এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    নজরুল ও তাঁর শ্যামা মা - অনুরাধা কুন্ডা | অলংকরণ: রমিত লীলা মজুমদারের অহি দিদির গল্পে আছে যখনই রান্না করতে বসতেন ন দশটা কচি কচি ছেলে মেয়ে তাকে এসে ঘিরে ধরে বসত। অহি দিদি নানা রকম খাবার করে তাদের খাওয়াতেন কিন্তু তারা কেউ কথা বলত না। গল্পের শেষে গিয়ে জানা গেল যে এই বাচ্চারা এখনকার বাচ্চা নয়। তারা ১০০ বছর আগের বাচ্চা যাদের এক দুষ্টু লোক জিভ কেটে দিয়েছিল খাওয়ার সময় তারা ভারী গন্ডগোল করতে বলে। লীলা মজুমদারের গল্প অথচ এই ভারী নিষ্ঠুর কাহিনীটি গল্পের মূল জায়গাতে রয়েছে। কেন জিভ কেটে দিয়েছিল তারা দুষ্টু বাচ্চা বলে না অন্য জাতের বাচ্চা বলে? লিলু পিসি সেসব কথা বলে যাননি কিন্তু আমরা এখন যে সময় বাস করি সেই সময় বসে এটা মনে হতেই পারে যে বাচ্চাগুলো বোধহয় অন্য জাতের ছিল। তাই তাদের কল কল করা জিভ, কেটে দিয়ে তাদের কচি মুখের সব কথা বন্ধ করে দিতে দুষ্টু লোকদের কোন অসুবিধা হয়নি। যে সময় আমরা বাস করি সেই সময় দলিত হবার অপরাধে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা, উঁচু জাত আর নিচু জাতের কলহ জনিত সংঘাতে জেরবার সমাজ বড় দূষিত হয়ে আছে। আর তাই এই সময় দাঁড়িয়ে, "জাতের নামে বজ্জাতি সব" বলে ওঠা, সমস্বরে বলে ওঠা, চিৎকার করে বলে ওঠা দরকার। সেই চিৎকার, সেই দ্রোহ সেই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম যিনি লেটোর দলে নাম লিখিয়ে নাটক লিখেছিলেন, লিখতে শিখেছিলেন গান, যার ধর্ম ছিল প্রকৃত অর্থেই মানবিকতা। ইদানিংকালে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভিডিও গুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে ঘরে ঘরে ঢুকে কিছু মানুষ প্রশ্ন করছেন আপনার বাড়িতে তুলসী গাছ আছে? তাতে জল দেওয়া হয়নি নিয়মিত? আপনার বাড়িতে ঠাকুর ঘর আছে? আপনি পুজো করেন? তারা মানুষের ঘরের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছেন ঠাকুরঘর দেখবার জন্য এবং রীতিমতো শাসন করছেন যে দেবতার পূজা ভালোভাবে বাড়িতে হচ্ছে না। ২০২৬ সালে বসে আমাদের দেখতে হচ্ছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা বলছেন যে সনাতনপন্থী হয়ে তারা কোনরকম অনাচার সহ্য করবেন না এবং হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের বিবাহ তারা লাভ জিহাদ বলে ঘোষণা করছেন। যে দেশে কাজী নজরুল ইসলাম শ্যামা সংগীত লিখেছেন, লিখেছেন কৃষ্ণ ভজন আর লিখেছেন "বলো বীর বলো উন্নত মম শির", সেই দেশের বীর পুঙ্গবরা গৃহস্থ বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাত রক্ষার জন্য শাসানি-ধমকানি দিচ্ছেন। মৌলবাদ যখন সভ্যতাকে গিলে খাওয়ার জন্য অজগরের মতন হাঁ করে রয়েছে, তখন এ কথা মনে করা আবশ্যক কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় ১০০ টি শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন। সেই সমস্ত শ্যামা সংগীত নিয়ে "রাঙা জবা" নামে একটি আলাদা গানের গ্রন্থ রয়েছে। অধুনা উগ্র মৌলবাদের পাল্লায় পড়লে তাঁকে হয়তো প্রবল হেনস্থা হতে হত জাতে মুসলমান হয়ে শ্যামা সংগীত লিখে ফেলার জন্য। নজরুলের শ্যামা সঙ্গীতে আশ্চর্য ভক্তিভাব। কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন, কথায় আর সুরে বাঙালির মন প্রাণ শীতল করেছে। কোন বাঙালি না "শ্যামা নামের লাগল আগুন "শুনে আপ্লুত হয়েছেন! অসাম্প্রদায়িকতার অপর নাম কাজী নজরুল ইসলাম। পুত্র বুলবুলের মৃত্যুতে তিনি শোকাহত। কি করে শান্ত করবেন নিজেকে দিশা পাচ্ছেন না। আবেগ উথলে ওঠে, নজরুল দিশাহারা হন বারবার আর সেই শোক পারাবার পার হওয়ার জন্য আকুল হয়ে ওঠেন। সান্নিধ্যে এলেন বরদাচরণ মজুমদারের। যোগী বরদাচরণ মজুমদার নজরুলকে শাক্ত সাধনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পুত্র শোকে ক্লান্ত নজরুলের মন কোথাও যেন একটি অবলম্বন খুঁজে পেল। ভয়ংকরী নয়, ধ্বংসকারিনী নয়, কাল রুপিনী নয়। কালিকা মূর্তির মধ্যে নজরুল খুঁজে পেলেন মাতৃমূর্তি। ঠিক যেমন রামপ্রসাদের গান। যেমন কমলাকান্তের শ্যামা সংগীত। দেবী সেখানে দেবী নন। তিনি জননী রুপা। মানুষ যখন মনের মধ্যে হাহাকার করে, তখন অবলম্বন হিসেবে সে বোধহয় মাকে খুঁজে বেড়ায়। বাঙালি হৃদয়ে মাতৃমুর্তির স্থান বড় অপরূপ। সে কখনো মা, কখনো মেয়ে। মা ডাকের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কন্যা। কন্যাকে মা বলে ডেকে শান্ত হয় মন। বাঙালির এই চিরকালীন আকুতি কে যে নজরুল রাগ প্রধানের সুরে বেঁধে ফেললেন, তাকে হিন্দু বা মুসলমান বলে আখ্যা দিয়ে, তার মেধা মনন আর হৃদয়ের বিশালত্বের পরিমাপ করবে কে?বুলবুল অকালে মৃত। কবি লিখেছেন "শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয়।" কিন্তু তার শূন্যতা তাতে পূর্ণ হয়নি। পুত্র শোকে আকুল পিতৃ হৃদয় শান্ত হয়েছে শাক্তসাধনার খোঁজ পেয়ে। একইসঙ্গে ইসলামী গান লেখা এবং শাক্ত সাধনার গান লেখা, এ বড় কঠিন কাজ। দুর্লভ প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম এই অসম্ভব কঠিন কাজ সম্ভব করেছিলেন দরদিয়া মননে। ইসলামী গান যখন লিখেছেন তখন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে" গানে যে আকুতি, সেই একই আকুতি ফুটে উঠেছে যখন এসে শ্যামা সঙ্গীতে লিখেছেন "স্থির হয়ে তুই বোস দেখি মা"। হিন্দু না "ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন, কান্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা'র"। এই অসম্ভব সাহসী উক্তি যাঁর কাব্য ভাষা, তিনি যে একাধারে ইসলামিক গান এবং হিন্দু ভক্তি গীতি রচনা করে সুর পিপাসু বাঙালির মন মাতিয়ে দেবেন তাতে সন্দেহ কিসের! কিন্তু শুধু মন মাতলে তো হবে না।মন শান্ত হবে কীসে। একদিকে স্ত্রী প্রমীলার অসুস্থতা, অন্যদিকে পুত্রশোক। কবি স্থিতধী হতে চাইছেন।তাই কী দেবী কালিকাকে মাতৃরূপে দেখেছেন? আর ঐ ব্যক্তিগত শোক উপশমের জায়গা থেকে উপনীত হয়েছেন মহাকালের কোলে মহাকালীর বন্দনায়? শোকে,প্রবল সন্তাপে মানুষ মাতৃক্রোড় খোঁজে।একমাত্র মা পারেন শোকের ক্ষতে স্নেহের মলমটি লাগাতে। নজরুল তাই কালীর শক্তিময়ী রূপ আর স্নেহময়ী মাতৃরূপকে আরাধনা করেছেন অনির্বচনীয় আকুতিতে...শ্যামা নামের লাগল আগুন আমার দেহ ধূপকাঠিতে,যতো জ্বালাই সুবাস ততো,ছড়িয়ে পড়ে চারিভিতে..। ব্যক্তিজীবনের শোকে যে দেহ, মন পুড়ছে,তাকে তিনি সমর্পণ করেছেন মায়ের পায়ে। আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হচ্ছে দেহ মন...ভক্তি আমার ধূমের মতো,উর্দ্ধে উঠে অবিরত..এই আকুতি তো একেবারে ঘরোয়া গৃহস্থ আজন্ম স্নেহের কাঙাল বাঙালি হৃদয়ের আর্তি। রবি ঠাকুর বলেছেন..আমার এ ধূপ না জ্বালালে,গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে।তাঁর নিঠুরকে সাধারণ মানুষ ততোটা বোঝে না,যতোটা বোঝে নজরুলের কালিকাকে। অ্যাবস্ট্র্যাক্ট নয়। কনক্রিট। মানুষ মূর্তি বোঝে। রবীন্দ্রনাথের নিঠুর তাই অনেকটা দূরের। মা বড় কাছের। তাঁর আরাধনায় অন্তরলোক স্নিগ্ধ, শান্ত হয়, আর পুত্রশোকাহত পিতা অপেক্ষা করেন, কবে তাঁর দেহ ভস্ম হবে..সেই ভস্মে আঁকা হবে মায়ের কপালের তিলক। নিজেকে নিবেদন করার এই আকুলতা, এমন ভক্তি, নিজেকে নিঃশেষ করা নিবেদন, এমন শ্যামা সংগীত কজন লিখতে পেরেছেন? ২০২৬ সালে এসেও আমরা হিন্দু মুসলমানের উর্ধ্বে উঠতে পারলাম না। এখনো আমাদের আলোচ্য বিষয় ওরা হিন্দু না, ওরা মুসলমান? তবে নজরুল কেমন করে লিখলেন এমন গান? কোন অপার সাধনায়, গভীর মেধায় এবং অনন্য ভক্তিতে লিখলেন "মহাকালের কোলে বসে গৌরী হল মহাকালী।"বিশেষ করে এই গানটিতে কালীর যে রূপ নজরুল বর্ণনা করেছেন সেটি আমাদের বিস্মিত করে। দেবী কালিকাকে মূর্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে এই সৌরজগতের এক প্রকাণ্ড অংশ হিসেবে ভাবা, কল্পনার কি বিস্ময়কর প্রকাশ। "তবু মায়ের রূপ কি হারায়, সে যে ছড়িয়ে আছে চন্দ্র তারায় মায়ের রূপের আরতি হয় নিত্য সূর্য প্রদীপ জ্বালি"।এই শ্যামা সংগীতটিতে কিন্তু নজরুল কংক্রিট থেকে একেবারে অ্যাবস্ট্রাক্ট এর দিকে চলে গেছেন এবং সেটিও চূড়ান্ত অ্যাবস্ট্র্যাক্ট। অপরিসীম ক্ষমতা বলে একজন কবি এই কল্পনা করতে পারেন। মহাকালীর যে কৃষ্ণবর্ণ রূপ সেটি তিনি প্রত্যক্ষ করছেন রাত্রির গভীর কালো আকাশের মধ্যে। চন্দ্র তারার গহনা পরা মাতৃ মূর্তি। মহাকাল এবং মহাকালী, উভয়কে এই সৌরজগতের অংশ হিসেবে কল্পনা করে, কালের এবং কালীর সম্পর্কের এক অপূর্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন কবি নজরুল ইসলাম। আবে সেই একই সঙ্গে বজায় রেখেছেন কালির ঘরোয়া অন্য একটি রূপ। "উমা হলো ভৈরবী হয় ভৈরবেরে বরণ করে" হেরি শিবের সিরে জাহন্নবীরে শ্মশানে মশানে ঘোরে।" দুর্গা হোমা এবং কালি যে একই মহাশক্তির বিভিন্ন রূপ তা এই ছোট্ট গানটির মধ্যে দিয়ে অপূর্ব ভাবে প্রকাশিত। অন্ন দিয়ে ত্রি জগতে অন্অনদা মোর বেড়ায় কেঁদে ভিক্ষু শিবের অনুরাগে ভিক্ষা মাগে রাজ দুলারি। একটি গানের মধ্যে মহাশক্তির এমন বিবিধ প্রকাশ আর কোন ভক্তিগীতিতে আছে? মুহূর্তে কালিকা হয়ে গেলেন ঘরের মেয়ে উমা, শিবের প্রেমে মাতোয়ারা উমা তিন ভুবনে অন্ন জুগিয়ে বেড়ান আর তার নিজের সংসারে কিনা অন্নেরর অভাব! অভাবে বাংলার দরিদ্র মানুষ নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ মধ্যবিত্ত মানুষ এই অন্নাভাব বড় ভালো বোঝে। তাই যে দেবী কালিকাকে তারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে প্রত্যক্ষ করতে পারেনা, তাকে দেখে ফেলে ওই ছোট্ট উমার মধ্যে। শিবের ঘরনী হয়ে তার যে গৃহিনীপণা, নজরুলের গানে তার বিশ্বস্ত প্রকাশ। তাই মায়ের কাছে নালিশ জানাচ্ছেন সন্তান। "আমার যারা দেয় মা ব্যথা আমায় জারা আঘাত করে তোরই ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী"। কোথায় যেন কানে বাজে "সকলি তোমারি ইচ্ছা"। কিন্তু নজরুল নিজস্বভাবে স্পষ্ট। "আমার যারা ভালোবাসে বন্ধু বলে বক্ষে ধরে তোরই ইচ্ছা ইচ্ছাময়ী আমায় অপমান করে যে মাগো তোরই ইচ্ছা সে যে।" জীবনের বিভিন্ন ওঠা পড়া কি নজরুলকে এইভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল?" আমায় যারা যায় মা ত্যেজে যারা আমার আসে ঘরে তোর ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী।" ভক্তি ভাবে পরিপূর্ণ, স্ফটিকের মত টলটলে স্বচ্ছ নিবেদন। ব্যথিত শোকাতুর সন্তান যেন নালিশ করছে মা-কে। একমাত্র মা-ই পারেন তার আহত, অপমানিত হৃদয়টিকে শান্ত করতে। একমাত্র বাঙালি ঘরেই দেবীকে মা এবং মেয়ে, এই দুইভাবে আরাধনা করা হয়। নজরুল তাই লিখতে পারেন "আমার ক্ষতি করতে পারে অন্য লোকের সাধ্য কিনা, দুঃখ যা পাই তোরই সে দান মাগো সবই তোর মহিমা।" এ গান যেন স্বগতোক্তি। সমস্ত দুঃখের স্থলনে এই গানের মধ্যে দিয়ে। সুরে, ভাবে, মননে, কোথাও এতোটুকু ঘাটতি নেই "তাই পায়ে কেহ দলে যবে, হেসে সয়ে যাই নীরবে।" সমর্পণের এই দর্শন সাধনার মূল কথা। তাই এই অপূর্ব ভাব সাধনার আরেক প্রকাশ আমরা দেখি "বলরে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণ তল" গানে।কবি বলছেন, "মায়াতরুর বাঁধন টুটে মায়ের পায়ে পড়লি লুটে, মুক্তি পেলি উঠলি ফুটে আনন্দ বিহ্বল, তোর সাধনা আমায় শেখা জীবন হোক সফল।"এ যেন ইংরেজ কবি জন কিটসের negative capability আহরণ করার সাধনা।"কবে তোরই মতো রাঙবে রে মোর মলিন চিত্ত দল"সম্পূর্ণ নিজের সত্তা বিসর্জন দিয়ে, ফুলের মতো নির্বিকারত্ব প্রাপ্তি। মাতৃ সাধনার মূল মন্ত্র। এই ভক্তির কোন জাত নেই। যে ভক্তি নিয়ে তিনি দেবী কালিকাকে মহাবিশ্বের মহাকালী রূপে দেখেন সেই একই ভক্তি নিয়ে তিনি লেখেন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে, মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে যেন উষার কোলে রাঙা রবি দোলে।"এই ভক্তি ভাবে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোন হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব নেই এবং জাত পাতের কোন প্রশ্নই নেই কারণ সন্তান আর মায়ের সম্পর্কের মধ্যে জাত আসেনা। এই সেই কাজী নজরুল যিনি লিখেছেন "বল বীর বল উন্নত মম শির", লিখেছেন "আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন।" লিখেছেন "আমি টর্পেডো আমি ভীম ভাসমান মাইন।" সেই তিনি আবার পরম ভক্তি ভরে মায়ের সঙ্গে সন্তান সম্পর্ক স্থাপন করে জানিয়েছেন তাঁর সমস্ত সুখ,তাঁর বেদনা তাঁর অভিমান তার অপমান। গানের মধ্যে দেবীর সঙ্গে পূজারীর, মায়ের সঙ্গে সন্তানের যে বিভিন্ন রকম সম্পর্ক উঠে আসে তা কিন্তু বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য। কখনো মা, কখনো রাঙা জবার বায়না ধরে কাঁদা কালো মেয়ে...আবার সেই তারার মালা চুলে গাঁথা এলোকেশী কন্যা। মুহূর্তে রূপান্তর। ঘরোয়া ক্রন্দনরত মেয়েটি নিমেষে সৌরজগতের মহাশক্তির প্রকাশ হয়ে ওঠে...তার যুগল আঁখি সূর্য চাঁদ। অনুরাগের রাঙা জবা থাকুক তাঁর মনের বনে,কালো মেয়ের রাগ ভাঙাতে তিনি ফুলের খোঁজে ঘোরেন...রাঙা চরণ দেখতে পেয়ে তাঁর শান্তি। পুত্রশোক কী এইভাবে কিছুটা শান্ত হয়েছিল তাঁর?" আমার আর কোনো গুণ নেই মা তারা"। স্বীকারোক্তি অকপট। "হাত বাড়িয়ে মা তোর কোলে যাব না আর মা মা বলে...মা হয়ে তুই ঘুরে বেড়াস,আমায় ধূলায় ফেলে রেখে..তোর আর ছেলেমেয়ে অনেক আছে..আমার শুধু নাই যে কেহ।" মা বেটার সম্পর্কে অভিমান আর আদর মিশিয়ে দেন কবি। এই সম্পর্কের কোনো দেশ নেই, জাতি নেই, ধর্ম নেই, আবার বাঙালিয়ানায় মোড়া একটি মিষ্টত্ব আছে, দেবী থেকে সে মুহূর্তে হয়ে ওঠে তাঁর 'হাবা মেয়ে'।"কোনো অঙ্ক শেখাও নি তো, তোমার অঙ্ক বিনা তারা।" ভাগের অঙ্ক শেখেননি নজরুল। তাই তাঁর ভক্তি এতো শুদ্ধ। সুর এতো প্রাণবন্ত। জগতজুড়ানি শ্যামার কাছে এক মাতৃহারা,সন্তানহারা প্রাণ। মা ছেলেকে মারে ধরে, কিন্তু কাছছাড়া করে না। চিরমাতৃহারা সন্তান আশ্রয় খুঁজছে ছোট শিশুর সারল্য নিয়ে। শব্দ চয়নে কী বিস্তার। "জুড়ানো" শব্দটি একান্ত বাঙালি। তার থেকে ' জুড়ানি', একেবারে ' জগতজুড়ানি'। তাকে বিদেশী ভাষায় ব্যক্ত করা মুশকিল। নজরুলের আবেগ বড় শক্তিশালী, শবের মাঝে শিবজাগানো শ্মশানকালীতে তাঁর কাছে আনন্দের নন্দিনী। কল্পনার বিস্তারে বিস্মিত হতে হয়। মা'কে পাষাণী বলেছেন, মা যে লুকিয়ে বেড়ান লোকে লোকে। আর মা কে না পেয়ে তাঁর ব্যথা ভরা হৃদয় জবা হয়ে ফোটে। আবার সেই নেগেটিভ কেপেবিলিটি। সেই নিবেদন আর ভক্তি। লেটোর দলে গানবাঁধা নজরুল, বিপ্লবী, বিদ্রোহী, অশান্ত, আবেগমথিত নজরুলের এক অনন্যরূপ খুঁজে পাই তাঁর শ্যামাসংগীতের কথায়, ভাবে, সুরে। তিনি কতোবড় ভক্ত ছিলেন,তা প্রমাণ করার জন্যে নয়,শাক্তসাধনায় কত গভীর ছিল তাঁর জ্ঞান তাও প্রমাণ করার জন্যে নয়...জাত পাতের তফাৎ জলাঞ্জলি দিয়ে তাঁর যে অনাবিল মনখানি ছিল, সেই মনের স্পর্শ পাওয়ার জন্যে। এই তীব্র হানাহানির সঙ্কটকালে, সাম্প্রদায়িকতার বীভৎস আস্ফালনে,পেশীশক্তির আগ্রাসনের সময়ে, একবার অন্তত মনে করা, কাজি নজরুল ইসলাম গান বেঁধেছিলেন, শ্যামা মায়ের গান। তাঁর ইসলামের সঙ্গে ভক্তিগানের কোনো বিরোধ ছিল না, কোথাও রসবিচ্যুতি ঘটেনি, সুরধারায় এক ভক্তিবিপ্লব ঘটে গেছে।নজরুলের সেই প্রবল শক্তিশালী অথচ শিশুর মতো সরল মনটি আজ ভারতবর্ষে বড় দরকার। যে দেশে লাভ জিহাদের নামে মানব হত্যা হয়, দলিত জল খেতে গেলে তাকে পিটিয়ে মারা হয়, দলিত মানুষ জন্মদিনের কেক কাটলে তাকে তথাকথিত উঁচু জাতের লোক হত্যা করে আর লীলা মজুমদারের মতো লেখককে জিভ কাটা ছেলেমেয়েদের গল্প লিখতে হয়, সেই দেশে নজরুল জন্মেছিলেন, যে ভক্তিভাবে ইসলামিক সঙ্গীত লিখেছিলেন, সেই একই ভক্তিভাবে শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন…যে গান আজও মানুষকে জাতপাতের উর্ধে তুলে এক মহাজাগতিক বিশ্বাস আর শরণের সন্ধান দেয়। গান গাওয়া হয়, অনুধাবন হয় কী?
    গুরুচণ্ডা৯-র গল্পপাঠ - গুরুচণ্ডা৯ | ছবি: রমিত‘পিরোবতির নাকছাবি’ গল্পটি শক্তি দত্ত রায়ের ‘পিরোবতি ও মুড়ির টিন’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। ‘হাজবপুরের কেচ্ছা' লেখকের 'অতিনাটকীয়’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। আজকের গল্প এস এস অরুন্ধতীর লেখা 'পাপ হে '। গল্পটি লেখকের 'চাঁপা ফুলের গন্ধে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। সুনাগরিক রঞ্জন দত্তর মৃত্যুর দিন - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পটি লেখকের 'ছয়ে রিপু’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।আজকের গল্প জয়ন্তী অধিকারীর 'না হাঁচিলে যারে'। গল্পটি লেখিকার 'কুমুদির রোমহর্ষক গল্পসমূহ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।অমর মিত্রের লেখা 'কাশী মথুরা বৃন্দাবন '। গল্পটি 'আমার ভয় করছে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।প্রতিভা সরকারের লেখা 'তালাও গ্রামের রূপকথা'। গল্পটি 'হে চিরসারথী’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।দময়ন্তীর লেখা 'দুষ্কালের পদধ্বনি'। গল্পটি 'দুষ্কালের আখ্যানমালা’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।উপল মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'তিলবাড়ি'। গল্পটি 'ম্যাকলাস্কিগঞ্জ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।মহারাজ মিত্রবর্মণের রাজ্যবিজয়, ঘেঁটুফুল ও ব্রহ্মকমলের গল্প, লিখেছেন রমিত চট্টোপাধ্যায়, পাঠ করেছেন অমিতাভ চক্রবর্তী।শক্তি দত্তরায়ের লেখা '৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড' বই থেকে নেওয়া ক্ষীরের পুতুল। গল্পপাঠে কেকে।স্মৃতি ভদ্রর লেখা 'রসুই ঘরের রোয়াক (দ্বিতীয় খণ্ড)' বই থেকে গল্পপাঠে পায়েল চ্যাটার্জী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস 'সীমানা' বই থেকে নেওয়া একটি পর্ব, নাম - দেশের কাজ। ২৫শে বৈশাখ পার হয়ে ১১ই জ্যৈষ্ঠ্যর এই বিশেষ সময়কালে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য, এই পর্বে ধরা হয়েছে সেই সময়ের দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের দেখা হওয়ার গল্প।গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।অ্যাবনর্ম্যাল - লিখেছেন কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পপাঠ - সোহিনী সেনগুপ্ত।ফোটোগ্রাফ - ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক, গ্রাফিক শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।কেকে-র 'ছায়ার পাখি' বই থেকে নেওয়া গল্প - জিহ্ব; পাঠ - পায়েল। চিত্রশিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শারদা মণ্ডলের 'পাকশালার গুরুচণ্ডালি' বই থেকে, পাঠ - পায়েল। চিত্রশিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাসজ্যোতিষ্ক দত্তর লেখা ‘সে ছিল একদিন আমাদের' বই থেকে 'ইস্কুলের গল্প'। পাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।মৃণাল শতপথীর লেখা ‘দিতি ও মহারানি' বই থেকে নেওয়া গল্প - পাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।
    আরশোলার ধর্নায় একদিন - শুভদীপ মণ্ডল | অলংকরণ: রমিত‘কোথা থেকে আসছেন?’ ‘নাম কী?’ ‘কী করা হয়?’হাসিমুখে, আলাপ জমানোর ভঙ্গিতেই একের পর এক প্রশ্নগুলো আসতে থাকলো, অবশ্যই হিন্দিতে। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জানালেন, এত লোকজনের জমায়েত হচ্ছে, নিরাপত্তার দায়িত্ব তো ওনাদের উপরেই – তাই একটু বাড়তি সতর্কতা। স্থান – দিল্লির যন্তরমন্তর-সংলগ্ন ককরোচ জনতা পার্টির ধর্না ও অনশন মঞ্চ, আর উপরোক্ত প্রশ্নকর্তা খাকি উর্দিধারী দিল্লি পুলিশ। ধর্নার জন্য নির্ধারিত জায়গাটি ডাইনে-বামে দেওয়াল আর সামনে-পিছনে পুলিশের ব্যারিকেড দিয়ে ঘেরা। পিঠের ব্যাগ স্ক্যান করিয়ে মেটাল ডিটেক্টরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে তারপর ভিতরে ঢোকা গেল। শুধু পুলিশ নয়, সঙ্গে প্যারা-মিলিটারি ফোর্স আর র‍্যাফ মিলিয়ে আক্ষরিক অর্থেই ‘পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ’ পুরো চত্বর [১]। শুধু পাহারা দেওয়া নয়, দিল্লি পুলিশ-নিযুক্ত ফোটোগ্রাফাররা ক্যামেরা হাতে টহল দিচ্ছেন চারিদিকে। ছোটোখাটো সমস্ত ঘটনা, জটলা, কলেজপড়ুয়াদের আলাপচারিতা, গান-বাজনা এবং প্রতিবাদীদের সমর্থনে হাজির হওয়া প্রতিটি মানুষ দিল্লি পুলিশের ক্যামেরাবন্দি হচ্ছেন। বিশেষ করে, যে স্বেচ্ছাসেবীরা প্রতিবাদকারীদের জন্য জল, খাবার, ওষুধ এসব নিয়ে আসছেন – তাঁদের রীতিমতো মুখের সামনে ক্যামেরা ধরে জেরা করা হচ্ছে। এ-ও জানা গেল, কিছু স্বেচ্ছাসেবীর বাড়িতেও হানা দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ চলেছে তাদের টাকার সোর্স জানতে। দুঃখের ব্যাপার এই, যে, এখনো অবধি জর্জ সোরোস, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ – কোনো লিঙ্কই খুঁজে পাওয়া যায়নি। জেরায় জানা গেছে, কিছু লোকজন নিজেদের গাঁটের কড়ি খরচ করেই প্রতিবাদকারীদের টিকে থাকার রসদ জুগিয়ে যাচ্ছেন। এসব গালগল্প অবশ্য দিল্লি পুলিশ কোনোভাবেই মেনে নিচ্ছে না। তদন্ত এবং নজরদারি চালু আছে চব্বিশ ঘণ্টা। আশা করা যায়, বলিউডের দেশপ্রেমী ডাইরেক্টররা দিল্লি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। তাঁদের হাত ধরে সত্য নিশ্চয়ই একদিন উন্মোচন হবে এবং সেদিন কোনো মাল্টিপ্লেক্সের বড় পর্দায় পপকর্ন খেতে খেতে দেশের জনসাধারণ জানবে – কীভাবে এইসব দেশদ্রোহী বেকার ছেলেমেয়েদের দল দেশের ভিতর থেকে দেশকে টুকরো টুকরো করার ষড়যন্ত্র করেছিল আর কীভাবে দিল্লি পুলিশের ধুরন্ধররা নিজেদের মগজাস্ত্র প্রয়োগ করে সেই রহস্য ভেদ করেছিলেন। [৭ - ৮] সে যাই হোক, আগামীর আচ্ছে দিনের স্বপ্ন সাইডে সরিয়ে রেখে আপাতত ডিসেম্বর মাসের রেকর্ড-ব্রেকিং AQI আর জুন-জুলাইয়ের হিটওয়েভের দিল্লিতে ফেরা যাক। জনপথ মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে মোটামুটি পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। তাতেই ধর্না মঞ্চ অবধি পৌঁছানোর আগেই পুরো টি-শার্ট ঘামে জবজবে। এই আবহাওয়ায় ককরোচদের অবস্থানের সেদিন দশম দিন। পৌঁছে জানলাম – শুধু সোনম ওয়াংচুক নন, অনশনে আছেন দিল্লি, জওহরলাল নেহরু এবং এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত কিছু ছাত্রছাত্রী-সহ জনা পনেরো [৭]। প্রাথমিক দাবি – NEET পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় স্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং আরও বৃহত্তরভাবে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করা। সমবেত মানুষজনের কথায় আরও অনেক বিষয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিপ্রকাশ ঘটলেও, মূল দাবী ওইটুকুই। এঁদের মধ্যে কয়েকজন সোনম ওয়াংচুক আসার আগে থেকেই অনশনে রত এবং তাঁদের শারীরিক অবস্থার বেশ খানিকটা অবনতি ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। এর কোনো খবরই বাইরে বিশেষ বের হয়নি, তার কারণ – সামগ্রিকভাবে মেইনস্ট্রিম মিডিয়া প্রথম দিন থেকেই এই আন্দোলনকে বয়কট করেছে। অবশ্য ধর্না চত্বরে ক্যামেরার অভাব নেই। কিছু ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিডিয়া হাউস ছাড়াও অনেকেই নিজেদের ইউটিউব বা ইন্সটাগ্রাম ভিডিও বানাচ্ছেন এবং শেয়ার করছেন। বড়সড় ইনফ্লুয়েন্সাররা অবশ্য অনুপস্থিত। সে নিয়েও ক্ষোভ আছে বোঝা গেল। রাস্তার ধারে অস্থায়ী টেবিল পেতে জল আর খাবার-দাবারের জোগান দিচ্ছেন উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার, দিল্লি, হরিয়ানা থেকে আগত বিভিন্ন ধর্ম আর ভাষার মানুষজন [১০]। তার পাশেই চোখে পড়ল মেডিসিন কাউন্টার। জনৈক ডাক্তার নিজেই এসেছেন First-Aid Kit, ORS, Paracetamol-সহ বিভিন্ন ওষুধের পসার নিয়ে [৯]। এক বাম ছাত্র সংগঠনের তরফ থেকে খোলা হয়েছে অস্থায়ী লাইব্রেরি। অবস্থানরত মানুষজন বই নিচ্ছেন, পড়ছেন, আবার ফেরত দিয়ে যাচ্ছেন। এই লেখা যেদিন লিখছি, তার ৩-৪ দিন আগে হঠাৎ সেই লাইব্রেরি বন্ধ করতে উদ্যোগী হয় দিল্লি পুলিশ। এ নিয়ে ধস্তাধস্তি হয় এবং ছাত্রদের তরফ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে গালাগালি ও ধমকধামক করার অভিযোগ আসে [১১]। স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশ্নের উত্তরে দিল্লি পুলিশের তরফে জানানো হয়, লাইব্রেরি নিয়ে তাদের কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে। অবশ্য অভিযোগ ঠিক কী আর কারা সেই অভিযোগ করেছেন – সে প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া যায়নি। [৯ - ১১] সরাসরি বলপ্রয়োগ না করে, নিজেদের বিপুল সংখ্যায় উপস্থিতি, ক্যামেরার নজরদারি আর জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আন্দোলোনকে কক্ষচ্যুত করার চেষ্টা চলছে প্রশাসনের তরফে। মাঝে মাঝে লাউডস্পিকারে ঘোষণা করে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে – এই ধর্নার সময়সীমা প্রথমদিন বেলা পাঁচটাতেই শেষ হয়ে গেছে, তাই সবাই যেন স্ব-স্ব-গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। এছাড়াও গত রবিবার (৫ই জুন) একসঙ্গে আরও পাঁচটি সংগঠনকে ওই একই জায়গায় অন্যান্য ইস্যুতে প্রতিবাদ জানানোর ছাড়পত্র দেওয়া হয়, খুব সম্ভবত একটা গোলমাল পাকানোর উদ্দেশ্য নিয়ে, যাতে একটা অজুহাত খাড়া করে অবশেষে ককরোচদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করা যায়। আমার ব্যক্তিগত ধারণা – সোনম ওয়াংচুক এসে পড়ায় পরিস্থিতি একটু জটিল হয়ে গেছে, নাহলে এত ছলাকলার আশ্রয় না নিয়ে, সরাসরি বলপ্রয়োগ করে এই আন্দোলন হয়তো আরও আগেই থামিয়ে দেওয়া হত। প্রশাসন মোটের উপর নিষ্ক্রিয় থাকলেও উনিজির ভক্তকূল কিন্ত বসে নেই। প্রথমদিন থেকেই টুকটাক চেষ্টা চলছে উপস্থিত আন্দোলোনকারীদের উত্যক্ত করে গোলমাল সৃষ্টি করার – সে ‘সাংবাদিক’ বা ‘আমজনতার প্রতিনিধি’ সেজে ট্যাঁড়া-ব্যাঁকা প্রশ্ন করেই হোক, বা ‘আন্দোলোনকারী’ সেজে ক্যামেরার সামনে সাজানো ইন্টারভিউ দেওয়ার নাম করে উত্তেজক কথাবার্তা বলে। সরাসরি গুন্ডামির ঘটনাও একটা দুটো ঘটেনি এমন নয়, তবে সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনাই। অভিজিৎ দিপকে বারবার আন্দোলোনকারীদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন – শত প্ররোচনাতেও এদের ফাঁদে পা না দিতে এবং এখনও অবধি তেমন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর নেই। সমাজমাধ্যমে বিজেপির আইটি সেল আন্দোলনকে বদনাম করার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কখনও বলা হচ্ছে – সোনম ওয়াংচুক বোতল থেকে জল নয়, চিকেন স্যুপ পান করছেন [৮], আবার কখনও বলা হচ্ছে অনশনকারী ছাত্রছাত্রীরা নাকি টয়লেটে গিয়ে চেটেপুটে খাবার-দাবার খেয়ে আসছেন। কয়েকজনকে ক্যামেরা হাতে টয়লেটের আশেপাশে ঘুরঘুর করতেও দেখা গেছে। ধন্য তাদের অধ্যবসায়। স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলোনকারীদের ‘ভাইরাস’ এবং ‘আতঙ্কবাদীদের বি-টিম’ বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়াও উপাধি হিসাবে ‘দেশবিরোধী’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী’, ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ – এসব উপরি পাওনা তো আছেই। অবশ্য ভক্তকূল ছাড়া এসব বস্তাপচা হেটস্পিচ আর কেউ গিলছে বলে মনে হয় না। বরং সংহতির দৃশ্য চোখে পড়েছে অনেক বেশি। কৃষক নেতারা এসেছেন, মঞ্চের উপর উঠে সমর্থন জানিয়ে গেছেন। প্রবীণ স্বাধীনতাসংগ্রামী পণ্ডিত রামকিষণ এসেছেন। বয়স ১০১ বছর, ভারত ছাড়ো আন্দোলন থেকে শুরু করে আজীবন আপোষহীন সংগ্রাম করেছেন। জেল খেটেছেন স্বাধীনতার আগে এবং পরবর্তীকালে, এমারজেন্সির সময়। এই বয়সেও প্রতিবাদ-মঞ্চে এসে অনেকটা সময় কাটালেন। বক্তব্য রাখলেন, ধৈর্য্য ধরে আন্দোলোনকারীদের কথা শুনলেন, উৎসাহ দিলেন, উপস্থিত জনতার প্রশ্নের উত্তরও দিলেন। প্রশান্ত ভুষণ, যোগেন্দ্র যাদব, সঞ্জয় সিং, মহুয়া মৈত্র, সাগরিকা ঘোষ, বৃন্দা কারাত – প্রমুখেরাও হাজিরা দিয়েছেন/দিচ্ছেন একে একে। এসেছেন অরুন্ধতী রয় ও আরও অন্যান্য সমাজকর্মীরা। সাধারণ মানুষজন আসছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে [৩]। তাঁরা তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অন্যায় এবং তার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে কীভাবে প্রশাসনিক হেনস্থার শিকার হয়েছেন – সেইসব ঘটনা তুলে ধরছেন। তাঁদের কথায় উঠে আসছে কিছু কমন ফ্যাক্টর – বিজেপি-শাসিত রাজ্য, বিবিধ দুর্নীতি, আতঙ্কের পরিবেশ, আর পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা বা ক্ষেত্রবিশেষে অতি সক্রিয়তা। ক্ষমতাবানের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ে ক্লান্ত হলেও, হাল ছাড়েননি তাঁরা। দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন এই ধর্না মঞ্চে, আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানাতে। এগিয়ে আসছেন – NEET-কেলেঙ্কারি যেসব ছাত্রছাত্রীদের ঠেলে দিয়েছে আত্মহত্যার পথে, তাদের বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনেরা [১২]। যেটুকু সময় থাকছেন, স্বেচ্ছাসেবীরা আগলে রাখছেন এঁদের সবাইকে। কাঠফাটা রোদ, ধুলোর ঝড়, মুষলধারায় বৃষ্টি – সবকিছুই সহ্য করতে হয়েছে, হচ্ছে। অনশনরত ছাত্রছাত্রীদের অস্থায়ী ছাউনি কোনোভাবেই পর্যাপ্ত ছিল না। বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেছে তাদের সবকিছু। তেরপল নিয়ে আসতে বাধা দিচ্ছে দিল্লি পুলিশ। তার জন্যও নাকি অনুমতি আসতে হবে ‘উপর’ থেকে [২, ১৪]। প্রধান মঞ্চের উপর অভিজিৎ ও আরও কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীদের দেখা গেল – একটা বড়সড় ব্যানার মাথার উপর ধরে সোনম ওয়াংচুককে প্রবল বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে। ম্যাগসেসে পুরষ্কারজয়ী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, পরিবেশবিদ, বিজ্ঞানী... তাঁর মতো মানুষ যে কোনো দেশের সম্পদ। ভাবছিলাম, আমার দেশের সংখ্যাগুরু নাগরিকের সেই বোধটুকুও কী আছে? প্রশ্ন এখানে দায়বদ্ধতার। পদ যত উঁচু, সেই পদের দায়বদ্ধতাও তত বেশি। কারণ সেইসব পদাধিকারীর একটা ভুল অগুনতি মানুষের জীবন ছারখার করে দিতে পারে—যা এক্ষেত্রে হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর অযোগ্যতা, অক্ষমতা – যাই বলুন না কেন, তা ২০-২২টা ছেলেমেয়েকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়েছে। অগুনতি ছেলেমেয়েকে হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছে। আর এটা তো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, গত কয়েকবছরে এতগুলো প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা সামনে এসেছে – এ যেন গা-সওয়া হয়ে যাচ্ছে আমাদের। চলতি বছরেই অভিযোগ এসেছে UPSC এবং NET পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়েও। Hanlon’s razor বলে, “Never attribute to malice that which is adequately explained by stupidity”, আবার Grey’s law অনুযায়ী, “Any sufficiently advanced incompetence is indistinguishable from malice”. যা ঘটে গেছে, তা স্রেফ অযোগ্যতার নিদর্শন, বা ইচ্ছাকৃত অনিষ্টসাধনের চেষ্টা... যে সিদ্ধান্তেই আপনি উপনীত হন না কেন, ক্ষমা-ঘেন্না করে দেওয়ার সময় অতিক্রান্ত। আর এই বিপুল ক্ষতির সামনে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়াকে ‘এমন কিছু বড় ঘটনা নয়’ প্রমাণ করতে বাজারে নেমেছেন। আশা করি তাঁদের বিবেক, মনুষ্যত্ব একদিন জাগবে। বছর বছর স্কুলে ছেলেমেয়েদের ঘাড় ধরে বসিয়ে যে প্রধানমন্ত্রীর ‘পরীক্ষা পে চর্চা’-র বাণী গিলতে বাধ্য করা হয়, পরীক্ষা নিয়ে এত বড় একটা কেলেংকারির পরও তা নিয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য শোনা যায়নি। অথচ দ্বিতীয়বার NEET পরীক্ষা সফল’ভাবে পরিচালনা করার জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাতে দেরি হয়নি একটুও। সাফল্যের কৃতিত্বের ভাগ নিতে সদা তৎপর। আর ব্যর্থতা এলে দেশবাসীর জন্য বরাদ্দ হিরন্ময় নীরবতা। [৫, ৬] আশার কথা, কিছু দক্ষিণপন্থী সমর্থকও অবশেষে জেগে উঠছেন এবং অন্তত এই একটি বিষয়ে সরকারকে সমর্থন করছেন না [৪, ১৩]। যন্তর-মন্তরে লোকজনের ভিড় বাড়ছে, কমছে। এক একদিন তিল ধারণের জায়গা থাকছে না, আবার কোনওদিন মেরেকেটে ৫০-১০০ জন। তাতে অবশ্য ককরোচদের উৎসাহে ভাটা নেই। রোদ, বৃষ্টি, ধুলোর ঝড় উপেক্ষা করে ওরা রোজ স্লোগান দেয়, গান গায়, একে অন্যের মনোবল বাড়ায়, ক্লান্ত হয়ে রাস্তার ধারেই একটু ঘুমিয়ে নেয়, আবার নতুন উদ্যমে দিন শুরু করে। আমিও যাচ্ছি মাঝেসাঝে। স্লোগান দিতে বা অনশন করতে নয়, স্রেফ হাজিরা দিতে। গত বেশ কয়েকবছর ধরে দিল্লি থেকে সামান্য দূরে থাকি চাকরির সূত্রে। যাদের মাঝে ওঠাবসা, তাদের অনেকের মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে অদ্ভুত উদাসীনতা বা নারকীয় উল্লাস দেখে প্রায়শই নিরাশায় ভুগি। এই কমবয়সী ছেলেমেয়েগুলোর দৃপ্ত চেহারা, মুষ্টিবদ্ধ হাত, প্রাণখোলা হাসি আর লড়াকু স্লোগানে আমার মনের অন্ধকার যেন একটু ফিকে হয়ে আসে। দিল্লির অসহ্য গরমও আর অতটা টের পাই না। দেখি – এদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য মাঝবয়সীরাও আসছেন। অফিস-ফেরতা, পিঠে বা হাতে ব্যাগ আর চেহারায় একরাশ ক্লান্তি নিয়ে। এঁরা সেই শ্রেণীর মানুষ, যাঁদের অনেককিছু হারানোর ভয় – স্থায়ী চাকরি, তিলে তিলে গড়ে তোলা সংসার, মাসিক কিস্তিতে কেনা গাড়ি, ফ্ল্যাটবাড়ি... যাঁরা খুব অতিষ্ঠ না হলে সচরাচর নিজেদের সযত্নে লালিত গণ্ডিবদ্ধ জীবনের বাইরে পা রাখেন না। এই আন্দোলন যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, এঁদের মতো আরও অনেকে আসবেন একটু একটু করে ভয় আর জড়তা কাটিয়ে। সেদিন মানুষের ভিড় যন্তর-মন্তর ছাড়িয়ে রাজপথে নেমে আসবে। আশা করবো – সেইদিন খুব দূরে যেন না হয়। সোনম ওয়াংচুক ইতিমধ্যেই প্রায় শয্যাশায়ী, তাঁর ওজন কমেছে ৭ কিলো। রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মান বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে গেছে। অনশনরত এক ছাত্র আর এক ছাত্রীকে ইতিমধ্যেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে [৫, ৬]। সোনম, অভিজিৎ, নেহা, আশুতোষ, জুনেইদ, সৌরভ আর তাদের সঙ্গীসাথীরা যে লড়াইয়ে নেমেছেন – তা আমাদের সবার লড়াই। জয়লাভ হবে কিনা জানা নেই, কিন্তু ময়দানে থাকতে হবে – এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। চরৈবেতি। [১] Youths rally in large numbers; bang plates, spoons to demand accountability at CJP protest - The Hindu[২] 'People falling sick': CJP's Dipke claims Delhi Police denied tarpaulin at protest site despite rain - Hindustan Times[৩] Fresh political support pours in on 15th day of CJP protest; student hospitalised - The Hindu[৪] Spoke to the AISA student activists about their hunger strike being ignored by the government - @PeekTVOfficial[৭] 6 Days Without Food Or Support From Parents - @PeekTVOfficial[৮] ‘Even If I D!e…’: Wangchuk’s Reply To Critics - @PeekTVOfficial[১২] Father Who Lost His Son Due to Paper Leak - @PeekTVOfficial[১৩] 58% NDA Voters Chahte Hain Dharmendra Pradhan Istifa Dein? | C-Voter Survey Mein Bada Khulasa - @official_cockroachjantaparty[১৪] CJP founder Abhijeet Dipke confronts Delhi police for not allowing tarpaulins at protest amid rains - @thenewindianxpress
  • হরিদাস পালেরা...
    সোনম ওয়াংচুকের অনশন - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | নিট নামক যে ধ্যাষ্টামো এবং অন্যান্য যেসব অরাজকতা চলছে, তার প্রতিবাদে দিল্লির যন্তরমন্তরে অনশন চলছে। সোনম ওয়াংচুকের অনশন ১৭ দিন পার করল। খুবই অসুস্থ, যা হবার কথা। কিন্তু সবাই দেখি এই চক্করে আমীর খানকে নিয়ে পড়েছে। আমীর নাকি সোনমের চরিত্র অবলম্বনে একটা সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। তার নাম থ্রি ইডিয়টস। সত্যিই ওটা সোনমকে নিয়ে কিনা আমি জানিনা। ট্রেলার চালিয়ে দেখলাম, আমীর আর করিনা কাপুর একসঙ্গে অনেক ছাতা খুলে ধাঁইধপাধপ নাচছেন। তৃতীয় শ্রেণীর বলিউডি সিনেমায় যেমন হয়। সোনমকে দেখে মনে হয়নি, ওরকম নাচবেন।এবার কথা হল, যদি সোনমকে নিয়েই সিনেমাটা হয়ে থাকে তো কী। বলিউডি সিনেমার প্রোডিউসার পছন্দমতো বিষয়বস্তু পেয়ে একটা থার্ডক্লাস রদ্দি মাল বানিয়ে বাজারে ছেড়েছেন। তাতে বলিউডি নেত্যকালীরা নেচেছেন। ব্যবসা হয়ে গেছে। মিটে গেছে। এবার সিনেমার নায়ক, সত্যিই সোনম ওয়াংচুক হয়ে রাস্তায় নামবেন নাকি?লোকে যে এইটা প্রত্যাশা করছে, তার একটা বড় কারণ হল নিজের মনেই বলিউডি নায়কদের একটা লার্জার-দ্যান লাইফ ইমেজ বানিয়ে রেখেছে। অখাদ্য সিনেমা দেখে দেখে যা কুঅভ্যাস হয় আরকি। মনে হয় অমিতাভের ওই অসহ্য ঢিসুম-ঢাসুমই বাস্তব, শাহরুক খান সত্যিই দুই হেলিকপ্টার দুই হাতে ধরে রাখতে পারেন। এই নায়ক-পুজো সর্বত্র। আদালতের এক বিচারক হঠাৎ ভগবান হয়ে যান। কোনো ফুটবলার হয়ে যান আস্ত দেবদূত, যেন অতিপ্রাকৃতিক কোনো শক্তির অধিকারী। টিভি চ্যানেল হয় সত্যের পরাকাষ্ঠা। আর সেলুলয়েড, বীরপুজোর আখড়া।পৃথিবীতে যত তৃতীয় শ্রেণীর জিনিসের রমরমা হচ্ছে, তত এগুলো বাড়ছ। অথচ, ভালো সিনেমায় দেখুন, এরকম কোনো প্রত্যাশা থাকেনা। গান্ধি চরিত্রে অভিনয় করা বেন কিংসলেকে কেউ কখনও বলেছে, একটু সত্যাগ্রহ করে দেখান প্লিজ? সুভাষ বসুর চরিত্রে অভিনয় করতে গেলে কি আর লোকে প্রত্যাশা করে অভিনেতা সাবমেরিন চড়ে জাপান যাবেন?এইসব দাবী কখনও ওঠেনা, কারণ, সবাই জানে, বেন কিংসলে নকল। অথচ এখানে মনে হচ্ছে, উল্টো। সেটা ওই অখাদ্য সিনেমা ক্রমাগত গলাধঃকরণ আর আত্মস্থ করার ফল। কিন্তু বাস্তব হল, আমীরের জন্য সোনম সোনম হননি। সোনম সোনমই, আমীর তাঁর অক্ষম অনুকরণ। অনুকরণ করে পয়সা কামিয়েছেন। আপনরা কেন বেছে বেছে সেই অখাদ্য জিনিস দেখেছেন, সে আপনারাই বলতে পারবেন। কিন্তু বাস্তব হল, সিনেমার হিরোরা হিরো নন। টিভি চ্যানেল সত্যের পরাকাষ্ঠা নয়। কোনো হিরো ঢিসুম-ঢাসুম করে কিংবা কোনো সঞ্চালক জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে, অথবা কোনো বিচারক মারকাটারি ন্যায়বিচার দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করবেনা। বরং হিরোরা চেপে যাবেন, সঞ্চালকরা মিথ্যে বলবে, আর আদালতের এখানে কিছুই করার নেই।সোনম বলেছেন তিনি হিরো না। ঠিক কথা। তিনি শ্রদ্ধেয় এবং সম্মাননীয় ব্যক্তি। তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে লড়ছেন। সবকিছুতে মত মিলবেনা, কিন্তু লড়ছেন, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এবং এই লড়াইয়ে কোনো ঢিসুম-ঢাসুম হবেনা। খুব বেশি হলে মরে যেতে পারেন। সিনেমার হিরোরা মরেনা, ঠিক সময়ে কোনো পুলিশের গাড়ি এসে বাঁচিয়ে দেয়, অথবা টিভির কোনো সাংবাদিক হঠাৎ গর্জে ওঠেন। নিশ্চিন্ত থাকুন, ওসব এখানে হবেনা। গঙ্গার দূষণ রোধে আমরণ অনশন করে চুপচাপ মরে গেছেন একজন, এই কিছুদিন আগে। কে জানে তাঁর কথা? আমরা যদি খবর ছড়াতে পারি তো জানবে, নইলে জানবেনা।এইসব জেনেশুনেই সোনম জীবন বাজি ধরেছেন। এবং এইজন্যই তিনি হিরো। তাবৎ বলিউডকে যোগ করলেও নায়কত্বে তাঁর ধারেকাছে কেউ পৌঁছবেনা। পুঃ এই খবর, এই বার্তা চারদিকে ছড়ান। কারণ, আমরা আমাদের নায়ককে নিশ্চয়ই মরতে দিতে চাইনা। যে সুতোর উপর সোনমের জীবন ঝুলে আছে, সেটার অনেকটাই আমরা। বলিউড ছাড়ুন, গোদি মিডিয়া ছাড়ুন, নকল নায়কপুজো ছাড়ুন। বাস্তবটা মেনে নিন।
    হিমাচলের ইতি উতি - ১০ - দ | ছবির মত গ্রাম গ্রাহাণ১২ তারিখ সকালে ঘুম ভাঙতে বেশ দেরী হল। আগেরদিনের অত হাঁটাহাঁটি সিঁড়ি ওঠানামায় এমন ক্লান্ত ছিলাম যে চোখ খুলতে খুলতে বেলা প্রায় সাড়ে নটা। তৈরী হয়ে বেরোতে সাড়ে দশটা। বাইরে একেবারে নীল চকচকে কাচের মত আকাশ। প্রথমেই হাজির হই The Evergreen Cafe. স্প্যানিশ অমলেট, বাটার টোস্ট আর কফি দিয়ে ভাল করে পেটপুজো সেরে একে ওকে জিজ্ঞাসা করে অল্প কিছুটা এগোতেই পুরোন ব্রিজ আর তার পাশ থেকেই ছাড়ছে গ্রাহাণ যাবার বোলেরো ক্যাম্পার। https://youtube.com/shorts/RyKGP0NbQSM?si=sZZvjWzg-oj6jWWGব্রিজ পেরিয়ে নদীর পাশ দিয়ে চলে গেছে গ্রাহাণের পথগ্রাহাণ ৭৭০০ ফিট উচ্চতায় একটা ছবির মত গ্রাম যেখানে এটিএম নেই, মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই, টিভি নেই, ইলেকট্রিসিটি খুব লিমিটেড, মদ্যপান, মদ্যপ্রস্তুতি, মদ্য প্রক্রিয়াকরণ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তবে গোটা পার্বতী উপত্যকা যে কারণে বিখ্যাত বা কুখ্যাত সেই মালানা ক্রিম এখানে দিব্বি পাওয়া যায়, তার চাষবাসও ভালই হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ও জনসমাগমের বাইরে একটেরে এই গ্রামের খবর আমায় দিয়েছিলেন ভ্রামণিক সুদীপ চ্যাটার্জি। চালাল দেখে তেমন খুশী হই নি একথা জানানোয় সুদীপ বলেছিলেন আরেকটু ওপরে গ্রহণ চলে গেলেই ভাল লাগত। গ্রহণ বা গ্রাহাণ নিয়ে তখুনি খোঁজ খবর করে ওই ওপরের তথ্যগুলো দেখে মনে হল এখানে তো যেতেই হবে। চারদিন থাকছি কাসোলে একটা দিন আমায় গ্রাহাণে যেতেই হবে। আজ ১২ই নভেম্বর সেই দিন। দ্য এভারগ্রিন থেকে বেরিয়ে ওই রাস্তায় সোজা কিছুটা হাঁটলেই একটা বেশ পুরোন ব্রিজ। এখানে পার্বতীর আওয়াজ এত জোরালো যে রীতিমত গলা তুলে কথা বলতে হয়। ওহো বলা হয় নি, ক্যাফের লোকেশানও ভারী চমৎকার, ফরেস্ট রেস্ট হাউসের পাশেই। এদের ওপন এয়ার বসার জায়গায় দিব্বি পার্বতী দেখতে দেখতে শুনতে শুনতে খাওয়া দাওয়া করা যায়। ব্রিজের মুখেই কাদামাখা দুখানা বোলেরো ক্যাম্পার দাঁড়িয়ে, পার্বতী চলার পথে সুক্ষ্ম জলকণা ছড়িয়ে গোটা ব্রিজ, রাস্তা ভিজিয়ে নাচতে নাচতে চলেছে। ক্যাম্পারের ছাদ খোলা অংশে বসলে ভাড়া ২০০/- আর ভেতরে বসলে ৩০০/-। একটা কাদামাখা গাড়ির সারথী রাস্তার অন্যদিকের পাহাড়ের গা বেয়ে নামা একটা রোগাটে জলধারার সাথে পাইপ লাগিয়ে গাড়িটা ধুচ্ছিলেন, জানালেন ওঁরই নাম্বার যাবার। ধোয়া হলে ভেতরে উঠে একটা জানলার ধার দখল করে বসা গেল। যাত্রা শুরুমিনিট পনেরো কুড়ির মধ্যেই গাড়ি ভরে গেল। সারথী জানালেন যাদের যাদের ইউপিয়াই পেমেন্ট তারা এখানেই ভাড়া মিটিয়ে দেন যেন। ওখানে পৌঁছে ক্যাশ ছাড়া কিছুই নেওয়া সম্ভব নয়। টুং টাং করে ভাড়া মেটানোর আওয়াজ শেষ হতেই গাড়ি স্টার্ট নিল। কাসোল থেকে গ্রাহাণের দূরত্ব ১০ কিমি, উচ্চতা বৃদ্ধি ২৫০০ ফিট। ঘন দেওদার বনের মধ্যে দিয়ে অতি সঙ্কীর্ণ পাথুরে এবড়ো খেবড়ো চড়াইপথ। পুরো পথ কাটাকুটি করে বয়ে আসছে গ্রাহাণ নালা। নদীর বুকে মস্ত মস্ত বোল্ডারে ধাক্কা খেয়ে জায়গায় জায়গায় জল সহস্রধারায় নেমে এসে একফুট কি দেড়ফুট ছোট্ট প্রপাত তৈরী করছে।এই নড়বড়ে ব্রিজটা পেরিয়ে এগোলে পথ হারানো অবধারিততাই এই ব্রিজের আগে সতর্কবার্তা দেওয়া আছে। স্থানীয়রাও চারণিকদের সাবধান করে দেনরাস্তা নয় পুরোটাই অফফরোডিং। মজা হচ্ছে যখন উল্টোদিক থেকে কোন ক্যাম্পার আসছে, একে তখন অনেকটা পিছিয়ে যেখানে সামান্য সাইড করার জায়গা আছে সেখানেই দাঁড়াতে হচ্ছে। যে নামছে তার রাস্তায় অগ্রাধিকার, উঠনেওয়ালা দাঁড়িয়ে পাশ দেবে এইই নিয়ম। পাশ কাটানোর সময় জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দুই সারথী রাস্তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তথ্য বিনিময় করেন। তাতেই জানা গেল পাঁচ কিলোমিটারের মাথায় এক জায়গায় রাস্তার কাজ হচ্ছে সেখানে মিনিট পনেরো দাঁড়াতে হবে। গ্রাহাণ নালা কাটাকুটি খেলেছে গোটা পথ জুড়েসে না হয় হল কিন্তু এখানে রাস্তাই নেই তো আবার রাস্তার কাজ কিসের? শোনা গেল এই নেই-রাস্তাও মাঝে মধ্যে ভেঙে ধ্বসে যায়, মাঝে মাঝে পাথর পড়ে মিনি টিলা হয়ে থাকে। নিয়মিত সেসব সরিয়ে তাপ্পিতুপ্পি দিয়ে ফোর হুইল ড্রাইভ গাড়ি চলার উপযুক্ত করে রাখতে হয়। আমরা যত উপরে উঠছি, নালা ততই নীচে চলে যাচ্ছে, আবার হঠাৎ কোন বাঁক পেরিয়েই দেখা হয়ে যাচ্ছে পাহাড় ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা অন্য এক জলধারার সাথে। সেও ‘'এসেছ? এসো এসো এগিয়ে চলো' বলতে বলতে হইহই করে দৌড়ে নেমে যাচ্ছে নীচের নালার দিকে। সরু জলধারা নেমে আসছে জঙ্গলের মধ্য দিয়েগ্রাহাণ গ্রামের ওপরের তিনটে জলপ্রপাত আর পথের সব কটা জলধারা মিশে তৈরী গ্রাহাণ নালা গিয়ে পার্বতীর সাথে মিশেছে কাসোলের একটু আগে। সেখানে নদীর গর্জনে কানে প্রায় তালা লেগে যায়। জঙ্গলের মধ্যে কিছুটা পর পরই গাছের গায়ে গ্রাহাণের পথনির্দেশ দেওয়া। যাঁরা এপথে চারণিক তাঁদের পথ হারানোর সম্ভাবনা বেশ কম। মোটামুটি তিরিশ মিনিট হেঁটে কোন পথনির্দেশ দেখতে না পেলে জানবেন আপনি হারিয়ে গেছেন। থুঞ্জাগ্রামের রাস্তা খাড়াই উঠে গেছে, সারথী জানান এ গ্রামে নাকি মাত্র দুটো হোমস্টে আছে। পথের মাঝে এক জায়গায় দেখা গেল পাশে অনেকটা পরিস্কার খোলা জায়গা, একপাশে একটা স্টেজের মত করা। শুনলাম সেখানে রেভ পার্টি হয় নিয়মিত। ৩১শে ডিসেম্বর পার্টির জন্য এই ধরণের অফগ্রিড জায়গার চাহিদা খুব বেশী। সমগ্র পার্বতী উপত্যকায় বেশ কয়েক হাজার পার্টি হয় ইংরিজি বছরশেষের দিনটায়। তার শতকরা আশিভাগই এরকম পাহাড়ের গায়ে জঙ্গলের মধ্যে যেখানেই খানিকটা সমতলভূমি পাওয়া যায় সেখানেই হয়। তবে গ্রাহাণে বিশেষ পার্টি হয় না। অ্যালকোহলের উপর কড়া নিষেধাজ্ঞা এখানে শাপে বর হয়েছে। গ্রাহাণে পৌঁছাবার বেশ অনেকটা আগে থেকেই গাছের গায়ে নোটিশ ঝুলছে ‘'নো অ্যালকোহল জোন'। শুধু যে গ্রাহাণে পাওয়া যায় না তাই নয় বহিরাগতরাও এখানে কোনওরকম অ্যালকোহলযুক্ত পানীয় আনতে পারেন না। ধরা পড়লে গ্রাম থেকে বহিষ্কার এবং মোটা অঙ্কের জরিমানা হয়। কথিত আছে যাজ্ঞবল্ক্য ঋষি, স্থানীয় ভাষ্যে ইয়্যাজ্ঞ বাল বা ইয়্যাজ্ঞল ঋষি, এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। সেই থেকে বহু শত বছর ধরে এই প্রথা চলছে। আমরা গাড়ির মধ্যে বলাবলি করি আগেকার মুনিঋষিরা তো গাঁজাই বেশী পছন্দ করতেন কিনা তাই। এক একটা বাঁক এমন সরু আর এমন খাড়াই যে গাড়ি ২ কি ৩ বারের চেষ্টায় উঠে মোড় ঘুরতে পারে আর ঘোরার সময় অবধারিত একদিকের চাকা শুন্যে ঘোরে। এক চুলের ভুল মানেই সোওজা স্বগগো। তা সেসব পেরিয়ে ক্যাম্পার একসময় এসে দাঁড়ায় গ্রাহাণের বেস পয়েন্টে। গ্রামের দূরত্ব এখান থেকে ১ কিলোমিটার কিন্তু খাড়াই প্রায় সাড়ে পাঁচশো ফুট। সবাই ঝটপট নেমে চড়তে শুরু করে দিলেন। তাকিয়ে দেখি সামনে আবার একটা ভাঙা ধ্বসে যাওয়া ঢাল প্রায় ১৫ ফিটের মত উঁচু। লাঠি বসালেই লাঠিটা ভুসভুস করে ঝুরো মাটির ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে। দুই তিনবার এগিয়ে পিছিয়েও বিশেষ সুবিধে করতে পারলাম না। আচ্ছা মুশকিল তো। খান পাঁচেক বোলেরো ক্যাম্পার ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে। তাদেরই এক সারথী বলেন এইটুকুই একটু ভাঙা, ওই উপরে উঠলে পাকা রাস্তা পাবেন। পাকা রাস্তা! বলে কি রে! কিন্তু এইটাই বা উঠবো কী করে? এবার আরেকজন এগিয়ে আসেন ‘'চলিয়ে ম্যাডাম’’ বলে হাত বাড়িয়ে দেন। এইবার একহাতে লাঠি আরেকহাতে ওঁর হাত ধরে সেই নরম ঝুরঝুরে ধ্বসা জায়গাটা পেরিয়ে উঠে আসি। ওই যে নীচে ক্যাম্পার দাঁড়িয়ে আছে সারিসারি ওইটাই গ্রাহাণের বেস পয়েন্টআর্ধেক হাঁটু অবধি ট্রাউজার, জুতোয় চন্দনরঙা মিহি মাটির একটা হাফ ইঞ্চি স্তর হয়ে গেছে। সত্যিই এখান থেকে বেশ একটা রাস্তাই করা। কোথাও মাটির পথের উপরে পাতলা সিমেন্টের আস্তরণ কোথাও পাথরের ফাঁকে ফাঁকে সিমেন্ট জমিয়ে তৈরী পথ। ওই ভাঙা জায়গাটা পেরিয়ে উঠেই একটা ছোট চায়ের দোকান। চা, ম্যাগী, মোমো, ওমলেট ইত্যাদি পাওয়া যাচ্ছে। দোকানে না উঠে একটু বসি দোকানের ধাপে। অল্পবয়সী দোকানি ছেলেটি বলে দিদি বেশীক্ষণ বোসো না, একটু দম নিয়েই উঠতে শুরু করো। এই এক কিলোমিটার রাস্তা একটু খাড়াই আছে। তা খাড়াই বলে খাড়াই… আমার অনভ্যস্ত ঠ্যাঙ আর তারচেয়েও বেশী অনভ্যস্ত হৃৎপিন্ড একটা করে বাঁক ঘুরলেই এমন দুমদুমাদুম করে লাফাতে থাকে যে কোথাও পাঁচমিনিট কোথাও আরো বেশী জিরিয়ে নিই। অনেক জায়গাতেই রাস্তা এত সরু যে জিরোতে গেলে ওই পাশের পাথরে ভর দিয়ে হেলে অন্যদের পাশ দিতে হয়। ওঠার লোক সব চলে গেলেও অনেকে নামছেন। ট্যুরিস্টই মূলত, একদিন বা দুদিন কাটিয়ে কিম্বা আরো উপরে ট্রেক করে ফিরছেন। সকলেই উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন ‘'বাস আ গ্যয়ে, অউর থোড়া হি যানা হ্যায়’’ এবং আমি চড়ছি তো চড়ছিই। ট্র‍্যাডিশানাল পাথর আর কাঠের বাড়িতা চলতে থাকলে সব রাস্তাই একসময় ফুরায়, এও ফুরালো। ঠিক গ্রামে ঢোকার আগে প্রায় ৮০ ডিগ্রি কোণে খান চল্লিশেক সিঁড়ি। একবার ভাবি ধুত্তোর আর পারছি না এখান থেকেই ফিরি। এমনিতে তো এই রাস্তাটাও দেওদার গাছের চিরল পাতার ফাঁক দিয়ে আসা সূর্য্যের আলোয় চিকরি মিকরি নকশাকাটা, ছায়া ছায়া ঘুম ঘুম। পাতার ফাঁকে বাতাস চলার হালকা শিষের আওয়াজ হলুদ ঠোঁট ম্যাগপাই আর ব্লু হুইসলিং থ্রাশের ডাক ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। https://youtube.com/shorts/IHDQj4vqRi4?si=K3WAOurZ6pwAgXoCSound of Silenceএখানেই এলিয়ে বসে থাকি খানিকক্ষণ, তারপর নামবো। আজকের আকাশটা মনে হচ্ছে কেউ পার্বতীর জলে ধুয়ে, লাপিস লাজুলির রঙে ছুপিয়ে মেলে দিয়েছে, এত উজ্জ্বল। ঈশ সুদীপ বলেছিলেন তেমন কিছু নয় নিতান্ত সহজ রাস্তা, শেষটা একটু খাড়া। এ তো বেশ খাড়াই বাপু। সুদীপের উদ্দেশ্যে কি একটু দাঁত কিড়মিড় করবো? নাহ তাতে অনেকটা এনার্জী খরচা হবে। তার চেয়ে বরং সিঁড়িটাই চড়ার চেষ্টা করা যাক। এরকম খাড়া সিঁড়ির ক্ষেত্রে আমি সব জায়গায় যা করি, এখানেও তাই করলাম। সোজা চার হাতপায়ে উঠতে শুরু করলাম। নামার সময় বসে বসে নেমেছিলাম। পাথরের ছাদওলা বাড়ি, সামনে শীতের জন্য কাঠ জড়ো করে রাখাগ্রাহাণ গ্রামে যতগুলো বাড়ি ঠিক ততগুলোই বা তার চেয়েও কয়েকটা বেশী হোমস্টে। তবে টিভি, মোবাইল, বাইক, গাড়ি এইসব না থাকায় ভারী শান্ত চুপচাপ জায়গা। এখানে একটা প্রাইমারী আর একটা জুনিয়ার হাই স্কুল আছে। স্কুল বোধহয় সকালে বসে, এখন ছুটি। রাস্তা জুড়ে অনেক বাচ্চা দৌড়ে খেলে বেড়াচ্ছে। বাড়িগুলো কাঠ আর পাথরের তৈরী। একটা বাড়ির বাইরে ডিশ অ্যান্টেনা লাগানো দেখে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি মাঝেমধ্যে দু একটা চ্যানেলের সিগনাল পাওয়া যায়। ঘুরেফিরে মন্দির চত্বরে পোঁছাই। কাঠের উপরে সুক্ষ্ম কুনি কাজ করা মন্দিরপাথরের ভিতের ওপরে কাঠের কুনিকাজ করা অপূর্ব স্থাপত্য। বহিরাগতদের মন্দিরে ঢোকা বা মন্দিরের কোন অংশ স্পর্শ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মন্দিরে উপাস্য দেবতা হলেন ঋষি যাজ্ঞবল্ক্য। গ্রামের চারদিকে গম আর বার্লির খেত। গম তোলা হয়ে গেছে, বার্লি কিছু আছে এখনো। আর আছে সর্ষেখেত। যেদিকে তাকাই সেদিকেই ধাপে ধাপে হলুদ আর সবুজের নানা শেডের রংবাহার। সুকুন ক্যাফের বাইরের সিঁড়ির ধাপে বসে ইউকুলেলে নিয়ে টুং টাং করছিলেন এক যুবক, নাম বললেন যোশুয়া। এখানে এসেছেন দিন পনেরো, কাসোলে আরো আগে। যাজ্ঞবল্ক্যের মন্দির - ভারতে আর কোথাও আছে কি? যোশুয়া এতদিনে হিন্দি মোটামুটি বলতে পারেন এবং হিন্দী বাৎচিৎ করতে ভারী উৎসাহী। দু:খ করে বললেন একটা রাস্তা তৈরী হচ্ছে, দুই তিন বছরের মধ্যে হয়ে যাবে নয়া গ্রাহানের দিক দিয়ে। নয়া গ্রাহাণ আবার কোথায়? ওইই যে গ্রামের যেদিকটা তত খাড়া নামে নি একটু ঢালু হয়ে নেমেছে সেইদিকে দেখো কখানা বাড়ি, ওই হল নয়া গ্রাহাণ। পিছন থেকে একটা কচি গলা বলে ও গ্রামের নাম পুলগি, তোমাদের জন্য নয়া গ্রাহাণ বলা হয়। ফিরে দেখি।একজন আড়াইফুটি ভদ্রমহিলা, স্কুল ড্রেস পরা। সঙ্গে আরো তিনজন ওনার সাইজের। সকলেই স্কুল ফেরত। এদিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকা যায় ঘন্টার পর ঘন্টাসবকটা পুঁচকে একসাথে তড়বড়িয়ে কথা বলতে লাগল। সে এক্কেবারে কলকাকলি ব্যান্ড। অনেক কষ্টে বোঝা গেল এরা আমায় জলপ্রপাত দেখাতে নিয়ে যেতে চায়। যদিও পা আর চলছে না তবু ঝকঝকে চোখের কচি মুখগুলোকে নিরাশ করতে মন চাইল না। কিন্তু গ্রাম ছাড়িয়ে একশো মিটার মত উঠেই এমন পা ব্যথা শুরু হল যে আর এগোনর সাহস পেলাম না। ওই বদখত পথটা নেমে ফিরতে হবে তো। তা সেও একসময় নামলাম। এবারে দোকানে ঢুকে বসি। নামার সময় পায়ের পাতায় চাপ পড়ে খুব, একটু বসে নেওয়া যাক। জলপ্রপাত - গ্রাহাণছবি সৌজন্য - যোশুয়াদোকানী ছেলেটির নাম চাঁদ। ও মানালির অটলবিহারি বাজপেয়ী ইন্সটিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে অ্যাডভান্সড কোর্স করেছে, সার্টিফায়েড গাইড। এছাড়া বরা সিগ্রি হিমবাহ ট্রেকিঙের সময় তুষারঝড়ের পরে উদ্ধারকাজেও অংশ নিয়েছে, প্রশংসাপত্র পেয়েছে। বলে দিদি তুমি ক্ষীরগঙ্গা ট্রেকে এসো, আমায় ৩ মাস আগে বলবে, আমি তোমাকে হাতে ধরে ঘুরিয়ে আনবো। সার পাস ট্রেক ক্ষীরগঙ্গার চেয়ে কঠিন। ক্ষীরগঙ্গা আরামসে গাছের ছায়ায় ছায়ায় হাঁটতে হাঁটতে চলে যাবে দেখো। চাঁদভাইশুনে লোভ লাগে। আসতে হবে, কিন্তু তার আগে ফিটনেস আরেকটু বাড়াতে হবে। জিজ্ঞাসা করি ও যখন গাইড হয়ে যায় তখন দোকান কে দেখে? বলে আরে এটা আমার মৌসির দোকান। মৌসি গেছে খেত থেকে বার্লি তুলতে আমি আজ ফ্রি তাই বসেছি। অনেক গল্প করে ওর ট্রেক করানোর, রেস্কিউ করার। সেই মাটি ধ্বসা পনেরো ফুট হাত ধরে নামিয়ে বোলেরো স্ট্যান্ডে পৌঁছে দিয়ে যায়। এক সারথীকে ডেকে বলে দিদিকে সাহি সালামৎ কাসোল পৌঁছে দিও। আমায় বলে, নম্বর তো রইল, হোয়াপ করে চলে এসো নিয়ে যাবো ক্ষীরগঙ্গা, মানতালাই লেক। ক্যাম্পার তো অন্তত পাঁচজন না হলে ছাড়বে না। আরেক সরকারী আধিকারিক ছিলেন অপেক্ষায়। গ্রাহাণে কিছু সরকারি কাজে এসেছেন। এলেন এক পুলিশ সাব ইনস্পেক্টার, তবে তিনি তাঁর শালার বাড়ি এসেছিলেন কোন বিয়ের সম্বন্ধের ব্যপারে। এইসব শুনতে শুনতে দেখতে দেখতে আরো জনা তিনেক হয়, তবে তাঁরা লোকাল তাই ৫০ টাকা করে দেবেন এবং খোলা জায়গায় বসবেন। আরো একজন হতে পুলিশবাবুর তাড়ায় গাড়ি ছাড়ে। অন ডিউটি না হলেই বা কি, পুলিশ তো বটে। পথে এক জায়গায় পাথর পড়ায় তার আগের বাঁকে থামতে হয়েছিল মিনিট পঁচিশেক মত। ততক্ষণে বিকেল পাঁচটা বেজে গেছে, গাড়ি থেকে নেমে দেখি কনকনে ঠান্ডা। গাড়ি থামাবার জন্য যারা নিযুক্ত, তারা রাস্তার পাশে কাঠ, গাছের ডাল শুকনো পাতা জড়ো করে আগুন জ্বেলেছে। বলে এসো এসো হাত পা সেঁকে নাও, কতক্ষণ পাথর পড়বে তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। তিনজন অল্পবয়সী ছেলেমেয়ে হেঁটে ফিরছিল, বলে আমরা চলে যাই, হাঁটছি তো। সবাই হেসে ওঠে, ‘পাগল নাকি তোমরা? পাথর কি জানে তোমরা হাঁটছ, তাই রেয়াত করবে?’  কাসোলে সন্ধ্যে গাঢ়, পাহাড়চুড়ায় তখনো অস্তসূর্য্যের রশ্মি মেয়েদুটো দিল্লি ইউনিভার্সিটির, ইংরিজিতে মাস্টার্স করছে, ছেলেটা এমবিএ ছাত্র। কাসোলে এসেছিল বেড়াতে, আগামীকাল ফেরত যাবে। কাসোল ফিরতে ফিরতে প্রায় অন্ধকার হয়ে আসে। কাল ফেরা, সারাদিন বাসে কাটবে তাই কিছু শুকনো খাবার কিনে হোস্টেলে ফিরি। কাসোল পুরোন ব্রিজ থেকে পুরোন মার্কেট পর্যন্ত খান আষ্টেক জার্মান বেকারি৷ চিজকেকের স্বাদ পুণের জার্মান বেকারির মত নয়, একটু নীরেশ। হোস্টেলে ফিরে খানিক জিরিয়ে নৈশাহারের জন্য বেরোই রাত আটটা নাগাদ। রাতের কাসোলমুনড্যান্স ক্যাফে একেবারে নদীর ধার ঘেঁষে। প্রথমে বাইরের লনে মিনিট পনেরো বসে প্রায় জমে যাবার অবস্থা। বাধ্য হয়ে ভেতরে গিয়ে বসি। হিমাচলে ট্রাউট মাছ ধরার সময় হল ৩১শে মার্চ থেকে ৩১শে অক্টোবর। নির্বিঘ্ন প্রজননের জন্য ১লা নভেম্বর থেকে ৩০শে মার্চ অবধি ট্রাউট ধরা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। তবে নভেম্বরের প্রথম দুই তিন সপ্তাহ কাসোলে অন্তত আপনি টাটকা ট্রাউট খেতে পাবেন। সরকারি পরিদর্শন হলে ফ্রিজারে রাখা মাছ বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। নিট্টু বলেছিল মুনড্যান্সে টাটকা মাছ পাবোই। গ্রিলড ট্রাউট উইত ম্যাশড পট্যাটোতা পেলাম। গ্রিলড ট্রাউট, আস্ত মাছও নেওয়া যায় বা কিছুটা অংশ। গ্রিলড ট্রাউট উইত ম্যাশড পোট্যাটো। সাথে স্যালাড ও দুই টুকরো গার্লিক ব্রেড। আহাহা অপূর্ব স্বাদ। মাছট এত টাটকা, মুখে দিলে মিলিয়ে যায়। খেয়েদেয়ে আজ আর ঘোরাঘুরি করতে পারলাম না, সোজা হোস্টেল এবং নিদ্রাদেবীর কোল। ১৩ই নভেম্বর সকালে উঠে তাপমাত্রা দেখে তো হাঁ। -২৪!! সোসান হলেও সেখানে এত কম হওয়া কী করে সম্ভব? কে জানে হয়ত কোন গ্লেসিয়ার আছে কাছাকাছি। নিট্টুকে আগেই বলে রেখেছিলাম আজ সকাল সাড়ে আটটায় কফি চাই আমার। চাইই চাই। এ কি গ্লেসিয়ারের পাশে নাকি, অ্যাঁ! কাসোল থেকে দিল্লি আসার সরাসরি বাস সবকটাই রাত্রিবেলা। আমি চাইছি সকাল বা দুপুরের বাস, যাতে রাত্রে দিল্লি পৌঁছাতে পারি। তা ওডিন হোস্টেলের গেটের পাশের বাস বুকিং অফিস জানিয়েছিল সকাল সাড়ে এগারোটার দিল্লিগামী বাস আছে তবে ভুন্টার থেকে। নিজ দায়িত্বে সাড়ে এগারোটার মধ্যে ভুন্টার পৌঁছাতে হবে। সেইমত ট্যাক্সি ইউনিয়ানের অফিসে বলে এসেছিলাম সকাল নটায় গাড়ি লাগবে। ওঁরা বলেছিলেন পনেরো মিনিট আগে ফোন করতে, তখন যে সারথীর নম্বর আসবে তাকেই পাঠাবেন। ভুন্টার থেকে দিল্লির পথে মান্ডির কাছাকাছিসেইমত ফোন করে যাকে পাওয়া গেল সে নিতান্ত বাচ্চা ছেলে। একটু চিন্তিত হয়ে বয়স জিজ্ঞাসা করে জানা গেল কুড়ি। কিছুদূর যেতেই তার গাড়ির অ্যালার্ম পিঁক পিঁক শুরু করল। ক্রমশ বাড়তে থাকায় এক জায়গায় একটা সার্ভিস সেন্টার পেয়ে সেখানে দেখিয়ে জানা গেল এঞ্জিন অয়েল লিক করছে। ছেলে গজগজ করছে এইমাত্র সার্ভিস করিয়েছি। মেকানিক সাহেব এক দাবড়ানি দিলেন, এ পুরোন লিকেজ নিশ্চয়ই দেখিয়েছিল তুমি পয়সা বাঁচাতে তাপ্পি লাগিয়েছ। ১৩০০ টাকা দিয়ে ঠিক করিয়ে গাড়ি চলল সাথে চলল ছেলের গজগজ। ১৫০০ টাকা ভাড়ার ১৩০০ বেরিয়ে গেল, আমার তো তেলের খরচই উঠবে না। কুলুর কাছেবাকী পথটুকু নির্বিঘ্নেই কাটল। ভুন্টারে পৌঁছে ঘন্টা দেড়েক অপেক্ষার পর বাসও এলো। বড় ভলভো, আরামদায়ক যাত্রা। শুধু চন্ডীগড়ে পঞ্চকুল্লার ওখানে এমন মারাত্মক জ্যাম পেলাম যে দিল্লি ISBT তে রাত দশটার বদলে পৌণে একটায় গিয়ে নামলাম। পরে দেখি সেই ছোকরা গুগল পে'তে মেসেজ করেছে বাড়িভাড়া দিতে পারছে না, ২০০০ টাকা পাঠাই যেন আমি। উত্তর না পেয়ে ১০০০টাকা ধার দিতে পারবো কিনা। যেহেতু ট্যাক্সি ইউনিয়ান থেকে পাঠিয়েছিল তাই আমার ফোন নম্বর ছিল না, গুগল পেতেই মেসেজ করে গেছে।ইনি বাসের পাশে পাশে উড়ছিলেনফিরে আসবার এতগুলো মাস পরেও কালগা পুলগা পরীবন গ্রাহাণের কথা মনে হলেই একটা কনকনে ঠান্ডা, চনমনে ভাললাগায় মন ভরে যায়। ভুলে গেছি চড়াই ওঠার কষ্ট। ভুলে গেছি গ্রাহাণ থেকে নামার পরের পায়ের ব্যথার কথা, ভুলে গেছি বাড়ি ফেরার পরে এক সপ্তাহ পায়ের ফোলা, পা ফেলতে না পারা ব্যথার কথা। মনে আছে মায়াবী পরীবন, ছোট্ট জলপ্রপাত, উত্তাল গ্রাহাণ নালা, স্কুল ইউনিফর্ম পরা অপাপবিদ্ধ তিন শিশুর কলকল, হলুদ সবুজ বাদামী ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া খেত। আবার যাবো শীগগিরই। (সমাপ্ত)
    প্রস্তর যুগ - Nirmalya Nag | “আজকে তোমার একটা জরুরী মিটিং আছে না?” বেডরুমের দরজায় এসে জিজ্ঞাসা করল রিমা।দেওয়ালে টাঙানো ঘড়ির দিকে চোখ গেল জয়দীপের; ন’টা প্রায় বাজে, ট্রেনটা মিস হয়ে না যায়। অফিস যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে তিন বছরের মেয়ের সঙ্গে বকবক করছিল সে। সদ্য জ্বর সেরে ওঠা রিয়া বাবার হাত চেপে ধরল। ধীরে ধীরে মেয়ের আঙুলগুলো ছাড়িয়ে নিল জয়দীপ, দু-গালে হামি খেয়ে টাটা বলে উঠে পড়ল। রিয়ার আয়া ঝর্ণাদিও এসে গেছে; জয়দীপ তাড়াতাড়ি মায়ের ঘরে গিয়ে “আসছি” বলে ছুটল বাইরের বারান্দার দিকে।খুব দেরি হয়ে গেছে, অন্য দিনের তুলনায় সাত-আট মিনিট বেশি সময় কাটিয়েছে রিয়ার সঙ্গে আজ। বিয়ের প্রায় আট বছর পরে তাদের জীবনে এসেছে মেয়ে, বড্ড বেশি আদর পায় সে বাবার কাছে। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে বারান্দার দরজার চৌকাঠে ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে জোর ধাক্কা লাগল জয়দীপের। দরজার ফ্রেমটা ধরে ব্যালান্স রাখল জয়দীপ, গলায় আসা চিৎকারটা গিলে নিয়ে পায়ের দিকে তাকালো। নখের ঠিক নিচে খানিকটা কেটে গেছে নিশ্চয়, রক্ত বেরিয়ে মোজার একটু জায়গা ভিজে যাচ্ছে। যন্ত্রনাটা পা বেয়ে ওপরে উঠে আসছে যেন, মুখটা বিকৃত হয়ে গেল জয়দীপের। “ভাগ্যিস রিমা দেখতে পায়নি; তাহলে এখনই বরফ টরফ লাগাতে বলতো, আর আরও দেরি হয়ে যেত।” বারান্দায় এল জয়দীপ, খেয়াল রাখল যাতে না খোঁড়ায়; রিমা এখনই এসে যাবে।বারান্দার এক পাশে একটা জুতোর র‍্যাক আর তার পাশে একটা প্লাস্টিকের টুল রাখা। টুলে বসতে না বসতেই রিমা এসে দাঁড়াল পিছনে। র‍্যাকের একটা পাল্লা খুলে ভিতরে তাকাল জয়দীপ, তার জন্য বরাদ্দ তাকেরত সামনেই রাখা আছে পুরনো ব্রাউন রঙের লেদার স্নিকারটা, সেটাই এক ঝটকায় টেনে বার করে ডান পা’টা আগে জুতোয় গলালো সে, তারপর বাঁ পা।“আবার সেই পুরনোটা…নতুনটা পরো,” ৩৯-বছরের স্বামীকে বলল রিমা।“সময় নেই, ট্রেন মিস হবে…,” ফিতে বাঁধা শেষ করে উঠে দাঁড়ালো জয়দীপ। “আসি,” বেরিয়ে পরল জয়দীপ।“সাবধানে যেও,” বলে দরজা বন্ধ করল রিমা, আর এক ঘণ্টার মধ্যে তাকেও বেড়োতে হবে। বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটা স্কুলে পড়ায় সে।গলি দিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগল জয়দীপ, এই জুতোটা একটু ভারি, পায়ে লাগছে বেশ, আগের মত সুরক্ষা মনে হয় আর দিতে পারছে না; নতুনটা প’রে এলেই হত। ওই সিন্থেটিক হালকা জুতো জোড়া গত জন্মদিনে তাকে উপহার দিয়েছিল রিমা। র‍্যাকের মধ্যে পুরনোটার পাশেই নতুনটা রাখা থাকে, দ্বিতীয় পাল্লাটা খুললেই ‘পা-লোক’কে পাওয়া যেত। ছোট থেকেই নানা জিনিসের নামকরণের বাতিক আছে জয়দীপের। নিজের বাড়ির নাম দিয়েছে ‘সুবোধ বালক’, অফিস হল ‘মাস-ও-হারা’। আগের জুতোটাকে ডাকে ‘চর্মসহচরী’, সেখান থেকে ছোট করে ‘সহচরী’;আর নতুনটার নাম ‘পা-লোক’। মিনিট দুয়েক পরেই জশোর রোডে এসে পড়ল জয়দীপ, বাঁদিকে ঘুরে ভাঙাচোড়া ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে শুরু করল বেলগাছিয়া মেট্রো স্টেশনের দিকে।সোমবারের অফিস টাইমে যশোর রোড পুরো জমজমাট; গাড়ির ধোঁয়ার গন্ধ, ট্রাফিকের শব্দ, বাস কন্ডাক্টর আর অটোচালকদের হাঁকাহাঁকির মধ্যে দিয়ে দ্রুত চলতে গিয়ে ঘেমে গেল জয়দীপ। বর্ষাকাল প্রায় শেষ হয়ে এল, আবহাওয়া বেশ আর্দ্র; আজ সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টি হতে পারে মোবাইলে দেখেছে সে।পায়ের ব্যাথাটা ভালই জানান দিচ্ছে; আস্তে আস্তে হাঁটারও উপায় নেই। ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নামল জয়দীপ – সারি সারি বাস, প্রাইভেট গাড়ি, হলুদ ট্যাক্সি, সাদা ক্যাব, টু-হুইলার, অটো আর সাইকেলের মধ্যে দিয়ে কোনও রকমে রাস্তার অন্য দিকে এল সে। পৌঁছে গেল মেট্রো স্টেশনে। ট্রেনটা মিনিট দুই দেরি করে এল, তাই পেয়ে গেল জয়দীপ। ভিড়ের মধ্যে গোঁটাগুঁতি করে এগোবার চেষ্টা করল সে, খান তিনেক স্টেশন পেরোবার পর জায়গাও পেয়ে গেল। ভালই হল, একটু আগে একজন পা মাড়িয়ে দেওয়াতে ব্যাথাটা বেড়ে গেছে, দপদপ করছে আঙুলটা।সামনে একটু ঝুঁকে পায়ের দিকে তাকাল জয়দীপ; জুতোটার অবস্থা সত্যিই খারাপ হয়ে গেছে – চামড়ার গায়ে ঘষা দাগ, হিলের একটা দিক ক্ষয়ে গেছে, লেসও যেন বেশি টান পড়লেই ছিঁড়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। পালিশও করা হয়নি কিছুদিন। ‘সহচরীর’ আশেপাশে এখন অনেকগুলো নতুন আর পুরনো ডার্বি, ফ্লোটার, অক্সফোর্ড, স্নিকার আর স্যান্ডাল; তাদের নানা ব্র্যাণ্ড, নানা রঙ, নানা দাম। তাদের মালিকদের কথাবার্তা, ফোনালাপ আর বিরক্তিকর রিলের আওয়াজের মাঝে একটু ঝিমুনি এল জয়দীপের।হঠাৎ কানে এল কারও গলা; তারুণ্যে ভরা স্বর, তাতে কিছুটা যেন বিদ্রূপ মেশানো; সে বলছে, “তোমাকে দিয়ে আর বেশি দিন চলবে না।”এর উত্তরে কেউ বলল, “কাউকে দিয়েই চির দিন চলে না; তবে যার যা কাজ তাকে সেটা শেষ পর্যন্ত করেই যেতে হয়।” এই গলার মালিক মনে হয় বয়স্ক।কারা কথা বলছে বুঝতে পারল না জয়দীপ, এদিক ওদিক তাকাল। খুব কাছ থেকেই শোনা গেল দুটো গলা, কিন্তু এই মুহুর্তে তো কাছাকাছি কেউই কথা বলছে না। ট্রেনে ঘোষণা হল এসপ্ল্যানেড স্টেশন আসছে। আবার চোখটা বুজে এল তার।প্রথম গলাটা ফের শোনা গেল,”তোমার চামড়া, তোমার রাবার সোল – সব গেছে। গত সপ্তাহে স্লিপ করেছ, আর একবার তো পেস্টিং খুলে যাচ্ছিল আর একটু হলেই। সময় হয়েছে, এবার সরে যাও। তুমি এখন লায়াবিলিটি।”দ্বিতীয় জনের স্বর এবার গম্ভীর। “সময়? অনেক কঠিন সময় পেরিয়ে এসেছি। হিলটা ক্ষয়ে গেছে কেন? সাত-আট বছর ধরে ঘোরাঘুরি ক’রে; এই ডাক্তার থেকে ওই ডাক্তার; এই টেস্ট থেকে সেই টেস্ট, অনেক হতাশার ভার বয়ে তবে আজ রিয়া এসেছে। বাঁ দিকের ওই স্ক্র্যাচটা? রূপকুণ্ড ট্রেক করার সময়ে পাথরে পা আটকে গিয়েছিল একটা বিপজ্জনক জায়গায়। টাকা দিয়ে আমার মূল্য বিচার করতে যেও না।”আদালতের সওয়াল জবাবের মত এই কথোপকথন কারা করছে এইবার জয়দীপের কাছে পরিস্কার হয়ে গেল -- সহচরী আর পা-লোক। নতুন জুতো আক্রমণ চালিয়ে গেলঃ “সেন্টিমেন্ট দিয়ে জীবন চলে না; সময়কে মেনে নিতে হয়। আবার বলছি, তুমি এখন লায়াবিলিটি।”লোকজনের হুড়োহুড়িতে চোখ খুলল জয়দীপ; পার্ক স্ট্রিট স্টেশনে দরজা খুলছে। তাড়াতাড়ি করে প্ল্যাটফর্মে নেমে অন্য অফিসযাত্রীদের ভিড়ে মিশে গেল সে; হাঁটতে গিয়ে টের পেল পা-টা আবার ব্যথা করছে। রাস্তায় এসে অফিসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হল পা-লোকের যুক্তিগুলো এড়িয়ে যাওয়া যায় না; আবার সহচরী যা বলেছে সেগুলোও ঠিক। গ্র্যান্ড হোটেল আর্কেডের একটা দোকান থেকে ১৫ বছর আগে সহচরীকে সংগ্রহ করেছিল সে, সেই সময়ের সাধ্যের কিছুটা বাইরে গিয়েই কিনেছিল। সে দিনের ঝকঝকে জুতোটা আজ জীর্ণ হয়েছে। পা-লোককে কিনেছিল অনলাইনে, অনেক দেখাশোনা রিসার্চ টিসার্চ করে; রিমা বলেছিল, “তুমি কিনে নাও, টাকা আমি দেবো।” আজকের মিটিংটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট, তবে পা-টাকেও একটু দেখতে হবে। একটা স্প্রে বা জেল টেল কিছু লাগালে আরাম হবে মনে হয়। আপাততঃ নিচু হয়ে জুতোর ফিতেটা টাইট করে বেঁধে নিল জয়দীপ; পা বাড়ালো ‘মাস-ও-হারার’ দিকে।এক ঘন্টার মিটিং ভালো ভাবেই চলল। কিছু অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হল জয়দীপকে; এবার প্রায় স্পষ্ট হয়ে গেল পরের প্রমোশন আসছে, এর জন্য দু’ বছর অপেক্ষা করে আছে সে। তৃপ্ত মনে এবার পায়ের দিকে নজর দিল সে।একজন অফিস অ্যাসিসট্যান্টকে দিয়ে ফার্স্ট এড বক্সটা আনালো জয়দীপ। ডান পায়ের জুতোটা খুলে দেখল রক্ত শুকিয়ে মোজাটা আটকে আছে বুড়ো আঙুলের কেটে যাওয়া জায়গাটায়। সাবধানে মোজা খুলল সে, ফুলে গেছে বুড়ো আঙুলটা, কাটা জায়গায় কালচে লাল শুকনো রক্ত। ডেটল দিয়ে ক্ষতর জায়গাটা পরিস্কার করে একটা ব্যান্ড এড লাগালো সে, পেন কিলার স্প্রে করল, ব্যাথাটা কমল কিছুটা। জুতোটা পরার সময়ে খেয়াল করল সোলের কাছটা আলগা হয়ে এসেছে; অন্যটা দেখল, সেটারও একই অবস্থা।আজকের বিশেষ দিনে লাঞ্চের সময়ে পার্থর কাছ থেকে একটা সিগারেট চেয়ে খেল সে, যদিও ধূমপান সে কদাচিত করে। পার্থ আবার অফিসের প্রচুর গোপন খবর রাখে, বলল কোম্পানি সম্ভবত অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের ঝা-জীকে আর রাখবে না। নানা শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত ঝা-জী এখন খুব ছুটি নেন, আরও বছর চারেক চাকরি ছিল ওনার।সন্ধ্যা হওয়ার আগেই আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল, যে কোনও সময়ে বৃষ্টি আসবে। পায়ের ব্যাথাটা আবার ফিরে এসেছে, অফিস ছুটির পর জয়দীপের ইচ্ছে হল না মেট্রো অবধি যাওয়ার; একটা ক্যাব বুক করল সে।ক্যাবে উঠলে এসি চালিয়ে দিল ড্রাইভার, গাড়ি চলতে শুরু করল বেলগাছিয়ার দিকে। ব্যাকপ্যাকটা পাশেই সিটের ওপর রেখে আরাম করে বসল জয়দীপ। মাথাটা হেলিয়ে দিল পিছনের দিকে, একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে ভাবতে লাগল যে নতুন দায়িত্ব অফিস দিয়েছে সেগুলো কী ভাবে ঠিক মতো করা যাবে। লেনিন সরনীর মোড় পেরিয়ে যাওয়ার পর পা দুটো একটু সরাতে গেল সে। চোখ গেল সহচরীর দিকে। কোন যুগ থেকে এই জুতোটা আছে তার কাছে। সহচরী তার সম্পর্কে যা জানে, ততটা হয়তো রিমাও জানে না।গাড়ির কাঁচ আর ছাদের ওপর বৃষ্টি পড়া শুরু হল, প্রথমে আস্তে, তার একটু পরেই বেশ জোরে।“ভালো বৃষ্টি হবে স্যার, সকাল থেকেই মেঘলা রয়েছে,” বলল ড্রাইভার। জয়দীপ শুধু “হুমমম” বলে থেমে গেল; ড্রাইভার বুঝল তার প্যাসেঞ্জারের কথা বলার ইচ্ছে নেই।একটু ঝিমুনি এসেছে জয়দীপের। তার মধ্যেই শুনতে পেল পা-লোকের গলা, “এই যে স্যার, তোমার মত টুটাফুটা চিজকে ইনি কেন এত পছন্দ করে বলো তো?”সহচরীর উত্তরে কি একটু আবেগের ছোঁয়া পাওয়া গেল? “মহাফেজখানা কাকে বলে জানো? আমি হলাম তাই। ওর জীবনের হাজারো দামী সময়ের সাক্ষী ছিলাম আমি। রিমার বাবা-মা ওর সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজী ছিল না; ও রিমার বাড়ি যেদিন যায় আর সফল হয়ে বেরিয়ে আসে সেদিন আমি ছিলাম। সেটা ছিল বৃহস্পতিবারের সন্ধ্যা। রিয়া হওয়ার সময়ে খুব সমস্যা হয়েছিল; হাসপাতালের করিডোরে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পায়চারি করেছি প্রায় সারা রাত, একটা মঙ্গলবারের রাত। সেই শুক্রবারের বিকেলে যখন ওর বাবা মারা যান, আর ও অফিস থেকে ফিরে আসে সেদিনও আমি ছিলাম।” পা-লোক বলল, “ইতিহাসের সাল তারিখ কোন কাজে লাগবে? এই দিয়ে কি তোমার ক্ষয়ে যাওয়া সোল নতুন হবে, না আলগা হওয়া পেস্টিং শক্ত হবে? এবার তোমার সাম্রাজ্যের পতনের সময়।”হাসির শব্দ কানে জয়দীপের; দীর্ঘ নির্মল হাসি। “সময়কে একটু সময় দাও, তারপর দেখ। গুড লাক।”“হাসির আবার কী হল?” জিজ্ঞাসা করল পা-লোক। সহচরীর কাছে থেকে কোনও উত্তর এল না। জয়দীপের মনে পড়ল না ওই জুতোর মধ্যে নারীসুলভ কিছু না থাকা সত্ত্বেও কেন ‘সহচরী’ নাম দিয়েছিল সে।বিদ্যুতের চমকে আকাশ ফালাফালা হয়ে যাওয়ার পরেই প্রচন্ড আওয়াজ করে বাজ পড়ল। আজকাল বাজ পড়ছে খুব বেশি, কেন কে জানে। বৃষ্টিও এখন বেশ জোরে পড়ছে, ট্রাফিকের স্পিড কমে গেছে। কপাল ভালো জয়দীপের, শ্যমবাজার পাঁচমাথার মোড়ে সিগন্যাল খোলা পেল সে, নইলে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হত কে জানে! আর জি কর হাসপাতাল পেরোবার সময়ে মোবাইল বেজে উঠল; রিমা। জিজ্ঞাসা করল কোথায় আছে ও, প্রচণ্ড বৃষ্টি পড়ছে বাড়ির কাছে। আর জানালো রিয়া এখন অনেকটা ভালো আছে। ফোন রেখে সামনে তাকালো জয়দীপ; উইন্ডস্ক্রিনের ওপর অঝোরে জল পড়ছে, ওয়াইপার এদিক ওদিক করছে ফুল স্পিডে। পাশের দিকে তাকালো সে, জলে পুরো ভেজা দু-একটা লোক ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, এই বৃষ্টিতে ছাতা কোনও কাজেই লাগবে না। বেশ কয়েকজন আশ্রয় নিয়েছে দোকানের সামনে। গাড়ির চাকার ধাক্কায় রাস্তার জল ছোটখাটো ঢেউ-এর মত ধাক্কা মারছে ফুটপাথের পাথরে। কারেন্ট যায়নি এই বাঁচোয়া।ব্যাকপ্যাক থেকে নিজের জন্য ফোল্ডিং ছাতা আর ব্যাগের জন্য রেন কভার বার করল জয়দীপ; আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাড়ি ঢুকে যাবে সে। ক্যাবটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল; ড্রাইভার চাবি ঘোরালো বার দুই, গাড়িটা ঝাঁকুনি দিয়ে সামান্য এগিয়ে ফের থেমে গেল। ড্রাইভার বিড়বিড় করে গাল দিচ্ছে বুঝতে পারল জয়দীপ। গিয়ার, ক্লাচ আর চাবি নিয়ে আরও কয়েকবার চেষ্টা করল ড্রাইভার, গাড়ি এগোল না। পিছন থেকে ড্রাইভাররা হর্ন দিতে আরম্ভ করেছে, তারপর জল জমা ট্রাফিকে ভরা রাস্তায় বেশ কষ্ট করেই গাড়ি ঘুরিয়ে এগিয়ে যেতে শুরু করল।“কী হয়েছে?” বিরক্তি আর উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল জয়দীপ। “ব্যাটারি গেছে স্যার,” উত্তর দিল ড্রাইভার, তার গলায় অসাহয়তা। “দেখে বেরোন না কেন? কী করব এখন?” বলল জয়দীপ। “সরি স্যার; এই বৃষ্টির মধ্যে কিছু করার নেই।”এসি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বদ্ধ গাড়ির মধ্যে গরম লাগতে শুরু করেছে জয়দীপের; বাইরের দিকে আবার তাকালো সে - ঘোলাটে জলের স্রোত বয়ে চলেছে রাস্তা দিয়ে। বাড়ির গলির মুখটা এখনও একটু দূরে; হেঁটে গেলে পাঁচ-ছয় মিনিটের মধ্যে বাড়ি পোঁছে যাওয়া যাবে। সহচরীর কথা একবার ভাবল সে… খুলে ফেলবে? নাহ, পায়ের কাটার জন্য সেটা ভালো হবে না; গাড়ির মধ্যে বসে থাকারও কোনও মানে নেই। রেন কভারটা ব্যাকপ্যাকে আটকে পিঠে নিয়ে নিল জয়দীপ, প্যান্টটা একটু গুটিয়ে নিল, ড্রাইভারকে টাকা দিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে। কাদাগোলা ঠান্ডা জল জুতোয় ঢুকে এল সঙ্গে সঙ্গে, ছাতা খোলার আগেই মাথা, জামা আর প্যান্টের বেশ কিছুটা ভিজে গেল। ফুটপাথে উঠে গেলে জল একটু কমবে; নোংরায় আটকে থাকা গালিপিটের দিকে দ্রুত ধেয়ে যাওয়া জল এড়িয়ে ফুটপাথে উঠল সে। গলিটা এখনও প্রায় ২০০ মিটার দূরে, জোরে পা চালালো সে। বৃষ্টির জন্য ভালো দেখা যাচ্ছে না, তার ওপর জয়দীপের ছাতাটাও একটু বড়। ঠিক এই জায়গাটায় কোনও দোকান নেই; উল্টো দিক থেকে এক জন মহিলা আসছেন, তাঁকে জায়গা দেওয়ার জন্য একটু বাঁ দিকে সরে গেল জয়দীপ, আর তার পরেই বাঁ পা-টা জোর ধাক্কা খেল একটা জমে যাওয়া সিমেন্টের বস্তায়।দাঁত চিপে যন্ত্রণাটা সহ্য করল সে, দাঁড়িয়ে গেল মিনিট খানেকের জন্য। এবার তার একটা পায়ে ক্ষত আর অন্যটায় চোট, দুটোই সহচরীর ফিতেয় বাঁধা।হঠাতই জয়দীপের মনে হল পা-লোকের গলা শোনা যাচ্ছে… “জল আর কাদায় পুরনো লেদার বডি ভারি হয়ে গেছে, ও আর চলবে না।” সহচরীর দিক থেকে কোনও উত্তর এল না।দুই পায়েই সমস্যা নিয়ে চলতে অসুবিধে হচ্ছে জয়দীপের, ধীরে ধীরে এগোতে লাগলো সে, গলির মুখে এসে দেখে ভেতরটা অন্ধকার, রাস্তার আলোগুলো জ্বলেনি। এখান থেকে বাড়ি যেতে স্বাভাবিক দিনে দুই থেকে তিন মিনিট লাগে, তবে আজকের কথা আলাদা।মজুমদার বাবুর বাড়ি এসে গেল, বছর তিনেক আগে উনি মারা যাওয়ার পর থেকে বাড়িটা বন্ধ হয়েই পড়ে আছে। বাউণ্ডারি ওয়ালের নিচের একটা গর্ত দিয়ে ভলকে ভলকে জল বেড়িয়ে আসছে বাড়ির ভেতর থেকে, গলির এক পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে বড় রাস্তার দিকে।মজুমদার বাবুর বাড়িতে আলো জ্বলছে না বলে ওখানটা আরও বেশি অন্ধকার, বৃষ্টি পড়ছে আর তার ওপর রয়েছে বড় ছাতা। বন্ধ গ্রিল গেটের কাছটায় জঞ্জাল জমে ছিল, খেয়াল করেনি জয়দীপ, তার ওপর দিয়ে হাঁটতে যেতেই বাঁ পা-টা আটকে গেল। টেনে বার করতে গিয়ে লাভ হল না। বোঝা গেল জঞ্জালের নিচে কোনও কিছুতে পা আটকে গেছে। বেশ বিরক্ত হয়ে ফের হ্যাঁচকা টান দিল সে, এবার পা-টা একটু নড়ল; তৃতীয় টান আরও জোরে, এবার কাজ হল, পা খুলে এল।ব্যালান্স সামলে নিয়ে পায়ের দিকে তাকালো জয়দীপ। সহচরীর বাঁ দিকের সোল আর বডির মধ্যে আর যোগ নেই, সামনের দিকটা আলগা হয়ে ঝুলছে। বাঁ পা-টা ঝাড়া দিল জয়দীপ, টুটাফুটা জিনিসটা প্রবল ঝটকা খেল, তবুও পায়ে আটকেই রইল।“আর আই পি,” তারুণ্যে ভরা গলা শুনতে পেল সে।প্রায় অন্ধকার গলিতে একা দাঁড়িয়ে রইল জয়দীপ; ঠান্ডা জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছে খোলা পা আর ছেঁড়া জুতোর ওপর দিয়ে, সহচরীর গায়ে লেগে থাকা ময়লায় যেন কিছুটা পরিস্কার হল। ডান পায়ের জুতোটা এখন কোনও কাজের নয়।একটু সরে এসে ছাতা সামলে এক হাঁটু গেড়ে বসল জয়দীপ; কষ্ট করে খুলে ফেলল বাঁ পায়ের জুতোর ভিজে যাওয়া ফিতে, পা থেকে ছাড়িয়ে ফেলল সেটা। তার পর ডান পায়েরটাও।জুতো জোড়া হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল জয়দীপ, কয়েক পা এগিয়ে জলের স্রোতের ঠিক মাঝখানে বসিয়ে দিল সে দুটো। স্রোতের ধাক্কায় একটু একটু করে পিছিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ ভলকে জল এল, এক পাটি পড়ে গেল পাশের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে জলের টানে গলির অন্ধকারে হারিয়ে গেল সহচরী।  
  • জনতার খেরোর খাতা...
    সংবৃতি  - Srimallar | ১ধর্ম কী? সে বিষয়ে জানার কোনও উত্তেজনানেই আমার। আমি শুধু জানি, ধর্ষকের ধর্ম ধর্ষণ করা। মায়ের ধর্ম কোলের শিশুকে বুকের দুধ দেওয়া আর প্রেমের ধর্ম, ছাপোষা নাগরিক হ’য়ে গোলাপ কিনে নেওয়া অফিস থেকে ফেরার পথে। এই তো। এইটুকুই। এর বেশি ধর্ম সম্পর্কে আমার কোনও উত্তেজনা নেই। নেই কোনও আন্তরিকবন্ধন।২আমি শুনেছি, শুনে এসেছি যে, শত্রুদের কোনও স্বর্গ নেই। নরকও নেই। শুনেছি এমন। শুনে এসেছি। কোথায় শুনেছি, কখন শুনেছি, কবে শুনেছি— সেসব জানি না। যে আমার এই লেখাটা পড়ছ, পড়তে চলেছ, সে হয়তো আমার বন্ধু। হয়তো শত্রু।  শুধু জেনো, নিজের কাছে আমি কখনও নিজের বন্ধু নই। নই শত্রুও। কে আমাকে কীভাবে দেখছে, সেটা বড়কথা নয়। বড়কথা হচ্ছে, নিজের সঙ্গে যে ভাষায় কথা বলি, আমি তার ব্যাকরণ জানি কিনা... 
    কালবেলার রৌদ্রছায়া - ২৭ - Anjan Banerjee | ( ২৭ ) স্বরাজ গোস্বামী সাতানব্বইয়ে পড়লেন। বয়সের তুলনায় শরীরের যন্ত্রপাতি বেশ ভালই আছে। একটাও অসংলগ্ন কথা বলেন না। কানে একটু কম শোনেন এখন, এইটুকুই। এটা ছাড়া তিনি যথেষ্ট সক্ষম আছেন। অতি বৃদ্ধদের মতো আবোল তাবোল বকা তার ধাতে নেই। তিনি তারকবাবুর বাবা। গড়ন ধরন, ধ্যান ধারণা, বিশ্বাস মূল্যবোধ সবদিক দিয়েই বাবা আর ছেলেতে আকাশ পাতাল ফারাক। স্বরাজবাবু কমিউনিস্ট টমিউনিস্ট নন, স্বাধীনতা আন্দোলনও করেননি। কিন্তু তিনি সাম্যবাদে বিশ্বাস করেন, যদিও তিনি জানেন সাম্যবাদ ধারণাটা বেশ ঘোলাটে। এ বিশ্বপ্রকৃতিতে সাম্যবাদ বলে কোন বস্তুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। সে মহাজাগতিক সাম্যই হোক কিংবা প্রাণীজগতের জাগতিক সাম্যই হোক। তিনি সেই যৌবনকাল থেকে অনেকের মুখে শুনছেন, লেনিন নাকি মোটেই সুবিধের লোক ছিলেন না। অপছন্দের অনেককে খুন করিয়ে দিতেন তার পোষা লোকজন দিয়ে। তা'লে আর হিটলার কিংবা মুসোলিনির সঙ্গে তার তফাৎ কী রইল ? কে জানে কী রইল, তা'বলে ধর্মতলায় লেনিনের মূর্তি ভাঙাটা তো ঠিক কাজ না। একদল লোক তাকে সামনে রেখে একটা আদর্শ নিয়ে চলছে হয়ত। যারা ভাঙছে তারা কি জেনে বুঝে এসেছে যে লেনিন ঠিক কেমন লোক ছিলেন। যেমন, যারা শ্রীরামচন্দ্রের নামে জয়ধ্বনি দেয় তারা কি জানে রামচন্দ্র ঠিক কেমন ছিলেন। তার সব কাজই সমর্থনযোগ্য ছিল কিনা। স্বরাজবাবু এখনও পড়াশোনার মধ্যেই থাকেন। কোথায় যেন পড়েছিলেন মনে নেই। কিন্তু কথাগুলো এখনও মনে আছে..... .... Empowerment of the powerless in a state by provoking to abhor the powerful men by exploiting their mediocre IQ is known as communism . তারপরই আছে.... ..... But the stark paradox is that the most powerfuls are so often the most corrupt politicians in a landmass. So what is the worthwhile solution ? স্বরাজবাবু তার পঁচিশ বছর বয়স থেকে সাম্যবাদী ভাবধারার দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। তবে কখনও কোন খাতায় নাম লেখাননি, মানে কোন দলের সদস্য হননি কখনও। সারা ভারত তখন ভেসে যাচ্ছে স্বাধীনতা সংগ্রামের জোয়ারে। সে যাই হোক, তার ছেলে তারকনাথ গোস্বামী কিন্তু অন্য পথের পথিক, যদিও বাবার ওপর তার খাঁটি ও নির্ভেজাল শ্রদ্ধা আছে। সে ব্যক্তিগতভাবে কোন জটিল এবং বহুমাত্রিক ভাবধারার বাহক নয়। তার চিন্তাধারা সরলরৈখিক। খুব সহজ সরল চিন্তাধারা, এ দুনিয়ায় টাকা ছাড়া কিছু হয় না, তা সে যে উপায়েই হোক না। তার সঙ্গে ক্ষমতা হলে আরও ভাল। সোমনাথকে আর একজনকে সঙ্গে করে ঘরে ঢুকতে দেখে তারকবাবু বললেন, ' এই রে... এই সময় এলে। টাইম খুব শর্ট। ছ'টা থেকে মিটিং আছে। বেশি টাইম দিতে পারব না... যা বলার শর্টে বল... ' সোমনাথ বসে পড়ল একটা চেয়ারে। তার দেখাদেখি একটু কুন্ঠিত ভঙ্গীতে অতীশও তার পাশের চেয়ারে বসল। অতীশকে দেখিয়ে সোমনাথ বলল, ' একে নিয়ে এলাম আপনার কাছে... আমার অনেকদিনের বন্ধু... '----- ' অ... কী ব্যাপার ? 'বলে একটা ব্যাগের ভিতর হাত ঢুকিয়ে কী একটা কাগজ খুঁজতে লাগলেন। অস্ফুটে বললেন, ' এখানেই তো ছিল... কোথায় যে কী রাখি... যাক পরে দেখব'খন... হ্যাঁ বল... '----- ' তারকদা এর একটা ইনকামের রাস্তা দরকার... একটা সলিড কিছু আর কী ... 'তারক গোস্বামী একবার অতীশের দিকে, একবার সোমনাথের দিকে তাকালেন তারপর ব্যাগটা গুটিয়ে কোলের ওপর রেখে বললেন, ' এখন কী করা হয় ? ' অতীশ বিনীত মুখে বলল, ' বিজনেস... ওই একটা ছোট দোকান আছে ... ' তারকবাবু আবার একবার এর দিকে একবার ওর দিকে তাকিয়ে বললেন, ' অ... তা কী করতে চাইছ ? 'এবার সোমনাথ হাল ধরল। ----- ' না, মানে একটা দেবস্থান যদি দাঁড় করানো যায়... 'তারকবাবু সোমনাথের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন প্রায় দশ সেকেন্ড। অনেক না বলা কথা, অনেক প্রশ্ন, অনেক সংশয় মেশানো নীরব দৃষ্টি। অবশেষে বললেন, ' কোথায় এখন ? ' অতীশ আনাড়ির মতো তাকিয়ে রইল, সোমনাথ কিন্তু গোঁসাই মশাইয়ের কথাটা ঠিক ধরে নিল। বলল, ' না... কোথাও নেই ঠিক। একদম সাদা লোক। তবে আপনি যদি বলেন... ' ----- ' এই তো মুশ্কিল। সাদার কোন দাম নেই এখন। ভ্যালুলেস। রঙ ছাড়া এখন কিছু হয় না ... যা হোক একটা। পরে দরকার মতো এদিক ওদিক করে নিলে হবে... ' ---- ' হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি। আপনি একটু গাইড করুন না ... ' সোমনাথ এগোতে থাকে। ----- ' জায়গা আছে ? '----- ' না... সেটাই তো প্রবলেম। সেই জন্যই আপনার কাছে আসা। একটু যদি দেখে দেন। আমিও পার্টনার হব ঠিক করেছি। কিছুটা পাবলিক সার্ভিসও তো হবে। যদি কিছু মনে না করেন জিনিসটা জমে গেলে আপনারও পারসেন্টেজ থাকবে...' তারকবাবু হাঁটুতে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন,' না, সে ঠিক আছে... সেটা কোন ব্যাপার না... '--- ' সোর্স থেকে খবর পাই অনেকেই লাইনে আছে। ঠিকমতো লাগাতে পারলে হেবি প্রফিটেবল বিজনেস, দেখছি তো ... ' সোমনাথ আর্জি পেশ করতে থাকে। অতীশ চুপচাপ বসে থাকে। মুখ খুলতে ভরসা করে না, পাছে আলগা কিছু বলে ফেলে। সে বুঝতে পেরেছে এসব জায়গা আঁটোসাটো কথাবার্তার জায়গা। দু একটা আনাড়ি এবং আলগা কথায় পাকা ঘুঁটি কেঁচে যেতে পারে। সোমনাথ সাত ঘাটের জল খাওয়া লোক। তারকবাবুর মতো লোক সামলানোর অভিজ্ঞতা তার আছে। সে যাই হোক, তারক গোস্বামী মশাই কিন্তু এত মসৃনভাবে লাইনে আসতে চাইছেন না। খালি পিছলে বেরিয়ে গিয়ে অন্য লাইনে চলে যাচ্ছেন। হাঁটুতে হাত বোলাতে বোলাতে মেঝের দিকে তাকিয়ে মিনিট খানেক ভেবে নিয়ে বললেন, ' দেখ, এক্ষুণি কিছু করতে যেও না। এরা তো সবে পাওয়ারে এসেছে। একটু মেপে নিতে হবে কিছুদিন ... ' ----- ' আপনি তো এ পার্টিতে এলেন শুনলাম ... জানা নেই? ------ ' জানা থাকলেও জল মাপতে হয়, সময়টা পাকতে দিতে হয় ... যারা হুট করে কিছু করে তারা দুটো নৌকোর ফাঁকে পড়ে যায়... মানে তলিয়ে যায় অতলে। ... আমার সঙ্গে ঘোর কিছুদিন, সব বুঝতে পারবে। এস না...কাজের অভাব হবে না, কতরকম লাইন আছে। খাওয়া পরার অভাব থাকবে না। আরে... ওসব আশ্রম মন্দির তো রইলই ... ঠিক সময়ে সিগন্যাল দেব আমি... ' অতীশের মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ' ওই রঙের ব্যাপারটা কী বলছিলেন ... 'তারকবাবু কিন্তু বিরক্ত হলেন না। বললেন, ' হ্যাঁ, ওইটাই, আদতে ওই জায়গাটাই আসল... খুব স্লিপারি। ঠিক আছে, ক'টা দিন ওয়েট কর... 'সোমনাথের দিকে তাকিয়ে বললেন, ' ফোন কোর ফোন কোর ... ' বাইরে বেরিয়ে সোমনাথ অতীশকে বলল, ' হয়ে যাবে... চিন্তা কর না। ওই পারসেন্টেজের টোপটা খেয়েছে মনে হয়। দেখি কোথায় জায়গা দেয়... '---- ' হাবভাব ঠিক ক্লিয়ার হল না... ' অতীশ বলে হাঁটতে হাঁটতে। ----- ' হ্যাঃ হ্যাঃ হ্যাঃ... তা যা বলেছ। শ্যাওলা ধরা পিছল উঠোন ... এদের ক্লিয়ার কখনই পাবে না। কিন্তু এদেরকে ভাঙিয়েই আমাদের খেতে হবে। অত বাছবিচার করতে গেলে যেখানে আছ সেখানেই পড়ে থাকবে, বুঝলে তো। কী বাপের কী ছেলে... হ্যাঃ হ্যাঃ... কোথায় স্বরাজ আর কোথা তারক...' ( ক্রমশ ) *****----******-***--- *************************
    যে কথা না-বললেই নয় : ৬  - অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায় | ২১ শে জুলাই কার? তিন পক্ষের দড়ি টানাটানি। বির্তকের কোনো অবকাশ নেই, ২১ শে জুলাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। কারণ ওই আন্দোলনটা মমতা বন্দোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে হয়েছিল, সচিত্র ভোটার কার্ডের দাবিতে। খুব জোর কংগ্রেস ২১ শে জুলাই পালন করতে পারে। কারণ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওই সময় কংগ্রেসের যুবনেত্রী ছিলেন। ঋতব্রতরা কোন্ অধিকারে ২১ শে জুলাই পালন করতে পারে? ঋতব্রতের দল সিপিএম তথা বামফ্রন্ট সরকারের পুলিশই তো তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর নির্দেশে ওইদিন ১৩ জন যুবককে গুলি করে হত্যা করেছিল। ২১ জুলাই বলতে সাধারণত পশ্চিমবঙ্গে পালিত তৃণমূল কংগ্রেসের ঐতিহাসিক 'শহিদ দিবস' বা সাধারণ অর্থে ২১শে জুলাই তারিখটিকে বোঝায়। ১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে যুব কংগ্রেসের সচিবালয় (রাইটার্স বিল্ডিংস) অভিযান চলাকালীন পুলিশের গুলিতে ১৩ জন কর্মী শহিদ হন। এই ১৩ জন শহিদ হলেন -- (১) রতন মণ্ডল, (২) কাজি মহম্মদ মইনউদ্দিন, (৩) সুরেশ বৈদ‍্য, (৪) দিলীপ দাস, (৫) অসীম দাস, (৬) বিদ্যুৎ মণ্ডল, (৭) কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, (৮) ইনামুল হক, (৯) রঞ্জিত দাস, (১০) প্রদীপ কর, (১১) শেখ বাবুল, (১২) বিশ্বনাথ রায়, (১৩) পরিতোষ দাস। ১৯৯৪ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে তৃণমূল কংগ্রেসই ২১ জুলাই শহিদ দিবস হিসাবে পালন করে আসছে। এই ২১ শে জুলাইকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলের রাজনৈতিক মঞ্চ হিসাবেই ব্যবহার করে আসছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। আশা করছি এ বছরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনো না কোনো রাজনৈতিক বার্তা দেবেন। বাংলা মানুষ মুখিয়ে আছে সেই বার্তা শোনার জন্য। তৃণমূল কংগ্রেসের পরবর্তী কর্মসূচী কী হবে, সেটাও জানাবেন।  ২১ শে জুলাই প্রমাণ হয়ে যাবে পশ্চিমবঙ্গের প্রধান বিরোধী শক্তি কারা? কালীঘাটের মমতা তৃণমূল না বালিশ চাটা ঋতব্রত তৃণমূল। অপেক্ষায় আছি।
  • ভাট...
    commentতরমুজ | আমি ভাবছি দেশে যখন এক বিপরীতমূখী হাওয়া চলছে। তখন প.ব. তে চাড্ডির সংখ্যা এত বাড়ছে কেন? আশে পাশের আবহাওয়া একটু গায়ে লাগার ফলে বুঝতে পারলাম। বেসরকারি স্কুল কলেজগুলোতে ট্রেনিং হচ্ছে।
    commentতরমুজ | //আইনস্টাইন, হেগেল কান্ট, মার্ক্স, ব্রেখট সবাই পুঁজিবাদী সমাজে জন্মেছেন। নীলস বোর, ওপেনহাইমার এবং আজকের পদার্থ বিদ্যা, রসায়ন ও চিকিৎসাবিদ্যার যত কিছু যুগান্তকারী আবিষ্কার সব পুঁজিবাদী সমাজেই হয়েছে।//
     
    পুঁজিবাদ আছে বলেই সাম্যবাদের প্রয়োজন আছে। না হলে শুধু দ্বান্দ্বিক বস্তু বাদেই কাজ চলে যেত। সাম্যবাদের প্রয়োজন হোত না। আর কিছু ব্যতিক্রমি ব্যক্তিত্বকে বাদ দিয়ে। পৃথিবীতে কোন আবিষ্কার যুগান্তকারী মনে হয়? এত সব আবিষ্কার যদি যুগান্তকারীই হত, তাহলে এত দুঃখ দারিদ্র পৃথিবীতে থাকত না। বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার যুগান্তকারী মনে হয়। কারন ঐ আবিষ্কারের থেকে উন্নততর আবিষ্কার ঐ সময়ে উপস্থিত থাকে না। যেমন সাম্যবাদের আলোতেই পুঁজিবাদকে কলঙ্কিত মনে হয়। সাম্যবাদী ধ্যান ধারনা না থাকলে। পুঁজিবাদ হেব্বি শাইনিং। সেই শাইনিং আলোর পিছনে হয়ত বেশিরভাগ মানুষ অনাহারে আছে। কারন ঐ সময় দ্বিতীয় কোনো অপশন থাকে না। তাই সামনে যা থাকে সেটাকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করা হয়। ..... যে ব্যবস্থা তার নাগরিকের 0.5% কেও গবেষণার কাজে লাগাতে পারে না। সেটা অন্তত কোনো বিজ্ঞান মনস্ক সমাজ হতে পারে না। 0.5% কেন? তার ধারে কাছেও নেই। আমার হিসাবে পুঁজিবাদী সমাজেই নুন্যতম 1% নাগরিককে গবেষণার কাজে লাগাতে হবে। আর সমাজতন্ত্রে 3% এবং সাম্যবাদী সমাজে 10%।
    commentবিশ্বগরু | Ransomware group World Leaks has posted on the dark web a huge cache of files related to India's largest nuclear plant, including purported blueprints of parts of its ​facilities and supplier details — information it labelled as coming from Reliance Group.
     
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত