাষ্ট্র হিসাবে আমেরিকার এতটাই মদত রয়েছে। গাজা স্ট্রিপে ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দেওয়ায় ইজরায়েল-হামাস যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ করার প্রস্তাব নিয়ে ১২ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় ভোট হয়। সবাভাবিক ভাবেই আমেরিকা ও ইজরায়েল প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেয়। পরে বাইডেন বলেন, পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশই ইজরায়েলকে সমর্থন করে। অথচ সাধারণ সভায় যুদ্ধ বন্ধের বিপক্ষে ভোট পড়েছিল ১০টি, পক্ষে ১৫৩টি। তাই যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব পাশ হয়। বাইডেন বেশিরভাগ পৃথিবী বলতে বুঝিয়েছেন অস্ট্রিয়া, চেক রিপাবলিক, গুয়াতেমালা, লাইবেরিয়া, মাইক্রোনেশিয়া, নাউরো, পাপুয়া নিউগিনি এবং প্যারাগুয়েকে। ইউরোপে আমেরিকার পুরনো মিত্র দেশগুলো ভোট থেকে বিরত ছিল। তার আগে রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব পেশ করা হলে আমেরিকা ভেটো প্রয়োগ করে। এই প্রথম নয়, দীর্ঘকাল ধরে আমেরিকা ইজরায়েলের পক্ষ নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দিয়েছে। সাধারণ সভার সদস্য ১৯৩টি দেশ। সভার প্রস্তাব মানার বাধ্যবাধকতা নেই। ওদিকে নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ১৫টি দেশ। আন্তর্জাতিক শান্তি বজায় রাখার দায়িত্ব নিরাপত্তা পরিষদের। সংশ্লিষ্ট দেশের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব মেনে চলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। না হলে রাষ্ট্রপুঞ্জ আক্রমণকারী দেশের বিরুদ্ধে স্যাংশন চালু করা ছাড়া সামরিক পদক্ষেপও নিতে পারে। আমেরিকা সহ পাঁচটি স্থায়ী সদস্য দেশের প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে। ওই পাঁচটি দেশের বা তাদের মিত্র দেশের বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনা হলে ভেটো প্রয়োগের জন্য প্রস্তাব কার্যকরী করা যায় না। এই কারণেই ইজরায়েল-হামাস বা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ রাষ্ট্রপুঞ্জ থামাতে পারেনি। ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউয়াভ গ্যালান্ট ডিসেম্বরের ২৬ তারিখে ইজরায়েলের কোনেসুট-এ (Knesset) বৈদেশিক বিষয় এবং প্রতিরক্ষা কমিটির মিটিং-এ বলেছেন, ইজরায়েলকে সাতটা ফ্রন্টে যুদ্ধ সামলাতে হচ্ছে। তিনি জানিয়েছেন—গাজা, লেবানন, সিরিয়া, পশ্চিম তীর, ইরাক, ইয়েমেন এবং ইরান—এই সাতটি ফ্রন্টের মধ্যে ইজরায়েল ছ’টি ফ্রন্ট সামলাচ্ছে। কথার ইঙ্গিতে মনে হয় নেতানিয়াহু এমন যুদ্ধ চাইছে যাতে আমেরিকাকে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি যুদ্ধে টেনে আনা যায়। আদর্শগত বা রাজনৈতিক পার্থক্য যতই থাকুক ইজরায়েলের মূলধারার রাজনীতিবিদরা হিংস্র, জাতবিদ্বেষী ভাষায় পরস্পরকে ছাপিয়ে গেছেন। কৃষি ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী আভি ডিচার জানিয়েছেন, আরেকটি নাকবা চলছে (১৯৪৮ সালে দেশ হিসাবে ইজরায়েল তৈরি হওয়ার সময় ইহুদিদের আক্রমণে আরবদের ঘর ছেড়ে চলে যাওয়ার বিপর্যয়কে ‘নাকবা’ বলা হয়)। অক্টোবর মাস থেকে কথাটা ব্যাপক ভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইজরায়েলের অনেক রাজনীতিবিদই ‘সেকেন্ড নাকবা’, ‘গাজা নাকবার’ কথা বলেছেন। আবার বিজনেস ম্যানেজমেন্ট গুরু এলিয়াহু ইজরায়েলকে গাজার উপর পরমাণু বোমা ফেলার কথা ভেবে দেখতে বলেছেন। এই ভয়ঙ্কর আগ্রাসী আচরণের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকা রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে, যেন যুদ্ধ বন্ধ করে ইজরায়েলকে গণহত্যাকারী হিসাবে ঘোষণা করা হয়। দুটি দেশই ১৯৪৮-এর কনভেনশন এগেনস্ট জেনোসাইডের পার্টি। ৮৪ পাতার আবেদনে ইজরায়েলের নৃশংসতা ও অত্যাচারের বিবিরণ ছাড়া ন’পাতা জুড়ে রয়েছে সরকারি কর্তাদের উচ্চারিত নিন্দনীয় নানা শব্দ ও বাক্য। ‘নাকবা’ শব্দটি ছাড়াও কর্তারা বক্তৃতা বা বিবৃতিতে প্যালেস্টাইনিদের জাতবিদ্বেষী ‘রাক্ষস’, ‘জন্তু’, ‘জঙ্গল’ ইত্যাদি শব্দ আকছার ব্যবহার করেছেন (শান্তির জন্য নোবেল পাওয়া ইজরায়েলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মেনাহেম বিগেন প্যালেস্টাইনিদের ‘দুপেয়ে জন্তু’ মনে করতেন। লেবার পার্টির প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মিয়া সত্তরের দশকের গোড়ায় প্যালেস্টাইনিদের ‘আরশোলা’ বলেছিলেন)। দক্ষিণ আফ্রিকা আবেদন করে, গণহত্যা ঠেকানোর জন্য সরাসরি ও প্রকাশ্যে নিন্দনীয় শব্দ ও বাক্য বলার জন্য ইজরায়েলকে শাস্তি দিতে হবে। একই সঙ্গে গাজা স্ট্রিপে মানবিক সাহায্যের অনুমতি দিতে হবে। ২৬ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক আদালত জানায়, ইজরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলাটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। তবে বিচারকরা গাজায় সামরিক পদক্ষেপ বন্ধ করতে সম্মত হননি, যুদ্ধ বন্ধের নির্দেশ দেননি। ইজরায়েলের প্রথম হিংস্রতা ছিল আরবদের আদিকালের বসতি থেকে তাড়ানো, যদি প্রতিরোধ করে হত্যা করা। অর্থমন্ত্রী বেজল্যাও স্মোট্রিচের ছ’বছর আগে লেখা নথি “দ্য ডিসাইসিভ প্ল্যান” অনুযায়ী তারা এগোচ্ছিল। নথিতে বলা হয়, গোটা পশ্চিম তীরে প্যালেস্টাইনিদের বলতে হবে তারা সেখানে থাকবে না চলে যাবে। যদি থাকতে হয়, না-মানুষ হয়ে থাকতে হবে। যদি অস্ত্র তুলে নিয়ে প্রতিরোধ করে তাহলে সন্ত্রাসবাদী হিসাবে তাদের হত্যা করতে হবে। শ্রোতাদের কাছে তাঁর পরিকল্পনা উপস্থাপনের সময় স্মোট্রিচকে জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি কি নারী ও শিশুদের কথাও বলছেন? উত্তরে তিনি বলেন, যুদ্ধের সময় যেমন হয়। বস্তুত সাধারণ নাগরিকরাও আইডিএফ-এর লক্ষ্যবস্তু। ‘+972’ নামে অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রবন্ধে সে কথা বলা হয়েছে। ‘+972’ হল ইজরায়েল, পশ্চিম তীর ও গাজার কোড নাম। চারজন ইজরায়েলি সাংবাদিককে নিয়ে পত্রিকাটি যাত্রা শুরু করেছিল। এখন কয়েকজন প্যালেস্টাইনি সাংবাদিকও যোগ দিয়েছেন। ৩০ নভেম্বর ওই পত্রিকায় ইজরায়েলি সাংবাদিক ইউভাল আব্রাহাম ‘এ মাস অ্যাসাসিনেশন ফ্যাক্ট্রি’ : ইনসাইড ক্যালকুলেটেড বম্বিং অফ গাজা’ প্রবন্ধে অজ্ঞাতনামা সামরিক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষের তথ্য ফাঁসকারীর সূত্র উল্লেখ করে জানিয়েছেন, অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং, স্কুল, ইউনিভার্সিটি, ব্যাঙ্ক, বাজার—সবই ইজরায়েল সামরিক কর্তৃপক্ষের লক্ষ্যবস্তু। কারণ ব্যাপকহারে সবকিছু ধ্বংস এবং নাগরিকের মৃত্যু হলে হামাসের উপর চাপ তৈরি হবে। আব্রাহাম জানিয়েছেন, সরকারি নথী অনুযায়ী ইজরায়েলের গোয়েন্দামন্ত্রক গাজা স্ট্রিপের সমস্ত প্যালেস্টাইনি নাগরিককে জোর করে মিশরের সিনাই উপদ্বীপে পাঠিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছে। অর্থাৎ ইজরায়েলের পরিকল্পনা হল গাজাকে মানুষের বসবাসযোগ্য রাখবে না। ইজরায়েলের নেতারা ভাবছেন, সামরিক শক্তি দিয়েই তা করা যাবে এবং প্যালেস্টাইনের আশপাশের দেশ ঘর ছাড়া প্যালেস্টাইনিদের ঠাই দেবে। কিন্তু সেইসব দেশ এমন অর্থনৈতিক সংকটে রয়েছে যে এখনই তা হবার নয়। তাই গাজাতে আরবদের জন্য আরও খারাপ দিন অপেক্ষা করছে।মরক্কো থেকে ইরাক পর্যন্ত মুসলমান ও খ্রিষ্টানরা হাজার হাজার বছর ধরে ইহুদীদের সঙ্গে শান্তিতেই ছিল। ওইসব দেশ জানে, ঔপনিবেশিক শক্তি জিয়নবাদী বর্ণবাদী ইজরায়েলকে আরব জগতে গুঁজে দিয়েছে। প্যালেস্টাইনিদের পূর্বপুরুষরা যুগ যুগ ধরে যেখানে ছিল, আমেরিকা বলেছে, সেখানে নাকি তাদের কোনও জমিজায়গা নেই। ইজরায়েল ও আমেরিকা অনেককাল ধরেই দুই রাষ্ট্রের সমাধান মানেনি। অথচ সেটাই একমাত্র সমাধান। এখন ইজরায়েলের মধ্যেই কথা উঠছে যে সেই দেশের বর্তমান নেতৃত্বের জন্যই মধ্যপ্রাচ্যে ভয়ঙ্কর সংকট দেখা দিয়েছে, তাদের সরে যেতে হবে। তবে যুদ্ধের সমর্থক দক্ষিণপন্থীরাই সে দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ। তাই এখনই ইজরায়েলের আচরণে বদল আসা করা যায় না।ইজরায়েল ও প্যালেস্টাইনের শান্তি, নিরাপত্তার স্থায়িত্বের চাবিকাঠি রয়েছে প্যালেস্টাইনের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের স্বীকৃতিতে। যুদ্ধ বন্ধ করে ইজরায়েলের দখলদারী ছেড়ে আসা তার পূর্ব শর্ত।সূত্রনির্দেশ:Menahem Halberstadt, Israel's Decisive Plan, 7 September, 2017Outrage after Israeli forces kill Israeli captives in Gaza, Aljazeera, 17 December, 2023Israel accused of wielding starvation as a weapon of war against Gaza, Alzazeera, 18 December, 2023Daniel Beaumont, Dead End: Israel Gets Lost in Gaza, Janata Weekly, 20 December, 2023Hope O’Dell, How the US has used its power in the UN to support Israel for decades, bluemarble, 20 December 2023Julian E. Barnes and Adam Goldman, C.I.A. Homes In on Hamas Leadership, U.S. Officials Say, New York Times, 12 January, 2024Vijay Prashad, Israel’s War on Palestine and the Global Upsurge Against It, Newsclick, 13 January , 2024United Nation, Press Release, Over one hundred days into the war, Israel destroying Gaza’s food system and weaponizing food, say UN human rights experts, 16 January, 2024 Ramzy Baroud, 100 Days of War and Resistance: Legendary Palestinian Resistance Will Be Netanyahu’s Downfall, Janata Weekly, 19 January, 2024Hope O'Dell, Why one ICJ judge voted against every approved provisional measure in South Africa’s genocide case against Israel, bluemarble, 26 January, 2024 Millions at risk of starving in Gaza as Israelis prevent aid deliveries, Al Jazeera, 7 February, 2024Peter Beaumont and Nedal Samir Hamdouna, ‘Our last stop is Rafah’: trapped Palestinians await Israeli onslaught, The Guardian, 7 February, 2024 ‘The destruction is massive … It’s a disaster area’: Israeli soldiers speak about fighting in Gaza, Jason Burke, The Guardian, 8 February, 2024 Peter Beaumont, and Emine Sinmaz, Gaza: Israel moves closer to Rafah offensive despite ‘bloodbath’ warning, The Guardian, 9 February, 2024 Emine Sinmaz, Netanyahu appears determined to press on with ground offensive on Rafah, The Guardian, 11 February, 2024 Journalist casualties in the Israel-Gaza war, Committee to Protect Journalists (upto 12 February, 2024) ক্রমশ...
  • হরিদাস পালেরা...
    হিগস বোসনের গল্প - ১ - অনির্বাণ কুণ্ডু | ১ এই গল্পটা শুরু করা যেতে পারে জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলকে দিয়ে। ইনি স্কটল্যান্ডের মানুষ। উনিশ শতকের এই বিজ্ঞানীর কথা বিজ্ঞানের ছাত্ররা নিশ্চয়ই শুনেছেন। তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের জগতে যাঁদের আসন একেবারে প্রথম সারিতে ইনি তাঁদের অন্যতম। তা এই ভদ্রলোক হঠাৎ এত বিখ্যাত কেন, যে পৃথিবীর সর্বকালের দশজন সেরা পদার্থবিজ্ঞানীর মধ্যে তাঁর নাম থাকবে?অনেক উঁচুমানের কাজের সঙ্গে ম্যাক্সওয়েলের নাম জড়িয়ে আছে, কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড়ো খ্যাতি তড়িৎ ও চুম্বকের ধর্ম নিয়ে কাজের জন্য। তাঁর আগেও অনেক প্রথিতযশা বিজ্ঞানী তড়িৎ এবং চুম্বকের ধর্ম নিয়ে অনেক কাজ করে এসেছেন। এঁদের মধ্যে বিশেষ করে উল্লেখ করতে হয় দু-জনের নাম – মাইকেল ফ্যারাডে এবং আঁদ্রে-মারি অ্যাম্পিয়ার। ফ্যারাডে আর অ্যাম্পিয়ার আলাদাভাবে দেখিয়েছিলেন, যে, কোনো বর্তনীতে তড়িৎ চললে তার চারপাশে একটা চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়, আবার চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে সাধারণ একটা তারের বর্তনী ফেলে রাখলে তাতে তড়িতের প্রবাহ দেখা যায়। অর্থাৎ, তড়িৎ এবং চৌম্বকক্ষেত্রের মধ্যে কিছু সম্পর্ক আছে। এই ঘটনা দুটো ব্যাখ্যা করার জন্যে দুই বিজ্ঞানী আলাদা করে দুটো সূত্রও দিয়েছিলেন। এদের আমরা এখন ফ্যারাডের সুত্র এবং অ্যাম্পিয়ারের সূত্র বলে জানি।এর বাইরে আরো দুটো সূত্র ছিল। একটা দিয়েছিলেন ফরাসি বিজ্ঞানী শার্ল-অগুস্তাঁ দ কুলম্ব। কোনো জায়গায় কিছু তড়িৎ আধান বা চার্জ ফেলে রাখলে তার চারপাশে কী হবে তাই নিয়ে। মনে রাখতে হবে, যে, আধান চললে তবেই তড়িৎপ্রবাহ হয়, আর প্রবাহ হলে তবেই চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি হয়—একই জায়গায় বসে থাকা স্থির আধান চৌম্বকক্ষেত্র তৈরি করতে পারে না। দ্বিতীয় সূত্রটার কোনো নাম কেউ কখনো দেয়নি, কিন্তু এর মূল বক্তব্য হল – চুম্বকের দুই মেরুকে কখনো আলাদা করা যায় না, যত ছোটো চুম্বকই নেওয়া হোক না কেন, তাতে সবসময়েই উত্তর আর দক্ষিণ মেরু একসঙ্গে পাওয়া যাবে।ম্যাক্সওয়েল ল্যাবরেটরিতে কোনো পরীক্ষানিরীক্ষার মধ্যে গেলেনই না। শুধু অঙ্ক কষে দেখালেন, যে, এই চারটে সূত্র একসঙ্গে সত্যি হতে পারে না, এদের মধ্যে একটা বড় রকম গাণিতিক অসঙ্গতি আছে। কিন্তু চারটে সূত্রই তো পরীক্ষা করে পাওয়া? ম্যাক্সওয়েল বললেন, তা হোক, কিন্তু অসঙ্গতি আছেই—সেটা সাধারণ পরীক্ষায় ধরা পড়বে না, তার জন্যে আরো সূক্ষ্ম পরীক্ষা লাগবে। কোথায় গোলমাল সেটাও তিনি দেখিয়ে দিলেন—অ্যাম্পিয়ারের সূত্রে। এই সূত্রটাকে তিনি সংশোধন করলেন, তারপরে আর কোনো অসঙ্গতি রইল না। পরে পরীক্ষায় তাঁর সংশোধন যে অভ্রান্ত—তারও প্রমাণ পাওয়া গেল।এর জন্যেই? শুধু এইটুকুর জন্যেই তাঁকে আমরা এত বড় বিজ্ঞানী বলে মেনে নেব? এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু আরো একটু গভীরে। ম্যাক্সওয়েল দেখিয়েছিলেন, যে, তড়িৎ আর চৌম্বক – এ দুটো বল আসলে আলাদা জিনিসই নয়, এরা একই বলের দুটো আলাদা প্রকাশ মাত্র। অর্থাৎ তিনি দুটো আলাদা বলকে একসঙ্গে মেলালেন। এদের আমরা এখন তড়িৎচৌম্বক বল বা ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফোর্স বলি। আরো একটা জিনিস এই অঙ্ক থেকে বেরিয়ে এল। কোনো জায়গায় তড়িৎক্ষেত্র বা চৌম্বকক্ষেত্র থাকলে তা একটা তরঙ্গ বা ঢেউয়ের জন্ম দেয়। ম্যাক্সওয়েল দেখালেন, যে, এই তরঙ্গের বেগ আলোর বেগের সঙ্গে সমান। অর্থাৎ আলো খুব সম্ভবত তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ।কিং'স কলেজে ম্যাক্সওয়েলের সূত্রের স্মারক: Lourakis তড়িৎ, চুম্বক, আর আলো – তিনটে জিনিসকে একসঙ্গে জুড়ে ম্যাক্সওয়েল একটা নতুন রাস্তা খুলে দিলেন। যাদের আমরা আলাদা আলাদা বল হিসেবে দেখি, তারা কি সত্যিই আলাদা, নাকি একই বলের বিভিন্ন রকম চেহারা? এই প্রশ্নের জবাব তখন থেকেই বিজ্ঞানীদের তাড়া করে বেড়িয়েছে, এখনও বেড়াচ্ছে। ম্যাক্সওয়েলের সময় অবশ্য মাত্র দুটো বলের কথাই জানা ছিল – তড়িৎচৌম্বক আর মহাকর্ষ। এদের দীর্ঘদিন ধরে মেলাবার চেষ্টা হয়েছে, অনেকেই করেছেন—এমনকি আইনস্টাইন পর্যন্ত—কেউই সফল হননি। ম্যাক্সওয়েলের পরে আরো দু-খানা বলের সন্ধান পাওয়া গেছে।এই দুটো বলের একটার নাম উইক ফোর্স (বাংলায় ‘দুর্বল বল’, কিন্তু এটা কেমন যেন বিরোধাভাস অলঙ্কার বা অক্সিমোরনের মত শোনায়—‘ক্ষীণ বল’ বলা যেতে পারে)। এটার সঙ্গে আমাদের একটু ভালোরকম পরিচয় দরকার। তেজস্ক্রিয়তার কথা আমরা বিজ্ঞানের বইতে পড়েছি, কোনো কোনো পরমাণু নিজে থেকেই ভেঙে অন্য পরমাণুতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। এই তেজস্ক্রিয়তার ফলে বিটা কণা নামে একরকম জিনিস বেরিয়ে আসে, তারা আসলে ইলেকট্রন। কিন্তু ইলেকট্রনের তো আধান আছে, সেটা এলো কোত্থেকে? তেজস্ক্রিয়তার ফলে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে যে নিউট্রন আছে, তার থেকে প্রোটন তৈরি হয়, আর আধান সমান রাখার জন্যে একটা ইলেকট্রন বেরিয়ে আসে। সঙ্গে আরো কিছু বেরোয়। যে বল এই ঘটনাটা ঘটায়, সেটাই ক্ষীণ বল।দ্বিতীয় নতুন বলটার নাম স্ট্রং ফোর্স (আবারও, বাংলায় ‘সবল বল’ কথাটা কেমন যেন শোনায়, মুশকিল হল পরিভাষার ক্ষেত্রে বাংলা এখনও বেশ দুর্বল; এটাকে ‘পীন বল’ বলা যাক, যদিও খুব জুৎসই হল না)। প্রোটন ও নিউট্রন যে মৌলিক কণা নয়—তা আমরা এখন জানি। কোয়ার্ক নামে একরকম মৌলিক কণা দিয়ে এরা তৈরি। খুব সহজভাবে বলতে গেলে, এক একটা প্রোটন বা নিউট্রনের মধ্যে থাকে তিনটে করে কোয়ার্ক। এদের একসঙ্গে আটকে রাখে স্ট্রং ফোর্স। পরমাণুর নিউক্লিয়াসের মধ্যে প্রোটন ও নিউট্রনকে একসঙ্গে আটকে রাখার জন্যেও স্ট্রং ফোর্সই দায়ী।তা, এখনো পর্যন্ত এই চারখানা বলের ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত করে জানি। গত প্রায় তিরিশ বছর ধরে বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, যে, পঞ্চম একরকম বলের সন্ধান পাওয়া গেছে—যে বল ব্রহ্মাণ্ডের বিভিন্ন অংশকে আরো জোরে দূরে ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছে। এটা আপাতত আমাদের কাজে লাগবে না, সুতরাং এ সম্বন্ধে আমরা আর কোনো আলোচনা করব না।২এই গল্পটা স্বয়ং নিউটন সাহেবকে দিয়েও শুরু করা যেতে পারে। বস্তুর ভর কাকে বলে, তার একটা ধারণা তিনিই দিয়ে গেছেন। সোজা কথায় বলতে গেলে, ভর হল কোনো বস্তুর জড়তার পরিমাপ। যার ভর যত বেশি তার জড়তাও তত বেশি। অর্থাৎ তাকে নাড়াতে গেলে তত বেশি বল প্রয়োগ করতে হবে। অন্যভাবে বললে, যার জড়তা যত বেশি, একই দূরত্ব পেরোতে তার বেশি সময় লাগবে।আইনস্টাইন আর এক ধাপ এগোলেন। তিনি বললেন, যে, কোনো জায়গায় ভর থাকলে, তা সেই জায়গার দেশ ও কালের জ্যামিতিকে দুমড়ে দেয়—অনেকটা একখণ্ড টান করা রবারের ওপর লোহার বল রাখলে যেমন টোল পড়ে—সেইরকম। এই দোমড়ানো দেশকালের মধ্যে দিয়ে কোনো বস্তু সরলরেখায় চললেও আমাদের চোখে তার চলার পথটা বাঁকা লাগে, আমরা বলি বস্তুটার ওপর ওই ভরের মহাকর্ষের টান কাজ করছে। অর্থাৎ ভর কাকে বলে, ভর কী কী করতে পারে – সবই বোঝা গেল, কিন্তু আসল জিনিসটাই বোঝা গেল না।দোমড়ানো দেশকালের কাল্পনিক ছবি: সূত্রভর জিনিসটা এলো কোত্থেকে? ইলেকট্রন, প্রোটন, আপনি, আমি – সবারই তো ভর আছে, নানারকম যন্ত্র দিয়ে মাপাও হয়, সেই ভরটা দিলো কে? ‘ভগবান দিয়েছেন’ বলতে পারলে সমস্যা চুকে যেতো, কিন্তু ওই ব্যাখ্যাটা বিজ্ঞানীদের চলবে না। সুতরাং, এই প্রশ্নটাও তাঁদের তাড়িয়ে বেড়ালো। এই লেখাটায় আমরা শুধু মৌলিক কণার ভর কী করে এলো – সে সম্পর্কে বলব; প্রোটন বা নিউট্রন মৌলিক কণা নয়, তাদের ভর কী করে এলো জানতে গেলে আরেকটু অন্যরকম অঙ্ক কষতে হবে।৩সত্যেন্দ্রনাথ বসু মশাইকে দিয়েও এই গল্পটা শুরু করলে খারাপ হয় না। দুর্ভাগ্যক্রমে তিনি এমন এক দেশে জন্মেছিলেন, যে, সেখানকার লোকে তাঁর কাজ সম্পর্কে এক বিন্দু না জেনেও তাঁকে আইকন বানিয়ে দেবার আগে দু-বার ভাবে না। ইউরোপে জন্মালে বিজ্ঞানী হিসেবে তিনি আরো বেশি স্বীকৃতি পেতেন, হয়তো নোবেল পুরস্কারও পেতেন, কিন্তু হিরো-বুভুক্ষুর দল তাঁকে নিয়ে এমন উৎকট মাতামাতি করত না (কতটা উৎকট তার পরিচয় পরে দেব)। সত্যেন্দ্রনাথ ঠিক কী করেছিলেন?আলো যে একরকম তরঙ্গ—সে কথা আগে বলেছি। আলোর আরো নানারকম জাতভাই আছে – তাপ, রেডিও, অতিবেগুনি, এক্সরশ্মি, গামারশ্মি – এদের সবাইকেই একসঙ্গে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ বলে। তরঙ্গকে মাপা হয় তার দৈর্ঘ্য দিয়ে, অর্থাৎ, একটা ঢেউয়ের মাথা থেকে পরের ঢেউয়ের মাথা পর্যন্ত দূরত্ব। বিভিন্ন জাত হয় শুধু তরঙ্গদৈর্ঘ্যের তফাতে। চোখে যে আলো দেখতে পাই, তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য হল ৫০০ ন্যানোমিটার মতন। এক ন্যানোমিটার: এক মিটারের একশো কোটি ভাগের এক ভাগ। লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি, বেগুনি আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য কম, তরঙ্গদৈর্ঘ্য আরো বাড়ালে তাপ, রেডিওতরঙ্গ; কমালে অতিবেগুনি, গামারশ্মি, ইত্যাদি।তড়িৎচুম্বকীয় বর্ণালী: সূত্র - উইকিকোনো জিনিসকে গরম করতে থাকলে তার থেকে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ বেরোয়। এর জন্যেই কামারশালায় লোহা গরম করলে প্রথমে লাল আর তারপর সাদা হয়ে ওঠে। এইরকম তরঙ্গ বেরোনোকে বলে বিকিরণ। একটা সম্পূর্ণ কালো বস্তুকে গরম করলে তার থেকে কোন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো কতটা বিকীর্ণ হবে—যাকে আমরা বর্ণালী বলি—সেটা বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে বের করেছিলেন। মুশকিল হল, যে, কোনো তত্ত্ব দিয়েই এই বর্ণালীর চেহারাটা ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত ১৯০০ সালে জার্মান বিজ্ঞানী মাক্স প্লাঙ্ক বললেন, আমরা যদি ধরে নিই — আলো বিকীর্ণ হয় তরঙ্গের আকারে নয়, ছোটো ছোটো শক্তির প্যাকেটের আকারে, তাহলে এই বর্ণালীটার ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। এক একটা প্যাকেটে কতটা শক্তি থাকবে, তা নির্ভর করে ওই আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের ওপরে—তরঙ্গদৈর্ঘ্য বাড়লে শক্তি কমবে, তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমলে শক্তি বাড়বে। মজার কথা হল, এদের অনুপাতটা সব সময় একই থাকে—বিজ্ঞানের ছাত্ররা জানেন, একে প্লাঙ্কের ধ্রুবক বলে। মোদ্দা কথায়, লাল আলোর প্যাকেটের শক্তি কম, গামারশ্মির প্যাকেটের শক্তি অনেক বেশি। আলোর এই প্যাকেট বা কণাকে আমরা ফোটন বলি (তার মানে কি আলোর তরঙ্গতত্ত্ব পুরো বাতিল হয়ে গেল? মোটেই না। কখনো সে তরঙ্গ আবার কখনো কণা। শুধু আলো নয়, সবকিছুই এই রকম দুই সত্তাবিশিষ্ট। কিন্তু সে আরেক মজার গল্প)।ফোটন হঠাৎ এই রকম একটা অদ্ভুত সূত্র মেনে চলে কেন—তার নিজস্ব কোন বৈশিষ্ট্যের জন্যে—সে কথাটার উত্তর দিয়েছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ। মূল কথাটা হল, দুটো ফোটনের শক্তি যদি এক হয়, তাহলে কোনোভাবেই তাদের আলাদা করা সম্ভব নয়। যদি আলাদা করা সম্ভব হত, তাহলে এক জায়গায় অনেকগুলো ফোটন রাখলে তারা কীভাবে থাকত – সেই হিসেবটা বহুদিন আগে ম্যাক্সওয়েল (আবার সেই ম্যাক্সওয়েল!) ও লুডভিগ বোলৎজমান দিয়ে গিয়েছিলেন। তাকে আমরা এখন ম্যাক্সওয়েল-বোলৎজমান সংখ্যায়ন বলি। সত্যেন্দ্রনাথ আর একটা নতুন রকম সংখ্যায়ন দিলেন, যাদের আলাদা করা যায় না তাদের জন্যে। পরে আইনস্টাইন এটাকে আরো একটু ঘষামাজা করে, আরো অন্যান্য জায়গায় লাগিয়ে দেখান—এই হিসেবটার নাম বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন।এখানে আর একটা কথা একটু বলার আছে। শুধু যে দুটো ফোটনকে আলাদা করা যায় না তা-ই নয়, দুটো ইলেকট্রনকেও আলাদা করা যায় না। কিন্তু ফোটন আর ইলেকট্রনের চরিত্রে একটু প্রভেদ আছে। একইরকম দুটো বা তার বেশি ফোটনকে এক জায়গায় রাখলে তারা কোনো আপত্তি করে না, দিব্যি ভদ্রলোকের মত একসঙ্গে থাকে। দুটো একরকমের ইলেকট্রনকে এক জায়গায় কোনোভাবেই রাখা যায় না, বনস্পতি না হলেও তারা নিজেদের মধ্যে ব্যবধান রাখে। প্রোটন, নিউট্রন, নিউট্রিনো – এরাও ইলেকট্রনের মতনই অহঙ্কারী। এদের জন্যে আলাদা একটা হিসেব আছে, সেটা দিয়েছিলেন ইতালিয়ান বিজ্ঞানী এনরিকো ফের্মি এবং ইংরেজ বিজ্ঞানী পল ডিরাক। এঁদের নামানুসারে এই হিসেবটাকে ফের্মি-ডিরাক সংখ্যায়ন বলে। ইলেকট্রনের মতন যে সব কণা এই সংখ্যায়ন মেনে চলে, তাদের বলি ফের্মিয়ন; আর ফোটনের মতন যারা বোস-আইনস্টাইন সংখ্যায়ন মেনে চলে, তাদের বলি বোসন। যত রকম মৌলিক কণা আছে, তারা সবাই এই দুটো গোত্রের যে কোনো একটায় পড়ে।৪অণুপরমাণুর রাজ্যে আমাদের চেনা নিয়ম খাটে না। ক্রিকেট বল যে নিয়ম মেনে চলে, ইলেকট্রনের বেলায় সে নিয়ম খাটাতে গেলে বিপদে পড়তে হয়। সেখানে যে নিয়ম খাটে তার নাম: কোয়ান্টাম মেকানিক্স। কোয়ান্টাম মেকানিক্স ঠিক কীভাবে কাজ করে—তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা যে আজও একমত হতে পেরেছেন তা নয়—এখনও নানারকম তর্কবিতর্ক চলে। কিন্তু একটা বিষয়ে কারোই সন্দেহ নেই—সেটা হল, যে, কোয়ান্টাম মেকানিক্স কাজ শুধু করে না, অত্যন্ত নিখুঁতভাবে কাজ করে। বেড়াল যদি ইঁদুর ধরতে পারে তাহলে বেড়ালের রং নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলে—অন্তত আমাদের বেশিরভাগেরই চলে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের দর্শনের পথ অনেক খানাখন্দে ভরা, সেটা সযত্নে এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে কাজ আমাদের করতেই হবে, কারণ ইলেকট্রন, ফোটন, কোয়ার্ক – সকলেই তো ওই নিয়মই মেনে চলে। আপনি যদি ঠিক করেই রাখেন, যে, এটা ভারি শক্ত জিনিস, কিছুতেই আপনি এটার মধ্যে ঢুকবেন না, তাহলে এখান থেকেই ক্ষান্ত দেওয়া ভালো। আর যদি সাহস করে আর একটু এগোতে পারেন, তাহলে ইন্টারেস্টিং কিছু পাওয়াও যেতে পারে।প্রথমেই অবশ্য একটা ধাক্কা খেতে হবে মহাকর্ষের ব্যাপারে। মহাকর্ষ বলের কোনো কোয়ান্টাম তত্ত্ব নেই। নেই মানে, বিজ্ঞানীরা আজ পর্যন্ত বের করে উঠতে পারেননি। গত প্রায় একশো বছর ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তবুও পারেননি। আর যাঁরা চেষ্টা করছেন তাঁরা কেউ হেঁজিপেজি নন, সকলেই প্রথম শ্রেণীর বিজ্ঞানী। একসময় মনে করা হয়েছিল, স্ট্রিং থিওরি থেকে এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে, কিন্তু সে আশাও এখন অনেকেই ছেড়ে দিয়েছেন, স্ট্রিং থিওরির ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল বলে আর মনে হচ্ছে না। যাই হোক, যা নেই তা নিয়ে আর দুঃখ করে কী হবে? ভাগ্য ভালো যে মৌলিক কণার জগতে মহাকর্ষের প্রভাব ধর্তব্যের মধ্যেই নয়, নইলে ভারি মুশকিলে পড়তে হত। আধখানা কোয়ান্টাম আর আধখানা সনাতন, অর্থাৎ অকোয়ান্টাম, এভাবে কাজ করা যায় নাকি?তড়িৎচুম্বকীয় বলের কথায় আসি। কোয়ান্টাম তত্ত্ব বাদ দিয়েও এর চমৎকার একটা চেহারা আছে, ম্যাক্সওয়েলের দেওয়া। অবশ্যই একা ম্যাক্সওয়েলের নয়, গোড়াতেই সে কথা বলেছি – কিন্তু অন্তিম রূপটা যে হেতু তিনিই দিয়েছিলেন, তাই একে ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্বই বলা হয়ে থাকে। এই তত্ত্বে কোনো ফোটন নেই, আছে শুধু তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। একে আমরা সনাতনী তড়িৎচুম্বকীয় তত্ত্ব বা ক্লাসিকাল ইলেকট্রোডায়নামিক্স বলে থাকি। কিন্তু এর একটা কোয়ান্টাম অবতারও আছে। সেখানে তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গের জায়গা নেয় আলোর কণা, ফোটন।এই কোয়ান্টাম তড়িৎচুম্বকীয় তত্ত্ব—ইংরেজিতে কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডায়নামিক্স বা সংক্ষেপে কিউইডি—এর সম্পর্কে দুচারটে কথা বলতেই হয়। কিউইডি একদিনে আসেনি, কোনো একজন বিজ্ঞানীর একার চেষ্টাতেও নয়। ১৯৪৭ সালে, প্রধানত রিচার্ড ফাইনম্যান এবং জুলিয়ান শুইংগার কিউইডির মূল চেহারাটা দাঁড় করান। দু-জনের রাস্তাটা অবশ্য একটু আলাদা ছিল। তখন জানা ছিল না—পরে জানা গেছে—১৯৪৩ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপানে বসে সিন-ইতিরো তোমোনাগা প্রথম কিউইডি দাঁড় করিয়েছিলেন। ফাইনম্যান, শুইংগার, এবং তোমোনাগা, তিনজনেই পরে নোবেল পুরস্কার পান। ফ্রিম্যান ডাইসন দেখান, যে, এই তিনজনের তত্ত্বই একই কথা বলে। ডাইসনের প্রমাণে সামান্য একটু ফাঁক ছিল, সেটা পূরণ করেন লন্ডনের ইম্পিরিয়াল কলেজের এক তরুণ বিজ্ঞানী, যিনি জন্মসূত্রে ভারতীয়, কিন্তু দেশভাগের পরে পাকিস্তানী নাগরিক। এঁর নাম আবদুস সালাম। এঁদের সবার চেষ্টায় যে জিনিসটা দাঁড়াল, মানুষের ইতিহাসে তার চেয়ে নিখুঁত তত্ত্ব কেউ কখনো দেখেনি। নিখুঁত মানে, ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে যা পাওয়া গেল, তত্ত্বের সঙ্গে তার এত চমৎকার মিল। সেইজন্যে কিউইডিকে বিজ্ঞানীরা আদর্শ তত্ত্ব বলে মনে করেন।এখানে অনেকে একটু গলা খাঁকারি দেবেন। স্বয়ং পল ডিরাকও দিতেন। তার কারণ কিউইডি-র অঙ্ক মোটেই দুই আর দুইয়ে চার করার মত নয়। এখানে বেশ কিছু জিনিস আছে, অঙ্ক কষে বের করতে গেলে যার উত্তর আসে অসীম। খুব বড় কোনো সংখ্যা না, সত্যি সত্যিই অসীম, অর্থাৎ ইনফিনিটি। পদার্থবিদরা অসীম নিয়ে কাজ করতে মোটেই পছন্দ করেন না, কারণ অসীম তো আর ল্যাবরেটরিতে যন্ত্র দিয়ে মাপা যায় না। আর তাছাড়া, ইলেকট্রনের ভর বা আধান – এগুলো তো আর অসীম হতে পারে না, এগুলোর মান বহুদিন আগেই মেপে বের করা হয়েছে। অথচ কোয়ান্টাম তত্ত্ব থেকে বের করতে গেলে অসীম ছাড়া আর কিছু আসছেও না। কী করে উদ্ধার পাওয়া যায়?ফাইনম্যানরা এরও একটা সমাধান বের করলেন। ধরা যাক – আপনি ইলেকট্রনের ভর বা আধান বের করবেন। যে ভর আপনি মাপেন, কিউইডির অঙ্কে তা দুটো জিনিসের বিয়োগফল হিসেবে আসে, যেমন ধরা যাক (ক – খ)। এর মধ্যে খ জিনিসটা আপনি অঙ্ক কষে বের করেছেন, অসীম। ক জিনিসটা কেমন, তা বের করার কোনো উপায় নেই। ওঁরা বললেন, ধরে নিন না কেন যে, ক জিনিসটাও অসীম, আর দুটো অসীমের বিয়োগফল হিসেবে একটা ছোট্ট সংখ্যা পড়ে রইল – ওটাই ইলেকট্রনের ভর। ইলেকট্রনের আধান, বা আর যে সব জায়গায় এরকম অসীম উত্তর আসে, সেখানেও ওঁরা এই খেলাটাই খেললেন। এখন দুটো অসীম সংখ্যার বিয়োগফল একটা সসীম সংখ্যা, যা যন্ত্র দিয়ে মাপা পর্যন্ত যায়, এটা অঙ্কের হিসেবে বেশ গোঁজামিল মনে হতে পারে, গণিতবিদরা তেড়ে মারতে উঠলেও তাঁদের দোষ দেওয়া যায় না। কিন্তু মজা হল এই প্রেসক্রিপশনটা নিখুঁতভাবে খেটে যায়—শুধু তাইই নয়, একবার এই উপায়ে গোটা তিনেক জায়গা থেকে অসীমকে তাড়িয়ে দিলে আর কোথাও কখনো অসীমের উপদ্রব হয় না। তাই পদার্থবিদরা বললেন, হতে পারে অঙ্কে গোঁজামিল আছে, কিন্তু এত চমৎকারভাবে অঙ্কের সঙ্গে পরীক্ষা যদি মিলে যায় তাহলে শেষ পর্যন্ত অঙ্কটা ভুল হতে পারে না। কাজেই, আপনাদের পছন্দ না হলে আপনারা আরো ভাল তত্ত্বের সন্ধান করুন, আমাদের এতেই দিব্যি চলবে। শুধু চলবে তাই নয়, আমরা এর পরেও অন্যান্য তত্ত্ব এই কিউইডি-র আদলেই তৈরি করব।ক্ষীণ আর পীন বলের তত্ত্ব নেহাৎ অর্বাচীন, তাই তাদের শুধু কোয়ান্টাম চেহারাটাই আছে। বিজ্ঞানীদের এবার চেষ্টা শুরু হল, এই দুটো বলকেও যদি কিউইডির ছাঁচে ফেলা যায়।চলবে...
    মায়াবট (শ্রদ্ধেয়া প্রব্রাজিকা শ্রদ্ধাপ্রাণাজীর স্মৃতিতে নিবেদিত) - Sara Man | আমি যখন ছোট ছিলাম, মায়ের কাছে গল্প শুনতাম এক আশ্চর্য পাঠশালার।‌ পাঠশালায় দুটো বাড়ি, একটা চারাগাছেদের জন্য আর একটা একটু বড়দের জন্য। হঠাৎ এক এক দিন চারাগুলো জল বাতাস পেয়ে হিলহিলিয়ে খিলখিলিয়ে যখন দু একটা লম্বা লিকলিকে ডাল ছড়াতো, তখন বিরাট একটা কালো সিংদরজায় কাঁপন ধরত। তার গায়ের সোনালি নকশাগুলো ঝিলিক দিত। আর সঙ্গে সঙ্গে দরজার সামনে এসে হাঁকতে হত, 'চি-চি-ং ফাঁক'।‌আর যায় কোথা! ক্যাঁচকোঁচ করে দরজা নড়ে সরে গেলেই হিলহিলে খিলখিলে ল্যাকপ্যাকে চারাগাছের দল তার ভিতর দিয়ে সেঁধিয়ে যেত। দরজার ওপারে ছিল একটু বড় গাছেদের বাড়ি।‌ চারিধারে হলদে সাদা জাফরি কাটা রেলিঙের মাঝে একরত্তি উঠোনে রোদে আর মেঘে রোজ খেলা করত। তার এককোণে একটা টলটলে চৌবাচ্চা, আর কলাফুলের গাছ। উঠোনের তিনদিকে টুকটুকে লাল পথ ছিল, সেই পথ গিয়ে মিশত একটা সবুজ বাগানে। বাগানে না আসলে দালানে - ঘন সবুজ ঘাসের মত মখমলি, মাটির দাওয়ার মত শীতল এক দালান। সে দালান যেমন বড়, না ঠিক বড় নয়, মানে যেন অতল গভীর, মানে ঠিক গভীর নয়, ঠিক কেমন বলতে ঠাহর পাইনা। তবে যেমনই হোক, খুব আপন আপন। আমি যেদিন প্রথম সেখানে গিয়েছিলাম, তখন সবে কুঁড়ি ফুটেছি, অমন কুঁড়ি পাঠশালে কেউ নেয়না। সেদিন সেই দালানে গিয়ে শুয়ে পড়লাম, ঘুম এসে গেল। চোখ খুলে দেখি দালানে একজন মা রয়েছেন। তিনি কে তো জানিনা, মনে হল মায়ের মতো। মা বলল, উনি সবার মা, মায়েরও মা, আমারও মা।যেদিন আমার তিন নম্বর সবুজ পাতা গজালো, সেইদিন বাবা আমাকে বাগবাজারে মালতী-পার-পাশে ইস্কুলে ভর্তি করে দিল। সেই আশ্চর্য পাঠশালায় যাওয়া হলনা। মা বলল, এখন এখানে থাকো, পাঠশালায় যেতে গেলে আমাকে নাকি অন্তত ছটা পাতা গজাতে হবে।পাঠশালায় যে এক বটঠাকরুণ আছেন, তা আমি জানতুম না। একদিন মা বলল, এবার থেকে মা রোজ বটগাছের ছায়ায় বসে ছোট্ট ছোট্ট চারাগাছদের বড় হতে শেখাবে। বড় হওয়া আবার শেখানো যায় বুঝি? ও তো এমনি এমনি হয়। আমারও তো একটা একটা করে পাতা বাড়ছে - এখন হয়েছে পাঁচটা। মা বলল, এমনি এমনি বড় হওয়া নয়, বড়োর মত বড় হওয়া শিখতে লাগে। হবেও বা, আমি এখন ছোট - সবটুকু তো জানিনা। আমার মা ছিল নদীর নামে কৃষ্ণা। মায়ের কলম থেকে অক্ষরগুলো ঝরঝরিয়ে তরতরিয়ে বেরিয়ে আলাদা নদী হত - গল্পের নদী, নাটকের নদী, ছড়ার নদী। আমি সেখানে সাঁতার কাটতাম। সে ভারি মজা হত। শুনলুম বটঠাকরুণ বলেছেন, এবার থেকে মায়ের কলমের অক্ষরগুলো গোল গোল করে ঘুরিয়ে নকশা করে পদ্মফুল বানাতে হবে। এক একটা পদ্মফুলে বসবে এক একটা কুঁড়ি গাছ। সেখানে জল বাতাস পেয়ে বড় হতে পারলে তাদের কলমও নদী হবে। সেই হওয়াটা নিশ্চিত করাই নাকি মায়ের কাজ। আমি ভাবি অদ্ভুত বটগাছ তো, সে নিজের জন্য মাটি নয়, সবার জন্য নদী বানাতে চায়! তাও মাকে বললুম, তুমি তো নিজেই নদী গো মা, পদ্মফুল বানাবে কী করে, বয়ে যাওয়া জলে যে ও ফুল থাকেনা। শুনলুম পাঠশালে মা নদী নয়, অনেক চারা বয়সে যখন বটের ছায়ায় মা আশ্রয় নিয়েছিল, তখন সেই বটঠাকরুণ গালুফুলো কোঁকড়া চুলো মায়ের কৃষ্ণা নাম বদলে ফুলকুমারী, মানে কৃষ্ণকুমারী করে দিয়েছেন। মা বলল টুংটাং ঠুং ঠাং ঝিরঝির কুলকুল জলের ধারা বেঁধে অতল আর থির, কাজল আর গভীর হ্রদ বানিয়ে পদ্ম ফোটানোই আজ থেকে মায়ের সাধনা। যেদিন থেকে মা এই অদ্ভুত কাজ শুরু করল, সেদিনই আমার ঘাড় সুড়সুড় করতে লাগল, হাত দিয়ে দেখি কেমন করে যেন ঘাড়ে একটা নতুন মানে আমার ছয় নম্বর পাতাটা গজিয়েছে।মায়ের কাজের সঙ্গে সঙ্গে আমার রোজের বদল হল।‌ সেই যখন আকাশ লাল করে সুয্যদেব সাতরঙা ঘোড়ায় চড়ে টগবগ করে বেরিয়ে পড়েন তখন মালতী ইস্কুলে যাই, সেখান থেকে বেরিয়ে মায়ের সঙ্গে পাঠশালায় যাই। আবার যখন সুয্যদেব পাটে বসেন, তখন বাড়ি ফিরি। ছোট পাঠশালায় একটা বাগান ছিল, না বাগান মানে ছাদ ছিল, ছাদে টিনের ছাউনি ছিল, ছাউনিতে বৃষ্টিফোঁটার গান ছিল। আর দুই মা ছিল, মানে আমরা ডাকতাম মাসি। একজন রাখালরাজার হাতে 'বেণু', আর একজনের ঝোলায় টকমিঠে ঝাল ঝাল রকমারি মণিমানিক। আর ছিল এক অশথগাছ। খুব ভালো আর দয়ালু। নিজের ঘরবাড়ি ত্যাগ করে পাঠশালাতেই থাকেন - তাই নতুন নাম হয়েছে ত্যাগপ্রাণা। কিন্তু পাঠশালায় সকলে সেই অশথগাছকে আদর করে বড়গীতাদি বলে ডাকত। সেই অশথগাছের তলায় সারাদিন বসে থাকতাম। একটা লালরঙা ছবিওলা রামায়ণের বই ছিল - সেটাই নাড়াচাড়া করতাম বসে।মা একদিন বলল, আমায় বটঠাকরুণ ডেকেছেন। আমি তো এক পায়ে খাড়া। কত না শুনেছি গল্প। লাফিয়ে লাফিয়ে পাতা নেড়ে নেড়ে চললাম এগিয়ে সেই বেণুমায়ের সঙ্গে। পথ বড় কম নয়। প্রথমে সিংদরজা, তার পর সেই অতলান্ত সবুজ দালান, তার ধারে একটা সিঁড়ি। ধাপে ধাপে ওঠে - এক পা, দু পা, তিন পা, চার পা - সিঁড়ি ঘোরে এক পাক, দু পাক - তিন পাকের পর ওপরে একটা সাদামাটা ঘর। সেখানেই আছেন বটঠাকরুণ। জানলা সাদা পর্দা দিয়ে ঢাকা। কিন্তু ঘরে ছায়া ছিলনা। ঠাকরুণের নিজের একটা আভা ছিল। তাতেই ঘরটা আলো আলো লাগছিল। ঘন বর্ষার আগে যেমন একটা গুরু গুরু শোনা যায়,  মৃদু তবু গম্ভীর, তেমন একটা কন্ঠ শুনলুম,- তুমিই বুঝি আমাদের কৃষ্ণকুমারীর মেয়ে?- (আমি হেসে বললুম) পদ্মফুল এঁকে দেখাবো তোমায়? তুমি মাকে যে বলেছিলে।- ওটা মায়ের জন্য। আমি চাই চারাগাছেরা বন্দী না থেকে নদী হয়ে যাক।- আরে জানি গো জানি, তাই তো খুব দেখতে ইচ্ছে করছিল তোমায়।- কেন?- ভাবছিলাম তুমি কেমন বটগাছ গো, এত যে ঝুরি নামিয়ে বসে আছো, নড়ন চড়ন নেই, তুমি নদীর খবর কোথায় পেলে? তোমার পাতার ওপরে ঐ যে আলোগুলো বসে আছে ওরাই বুঝি খবর দেয়?- হ্যাঁ, তা তো দেয়।- ঠিক বুঝেছি। জানো তো, নদী হবার কথা শুনে পর্যন্ত আমি পথ খুঁজছি, কী করে নদী হব, পথ পেয়ে যাব ঠিক তুমি দেখে নিয়ো।‌- বেশ, তাই হোক।আবার বেণুমায়ের সঙ্গে সেই পথ উজিয়ে ফেরা। তবে ফেরার সময়ে অবিরাম কানের মধ্যে ছল ছল ছলাৎ, কলকল কুলুকুলু কী যেন সব ঝঙ্কার উঠতে লাগল। চুপচাপ অশথ গাছের তলায় গিয়ে বসলুম। আমার মুখ দেখে অশথ গাছ বলল- কী কথা হল বটঠাকরুণের সঙ্গে?- বললুম, আমি নদী হবার পথ খুঁজছি।- তাই বুঝি? আমি একটা দিশা জানি পথের, তোমাকে সেখান থেকে নিজেকে খুঁজে নিতে হবে।- কোথায় বলো না গো!অশথ গাছ তখন নড়েচড়ে এক বিশাল কালো দেরাজ খুলে বললে, এদিকে এসো। আমি মুখ বাড়িয়ে দেখি তার মধ্যে অজস্র কীসব যেন ঝিলমিল করছে, চোখে ধাঁধা লেগে যায়। একটু চোখ সয়ে এলে দেখলাম বই। এদের মধ্যেই নদীর পথ আছে। মনে ভাবি, - মা অক্ষরের কথাই বলেছিল বটে।তারপরে রাত ভোর হয়, রাঙা আলো হলুদ হয়, হলুদ থেকে সাদা। আমি আর রাঙা আলোয় মালতী ইস্কুলে যাইনা। সুয্যির আলো সাদা হলে মায়ের হাত ধরে পাঠশালে যাই। বটঠাকরুণ যে পরীক্ষা করে দেখতে চান, আমি নদী হতে পারি কিনা। সারাদিনমান কেটে যায় নানা কাজে। দিন থেকে সপ্তা, সপ্তা থেকে মাস। ঠাকরুণের কথা ভুলে থাকি। হঠাৎ একদিন কোকিল ডেকে উঠল। চৈতি হাওয়া পাঠশালার আনাচে কানাচে ঘুরে ঘুরে নেচে বেড়াতে লাগল। মনে একটা খুশির দোলা - জানিনা আজকে কী! মাকে বললুম,- আজ এত আনন্দ হচ্ছে কেন গো মা, মনটার মধ্যে আপনা আপনি নূপুর বাজছে, কানে যেন ঘন্টা বাজছে টুংটাং!- সে তো হবেই, আজ যে রামচন্দ্রের জন্মদিন।- রা-ম! অযোধ্যার রাম? তার জন্মদিন পালন হবে? কীকরে গো মা?- আজ ছুটির পরে বটঠাকরুণ সকলকে রামলক্ষ্মণের গল্প বলবেন, শুনবি।‌আজ গল্প হবে! পল যায়, ক্ষণ যায়, সে এক অপেক্ষা! সময়ের কলগুলো সেদিন ইচ্ছে করেই খুব ধীরে চলতে লাগল, আর আমার প্রাণপাখি খালি উড়ি উড়ি করে। অবশেষে ছুটি হল, মায়ের সঙ্গে সেই সবুজ দালানে গিয়ে বসলুম। দালানে বেশ ভিড়। সকলেই গল্প শুনতে এসেছে। একধারে মহাযোগী রাজর্ষি সিদ্ধার্থ শ্বেতপদ্মের ওপরে বসে রয়েছেন। তার সামনে একটি সাদামাটা কাঠের পীঠাসন।‌ আমি চোখ পিটপিট করে চারিপাশ দেখছিলুম। এমন সময়ে দেওয়ালগুলো ফিসফিস করতে শুরু করল, ঐ যে শ্রদ্ধাপ্রাণা, লক্ষ্মীদি, ল-ক্ষ্মী, ল----ক্ষ্মী কে? শ্রদ্ধাই বা কে? হ্যাঁ, বটঠাকরুণ খুব লক্ষ্মীমন্ত একথা আমি মানি, তাঁকে সবাই শ্রদ্ধা ভক্তি করে, এও ঠিক।‌ তাহলে কি এগুলো ওঁর নাম? বটঠাকরুণ নিজেই একটা আলো-গাছ, তাঁর আবার নামে কী প্রয়োজন? সাতপাঁচ ভাবা বন্ধ হল, কারণ বটঠাকরুণ সেই পীঠাসনে এসে বসলেন। মহাদেবের জটার মত তাঁর ঝুরিগুলো ঝলমলিয়ে উঠলো। ফাঁকে ফাঁকে মখমলি পাতাগুলো দুলতে লাগল, চিকমিক ঝিকমিক করতে লাগল। সেই অতল দালানের সবুজ আর বটের পাতার সবুজ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।‌ দালানের এই ক্ষুদ্র ভিড়টাতো ছার, আজ বিশ্বচরাচর তাঁর এই রূপ দেখে যেন স্তব্ধ হয়ে রইল। পিছনে সিদ্ধার্থ ধ্যানে বসেছেন। আচ্ছা জেতবনের অক্ষয় বট - সেও কি এমনই ছিল? জলদ মেঘের গুরু গুরু কন্ঠে বটঠাকরুণ রামলক্ষ্মণের গল্প বলছেন।‌ চারভাইয়ের জন্মে অযোধ্যায় সেদিন কী আনন্দের স্রোত! অশথ গাছের দেরাজে একটা বই ছিল, 'নালক'। আমি তার ভিতরে অক্ষরের নদী খুঁজতে গিয়েছিলাম। বুদ্ধের জন্মে কপিলাবস্তুর আনন্দ, আর অযোধ্যার আনন্দ আমার কাছে একাকার হয়ে যাচ্ছিল।দিন যেতে যেতে একদিন আমি নিজে নিজে সিংদরজা পেরিয়ে পাঠশালার সেই দালান বাড়িতে ঢুকে পড়লুম, মায়ের হাত ধরে না, বেণুমায়ের সঙ্গেও না, পুরো একা। বটঠাকরুণের সঙ্গে মাঝেসাঝেই দেখা হত। রামের জন্মদিন এলে মানে প্রতি রামনবমীতে গল্প শোনাও চলল পুরোদমে।‌ আমার কচি বাকল ঝরে ঝরে ঝুনিয়ে উঠছিলুম একটু একটু করে। তবে সঙ্গে আরও চারাগাছেরা ছিল যারা একটু বেশিই ঝুনো হয়েছিল। আমাদের পাঠশালা ছিল মেয়ে গাছেদের জন্য। তার মানে ধারে চারে ছেলে চারাগাছ ছিলনা তা তো নয়, বিস্তর ছিল। উঁকিঝুঁকিও ছিল। আমরা বটগাছের ছায়ায় থাকলেও একটা কাঁঠাল গাছের গান পথেঘাটে খুব শুনতুম, - হুঁ হুঁ যে কাঁঠালের আঠা-আ-আ, লাগলে পরে ইত্যাদি। গানটা চারাগাছেদের মনে ধরেছিল। আমরা সবাই সবই জানছিলুম, কেবল পাঠশালায় এসব কথা উচ্চারণ বারণ ছিল। একবারের রামনবমীতে বটঠাকরুণ রামচন্দ্র আর হনুমানের কাহিনী শোনালেন, ভক্ত আর ভগবান, ভগবান না কি চিরসখা, সখা নাকি রক্ষক? তিনি যখন গল্প করতেন তখন তো সকলে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেতাম, তারপরে কিছুদিন কেবল সেই নিয়েই আলোচনা চলত। একটা ঝুনো চারা বলে উঠল - আহারে কী পীরিতি! পাশ থেকে আর এক ঝুনো সঙ্গত দিল - পীরিতির বাকশো। ব্যাস - সেই হল আমাদের সঙ্কেত। আর উঁহুঁ, হুঁ হুঁ নয়, সবার সামনেই বাকশো নিয়ে আলোচনা চলতে লাগল। কয়েকটা নালিশকুটি, মরকুটি চারা এসে যদি নাক কান গলানোর চেষ্টা করত, ঝুনো চারারা চোখ গোল করে বলে দিত - এখানে রামচন্দ্র আর হনুমানের গল্প হচ্ছে, শোননি বুঝি বটঠাকরুণের মুখে! ঐ নাম শুনে নালিশকুটিরা দমে যেত, সে আমাদের কী এক নিষিদ্ধ মজা! কিন্তু পাঠশালায় ধরা না পড়লেও মায়ের কাছে ধরা খেলাম।- তোরা বটঠাকরুণের নাম নিয়ে ছলনা করিস?সেদিনও ছিল এক রামনবমী। বটঠাকরুণ বলে চলেন - বিশ্বামিত্র মুনি এসেছেন রামলক্ষ্মণকে নিয়ে যাবেন তাড়কা বধ করার জন্য। ছোট ছেলে রাক্ষসের সঙ্গে কীকরে যুদ্ধ করে, ভেবে কেউ কূলকিনারা পায়না, দশরথ কাঁদেন ভূমিতে পড়ে, অযোধ্যায় কত শোক, মা কৌশল্যা কাঁদেন, পুরবাসী কাঁদে, সবুজ গাছ, হলদে পাখি, বাগানের লাল ফুল কাঁদে, আমরা সজল চোখে দেখি সেই দৃশ্য। হঠাৎ তাল কেটে যায়, দেখি বেণু মা এককোণে দুই হাঁটুর মধ্যে থুতনি ডুবিয়ে অঝোর ধারায় কেঁদে চলেছে ঠিক যেন মা কৌশল্যার মত। থমকে যাই, বেণুমায়ের কি কিছু হারিয়ে গেছে? মায়ের কাছে শুনলুম, সেই যেবার পুব পশ্চিমের মাঝখানে পাঁচিল উঠল, এদিকের বন ওদিকে, ওপাশের জঙ্গল এপাশে - সব লন্ডভন্ড হয়ে গেল, ফুল ফল, পাখি, কাঠবিড়ালি, চারাগাছ, বড়গাছ যে যেখানে ছিল, সবার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেল, সেই সময়ে বেণুমা আর কোলের ছেলেকে বসিয়ে রেখে তার বর - 'একটু আসছি' বলে চলে গেল, আর ফেরেনি। ছোট্ট জীবন আমার, এত কষ্টের কথা আগে শুনিনি। আমার ভিতরটা আর্তনাদ করে, ওপরে নির্বাক।- তারপর?- কোনভাবে বটঠাকরুণ জানতে পেরে আশ্রয় দিয়েছেন।- সকলেই তো কষ্ট করেছে মা, শুধু বেণুমার কপালে এমন কেন হল?- শুধু বেণুদি কেন, এমন হয়েছে হাজারে হাজারে। বটঠাকরুণ নিজেই কতজনকে উদ্ধার করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই।মায়ের কথা শুনে মুখে আর কথা সরেনা আমার। কিছুক্ষণ পরে বললুম,- আর কাউকে চেনো এমন যাকে বটঠাকরুণ উদ্ধার করেছেন?- চিনতে হবে কেন? আমি নিজেই তেমন উদাহরণ।- মানে?- আমার বাবার সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝিতে দুঃখ কষ্ট সহ্যের অতীত হয়ে গেল। বাগবাজারের বনেদী প্রাসাদে বাবা আমাদের খাওয়া বন্ধ করে দিল। আমার মা তখন আমাদের দুইজোড়া ভাইবোনদের সঙ্গে নিয়ে অনেকদূরে অশোকবনে মানে অশোকনগরের উদ্বাস্তু কলোনিতে স্বেচ্ছানির্বাসন নিয়েছিল। পাঠশালা আসা বন্ধ হল। অভাব, অনটনে আনন্দের সব দরজা বন্ধ হল।- সেকী! তারপর?- বটঠাকরুণ যে আমাদের ভুলে যাননি, তিনি যে আমাদের খুঁজছেন তা জানতুম না।‌আমি নির্বাক।- দুবছর খোঁজাখুঁজির পর, তিনি আমাদের খুঁজে বার করেন। একটা একটা করে বন্ধ দরজা খুলে, পাঠশালা শেষ করিয়ে আমাকে পৌঁছে দেন মহাবিদ্যালয়ে, তারপর সংসারে - যেখানে তোকে পেলাম।‌আমার মনের ভেতর উথালপাথাল চলতে থাকে। বটঠাকরুণ নিজেই এক বাল্মীকি, তাই রামায়ণের গল্প এমন সজীব করে তুলতে পারেন। যা শুনলুম তার অর্থ হল যে, আমার এই ক্ষুদ্র অস্তিত্বটা বটঠাকরুণের কাছে ঋণী। দুঃখের মাঝেও মনে মনে হাসি, কপিলাবস্তুর সোনার পাঁচিলের বাইরে বেরিয়ে রাজপুত্র সিদ্ধার্থ রোগ, দুঃখ, জরা, মৃত্যু দেখেছিলেন। এমন প্রথম ধাক্কা সবার জীবনেই আসে। হ্যাঁ, সকলে বুদ্ধ হতে পারেনা ঠিকই, তবে বোধের উত্তরণ হয়। মা বলে চলেছিল, সব কথা কানে ঢুকছিলনা আমার। একটু শান্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলুম,- বটঠাকরুণ এত কাজ, এত ব্যস্ততার মধ্যেও এত শক্তি কোথায় পান গো মা?- কেন পাঠশালায় শুনিসনি - সত্যের জন্য সব কিছু ত্যাগ করা যায়, কোন কিছুর জন্যই সত্যকে ত্যাগ করা যায়না! বটঠাকরুণ সত্যকে ধরে আছেন, সেই তাঁর শক্তি। বড় থেকে ছোট কোন দুঃখই তাঁর অগোচরে থাকেনা। মনে নেই রাঙা আলোয় ঘর থেকে বেরিয়ে ছোট্ট চারা তুই চাঁদের আলোয় ঘরে ফিরতিস, তাই নিজেই তোকে ডেকে কেমন পাঠশালায় টেনে নিলেন! আর তোরা ওঁর নাম নিয়ে ছলনা করিস!মায়ের কথায় চমকে উঠি। ছলনা শব্দটা যে এতটা ধারালো আগে তা বুঝিনি। অনুতাপে দগ্ধ হয়ে যাই।‌ আমার পোড়া চেতনাটা টুকরো টুকরো হয়ে বটঠাকরুণের ঝুরির ঝিলিমিলি আলোর সঙ্গে মিশে ছড়িয়ে যায় মাঠ ঘাট বনবাদাড় পেরিয়ে পর্বতচূড়ায় শীতল হিমানীর উদ্দেশে।‌ পাঠশালা পেরিয়ে মহাবিদ্যালয়ে, মহাবিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংসারে। সত্যই শক্তি, শক্তি না পেলে বরফ গলে জল হয়না, জলকণা জুড়ে জুড়ে নদী হয়না। আমাকে নদী হতে হবে - আমি বটঠাকরুণকে কথা দিয়েছি। সুয্যদেবের উদয় থেকে অস্ত, আবার অস্ত থেকে উদয়, পৃথিবীটা এই চাকায় খালি ঘুরে মরে। আমি মায়ের মত চারাগাছেদের নদী করে তোলার কাজ নিয়েছি, আমার নিজের কোলেও কুঁড়ি ফুটেছে।‌ খুব ইচ্ছে করে কুঁড়ি কোলে নিয়ে একবার বটঠাকরুণের কাছে যাই। এত ইচ্ছে তবু পা সরেনা, শ্যাওলা, ঝাঁঝি জমিয়ে ফেলেছি বিস্তর, কেবল পিছন থেকে টেনে ধরে। একদিন সকালের হলুদ আলোয় তেমন চাঁপা ফুলের উজ্জ্বল রং ধরছিলনা, কেমন যেন মরা মরা, পাঁশুটে। আমি জানলা দিয়ে তাকিয়ে ছিলুম, এমন কেন হল? তখনই কে যেন খবর দিল, সুয্যদেব সাতরঙা সাতঘোড়ার রথে এসে বটঠাকরুণকে নিয়ে চলে গেছেন আকাশের ওপারে, তাই এখন পৃথিবীতে রং কম পড়ে গেছে। এতদিনের শেওলা ঝাঁঝি সরিয়ে, বনবাদাড় কেটে, শেয়ালকাঁটা, ফণিমনসা পেরিয়ে মাকে নিয়ে গেলাম পাঠশালায়।সেই আমার মাকে পাশে নিয়ে শেষবারের মত সবুজ দালানে দাঁড়ানো। পাঠশালায় কত ভিড়, তবু দশদিকে শুধু হুহু, খাঁ খাঁ। সেই ঝুরিগুলোর ঝিলিমিলি আলো নেই, কেবল তার একটা আভার রেশ মেখে চারদিক আলো আলো হয়ে আছে। এখন তো আর মাও নেই। আজকাল কীসব অচেনা গাছ এসেছে চারিপাশে, ছায়া দেয়না, ডালপালা নেই, ঝুরি নেই, পাতায় ছাউনি নেই, কেবল লম্বা ঢ্যাঙা লাঠি গাছ, মাথাটা বল্লমের ফলার মত সূঁচোলো। রামলক্ষ্মণের নামে সেই প্রীতির গল্পগুলো আজকাল আর কেউ বলেনা। আমার ভারি ভয় করে, ঘুম আসেনা। ও বটঠাকরুণ, লক্ষ্মীটি আর একবার রামলক্ষণের ভালোবাসার গল্প বলো আমায়, শুনতে শুনতে আমি ঘুমোই। ও বটঠাকরুণ! শুনতে পাচ্ছো? তুমি ফিরে এসো।‌ আমার বড্ড রোদ লাগছে।‌
    ফারাও-এর দেশে কয়েকদিন - ৩ - সুদীপ্ত | সারাদিনের বিমান-যাত্রা, মিশরের ঘোরাঘুরি (দু-দুটো মিউজিয়াম) সব মিলিয়ে শ্রান্তিতে রাতের ঘুম ভালো-ই হয়েছিল। প্রতিদিন আমাদের সব হোটেলেই সকালে ‘Wake up call’-এর ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। যদিও আমরা তার অনেক আগেই উঠে পড়েছি। হোটেলেই প্রাতঃরাশ সেরে ঠিক সকাল সাড়ে সাতটায় আমরা বাসে উঠে বেরিয়ে পড়লাম আলেকজান্দ্রিয়া-র উদ্দেশ্যে। আলেকজান্দ্রিয়া থেকে ফেরার পথে আমরা গিজার লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো দেখে ফিরবো। আলেকজান্দ্রিয়া যেতে সময় লাগবে তিন ঘন্টা, মাঝে ব্রেক দেওয়া হবে ঘন্টা দুয়েক পর। বাসে উঠে আজ সবাইকে এক এক করে পরিচয় দিতে হল, যদিও সকলের সঙ্গে এর মধ্যেই আলাপ হয়ে গেছে ভালোই।  বাস থেকে কায়রোর দৃশ্য দেখতে দেখতে এবার তাহলে মিশরের দেবদেবীদের গল্প বলে নেওয়া যাক কিছুটা। আমাদের মতো তেত্রিশ কোটি দেবতা নয় বটে, প্রাচীন মিশরের দেবদেবী কম করে হলেও খান পঞ্চাশ! যদিও বহুল প্রচলিত দেবদেবী হাতে গোনা। আর গল্পগুলো শুনলে ছোটোবেলায় শুকতারায় পড়া নন্দলাল ভট্টাচার্যের পুরাণের গল্প মনে পড়ে, যেখানে দেবতারাও আমাদের মতোই মাটির মানুষ, রাগ-দ্বেষ- প্রেম-প্রীতি-ঈর্ষা-লড়াই সবই আছে।  তবে এই সমস্ত তিন হাজার বছরের প্রাচীন দেবদেবী আর তাঁদের পুজোপাঠ ৫০০ থেকে ৬০০ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যে খ্রীষ্ট আর ইসলাম ধর্মীয় শাসকদের আগ্রাসন আর নিষেধাজ্ঞায় মোটামুটি উঠে যায়। শেষ দেবী আইসিসের মন্দিরটি ছিল আসোয়ান-এর ফিলে টেম্পল, সেটিকেও বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমান মিশরের প্রধান ধর্ম ইসলাম আর ভাষা হলো আরবীয়। এবার আসা যাক দেবদেবীদের কথায়। মিশরের সৃষ্টিকর্তা দেবতা হলেন আতুম, আমাদের পুরাণে যেমন ব্রহ্মা! এই আতুমের আবার দুই যমজ ছেলে-মেয়ে (শুধু পিতার ঔরসে কিভাবে জন্মালেন এঁরা  সেসব জিগ্যেস ক’রে বিব্রত করবেন না, ওসব বায়বীয় জন্মের গপ্পো দেশে-দেশে ছড়িয়ে আছে) – শু আর তেফনুত। শু হলেন বাতাসের দেবতা আর তেফনুত জলের দেবী। শু আর তেফনুত-এর সন্তানেরা হলেন পৃথিবীর দেবতা গেব আর আকাশের দেবী নুত।  প্রাচীন মিশরে (এবং এখনো) ভাই-বোনের মধ্যে বিবাহ প্রচলিত আছে বংশের রক্ত শুদ্ধ রাখা ইত্যাদি কারণে। দেবী নুত-এর একটি ছবি খুব-ই প্রচলিত এবং অধিকাংশ ফারাওদের সমধির মূল গর্ভগৃহের ছাদে এবং কফিনের উপরের আবরণের ভিতর দিকে এই অলংকরণ দেখা যায়, কারণ তাঁকে মৃতের রক্ষাকর্ত্রী বলে মনে করা হয়। ছবিতে দেবী নুত পুরো আকাশ জুড়ে থাকেন নগ্ন শরীরে, তাঁর শরীর জুড়ে থাকে অসংখ্য তারা, যেহেতু তিনি আকাশের দেবী আর ভিন্নমতে তারাদের জন্মদাত্রী। তাঁর নীচে থাকেন গেব, ঠিক যেমন আকাশ ছেয়ে থাকে পৃথিবী-কে। নুতের দুই হাত আর দুই পা ছুঁয়ে থাকে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম দিক। এইবার মজার ঘটনা হলো, সূর্যের দেবতা রা (পরে আমুন বা একত্রে আমুন-রা), যাঁকে নুতের-ই সন্তান বলে ভাবা হয়, তাঁকে নুত প্রতিদিন ভোরবেলায় প্রসব করেন, অতএব সূর্যোদয় হয়, আর সন্ধ্যেয় গিলে ফেলেন, ফলে সূর্যাস্ত হয়। জন্মের পর রা ‘আতেত’ নামে একখানি নৌকায় নুতের শরীর বরাবর নীলনদ বেয়ে চলতে থাকেন দুপুর পর্যন্ত, আবার দুপুরের পর ‘সেখতেত’ নামের এক নৌকায় ফিরে আসেন নুতের কাছে, আর গপ করে নুত তাঁকে গিলে ফেলেন। তবে দৈনিক গিলে ফেলা আর প্রসব করার এই মূল গল্পটুকু নুত-সম্পর্কিত এই ছবির উপপাদ্য হলেও আরও অনেক ভাবে ছবিটি আঁকা হয় আর ব্যাখ্যা করা হয় সম্পাদ্য হিসেবে। গেব আর নুত-এর চার সন্তান, দুই ছেলে আর দুই মেয়ে – ওসাইরিস (ছেলে), আইসিস (মেয়ে), সেথ (ছেলে), নেফথিস (মেয়ে)। ওসাইরিস-এর সঙ্গে বিয়ে হয় আইসিস-এর আর সেথ-এর সঙ্গে বিয়ে হয় নেফথিস-এর। কিন্তু সেথ-এর আবার পছন্দ ছিল আইসিস-কে। অতএব আদিম রিপুর তাড়নায়, ঈর্ষান্বিত সেথ একসময় হত্যা করলেন তাঁর বড়দা ওসাইরিস-কে এবং দেহটাকে টুকরো টুকরো করে কেটে দেহাংশগুলো লুকিয়ে ফেললেন! সিংহাসন দখল করে পেতে চাইলেন আইসিস-কে। বেচারী আইসিস সেথ-কে প্রত্যাখ্যান করে মনের দুঃখে বেরিয়ে পড়েন ওসাইরিস-এর দেহাংশ খুঁজতে। অনেক বছর-মাস ধরে সেসব টুকরো খুঁজে খুঁজে জোড়া লাগিয়ে জাদুবলে ওসাইরিসের দেহে প্রাণসঞ্চার করেন। ওসাইরিস-কে বলা হয় মিশরের প্রথম ফারাও, কিন্তু মৃত্যুর পর বেঁচে উঠলেও তিনি ফিরে না এসে থেকে যান মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের দেবতা হয়ে। মামিফিকেশনের পর তাই ওসাইরিসের (আমাদের যমরাজ যেমন) সামনেই মৃতের হৃদপিন্ডের ওজন করেন আনুবিস আর বিচার করা হয় পাপ-পুণ্যের, চিত্রগুপ্তের মতো খাতায় সেসব লিখে রাখেন দেবতা থথ।ওসাইরিস তো বেঁচে উঠলেন, এদিকে তাঁর আর দেবী আইসিসের এক ছেলে জন্ম নিল, হোরাস। মিশরের সব ফারাও হোরাসের মানসপুত্র, যুদ্ধ আর শিকারের দেবতা। এঁর মুখ আঁকা হয় বাজপাখির আদলে। হোরাস জন্ম নিয়ে শুনলেন সেথ-এর অপকর্মের কথা, ফিরে এসে সিংহাসন দাবী করে শুরু করলেন ভীষণ যুদ্ধ সেথ-এর সঙ্গে।  যুদ্ধের ফাঁকেই হোরাসের চোখ উপড়ে নিলেন সেথ, পরে দেবী হাথোর এসে সেই চোখ (এই সেই বিখ্যাত ‘হোরাসের চোখ’) সারিয়ে তুললেন। এরপর আর-ও অনেক যুদ্ধবিগ্রহ, জয় পরাজয়ের পর শেষে হোরাসের জয় হলো আর ফিরে পেলেন সিংহাসন। সেথ হয়ে গেলেন হিংসা, মুরুভূমি আর ঝড়ের দেবতা। আইসিস পূজিত হলেন হলেন আদর্শ মাতা আর বধূরূপী দেবী হিসেবে। হাথোর ছিলেন দেবতা হোরাসের পালিকা মা, আবার কেউ বলেন তিনি ছিলেন হোরাসের পত্নী। হাথোর হলেন ভালোবাসা, যৌনতা এবং মাতৃত্বের দেবী। আরও অনেক দেবতা আছেন, যেমন সিংহ-মুখী দেবী সেখমেত (দেবতা পিতাহ-র স্ত্রী এবং যুদ্ধ, শত্রুনাশের দেবী), শকুন-মুখী দেবী নেখবেত, কুমীর-মুখধারী সোবেক বা আইবিস-মুখধারী থথ, বা বেবুন-মুখধারী হাপি এমন অনেক। আর দেবতাদের রাজা ভেড়া-মুখধারী আমুন-রা তো আছেন-ই। আবার পরে না-হয় এঁদের কারও কারও পরিচয় দেওয়া যাবে। বাসে যেতে যেতেই চোখে পড়ল কায়রো টাওয়ার আর সুন্দর স্থাপত্যের কিছু মসজিদ। কায়রো ছাড়ার আগে আমরা পার হলাম ‘6th October Bridge’। এই সেতুটি প্রায় একুশ কিলোমিটার দীর্ঘ আর নীলনদকে দুবার পার হয়, মাঝে পড়ে গাজিরা দ্বীপ। এছাড়া চোখে পড়ল মুকাত্তাম (বা মুকাদ্দাম) পাহাড়। এই পাহাড় থেকেই নাকি পিরামিড বা মন্দির তৈরীর চুনাপাথর বা লাইমস্টোন কেটে নিয়ে যাওয়া হতো। আমাদের বাস ছুটে চলেছে মরুভূমির মধ্যে একফালি রাস্তা দিয়ে। দুপাশে বালির মধ্যে দূরে খেয়াল করলে মরীচিকা সহজেই চোখে আসে। মাঝে মধ্যে ছোটো একটা দুটো গ্রাম, খান দশ-কুড়ি বাড়িঘর, কোনো কোনো জায়গায় মরুভূমির মধ্যেই জলের ব্যবস্থা করে বানানো ফলের আর সব্জীর ক্ষেত; ঘন্টা দুয়েক পর থামা হলো কফি ব্রেক নিতে। এরপর বাস যত এগোতে শুরু করলো আবহাওয়া পালটে যেতে থাকলো, আকাশে মেঘের আনাগোনাও বেড়ে গেল। শীতকাল মিশরের খুব আরামদায়ক সময় হলেও আলেকজান্দ্রিয়ায় এটি ঘোর বর্ষাকাল। তবে সমুদ্রের তীরে হওয়ায় সবসময়েই ফুরফুরে হাওয়া আর মেঘ-বৃষ্টিও এই আছে, এই নেই। আলেকজান্দ্রিয়ায় শহরে ভিতর ঢুকতেই মনে হলো বড়বাজার বা কলুটোলার রাস্তায় ঢুকে পড়েছি, রীতিমতো ট্রাম, অটো সবই চলছে, জায়গায় জায়গায় খানা-খন্দ, জমে থাকা বৃষ্টির জল পেরিয়ে হাঁটাহাঁটি, ভাঙাচোরা পুরনো বাড়িঘর, ঘিঞ্জি দোকানপাট; এর মধ্যে দিয়েই আমাদের বাস চলেছে, বাসে পুলিশ তো আছেই, মাঝে মধ্যে সামনের রাস্তাও পুলিশের গাড়ি হুটার বাজিয়ে এসে খালি করে দিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে হালকা বৃষ্টিও শুরু হয়েছে। তার মধ্যেই আমরা এসে পৌঁছোলাম  ক্যাটাকম্ব-এ, যার নাম ‘ক্যাটাকম্ব অব কম-এল-শোকাফা’। কায়রো টাওয়ার কায়রোর রাস্তাঘাট - আমরা চলেছি ৬ই অক্টোবর সেতুর উপর দিয়ে  আলেকজান্দ্রিয়া না কলুটোলা - ধরতে পারবেন না!  আলেকজান্দ্রিয়া – ৩৩২ খ্রীষ্টপূর্ব – ম্যাসিডোনিয়ার সম্রাট তৃতীয় আলেকজান্ডার (ওরফে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট) পারস্য জয় করে আজকের গাজা পার হয়ে এসে ঢুকে পড়লেন মিশরে। পারস্যের অত্যাচার আর লুন্ঠন থেকে বাঁচতে মিশর-ও বাধ্য হয়ে বেছে নিল ‘লেসার ইভিল’ আলেকজান্ডারকে (যদিও তাঁর দিগবিজয়ে যাঁরা বাধা দিয়েছেন তাঁদের উপর অত্যাচারের কোনো মাত্রা রাখেননি , পুরু বা পোরাসের গল্প সত্যি ইতিহাস কিনা তা নিয়ে আজকের দিনে ধন্দ আছে) , তায় আবার যুদ্ধবিগ্রহে তিনি মিশরের প্রাচীন ফারাওদের মতো-ই পারদর্শী!  তার উপর প্রথমেই মিশরে এসে তিনি দেখতে চাইলেন ‘এপিস বুল’-কে এবং সম্মান জানালেন! ব্যস, মিশরীয়রা মুগ্ধ, নির্ঘাৎ সেই প্রাচীন যুগের-ই কোনো মহান ফারাও এসে গেছেন তাঁদের রক্ষা করতে। সুতরাং নীলনদের উপত্যকা সহজেই বিনা বাধায় ম্যাসিডোনিয়ান সাম্রাজ্যের আওতায় এসে গেল। কিন্তু আলেকজান্ডার আরও উত্তরে গেলেন হোমারের ওডিসি-তে পড়া ফারোস দ্বীপের সন্ধানে, পেলেন এবং তাঁর নিজের নামে একটি শহর স্থাপন করলেন ,  ব্যবসা-বাণিজ্য আর ভূমধ্যসাগরীয় দ্বীপ আর রাজ্যগুলিতে যাতায়াতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকারী স্থান হিসেবে। শোনা যায় বহু আগে দ্বিতীয় রামেসিস ক্রীট দ্বীপের সঙ্গে বাণিজ্যিক স্বার্থে এখানে একটি বন্দর স্থাপন করেছিলেন তবে তারপর সেসব সূত্র ক্ষীণ হয়ে যায়। আলেকজান্ডার যদিও কয়েক মাসের মধ্যেই আবার দিগবিজয়ে বেরিয়ে পড়লেন; এরপর তাঁর অকালমৃত্যুর পর মিশরের দায়িত্ব নিলেন তাঁর এক সেনাপতি সোতার, তিনি হলেন প্রথম টলেমি, শুরু হলো টলেমিক যুগ; মিশরের প্রাচীন ধর্ম ইত্যাদি পারস্যের দখলদারীতে অনেকটাই ভেঙে পড়েছিল, টলেমিক যুগ এসে তাকে কিছুটা ফিরিয়ে এনে খানিক গ্রীক আর রোমান ধর্মবিশ্বাস মিলিয়ে দিল। এতে মিশরীয়দের কিছুটা মন জয়-অ করা হলো। চলল টলেমি রাজাদের রাজত্ব পরের শ-তিনেক বছর। আর আলেকজান্দ্রিয়ার সঙ্গে জুড়ে আছে জুলিয়াস সীজার, মার্ক অ্যান্টনি আর ক্লিওপেট্রার নাম। ক্লিওপেট্রা (সপ্তম ক্লিওপেট্রা) নিয়ে লোকজন যতটা হৈ চৈ করে থাকে প্রকৃত প্রস্তাবে তেমন সুন্দরী তিনি ছিলেন বলে শোনা যায় না, কিন্তু তাঁর যৌন আবেদন এবং কূটবুদ্ধি ছিল অনবদ্য, যা তিনি কাজে লাগিয়েছিলেন, সিজার থেকে মার্ক অ্যান্টনি সবার ক্ষেত্রেই। আর নিজেকে সর্বদা রেখেছিলেন সহ-শাসক করে, ত্রয়োদশ(ভাই), চতুর্দশ (ভাই – এঁকে ক্লিওপেট্রা নিজেই হত্যা করান), পঞ্চদশ (সিজারের ঔরসে পুত্র সিজারিয়ন) টলেমির সঙ্গে নিজের পদাধিকার অক্ষুণ্ন রেখে। ক্লিওপেট্রার গল্প সর্বজনবিদিত, সে এখানে বিস্তারিত বলব না।  শুধু এটুকু বলি ,  পরবর্তীকালে অক্টাভিয়ান আলেকজান্দ্রিয়া এবং মিশরের আধিপত্য দখল করলে ক্লিওপেট্রা বিষপান করেন এবং সে-খবর শুনে মার্ক অ্যান্টনি আত্মহত্যা করেন, এবং দুজনকেই একসাথে সমাহিত করা হয়। কিন্তু সেই সমাধি আজও খুঁজে পাওয়া যায় নি, মনে করা হয়, হয়ত আলেকজান্দ্রিয়াতেই আছে কোথাও লুকিয়ে অথবা স্থান পেয়েছে সমুদ্রের অতলে।ক্যাটাকম্ব হলো মাটির নীচে থাকা একধরণের সমাধিক্ষেত্র। নামার রাস্তা সরু সিঁড়ি দিয়ে হলেও, নীচে নামার পর চারদিক দিয়ে প্রশস্ত সুড়ঙ্গ আর প্রতি সুড়ঙ্গের দুপাশে খোপ কেটে তৈরী করা সারি সারি চৌকো গর্ত, এই গর্তগুলি-তেই রেখে দেওয়া হতো মৃতদেহের মমি। তবে এই ক্যাটাকম্ব ভ্যালি অব দ্য কিংস-এর মতো সমাধিক্ষেত্র নয়, এগুলো অনেকটা রোমান ধাঁচের। আবার এতে গ্রীক আর প্রাচীন মিশরীয় ধারার কারুকার্য-ও রয়েছে। প্রথমে ক্যাটাকম্বের চত্বরে ঢোকার পরেই রয়েছে কয়েকটি সার্কোফেগাস যার কারুকার্যে গ্রীক-রোমান প্রভাব স্পষ্ট। তারপর একটি সান-ডায়াল বা সূর্যঘড়িও রাখা রয়েছে। এরপর ক্যাটাকম্ব। এটির গভীরতা প্রায় ৩৫ মিটার। আর নীচে তিনটি স্তর বা তল আছে। উপর থেকে দেখতে এটি কুয়োর মতোই, নীচে প্রতি স্তরে প্রশস্ত জানলা করা আছে। উপর থেকে দড়ি দিয়ে মমি নামিয়ে দিলে নীচের ওই জানলা দিয়ে নিয়ে নেওয়া হতো, তারপর চালান করে দেওয়া হতো সমাধি-কক্ষের নির্দিষ্ট গর্তে। এই ক্যাটাকম্ব-টি বহুকাল আগেই হারিয়ে গিয়েছিল। ১৯০০ সনে হঠাৎ এক সুন্দর দিনে একটি গাধা কোনোকারণে এই ধ্বংসাবশেষের উপর এসে পড়ে আর একেবারে ক্যাটাকম্বের গর্তে পপাত চ! সেখান থেকেই বেরিয়ে পড়ে এই জায়গাটি। কম-এল-শোকাফা নামটি এসেছে আসলে মাটির হাঁড়ি-কুড়ির স্তূপ থেকে। যেহেতু এটি ছিল সমাধিক্ষেত্র, যাঁরা মমি নিয়ে আসতেন এখানে সমাধিস্থ করার জন্যে বা সমাধিস্থ ব্যক্তি-কে শ্রদ্ধা জানাতে, আর সঙ্গে আনতেন মাটির পাত্রে খাবার-দাবার, খাওয়ার পর সমাধিক্ষত্র থেকে আর সেসব ফিরিয়ে নিয়ে না গিয়ে এখানেই ফেলে যেতেন, ঐ আমাদের শ্মশানযাত্রীরাও যা করে থাকেন। সেসব জমে গিয়েই স্তূপ হয়ে গিয়েছিল, আর তা থেকেই এই নাম। নীচে সেই খাবার জায়গা বা ডাইনিং হল-ও রয়েছে। মূল সমাধিক্ষেত্রের গর্ভগৃহে ঢোকার মুখে দুপাশে দুই রোমান পুরুষ ও নারীর মূর্তি, মনে করা হয় এঁরাই হলেন এই ক্যাটাকম্ব-এর স্থপতি এবং তাঁর স্ত্রী, পুরুষ মূর্তির দেহে মিশরীয় পোষাক হলেও চুলের আকার রোমান্দের মতোই। প্রবেশদ্বারের মাথায় দুপাশে ডানা ছড়িয়ে বাজপাখি অর্থাৎ হোরাস,  দুপাশে দাড়িওয়ালা সাপ, তার মাথায় ফারাও-এর মুকুট, ইনি হলেন গ্রীক দেবতা অগাথোডেমন (মিশর ও গ্রীসের জগাখিচুড়ি ধর্মীয় প্রভাবের ফল), তাঁর উপরে স্বয়ং মেডুসা রাগী চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছেন প্রবেশকারীদের দিকে। এরপর দেওয়ালে ছবি এপিস বুলের, তাকে গলায় নেকলেস-সহ হার (পেকটোরাল) পরিয়ে দিচ্ছেন স্বয়ং ফারাও, আর একদিকে রয়েছেন দেবী মাত। আর একটু এগিয়ে গেলে মূল সমাধিকক্ষ, তার দরজার দুপাশে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং আনুবিস। ঢুকেই দেওয়ালে অসাধারণ একটি ছবি। দেবতা ওসাইরিসের মামিফিকেশন করছেন আনুবিস, দুপাশে দাঁড়িয়ে হোরাস (বাজ-মুখী) আর থথ (আইবিস-মুখী)। এই ঘর থেকেই শুরু হয়ে যায় সারি দিয়ে সমাধির গর্ত, একটি-দুটির পাথরের আবরণ এখনো আছে, বাকি সবই খোলা। বেশ গা ছমছমে ব্যাপার, ভাবছিলাম সব আলো যদি কখনো নিভে যায় আনুবিস কি এসে দেখা দেবেন? তবে তার আগেই সামাহ আমাদের ডেকে নিয়ে দেখাতে থাকলো যেখান দিয়ে সেই হতভাগ্য গাধা নীচে পড়ে গিয়েছিল, তারপর আমাদের নিয়ে গেল আর একটি প্রশস্ত হলঘরে যেখানে একটি কাচের বাক্সে রাখা রয়েছে অসংখ্য হাড়গোড়, এসব নাকি মানুষ আর ঘোড়ার হাড়। রোমান সেনাপতি বা সর্বাধিনায়ক কারাকাল্লা (মার্কাস অরেলিয়াস) এখানে বহু আলেকজান্দ্রিয়ার মিশরীয় বাসিন্দাদের (সম্ভবতঃ সম্রাটকে নিয়ে উপহাস-মশকরায় কোনোভাবে লিপ্ত হয়েছিলেন তাঁরা), তাদের পোষ্য ঘোড়া ইত্যাদি সব একত্রিত করে নৃশংসভাবে হত্যা করেন, এসব হাড় নাকি সেই হত্যালীলার নিদর্শন। তবে ঘোড়ার হাড়গুলো কোনো যুদ্ধক্ষেত্র থেকেও এসে থাকতে পারে, এ-ব্যাপারে দ্বিমত আছে। ক্যাটাকম্বের বাইরে রাখা সারকোফেগাস আধ-ভাঙ্গা সান-ডায়াল আর স্ফিঙ্কস ক্যাটাকম্ব  ক্যাটাকম্বে নামার শুঁড়িপথ  সমাধিস্থল নীচে  সমাধিক্ষেত্রের প্রথম প্রবেশদ্বারে অগাথোডেমন আর মেদুসা  ক্যাটাকম্ব-এর স্থপতি  হাড়মালা ছাড়ো,ফুলোমালা পরো ... গর্ভগৃহের দরজায় আনুবিস  ওসাইরিসের মামিফিকেশন করছেন আনুবিস, সঙ্গে আছেন হোরাস ও থথ  (বুক অব দ্য ডেড-এর পাতা থেকে) ঘোড়া আর মানুষের হাড়গোড় ক্যাটাকম্ব থেকে বেরিয়ে এসে এবার আমরা চললাম রোমান অ্যাম্ফিথিয়েটার দেখতে, যাওয়ার পথে বাস থেকেই দেখলাম পম্পেই-এর পিলার, এটির সঙ্গে পম্পেই-এর কোনো সম্পর্ক নেই, এটি রোমান সম্রাট ডায়োক্লেশিয়ান-এর আলেকজান্দ্রিয়া জয়ের স্মারক একটি বিজয়-স্তম্ভ, যেটি বানানো হয়েছিল আনুমানিক ৩০০ খ্রীষ্টপূর্বে। এখানে আমরা নামি নি। বৃষ্টি এতক্ষণ ধরে এসেছিল, আবার শুরু হলো। আর তেমনি সরু রাস্তায় ঢুকে পড়লো বাস। সঙ্গে সঙ্গে হুটার বাজিয়ে পুলিশের গাড়িও এসে গেল। যা ট্রাফিক জ্যাম দেখেছিলাম, পুলিশ না থাকলে বা একা প্ল্যান করলে ওই গেরো থেকে সময়-মতো বেরিয়ে আসা একেবারেই অসম্ভব হতো! এখানে এক অদ্ভুত জিনিস দেখলাম, যত ছোটো ছোটো ব্যক্তিগত গাড়ি দেখছি সবই দেখি  মার্সিডিজ বা অডি বা ওই গোত্রের। সামাহ বলল তার কোনো মানে নেই, এখানে প্রচুর ছোটো ছোটো কারখানা আছে যেখানে গাড়ির বিভিন্ন ব্র্যান্ডের বিভিন্ন অংশ বা যন্ত্রাংশ জুড়ে দিয়ে অভিনব গাড়ি বানিয়ে দিয়ে দেয়। মানে আমি একটা গাড়ি বানালাম, যার পশ্চাদ্দেশ হল অডি, ইঞ্জিন হল মার্সিডিজের, সামনের বনেট হলো ফোর্ডের, এইরকম সব। আর সত্যি দেখি সার দিয়ে সেরকম অর্ধেক গাড়ির অংশ রাখা রয়েছে, এক এক ব্র্যান্ডের! কি কান্ড! বিস্ময় কাটতে না কাটতেই এসে হাজির হলাম রোমান থিয়েটারের দরজায়। পম্পেই-এর পিলাররোমান থিয়েটার – কম-এল-ডিকা – তৈরী হয়েছিল আনুমানিক তৃতীয় বা চতুর্থ শতকে। এটি সম্পূর্ণ রোমান শিল্পকলার নিদর্শন, দূরদূরান্তেও মিশরের কোনোকিছুর সঙ্গে খাপ খায় না। ভিতরে রয়েছে একটি মুক্তাঙ্গন থিয়েটার, তার চারপাশ দিয়ে ধাপে ধাপে বসার জায়গা, বসার জায়গা-গুলো সবই মার্বেল পাথরের আর তার গায়ে আজও নম্বর লেখা আছে দেখা যায়। গান-বাজনা, বিতর্ক, মল্লযুদ্ধ, আলোচনা ইত্যাদির জন্যেই এই অ্যাম্ফিথিয়েটার-টি ব্যবহার হতো।  এখান থেকে প্রশস্ত পথ ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলে রোমান বাথ-এর জায়গা। লাল ইঁট দিয়ে তৈরী সারি সারি কৃত্রিম জলাশয়ের  ধ্বংসাবশেষ। এগুলোর কোনোটা ছিল গরম জলের জন্যে নির্দিষ্ট, কোনোটা ঠান্ডা জলের। অর্ধভগ্ন কয়েকটি স্তম্ভ এখনো দাঁড়িয়ে আছে ভূমিকম্পে বার বার এলাকাটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরেও। আর বাকি পাথর, মাটি ছেয়ে গেছে মসৃণ ঘাসজমিতে, কোথাও কোথাও জংলী ফুলও উঁকি মারছে এদিক-ওদিক। কম-এল-ডিকা থেকে বেরিয়ে এবার আমরা চললাম ভূমধ্যসাগরের তীরে, সেখানেই আমরা আজ মধ্যাহ্নভোজ সারবো অ্যাথিনিওস নামে একটি গ্রীক রেস্তোঁরায়।  কম-এল-ডিকার দৃশ্য  রঙ্গমঞ্চ রোমান বাথ ভূমধ্যসাগর দেখতে দেখতে মধ্যাহ্নভোজন সেরে রাস্তা পার হয়ে আমরা বাইরে থেকে দেখলাম কাইত-বে দুর্গ (সিটাডেল অব কাইত-বে , পঞ্চদশ শতকে সুলতান কাইত-বে নির্মিত), এটি ফারোস দ্বীপের উপরেই; এই দুর্গের এলাকাতেই  নাকি ছিল আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত লাইটহাউজ, যা তৈরী হয়েছিল দ্বিতীয় টলেমি ফিলাদেলফিয়াস-এর রাজত্বকালে, ২৮০ খ্রীষ্টপূর্বের আশেপাশে। এর উচ্চতা ছিল প্রায় একশো মিটারের কাছাকাছি। তিনটি তলে বিভক্ত এই লাইটহাউজ উপর্যুপরি ভূমিকম্পে অনেকাংশে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিশেষতঃ উপর দিকের অংশটি ভেঙে পড়ে। পড়ে শোনা যায়, বাইজেন্টাইন সম্রাট আবিদ-আল-মালিক-এর চক্রান্তে রটিয়ে দেওয়া হয় এই লাইটহাউজের নীচে গুপ্তধন আছে। অতএব সম্মিলিত খোঁড়াখুঁড়ির ফলে একসময় পুরো লাইটহাউজ-টি ভেঙে পড়ে। লাইটহাউজের একেবারে মাথায় বসানো ছিল জিউস আর পোসেইডনের মূর্তি, পরে সমুদ্রের তলদেশ থেকে পোসেইডনের মূর্তিটি খুঁজে পাওয়া যায়। ভূমধ্যসাগর - একেবারে ডানদিকে দূরে দেখা যাচ্ছে সিটাডেল অব কাইত-বে,যেখানে ছিল লাইটহাউস কাইত-বের দুর্গ এবার আমরা চললাম আলেকজান্দ্রিয়া-র অন্যতম আকর্ষণ সুবিখ্যাত গ্রন্থাগার দেখতে। বিবলিওথেকা আলেকজান্দ্রিয়া অর্থাৎ আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগার। কিন্তু এটি নবনির্মিত। মূল গ্রন্থাগারটি আনুমানিক ৩০০ খ্রীষ্টপূর্বে দ্বিতীয় টলেমির রাজত্বকালে ডিমিট্রিয়াস-এর তত্ত্বাবধানে নির্মাণ করা হয়। এর সংগ্রহে ছিল প্রায় দুই লক্ষ বই, স্ক্রোল ইত্যাদি। পরে ৪৮ খ্রীষ্টপূর্বে জুলিয়াস সীজার আলেকজান্দ্রিয়া অবরোধ করলে, তীরবর্তী মিশরীয় জাহাজগুলিতে আগুন লাগানোর নির্দেশ দেন। সেই আগুন শহরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং গ্রন্থাগারেও ভয়াবহ আগুন লেগে বহু বই, স্ক্রোল, অন্যান্য লিখিত তথ্যাদি, পুড়ে নথি নষ্ট হয়ে যায়। এরপরেও গ্রন্থাগারটিকে আবার গড়ে তোলা হয়, সংগ্রহ বাড়িয়ে তোলা হয় নানা উপায়ে। কিন্তু ক্লিওপেট্রার সময়ের পর থেকেই এই গ্রন্থাগার আবার বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যেতে থাকে এবং সম্ভবতঃ খলিফা উমর-এর নির্দেশে শেষ পেরেকটি পুঁতে দেওয়া হয় এই গ্রন্থাগারের কফিনে বাকি সব বই আর স্ক্রোলগুলিকে আগুনে পুড়িয়ে বিনষ্ট করে। সুতরাং এখন আমরা যে গ্রন্থাগার দেখছি এটি সেই কুলীন প্রাচীন গ্রন্থাগারটি নয়, তা হারিয়ে গেছে কালের অতলে। নতুন গ্রন্থাগারটির নির্মাণের ভাবনা শুরু হয় ১৯৭৪ সন থেকে আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে, সঙ্গে ইউনেস্কো আর রাষ্ট্রসংঘ সাহায্য করে আর নির্মাণের পর গ্রন্থাগারটি খুলে দেওয়া হয় ২০০২ সনে। এর আকার সমুদ্রের দিক থেকে দেখলে একটি উদীয়মান সূর্য। কিছুটা বোঝা গেলেও আমাদের সমুদ্রের দিক থেকে দেখার উপায় ছিল না। ভিতরে শুধু পড়ার জায়গাটুকুই প্রায় ২০০০০ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে। এগারোটি তল জুড়ে কত যে বই থরে থরে সাজিয়ে রাখা, আর প্রচুর পড়ার টেবিল, কোথাও কোথাও কম্প্যুটার বসানো রয়েছে, প্রয়োজন-মতো ব্যবহারের জন্যে। আমরা বিভিন্ন অলিন্দে ঘুরে ঘুরে উপর-নীচ করে বই দেখতে শুরু করলাম, চেনা নামও দেখে ফেললাম বেশ কিছু। আর কে নারায়ণের বইগুলো দেখে বেশ ভালো লাগলো।  এই গ্রন্থাগারে মূলতঃ আরবী, ইংরাজী আর ফ্রেঞ্চ ভাষার বই-এর সংগ্রহ রয়েছে।  গ্রন্থাগারটি ছটি বিভাগে বিভক্ত – কলাবিভাগ ও মাল্টিমিডিয়া, দৃষ্টিহীনদের জন্যে বিভাগ, শিশু বিভাগ, তরুণদের বিভাগ, মাইক্রোফর্ম এবং সবশেষে দুষ্প্রাপ্য সংগ্রহ। আমরা প্রথম তিনটি বিভাগ ঘুরে দেখলাম। এত সুন্দর পরিবেশ আর ব্যবস্থা, আমাদের সকলের বাড়িতেই এর একটা ক্ষুদ্র সংস্করণ থাকলে বেশ হতো! অবশ্য যা আছে তাই বা ধুলো ঝাড়ার  আর গুছিয়ে রাখার সময় মেলে কই! বেরিয়ে আসার আগে স্যুভেনির হিসেবে সংগ্রহ করে নিলাম খান চারেক বুকমার্ক, বিবলিওথেকা আলেকজান্দ্রিয়ার স্মৃতি। এখানে চারটি প্রদর্শনীশালাও আছে, তবে আমরা সময়ের অভাবে যাই নি সেখানে। গ্রন্থাগারের ঠিক উল্টোদিকেই রয়েছে আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি প্রবেশদ্বার। সেখান থেকেই আমাদের ফিরে আসার পর্ব শুরু হলো আলেকজান্দ্রিয়া-কে বিদায় জানিয়ে। এখান থেকে আমরা সোজা চলে যাবো গিজায়, সেখানে দেখবো লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো, সঙ্গে প্যাপাইরাস ফ্যাক্টরি। বিবলিওথেকা আলেকজান্দ্রিয়া  গ্রন্থাগারের ভিতরের দৃশ্য - বই পড়ুন ও পড়ান  গ্রন্থাগার চত্বরে - আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট 
  • জনতার খেরোর খাতা...
    ছিন্ন শিকল পায়ে নিয়ে... - Pradhanna Mitra | অক্টোবর ১: গতকাল, ৩০শে সেপ্টেম্বর ১৮৭৬, সকাল এগারোটার কয়েক মিনিট বাদে মস্কো থেকে আগত মারিয়া বরিসভা নামে এক দরজি বিশ নম্বর গালেরনায়া স্ট্রীটের ছয়তলা উঁচু অভ্‌সিয়ান্নিকভ হাউসের চিলেকোঠার জানলা থেকে নিচে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে। ... আত্মহত্যার সময়ে বরিসভার দু-হাতে মেরি-মাতার আইকন ধরা ছিল। (জনৈক সংবাদপত্রে প্রকাশিত কলামের অংশবিশেষ)    দস্তয়েভস্কির মতে, এটি ‘বিনীত, বিনম্র আত্মহননের এক অভূতপূর্ব নিদর্শন’। তিনি লিখছেন, “এখানে দেখাই যাচ্ছে, কোনও কাতরোক্তি বা কারও বিরুদ্ধে কোনও অনুযোগ --- এসবের কিছু নেই। স্রেফ বেঁচে থাকাটাই তার পক্ষে দুর্বিসহ হয়ে উঠেছিল। ‘ঈশ্বর তা চানও নি’ --- তাই সে মারা গেল, প্রার্থনা করতে করতেই মারা গেল। কিন্তু কিছু ব্যাপার আছে যেগুলি দেখতে যত সাধারণ-ই হোক-না-কেন, তা নিয়ে দীর্ঘক্ষণ চিন্তা না করে পারা যায় না। সেগুলি আপনার চোখের সামনে এমনভবে দাঁড়িয়ে থাকবে যেন আপনি নিজেও তার জন্যে দায়ী। এই বিনম্র মেয়েটি যে নিজেকে এমনভাবে ধ্বংস করে দিল এটা কিন্তু আপনি চান-না-চান আপনার মনকে পীড়া দেবেই দেবে।” দস্তয়েভস্কি লিখছেন, তার ‘লেখকের দিনলিপি’তে।অতঃপর জন্ম নিচ্ছে এমন এক নভেলা, যার মূল ঘটনা এই আত্মহত্যা, কিন্তু তার পেছনে এক জ্বলন্ত বিষয়, একটা প্রশ্ন, যে প্রশ্নের মুখোমুখি আমরা সবাই, কমবেশি, বিশেষত, আমরা মেয়েরা, যে সমস্যার অগ্নিপরীক্ষা থেকে আজও বেরিয়ে আসতে পারি নি।“স্বাধীনতা অথবা ভালোবাসার অধীনতা” --- কোনটা কাম্য?দস্তয়েভস্কি তার আখ্যানে যে পরিসর তৈরী করলেন, তা হল, এক স্বামীর তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব, তার স্ত্রী’র আত্মহত্যার পর, সেই রাত্রে, তার স্ত্রীরই মরদেহের সামনে। সাধারণত, আমি দেখেছি, আত্মহত্যা নিকটপ্রিয়জনকে আত্মধিক্কারে মগ্ন করিয়ে দেয়, তা সে যতই নির্দোষ হন না তিনি। কিন্তু দস্তয়েভস্কি, এই পর্যায়ে, ব্যাপারটাকে এক জটিল মনোবিকলনের দিকে নিয়ে গেছেন। ‘সম্পর্ক’, যে-কোনরকমেরই হোক না কেন, শব্দটার পেছনে যে প্রবহমান জীবনধারা বয়ে চলে বছরের পর বছর ধরে, তা আমার কাছে খুবই জটিল এবং গহীন লাগে। আমি দেখেছি ‘পিতা পুত্রকে নাহি দেয় স্থান / হেথা সুখ ইচ্ছ মতিমান?’ এ কোন কবিকল্পনা নয়। কোথাও যেন, একটা পর্যায়ে এসে, সম্পর্ক একতরফা হয়েই যায়। একপক্ষ অপরপক্ষকে Dominate করবে, এবং করেই চলবে; এর নাম আমরা দিই ‘ভালোবাসা’। আমাদের শাস্ত্র রাধা’র কথা বলে, সীতা’র কথা বলে। চিরজনমদুখিনী এই দুই ভারতীয় ‘রোল মডেল’ বরাবরই ‘submissive’, এবং আমরা তাকে দেবীরূপে পূজা করি। মজার ব্যাপার, দ্রৌপদী দেবী নন। অর্থাৎ, সম্পর্কে একজন চিরকাল নিপীড়িত হবে, আরেকজন নিপীড়ন করবে; একজন TOP তো আরেকজন BOTTOM; একজন সুবিধা নিয়েই যাবে, তো অপরজন সুবিধা দিতে বাধ্য থাকবে; একজন শোষক, তো আরেকজন শোষিত; একজন নিজেকে নিঃশেষ করে, উজাড় করে নিঃস্ব হয়ে যাবে, মুখে তবু রা কাড়বে না, তো অপরজন শুধুমাত্র নির্লজ্জের মতো সেই উজাড়িত ত্যাগ গ্রহণ করে করে নিজেকে পূর্ণ করে যাবে। সম্পর্কে দুই তরফের Responsibility কেবলমাত্র একপক্ষের আহুতির খাতে বয়ে যাবে, তার স্থান পরিবর্তন করবে না। এটাই, মোটামুটিভাবে ভারতীয়দের ধর্মীয় নিদান। বাস্তবে, হয়তো, কখনও কখনও বার্ধক্য কিম্বা পীড়ার বেশে প্রতিশোধ তার স্থান নেবে, কিন্তু সেটা কি সম্পর্কের পূর্ণতা? সে তো দীর্ঘদিনের বঞ্চনার নিষ্ঠুর জঘন্য প্রতিবাদ। তা সম্পর্ককে সুস্থ করে না, সম্পর্ককে ক্যান্সারের মতো এক রোগের হাতে সঁপে দেওয়ার মতো হয়। প্রসঙ্গত, মেয়েরাই যে একমাত্র এর শিকার, এ আমি বিশ্বাস করি না, পুরুষরাও, এই ধ্বংসযজ্ঞে নিজেদের আহুতি দিয়ে এসেছেন যুগের পর যুগ ধরে। দাঁড়িপাল্লায় দুজনেই সমান সমান, যে কারণে, হয়তো, কোন সম্পর্কই, কোনদিন সমান খাতে বয়ে যেতে পারে নি। পারফেক্ট পারস্পরিক বোঝাপড়া এক আদর্শ কাব্যকথার উদাহরণ, যা কোনদিন কেউ archive করতে পারবে বলে মনে হয় না।মজার ব্যাপার, যিনি সুবিধা নিয়েই চলেন, অর্থাৎ, শোষক, কিম্বা শাষক, তিনি কিন্তু কোনভাবেই বিশ্বাসই করতে পারেন না যে, তিনি কোন অন্যায় করছেন! ‘ভালবাসা’ শব্দটা এতটাই ভ্রমাত্মক, যে পরাধীন করে রাখার মধ্যে, possessiveness-এর মধ্যে তিনি এক মঙ্গলময়তা দেখেন। কিম্বা শাসনের অমোঘ প্রকাশ যে অন্যের গলায় ফাঁসের দড়ি হয়ে পড়ছে তা টেরই পান না, কিম্বা পেলেও, ‘প্রেম’ কিম্বা ‘concern’ শব্দটার মধ্যে দিয়েই নিজের মহানুভবতার আত্মপ্রসাদ লাভ করে চলেন। চুড়ান্ত কিছু একটা হয়ে যাওয়ার পর, যখন, আত্মবিশ্লেষণ অবধারিত হয়ে পড়ে, তখনও, নিজের দায়, বুঝতে পেরেও, অপরের ঘাড়ে সেটি চাপানোর মধ্যে দিয়ে অবচেতনে থাকা অপরাধের বোঝা সরিয়ে পুনরায় মূলস্রোতে ফিরে আসতে চান। এর সমাধান? অধিকাংশ মানুষই তো এর সমাধান করেই জীবনধারণ করে। সেটা কি? একজনকে নত হতেই হয়। সে অধীনতা স্বীকার করে, বাকি জীবন চলে তার নীরব ক্ষয়। যারা তা চায় না, ছিন্ন শিকল পায়ে নিয়ে যে পাখীর ওড়ার সাধ জাগে, সেই পাখী ‘ডিভোর্স’ করে, কিম্বা ‘আত্মহত্যা’। দস্তয়েভস্কি এর মধ্যে থেকে আত্মহত্যাকে তুলে নিয়ে আসলেন। যিনি শোষণ করছিলেন, তার Narrative –এ উঠে আসা এই সম্পর্কের সংকট আমাকে শিহরিত করে। কেন সে নিজের দোষ দেখতে পায় না? দস্তয়েভস্কি তার ডায়রিতে লিখেছিলেন ---“… -কে টেবিলের ওপর শুইয়ে রাখা হয়েছে। আর কি কখনও ওকে দেখতে পাব? খ্রীষ্ট যে আমাদের শিখিয়েছিলেন, ‘তোমার প্রতিবেশীকে আপনার মতো প্রেম করিবে’--- সেটা অসম্ভব। … মানুষের বাধা তার অহং, তাই মানুষ এমন একটা আদর্শের সন্ধান করে, যা তার নিজের প্রকৃতির বিপরীত…” এই অহং-এর মুখোমুখি আরও একবার। আমি মুখোমুখি হই। কোনটা আমি বাছব? আমার সম্পর্কগুলো আমাকে কোন দিকনির্দেশ করছে? স্বাধীনতা, অথবা ভালোবাসার অধীনতা? তার লেখনীর আয়না আবার আমার সামনে তিনি তুলে ধরছেন। কালো কালো ছায়ার মধ্যে থেকে আমি নিজেকে কেমন যেন ধুসর পান্ডুলিপি-র মতো দেখতে পাই। চিনতে পারি না নিজেকে। আমি অহংপূর্ণ, না অহংবর্জিত, না কি ছায়ায়-মায়ায় মেশানো এক রহস্যময় বিষদময়তা?ক্রোত্কায়া, তথা ‘বিনতা’ আমাকে কোন মায়াময় প্রশ্নের সাদা-কালো অরণ্যাণীর মধ্যে ঠেলে দেয়! দস্তয়েভস্কি, আরও একবার, আমার কাছে নিদারুন অসহনীয় হয়ে ওঠে, ছোট্ট নভেলাটি দেখতে দেখতে শেষ হয়ে যায়।======================বিনতাফিয়োদর দস্তইয়েভস্কিঅনুবাদকঃ অরুণ সোমপ্রতিক্ষণমুদ্রিত মূল্যঃ ২০০ টাকাছবি কৃতজ্ঞতাঃ সমর্পিতা
    কবিতা- চিঠঠি আই হ্যায় - Supriya Choudhury | চিঠঠি আই হ্যায়——————      সুপ্রিয়া চৌধুরী      —————-“চিঠঠি আই হ্যায়” বলে “আহিস্তা -আহিস্তা” চলে গেলেন গজলের এক কিংবদন্তী জাদুকরনা ফেরার দেশে। রেখে গেলেন এমন সুরের মুর্ছনা সে চিঠিতে-যার ভাজে ভাজে পাতায় পাতায় শুধু সুরই আসে ভেসে।বলে গেলেন …..যত্নে রেখো আমার শেষ চিঠি …….ইতি …..পঙ্কজ উধাস।….শেষ হলেও, - এ যে আমাদের অশেষ প্রাপ্তি।সুরের মৃত্যু নেই,  দুঃখ নেই,  বিচ্ছেদ নেই তাই তো এই সুরমাধুরী অমর সকলের হৃদয়েই।——————————————- 
    ইঞ্চিজি জিন্দাবাদ  - Eman Bhasha | ইঞ্চিজি জিন্দাবাদ সংসদে প্রণাম করেছিলেন। সংসদ ভবন তালাবন্ধ।পেটিএম নোটবন্দির পরদিন তাঁর ছবি দিয়ে। মার্চ থেকে পেটিএম পেমেন্টস ব্যাঙ্ক বন্ধ।নোটবন্দির সুফল না পেলে ৫০ দিন পর জ্বালিয়ে দেবেন বলেছিলেন। দেশ জ্বলছে। ক্ষমতায় আসার একমাসের মধ্যে ২৫% করে জিনিসের দাম কমাবেন বলেছিলেন। জিনিসপত্রের দাম ৩০০-৫০০% বেড়েছে।বছরে ২কোটি করে চাকরির কথা বলেছিলেন।১৪ কোটির চাকরি চলে গেছে। বিএসএনএলে এক লাখ ৯৭ হাজারের চাকরি গেছে। দুই লাখ সৈন্যর কাজ গেছে। সেনাবাহিনীতেও চাকরি নেই। চার বছরের চুক্তি কাজ। ব্যাঙ্ক ২৭টি থেকে কমে ১২টি।‌এটি ৫ টি হবে। ব্যাঙ্কে নিয়োগ বন্ধ। রেলের ১১ লাখ পদ শূন্য।সাড়ে তিন লাখকে অবসর দেওয়া হয়েছে।কেন্দ্রীয় সরকারের সাত লাখ পদ শূন্য।জীবনবিমার অবস্থা খারাপ। নতুন নিয়োগ নেই। জনগণের লাখ লাখ কোটি টাকা আদানিকে বাঁচাতে দেওয়া হয়েছে।বেসরকারি ইয়েস ব্যাঙ্ক বাঁচাতে সরকারি ব্যাঙ্কে রাখা জনগণের টাকা দেওয়া হয়েছে।১৫ লাখ কোটি টাকার ব্যাঙ্ক ঋণ মকুব করা হয়েছে আদানি আম্বানিদের।স্বল্পসঞ্চয়ে রেকর্ড সুদ কমেছে।গৃহঋণে প্রচুর সুদ গুণতে হচ্ছে ক্রেতাদের।আদানি আম্বানিদের পোয়াবারো। সব্জি মাছ মাংস ডিম দুধ চাল ডালের বাজারে আদানি আম্বানি ঢোকার পর সব জিনিসপত্রের দাম ৩০০% থেকে ৫০০% বেড়েছে।উদাহরণ আটা । ১৮ টাকা থেকে বেড়ে ৪৫ টাকা।সরষের তেল ৪৫-৪৮ টাকা থেকে বেড়ে ১৭০-২২০ টাকা।তিল ২০ টাকা কেজি থেকে ৩০০ টাকা।সরষে আটটাকা কেজি থেকে ৮০ টাকা।চাষি কিন্তু দাম পাচ্ছেন না।চাষি টমেটো বেচছেন ৫০ পয়সা থেকে দুটাকা কেজিতে। বাজারে ৩০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত কেজি বিক্রি হচ্ছে।রসুন ৫০ টাকায় ১০০ গ্রাম। এক কেজির দাম ৫০০ টাকা।আগে কোলে মার্কেটে এক কেজি রসুনের দাম ছিল ৪৫-৫০ টাকা।ফড়েরা দু থেকে পাঁচটাকা দাম বাড়াত। ফড়েদের বিরুদ্ধে বলে আদানি আম্বানি লুঠেরারাজ কায়েম করেছে। গদি মোডিয়া চুপ।সব ওদের কেনা অথবা পয়সায় চলছে।ওষুধ কেনা কঠিন হয়েছে। ওষুধের দাম ২০০-৩০০% বেড়েছে।সবকিছুতেই জিএসটি। অথচ পেট্রল ডিজেলে জিএসটি নাই। ২৬ টাকা মূল্যের পেট্রল ১০৬ টাকায় বেচছে।পেট্রল ৪০ টাকা লিটার দেবে বলেছিল।ডলারের দাম এখন ৮৩ টাকা। তিনি আসার আগে ছিল ৬৩ টাকা।তিনি ক্ষমতায় আসার পর পাঁচটি সেনানিবাসে হামলা হয়েছে।পুলওয়ামায় ৪২ জন জওয়ান মারা গেছেন। কোনও তদন্ত কমিশন বসানো হয়নি।সেনাবাহিনীতে এক পদ এক পেনশন দেবে বলেছিল।দেয়নি। অবসরপ্রাপ্ত সেনা সবার সামনে আত্মহত্যা করেছেন।সেনাবাহিনী সহ সব সরকারি দপ্তরে পেনশন তুলে দিয়েছে ২০০৪ থেকে।গুজরাট মধ্যপ্রদেশে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে বেতন নিয়ে প্রবল বিক্ষোভ।গুজরাটে গত ২২ বছর বিদ্যালয় মহাবিদ্যালয়ে শূন্য পদে স্থায়ী শিক্ষক অধ্যাপক নিয়োগ হয়নি। সব কমপয়সায় দলীয় ক্যাডার নিয়োগ। চুক্তিতে।কেন্দ্রীয় সরকারের প্রায় দু লাখ টাকা বেতনের যুগ্মসচিব পদে ৬৪ জন নিজের লোককে নিয়োগ করা হয়েছে। সরকারি চাকরির পরীক্ষা ছাড়াই।বলেছিলেন, চাকরিতে দুর্নীতি মানবো না।এইসব ঢাকতে হিন্দু মুসলমান মন্দির মসজিদ কাশ্মীর পাকিস্তান নিয়ে বিদ্বেষ বিভাজন ও বিস্ফোরণের রাজনীতি চালাচ্ছে।
  • ভাট...
    comment:|: | আটটা উনিশ: উইকি পিসি বললেন Empirical research.
    commentArindam Basu | "Subsequently, it was found in the official records that Agrawal has the responsibility in naming the big cats and keeping the government in the dark. Then the state government suspended him on Friday"
     
    এ কিরকম আজব "রেসপনসিবিলিটি"? যার জন্য ভদ্রলোকের চাকরিটা অবধি গেল। আর বাঘ সিংহর নাম আকবর সীতা টিতা হলেই বা কার কি আসে যায়? আজ অবধি কোন সিংহ নিজেকে আকবর বলে ঘোষণা করেছে, না পশু পাখীদের ধর্ম পুরাণ ইত্যাদি নিয়ে কোন মাথাব্যথা আছে? 
    ভারতে বিচারকদের মনে হয় আজকাল বিশেষ কাজকর্ম নেই, পরশুরামের হনুমানের স্বপ্নের মত রামরাজ্য প্রতিষ্ঠা হলে যা হয়। 
    commentb | আপনারা তো অনেক হিন্দি পড়েছেন, বলুন তো "अनुभवजन्य अनुसंधान" এর মানে কি ? 
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত