এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানুষদের নিয়ে কথা কে বলবে? - সুমন সেনগুপ্ত | অলংকরণ: রমিতদ্যা টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রাক্তন মুখ্য সম্পাদক রাজাগোপালের বহুদিনের পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণ হয়নি, পুলিশ যে তথ্য যাচাই করে, সেই তথ্য যাচাইতে জানা গেছে যে তাঁর নাম যেহেতু ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না, তাই তিনি ভারতীয় কি না, তার স্বপক্ষে তাঁরা কোনও প্রমাণ নাকি দাখিল করতে পারেনি, তাই তাঁরা বিরূপ রিপোর্ট দিয়েছে। যা বোঝা যাচ্ছে দেশের অন্যতম বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং সম্পাদক রাজাগোপালের নাম গত ২০২৬ সালের ভোটার তালিকায় না থাকার ফলে, তাঁর পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণ হবে কি না, তা প্রশ্নের মুখে।এই বিষয়ে তাঁর নিজস্ব একটি বয়ান সমাজমাধ্যমে ঘুরছে। সেই বক্তব্যের বেশ কিছুটা অনুবাদ করে পড়া প্রয়োজন। আমাদের মধ্যে অনেকেই হয়ত তৃণমূলের অপশাসন গিয়ে বিজেপির শাসন ব্যবস্থা আসাতে উল্লসিত, কিন্তু সেই ভোটে কি সত্যিই মানুষের রায় প্রতিফলিত হয়েছে, এই প্রশ্নও টুকটাক উঠছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ইভিএম পুড়ে যাওয়ার ঘটনা, সেই প্রশ্নে আরো ঘৃতাহুতি দিয়েছে। তিনি লিখেছেন - “এই বছরের মার্চ মাসে, কলকাতার বালিগঞ্জ নির্বাচনী এলাকার ভোটার তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দেওয়া হয়। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে, ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়ায় ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আমার বা আমার প্রয়াত বাবার কারও নামই খুঁজে পাওয়া যায়নি। আমার বাবা ছিলেন একজন গান্ধীবাদী ব্যক্তিত্ব, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক এবং কেরালার ‘গান্ধী স্মারক নিধি’র প্রাক্তন রাজ্য সম্পাদক। তিনি ২০১৬ সালে প্রয়াত হন। তাঁর মতো একজন সচেতন ও দায়িত্বশীল ভোটারের নাম কীভাবে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে, তা আমার বোধগম্য নয়।পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ২৭ লক্ষ বাসিন্দার মতোই, তথাকথিত ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’র (Logical Discrepancies) কারণে আমার নামও তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আমার ম্যাট্রিকুলেশন বা মাধ্যমিক পরীক্ষার নথি জমা দেওয়া সত্ত্বেও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি; বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলোর একটিতে আমার আপিলটি বিচারাধীন রয়েছে। এর ফলে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে আমি ভোট দিতে পারিনি।আরও হতাশাজনক হলো আমার পাশপোর্ট পুনর্নবীকরণের আবেদনের বিষয়টি। যদিও ১৯ মার্চ, ২০২৬-এ আমি বায়োমেট্রিক সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছিলাম, তবুও পুলিশ ভেরিফিকেশন বা যাচাইকরণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয়নি কারণ ভোটার তালিকায় আমার নাম আর নেই। বেশ কিছু বিকল্প নথিপত্র জমা দেওয়া সত্ত্বেও আমাকে জানানো হয়েছে যে সেগুলো অপর্যাপ্ত। বস্তুত, আজ (২৭ জুন, ২০২৬) পাসপোর্ট নবায়নের জন্য বায়োমেট্রিক দেওয়ার পর ১০০ দিন অতিক্রান্ত হলো। গত সপ্তাহে পাসপোর্ট প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায় যে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি উল্লেখ করে কলকাতা পুলিশ একটি ‘প্রতিকূল প্রতিবেদন (adverse report) পাঠিয়েছে। আমাকে অবিলম্বে কলকাতার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে (Regional Passport Office) হাজির হতে বলা হয়েছে; কিন্তু আমি যখন সাক্ষাতের জন্য সময় (অ্যাপয়েন্টমেন্ট) চাইলাম—যা ছাড়া সেখানে প্রবেশ করা কঠিন—তখন আমাকে ১৭ জুলাই, ২০২৬-এর তারিখ দেওয়া হলো।এরই মধ্যে, ক্যালিফোর্নিয়ায় কর্মরত সাংবাদিক আমাদের মেয়ের বিয়ে সম্পন্ন হলো সান ফ্রান্সিসকোতে, ১৭ এপ্রিল। বলাই বাহুল্য, বৈধ দশ-বছরের মার্কিন ভিসা থাকা সত্ত্বেও, একটি সচল পাসপোর্ট ছাড়া সেই বিয়েতে আমার পক্ষে উপস্থিত হওয়া অসম্ভব ছিল।বাস্তব বিচারে, আমি এখন এক ধরণের নাগরিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি—যদিও সরকার সম্প্রতি পুনর্ব্যক্ত করেছে যে পাসপোর্ট নাগরিকত্বের কোনো প্রমাণ নয়। আমার সারাদিনের সময়ের বড় একটা অংশ এখন ব্যয় হচ্ছে পারিবারিক নথিপত্র পুনরুদ্ধার এবং কয়েক দশক আগের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জোগাড় করার প্রচেষ্টায়... আমার দিন শুরু হয় ভোটাধিকার সংক্রান্ত আবেদনের বর্তমান অবস্থা এবং পাসপোর্টের আবেদনের গতিবিধি (ট্র্যাকার) যাচাই করার মধ্য দিয়ে। এরপর আমি সেই কলেজে চিঠি লিখি যেখানে আমার মা ১৯৬৫ সালে শিক্ষকতা করেছিলেন এবং সেই স্কুলে যেখান থেকে তিনি ১৯৫৯ সালে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন; উদ্দেশ্য হলো এমন কোনো নথিপত্র জোগাড় করা যা তাঁর অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়। স্কুলটি এ ব্যাপারে বেশ সহায়তা করেছে, কিন্তু কলেজটি তা করেনি। একইভাবে, আমি কেরালার মদ্যপান-বিরোধী প্রচারণায় যুক্ত কর্মীদের সাথে কথা বলি—একটি অনলাইন গ্রুপে ঘটনাক্রমে এক কর্মীর নাম পাওয়ার পর আমি যে তালিকা তৈরি করেছিলাম, তা ধরেই এগোচ্ছি। আমি তাঁদের কাছে এমন কোনো সংবাদপত্রের কাটিং বা ছবি চাইছি যাতে অবৈধ মদের দোকান ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আমার বাবার প্রচারণার প্রমাণ পাওয়া যায়।আমার এই সব প্রচেষ্টায় কিছু ঘনিষ্ঠ বন্ধু এবং বিশিষ্ট ব্যক্তি সহায়তা করেছেন। তবে কোনো সংবাদমাধ্যম বা সাংবাদিক সংগঠন বা গিল্ড (যার আমি সদস্য নই) আমার এই পরিস্থিতির প্রতি কোনো আগ্রহ দেখিয়েছে কি না, তা আমার জানা নেই। একজন প্রবীণ সাংবাদিক আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই ব্যতিক্রমী নয়; কারণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লক্ষ লক্ষ ভারতীয়কে নিত্যদিনের বাস্তবতা হিসেবে এই ‘প্রত্যাখ্যান’ এর মুখোমুখি হতে হয়েছে। আমি সেই যুক্তি মেনে নিয়েছি।নিজেকে ভুক্তভোগী বা ‘ভিক্টিম’ হিসেবে তুলে ধরা আমার উদ্দেশ্য কখনোই ছিল না। বরং আমি একটি বৃহত্তর বিষয়কে সামনে আনতে চেয়েছি: সাংবাদিকতায় পেশাগত জীবন কাটানো এবং মোটামুটি পরিচিত একটি সংবাদপত্রের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা কোনো ব্যক্তি যদি এমন সব সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন, তবে সমাজের প্রান্তিক মানুষগুলোকে কী ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা সহজেই অনুমেয়। আমি কি কোনো সংবাদপত্রের দ্বারস্থ হয়েছি? না, কারণ আমি চাই না বিষয়টি কেবল আমাকে কেন্দ্র করেই কোনো ইস্যু হয়ে উঠুক। সম্পাদক ও সাংবাদিকরা কি আমার এই সমস্যার কথা জানেন? অবশ্যই, তাঁদের অনেকেই জানেন। আর যদি না-ই জানেন, তবে তাঁদের এই পেশায় থাকা উচিত নয়—আপনারও কি তাই মনে হয় না?তবুও, এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পূর্ণ নীরবতা আমার সেই সন্দেহকেই নিশ্চিত করেছে—যা এখন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে আরও জোরালো হয়েছে—যে তথাকথিত মূলধারার সাংবাদিকতার সাথে আমার জীবনের খুব একটা সম্পর্ক নেই। আমি এখন আর কোনো সংবাদপত্র ‘পড়ি’ না। কোনো কোনোটির ওপর হয়তো চোখ বুলিয়ে নিই, কিন্তু কদাচিৎ এমন কিছু খুঁজে পাই যা আমার আগ্রহ জাগিয়ে তোলে।’’রাজাগোপালের এই বয়ানটি হয়ত, অনেকেই পড়েছেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও নির্লিপ্ত থেকেছেন, ঠিক যেমনটা ভোটের আগে, কিংবা আসামের এনআরসি’র সময়ে ছিলেন। তখন হয়ত বেশীরভাগ মানুষ ভেবেছিলেন, এই সমস্যা শুধু মুসলমানদের বা ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের নিয়ে হবে, তাই তখন খুব বেশী শোরগোল করেননি। সেই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোও খুব বেশী সোচ্চার হয়নি, তারা সবাই ব্যস্ত ছিল নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারে। তৃণমূল কংগ্রেসের ধারণা ছিল, যে ঐ ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনীতে বাদ গেলেও মানুষের সমর্থন তাঁদের দিকে থাকবে। সেই জন্যেই তাঁদের শ্লোগান ছিল, ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা’। অথচ তাঁদের জনভিত্তি যে কমছিল, তা তাঁরা এঁচে উঠতে পারেনি। ওদিকে বামেদের একাংশ, বিশেষ করে সিপিআইএম ভেবেছিল এই প্রক্রিয়াতে তৃণমূলের ক্ষতি হবে, সুতরাং খুব বেশী হইচই না করলেও চলবে, তাই তাঁরা দায়সারা ভাবে বিরোধিতা করেছিল। এমনকি আইএসএফের পক্ষ থেকেও নৌশাদ সিদ্দিকি’র একটা বক্তব্য এসেছিল, ‘কোনও নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা নেই মুসলমানদের বেনাগরিক করার, প্রয়োজনে গোরের মাটি এনে প্রমাণ দেওয়া যাবে তাঁরা এই দেশের বাসিন্দা’।যদি ঘটনা পরম্পরা পরপর সাজানো যায়, তাহলে দেখা যাবে, প্রাথমিক যে খসড়া তালিকা প্রকাশিত হয়, সেখানে ৫৮ লক্ষ নাম বাদ যায়, তার মধ্যে, মৃত, স্থানান্তরিত এবং অন্য ইনিউমারেশন ফর্ম জমা না দেওয়া ব্যক্তিদের নাম ছিল। যদিও সেই তালিকা নিয়েও অনেক প্রশ্ন ছিল তবুও অনেকে এই বিষয়টা মেনে নিয়েছিলেন। এরপর নির্বাচন কমিশন আসরে নামে তাঁদের ব্রহ্মাস্ত্র নিয়ে, নামের বানান, বাবার নাম বা মায়ের নাম বা পরিবারের অন্য কোনও ব্যক্তির নাম যদি ২০০২ সালের তালিকায় না থাকে, তাঁদের শুনানিতে ডাকা হয়। বলা হয়, এই ব্যক্তিদের ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ আছে, এবং নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সামনে উপস্থিত হয়ে তাঁদের প্রমাণ করতে হবে, তাঁরা এই দেশের নাগরিক এবং ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে তবেই তাঁরা তাঁদের নাম তুলতে পারবেন।যদি খেয়াল করা যায়, এই শুনানিতে উপস্থিত হতে বলা হয়, সেই সংখ্যাটা ছিল প্রায় ১.৫ কোটি। বিভিন্ন শুনানি কেন্দ্রে তখন যাঁরা উপস্থিত হচ্ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রাদায়ের মানুষ ছিলেন। বৃদ্ধ থেকে আশীতিপর অসুস্থ মানুষজন ও ছিলেন। রাজ্যের প্রথম সারির প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রে প্রায় প্রতিদিন এই হয়রানির ছবি প্রথম পাতায় থাকলেও, একমাত্র গণশক্তি পত্রিকা প্রথম ৬ দিন সম্পূর্ণ নীরব ছিল। তাঁরা একটি কথাও বলেনি, বা একটি ছবিও প্রকাশ করেনি। শুধু তাই নয়, নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে চুপ থেকেছে। ততদিনে বিষয়টা আদালতে গেছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি চলছে। এই প্রক্রিয়া আদৌ সাংবিধানিক কি না, তা নিয়ে নানান প্রশ্ন উঠে গেছে। এই হয়রানি নিয়েও কথা হয়েছে, কিন্তু প্রধান বিচারপতি বারংবার বলে গেছেন, কোনওভাবেই এই প্রক্রিয়া বন্ধ করা যাবে না। তিনি মেনে নিয়েছেন মানুষের হয়রানি হচ্ছে, তার জন্য তিনি বেশ কিছু পন্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেন, কিন্তু নির্বাচন কমিশন আদৌ কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব পরীক্ষা করতে পারে কি না সেই রায় তিনি স্থগিত রাখেন। অন্য আরো একজন যে বিচারপতি এই মামলা শুনছিলেন, ঘটনাচক্রে তিনি বাঙালি হওয়া সত্ত্বেও এবং বাঙালির নামের পদবী সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গী স্পষ্ট করলেও, এই ‘লজিকাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ বা যৌক্তিক অসঙ্গতি যে একেবারেই অযৌক্তিক তা স্পষ্ট করে বলেননি।ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে। প্রায় ২৭ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছে চূড়ান্ত তালিকা থেকে, যাঁরা এবারের বাংলার নির্বাচনে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি। সবচেয়ে লজ্জাজনক বিষয় হল, প্রধান বিচারপতি এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেছেন, এইবার ভোট দিতে না পারলেও পরের বার দিতে পারবেন এই মানুষেরা। সঙ্গে আরো বলেছেন, যে এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে নাগরিকত্বের কোনও যোগ নেই। এই ২৭ লক্ষ মানুষকে বলা হয়েছে ট্রাইবুনালে আবেদন করতে। ততদিনে কমিশন নির্বাচন ঘোষণা করে দিয়েছে। দেখা গেছে প্রায় ৩৪ লক্ষ মানুষ ঐ ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন। তারপরে নির্বাচন হয়েছে এবং বিজেপি ২০৫টি আসন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে।তারপরে আরো অনেক ঘটনা ঘটেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙেছে। যে মানুষটি নিজে একটা রাজনৈতিক দল তৈরি করেছিলেন, সেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল ধরে রাখতে পারেননি। কিন্তু সেইসব বাদ দেওয়া গেলেও ঐ বাদ যাওয়া মানুষদের কথা সবাই ক্রমশ ভুলতে বসেছে। তারপরে নতুন করে আবার এই বিষয়টা এখন সামনে আসা শুরু হয়েছে। নতুন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে বাদ যাওয়া মানুষদের আর কোনও সরকারি সুযোগ সুবিধা দেওয়া যাবে না। রেশন থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সুবিধা কোনটাই যেন এই ভোটার তালিকা থেকে জোর করে বাদ দেওয়া মানুষেরা না পান, সেই নির্দেশিকা জারি হয়েছে। তার মধ্যে বিদেশ মন্ত্রক থেকে বলা হয়েছে, যে পাশপোর্ট থাকা মানেই সেই ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক তা প্রমাণিত হয় না। হয়ত এই আইন আগেও ছিল, কিন্তু এই সময়ে এই কথা বলা এবং টেলিগ্রাফ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদকের সাম্প্রতিক বার্তা দেখিয়ে দেয়, অলিখিত ভাবে হলেও দেশের সরকার ঐ ভোটার তালিকাকেই প্রামাণ্য নথি হিসেবে ধরছেন।হয়ত রাজাগোপাল তাঁর নিজের সমস্যার সমাধান করে ফেলতে পারবেন। তাঁর সেই সামাজিক সুবিধা আছে, কিন্তু যে অসংখ্য মানুষের নাম বাদ গেছে, তাঁদের কী হবে? তাঁদের সম্পর্কে সিপিআইএমএল এবং সিপিআইএম ছাড়া কংগ্রেসও এখনো কোনও জোরালো কিছু বলেনি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভোটার তালিকা থেকে যাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের সব ধরনের জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। বাংলায় এই প্রক্রিয়াটি চলছে এবং এরপর হিন্দি-বলয়ের বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতেও এর পুনরাবৃত্তি ঘটবে। এর ফলে কেবল মুসলিমরাই নয়, বরং বহু দরিদ্র পরিবারও মারাত্মক পরিণতির সম্মুখীন হচ্ছে। এটি কোনো সাম্প্রদায়িক সংঘাত নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি শ্রেণি বা জাতিগত (বর্ণভিত্তিক) ইস্যু। তাছাড়া, রাষ্ট্র এবং তার মদতপুষ্ট শক্তিগুলো যখন সংখ্যালঘু ও সামাজিকভাবে বা অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করে, তখন তাকে আর কেবল 'সংঘাত' বলা চলে না। জেনে রাখুন, বৈষম্যের মাত্রা আরও এক ধাপ বেড়ে গেছে। রাজনৈতিক দলগুলো ছাড়া ভোটাধিকার থেকে বাদ যাওয়া মানুষদের নিয়ে কথা কে বলবে? সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে দেশের সর্বোচ্চ আদালতও এই বিষয়ে এখনো অবধি কোনও কথা বলেনি। তাহলে এই মানুষদের কী হবে, এই বাদ যাওয়া মানুষেরা তবে কি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়েই থেকে যাবেন? জনগণনা থেকে তাঁরা বাদ পড়বেন না তো? একটা ‘অযৈক্তিক’ যুক্তি এত মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে, আর রাজনৈতিক দলগুলো কিচ্ছু করবে না?
    মধুবাতা ঋতায়তে - শারদা মণ্ডল | ছবি - Imagen 3ছাঁচনপুরের আত্মবিশ্বাসের কথাই যদি উঠলো তবে আর একটা আত্মবিশ্বাসের গল্প শোনাই। ঘটনাটা আমার ভৌগোলিক জীবনে অনেক দিক থেকেই খুব স্পেশাল। প্রথম ব্যাপার হচ্ছে সেই প্রথম আমি নিজের কলেজের সঙ্গে না গিয়ে অন্য কলেজের ছাত্রীদের সঙ্গে ফিল্ডে গিয়েছিলাম ফিল্ড এক্সপার্ট হয়ে। দ্বিতীয়ত এই যাওয়াটার সঙ্গে আমার শৈশবের আশাপূরণের একটা যোগসূত্র ছিল। ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি। আমি আসলে নিবেদিতা ইস্কুলের ছাত্রী ছিলাম। সেই কবে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হলাম - সনটা ১৯৭৭। শুধু তো আমি নই, আমার বোন, আমার মা, আমার মেজ মাসি, আমার ছোট মাসি - সব্বাই নিবেদিতা ইস্কুলে পড়েছিল। আমাকে ধরে মাতৃকুলে তা সে চার প্রজন্মের সম্পর্ক। আমরা যখন ছাত্রী, সেই সময়ে ক্লাস নাইনে মেয়েদের ইস্কুল থেকে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া হত। অঙ্কের শিক্ষিকা ছিলেন শুক্লাদি। তাঁর স্বামী বিখ্যাত পর্বতারোহী প্রাণেশ চক্রবর্তী। তিনি নিয়ে যেতেন পুরুলিয়ার মাঠাবুরু ক্যাম্পে। আজও আন্তর্জাল জুড়ে তাঁর অজস্র কীর্তি, বহু রোমহর্ষক পর্বতাভিযানের রিপোর্ট ছড়িয়ে আছে নানান ওয়েবসাইটে। ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজনে তাঁর লেখা একটি বইয়েরও হদিশ পেয়েছিলাম - আড়াইশো পাতার বাংলা বই - হিমালয় ভ্রমণ গাইড - পাবলিশার মিত্র ঘোষ। পড়ার খুব ইচ্ছেও হয়েছিল। কিন্তু আমাদের দেশে যা হয় - প্রেজেন্টলি আনঅ্যাভেলেবল। জীবনে সব আশা পূরণ হয়না। আমারও হলনা। আমি যখন নাইনে উঠলাম, কীজানি হয়ত প্রাণেশ স্যার কোন কঠিন অভিযানে বাইরে ছিলেন। তাই আমরা গেলাম শান্তিনিকেতনে। বন্ধুদের সঙ্গে সেই প্রথম বেরোনো, আনন্দ খুবই হয়েছিল - সালটা ১৯৮৫। কিন্তু ৮৭ সালে আমার দুবছরের ছোট বোন মাঠা ক্যাম্পে গেলো। তাঁবুতে থাকল, খড়ের ওপর বাড়ির কম্বল পেতে। ক্লান্ত শরীরে একদিন ফিরে দেখল ওর বিছানায় ধেড়ে কুকুর শুয়ে আছে। তাকে বার করে দিয়ে বোন শুয়ে পড়ল। একটা মাত্র কলাই করা মগ - তাতেই চা খাওয়া, আবার তাতেই প্রাতকৃত্যের পর জল শৌচ। আসলে পাহাড়ে চড়তে গেলে ন্যূনতম লাগেজ দরকার - বাড়তি আরাম চলেনা - বোন সেটাই শিখে এলো। তার ওপরে দড়ি ধরে কেমন করে উঠলো, নামতে গিয়ে কেমন দড়িতে ঝুলে গেলো, বড় বড় চোখ নাচিয়ে তার বর্ণনা দিতে লাগলো ঘুরে ঘুরে। তার বাক্য - ঝর্নার গতি যত প্রবল হোল, তার চেয়ে দুর্বার গতিতে বেড়ে চলল আমার আফশোষ। শ্রুতির স্মৃতি আর আশার কুহক, দুইয়ে মিলে কুয়াশা ঘেরা মাঠাবুরু আমাকে কেবলই তার দিকে টেনে নিয়ে গেলো মনে মনে। সশরীরে যেতে না পারলেও, একবার প্রাণেশ স্যার ইস্কুলে পর্দা টাঙিয়ে পাহাড়ে চড়ার স্লাইড দেখিয়েছিলেন - সেদিন দেখেছিলাম। জল নেই, ইঁট সাজিয়ে তার মধ্যে শুকনো পাতা ভরে আগুন জ্বালিয়ে কেমন করে চট জলদি ডিম সেদ্ধ করা যায়। জল নেই তো কী! ডিমগুলো বালি কাদা ধুলো মাখিয়ে আগুনে ফেলে দিলেই হোল। সেই কবেকার কথা, স্মৃতি এখনও কেমন জ্বলজ্বলে। আসলে আমি এমন পাহাড় পাগল কখনোই হতাম না। দোষ আমার নয়। দুজন ভূগোলের দিদি ছিলেন, কাকলিদি আর মানসীদি। দুজনে মিলে ফাইভ থেকে টেন - ছ বছর ধরে হিমালয়, আল্পস, রকি, আন্দিজ করে করে আমার গোলা মাথা একেবারে তালগোল পাকিয়ে দিয়েছিলেন। তারপর আর কী! কেরিয়ার, সংসার - নানা কাজের চাপে আর সময়ের খাপে মানাতে মানাতে মাঠাবুরুতে রক ক্লাইম্বিং ক্যাম্প আমার স্বপন থেকে অবচেতনে স্থান নিল। জীবনে কিছু প্রাপ্তি অপ্রাপ্তি, গড়ন ভাঙনের গল্প না থাকলে জমেনা। ধীরে ধীরে চাকরি জীবন চলে গেলো কুড়ি কুড়ি বছরের পার, উঁহু, কুড়ি তো নয় পঁচিশ। মা বাবা গত হবার পর, আবার আমি শৈশবের স্বাদ পেতে ইস্কুলের দিকে ফিরলাম। প্রাক্তনী সভার সদস্য হলাম। নিবেদিতা হেরিটেজ মিউজিয়ামে যাতায়াত শুরু করলাম। আর সেখানেই ঘটে গেলো এক আশ্চর্য ঘটনা। অশেষপ্রাণা মাতাজী আমাকে বিবেকানন্দ বিদ্যাভবনের তিরিশজন ছাত্রীকে নিয়ে পুরুলিয়ার মাঠাবুরু ক্যাম্পে যাবার অনুরোধ করলেন। চমকে উঠলাম - এও কি সম্ভব? ১৯৮৫ সালে যা নিয়ে আফশোষ ছিল, সেই সুযোগ কি তবে চার দশক পরে মানে ২০২৫ এ সত্যি সত্যি এলো? সুযোগ ছাড়ার কোন প্রশ্নই ছিলনা। আমাদের নিবেদিতা হেরিটেজ মিউজিয়ামের তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে ডানা মেলেছে একটি প্রতিষ্ঠান যা হয়তো একদিন মহীরুহ হয়ে উঠবে - নীহার - নিবেদিতা ইন্সটিটিউট অফ হিউম্যান অ্যাডভান্সড রিসার্চ। নীহার একটি প্রকল্প শুরু করেছে - লীডারশিপ কোর্স। আমাদের মেয়েগুলির মধ্যে কাদের সঠিক নেত্রী হয়ে ওঠার দক্ষতা বা মানসিকতা আছে তাদেরকে চিনে নিয়ে সঠিক ভাবে পথ দেখানোই নীহারের এই লীডারশিপ কোর্সের কাজ। এই কোর্সের কতটা সম্ভাবনা আছে, তা খতিয়ে দেখার পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয়েছে বিবেকানন্দ বিদ্যাভবন কলেজে। একদিন আমার মাও ঐ কলেজ থেকেই পাশ করেছিলেন। এই কলেজের পঞ্চম অর্ধবর্ষের তিরিশজন মেয়ে এই কোর্সের প্রথম ছাত্রী। দস্তুরমতো ইন্টারভিউ করে এদের বেছে নেওয়া হয়েছে। এই কোর্সের অঙ্গ হিসেবে মাঠা পাহাড়ে ক্যাম্প হোল দুদিনের। সেই ক্যাম্পেই সঙ্গে চললাম আমি। হাওড়া স্টেশন থেকে রাতে আদ্রা চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার ধরে ভোরে নামলাম বরাভূম স্টেশনে। সেখান থেকে গাড়ি করে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যে। মাঠা পাহাড়ের পাদদেশে এই রিসর্টটির নাম হল পাতালঘর। মেয়েরা রইল তাঁবুতে। আধখানা চাঁদের মত চেনটানা তাঁবুর মধ্যে দুটি করে বিছানা পাতা। কলঘরের জায়গাটি পাশেই, একটুখানি হেঁটে যেতে হয়। আর আমরা দিদিমণিরা রইলাম তাঁবুর মুখোমুখি হবিট হাউসে। এগুলোও দেখতে আধখানা চাঁদেরই মত, তবে কিনা পাকা ঘর, লাগোয়া কলঘর। ঘরে যেটুকু না থাকলে নয়, ততটুকুই পরিকাঠামো রয়েছে। ঘরের চালে মাটির পরত, তার ওপরে ঘাসের চাষ করা হয়েছে। জনপ্রিয় পশ্চিমী শিশু সাহিত্যের কাল্পনিক চরিত্র এই হবিট, যারা মাটির তলায় গর্ত করে থাকে। বিশ্ব জুড়ে ন্যূনতম স্বাচ্ছন্দে গড়া পরিবেশ বান্ধব এই হবিট হাউসগুলি পর্যটনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ বহু মানুষই এখন প্রাচুর্য, বাহুল্য ছেড়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে সাধারণ ভাবে কয়েকটা দিন কাটাতে চায়। শুনলাম, পশ্চিমবঙ্গের প্রথম হবিট হাউস এই পাতালঘর, বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে তৈরি করা হয়েছে। দরকার মত কম বেশি তাঁবু খাটিয়ে দেওয়া হয়, আর হবিট হাউস আছে সাতটা। সেখানেও দুজন বা তিনজন করে আরামসেই থাকা যায়। রান্নাঘর আর খাবার জায়গা আলাদা। কাউন্টার থেকে নিজেকে খাবার নিয়ে আসতে হয়। পরিবেশনের বন্দোবস্ত নেই। পানীয় জল কোন ফিল্টার ছাড়া অবিশ্বাস্য ভাবে স্বাস্থ্যকর, সমস্যা একটাই ঐ জলের গুণে খুব খিদে পেয়ে যায়। যাই হোক চারপাশের বৈচিত্র্য, সৌন্দর্য ইত্যাদি দেখার সময় মিললোনা, কারণ ট্রেনিং শুরু হয়ে গেলো। মেয়েদের দেওয়া হোল পনের মিনিট সময়, যার মধ্যে যে যার তাঁবুতে ঢুকে, ব্যাগ রেখে, আর কিছু বন্দোবস্ত করে লাইনে দাঁড়াতে হবে। তবে জুতো থাকবে তাঁবুর বাইরে। কেবল রাতে জুতোজোড়া তাঁবুতে ঢুকিয়ে নিতে হবে। না না দুষ্টু মানুষের ভয় এখানে নেই, তবে কোন বন্য জন্তু ভালোবেসে যদি মুখে করে এক পাটি বা দুটো পাটিই নিয়ে যায়, তার দায় কর্তৃপক্ষের নয়। পাশে কলঘরে গিয়ে চোখেমুখে জল দিয়ে আসতেই পারে, তবে তাতে সময়ের ছাড় নেই, তাই অতটা ঝুঁকি না নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আমাদের মেয়েরা বুদ্ধিমতী, তারা ও পথ মাড়ালোনা। কিন্তু আমরা? মেয়েরা পনের মিনিট হলে তাদের ম্যামেরা কি পনের ঘন্টা সময় নিতে পারে? আমরাও ভুরু কুঁচকে তিরিশ মিনিটে মাঠে পৌঁছলাম। মাঠে ততক্ষণে খাটানো হয়েছে এক খাড়াই দড়ির জাল। নীচ থেকে প্রথমবার ওপরে তাকালে জ্যাকের বীনস্টক গাছে ওঠা মনে পড়ে যায় বটে। আমাদের মেয়েরা সারি দিয়ে দাঁড়িয়েছে একে একে সেই জাল বেয়ে আকাশের কাছে পাড়ি জমানোর জন্য। তাদের কারোর চোখে অভিযাত্রীর আহ্লাদ তো কারোর করুণ দৃষ্টিতে ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচির আকুতি। দেখলাম পেল্লাই গাছেদের শরীর আর শক্ত শক্ত খুঁটির সঙ্গে বাঁধা ঐ জাল, দুপাশে দক্ষ ট্রেনারদের বজ্র মুঠি আর তীক্ষ্ণ নজরের আওতায় রয়েছে। পান থেকে চুন খসার জোটি নেই। দর্শক আমরা চারজন - বড় মাতাজী, ছোট মাতাজী, সঙ্গে বৈশাখী আর আমি দুই দিদিজী। বৈশাখীও আমার মতই আর একটি কলেজের ভূগোলের দিদিমণি। সেদিন মাঠা পাহাড়ের আকাশ বড় নীল, পাহাড় বড় সবুজ, কাঁচা হলুদ সর্ষে ফুলের মত রোদ বুঝি সবার কানেই বাঁশি বাজাচ্ছিল। একটা মিঠেকড়া ঠান্ডা বাতাস সোয়েটার চাদরের ভিতর দিয়ে খালি লুকোচুরি খেলছিল। বাতাসে বন তুলসীর ঝাঁজ - এমনি দিনে মানুষের মুখোশ খুলে মুখ বেরিয়ে পড়ে। পাকা চুলের পর্দা সরিয়ে মুখ বাড়ায় কিশোরী মন। ২০২৫ কে সরিয়ে রেখে এতদিন বাদে বেরিয়ে পড়ে ১৯৮৫। মাথার দুপাশে পুঁচু পুঁচু বেণী বেঁধে তাতে অপটু হাতে লাল ফিতে বাঁধা শারদা মেয়েদের লাইনে দাঁড়ায় জাল বাইবে বলে।হলদে রোদের মিশেল দেওয়া হলুদ রঙের মোটা আর শক্ত প্লাস্টিক দড়ির জাল। আমি প্রাণপণ চাইছিলাম সবটুকু শিখে নিতে, আসলে এমন সুযোগ আর কোনদিনও আসবে কিনা জানা নেই, তাই চাইছিলাম যা কিছু ঘটছে তার সব কিছু শুষে নিতে। তিনটি উপকরণ - হেলমেট, হারনেস আর ক্যারাবিনার। আমার মাথায় যখন লেডী ট্রেনার হেলমেট পরিয়ে দিলেন, আমার মনে মনে হাসি পেল। শিক্ষার্থীর পা পিছলে মাথা ছাতু হবার ভয় আছে ওঁদের। কিছু হয়ে গেলে জবাবদিহি করতে হবে যে। তবে নাঃ আমার একটুও ভয় করছেনা। চিরকালই পরীক্ষা সামনে এলে কেমন একটা উল্লাস হয় আমার। হেলমেটের পর হারনেস বাঁধা - মহিলা এতটাই কষে সেটি আমার কোমরে বাঁধলেন যে আমি একেবারে ককিয়ে উঠলাম। পেট - কোমরটি যে আর ১৯৮৫ র নেই, তার চারিদিকে তেল-ঘি-মাখন-চীজ - আরো কতকিছুর থাক থাক মেখলা। কোমর বন্ধনীটির একটি অংশ পাদুটোকে গোল গোল ফাঁসের মত আটকে রেখেছে। অর্থাৎ যদি কিছু ঐ পিছলানো টিছলানো (ভগবান না করুন) - তবে ওই ফাঁসে আটকে মোটামুটি পাখি হয়ে ডানা ঝাপটানো যাবে। তবে মেখলা - বন্ধনী যা কিছুই থাক, দড়ির জালের এপাশ ওপাশ টানা দড়িটি দুপাশের ট্রেনারদের হাতে বন্দী। ঐ দড়িটিই লাইফ লাইন - সেটা আবার আমার বন্ধনীটির সঙ্গে একটি মোক্ষম ক্লিপ দিয়ে আঁটা। আর এই ক্লিপটাই হল ক্যারাবিনার - যার ভরসায় আমি মেঘের দিকে মোর তনু - ক্যারাভান লয়ে পাড়ি দেব। আসলে ছাত্রীরা কেমন করে উঠছে, কী কী ভুল হচ্ছে, কোনভাবে ওঠাটা ঠিক, শিক্ষকরা কী নির্দেশ দিচ্ছেন, এগুলো আমি নিবিষ্ট মনে দেখছিলাম। কিন্তু দেখে শেখা এক, আর ঠেকে শেখা আরেক। দেখে শিখলাম যে, জালের দিকে মুখ করে দাঁড়াও, জালের ঠিক গ্রন্থিগুলোতে পা দিতে হবে, তা নইলে জোর পাবেনা। হাত দিয়ে জাল ধরবে, কিন্তু হাত থাকবে কাঁধের লেভেলের ওপরে - নইলে শরীরের ব্যালেন্স থাকেনা। এবারে উঠতে গিয়ে দেখি জাল থলথল, হাওয়া খলবল, পা টলটল, ঘাম গলগল, বুক ধকধক, হাঁটু ক্যাঁচকোচ, কাঁধ খিঁচমিচ - এমনতরো কত কী? কিন্তু নীচের ঢালু অংশটা পেরোনোর পর খাড়া অংশটায় যেতে যেতে ছন্দটা বুঝে গেলাম। একেবারে টিকটিকির মত - ডান হাত আর ডান হাঁটু তোলো, তারপর বাঁ হাত বাঁ হাটু ডানদিকের চেয়ে উঁচুতে তোল - কেল্লা ফতে। আবার উলটো দিকে একই নিয়মে নেমে এলাম কোন মতে। এদিকে হাঁফানো, ওদিকে আনন্দে লাফানো, সে আমার সসেমিরা অবস্থা। ট্রেন ধরার আগের দিন পর্যন্ত ধুঁকছিলাম - যেতে কী পারবো? এত বড় দায়িত্ব, নেওয়া কি উচিত হবে? এখন দেখছি, আমার শরীরে যত ব্যাথাবুথা সব উধাও। কতদিন পরে আমার আমিকে নিজের করে ফিরে পেলাম! সব চেয়ে বড় হল আমি পেরেছি - আমি পারি - পৃথিবীর যে কোন সমস্যা সামনে আসুক না - লড়কে লেঙ্গে মেরা খোয়াবিস্তান। মেয়েদের মোবাইল ফোন জমা দিয়ে দিতে হয়েছিল। আমরা টীচার বলে ছাড় ছিল। কিন্তু খানিকটা স্বেচ্ছাতেই দিনের বেশিরভাগ সময়ে ও জিনিসটিকে ত্যাগ দিয়েছিলাম। আর দিয়েছিলাম বলেই প্রতি মূহূর্তে ছবিছাপা দিয়ে আপডেট দেওয়া আর আপডেটেড হয়ে থাকার বালাই ছিলনা। প্রকৃতির কোলে সত্যি সত্যি শান্তি আর আরাম উপভোগ করছিলাম। শরীরে যতই পরিশ্রম হোক, এ হল “প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি”। একটা দিনে কত যে কাজ হল, আমরা নিজেরাই অবাক। এই ধরা যাক - দড়ির ব্রিজ পেরোনো। জিপ লাইনিঙের মত হারনেস ক্যারাবিনারের ভরসায় ঝুলে ঝুলে জলা পেরোনো - যার পোষাকী নাম - রিভার ক্রসিং। রাতে ঠান্ডা ঘন হয়ে আসে। অন্ধকারের হাত ধরে আকাশ মাটির সীমানা মুছে বন যেন কাছে আসে, হাওয়ার ঝোঁকে ফিসফিসিয়ে ও কী কিছু বলে যায়? শহরের মত লেট নাইটের সুযোগ এখানে নেই। ঘড়ি ধরে খেতে বসা, নিজেই কাউন্টার থেকে খাবার নিয়ে আসা, আবার খাওয়া শেষে থালা বাটি মেজে রাখা পরের দিনের ব্যবহারের জন্য। কোন দাও, লাও এর ব্যাপার নেই - “আপনা হাত জগন্নাথ, করবে ভাই বাজিমাৎ”। বিছানায় যাবার আগে অভ্যাস মত ডায়রি নিয়ে বসি। এই পাহাড়ে চড়ার ট্রেনিঙের সঙ্গে আমার জীবনে আর একটা জিনিস ঘটে গেছে। আসলে যে কলেজের সঙ্গে এসেছি সেটা তো আমার নিজের চেনা কলেজ নয়, তাই ছাত্রীদের ওপরে শিক্ষক হিসেবে সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ছিলনা। যেটা ফিল্ডে খুব দরকার। তাই আমি প্রথম পরিচয়েই বলে নিয়েছিলাম যে যেহেতু আমি এককালের রামকৃষ্ণ সারদা মিশনের ছাত্রী, তাই তোমাদের মত আমি এই ক্ল্যানেরই সন্তান। এটা বলেছিলাম যাতে ওরা আমাকে অ্যাকসেপ্ট করে নেয়। আসলে ওদের কাছে তো আমি বহিরাগত। তাই স্ট্র্যাটেজিক ইনসাইডার হয়ে ওঠার তাগিদে এই অস্ত্র প্রয়োগ করেছিলাম, আমার আর ছাত্রীদের মাঝখানের প্রাতিষ্ঠানিক ভয়ের আর অচেনার প্রাচীরটা যাতে ভেঙে যায়। দেখলাম এতে আশ্চর্য কাজ দিয়েছে। ওরা আমাকে আর ‘নজরদার’ বা নিয়ন্ত্রক ভাবছে না, বরং ভাবছে নিজেদেরই একজন। মাঠাবুরুতে দেখলাম ওরা আমাকে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর নয়, সিনিয়র দিদি ভেবে নিয়েছে। কাছে আসছে, টীচারদের কাছে যেকথা গোপন করতে হবে সেটারও সাহায্য চাইছে, তুমি তুমি করে কথা বলছে। এটা আমার কাছে একটা সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। আমার নিজের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে মনের টান, তথ্য বিনিময় স্বাভাবিক ভাবেই অনেক বেশি। কিন্তু সেই সম্পর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ক্লাসরুম, যেখানে ক্ষমতার হায়ারারকি বা ধাপ আছে - শিক্ষক ওপরে, স্টুডেন্ট নিচে। ভূগোলের শিক্ষক হিসেবে আমি হয়তো এতদিন ফিল্ডে ‘কন্ট্রোল’ বা শাসনকেই সবচেয়ে জরুরি মনে করেছি। শাসনের দরকারও আছে। আজকাল যা দিন পড়েছে, ছেলেমেয়েরা প্রকৃতির কাছ থেকে কিছু শিখুক আর না শিখুক, পরিবার বা সমাজের কাছ থেকে একটা মোক্ষম কথা খুব ভালো করে শিখে যায়, যে প্রকৃতির কাছে গেলে মাদক নিয়ে নেশা করতে হয়। এই পিয়ার প্রেশার এতটাই যে যারা এর মধ্যে ছিলনা, তারাও ঢুকতে বাধ্য হয়। মুক্ত প্রকৃতি হয়ে ওঠে একধরণের লিমিনাল স্পেস' - বা ‘সীমান্তবর্তী মুক্ত অঞ্চল’ - যেখানে কেউ চেনেনা, যা খুশি করা যায় - এক ধরণের ছদ্ম স্বাধীনতার জায়গা। মিশনের এই ছাত্রীদের নিয়ে বিশেষ করে পাহাড় চড়া ক্যাম্পে এধরণের কোন আশংকা নেই। তাই ছাত্রীদের সঙ্গে শাসন নয় সখ্যতা - বেশ উপভোগ করছি। এইসব সময়ে মনে আরও আকাশ পাতাল সব চিন্তা আসে। আজকে শিখলাম দড়ির জাল বাওয়া, দড়িতে হাঁটা আর দড়িতে ঝুলে নদী পেরোনো। কোনো দুর্গম জায়গায় সার্ভে করতে গেলে অথবা কোন ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের সময়ে এইসব স্কিল খুব কাজে লাগে। একটা সময়ে খুব ভাবতাম যে আমি আমার স্যার মনতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ রঞ্জন বসু, সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের মত বা তাঁদের স্যার থর্নবারি, উলরিজ মরগ্যান বা ডেভিস, পেঙ্কের মত পাহাড় নদী চষে বেড়াতে পারিনি। নতুন কিছু আবিষ্কার করতে পারিনি। মনে খুব আফশোস হত। কিন্তু ধীরে ধীরে যতই ক্রিটিকাল বা তারও পরে পোস্ট মডার্ন ভূগোলের সংস্পর্শে এলাম তখন আবার ভাবনাটা খানিকটা বদলে গেল। অনুভব করলাম যে এবল বডিড মেল না হয়েও আমি আমার জীবনে এই পৃথিবীকে দেখেছি এক সংবেদনশীল নারীর চোখে। এটাই বা কম কী! আসলে উইলিয়াম মরিস ডেভিস, ওয়াল্টার পেঙ্ক, ডব্লিউ ডি থর্নবারি বা সি ডব্লিউ উলরিজদের মতো ভূবিজ্ঞানীরা—কিংবা আমাদের বাংলার শ্রদ্ধেয় মনতোষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুভাষ রঞ্জন বসু বা সুভাষ মুখোপাধ্যায় স্যারেরা যে সময়ে ভূগোল চর্চা করেছেন, তখন বিষয়টার মূল ধারাটাই ছিল পজিটিভিসম (প্রত্যক্ষবাদ) এবং জিওমরফোলজি কেন্দ্রিক। তারও আগে উনিশ শতকে ভূগোল ছিল মূলত পুরুষালি অ্যাডভেঞ্চার এবং যেন একটা সাম্রাজ্য বিস্তারের হাতিয়ার। ধরে নেওয়া হতো, ভূগোল মানেই হলো একজন ‘এবল-বডিড মেল’ বা শারীরিকভাবে শক্তিশালী পুরুষ দুর্গম পাহাড়ে চড়বেন, নদী চষে বেড়াবেন, মানচিত্র আঁকবেন আর নতুন জায়গা ‘আবিষ্কার’ বা জয় করবেন। প্রকৃতি তখন যেন ছিল একটা জ্যামিতিক বস্তু। আর আমি যে আফশোষে ভুগছি, তা আসলে আমার ব্যক্তিগত খামতি নয়, শত বছরের তৈরি করা একটি পুরুষতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, যার জন্য আমি নিজেই নিজেকে ‘অভিযাত্রী’ আইডেন্টিটি দিতে পারিনা, মানে কুণ্ঠাবোধ করি। হবিট হাউসের বাইরের আকাশ এখন নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। আকাশে চাঁদ নেই, তাই হাজার তারার আলো। সেদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানিনা। চলবে...
    রুশ টি সেট আর পেয়ারাতলায় মেম বৌমা - স্মৃতি ভদ্র | অলংকরণ: রমিতছায়া দোলানো দুপুর হোক কিংবা নিহার জড়ানো সন্ধ্যা, বড়ঘরের লালবারান্দা আসলে কখনই বিরান হতো না। সাংসারিক কাজের অবসরে খানিক জিরিয়ে নেওয়ার অজুহাতে অথবা উনুনপাড়ের নুনতেলের গন্ধ গা থেকে মুছে নিজেকে একটু পরিপাটি করে তোলার ইচ্ছা---সেই লাল বারান্দাই হয়ে উঠতো সকলের একমাত্র গন্তব্য। নেহাতই লালমেঝের একহারা বারান্দা। তাতে ঐশ্বর্য বলতে দিনের নানাসময়ে নানারকম ছায়ার আল্পনা ছাড়া আর কীইবা ছিল। কখনও বাইরবাড়ির দেবদারু বাগানের নিছিদ্র ছায়া আবার কখনও প্রকান্ড বরইগাছের আড় পেরিয়ে পেয়ারাগাছের মাথাদোলানো ছায়া, ব্যস্ অতটুকুই। তবুও সে বারান্দা নিজ মহিমায় আমাদের বাড়ির সৌখিন স্থান হয়ে উঠেছিলো নির্দ্বিধায় তখন। কিন্তু সৌখিনতা শব্দটির সঙ্গে তখনও পরিচয় হয়নি আমার। সময়ের সরল রৈখিক পথ ধরে চলতে গিয়ে চারপাশে যা কিছু মিলতো সবই তখন আমার কাছে জীবনের নামান্তর। আর সে পাওয়ায় কখনও বাহুল্য ছিল না। তাই নকশা কাটা কাঠের দুটো থাম, দেয়ালে হেলান দিয়ে নির্ভার দাঁড়িয়ে থাকা ক'খানা পিঁড়ি আর পেতলের ঘটি ভরা জল। এতটুকুই। আমাদের বাড়ির লাল বারান্দার এক জীবনঘনিষ্ঠ ছবি। তবুও সেই সাধারণ বারান্দায় জ্বলজ্বল করতো বাড়ির সকল অন্তরঙ্গ আনন্দ। এজন্যই মনে হয় ঠাকুমা সে বারান্দার গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিতেই নকশিকাটা কাঠের থামে ঝুলিয়ে দিয়েছিলো রাশিয়ান ডিম্বাকৃতির একটা আয়না।শুধু অতটুকুই সংযুক্তি। তাতেই সেই লাল বারান্দা সাজঘরের গৌরবটুকুও গায়ে জড়িয়ে নিয়েছিলো অক্লেশে। প্রতিদিন সকালে নিত্যপূজা শেষে নাকে-কপালে তিলক আঁকা ঠাকুমা উনুনের আগুনদিনে পা বাড়াবার আগে সে আয়নায় সামনে দঁড়িয়ে চুলের খোঁপায় আরেকপ্রস্ত চিরুনী বুলিয়ে নিতো বেশ যত্ন করেই। আবার আগুন ঘামে তিলক গলানো সময় ফুরালে কলঘর থেকে কসকো সাবানের ঘ্রাণ সারা উঠোন ছড়িয়ে যখন লাল বারান্দায় এসে দাঁড়াতো ঠাকুমা, তখনও ওই রাশিয়ান আয়নাই ঠাকুমার প্রতিচ্ছবি হয়ে হেসে উঠতো সারাদিনের প্রতীক্ষা শেষে। এরপর তিব্বত স্নো...তিব্বত ট্যালকম পাউডার…তর্জনীর ডগায় ভরিয়ে সিঁদুরের টিপ…উঠোনজুড়ে ঠাকুমার ঘ্রাণ। আর লাল বারান্দায় থামে ঝোলানো আয়নায় পরিমিত লাবণ্যময়তার এক টুকরো স্নিগ্ধ সময়। এরপর বারবেলার নিরালা দুপুর। লালবারান্দায় পশ্চিম আকাশের তেজ কমে আসা রোদ। বরইগাছের গায়ে উটকো বাতাস। ভুল করে উড়ে আসা ডালিমগাছের ঘরছাড়া ফুল। লো ভলিউমের রেডিওর অবিছিন্ন বার্তালাপ। আর আমাদের ভাতঘুমের অপরিবর্তনীয় রুটিন। কিন্তু কিছু কিছু দিনে গড়পড়তা হিসেবেও টান পড়তো। নিরালা দুপুরের শ্রান্ত সময়ও হয়ে উঠতো নির্বাক চালচিত্রের স্থির অবকাশ। সেসব দুপুর ঠিক অন্য দুপুরগুলোর থেকে আলাদা হতো। চিরায়ত দুপুর থেকে সময় চুরি করে ঠাকুমা কাঠের বাক্স থেকে টেনে বের করতো বেশ বড়সড় একটা এ্যালবাম। সাদাকালো ছবির এ্যালবাম। তার পাতা উল্টাতেই থেমে যেতো ঠাকুমার সময়। একদৃষ্টি। লুকোনো দীর্ঘশ্বাস। আর আড়ষ্ট আঙুলে ছুঁয়ে থাকা এ্যালবামের পাতা। দুপুরগুলো কেমন যেন নি:স্ব হয়ে উঠতো।সাহেব কাকু। সেই কবে রাশিয়ায় পড়তে গিয়েছিলেন। আর ফেরেননি। ফিরতো পোস্টাকার্ডের চিঠি, ফিরতো এ্যালবামের ছবি। সেই ছবিতে কতগুলো তরুণ তরুণী। কখনো তারা সমুদ্রের পাড়ে রৌদ্রস্নাত। কখনো পরিপাটি ঘরে আনন্দরত। প্রতিটি ছবিতেই সাহেবকাকুর পাশে পুতুলের মতো দেখতে এক তরুণী। আমার মেম বৌমা। সালটা আশির মধ্যভাগ হবে। হঠাৎ করেই পোস্টাকার্ডের কয়েকটা বাক্য আমাদের বাড়ির উৎসবের অজুহাত হয়ে উঠলো। উঠোনের অন্যপাশে সদ্য গড়ে ওঠা ঘরের দেয়াল বারবার ঝেড়েমুছে পরিস্কার রাখা, উপরের ঘর থেকে পেতলের বড় বড় হাঁড়িকুড়ি নামিয়ে সেসব ধুয়ে রোদে শুকিয়ে রাখা, ধুনুরি ডেকে শিমুল তুলায় বালিশ ভরা---সে এক মহাযজ্ঞ। কারো কথা বলার সময় নেই। দু-দন্ড বসে অবসর উৎযাপন নেই। শুধু আয়োজন আর আয়োজন। ঝুনো নারিকেলের তক্তি বয়ামে ওঠে, কুলের আচার রোদে পড়ে, তিলের কটকটি পাথরের থালে জুড়ায়---তবুও কাজ ফুরায় না।অবশেষে কিছু কাজ বাকী রেখেই বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ালো সেই দিন। এসে দাঁড়ালো নীলচোখের রাশিয়ান মেম বৌমা। সৌখিনতা শব্দের সঙ্গে আমার পরিচয় ঠিক সেই মুহুর্ত থেকেই। ধানদূর্বায় বরণ আর লালঝালড়ের তালপাখায় আম্রপল্লব ছোঁয়ানো হাওয়ার আশীর্বাদ শেষে মেম বৌমা লাল বারান্দায় উঠতেই উঠোন ভরে গিয়েছিলো মানুষে। পাড়া পেরিয়ে, গ্রাম পেরিয়ে,, নদী পেরিয়ে সবাই দেখতে এসেছিলো মেম বৌকে। লম্বা জার্ণির ক্লান্তি জড়ানো চেহারায় জ্বলজ্বলে নীল চোখের মানুষটির হাসিমুখ বলে দিয়েছিলো অদ্ভুত সেই পরিস্থিতি আগে থেকেই অবগত করা হয়েছিলো তাঁকে। কেউ অকারণে হাসে, কেউ অবাক চোখে তাকায়, কেউ ছুঁয়ে দেখতে চায়, কেউ ইচ্ছে করেই টিপ্পনী কাটে---বুঝে কিংবা না বুঝেও মেম বৌমার সেই একই হাসিমাখা মুখ। কিন্তু তা আর কতক্ষণ! তাই মেম বৌ দেখার লৌকিকতা শেষে বাড়ির বৌ পা রাখলো বড় ঘরে। মধ্যবিত্ত বাঙালী ঘরে প্রবেশ হলো সীমানাহীন আন্তর্জাতিকতা। মিডি স্কার্ট পড়া মেম বৌ যখন নিত্যঠাকুরের সামনে দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে অদ্ভুত বাংলায় উচ্চারণ করে,টাকুর...তখন হেসে গড়িয়ে পড়া নয়, আদর করে সামলে নেওয়া ঠাকুমা নিজের মাথায় ঘোমটা টেনে বলে ওঠে,রাধাগোবিন্দ...কাঁটাচামচ দিয়ে ইলিশমাছ খাবার বায়না দেখে চিতল মাছে কোরা এগিয়ে দিতে দিতে বলে ঠাকুমাই আবার ত্রাণকর্তা,নাতাশা বৌমা...ঝাল ছাড়া রান্না করেছি মিঠা করে...খাও...কিন্তু মেম বৌমা কি শুধুই বসে বসে এসব আপ্যায়ন নেবে? তা কীভাবে হয়। তাই সবার জন্য নিজে হাতে চা বানানোর বায়না ধরতেই মনিপিসি এগিয়ে এসেছিলো বন্ধু হয়ে। লালবারান্দায় কেরোসিনের স্টোভে নীল আঁচ উঠতেই তাতে বসেছিলো পেতলের খাবড়ি। জল ফুঁটে উঠতেই রাশিয়ান বিশেষ চা পাতা ঘ্রাণ ছড়িয়েছিলো বাড়ির সেই আনন্দময় দিনগুলোর গায়ে আরও একটু খুশি ছড়িয়ে দিয়ে।আর লাল বারান্দায় মহাসমারোহে বেরিয়ে এসেছিলো রাশিয়ান টি সেট। ফুলের ছবি আঁকা সেই টি সেট নাকি ছিল মেম বৌমার সৌখিন কালেকশনের একটি অংশ। বারানভকা নামের কোনো এক অচেনা জায়গা থেকে আগত সেই টি সেট আমাদের বাড়ির অন্যতন সৌখিন অনুসঙ্গ হয়ে উঠেছিলো সেদিন থেকে।তবে সত্যিকারের সৌখিনতা তো ছিল নীল চোখের রাশিয়ান মেম বৌ। কখনো লালপেড়ে গরদ শাড়ি আর কপালে সিঁদুরের টিপ পড়িয়ে বাঙালি বানিয়ে দেবার ইচ্ছা, আবার কখনো উঠোনের উনুনে আতপ চালের ঘি ভাতে কিশমিশ ছড়িয়ে দেবার অনুরোধ---সবকিছুতেই বাড়ির সকলের ছিল অন্য সংস্কৃতির মানুষটিকে বাঙালি বানিয়ে দেবার সুপ্ত আকাঙ্খা। আর মেম বৌ?নীল চোখের তারায় হাসি ভাসিয়ে ক'দিনেই হয়ে উঠেছিলো মধ্যবিত্ত বাড়ির সকলের সৌখিন আত্মীয়।
  • হরিদাস পালেরা...
    ভালো ঝালমুড়ি - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | মাননীয় বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষকে আমার খুব ভালো লাগে। যেরকম দৃপ্ত কণ্ঠ, তেমনই বক্তব্যের জোর। প্রতি জমানাতেই আগের জমানা কত খারাপ ছিল, এই নিয়ে ওঁর কথা শুনেই অনেক কিছু জানতে পারি। এবার একটু বেশিই পারছি। অনেক ভিডিও ঘুরে বেড়াচ্ছে। এক জায়গায় দেখলাম বললেন, রামকে ভোলা যাবেনা, কারণ ওঁর আদি বাড়ি রামরাজাতলা। রামকে কে ভুলে যাচ্ছিল, আমি ঠিক জানিনা। আমাদের ইশকুলে পাঠ্য ছিল "সীতা বিনা আমি যেন মণিহারা ফণী", আমরা কলেজ বেলা থেকে মহায়ন লিখে এবং পড়ে আসছি, কেরেস্তান মধূ দত্ত অবধি মেঘনাদবধ কাব্য লিখে ফেললেন। তবে গুরুবাক্য মহাবাক্য, বলেছেন যখন, নিশ্চয়ই যাচ্ছিল। আরেকটা ভিডিওয় দেখলাম, ওঁকে সামনে বসিয়ে একজন বললেন সৌরভ পালোধীকে বার করে দিতে হবে, চল ফোট। কোনো একটা শিল্পকর্মী সভা-টভায়ই হবে। সেটা ঠিকই আছে। কিন্তু সঙ্গে আরও বললেন, রুদ্রদাকে আমি দেখেছি রাতের পর রাত ঘুমোতে পারেননা। শুনে আমার পথের দাবীর সব্যসাচীর কথা মনে পড়ল। সেই হে বীর, তুমি দেশের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ করিয়াছ, ইত্যাদি প্রভৃতি। রুদ্রবাবু শুনে দেখি মিটিমিটি হাসছেন। এই ইনসোমনিয়ার ব্যাপারটা ২১ সালের, না তার আগেও হত, সেটা আর খোলসা হলনা। কিন্তু সবথেকে ভালো যেটা দেখলাম, সেটা অন্য আরেকটা লম্বা বক্তৃতা। প্রথমে বললেন, ব্রাত্য বসুরা গুণী শিল্পী। ওঁরা জেলে থাকবেন না বেলে থাকবেন, সে আইন ঠিক করবে, কিন্তু শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত। শুনে আমার দুর্ধর্ষ লাগল। জেলে থাকবেন না বেলে থাকবেন, সেটা আইন না ডিমধারী 'সাধারণ মানুষ' ঠিক করবে, সেটা নিয়ে একটু ধন্দ ছিল, কিন্তু সে ঠিকই আছে। তারপর বললেন, স্বরূপ বিশ্বাসরা শিল্পের কিচ্ছু বোঝেন না, কস্মিনকালেও চাষবাস নেই, শিল্পকে দখল করতে এসেছিলেন। এর চেয়েও খাঁটি কথা আর হয়না। সম্পূর্ণ একমত হয়ে গেলাম। কিন্তু তারপরই এল ক্লাইম্যাক্স। উনি বললেন, এই জন্যই ব্রাত্য বসুরা বেশি অপরাধী। কারণ তাঁরা যা করেছেন জেনেবুঝে করেছেন। ওঁদের ক্ষমা নাই। এইটা শুনে আমি, যাকে বলে বাকরহিত। শুধু বিষয়বস্তুর গুণে না। থ্রোয়িং এবং ক্লাইম্যাক্সের গুণে একটা সাধারণ বক্তব্যই কীরকম সিনেমা হয়ে উঠতে পারে, এ যেন তার জ্বলন্ত হাতেকলমে উদাহরণ। এই জন্যই আমার ওঁকে এত ভালো লাগে। আশা করব এটা উনি চালিয়ে যাবেন। বাম জমানায় গণসঙ্গীত গেয়ে শ্রেণীশত্রুদের মুখোশ খুলে দিয়েছেন, তৃণ জমানায় বাম অপশাসনকে চিনিয়ে দিয়েছেন, বিজেপি জমানায় নিখুঁত ভাবে চিহ্নিত করেছেন তৃণমূলের অপরাধীদের। আশা করি, পরের জমানায় একই ভাবে বিজেপিরও মুখোশ খুলে খানখান করে দেবেন। এক আধটা জমানায় এক-আধজনকে এরকম করতে দেখেছি, কিন্তু সমস্ত জমানায় এই একই ধারাবাহিকতা? অসম্ভব। ওঁর উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি এবং সর্বাঙ্গীণ কুশল কামনা করি। পুঃ বক্তব্যগুলো কোনোটাই হুবহু না, যেজন্য উদ্ধৃতি-চিহ্ন দিইনি। হুবহু শুনতে গেলে ভিডিও শুনে নেবেন। সাক্ষাৎ অমৃতকাল, আইন আইনের পথে চলছে, বুলডোজার বুলডোজারের পথে। আদালত আদালতের মতো কড়া পর্যবেক্ষণ দিচ্ছে, কোমরে দড়ি দিয়ে হাঁটানো নিজের পথে। কলকাতার মিড-ডে মিলে ডিম থাকছেনা, শুধু ছোঁড়ার কাজে থাকছে। লক্ষ্মীর ভান্ডার আর স্বাস্থ্যসাথী হাওয়া, অন্নপূর্ণা আর আয়ুষ্মান কে পাবেন, কবে পাবেন কেউ জানেনা। এই তো সময়, যখন বিপ্লবীরা শমীকবাবুর থানে গিয়ে হত্যে দিচ্ছেন, বাম কবিরা অটলবিহারী বাজপেয়ীতে মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছেন, সায়নী ঘোষ সাদা শাড়ি ছেড়ে টি-শার্টে ফিরে যাচ্ছেন, চাকরি হারিয়ে রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন আরবানায় থাকতে যোগ্যতা লাগে। এই বাজারে প্যানেলভুক্ত চ্যানেলজীবী মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন, হাসি হাসি মুখে ছবি তুলবেন না তো কবে তুলবেন? তিনি তো আর জার্সি বদলাননি, যে দলে ছিলেন তাতেই আছেন। হাতির নাকি দুধরণের দাঁত হয়। একটা খাবার, একটা দেখানোর। গতকাল খবর এসেছে, কাঁকিনাড়ার জনৈক কার্তিক সাউ আত্মহত্যা করেছেন। তিনি ঝালমুড়ি বিক্রি করতেন ট্রেনে। কাগজে পড়লাম, কয়েকদিন আগে ১৪০০ টাকা ফাইন হয়েছিল, আর পয়লা জুলাই থেকে ট্রেনে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হবে বলা হয়েছিল। তাই অবসাদে তিনি মরণঝাঁপ দেন। এটা উন্নয়নের হাতির খাবার দাঁত, যে দাঁত দিয়ে হাতি তাঁকে খেয়ে ফেলেছে বলে অভিযোগ। অন্যদিকে ডবল ইঞ্জিন সরকার ঝালমুড়ির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডার। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং দোকানে গিয়ে ঝালমুড়ি খান, ফোটোশুট হয়। দোকানদার বিখ্যাত হয়ে যান। তারপর সরকার গঠন করে মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং দিল্লি গিয়ে ঝালমুড়ির স্টল দেন। তারও ছবি ওঠে। ভিডিও ওঠে। এটা হল হাতির দেখানোর দাঁত। যেমন সুন্দর, তেমনই মনোমুগ্ধকর। দেখলে হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।আমরা জেনেছি, অর্থনীতি এতই উন্নত, যে, হকাররা এখন কোটিপতি। টিভিতে হইহই করে শুনেছি সেইসব কথা। যাঁরা বলেছেন, তাঁরা অবশ্য নিজের পেশা ছেড়ে দিয়ে কেউ হকারি করেননি। আমরা আজই জেনেছি, একজন কোটিপতি-সন্তান তিরুপতিতে গিয়ে আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের প্রতি নিষ্ঠা প্রদর্শন করে এসেছেন। বিজ্ঞাপনে, খবরে সেই ছবি ছয়লাপ। আমরা হাঁ করে দেখেছি। হকারের খবরটা অবশ্য কোথাও এক কোণে একটুখানি। কোনো অর্বুদপতি তিরুমালায় চুল উৎসর্গ করেন, আর কোনো হকার উচ্ছিন্ন হয়ে জীবন উৎসর্গ করেন, দেখানোর আর খাবার দাঁতের মধ্যে পার্থক্য তো এইটুকুই। একটা খুব বড়, ঝকঝকে। আরেকটা ছোটো, দেখাই যায়না, কিন্তু ধারালো।
    ভাগবত পুরাণ - ১/৮ - Kishore Ghosal | কত দিন আমি কৃষ্ণের সঙ্গে একসাথে বসে থেকেছি, ঘুরেছি, খেয়েছি, শুয়েছি। মাধব সর্বদা হাসিমুখে আমায় অর্জুন, পার্থ, সখে কিংবা কুরুনন্দন বলে ডাকতেন। কতদিন পরিহাসছলে তাঁকে কত কথা বলেছি। আজ মনে হচ্ছে, সে সব কথা পুরুষোত্তম ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে আমার বলা উচিৎ হয়নি। তিনি কিন্তু কিছু মনে করেননি। পিতা যেমন পুত্রের, বন্ধু যেমন বন্ধুর এবং পতি যেমন পত্নীর সকল অপরাধ ক্ষমা করে দেন, তিনিও আমার সমস্ত অপরাধ ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। "ভাগবত পুরাণ" - প্রথম স্কন্ধ - অষ্টম পর্ব -ভাগবত পুরাণ - পর্ব ১/৮
    খোঁজা খুঁজি - Amit Chatterjee | খোঁজাখুঁজিঅমিত চট্টোপাধ্যায়আমার বড়োই খোঁজার বাতিকপিঁপড়ে খুঁজি কম্বলে।ভরদুপুরে ডাকাত খুঁজি হাজির হয়ে চম্বলে।চোরাই জিনিস খোঁজার বেলায় অভিজ্ঞতা বেশ প্রাচীন। পাকড়ে আনি চোরকে খুঁজে,পালাক না সে রুশ বা চিন! কাঠফাটা রোদ করতে আড়াল ফুটো ছাতার খোঁজ রাখি কারুর বাড়ি খুঁজতে গিয়ে ভুল ঠিকানায় নাম ডাকি হারিয়ে যাওয়া গরুর খোঁজেচরকিপাক যে খাচ্ছি রোজখুঁজতে গিয়ে পাচ্ছি না তোহারিয়ে যাওয়া জুতোর খোঁজকত কিছুই খোঁজার বাকি, তবুও খুঁজতে যাচ্ছি না।খুঁজতে যাব, চশমাটা যে,কোথাও খুঁজে পাচ্ছিনা!
  • জনতার খেরোর খাতা...
    পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য কেন টিকে গেল? - AR Barki | হোলি রোমান সাম্রাজ্য এবং বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য—দুটিই নিজেদের রোমান সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি দাবি করত। কিন্তু পশ্চিমাংশ ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দেই ভেঙে পড়েছিল, যেখানে পূর্বাংশ বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য আরও প্রায় ১,০০০ বছর (১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত) টিকে ছিল। বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) এমন এক জায়গায় অবস্থিত ছিল, যাকে প্রাকৃতিকভাবেই একটি দুর্গ বলা যায়। এটি তিন দিক থেকে পানি দ্বারা বেষ্টিত ছিল, যার ফলে কেবল একদিক থেকে স্থলপথে আক্রমণ করা সম্ভব হতো।স্থলভাগকে রক্ষা করার জন্য ছিল বিখ্যাত থিওডোসিয়ান দেয়াল (Theodosian Walls), যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যেকোনো আক্রমণ প্রতিহত করেছে। সমুদ্রপথে আক্রমণ ঠেকাতে তারা গোল্ডেন হর্ন (একটি সামুদ্রিক প্রণালী) জুড়ে বিশালাকার লোহার শিকল টেনে দিত, যাতে শত্রু জাহাজ ঢুকতে না পারে। কনস্টান্টিনোপল ছিল সিল্ক রোড (Silk Road) এবং ভূমধ্যসাগরীয় বাণিজ্য পথের মিলনস্থল। এশিয়া, আফ্রিকা এবং ইউরোপের সমস্ত বাণিজ্য এই শহরের ওপর দিয়ে হতো। এই বিপুল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে বাইজেন্টাইনরা সহজেই বিশাল সেনাবাহিনী পরিচালনা করতে পারত, দুর্গের সংস্কার করতে পারত এবং প্রয়োজনে শত্রুদের বিশাল অঙ্কের টাকা (Trubute/ঘুষ) দিয়ে যুদ্ধ এড়িয়ে যেত। বাইজেন্টাইনদের কাছ ছিল গ্রিক ফায়ার। এটি ছিল এক ধরণের তরল আগুন, যা পানির ওপরেও জ্বলত। সমুদ্র যুদ্ধে শত্রু জাহাজের ওপর এটি স্প্রে করা হতো।  পানি দিয়ে এই আগুন নেভানো যেত না বলে শত্রু নৌবাহিনী এর সামনে পঙ্গু হয়ে পড়ত। এই প্রযুক্তির সূত্রটি বাইজেন্টাইনরা এতটাই গোপন রেখেছিল যে আজ পর্যন্ত এর সঠিক উপাদান কী ছিল তা জানা যায়নি। পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য যেখানে স্থানীয় জমিদার বা সামন্ত প্রভুদের কোন্দলে দুর্বল হয়ে পড়েছিল, বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য সেখানে অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হতো। তাদের কর আদায় ব্যবস্থা ছিল চমৎকার, যার ফলে যুদ্ধের সংকটের সময়েও রাজকোষ কখনো শূন্য হতো না। বাইজেন্টাইনরা কেবল তরবারি দিয়ে নয়, বুদ্ধি দিয়ে যুদ্ধ জিতত। তাদের একটি সুপরিচিত নীতি ছিল—"শত্রুর শত্রুকে বন্ধু বানানো"। তারা এক বর্বর জাতিকে অন্য বর্বর জাতির বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিত। গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার এবং বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে তারা অনেক বড় বড় যুদ্ধ ছাড়াই সাম্রাজ্যের সীমান্ত সুরক্ষিত রেখেছিল। এতসব চমৎকার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ১৪৫৩ সালে অটোমেন তুর্কিদের হাতে এই বিখ্যাত শহর ও সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
    শ্রীচৈতন্য।  - Sobuj Chatterjee | তিনি ছিলেন ১৫শ শতাব্দীর একজন মহান আধ্যাত্মিক পুরুষ ; নির্ভীক সাম্যের প্রতীক এক মণীষী, সমাজ সংস্কারক এবং গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মের প্রবর্তক। তাঁর প্রধান দর্শন ছিল 'অচিন্ত্য ভেদাভেদ'। তাঁর প্রবর্তিত 'ভক্তি আন্দোলন' জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে প্রেম ও হরিনাম সংকীর্তনের মাধ্যমে সমাজে নবজাগরণ সৃষ্টি করেছিলতাঁর অভাব এই দুঃসময়ে মরমে মরমে উপলব্ধ হয়।প্রাগৈতিহাসিক বিদ্বেষ দূষনে জর্জরিত আজকের এই পৃথিবী! যেখানে প্রেমেপ্রীতির নেই বিন্দুমাত্র স্থান। চতুর্দিকে শুধু হানাহানির লেলিহান শিখার গর্ভে গ্রাস হযে চলেছে অসহায় মানুষ।জাতি আর ধর্মের অজ্ঞান-আক্রোশে মানুষই আজ মানুষের ভক্ষক! কোথাও নেইকো পার।মনে হয় যেন অনন্ত কৃষ্ণগহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে গোটা পৃথিবীর মানুষ! এমন নারকীয় পরিস্থিতি তে প্রেমের দেবতা,শ্রীচৈতন্য যদি আজ ফিরেও আসেন তবে মানুষের হাতেই তাঁকে খুন হতে হবে! কারণ তিনি ফিরলেও মানুষের চৈতন্য আজও ফেরেনি!তবু আজও এই মহামানবের প্রয়ান ঘিরে দূর্লঙ্ঘ রহস্য জাল। এক অসীম সাহসী গবেষক ডাঃ জয়দেব মুখোপাধ্যায় ;;এই রহস্য উদ্ঘাটনে ব্রতী হয়ে অজ্ঞাত কারণে মৃত্যুবরণ করেন ১৯৯৫ সালে। ঋণ স্বীকারঃ অন্তর জাল।
    লর্ড বায়রনের বঙ্গ-লন্ডনে আগমন - Shayak Mitra | সতেরো বছর বয়সে ডাক্তারি কলেজের পড়া মাথায় তুলে লর্ড বায়রনের অসম্পূর্ণ মহাকাব্য, ও ইংরেজি ভাষায় অপূর্বতম কবিতাগুলির একটি, ‘ডন জুয়ান’-এর একাদশ সর্গের ছান্দিক ও লয়গত সংগতি বজায় রেখে অনুবাদের একটি তাৎক্ষণিক প্রয়াস। যদিও প্রকাশের ইচ্ছে নেই, পর্যায়ক্রমে বাকি সর্গগুলো শেষ করার ইচ্ছে আছে। এটি নিছকই এক "এক্সপেরিমেন্ট" হওয়ায় ধারাবাহিক রূপে নেই। 'অনুবাদকের (অতিরিক্ত) কথা' এবং টীকাসমগ্র আপাতত, অর্থাৎ খেরোর খাতার এই পৃষ্ঠায়, উহ্য রইল।  একাদশ সর্গ বার্কলি! তোমার তত্ত্বটি অপদার্থযা দিয়ে পদার্থ অস্বীকার করো;শুনি এর বিরুদ্ধে সব তর্কই ব্যর্থ,যা উত্তম জ্ঞানের চাইতেও সূক্ষ্মতর;তাও কী বিশ্বাসে হবে এ কৃতার্থ?ভগ্ন পদার্থের সীসায় তুলে ধরোবা হীরকে লেখো ভুবনের আত্মা,যাতে এক মুণ্ডু থাকলেও পায় না পাত্তা।ব্রহ্মাণ্ডব্যাপী অহংকারের স্পর্শ ব্রহ্মাণ্ডে পাওয়া কি তীক্ষ্মই না আবিষ্কার!তাও কেবল আমরা সব হলে আদর্শ;থাক বিশ্বের বাজি (বিশ্ব বোঝার দায় তোমার)।ওঃ, সন্দেহ! তোমার অপার উৎকর্ষআমায় করে সন্দিগ্ধ - সত্যের আররশ্মি না নিক আমার আত্মিক পানীয়যা স্বর্গ-সুরা, তাও অসহনীয়।কারণ সবসময় আসে বদহজম(খুব আত্মিক কিছুই নয়), ও আমার ভাবনাএক সমস্যা দিয়ে করে খতম,যা কক্ষনোই আমার দুঃখের জবাব না:মানব সমাজে সেই জায়গা খুব কম,যেথা কাম ও লিঙ্গের পার্থক্যের লাভ নারয় লুপ্ত; জ্ঞান-বিস্ময়ের ঋক্ষকোষএই বিশ্ব - তবু এক গৌরবময় দোষ।নিয়তিতে থাকলে এমন বিচার,সুখকর হবে হঠাৎ জোটার থেকে;সত্যি ফললে করব না অস্বীকার,পাছে আমায় মারধোর করে অনেকে।তা ভালো, কারণ এই প্রাণের সংহারহবে এসব সমাধান ব্যতিরেকে;যা অন্তে সবার কাছে হয় বিদিত,বা অন্তত তার আগেই আমরা মৃত।তাই ছাড়ছি সমস্ত দার্শনিক কথা,যার আদৌ খুঁজে পাইনি স্থায়ী এক আশ্রয়;আমার মতে, আসল বিচক্ষণতা -"যা আছে, তা আছে", এই উক্তিটাই বোধহয়।তাও ক'দিন আমার বুকে বড়ই ব্যথা!খারাপ বাতাসেই কি পীড়িত এই হৃদয়?জানি না - অবস্থা যে বেশ সঙ্গীন!তাই ধর্ম-পন্থাও হয়ে যায় প্রাচীন।প্রথম পীড়ায় দেখলাম ঈশ্বরের চিত্ত;(যা সন্দেহের বাইরেই, যেমন শয়তান)দ্বিতীয়ে বুঝলাম মেরির কুমারিত্ব;তৃতীয় দেয় পাপের উৎসের সন্ধান;চতুর্থ পীড়ায় ত্রিমূর্তির অস্তিত্বএতই অকাট্যভাবে হয় প্রমাণ,যে আমার ভীষণ আশা তিন থেকে হোক চার,যাতে আমার ভক্তি হয় আরওই দুর্নিবার।গল্পে ফিরছি: অ্যাক্রোপলিস পদতলেরেখে অ্যাটিকা উপভোগ করেছে যে,যে নৌযাত্রার অন্তে কনস্ট্যান্টিনোপলেপা রেখেছে; চিনেমাটির পেয়ালাতে চা নিয়েছে চীনের ক্ষুদ্রাক্ষী মহলে;মৃন্ময় নাইনেভি অথবা টিম্বকটুর সেলোক হলেও, ভাববে "তুচ্ছ এই লন্ডন-নগর!"তাও সে প্রশ্ন কোরো তাকে এক বছর পর।ডন জুয়ান এখন শুটার'স হিলে হাঁটে,সূর্যাস্তের সময় সেই টিলা-টির নতিআস্ত লন্ডন অঙ্কিত যার ললাটে;তার রাস্তায় পাপ ও পূণ্যের কাল-বসতি;সে নিঝুম পরিবেশে, নির্ঝঞ্ঝাটেশোনে এক্কাটির ছান্দিক চক্রগতি;আর এক ফুটন্ত, অস্থির, ব্যস্ত কোলাহলসেই শহরের, যা নিজের জঞ্জালেই অচল।বলছি যে, জুয়ান, গভীর চিন্তায় মগ্ন,(এই মহান দেশের মহত্বে বিস্মিত)হেঁটে এক্কার সাথে থেকে সংলগ্ন,চেঁচিয়ে উঠল, যখন চূড়ায় স্থিত:"এইখানেই স্বাধীনতা রয় অভগ্ন!এইখানেই জনগর্জন নয় দমিত,কারারুদ্ধ, উৎপীড়িত; তাই, পুনরায়নতুন নির্বাচনে তার জন্ম প্রমাণ পায়।এই তো শুদ্ধ জীবন ও নারীগণ!... সবই হয় যৌক্তিক মূল্যতে বিক্রয়;আর কেউ তার সম্পত্তি করলে বর্জন,সালে তার দেখি কত রোজগার হয়।এখানেই দুর্লঙ্ঘ্য আইনের শাসন,ফাঁদমুক্ত রাস্তায় নেই পথিকের ভয়;এখানেই" - তাকে চুপ করায় এক ছুরি,আর "মাল বের কর, নয় ফুটো করব ভুঁড়ি!"এক্কার পাশে হঠাৎ এখন আগত,সে হয়ে ওঠে চার ডাকাতের লক্ষ্য।সুযোগটি নিতে কাজের ছেলের মত,ঘাপটি মেরে ছিল এই গোটা পক্ষ -যাতে আনমনে রাস্তায় ঘুরতে রতএক ব্যক্তি না হলে লড়াইয়ে দক্ষ,এই স্বর্ণদ্বীপে (খুব আতঙ্ক হয়),খুইতে পারে তার বস্ত্র-ধন উভয়।জুয়ান ইংরেজিতে হলেও নির্গুণ,জানত তাদের সেই গালিটি, "গড ড্যাম!"আর এক্ষেত্রেও তার হাল এমন করুণ,তাদের এই "শালা"-য় সে শুনছে "শালাম,"অর্থাৎ "ঈশ্বর তোমার সঙ্গে থাকুন!"মোর অর্ধ-ইংরেজ হওয়ার পরিণাম:দুর্ভাগ্য যে বলতে পারি না কভু,কেউ অন্যথা কয় "সঙ্গে থাকুন প্রভু!"তাও যা ছিল অতর্কিত ও ভণ্ড,তাদের সেই ইঙ্গিত জুয়ান বোঝে অতঃপর;হঠাৎ তার জামার পিস্তলের প্রচণ্ডগুলিতে ঘায়েল হয় এক দুষ্কৃতীর উদর।আর, যেন প্রান্তরে সুপ্ত এক ষণ্ড,লোকটা আছাড় খেয়ে কাদা মাখে বিস্তর,যার চিৎকার শোনে তার নিকটের সঙ্গী:"ওঃ, জ্যাক! খুন করে ফেলল ওই ফিরঙ্গী!"এ শুনে জ্যাক ও তার দল মারল ছুট,আর জুয়ানের-টা ছিল খানিক দূরে;কাণ্ড দেখে তাদের বিস্ময় প্রস্ফুট,ফলে সাহায্য এলো দেরি করে।জুয়ান ভাবল - তার কাণ্ডজ্ঞান অটুট -"মলম-পটিতে এঁকে দেব মুড়ে,"দেখে তার উন্মাদ দেহের রক্ত-বমি,"ইস! একটু যদি ধৈর্য ধরতাম আমি!মনে হয়, স্বাগত জানানোর রীতিএদেশে এই রকমই; দেখতে গেলেচুরি হেথা সরাইওয়ালার-ও নীতি,গালিগালাজ বা বন্দুক নাও পেলে।কিন্তু কি কষ্টকর এই লোকটির ইতি;এঁকে তো রাখতে চাই না রাস্তায় ফেলে -কি কাতরাচ্ছেন উনি! আচ্ছা, কি করি?"ও বলল, "এসো, এঁকে তুলে ধরি!"কিন্তু হঠাৎ আহতের আর্তনাদ - "চাপ নিস কেন? আসে মোর এন্তেকাল!"এক গেলাস মালই হোক তার শেষ প্রসাদ,"হেথাই মরব - লুঠের যে করুণ হাল!"গাঢ় রক্তের শ্বাসরুদ্ধ দুঃসংবাদপেয়ে সে খুলল তার গলার রুমাল;অবশ কন্ঠে অনুরোধ রাখল সেমরার আগে: "রুমালটা স্যাল-কে দে!"জুয়ান বুঝল না - কেন অবতীর্ণ হয় রক্তাক্ত কাপড়টি ঠিক তার পায়ে;বা, দেখে তার শিকারের শব প্রকীর্ণ,কী যে মিনতি ছিল তার বিদায়ে।টম একদা ছিল না এত শীর্ণ!সে রংবাজির এক ওস্তাদ ছিল গাঁয়ে,আর বাদশা চারশো বিশ - তারপর তার ঝুলিহয় খালি, আর শরীরে ঢোকে গুলি।রাখতে এই দুর্ঘটনার শুভ অন্ত,জুয়ান প্রতিকার করল যথাসাধ্য;তাও শেষ হওয়ায় পরীক্ষকের তদন্ত,রাজধানীর দিকে ছুটতে হল বাধ্য।তাকে যেন এক বদমাশ শেষ পর্যন্তনা বানিয়ে দেয় এদেশের সান্নিধ্য;আত্মরক্ষায় এক হত্যা - আসার মোটে আধ-দিনের মধ্যে - খুব শোকেরই বটে!স্ব-যুগের যে ছিল জাঁদরেল বিজেতা,সেই বাচ্চুর উইকেট পড়ল স্বর্গক্রোড়ে;কে ছিল টমের মতো গুণ্ডা-নেতা,রকের মাতাল, বা ঠগবাজ পাড়ার মোড়ে?যদিও মামার দল নিষেধ করে তা,বট-রাস্তায় কে অমন তার যন্তর ছোঁড়ে?কে তার খুবসুরত আইটেম স্যাল-কে নিয়ে,তার পেয়ারকে টিপ-টপ করে নেয় রগড়িয়ে?কিন্তু টম আর নেই - তাই তার কথাও নেই।দৈব কৃপায় বীর-মৃত্যু অনিবার্য,পরবর্তী ঠাঁই কোথায় তা জানলেই।হে, থেমিস, নদ! জুয়ানের এক্কার ধার্যপথ লিখিত যে তোমার সৈকতেই!যার চাকায় ফলে বজ্রদস্তুর কার্য,কেনিংটন আর বাকি সকল "টন" ধরে;নাম শুনলেই ভাবি দৌড়ে যাই শহরে।এবং বনহীন সেই "গ্রোভ্স"-এর উপবন(বা "উপবন্যা"), ও "মাউন্ট প্লেজ্যান্ট" নামেরাজস্থানের নেয় পায়খানায় স্মরণ:ভাড়ায় সুলভ সব ইঁটের ছোট্ট খামেধুলোর ঝড় আছে ভাড়াটে এখন;সভ্য সমাজের মুখে, "স্বর্গধামে"স্থান পায় এখানে যেসব ঘরের সারি,তা ছাড়লেই বাঁচত বিশ্বের প্রথম নারী।টাঙ্গায় ও এক্কায় করছে রাস্তার ধোলাই -যাত্রীর সংশয়ে গর্জায় প্রত্যেক চাকা;এই সরাইয়ে আছে সুস্বাদু চোলাই,আর ওই বাজার এক মুহূর্তে হয় ফাঁকা।নাপিতের দোকান চব্বিশ ঘণ্টা খোলাই -তার পুতুলে হরেক পরচুলো রাখা;এই যে দারোয়ান, লম্ফের তেলটা ঢালো!(সে আমলে ছিল না গ্যাসের আলো);এই সব, আরও অনেক সব, হয়ে আসেএক পর্যটক মায়াবী ব্যাবিলনে;কেউ ঘোড়ার পিঠে, কেউ টাঙ্গাতে ভাসে,তাও সকল পথই সমান - আমার মনে।বাকি কথা থাক! আমার ওপর হাসেমানচিত্রের অধিকার। আর, এতক্ষণেজুয়ানের দল পেরিয়েছে এক সেতু,চাঁদের আলোয় (আজ পূর্ণিমা যেহেতু)। বেশ মধুরই শুনতে, রুপোলি সাঁঝেথেমিস - স্নিগ্ধ, তাও প্রভাবান এক নালা!যদিও লন্ডনের চাঞ্চল্যের মাঝেআগে কানে আসে একগাদা "শালা!"আর ওয়েস্টমিনস্টারের উজ্জ্বলতর ঝাঁঝেসব জ্বললেও, তার সেই গির্জাটি নিরালাখ্যাতি যেথা ভৌতিক এক অতিথি,ও জ্যোৎস্না-ধৌত এক পবিত্র স্মৃতি। আদিবাসীরা আর নেই। ভালো কথা!আছে স্টোনহেঞ্জ - সেটাই বা কাকে বলে?বেথলেমের বেড়ি আছে, তাই অযথাকামড়াবে না তোমায় কোনো পাগলে;হাজতকে আঁকড়ে ধরছে ঋণের প্রথা,আর নগরপালের সুবিশাল মহলেকিচ্ছু চলছে না জনসাধারণের কাম;আর এসব চাইতে বেশি সেই গির্জাটির দাম।পেল মেল বা চেয়ারিং ক্রসে গিয়ে দেখ!আলোর সারিটাই যেন সোনায় পুষ্ট।হে, গরীব, মরচে-ধরা ইউরোপ, শেখ -তোমার প্রতি যে চন্দ্রিমাও রুষ্ট!ফ্রান্স! কই, দেখি এত যে বিপ্লব লেখ,তোমার আলোর খুঁটিগুলোও কি দুষ্ট!সেখান থেকে কোনো বাতি না লটকে,লটকাচ্ছে মড়াগুলো সব ঘাড় মটকে।রাস্তা জুড়ে তাও ভদ্দর মড়ার ছায়াবা সিংহাসনের কাঁচা কাঠের চিতা,পন্ডিতদের কাছে নয় সাময়িক মায়া;তাও কানাদেরই জন্যে এই কবিতা,কারণ বিপ্লবী চিন্তা এক আলেয়া।সভ্যতার এই বেশ অসভ্য ভণিতা সদর্পে জ্বললে করে ভীত-ভ্রান্ত -আর বুদ্ধির কৌশল দেয়, যদি হয় শান্ত।হেথা এতই আলো আছে, লন্ডনেএকটি সৎ ব্যক্তি না পাওয়ার আফশোসডায়োজেনিসের এক বিরাট লণ্ঠনে,নয় লোকের বা আলোকের সংখ্যার দোষ;দোষ থাকবে বিশ্বে সততার বণ্টনে(যদিও লন্ডন একটা বিশ্বকোষ)।আমিও সেই গুপ্তধন খুঁজতে ব্যর্থ,তাই ভাবি, বিশ্বের কেবল আছে স্বার্থ!ডন জুয়ান, আমাদের কূটনৈতিক ছেলে,খটখটিয়ে অন্য ছেলেদের পেরোয়;সব দরজার কড়ায় খটখট হয় পেল মেলে,ও পাওনাদার-রা ফকির হয়ে বেরোয়।ঘরে কেউ অতিথি পেট ভরে খেলে,রাত্রে আর ভবঘুরে রয় না সে। রয়জুয়ান, যে শেষটায় ছাড়াল এই সড়ক,সেন্ট জেমসের প্রাসাদ এবং জুয়ার "নরক"।জুয়ান-রা আসতেই শৌখীন সব বেয়ারা ভিড় জমাল তাদের সরাইয়ের দ্বারে;আর সেইসব নিশাচর পিঙ্গলা, যারালাগে ভদ্র লন্ডনের উপকারে,এবং সমাজে দাম্পত্যের এক ধারাঅভদ্রভাবেও বজায় রাখতে পারে,যেমন ম্যালথাস শেখায় বিবাহের মান।এক্কা থেকে এখন নামছে জুয়ানদেখতে তার সরাইরুপী স্বপ্ননীড়;অবশ্যই এক বিদেশীর - বা, তার জন্যযার সঙ্গে ভাগ্যের সম্পর্ক নিবিড়,আর হাতখরচ যার তোশামোদেই ধন্য।সেথা অনেক বাসি আবাসীর ভিড়,এক-একজন রাজনীতির হারানো পণ্য -যদি না কেউ, খ্যাতির ছোট্ট এক ফাঁকে,টাটকা হাতে তাদের বাসি নাম আঁকে।জুয়ানের ছিল না এক মোক্ষম পদযা বলবে তার লক্ষ্যটি নিজের খাস,না দেশ-কল্যাণের পক্ষে ফলপ্রদ;তার ছিল বিরাট সূক্ষ্ম এক ফরমাশ।সবাই ভাবল, এক বিদেশী রসদএই সুশ্রী যুবকটি; কোন্ গোপন আশমেটাতে এসেছে সে স্বদেশ ছেড়ে,নিয়ে তাদের সম্রাজ্ঞীর হৃদয় কেড়ে?ডন জুয়ানের রক্ষক হয় অনেক জল্পনা:প্রেমে তার দাপট, আর অদ্ভুত যুদ্ধতে।সকল ইংরেজদের মাথা ভর্তি কল্পনা;মেয়েদের বেশি - আহ্লাদের জগতেযুক্তির বিরুদ্ধে বিপ্লব তাদের অল্প না!লন্ডনে লাগল জুয়ান চটুল হতে:ধীরে ধীরে সে এসে সবার চর্চায়,হয় ভাবুক লোকের খাদ্য - বিনা খরচায়। বলছি না যে তারা কেউ খায় না খেটে;খাবার বা খবর থাকে সবার মুখে।এ সবই জমা হলে তাদের পেটে,তফাৎ আর থাকবে না কারুরই সুখে;রন্ধন-প্রণালী জানলেই তোমরা সেঁটেখেয়ে, যুক্তির প্রতি দাঁড়াবে রুখে।সব যদি প্রেম-গুজবের কাঙাল হয়,কি তফাৎ রাখে মগজ আর হৃদয়?যথাস্থানে জুয়ান হয় পরিচিত,ও তার রুশ রাজকীয় খুঁটিনাটি;বুঝেই তারা ভদ্র ভেংচিতে স্ফীত,যাদের শাসনে সন্দেহটাই খাঁটি।দেখে (সরকারে এটাই জরুরি তো!)কচি জুয়ানের বোকা চেহারাটি,তার সকল স্বপ্ন গিলতে এরা চায় -বাজপাখি যেমন চড়ুই ধরে খায়।তাদের এই দোষটি বয়সের বিকার,তাও সে কথায় পরে আসব। না এলে,বুঝবে তারিফের ইচ্ছে নেই আমারএক রাজনীতিজ্ঞ ঘুষ আর মানুষ খেলে,যার সাহস নেই মিথ্যেটুকু বলার।এখন এই গুণটি নারীর মধ্যে মেলে -তার মিথ্যে ছাড়া কিছু বলা বারণ;সে সত্যেরই তুলনায় অসাধারণ।আসল প্রশ্ন হল, "মিথ্যা" মানে কি?বোধহয় তা শুধুই মুখোশ-পরা সত্য;আমি বলব, এক চিমটে হলেও মেকিইতিহাস, ধর্ম, আইনের সব তথ্য।আসল সত্যের ছায়াটুকু পড়লে কিবেঁচে থাকবে এই কবিতার মহত্ত্ব?না অতীতের কোনো ঘটনা নিয়েকেউ ভবিষ্যদ্বাণী দেবে চালিয়ে?জয় মিথ্যা! জয় মিথ্যাবাদী! কে আছে,যে আমার চরিত্রকে করবে ঘৃণা?সমাজের সব প্রশংসা আমার কাছে,তাই দুঃখ আর প্রকাশ করতে পারি না(সততার চোটে কেউ না মানলে পাছে,যে রাজ্যের তারিফ একদম ভণ্ডামি না)... সবুজ আইরিশদের দেখ! - সত্যের ভয়েরাজমুকুট চেটে জিভটা গেছে ক্ষয়ে।জুয়ানের দেহ ও তার চাল হয় পেশ,যা দেখে উঠল অবাক ফিসফিসানি;একটি বিশাল হীরায় দীপ্ত তার বেশ,যা দেখে সবার চোখে এলো পানি।ক্যাথরিন একদিন জুয়ানকে সবিশেষমত্ততায় (প্রেমের বা মদের, কি জানি)ওই রত্ন প্রদান করে বানায় ধন্য,তার দেহের প্রচুর যত্ন নেওয়ার জন্য।আর ছিল যেসব মন্ত্রী ছোটখাটো,কষ্টে থামায় সেই হিংসুক গলা সাধাযার ঠ্যালা বুঝে তাদের বড়লাটওহাতে নেয় ফকির রাজার আইনধাঁধা;তার কেরানিরাও লোভে আঁটোসাঁটো -এক স্নানঘর-হর্ম্যের নর্দমার সেই বাধাযা এমন দুর্নীতির কাদায় হয় মোটা -তাও ছাড়ল নম্র জলের দু-এক ফোঁটা।বেয়াদপিটাই তাদের মাসিক আয়;লোভের জন্যই তো রোজ তাদের খাটুনি,যুদ্ধে বা শান্তিতে, যেখানেই যায়।এ নিয়ে সন্দেহ থাকলে, কই, শুনি! -পড়শিকে জিজ্ঞেস করা তোমার দায়:এমন করখেকোদের বজ্র আঁটুনিযে কারুর স্বাধীন হাড় জ্বালিয়ে গেলে,সে ভাববেই - সব পা-চাটা খানকির ছেলে।জুয়ান তাও नौटंकी-র সাথে হয় গ্রহণ -ওই ঢং মেলাতে বললাম রাষ্ট্রভাষা,যে রাষ্ট্রে সকল চালই করে বহনভাবনার বক্রতা (যেন জুয়ার পাশা),আর বাক্য, লিপি - দুই প্রথাতেই গহন।যখন এক জায়গা মানুষে হয় ঠাসা -কায়দা, চালাকি, গালাগালিও বাড়ে,ঠিক যেমন দেখতে পাও মাছের বাজারে।বাংলা "শালা"-টি তবু অভিজাত।অন্য "রাষ্ট্রগালি"-তে গলদ অনেক,যার জন্যে মানবদেহই আজ কুখ্যাত;তাই আমি ভদ্রতা রাখতে ভীষণ একঅশ্রাব্য আর কিছু বলতে চাই না তো!(সে ক্ষতি এমনিই হয়েছে আগে ক্ষণেক)তাই এর তুলনায় "শালা"-টা বেশ সূক্ষ্ম -খিস্তির আত্মা, তাও দার্শনিকের দুঃখ।গাল খাওয়ার জন্য আছে নিজের বাড়ি।আসল বা নকল ভদ্রতা যার দরকারসে নীল সমুদ্র পারে দেবে পাড়ি,বাইরে যদিও পরেরটাই দেয় সরকার।কালে-ভদ্রে একটা স্বদেশে ছাড়ি,দেখবে আরেকটার গল্প সব এরপরকার;যাইহোক, এসব কথা ধরেছে গতে -এই পদ্যের দরকার ঐক্য, আমার মতে।ওই মহান দুনিয়ায় - সমাজে - মানে যা রয় পাশ্চাত্য শহরের পশ্চাতে;ক'হাজার লোকলস্কর থেকে যে পানে(যাদের জ্ঞান নেই মাথায় বা কৌশল হাতে),আর সব ঘুমোলেও উঠে বসে, জানেপৃথিবীর ওপর করুণায় তাকাতে -সেই উচ্চাঙ্গ সমাজে পায় সম্মান,বিলাসিতায় অভ্যস্ত ডন জুয়ান।সে ছিল কুমার, তাই হল আকৃষ্টউৎসুক কুমারী ও সন্দিগ্ধ কনে,বিচার করতে তার পৌরুষের বৈশিষ্ট্য;আর (প্রেম বা অহংকার না থাকলে মনে)দ্বিতীয় গোষ্ঠীও তার প্রতি সুমিষ্ট,তাও কণ্টকস্বরূপ পতিদের জীবনে -খাতিরের কাঙাল - ও পরকিয়ার দ্বিগুণ পাপ লুকোনোর ঝামেলাই সার।কিন্তু সত্যিই এক কুমার আমার নায়ক,ধনের, প্রাণের, ও জ্ঞানের পথিকৃৎ;অপূর্ব নর্তক আর এমন এক গায়ক,ভাবালু যেন মোৎসার্টের সংগীত -ঠিক সময়ে মধুর বা দুঃখদায়ক;এই বয়সেই তার শিক্ষা হয় উচিত,কারণ সে জানে কি বিকট এই বিশ্ব,ও সাহিত্যের কাছে কত অস্পৃশ্য।কন্যাদের গালে লজ্জার লোহিত লীলা;তাও কনেদের রংটাই রয় বেশিক্ষণ -যৌবনে রঙিন আর সীসায় রঙ্গিলাটেমসের ধারে এই দুই গোষ্ঠীর বদন;জুয়ানের মত "দাসেরে রাখিলাচির-ঋণী", তাদের সেই প্রলোভন।মেয়েদের তার রোজগার আর পোষাক চাই;মায়েরা শুধোয়, "তোমার কয়টা ভাই?"জুয়ানের বিদেশি ধনের যে শস্য,সেসব চতুর দর্জি তার নেয় সুযোগগিন্নিরা যাদের হাল পোশাকের পোষ্য,ধার দিতে করে মোটা দর প্রয়োগ;দাম্পত্যের পেয়ারকে করবে তাদের বশ্য -যা সুদে আর আসলে হবে ভোগ,শেষে বরগুলোর পকেট করে খালি;আর বাড়তি পাওনা রয় আফশোস ও গালি।আসে সব প্রেমপত্রপ্রেমী বিদুষীনিয়ে টুপি-পরা আঁতেল গরিমা,যারা জমকালো নীল পোশাকেই খুশি।ছড়ার কাঙাল, নরম একদল নীলিমা,বলে সব সস্তা ফরাসি বা রুশীজানতে চায় কিছু পণ্ডিতের মহিমা -হোমারের উপর জুয়ানের জবানি,আর কোনটা মধুর: রুশ না ইস্পাহানি।জুয়ান বোধহয় কখনও নেয়নি গড়েনিজেকে এক মধুসূদনের ছাঁচে,তাই এসে পণ্ডিত বুড়িদের নজরেএখন বুঝল, পালাতে পারলেই বাঁচে।তার জ্ঞান ছিল যুদ্ধে, প্রেমে, দপ্তরে,আর দৈহিক শিল্পে (মানে - যেমন, নাচে);এখন দেখে কাব্য-ঝর্ণা নিখিল,সে জানল তা স্বচ্ছ নয়, ঘোলা নীল।কোনক্রমে এক শান্ত প্রত্যয় রেখেযত্রতত্র শব্দের সে ছোটায় বন্যা;ভাবি এই বিরল অধ্যবসায় দেখে,তা সংকোচের অকাট্য নিদর্শন না।এমন তার কথাবার্তা খাতায় লেখেমিস অ্যারামিন্টা স্মিথ (এই বিস্ময়কন্যা "ক্ষিপ্ত হার্কিউলিস"-কে অনুবাদ করেক্ষিপ্ততর ইংরেজিতে - কৈশোরে)।জুয়ান জানত বেশ কয়টা ভাষা - যেমনস্বাভাবিক - যে চর্চাতে হয় আকর্ষ এই বিজ্ঞ নারীদের তার প্রতি এমন।তবু তার কলজেয় নেই কবিত্বের স্পর্শ,ভাবতেই পণ্ডিতদের মনটা করে কেমন(থাকলেই যে তার প্রতিভা হয় আদর্শ!);মিস পুরু-শালিনী আর আঁতেলিনী চানতাঁদের নামে সুন্দর এক ইস্পাহানি গান।যাইহোক, জুয়ান শেষে হয় অন্তর্ভুক্তবড় আর ছোট তাদের সব বৈঠকে;আর যেমন সস্তা পত্রিকায় সব যুক্ত,নজর দেয় তাকে দশ হাজার লেখকে(বিক্রি বাঁচাতে এই সংখ্যাই হয় উক্ত)ফেলতে তার শিক্ষাকে কাগজের ছকে;সঙ্গে "সেরা আশিটা জ্যান্ত কবি"ব্যাঙ্কুও-র স্ফটিকে মেধার প্রতিচ্ছবি।"সেরার সেরা কবি"-র তিন সাল অন্তরেক্ষমতা জাহির করাটাই হয় কাজ -যেন এক কুস্তির আখড়ায় তার ডাক পড়ে,যদিও জিনিসটাই যে নকল আজ।জয়ী না হতে চাইলেও এ সমরেবা টুপি মাথায় গর্দভ-ধামে রাজ,নিজেই সকলকে দেখেছি, অজান্তেআমাকে কবিদের নেপোলিয়ন মানতে।তাও মস্কোয় পড়ল জুয়ান, আর ফালিয়েরোলাইপ্সিগে - কেন্ আমার সঁ-জাঁয়ের টিলা;"আলিয়ঁস"-এর কোঠায় পাকছে গাধার গেরো,আর স্বয়ং সিংহও হারছে মোকাবিলা;কিন্তু এমন "কব" বা "রেজি" সিংহেরওহয় ধ্বংস আসে, নয় থাকে রাজলীলা,নয় একাই সে কোন্ দ্বীপে সন্ন্যাস নেয় -তার কপট সাউদি লোয়ের কপাট দেয়।আজ ধর্মের চূড়ায় হলেও, আমার আগেরাজ করত স্কট, মুর, ক্যাম্পবেলের ঘরানা;সব কবিই এখন পুরোহিত বিভাগে(কাব্য আর নেই কাব্যলক্ষীর জেলখানা)।পক্ষীরাজের আজ উড়তে রণ-পা লাগে,নিষ্ঠুর মালিক যার ছিঁড়ে ফেলছে ডানা;আমার অতি শ্রদ্ধেয় বুলি গুরু!যে গির্জার সম্পদ লুঠতে করবে শুরু।তবু লোকটা খাটে প্রচুর, তার ফলদকাব্য-দ্রাক্ষা থেকে ঢালতে মদিরা,তাও শেষে পড়ে ভিনিগার। এই গলদন' কাব্যদূতীকে দেয় নীরস পীড়া;শোনায় পদ্যের এই লাঙল-টানা বলদ(যাকে খেদায় সু-পুরুষ ও কবিরা)পারস্য রাজে বন্ধ্য রোমান অত্যাচার,তার কুৎসিত দেবীর বন্ধ্য পূজারীর চিৎকার।আর আছে আমার ভদ্দর বাবু, যেনাকি আমার কবিতায় আনবে নীতি;স্বয়ং আমিও হতে চায় যদি সে,তার সব প্রচেষ্টার থাকতেই হবে ইতি।কোলরিজকেই মহান ভাবে অনেকে;ওয়ার্ডসওয়ার্থের রয় দু-তিন চামচার সমিতি।ভাবছে ল্যান্ডর, ওই জংলী মাথামোটা,যে দাঁড়কাক সাউদি রাজহংসই পুরোটা।জন কীটস্! তাকে করল অকালে হত্যাতার একটু "ধ্রুপদী" বার্তার কটাক্ষ;ওর গ্রীক-মার্কা পদ্যের দুর্বোধ্য সত্তাদেয় দেবদেবীর জীবনের উদ্ভট সাক্ষ্য,আর এতেই জানা যায় তার বুদ্ধিমত্তা।হায়, বেচারা কবি! বানিয়ে লক্ষ্য,একটিমাত্র প্রবন্ধ দিল ফুঁকেঅদ্ভুতভাবেই এই অগ্নিময় বস্তুকে।সংখ্যায় তার বাড়ছেই জ্যান্ত-মৃত দাবি,যা দুষ্প্রাপ্য ও যার মালিক অজানা;লাভ করার আগেই পরলোকের চাবি, কালে তার শীতল রক্তের ওপর হানা দেবে তাদের পোড়া ঘিলুর ঘি। ভাবিএই ভিড়েই বিধ্বস্ত সেই মালিকানা;যেন ত্রিশ নকল শাসকের ভীমরতি করছে রোমের ঐতিহ্যের প্রচুর ক্ষতি।যেথা আসল শক্তিধর রাজার "রক্ষক",এ সাহিত্যের সেই নিকৃষ্ট সাম্রাজ্য;যে বিষাক্ত অমৃত আনে এই "ভক্ষক",তা আলস্য ও লাম্পট্যে বিভাজ্য -যাতে খাদ্যরূপ রাজার করতে শখ হোকতোষণে এই রাক্ষসদের মূক সাহায্য;তাও এদের আমি, নিজের জায়গায় হলে,দেখাতাম মগজ-যুদ্ধ কাকে বলে।আমি বোধহয় থাকলে লড়ার মেজাজে,দিতাম - মেরে দু-একটা সস্তা কায়দা -মোচড় এই ভাড়াটে গুন্ডাদের ল্যাজে;তাও চুনোপুঁটি পাকড়ে কার কি ফায়দা?এক নিরীহ স্বভাবই আমায় সাজে।এদের মোক্ষম ভোগান্তি রইলে, হায়! তাআমার ছোট্ট জ্ঞানদাত্রীর মুচকি চাওয়া,যে হয় এক লাজুক প্রণাম ঠুকেই হাওয়া।মহা সমস্যায় ফেলছিল জুয়ানকেসেই একদল জ্যান্ত কবি আর নীল মেয়ে;এমন নিষ্ফল আলোচনা তার প্রাণকেকালে করায় দুর্বল - আর সেই একঘেয়েবৈঠক ত্যাগ করতে বাধ্য, তার সম্মানকেঅক্ষত রেখেই সে সন্ধানে পেয়েযায় নক্ষত্রের ন্যায় কোনো উৎফুল্ল বিষয়;হায়, সূর্যশিশু! সত্যের রশ্মি - বাষ্প নয়!তার প্রত্যেক সকাল জুড়ে রয় কাজকর্ম -মানে, সব কাজকর্মের মতোই এক শূন্যযা আঁকতে অবস্থা হয় গলদঘর্ম;আর বিশ্রামকেই ভাববে মহাপুণ্যমারণ-দায়িত্বে বিষাক্ত তার চর্ম।খাটে একবার পড়লে, সব কাজেই ক্ষুণ্ণহই আমরা (নিজের দেশের কল্যাণ বাদে;যার সময় এলেও দেশ রইবেই বিষাদে)।তার বিকেল জুড়ে রয় নিদ্রা আর মুষ্টি,ভোজন আর নিমন্ত্রণ; সন্ধ্যায়, "উদ্যান"নামক সবজির ঝুড়িতে পায় সন্তুষ্টিঘোড়ার পিঠে তার ভবঘুরে প্রাণ,যার ফুল বা ফলে নেই মৌমাছির পুষ্টি;তাও এটাই তো সেই একমাত্র "বাগান"(মূরের ভাষায়) যেথা শৌখিন সমাজ -নারীগণ - পায় মুক্ত বায়ুর আন্দাজ।তারপর পোশাক! - নৈশভোজ! - বিশ্বের জাগরণ!-বাতির ঝকঝক! - চাকার খটখট! - সড়ক-বাজারজুড়ে ধূমকেতুর ন্যায় এক্কাদের আলোড়ন! - জলসাঘরে সাজসজ্জার জমকালো সম্ভার! -নৃত্যের আর শিল্পের এক জীবন্ত বিস্ফোরণ! -বিস্ফোরণ! - সকল দরজায় পিতলের কড়ার! -যা খুললেই কয়েক হাজার শৌখিন বাবুহয় নকল সোনার নকল স্বর্গে কাবু।ওই তো সম্ভ্রান্ত কর্ত্রী! - সে দাঁড়িয়েথাকবে তিন হাজার নমস্কারের পরে;ওই ওয়াল্ৎজ্! একমাত্র নাচ যা ভাবিয়েতুলে মেয়েদের (সমাজের নজরে),তার দোষের সাথে দেয় প্রেমেও ফাঁসিয়ে।কামরা-বৈঠক যায় কানায় কানায় ভরে -"দাঁড়াও, পথিক লর্ড, তিষ্ঠ দীর্ঘকাল!"লেডির সাথে সিঁড়িতে সামলাও টাল!দরজার বাইরে দেখে এই হট্টগোল,ভিড়ের বাইরে তারই অশেষ বিলাস রয়যে ঘরকুনো ব্যাঙ পায় তার "কুয়োর জল",কোনও গোপন কোটরে নিয়ে আশ্রয়;অন্য দর্শকদের ওঠে কান্নার রোল,ওঠে তিরস্কার, বিদ্রুপ, কেউ উদাস রয়,ওঠে অহংবোধ, প্রশংসা, কেউ হাসে -রাত বাড়লে প্রচুর হাইও কারুর আসে।তাও এই উপায় সর্বদা সফল নয়;এক জলসায়, জুয়ানের ন্যায় স্বতঃস্ফূর্তযোদ্ধাকে দিক বুঝে পা ফেলতে হয় -রণস্থল যে চাঞ্চল্যেই পরিপূর্ত!রত্নে, রেশমে, মুক্তায় দীপ্তিময়এই সভায় নিজেই যেন সে বিমূর্ত;হায়! ওয়াল্ৎজের মাধুর্যে সে হয় বিলীন,বা কোয়াদ্রিলের তাণ্ডবে সংজ্ঞাহীন।সেসব তাল না গুনে, কেউ চাইলে নাচতেএক রাজকন্যার (বা পড়শির বউয়ের) কাছে,আগে তার নিজের পকেটকে হয় বাঁচতে:তাড়াহুড়োয় ধরা না পড়ে পাছে!নিজের জন্যে এক প্রিয়তমা যাচতেঅধৈর্য ভদ্রলোকের বিপদ আছে;তাই বোকা সাজতে সবাই করলে চালাকি,সে জানবে যে বেশি লাফানোর জ্বালা কি।মেয়ে পটলে, তার পাশেই বসো খেতে;না পটলে - লুকোও! দাও তাকে নজর!আহ্লাদের স্বর্ণাভ চাবুক এই প্রেতেস্মৃতির ওপর সর্বদাই করবে ভর,যৌবনের বিলাসের মৃত্যুসংকেতে;ক্লান্তির আহত শরীরের গহ্বর!এক নরম মানস বোঝে খুবই অল্পএসব ওয়াল্ৎজ্-বিদারক আবেগের গল্প।তাই নেবে আমার এই উপদেশবাণীমাত্র কয়েক নগণ্য মানুষ। তারাদেয় নজর, নেয় পিছু, আর হয় সাবধানী -ফন্দি ফসকালেই ফাঁসবে তাদের ফাঁড়া;আজকাল মেয়েরা তাদেরই চায় জানি(আগে বেশি চাইত - আর ছাড়ত), যারাদামি, নতুন, বা সুন্দর; বিরাট যোদ্ধা,চটুল, বিরাট বুদ্ধু - বা একটু বোদ্ধা।থাকলেও যৌবন, খ্যাতি, উচ্চাঙ্গ ধন,আমার নায়ক - এক সুশ্রী আগন্তুক -প্রত্যেক দাসের ন্যায় দেবেই মুক্তিপণসেই সংকট-ত্যাগে যদি হয় উৎসুক,যা এক বিশিষ্ট ব্যক্তির আচ্ছাদন।কষ্টের জীবনে (ভাবে সব নিন্দুক)রয় সাহিত্য, ব্যাধি, বা "পকেট গড়ের মাঠ";এক উচ্চাঙ্গ যুবার জীবন সে করুক পাঠ!যৌবনই সে যুবকের পক্ষে নব্য,সুশ্রী - তাও জীর্ণ - বিত্তবান ভিখারী,এক ইহুদিই যার উৎস ও গন্তব্য -গিলছে যার পৌরুষ কয়েক হাজার নারী;রাত্রের দুই সভায় পায় এদের মন্তব্যএকদল ভুঁইফোড় বা একদল অত্যাচারী;এরা নেয় খাদ্য, মদ্য, বেশ্যা, জুয়া,আর তারপর ভরে বংশের মরণ-কুয়া।"হে আশির বুড়ো," চেঁচায় ইয়ং, "তুই নিঃস্ব!কই তোর শৈশবের বিশ্ব? কই তার স্ফূর্তি?"হায় আটের ছেলে! কই তোর বাল্যের বিশ্ব?খুঁজে দেখি - চূর্ণ সে স্ফটিকমূর্তি!ছিল কম্পিত, রুক্ষ, প্রায় অদৃশ্য;নিমেষেই হয় তার নীরব আয়ুপূর্তি।সম্রাট, শাসক, সচিব, ভাষক, সংগ্রামী,শৌখিন ভণ্ডলোক - সবাই অন্তগামী।আজ মহাবীর বোনাপার্ট কই, হে ভগবান?মহাকীট ক্যাসলরে কই? শয়তান জানে।কই বা সমস্ত গ্র্যাটান, কার‍্যান, শেরিডান,সভা-দপ্তর তটস্থ যাদের ঘ্রাণে?এখন কই বেচারি রাণীমার ক্ষুণ্ন প্রাণ?কই শার্লট - ব্রিটেন পাগল যার সম্মানে?শহীদ পাঁচ শতাংশের ঠিকানা ছাড়া,বলি কোন চুলোয় গেছে আমার ভাড়া?কই ব্রামেল, ওয়েলস্লি? দু-নম্বরীর দোরে।হুইটব্রেড? রমিলি? জর্জ (তিন-নম্বর দস্যি)?!তার চরমপত্র আজ চরম ফাঁপরে;কই, গত জর্জের চাট্টিখানি পুষ্যি?নেচেই বেহাল স্কটিশ বেহালার ছড়ে সেই দেশে; কি হে, চতুর সব মনুষ্যি,ছয় মাস চলছে মাথায় এই ফন্দি ভাঁজা,তেল মেরে চুলকে দেবে রাজার হাজা?কই আমার সব মাননীয়া শ্রীমতী,কই আমার লেডি অমুক? কই লর্ড তমুক?কারুর যাত্রার ছেঁড়া পোশাকের গতি;বিয়ে, বিচ্ছেদ, আরেকবার বিয়ে প্রমুখআপদই আজ প্রায় সবার পরিণতি।কই ডাবলিনের চিৎকার? লন্ডন কেন মূক?কই গ্রেনভিলের দল আজ? দল পাল্টে ক্লান্ত।কই হুইগ ভাইসব মোর? পক্ষাঘাতেই ক্ষান্ত।কই সব লেডি ফ্রান্সেস আর ক্যারোলাইনেরদাম্পত্য? ভঙ্গুর, ছিন্ন! - হে পত্রিকা,প্রভাতেই যাতে সব বিবাহ-আইনেরও বিধ্বস্ত শয্যার থাকে তালিকা!কও, মায়াময় শখের বাহক, কোন মাইনেরঘটকের হল্লায় ভরছে এই পঞ্জিকা?স্বদেশে থাকলে তীব্র কেচ্ছার সম্পদ,আজ মৃত্যু বা গা-ঢাকা দেওয়াই কম বদ।ভীতু ডিউককে চোখ মারত যে একদা,তার প্রেমপাত্র আজ তাঁর "কনিষ্ঠ ভ্রাতা";ঠগবাজদের টোপই গিলছে কেউ সর্বদা:কন্যা হচ্ছে কনে, বা শুধুই মাতা।বুড়িরা আর রূপসী রয়নি সদা;বড়ই লম্বা এমন ঝামেলার খাতা -তাও নতুন কিছুই নয়। যা নতুন অতি,তা চেনা বদলের অচেনা গতি।সত্তর বছরের গল্প রাখো! সাতে,রাজ-রাজড়া থেকে চামারের কপালেআমি এত বদল গুনেছি হাতে,যে আসবে না এক শতাব্দীর নাগালে;নিয়তির খেলায় হোক, বা সমপাতে।বদলের মানেটাও বারবার বদলালে,মানুষের সবই নশ্বর ও পুরানো;নয় কেবল হুইগদের গদি না জেতানো।আমি নেপোলিয়নকে দেখেছি হতেদেবরাজ থেকে যমদূতের এক অতিথি।দেখেছি এক ডিউক (নাম নেই যার জগতে)মহাগর্দভ সেজে করছে রাজনীতি,নিজের মুখোশ বিকিয়ে। চাই নৌকোতেনতুন পাল তুলে লিখতে নতুন স্মৃতি -তাও দেখে জর্জের ধিক্কার ও জয়গান,ভাবতে ভয় করে কোনটা রাজসম্মান।দেখেছি লাখপতিদের চাইতে ভিক্ষা,দেখেছি মাদাম সাউথকোটের মাতলামি;দেখেছি রাজসভায় মজুরদের দীক্ষা,লোকসভায় কর-ভক্ষণ দেখেছি আমি;দেখেছি রাণীর ইজ্জতের পরীক্ষা,দেখেছি ঘুঁটের মালায় রাজপ্রণামী;দেখেছি ক্লান্ত গর্দভরূপ ক' জাতিউচ্চ সমাজের বোঝায় মারছে লাথি।দেখেছি ছোট্ট কবি, গোদা বক্তা -অরোধ্য - আরাধ্য নয় - অনেক শাসক;দেখেছি যে, রাজকোষের উপভোক্তাজমিদারই তার বংশজমির নাশক;ঘোড়সওয়ার কুকুরদের বন্দুকে তক্তাহওয়া জনতার দেখেছি মহাশোক।দেখেছি মদের দরে জীবন গেলা,জন বুল অর্ধেক বুঝলেও বোকামির ঠ্যালা।তাও "দিনটা তোমার", জুয়ান, "তোমার, তোমার!"জীবনের ভঙ্গমঞ্চে রোজ-রোজ আসেএমনই এক রঙিন নাট্যনিগম, আরদিন শেষে কাঙালরা যায় রাহুর গ্রাসে।যা করছ তাতে নজর রেখো কম, আরযা বলছ তা রেখো নিজের তল্লাশে;হও সাবধান, হও জোচ্চোর, হও সবসময়যা দেখছ তা; যা দেখাচ্ছ তা নয়।অন্য সর্গেও আর শোনাই কোন আক্কেলেকি দেখল আমার নায়ক, সেই প্রদেশেযার সভ্যতা নিয়ে সব বুড়ো-ছেলেউন্মাদ গর্বেই মরছে? তা ঝেড়ে কেশেফেলতাম আমাকে হুতোম প্যাঁচায় পেলে,তাও একটাই কথা বলে রাখছি শেষে:তোমরা নৈতিক মানুষ নও, তোমরা জানো -কেউ কবির স্পষ্ট বিচার না-ই মানো।তাও জুয়ান যা দেখল আর বুঝল - ঠিককরলাম, থাকবে আমার বিষয় ও তর্কে।এই কল্পনা হোক ভদ্রতার প্রতীক,কারণ পদ্যটা নয় আমার সম্পর্কে;বাক্যের ও ইঙ্গিতের সব খুচরো দিকপেঁচিয়ে প্রত্যেক কলমচি তার স্বরকে কুপথে ঠেললেও - জানবে সর্বোপরি,আমার যা বলার বলি সরাসরি।কোনো কি বিজ্ঞ স্বামী-শিকারিনীএক কন্যার সাথে দেয় জুয়ানের বিয়ে?না আর কোনও মূল্যবতী রঙ্গিণী(মানে, ভাগ্যের বৈবাহিক দৌলত নিয়ে)রাখে সন্তান-সন্তোষে তাকে ঋণী,দাম্পত্যের বৈধ বদ বাধ্যতা দিয়ে?নারীগানে সে হওয়ায় একটু বন্য,তার পয়সা বা আব্রু কি হয় বিপন্ন?সব জবাব সময়ের গোপন সিন্দুকে।হে আক্রামক কাহিনী, নাও বিশ্রাম;মিশ্রিত হও দীর্ঘ বিবাদের বুকে,দিনকে রাত বানানোই যার কণ্ঠের কাম(বা স্থূল ভাবা সূক্ষ্ম সাহিত্যকে)।তোমায় কেউ না ঠুকলে ছান্দিক প্রণাম,তাই হোক! - থেকো একা এই স্বাধীন স্বরে,যা পাবে না কেউ সিংহাসনের দরে।
  • ভাট...
    commentMP | আমার এখন মনে হয় কৃষ্ণ ও কৃষ্ণা এই দুই প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ruthless স্ট্র্যাটেজিক লংটার্ম প্ল্যানিং এর কারণেই এই ভারত যুদ্ধ l কৃষ্ণের ছিলো রাজনৈতিক ভাবে পাণ্ডবদের হাতের পুতুল করে আর্যাবর্তের একছত্র অধিপতি হওয়া ও কৃষ্ণার উদ্যেশ্য কৌরবদের নির্বংশ করে প্রতিশোধ গ্রহণ l দুজনেই প্রবলভাবে ক্রোধ ও বিদ্ধেষের বশ কিন্তু নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা প্রবল থাকায় এরা নিজেদের উদ্যেশ্যে সফল l তবে এই সাফল্য কি pyrhic victory ? মহাভারতের কবি দেখাচ্ছেন যে কৃষ্ণ ও কৃষ্ণা দুজনেরই বংশ নির্মূল হলো শেষে l এটাই হয়তো প্রকৃতি ও মহাকালের বিধান l
    commentMP | মানালী, দ্রৌপদী চরিত্রটিকে কি আদৌ ট্র্যাজিক ভাবে ভাবা যেতে পারে ? প্রথমতঃ নিজের গগনচুম্বী আত্মঅহংবোধে কর্ণকে সুতপুত্র বলে প্রত্যাখ্যান করা ও দুর্যোধনকে অন্ধ রাজার অন্ধ সন্তান বলে অপমান করা l এর ফলেই দুর্যোধনের মনে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে ধিকিধিকি যার ফল পাশাখেলা l দ্বিতীয়তঃ, ভীমসেনকে প্ররোচনা দেওয়া কৌরবদের নির্বংশ করবার জন্যে যেখানে দোষী বলা যেতে পারে শুধুমাত্র দুর্যোধন দুঃশাসন কিন্তু বিকর্ন প্রভৃতি অনেক কৌরবেরা কোন দোষ করেননি l আর ফলাফল কি হলো ? কৌরবদের নির্বংশ হবার সঙ্গে সঙ্গে প্রবল প্রতিশোধস্পৃহার বশে অশ্বত্থামার হাতে দ্রৌপদীর সকল পুত্রের মৃত্যু হলো এই হলো দ্রৌপদীর কুরুক্ষেত্রের হোতা হবার পুরস্কার l কৃষ্ণের সঙ্গে তার illicit affair হয়েও থাকতে পারে হয়তো সেজন্যেই কৃষ্ণের দ্রৌপদীর প্রতি এতো অনুরুক্তি l এসব কারণের জন্যেই দ্রৌপদীকে হয়তো ট্রাজিক নয় মহাভারতের খলনায়িকা ভাবা খুব ভুল হবে কি ?
    commentManali Moulik | "কামকেলি লয়ে, করিল ভাতৃবধূ দ্বয়ে": বিভিষণের প্রতি ইন্দ্রজিৎ।
     
    এটা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব‍্যাসকে নিয়ে বলা। অম্বিকা ও অম্বালিকা প্রসঙ্গে। ওনার ভ্রাতৃবধূদ্বয়। একটা অপূর্ব শ্রুতিনাটকও আছে এই নিয়ে 'অনাম্নী অঙ্গনা'। আর এটা 'নীলধ্বজের প্রতি জনা।'
     
    তরমুজ, আপনার সত‍্যি পুডিং বানানো উচিত।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত