এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানুষদের নিয়ে কথা কে বলবে? - সুমন সেনগুপ্ত | অলংকরণ: রমিতদ্যা টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রাক্তন মুখ্য সম্পাদক রাজাগোপালের বহুদিনের পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণ হয়নি, পুলিশ যে তথ্য যাচাই করে, সেই তথ্য যাচাইতে জানা গেছে যে তাঁর নাম যেহেতু ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না, তাই তিনি ভারতীয় কি না, তার স্বপক্ষে তাঁরা কোনও প্রমাণ নাকি দাখিল করতে পারেনি, তাই তাঁরা বিরূপ রিপোর্ট দিয়েছে। যা বোঝা যাচ্ছে দেশের অন্যতম বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং সম্পাদক রাজাগোপালের নাম গত ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় না থাকার ফলে, তাঁর পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণ হবে কি না, তা প্রশ্নের মুখে।এই বিষয়ে তাঁর নিজস্ব একটি বয়ান সমাজমাধ্যমে ঘুরছে। সেই বক্তব্যের বেশ কিছুটা অনুবাদ করে পড়া প্রয়োজন। আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত তৃণমূলের অপশাসন গিয়ে বিজেপির শাসন ব্যবস্থা আসাতে উল্লসিত, কিন্তু সেই ভোটে কি সত্যিই মানুষের রায় প্রতিফলিত হয়েছে, এই প্রশ্নও টুকটাক উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইভিএম পুড়ে যাওয়ার ঘটনা, সেই প্রশ্নে আরো ঘৃতাহুতি দিয়েছে। তিনি লিখেছেন - “এই বছরের মার্চ মাসে, কলকাতার বালিগঞ্জ নির্বাচনী এলাকার ভোটার তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দেওয়া হয়। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে, ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়ায় ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আমার বা আমার প্রয়াত বাবার কারও নামই খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমার বাবা ছিলেন একজন গান্ধীবাদী ব্যক্তিত্ব, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং কেরালার ‘গান্ধী স্মারক নিধি’র প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক। তিনি ২০১৬ সালে প্রয়াত হন। তাঁর মতো একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল ভোটারের নাম কীভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে, তা আমার বোধগম্য নয়।পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৭ লক্ষ বাসিন্দার মতোই, তথাকথিত ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’র (Logical Discrepancies) কারণে আমার নামও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আমার ম্যাট্রিকুলেশন বা মাধ্যমিক পরীক্ষার নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি; বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলোর একটিতে আমার আপিলটি বিচারাধীন রয়েছে। এর ফলে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে আমি ভোট দিতে পারিনি।আরও হতাশাজনক হলো আমার পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণের আবেদনের বিষয়টি। যদিও ১৯ মার্চ, ২০২৬-এ আমি বায়োমেট্রিক সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিলাম, তবুও পুলিশ ভেরিফিকেশন বা যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়নি কারণ ভোটার তালিকায় আমার নাম আর নেই। বেশ কিছু বিকল্প নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও আমাকে জানানো হয়েছে যে সেগুলো অপর্যাপ্ত। বস্তুত, আজ (২৭ জুন, ২০২৬) পাসপোর্ট নবায়নের জন্য বায়োমেট্রিক দেওয়ার পর ১০০ দিন অতিক্রান্ত হলো। গত সপ্তাহে পাসপোর্ট প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে কলকাতা পুলিশ একটি ‘প্রতিকূল প্রতিবেদন (adverse report) পাঠিয়েছে। আমাকে অবিলম্বে কলকাতার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে (Regional Passport Office) হাজির হতে বলা হয়েছে; কিন্তু আমি যখন সাক্ষাতের জন্য সময় (অ্যাপয়েন্টমেন্ট) চাইলাম—যা ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা কঠিন—তখন আমাকে ১৭ জুলাই, ২০২৬-এর তারিখ দেওয়া হলো।এরই মধ্যে, ক্যালিফোর্নিয়ায় কর্মরত সাংবাদিক আমাদের মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হলো সান ফ্রান্সিসকোতে, ১৭ এপ্রিল। বলাই বাহুল্য, বৈধ দশ-বছরের মার্কিন ভিসা থাকা সত্ত্বেও, একটি সচল পাসপোর্ট ছাড়া সেই বিয়েতে আমার পক্ষে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব ছিল।বাস্তব বিচারে, আমি এখন এক ধরণের নাগরিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি—যদিও সরকার সম্প্রতি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে পাসপোর্ট নাগরিকত্বের কোনো প্রমাণ নয়। আমার সারাদিনের সময়ের বড় একটা অংশ এখন ব্যয় হচ্ছে পারিবারিক নথিপত্র পুনরুদ্ধার এবং কয়েক দশক আগের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করার প্রচেষ্টায়... আমার দিন শুরু হয় ভোটাধিকার সংক্রান্ত আবেদনের বর্তমান অবস্থা এবং পাসপোর্টের আবেদনের গতিবিধি (ট্র্যাকার) যাচাই করার মধ্য দিয়ে। এরপর আমি সেই কলেজে চিঠি লিখি যেখানে আমার মা ১৯৬৫ সালে শিক্ষকতা করেছিলেন এবং সেই স্কুলে যেখান থেকে তিনি ১৯৫৯ সালে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন; উদ্দেশ্য হলো এমন কোনো নথিপত্র জোগাড় করা যা তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়। স্কুলটি এ ব্যাপারে বেশ সহায়তা করেছে, কিন্তু কলেজটি তা করেনি। একইভাবে, আমি কেরালার মদ্যপান-বিরোধী প্রচারণায় যুক্ত কর্মীদের সাথে কথা বলি—একটি অনলাইন গ্রুপে ঘটনাক্রমে এক কর্মীর নাম পাওয়ার পর আমি যে তালিকা তৈরি করেছিলাম, তা ধরেই এগোচ্ছি। আমি তাঁদের কাছে এমন কোনো সংবাদপত্রের কাটিং বা ছবি চাইছি যাতে অবৈধ মদের দোকান ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আমার বাবার প্রচারণার প্রমাণ পাওয়া যায়।আমার এই সব প্রচেষ্টায় কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি সহায়তা করেছেন। তবে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিক সংগঠন বা গিল্ড (যার আমি সদস্য নই) আমার এই পরিস্থিতির প্রতি কোনো আগ্রহ দেখিয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই। একজন প্রবীণ সাংবাদিক আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই ব্যতিক্রমী নয়; কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে নিত্যদিনের বাস্তবতা হিসেবে এই ‘প্রত্যাখ্যান’ এর মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমি সেই যুক্তি মেনে নিয়েছি।নিজেকে ভুক্তভোগী বা ‘ভিক্টিম’ হিসেবে তুলে ধরা আমার উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না। বরং আমি একটি বৃহত্তর বিষয়কে সামনে আনতে চেয়েছি: সাংবাদিকতায় পেশাগত জীবন কাটানো এবং মোটামুটি পরিচিত একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা কোনো ব্যক্তি যদি এমন সব সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন, তবে সমাজের প্রান্তিক মানুষগুলোকে কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা সহজেই অনুমেয়। আমি কি কোনো সংবাদপত্রের দ্বারস্থ হয়েছি? না, কারণ আমি চাই না বিষয়টি কেবল আমাকে কেন্দ্র করেই কোনো ইস্যু হয়ে উঠুক। সম্পাদক ও সাংবাদিকরা কি আমার এই সমস্যার কথা জানেন? অবশ্যই, তাঁদের অনেকেই জানেন। আর যদি না-ই জানেন, তবে তাঁদের এই পেশায় থাকা উচিত নয়—আপনারও কি তাই মনে হয় না?তবুও, এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পূর্ণ নীরবতা আমার সেই সন্দেহকেই নিশ্চিত করেছে—যা এখন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে আরও জোরালো হয়েছে—যে তথাকথিত মূলধারার সাংবাদিকতার সাথে আমার জীবনের খুব একটা সম্পর্ক নেই। আমি এখন আর কোনো সংবাদপত্র ‘পড়ি’ না। কোনো কোনোটির ওপর হয়তো চোখ বুলিয়ে নিই, কিন্তু কদাচিৎ এমন কিছু খুঁজে পাই যা আমার আগ্রহ জাগিয়ে তোলে।’’রাজাগোপালের এই বয়ানটি হয়ত, অনেকেই পড়েছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও নির্লিপ্ত থেকেছেন, ঠিক যেমনটা ভোটের আগে, কিংবা আসামের এনআরসি’র সময়ে ছিলেন। তখন হয়ত বেশীরভাগ মানুষ ভেবেছিলেন, এই সমস্যা শুধু মুসলমানদের বা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের নিয়ে হবে, তাই তখন খুব বেশী শোরগোল করেননি। সেই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোও খুব বেশী সোচ্চার হয়নি, তারা সবাই ব্যস্ত ছিল নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারে। তৃণমূল কংগ্রেসের ধারণা ছিল, যে ঐ ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে বাদ গেলেও মানুষের সমর্থন তাঁদের দিকে থাকবে। সেই জন্যেই তাঁদের শ্লোগান ছিল, ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা’। অথচ তাঁদের জনভিত্তি যে কমছিল, তা তাঁরা এঁচে উঠতে পারেনি। ওদিকে বামেদের একাংশ, বিশেষ করে সিপিআইএম ভেবেছিল এই প্রক্রিয়াতে তৃণমূলের ক্ষতি হবে, সুতরাং খুব বেশী হইচই না করলেও চলবে, তাই তাঁরা দায়সারা ভাবে বিরোধিতা করেছিল। এমনকি আইএসএফের পক্ষ থেকেও নৌশাদ সিদ্দিকি’র একটা বক্তব্য এসেছিল, ‘কোনও নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা নেই মুসলমানদের বেনাগরিক করার, প্রয়োজনে গোরের মাটি এনে প্রমাণ দেওয়া যাবে তাঁরা এই দেশের বাসিন্দা’।যদি ঘটনা পরম্পরা পরপর সাজানো যায়, তাহলে দেখা যাবে, প্রাথমিক যে খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়, সেখানে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ যায়, তার মধ্যে, মৃত, স্থানান্তরিত এবং অন্য ইনিউমারেশন ফর্ম জমা না দেওয়া ব্যক্তিদের নাম ছিল। যদিও সেই তালিকা নিয়েও অনেক প্রশ্ন ছিল তবুও অনেকে এই বিষয়টা মেনে নিয়েছিলেন। এরপর নির্বাচন কমিশন আসরে নামে তাঁদের ব্রহ্মাস্ত্র নিয়ে, নামের বানান, বাবার নাম বা মায়ের নাম বা পরিবারের অন্য কোনও ব্যক্তির নাম যদি ২০০২ সালের তালিকায় না থাকে, তাঁদের শুনানিতে ডাকা হয়। বলা হয়, এই ব্যক্তিদের ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ আছে, এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁদের প্রমাণ করতে হবে, তাঁরা এই দেশের নাগরিক এবং ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে তবেই তাঁরা তাঁদের নাম তুলতে পারবেন।যদি খেয়াল করা যায়, এই শুনানিতে উপস্থিত হতে বলা হয়, সেই সংখ্যাটা ছিল প্রায় ১.৫ কোটি। বিভিন্ন শুনানি কেন্দ্রে তখন যাঁরা উপস্থিত হচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রাদায়ের মানুষ ছিলেন। বৃদ্ধ থেকে আশীতিপর অসুস্থ মানুষজন ও ছিলেন। রাজ্যের প্রথম সারির প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিন এই হয়রানির ছবি প্রথম পাতায় থাকলেও, একমাত্র গণশক্তি পত্রিকা প্রথম ৬ দিন সম্পূর্ণ নীরব ছিল। তাঁরা একটি কথাও বলেনি, বা একটি ছবিও প্রকাশ করেনি। শুধু তাই নয়, নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে চুপ থেকেছে। ততদিনে বিষয়টা আদালতে গেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি চলছে। এই প্রক্রিয়া আদৌ সাংবিধানিক কি না, তা নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠে গেছে। এই হয়রানি নিয়েও কথা হয়েছে, কিন্তু প্রধান বিচারপতি বারংবার বলে গেছেন, কোনওভাবেই এই প্রক্রিয়া বন্ধ করা যাবে না। তিনি মেনে নিয়েছেন মানুষের হয়রানি হচ্ছে, তার জন্য তিনি বেশ কিছু পন্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেন, কিন্তু নির্বাচন কমিশন আদৌ কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব পরীক্ষা করতে পারে কি না সেই রায় তিনি স্থগিত রাখেন। অন্য আরো একজন যে বিচারপতি এই মামলা শুনছিলেন, ঘটনাচক্রে তিনি বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও এবং বাঙালির নামের পদবী সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী স্পষ্ট করলেও, এই ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতি যে একেবারেই অযৌক্তিক তা স্পষ্ট করে বলেননি।ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছে চূড়ান্ত তালিকা থেকে, যাঁরা এবারের বাংলার নির্বাচনে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হল, প্রধান বিচারপতি এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেছেন, এইবার ভোট দিতে না পারলেও পরের বার দিতে পারবেন এই মানুষেরা। সঙ্গে আরো বলেছেন, যে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে নাগরিকত্বের কোনও যোগ নেই। এই ২৭ লক্ষ মানুষকে বলা হয়েছে ট্রাইবুনালে আবেদন করতে। ততদিনে কমিশন নির্বাচন ঘোষণা করে দিয়েছে। দেখা গেছে প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষ ঐ ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন। তারপরে নির্বাচন হয়েছে এবং বিজেপি ২০৫টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে।তারপরে আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙেছে। যে মানুষটি নিজে একটা রাজনৈতিক দল তৈরি করেছিলেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল ধরে রাখতে পারেননি। কিন্তু সেইসব বাদ দেওয়া গেলেও ঐ বাদ যাওয়া মানুষদের কথা সবাই ক্রমশ ভুলতে বসেছে। তারপরে নতুন করে আবার এই বিষয়টা এখন সামনে আসা শুরু হয়েছে। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বাদ যাওয়া মানুষদের আর কোনও সরকারি সুযোগ সুবিধা দেওয়া যাবে না। রেশন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সুবিধা কোনটাই যেন এই ভোটার তালিকা থেকে জোর করে বাদ দেওয়া মানুষেরা না পান, সেই নির্দেশিকা জারি হয়েছে। তার মধ্যে বিদেশ মন্ত্রক থেকে বলা হয়েছে, যে পাশপোর্ট থাকা মানেই সেই ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক তা প্রমাণিত হয় না। হয়ত এই আইন আগেও ছিল, কিন্তু এই সময়ে এই কথা বলা এবং টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদকের সাম্প্রতিক বার্তা দেখিয়ে দেয়, অলিখিত ভাবে হলেও দেশের সরকার ঐ ভোটার তালিকাকেই প্রামাণ্য নথি হিসেবে ধরছেন।হয়ত রাজাগোপাল তাঁর নিজের সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারবেন। তাঁর সেই সামাজিক সুবিধা আছে, কিন্তু যে অসংখ্য মানুষের নাম বাদ গেছে, তাঁদের কী হবে? তাঁদের সম্পর্কে সিপিআইএমএল এবং সিপিআইএম ছাড়া কংগ্রেসও এখনো কোনও জোরালো কিছু বলেনি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের সব ধরনের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। বাংলায় এই প্রক্রিয়াটি চলছে এবং এরপর হিন্দি-বলয়ের বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতেও এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এর ফলে কেবল মুসলিমরাই নয়, বরং বহু দরিদ্র পরিবারও মারাত্মক পরিণতির সম্মুখীন হচ্ছে। এটি কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘাত নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি শ্রেণি বা জাতিগত (বর্ণভিত্তিক) ইস্যু। তাছাড়া, রাষ্ট্র এবং তার মদতপুষ্ট শক্তিগুলো যখন সংখ্যালঘু ও সামাজিকভাবে বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করে, তখন তাকে আর কেবল 'সংঘাত' বলা চলে না। জেনে রাখুন, বৈষম্যের মাত্রা আরও এক ধাপ বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো ছাড়া ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানুষদের নিয়ে কথা কে বলবে? সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতও এই বিষয়ে এখনো অবধি কোনও কথা বলেনি। তাহলে এই মানুষদের কী হবে, এই বাদ যাওয়া মানুষেরা তবে কি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়েই থেকে যাবেন? জনগণনা থেকে তাঁরা বাদ পড়বেন না তো? একটা ‘অযৈক্তিক’ যুক্তি এত মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে, আর রাজনৈতিক দলগুলো কিচ্ছু করবে না?
    মধুবাতা ঋতায়তে - শারদা মণ্ডল | ছবি - Imagen 3ছাঁচনপুরের আত্মবিশ্বাসের কথাই যদি উঠলো তবে আর একটা আত্মবিশ্বাসের গল্প শোনাই। ঘটনাটা আমার ভৌগোলিক জীবনে অনেক দিক থেকেই খুব স্পেশাল। প্রথম ব্যাপার হচ্ছে সেই প্রথম আমি নিজের কলেজের সঙ্গে না গিয়ে অন্য কলেজের ছাত্রীদের সঙ্গে ফিল্ডে গিয়েছিলাম ফিল্ড এক্সপার্ট হয়ে। দ্বিতীয়ত এই যাওয়াটার সঙ্গে আমার শৈশবের আশাপূরণের একটা যোগসূত্র ছিল। ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি। আমি আসলে নিবেদিতা ইস্কুলের ছাত্রী ছিলাম। সেই কবে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হলাম - সনটা ১৯৭৭। শুধু তো আমি নই, আমার বোন, আমার মা, আমার মেজ মাসি, আমার ছোট মাসি - সব্বাই নিবেদিতা ইস্কুলে পড়েছিল। আমাকে ধরে মাতৃকুলে তা সে চার প্রজন্মের সম্পর্ক। আমরা যখন ছাত্রী, সেই সময়ে ক্লাস নাইনে মেয়েদের ইস্কুল থেকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হত। অঙ্কের শিক্ষিকা ছিলেন শুক্লাদি। তাঁর স্বামী বিখ্যাত পর্বতারোহী প্রাণেশ চক্রবর্তী। তিনি নিয়ে যেতেন পুরুলিয়ার মাঠাবুরু ক্যাম্পে। আজও আন্তর্জাল জুড়ে তাঁর অজস্র কীর্তি, বহু রোমহর্ষক পর্বতাভিযানের রিপোর্ট ছড়িয়ে আছে নানান ওয়েবসাইটে। ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজনে তাঁর লেখা একটি বইয়েরও হদিশ পেয়েছিলাম - আড়াইশো পাতার বাংলা বই - হিমালয় ভ্রমণ গাইড - পাবলিশার মিত্র ঘোষ। পড়ার খুব ইচ্ছেও হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশে যা হয় - প্রেজেন্টলি আনঅ্যাভেলেবল। জীবনে সব আশা পূরণ হয়না। আমারও হলনা। আমি যখন নাইনে উঠলাম, কীজানি হয়ত প্রাণেশ স্যার কোন কঠিন অভিযানে বাইরে ছিলেন। তাই আমরা গেলাম শান্তিনিকেতনে। বন্ধুদের সঙ্গে সেই প্রথম বেরোনো, আনন্দ খুবই হয়েছিল - সালটা ১৯৮৫। কিন্তু ৮৭ সালে আমার দুবছরের ছোট বোন মাঠা ক্যাম্পে গেলো। তাঁবুতে থাকল, খড়ের ওপর বাড়ির কম্বল পেতে। ক্লান্ত শরীরে একদিন ফিরে দেখল ওর বিছানায় ধেড়ে কুকুর শুয়ে আছে। তাকে বার করে দিয়ে বোন শুয়ে পড়ল। একটা মাত্র কলাই করা মগ - তাতেই চা খাওয়া, আবার তাতেই প্রাতকৃত্যের পর জল শৌচ। আসলে পাহাড়ে চড়তে গেলে ন্যূনতম লাগেজ দরকার - বাড়তি আরাম চলেনা - বোন সেটাই শিখে এলো। তার ওপরে দড়ি ধরে কেমন করে উঠলো, নামতে গিয়ে কেমন দড়িতে ঝুলে গেলো, বড় বড় চোখ নাচিয়ে তার বর্ণনা দিতে লাগলো ঘুরে ঘুরে। তার বাক্য - ঝর্নার গতি যত প্রবল হোল, তার চেয়ে দুর্বার গতিতে বেড়ে চলল আমার আফশোষ। শ্রুতির স্মৃতি আর আশার কুহক, দুইয়ে মিলে কুয়াশা ঘেরা মাঠাবুরু আমাকে কেবলই তার দিকে টেনে নিয়ে গেলো মনে মনে। সশরীরে যেতে না পারলেও, একবার প্রাণেশ স্যার ইস্কুলে পর্দা টাঙিয়ে পাহাড়ে চড়ার স্লাইড দেখিয়েছিলেন - সেদিন দেখেছিলাম। জল নেই, ইঁট সাজিয়ে তার মধ্যে শুকনো পাতা ভরে আগুন জ্বালিয়ে কেমন করে চট জলদি ডিম সেদ্ধ করা যায়। জল নেই তো কী! ডিমগুলো বালি কাদা ধুলো মাখিয়ে আগুনে ফেলে দিলেই হোল। সেই কবেকার কথা, স্মৃতি এখনও কেমন জ্বলজ্বলে। আসলে আমি এমন পাহাড় পাগল কখনোই হতাম না। দোষ আমার নয়। দুজন ভূগোলের দিদি ছিলেন, কাকলিদি আর মানসীদি। দুজনে মিলে ফাইভ থেকে টেন - ছ বছর ধরে হিমালয়, আল্পস, রকি, আন্দিজ করে করে আমার গোলা মাথা একেবারে তালগোল পাকিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর আর কী! কেরিয়ার, সংসার - নানা কাজের চাপে আর সময়ের খাপে মানাতে মানাতে মাঠাবুরুতে রক ক্লাইম্বিং ক্যাম্প আমার স্বপন থেকে অবচেতনে স্থান নিল। জীবনে কিছু প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি, গড়ন ভাঙনের গল্প না থাকলে জমেনা। ধীরে ধীরে চাকরি জীবন চলে গেলো কুড়ি কুড়ি বছরের পার, উঁহু, কুড়ি তো নয় পঁচিশ। মা বাবা গত হবার পর, আবার আমি শৈশবের স্বাদ পেতে ইস্কুলের দিকে ফিরলাম। প্রাক্তনী সভার সদস্য হলাম। নিবেদিতা হেরিটেজ মিউজিয়ামে যাতায়াত শুরু করলাম। আর সেখানেই ঘটে গেলো এক আশ্চর্য ঘটনা। অশেষপ্রাণা মাতাজী আমাকে বিবেকানন্দ বিদ্যাভবনের তিরিশজন ছাত্রীকে নিয়ে পুরুলিয়ার মাঠাবুরু ক্যাম্পে যাবার অনুরোধ করলেন। চমকে উঠলাম - এও কি সম্ভব? ১৯৮৫ সালে যা নিয়ে আফশোষ ছিল, সেই সুযোগ কি তবে চার দশক পরে মানে ২০২৫ এ সত্যি সত্যি এলো? সুযোগ ছাড়ার কোন প্রশ্নই ছিলনা। আমাদের নিবেদিতা হেরিটেজ মিউজিয়ামের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে ডানা মেলেছে একটি প্রতিষ্ঠান যা হয়তো একদিন মহীরুহ হয়ে উঠবে - নীহার - নিবেদিতা ইন্সটিটিউট অফ হিউম্যান অ্যাডভান্সড রিসার্চ। নীহার একটি প্রকল্প শুরু করেছে - লীডারশিপ কোর্স। আমাদের মেয়েগুলির মধ্যে কাদের সঠিক নেত্রী হয়ে ওঠার দক্ষতা বা মানসিকতা আছে তাদেরকে চিনে নিয়ে সঠিক ভাবে পথ দেখানোই নীহারের এই লীডারশিপ কোর্সের কাজ। এই কোর্সের কতটা সম্ভাবনা আছে, তা খতিয়ে দেখার পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয়েছে বিবেকানন্দ বিদ্যাভবন কলেজে। একদিন আমার মাও ঐ কলেজ থেকেই পাশ করেছিলেন। এই কলেজের পঞ্চম অর্ধবর্ষের তিরিশজন মেয়ে এই কোর্সের প্রথম ছাত্রী। দস্তুরমতো ইন্টারভিউ করে এদের বেছে নেওয়া হয়েছে। এই কোর্সের অঙ্গ হিসেবে মাঠা পাহাড়ে ক্যাম্প হোল দুদিনের। সেই ক্যাম্পেই সঙ্গে চললাম আমি। হাওড়া স্টেশন থেকে রাতে আদ্রা চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার ধরে ভোরে নামলাম বরাভূম স্টেশনে। সেখান থেকে গাড়ি করে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যে। মাঠা পাহাড়ের পাদদেশে এই রিসর্টটির নাম হল পাতালঘর। মেয়েরা রইল তাঁবুতে। আধখানা চাঁদের মত চেনটানা তাঁবুর মধ্যে দুটি করে বিছানা পাতা। কলঘরের জায়গাটি পাশেই, একটুখানি হেঁটে যেতে হয়। আর আমরা দিদিমণিরা রইলাম তাঁবুর মুখোমুখি হবিট হাউসে। এগুলোও দেখতে আধখানা চাঁদেরই মত, তবে কিনা পাকা ঘর, লাগোয়া কলঘর। ঘরে যেটুকু না থাকলে নয়, ততটুকুই পরিকাঠামো রয়েছে। ঘরের চালে মাটির পরত, তার ওপরে ঘাসের চাষ করা হয়েছে। জনপ্রিয় পশ্চিমী শিশু সাহিত্যের কাল্পনিক চরিত্র এই হবিট, যারা মাটির তলায় গর্ত করে থাকে। বিশ্ব জুড়ে ন্যূনতম স্বাচ্ছন্দে গড়া পরিবেশ বান্ধব এই হবিট হাউসগুলি পর্যটনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ বহু মানুষই এখন প্রাচুর্য, বাহুল্য ছেড়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে সাধারণ ভাবে কয়েকটা দিন কাটাতে চায়। শুনলাম, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম হবিট হাউস এই পাতালঘর, বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে। দরকার মত কম বেশি তাঁবু খাটিয়ে দেওয়া হয়, আর হবিট হাউস আছে সাতটা। সেখানেও দুজন বা তিনজন করে আরামসেই থাকা যায়। রান্নাঘর আর খাবার জায়গা আলাদা। কাউন্টার থেকে নিজেকে খাবার নিয়ে আসতে হয়। পরিবেশনের বন্দোবস্ত নেই। পানীয় জল কোন ফিল্টার ছাড়া অবিশ্বাস্য ভাবে স্বাস্থ্যকর, সমস্যা একটাই ঐ জলের গুণে খুব খিদে পেয়ে যায়। যাই হোক চারপাশের বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ইত্যাদি দেখার সময় মিললোনা, কারণ ট্রেনিং শুরু হয়ে গেলো। মেয়েদের দেওয়া হোল পনের মিনিট সময়, যার মধ্যে যে যার তাঁবুতে ঢুকে, ব্যাগ রেখে, আর কিছু বন্দোবস্ত করে লাইনে দাঁড়াতে হবে। তবে জুতো থাকবে তাঁবুর বাইরে। কেবল রাতে জুতোজোড়া তাঁবুতে ঢুকিয়ে নিতে হবে। না না দুষ্টু মানুষের ভয় এখানে নেই, তবে কোন বন্য জন্তু ভালোবেসে যদি মুখে করে এক পাটি বা দুটো পাটিই নিয়ে যায়, তার দায় কর্তৃপক্ষের নয়। পাশে কলঘরে গিয়ে চোখেমুখে জল দিয়ে আসতেই পারে, তবে তাতে সময়ের ছাড় নেই, তাই অতটা ঝুঁকি না নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের মেয়েরা বুদ্ধিমতী, তারা ও পথ মাড়ালোনা। কিন্তু আমরা? মেয়েরা পনের মিনিট হলে তাদের ম্যামেরা কি পনের ঘন্টা সময় নিতে পারে? আমরাও ভুরু কুঁচকে তিরিশ মিনিটে মাঠে পৌঁছলাম। মাঠে ততক্ষণে খাটানো হয়েছে এক খাড়াই দড়ির জাল। নীচ থেকে প্রথমবার ওপরে তাকালে জ্যাকের বীনস্টক গাছে ওঠা মনে পড়ে যায় বটে। আমাদের মেয়েরা সারি দিয়ে দাঁড়িয়েছে একে একে সেই জাল বেয়ে আকাশের কাছে পাড়ি জমানোর জন্য। তাদের কারোর চোখে অভিযাত্রীর আহ্লাদ তো কারোর করুণ দৃষ্টিতে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচির আকুতি। দেখলাম পেল্লাই গাছেদের শরীর আর শক্ত শক্ত খুঁটির সঙ্গে বাঁধা ঐ জাল, দুপাশে দক্ষ ট্রেনারদের বজ্র মুঠি আর তীক্ষ্ণ নজরের আওতায় রয়েছে। পান থেকে চুন খসার জোটি নেই। দর্শক আমরা চারজন - বড় মাতাজী, ছোট মাতাজী, সঙ্গে বৈশাখী আর আমি দুই দিদিজী। বৈশাখীও আমার মতই আর একটি কলেজের ভূগোলের দিদিমণি। সেদিন মাঠা পাহাড়ের আকাশ বড় নীল, পাহাড় বড় সবুজ, কাঁচা হলুদ সর্ষে ফুলের মত রোদ বুঝি সবার কানেই বাঁশি বাজাচ্ছিল। একটা মিঠেকড়া ঠান্ডা বাতাস সোয়েটার চাদরের ভিতর দিয়ে খালি লুকোচুরি খেলছিল। বাতাসে বন তুলসীর ঝাঁজ - এমনি দিনে মানুষের মুখোশ খুলে মুখ বেরিয়ে পড়ে। পাকা চুলের পর্দা সরিয়ে মুখ বাড়ায় কিশোরী মন। ২০২৫ কে সরিয়ে রেখে এতদিন বাদে বেরিয়ে পড়ে ১৯৮৫। মাথার দুপাশে পুঁচু পুঁচু বেণী বেঁধে তাতে অপটু হাতে লাল ফিতে বাঁধা শারদা মেয়েদের লাইনে দাঁড়ায় জাল বাইবে বলে।হলদে রোদের মিশেল দেওয়া হলুদ রঙের মোটা আর শক্ত প্লাস্টিক দড়ির জাল। আমি প্রাণপণ চাইছিলাম সবটুকু শিখে নিতে, আসলে এমন সুযোগ আর কোনদিনও আসবে কিনা জানা নেই, তাই চাইছিলাম যা কিছু ঘটছে তার সব কিছু শুষে নিতে। তিনটি উপকরণ - হেলমেট, হারনেস আর ক্যারাবিনার। আমার মাথায় যখন লেডী ট্রেনার হেলমেট পরিয়ে দিলেন, আমার মনে মনে হাসি পেল। শিক্ষার্থীর পা পিছলে মাথা ছাতু হবার ভয় আছে ওঁদের। কিছু হয়ে গেলে জবাবদিহি করতে হবে যে। তবে নাঃ আমার একটুও ভয় করছেনা। চিরকালই পরীক্ষা সামনে এলে কেমন একটা উল্লাস হয় আমার। হেলমেটের পর হারনেস বাঁধা - মহিলা এতটাই কষে সেটি আমার কোমরে বাঁধলেন যে আমি একেবারে ককিয়ে উঠলাম। পেট - কোমরটি যে আর ১৯৮৫ র নেই, তার চারিদিকে তেল-ঘি-মাখন-চীজ - আরো কতকিছুর থাক থাক মেখলা। কোমর বন্ধনীটির একটি অংশ পাদুটোকে গোল গোল ফাঁসের মত আটকে রেখেছে। অর্থাৎ যদি কিছু ঐ পিছলানো টিছলানো (ভগবান না করুন) - তবে ওই ফাঁসে আটকে মোটামুটি পাখি হয়ে ডানা ঝাপটানো যাবে। তবে মেখলা - বন্ধনী যা কিছুই থাক, দড়ির জালের এপাশ ওপাশ টানা দড়িটি দুপাশের ট্রেনারদের হাতে বন্দী। ঐ দড়িটিই লাইফ লাইন - সেটা আবার আমার বন্ধনীটির সঙ্গে একটি মোক্ষম ক্লিপ দিয়ে আঁটা। আর এই ক্লিপটাই হল ক্যারাবিনার - যার ভরসায় আমি মেঘের দিকে মোর তনু - ক্যারাভান লয়ে পাড়ি দেব। আসলে ছাত্রীরা কেমন করে উঠছে, কী কী ভুল হচ্ছে, কোনভাবে ওঠাটা ঠিক, শিক্ষকরা কী নির্দেশ দিচ্ছেন, এগুলো আমি নিবিষ্ট মনে দেখছিলাম। কিন্তু দেখে শেখা এক, আর ঠেকে শেখা আরেক। দেখে শিখলাম যে, জালের দিকে মুখ করে দাঁড়াও, জালের ঠিক গ্রন্থিগুলোতে পা দিতে হবে, তা নইলে জোর পাবেনা। হাত দিয়ে জাল ধরবে, কিন্তু হাত থাকবে কাঁধের লেভেলের ওপরে - নইলে শরীরের ব্যালেন্স থাকেনা। এবারে উঠতে গিয়ে দেখি জাল থলথল, হাওয়া খলবল, পা টলটল, ঘাম গলগল, বুক ধকধক, হাঁটু ক্যাঁচকোচ, কাঁধ খিঁচমিচ - এমনতরো কত কী? কিন্তু নীচের ঢালু অংশটা পেরোনোর পর খাড়া অংশটায় যেতে যেতে ছন্দটা বুঝে গেলাম। একেবারে টিকটিকির মত - ডান হাত আর ডান হাঁটু তোলো, তারপর বাঁ হাত বাঁ হাটু ডানদিকের চেয়ে উঁচুতে তোল - কেল্লা ফতে। আবার উলটো দিকে একই নিয়মে নেমে এলাম কোন মতে। এদিকে হাঁফানো, ওদিকে আনন্দে লাফানো, সে আমার সসেমিরা অবস্থা। ট্রেন ধরার আগের দিন পর্যন্ত ধুঁকছিলাম - যেতে কী পারবো? এত বড় দায়িত্ব, নেওয়া কি উচিত হবে? এখন দেখছি, আমার শরীরে যত ব্যাথাবুথা সব উধাও। কতদিন পরে আমার আমিকে নিজের করে ফিরে পেলাম! সব চেয়ে বড় হল আমি পেরেছি - আমি পারি - পৃথিবীর যে কোন সমস্যা সামনে আসুক না - লড়কে লেঙ্গে মেরা খোয়াবিস্তান। মেয়েদের মোবাইল ফোন জমা দিয়ে দিতে হয়েছিল। আমরা টীচার বলে ছাড় ছিল। কিন্তু খানিকটা স্বেচ্ছাতেই দিনের বেশিরভাগ সময়ে ও জিনিসটিকে ত্যাগ দিয়েছিলাম। আর দিয়েছিলাম বলেই প্রতি মূহূর্তে ছবিছাপা দিয়ে আপডেট দেওয়া আর আপডেটেড হয়ে থাকার বালাই ছিলনা। প্রকৃতির কোলে সত্যি সত্যি শান্তি আর আরাম উপভোগ করছিলাম। শরীরে যতই পরিশ্রম হোক, এ হল “প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি”। একটা দিনে কত যে কাজ হল, আমরা নিজেরাই অবাক। এই ধরা যাক - দড়ির ব্রিজ পেরোনো। জিপ লাইনিঙের মত হারনেস ক্যারাবিনারের ভরসায় ঝুলে ঝুলে জলা পেরোনো - যার পোষাকী নাম - রিভার ক্রসিং। রাতে ঠান্ডা ঘন হয়ে আসে। অন্ধকারের হাত ধরে আকাশ মাটির সীমানা মুছে বন যেন কাছে আসে, হাওয়ার ঝোঁকে ফিসফিসিয়ে ও কী কিছু বলে যায়? শহরের মত লেট নাইটের সুযোগ এখানে নেই। ঘড়ি ধরে খেতে বসা, নিজেই কাউন্টার থেকে খাবার নিয়ে আসা, আবার খাওয়া শেষে থালা বাটি মেজে রাখা পরের দিনের ব্যবহারের জন্য। কোন দাও, লাও এর ব্যাপার নেই - “আপনা হাত জগন্নাথ, করবে ভাই বাজিমাৎ”। বিছানায় যাবার আগে অভ্যাস মত ডায়রি নিয়ে বসি। এই পাহাড়ে চড়ার ট্রেনিঙের সঙ্গে আমার জীবনে আর একটা জিনিস ঘটে গেছে। আসলে যে কলেজের সঙ্গে এসেছি সেটা তো আমার নিজের চেনা কলেজ নয়, তাই ছাত্রীদের ওপরে শিক্ষক হিসেবে সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছিলনা। যেটা ফিল্ডে খুব দরকার। তাই আমি প্রথম পরিচয়েই বলে নিয়েছিলাম যে যেহেতু আমি এককালের রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের ছাত্রী, তাই তোমাদের মত আমি এই ক্ল্যানেরই সন্তান। এটা বলেছিলাম যাতে ওরা আমাকে অ্যাকসেপ্ট করে নেয়। আসলে ওদের কাছে তো আমি বহিরাগত। তাই স্ট্র্যাটেজিক ইনসাইডার হয়ে ওঠার তাগিদে এই অস্ত্র প্রয়োগ করেছিলাম, আমার আর ছাত্রীদের মাঝখানের প্রাতিষ্ঠানিক ভয়ের আর অচেনার প্রাচীরটা যাতে ভেঙে যায়। দেখলাম এতে আশ্চর্য কাজ দিয়েছে। ওরা আমাকে আর ‘নজরদার’ বা নিয়ন্ত্রক ভাবছে না, বরং ভাবছে নিজেদেরই একজন। মাঠাবুরুতে দেখলাম ওরা আমাকে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর নয়, সিনিয়র দিদি ভেবে নিয়েছে। কাছে আসছে, টীচারদের কাছে যেকথা গোপন করতে হবে সেটারও সাহায্য চাইছে, তুমি তুমি করে কথা বলছে। এটা আমার কাছে একটা সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। আমার নিজের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মনের টান, তথ্য বিনিময় স্বাভাবিক ভাবেই অনেক বেশি। কিন্তু সেই সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ক্লাসরুম, যেখানে ক্ষমতার হায়ারারকি বা ধাপ আছে - শিক্ষক ওপরে, স্টুডেন্ট নিচে। ভূগোলের শিক্ষক হিসেবে আমি হয়তো এতদিন ফিল্ডে ‘কন্ট্রোল’ বা শাসনকেই সবচেয়ে জরুরি মনে করেছি। শাসনের দরকারও আছে। আজকাল যা দিন পড়েছে, ছেলেমেয়েরা প্রকৃতির কাছ থেকে কিছু শিখুক আর না শিখুক, পরিবার বা সমাজের কাছ থেকে একটা মোক্ষম কথা খুব ভালো করে শিখে যায়, যে প্রকৃতির কাছে গেলে মাদক নিয়ে নেশা করতে হয়। এই পিয়ার প্রেশার এতটাই যে যারা এর মধ্যে ছিলনা, তারাও ঢুকতে বাধ্য হয়। মুক্ত প্রকৃতি হয়ে ওঠে একধরণের লিমিনাল স্পেস' - বা ‘সীমান্তবর্তী মুক্ত অঞ্চল’ - যেখানে কেউ চেনেনা, যা খুশি করা যায় - এক ধরণের ছদ্ম স্বাধীনতার জায়গা। মিশনের এই ছাত্রীদের নিয়ে বিশেষ করে পাহাড় চড়া ক্যাম্পে এধরণের কোন আশংকা নেই। তাই ছাত্রীদের সঙ্গে শাসন নয় সখ্যতা - বেশ উপভোগ করছি। এইসব সময়ে মনে আরও আকাশ পাতাল সব চিন্তা আসে। আজকে শিখলাম দড়ির জাল বাওয়া, দড়িতে হাঁটা আর দড়িতে ঝুলে নদী পেরোনো। কোনো দুর্গম জায়গায় সার্ভে করতে গেলে অথবা কোন ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সময়ে এইসব স্কিল খুব কাজে লাগে। একটা সময়ে খুব ভাবতাম যে আমি আমার স্যার মনতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ রঞ্জন বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মত বা তাঁদের স্যার থর্নবারি, উলরিজ মরগ্যান বা ডেভিস, পেঙ্কের মত পাহাড় নদী চষে বেড়াতে পারিনি। নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারিনি। মনে খুব আফশোস হত। কিন্তু ধীরে ধীরে যতই ক্রিটিকাল বা তারও পরে পোস্ট মডার্ন ভূগোলের সংস্পর্শে এলাম তখন আবার ভাবনাটা খানিকটা বদলে গেল। অনুভব করলাম যে এবল বডিড মেল না হয়েও আমি আমার জীবনে এই পৃথিবীকে দেখেছি এক সংবেদনশীল নারীর চোখে। এটাই বা কম কী! আসলে উইলিয়াম মরিস ডেভিস, ওয়াল্টার পেঙ্ক, ডব্লিউ ডি থর্নবারি বা সি ডব্লিউ উলরিজদের মতো ভূবিজ্ঞানীরা—কিংবা আমাদের বাংলার শ্রদ্ধেয় মনতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ রঞ্জন বসু বা সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্যারেরা যে সময়ে ভূগোল চর্চা করেছেন, তখন বিষয়টার মূল ধারাটাই ছিল পজিটিভিসম (প্রত্যক্ষবাদ) এবং জিওমরফোলজি কেন্দ্রিক। তারও আগে উনিশ শতকে ভূগোল ছিল মূলত পুরুষালি অ্যাডভেঞ্চার এবং যেন একটা সাম্রাজ্য বিস্তারের হাতিয়ার। ধরে নেওয়া হতো, ভূগোল মানেই হলো একজন ‘এবল-বডিড মেল’ বা শারীরিকভাবে শক্তিশালী পুরুষ দুর্গম পাহাড়ে চড়বেন, নদী চষে বেড়াবেন, মানচিত্র আঁকবেন আর নতুন জায়গা ‘আবিষ্কার’ বা জয় করবেন। প্রকৃতি তখন যেন ছিল একটা জ্যামিতিক বস্তু। আর আমি যে আফশোষে ভুগছি, তা আসলে আমার ব্যক্তিগত খামতি নয়, শত বছরের তৈরি করা একটি পুরুষতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যার জন্য আমি নিজেই নিজেকে ‘অভিযাত্রী’ আইডেন্টিটি দিতে পারিনা, মানে কুণ্ঠাবোধ করি। হবিট হাউসের বাইরের আকাশ এখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। আকাশে চাঁদ নেই, তাই হাজার তারার আলো। সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। চলবে...
    রুশ টি সেট আর পেয়ারাতলায় মেম বৌমা - স্মৃতি ভদ্র | অলংকরণ: রমিতছায়া দোলানো দুপুর হোক কিংবা নিহার জড়ানো সন্ধ্যা, বড়ঘরের লালবারান্দা আসলে কখনই বিরান হতো না। সাংসারিক কাজের অবসরে খানিক জিরিয়ে নেওয়ার অজুহাতে অথবা উনুনপাড়ের নুনতেলের গন্ধ গা থেকে মুছে নিজেকে একটু পরিপাটি করে তোলার ইচ্ছা---সেই লাল বারান্দাই হয়ে উঠতো সকলের একমাত্র গন্তব্য। নেহাতই লালমেঝের একহারা বারান্দা। তাতে ঐশ্বর্য বলতে দিনের নানাসময়ে নানারকম ছায়ার আল্পনা ছাড়া আর কীইবা ছিল। কখনও বাইরবাড়ির দেবদারু বাগানের নিছিদ্র ছায়া আবার কখনও প্রকান্ড বরইগাছের আড় পেরিয়ে পেয়ারাগাছের মাথাদোলানো ছায়া, ব্যস্ অতটুকুই। তবুও সে বারান্দা নিজ মহিমায় আমাদের বাড়ির সৌখিন স্থান হয়ে উঠেছিলো নির্দ্বিধায় তখন। কিন্তু সৌখিনতা শব্দটির সঙ্গে তখনও পরিচয় হয়নি আমার। সময়ের সরল রৈখিক পথ ধরে চলতে গিয়ে চারপাশে যা কিছু মিলতো সবই তখন আমার কাছে জীবনের নামান্তর। আর সে পাওয়ায় কখনও বাহুল্য ছিল না। তাই নকশা কাটা কাঠের দুটো থাম, দেয়ালে হেলান দিয়ে নির্ভার দাঁড়িয়ে থাকা ক'খানা পিঁড়ি আর পেতলের ঘটি ভরা জল। এতটুকুই। আমাদের বাড়ির লাল বারান্দার এক জীবনঘনিষ্ঠ ছবি। তবুও সেই সাধারণ বারান্দায় জ্বলজ্বল করতো বাড়ির সকল অন্তরঙ্গ আনন্দ। এজন্যই মনে হয় ঠাকুমা সে বারান্দার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিতেই নকশিকাটা কাঠের থামে ঝুলিয়ে দিয়েছিলো রাশিয়ান ডিম্বাকৃতির একটা আয়না।শুধু অতটুকুই সংযুক্তি। তাতেই সেই লাল বারান্দা সাজঘরের গৌরবটুকুও গায়ে জড়িয়ে নিয়েছিলো অক্লেশে। প্রতিদিন সকালে নিত্যপূজা শেষে নাকে-কপালে তিলক আঁকা ঠাকুমা উনুনের আগুনদিনে পা বাড়াবার আগে সে আয়নায় সামনে দঁড়িয়ে চুলের খোঁপায় আরেকপ্রস্ত চিরুনী বুলিয়ে নিতো বেশ যত্ন করেই। আবার আগুন ঘামে তিলক গলানো সময় ফুরালে কলঘর থেকে কসকো সাবানের ঘ্রাণ সারা উঠোন ছড়িয়ে যখন লাল বারান্দায় এসে দাঁড়াতো ঠাকুমা, তখনও ওই রাশিয়ান আয়নাই ঠাকুমার প্রতিচ্ছবি হয়ে হেসে উঠতো সারাদিনের প্রতীক্ষা শেষে। এরপর তিব্বত স্নো...তিব্বত ট্যালকম পাউডার…তর্জনীর ডগায় ভরিয়ে সিঁদুরের টিপ…উঠোনজুড়ে ঠাকুমার ঘ্রাণ। আর লাল বারান্দায় থামে ঝোলানো আয়নায় পরিমিত লাবণ্যময়তার এক টুকরো স্নিগ্ধ সময়। এরপর বারবেলার নিরালা দুপুর। লালবারান্দায় পশ্চিম আকাশের তেজ কমে আসা রোদ। বরইগাছের গায়ে উটকো বাতাস। ভুল করে উড়ে আসা ডালিমগাছের ঘরছাড়া ফুল। লো ভলিউমের রেডিওর অবিছিন্ন বার্তালাপ। আর আমাদের ভাতঘুমের অপরিবর্তনীয় রুটিন। কিন্তু কিছু কিছু দিনে গড়পড়তা হিসেবেও টান পড়তো। নিরালা দুপুরের শ্রান্ত সময়ও হয়ে উঠতো নির্বাক চালচিত্রের স্থির অবকাশ। সেসব দুপুর ঠিক অন্য দুপুরগুলোর থেকে আলাদা হতো। চিরায়ত দুপুর থেকে সময় চুরি করে ঠাকুমা কাঠের বাক্স থেকে টেনে বের করতো বেশ বড়সড় একটা এ্যালবাম। সাদাকালো ছবির এ্যালবাম। তার পাতা উল্টাতেই থেমে যেতো ঠাকুমার সময়। একদৃষ্টি। লুকোনো দীর্ঘশ্বাস। আর আড়ষ্ট আঙুলে ছুঁয়ে থাকা এ্যালবামের পাতা। দুপুরগুলো কেমন যেন নি:স্ব হয়ে উঠতো।সাহেব কাকু। সেই কবে রাশিয়ায় পড়তে গিয়েছিলেন। আর ফেরেননি। ফিরতো পোস্টাকার্ডের চিঠি, ফিরতো এ্যালবামের ছবি। সেই ছবিতে কতগুলো তরুণ তরুণী। কখনো তারা সমুদ্রের পাড়ে রৌদ্রস্নাত। কখনো পরিপাটি ঘরে আনন্দরত। প্রতিটি ছবিতেই সাহেবকাকুর পাশে পুতুলের মতো দেখতে এক তরুণী। আমার মেম বৌমা। সালটা আশির মধ্যভাগ হবে। হঠাৎ করেই পোস্টাকার্ডের কয়েকটা বাক্য আমাদের বাড়ির উৎসবের অজুহাত হয়ে উঠলো। উঠোনের অন্যপাশে সদ্য গড়ে ওঠা ঘরের দেয়াল বারবার ঝেড়েমুছে পরিস্কার রাখা, উপরের ঘর থেকে পেতলের বড় বড় হাঁড়িকুড়ি নামিয়ে সেসব ধুয়ে রোদে শুকিয়ে রাখা, ধুনুরি ডেকে শিমুল তুলায় বালিশ ভরা---সে এক মহাযজ্ঞ। কারো কথা বলার সময় নেই। দু-দন্ড বসে অবসর উৎযাপন নেই। শুধু আয়োজন আর আয়োজন। ঝুনো নারিকেলের তক্তি বয়ামে ওঠে, কুলের আচার রোদে পড়ে, তিলের কটকটি পাথরের থালে জুড়ায়---তবুও কাজ ফুরায় না।অবশেষে কিছু কাজ বাকী রেখেই বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালো সেই দিন। এসে দাঁড়ালো নীলচোখের রাশিয়ান মেম বৌমা। সৌখিনতা শব্দের সঙ্গে আমার পরিচয় ঠিক সেই মুহুর্ত থেকেই। ধানদূর্বায় বরণ আর লালঝালড়ের তালপাখায় আম্রপল্লব ছোঁয়ানো হাওয়ার আশীর্বাদ শেষে মেম বৌমা লাল বারান্দায় উঠতেই উঠোন ভরে গিয়েছিলো মানুষে। পাড়া পেরিয়ে, গ্রাম পেরিয়ে,, নদী পেরিয়ে সবাই দেখতে এসেছিলো মেম বৌকে। লম্বা জার্ণির ক্লান্তি জড়ানো চেহারায় জ্বলজ্বলে নীল চোখের মানুষটির হাসিমুখ বলে দিয়েছিলো অদ্ভুত সেই পরিস্থিতি আগে থেকেই অবগত করা হয়েছিলো তাঁকে। কেউ অকারণে হাসে, কেউ অবাক চোখে তাকায়, কেউ ছুঁয়ে দেখতে চায়, কেউ ইচ্ছে করেই টিপ্পনী কাটে---বুঝে কিংবা না বুঝেও মেম বৌমার সেই একই হাসিমাখা মুখ। কিন্তু তা আর কতক্ষণ! তাই মেম বৌ দেখার লৌকিকতা শেষে বাড়ির বৌ পা রাখলো বড় ঘরে। মধ্যবিত্ত বাঙালী ঘরে প্রবেশ হলো সীমানাহীন আন্তর্জাতিকতা। মিডি স্কার্ট পড়া মেম বৌ যখন নিত্যঠাকুরের সামনে দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে অদ্ভুত বাংলায় উচ্চারণ করে,টাকুর...তখন হেসে গড়িয়ে পড়া নয়, আদর করে সামলে নেওয়া ঠাকুমা নিজের মাথায় ঘোমটা টেনে বলে ওঠে,রাধাগোবিন্দ...কাঁটাচামচ দিয়ে ইলিশমাছ খাবার বায়না দেখে চিতল মাছে কোরা এগিয়ে দিতে দিতে বলে ঠাকুমাই আবার ত্রাণকর্তা,নাতাশা বৌমা...ঝাল ছাড়া রান্না করেছি মিঠা করে...খাও...কিন্তু মেম বৌমা কি শুধুই বসে বসে এসব আপ্যায়ন নেবে? তা কীভাবে হয়। তাই সবার জন্য নিজে হাতে চা বানানোর বায়না ধরতেই মনিপিসি এগিয়ে এসেছিলো বন্ধু হয়ে। লালবারান্দায় কেরোসিনের স্টোভে নীল আঁচ উঠতেই তাতে বসেছিলো পেতলের খাবড়ি। জল ফুঁটে উঠতেই রাশিয়ান বিশেষ চা পাতা ঘ্রাণ ছড়িয়েছিলো বাড়ির সেই আনন্দময় দিনগুলোর গায়ে আরও একটু খুশি ছড়িয়ে দিয়ে।আর লাল বারান্দায় মহাসমারোহে বেরিয়ে এসেছিলো রাশিয়ান টি সেট। ফুলের ছবি আঁকা সেই টি সেট নাকি ছিল মেম বৌমার সৌখিন কালেকশনের একটি অংশ। বারানভকা নামের কোনো এক অচেনা জায়গা থেকে আগত সেই টি সেট আমাদের বাড়ির অন্যতন সৌখিন অনুসঙ্গ হয়ে উঠেছিলো সেদিন থেকে।তবে সত্যিকারের সৌখিনতা তো ছিল নীল চোখের রাশিয়ান মেম বৌ। কখনো লালপেড়ে গরদ শাড়ি আর কপালে সিঁদুরের টিপ পড়িয়ে বাঙালি বানিয়ে দেবার ইচ্ছা, আবার কখনো উঠোনের উনুনে আতপ চালের ঘি ভাতে কিশমিশ ছড়িয়ে দেবার অনুরোধ---সবকিছুতেই বাড়ির সকলের ছিল অন্য সংস্কৃতির মানুষটিকে বাঙালি বানিয়ে দেবার সুপ্ত আকাঙ্খা। আর মেম বৌ?নীল চোখের তারায় হাসি ভাসিয়ে ক'দিনেই হয়ে উঠেছিলো মধ্যবিত্ত বাড়ির সকলের সৌখিন আত্মীয়।
  • হরিদাস পালেরা...
    হিমাচলের ইতি উতি - ৯ - দ | পার্বতী লেক - পার্বতী ড্যামপুলগা ৭২৫০ ফিট উচ্চতায় আরেকটা ছোট্ট সুন্দর গ্রাম। রাস্তা থেকে গাড়ি সরাসরি পৌঁছাতে না পারলেও কিছু কিছু বাইক অফরোডিং করে উঠে যায়। ফলে পরিবেশ একেবারে কলুষমুক্ত বলা যায় না। নরেশজি বলেছিলেন বারশৈনি বাসস্ট্যান্ড থেকে একটু এগিয়ে একটা পায়ে চলা পাকদন্ডী আছে। সেটা ধরে উঠে গেলে পাইনবনের মধ্যে দিয়ে ছায়ায় ছায়ায় আধঘন্টায় পুলগা পৌঁছে যাওয়া যায়। তা গাড়িতেও মোটামুটি ওই আধঘন্টা চল্লিশ মিনিট মতই লাগল। মানুষের ঘরবাড়ি - পুলগা পার্বতী ড্যাম পেরিয়ে পাহাড়ী রাস্তায় খানিকদূর এঁকেবেঁকে গিয়ে একটা মস্ত গাছের নীচে আরো খান দশবারো গাড়ির পাশে দাঁড় করিয়ে নরেশজি বললেন ওই দেখো সিঁড়ি, ওইকটা উঠলেই পুলগা গ্রাম। তা নেমে দেখলাম ঠিক ওই কটা নয় মোটামুটি তিনভাগে মোট পঁচিশটার মত সিঁড়ি। তবে কোথাও মাটি কোথাও পাথরে পরিস্কার ধাপ কাটা। মাটির ধাপগুলোর একধার ঘোড়ার বর্জ্যে রীতিমত পিছল। সেসব এড়িয়ে গ্রামে পৌঁছে দেখি চারিদিক শুনশান। এখানে জানলার কাচে ধরা দেয় বরফচুড়াএই গলি সেই গলি খানিক হেঁটে এক জায়গায় দেখি রাস্তাটা শেষ হয়েছে পাহাড়ের কিনারায়, প্রায় হাজার খানেক ফুট নীচে পার্বতী চলেছে। আর নেমে যাওয়া ঢালের গায়ে আপেলবাগান। বাগান না বলে বন বলাই ভাল, খুব খেয়াল করলে সরু পাকদন্ডী দেখা যায়। গলির দুধারের বাড়িগুলোর দরজা জানলা বন্ধ। ওই রাস্তা যেখানে শেষ তার ঠিক আগে একটা ছড়ানো উঠোনে কজন মহিলা বসে কিছুর দানা বাছছিলেন। দানাগুলো দেখতে রাজমা আর লোভিয়ার মাঝামাঝি। এর মাঝেই পথ গিয়েছেজিজ্ঞাসা করে জানলাম ওগুলো রাজমাই বটে। ‘'কড়ক ঠান্ড'এর প্রস্তুতি চলছে। ফসল তোলা শেষ হয়েছে গত সপ্তাহে। এখন ঝেড়ে বেছে তুলে রাখা হবে, আগামী এক বছরের সঞ্চয়। এতক্ষণে মানুষের দেখা পেয়ে তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করি পরীবনএর রাস্তা। পুলগায় আমার আসার মুখ্য কারণই হল পরীবন বা Fairy Forest দেখা। ওই মহিলাদের মধ্যে একজন মোটামুটি হিন্দী বলতে পারেন। বাকীরা কিছুটা বুঝলেও হিমাচলি ছাড়া আর কিছু বলতে পারেন না। তিনিই বলেন ওইদিকে গিয়ে একটু হাঁটলেই দেখবে মন্দির। ওটা পেরিয়ে আরেকটু হাঁটলেই খেতি আসবে, খেতি পেরোলেই পরীবন। আবার গলি বরাবর চলি। হিমাচলি কাঠের কাজকরা জানলা, দরজা, কাঠের বাড়ি। কিছু বাড়ি দেখেই বোঝা যায় এগুলো হোমস্টে, সে নামের বোর্ড থাকুক বা নাই থাকুক। তবে হোমস্টে না হলেও হিমাচলের এই সব গ্রামে এসে থাকতে চাইলে দুএকরাত গ্রামবাসীরাই কেউ না কেউ থাকতে দেন। হয়ত একবাড়িতে থাকা কারণ তার এক্সট্রা বালিশ কম্বল আছে, আর একবাড়িতে খাওয়া কারণ তার কাছে অতিরিক্ত একটা কি দুটো পেট ভরানোর সংস্থান আছে। পুলগা যা দেখলাম ইংরিজিতে যাকে বলে dreamy hamlet, একেবারে তাই। খানিক এগিয়ে মন্দির পৌঁছে দেখি দরজা বন্ধ। নারায়ণ মন্দির, গ্রামের লোকজন মনে করে স্বয়ং নারায়ণ গ্রামবাসীকে সর্বদা চোখে চোখে রাখেন, বিপদ থেকে রক্ষা করেন। স্থানীয় ভাষায় অবশ্য নারাইন বলেন এঁরা। চত্বরে চার পাঁচজন যুবক বসে গল্প করছিলেন, আমাকে এগোতে দেখেই সাবধান করেন মন্দিরের দেওয়ালে যেন হাত না দিই। চাইলে দূর থেকে সিঁড়ির ধাপে প্রণাম করতে পারি, কিন্তু সর্বোচ্চ ধাপে যেন পা বা হাত না দিই। নারাইন মন্দির - পুলগাজানা গেল সপ্তাহে একদিন পুরোহিত এসে দরজা খোলেন, পুজো করেন। বহিরাগতরা চাইলে সেদিন নির্দিষ্ট প্রণামী দিয়ে দর্শন প্রণাম ইত্যাদি করতে পারে। আমার প্রণাম ফনামের বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও ছিল না, তবে এরা আমায় একা মহিলা দেখে মুরগি করল কিনা এই খটকাটা ছিল। পরে নরেশজি বললেন অনেক বেশী ট্যুরিস্ট এলে ওসব অত খেয়াল রাখে না, তবে অল্প লোক থাকলে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকে বটে। ওরাই দেখিয়ে দিল পরীবনের পথ। পরীবন পরীবন পরীবন নামখানা সার্থক। পাইন আর দেওদার একদম ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে এমনভাবে মাথা তুলেছে যে আলো আর ছায়া কখনো কাটাকুটি খেলছে তো কখনো লুকোচুরি। পাইনের গাঢ় গন্ধ, দেওদারের ঘন বোতলসবুজ রঙ, আলোছায়ার চিকিমিকি আর হঠাৎ নেমে যাওয়া তাপমাত্রায় গায়ে শিরশিরানি ধরানো ঠান্ডায় ঘোর লাগে। মনে হয় ওই তো কুয়াশারঙা পরী ফুরুৎ করে ভেসে গেল। ওই ওওই যে পরীর ঝিকমিকে ডানাজোড়া নীচের আপেলবাগানের দিকে উড়াল দিল বুঝি বা। ঘোর লাগানো নেশা ধরানো পরীবনসকালে প্রথম সূর্য্যের আলোয় পরীবনকে নাকি এই জগতের বাইরের কোন অলৌকিক জায়গা মনে হয়। অপরূপ সেই আলোছায়ায় হেঁটে বেড়াতে দূর দুরান্ত থেকে মানুষ আসেন এখানে, বিদেশীই বেশী। কেউ কেউ রাত্রেও থেকে যান যদিও থাকার নিয়ম নেই। ঘটে দুর্ঘটনাও। গোটা পার্বতী উপত্যকায় হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া বিদেশীর সং্খ্যা প্রচুর। সেসব ঘটনাকে ঘিরে সত্য মিথ্যায় মেশানো মিথও প্রচুর। মালানার দিকেই বেশী হলেও পরীবনের দিকেও কিছু আছে। ওই মন্দিরের সামনে বসা যুবকরাই জানিয়েছিলেন। পুঁচকে জলপ্রপাতবোধহয় ২ কিলোমিটার মত হাঁটার পরে একটা পুঁচকে জলপ্রপাতের সাথে দেখা হয়। প্রপাত বলে বোসো না একটু চুপটি করে, দেখো কেমন ঠান্ডা জল আমার। আমি বলি তুমি তো এইটুকুনি পুঁচকে। এগিয়ে দেখি আট্টু বড় কাউকে পাই কিনা। প্রপাত অভিমান করে বলে যাও না দেখো সেখানে কেমন গভীইর জঙ্গল। অনেকেই পথ চিনে ফিরতে পারে না, ভুলো হাওয়া তাদের এদিক ওদিক ঘুরিয়ে নিয়ে যায়, পরীরা তাদের লুকিয়ে রাখে। তা বটে কোত্থাও একটা মানুষ নেই আর মোবাইল নেটওয়ার্ক তো নেইই। খানিকক্ষণ বসে ওই পুঁচকে প্রপাতের সাথে খেলা করে ফেরার পথ ধরি। প্রপাত বলে আবার এসো সকাল সকাল, আমার ভাইবোনদের সাথে দেখা করে যেও। আর সাবধানে যাও এখানে অনেক বিছুটি গাছ। সত্যিই তো, আসার সময় খেয়াল করি নি এখন দেখি বনতল বিছুটিময়। কয়েকটার আবার রীতিমত কাঁটা কাঁটা পাতা। এই অঞ্চলে বিছুটিপাতার চাটনিও খায়। সুযোগ পেলে চেখে দেখতে হবে। পুলগা কালগা আর টুলগা তিন বোনের মধ্যে একজনের সাথেই দেখা হল সবে। এবারে যাই বাকী দুজনের খোঁজে। https://youtube.com/shorts/9FcSiAJj_k4?si=QECmYgg-BchZ1VAjকালগার পথকালগা গ্রামে পৌঁছানোর সিঁড়ি সেই পার্বতী ড্যামের কাছে। প্রথম যে সিঁড়ির কাছে গেলাম সেখান দিয়ে তখন ওঠা সম্ভব নয়। টুপটাপ দুমদাম করে পাথর পড়ছে একটু ওপরে। রাস্তা থেকে তা দেখা যাচ্ছে না, মাঝে মাঝে আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আর একজন গ্রামবাসী রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন সবাইকে সাবধান করে অন্য পথে পাঠানোর জন্য। আর একটু এগিয়ে একদম ড্যামের মুখটাতেই আরেকটা সিঁড়ি। ওই মাটিতে ধাপ কাটা, তবে বেশ সরু। পাশাপাশি দুজন যাওয়া প্রায় অসম্ভব। বাঁধের পাশের বোর্ডে যদিও লেখা পার্বতী ড্যাম এন্ড হাইড্রো ইলেকট্রিক পাওয়ার তবে স্থানীয় লোকজন একে বারশৈনী ড্যামও বলেন। ক্ষীরগঙ্গা ট্রেকের শুরু এখান থেকেই হয়। মানে মোটরচালিত যান সে গাড়িই হোক কি বাইক এই পর্যন্তই আসে। এই সিঁড়ি থেকেই হাঁটা শুরু হয়। তোশ থেকেও রুদ্রনাগ জলপ্রপাত হয়ে ক্ষীরগঙ্গা যাবার একটা রাস্তা আছে, তবে সেটা অনেকটা লম্বা আর বেশিরভাগ পথেই গাছের ছায়া বিশেষ নেই। কালগা থেকে যে পথ যায় সেটা অপেক্ষাকৃত কম, পাইন দেওদারের জঙ্গলের বন্য সৌন্দর্য্যের মধ্য দিয়ে যাত্রাপথ। অমন চপলা চঞ্চলা পার্বতীকে বাঁধের বাঁধনে স্থির স্রোতহীন এক নিষ্প্রাণ সবুজ পাথরের মত পড়ে থাকতে দেখে বড় কষ্ট হল। ৮০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার এই কেন্দ্রের ৯ ১২% বিদ্যুৎ হিমাচল প্রদেশেই থাকে। বাকীটা গ্রিডের মাধ্যমে দেশের অন্যত্র যায়। হিমাচল মস্ত বড় রাজ্য, কতটুকুই বা স্থানীয় লোকজন পায়। অবশ্য বাঁধের অন্য উপযোগীতা যেটা, জলসেচ, সেটা এই বাঁধ প্রায় ২৪০০০ হেক্টর জমিতে করে। তাতে এলাকাবাসীর লাভ হয় বৈ কি। কি জানি পার্বতীকে না বেঁধে বা ছোট বাঁধ দিয়ে সোলার প্যানেল বসালে কি বেশী ভাল হত? এটা তো ঘটনা যে এত বাঁধের ফলেই হিমাচলে এত ধ্বস আর বিধ্বংসী বন্যা হয় এখন। এইসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতেই দেখি দুজন ভৌমশাই এসে আমাকে ভাল করে শুঁকছেন। একজন তো পারলে তখুনি গায়ে চড়ে পড়েন। রাস্তার পাশেই একটা ছোট চায়ের দোকান। দোকানি বলেন এদিকেও পাথর পড়ছিল এখন একঘন্টা বন্ধ আছে, এইবেলা ঝটপট উঠে যান। ক্ষীরগঙ্গা যাবেন তো কাল সকালে? বলি না না এমনিই বেড়াতে এসেছি। উঠব কিনা ভাবছি। আসলে একটু একটু ভয় করছিল। যদিও গ্রামের লোকজন জিনিষপত্র পিঠে নিয়ে দিব্বি উঠে যাচ্ছেন। দোকানি হাঁক দিয়ে বলেন এ কাল্লুবাবা দিদিকো গাঁও পৌঁছা দে। ওমা কালোসাদা ভৌবাবু উঠে এগিয়ে এসে প্যান্ট কামড়ে ধরেন আলতো করে। তিনি উচ্চতায় আমার পেট ছাড়িয়ে প্রায় বুকের কাছাকাছি। আমি চমকে সরে যাই খানিকটা। কাল্লুবাবা এবারে মুখোমুখী দাঁড়িয়ে আমায় দেখেন, চোখ মিটমিট করে, জিভ বেরিয়ে আসে অ্যাত্তখানি যেন হাসছেন। কি অপমান দ্যাখো দিকি! আমি ব্যাজার মুখে সিঁড়ির দিকে এগোই। কাল্লুবাবা মহা উৎসাহে পাশের ঢাল বেয়ে দৌড়ে গিয়ে আমার তিন ধাপ আগে আগে চলতে থাকেন। কাল্লুবাআবাআ এরপরে তো ওই হিমালয়ের সর্বত্রই ভৌমশাইরা যেমন করে, পথ দেখিয়ে চলা আর মাঝে মাঝে পেছন ফিরে দেখা আসছি কিনা। দাঁড়িয়ে গেলে পাশে এসে দাঁড়ানো বা বসে পড়া। তবে কাল্লুবাবা কোথাও আমায় ১ মিনিটের বেশী দাঁড়াতে দেন নি। অবশ্য গ্রাম পৌঁছাতে কুড়ি মিনিটের বেশী লাগেও নি। পুলগার মত ঘুমন্ত নয় কালগা। বেশ চনমনে, অজস্র হোমস্টে, বেশ কিছু ক্যাফে, খাবার দোকান, মুদিখানার দোকান, ভ্যারাইটি স্টোর্স। এখানেও গ্রামের গায়ে ঢাল বরাবর প্রচুর আপেলগাছ আর পাইনবন। সম্পূর্ণ মোটরযানমুক্ত হওয়ায় টাটকা তরতাজা পরিবেশ। কালগা ৮০০০ ফিট উচ্চতার কালগা থেকে ক্ষীরগঙ্গা ছাড়াও আরো বেশ কিছু ট্রেক শুরু হয় দেখলাম। বুনবুনি পাস ট্রেক (এটা বেশ চ্যালেঞ্জিং), সার পাস ট্রেক, পিন-পার্বতী পাস ট্রেক(এটাও কঠিন), তেওলা গ্লেসিয়ার হাইক, মানতালাই লেক ট্রেক। এর মধ্যে সার পাস ট্রেকটা নাকি গ্রাহাণ সার্কিটে পড়ে। গ্রাহাণে আমার আগামীকাল যাবার কথা। হোস্টেলে ফিরে ম্যাপটা দেখতে হবে তো। ট্রেক করানোর বেশ কিছু সংস্থাও দোকান সাজিয়ে উপস্থিত। সবমিলিয়ে কালগা বেশ জমজমাট। আপেল বাগান (নভেম্বরে এত সবুজ গাছ খুবই আশ্চর্য্যের ব্যপার) স্থানীয় এক মহিলা বলেন চলো চলো তোমায় জলপ্রপাত দেখিয়ে আনি। শুনলাম অবসর সময়ে এঁরা সকলেই লোকাল গাইডের কাজ করেন। চললাম তাঁর সঙ্গে। উনি দু:খ করে বলেন দ্যাখো তো এত দেরী করে এসেছ সব আপেল শেষ হয়ে গেছে। এখানকার আপেলের যা স্বাদ না, ও তুমি তোমাদের সমতলে পাবে না। কালগা গ্রামটার একটা মজা হল এত দোকান ক্যাফে ঘরবাড়ি সত্ত্বেও এদিক ওদিক করে খানিক এগিয়ে গেলেই একদম শান্ত নির্জন জনশুন্য এলাকা পাওয়া যায়। ওই জলপ্রপাতের কাছটাই যেমন, এক্কেবারে অন্য পৃথিবী। ওওই যে সেই কাঠের ব্রিজকিন্তু জলপ্রপাত অবধি যেতে পারি না। জলপ্রপাতের জল বয়ে আনা নালাটা পেরোবার ব্যবস্থা হল একটা কাঠের ব্রিজ। আর সে ব্রিজটা ওই একমানুষ কি বড়জোর দেড়মানুষ চওড়া হবে। আর তার না আছে রেলিং না আছে নালার দুইপাশে কোন পিলার জাতীয় শক্তপোক্ত কিছু। দূর থেকে দেখেই মাথা বাঁই করে ঘুরে যায়। এ আমি একা পেরোতেই পারবো না, ভার্টিগো ট্রিগার করবেই করবে। দোরমাদিদি হাইকিং স্টিক দেখিয়ে বলে চলে এসো ওইটে ঠুকে ঠুকে এগিয়ে এসো, কুছ নেহি হোগা। না: থাক বাপু। এই বেশ আছি, চল ফিরি। হিমাচলি কাঠের কাজ করা হনুমান মন্দির - কালগাতিনবোনের তৃতীয়জন টুলগা গ্রাম ৭৯০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত খুব শান্ত প্রায় বিচ্ছিন্ন একটা গ্রাম। দোরমাদিদি বললেন পুলগা থেকে ৫ -৭ মিনিটের ছোট্ট একটা চড়াই চড়লেই টুলগা পৌঁছে যাওয়া যায়। কালগা থেকে টুলগার রাস্তাটা একটু দীর্ঘ, প্রায় ১৫ - ২০ মিনিট লাগবে। আমি মনে মনে হিসাব করে বুঝি পুলগা থেকে চড়াইটা খাড়াই হবে, বরং কালগা থেকে সামান্য উৎরাই বা পুরোটাই একই লেভেলে হবার কথা। কাজেই কালগা থেকে সহজ। কিন্তু আমার আজকে আর হাঁটতে ইচ্ছে করছে না। এবারে ফিরি। দোরমাদিদি অবশ্য বলছিলেন টুলগায় গিয়ে আজ রাত্তিরটা থেকে কাল সকালে আরেকটু ঘুরে ফিরে ফিরতে। টুলগায় হোমস্টে পাওয়া যায় ৫০০ টাকাতেই, রাতের খাওয়া সমেত। দিদি কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলেন এখন এই অফ সিজনে গিয়ে একটু বললেই ৩০০ টাকাতেও পেয়ে যাবো। খুবই লোভনীয় অফার নি:সন্দেহে। শীগগিরই আবার আসবো, কয়েকদিন থাকবো বলে নামার পথে এগোই। কাল্লুবাবা কোত্থেকে দৌড়ে এসে হাঁটুতে মাথা ঘষে ল্যাজ ট্যাজ নেড়ে একমুখ হাসি নিয়ে ঠিক তিন ধাপ আগে আগে নামতে শুরু করেন। রাস্তায় নেমে চায়ের দোকানে বসে চা আর মোমো দিতে বলি। কাল্লুবাবা এসে গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। দোকানী কুন্ঠিত হয়ে বলেন শুধু চিকেন মোমো হবে, ভেজ নেই। সে তো খুবই ভাল কথা। নরেশজিকে ডাকতে তিনি এসে জানান ইতোমধ্যেই ৩ কাপ চা খাওয়া হয়ে গেছে আর ভেজমোমোর শেষ প্লেটটা উনিই খেয়ে ফেলেছেন। দোকানীকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি কাল্লুবাবাকে ওঁরা সবাই মিলে কিছুটা ট্রেনিং দিয়েছেন, তবে সে সামান্যই। নিজের বুদ্ধিতেই ও ট্যুরিস্টদের গাইড করে নিয়ে যায় নিয়ে আসে। ফেরার সময় বাঁধ এলাকা ছাড়াতেই পার্বতী আবারো একেবারে নাচতে নাচতে, শেষবেলার সূর্য্যের সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলতে খেলতে চলল সঙ্গে সঙ্গে। নরেশজিকে জিজ্ঞাসা করি এই গ্রামগুলোতে মানুষের সিরিয়াস অসুখ বিসুখ হলে কী করে? বললেন বেশীরভাগ ‘'বৈদ্যজি'র কাছে জড়িবুটি, আয়ুর্বেদ চিকিৎসা করায়। খুব সিরিয়াস কিছু হলে চেয়ারে বসিয়ে বা মোটা কম্বলে শুইয়ে চারপাঁচজন মিলে নামিয়ে আনে গাড়ির রাস্তা পর্যন্ত। তারপর নিয়ে যায় মণিকরণ বা কুলুতে। এমনকি কাসোলেও কোন হাসপাতাল নেই। নরেশজির মেয়ের পা ভেঙেছিল দুই বছর আগে। এক্সরে থেকে প্লাস্টার করা, অপারেশান, প্লাস্টার কাটা সবই কুলুতে নিয়ে করাতে হয়েছে। আমি স্পিতি ঘুরেছি শুনে বলেন আরেকবার চলো আমার অল্টোয় চড়ে স্পিতি ঘুরে আসবে। হেসে বলি নিশ্চয়ই। বাপরে কুঞ্জুম পাস আর গ্রাম্ফু থেকে বাতাল অল্টোয় চড়ে পেরোচ্ছি ভেবেই গা হাত পা ব্যথা করতে থাকে। ওসব হবে না সে তো উনিও জানেন আমিও জানি। কাসোলে গোধুলি হোস্টেল থেকে রাত সাড়ে আটটা নাগাদ বেরোই রাতের খাবার খেতে। ইচ্ছে ছিল মুনড্যান্স ক্যাফে, কিন্তু জব্বর ঠান্ডা তাই সামনেই একটা বড়সড় পাঞ্জাবী রেস্তঁরা দেখে ঢুকে পড়ি। তন্দুরি রুটি আর চিকেনের একটা পাঞ্জাবী প্রিপারেশান খেয়ে শীতটা কমে। শুনশান রাস্তায় একটু হাঁটাহাঁটি করে হোস্টেল। সামনের উঠোনে একটা ড্রামের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে হাত সেঁকছে নিট্টুরা সবাই। ঘরে ফিরে ছবি ভিডিওগুলো দেখি। পরীবন ছেয়ে যায় সমস্ত চেতনা জুড়ে। ধীরে ধীরে ভিডিও, কিছু ছবি ডিলিট করি একসাথে। টিক টিক টিক টিক ডিলিট। থাক কিছু কিছু জায়গা, কিছু মুহূর্ত্ত শুধু স্মৃতিতেই থাক। কাল যাবো গ্রাহাণ। (পরের পর্বে সমাপ্ত)
    বিনোদ ডাক্তারের দাওয়াখানা  - Somnath mukhopadhyay | বিনোদ ডাক্তারের দাওয়াখানা। “ শোন্ বাপু, অত তড়বড়ানি করলে মোটেই চলবে না। শরীরে রোগ বাঁধিয়ে এসেছিস সে খেয়াল আছে? বুঝতে পারছি, শরীরে ঠিক জুৎ পাচ্ছিসনা, কিন্তু আমিই বা কি করি বল? সুঁই না ফোটালে তোর ঐ বিষিয়ে ওঠা পায়ের ব্যথা কমবে না। ” কথাগুলো যার উদ্দেশ্যে বলা সেই মানুষটির নাম নফর চাঁদ, এ তল্লাটে তার ভারি নামডাক ওস্তাদ ঘরামি হিসেবে। আর যিনি বলছেন তিনি হলেন বিনোদ ডাক্তার। কুসুমপুর গেরামে তাঁর দাওয়া খানাতেই চলছে এমন কথোপকথন। আমার এই কাহিনির অনেকটাই থাকবে এঁদের দখলে। তাই গোড়াতেই এদের কথা সেরে নিই। শুরুটা বরং করি নফর চাঁদের কথা দিয়েই। ওস্তাদ ঘরামি। বাঁশ,দরমা,মাটি,কাঠ,শন দিয়ে বাহারি বাড়ি তৈরির কাজে তার জুড়ি নেই। কুসুমপুরের শরীরে যেহেতু এখনও শহুরে আচকান চেপে বসেনি, তাই গায়ে গতরে তার এখনো গাঁ গাঁ গন্ধ। ফলে গেরামের বেবাক খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির ঘরবাড়ি এখনও এই নফর ঘরামির নজরবন্দি। সারা দিনমান সে টেঙস্ টেঙস্ করে হেঁটে হেঁটে চরকি কাটছে গোটা গেরাম জুড়ে। কার‌ও ঘরের চাল থেকে একটা কি দুটো খড় দমকা হাওয়ায় নড়েচড়ে খসে পড়ার জোগাড় হয়েছে কি হয়নি, কিংবা মাটির পুরুষ্টু দেওয়ালের কোথাও একটু হয়তো চটে গেছে, অমনি নফর চাঁদ হাজির। নিজের চাঁদবদনে একরাশ খিল্লি তুলে বলবে - “ও বজেশ্বর দাদা! ছাউনীখান যে খসে পড়ার জোগাড় হলো, দেওয়ালেও দেখছি মাটি খসে ধসে যায়। বলছি কি বজেশ্বর দাদা, এবেলা কাজের চাপ কম আছে, মেরামত করে দিয়ে যাই। এখন অল্পে অল্পে হয়ে যাবে। যত দেরি করবে তত খরচ বাড়বে। যা মাগ্গিগণ্ডার বাজার ! আরে বাপু! বেথাই ভাবছো,মালপত্তরের জোগাড় তো তোমায় করতি হবেনা, নাসিরুদ্দিনকে বলে দেব, কয়েক পণ খড় আর বাঁশ পাইঠে দেবে। পয়সা কড়ির‌ও চিন্তা তেমন কিছু নেই। যতটা পারবে এখন দেবে। বাকিটা রয়েসয়ে দিওখনে। আরে বাপু, অত দোনোমনায় ভুগতে নেই। ওই যে গো শাস্তরে বলেছে না–শুভকাজ কর তাড়াতাড়ি, না হলে জেন, পস্তাবে ভারি!”  নফর চাঁদের মুখে নাগাড়ে এতো কথা শুনে ব্রজেশ্বর হয়তো খানিকটা ফিক্ করে হেসে উঠেছে, ব্যস হয়ে গেল! অজগর সাপ যেমন প্যাঁচে প্যাঁচে পয়জার করে শিকারকে বিবশ করে,নফর চাঁদ ঘরামির‌ও যে তেমনটাই দস্তুর। সাপের হাসি চেনে বেদে, আর মানুষের হাসি দেখে তার মন পড়তে জুড়ি নেই এই নফর চাঁদের। থেমে যাওয়া রেকর্ড আবার চালাতে শুরু করবে। “শোনোগো দাদা, খোদা কসম। নফর চাঁদ কখনও মিথ্যে বলেনা। যা ল্যাজ্য তাই বলে। সেই পাঁচ সণ আগে আমাদের ফুলু রাণীর বে র সময় শেষবারের মতো তোমার এই ঘর ছেয়ে ছিলাম, তারপর তো আর হাত‌ই দিতে হয়নি। মালমশলা খাঁটি হবার এই হলো সুবিধে, কোনো সমিস্যি থাকে না। ইদের সময়ের এক ফালি চাঁদের মতো তোমার ওই গম্ভীর মুখের এক চিলতে হাসিটাকে একটু বড়ো করে মেলে ধরো, তাহলেই আমার শুকনো পেরানে খুশির লহর উঠবে। ঘাড়ডারে একটু কায়দা মতো নাড়তো দিখি। কাল থেকেই লেগে পড়ি। দিন তিনেক তো লাগবেই।” ভাষণের দ্বিতীয় পর্ব শেষ করে এবার একটু জিরিয়ে নেবে নফর।  এরমধ্যেই হয়তো নফরের বাক্যিবাণে বিবশ হয়ে নিজের অজান্তেই সম্মতি দিয়েছে ব্রজেশ্বর, মানে তাকে একরকম বাধ্য করেছে ঘরামি নফর চাঁদ। এবার হাসতে হাসতেই ব্রজেশ্বর বলে ওঠে, তোর্ নাম নফর চাঁদ না হয়ে নাছোড় চাঁদ রাখা উচিত ছিল। আমি এখন থেকে তোকে নাছোড় চাঁদ বলেই ডাকব। কি গোঁসা হবে না তো?” আবারও একগাল হেসে নফর বলে উঠবে, “কি যে বলো বজেশ্বর দাদা, তুমি হলে গেরামের মান্যিগণ্যি বুজরুগ মানুষ, তোমার কথায় রাগ করলি চলবে কেন? আর এই কথায় কথায় গোঁসা করা আমার বাপু তেমন ধাতে সয় না। তাছাড়া গোলাপেরে তুমি যে নামেই ডাকো না কেন, তার সুবাসে কি আর ঘাটতি পড়ে? ও, তুমি আমারে নফর বলো আর নাছোড় বলো, মানুষটার তো তাতে কোন হেরফের হবেনি, তুমি ওই নতুন নামেই আমারে ডেকো”। আপাতত সাঙ্গ হলো বাবু নফর চাঁদ থুড়ি নাছোড় চাঁদ অপেরা প্রযোজিত, পরিচালিত এবং অভিনীত – “ শ্রী বজেশ্বর বধ পালা”। মেঘ ডাকাডাকির পর্ব সমাপ্ত হয়ে একটু একটু করে হাওয়া বদলের আভাস মিলতেই রোগ ব্যাধির প্রকোপ বাড়তে থাকে হু হু করে। এমন সময় বিনোদ ডাক্তারের ব্যস্ততাও বাড়ে খুব। সব তাঁকে একা হাতেই সামলাতে হয় –রোগী দেখা, তার ওষুধ তৈয়ের করা, কখন কোনটা খাবে তা ঠিকমতো বুঝিয়ে দেওয়া বেবাক কাজ একাই সামলে নেয় বিনোদ ডাক্তার। তবে এতো করেও সেভাবে লক্ষ্মীর আশীর্বাদ বর্ষায় না। তাতে যে খুব আক্ষেপ আছে বিনোদের তাও একদমই নয়। মানুষের পাশে থাকার জন্য সবসময় যেন ঢেঙা শরীর আর চাঙ্গা মন নিয়ে মুখিয়ে আছে মানুষটা। লোকজন কি আর সাধে গদগদ হয়ে বলে – “বিনোদ ডাক্তার হলো স্বয়ং ধণ্বন্তরী, একবার অসুস্থ শরীলডারে টেনে হিঁচড়ে তেনার দোরে হাজির হলেই হলো, সব আদি ব্যাধি নিমেষেই পগাড় পার।”  বিনোদ অবশ্য নিজের বড়াই কখনোই করেনা, বরং ইনিয়ে বিনিয়ে কেউ তেমন কথা বলতে শুরু করলেই একগাল হাসি হেসে বলবে, “কি গো কানাইয়ের মা, আমিতো তোমাকে গাল দিইনি কখনও, তাহলে চোত মাসের গাজনের ঢাকের মতো ড্যাঙ ড্যাঙ করে কথা ক‌ইছো কেন? ও বুঝতে পেরেছি, আজ বুঝি শাড়ির আঁচলে নুড়ি পাথর বেঁধে আননি? না এনেছো, বাপু বেশ করেছো। আজ ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি, বুঝেশুনে খেতে হবে। পরশুর মধ্যেই বিলকুল ঠিক হয়ে যাবে। খাড়া হবার খবরটা মনে করে দিয়ে যেও বাপু,না হলে সুঁই ফোটাতে হবে, মনে রেখো।” বিনোদ জানে সুঁই ফোটানোর কথা বললেই কানাইয়ের মায়ের শরীরের রোগ আধখানা কমে যাবে। সব সমস্যার সমাধান ঐ বাঁধা ফর্মুলার ওষুধে হয়না। বিনোদ ডাক্তার একথা বিলক্ষণ জানে। একগাল হাসি হেসে কানাইয়ের মা বাড়ির পথ ধরে। কানাইয়ের মার বয়স হচ্ছে তার ওপর সারাদিন আঁচ জ্বেলে মুড়ি ভাজবে শাশুড়ি আর বৌমা মিলে। সেই মুড়ি বস্তায় ভরে সাইকেলের পেছনে বেঁধে নিয়ে কানাই যাবে সেই দূরের গঞ্জে, বেচতে। বুড়ির হাতের যাদুতে মুড়ি হয়ে ওঠে মুচমুচে, তাজা। কানাইয়ের বৌ, সোহাগীও মাঝে মাঝেই আসে বিনোদ ডাক্তারের কাছে নানারকম পরামর্শ চাইতে। এমন ক্ষেত্রে একাই চলে আসে, সন্ধের দিকে। এই সময়টাতে ডাক্তারবাবু একটু কম চাপে থাকে। আজ‌ও এসেছে। একলাই। বিনোদ কিছু কাগজপত্র নাড়াচাড়া করছিল। চেম্বারের সামনে সোহাগী দাঁড়াতেই একগাল হেসে বিনোদ বলে ওঠে – “এসো মা লক্ষ্মী, আজ হঠাৎ কি মনে করে?” “ বাপের কাছে মেয়ে আসবে, তার জন্য আবার আগাম দরখাস্ত করতে হবে না কি গো ? আজ একটু ফুরসৎ পেলাম তাই ই!”সোহাগীর উত্তর। সোহাগীর এই কথাগুলো মনে ধরে বিনোদের। সেও হেসে বলে, “মেয়ে আমার বেশ রসিয়ে কষিয়ে কথা বলতে পারে দেখছি। তাইতো তোমার কথাখানি মধুর মতো কানে বাজলো, না হলে সারাদিনতো কাটে অকেজো দেহ যন্ত্রের কটকটানি শুনে শুনে। বল মা বল। তোর সমস্যার কথা বল।” “সমস্যার কি আর অন্ত আছে গো কাকা?” গুরুপদর চায়ের দোকানে বসে গরম চায়ের গেলাসে বেশ আয়েশ করে চুমুক চড়াতে চড়াতে কথাগুলো বলে কানাই। তার বেজায় চায়ের নেশা, তবে সোহাগীর অবশ্য চায়ের তেমন নেশা নেই। ভোরবেলায় উঠোনে ঝাড়ু দিতে দিতে এক ফাঁকে জনতা স্টোভে জল চড়িয়ে দেয় সোহাগী। ততক্ষণে কানাইও উঠে পড়েছে। জল গরম হলে সেই চা টা বানিয়ে ফেলে। এ আর তেমন হ্যাপার কাজ কি! কাশি হলে নিজেই যেমন খানকতক বাসকপাতা, তুলসি পাতা আর আদা মিশিয়ে জম্পেশ করে একটা পাচন বানিয়ে নিয়ে ঢকঢক করে গলায় ঢেলে ফেলে, চা তৈরি করাতো তেমনি ব্যাপার না কি! মাপমতো চিনি মেশানোটাই যা একটু ভেবে চিন্তে করতে হয়। কয়েকদিন অবশ্য শরীরটা একটু যেন বেসুরো লাগছে তার। হয়তো হাওয়া বদলের প্রভাব। তবে কানাই জানে, তার শরীর অকেজো হয়ে পড়া মানেই হলো তিনজনের এই সংসারে টলমল হয়ে পড়া। গুরুপদর সঙ্গে অনেক দিনের সম্পর্ক কানাইয়ের। একটা চায়ের দোকান চালায় গুরুপদ। সেটি একেবারে বাস গুমটির লাগোয়া, ফলে সারাদিন ধরেই রকমারি মানুষের ব্যস্ততা লেগেই থাকে, কথা বলার ফুরসৎ পাওয়াটাই সমস্যা। তবুও কানাইয়ের জন্য কিছুটা সময় বের করে নেয় গুরুপদ। আসলে কানাইকে সে পছন্দ করে। গল্পের মধ্যে রস না থাকলে সে গল্প শ্রোতাকে ধরে রাখতে পারেনা। তাই নানান চুটকির মিশেল দিতে হয় থেকে থেকে। আজ‌ও তেমন চটকদারি চালে কথা শুরু করে গুরুপদ। “ বুঝলে কানাই ! খবর পেলাম ক্যানেলের ধারের ঐ বড় জমিতে নাকি হাসপাতাল হবে। এখন জমির মাপজোক চলছে। শহরের বাবুরা এসে নাকি সব দেখেশুনে গেছে। তেনাদের বেশ পছন্দ হয়েছে জায়গাটা ‌। এখন চৌধুরীবাবুদের শরিক সাঙাতদের সঙ্গে দরদাম নিয়ে কথাবার্তা চলছে। এখানে হাসপাতাল হলে আমাদের এই জায়গাটার দর বেড়ে যাবে তরতরিয়ে।” গুরুপদ তার ভাঁড়ার থেকে এই গোপন খবর শুনিয়ে দেয় কানাইকে। হাসপাতালের কথায় কানাইয়ের মনে নতুন কিছু ভাবনা ঢেউ তোলে। সে মনে মনে ভাবে তেমন হলে একবার সোহাগীকে দেখাতে নিয়ে আসবে। চার বছর হতে চললো, সোহাগী তার ঘরে এসেছে, অথচ এখনও তার কোল ভরেনি। এনিয়ে গেরামের লোকজন নানারকম কথা বলে। মা নিজের মুখে কিছু না বললেও কানাই বোঝে যে মোক্ষদাও এসব নিয়ে একটা চাপা চাপ অনুভব করে। সোহাগী অবশ্য এখনো এমন কথায় কান সেভাবে দেয়না। এই নিয়ে কথা তুললেই বলে উঠবে,-- “ও সব আমার আর তোমার ভাবনায় হবেনি। গোবিন্দের ওপর ভরসা রাখো”। তবে কানাই ভাবে সত্যিটা তাকেও বোধহয় ভেতরে ভেতরে কুড়ে কুড়ে খায়। বড় ভালো মেয়ে সোহাগী।  সোহাগীর কথা মনে পড়তেই হঠাৎ করে ব্যস্ত হয়ে পড়ে কানাই। গেলাসে পড়ে থাকা চায়ে দ্রুত চুমুক দিতে দিতে সে গুরুপদকে বলে – “আজ যে কিছু পয়সা পেলে ভালো হয়। কিছু কেনাকাটা করতে হবে।” গুরুপদ কানাই আর তার মুড়ির ব্যাপারে একেবারে দরাজহস্ত। না করেনা। দোকানের ভেতর থেকে টাকা এনে দেয়। দুজনেই জানে যে কোনো সম্পর্কে পারস্পরিক বিশ্বাস‌ই হলো সবথেকে বড় পুঁজি। বিকেল গড়াতেই গিরিজা উনুনে তেল চড়িয়ে চপ ভাজতে শুরু করেছে। গন্ধে গন্ধে চারে ভেড়া মাছের মতো ভিড় করে খদ্দেররা। টাকা কটা প্যান্টালুনের পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেয় কানাই। বেশ খানিকটা পথ পাড়ি দিতে হবে তাকে। চারদিকে অন্ধকার থাকতেই র‌ওনা দিয়েছে নাসিরউদ্দিন। তাই আলো ফুটতে না ফুটতেই সাবেকি গরুর গাড়িতে নধর চেহারার কিছু বাঁশ আর কয়েক কাহন খড় এনে হাজির করে ব্রজেশ্বরের উঠোনে। পৌছেই নাসিরউদ্দিন হাঁক দেয়, – “ও মা ঠাকুরণ! নাসির মোল্লা হাজির হয়েছে গো! সময়মতো জলপাণির ব্যবস্থা করো। অনেক দিন পর এলেম তোমাদের দুয়ারে। আমি এদিকের ফাঁকা জায়গায় সব নামিয়ে রাখছি। নফর চাঁদ এই এলো বলে। নফরের জন্য‌ও দানাপানির জোগাড় রেখ”।  যাকে উদ্দেশ্য করে নসু মিঞার এমন হেঁকে ডেকে কথা ক‌ওয়া, সেই মা ঠাকুরণ সিদ্ধেশ্বরী এতক্ষণে আবির্ভূতা হন। এতো সকালেই তার কলঘরের কাজ সারা হয়ে গিয়েছে। নাসির‌উদ্দিনকে দেখে একটু আদুরে রাগ দেখিয়ে বলেন,-- “যেমন তোরা, তেমন তোদের কর্তা মশাই। বলা নেই কওয়া নেই এসে হাজির হলেই হলো। এখন এই হ্যাপা সামাল দেবে কে? আমার কি আর সেই আগের মতো গায়ে গতরে বল আছে নাকি? কতবার করে তো তেনাকে বললাম – বাপু হে, অনেক কাল হলো। এবার এই কাঁচা বাড়ির মায়া ছেড়ে একটা নতুন পাকা বাড়ি কর। কে শোনে কার কথা? বলে, গিন্নি! এটা বাপ পিতামর ভিটেবাড়ি। রাতারাতি এটাকে বদলে ফেলার হক আমার নেই। থাকো এই খোড়ো বাড়ির বাসিন্দা হয়ে।” সিদ্ধেশ্বরীর এবারের রাগে আর আদর নেই। নাসিরউদ্দিন এ কথার জবাব দেয় না, সে নিজে এক ভিটে হারানো যাযাবর। তাই তার কাছে ভিটে হারানোর যন্ত্রণা অন্য অনুভূতি জাগায়। “বুঝলি রে মা, আমাদের শরীর হচ্ছে একটা জটিল যন্ত্র। বাইরে থেকে দেখে ভেতরের সবটা বুঝতে পারা যায় না। এখনই অত ধৈর্য্য হারিয়ে ফেললে চলবেনা। একটু অপেক্ষা করে থাকতে হবে। তবে আমি হাল ছাড়ছিনা। আর এই ফুল ফোটানোর সব দায় তো তোমার একার নয়। এতে যে কানাইয়ের‌ও একটা বড়ো ভূমিকা রয়েছে।” দাওয়াখানার আলোআঁধারিতে সোহাগীর মুখোমুখি বসে বিনোদ ডাক্তার, ঢাকা মিটফোর্ডের প্রাক্তনী, কথাগুলো বলে কন্যাসমা সোহাগীকে। এই কথার মাঝেই হন্তদন্ত হয়ে কানাই ঢোকে। কানাইকেও বুঝিয়ে বলেন সব। নিজের প্যাডে খসখস করে একটা চিঠি লিখে কানাইয়ের হাতে দেন। “ শোনো কানাই, এই চিঠিটা নাও। সদরে গিয়ে কয়েকটা পরীক্ষা করে আনতে হবে। অত চিন্তার কিছু নেই। সদর হাসপাতালে ডঃ প্রভঞ্জন বোসের সঙ্গে দেখা করে এই চিঠিটা তাঁকে দিও। ও আমার ছাত্র। ওই সব ব্যবস্থা করে দেবে। রিপোর্টগুলো পেলে তারপরের চিকিৎসাটা না হয় আমিই করবো। তার জন্য চিন্তা করতে হবেনা। ” বিনোদের চারপাশে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এক অপার্থিব আলো। সেই আলোর ছটা সোহাগী দেখতে পায়। সে জানে এই আলো বহুযুগের ওপার থেকে আসা কোনো এক অজানা নক্ষত্রের আলো। এ আলো একালে হারিয়ে গেছে।  নিজের বাড়ির বারান্দায় একলাই বসে আছে বিনোদ ডাক্তার। সুনন্দা ঘরের ভেতরে টুকটাক কাজ নিয়ে হয়তো ব্যস্ত রয়েছে। ছেলেটা চলে যাবার পর একা একাই এতোগুলো বছর পার করে দিল দুজনে। নিজে ডাক্তার হয়েও অসুস্থ ছেলেটাকে রক্ষা করতে না পারার গভীর যন্ত্রণা ঘুন পোকার মতো কুড়ে কুড়ে খায় তাঁকে। অন্ধকারের আবছায়ায় চরাচর কেমন রহস্যময় মনে হয়। চোখ বুজে অনেক অনেক পুরনো কথা ভাবতে থাকে বিনোদ। মনে পড়ে ঢাকা মিটফোর্ডের দিনগুলোর কথা। বিপ্লবী বিনয় বসু ছিলেন তাঁর বাবার সহপাঠী। সে সব গল্প শুনতে শুনতেই বড় হয়ে ওঠা। দেশ ভাগের সময় বিনোদ মিটফোর্ডের ইন্টার্ন। দেশ ছেড়ে, ভিটে ছেড়ে সীমানা পেরিয়ে এপারে চলে আসা। সেই থেকেই কুসুমপুরে ঠাঁই নেওয়া। কুসুমপুর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে মন চায়নি বিনোদ ডাক্তারের। যতবার ভেবেছে ততবারই যেন কুসুমপুর অভিমানিনী মেয়ের মতো তাঁকে আটকে রেখেছে। বিনোদ জানে, এঁরা বড়ো অসহায়। ওদের ছেড়ে যাওয়া মানেই হলো এতোগুলো মানুষকে এক অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে যাওয়া।  সন্ধে উতড়ে গেছে অনেকক্ষণ। থানার দেউড়িতে ঢং ঢং করে সাতটার ঘন্টা বাজে। মুনিয়া চা নিয়ে হাজির হয়। এই অনাথ মেয়েটাই এখন সুনন্দার সবসময়ের সঙ্গী। – হ্যাঁরে মুনিয়া, দিদি কোথায়? – দিদিতো এখন উল কাঁটা নিয়ে তোমার জন্য মাফলার বুনছে।– দিদিকে বল, আমি ডাকছি। ঘর থেকে বরং বেতের চেয়ারটা এনে দে। এখানে বসে চা খাক্।সুনন্দা এসে পাশে বসে। দূরের গাছের আড়াল থেকে উঁকি দেয় শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ। বিনোদ সুনন্দার হাতে হাত রেখে বলে, সু একটা গান গাও। তোমার গলায় গান শুনলে মনের সব শূন্যতা ভরে যায়। সুনন্দা কথা বলেনা। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে শুরু করে তাঁর প্রিয় একটা গান। বাহির পথে বিবাগি হিয়া কিসের খোঁজে গেলি, আয় রে ফিরে আয়। পুরানো ঘরে দুয়ার দিয়া ছেঁড়া আসন মেলি বসিবি নিরালায়। ……………… তবু তো আছে আঁধার কোণে ধ্যানের ধনগুলি — একেলা বসি আপন- মনে মুছিবি তার ধূলি, গাঁথিবি তারে রতনহারে, বুকেতে নিবি তুলি মধুর বেদনায়.. চারিদিকের গভীর নিরালা নীরবতাকে ক্ষণিকের জন্য ছিন্ন করে দুটি ব্যাকুল হৃদয়ের নিভৃত বেদনার সুর ছড়িয়ে পড়ে দূর থেকে দূরান্তে…..কুসুমপুর আর নিরালা র‌ইলো না। একটু একটু করে সময়ের হাত ধরে কুসুমপুরের আকাশ, বাতাস, নদী নালা,খাল বিল, জমি জিরেত, বাগ বাগিচা মায় মানুষগুলো পর্যন্ত অন্যরকম হয়ে গেল। কিছু মানুষ যেমন কানাইয়ের মা, শিউলি ফজলুল চাচা, গোলাপী দাসী - যাঁর লীলা কীর্তন গান আর পাঠ শুনতে জমা হতো হাজার হাজার শ্রোতা, হারান হাজরা সবসময় যে মানুষটার কথা মাথায় রেখে যাত্রাপালা লেখা হতো, বিনোদ ডাক্তারের এতো দিনের সঙ্গীনি সুনন্দাও চলে গেছে এই বদলে যাওয়া পটভূমিতে তাঁর একান্ত আপনজন ডাক্তারবাবুকে একলা ফেলে রেখে। বিনোদ ডাক্তার এখনও অভ্যাস বশত চেম্বারে এসে বসেন সন্ধেবেলায়। দু চারজন খুব পুরোনো লোকজন মাঝেমধ্যে এসে খানিকক্ষণ সঙ্গ দিয়ে যায়। কুসুমপুরে এখন নতুন নতুন ডাক্তারদের আনাগোনা, শহর থেকে গাড়ি হাঁকিয়ে এসে কেউ দেখেন চোখ, কেউ কান, কেউ দাঁত, কেউ হয়তো হৃদয় – মানুষের শরীরটাকে এখন খণ্ড খণ্ড করে দেখাটাই নাকি দস্তুর। নব্বই পার করে দেওয়া একজন মানুষের চোখে এসময়ের দুনিয়া একদম আলাদা, একদম। বিনোদ ডাক্তার জানেন এমন পৃথিবীতে তিনি নিতান্তই বেমানান, অচল। এসব নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র আক্ষেপ বা অনুযোগ নেই। কার কাছে অনুযোগ করবে সে! কিন্তু অনুযোগ আছে অনেকের। হঠাৎ করে বদলে যাওয়া সামাজিক অর্থনৈতিক পটভূমিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে অনেক অনেক মানুষ। গ্রামের খোলশ ছেড়ে শহরের মলাটে সবকিছুকে মুড়ে নিতে গিয়ে আজ বিসর্জনের বাজনা বেজেছে তাদের ঘরে। এসব কথা বিনোদ ডাক্তারের মনে তুফান তোলে কিন্তু তিনি জানেন একে রোখা যাবেনা। শহুরে হাওয়ায় হয়তো উপড়ে যাবে এত দিনের শেকড়ের সব বাঁধন। বড় একা মনে হয় নিজেকে।কাল রাতে ঘুমাতে পারেনি বিনোদ। হাজার চিন্তা মাথার মধ্যে জট পাকিয়ে আছে। তাই আজ ভোরেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছেন। এই সময়টাতে নদীর পাড়ে হাঁটতে খুব ভালো লাগে। নদীর বুক চিরে সূর্য ওঠার সময় সমাগত। নতুন একটা সকাল,নতুন একটা দিনের সূচনা হতে চলেছে। প্রতিদিনের চেনা অংশুমালি সূর্যদেবকেও হঠাৎ কেমন অচেনা মনে হয় বিনোদ ডাক্তারের। একটা কচি হাত এসে বিনোদের হাত ধরে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন মুনিয়ার ছেলে বীরসা। খানিক তফাতে মুনিয়া আর সুষেণ‌ও দাঁড়িয়ে আছে। বিনোদ কোনো কথা বলেন না। জোরে, আরও জোরে খালি চেপে ধরেন ছোট্ট বীরসার হাত, কুসুমপুরের ভবিষ্যতের হাত। নতুন সুর্যের আলো এসে পড়ে ওদের ওপর।সোমনাথ মুখোপাধ্যায় জুলাই,০২, ২০২৬.
    ভালো ঝালমুড়ি - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | মাননীয় বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষকে আমার খুব ভালো লাগে। যেরকম দৃপ্ত কণ্ঠ, তেমনই বক্তব্যের জোর। প্রতি জমানাতেই আগের জমানা কত খারাপ ছিল, এই নিয়ে ওঁর কথা শুনেই অনেক কিছু জানতে পারি। এবার একটু বেশিই পারছি। অনেক ভিডিও ঘুরে বেড়াচ্ছে। এক জায়গায় দেখলাম বললেন, রামকে ভোলা যাবেনা, কারণ ওঁর আদি বাড়ি রামরাজাতলা। রামকে কে ভুলে যাচ্ছিল, আমি ঠিক জানিনা। আমাদের ইশকুলে পাঠ্য ছিল "সীতা বিনা আমি যেন মণিহারা ফণী", আমরা কলেজ বেলা থেকে মহায়ন লিখে এবং পড়ে আসছি, কেরেস্তান মধূ দত্ত অবধি মেঘনাদবধ কাব্য লিখে ফেললেন। তবে গুরুবাক্য মহাবাক্য, বলেছেন যখন, নিশ্চয়ই যাচ্ছিল। আরেকটা ভিডিওয় দেখলাম, ওঁকে সামনে বসিয়ে একজন বললেন সৌরভ পালোধীকে বার করে দিতে হবে, চল ফোট। কোনো একটা শিল্পকর্মী সভা-টভায়ই হবে। সেটা ঠিকই আছে। কিন্তু সঙ্গে আরও বললেন, রুদ্রদাকে আমি দেখেছি রাতের পর রাত ঘুমোতে পারেননা। শুনে আমার পথের দাবীর সব্যসাচীর কথা মনে পড়ল। সেই হে বীর, তুমি দেশের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করিয়াছ, ইত্যাদি প্রভৃতি। রুদ্রবাবু শুনে দেখি মিটিমিটি হাসছেন। এই ইনসোমনিয়ার ব্যাপারটা ২১ সালের, না তার আগেও হত, সেটা আর খোলসা হলনা। কিন্তু সবথেকে ভালো যেটা দেখলাম, সেটা অন্য আরেকটা লম্বা বক্তৃতা। প্রথমে বললেন, ব্রাত্য বসুরা গুণী শিল্পী। ওঁরা জেলে থাকবেন না বেলে থাকবেন, সে আইন ঠিক করবে, কিন্তু শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। শুনে আমার দুর্ধর্ষ লাগল। জেলে থাকবেন না বেলে থাকবেন, সেটা আইন না ডিমধারী 'সাধারণ মানুষ' ঠিক করবে, সেটা নিয়ে একটু ধন্দ ছিল, কিন্তু সে ঠিকই আছে। তারপর বললেন, স্বরূপ বিশ্বাসরা শিল্পের কিচ্ছু বোঝেন না, কস্মিনকালেও চাষবাস নেই, শিল্পকে দখল করতে এসেছিলেন। এর চেয়েও খাঁটি কথা আর হয়না। সম্পূর্ণ একমত হয়ে গেলাম। কিন্তু তারপরই এল ক্লাইম্যাক্স। উনি বললেন, এই জন্যই ব্রাত্য বসুরা বেশি অপরাধী। কারণ তাঁরা যা করেছেন জেনেবুঝে করেছেন। ওঁদের ক্ষমা নাই। এইটা শুনে আমি, যাকে বলে বাকরহিত। শুধু বিষয়বস্তুর গুণে না। থ্রোয়িং এবং ক্লাইম্যাক্সের গুণে একটা সাধারণ বক্তব্যই কীরকম সিনেমা হয়ে উঠতে পারে, এ যেন তার জ্বলন্ত হাতেকলমে উদাহরণ। এই জন্যই আমার ওঁকে এত ভালো লাগে। আশা করব এটা উনি চালিয়ে যাবেন। বাম জমানায় গণসঙ্গীত গেয়ে শ্রেণীশত্রুদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন, তৃণ জমানায় বাম অপশাসনকে চিনিয়ে দিয়েছেন, বিজেপি জমানায় নিখুঁত ভাবে চিহ্নিত করেছেন তৃণমূলের অপরাধীদের। আশা করি, পরের জমানায় একই ভাবে বিজেপিরও মুখোশ খুলে খানখান করে দেবেন। এক আধটা জমানায় এক-আধজনকে এরকম করতে দেখেছি, কিন্তু সমস্ত জমানায় এই একই ধারাবাহিকতা? অসম্ভব। ওঁর উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি এবং সর্বাঙ্গীণ কুশল কামনা করি। পুঃ বক্তব্যগুলো কোনোটাই হুবহু না, যেজন্য উদ্ধৃতি-চিহ্ন দিইনি। হুবহু শুনতে গেলে ভিডিও শুনে নেবেন। সাক্ষাৎ অমৃতকাল, আইন আইনের পথে চলছে, বুলডোজার বুলডোজারের পথে। আদালত আদালতের মতো কড়া পর্যবেক্ষণ দিচ্ছে, কোমরে দড়ি দিয়ে হাঁটানো নিজের পথে। কলকাতার মিড-ডে মিলে ডিম থাকছেনা, শুধু ছোঁড়ার কাজে থাকছে। লক্ষ্মীর ভান্ডার আর স্বাস্থ্যসাথী হাওয়া, অন্নপূর্ণা আর আয়ুষ্মান কে পাবেন, কবে পাবেন কেউ জানেনা। এই তো সময়, যখন বিপ্লবীরা শমীকবাবুর থানে গিয়ে হত্যে দিচ্ছেন, বাম কবিরা অটলবিহারী বাজপেয়ীতে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছেন, সায়নী ঘোষ সাদা শাড়ি ছেড়ে টি-শার্টে ফিরে যাচ্ছেন, চাকরি হারিয়ে রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন আরবানায় থাকতে যোগ্যতা লাগে। এই বাজারে প্যানেলভুক্ত চ্যানেলজীবী মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন, হাসি হাসি মুখে ছবি তুলবেন না তো কবে তুলবেন? তিনি তো আর জার্সি বদলাননি, যে দলে ছিলেন তাতেই আছেন। হাতির নাকি দুধরণের দাঁত হয়। একটা খাবার, একটা দেখানোর। গতকাল খবর এসেছে, কাঁকিনাড়ার জনৈক কার্তিক সাউ আত্মহত্যা করেছেন। তিনি ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন ট্রেনে। কাগজে পড়লাম, কয়েকদিন আগে ১৪০০ টাকা ফাইন হয়েছিল, আর পয়লা জুলাই থেকে ট্রেনে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হবে বলা হয়েছিল। তাই অবসাদে তিনি মরণঝাঁপ দেন। এটা উন্নয়নের হাতির খাবার দাঁত, যে দাঁত দিয়ে হাতি তাঁকে খেয়ে ফেলেছে বলে অভিযোগ। অন্যদিকে ডবল ইঞ্জিন সরকার ঝালমুড়ির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং দোকানে গিয়ে ঝালমুড়ি খান, ফোটোশুট হয়। দোকানদার বিখ্যাত হয়ে যান। তারপর সরকার গঠন করে মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং দিল্লি গিয়ে ঝালমুড়ির স্টল দেন। তারও ছবি ওঠে। ভিডিও ওঠে। এটা হল হাতির দেখানোর দাঁত। যেমন সুন্দর, তেমনই মনোমুগ্ধকর। দেখলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।আমরা জেনেছি, অর্থনীতি এতই উন্নত, যে, হকাররা এখন কোটিপতি। টিভিতে হইহই করে শুনেছি সেইসব কথা। যাঁরা বলেছেন, তাঁরা অবশ্য নিজের পেশা ছেড়ে দিয়ে কেউ হকারি করেননি। আমরা আজই জেনেছি, একজন কোটিপতি-সন্তান তিরুপতিতে গিয়ে আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতি নিষ্ঠা প্রদর্শন করে এসেছেন। বিজ্ঞাপনে, খবরে সেই ছবি ছয়লাপ। আমরা হাঁ করে দেখেছি। হকারের খবরটা অবশ্য কোথাও এক কোণে একটুখানি। কোনো অর্বুদপতি তিরুমালায় চুল উৎসর্গ করেন, আর কোনো হকার উচ্ছিন্ন হয়ে জীবন উৎসর্গ করেন, দেখানোর আর খাবার দাঁতের মধ্যে পার্থক্য তো এইটুকুই। একটা খুব বড়, ঝকঝকে। আরেকটা ছোটো, দেখাই যায়না, কিন্তু ধারালো।
  • জনতার খেরোর খাতা...
    লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বনাম অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার - অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায় | বিগত তৃণমূল সরকার ২ কোটি মহিলাকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দিতেন। প্রতি মাসে ১৫০০ টাকা করে হলে বছরে ১৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ বছরে ১৮ হাজার টাকা প্রতি মহিলা পেলে ২ কোটি মহিলার জন্য সরকারের খরচ হত ৩৬ হাজার কোটি টাকা। সরকার বদলে নতুন সরকার এসেছে। নতুন সরকার লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের নাম বদল করে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার করলেন। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের জন্য বাজেট ধার্য করলেন ৩৬ হাজার কোটি টাকা। দেবেন মাথা পিছু ৩০০০ টাকা করে, অর্থাৎ ডাবল। ডাবল টাকা দিতে হলে ২ কোটি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রাপকদের সবাইকে তো দেওয়া সম্ভব নয়। ২ কোটি মহিলাকে ৩০০০ টাকা করে দিতে হলে বাজেট বরাদ্দে ৭২ হাজার কোটি টাকা করতে হত। অতএব ৩৬ হাজার কোটি টাকার মধ্যে যদি দিতে হয়, তাহলে ২ কোটি মহিলা কিছুতেই ৩০০০ হাজার করে পেতে পারে না। পাবে ১ কোটি মহিলা। যোগ্য হোক বা অযোগ্য হোক, পাবেন কিন্তু ১ কোটি মহিলা। তার বেশি একজন মহিলাও পাবেন না। পেতে পারেন না। এই পোস্ট লেখা পর্যন্ত সরকার বাজেট বৃদ্ধি করেছেন বলে শুনিনি। আগামী ৯ মাসের মধ্যে করবেন কি না সে বিষয়েও সরকার কিছু বলেননি। পরের বছরের বাজেটে বরাদ্দ বাড়বে কি না, সেটাও অজ্ঞাত। অত এব যারা পেয়েছেন, তারা পেয়েছেন। যারা পাননি, তারা পাবেন কি না, সে বিষয়ে অঙ্ক মেলাতে পারছি না। তবে ২ কোটি মহিলাই ৩০০০ টাকা পেতে পারে, সরকার যদি কৌশল করে ১ কোটিকে অল্টারনেট করে দেয়। অর্থাৎ এক মাস ১ কোটি, পরের মাসে অন্য ১ কোটি। সেই কৌশল অবলম্বন করেছে কি না, আমার জানা নেই। তবে জুন মাসের শুরুতে যারা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের টাকা পেয়েছিল, তারা কিন্তু জুলাই মাসের শুরুতে টাকা এখনো পাননি। আগামী ১০ জুলাইয়ের মধ্যে যদি না পান, তাহলে বুঝতে হবে কৌশলটা প্রয়োগ হয়েছে।
    কবিতাবাতাস  - Srimallar | এই তো সময়। বৃষ্টি দেখার। এই তো সময়। যখন মেঘ আসছে, শহরকে অন্ধকারে ঢেকে দিতে৷ এই তো সময়। ঘরের জানলা বন্ধ করার বদলে খুলে দেওয়া ভালবেসে। বৃষ্টি। কী ঝড়। কী তাণ্ডব। দুর্যোগের ভয়ংকর রূপ। স্মৃতির সঙ্গে তর্ক এবং কথাবন্ধ শেষমেশ। দুর্যোগ আসছে জন্ম পেরিয়ে। বাইরেটা অন্ধকার। কথাবন্ধ রেখেছি। তবু ভাষা পেয়েই চ’লেছে আমার নবীন কবিতাবাতাস...  
    ইগ্নোজ সেমেলওয়াইজ: মায়েদের "ত্রাণকর্তা" বা "রক্ষাকর্তা" (Saviour of Mothers)  - L P Datta | মধ্যরাতের নিস্তব্ধতাকে ভেদ করে স্যালাইন বোতলের ড্রিপ থেকে বেদনানাশক ওষুধটি ক্যানুলার মাধ্যমে ধীরে ধীরে আমার শিরায় প্রবেশ করছিলো। মিনিট খানেকের ব্যবধানে ঘটে চলা জরায়ুর সংকোচন আর প্রসব-বেদনাকে সাময়িক প্রছন্ন করে ওষুধের প্রভাব অতি ধীরে আমার মস্তিষ্ক কে আচ্ছন্ন করতে সক্ষম হচ্ছিলো। একাধারে তলিয়ে যাচ্ছিলাম নিদ্রার অতলে, অপরধারে প্রসব আসন্নকালে শরীর চাইছিল জাগিয়ে রাখতে। চেতন-অবচেতনের সেই দোলাচলে কেবল আমি নই, প্রতিটি নারীর মনন জুড়ে থাকে একটিই প্রার্থনা তার সন্তান যেন সুস্থ দেহে পৃথিবীর আলো দেখে, সে নিজে যেন নবজাতকের জন্য সুস্থ থাকে। আমিও সেই মুহূর্তে এই প্রার্থনাই করেছিলাম। আমার সন্তানকে নিয়ে সুস্থ দেহে যেদিন বাড়ি ফিরেছিলাম সেদিন ঈশ্বরের সাথে সাথে ধন্যবাদ জানিয়েছিলাম ২০০ বছর পূর্বের এক খ্যাপাটে ডাক্তারকে যাকে বিজ্ঞানের ইতিহাস অভিহিত করে "মায়েদের ত্রাণকর্তা" বা "রক্ষাকর্তা" (Saviour of Mothers) রূপে।১৮৪৬ সাল, ভিয়েনা জেনারেল হসপিটাল; সবাই বলে সন্তান প্রসবের জন্য এখানে এসে ফেরত যাওয়া ভাগ্যের হাতে জুয়া খেলার মতো। মা এবং সন্তান দু ক্ষেত্রেই মৃত্যুহার আকাশছোঁয়া। অকালমৃত্যুকে স্বাভাবিক মেনে নেওয়া সেই হাসপাতালে এক ডাক্তারবাবু ছিলেন যিনিই কেবল এই স্বাভাবিকতা, মৃত্যুর পুনরাবৃত্তিকে মানতে চাইছিলেন না। তথাকথিত সমাজের সভ্য-ভদ্র মানুষের চোখে ক্ষ্যাপাটে সেই মানুষটি কেবলই খুঁজে খুঁজে ফিরতেন মা এবং নবজাতকদের এই অকাল মৃত্যুর কারণ। বেশ কিছুদিনের অধ্যবসায় এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি একটি অদ্ভুত বৈষম্য লক্ষ্য করলেন। হাসপাতালটিতে দুটি প্রসূতি ওয়ার্ড ছিল, একটি পরিচালিত হতো ডাক্তার এবং শিক্ষানবিশ ছাত্র দ্বারা, অপরটি মিডওয়াইফ বা ধাত্রীদের দ্বারা। ডাক্তারবাবু লক্ষ্য করলেন ধাত্রীদের দ্বারা পরিচালিত বিভাগটিতে মৃত্যুহার তুলনামূলক অনেক কম, নবজাতক শিশুদের মধ্যে বা মায়েদের মধ্যে জন্ম-পরবর্তী চাইল্ডবেড ওরফে পিউপেরাল ফিভার জনিত সংক্রমণের হার অনেক কম। অপরধারে ডাক্তার পরিচালিত বিভাগটিতে সুস্থ গর্ভবতী মায়েরা হাসপাতালে প্রবেশ তো করতেন, কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যুকে আলিংগন করতেন। মৃত্যু নিয়ে সকলেরই নিজস্ব ধারণা ছিল; দূষিত বাতাস? অতিরিক্ত ভীড়? নাকি কোন খাবার? কোন তথ্য বা ধারণাই একে অন্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলনা। কেবল সেই পাগলাটে ডাক্তারবাবু উপলব্ধি করলেন দুটি বিভাগের মধ্যে পার্থক্য এটুকুই, ডাক্তার এবং শিক্ষানবিশ ছাত্ররা ময়নাতদন্ত সেরে সরাসরি প্রসূতি বিভাগে উপস্থিত হতেন প্রসবজনিত সহায়তা প্রদানে, ধাত্রী নারীরা কোন ময়নাতদন্তে অংশগ্রহণ করতেন না। ডাক্তারবাবু অনুমান করলেন অদৃশ্য  "মৃতদেহ-কণা" মৃতদেহ থেকে জীবিতদের মধ্যে  বাহিত হয়ে এই সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। ১৮৪৬ সাল, আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগের কথা, জীবাণু বা আণুবীক্ষণিক জীব সম্বন্ধে প্রাথমিক কোনো ধারণাই তখনও ছিল না। সেই সময়কালে ডাক্তার ইগ্নোজ স্যামেলোয়াইজ এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিলেন৷ ময়নাতদন্ত শেষে সমস্ত ডাক্তারদের ক্লোরিনযুক্ত চুনের দ্রবনে হাত ধুয়ে তবেই প্রসূতি বিভাগে রুগীদের চিকিৎসার নিদান দিলেন। একটি ছোট্ট অভ্যেস, ফলাফল অলৌকিক। মৃত্যুর হার কমে ১% এর অল্প বেশি, ১.২%তে থেমে গেলো। ১৮৪৮ সালের মার্চ এবং অগাস্ট মাসে মৃত্যুর হার শুন্য!কি ভাবছেন! সবাই ডাক্তারবাবুকে ধন্য ধন্য করছেন! তিনি উদযাপনের আশা করেছিলেন, ঠিক যেমন আপনি-আমি করছি। পরিবর্তে কর্মক্ষেত্রের সহকর্মীদের মধ্যকার কূটনীতির শিকার  হলেন। পুরুষ শাসিত সমাজে তিনি কিনা পুরুষ ডাক্তারদের হাতকে অপরিশোধিত বলছেন! ধাত্রী নারীদের অগ্রাধিকার দিচ্ছেন পৃথিবীতে নতুন প্রাণ প্রতিষ্ঠায়! তথাকথিত শিক্ষিত সমাজ তাঁকে অবমাননা করেই ক্ষান্ত হলো না, অর্থহীন খামখেয়ালি ধারণার জন্ম দেওয়ার অপরাধে ১৮৪৯ সালে ডাক্তারবাবুর নবায়ন বন্ধ করা হলো, তিনি হাসপাতালে চিকিৎসার অধিকার হারালেন। শিক্ষকতার জন্য আবেদন করলেন, আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলো। এই প্রতিকূল সমালোচনা ডাক্তারবাবু সহ্য করতে পারেননি। ভিয়েনা ছাড়তে হলো কিন্তু তিনি হাল ছাড়লেন না। ক্রমাগত তথাকথিত সেই খুনি সিস্টেমের বিরুদ্ধে দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকীয় কলামে খোলা-চিঠি লিখে চলেছিলেন। ১৮৬৫ সাল, সহকর্মীরা অপর একটি হাসপাতাল পরিদর্শনের নাম করে নিয়ে গিয়ে জোর করে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করে দিয়ে এলেন। একজন সুস্থ, কর্মক্ষম মানুষ কত অসহায়! মানুষটার দোষ এটাই তিনি তথাকথিত সিস্টেমের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন? আমরা মধ্যবিত্ত মানুষ পোয়েটিক জাস্টিসে বড়ই বিশ্বাস করি। সমস্যা হলো পোয়েটিক জাস্টিসের উদাহরণ বাস্তব জীবনে পাওয়া মুশকিল কেবল নয়, বহুলাংশেই অসম্ভব। যে মানুষটি অসংখ্য মা এবং শিশুদের মধ্যে জন্ম-পরবর্তী সংক্রমণ নিরাময় করলেন, অগণিত জীবন বাঁচালেন, তিনিই সেই মানসিক হাসপাতালের কর্মীদের দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে সেপসিস হয়ে একই সংক্রমণে এক পক্ষকাল পর মারা গেলেন। আরও অনেকগুলি বছর পার করে পাশের দেশ ফ্রান্সে আরেক বিজ্ঞানী লুই পাস্তুরের জীবাণুতত্ত্ব প্রমাণ করবে সংক্রমণের মূলে রয়েছে আণুবীক্ষণিক জীব। অপর প্রতিবেশী দেশ ব্রিটেনে ডাক্তার বিজ্ঞানী জোসেফ লিস্টার তার অগ্রজকে মান্যতা দেবেন। আজ সকল ডাক্তার, নার্স হাত ধুঁয়ে জীবাণুমুক্ত করে কাজ শুরু করেন, কোভিড-কালে হাত ধোঁয়াই ছিল সংক্রমণ ঠেকানোর প্রাথমিক এবং প্রধান নিদান। পয়লা জুলাই, হাঙ্গেরিয়ান চিকিৎসক ইগ্নোজ সেমেলওয়াইজের জন্মদিন। কিছু মানুষ থাকেন যাদের ভাবনা যুগের থেকে, নিজের সময়ের থেকে এগিয়ে থাকে এবং সেই ভাবনাই সমগ্র মানব- সমাজ, সভ্যতাকে কয়েকশত বছর এগিয়ে দেয়। সেই মানুষটি হারিয়ে যান কালের সরণীতে, কিন্তু তাঁর কীর্তি লিপিবদ্ধ হয়ে রয়ে যায় সময়ের আখরে। কিছু অহংকারী পুরুষের স্বার্থে বলিপ্রদত্ত এক বিজ্ঞানীকে এক মায়ের প্রণাম। বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে তিনি ভুল ছিলেন না, কেবল যুগের অনেকখানি এগিয়ে ছিলেন।
  • ভাট...
    commentশসা | আমি ডাক্তার নই। তবুও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি। কোরোনা ভ্যাক্সিন নেওয়ার পর থেকে মানুষের, বিশেষ করে বয়স্কদের চিন্তা শক্তি বেড়ে গেছে। এবং ডোপামিন ক্ষরন কম হচ্ছে।
    commentতরমুজ | আমি ডাক্তার নই। তবুও বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি। কোরোনা ভ্যাক্সিন নেওয়ার পর থেকে মানুষের, বিশেষ করে বয়স্কদের চিন্তা শক্তি কমে গেছে। এবং ডোপামিন ক্ষরন বেশি হচ্ছে।
    commentহেঁয়ালি | হ্যাঁ কৃষ্ণ সেকালের অ্যাই অবতার ছিলেন। ওনার সঙ্গে ঘন্টাখানেক চ্যাট করার পরেই ব্রেনওয়াশড অর্জুন হাতে গান্ডীব তুলে কুরুক্ষেত্র শুরু করেন। গীতা আদতে অ্যাই স্লপ।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত