এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    নজরুল ও তাঁর শ্যামা মা - অনুরাধা কুন্ডা | অলংকরণ: রমিত লীলা মজুমদারের অহি দিদির গল্পে আছে যখনই রান্না করতে বসতেন ন দশটা কচি কচি ছেলে মেয়ে তাকে এসে ঘিরে ধরে বসত। অহি দিদি নানা রকম খাবার করে তাদের খাওয়াতেন কিন্তু তারা কেউ কথা বলত না। গল্পের শেষে গিয়ে জানা গেল যে এই বাচ্চারা এখনকার বাচ্চা নয়। তারা ১০০ বছর আগের বাচ্চা যাদের এক দুষ্টু লোক জিভ কেটে দিয়েছিল খাওয়ার সময় তারা ভারী গন্ডগোল করতে বলে। লীলা মজুমদারের গল্প অথচ এই ভারী নিষ্ঠুর কাহিনীটি গল্পের মূল জায়গাতে রয়েছে। কেন জিভ কেটে দিয়েছিল তারা দুষ্টু বাচ্চা বলে না অন্য জাতের বাচ্চা বলে? লিলু পিসি সেসব কথা বলে যাননি কিন্তু আমরা এখন যে সময় বাস করি সেই সময় বসে এটা মনে হতেই পারে যে বাচ্চাগুলো বোধহয় অন্য জাতের ছিল। তাই তাদের কল কল করা জিভ, কেটে দিয়ে তাদের কচি মুখের সব কথা বন্ধ করে দিতে দুষ্টু লোকদের কোন অসুবিধা হয়নি। যে সময় আমরা বাস করি সেই সময় দলিত হবার অপরাধে মানুষ পিটিয়ে হত্যা করা, উঁচু জাত আর নিচু জাতের কলহ জনিত সংঘাতে জেরবার সমাজ বড় দূষিত হয়ে আছে। আর তাই এই সময় দাঁড়িয়ে, "জাতের নামে বজ্জাতি সব" বলে ওঠা, সমস্বরে বলে ওঠা, চিৎকার করে বলে ওঠা দরকার। সেই চিৎকার, সেই দ্রোহ সেই বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম যিনি লেটোর দলে নাম লিখিয়ে নাটক লিখেছিলেন, লিখতে শিখেছিলেন গান, যার ধর্ম ছিল প্রকৃত অর্থেই মানবিকতা। ইদানিংকালে ভাইরাল হয়ে যাওয়া ভিডিও গুলোর মধ্যে দেখা যাচ্ছে ঘরে ঘরে ঢুকে কিছু মানুষ প্রশ্ন করছেন আপনার বাড়িতে তুলসী গাছ আছে? তাতে জল দেওয়া হয়নি নিয়মিত? আপনার বাড়িতে ঠাকুর ঘর আছে? আপনি পুজো করেন? তারা মানুষের ঘরের ভিতরে ঢুকে যাচ্ছেন ঠাকুরঘর দেখবার জন্য এবং রীতিমতো শাসন করছেন যে দেবতার পূজা ভালোভাবে বাড়িতে হচ্ছে না। ২০২৬ সালে বসে আমাদের দেখতে হচ্ছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তারা বলছেন যে সনাতনপন্থী হয়ে তারা কোনরকম অনাচার সহ্য করবেন না এবং হিন্দুর সঙ্গে মুসলমানের বিবাহ তারা লাভ জিহাদ বলে ঘোষণা করছেন। যে দেশে কাজী নজরুল ইসলাম শ্যামা সংগীত লিখেছেন, লিখেছেন কৃষ্ণ ভজন আর লিখেছেন "বলো বীর বলো উন্নত মম শির", সেই দেশের বীর পুঙ্গবরা গৃহস্থ বাড়ি বাড়ি গিয়ে জাত রক্ষার জন্য শাসানি-ধমকানি দিচ্ছেন। মৌলবাদ যখন সভ্যতাকে গিলে খাওয়ার জন্য অজগরের মতন হাঁ করে রয়েছে, তখন এ কথা মনে করা আবশ্যক কাজী নজরুল ইসলাম প্রায় ১০০ টি শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন। সেই সমস্ত শ্যামা সংগীত নিয়ে "রাঙা জবা" নামে একটি আলাদা গানের গ্রন্থ রয়েছে। অধুনা উগ্র মৌলবাদের পাল্লায় পড়লে তাঁকে হয়তো প্রবল হেনস্থা হতে হত জাতে মুসলমান হয়ে শ্যামা সংগীত লিখে ফেলার জন্য। নজরুলের শ্যামা সঙ্গীতে আশ্চর্য ভক্তিভাব। কালো মেয়ের পায়ের তলায় দেখে যা আলোর নাচন, কথায় আর সুরে বাঙালির মন প্রাণ শীতল করেছে। কোন বাঙালি না "শ্যামা নামের লাগল আগুন "শুনে আপ্লুত হয়েছেন! অসাম্প্রদায়িকতার অপর নাম কাজী নজরুল ইসলাম। পুত্র বুলবুলের মৃত্যুতে তিনি শোকাহত। কি করে শান্ত করবেন নিজেকে দিশা পাচ্ছেন না। আবেগ উথলে ওঠে, নজরুল দিশাহারা হন বারবার আর সেই শোক পারাবার পার হওয়ার জন্য আকুল হয়ে ওঠেন। সান্নিধ্যে এলেন বরদাচরণ মজুমদারের। যোগী বরদাচরণ মজুমদার নজরুলকে শাক্ত সাধনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। পুত্র শোকে ক্লান্ত নজরুলের মন কোথাও যেন একটি অবলম্বন খুঁজে পেল। ভয়ংকরী নয়, ধ্বংসকারিনী নয়, কাল রুপিনী নয়। কালিকা মূর্তির মধ্যে নজরুল খুঁজে পেলেন মাতৃমূর্তি। ঠিক যেমন রামপ্রসাদের গান। যেমন কমলাকান্তের শ্যামা সংগীত। দেবী সেখানে দেবী নন। তিনি জননী রুপা। মানুষ যখন মনের মধ্যে হাহাকার করে, তখন অবলম্বন হিসেবে সে বোধহয় মাকে খুঁজে বেড়ায়। বাঙালি হৃদয়ে মাতৃমুর্তির স্থান বড় অপরূপ। সে কখনো মা, কখনো মেয়ে। মা ডাকের মধ্যে লুকিয়ে থাকে কন্যা। কন্যাকে মা বলে ডেকে শান্ত হয় মন। বাঙালির এই চিরকালীন আকুতি কে যে নজরুল রাগ প্রধানের সুরে বেঁধে ফেললেন, তাকে হিন্দু বা মুসলমান বলে আখ্যা দিয়ে, তার মেধা মনন আর হৃদয়ের বিশালত্বের পরিমাপ করবে কে?বুলবুল অকালে মৃত। কবি লিখেছেন "শূন্য এ বুকে পাখি মোর ফিরে আয়।" কিন্তু তার শূন্যতা তাতে পূর্ণ হয়নি। পুত্র শোকে আকুল পিতৃ হৃদয় শান্ত হয়েছে শাক্তসাধনার খোঁজ পেয়ে। একইসঙ্গে ইসলামী গান লেখা এবং শাক্ত সাধনার গান লেখা, এ বড় কঠিন কাজ। দুর্লভ প্রতিভার অধিকারী কাজী নজরুল ইসলাম এই অসম্ভব কঠিন কাজ সম্ভব করেছিলেন দরদিয়া মননে। ইসলামী গান যখন লিখেছেন তখন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে" গানে যে আকুতি, সেই একই আকুতি ফুটে উঠেছে যখন এসে শ্যামা সঙ্গীতে লিখেছেন "স্থির হয়ে তুই বোস দেখি মা"। হিন্দু না "ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন, কান্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা'র"। এই অসম্ভব সাহসী উক্তি যাঁর কাব্য ভাষা, তিনি যে একাধারে ইসলামিক গান এবং হিন্দু ভক্তি গীতি রচনা করে সুর পিপাসু বাঙালির মন মাতিয়ে দেবেন তাতে সন্দেহ কিসের! কিন্তু শুধু মন মাতলে তো হবে না।মন শান্ত হবে কীসে। একদিকে স্ত্রী প্রমীলার অসুস্থতা, অন্যদিকে পুত্রশোক। কবি স্থিতধী হতে চাইছেন।তাই কী দেবী কালিকাকে মাতৃরূপে দেখেছেন? আর ঐ ব্যক্তিগত শোক উপশমের জায়গা থেকে উপনীত হয়েছেন মহাকালের কোলে মহাকালীর বন্দনায়? শোকে,প্রবল সন্তাপে মানুষ মাতৃক্রোড় খোঁজে।একমাত্র মা পারেন শোকের ক্ষতে স্নেহের মলমটি লাগাতে। নজরুল তাই কালীর শক্তিময়ী রূপ আর স্নেহময়ী মাতৃরূপকে আরাধনা করেছেন অনির্বচনীয় আকুতিতে...শ্যামা নামের লাগল আগুন আমার দেহ ধূপকাঠিতে,যতো জ্বালাই সুবাস ততো,ছড়িয়ে পড়ে চারিভিতে..। ব্যক্তিজীবনের শোকে যে দেহ, মন পুড়ছে,তাকে তিনি সমর্পণ করেছেন মায়ের পায়ে। আগুনে পুড়ে শুদ্ধ হচ্ছে দেহ মন...ভক্তি আমার ধূমের মতো,উর্দ্ধে উঠে অবিরত..এই আকুতি তো একেবারে ঘরোয়া গৃহস্থ আজন্ম স্নেহের কাঙাল বাঙালি হৃদয়ের আর্তি। রবি ঠাকুর বলেছেন..আমার এ ধূপ না জ্বালালে,গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে।তাঁর নিঠুরকে সাধারণ মানুষ ততোটা বোঝে না,যতোটা বোঝে নজরুলের কালিকাকে। অ্যাবস্ট্র্যাক্ট নয়। কনক্রিট। মানুষ মূর্তি বোঝে। রবীন্দ্রনাথের নিঠুর তাই অনেকটা দূরের। মা বড় কাছের। তাঁর আরাধনায় অন্তরলোক স্নিগ্ধ, শান্ত হয়, আর পুত্রশোকাহত পিতা অপেক্ষা করেন, কবে তাঁর দেহ ভস্ম হবে..সেই ভস্মে আঁকা হবে মায়ের কপালের তিলক। নিজেকে নিবেদন করার এই আকুলতা, এমন ভক্তি, নিজেকে নিঃশেষ করা নিবেদন, এমন শ্যামা সংগীত কজন লিখতে পেরেছেন? ২০২৬ সালে এসেও আমরা হিন্দু মুসলমানের উর্ধ্বে উঠতে পারলাম না। এখনো আমাদের আলোচ্য বিষয় ওরা হিন্দু না, ওরা মুসলমান? তবে নজরুল কেমন করে লিখলেন এমন গান? কোন অপার সাধনায়, গভীর মেধায় এবং অনন্য ভক্তিতে লিখলেন "মহাকালের কোলে বসে গৌরী হল মহাকালী।"বিশেষ করে এই গানটিতে কালীর যে রূপ নজরুল বর্ণনা করেছেন সেটি আমাদের বিস্মিত করে। দেবী কালিকাকে মূর্তি থেকে বিচ্ছিন্ন করে এই সৌরজগতের এক প্রকাণ্ড অংশ হিসেবে ভাবা, কল্পনার কি বিস্ময়কর প্রকাশ। "তবু মায়ের রূপ কি হারায়, সে যে ছড়িয়ে আছে চন্দ্র তারায় মায়ের রূপের আরতি হয় নিত্য সূর্য প্রদীপ জ্বালি"।এই শ্যামা সংগীতটিতে কিন্তু নজরুল কংক্রিট থেকে একেবারে অ্যাবস্ট্রাক্ট এর দিকে চলে গেছেন এবং সেটিও চূড়ান্ত অ্যাবস্ট্র্যাক্ট। অপরিসীম ক্ষমতা বলে একজন কবি এই কল্পনা করতে পারেন। মহাকালীর যে কৃষ্ণবর্ণ রূপ সেটি তিনি প্রত্যক্ষ করছেন রাত্রির গভীর কালো আকাশের মধ্যে। চন্দ্র তারার গহনা পরা মাতৃ মূর্তি। মহাকাল এবং মহাকালী, উভয়কে এই সৌরজগতের অংশ হিসেবে কল্পনা করে, কালের এবং কালীর সম্পর্কের এক অপূর্ব ব্যাখ্যা দিয়েছেন কবি নজরুল ইসলাম। আবে সেই একই সঙ্গে বজায় রেখেছেন কালির ঘরোয়া অন্য একটি রূপ। "উমা হলো ভৈরবী হয় ভৈরবেরে বরণ করে" হেরি শিবের সিরে জাহন্নবীরে শ্মশানে মশানে ঘোরে।" দুর্গা হোমা এবং কালি যে একই মহাশক্তির বিভিন্ন রূপ তা এই ছোট্ট গানটির মধ্যে দিয়ে অপূর্ব ভাবে প্রকাশিত। অন্ন দিয়ে ত্রি জগতে অন্অনদা মোর বেড়ায় কেঁদে ভিক্ষু শিবের অনুরাগে ভিক্ষা মাগে রাজ দুলারি। একটি গানের মধ্যে মহাশক্তির এমন বিবিধ প্রকাশ আর কোন ভক্তিগীতিতে আছে? মুহূর্তে কালিকা হয়ে গেলেন ঘরের মেয়ে উমা, শিবের প্রেমে মাতোয়ারা উমা তিন ভুবনে অন্ন জুগিয়ে বেড়ান আর তার নিজের সংসারে কিনা অন্নেরর অভাব! অভাবে বাংলার দরিদ্র মানুষ নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষ মধ্যবিত্ত মানুষ এই অন্নাভাব বড় ভালো বোঝে। তাই যে দেবী কালিকাকে তারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের মধ্যে প্রত্যক্ষ করতে পারেনা, তাকে দেখে ফেলে ওই ছোট্ট উমার মধ্যে। শিবের ঘরনী হয়ে তার যে গৃহিনীপণা, নজরুলের গানে তার বিশ্বস্ত প্রকাশ। তাই মায়ের কাছে নালিশ জানাচ্ছেন সন্তান। "আমার যারা দেয় মা ব্যথা আমায় জারা আঘাত করে তোরই ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী"। কোথায় যেন কানে বাজে "সকলি তোমারি ইচ্ছা"। কিন্তু নজরুল নিজস্বভাবে স্পষ্ট। "আমার যারা ভালোবাসে বন্ধু বলে বক্ষে ধরে তোরই ইচ্ছা ইচ্ছাময়ী আমায় অপমান করে যে মাগো তোরই ইচ্ছা সে যে।" জীবনের বিভিন্ন ওঠা পড়া কি নজরুলকে এইভাবে ভাবতে শিখিয়েছিল?" আমায় যারা যায় মা ত্যেজে যারা আমার আসে ঘরে তোর ইচ্ছায় ইচ্ছাময়ী।" ভক্তি ভাবে পরিপূর্ণ, স্ফটিকের মত টলটলে স্বচ্ছ নিবেদন। ব্যথিত শোকাতুর সন্তান যেন নালিশ করছে মা-কে। একমাত্র মা-ই পারেন তার আহত, অপমানিত হৃদয়টিকে শান্ত করতে। একমাত্র বাঙালি ঘরেই দেবীকে মা এবং মেয়ে, এই দুইভাবে আরাধনা করা হয়। নজরুল তাই লিখতে পারেন "আমার ক্ষতি করতে পারে অন্য লোকের সাধ্য কিনা, দুঃখ যা পাই তোরই সে দান মাগো সবই তোর মহিমা।" এ গান যেন স্বগতোক্তি। সমস্ত দুঃখের স্থলনে এই গানের মধ্যে দিয়ে। সুরে, ভাবে, মননে, কোথাও এতোটুকু ঘাটতি নেই "তাই পায়ে কেহ দলে যবে, হেসে সয়ে যাই নীরবে।" সমর্পণের এই দর্শন সাধনার মূল কথা। তাই এই অপূর্ব ভাব সাধনার আরেক প্রকাশ আমরা দেখি "বলরে জবা বল, কোন সাধনায় পেলি শ্যামা মায়ের চরণ তল" গানে।কবি বলছেন, "মায়াতরুর বাঁধন টুটে মায়ের পায়ে পড়লি লুটে, মুক্তি পেলি উঠলি ফুটে আনন্দ বিহ্বল, তোর সাধনা আমায় শেখা জীবন হোক সফল।"এ যেন ইংরেজ কবি জন কিটসের negative capability আহরণ করার সাধনা।"কবে তোরই মতো রাঙবে রে মোর মলিন চিত্ত দল"সম্পূর্ণ নিজের সত্তা বিসর্জন দিয়ে, ফুলের মতো নির্বিকারত্ব প্রাপ্তি। মাতৃ সাধনার মূল মন্ত্র। এই ভক্তির কোন জাত নেই। যে ভক্তি নিয়ে তিনি দেবী কালিকাকে মহাবিশ্বের মহাকালী রূপে দেখেন সেই একই ভক্তি নিয়ে তিনি লেখেন "তোরা দেখে যা আমিনা মায়ের কোলে, মধু পূর্ণিমারই সেথা চাঁদ দোলে যেন উষার কোলে রাঙা রবি দোলে।"এই ভক্তি ভাবে কোনো কৃত্রিমতা নেই, কোন হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব নেই এবং জাত পাতের কোন প্রশ্নই নেই কারণ সন্তান আর মায়ের সম্পর্কের মধ্যে জাত আসেনা। এই সেই কাজী নজরুল যিনি লিখেছেন "বল বীর বল উন্নত মম শির", লিখেছেন "আমি বিদ্রোহী ভৃগু ভগবান বুকে এঁকে দিই পদচিহ্ন।" লিখেছেন "আমি টর্পেডো আমি ভীম ভাসমান মাইন।" সেই তিনি আবার পরম ভক্তি ভরে মায়ের সঙ্গে সন্তান সম্পর্ক স্থাপন করে জানিয়েছেন তাঁর সমস্ত সুখ,তাঁর বেদনা তাঁর অভিমান তার অপমান। গানের মধ্যে দেবীর সঙ্গে পূজারীর, মায়ের সঙ্গে সন্তানের যে বিভিন্ন রকম সম্পর্ক উঠে আসে তা কিন্তু বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য। কখনো মা, কখনো রাঙা জবার বায়না ধরে কাঁদা কালো মেয়ে...আবার সেই তারার মালা চুলে গাঁথা এলোকেশী কন্যা। মুহূর্তে রূপান্তর। ঘরোয়া ক্রন্দনরত মেয়েটি নিমেষে সৌরজগতের মহাশক্তির প্রকাশ হয়ে ওঠে...তার যুগল আঁখি সূর্য চাঁদ। অনুরাগের রাঙা জবা থাকুক তাঁর মনের বনে,কালো মেয়ের রাগ ভাঙাতে তিনি ফুলের খোঁজে ঘোরেন...রাঙা চরণ দেখতে পেয়ে তাঁর শান্তি। পুত্রশোক কী এইভাবে কিছুটা শান্ত হয়েছিল তাঁর?" আমার আর কোনো গুণ নেই মা তারা"। স্বীকারোক্তি অকপট। "হাত বাড়িয়ে মা তোর কোলে যাব না আর মা মা বলে...মা হয়ে তুই ঘুরে বেড়াস,আমায় ধূলায় ফেলে রেখে..তোর আর ছেলেমেয়ে অনেক আছে..আমার শুধু নাই যে কেহ।" মা বেটার সম্পর্কে অভিমান আর আদর মিশিয়ে দেন কবি। এই সম্পর্কের কোনো দেশ নেই, জাতি নেই, ধর্ম নেই, আবার বাঙালিয়ানায় মোড়া একটি মিষ্টত্ব আছে, দেবী থেকে সে মুহূর্তে হয়ে ওঠে তাঁর 'হাবা মেয়ে'।"কোনো অঙ্ক শেখাও নি তো, তোমার অঙ্ক বিনা তারা।" ভাগের অঙ্ক শেখেননি নজরুল। তাই তাঁর ভক্তি এতো শুদ্ধ। সুর এতো প্রাণবন্ত। জগতজুড়ানি শ্যামার কাছে এক মাতৃহারা,সন্তানহারা প্রাণ। মা ছেলেকে মারে ধরে, কিন্তু কাছছাড়া করে না। চিরমাতৃহারা সন্তান আশ্রয় খুঁজছে ছোট শিশুর সারল্য নিয়ে। শব্দ চয়নে কী বিস্তার। "জুড়ানো" শব্দটি একান্ত বাঙালি। তার থেকে ' জুড়ানি', একেবারে ' জগতজুড়ানি'। তাকে বিদেশী ভাষায় ব্যক্ত করা মুশকিল। নজরুলের আবেগ বড় শক্তিশালী, শবের মাঝে শিবজাগানো শ্মশানকালীতে তাঁর কাছে আনন্দের নন্দিনী। কল্পনার বিস্তারে বিস্মিত হতে হয়। মা'কে পাষাণী বলেছেন, মা যে লুকিয়ে বেড়ান লোকে লোকে। আর মা কে না পেয়ে তাঁর ব্যথা ভরা হৃদয় জবা হয়ে ফোটে। আবার সেই নেগেটিভ কেপেবিলিটি। সেই নিবেদন আর ভক্তি। লেটোর দলে গানবাঁধা নজরুল, বিপ্লবী, বিদ্রোহী, অশান্ত, আবেগমথিত নজরুলের এক অনন্যরূপ খুঁজে পাই তাঁর শ্যামাসংগীতের কথায়, ভাবে, সুরে। তিনি কতোবড় ভক্ত ছিলেন,তা প্রমাণ করার জন্যে নয়,শাক্তসাধনায় কত গভীর ছিল তাঁর জ্ঞান তাও প্রমাণ করার জন্যে নয়...জাত পাতের তফাৎ জলাঞ্জলি দিয়ে তাঁর যে অনাবিল মনখানি ছিল, সেই মনের স্পর্শ পাওয়ার জন্যে। এই তীব্র হানাহানির সঙ্কটকালে, সাম্প্রদায়িকতার বীভৎস আস্ফালনে,পেশীশক্তির আগ্রাসনের সময়ে, একবার অন্তত মনে করা, কাজি নজরুল ইসলাম গান বেঁধেছিলেন, শ্যামা মায়ের গান। তাঁর ইসলামের সঙ্গে ভক্তিগানের কোনো বিরোধ ছিল না, কোথাও রসবিচ্যুতি ঘটেনি, সুরধারায় এক ভক্তিবিপ্লব ঘটে গেছে।নজরুলের সেই প্রবল শক্তিশালী অথচ শিশুর মতো সরল মনটি আজ ভারতবর্ষে বড় দরকার। যে দেশে লাভ জিহাদের নামে মানব হত্যা হয়, দলিত জল খেতে গেলে তাকে পিটিয়ে মারা হয়, দলিত মানুষ জন্মদিনের কেক কাটলে তাকে তথাকথিত উঁচু জাতের লোক হত্যা করে আর লীলা মজুমদারের মতো লেখককে জিভ কাটা ছেলেমেয়েদের গল্প লিখতে হয়, সেই দেশে নজরুল জন্মেছিলেন, যে ভক্তিভাবে ইসলামিক সঙ্গীত লিখেছিলেন, সেই একই ভক্তিভাবে শ্যামাসঙ্গীত লিখেছিলেন…যে গান আজও মানুষকে জাতপাতের উর্ধে তুলে এক মহাজাগতিক বিশ্বাস আর শরণের সন্ধান দেয়। গান গাওয়া হয়, অনুধাবন হয় কী?
    গুরুচণ্ডা৯-র গল্পপাঠ - গুরুচণ্ডা৯ | ছবি: রমিত‘পিরোবতির নাকছাবি’ গল্পটি শক্তি দত্ত রায়ের ‘পিরোবতি ও মুড়ির টিন’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। ‘হাজবপুরের কেচ্ছা' লেখকের 'অতিনাটকীয়’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। আজকের গল্প এস এস অরুন্ধতীর লেখা 'পাপ হে '। গল্পটি লেখকের 'চাঁপা ফুলের গন্ধে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। সুনাগরিক রঞ্জন দত্তর মৃত্যুর দিন - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পটি লেখকের 'ছয়ে রিপু’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।আজকের গল্প জয়ন্তী অধিকারীর 'না হাঁচিলে যারে'। গল্পটি লেখিকার 'কুমুদির রোমহর্ষক গল্পসমূহ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।অমর মিত্রের লেখা 'কাশী মথুরা বৃন্দাবন '। গল্পটি 'আমার ভয় করছে’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।প্রতিভা সরকারের লেখা 'তালাও গ্রামের রূপকথা'। গল্পটি 'হে চিরসারথী’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে সোহিনী সেনগুপ্ত।দময়ন্তীর লেখা 'দুষ্কালের পদধ্বনি'। গল্পটি 'দুষ্কালের আখ্যানমালা’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।উপল মুখোপাধ্যায়ের লেখা 'তিলবাড়ি'। গল্পটি 'ম্যাকলাস্কিগঞ্জ’ বই থেকে নেওয়া। গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।মহারাজ মিত্রবর্মণের রাজ্যবিজয়, ঘেঁটুফুল ও ব্রহ্মকমলের গল্প, লিখেছেন রমিত চট্টোপাধ্যায়, পাঠ করেছেন অমিতাভ চক্রবর্তী।শক্তি দত্তরায়ের লেখা '৪৬ হরিগঙ্গা বসাক রোড' বই থেকে নেওয়া ক্ষীরের পুতুল। গল্পপাঠে কেকে।স্মৃতি ভদ্রর লেখা 'রসুই ঘরের রোয়াক (দ্বিতীয় খণ্ড)' বই থেকে গল্পপাঠে পায়েল চ্যাটার্জী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শেখরনাথ মুখোপাধ্যায়ের ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস 'সীমানা' বই থেকে নেওয়া একটি পর্ব, নাম - দেশের কাজ। ২৫শে বৈশাখ পার হয়ে ১১ই জ্যৈষ্ঠ্যর এই বিশেষ সময়কালে আমাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য, এই পর্বে ধরা হয়েছে সেই সময়ের দুই প্রধান ব্যক্তিত্ব নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের দেখা হওয়ার গল্প।গল্পপাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী।চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।অ্যাবনর্ম্যাল - লিখেছেন কুন্তলা বন্দ্যোপাধ্যায়। গল্পপাঠ - সোহিনী সেনগুপ্ত।ফোটোগ্রাফ - ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক, গ্রাফিক শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।কেকে-র 'ছায়ার পাখি' বই থেকে নেওয়া গল্প - জিহ্ব; পাঠ - পায়েল। চিত্রশিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।শারদা মণ্ডলের 'পাকশালার গুরুচণ্ডালি' বই থেকে, পাঠ - পায়েল। চিত্রশিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাসজ্যোতিষ্ক দত্তর লেখা ‘সে ছিল একদিন আমাদের' বই থেকে 'ইস্কুলের গল্প'। পাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।মৃণাল শতপথীর লেখা ‘দিতি ও মহারানি' বই থেকে নেওয়া গল্প - পাঠে অমিতাভ চক্রবর্তী। চিত্র শিল্পী - রমিত চট্টোপাধ্যায়, ভিডিও সম্পাদনা - সৌরভ দাস।
    আরশোলার ধর্নায় একদিন - শুভদীপ মণ্ডল | অলংকরণ: রমিত‘কোথা থেকে আসছেন?’ ‘নাম কী?’ ‘কী করা হয়?’হাসিমুখে, আলাপ জমানোর ভঙ্গিতেই একের পর এক প্রশ্নগুলো আসতে থাকলো, অবশ্যই হিন্দিতে। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জানালেন, এত লোকজনের জমায়েত হচ্ছে, নিরাপত্তার দায়িত্ব তো ওনাদের উপরেই – তাই একটু বাড়তি সতর্কতা। স্থান – দিল্লির যন্তরমন্তর-সংলগ্ন ককরোচ জনতা পার্টির ধর্না ও অনশন মঞ্চ, আর উপরোক্ত প্রশ্নকর্তা খাকি উর্দিধারী দিল্লি পুলিশ। ধর্নার জন্য নির্ধারিত জায়গাটি ডাইনে-বামে দেওয়াল আর সামনে-পিছনে পুলিশের ব্যারিকেড দিয়ে ঘেরা। পিঠের ব্যাগ স্ক্যান করিয়ে মেটাল ডিটেক্টরের মধ্যে দিয়ে হেঁটে তারপর ভিতরে ঢোকা গেল। শুধু পুলিশ নয়, সঙ্গে প্যারা-মিলিটারি ফোর্স আর র‍্যাফ মিলিয়ে আক্ষরিক অর্থেই ‘পুলিশে পুলিশে ছয়লাপ’ পুরো চত্বর [১]। শুধু পাহারা দেওয়া নয়, দিল্লি পুলিশ-নিযুক্ত ফোটোগ্রাফাররা ক্যামেরা হাতে টহল দিচ্ছেন চারিদিকে। ছোটোখাটো সমস্ত ঘটনা, জটলা, কলেজপড়ুয়াদের আলাপচারিতা, গান-বাজনা এবং প্রতিবাদীদের সমর্থনে হাজির হওয়া প্রতিটি মানুষ দিল্লি পুলিশের ক্যামেরাবন্দি হচ্ছেন। বিশেষ করে, যে স্বেচ্ছাসেবীরা প্রতিবাদকারীদের জন্য জল, খাবার, ওষুধ এসব নিয়ে আসছেন – তাঁদের রীতিমতো মুখের সামনে ক্যামেরা ধরে জেরা করা হচ্ছে। এ-ও জানা গেল, কিছু স্বেচ্ছাসেবীর বাড়িতেও হানা দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ চলেছে তাদের টাকার সোর্স জানতে। দুঃখের ব্যাপার এই, যে, এখনো অবধি জর্জ সোরোস, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ – কোনো লিঙ্কই খুঁজে পাওয়া যায়নি। জেরায় জানা গেছে, কিছু লোকজন নিজেদের গাঁটের কড়ি খরচ করেই প্রতিবাদকারীদের টিকে থাকার রসদ জুগিয়ে যাচ্ছেন। এসব গালগল্প অবশ্য দিল্লি পুলিশ কোনোভাবেই মেনে নিচ্ছে না। তদন্ত এবং নজরদারি চালু আছে চব্বিশ ঘণ্টা। আশা করা যায়, বলিউডের দেশপ্রেমী ডাইরেক্টররা দিল্লি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছেন। তাঁদের হাত ধরে সত্য নিশ্চয়ই একদিন উন্মোচন হবে এবং সেদিন কোনো মাল্টিপ্লেক্সের বড় পর্দায় পপকর্ন খেতে খেতে দেশের জনসাধারণ জানবে – কীভাবে এইসব দেশদ্রোহী বেকার ছেলেমেয়েদের দল দেশের ভিতর থেকে দেশকে টুকরো টুকরো করার ষড়যন্ত্র করেছিল আর কীভাবে দিল্লি পুলিশের ধুরন্ধররা নিজেদের মগজাস্ত্র প্রয়োগ করে সেই রহস্য ভেদ করেছিলেন। [৭ - ৮] সে যাই হোক, আগামীর আচ্ছে দিনের স্বপ্ন সাইডে সরিয়ে রেখে আপাতত ডিসেম্বর মাসের রেকর্ড-ব্রেকিং AQI আর জুন-জুলাইয়ের হিটওয়েভের দিল্লিতে ফেরা যাক। জনপথ মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে মোটামুটি পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথ। তাতেই ধর্না মঞ্চ অবধি পৌঁছানোর আগেই পুরো টি-শার্ট ঘামে জবজবে। এই আবহাওয়ায় ককরোচদের অবস্থানের সেদিন দশম দিন। পৌঁছে জানলাম – শুধু সোনম ওয়াংচুক নন, অনশনে আছেন দিল্লি, জওহরলাল নেহরু এবং এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত কিছু ছাত্রছাত্রী-সহ জনা পনেরো [৭]। প্রাথমিক দাবি – NEET পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দায় স্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ এবং আরও বৃহত্তরভাবে সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করা। সমবেত মানুষজনের কথায় আরও অনেক বিষয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভের বহিপ্রকাশ ঘটলেও, মূল দাবী ওইটুকুই। এঁদের মধ্যে কয়েকজন সোনম ওয়াংচুক আসার আগে থেকেই অনশনে রত এবং তাঁদের শারীরিক অবস্থার বেশ খানিকটা অবনতি ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। এর কোনো খবরই বাইরে বিশেষ বের হয়নি, তার কারণ – সামগ্রিকভাবে মেইনস্ট্রিম মিডিয়া প্রথম দিন থেকেই এই আন্দোলনকে বয়কট করেছে। অবশ্য ধর্না চত্বরে ক্যামেরার অভাব নেই। কিছু ইন্ডিপেন্ডেন্ট মিডিয়া হাউস ছাড়াও অনেকেই নিজেদের ইউটিউব বা ইন্সটাগ্রাম ভিডিও বানাচ্ছেন এবং শেয়ার করছেন। বড়সড় ইনফ্লুয়েন্সাররা অবশ্য অনুপস্থিত। সে নিয়েও ক্ষোভ আছে বোঝা গেল। রাস্তার ধারে অস্থায়ী টেবিল পেতে জল আর খাবার-দাবারের জোগান দিচ্ছেন উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, বিহার, দিল্লি, হরিয়ানা থেকে আগত বিভিন্ন ধর্ম আর ভাষার মানুষজন [১০]। তার পাশেই চোখে পড়ল মেডিসিন কাউন্টার। জনৈক ডাক্তার নিজেই এসেছেন First-Aid Kit, ORS, Paracetamol-সহ বিভিন্ন ওষুধের পসার নিয়ে [৯]। এক বাম ছাত্র সংগঠনের তরফ থেকে খোলা হয়েছে অস্থায়ী লাইব্রেরি। অবস্থানরত মানুষজন বই নিচ্ছেন, পড়ছেন, আবার ফেরত দিয়ে যাচ্ছেন। এই লেখা যেদিন লিখছি, তার ৩-৪ দিন আগে হঠাৎ সেই লাইব্রেরি বন্ধ করতে উদ্যোগী হয় দিল্লি পুলিশ। এ নিয়ে ধস্তাধস্তি হয় এবং ছাত্রদের তরফ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে গালাগালি ও ধমকধামক করার অভিযোগ আসে [১১]। স্বেচ্ছাসেবীদের প্রশ্নের উত্তরে দিল্লি পুলিশের তরফে জানানো হয়, লাইব্রেরি নিয়ে তাদের কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে। অবশ্য অভিযোগ ঠিক কী আর কারা সেই অভিযোগ করেছেন – সে প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া যায়নি। [৯ - ১১] সরাসরি বলপ্রয়োগ না করে, নিজেদের বিপুল সংখ্যায় উপস্থিতি, ক্যামেরার নজরদারি আর জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে আন্দোলোনকে কক্ষচ্যুত করার চেষ্টা চলছে প্রশাসনের তরফে। মাঝে মাঝে লাউডস্পিকারে ঘোষণা করে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে – এই ধর্নার সময়সীমা প্রথমদিন বেলা পাঁচটাতেই শেষ হয়ে গেছে, তাই সবাই যেন স্ব-স্ব-গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। এছাড়াও গত রবিবার (৫ই জুন) একসঙ্গে আরও পাঁচটি সংগঠনকে ওই একই জায়গায় অন্যান্য ইস্যুতে প্রতিবাদ জানানোর ছাড়পত্র দেওয়া হয়, খুব সম্ভবত একটা গোলমাল পাকানোর উদ্দেশ্য নিয়ে, যাতে একটা অজুহাত খাড়া করে অবশেষে ককরোচদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করা যায়। আমার ব্যক্তিগত ধারণা – সোনম ওয়াংচুক এসে পড়ায় পরিস্থিতি একটু জটিল হয়ে গেছে, নাহলে এত ছলাকলার আশ্রয় না নিয়ে, সরাসরি বলপ্রয়োগ করে এই আন্দোলন হয়তো আরও আগেই থামিয়ে দেওয়া হত। প্রশাসন মোটের উপর নিষ্ক্রিয় থাকলেও উনিজির ভক্তকূল কিন্ত বসে নেই। প্রথমদিন থেকেই টুকটাক চেষ্টা চলছে উপস্থিত আন্দোলোনকারীদের উত্যক্ত করে গোলমাল সৃষ্টি করার – সে ‘সাংবাদিক’ বা ‘আমজনতার প্রতিনিধি’ সেজে ট্যাঁড়া-ব্যাঁকা প্রশ্ন করেই হোক, বা ‘আন্দোলোনকারী’ সেজে ক্যামেরার সামনে সাজানো ইন্টারভিউ দেওয়ার নাম করে উত্তেজক কথাবার্তা বলে। সরাসরি গুন্ডামির ঘটনাও একটা দুটো ঘটেনি এমন নয়, তবে সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনাই। অভিজিৎ দিপকে বারবার আন্দোলোনকারীদের মনে করিয়ে দিচ্ছেন – শত প্ররোচনাতেও এদের ফাঁদে পা না দিতে এবং এখনও অবধি তেমন অপ্রীতিকর ঘটনার খবর নেই। সমাজমাধ্যমে বিজেপির আইটি সেল আন্দোলনকে বদনাম করার নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কখনও বলা হচ্ছে – সোনম ওয়াংচুক বোতল থেকে জল নয়, চিকেন স্যুপ পান করছেন [৮], আবার কখনও বলা হচ্ছে অনশনকারী ছাত্রছাত্রীরা নাকি টয়লেটে গিয়ে চেটেপুটে খাবার-দাবার খেয়ে আসছেন। কয়েকজনকে ক্যামেরা হাতে টয়লেটের আশেপাশে ঘুরঘুর করতেও দেখা গেছে। ধন্য তাদের অধ্যবসায়। স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রী আন্দোলোনকারীদের ‘ভাইরাস’ এবং ‘আতঙ্কবাদীদের বি-টিম’ বলে অভিহিত করেছেন। এছাড়াও উপাধি হিসাবে ‘দেশবিরোধী’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী’, ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ – এসব উপরি পাওনা তো আছেই। অবশ্য ভক্তকূল ছাড়া এসব বস্তাপচা হেটস্পিচ আর কেউ গিলছে বলে মনে হয় না। বরং সংহতির দৃশ্য চোখে পড়েছে অনেক বেশি। কৃষক নেতারা এসেছেন, মঞ্চের উপর উঠে সমর্থন জানিয়ে গেছেন। প্রবীণ স্বাধীনতাসংগ্রামী পণ্ডিত রামকিষণ এসেছেন। বয়স ১০১ বছর, ভারত ছাড়ো আন্দোলন থেকে শুরু করে আজীবন আপোষহীন সংগ্রাম করেছেন। জেল খেটেছেন স্বাধীনতার আগে এবং পরবর্তীকালে, এমারজেন্সির সময়। এই বয়সেও প্রতিবাদ-মঞ্চে এসে অনেকটা সময় কাটালেন। বক্তব্য রাখলেন, ধৈর্য্য ধরে আন্দোলোনকারীদের কথা শুনলেন, উৎসাহ দিলেন, উপস্থিত জনতার প্রশ্নের উত্তরও দিলেন। প্রশান্ত ভুষণ, যোগেন্দ্র যাদব, সঞ্জয় সিং, মহুয়া মৈত্র, সাগরিকা ঘোষ, বৃন্দা কারাত – প্রমুখেরাও হাজিরা দিয়েছেন/দিচ্ছেন একে একে। এসেছেন অরুন্ধতী রয় ও আরও অন্যান্য সমাজকর্মীরা। সাধারণ মানুষজন আসছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে [৩]। তাঁরা তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অন্যায় এবং তার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে কীভাবে প্রশাসনিক হেনস্থার শিকার হয়েছেন – সেইসব ঘটনা তুলে ধরছেন। তাঁদের কথায় উঠে আসছে কিছু কমন ফ্যাক্টর – বিজেপি-শাসিত রাজ্য, বিবিধ দুর্নীতি, আতঙ্কের পরিবেশ, আর পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা বা ক্ষেত্রবিশেষে অতি সক্রিয়তা। ক্ষমতাবানের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ে ক্লান্ত হলেও, হাল ছাড়েননি তাঁরা। দূর-দূরান্ত থেকে এসেছেন এই ধর্না মঞ্চে, আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানাতে। এগিয়ে আসছেন – NEET-কেলেঙ্কারি যেসব ছাত্রছাত্রীদের ঠেলে দিয়েছে আত্মহত্যার পথে, তাদের বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনেরা [১২]। যেটুকু সময় থাকছেন, স্বেচ্ছাসেবীরা আগলে রাখছেন এঁদের সবাইকে। কাঠফাটা রোদ, ধুলোর ঝড়, মুষলধারায় বৃষ্টি – সবকিছুই সহ্য করতে হয়েছে, হচ্ছে। অনশনরত ছাত্রছাত্রীদের অস্থায়ী ছাউনি কোনোভাবেই পর্যাপ্ত ছিল না। বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেছে তাদের সবকিছু। তেরপল নিয়ে আসতে বাধা দিচ্ছে দিল্লি পুলিশ। তার জন্যও নাকি অনুমতি আসতে হবে ‘উপর’ থেকে [২, ১৪]। প্রধান মঞ্চের উপর অভিজিৎ ও আরও কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবীদের দেখা গেল – একটা বড়সড় ব্যানার মাথার উপর ধরে সোনম ওয়াংচুককে প্রবল বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচাতে। ম্যাগসেসে পুরষ্কারজয়ী, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, পরিবেশবিদ, বিজ্ঞানী... তাঁর মতো মানুষ যে কোনো দেশের সম্পদ। ভাবছিলাম, আমার দেশের সংখ্যাগুরু নাগরিকের সেই বোধটুকুও কী আছে? প্রশ্ন এখানে দায়বদ্ধতার। পদ যত উঁচু, সেই পদের দায়বদ্ধতাও তত বেশি। কারণ সেইসব পদাধিকারীর একটা ভুল অগুনতি মানুষের জীবন ছারখার করে দিতে পারে—যা এক্ষেত্রে হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীর অযোগ্যতা, অক্ষমতা – যাই বলুন না কেন, তা ২০-২২টা ছেলেমেয়েকে মৃত্যুর পথে ঠেলে দিয়েছে। অগুনতি ছেলেমেয়েকে হতাশার অন্ধকারে নিমজ্জিত করেছে। আর এটা তো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, গত কয়েকবছরে এতগুলো প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনা সামনে এসেছে – এ যেন গা-সওয়া হয়ে যাচ্ছে আমাদের। চলতি বছরেই অভিযোগ এসেছে UPSC এবং NET পরীক্ষার প্রশ্নপত্র নিয়েও। Hanlon’s razor বলে, “Never attribute to malice that which is adequately explained by stupidity”, আবার Grey’s law অনুযায়ী, “Any sufficiently advanced incompetence is indistinguishable from malice”. যা ঘটে গেছে, তা স্রেফ অযোগ্যতার নিদর্শন, বা ইচ্ছাকৃত অনিষ্টসাধনের চেষ্টা... যে সিদ্ধান্তেই আপনি উপনীত হন না কেন, ক্ষমা-ঘেন্না করে দেওয়ার সময় অতিক্রান্ত। আর এই বিপুল ক্ষতির সামনে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়াকে ‘এমন কিছু বড় ঘটনা নয়’ প্রমাণ করতে বাজারে নেমেছেন। আশা করি তাঁদের বিবেক, মনুষ্যত্ব একদিন জাগবে। বছর বছর স্কুলে ছেলেমেয়েদের ঘাড় ধরে বসিয়ে যে প্রধানমন্ত্রীর ‘পরীক্ষা পে চর্চা’-র বাণী গিলতে বাধ্য করা হয়, পরীক্ষা নিয়ে এত বড় একটা কেলেংকারির পরও তা নিয়ে তাঁর কোনো বক্তব্য শোনা যায়নি। অথচ দ্বিতীয়বার NEET পরীক্ষা সফল’ভাবে পরিচালনা করার জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে অভিনন্দন জানাতে দেরি হয়নি একটুও। সাফল্যের কৃতিত্বের ভাগ নিতে সদা তৎপর। আর ব্যর্থতা এলে দেশবাসীর জন্য বরাদ্দ হিরন্ময় নীরবতা। [৫, ৬] আশার কথা, কিছু দক্ষিণপন্থী সমর্থকও অবশেষে জেগে উঠছেন এবং অন্তত এই একটি বিষয়ে সরকারকে সমর্থন করছেন না [৪, ১৩]। যন্তর-মন্তরে লোকজনের ভিড় বাড়ছে, কমছে। এক একদিন তিল ধারণের জায়গা থাকছে না, আবার কোনওদিন মেরেকেটে ৫০-১০০ জন। তাতে অবশ্য ককরোচদের উৎসাহে ভাটা নেই। রোদ, বৃষ্টি, ধুলোর ঝড় উপেক্ষা করে ওরা রোজ স্লোগান দেয়, গান গায়, একে অন্যের মনোবল বাড়ায়, ক্লান্ত হয়ে রাস্তার ধারেই একটু ঘুমিয়ে নেয়, আবার নতুন উদ্যমে দিন শুরু করে। আমিও যাচ্ছি মাঝেসাঝে। স্লোগান দিতে বা অনশন করতে নয়, স্রেফ হাজিরা দিতে। গত বেশ কয়েকবছর ধরে দিল্লি থেকে সামান্য দূরে থাকি চাকরির সূত্রে। যাদের মাঝে ওঠাবসা, তাদের অনেকের মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষেত্রবিশেষে অদ্ভুত উদাসীনতা বা নারকীয় উল্লাস দেখে প্রায়শই নিরাশায় ভুগি। এই কমবয়সী ছেলেমেয়েগুলোর দৃপ্ত চেহারা, মুষ্টিবদ্ধ হাত, প্রাণখোলা হাসি আর লড়াকু স্লোগানে আমার মনের অন্ধকার যেন একটু ফিকে হয়ে আসে। দিল্লির অসহ্য গরমও আর অতটা টের পাই না। দেখি – এদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য মাঝবয়সীরাও আসছেন। অফিস-ফেরতা, পিঠে বা হাতে ব্যাগ আর চেহারায় একরাশ ক্লান্তি নিয়ে। এঁরা সেই শ্রেণীর মানুষ, যাঁদের অনেককিছু হারানোর ভয় – স্থায়ী চাকরি, তিলে তিলে গড়ে তোলা সংসার, মাসিক কিস্তিতে কেনা গাড়ি, ফ্ল্যাটবাড়ি... যাঁরা খুব অতিষ্ঠ না হলে সচরাচর নিজেদের সযত্নে লালিত গণ্ডিবদ্ধ জীবনের বাইরে পা রাখেন না। এই আন্দোলন যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, এঁদের মতো আরও অনেকে আসবেন একটু একটু করে ভয় আর জড়তা কাটিয়ে। সেদিন মানুষের ভিড় যন্তর-মন্তর ছাড়িয়ে রাজপথে নেমে আসবে। আশা করবো – সেইদিন খুব দূরে যেন না হয়। সোনম ওয়াংচুক ইতিমধ্যেই প্রায় শয্যাশায়ী, তাঁর ওজন কমেছে ৭ কিলো। রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মান বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছে গেছে। অনশনরত এক ছাত্র আর এক ছাত্রীকে ইতিমধ্যেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে [৫, ৬]। সোনম, অভিজিৎ, নেহা, আশুতোষ, জুনেইদ, সৌরভ আর তাদের সঙ্গীসাথীরা যে লড়াইয়ে নেমেছেন – তা আমাদের সবার লড়াই। জয়লাভ হবে কিনা জানা নেই, কিন্তু ময়দানে থাকতে হবে – এ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। চরৈবেতি। [১] Youths rally in large numbers; bang plates, spoons to demand accountability at CJP protest - The Hindu[২] 'People falling sick': CJP's Dipke claims Delhi Police denied tarpaulin at protest site despite rain - Hindustan Times[৩] Fresh political support pours in on 15th day of CJP protest; student hospitalised - The Hindu[৪] Spoke to the AISA student activists about their hunger strike being ignored by the government - @PeekTVOfficial[৭] 6 Days Without Food Or Support From Parents - @PeekTVOfficial[৮] ‘Even If I D!e…’: Wangchuk’s Reply To Critics - @PeekTVOfficial[১২] Father Who Lost His Son Due to Paper Leak - @PeekTVOfficial[১৩] 58% NDA Voters Chahte Hain Dharmendra Pradhan Istifa Dein? | C-Voter Survey Mein Bada Khulasa - @official_cockroachjantaparty[১৪] CJP founder Abhijeet Dipke confronts Delhi police for not allowing tarpaulins at protest amid rains - @thenewindianxpress
  • হরিদাস পালেরা...
    সামসুর ভাইয়ের সব্জির ভ্যান ও কৃষির টুকিটাকি। - Somnath mukhopadhyay | সামসুর ভাইয়ের সব্জির ভ্যান ও কৃষির টুকিটাকি  রোজ সকালে সবজি কিনতে গিয়ে বেশ খানিকটা সময় গপ্পো করি সবজিওয়ালা সামসুর ভাইয়ের সঙ্গে। সামসুর ভাইয়ের বিশেষতা হলো -তার বিঘা দুই জমি রয়েছে পারিবারিকভাবে। সেই জমিতে সে সম্বৎসর নানান ধরনের সবজির চাষ করে। ফলনের একটা বড়ো ভাগ পাইকারি দরে মাঠ থেকেই বিক্রি করে দেয় ; এতে চাষের খরচের একটা বড়োসড়ো অংশ থোক টাকায় ঘরে ঢুকে পড়ে,আর ক্ষেতে পড়ে থাকা বাকিটুকু ভ্যান রিক্সায় নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে বিক্রি করে খুচরো দরে, এতে তার জনসংযোগ হয়, পরিচিতি বাড়ে, বুঝতে পারে পাবলিক ঠিক কী কিনছে এবং খাচ্ছে। মুনাফাটাকে নিজের মতো করে সাজিয়ে গুছিয়ে নিতে পারে।অবশ্য সব ধরনের সবজি তো আর নিজের ক্ষেতে হয়না, আর সাতসকালে পাঁচ রকম সবজি গাড়িতে না দেখলে খদ্দেরের মন টানবে কেন? তাই সকালের পাইকারি হাট থেকেও অন্যান্য সবজি কিনে গাড়ি ভরে নিয়ে আসে। আমরা হামলে পড়ি। ফুটন্ত হাঁড়ির একটা দুটো ভাত দুই আঙ্গুলের মাঝে নিয়ে টিপলেই যেমন মা টের পেয়ে যেতেন গোটা হাঁড়ির খবর, ঠিক তেমনি সামসুর ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলেই আমি বেশ টের পেয়ে যাই অন্তত আমার রাজ্যের ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের হাল হকিকত। সামসুরের সঙ্গে কথায় কথায় জানতে পারি আমাদের আগামী দিনের খাবার দাবারের খাস খবর। সামসুর ভাইয়ের কথা শুনে মাঝে মাঝে রীতিমতো অবাক হ‌ই, ধাঁধায় পড়ে যাই। বলে কি! সেদিন সামসুর ভাই আমাকে যা বললো তা সবার সঙ্গে ভাগ করে নিতেই আজ কলম বাগিয়ে বসেছি। তার কথায় –  – “আমরা খাই কেন বলো দিকি ? আমাদের খাওয়ার মূল মতলব হলো বেঁচে থাকা। আবার যেমন তেমন খেলে তো চলবে না, ভেবে চিন্তে খেতে হবে যাতে করে যা খাচ্ছি তা যেন আমাদের পেটের খোল ভরার সঙ্গে সঙ্গে শরীলের পুষ্টি করে, আমরা খেটে খাবার বল পাই। এর আরও একটা বিষয় আছে আর তা হলো বিশ্ব পকিতির সঙ্গে সম্পক্কের সেতু বাঁধা। আমি সবজি বেঁচতে গিয়ে দেখি অনেক হালফিলের বাবু- বিবি আছেন যাঁরা সব সব্জির সঠিক নাম ধাম‌ই জানেনা, চেনেনা। উচ্ছে আর করলার,লাউ আর চালকুমড়োর ফারাক‌ধরতে পারে না। আরে বাপু!খাবার আগে জানতেতো হবে যা খাচ্ছ তার পেছনের সত্যটা।  সামসুর ভাইয়ের কথা শুনে রীতিমতো চমকে উঠি! বলে কি পাগল! খাবার সামনে সাজিয়ে দিলে গপাগপ গলপথে উদরে চালান করতে ব্যস্ত হয়ে পড়াটাই দস্তুর বলে জানি ও মানি। সেখানে এসব কথা ভাবার সময় কোথায়? আমার ভ্যাবাচ্যাকা পানা মুখ দেখে সামসুর ভাই হাসতে হাসতে বলে – “এই যে খাচ্ছো তাতে পৃথিবীর তাত বাড়েনা? নাঙল দে জমি চষলেই মাটির ফাঁক ফোকরে ঘাপটি মেরে থাকা তাপ বাইরে বেইরে পড়ে। এতেই কি আর কাম খতম হলো ভেবেছো?ভাবো ভাবো মন দিয়ে ভাবতে শেখো। দাও দিকি পয়সা কড়ি তাড়াতাড়ি, মেলা সবজিতে গাড়ি বোঝাই। এগুলো বেচে ঝটপট ঘরে ফিরবো। বিকেলে আবার জমিতে পানি দিতে হবে।” সামসুর ভাই সবজির সাথে সাথে একরাশ ভাবনা ফেলে রেখে গেছে আমার জন্য। সেগুলোকে এবার সামলাতে হবে।  বিশ্ব উষ্ণায়নের বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই এই সময়ের কৃষি বিজ্ঞানীরা আরও টেকস‌ই, আরও পরিবেশের সাথে মানানসই করে গড়ে তুলতে চাইছেন আমাদের কৃষিকে। এই চাওয়াটার মধ্যে হয়তো ঠেকে শেখার তাগিদ আছে, তাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এই ইচ্ছেটাকে সম্মান জানাতে হবে বৈকি। কী হবে সেই কৃষির মডেল যা সামসুর ভাইয়ের কথা মতো আমাদের জীবন - পুষ্টি - প্রকৃতি পরিবেশকে এক নিয়মের তন্ত্রে বেঁধে রাখবে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলাফলকে যথাসম্ভব খাটো করে উন্নীত করবে সকলের বেঁচে থাকার আনন্দকে ? কাজটা মোটেই সহজসাধ্য নয়, কেননা যেদিন আমাদের আদি পূর্বপুরুষরা জঙ্গল সাফ করে চাষের উপযোগী জমির পত্তন করলো সেদিন থেকেই যে পৃথিবীর তাপীয় সাম্যের ভঙ্গ হলো।  আজ এই অবস্থায় পৌঁছে আমাদের দেখতে হবে যে ভাবী কৃষিতে নিবেশ যেন সঠিক মাত্রায় হয় যাতে সাধারণ কৃষিজীবী মানুষেরা কৃষির বহুমুখী ঝুঁকির হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে। তাঁদের হাতে আরো বেশি অর্থ আসার সম্ভাবনা তৈরি করতে হবে। মাথায় রাখতে হবে যে নিবেশের পরিমাণ বাড়লে বাড়তি আয়ের জন্য বাড়বে দাম যা বহু মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। প্রশ্ন উঠবে, ইনপুটের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনা হলে আউটপুট বা উৎপাদনের পরিমাণ কমে যাবে না তো? মনে রাখতে হবে যে নিবেশের পরিমাণ কম হলে কৃষির উৎপাদন কমে যাবে - এমনটা কখনোই ঠিক নয়। উৎপাদনশীলতা কেবলমাত্র বিনিয়োগের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না,তা নিয়ন্ত্রণ হয়পরিকাঠামোর দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে। গাদাগুচ্ছের বিনিয়োগ করলেই ফসলের বন্যায় ক্ষেত ভরে উঠবে এমন কিন্তু নয়। বিনিয়োগ বাড়ানোর স্বপ্ন দেখিয়ে কৃষকদের প্রলুব্ধ করাটার মধ্যেও এক আশঙ্কা রয়েছে। মনে রাখতে হবে যে আমাদের দেশের এক বড়ো সংখ্যক কৃষক হলেন মাঝারি ও ক্ষুদ্র জোতের কৃষক। তাদের পক্ষে চট করে বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়। সামসুর ভাইয়ের কথায় - এতে করে লাভের গুড় পিঁপড়ে খেয়ে নেবার ভয় রয়েছে। সবদিক দেখে নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তাহলে উৎপাদন বাড়বে কী করে? কৃষি বিজ্ঞানীরা বলছেন বহু কর্ষণের ফলে এমনিতেই আমাদের কৃষি জমির স্বাস্থ্য দুর্বল হয়ে পড়েছে। যথেচ্ছভাবে রাসায়নিক সারের ব্যবহার নষ্ট করে ফেলেছে জমির একান্ত বাস্তুতান্ত্রিক ভারসাম্যের বুনিয়াদ। ফসলের বৃদ্ধির জন্য চাই জল। অথচ জলের প্রধান জোগানদার মৌসুমি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমেছে, বাড়ছে অনিয়মিতি। একালে ক্রপ ম্যানেজমেন্টের সাথে জলের সুষ্ঠু ও যথাযথ ব্যাবহারের ওপরেই জোর দেবার কথা বলা হচ্ছে। প্রতিটি বৃষ্টি বিন্দু তাই আগামী দিনে মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠতে চলেছে। আগামী দিনে প্রতি ফোঁটা জলের জন্য আমাদের লড়াই করতে হবে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে নতুন নতুন রোগপোকার আক্রমণ বাড়ছে। সামসুর ভাইয়ের ঝিঙের ফসলের ৮০% নষ্ট হয়ে গেছে অজানা সমস্যার কারণে। প্রায় আট কাঠা জমির মুখী কচু নষ্ট হয়ে গেছে অসময়ের বৃষ্টিতে। এরফলে বিপন্ন হয়ে গেছে তার কৃষিকর্মের স্থিতিশীলতা। সামসুর ভাইয়ের মতো কৃষকেরা উপলব্ধি করতে পারছেন যে এবার তাদের আবহমানকালের কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায় খানিকটা রদবদল করতে হবে যাতে তাদের কৃষির ভবিষ্যৎ সুস্থিত হয়, কীটনাশক আর রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহারকে নিয়ন্ত্রণে এনে উৎপাদনকে সত্যিকারের স্থিতিশীল করে তোলা সম্ভব হয়। সামসুর ভাইদের কাছে কৃষির স্থিতিশীলতার অর্থ হলো বাতাবরণের বদলে যাওয়া অবস্থার সঙ্গে সর্বতোভাবে মানানসই হয়ে ওঠা। যতটুকু তারা বিনিয়োগ করছেন তার সুদে মূলে ফেরত পাওয়া। দ্বিতীয়ত, আগামীর কৃষিতে ঝুঁকির মাত্রা কমিয়ে ফেলতে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে ঝুঁকির আশঙ্কায় নিয়ত আশঙ্কিত থাকতে হয়। অনেকক্ষেত্রেই এক ফসলী কৃষি ঝুঁকির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। তবে মৌসুমি জলবায়ু অঞ্চলের কৃষিতে একাধিক বসল উৎপাদনের প্রবণতা রয়েছে। এর প্রতি অধিকাংশ কৃষককে উৎসাহিত করতে হবে আরও বেশি করে যাতে করে ফসলের বৈচিত্র্য বাড়ানোর পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হয় আরও গভীর ভাবে। কৃষির মধ্য দিয়ে মানুষ আর প্রকৃতির কাঙ্ক্ষিত সেতুবন্ধ রচিত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে এর প্রয়োজনে পশুদের আরও অর্থকরীভাবে বৃহত্তর কৃষি ব্যবস্থার অধীনে আনতে হবে। মনে রাখতে হবে যে কৃষকদের আয়ের উৎসের যত বেশি করে বিকেন্দ্রীকরণ করা সম্ভব হবে তত‌ই কমবে কৃষক তথা কৃষি ব্যবস্থার ঝুঁকির মাত্রা। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে তালমিলিয়ে খাপ খাইয়ে নিতে না পারলে কৃষির ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।  সাথে সাথে নতুন অবস্থায় ফসল নির্বাচনে আরও সতর্ক হতে হবে কৃষকদের। একদিকে বাজারে ফসলের চাহিদা, অন্যদিকে আবহাওয়ার বদল - এই দুয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে কৃষকদের। সামসুর ভাই আগাম জানিয়ে দিয়েছে যে এবার শীতে সে শুঁটি ফসল বীনসের চাষ করতে চায় কেননা এর বাজার দর ভালোজলের চাহিদা কম, তেমন পরিচর্যার প্রয়োজন নেই, কেবল মাচায় তুলে দেওয়া ছাড়া। কথায় বলে ঠেকে শেখা। সামসুর ভাইয়ের এখন সেই দশা। ইদানিং কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রক স্বল্প বৃষ্টিপাত যুক্ত অঞ্চলে মিলেট বা ক্ষুদ্র দানাশস্যের চাষকে জনপ্রিয় করতে উৎসাহিত করছে কৃষকদের। এই প্রচেষ্টা পরিবেশানুগ ভাবনার সংযোজন। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে ফসলের উৎপাদনশীলতা নির্ভর করে জমির স্বাভাবিক স্বাস্থ্যের ওপর। আর সেই স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য ফসলের বৈচিত্র্য আনতেই হবে। এক‌ই জমিতে লাগাতার এক‌ই ফসলের উৎপাদন না করে আনতে হবে ফসলের বৈচিত্র্য। সামসুর ভাইয়েরা এ তথ্য জানেন না এমন নয় তবে তাকে আরও প্রয়োগমুখী করে তুলতে হবে কৃষির স্থিতিশীল ভবিষ্যতের জন্য। সবশেষে যেটা বলার তা হলো জমির জন্য সঠিক ফসলের নির্বাচন। ভ্যান রিক্সায় সব্জির পসরা সাজিয়ে প্রতিদিন সকালে সামসুর ভাইয়ের পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়িয়ে জনসংযোগ করার মুখ্য উদ্দেশ্য‌ই হলো খদ্দেরদের পছন্দের যাচাই করা। কোন ফসলের চাহিদা বাড়ছে, কোন ফসলের চাহিদা কমছে সেই গুরুত্বপূর্ণ খবর জানতে এই পদ্ধতি খুব উপযোগী তার কাছে। একালে মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বেড়েছে।কোন্ ফসল, কোন্ সব্জি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজে লাগবে তা মেনে চলতে চাইছেন এই প্রজন্মের অনেকেই। এই পছন্দ - অপছন্দের তালিকা থেকে কৃষকরা সংকেত পান। ইদানিং শরীরের gut microbiome নিয়ে চর্চা চলছে জোরকদমে। এরফলে খাদ্য নিয়ে আমাদের সচেতনতার মাত্রা বেড়েছে। ডাক্তারবাবুরা রোগীদের শরীরের হালহকিকত যাচাই করে জানিয়ে দিচ্ছেন শরীরের পক্ষে উপযুক্ত খাদ্য তালিকা। কোন্ কোন্ ফসলে ডায়েটারি ফাইবার বেশি,এন্টি অক্সিডেন্টে ভরপুর কোন্ সব্জি, ফলিক অ্যাসিড কী থেকে পাওয়া যাবে – এসব তথ্য এখন আমাদের ভাবনা থেকে সামসুর ভাইয়ের চিন্তার বিষয় হয়ে উঠেছে। এই জানকারির প্রয়োগ হচ্ছে কৃষিজমিতে। তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারছে যত বেশি ফসলের বৈচিত্র্য তত বেশি প্রসারিত বাজার, বিপণন; তত বেশি ভালো মাটির সুস্থতা,সরসতা।এ সবই এক স্থিতিশীল কৃষি ভবিষ্যতের জন্য উপযোগী। এসব আমাদের মা ঠাকুমা দিদিমাদের খাদ্য ভাবনায় সুরক্ষিত ছিল বহু বহু কাল। সাবেকি বলে সেই প্রজ্ঞার বড়ো অংশকেই আমরা বাতিল করেছি অথবা সরিয়ে রেখেছি। অথচ তার মধ্যেই নিহিত আছে বহু বহু বছরের অভিজ্ঞতা ও প্রমা। তাকে ফিরিয়ে আনতে হবে নিজেদের স্বাস্থ্যের জন্য এবং এক সুস্থিত, সুন্দর, বৈচিত্র্যময় ভবিষ্যতের জন্য।   সোমনাথ মুখোপাধ্যায় জুলাই ১৮.২০২৬.
    ভাগবত পুরাণ - ২/১ - Kishore Ghosal | “হে রাজন, পুরুষের অন্তিমকাল উপস্থিত হলে, নির্ভয়ে পুত্রকলত্র ইত্যাদি থেকে সমস্ত আসক্তি মুছে ফেলতে হবে। ঘরে থাকলে এই আসক্তি বিনাশের পরেও আবার ফিরে আসতে পারে, সেই কারণে ঘর ছেড়ে তীর্থস্থানে গিয়ে, নির্জন পবিত্র স্থানে কুশ, মৃগচর্মের আসনে বসতে হবে। তারপর অ, উ ও ম এই তিন অক্ষরের প্রণবরূপ ব্রহ্মবীজ মনে মনে জপ করতে হয়। জপ করতে করতে প্রাণায়ামে শ্বাস জয় করে মনকে বশীভূত করতে হবে। তারপর স্থির বুদ্ধি দিয়ে মনের থেকে ইন্দ্রিয়ের সকল বিষয়ের যোগ ছিন্ন করতে হবে। এই কর্ম বিধিকে প্রত্যাহার বলে।  ভাগবত পুরাণ - পর্ব ২ /১
    বহ্নি মধুময় অথবা মধু বহ্নিময়ঃ (উপন্যাসিকা ঃ পর্ব ২)  - রানা সরকার | অনাদিবাবুর ঘরোয়া ক্লাব ঘর। এখানে কাউকে পরোয়া করা হয় না বা কেউ এখানে জড়োয়া গয়না পরে এসে ভেড়ৃয়া ময়না সেজে বসে থাকে না। এখানে যখন এসেছ তখন তুমি মুক্ত হও। মানে তোমার মনের কোণে যে শব্দগুচ্ছ জমেছে তা ক্লাবঘরের উষ্ণ আলাপচারিতায় গলিয়ে ফেল। জ্ঞান দাও; জ্ঞান নাও। কিন্তু বাপু ঘ্যানঘ্যান কোরো না।সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি পড়ছিল। তবে জোরে নয়, ইলশেগুড়ি। আড্ডার টানে প্রায় সবাই এসে হাজির। আলোচনাও বেশ জমে উঠেছে। বিষয় ব্যবসা। অনেকে অনেক কথা বলল। যেমন, বাঙালীরা ব্যবসা বিমুখ। ব্যবসা করা ছেলের সাথে বিয়ে দিতে মেয়ের মায়েরা বত্রিশবার ভাবেন। অন্যজন বললেন যে ওটা আসলে অজুহাত। আসলে বাঙালীর উদ্যোম নেই। অনেকে হা হা করে উঠল। তাহলে দ্বারকানাথ, রবীন্দ্রনাথ, মতিলাল শীল, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, নেতাজী সুভাসচন্দ্র বোস, সত্যজিৎ রায় প্রমুখেরা জন্ম নিতেন না। কতধরণের কতরকমের ব্যবসা আছে সেসব নিয়ে আলোচনা করলেন বারিণবাবু।সবশুনে অনাদিবাবু বললেন, “দেখ বাপু, সব থেকে ভালো ব্যবসা হল বিয়ের ব্যবসা।বেশ একটা শাঁসাল শ্বশুড় দেখে মেয়ে পাকড়াও, মানে পটিয়ে ফেল।ব্যাস, তারপর বিন্দাস দিন কাটাও”।বারিণবাবু হাসতে থাকলেন। বললেন, “তোমার মুখে আজকালকার ছেলে-ছোকরাদের ভাষা শুনতে বেশ লাগে। তবে ব্যাপারটা গোলমেলে হয়ে যাচ্ছে না তো? ব্যবসা, বিয়ে -গুলিয়ে যাচ্ছে না তো?”“বিন্দুমাত্র না। আগেকার বহু রাজা রাজারাও বিয়ে করে করে রাজ্যবিস্তার করতেন ”।“কিন্তু কোথায় রাজা আর কোথায় প্রজা..?”“এটা কিন্তু এখন প্রজাতান্ত্রিক দেশ। আর অনেক বিয়ে করারও দরকার নেই। রাজারাজরা, নবাব, বাদশাহ, কিং - এরা বিয়ে করে রাজ্যবিস্তার করেছে, আর আমাদের এরা না হয় একটা বিয়ে করে যৎকিঞ্চিৎ অর্থবিস্তার করবে”।কথাগুলো পলতেদা, মধু, মংকাদের লক্ষ্য করে। ওরা একটু চার্জড হয়ে উঠল।“কিন্তু এই সম্পর্ক কি মধুর হবে রায়মশা্ই ...?”“আরে হবে, হবে। মধু খাবেন আর হুল খাবেন না? তা হয়? তবে মনের চুনটি সাথে করে রাখতে হবে সবসময়। ফোটালেই প্রলেপ দিয়ে নেবেন”। “আপনি পারেনও বটে”।“হ্যাঁ!, শুনে নাও যুবাগন। প্রেম করতে হবে। ধরতে হবে পয়সাওয়ালা মেয়ে।তার জন্য হতে হবে উদ্যোগী ..”।“কারণ?”“কারণ ‘উদ্যোগীনং পুরুষসিংহমুপৈতি পত্নীঃ’। তবে ইদানিং ব্যাপারটা বদলে যাচ্ছে। এখন দেখা যাচ্ছে যে উদ্যোগীং নারীসিংহীমুপৈতি পতিঃ”।সবাই হাসতে থাকল। যে গুমোট ভাবটা সবার মনে আকাশ বেয়ে জমে ছিল তা কেটে গেল অনেকটা। পুরোহিত মশাই কোণের দিক করে বসে ছিলেন। অনাদিবাবু তার মুখের জ্যামিতিটা পড়ে নিয়ে বললেন, “কী পুরোহিত মশাই, কথাটা মনে হচ্ছে মনঃপুত হয় নি আপনার ?”নিজের দিকে সবার দৃষ্টি অনুভব করে একটু নড়েচড়ে বসলেন পুরোহিত মশাই। বেশ একটা কেউকেটা ভাব করে বললেন, “হু, বন্দোবস্তোটা মন্দ নয়; মন্দ নয়। তবে অনেক কিছু দেখে নিতে হবে। যে সে মেয়ে বিয়ে করে শেষে ফাঁসবে নাকী ..”“সেটা কীরকম?”, বারিণবাবু জানতে চাইলেন।“প্রথমেই দেখে নিতে হবে মেয়ে মাঙ্গলিক কী না ...”।“কী লিক?”“মেয়ের মঙ্গল লিক করেছে কীনা দেখে নিতে বলছেন”, পলতেদা সবাইকে বুঝিয়ে দিলো।সবাই আবার ফেটে পড়ল হাসিতে।“এইজন্যই আমি কিছু বলি না। যতসব পশ্চাৎপাকার দল। ... যান, আমি আর বলবই না”। পুরোহিতমশাই গোঁসা করে মুখ গুঁজে রইলেন। সবাই যে যার মতো তাকে বোঝতে লাগল। শেষে অনাদিবাবু পলতেদাকে ইশারা করলেন। মুখ চেপে হেসে পলতেদা ক্ষমা চাইল। এই ব্রম্হাস্ত্রতে কাজ দিল। পুরোহিত মশাই পলতেদাকে ভগবানের ভঙ্গিতে বরাভয় দিয়ে বললেন, “ও আমি কিচ্ছু মনে করিনি। হ্যাঁ, সোনার চাঁদ ছেলেরা সব। ও একটু আধটু হয় ....”।“হ্যাঁ, কী যেন বলছিলেন?”, অনাদিবাবু খেইটা ধরতে চাইলেন।“মঙ্গল”, মংকা ধরিয়ে দিল।“হ্যাঁ, দেখে নিতে হবে মেয়ে মাঙ্গলিক কী না বা ভৌমদোষ আছে কীনা। পাত্র-পাত্রীর জন্মছক মেলাতে হবে। ওপাড়ার সমীরণ, বলি আমার কথা না শুনে করলি তো বিয়ে, করলি তো? তারপর সাতমাসের মাথায় কী হল, কী হল? .... গেলি তো ...”পুরোহিত মশাই যেন নস্ট্রাডামুস আর আমরা সব পাপীতাপী। যেন দিব্যচক্ষে যা দেখছেন বা বলা ভালো অবলোকন করছেন তাই কমেন্ট্রির মাধ্যমে আমাদেরকে বলছেন। বলছেন আমাদের মঙ্গলের জন্য, আমাদের পাপস্খালনের জন্য।পুরোহিত মশাই বলে চললেন, “আমি হলফ করে বলতে পারি, সমীরন যাকে বিয়ে করেছিল তার জন্মকুন্ডলীতে চতুর্থ, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, দশম অথবা দ্বাদশের কোথাও না কোথাও মঙ্গল আছে”।পকাই প্রতিবাদ করে উঠল, “না, পুরোহিত মশাই আপনার কথা মানতে পারলাম না। সমীরণদা খুব মদ খেত, তাই সিরোসিস হয়েছিল....”খুব করে পকাইকে লক্ষ্য করে হেসে নিলেন। বললেন, “আরে! ওকে মদ কে ধরিয়েছিল ?”“সবাই জানে। সারদাপল্লীর নাড়ুমাতাল!”।“না। নাড়ু না। ওকে মদ ধরিয়েছিল মঙ্গল ...”“কে মঙ্গল?”“কে মঙ্গল...”, পুরোহিত মশাই খানিকটা ভেঙালেন। বললেন, “মঙ্গলগ্রহ”।আমরা সবাই ফ্যাকফ্যাক করে হাসতে লাগলাম।পলতেদা আর থাকতে না পেরে বলল, “আপনার মঙ্গল কোথায় আছে ? নুনশোতে আবার লাইন দেয়নি তো ?”“এই ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। যত্ত সব ....। তারপর গণ দেখতে হবে...”“সে আবার কী?”, মধু জানতে চাইল।“সেকী! তুমি গণ জানো না? নরগণ, দেবগণ আর রাক্ষসগণ ...”এবার অনাদিবাবু বাকযুদ্ধে অবতির্ন হলেন। বললেন, “ঠাকুরমশাই, তাহলে হেক্সাগন, পেন্টাগন, ডেকাগন ...., এদের কী হবে?”“কিন্তু এদের সম্বন্ধে তো আগে কিছু শুনিনি!”। খানিকটা ধন্দে পড়ে গিয়ে বললেন, “আরো গণ আছে নাকী?”“আছে বৈকী। তবে সবচেয়ে ভয়ানক গন হল ...”মুখের কথা কেড়ে ঠাকুরমশাই এর জবাব, “রাক্ষস!”।“না”।“তবে?”“জনগণ"।সবাই তুমুল হাসতে লাগল। কেউ কেউ হাসি চাপতে না পেরে টেবিলে, মেঝেতে, এর ওর গায়ে চাপড় মারল। ঠাকুরমশাই অপ্রস্তুত হযে পড়লেন। "হ্যাঁ। জনগণ। পুরো বাই পোলার। এই ভালো তো এই খারাপ। কখনও আদরে আদরে অতিষ্ঠ করে দেবে, আবার কখনও কেলিয়ে কাঁঠাল পাকিয়ে দেবে! এই মাথায় তুলে নাচ্ছে, তো এই দূর ছাই দূর ছাই করছে!! গোটাটাই আবেগে করছেন কী না। যুক্তিবোধ থাকলে..." “আহ! বড্ড বাজে কথা হচ্ছে”। জয়ন্তদার জলদগম্ভীর গলায় তর্কের প্রস্তুতি। জয়ন্তদা একটা কলেজে পার্টটাইম করেন; বিষয় পলিটিক্যাল ইকনমিক্স। এই কিছু দিন আগে ঐতিহাসিক ভুল টুল ইত্যাদি নিয়ে তুমুল আলোচনা চলছিল অনাদিবাবুর সঙ্গে। মার্কক্সিস্ট তাত্ত্বিক হিসেবে সমধিক পরিচিত। শোনা যায় জয়ন্তদা প্রেমে হাফসোল খেয়েছেন। অনেকক্ষন ধরে কী একটা যেন পড়ছিলেন। আমরা সকলে সাবধান হয়ে বসলাম। মনটাকে বললাম, খবরদার।জয়ন্তদা বলে চললেন, “আসল কথাটা কেউ বলছে না। যদি মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে দেখো, তবে দেখবে মেয়ে হ’ল চারপ্রকার .....”।ঠাকুরমশাই ব্যাপারটা নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্ল শুরু করলেন। বললেন, “অ্যাহ! কী চারপাতা ইংজিরি শিখেছ, আর বিদ্যে জাহির করছ? বলি পাঁজিটা পড়ে দেখেছ একবার? সেখানে জ্বলজ্বল করে লেখা আছে মেয়ে হল পাঁচপ্রকার। শঙ্খিনী, পদ্মিনী, হস্তীণী ...”।“দেখুন ঠাকুরমশাই এটা একটা ইন্টেলেকচুয়াল কথা হচ্ছে। আপনি আপনার নন-ইন্টেলেকচুয়াল পাঁজিপত্তর এর বাইরে রাখলেই ভালো হয়”।ঠাকুরমশাই মানে না বুঝে আবার কথা বলতে উদ্যত হয়েছিলেন। অনাদিবাবু ব্যাপারটা সামলালেন। ঠাকুরমশাইকে বললেন “আপনার বলার সময় জয়ন্ত কিন্তু কিছু বলেনি। সুতরাং কী বলছে আগে শুনুন, ওকে বলতে দিন। বলো, জয়ন্ত”“হ্যাঁ, যা বলছিলাম”, নিজেকে গুছিয়ে নিলেন জয়ন্তদা।, “যদি মার্ক্সীয় দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে দেখ তবে দেখবে মেয়ে হ’ল চারপ্রকার”।“কী রকম?”“আদিম সাম্যবাদী মেয়ে, সামন্ততান্ত্রিক মেয়ে, বুজোর্য়া মেয়ে আর প্রলেতারিয়েত মেয়ে। আদিম সাম্যবাদী মেয়ে পাওয়া এখন খুব মুশকিল। এরা অল্পবয়সেই বিয়ে করে নেয়, বেশী পাওয়া যায় না। স্বভাবে এরা খুব ঠান্ডা হয়। খুব যত্নআত্তি করে টরে। নিজেরা অর্থ উপার্জন করে বা টাকাপয়সা তুলে দেয়”। “মানে নাবালিকা অবস্থাতেই ....?। আর সামন্ততান্ত্রিক?”, বারিণবাবু জানতে চাইলেন।“না। সদ্য সাবালিকা হলেই..., আর সামন্ততান্ত্রিকরা আবার মারধোর করলেও ঠিক সময়ে খেতে টেতে দেয়। মাস গেলে রোজগারটা নিজেরা নিয়ে নেন। আর মুড ভালো থাকলে আদরযত্নও করে”। “মারধোর!”, ভয়ে সিঁটিয়ে গেল মংকা।“হ্যাঁ। টাকা রোজগার করে না আনলে ঠ্যাঙাবে না? আর বুর্জোয়া মেয়েরা হল আবার বাজারকেন্দ্রিক। খালি পায়ের ওপর পা তুলে বসে থেকে হুকুম করে। প্রতিমাসে এ্যায়সান শপিং করবে, এ্যায়সান শপিং করবে, যে দেখবে পকেট ফেল করে গেছে। তারপর ফি হপ্তায় এখানে খেতে যাওয়া, ওখানে আউটিং-এ যাওয়া...”। মধুরা সবাই নিজেদের পকেট হাতড়াল।“আর প্রলেতারিয়েত?” ফচকা আশাহত ভাবে জানতে চাইল।“এরা মুখরা হয়। হ্যাঁ, মুখে মুখে প্রচন্ড ঝগড়া করে। ঠ্যাঙাতেও ওস্তাদ। বড় বড় কথা বলে বাপের বাড়ি সম্বন্ধে। কিন্তু আসলে লবডঙ্কা.....। নিজেরা সব সময় কর্তৃত্ব করে। তবে উপার্জন করে আর মনটা ভালো হয়...। একেবারে জলের মতো”। “তাহলে কাকে বিয়ে করব?”, পলতেদার সারেন্ডার ভঙ্গি। “হুঁ, বলা খুব কঠিন”।অনাদিবাবু আমাদের আশ্বস্ত করলেন, “একটা সাম্যবাদী পয়সাওয়ালা বিধবা বা ডিভোর্সী মেয়ে পেলে তোমাদের ভালো হয়। তোমাদের তো চিনি। যা এক একটা ভীতু আর লোভী ছেলে সব তোমরা ...”।মধুময়ের এতো কিছু মাথায় ঢুকছিল না। একটা বিয়ে করবে তার জন্য এতো কিছু! কই, তাদের গুরুজনেররাও তো বিয়ে করেছেন। এতো ঝামেলা তো ছিল না। মা-বাবা পছন্দ করেছে আর ছেলে-মেয়ে তাদের কথা মতো বাধ্য হয়ে বিয়ে করেছে। বিয়ের পর হয়েছে প্রেম। তারপর সন্তানাদি নিয়ে হইহই করে করেছে সংসার। এখন না হয় ব্যাপারটা একটু পাল্টাতে পারে। যেমন আগে বাবা-মা পছন্দ করেছেন, এখন না হয় ছেলে-মেয়েরা নিজেদের পছন্দ করবে আর বাবা-মা দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দেবে। তা বলে এতো সব! এর মধ্যে বরুনদা আবার আরও নতুন কথা শোনালেন। বরুনদা মানে বরুণ চট্টোপাধ্যায়। এশিয়াটিক সোসাইটিতে রিসার্চ করেন। সঙ্গে ফিল্ম স্টাডিজ। বহু সিনেমা দেখেছেন। ঐ যাকে বলে পুরোদস্তুর ‘ফিল্ম-বাফ’। তিনিও বললেন যে মেয়ে চাররকমের হয়, তবে জয়ন্তদা যা বলল ঠিক সেই রকম নয়, ওর কনসেপ্টটা নাকী পুরোনো; জং ধরে গেছে। নতুন কনসেপ্টে চারপ্রকার মেয়ে হল - পোস্টমর্ডান, পোস্টকলোনীয়াল, পোস্টস্ট্রাকচারাল আর পোস্টমার্ক্সীয়ান!।মধুময় ভাবতে বসল, এরা আবার কী রকম হবে কে জানে? বিয়ের পর সবকিছু ‘পোস্ট’ না করে দেয়! এদের বলা হয় নি, অনেকদিন ধরে পাড়ার ঐ বহ্নিকে তার বেশ পছন্দ। গ্রীবাটি একদম হংসের মতো। চাঁদের মতো মুখ। কলেজ যাবার পথে মধুকে দেখেছে কয়েকবার, হেসেছেও বোধহয়। কিন্তু মধু ভেবে পাচ্ছে না ঠিক কীভাবে ওর সাথে ভাব জমাবে। যা একটা জাঁদরেল বাবা। তার ওপর আছে একটা বিটকেল কাজের লোক।(চলবে)
  • জনতার খেরোর খাতা...
    কালবেলার রৌদ্রছায়া  - ২৮  - Anjan Banerjee | ( ২৮ ) মেঘলা দিন। সকাল থেকেই নিবিড় ছায়ায় ঢাকা। অনুমিতের মনটা যেন গাছতলায় পড়ে থাকা শুকনো পাতার মতো এলোমেলো উড়ে বেড়াচ্ছে। পবন, সিরাজ, শৌর্যরা নিশ্চয়ই এমন ছায়া মাখা দিনে মস্তি নিতে বসে গেছে কোন একটা ঠেকে বোতল খুলে। অনুমিত ভাবল ওদের কাউকে একটা ফোন করে। কিন্তু তেমন চাড় বোধ করল না। মনটা কেমন মেঘলা মেঘলা লাগছে। বাবাও অনেকদিন কাজ টাজের ব্যাপারে কিছু বলছে না। বোধহয় নতুন গভর্নমেন্টকে বুঝে নিতে চাইছে একটু। পলিটিক্সের ছানবিন করতে ব্যস্ত। বাড়িতে থাকতে ভাল লাগছে না। কারও একজনের সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। না না পার্ক স্ট্রিটের কোন আলো আঁধারি বারে মদের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে নয়। মেঘলা আকাশের নীচে কোন নির্জন একটা গাছতলায় দাঁড়িয়ে একজনের সঙ্গে কিছু কথা বলা। অনুমিত ভাবল, কি সব ক্যালাস ন্যাকা ন্যাকা চিন্তা করছে সে। কোন মানেই হয় না। তবে বাড়িতে থাকা গেল না। ভাবল, বেরিয়ে পড়া যাক। কাউকে না কাউকে পেয়ে যাবে। বেলা তিনটে বাজে। মেঘলা দিনে লেকের উল্টোদিকে সাদার্ন এভিনিউ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবল কার কাছে যাওয়া যায়। এই ভরা দুপুরে বন্ধুরা এখন সকলেই কোন না কোন কাজে ব্যস্ত। আর যে কোন কাজে নেই সে মস্তিতে আছে নিশ্চয়ই। ওসব ভাবতেই ভাল লাগছে না অনুমিতের। ভাবতে ভাবতে হাঁটতে লাগল রাস্তায় অন্য কারও সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে ভাল হয়। লেকের ওদিকেই তো ওদের বাড়ি। হাঁটতে হাঁটতে ওদের বাড়ির কাছে গেলে কেমন হয়। বাবা তাকে সঙ্গে নিয়ে একদিন হাজির হয়ে গিয়েছিল ওদের বাড়ি। কী হ্যারাসমেন্ট... ওঃ। এখান থেকে বেশি দূর তো নয়। ওই তো ওই ডানদিকে টার্ন নিয়ে খানিকটা গেলে তিনতলা বাড়িটা। বাড়ির কালারটা কী যেন, ঠিক খেয়াল নেই। একদিনই তো গেছে। অত কি আর মনে রাখা যায় নাকি। ওরকম একটা সিচুয়েশান... সঙ্গে জাস্টিস অনিন্দ্য বসু। কিন্তু এখন যাওয়াটা কি ঠিক হবে বাড়িটার কাছে। কেউ যদি দেখে ফেলে কী মনে করবে। এমনিতেই তো তার অনেক বদনাম। অনুমিত ধীর গতিতেই হাঁটছিল। তার গতি আরও শ্লথ হয়ে এল। মেঘলা বাতাস পাক খাচ্ছে লেকের মধ্যে। তার মনে হল, এমনও তো হতে পারে তাকে হঠাৎ উল্টোদিক দিয়ে আসতে দেখা গেল। আসতেই পারে। এটা তো তার পাড়া বলা যায়। সাদার্ন এভিনিউ ধরে লেকের মোড়ের দিকে হেঁটে আসাটা খুব অসম্ভব কিছু না। কিন্তু এই অসময়ে সে এখান দিয়ে যাবেই বা কেন। তবু এরকম কিছু তো ঘটতেই পারে। বলা তো যায় না। কিন্তু যদি ঘটেই তাহলে সে কী করবে। অনুমিত কিছুই ভেবে রাখেনি। আগে যা বলত তা আর এখন বলা যাবে না। এত সব ভেবে লাভ কী, অনুমিত ভাবল। সে চাইলেই কি এই রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার দেখা পেয়ে যাবে নাকি। এরকম কখনও হয় না। কিন্তু হল। কখন কোথায় কিভাবে যে কারও ইচ্ছা পূরণ হয়ে যায় কেউ বলতে পারে না। অনুমিত আচমকা দেখল প্রায় তিরিশ মিটার দূরে ভেসে উঠল গোলাপি শার্ট আর কালো প্যান্ট পরা একটা ফর্সা মতো মেয়ে। কাঁধে একটা ঝোলা। মাথা নীচু করে কী ভাবতে ভাবতে উল্টোদিক থেকে এদিকে হেঁটে আসছে। অনুমিতের বুকের রক্ত দোল খেয়ে গেল এক লহমায়। তার নিজের কাছে নিজেকে অচেনা লাগল। তার মনে হল দেখা না পেলেই ভাল হত। কী যে বলবে ওকে সেটাই তো ঠিক করতে পারেনি এখনও। অনুমিত দাঁড়িয়ে পড়ল। অদ্ভুত ব্যাপার। তার মনে হল পিছন ফিরে হাঁটতে থাকি। তারপর ভাবল, দূর... এরকম করতে যাবে কেন, পাগল নাকি। এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই মনোমিতা দশ মিটারের মধ্যে এসে পড়ল এবং সামনে অনুমিতকে দেখতে পেল। কোন অল্প পরিচিত কাউকে দেখতে পেলে কেউ যেমন ভাবে তাকিয়ে থাকে মনোমিতা তেমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে অনুমিতের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। দুজনে সামনাসামনি এসে গেল। মনোমিতা সহজ স্বাভাবিক স্বরে বলল, ' আপনি এখানে ? 'অনুমিত ঠিক কী বলা উচিৎ ভেবে না পেয়ে বলল, ' ওদিকে যাচ্ছি একটু ... কাজ আছে... ' ----- ' ও। আমার বাড়ি তো ওদিকে... 'অনুমিত বলে ফেলল, ' হ্যাঁ জানি... ' মনোমিতা অবাক হয়ে বলল, ' তাই ? 'অনুমিত দ্রুত সামলে নিল, ' মানে, গেস করে নিলাম। ওদিক থেকে আসছেন যখন... '----- ' ও আচ্ছা ... ঠিক আছে... 'বলে মনোমিতা এগোবার জন্য পা বাড়াল। অনুমিতের স্বভাব চরিত্র গত মাস দুয়েকে ভালোরকম জানা হয়ে গেছে তার। জায়গাটায় লোকজন নেই বললেই চলে। বেশিক্ষণ দাঁড়ানোটা নিরাপদ না। এসব লোককে কিছু বিশ্বাস নেই। নিশ্চয়ই বাবার ভয়ে এখন একটু মিইয়ে আছে। কিন্তু আবার বদমায়েসি শুরু করতে কতক্ষণ। এরা কখনও বদলায় না। এর মধ্যেও তো একদিন... যাকগে... সে অনুমিতের পাশ কাটিয়ে সামনে পা বাড়াতে অনুৃমিত বলল, ' দেখলাম... 'মনোমিতা ভদ্রতাবশত দাঁড়িয়ে গেল। ----- ' কী ? '----- ' ফেসবুকে আপনার রিলটা দেখলাম। সি জে পি -র ক্যাম্পেনিংয়ের ব্যাপারে... খুব গাটসি স্পিরিটেড প্রেজেন্টেশান হয়েছে... আই লাইকড ইট... ' মনোমিতার একটা স্বস্তির শ্বাস পড়ল। বলল, ' দিল্লী গিয়েছিলাম, যন্তর মন্তরের প্রোগ্রামে। কাল ফিরেছি। আবার যাবার কথা আছে নেক্সট উইকে যদি ক্যাম্পেনটা কন্টিনিউড হয় ... ' মনোমিতার মুখে যেন একটা অদ্ভুত আলো এসে পড়ল। অনুমিত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। মনোমিতার কেমন একটা অস্বস্তি হতে লাগল। জায়গাটায় লোকজন কম। সে বলল, ' আচ্ছা... আসি তা'লে। আন্টিকে বলবেন আমার কথা। আসি ... ' কিন্তু মনোমিতা পা বাড়াবার আগেই অনুমিত বলল, ' ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড, একটা কথা বলব ? 'মনোমিতার মনে এক ফালি উদ্বেগ জমা হল। কিন্তু কোন উপায় নেই। বলল, ' হ্যাঁ, বলুন না... ' ----- ' আমার একটা রিকোয়েস্ট আছে। আগে যেগুলো হয়েছে সেগুলো ভুলে যান, আর ইয়ে... 'অন্যদিকে তাকিয়ে ঝট করে বলল, ' ফরগিভ মি। জাস্ট ফরগেট অ্যান্ড ফরগিভ... ' মনোমিতা বেশ ফাঁপরে পড়ে গেল। ভাবল, এ তো বেশ ঝামেলায় পড়া গেল। এই ধরনের লোকজনকে একেবারেই বিশ্বাস করা যায় না। নতুন কোন মতলব আঁটছে কে জানে। অবশ্য, তেমন উদ্ভাবনী দক্ষতা এর আছে বলে মনে হয় না। ভাবল, এরা বেসিক্যালি ডাল হেডেড হয়। সে আর কী বলবে, মৃদুস্বরে দায়সারা ভঙ্গীতে বলল, ' ঠিক আছে ঠিক আছে। আসলাম... 'আসলাম বলল বটে কিন্তু আসা গেল না। অনুমিত তাড়াতাড়ি বলল, ' আর একটা কথা ছিল... ' ----- ' হুঁ... বলুন... ', মনোমিতা বেশ বিড়ম্বিত বোধ করছে। অনুমিত এর পর যেটা বলল সেটা মনোমিতার অনুমানের বাইরে ছিল। অনুমিত কিছুটা লাজুক মুখে বলল, ' কক্রোচের ব্যাপারটা ডিটেলে জানতে চাই। এখন যেটা হচ্ছে... মিস্টার ওয়াংচুকের ইস্যুটাও বুঝতে চাই ... 'মনোমিতা অনুমিতের মুখে এসব কথা শুনলেও মোটেই আবেগে গলে গেল না। সে বলল, ' সোশ্যাল মিডিয়ায় তো প্রচুর এক্সপোজার হচ্ছে। ওখানে সব পাবেন... '----- ' হ্যাঁ কিছুটা দেখেছি। আপনারা যারা ডায়রেক্টলি ইনভলভড আছেন তাদের কাছে শুনতে চাই। আমি এসব নিয়ে ভাবিনি আগে... ' ----- ' আচ্ছা ঠিক আছে। শিঞ্জিনী ম্যাডামকে বলবেন। যাব একদিন। ওখানেই ডিসকাস করব... আচ্ছা আসি এখন। লেট হয়ে যাচ্ছে... ' ----- ' ইয়েস... অফ কোর্স। আসুন আসুন। ওহ্ ইয়েস... আর একটা লাস্ট কথা... আমি দিল্লী যেতে চাই প্রোগ্রামটা জয়েন করতে। আপনি আবার কবে যাবেন ? ' ----- ' আমি ডেট ফিক্স করিনি এখনও। আপনি যে কোনদিন যেতে পারেন। যে কেউ যেতে পারে যন্তর মন্তরে। এখন সোনম স্যার কেমন থাকেন তার ওপর ডিপেন্ড করছে... ' কথাটা অনুমিতের পছন্দ হল কিনা ঠিক বোঝা গেল না। সে বলল, ' হুঁ... তা ঠিক। দেখি কী করা যায়... ওখানে হয়ত দেখা হবে... ' মনোমিতা আর দাঁড়াল না। হাঁটতে শুরু করল জোর পায়ে। ( ক্রমশ ) ********************************************
    দেওয়া-নেওয়া  - Srimallar | মন যদি কাল শুকনো স্রোতে আরাম নামায়, কী করবে? হয়তো তখন ঘোরের মধ্যে নিজের ভেতর খুঁজবে প্রেম!  প্রশংসাশোক বাসলে ভালো, ঠোঁটের কাছে অন্তরাল... বাতাস তোমার মাঙ্গলিক আর জয়ের ঊর্ধ্বে সাম্য লাল!  আহত সাত ঘোড়ার প্রতি তোমার মায়ের বিতৃষ্ণায়—ঘাসের রঙে ঘটছে বদল, নতুনশাসক ব্যবস্থায়...  ছন্দে তুমি মন রাখোনি, অগত্যা কাল কী করবে? তোমায় দিচ্ছি দ্বন্দ্ব সমাস। আমাকে দাও সান্ধ্যমেঘ...
    ভুলডোজার।  - Sobuj Chatterjee | শনিবারের বারবেলাতে প্রেমটা চটকে গেলোইসাবেলার ভুলডোজার-বাবা হাজির হলো; মাথায় টাকবেজায় রাগ-উত্তরে তে ছিলো!!
  • ভাট...
    commentalbert banerjee | মাফ করবেন ওই সরল সাধাসিধা ভদ্রলোককে নিয়ে ভুল ভালকথা না বললে গালটা দিতাম না।
    commentalbert banerjee | দীপ চালান ভাই মুশকিল হচ্ছে আপনি মনুটাও পড়েন নি।
    অমোঘ লীলা বাঞ্চোদ এর নাম মনে আছে রামকৃষ্ণকে নিয়ে ভুলভাল বলেছিলো
    commentহে হে | সেকিবে চাড্ডির পো তিন বচ্ছর আগে ইস্কনের পিন্ডি চটকেছিলিস নিকি গপাস করে গিলে নিইছিলি? তিন বচ্ছরে ভরে ভরে সাইট নোংরা করে গেচিস একটা রা ও ত কাড়িস নি ইস্কন নিয়ে। তিন বচ্চরের নলচের আড়ালে কি আর তোর ওই ধামার মত পোঁদ ঢাকা পড়ে নিকি?
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত