এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই

  • তাজা বুলবুলভাজা...
    এক পা আগে, তিন পা পিছে - নরেশ জানা | বারোই জুলাই কেন্দ্রের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান অবশেষে জানিয়ে দিলেন যে, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগের স্নাতক স্তরের পাঠ্যসূচিতে কোন রদবদল করা হচ্ছে না এবং ওই পাঠ্যসূচিতে 'মনু স্মৃতি'র অংশ বিশেষ অন্তর্ভুক্তি করার যে প্রস্তাব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ফ্যাকাল্টি সুপারিশ করেছিল তা বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষামন্ত্রী এ কথাও বলেন যে, কেন্দ্র সরকার দেশের সংবিধানকে সর্বত ভাবে মান্যতা দিয়ে চলবে এবং সংবিধানের সঙ্গে সাযুজ্য নেই এমন কোন জিনিস গ্রহণ করবে না। শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা আগে অর্থাৎ এগারো জুলাই প্রায় মধ্য রাতে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যোগেন্দ্র সিং জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, পাঠ্যসূচিতে মনু স্মৃতি অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব তিনি তাঁর একক ক্ষমতা বলে বাতিল করে দিয়েছেন। আশ্চর্যের বিষয় হল দুটি ঘোষণাই খুবই তড়িঘড়ি করে করা হল। তড়িঘড়ি এই কারণেই বলা যে, আর কিছুক্ষণ পরেই বাতিল হওয়া প্রস্তাবটি বিশ্ব বিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে আলোচনা হতে যাচ্ছিল। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ফ্যাকাল্টির তরফে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে প্রস্তাবটি পেশ করার কথা ছিল। যে দ্রুততার সঙ্গে সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তরফে প্রস্তাবটি বাতিল করা হয় তাতে এমনটা মনে হতে পারে যে, কেন্দ্র সরকার কিংবা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই ধরনের উদ্ভট প্রস্তাব সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। তাই প্রস্তাবটি দেখা মাত্রই খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। যদিও বিষয়টি তেমন নয় বরং তার উল্টো। খুবই পরিকল্পনা মাফিক 'মনু স্মৃতি'-র মত একটি পশ্চাৎপদ ভাবনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের পাঠ্য হিসেবে আনার চেষ্টা করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল যাতে ভবিষ্যতের আইনবিদরা বিশ্বের আধুনিক আইন ব্যবস্থার পরিবর্তে ব্রাহ্মণ্যবাদী অনুশাসন সমূহের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতীয় আইন ব্যবস্থাকে দেখতে পারেন। গত জুন মাসে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ফ্যাকাল্টি আইন বিভাগের প্রথম ও তৃতীয় বর্ষের (এলএলবি) ছাত্রছাত্রীদের 'মনুস্মৃতি' বা 'মনুর আইন' পড়ানোর লক্ষ্যে পাঠ্যসূচিতে ওই সংশোধনী আনতে চেয়ে একটা সভা করেছিল। সেখানেই আইন ফ্যাকাল্টির সদস্যরা সর্ব সম্মতিক্রমে এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছিল। ঠিক হয়েছিল বিষয়টি অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে পাঠানো হবে জন্য প্রস্তাব আকারে। বারো জুলাই এই অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। পাঠ্যসূচি বা সিলেবাস সংক্রান্ত দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা এই অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলে প্রস্তাবটি আলোচনার আগেই আইন তা খারিজ করে দেন উপাচার্য অধ্যাপক যোগেশ সিং এবং কয়েক ঘণ্টা বাদে সরকারের তরফে শিক্ষা মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। ওই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, মনুস্মৃতি বিষয়ক দু'টি বিশেষ ভাষ্য গঙ্গানাথ ঝা'র 'মনুস্মৃতি উইথ মনুভাষ্য অব মেধা তিথি' এবং টি কৃষ্ণস্বামী আয়ারের 'কমেন্টারি অব মনুস্মৃতি- স্মৃতিচন্দ্রিকা' আগামী আগস্ট মাস থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন পাঠ্যবর্ষ থেকে শুরু করা হোক। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে যে, গত চব্বিশ জুন ফ্যাকাল্টির কোর্স কমিটির বৈঠকে 'সর্বসম্মতিতে' এই পাঠ্যসূচি পরিমার্জনের প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়। সেই বৈঠকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ২০২৩ সালে আইন বিভাগের প্রধান তথা 'ফ্যাকাল্টির ডিন অধ্যাপিকা অঞ্জু ওয়ালি টিকু। এই প্রস্তাবটি জানাজানি হওয়ার পরই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতায় নামেন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের বামপন্থী সংগঠন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক টিচার্স ফ্রন্ট (এসডিটিএফ)। উপাচার্য যোগেশ সিংকে লেখা এক চিঠিতে এসডিটিএফ'র চেয়ারপারসন এসকে সাগর এবং সাধারণ সম্পাদক এসএস বারওয়াল স্পষ্ট বলেছেন, "প্রস্তাবিত এসব ভাষ্য সমাজে পশ্চাদমুখী দৃষ্টিভঙ্গি প্রচার করে; মহিলা এবং প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকারের বিরোধিতা করে; প্রগতিশীল শিক্ষাব্যবস্থারও সম্পূর্ণ বিরোধী।"ওই অধ্যাপকরা বলেছেন, "ছাত্রছাত্রীদের মনুস্মৃতি পড়ানোর সুপারিশ অত্যন্ত আপত্তিকর। কারণ মনুস্মৃতি আসলে ভারতের মহিলা ও পিছিয়ে থাকা মানুষের প্রগতি এবং শিক্ষার উলটো কথা বলে।” উপাচার্যকে অধ্যাপকরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, "মনুস্মৃতির বেশ কয়েকটি জায়গায় মহিলাদের শিক্ষা ও সমানাধিকারের বিরোধিতা করা হয়েছে। ফলে মনুস্মৃতির কোন অধ্যায় বা অংশ পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক কাঠামো এবং নীতির পরিপন্থী হবে।" শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান যেন অনেকটা এই ভাবনার প্রতিফলন ঘটিয়ে তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, "ভারতীয় সংবিধানকে সর্বত ভাবে মান্যতা দিয়ে চলবে এবং সংবিধানের সঙ্গে সাযুজ্য নেই এমন কোন জিনিস গ্রহণ করবে না।" অথচ মজার বিষয় হল, ধর্মেন্দ্র প্রধানের এই বক্তব্য বিজেপি এবং তার মতাদর্শ নিয়ন্ত্রক আরএসএসের ভাবনার পরিপন্থী। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর থেকেই শিক্ষা সংস্কৃতি, ইতিহাস থেকে থেকে বিজ্ঞান, সর্বত্রই পশ্চাদমুখী ভাবনাচিন্তা ঢুকিয়ে দেওয়ার যে ঘৃণ্য অভিযান শুরু হয়েছে তারই অঙ্গ হিসেবে মনু সংহিতাকে ভারতের আইন হিসেবে চালু করার চেষ্টা চলছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা চাইছে আইনের আড়ালে সাম্প্রদায়িক ও জাতপাতের ব্যবস্থাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার।২০২৩ মোদী সরকারের শেষ দশ বছরের সংসদের শেষ অধিবেশন হয়। সেই শীতকালীন অধিবেশনে অধ্যক্ষ নজিরবিহীন ভাবে ১৪৬ জন বিরোধী সাংসদকে বহিষ্কার করে দেশের জন্য নতুন আইন বিধি প্রণয়ন করে। ২০২৪ সালের পয়লা জুলাই থেকে দেশে ওই নতুন তিনটি আইন বিধি চালু হয়েছে যা ভারতীয় আইন সংহিতা নামে পরিচিত। সরকারের আসল উদ্দেশ্য ছিল ওই আইন সংহিতা সমূহের পরিপ্রেক্ষিতে একটি মনুবাদী আইনি চিন্তাধারাকে ক্রমশ সংঘটিত করা। পাঠ্যসূচিতে সেই ভাবনার অনুপ্রবেশ ঘটানো। যে কারণে এই প্রস্তাবের প্রধান উদ্যোক্তা, ফ্যাকাল্টির ডিন অধ্যাপিকা অঞ্জু ওয়ালি টিকু বলেছেন, "পাঠ্যসূচিতে মনু স্মৃতির অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাবটি ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতির (এনইপি-২০২০) লাইনকে অনুসরণ করেই তৈরি করা হয়েছিল।" তিনি আরও বলেছেন, "মনু স্মৃতি মহিলাদের স্বনির্ভরতা ও শিক্ষা বিস্তারের বিরোধী এবং পিছিয়ে পড়া মানুষদের অগ্রগতির পরিপন্থী বলে যে দাবি করা হয় তা ভুল।" অর্থাৎ অধ্যাপিকা টিকু পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে তিনি যা করেছেন তা বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকারের ভাবনার প্রতিফলন। এমনটা নয় যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কিংবা সরকার এসব জানত না। আসলে ২০২৪ লোকসভা নির্বাচন ভারতের অষ্টাদশ লোকসভার চরিত্র আমূল বদলে দিয়েছে। ২০২৩ সালের সর্বশক্তিমান নরেন্দ্র মোদী এবং তাঁর দলকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিয়েছে অষ্টাদশ লোকসভা। এখন আর 'মোদী সরকার' কিংবা 'মোদীর বিজেপি সরকার' বলতে পারা যাচ্ছে না। খুব কষ্ট করে নরেন্দ্র মোদীকে বলতে হচ্ছে, এনডিএ সরকার। সংসদে একটি শক্তিশালী বিরোধী জোটের বিরুদ্ধে তাঁকে নির্ভর করতে হচ্ছে একটি অস্থিতিশীল জোটের ওপর। মোদীর জোটের বন্ধুরা হলেন অন্ধ্রপ্রদেশের চন্দ্রবাবু নাইডু এবং বিহারের নীতিশ কুমার। দু’জনেই আঞ্চলিক ও নিজ নিজ অঞ্চলের স্থিতিস্থাপকতা আঞ্চলিক কম্পালসনের ওপর নির্ভরশীল। এই কম্পালসন দু’জনেরই হাতের বাইরে। এই রকম পরিস্থিতিতে দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্কে জড়াতে চাইছেনা বিজেপি। যে কারণে ধীরে চলার নীতি। যে কারণে পিছিয়ে আসা পাঠ্যসূচিতে মনু স্মৃতির অন্তর্ভুক্তিকরণ প্রক্রিয়া থেকে।২০২৪ লোকসভায় নরেন্দ্র মোদীর চারশো পারের খোয়াব যদি সত্যি সত্যি বাস্তবায়িত হত তাহলে ২০২৫ সালে আরএসএসের শতবর্ষে সংঘকে হিন্দু রাষ্ট্র উপহার দেওয়া কিংবা আইন হিসেবে মনু সংহিতাকে প্রতিষ্ঠিত করা অসম্ভব ছিল না খুব। কারণ নিজের তৃতীয় দফার সরকারে তিনি যে সংবিধান বদলাবেন এমন আভাস নরেন্দ্র মোদী নিজে এবং অমিত শাহ দিয়ে রেখেছিলেন। নির্বাচনের প্রাক্কালে বারংবার তাঁদের বিরক্তি প্রকাশ পেয়েছে মুসলিম ও দলিতদের প্রতি। বড়সড় আঘাত আসার উপক্রম হয়েছিল পিছিয়ে পড়া অংশের জন্য বরাদ্দ সংরক্ষণ নীতিতে। এই নীতিগুলি নিয়ে আপাতত নীরব থাকবে বিজেপি কারণ অন্ধ্রপ্রদেশ ও বিহারের মুখ্যমন্ত্রীরা তাহলে বিজেপির সঙ্গ ত্যাগ করবে। কিন্তু তার জন্য পুরোপুরি থেমে থাকবে না এই প্রচেষ্টা। এটা মনে করার কোন কারণ নেই যে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ঘোষণার সাথে সাথে বিজেপি বা আর এস এস এই প্রস্তাবটিকে পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছে। তারা সময়ের জন্য অপেক্ষা করছে মাত্র। পরিস্থিতির কারণেই এক পা এগিয়ে তিন পা পিছিয়ে এলো তারা। সুযোগ পেলে লাফানোর কসুর করবে না তারা। নতুন বন্ধু খোঁজার প্রবল প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিজেপি। তেমন বন্ধু পেলে স্বরূপে ফিরবেনই মোদী। তাই আত্মসন্তুষ্টির কোন জায়গা না রাখাই ভালো।
    ডেভিড লিভিংস্টোনের খোঁজে-১৪৬ - হেনরি মর্টন স্ট্যানলে | সূর্যাস্তের সময় বাগামোয়ো শহরে প্রবেশ করলাম। "আরও তীর্থযাত্রী শহরে আসে," বেউলাতে এই কথাগুলো শোনা গেল। "শ্বেতাঙ্গ লোকটি শহরে এসেছে," আমরা বাগামোয়োতে এই শব্দগুলো শুনলাম। আর আগামীকাল আমরা জল পেরিয়ে জাঞ্জিবারে যাব, সোনার দরজা দিয়ে প্রবেশ করব; আর কিছুই দেখতে হবে না, কোন গন্ধ শুঁকতে হবে না, আর পেটের পক্ষে আপত্তিকর কিছুর স্বাদ আর পেতে হবে না!কিরাঙ্গোজি তার শিঙা বাজাতে থাকল, আস্টলফো১-এর জাদু-শিঙ্গার মতন প্রায় বিস্ফোরণের সম্ভাবনা দেয় আর কি! স্থানীয়রা ও আরবরা আমাদের চারপাশে ভিড় করে এলো। আর সেই উজ্জ্বল পতাকা, যার নক্ষত্রগুলি মধ্য আফ্রিকার বিশাল হ্রদের জলের উপর দুলেছিল, যেটি উজিজিতে দুর্দশাগ্রস্ত, নির্যাতিত লিভিংস্টোনের কাছে ত্রাণের প্রতিশ্রুতি হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল, সে আবার সমুদ্রে ফিরে এলো - ছেঁড়া অবস্থায় তা সত্য, তবে কোন ভাবেই অসম্মানিত নয়- ছিন্ন-ভিন্ন, কিন্তু পূর্ণ-সম্মানে।শহরের কেন্দ্রে পৌঁছে, একজন শ্বেতাঙ্গকে দেখতে পেলাম। একটা বড়, সাদা বাড়ির সিঁড়িতে দাঁড়িয়েছিলেন। আমারই মতো ফ্ল্যানেল ও হেলমেট তাঁর পরনে; অল্পবয়সী, লালচে-গোঁফওলা; ঝকঝকে, প্রাণবন্ত, হাসিখুশি মুখ, একদিকে সামান্য হেলানো মাথাটি তাঁর চেহারাতে একটা বেশ চিন্তাশীল ভাব এনে দিয়েছিল। শ্বেতাঙ্গটি আমারই মতো মনে হল। তাঁর দিকে এগিয়ে গেলাম। তিনিও আমার দিকে এগিয়ে এলেন, আমরা করমর্দন করলাম – পরস্পরকে জড়িয়ে ধরাটুকুই যা শুধু বাদ রইল। “ভেতরে আসবেন না?” তিনি বললেন.“ধন্যবাদ।”"কী নেবেন - বিয়ার, স্টাউট, ব্র্যান্ডি? ওহো, বাই জর্জ! আপনার দুর্দান্ত সাফল্যের জন্য অভিনন্দন জানাই,” তিনি আবেগাভিভূত হয়ে বলে উঠলেন।তখনই তাঁকে বুঝে ফেললাম। ইনি একজন ইংরেজই হবেন । এরকম কাজ করা তাদেরই অভ্যাস; তবে মধ্য আফ্রিকায় ব্যাপারটা একটু অন্যরকম ছিল। (“অসাধারণ সাফল্য! এইভাবেই কি আমার অভিযানকে দেখা হবে? তবে তাও ভাল। কিন্তু ইনি কীভাবে এসম্পর্কে জানলেন? ওহ, ভুলেই গেছি। আমার দূতেরা কথা রটিয়েছে, বুঝলাম।)“ধন্যবাদ। যা দেবেন তাতেই চলবে।”“আসুন একটু বিয়ার খাই। এই ছোকরা তাড়াতাড়ি দে, না হলে তোকে পিটিয়ে ছাতু করব," সে হেঁকে-ডেকে বলল।তারপর যা কথাবার্তা হল, তার আর বিশদ বিবরণ দিয়ে কী হবে! শীঘ্রই তাঁর নিজস্ব লঘুচালে, মজা করে জানালেন তিনি কে, কেন এসেছেন, তাঁর কী আশা-আকাঙ্ক্ষা, কেমন ধ্যান ধারণা আর বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কীই বা মনে করেন। তিনি হলেন লেফটেন্যান্ট. উইলিয়াম হেন, আর.এন। রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি লিভিংস্টোনকে খুঁজে বের করার ও ত্রাণ পাঠানোর জন্য যে লিভিংস্টোন অনুসন্ধান ও ত্রাণ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে, সে অভিযানের তিনি নেতা। অভিযানের পরিকল্পনার গোড়ায় লেফটেন্যান্ট. লেওয়েলিন এস ডসন-কে এর নেতা হিসেবে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু আমার লোকদের থেকে তিনি যখন শুনেছিলেন যে আমি লিভিংস্টোনকে খুঁজে পেয়েছি, তখন তিনি জাঞ্জিবারে চলে গিয়েছেন, আর ডক্টর জন কার্কের সঙ্গে পরামর্শ করার পরে, পদত্যাগ করেছেন। তার এখন আর কোন দায়িত্ব নেই, সকল দায়িত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে লেফটেন্যান্ট. হেনের উপর দেওয়া হয়েছে। মোম্বাসার একজন মিশনারি মিস্টার চার্লস নিউও এই অভিযানে যোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনিও দায়িত্ব ত্যাগ করেছেন। অগত্যা এখন পরে আছেন লেফটেন্যান্ট. হেন ও মিস্টার অসওয়াল্ড লিভিংস্টোন, ডাক্তারের দ্বিতীয় পুত্র।“মিস্টার অসওয়াল্ড লিভিংস্টোন এখানে?" আমি বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।“হ্যাঁ; তিনি সোজা এখানেই আসছেন।”“আপনি এখন তাহলে কি করবেন ?” আমি জানতে চাইলাম।“মনে তো হয় না যে এরপর আর যাওয়ার কোন মানে হয়! আপনি আমাদের পালের হাওয়া পুরো কেড়ে নিয়েছেন। যদি আপনি তাঁর প্রয়োজন মিটিয়েই থাকেন, তবে আর আমার গিয়ে কী লাভ? আপনার কি মনে হয়?”“দেখুন, এটা অনেক কিছুর উপর নির্ভরশীল। আপনাকে ঠিক কি হুকুম দেওয়া হয়েছে সেটা আপনিই সবচেয়ে ভাল জানেন। .আপনি যদি কেবল তাকে খুঁজে বার করতে ও তাঁকে আরও রসদ জোগাতে এসে থাকেন, তাহলে আপনাকে সত্যই বলতে পারি যে তাঁকে খুঁজে পাওয়া গেছে, রসদও দেওয়া হয়েছে। কয়েকটিন মাংস ও আর কয়েকটা খুচরো জিনিস ছাড়া আর কিছুই তার দরকার নেই। তার নিজের হাতে লেখা প্রয়োজনীয় জিনিসের তালিকা আমার সঙ্গেই আছে। তবে তার ছেলেকে তো যেভাবেই হোক যেতে হবে, এবং সে বাবদে প্রয়োজনীয় লোকলস্কর আমি যথেষ্ট সহজেই পেয়ে যাব।”“আচ্ছা, তিনি স্বস্তিমত থাকলে আর আমার গিয়ে কোনো লাভ নেই।’“ভেবেছিলাম ভাল ভাল শিকার করব। আমি শিকার করতে খুব পছন্দ করি। একটা আফ্রিকান হাতিকে মারার যে আমার কত শখ!”“হ্যাঁ, লিভিংস্টোনের আপনাকে প্রয়োজন নেই। তিনি জানিয়েছেন যে তাঁর কাছে প্রচুর রসদ আছে— তাঁর হাতের কাজ আরামদায়কভাবে শেষ করার জন্য সেই রসদ যথেষ্ট! আর নিশ্চয় তিনিই এটা সব থেকে ভাল বুঝবেন। তাঁর কোন কিছুর অভাব থাকলে তিনি নিশ্চয় সে কথা তালিকায় উল্লেখ করতেন। এর বেশি জিনিসই বরঞ্চ তার কাছে বাধা হবে। -সেসব বইবার লোক তো পাবেন না। এখানে কি কি আছে?"তিনি মৃদুহাস্যে বললেন, “আমাদের ভাণ্ডার কাপড় ও পুঁতিতে ভরা। একশ নব্বইটারও বেশি বস্তা রয়েছে।”“একশ নব্বই খানা মোট! ”“হ্যাঁ ”“আরে, এত মালপত্র নিয়ে কোথায় যাবেন? এত জিনিস বইবার মত যথেষ্ট লোক তো পুরো উপকূলেই নেই। একশ নব্বই বোঝা! সেসব বইতে তো অন্তত আড়াইশ লোক লাগবে, কারণ কমপক্ষে পঞ্চাশ জন অতিরিক্ত লোক তো নিতেই হবে!” এই সময়ে একজন লম্বা, হালকা, অল্প বয়স্ক, ভদ্রলোক প্রবেশ করলেন। ফ্যাকাশে গাত্রবর্ণ, পাতলা চুল, কালো ঝকঝকে চোখ, আমার সঙ্গে তাঁকে মিঃ অসওয়াল্ড লিভিংস্টোন নামে পরিচয় করানো হল। এই ভূমিকা অবশ্য প্রায় অপ্রয়োজনীয় ছিল, কারণ তাঁর চেহারায় তাঁর বাবার অনেকটাই ছাপ আছে। তাঁকে দেখলে বেশ স্থিরপ্রতিজ্ঞ বলে মনে হয়। আর তিনি আমাকে যেভাবে অভিবাদন করলেন, তার থেকে মনে হল তিনি বরং বেশ সংযতবাক। আমার অবশ্য মনে হল এটা তার ভবিষ্যতের জন্য ভাল কারণ আমি এই গুণটাকে নতুন ধারণা আশুগ্রাহিতার প্রকাশ হিসেবে দেখলাম। এই দুই যুবকের মত বিপরীতমুখী চরিত্র খুব কমই একসঙ্গে উপস্থিত হয়েছে। একজন চঞ্চল, অনাবশ্যক, অসংলগ্ন, প্রফুল্ল, অনিয়ন্ত্রিত জীবনীশক্তিতে সদা ফুটন্ত, অপ্রতিরোধ্য-রকমের অদম্য, হাসিখুশি ও আনন্দময়। অন্যজন শান্ত, সামান্য কঠোরও, সদা-অবিচলিত আচরণে, বিনীত রাশভারী, অটল-সংকল্পবদ্ধ, স্থিরতার প্রতিমূর্তি, তবে তার চোখের ঝিলিক অটল অভিব্যক্তিতে প্রাণসঞ্চার করে। দুজনের মধ্যে, আমার মতে পরের জন এমন একটি অভিযানের যোগ্যতর নেতা হতেন; যদিও উচ্ছল, সাহসী, সদা স্ফূর্তিতে ফুটতে থাকা হেনের যদি অন্যরকমের কালসহ গুণাবলী থাকে—যে সকল গুণ দৈহিক গঠনতন্ত্রের অংশ নয়, বরং মনের সঙ্গে যুক্ত - পুনঃ পুনঃ বিপর্যয়, জ্বর-জ্বালা, দুঃখ-কষ্ট ও অসুবিধার মধ্যেও ধৈর্য না হারানো ও সেসব সহ্য করার নৈতিক সাহস যদি তার থাকে, তাহলে সে একজন যোগ্য সঙ্গী বটে। মনে হল, লিভিংস্টোন প্রকৃতিগত ভাবে দায়িত্বের বোঝাকে বইতে সক্ষম। হেন যদিও পুরুষত্বের গুণসমূহ অর্জন করেছেন, তবু তাঁর স্বাভাবিক প্রাণোচ্ছলতা ও আবেগপ্রবণতার কারণে এই ধরনের দায়িত্বের জন্য এখনও খুব কম বয়সী বলে মনে হয়েছিল। “আমি লেফটেন্যান্ট হেনকে বলছিলাম যে তিনি যান আর নাই যান, আপনাকে আপনার বাবা মিস্টার লিভিংস্টোনের কাছে যেতেই হবে।”“ওহ, আমিও যাব বলেই ঠিক করেছি।”“হ্যাঁ, সেটাই ঠিক। আপনাকে ঠিকমত লোকজন দিয়ে দেব, আপনার বাবার কী রসদ প্রয়োজন তাও দেব। আমার লোকেরা আপনাকে ইউন্যান্যেম্বেতে নিয়ে যাবে - কোন সমস্যা হবে না। ওরা রাস্তাঘাট ভালই জানে, সেটা একটা বড় সুবিধা। তারা জানে কিভাবে নিগ্রো সর্দারদের মোকাবিলা করতে হয়, তাদের সম্পর্কে আপনার মাথা ব্যথা করারও দরকার নেই, শুধু হাঁটতে হবে। যেটা সবথেকে বেশি দরকার তাহল খুব দ্রুতগতিতে চলা. আপনার বাবা জিনিসপত্রের জন্য অপেক্ষা করবেন।”“সেরকম হলে আমি ওদের খুবই তাড়াতাড়ি হাঁটাব।”“হ্যাঁ, ওরা তো মোট ছাড়া হাঁটবে, কাজেই সহজেই লম্বা পথ পাড়ি দিতে পারবে।”ব্যাপারটা ওখানেই মিটে গেল। হেন মনস্থ করলেন যে, ডাক্তারকে যেহেতু রসদের যোগান দেওয়া হয়েছে, তাঁর আর যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু, আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করার আগে, তিনি একবার ডক্টর কার্কের সঙ্গে পরামর্শ করতে চাইলেন। সেই উদ্দেশ্যে তিনি হেরাল্ড অভিযানের সঙ্গে পরের দিন জানজিবারে যাবেন।দুপুর দুটোয় আমি আরামদায়ক এক বিছানায় গা ঢেলে দিলাম। শয়নকক্ষের কিছু কিছু জিনিসপত্র যেমন হ্যাভারস্যাকস, ন্যাপস্যাকস, পোর্টম্যান্টো, চামড়ার বন্দুকের বাক্স-এসবের থেকে একটা দারুণ নতুন নতুন গন্ধ বেরোচ্ছে। নতুন অভিযানে হাত পাকাচ্ছে তো এঁরা, এখনও ভাল মতন বুদ্ধি পাকেনি; সবারই প্রথম প্রথম এমন হয়, তবে আফ্রিকার অন্দরমহল থেকে একবার ঘুরে এলেই এইসব বাড়াবাড়ি উবে যাবে। আহ! বিছানায় শুয়ে কী যে একটা স্বস্তির শ্বাস ফেললাম! ভাবলাম, “ঈশ্বরকে ধন্যবাদ! আমার হন্টনপর্ব শেষ হল।”১অ্যাস্টলফো ফরাসী গল্পের কাল্পনিক নায়ক, যে বহুবিধ জাদু-দ্রব্যের মালিক ছিল। এর জাদুশিঙার শব্দে সকল শত্রু পালিয়ে যেত। (এইখানে ষোড়শ অধ্যায়ের শেষ)ক্রমশ…
    প্রকৃতির রুদ্রমূর্তির কাছে সুন্দরবনের আত্মসমর্পণ বিনা আর কি কোন পথ নেই! - ডঃ দেবর্ষি ভট্টাচার্য | সমুদ্রগর্ভ থেকে উঠে এসে ঝাঁপিয়ে পড়া সর্বগ্রাসী তাণ্ডব চূর্ণবিচূর্ণ করে ফেলে নিত্যনৈমিত্তিক দ্বীপ-যাপন। তার পোশাকি নাম যাই হোক না কেন, দ্বীপভূমিতে ফি বছরই বিধ্বংসী আঘাত হানে সেই হিংস্র দানব। তছনছ করে দেয় ঘর-গেরস্থালী। কূলপ্লাবী নোনা জলোচ্ছ্বাসে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় স্বপ্নমাখা পোয়াতি শস্যক্ষেত্র। জীবিকা আগলানোর দায় তখন শিকেয়। প্রাণপণে অসহায় জীবন আগলে রাখার পরিত্রাহি কলরবেই ত্রস্ত চরাচর। নৃশংস মৃত্যুদানব যেন গিলে খেতে আসছে একের পর এক আস্ত জীবনকে। আজন্মের ভিটেমাটির মায়া ত্যাগ করে, উঁচু রাস্তার ঠিকানায় আশ্রিত সর্বস্বান্ত মানুষগুলো থরথর করে কাঁপতে থাকে জীবনের ভার অমোঘ অদৃষ্টের কাছে গচ্ছিত রেখে। কালের নিয়মে, হিংস্র মৃত্যুদানবের উন্মত্ত নেশাতে এক সময় অবসাদ এসে জমাট বাঁধে। অহর্নিশি তোলপাড়ের ক্লান্তিতে খরস্রোতা নদীর চোখ ক্ষণিকের তরে বুজে আসে। বিধ্বস্ত চরাচরে ঝুপ করে নেমে আসে শ্মশানের স্তব্ধতা। গোবর নিকানো আদুরী উঠোনময় শুধু চরে বেড়ায় স্মৃতির বিধ্বংসী খণ্ডচিত্র। সুন্দরবনের মানুষদের আছেটাই বা কি, যে হারাবে! কিঞ্চিত জমি-জিরেত, খান কয়েক গবাদি পশু, স্বপ্ন বোঝাই ডিঙি নৌকো, আর নদীর ওপারের ভয়াল বাদাবন। অতএব, নতুন চাক বাঁধার স্বপ্নে বিভোর হয়ে আবার নতুন করে শুরু হয় বিন্দু বিন্দু মধু সঞ্চয়ের দিবারাত্রির কাব্য। স্বপ্নের শরীরে একটু একটু করে আশার পলি গেঁথে ফের মাথা তোলে স্বস্তির বাঁধ। মৃত্যুর ঘোর স্তিমিত হতেই আবার ডালপালা মেলে জাঁকিয়ে বসে দ্বীপ-জীবন। মেঠো ফুলের খিলখিল হাসিতে ভরে যায় আবাদ প্রান্তর। ঝাঁক ঝাঁক পাখির কোলাহলে মুখরিত হয়ে ওঠে নদী বেষ্টিত চর-জীবন। নোনা হাওয়ায় শ্বাস ভরে সুন্দরবন ব-দ্বীপ আবার খুঁজে নেয় নতুন জীবনের সুলুক সন্ধান। ক্যালেন্ডারের দিনক্ষণ মেনে সাক্ষাৎ মৃত্যুদূত ঝাঁপিয়ে পড়ে লণ্ডভণ্ড করে দেয় দ্বীপ জীবনের বারোমাস্যা। ফি বছর নদী বাঁধ গড়া হয়। আবার ফি বছর সেই বাঁধ চৌচির করে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে বিষাক্ত নোনা জল। দ্বীপভূমির মিঠে স্বাদে এক লহমায় ভরে ওঠে নোনতা গরল। রক্ত জল করে ফলানো ফসল উজাড় হয়ে যায় নোনা গরলের দংশনে। পাক্কা তিন বছর লেগে যায় আবাদি জমির জিভ থেকে নোনা স্বাদ ধুয়ে মুছে সাফ করতে। এভাবেই মরে যেতে যেতে আবার বেঁচে থাকার খড়কুটোর সন্ধানে ঝাঁপিয়ে পড়ে শোলমাছের মতো গড়নের বাদাবনের লড়াকু মানুষজন। নদীর জল পলিকে সঙ্গী করে ছুটে আসে সাগরের অমোঘ টানে। জোয়ারের সময়ে সমুদ্রের বিপরীতমুখী জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কায় সেই পলিগুলো ছড়িয়ে পড়ে চারিপাশে। ভাঁটা আসতেই পলিগুলো নদীবক্ষের চারিপাশে থিতু হয়ে জমতে শুরু করে। এমনিভাবেই জোয়ার-ভাঁটার অমোঘ নিয়ম মেনে পলি জমে জমে নদীবক্ষে গজিয়ে ওঠে নতুন চরাচর। নতুন জীবনের সুলুক। একদিন কাকভোরে সেই চরাচর ফুঁড়ে উঁকি মারে তিরতিরে চারাগাছ। আকাশের ঠিকানায় লেখা চিঠির গন্ধে ঠিক খবর যায় পাখিদের ডেরায়। কিচিরমিচির কলকাকলিতে ঘুম ভাঙে নব্য চরভূমির। জীবন যুদ্ধে দগ্ধ কিছু মানুষও এসে জড়ো হয় জনশূন্য দ্বীপের প্রশান্তির আশ্রয়ে। শুরু হয় জীবন যুদ্ধে টিকে থাকার অদম্য লড়াই। প্রতিকুল প্রকৃতিকে একটু একটু করে বাগে আনার নাছোড় প্রয়াসের হাতে হাত রেখে শুরু হয় নতুন দ্বীপ-জীবন। পৃথিবীর অন্যান্য ব-দ্বীপগুলোর তুলনায় সুন্দরবনের দ্বীপগুলো বয়সে ও গঠনে অপেক্ষাকৃত নতুন এবং যারপরনাই অপরিপক্ব। গঠনগতভাবে একটা মজবুত দ্বীপ গড়ে উঠতে দীর্ঘ সময় ধরে চরভূমিতে নদীবাহিত পলিমাটির আনাগোনা অবশ্য প্রয়োজন। কিন্তু নদীবাহিত পর্যাপ্ত পলিমাটি সমৃদ্ধ পরিপক্ব দ্বীপভূমি গঠিত হওয়ার প্রাক্কালেই সুন্দরবনের দ্বীপগুলোতে মানুষের আনাগোনা শুরু হয়ে যায়। মানুষ তাঁর বেঁচে থাকা ও জীবিকা নির্বাহের অমোঘ তাগিদে দ্বীপের অভ্যন্তরে সর্বনাশা নোনা জল আটকানোর প্রয়োজনে বসতি স্থাপনের শুরুতেই নদীবাঁধ তৈরি করে ফেলে। দ্বীপের চারিপাশে বাঁধ থাকার দরুন নদীবাহিত পলি দ্বীপের অভ্যন্তরে আনাগোনায় বাধাপ্রাপ্ত হয়ে নদীগর্ভেই থিতু হয়ে পড়ে। যার ফলস্বরূপ, নদীতল অগভীর হয়ে নদীর নাব্যতাকে কমিয়ে আনে এবং সাধারণ জোয়ারের সময়েই নদীজলের উচ্চতা প্রায় বাঁধের কাছাকাছি চলে আসে। সামুদ্রিক ঝড়ের প্রভাবে নদীতে যখন অস্বাভাবিক রকমের জলস্ফীতি হয়, তখন নদীবাঁধ উপচে বা ভেঙে চুরমার করে দ্বীপভূমিতে নোনা জল হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে। যার অবধারিত ফল হল, মিঠা মাটিতে ফলিত শস্যের অনিবার্য ধ্বংস, মিঠা জলে লালিত মাছের অবধারিত মৃত্যু, নোনা জলের ছোঁয়ায় আবাদি জমির ফসল উৎপাদন ক্ষমতার নিশ্চিত সর্বনাশ, পানীয় মিঠা জলের চরম আকাল এবং সর্বোপরি, নদী বেষ্টিত চরাচরের বাসিন্দাদের ঘোরতর জীবন সংশয়। গঠনগত দিক থেকে সুন্দরবনের দ্বীপগুলোর মধ্যেই বিস্তর তারতম্য রয়েছে। বৃহত্তর সুন্দরবন ব-দ্বীপের পশ্চিমাংশের দ্বীপগুলো, যেমন সাগরদ্বীপ, বকখালি-ফ্রেজারগঞ্জ ইত্যাদি, আকারে যথেষ্ট বড় এবং গঠনগত ভাবে অপেক্ষাকৃত পরিপক্ব। আবার সুন্দরবনের পূর্বাংশের দ্বীপগুলো, অর্থাৎ জঙ্গল লাগোয়া গোসাবা ব্লকের অন্তর্গত অধিকাংশ দ্বীপগুলো, আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট এবং গঠনগত ভাবে অপেক্ষাকৃত অপরিপক্ব। অর্থাৎ, নদী বাহিত পলিমাটির সর্বোত্তম স্তূপাকৃতির বেশ কিছুকাল আগে থেকেই এইসকল দ্বীপগুলোতে মানুষ বসতি গড়েছে। বেঁচে থাকা ও জীবিকা নির্বাহকে সুনিশ্চিত করার নিদারুণ প্রয়োজনে দ্বীপের চারিপাশে বাঁধ নির্মাণ করেছে। সেহেতু, মজবুত দ্বীপ গঠিত হওয়ার আগেই এই দ্বীপগুলিতে নদী বাহিত নতুন পলির আনাগোনা প্রকটভাবে ব্যাহত হয়েছে। ফলস্বরূপ, নদীবক্ষে জলস্ফীতির কারণে সুন্দরবনের পূর্বাংশের দ্বীপগুলোই অপেক্ষাকৃত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। পরিসংখ্যান বলছে, ফি বছর গড়ে পাঁচ থেকে ছয়টি ঘূর্ণিঝড় বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে সৃষ্টি হয়, যার মধ্যে অন্ততপক্ষে দুটি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হয়ে ভারতের পূর্ব উপকূলকে বিধ্বস্ত করে। গত কয়েক বছরে ভারতীয় উপকূলীয় অঞ্চল যে কয়টি ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবলীলা প্রত্যক্ষ করেছে, তার মধ্যে চারটিই উদ্ভূত হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। বঙ্গোপসাগরে এত ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হওয়ার পেছনে নির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে। বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের চারিপাশে মন্থর বাতাস এবং উষ্ণ বায়ুস্রোতের সাথে অধিক পরিমাণ বৃষ্টিপাত এমনিতেই সারা বছর উপসাগরীয় তাপমাত্রাকে তুলনামূলকভাবে ঊর্ধ্বমুখী রাখে। ব্রহ্মপুত্র, গঙ্গার মতো বহুবর্ষজীবী (পেরিনিয়াল) নদী বাহিত উষ্ণ জলের ধারাবাহিক প্রবাহ সমুদ্রের নীচের শীতল জলের সাথে মিশে যাওয়ার দরুন পরিস্থিতিকে আরও ঘোরালো করে তোলে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চ তাপমাত্রা বঙ্গোপসাগরের বায়ুর চাপকে ক্রমাগত নিম্নমুখী করে ফেলার ফলে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনা উদ্ভূত হয়। প্রশান্ত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগরের মধ্যবর্তী অঞ্চলে প্রশস্ত স্থলভূমির অভাবে ঘূর্ণায়মান বায়ু উপসাগরীয় অঞ্চলের দিকে অবাধে ধাবিত হয়। এই ধাবিত ঘূর্ণায়মান বায়ু সমুদ্রপৃষ্ঠে সৃষ্ট ঘূর্ণাবর্তের আকর্ষণে পুঞ্জীভূত হয়ে নিম্নচাপকে ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তর করে ফেলে। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য যেখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার (এসএসটি)প্রান্তিক মান ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস প্রয়োজন, সেখানে বঙ্গোপসাগর পৃষ্ঠের তাপমাত্রা (এসএসটি) প্রায়ই ৩১-৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকে। ফলস্বরূপ, বঙ্গোপসাগরে ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির সম্ভাবনা জোরালো হয়। এই কঠিন সময়ের মৌলিক প্রশ্নটা হল, সুন্দরবন ব-দ্বীপকে কি প্রকৃতির রোষানল থেকে আদৌ বাঁচানো সম্ভব? নাকি প্রকৃতির আপন খেয়ালেই সুন্দরবন একদিন তলিয়ে যাবে নদীগর্ভের অতলে? প্রশ্নটা নিঃসন্দেহে দুরূহ, কিন্তু সদিচ্ছা ও সুপরিকল্পনা থাকলে সুন্দরবনের দ্বীপগুলোকে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করা কি আদৌ অসম্ভব? পৃথিবীর অন্যান্য দ্বীপপুঞ্জের মতোই ঘূর্ণিঝড়ের ঝাপটায় সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসের ফলে বাঁধভাঙা বন্যার কারণে সুন্দরবনের দ্বীপগুলো ভয়ঙ্করভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারতীয় সুন্দরবন ব-দ্বীপ অধীনস্থ মোট ১০২ টি দ্বীপের মধ্যে মানুষের বসবাস ৫৪টি দ্বীপে। বাকি ৪৮টি দ্বীপ জঙ্গলাকীর্ণ এবং সুন্দরবন জাতীয় উদ্যানের অধীনস্থ। মনুষ্য অধ্যুষিত ৫৪টি দ্বীপের মধ্যে কোন্‌ কোন্‌ দ্বীপগুলোর ক্ষেত্রে কংক্রিটের পাকা নদী বাঁধ নির্মাণ আশু প্রয়োজন, তা নদী ও নির্মাণ বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় প্রশাসন ও অভিজ্ঞ জনসাধারণের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে স্থির করা হল প্রথম আবশ্যিক কাজ। দ্বিতীয় ধাপে, নির্মাণ প্রস্তাবিত নদীবাঁধগুলোর উচ্চতা ঠিক কতটা হওয়া সমীচীন, সেই সম্বন্ধে বিশেষজ্ঞ, গবেষক ও স্থানীয় অভিজ্ঞ মানুষদের মতামত অগ্রাধিকারের সাথে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তৃতীয় ধাপে, কতটা দৈর্ঘ্য জুড়ে এই কংক্রিটের নদীবাঁধ নির্মাণ আশু প্রয়োজন, তা জরিপ করা এবং যথাযথ নকশা ও অর্থমূল্যের প্রয়োজনীয়তা সমৃদ্ধ একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ। এর পরের ধাপটি হল, প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ এবং বরাদ্দ অর্থ অনুযায়ী ধাপে ধাপে নিষ্ঠার সাথে পাকা নদীবাঁধ নির্মাণ। সেই সঙ্গে আরও দুটি অতি গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্যকে বিন্দুমাত্র অবহেলা করলে সুন্দরবন ব-দ্বীপ অঞ্চলের কোন দ্বীপ এবং দ্বীপ বেষ্টিত কোন নদীবাঁধকেই কিন্তু টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। প্রথমটি হল, সুন্দরবনের মনুষ্য অধ্যুষিত দ্বীপের নদীবাঁধকে আবৃত করে এবং জঙ্গলাকীর্ণ দ্বীপগুলির অভ্যন্তরে প্রচুর সংখ্যায় ম্যানগ্রোভ বৃক্ষ রোপণ। সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়ের বিধ্বংসী তাণ্ডবকে রুখে দেওয়ার জন্য এই ম্যানগ্রোভ বৃক্ষরাশিই প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করে। ফলে, সুন্দরবন অঞ্চলের স্থলভূমিকে নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার সম্ভাবনা থেকে রক্ষা করার স্বার্থে দ্বীপের চারিপাশে পর্যাপ্ত সংখ্যায় ম্যানগ্রোভ বৃক্ষ রোপণ, লালন ও যথাযথ সংরক্ষণ অবশ্য প্রয়োজন। দ্বিতীয়টি হল, সুন্দরবনের মনুষ্য অধ্যুষিত দ্বীপগুলোর চারিপাশের নদীগুলিতে নিয়মিত ড্রেজিং-এর সুবন্দোবস্তের মাধ্যমে নদীবক্ষের নাব্যতা ফিরিয়ে আনা। লোকালয় বেষ্টনকারী নদীগুলো নাব্যতা ফিরে পেলে, জলস্ফীতির সময়ে বাঁধ উপচে বা ভেঙে নদীর নোনাজল সুন্দরবনের আবাদি দ্বীপগুলোতে ঢুকে পড়ার সম্ভাবনাকে অনেকাংশেই হ্রাস করা সম্ভব হবে। সুন্দরবনের ব-দ্বীপ এবং দ্বীপে বসবাসকারী মানুষগুলোকে বাঁচানোর লক্ষ্যে এই অতি প্রয়োজনীয় কাজগুলো করতে হবে দ্রুততা ও সততার সাথে। নচেৎ, প্রকৃতির রুদ্রমূর্তির কাছে অবনত মস্তকে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কোন্‌ বিকল্পই বা খোলা রয়েছে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য সুন্দরবন ব-দ্বীপ ও অসহায় দ্বীপবাসীদের বাঁচানোর জন্য? তথ্যসূত্রঃ1. Island area changes in the Sundarban region of the abandoned western Ganga–Brahmaputra–Meghna Delta, India and Bangladesh 2. The Indian Sundarban Mangrove Forests: History, Utilization, Conservation Strategies and Local Perception 3. Sea level rise and Sundarban islands: A time series study4. The Dynamic change of climate and struggle for existence of Indian Sundarban5. Indian Sundarbans Delta: A Vision6. Ghosh, A., Schmidt, S., Fickert, T., & Nüsser, M. (2015). The Indian Sundarban Mangrove Forests: History, Utilization, Conservation Strategies and Local Perception. Diversity, 7, 149-169.
  • হরিদাস পালেরা...
    তোমার বাস কোথা যে...- ১১ - Nirmalya Nag | ।। এগারো ।।[ এই কাহিনীর সব চরিত্র কাল্পনিক। জীবিত বা মৃত কোনো ব্যক্তির সাথে কোনও মিল যদি কেউ খুঁজে পান তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত এবং কাকতালীয়। ] ওই রাতে ইন্দ্রনীলের অদ্ভুত কথার পর কয়েক দিন কেটে গেছে। বিনীতা কিছুটা ধাতস্থ হয়েছে এই ক’দিনে। তবে মাঝে মাঝেই তার মনে হয়েছে কী বোঝাতে চেয়েছিল তার স্বামীর ডাক্তার? প্রেম নিবেদন করল? এ ছাড়া অন্য কিছু আর কী হতে পারে? বিনীতার কথায় ইন্দ্রনীল নিশ্চয় বুঝেছে রোগী আর স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক খুব একটা স্বাভাবিক নয়। শর্মার বাড়ির পার্টিতে ইন্দ্রনীল তাহলে সত্যিই তাকে দেখছিল। আর হবি তো হ তার কাছেই কিনা অরুণাভকে পাঠাল কোলিয়ারির ডাক্তার শ্রীবাস্তব! অবশ্য সে-ই বা কেমন করে জানবে ব্যাপারটা এই রকম একটা মোড় নেবে? এখন বিনীতার কী করনীয়? অরুণাভর কাছে ভালবাসা সে পায়নি। সে কি সাড়া দেবে ইন্দ্রনীলের ডাকে? অরুণাভ আছে আর এক বছর…এই কথাটা মনে আসতেই আর একটা সম্ভাবনা মাথায় এল বিনীতার। ডাক্তার চিকিৎসা ঠিক মত করবে তো? গায়ত্রী কাগজপত্র পাঠিয়েছিল কলকাতার ডাক্তারকে, সে বলেছিল সব ঠিক আছে। তবে তখন তো এই সব ঘটেনি। ডাক্তার পালটাবে? তাতে কি অরুণাভ রাজী হবে? সেকেন্ড ওপিনিয়ন নিতেও বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখায়নি সে। তাতে নাকি কাজের ক্ষতি হবে। ইন্দ্রনীল লোকটা আসলে কেমন? ও কি অরুণাভর ক্ষতি করতে পারে? হাসপাতালে দেখা হওয়া সেই বাচ্চা ছেলেটির মা তো প্রচুর প্রশংসা করেছিল। পেশেন্ট দেখতে তাদের বাড়িতেও গেছিল ইন্দ্রনীল। আচ্ছা, ওই মহিলা তো বেশ ভাল দেখতে ছিলেন। বিনীতা জানে সে নিজেও নেহাত মন্দ নয় দেখতে। এ দুটো কি দুই-এ দুই-এ চার করা যায়? তবে তার বাড়িতে আসা অবশ্য নেমন্তন্ন রক্ষা করতে। অরুণাভ কেন যে ডিনারে ডাকল ডাক্তারকে, না এলে এই সব কিছুই হয়তো ঘটত না। স্বামীকে কিছু জানায়নি এখনও বিনীতা। জানালেও কোনও লাভ হবে বলে মনে হয় না। এমন অভিজ্ঞতা তার জীবনে প্রথম। এমনিতেই অসুখ বিসুখ নিয়ে ঝামেলার শেষ ছিল না, তার ওপর এই সব। বিনীতার মনে হয় কাউকে একটু বলতে পারলে ভাল হত, মনটা একটু হালকা হত। গায়ত্রী ছাড়া আর কেউ নেই যার কাছে কিছু বলা যায়, তবে এসব কথা ওকেও বলা যাবে না। কি ভাবে নেবে কে জানে। গায়ত্রী খুবই ভাল মেয়ে, তবে একটু কনজারভেটিভ। হয়তো বিনীতারই দোষ দেখবে, নয়তো বলবে ভগবানকে ডাক। পুজো আচ্চা নিয়ে বিনীতা খুব একটা ভাবে না। স্নান সেরে মা কালীর ছবির সামনে একটা ধূপ দেখায় এই পর্যন্ত। সামনের বছর সরস্বতী পুজো করবে বলে ভেবেছে রঙিনের জন্য। প্রতিবেশীরা কেউ পুজোতে ডাকলে অবশ্য যায় রঙিনকে নিয়ে।   বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় একা বসে চা খেতে খেতে এসবই কথা ভাবছিল বিনীতা। একা চা খাওয়া অবশ্য তার কাছে রুটিন ব্যাপার। অরুণাভ অফিস গেছে। রঙিন গিয়েছিল কাছেই এক বন্ধুর বাড়ি; ফিরে এসেছে। বাইরে একটা মোটরবাইক থামার আওয়াজ আর কলিং বেলের শব্দ হল। দরজা খুলে গায়ত্রী আর তার বর রঞ্জিতকে দেখে খুব অপ্রস্তুত হল বিনীতা। ওরা সন্ধ্যাবেলা আসবে আগেই জানিয়েছিল, কিন্তু সেটা ও বেমালুম ভুলে গিয়েছিল সে। তবে ওরা আসাতে একটা সুবিধে হল, বিনীতার মনের মধ্যে যে ঝড় বইছিল সেটা থামল। রঞ্জিতের সবসময়েই হাসিমুখ, সে ব্যবসা করে, স্থানীয় বাজারে একটা শাড়ি-জামাকাপড়ের দোকান আছে তার। এবার বোকারোর সেক্টর ফোরে সিটি সেন্টারের কাছে একটা বড় দোকান দিচ্ছে, সেখানে অবশ্য এক জন পার্টনার আছে। সেই দোকানের উদ্বোধনের নেমন্তন্ন করতে আসবে জানিয়েছিল ওরা। রঞ্জিত অরুণাভকেও ফোনে বলেছিল যে আজ আসবে।“সরি রে, একদম ভুলে গেছিলাম তোরা আসবি,” বিনীতা বলল গায়ত্রীকে।“সে ঠিক আছে, রঙিন কই?”“ভেতরে আছে। দাঁড়া ডাকি।” বিনীতার ডাকে রঙিন এল বাইরের ঘরে।গায়ত্রী কথা বলছে রঙিনের সাথে, তখন রঞ্জিত বিনীতাকে জিজ্ঞেস করল অরুণাভর কথা।“স্যারজী কোথায়? নিশ্চয় অফিসে আছেন।”“হ্যাঁ, আর কোথায় যাবে বলুন।”“এই শরীর নিয়ে… যাকগে, এসব তো আর ওনাকে বলে লাভ নেই।”বিনীতা বিসপাতিয়াকে ডেকে চা দিতে বলল।বিসপাতিয়া গায়ত্রীকে আগে থেকেই চেনে, এই বাড়িতে তাকে কাজ এই ভাবিই দিয়েছিল। দু’জনে কথা বলল একটু, সেই ফাঁকে রঙিন চলে গেল। এবার সে পড়তে বসবে। মা তাকে দুটো পোয়েম মুখস্থ করতে বলেছে।বাইরে গাড়ি থামার আওয়াজ আসায় বোঝা গেল অরুণাভ ফিরে এল। সাহেবের ব্যাগ, টিফিন ক্যারিয়ার আর গাড়ির চাবি বিসপাতিয়ার হাতে দিয়ে চলে গেল ড্রাইভার বিকাশ। বাইরের বারান্দায় টবে খান চারেক পাতাবাহারের গাছ আছে। আর আছে একটা ছোট বসার জায়গা, তার সামনেই জুতো রাখার র‍্যাক। জুতো মোজা সেখানেই ছেড়ে ঘরে এল অরুণাভ, বসল একটা সিঙ্গল সোফাতে।“কী ব্যাপার স্যারজী? সন্ধ্যা সাতটা অবধি কাজ?” রসিকতা করে জিজ্ঞাসা করল রঞ্জিত।“চাকরি করে খেতে হয় ভাই। আপনার মত মালিক তো আর নই। তারপর মালিক, হালচাল কেমন?” একই ভাবে উত্তর দিল অরুণাভ।হাতের ফাইল থেকে একটা খামসহ কার্ড বার করে অরুণাভর দিকে এগিয়ে দিল রঞ্জিত। “নতুন দোকানের ওপেনিং নেক্সট রবিবার, একবার পায়ের ধুলো দিতেই হবে দাদা।”খামের ওপর অরুণাভ আর বিনীতার নাম লেখা। খাম থেকে কার্ড বার করে দোকানের নাম দেখে ভ্রূ কুঁচকে গেল অরুণাভর।“টেগোর ফ্যাশন হাউস! রবীন্দ্রনাথের সাথে ফ্যাশনের কিম্বা জামাকাপড়ের কি রিলেশন?” বিনীতার দিকে কার্ড এগিয়ে দিল অরুণাভ।“দেখুন না দাদা… কী একটা নাম দিয়েছে। এখানকার দোকানের নাম কুসুম ক্লথ স্টোর আর ওখানে ওই,” অনুযোগ করল গায়ত্রী।“কি ভাবি, আপনারও কি একই মত?” জিজ্ঞেস করল দোকান মালিক।“সত্যিই তো… টেগোর কেন?” বলল বিনীতা।“ইয়েস। এই একটা প্রশ্ন লোককে হন্ট করবে। একজন জিজ্ঞেস করবে আর একজনকে - হোয়াই টেগোর? সে আবার জিজ্ঞেস করবে তিন নম্বর লোককে - হোয়াই টেগোর? এই চেন চলতে থাকবে আর দোকানের নাম ছড়িয়ে পড়বে ইন ওয়ার্ড অফ মাউথ। নতুন দোকান, তাও সেক্টর ফোরে। পাবলিসিটি তো লাগবেই,” ছদ্ম গাম্ভীর্যের সাথে বলল রঞ্জিত।“আইডিয়া আচ্ছা হ্যায়,” মাথা ঝাঁকিয়ে বলল অরুণাভ।“ওই নামের জন্যই লোকে দোকানে আসবে। আর বৃষ্টি যদি হয় তবে ছাট আসবেই,” বলল রঞ্জিত।“মানে দোকানে লোকজন এলে বিক্রিও হবে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আর ফ্যাশন…?” পুরোন কথায় ফিরে এল দাস সাহেব।“দেখুন স্যারজী, কেন ভাবছেন যে টেগোর মানেই রবীন্দ্রনাথ। অন্য কেউও তো হতে পারে।”রঞ্জিতের প্রশ্নের উত্তর এল গায়ত্রীর কাছ থেকে। “কেবল রবীন্দ্রনাথের ফ্যামিলিই ওই সারনেম ব্যবহার করে। আর কোনও টেগোর নেই। বাকি সব ঠাকুর।”মুখের একটা অদ্ভুত ভঙ্গি করল রঞ্জিত। “ঠাকুর, তাই না…?” একটু থামল সে, তারপর শোলে ফিল্মের ঢঙে বলল, “কিৎনে আদমী হ্যায়?”“মানে?” কথাটা গায়ত্রী বলল, তবে প্রশ্নটা সবার মনেই এসেছিল।“দেখ গায়ত্রী, তুমি কলকাতার কলেজে পড়েছো। বাংলা ভাল জানো, বোঝো, একটু আধটু পড়তেও পারো। । তোমার জানা আছে কে টেগোর, আর কে ঠাকুর। কিন্তু বোকারোতে কত জন জানবে? আর যারা জানবে তারা হল… কী যেন বলে বাংলায়… হ্যাঁ, ভদ্রলোক। যারা জানবে তারা সব ভদ্রলোক। আর স্যারজী, কোনও ভদ্রলোক এমন বেকার কোয়েশ্চেন করবে না, আমার দোকানেও আসবে না,” পরিস্কার বুঝিয়ে দিল গায়ত্রীর স্বামী। তারপর চায়ের কাপে চুমুক দিল।একটু আগেই চা দিয়ে গেছে বিসপাতিয়া।অরুণাভ আর বিনীতা হেসে উঠল; আর গায়ত্রী ডান হাত আর মাথা নাড়িয়ে যে ভাবটা করল তার একটাই মানে হয় - ‘ধ্যাৎ’।“এক মিনিট,” ফের শুরু করল অরুণাভ, ”একটু ভুল বলেছি। স্যারজীও তো ভদ্রলোক, আর তিনিও ওই সেম কোয়েশ্চেন করলেন। তার মানে, প্রশ্ন মনের মধ্যে থাকলেও ভদ্রলোকেরা দোকানে আসবে,” বলল রঞ্জিত।রঞ্জিতের উচ্চারন করা তিনটে শব্দ - “একটু ভুল বলেছি” - বিনীতাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল গত রবিবারের রাতে। একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল সে। তবে জোর করে মনকে বর্তমানে টেনে আনল।ওদিকে অরুণাভ প্রশ্ন করল রঞ্জিতকেঃ “এখানকার দোকানের কী হবে?”“থাকবে। দু’ জায়গায় সময় দিতে হবে। লোকে যেমন দুই বৌকে টাইম দেয়।”“তাই? তাহলে গায়ত্রীর জায়গা কোথায়?” জিজ্ঞাসা করল বিনীতা।“কেন? গায়ত্রী আমার বৌ নাকি?” সকলের অবাক হওয়াটা, বিশেষ করে নিজের স্ত্রীর ভ্রূ কুঁচকে তাকানোটা, উপভোগ করল রঞ্জিত। তারপর বলল, “ও তো আমার গার্লফ্রেন্ড।”মৃদু হাসল শ্রোতারা। রঞ্জিত আর তার স্ত্রীর মধ্যে বন্ডিং খুব ভাল। এই একটি কারণে মাঝে মাঝে গায়ত্রীকে ঈর্ষা করে বিনীতা।“এবার উঠব,” বলল রঞ্জিত, “আরও দু’জায়গায় যেতে হবে এই কলোনিতেই। সবাইকে ফোনেই বলা আছে অবশ্য, যদি বাই চান্স যেতে না পারি। স্যারজী, আপনাকে আসতেই হবে। ভাবি, রঙিনকে নিয়ে চলে আসবেন।”“আমি আর রঙিন রেডি। বাকি আপনার স্যারজী জানেন,” বলল বিনীতা।“চারটের সময়ে হবে বলে মনে হয় না। তবে সন্ধেবেলায় যাওয়ার চেষ্টা করব,” জানাল অরুণাভ।যাক, কোথাও একটা অন্তত এক সাথে যাওয়া যাবে, যেটার সাথে অফিসের কোনও কানেকশন নেই, ভাবল বিনীতা। আর তার পরেই মনে হল রঞ্জিতের নতুন দোকান সেক্টর ফোরে, আর সেক্টর ফোর মানেই বিএসসি হসপিটাল, আর সেটার মানেই… নাহ, বড্ড বেশি বেশি ভাবছে বিনীতা। বরং চেষ্টা করা যাক মনের ভেতর থেকে এই ঝড়কে সরিয়ে দেওয়ার। প্রথম ধাপ সফল হবে না জানে সে, তবু দেখা যাক।রাতে শোবার সময়ে বিনীতা জিজ্ঞাসা করল, “এক জন ডাক্তারের কথার ওপর ভরসা করেই তো পুরো ট্রিটমেন্ট চলছে। একটা সেকেন্ড ওপিনিয়ন তো নেওয়া যায়।”বই থেকে চোখ সরালো অরুণাভ। “কেন? কিছু হয়েছে? আমি তো ভালই আছি। আগেই তো বলেছি অন্য ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময় নেই।”“একবার একটা ওপিনিয়ন তো নেওয়াই যায়।”“শ্রীবাস্তব আমায় খারাপ কোনও ডাক্তারের কাছে পাঠাবে না। বাই দ্য ওয়ে, আমি হসপিটালে থাকার সময়ে কিছু মেডিক্যাল ডকুমেন্টের ছবি তুলেছিলে মোবাইলে। সেগুলো কী করলে?”অস্বস্তিতে পড়ল বিনীতা। সেটাও চোখে পড়েছে! মনে হচ্ছিল তো ঘুমোচ্ছে।“কলকাতার এক ডাক্তারের কাছে পাঠিয়েছিলাম, গায়ত্রীর থ্রু দিয়ে।”“কী বলেছেন তিনি?”বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলল বিনীতা। “বলেছেন মোড অফ ট্রিটমেন্ট ঠিক আছে।”“তাহলে আবার ফ্রেশ ওপিনিয়নের কথা উঠছে কেন?” বই-এর দিকে চোখ গেল অরুণাভর। সেই ভাবেই বলল পরের কথাটা, “কনান ডয়েল বলেছিলেন, একজন ডাক্তার যখন ভুল করে সে একজন ক্রিমিনাল, কারণ তার জ্ঞানও আছে আর নার্ভও আছে। আমার মনে হয় না ডক্টর বিশ্বাস নিজেকে ক্রিমিনাল হিসেবে দেখতে চাইবেন।”এরপর আর কিছু বলার নেই বিনীতার। চিরুনিটা তুলে নিয়ে বারান্দার দরজার দিকে এগিয়ে গেল সে। (ক্রমশঃ)
    বাংলাদেশ, বাংলাদেশ  - সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায় | বাংলাদেশের অবস্থা যে ভয়াবহ, সে আর নতুন করে বলার কিছু নেই। ছাত্ররা গুলি খাচ্ছেন। ট্যাঙ্কও নামছে শুনলাম।  আমার তালিকায় থাকা ছেলেমেয়েরা দেখছি "আন্দোলনে যাচ্ছি" লিখে রাস্তায় নেমে পড়ছেন। ইন্টারনেট নাকি জায়গায় জায়গায় বন্ধ। মেদিনিপুরের ভারত-ছাড়ো আন্দোলনের ইতিহাস মাথায় আসছে। যুবকরা পকেটে নাম-ঠিকানা লেখা কাগজ নিয়ে মিছিলে নামতেন সেই সময়। কেউ ফিরতেন, কেউ ফিরতেননা। আবু সাইদ ফেরেননি। ঢাকা তিয়েন-আন-মেন-স্কোয়ার হবে কিনা জানিনা, তবে আবুর ছবি তিয়েন-আন-মেন-স্কোয়ারের সেই যুবকের মতোই আইকনিক হয়ে গেছে। কোনো সন্দেহ নেই, হাসিনা সরকার বৈধতা হারিয়েছে। ভোটের ফলাফল যাই হোক, বিদায়ঘন্টা বাজছে। এইসব কান্ড ঘটানোর পর কোনো সরকার দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারেনা। এরশাদ পারেননি। সাম্প্রতিক কালে এর চেয়ে ঢের কম জনজাগরণে পশ্চিমবঙ্গেও উল্টে গিয়েছিল রাজ্যপাট। হাসিনার যাওয়াও সময়ের অপেক্ষা। এই খানেই শঙ্কা জাগছে। হাসিনা গেলে কে? বিএনপি এবং বিশেষ করে জামাত, এই আন্দোলনে সক্রিয়। নিঃসন্দেহে। আন্দোলনকারীরা শিবিরের নাম শুনলেই রেগে যাচ্ছেন। কিন্তু সত্য কথা হল,  "আমরা কারা? রাজাকার" স্লোগান কে ব্যঙ্গাত্মকভাবে দিচ্ছে, আর কে প্রাণ থেকে, সেটা এই দূর থেকে বোঝা সম্ভব না। তাই ভয় পাচ্ছি। ভয়ের একটা কারণ হল, আমরা ইরানের ইতিহাস জানি। বিরাট একটা গণাভ্যুত্থান ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়েছিল স্বৈরাচারী শাসককে। স্বৈরাচারি, কিন্তু পশ্চাদপদ না। আন্দোলনের প্রথম সারিতে ছিলেন বামপন্থীরা। ইসলামিক শক্তি ছিল সঙ্গে। এই অভূতপূর্ব মেলবন্ধনকে,  এমনকি প্রবল সিনিক মিশেল ফুকোও আলিঙ্গন করেছিলেন, এবং পরে বলেছিলেন, ভুল করেছিলেন। কারণ ইরানের ক্ষমতা তারপর কে দখল করে, এবং কী হয়, সে আমরা জানি। ভয় পাচ্ছি আরও একটা কারণে। আমি কোনোদিন ঢাকা যাইনি। শাহবাগ জানি দূর থেকে। কিন্তু যাদের ততটা দূর থেকে জানতামনা, তাঁরা হলেন অভিজিৎ রায় বা ওয়াশিকুর বাবু। দেখা হয়নি কখনও, একই নৌকোর লোকও না, কিন্তু কথা তো হয়েছে টুকটাক। মেলে বা ফোরাম-টোরামে। সচলায়তন মনে আছে। সেইসব চাপাতির ইতিহাস মনে আছে। দুঃস্বপ্নের মতো।আন্দোলন যখন শুরু হয়, কারো নিয়ন্ত্রণ থাকেনা। জনজাগরণ কারো বাবার চাকর নয়। কিন্তু প্রতিটা জনজাগরণের সময়ই নেপথ্যে কিছু শক্তি হিসেব করে চলে। যেকোনো পক্ষেরই। ১৯১৭ সালে লেনিনের হিসেব তো প্রবাদপ্রতিম হয়ে আছে। যেন বীজগণিত। ৬ তারিখ ক্ষমতা দখলের পক্ষে খুব তাড়াতাড়ি, ৮ এ খুব দেরি হয়ে যাবে। তাই ৭ ই চাই। এবং সেই দিনটা ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে আছে। উল্টোদিকে কেরেনস্কিরও  কিছু অঙ্ক ছিল, যা আমরা জানিনা। বাংলাদেশের আন্দোলনকারীরাও নিশ্চিত থাকতে পারেন, তাঁদের রক্তঢালা যখন চলছে, ঠিক তখনই কেউ না কেউ হিসেবও করে চলেছে। এই উন্মাদ সময়ে সেদিকে নজর দেওয়া অসম্ভব মনে হয়। কিন্তু নজর দিলে ভালো হত আর কি। আমি বহুদূরে। সারা জীবনে বাংলাদেশে পা দিইনি। কিন্তু অনুসরণ তো করি। আবেগও আছে। তাই যা মনে এল লিখে ফেললাম। খানিক অনধিকার চর্চা। কিন্তু সে আর কী করা যাবে। 
    ভূতডাঙার  গল্প - Kishore Ghosal | [ভূত মানেই আগুনের ভাঁটার মতো চোখ - মূলোর মতো দাঁত কুলোর মতো কান - "হাঁউ মাউ খাঁউ মানুষের গন্ধ পাঁউ" বলে ধেয়ে আসে ঘাড় মটকে চুমুক দিয়ে রক্ত খেতে ...না এরকম কোন ভূতের সন্ধান আজ পর্যন্ত পাইনি । তবে যে ভূতদের পরিচয় পেয়েছি - তারা সবাই বন্ধু - এবং সত্যি বলতে মানুষের মধ্যেও আজকাল এমন বন্ধু পাওয়া  অসম্ভব। বিশ্বাস না হলে - নীচের গল্পটি পড়ে দেখুন।]     ১এ তল্লাটে প্রমথ শিকদারের নামে বাঘে-গরুতে একঘাটে বসে গল্পগুজব করে, জল খায়। গোলগাল কালোকোলো চেহারায় ঘাড় নেই, কোমর নেই। আছে মস্ত বড়ো একটি পেট। গলায় শেকলের মতো মোটা সোনার চেন দুলিয়ে, ধপধপে সাদা পাঞ্জাবিতে পেটটি মুড়ে, পিছনে চার পাঁচজন শাগরেদ নিয়ে যখন পথে হাঁটেন, সে ভারি ভারিক্কি আর রাশভারি ব্যাপার হয়ে ওঠে। রাস্তার নেড়ি কুকুরগুলোও মাঝরাস্তা ছেড়ে নর্দমার ধারে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকে। একটুও ঘেউ ঘেউ করে না।তাঁর দুহাতের দশ আঙুলে চোদ্দটি আংটি। চোদ্দ ভাগ দুই ইকোয়ালস টু সাত রকমের ব্যবসা, প্রমথবাবু বলেন বিজিনেস। কয়লার ব্যবসা, ট্রান্সপোর্টের ব্যবসা, সতেরখানা মিনিবাস চলে মেনরুটে। আলু আর পেঁয়াজ বোঝাই চারখানা হিমঘর। আজকাল তেমন না চলা দুটো সিনেমা হল। আর বিশাল জমিতে হাত পা ছড়ানো রাইস মিল। আর সর্বশেষ সাতনম্বরটা হল বাড়ি বানানোর প্রমোটারি। ইদানীং এই প্রমোটারি করতে গিয়েই তাঁকে কিছুটা মুশকিলে পড়তে হয়েছে বলে তিনি বেশ মনমরা। মুশকিল আসানের জন্যে জ্যোতিষীর কাছে আরেকটি রত্নের বিধান নেবেন, নাকি তারাপীঠ খ্যাত কোন তান্ত্রিকের শরণাপন্ন হবেন, এই দ্বিধায় তিনি চিন্তাকুল।২মৃদুলবাবু নামেও মৃদু, কাজে কর্মেও মৃদু। আজকের দিনে এমন নির্বিবাদি সাতে পাঁচে না থাকা ভদ্র মানুষ প্রায় বিরল বললেই চলে। রোগা পাতলা একহারা চেহারার মানুষটি প্রফুল্লনগরে পঁয়তিরিশ বছরের উপর রয়েছেন চাকরি সূত্রে। দীর্ঘদিন এই জায়গায় থাকার ফলে তাঁর ও তাঁর পরিবারের জায়গাটি খুব পছন্দ হয়ে গিয়েছে। ছুটিছাটাতে মেদিনীপুরের এগরা মহকুমায় তাঁদের আদি নিবাসে যান ঠিকই কিন্তু মন টেঁকে না। দিন চারেক থাকার পরেই প্রফুল্লনগর ফেরার জন্যে তাঁদের মন আঁটুবাঁটু করে। প্রফুল্লনগর সরকারি শিল্পনগরী, সেখানে চাকরি থেকে অবসরের পর আর থাকার উপায় নেই। তাছাড়া প্রফুল্লনগরকে মৃদুলবাবু যে একাই ভালোবাসেন, তাতো নয়, আরো অনেকেই এমন আছেন। তাঁরা সকলেই মৃদুলবাবুর সহকর্মী। বছর দশেক আগে অনেকে মিলে প্রফুল্লনগরের পাশেই বিশাল জমি কিনেছিলেন একসঙ্গে, তারপর নিজের নিজের দরকার এবং সাধ্যমতো ভাগ করে নিয়েছিলেন। মৃদুলবাবু নিয়েছিলেন কাঠা পাঁচেকের জমি। তাঁর স্ত্রীর বহুদিনের স্বপ্ন ছিল ছোট্ট একটা বাড়ি, সামনে ফুলের গাছ, পিছনে সব্জিবাগান আর দু চারটে ফলফুলুরির গাছ। দামে একটু কমে পেয়েছিলেন এবং নিরিবিলিতে থাকবেন বলে মৃদুলবাবু জমিটা নিয়েছিলেন একদম এক শেষ প্রান্তে। প্রায় পঁয়ত্রিশজন সহকর্মী মিলে শখ করে গড়ে তোলা এই জায়গাটার নাম দিয়েছিলেন জয়ন্তনগর।     চাকরি থেকে অবসর নিয়ে মৃদুলবাবু নতুনবাড়িতে উঠে এসেছেন এই বছর দুয়েক হল। মনোমত গাছপালা লাগিয়ে আর সকাল বিকেল তাদের সেবাশুশ্রূষা করে নিশ্চিন্ত আরামে অবসর জীবন কাটাচ্ছেন তিনি আর তাঁর স্ত্রী। একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়ে ব্যাঙ্গালুরুতে থাকে, আর একমাত্র ছেলে কলকাতার হস্টেলে থেকে ডাক্তারি পড়ে। কাজেই বাড়িতে থাকার লোক মৃদুলবাবু আর তাঁর স্ত্রী।৩ছোটখাটো জমিতে প্রোমোটারি করে হাত পাকানো প্রমথবাবুর এইবার চোখে পড়ল জয়ন্তনগরের পিছনের জমিটা। বিশাল জমিটা জলের দরে একসঙ্গে নিয়ে নিলে হাউসিং কমপ্লেক্স করতে কোন বাধা নেই। কুয়ো সাইজের সুইমিং পুল, রুমাল সাইজের সবুজ বাগান, আর একটা হনুমান মার্কা দোলনা, একটা জিরাফমার্কা স্লিপ খাটানো চিলড্রেন্‌স্‌ পার্কের লোভ দেখিয়ে শ দেড়েক ফ্ল্যাট অনায়াসে বেচে দেওয়া সম্ভব। প্রমথবাবুর এক শাগরেদ আরো বুদ্ধি দিল বড়োরাস্তার ধারে একটা শপিং মল খুলতে পারলে, ফ্ল্যাটের দাম বেড়ে যাবে দুগুণ। শাগরেদের প্রস্তাবটা খুব মনে ধরে গিয়ে প্রমথবাবুর মুশকিল শুরু হল। জয়ন্তনগরের পিছনের যে বিশাল জমিটা প্রমথবাবু হস্তগত করেছেন, রাস্তার দিকে তার মুখটা বেশ ছোট, শপিংমল করার মতো যথেষ্ট নয়। শপিংমল করার মতো জায়গা হতে পারে মৃদুলবাবুর জমি ও তাঁর পিছনের দুটো জমি হাতাতে পারলে। পিছনের জমি দুটো এখনো খালি পড়ে আছে, কাজেই ওদুটোকে বেশি দাম ফেললেই পাওয়া যাবে, কিন্তু মৃদুলবাবুর শখের বাড়িটা?৪রোববার সাতসকালে নয়নতারার ঝাড়ে নিচু হয়ে জল ঢালতে ঢালতে মৃদুলবাবু দেখলেন, তাঁর বাড়ির সদরে প্রমথবাবু আর তাঁর পিছনে চার পাঁচজন হাট্টাকাট্টা শাগরেদ দাঁড়িয়ে আছে।জোড়হাত করে দুগাল ফোলানো হাসিমুখে প্রমথবাবু বললেন, “বাঃ, ফাসকেলাস বাগান বানিয়েচেন, মৃদুলবাবু? খুব সোন্দর”। প্রমথবাবুর মতো ডাকসাইটে লোকের মুখে নিজের নাম শুনে মৃদুলবাবু আরো ঘাবড়ে গেলেন। তিনি সোজা হয়ে দাঁড়ালেন, তাঁর হাতের ঝাঁঝরি থেকে ঝরে পড়তে থাকা জলে হাবুডুবু খেতে লাগল নয়নতারার চারাগুলো। মৃদুলবাবুর অবস্থা বুঝতে প্রমথবাবুর অসুবিধে হল না। গ্রিলের গেটের ছিটকিনি খুলে ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, “আপনি কিছু বলছেন না, তাই নিজেই ঢুকে পড়লাম, ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ”। বিশাল পেট দুলিয়ে হাসলেন প্রমথবাবু। এতক্ষণে যেন মৃদুলবাবু ধাতস্থ হলেন। নয়নতারার চারাগুলোর ওপরেই ঝাঁঝরি ফেলে দিয়ে হাত জোড় করে এগিয়ে গেলেন প্রমথবাবুর দিকে, বললেন, “আপনার মতো মানুষ আমাদের মতো সামান্য লোকের ঘরে, খুব ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, স্যার। আসুন, আসুন। সামনে কি ইলেকশন নাকি, কই শুনিনি তো! বিধানসভা না লোকসভা”? “ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ, আমাকে কি দেখে নেতা মনে হচ্ছে? তা অবিশ্যি মন্দ বলেন নি। না, মৃদুলবাবু সে সব নয়, অনেক খেটেখুটে সামান্য কিছু জমিয়েছি, আপনাদের সকলের শুভ ইচ্ছায়। কাজের চাপে পাড়াপড়শীদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হয়ে ওঠে না, তাই এলাম একবার এদিকে। তা, বেশ বানিয়েছেন বাড়িটা। আমার খুব মনে লেগেছে”। “ওই আর কি”? হেঁ হেঁ হেঁ, বিগলিত হেসে মৃদুলবাবু বললেন, “গরীবের স্বপ্নটুকুই তো সম্বল”। “তবে যাই বলুন, আজকাল বাড়ি করে বুড়ো বয়সে একা একা থাকা খুব মুশকিল। দেখুন না, এত বড়ো বাড়ি, সামনে পেছনে গাছপালা। রাতবিরেতে বিপদ আপদ হলে কাকপক্ষিরও সাড়া পাবেন ভেবেছেন? এর চেয়ে ফ্ল্যাট কিন্তু খুব ভালো। সারাক্ষণ সিকিউরিটি। দেড়শ ফ্ল্যাটের লোকজন। ভাবতে পারছেন? বিপদে আপদে একবার হাঁক দিলে ঘরে পা ফেলার জায়গা পাবেন না, ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ । তারপরে ধরুন সকালে বিকেলে সাঁতার, শরীরটাকে তো রাখতে হবে! ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ। বিকেলের দিকে নাতি নাতনীদের হাত ধরে চিলড্রেন্‌স্‌ পার্ক। এগুলোও কি কম স্বপ্ন? ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ”। প্রমথবাবুর দুলতে থাকা অদ্ভূত পেটের দিকে তাকিয়ে রইলেন, মৃদুলবাবু। শুধুমাত্র ফ্ল্যাটের উপকারিতা বোঝানোর জন্যে প্রমথবাবুর মতো লোক সাত সকালে তাঁর বাড়ি বয়ে এসেছেন, এটা অসম্ভব। মৃদুলবাবু কিছু বললেন না, অপেক্ষা করতে লাগলেন প্রমথবাবুর পরের কথার জন্যে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে প্রমথবাবু আবার বললেন, “চোদ্দ আনা নয়, একদম পড়ে পাওয়া ষোলো আনা, মৃদুলবাবু। আপনাকে একটা ফ্ল্যাট আমি দিতে চাই, একদম ফ্রি”!“ফ্রি? তার মানে? কেন”? “একদম ফ্রি। তার সঙ্গে নগদ টাকা – তা ধরুন তিন লাখ, না না তিন নয়, তিনে শত্রু হয়, ধরুন চার। একটু থেমে বড়ো মার্বেলের গুলির মতো গোলগোল চোখ করে বললেন – কি? অফারটা কেমন? চৈত্র সেলকেও হার মানাবে, মোশাই। ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ”। কিছুই বুঝতে না পেরে, অবাক চোখে প্রমথবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন মৃদুলবাবু, কিছু বললেন না। “আপনার এই বাড়িটা আমার খুব পছন্দ। ওই চার লাখ টাকাটা আপনার এই বাড়ি আর জমিটুকুনির জন্যে, আর ফ্ল্যাটটা পুরোপুরি ফ্রি। কি এবার কেমন মনে হচ্ছে অফারটা? বাম্পার না? ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ”। এতক্ষণে মৃদুলবাবু বুঝতে পারলেন প্রমথবাবুর আসল উদ্দেশ্যটা। উত্তেজিত ভাবে বললেন, “কিন্তু এ বাড়িতো আমি বেচব না, প্রমথবাবু। আমরা থাকব বলে এই বাড়ি বানিয়েছি, বেচে ফ্ল্যাটে যাবার জন্যে তো নয়”। এতক্ষণের হাসিমাখা মুখ তাও সহ্য হচ্ছিল, এখন প্রমথবাবুর উৎকট গম্ভীরমুখের দিকে তাকিয়ে, মৃদুলবাবুর গা জ্বলে গেল। প্রমথবাবু গম্ভীর মুখে বললেন, “কটা দিন একটু ভেবে দেখতে ক্ষতি কি, মৃদুলবাবু। ঝোঁকের মাথায় নেওয়া সিদ্ধান্ত অনেক সময়েই ভুল হয়ে যায়। তাছাড়া, আমার সিদ্ধান্তটাও তো একেবারে ফেলে দেবার নয়। আমার এই জায়গাটা যে না হলেই নয়”। “কটা দিন কেন, প্রমথবাবু, সারা জীবন ধরে ভাবলেও আমার সিদ্ধান্ত বদলাবে না”, মৃদুলবাবু খুব দৃঢ়স্বরে বললেন। “বেশ কথা। কিন্তু জীবনের আর কি ভরসা বলুন দেখি। আজ আছে, কাল হয়তো নেই। বিজিনেস করি বলে, ভাববেন না যেন, সাহিত্য টাহিত্য বুঝি না। ওই যে বলে না, পদ্ম পাতায় জল, করে টলোমল, ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ। সে যাক, তাহলে আজ এখন আসি মৃদুলবাবু, আপনার সঙ্গে আলাপ হয়ে খুবই আনন্দ পেলাম। তবে অফারটা কিন্তু মনে রাখবেন – বাম্পার অফার, ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ । আরেকবার ভেবে দেখবেন, ভাবতে তো আর ট্যাক্সো লাগে না। ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ”।৫মৃদুলবাবুর মতো নির্বিবাদী লোককে তুলে, তাঁর জমিটা হাতিয়ে নেওয়াটা প্রমথবাবুর কাছে মশা মারার সামিল। সেখানে মুশকিল হত না, মুশকিলটা হলো অন্য জায়গায়। রোববার দিন মৃদুলবাবুর বাড়ি থেকে ফিরে প্রমথবাবু তাঁর শাগরেদদের সঙ্গে বসে ঠিক করলেন, বুধবার থেকে শুরু করে দেবেন ফ্ল্যাট বানানোর কাজ। বুধবার শুভ দিন, খনার বচনে আছে, মঙ্গলের ঊষা বুধে পা, যথা ইচ্ছে তথা যা। বুধবার দিন জনা পঞ্চাশেক শ্রমিক গিয়েছিল কাজ শুরু করতে। গাছপালা, ঝোপ ঝাড় কেটে, জমিটাকে মাপ জোক করার মতো সাফ করার জন্যে। নকশায় দেখানো ফ্ল্যাটবাড়ি, সুইমিং পুল, চিল্ড্রেন্‌স্‌ পার্ক, রাস্তা, কোথায় কোনটা হবে সেটাকে জমিতে হিসেব মতো ঠিক ঠাক বসাতে হবে তো? মিনিট পনের হয়েছে কি, হয় নি, ঝোপঝাড়ে শ্রমিকরা সবে কাস্তে, দায়ের কোপ মারতে শুরু করেছে, হঠাৎ চারদিক থেকে শুরু হয়ে গেল পাথর বৃষ্টি। পাথর শুধু নয়, ইঁটের টুকরো, আধলাও। পঞ্চাশজন লোক নেহাত কম নয়, চ্যাংড়া ছোঁড়াদের কীর্তি ভেবে তারা চারদিকে দৌড়োদৌড়ি করেও কাউকে দেখতে পাচ্ছিল না। কিন্তু ঢিলের বৃষ্টি একবারের জন্যেও ঢিলে হল না। অন্ততঃ জনা দশেকের মাথায় আলু, নাকে আলু, কপালে আলু। ছোট খাটো চোট তো সবাই পেয়েছে। আধঘন্টা চেষ্টা করেও যখন কাউকেই দেখা গেল না, বেচারা লোকগুলো ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল কাজ ছেড়ে। যাবার আগে হাল্লা লাগিয়ে দিল, ওই জমিতে নির্ঘাৎ ভূত আছে।৬প্রমথবাবু ছিলেন না, হিমঘরে আলু দেখতে গিয়েছিলেন। লালচে রঙের হাজার হাজার বস্তায় ভরা আলু দেখলে তাঁর বড়ো আনন্দ হয়। শীতের শেষে চাষির ঘর থেকে তিনটাকা কিলো দরে আলু তোলেন, প্রথমদিকে দশটাকায় ছাড়েন, পরের দিকে কুড়ি বাইশেও দর তুলে দেন। ডাক্তারের পরামর্শে তাঁর আলু খাওয়া বারণ, কিন্তু আলু থেকে সারাবছরে তাঁর যা আয় হয় তাতে তাঁর মার্বেলের গুলির মতো চোখও স্বপ্নালু হয়ে ওঠে।দুপুরে খেতে বসে ভাইপোর থেকে সব ঘটনা শুনে প্রমথবাবু হাসলেন ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ। সারা জীবনে ব্যবসা করতে গিয়ে ছোটখাটো বিঘ্ন তিনি অনেক সামলেছেন, কাজেই এই ঘটনাকে তিনি আমলই দিলেন না। দুপুরে খাওয়ার পর ঘণ্টা দুয়েক না ঘুমোলে তিনি শরীরের জোর হারিয়ে ফেলেন। তাই চারটে নাগাদ ঘুম থেকে উঠে বাইরের ঘরে বসে চা খেতে খেতে সবার থেকে সবিস্তারে শুনলেন ঘটনাটার কথা। শুনে তিনি হুকুম দিলেন কাত্যায়ন শাস্ত্রীকো উঠাকে লাও।শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী স্বর্ণপদক প্রাপ্ত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন তান্ত্রিক। এই সোনার পদক তাকে কে দিয়েছিল কেউ জানে না। সপ্তাহের ছদিন দক্ষিণবঙ্গের ছটি প্রান্তে এঁনার জমজমাট চেম্বার। নৈহাটি, ঘুঁটিয়ারি শরীফ, প্রফুল্লনগর, চাকদহ, শেওড়াফুলি আর লক্ষ্মীকান্তপুর, সোম থেকে শণি এই তাঁর চেম্বারের রুটিন। আজ বুধবার, তাঁর চেম্বার প্রফুল্লনগরে। আধঘন্টার মধ্যে তাঁকে বাইকে করে তুলে নিয়ে এল প্রমথবাবুর জনৈক শাগরেদ।৭ বাড়ির ভেতর থেকে শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রীর বানানো প্রমথবাবুর জন্মকোষ্ঠি আনানোই ছিল। শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী প্রমথবাবুকে প্রণাম করে সামনে বসতেই, প্রমথবাবু তার দিকে ছুঁড়ে দিলেন কোষ্ঠিটা। বললেন, “সময়টা ভালো যাচ্ছে না হে, কাত্তিকচন্দোর, কুষ্ঠিটা একবার দেখে দাও তো”। শ্রীশ্রী কাত্যায়নের আদি নাম ছিল কার্তিক চন্দ্র হাতি। প্রমথবাবু দীর্ঘ পরিচয় সূত্রে এসব তথ্য জানেন। মিনিট পাঁচেক খুব মন দিয়ে কোষ্ঠির দিকে তাকিয়ে থেকে শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী খুব গম্ভীর চিন্তামগ্ন মুখে বলল, “জমি সংক্রান্ত ঝামেলা মনে হচ্ছে, দাদা”। প্রমথবাবু মুগ্ধচোখে তাকিয়ে রইলেন, শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রীর দিকে। কোষ্ঠি থেকে মুখ না তুলে সে আরো বলল, “আপনারা তো ভূত প্রেতে বিশ্বাস করেন না দাদা, আমার কিন্তু মনে হচ্ছে আপনার ওপর অপদেবতার বক্র দৃষ্টি পড়েছে”। প্রমথবাবু উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, “মোক্ষম বলেছ, ভায়া। আমরা বিশ্বাস করি বা না করি, যা আছে সে তো আছেই। এখন এর থেকে মুক্তির উপায় কি তাই বলো”।             কোষ্ঠি ছেড়ে এবার শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী তার রেক্সিনের ব্যাগ খুলে বহুদিনের পুরোনো একটা পুঁথি বের করল। এমন জিনিষ উপস্থিত কেউই দেখে নি কোনদিন। তারা হুমড়ি খেয়ে পড়তে যাচ্ছিল শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রীর ঘাড়ে। প্রমথবাবু মেঘের মতো স্বরে বললেন, “অ্যাই, ওকে ডিস্টার্ব করিস না, এসব মোটেই ছেলে খেলার জিনিষ নয়।শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী তার ছোট্ট ডাইরিতে পেন্সিল দিয়ে অনেক আঁকি বুঁকি কাটতে কাটতে ভাবছিল, আজ প্রফুল্লনগরে সকাল থেকে এসে বাজার খুব খারাপ। সকালের দিকে দুটো মাত্র কেস এসেছিল, তারপর এতক্ষণ আর কোন কেস জোটেনি। বাকি সময়টা হারুর সঙ্গে গল্প করে কাটিয়ে দিয়েছিল। হারু তার চেম্বারের উল্টোদিকের চায়ের দোকান থেকে চা দিয়ে যায়। হারুটা প্রফুল্লনগরের গেজেট, সব খবর তার কাছে পাওয়া যায়। আজ সকালের প্রমথবাবুর জমির ঘটনাটা সবিস্তারে হারুর কাছেই শোনা। সেটা যে এমনভাবে কাজে লেগে যাবে শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী স্বপ্নেও ভাবে নি। শনিবারে লক্ষ্মীকান্তপুরের চেম্বারে তার কত রোজগার হয়, সেটা মনে মনে হিসেব করে নিল। এমন সুযোগ যখন পাওয়া গেছে, আজকের ঘাটতিটা আর শনিবারের রোজগারটা সুদে আসলে এখান থেকে তুলে নিলেই তো হয়! খুব চিন্তান্বিত মুখে শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী বলল, “একটা স্বস্ত্যয়ন করা দরকার। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, পারলে সামনের শনিবার। আপনার জানাশোনা ভালো তন্ত্রসাধক কেউ আছে নাকি, দাদা”? “তুমি থাকতে আমি কারো কাছে যাবো না, কাত্তিক। স্বস্ত্যয়ন করলে তুমিই করবে”। “কিন্তু আপনি তো জানেনই, দাদা, শনিবারে আমার লক্ষ্মীকান্তপুরে কথা দেওয়া আছে”। “রাখো তোমার কথা। যা করার তুমিই করবে। এর আর নড়চড় চলবে না”। “আপনি বললে তো না করতে পারিনা, দাদা, এই হচ্ছে মুশকিল। তবে ক্ষতি হয়ে যাবে বড্ড”। “কত ক্ষতি হবে? বলি আমিও তো তোমাকে তোমার দক্ষিণা দোবো নাকি? বাদবাকি যা খরচা হবে সেও দেব”। “তা ধরুন, স্বস্ত্যয়নের যোগাড়েই হাজার সাতেক যাবে, আর আমার দক্ষিণা যা আপনার ভালো মনে হয়”। প্রমথবাবু কোন ঝুঁকির মধ্যে যেতে চান না, তিনি বললেন, “সব মিলিয়ে তোমায় দশহাজার এক দোবো। তুমি আর মনে কোন দ্বিধা রেখোনা, হে কাত্তিক। শনিবারের ব্যাপারটা পাক্কা করে নাও। আর এই নাও আজকের পাঁচশো”। পকেট থেকে পাঁচশো টাকার নোট বের করে কাত্তিকের দিকে বাড়িয়ে দিলেন। কাত্তিক নোটটা হাতে নিয়ে কপালে ঠেকালো, তারপর নিজের পকেটে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, “আজকেরটা দরকার ছিল না, দাদা, আমি কি আপনার পর? তবে আপনার আশীর্বাদ যখন নিতে তো হবেই”। “তুমি যে আমায় কি চিন্তা মুক্ত করলে, কাত্তিক, তুমি বুঝবে না”। “আজ্ঞে, সে কথাতো একশবার। আপনারা হচ্ছেন কৃতী পুরুষ। তবে ওই কথাই রইল দাদা, সামনের শনিবার মধ্যরাতে, আমি সব যোগাড় করে ঠিক সময় মতো চলে আসব”। ৮ইন্দিরাদিদি রাত নটা পর্যন্ত পড়িয়ে কালকের হোমটাস্ক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার পর রুনু আর ঝুনুও বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল। এই সময়টা মাও পড়ার জন্যে খুব কিছু বলেন না। কারণ ইন্দিরাদিদি এমন কড়া, তিনঘন্টার মধ্যে এতটুকুও ফাঁকি দেবার উপায় রাখে না। গতবারের চেয়ে এবারের রেজাল্টটা অনেক ভালো হওয়ায় বাড়ি থেকে চাপটা কিছুটা হলেও কমেছে।বাইরে বেরিয়ে রুনুঝুনু পেয়ারা গাছের ছায়ায় বসে থাকা ঝাপসা রুকু-সুকুকে দেখতে পেল। রুনু জিগ্‌গেস করল, “কি রে, আর কিছু নতুন খবর পেলি”? “ওঃ, তোমাদের এই পড়ার চাপটা তোমরা কি করে সহ্য করো, ভেবে পাই না। ভয় লাগে না? এখন বুঝছি, কেন তোমরা আমাদেরকে ভূত জেনেও ভয় পাও নি। লেখাপড়া ব্যাপারটাই এমন ভয়ংকর, তার পরে আর কোন কিছুতেই ভয় লাগে না”। “বাজে বকিস না তো। সকালের পর আর কিছু হয় নি তো”? “হয় নি আবার? প্রথমবাবুর বাড়িতে বিকেলে জোর মিটিং হয়েছে”। “প্রথম নয়, প্রমথ”। “জানি, প্রমথ মানেও কিনা ভূত তাই মানুষের ওই নাম আমরা উচ্চারণ করতে চাই না”। “আচ্ছা বেশ, কিসের মিটিং বল”। “কিসের আবার ভূত তাড়ানোর মিটিং”। “মানে”? রুনু-ঝুনু একসঙ্গে চমকে উঠল। “হুঁ। বাসস্ট্যান্ডের গায়ে ছোট্ট গুমটিতে শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী বসে, চেন”? “না। কেন? কি করেছে সে”? “মস্ত তান্ত্রিক, শনিবার স্বস্ত্যয়ন করে আমাদের পাড়া ছাড়া করবে”। “তান্ত্রিক? তার মানে যারা সেই ওঁ হ্রিং ক্রিং ফট্‌ করে? সর্বনাশ, তাহলে কি হবে”? “ধুর ভেবো না তো, কিচ্ছু হবে না। ও তান্ত্রিক না হাতি। ওর সত্যি নাম হচ্ছে নাত্তিক চন্দ্র হাতি”। “নাত্তিক? নাত্তিক আবার কারো নাম হয় নাকি”? “আরে বাবা, নাত্তিক নাত্তিক। মা দুগ্‌গার ছোট ছেলে। আমরা ভূততো তাই ঠাকুর দেবতার নাম করতে পারি না”। “ও কার্তিক। তাই বল। কিন্তু তাহলে মা দুর্গার নাম করলি কি করে? তিনি কি ঠাকুর নন”? “তুমি একদম বোকা ঝুনুদিদি, মায়ের আবার ঠাকুর-দেবতা কি? মা তো মা-ই। মায়ের নাম সবাই, সবসময় উচ্চারণ করতে পারি”। “আচ্ছা, আচ্ছা, বুঝেছি, এখন শনিবারে কী হবে, তাই বল”। “সে আমরা ঠিক করে নিয়েছি। আমরা সেদিন প্রফুল্লনগরে যতো ভূত আছে সব্বাইকে নিয়ে মাঠে জড়ো হবো। আর স্বস্ত্যয়ন শুরু করার আগেই ঢিল মেরে সব পণ্ড করে দেব, দেখ না। প্রথম মারব প্রথমকে আর ওই নাত্তিককে”।এতক্ষণ সুকু কোন কথা বলে নি, রুকুর শেষ কথায় সুকু আওয়াজ করল - ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ। সেই শুনে ঝুনু বলল, “ও আবার কি আওয়াজ, ঘুঘুর ডাকের মতো”? হি হি করে হেসে রুকু বলল, “ও হচ্ছে প্রথমের হাসি। সেদিন ওর হাসি আমরা ঘু ঘু ঘুচিয়ে দেবো”। মায়ের রান্না হয়ে গিয়েছিল, বারান্দার দিকে তাঁর আসার শব্দ পেয়ে রুকুসুকু মিলিয়ে গেল পেয়ারা গাছের আড়ালে।৯ঊষাদি, মৃদুলবাবুর স্ত্রী, রুনুঝুনুর মায়ের খুব বন্ধু। ঊষাদিরা যখন প্রফুল্লনগরে ছিলেন, রুনুঝুনুর মায়ের সঙ্গে খুব ভাব ছিল, একদম নিজের ছোটবোনের মতো ভালবাসতেন রুনুঝুনুর মাকে। আর মৃদুলবাবুর পাশের জমিটাও রুনুঝুনুর বাবা মুকুন্দবাবু নিয়েছেন। ইচ্ছে আছে চাকরি থেকে অবসরের পর পাশাপাশি বাড়িতে থাকবেন। আপদে বিপদে কোন সমস্যা হবে না। রবিবারের সকালে ঘটনার পরেই ঊষাদি ফোন করে সব জানিয়েছিল রুনুঝুনুর মাকে। প্রমথবাবুর দেওয়া প্রস্তাব শুনে আর মুকুন্দবাবুর কাছে প্রমথবাবুর ভয়ংকর পরিচয় শুনে রুনুঝুনুর মায়ের বুক কেঁপে উঠেছিল - হে ঠাকুর, একি বিপদে ফেললে ঊষাদিদিকে। সেই রোববার থেকে চিন্তায় তাঁর ভালো ঘুম হচ্ছে না। আজ দুপুরে মুকুন্দবাবু খেতে এসে প্রমথবাবুর জমিতে ভূতের ঢিল মারার ঘটনাটা শুনিয়েছেন। সেই শুনে অব্দি তাঁর চিন্তা আরো বেড়ে গেছে। এক ছিল প্রমথবাবু, তার ওপরে জুটল ভূতের ঢিল! কি সর্বনেশে কাণ্ড। হে প্রমথনাথ, হে ভূতনাথ, তোমার ভূতদের তুমি সামলাও, বাবা। প্রমথনাথ শিব ঠাকুরের আরেক নাম। ব্যাপারটা নিয়ে সেই থেকে সারাক্ষণ চিন্তা করতে করতে সন্ধ্যেবেলা তাঁর মাথায় এল, এর পিছনে তাঁর মেয়েদের, রুনুঝুনুর হাত নেই তো? তাদের ভূতবন্ধু রুকুসুকু যমজ ভূতের কাণ্ড নয়তো এটা? গতবছর তাঁরা যখন সিমলা-কুলু-মানালি হয়ে হরিদ্বার বেড়াতে গিয়েছিলেন, এই দুই যমজ ভূত এক কাণ্ড বাধিয়ে বসেছিল। তাঁর খুব সন্দেহ হচ্ছে, এ ওদেরই কীর্তি।বারান্দায় এসে কিছু দেখতে পেলেন না, দুই বোন চুপ করে বসে আছে অন্ধকারে। “কি করছিস রে, তোরা দুজনে”? রুনুঝুনুকে জিগ্‌গেস করলেন ওদের মা। “কিচ্ছু না, এই একটু ঠাণ্ডা হাওয়া খাচ্ছি”। “ওরা এসেছিল”? “কারা”? “কারা আবার, রুকুসুকু”? “হুঁ, এসেছিল। তোমার ভয়ে চলে গেছে, মা”। “বোঝো কাণ্ড, এতদিন জানতাম ভূতেদের মানুষ ভয় পায়, এখন ভূতেরা আমাকে ভয় পাচ্ছে”! “সবাইকে নয়, ওরা মায়েদের খুব ভয় করে”। “আজ সকালে প্রমথবাবুর জমির ঘটনাটা ওদেরই কাজ, না”? “হুঁ”। “তোরা কি পাগল হয়ে গেছিস, প্রমথবাবু আমাদের ছেড়ে দেবে, জানতে পারলে”? “কেউ জানবে কেন? আর প্রমথবাবু কেন ধমকেছে, মৃদুলজেঠুর মতো শান্তশিষ্ট ভালো মানুষ কে? আমরা তো কেউ কিছু করতে পারবো না, রুকুসুকু যদি আটকাতে পারে, চেষ্টা করে দেখুক না”। “প্রমথবাবু এত সহজে ছেড়ে দেবে ভেবেছিস? ও নাম করা তান্ত্রিক ডেকে যাগযজ্ঞ করাবে, রুকুসুকুকে তাড়িয়ে আমাদের নিয়ে পড়বে। আমরাও বিপদে পড়ব, বিপদে পড়বে ঊষাদিরাও”। “করছে তো, আসছে শনিবার, প্রমথবাবুর জমিতে বিশাল যজ্ঞ”। “তোরা কি করে জানলি”? “রুকুসুকু খবর দিয়ে গেল। ওরাও রেডি, সব ভূত মিলে পণ্ড করে দেবে যজ্ঞ”। “এই ভয়ংকর কাণ্ডের মধ্যে তোরা কেন জড়িয়ে পড়লি”? “সরুদা বলে, কাউকে না কাউকে তো সামনে আসতেই হবে, তা না হলে প্রমথবাবুদের মতো লোকদের ভূতের কেত্তন তো বেড়েই চলবে। তুমি একদম চিন্তা করো না, মা। রুকুসুকু সবদিক ঠিক সামলে দেবে, ভেবো না। কথাগুলো শুধু পাঁচকান না হয় সেটা দেখ। এমনকি ঊষা জেঠিমাদেরও বলো না”।১০কালো সর্ষে, সাদা সর্ষে, কালো তিল, ধুনো, গুগ্‌গুল, সতেরটা কাঁঠালি কলা, ১০৮টা বেলপাতা, এক পোয়া আতপ চাল, ঘি, মধু, গোবর, বেল কাঠ, পঞ্চ শস্য, পঞ্চগুঁড়ি, মড়ার খুলি, ছাগলের পায়ের হাড়।  দরকার ছিল মানুষের পায়ের হাড়, যোগাড় করতে পারে নি শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী। তাই ছাগলের সামনের পায়ের হাড় দিয়ে ম্যানেজ করে নিয়েছে পাড়ার মাংসের দোকান থেকে। ছাগলের না মানুষের চিনতে পারার আগেই, সাধারণ লোকে হাড় দেখলেই চমকে যাবে।রাত্রি বারোটা নয় গতে মাহেন্দ্রক্ষণ। সাড়ে এগারোটা নাগাদ শ্রী কার্তিকচন্দ্র হাতি বারমুডা আর টি শার্ট ছেড়ে, রক্তাম্বর পড়ে স্বর্ণপদক প্রাপ্ত তান্ত্রিক শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী হয়ে উঠল। কপালে মোটা করে সিঁদুরের টিপ। স্বস্ত্যয়নের সব যোগাড় নিয়ে উঠে পড়ল প্রমথবাবুর জাইলো গড়িতে। গাড়িতে প্রমথবাবু এবং তাঁর ভাইপো। বাকিরা সবাই বাইকে। সকলের মনের মধ্যে দারুণ উত্তেজনা, আজ স্বচক্ষে দেখতে পাওয়া যাবে ভূতের বাপের শ্রাদ্ধ। ঈশাণ কোণে মুখ করে বেলগাছের নীচে একটা জায়গা ঠিক করাই ছিল। সেখানে আসন পেতে স্বস্ত্যয়নের যোগাড় নিয়ে বসে পড়ল শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী । ঘিয়ের প্রদীপ জ্বলে উঠল, ধুপ, ধুনো, গুগ্‌গুলের সুগন্ধে রাতের জঙ্গল ভরে উঠল। হোম কুণ্ড তৈরি করে শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী প্রমথবাবুর থেকে যখন হোম শুরু করার অনুমতি চাইল, মোবাইলের পর্দায় সময় তখন রাত বারোটা বেজে আট মিনিট। প্রমথবাবুর থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতি পাবার পর, শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী চিৎকার করে উঠল, “ব্যোমশংকর, কালি করালী নৃমুণ্ডমালিনী ভীমা ভয়ংকরী মা, তোর সব চেলাদের সামলে রাখ মা, সামলে রাখ...”। তারপর হোমকুণ্ডে আগুন ধরিয়ে জ্বালিয়ে তুলল হোমের আগুন। ঘিয়ের পাত্র থেকে কাঠের কুষিতে ঘি নিয়ে, “ওং হ্রিং ক্রিং ঋং লং অং বং চং স্বাহা”, বলে যজ্ঞে ঘি দিতেই উপস্থিত সকলের পিঠে এসে পড়তে লাগল ঢিল, আর আশপাশ থেকে অনেকগুলো কণ্ঠে সমবেত সুর শোনা গেল “স্বাআআ হাআআআ”। শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রীর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল, একবার তার মনে হল সব ছেড়ে ছুড়ে পালায়, কিন্তু টাকাও তো নেহাত কম নয়, প্রায় পনেরদিনের রোজগার! দুরুদুরু বুকে সে বলল, “তেনারা এসে গেছেন, তেনারা বিঘ্ন সৃষ্টি করছেন। দাদা, ব্যাপার খুব সুবিধের নয় মনে হচ্ছে...” শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী একটা বেলপাতা ঘিয়ে ডুবিয়ে, যজ্ঞের আগুনে দিতে দিতে বলল, “ওং হ্রিং ক্রিং ঋং লং অং বং চং স্বাহা”। এবারে হাজার কন্ঠের স্বর শোনা গেল “স্বাআআ হাআআআ”, তার সঙ্গে চারদিক থেকে ঝরতে লাগল ঢিল আর ইঁটের বৃষ্টি। এবার আর থামল না, লাগাতার চলতেই থাকল, “স্বাআআ হাআআআ” আর তার সংগে সংগে ঢিলের বৃষ্টি। তার সঙ্গে নতুন শুরু হল ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ শব্দে সমবেত হাসি।             শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “দাদা, এই অবস্থায় আপনি হাসছেন? আমি চললাম, বেঁচে থাকলে অনেক সাধনা করতে পারবো...” “আমি হাসছি? হতভাগা, তোর মনে এই ছিল রে কেতো, কি যজ্ঞি শুরু করলি, এ যে দুনিয়ার ভূত এসে জড়ো হয়ে গেল। আমাকে ফেলে যাস নি, বাবা কাত্তিক”। প্রমথবাবু শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রীর হাত ধরে দৌড়তে শুরু করলেন গাড়ির দিকে। গাড়ির কাছে পৌঁছে দেখলেন কেউ নেই, না ড্রাইভার, না তাঁর কোন শাগরেদ। বিপদ বুঝে কে কখন পালিয়ে গেছে তিনি জানতেও পারেন নি। অথচ তাঁদের পিছনে তাড়া করে গাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে গেছে ঢিলের বৃষ্টি, আর ঘুঁ ঘুঁ ঘুঁ হাসি। তাঁদের দুজনের পিঠে আর মাথায় যে পরিমাণ আলু গজিয়ে উঠেছে, তাতে তাঁর হিমঘর অনেকটাই ভরে উঠবে। যদিও এ আলু অখাদ্য!            ১১এর পরের ঘটনা খুব সংক্ষিপ্ত। প্রমথবাবুর ওই জমিটার লোকমুখে নামই হয়ে গেল ভূতডাঙা। আটষট্টি জন পার্টি, প্রমথবাবুর ফ্ল্যাট কেনার জন্যে বুকিং করেছিল, তারা সবাই সকালে সন্ধ্যেয় প্রমথবাবুর বাড়ি এসে বসে থাকে টাকা ফেরত নেওয়ার জন্যে। প্রমথবাবু ভোরে বেরিয়ে যান ফেরেন প্রায় মাঝরাত্রে। আজকাল তিনি ভুলেও আর হাসেন না।শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী সেই যে প্রফুল্লনগর ছেড়েছে, আর এ মুখো হয় নি। এদিকে কিভাবে কে জানে তার সব চেম্বারেই এই বিচ্ছিরি বেইজ্জতির খবরটা সবাই জেনে গেছে। কাজেই শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রী এখন অন্য জায়গায় বসার জন্যে চেম্বার খুঁজছে।তোমাদের এলাকায় ভালো কোন জায়গা যদি পাও শ্রীশ্রী কাত্যায়ন শাস্ত্রীকে জানাবে, প্লিজ? -০- "তেঁনারা" গ্রন্থে এমনই নখানা গল্প সংকলিত হয়েছে -   ই-বুক পেতে এই লিংকটি টিপুন- https://play.google.com/store/books/details?id=Nvn8EAAAQBAJ&pli=1&fbclid=IwZXh0bgNhZW0CMTEAAR3O-GmeDx-WAkCpDuQf_ool-xkib_W8lQALjb6Sken6aOO-_BaE53IB75w_aem_ek3rkyVoueGz6aCV4pSHzA অথবা ঘরে বসে বইটি হাতে পেতে এই লিংকটি টিপতে হবে -  https://joydhakbooks.in/product/tenara/?fbclid=IwZXh0bgNhZW0CMTEAAR1r8j09hj1PM3aoxfJY_8-QPZ4dQiCtB2pgmCBx6iZ0PuWm0kd_I_P-8eE_aem_JGXlYZRByhWQHFzgDzbhVw
  • জনতার খেরোর খাতা...
    মানিকবাবুর মেঘ  - Jishnu Mukherjee | অ্যামবিয়েন্ট সাউন্ডের ব্যবহার যেমন ধরা যাক চেঁচিয়ে বলা পাম্প চালাতে, বৃদ্ধ বাবাকে দেখানোর সময় তাঁর স্থবিরতা বোঝানোর জন্য ঘড়ির টিক টিক, পাম্প চলার আওয়াজ, বাবার মৃত্যুদৃশ্যে টেপরেকর্ডারের আওয়াজ।ডিটেইল যেমন রিকশার গায়ে লেখা আবার দেখা হবে, চে গেভারার দেওয়ালচিত্রের নিচে কাস্তে হাতুড়ির ছবি তার তলায় লেখা মিসিং, মাস্টারকে মাইনে দিতে এসে গায়ে ওড়না জড়িয়ে নেওয়া।বাংলা ছবি অডিও ভিজ্যুয়ালি ভাবছে দেখে ভালো লাগলো, আশা জাগলো।অবশ্যই দেখুন।
    খ্যাপা - পাগলা গণেশ | আজ চারিদিকে যেখানে চোখ যায় সবাই বিকারগ্রস্ত,পাগল, মাতাল, খ্যাপা।তার মাঝে একজন ডেকে গেল, "ওই খ্যাপা।"আমি চারিদিকে তাকিয়ে দেখি, কেউ কোথাও নেই; আমি আর লোকটা ছাড়া,আমারও কদিন সন্দেহ হচ্ছিল নিজের অবস্থা নিয়ে,এই যে স্রোতে গা ভাসাতে পারছি না আগের মতো, যুক্তি খুঁজছি,এসব তো আগে হতো না!মাস গেল,একটা গোটা বছরও,রোগ বেড়ে গেল,ডাক্তার বলল, "এ ব্যাধি দুরারোগ্য।"আমি আর ভাবিনি চিকিৎসা নিয়ে,নিজেকে সুস্থ প্রমাণ করতে লাগলাম প্রানপণে,দল গড়লাম, নাম দিলাম 'অমুক',দলে দলে লোক যোগ দিল তাতে,সবাই আমার মতো,নিজেদের ঘোষণা করলাম সুস্থ বলে,বললাম, "আমরা সুস্থ মানুষের প্রতিনিধি।"আগে দল ছিল দুচারটা,ভক্তপাগল,নেতাপাগল,টাকাপাগল নামে।এখন আর কেউ খ্যাপা বলে না আমাদের,এখন সবাই সুস্থ, একটাই দলের সদস্য সবাই।ডাক্তারের পেশা উঠে গেছে।
    হেদুয়ার ধারে - ১৫৮  - Anjan Banerjee | মজিদ আর বাবলু এখন সন্তোষের সঙ্গে কাজ করছে। সন্তোষের দোকানেও বসে।সন্তোষ দোকানে বসেই বলল, ' তোদের একটা খবর করতে হবে। কানুদা মার্ডার হয়েছে জানিস তো ? সাগরদার ডানহাত ছিল ... 'মজিদ ঘাড় নাড়ল। বাবলু বলল, ' হ্যাঁ জানি। সাগরবাবুর ডানহাত ছিল। দেখিনি অবশ্য কোনদিন ... '---- ' হ্যাঁ ... ঠিক। এমনি তো ছেড়ে দেওয়া যাবে না। কি বলিস ? '----- ' না না ... তা হয় নাকি ! বদলা নিশ্চই নিতে হবে ... ' বাবলু বলল।মজিদ আবার ঘাড় নাড়ল, যার মানে সে সঙ্গে আছে।----- ' হ্যাঁ ওই ... সেটাই আর কি ... বলছি আমি ...'----- ' কি করতে হবে ? ' মজিদ বলল।---- ' তেমন কিছু না ... কে লোক লাগাল সেটা বার করতে হবে। আগে দেখবি স্বরূপ খাঁড়ার লোক কিনা। ওদিক থেকেই শুরু করবি ... আমি খালপারের দিকটা দেখছি ... '----- ' হুঁ বুঝেছি ... দেখে নিচ্ছি ... ' বাবলু বলল।দুপুর দুটো নাগাদ দোকান বন্ধ করে সন্তোষ বেরিয়ে পড়ল।প্রথমে গেল দেশবন্ধু পার্কের পিছনে শ্যামবাজার খালপারে।রোদ্দুর জমজম করছে। দুটো ছই দেওয়া নৌকো বাঁধা রয়েছে। তিন চারজন খালের জলে ছিপ ফেলে বসে আছে, চ্যাং, খলসে যা ওঠে। একটু ফারাকে আঠ দশটা ঝুপড়ি। দু একটার সামনে দড়ির খাটিয়া পাতা রয়েছে।সন্তোষ খালের ধারে গিয়ে দাঁড়াল। একপাশে দাঁড়িয়ে মাছ ধরা দেখতে লাগল।মিনিট দশেক এইভাবে কাটার পর সন্তোষ দেখল ওই মাছ ধরা লোকগুলোর মধ্যে কালো হাতকাটা গেঞ্জি পরা একজন রোগামতো লোক তাকে মাঝে মাঝে ঘুরে ঘুরে দেখছে। সন্তোষ চোখ ঘোরাল না, ওদের দিকেই তাকিয়ে রইল। তার মনে হচ্ছে, ছিপে অবশ্যই মাছ উঠবে।আরও মিনিট পাঁচেক গেল। খালের জল থেকে দু চারটে ক'রে মাছ উঠছে। ছিপ ফেলা লোকগুলো খুব উৎসাহিত বোধ করছে। আর সেই লোকটা মাঝে মাঝে ঘুরে ঘুরে দেখছে সন্তোষের দিকে।সন্তোষ এবার পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল মাছধরা লোকগুলোর দিকে।ওই কালো গেঞ্জি লোকটা উঠে দাঁড়াল। সন্তোষের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ' দাদা কি এদিকে থাকেন নাকি ? 'সন্তোষ একটা দিক দেখিয়ে বলল, ' হ্যাঁ ... ওই ওদিকে থাকি ... 'কোনদিক দেখাল ঠিক বোঝা গেল না। তারপর বলল, ' শুনলাম সেদিন এখানে একটা মার্ডার হয়েছে ... তাই জায়গাটা দেখতে এলাম ... 'কথাটা শুনে চারটে লোকই কেমন গুটিয়ে গেল। সন্তোষের আপাদমস্তক মাপতে লাগল সন্দেহ মাখা চোখে। সন্তোষকে বোধহয় 'খোঁচড়' -এর লোক ভেবে নিয়ে সতর্ক হয়ে গেল। ছিপ টিপ গুটিয়ে নিয়ে একজন বলল, ' নাঃ ... আজ আর উঠবে না ... চল যাই ... 'সন্তোষ বলতে লাগল, ' এরকম শান্ত জায়গা ... এখানে একজনের মার্ডার হয়ে গেল ! আশ্চর্যের ব্যাপার ... এখানে কে খুন করবে ? 'কথাটায় কাজ হল। কালো গেঞ্জি পরা লোকটা উত্তেজনার মাথায় তড়িঘড়ি বলে উঠল, ' আরে না না ... মার্ডার এখানে কেন হবে ... পাগল নাকি ? করে দিয়ে এখানে বডি ফেলে গেছে ... একদম সাফসুফ কথা ... 'বলে ফেলেই সঙ্গে সঙ্গে সামাল দেবার চেষ্টা করল।----- ' না ... এমনি বললাম আর কি ... আমরা ওসবের কি জানি ... হ্যাঃ হ্যাঃ ... 'সন্তোষ ঘাঘু লোক। জায়গাটা ধরে নিল। বলল, ' তাই তো ... আমিও তো সেটাই ভাবছি ... এখানে কি ক'রে ... আজিব ব্যাপার ... কিন্তু খালাসটা হল কোথায় ? 'ওদের মধ্যে একটা লোকের সতর্কতার বাঁধন আবার আলগা হয়ে গেল, বোধহয় উদ্বেগজনিত কারণে।তার সঙ্গীরা তাকে সতর্ক করার আগেই সে হড়বড়িয়ে বলে উঠল, ' নিজের চোখে দেখলাম। তা ধরুন রাত বারোটা হবে ... পেচ্ছাপ করতে বাইরে এসেছিলাম ... চেপে গেল। একটা ট্যাক্সি এসে দাঁড়াল চুপচাপ। চারটে লোক একটা বডি বার করে ফেলে দিয়ে এক মিনিটের মধ্যে হাওয়া ওই আর জি করের দিকে। গাড়িতে স্টার্ট মারাই ছিল ... 'সন্তোষ চোখ ছানাবড়া করে লোকটার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ' এ তো সাঙ্ঘাতিক ব্যাপার ভাই ... শুনেই তো আমার হাত পা কাঁপছে। তোমার তো খুব সাহস আছে বলতে হবে ... আমি তো রাত দুপুরে এসব দেখলে প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলতাম ... মাইরি বলছি ... 'লোকটা সন্তোষের মুখে তার প্রশংসা শুনে লাজুক ভঙ্গীতে হাসল। সন্তোষ বুঝতে পারল নিতান্তই গোবেচারা নীরিহ লোক এরা।তাকে খুব সম্ভবত পুলিশের লোক ভেবে এরা তাকে অগ্রাহ্য করে চলে যেতে সাহস পাচ্ছে না।একেবারেই সরল প্রকৃতির লোকজন।সন্তোষ আবার বলল, ' কি অদ্ভুত ব্যাপার না ? কোন আওয়াজ নেই... কিছু নেই, চুপচাপ ডেডবডি নামিয়ে দিয়ে চলে গেল ... একটা কথাও কেউ বলল না ... 'প্রশংসিত লোকটা বোধহয় খানিকটা অনুপ্রাণিত হবার বশে বলে উঠল, ' দ্যাখেন ... সত্যি কথা বলতে কি একটা নাম আমার কানে এল যেন ... খুব আস্তে বলছিল যদিও ... মানে নিশুত রাত বলেই শোনা গেল ... 'সন্তোষ নির্লিপ্ত ভাব বজায় রেখে বলল, ' ও ... তাই নাকি ? কি আর বলবে ... হাড় বজ্জাত লোক সব।ওদের কথা সব ফিসফিসে, কিছু শোনার যায় না ... 'এবার ওই মাছধরা লোকটা বোধহয় নিজের কৃতিত্ব জাহির করার জন্য ফস করে বলে বসল, ' তেমন কিছু শুনতে না পেলেও একটা নাম যেন পরিষ্কার শুনলাম দুবার ... 'সন্তোষ সুকৌশলে নিজের অভিপ্রায় ঢেকে রাখল।নির্লিপ্তির ভান করে বলল, ' সে কি আর শোনা যায় ? ... যাকগে ... কি দরকার আমাদের ... 'কিন্তু লোকটা ততক্ষণে সন্তোষের টোপ গিলে ফেলেছে। সে না বলে ছাড়বে না ঠিক করেছে। তার সঙ্গীরা, বিশেষ করে কালো হাতকাটা গেঞ্জি পরা লোকটা তাকে আকারে ইঙ্গিতে থামাবার চেষ্টা করছিল। কিন্তু ফল হল না কিছু।সে বলে ফেলল, ' না ... দেখুন ... সত্যি কথা বলতে কি, নাম কিছু শুনতে পাইনি ... ওরা কি আর অত আনাড়ি ? 'তার সাথীরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সন্তোষ ভাবল, ' যাঃ গেল ... 'কিন্তু লোকটা এখনও থামেনি। সে বলল, ' যেটা দিয়ে মেরেছে, মনে হয় সেই অস্তরটার নাম বলছিল ... '--‐- ' আচ্ছা ! কিরকম কিরকম ? '----- ' দু তিনবার শুনলাম খাঁড়া খাঁড়া। মনে হয় খাঁড়া দিয়ে মেরেছে শালারা ... ইশশ্ ... একটা জলজ্যান্ত মানুষকে এইভাবে ... মায়ের কোন মন্দিরের খাঁড়া কে জানে ... 'সন্তোষের বুকের ভিতর দপ করে একটা আলো জ্বলে উঠল।সে অবশ্য উত্তেজনাটা বাইরে আনল না।নিপাট ভঙ্গীতে বলল, ' সে আবার কি ! খাঁড়া দিয়ে মানুষ খুন ? তা কোন মন্দিরে নিয়ে গিয়ে বলি দিল বেচারাকে জানার খুব ইচ্ছে রইল ... যাক চলি এখন ... এসব কথা পাঁচকান না করাই ভাল ... কার মনে কি আছে ... 'কালো গেঞ্জি বলল, ' সেটাই তো ... সেটাই তো ... এ গাধাটা বোঝে না কিছু ... 'সন্তোষ পিছন ফিরল। খালের জলে নৌকো দুটো হাওয়ার ধাক্কায় হাল্কা হাল্কা দুলছে। ছইয়ের ওপর রোদ পড়েছে তেরছা হয়ে।সন্তোষ বেলা সাড়ে চারটে নাগাদ চোরবাগানের এক ঘিঞ্জি অপরিসর গলিতে গিয়ে পৌঁছল। গলিতে ঢুকে ডানদিকে একটা ছোট একতলা ভাঙাচোরা, পলেস্তারা খসা বাড়ি। এখানে কানুর দাদা বৌদি এবং দুই ছেলেমেয়ে থাকে। বাড়িটা খুব সম্ভবত পৈত্রিক। বহুদিন কোন সংস্কার হয়নি। কানু তার দাদা বৌদির সঙ্গে থাকত।কানুর দাদা কি করেন কে জানে। চল্লিশ বিয়াল্লিশ বছরের মতো বয়স হবে। বাড়িতেই ছিলেন।তিনি বেরিয়ে এসে বললেন, ' আপনাকে তো ঠিক চিনলাম না। 'সন্তোষ সরাসরি বলল, ' আমি সাগর মন্ডলের সঙ্গে আছি। কানুকে আমার বন্ধু বলতে পারেন ...'কানুর দাদা খুব একটা উৎসাহ দেখালেন না।খুব সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া দিলেন, ' ও ... 'বাড়ির ভিতরে আমন্ত্রণ জানালেন না সন্তোষকে। আবার অভদ্র আচরণও করলেন না। বাড়ির বাইরে দরজার দুপাশে দুটো ছোট রক আছে। উনি সন্তোষকে বললেন, ' আসুন ... এখানে বসুন ... 'বলে নিজে বসে পড়লেন সেখানে। সন্তোষও তার পাশে বসল।সন্তোষ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ' এমনি দেখা করতে এলাম ... সাগরদাও আসবে পরে .... খুব ভেঙে পড়েছে কানুর এই ব্যাপারটায়...'কানুর দাদা প্রীতিময়বাবু বললেন, ' এরকম কিছু যে হবে সেটা আমাদের জানাই ছিল। খুব একটা অবাক হইনি ... সবই কর্মফল আর কি ... 'সন্তোষ প্রীতিময়বাবুর ভাবনার গতি প্রকৃতি মোটামুটি আন্দাজ করতে পারছে। প্রীতিময় যে অন্য লাইনের লোক সেটাও বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না তার। কিন্তু সে সব নিয়ে তর্কাতর্কি করার মেজাজে সে এখন নেই। কানু চলে যাওয়ায় তার দাদার মনে কোন তাপ উত্তাপ আছে বলে মনে হচ্ছে না। বরং মনে হচ্ছে হাঁফ ছেড়ে বেঁধেছে।প্রীতিময় আবার বলল, ' ও ছোটবেলা থেকেই এরকম ধরণের। তারপর এখন তো বদসঙ্গে পড়ল.... লোকের ওপর ঝামেলা মাস্তানি করলে তার ফলও তো ভুগতে হবে ... এ তো জানাই কথা ... 'সন্তোষ বুঝতে পারল কেন এ দেশের কিছু হয় না। যে দেশের মানুষ এরকম ধান্দাবাজ, স্বার্থপর সে দেশের কি হবে। বেশ বোঝা যাচ্ছে ভদ্রলোক সাগরের নামে খোলাখুলি ভাল মন্দ কিছু বলতে পারছে না। কিন্তু ভিতরে জ্বালা আছে।কিন্তু সন্তোষ কোন বাতবিতন্ডায় জড়ানোর জন্য এখানে আসেনি। সে এসেছে খবর জোগাড় করতে। সেটাই তার কাজ। ওসব তক্কাতক্কি নিখিল স্যারেরা করবে।কানুর দাদা বোধহয় চুপচাপ থাকতে পারেন না।বলতে লাগলেন, ' কখন কোথায় বেরিয়ে যাচ্ছে তার ঠিক আছে নাকি ? এক পয়সা রোজগারের মুরোদ নেই, সমাজসেবা করছে ... হ্যাঃ। লোকের উপকার করতে গেলে আগে নিজে ওজনদার হতে হয় ... হ্যাঃ ... 'সন্তোষ চুপচাপ রইল, কোন প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে। ওটা তার কাজ না।------ ' কোন বাছবিচার নেই ... যে যখন ডাকছেবেরিয়ে যাচ্ছে। কচিখোকা নাকি ... হ্যাঃ ... এই তো সেদিনই ধর না ... বেলা তিনটে নাগাদ ... 'সন্তোষ চুপ করে রইল কোন কথা না বলে। সে জানে প্রীতিময় নিশ্চিত কিছু বলবে এবার।----- ' .... হ্যাঁ ... আমি তখন দোকান থেকে ফিরেছি ভাত খাওয়ার জন্য ... দেখি কে একটা ডাকছে কানুকে ... কানু তাড়াতাড়ি গায়ে জামাটা গলিয়ে বেরিয়ে গেল। ভাবলাম, নিশ্চয়ই কোন জরুরী সমাজসেবার ডাক পেয়েছে ... হ্যাঃ ... 'সন্তোষ এবার নম্রকন্ঠে বলল, ' যে ডাকতে এসেছিল তাকে চেনেন নাকি দাদা ? '------ ' একটু যেন চেনা চেনা লাগল, এদিককারই ছেলে মনে হল তবে ঠিক মনে করতে পারলাম না ... '----- ' কোথায় যেতে হবে কিছু বলল ? '----- ' বলেছে হয়ত। আমার কানে কিছু আসেনি। তারপর তো হুড়ুম দুড়ুম করে বেরিয়ে গেল। ও হ্যাঁ ... শক্তিপদর বাড়ি, না কি একটা বলল। শক্তিপদ বিশ্বাসের বাড়ি তো ওই মোড়ে ... ফার্নিচারের ব্যবসা ... পয়সাওয়ালা লোক ... তাকে নাকি কারা মারধর করেছে। সে সব মেটাবার জন্যই বোধহয় কানুকে ডাকতে এসেছিল ... '----- ' ও ... তা আপনি শক্তিপদবাবুর ওখানে কোন খোঁজ করেননি কানু না ফেরার পর ... '----- ' না না ... আমি ওসব ঝামেলায় জড়াতে যাব কেন ? তাছাড়া আমি অত বুঝবই বা কি করে ? কানু তো ওরকম প্রায় দিনই রাত্রে বাড়ি ফিরত না। এখানে ওখানে অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকত ... আমার কি অত ফুরসত আছে নাকি ? '----- ' আপনি স্বরূপ খাঁড়া কিংবা বংশীলালকে চেনেন নাকি ? মানে নাম শুনেছেন ? 'সন্তোষ লক্ষ্য রাখল প্রীতিময়ের মুখের দিকে। তার নজর এড়াল না, কানুর দাদা কেমন যেন চমকে উঠলেন।বললেন, ' না না ... আমি ওসব কাউকে চিনি না ... আমি ছাপোষা লোক ... এরা কে ? '----- ' তা ভাল। এসব লোকজন না চেনাই ভাল। এই তো দিব্যি আছেন ...'----- ' কোথায় আর দিব্যি ভাই .... সংসার টানতে জেরবার হয়ে যাচ্ছি। কাপড়ের দোকানের কর্মচারী। বুঝতেই পারছ ... দুটো উপরি রোজগারের ধান্দায় হন্যে হয়ে ঘুরি ... '----- ' হমম্ .... বুঝলাম ... ' সন্তোষ বলল আপনমনে।----- ' কি বুঝলে ভাই ? তুমি তো দেখছি পুলিশের মতো জেরা করতে শুরু করলে ...'----- ' আরে না দাদা, কি যে বলেন ... আমার যদি অত যোগ্যতা থাকত, তা'লে তো হয়েই গিয়েছিল ... আচ্ছা ঠিক আছে দাদা ... আমি আসি এখন ... আবার হয়ত দেখা হবে ... একটু সাবধানে থাকবেন কিছুদিন ... বলা তো যায় না ... 'বিবেকানন্দ রোডের দিকে হাঁটতে হাঁটতে সন্তোষের মনে হল কানুর দাদা বড় বেশি কথা বলে। এটা কি তার স্বভাব, নাকি শুধু তার সঙ্গেই এত কথা বলল ? অভাবে স্বভাব নষ্ট হয় এটা অবশ্য অনেক ক্ষেত্রেই মিথ্যা নয়।সে এটাও ভাবল, দেখা যাক মজিদরা কি খবর নিয়ে আসে। তারপর নয় সবাই মিলে যোগ বিয়োগ করতে বসব।সন্ধেবেলায় নিখিল স্যারের ওখানে যেতে হবে।( চলবে )********************************************
  • ভাট...
    comment&/ | অনেক অনেক ধন্যবাদ, অরিন। খুব জরুরী তথ্য সব। ডাইভার্সিটি ইজ দ্য কী। যেকোনো রকম হিউম্যান এন্ডেভারে ডাইভার্সিটি খুব হেল্প করে। কিন্তু এমনিতে সাধারণ মানুষের পক্ষে 'নিজের লোক' 'পরের লোক' মনোভাবটা কাটিয়ে ওঠা শক্ত। এটা মনে হয় আমাদের বিবর্তনের সঙ্গে জড়ানো, বিরাট সময় জুড়ে আমরা তো যার যার ক্ল্যানের মধ্যে থেকেছি। বাইরের সবকিছু সন্দেহের চোখে দেখেছি। সেই দাগ এখনও আমাদের মনের মধ্যে।
    commentঅরিন | &/, "ম্যান্ডেলার ওখানে সত্যি সত্যি কতটা কী করতে পেরেছিলেন, কোটাহীন ভাবেই দেশ চালিয়ে নিতে পেরেছিলেন কিনা, তাঁর জমানার পরে কী হল--এইসব"
     
    নেলসন ম্যাণ্ডেলা "কোটাহীন ভাবেই দেশ চালিয়ে নিতে পেরেছিলেন" তা বোধহয় নয় | 
    এটা দেখুন,
     
    "South Africa has benefited from fair AA (Affirmative Action) interventions to remove both blatant and subtle forms of societal discrimination towards Black residents who could not access lucrative educational and employment opportunities. As such, it provides a good model to study for global AA initiatives. Like the U.S., South Africa continues to work towards using its diversity to boost national competitiveness.2 This has been particularly important following the legalized racism that existed in South Africa's apartheid era which meant that Blacks and other people of color could only serve as unskilled or semi-skilled workers and could not rise above junior management positions. The same was true of women, who had faced years of gender discrimination in South Africa. From 1994 to 1999, President Nelson Mandela's administration embraced AA to transform the South African workforce. Its AA program provided equal access to minorities, so they could fill jobs previously inaccessible during Apartheid. The Employment Equity Act (No. 55 of 1998), which focused on providing employment equity to historically disadvantaged groups in South Africa, prohibited identity-based discrimination, stating that "no person may unfairly discriminate, directly or indirectly, against an employee in any employment policy or practice, on one or more grounds including race, gender, pregnancy, marital status, family responsibility, ethnic or social origin, color, sexual orientation, age, disability, religion, HIV status, conscience, belief, political opinion, culture, language, and birth." As another AA intervention, the Employment Equity Act (Chapter 11, No. 5) required that organizations take relevant steps to promote equal opportunity by eliminating discrimination in employment policies and practices. When White South Africans protested AA due to fears of losing previously enjoyed unearned privileges, Mandela responded by convincing White South Africans that racial inclusion was South Africa's only way to re-engage with the global community after Apartheid.3 Specifically, Mandela granted government contracts (i.e., architectural construction, roadway design, training of staff, etc.) to institutions whose equity partners were members of formerly disadvantaged groups.4 This diversity requirement did not constitute discrimination towards Whites, as it gave people of all skin colors access to lucrative jobs. This, in turn, has encouraged companies to diversify their management and has made South African teams and contractors more competitive, as they can more easily satisfy the needs of diverse populations locally and across the globe. South Africa's AA and diversity management efforts have been seen as a success, demonstrating that accessibility and inclusion can create a fair economy for people of all backgrounds, and can be used as a model for all AA initiatives globally.5 Therefore, other nations such as the United States can certainly benefit from South Africa's AA best practices to enhance their own diversity, inclusion, and equity (DEI) initiatives towards the integration of minorities and women in all workplaces and ranks."
     
    [৩]: Sithole, M., Dastoor, B., and Ippolito, G., Affirmative Action in South Africa: Decades of White Privilege. In B.G. Mujtaba's "Workforce Diversity Management" book, pp. 121-123. ILEAD Academy: Florida
    [৪]: https://archive.jsonline.com/news/opinion/what-nelson-mandela-meantb99158524z1-234818401.html/ (এই লেখাটা বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য
     
    commentঅরিন | lcm এর এই ছবিটা ভারী সুন্দর, চারটে অবস্থাকেই ভারী সুন্দর করে দেখিয়েছে । বেসবল মাঠের ছবিটার থেকে অনেক ভালো ।
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত