এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  গপ্পো  শরৎ ২০২৩

  • ট্যাঙ্কশংকর, লোকটা ও এক সম্ভাব্য/অসমাপ্ত মহাজাগতিক কিস্যা-১

    সৌমিত্র ঘোষ
    গপ্পো | ০৪ নভেম্বর ২০২৩ | ৮৬৫ বার পঠিত
  • মেনকার মেয়ের মাগ্গদশ্শক  | যদি এই জীবনের বন্দরে নানাদেশী তরী এসে নোঙর করে | ঘোড়ামারা দ্বীপ | দ্বিষো জহি | কবি যখন পাহাড় হয়ে যায় | ট্রফি | ফকিরি | বাংলা ভাষার গঠন নিয়ে চর্চা ও কিছু প্রস্তাব | কাঠের মানুষ | তাজ ও মাহোল | কবিতাগুচ্ছ | কোন নাম নেই | টিফিনবেলার গান | সান্দ্র ধাতবসঙ্গীত | মশা-ই | গুনাহ! গুনাহ! | রেনেসাঁস থেকে রসগোল্লা সবই কলোনিয়াল | সু-পাত্রের সন্ধান দেবে অঙ্ক | যদি বল প্রেম | যশপতির একদিন | চোদ্দপিদিম | গভীর জল | লেখা-সাক্ষাৎ | ব্ল্যাকআউট ডাইনিং - পর্ব ১ | কন্যাকুমারী | সিন্ধুতট | ট্যাঙ্কশংকর, লোকটা ও এক সম্ভাব্য/অসমাপ্ত মহাজাগতিক কিস্যা-১ | ট্যাঙ্কশংকর, লোকটা ও এক সম্ভাব্য/অসমাপ্ত মহাজাগতিক কিস্যা-২ | আনন্দ মঠ – ইতিহাসের সন্তান, ইতিহাসের জননী | ব্ল্যাকআউট ডাইনিং -- পর্ব ২ | অর্গ্যাজম | কবি-কাহিনি | ব্ল্যাকআউট ডাইনিং -- পর্ব ৩ | কমরেড গঙ্গাপদ | বিপজ্জনক খেলা | বেলার বেতার | গভীর অসুখে নিমজ্জিত মণিপুর | আবোল তাবোল | শিউলিরা | বিসর্জন | এক রাজা, দুই কবিরাজ | হাওয়া হাওয়া | ভোলবদল | ধৃতরাষ্ট্র ও দশরথঃ মহাকাব্যের দুই পিতা ও তাদের রাজধর্ম | মারীকথা | দামামা | হাওয়া মোরগের জীবন | পলায়নবাদীর সঞ্জীবনী বটিকা | নিত্যগতি | তিনটি কবিতা | চিত্রকর | যাবার কথা
    প্রথম ভাগ


    ঢিল

    একটা ঢিল ছোড়া যাক। ঢিলটা কাক-ওড়া সরলরেখা ধরে যেতে থাক। যদিও কাকেরা সরলরেখায় ওড়ে, বিষয়টা এমন, মানে, প্রামাণ্য নয়। বিষয়টা কাক নয় ঢিল, ঢিলটা মহাজাগতিক দ্রুতগতিতে সাঁই সাঁই ধাবমান, সরলরেখা কিম্বা প্যারাবোলায়। সরলরেখা, প্যারাবোলা বা নেহায়েৎ ছাপোষা বক্ররেখা ধরে যেতে যেতে ঢিল টাল খেতে বা লড়খড়াতে পারে, নাও পারে। বিষয়টা সেটা নয়। মানে, ঢিলটা কি আদৌ আছে? থাকলেও সেটা কি দৌড়োচ্ছে? আরো মোদ্দা কথা যেটা, সেটা কি ছোড়া হয়েছে? এ সব প্রশ্নের মীমাংসা ধীরে ধীরে হবে, কিম্বা আদৌ, কখনোই হবে না। আরো গোলমেলে যে বিষয়টা, সেটা হলো প্রশ্নগুলো কি আদৌ করা হয়েছে, হবে, হয়েছিলো? কি জানা যাচ্ছে, কি যাচ্ছে না? পরতে পরতে যেভাবে পেঁয়াজ খোলে, শালুক ফুল ফোটে, ছোট ডিম বড় হয়, পিঁপড়ের ডানা গজায়, মোদ্দা, ব্রহ্মজ্ঞান লাভ হয়, সেভাবে জানা হবে, বোঝা হবে, জ্ঞান হবে। অথবা হবে না। মোদ্দা, অত ভেবে অযথা বিচলিত হবার কিছু নেই, মনোবিকলনে পেট কামড়ায়, কান কটকট করে, শরীর কষে যায়। আরো অনেক খারাপ, মাথা গুলোনো উদ্ভুট্টে ব্যাপারস্যাপার হয়। সে সব নিয়ে দশ প্যাচাল পাড়ার কোনো মানে হয় না।

    ঢিলটা যাচ্ছে, যাচ্ছে, যাচ্ছেই। অবশ্য না গিয়ে গোত্তা খেয়ে পড়ে যেতে পারে, কিম্বা মহাশূন্যে ঝুলে থাকতেও পারে। মানে যা ইচ্ছে হতে পারে, কিম্বা পারে না। সম্ভাবনা থেকেই যায়। সম্ভাবনা ভাইরাসের কিম্বা হোমিওপ্যাথিক ওষুধের মতো, একটা থেকে আর একটা, আর একটা থেকে একটার একটা, এভাবে বড়ি থেকে গুঁড়ো থেকে দানা ফোঁটা ও অণুপরমাণু অবধি চলে যেতে পারে, লাফাতে পারে, ডিঙোতে পারে, স্থানকাল নিশ্চিহ্ন করে বিন্দু এক থেকে বিন্দু দুই-য়ে পৌঁছে যেতে পারে। সম্ভাবনাচক্কর থেকে ছাড়ান নেই। অবশ্য আমরা ক্লাস ফাইভের সরলজ্যামিতির ভাষায় 'ধরে নিতে'ই পারি, যেমন রেখা, কোণ, বৃত্ত, ক্ষেত্র ইত্যাদি। সেইরকম, ধরে নিই, একটা ঢিল। আবার, ধরে নিই, ঢিলটা ছোঁড়া হয়েছে। ধরে নিই(৩) ঢিলটা দৌড়োচ্ছে। (৪) ঢিলটা সরলরেখায় দৌড়োচ্ছে। (৪ক) ঢিলটা বক্ররেখায় দৌড়োচ্ছে। (৪ক(ক)) ঢিলটা প্যারাবোলা মেরে দৌড়োচ্ছে। ধরে নিই(৫) এইরকম সব হচ্ছে।

    ঢিলের গতিপথ গুরুত্বপূর্ণ। ঢিল আছে ও দৌড়োচ্ছে এই সম্পাদ্য থেকে বোঝা যায়, ঢিলটা নেই কিম্বা থাকলেও কেলটে পড়ে আছে, এই প্রতিসম্পাদ্যদ্বয় খারিজ, বাতিল, আব্বুলিশ। এই পেশিবলী জ্ঞান থেকে পুনঃ ধরে নিই, ঢিলটি আছে, দৌড়োচ্ছে, থামছে না, এ তর্ক অকাট্য। যাই হোক, ঢিলের গতিপথ নিয়ে তর্ক ছিলো না, থাকলেও তা শোনা হবে না। সুতরাং, ঢিল যায়, যেতে থাকে। সরলরেখা, উপবৃত্ত, বক্ররেখা। যেভাবে কাকপাখি ওড়ে, এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে শিরদাঁড়া পথ ছড়িয়ে থাকে, সোজা যেতে যেতে হুস করে ধনুষ্টঙ্কারের মতো বেঁকে যায় উড়ালপুল।

    ঢিল যদি থাকে, যদি যায়, তার গতিপথের ডাইনে বাঁয়ে সামনে পিছনে অনেক কিছু থাকে, কোণ কেটে বা সমান্তরাল। ঢিলটাকে ধরে নিলে এই কোণ কাটা সমান্তরাল থাকাগুলোকেও ধরে নিতে হবে। যে ঢিলটার কথা হচ্ছে, তার ডাইনে ও বাঁয়ে থইথই করছে স্থান, ধরে নিই। স্থান শূন্য থাকে না বিবেচনায় ধরে নিই, সেখানে মেলা কিছু আছে, ঠাসাঠাসি গাদাগাদি করে, খাপে খাপে ঢুকে। ধরে নিই, বাড়ি আছে ঘর আছে মহিষ মানুষ কুকুর বেড়াল বাদুড় ইঁদুর দোকান বাজার অটো টোটো বাইক সাইকেল রিক্সা মার্সিডিজ বেঞ্জ সব আছে। এ ওর গা বেয়ে উঠছে দিনরাত, চুলকে, কামড়ে কি খিমচে দিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, কখনো যাচ্ছেও না আবার, ঠাসাঠাসি গাদাগাদি থাকাটাকা ঘিরে কুন্ডলি পাকিয়ে বা চাপচাপ জমে আছে থিকথিকে কথা ও ছবি। উঃ আঃ বাবারে মারে মরে গেলাম। লাগে লাগে। জিন্দাবাদ। জয় হিন্দ বন্দে মাতরম। লাল সেলাম ধনতেরাস। চৈত্র সেল। কেউ মুখ ভ্যাংচাচ্ছে। চুমু খাচ্ছে। কুঁই কুঁই চুক চ্যাক। পুঁচ পুঁচ হুসহাস। গপাত গপাত দ্রাম দ্রুম। চিঁইইইইইই।

    ঢিল সাঁইসাঁই যাচ্ছে, ঢিলের ডান ও বাঁপাশে ঠাসাঠাসি, গাদাগাদি, থিকথিকে, স্থানভরানো জমাট ভিড়, ধরে নিলাম। ধরে নিই(৭) ঢিলের গতিপথের আড়াআড়ি অন্য গতিপথ। সেখান দিয়ে কোণ কেটে, স্থান চিরে, সমান্তরালে ও বরাবর, সরলরেখা ও বক্ররেখায় (ও বৃত্তাকারে--লুপ থাকে যদি) রেল দৌড়োচ্ছে। সবসময় নয়, যখন চলে তখন। রেল চলুক না চলুক, ধরে নিই(৮) রেলপথের ধারে একটি দরকচা মারা, ছাতা পড়া ও বেমক্কা স্টেশন আছে। বেমক্কা কেননা যে এটি না থাকতেও পারতো। স্টেশন না থাকলে সেই স্থানে লোম ওঠা ঘেয়ো ও তাগড়া ওপাড়ার টমি পথকুক্কুরের দল, গৃহহীন ভিকিরিকুল ও পাতাখোর বালযুবকেরা যুগপৎ ঠ্যাং তুলে ও না তুলে হিসু করতে পারতো। কিম্বা সেখানে অবিরল প্রোমোটারকৃপায় এন্তার ভিজেশুকনো বালিবজরি জমা হতে পারতো। কিম্বা ঝিনচাক বিগবাজার হতে পারতো। কিম্বা পার্টি অফিস। কিম্বা ঝুগগিঝুপড়ি। যা হয় যা থাকে, তা, যা হয় না বা থাকে না, তাকে, অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্র নিরন্তরতায় গুমখুন করতে থাকে, তার (দ্বিতীয়টির) বডিসুদ্ধ লোপাট হয়ে যায়। এই খুনহত্যারক্তপাত ইত্যাদি থেকে অনর্গল কিস্যা ও কহানি তৈরি হতে থাকে, থাকা ও না থাকার মধ্যিখানের অনিশ্চিত থলথলে ভুর্বলোকে অগণন লার্ভাসদৃশ ছায়াভূতদের (কিম্বা মায়াডেটাদের) মতো তারা কিলবিল করে। ধরে নিই, ঢিল, তার বাঁ ও ডান পাশের থইথই স্থান, স্টেশন ও রেলপথ, প্যারাবোলা ও রেখাভুলভুলাইয়া এবং তৎসংলগ্ন আখাম্বা কিচমিচে ভিড়, এসব মিলিয়ে যে মরপৃথিবী, সেখানে যারা বাস করে, তাদের কেউ কেউ এই সব কহানিডেটা বা ডেটাকহানির খোসা বা কোড ছাড়াতে সক্ষম। যে ঢিল নেই কিম্বা আছে, তার গতিপথ ও পরিপার্শ্বের কথা সাতকাহন করে বলা হচ্ছে যখন, তারও এক কুলুজিকার বর্তমান, ধরে নিতে হয়। ফলত, ঢিলের ডান এবং বাঁ পাশ, নিচের রেলপথ ও স্টেশন, এসবের যে কিস্যাকাহিনী, তা বলনেওয়ালা কাউকেও ধরে নিতে হয়। যা কিছু জানা যায় কিম্বা জানা যায় না, তার খোলনলচেহাড়মাংসমজ্জা, যোনিলিঙ্গবিচিবুক, শুক্রাণু ডিম্বাণু, জিন ক্রোমোজোম এবং আর এন এ ডি এন এ সব এভাবে গড়ে ওঠে। কিম্বা ওঠে না।

    বারান্দা ও ছাদ

    ফলত, সুতরাং, অতএব, ঢিল যে গতিপথে সাঁইসাঁই দৌড়োয়, তার বাম পাশে একটি বাড়ি আছে, ছিলো, থাকবে। বাড়িটির ঈশান ও নৈঋত কোণে, পূর্বে পশ্চিমে উত্তরে দক্ষিণে, সামনে পিছনে ডাইনে ও বাঁয়ে, যতদূর দেখা যায়, মানে মানুষ, কাক, শকুন ও কুকুর যতদূর অবধি দেখতে পায়, আরো বাড়ি। বাড়িগুলি মুখ্যত পাইখানা-হলুদ, বোদা নীল, মেটে লাল, আদ-বাদামি, বা ওইরকম রঙের, কোনটা সোজা, কোনটা চ্যাপ্টা, কোনটা বেঁটে, কোনটা কিছু বা লম্বা। বা ট্যারছা। বাড়ি থাকলেই বারান্দা থাকে না, কিন্তু কি আশ্চর্য, বাড়ি না থাকলে বারান্দা থাকেই না। সুতরাং, ধরে নিই(৯) বারান্দা ও বাড়ি। বাড়ি ও বারান্দা। ঢিল দৌড়োচ্ছে, রেল ছুটছে, কাক উড়ছে। যে কাহিনীর কথা বলা হচ্ছে, সেটা এখান থেকে শুরু হচ্ছে, ধরে নিই(১০)। ঢিল নিজের গতিপথ থেকে ভটকে বা কক্ষচ্যুত হয়ে এসে পড়ে বারান্দা থেকে অসমকোণে গোঁৎ খেলে, একটি ছাদ পাওয়া যায়। বারান্দার ক্ষেত্রে যেমন, ছাদের ক্ষেত্রেও বাড়ির প্রাককল্পনা থাকতেই হয়। সুতরাং বাড়ির ওপরে ছাদ বা ছাদের নীচে বাড়ি, ধরে নিই(১১)। বাড়ি ও ছাদের নিগূঢ় আর্ন্ত ও অর্ন্তসম্পর্ক প্রসঙ্গে বিস্তারিত চর্চায় পারলে ফিরে আসা হবে। আপাতত যা দাঁড়ালো, বাড়ি ও বারান্দা, ছাদ ও বাড়ি, অসমকোণ ও ভটকে হুয়ে ঢিল। বাড়িটিকে কমন নিয়ে, ঢিলটিকে নিজের গতিপথে ফেরাই। বাকি থাকে বারান্দা ও ছাদ। এইখেন থেকে অসলি সিন শুরু হয়, মানে কচি জ্ঞানাঙ্কুরটি উন্মিলিত হতে বা জল খসাতে শুরু করে।

    যে কোন কহানিতে যেমন, এটিতেও প্রত্যাশিত ট্যুইস্ট থাকে। বারান্দা মানে স্রেফ, নিছক, নিতান্তই বারান্দা নয়, সেখেনে কেউ বসে আছে। মানে, ধরে নিই, বসে আছে(১২)। যে জ্যামিতি ভিন্ন আপাতত গতি নেই, সরলরেখা, বক্ররেখা, বৃত্ত ও ক্ষেত্রের সেই পরম ও শুধ্ গাণিতিক চক্করে এই বসে থাকাটা নচেৎ নেহায়েৎ বেয়াদবি ঠেকে। মোদ্দা, বারান্দায় কেউ বসে আছে। ওদিকে, ছাদটাও খালি নয়। ধরে নিই(১৩) তার চারপাশে মরাহলুদে-কেলটে-ছাতা-পড়া আলসে আছে। ছাদের নিচে, পূর্বেই বিবৃত, বাড়ি আছে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। হলে ভালো হতো, কিন্তু জ্যামিতির মধ্যে নানারকম ঘুসপেটি অস্তিত্ব ঢুকে পড়ে গুলিয়ে দেবে, এটা যদি রেওয়াজ হয়, তন্মোতাবেক, আরো নানান বেমক্কা কুচুটেপনা আছে, ছিলো, থাকবে। পুনঃ, তন্মোতাবেক, ধরে নিই(১৬) ছাদের ওপর একটা লোহার বাক্স, সিন্দুক, আধার বা জল ভরবার ট্যাঙ্ক আছে। বারান্দা নয়, বাড়ি নয়, বারান্দায় যে বসে থাকে সে ক্রমশ বেলুনফোলা ফুলতে ফুলতে বর্তমান কিস্যাটিকে ধীরে ধীরে নিজের ভিতরে নেয়। অনুরূপে, ছাদ, তৎপ্রহরি মরাহলুদে-কেলটে-ছাতা-পড়া আলসে ও ছাদের নিচের বাড়ি ছাপিয়ে এই বেমক্কা, বেয়াদপ, জ্যামিতিশত্রু ট্যাঙ্কটা নিজেকে বিচ্ছিরি ভাবে জাহির করতে থাকে, এমনকি দেখা যাবে কালক্রমে সে ও বারান্দায় বসে থাকা স্যাম্পলটি পরষ্পর সম্পর্কযুক্ত; ফলত বাড়ি, আলসে, বারান্দা, ছাদ, এসব বেফালতু ফক্কিকারি।

    ট্যাঙ্ক

    বারান্দায় যে বসে থাকে, ট্যাঙ্কটি তার দৃষ্টিগোচর হয়। যে ঢিলকহানি না থাকলে এতদূর অবধি আসা যেতোই না, তা তখনো শুরু হয়নি। কিম্বা শুরু হলেও তজ্জনিত কূটকচালি বিশ্রী মাকড়সাজাল ছড়ায়নি। ধরে নিই, বারান্দায় বসে থেকে কেউ ট্যাঙ্কটা দেখলো। এখন, প্রশ্ন উঠতে পারে ট্যাঙ্ক কোথা থেকে এলো। এলো একারণে, ট্যাঙ্ক না এলে সে জায়গায় লোহার বাক্স, সিন্দুক বা ওইরকম কিছু থাকতে হতো, ট্যাঙ্ক আছে বলে তারা নেই। অন্যদিকে, ট্যাঙ্ক না থাকলে বর্তমান কহানীর ভ্রূণহত্যা হয়ে যাবে, সুতরাং ট্যাঙ্ক থাকবেই। থাকতেই হবে। না থাকলে অনেক বিপর্যয় ঘটবে।

    তন্মধ্যে প্রধান, ট্যাঙ্ক না থাকলে, শংকরও থাকবে না। মানে, থাকতেই পারে, থাকতে পারেই, কিন্তু এই কিস্যায় নয়। যেহেতু এস্থলে কিস্যাই হরিবিষ্ণুরামলালাআল্লাহ ও প্রভু যেসু ও ঈশ্বর স্বয়ম, কিস্যার বাইরে যাওয়া যাবে না, লক্ষণরেখা কিম্বা মন্ত্রপুত গন্ডি যাই বলা হোক, কদাচ সীমান্ত পেরুনো যাবে না। পেরুলে সাক্ষাৎ ইবলিশবাচ্চারা ও রক্তপিপাসু ড্রাকুলাসখীরা কামড়ে যে দেবে না, তা নিশ্চিত নয়। জ্যামিতির মধ্যে বহিরাগত শয়তানি ঢুকে পড়তে পারে, ইতিমধ্যে পড়েছেও। তা বলে জ্যামিতি ছেড়ে অজ্যামিতিতে যাওয়া যাবে না, কোন সিন নেই। হঠকারিতা নয়।

    যাই হোক। বারান্দায় বসে থাকা লোকটা ট্যাঙ্কটাকে দেখে ফেলেছে। রোদ বাড়ছে, মেঘ ঘনাচ্ছে, বৃষ্টি হলেও হতে পারে, দেয়ালে পিঁপড়ে, মাটিতে শামুক ও কেন্নো, ঘরে ঘরে মাছ ভাজা বারসাবান ও তীক্ষ্ণ বাথরুমগন্ধ। কেউ সুইইই করে শিস দিলো। কেউ কাউকে লাথি মারলো। কেউ ফর্সা হলো। কেউ কালো হলো। একটা কুকুর অন্যটাকে দেখে ঘ্যাক করে তেড়ে গেলো। এতদ্বারা পরিপ্রেক্ষিত, পৃষ্ঠভূমি ও পরিবেশ নির্মিত হলো। যা যা বলা হলো সব একসঙ্গে, গোছা করে, ধরে নিই। পুনঃ ধরি, এমত পরিপ্রেক্ষিত, পৃষ্ঠভূমি ও পরিবেশে শংকর এলো বা আবির্ভুত হলো। শংকর মানে শংকর ভগমানও হতে পারতো এই বিবেচনায় আবির্ভাব/আবির্ভুত শব্দ ব্যবহৃত হলো। নিতান্তই সাধারণভাবে, কোনো প্রেজুডিস নাই।

    শংকর ও ট্যাঙ্ক

    যাই হোক। বারান্দায় বসে থাকা লোকটা শংকরকেও দেখলো কেননা ট্যাঙ্কটা ইতিপূর্বে দেখা হয়েছে, আর ট্যাঙ্কটা দেখলে শংকরকে দেখতেই হবে। যাবতীয় বারান্দায় বসে থাকা লোকেরা যাবতীয় জলের ট্যাঙ্ক দেখলেই যে তৎসহ শংকরকে ফাউ দেখতেই হবে, এমন কোন গোদা সাধারনিকরন করা হচ্ছে না। হতেই পারে যে বহুক্ষেত্রে শংকর না থেকে হরিশংকর, জটাশংকর, উমাশঙ্কর, নিবারণ, ঋতব্রত, অতসী, ভুলু কুকুর, পুঁইমাচা, লাউডগা সাপ বা ঝরা পাতা ইত্যাদি থাকতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এদের মধ্যে কেউ নাও থাকতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে, বা আবার বহুক্ষেত্রেই, হাতুড়ি শাবল বেলচা গাইতি নিয়ে বাড়ি ভাঙার জন্য প্রোমোটারের লোকজন থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে কিছুই না থাকতে পারে। ধরে নিই, এক্ষেত্রে এই যাবতীয় সিনারিও( যদ্বারা শংকরের না থাকা এবং সুতরাং ট্যাঙ্কের সঙ্গে শংকরের অচ্ছেদ্য নিবিড় সংযোগ, যদ্বারা ফাইন্যালি বারান্দায় বসে থাকা লোকটা শংকরকেও দেখে, এই অনুপুঙ্খ কার্যকারণ সম্পর্ক নির্মিত হতো না), তাদের চূড়ান্তভাবে বাতিলখারিজধ্বংস করার কঠিন দূর্গম প্রক্রিয়ার উতারচড়াওয়ের মধ্য দিয়ে এই কাহিনীর হাড্ডিমাস নির্মিত হয়।

    লোকটা ও দেখা

    মোদ্দা, লোকটা, অর্থাৎ, বারান্দায় বসে থাকা লোকটা ট্যাঙ্ক ও শংকরকে দেখলো যুগপৎ। পুনঃ অর্থাৎ, ট্যাঙ্কটাকে আগে দেখা হলো, পরে শংকরকে, অথবা উল্টোটা, ব্যাপারটা এরকম একরৈখিক সিধাসাধা নয়। এই কহানির অর্ন্তগত স্বতঃসিদ্ধ জ্যামিতি অনুযায়ী, সো ফার য়্যাজ লোকটার প্রথম দেখা ইজ কন্সার্ন্ড, ট্যাঙ্ক ঔর শংকর একসঙ্গে আসবে। নিগলিতার্থ, ট্যাঙ্ক না থাকলে শংকর থাকতে পারতো, আবার শংকর না থাকলেও ট্যাঙ্কটা দিব্যি থেবড়ে বসে থাকতে পারতো। কিন্তু তাহলে লোকটার দেখায় ট্যাঙ্ক ও শংকর, শংকর ও ট্যাঙ্ক, ট্যাঙ্ক-শংকর, শংকর-ট্যাঙ্কের অনবদ্য যুগলবন্দীর যে অসাধারণ, অলৌকিক এবং দিব্য ঝর্ণাজলীয় উৎসারসম কাহিনীস্রোত ছলকে ওঠে, তার উৎসমুখ বন্ধ হয়ে যেতো। কিম্বা বলা ভালো, তা জন্মাতোই না। এই মোদ্দা বিষয়টা মাথায় রাখতেই হবে।

    লোকটা ট্যাঙ্ক ও শংকরকে যুগপৎ দেখছে, এটি প্রতিষ্ঠিত। কালক্রমে ট্যাঙ্ক ও শংকরের দুই বা আত্মপর মিশে গিয়ে ট্যাঙ্কশংকর কিম্বা শংকরট্যাঙ্কের অদ্বৈত রচিত হবে, কিন্তু তা হুড়োতাড়ায়, হড়বড়াহটে নয়, বরং ধীর লয়ের সঙ্গীত যথা, মর্মরিত পল্লবিত বিস্তারিত হয়। এই যে ধীর দেখা, ধীর অধ্যয়ন, ধীর জ্ঞান, এর মাহাত্ম্য আছে। টিলটি দৌড়োয়, লোকটি দেখে, ট্যাঙ্ক ও শংকর থাকে, ট্যাঙ্কশংকর হয়। বিপুলা এ মহাবিশ্ব লয়ে যে নুড়িমার্বেলের জিত্তাল খেলা চলে, তার কতটুক জানা? কাল নিরবধি ও লোকটি ট্যাঙ্ক ও শংকরকে দেখলো। কি দেখলো? আদতে যে নিঃসাড় নিষ্প্রাণ শূন্যতা বিশ্বের যতেক ফাঁকফোকর গলিগলতা কানাঘুঁজি ভর্তি করে রাখে, তার মধ্যে কোথাও লোকটা ঘাপটি মেরে আছে। কোথাও একটা ট্যাঙ্ক আছে। একটি শংকরও আছে। ঢিলটাকে ভটকে আনা হয়েছে বটে, কিন্তু তা আবার নিজের গতিপথে ফিরে যেতেই পারে। তাহলে কোথাও একটা লোক, মানে একটা বারান্দায় বসা লোক, অন্য কোথাও একটা ট্যাঙ্ক ও অন্য কোথাও কোথাও একটি শংকর, এ তিনের মধ্যে যোগসূত্র কি? ধরে নেওয়া হয়েছে, এ তিন নিজ নিজ পরিসরে বিদ্যমান। বিশদ পরিপ্রেক্ষিত, পৃষ্ঠভূমি ও পরিবেশ নিয়ে সংক্ষিপ্ত নোট দেওয়াও হয়েছে। কিন্তু এতদ্বারা এই খিটের সন্তোষজনক মীমাংসা হয় নাই। সন্ধানক্ষেত্র বিস্তৃততর করতে হয়।

    জ্যামিতি

    যেহেতু জ্যামিতি ভিন্ন এই কহানি জন্মে না, এবং কহানির কোষে কোষে জ্যামিতির সুচতুর কূটবীজ, ধরে নিই(২৯) লোকটা বারান্দায় বসে বসে ট্যাঙ্ক ও শংকরকে দেখলো। দেখা কথাটি এখানে মূল, কুলকুন্ডলিনীজাগানিয়া, ওমনাদ বা আদি শব্দ, ফলো কিয়া যায়।

    লোকটা বারান্দায় বসে দিব্যি সাতসতেরো ভাবছিলো। বিকেলে ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগানের বড় খেলা, মোড়ের দোকানে চা সিঙাড়া বোঁদে খাওয়া, বিশ্ববিপ্লব ও বিচি শিরশির করানো মেয়েছেলেসকল(যেহেতু লোকটা লোক, অর্থে পুংলিঙ্গ, লিংগভেদে অন্য আউটকাম হতেই পারতো)। আগেই বলা হয়েছে, দেয়ালে পিঁপড়ে হাটছিলো, মেঝেতে আরশুলা, বাইরে রোদ বাড়ছে, বৃষ্টি হতে পারে। এমতাবস্থায় সে হঠাৎ ট্যাঙ্ককে, শংকরকে, কিম্বা ট্যাঙ্ক ও শংকরকে যুগপৎ, দেখলো কেন? সে তো আরামসে বাথরুমে ঢুকে এইসেই করতে, পদ্য কিম্বা বিপ্লবী লিফলেট লিখতে, ঘুমিয়ে পড়তে পারতো। এসব না করে, সে ‘দেখলো’ কেন? কেন? কেন? হয় এক আধিদৈবিক তর্কের অবতারণা হয়, যথা ‘দেখা'টি পূর্বনির্ধারিত ছিলো, ‘দেখতে’ হতোই, ‘দেখতে’ই হতো, কাটান নেই। এ তর্কের মুশকিল, সেক্ষেত্রে শুধু দেখা নয়, আরো অনেক কিছুকে একইভাবে পূর্বনির্ধারিত বলে ধরে নিতে হয়। যথা যে দেখছে তাকে, যে বারান্দায় বসে বসে দেখাটা হচ্ছে আর যে বাড়ির মধ্যে বারান্দাটা গুপী হয়ে আছে তাদের, ওদিকে ট্যাঙ্কটাকে, ছাদটাকে, মরাহলুদে-কেলটে-ছাতা-পড়া আলসেটাকে, ছাদের নিচের বাড়িটাকে এবং শংকরকেও। এরকম সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে কোথায় গিয়ে ঠেকতে হয় শেষমেষ, বোঝা দুষ্কর। সুতরাং, ওই গাড্ডায় না যাওয়াই ভালো। বরং জ্যামিতিবদ্ধ থাকায় সার্বিক মঙ্গল। কাহিনীটি নিজের জায়গায় থাকে, নিয়ন্ত্রণাধীন। ঠিক তুতু কুত্তার মতো না হলেও, সবুজ ঘাসফড়িংয়ের মতোও নয়, যে যখনতখন ফরফর করে উড়ে উড়ে সবাইকে ভেবলে দেবে।

    খিট

    যাই হোক। লোকটা দেখলো। একটা ট্যাঙ্ক। একটা শংকর। রোদ গনগন ও মাছি ভনভন করছে, মেঘ ঘনাচ্ছে, বৃষ্টি হতে পারে, কিয়দ্দুরে একটি সাদার-ওপরে-কালো-ছিটছিট বোঁটকা রামছাগল একমনে কাগজ চিবুচ্ছে, ঈশান ও নৈঋত কোণে, উত্তর দক্ষিণ পূব পশ্চিমে বাড়ি, নারিকেল ও সুপারি গাছ, মধ্যে মধ্যে বিস্তর পানাপুকুর, কাঁচা নালি, ইঁটের রাস্তা। যাই হোক। লোকটা দেখলো, শঙ্কর ট্যাঙ্কটার কাছে গেলো, গিয়ে পা লম্বা করে ডিঙি মেরে ট্যাঙ্কের ওপরে কিছু দেখার চেষ্টা করলো। লোকটা যেখানে বসে ছিলো সেখান থেকে ট্যাঙ্কের ওপরটা ভালো দেখা যায় না। শংকর দেখতে পাচ্ছিলো, ধরে নিই(৪৫)। অথবা পাচ্ছিলো না। কেননা এরপর শংকর ট্যাঙ্কের লোহার ঢাকনিটা খুলে ফেললো। পা আরো লম্বা করে উঁচু হয়ে নিচের দিকে দেখলো। ট্যাঙ্কের খোলামুখে শংকরের মুখ আটকে গেলো। লোকটা দেখতে পায় না। কিন্তু ধরে নিই, শংকর পায়। ট্যাঙ্কের ভিতরে কি থাকে? পুনঃ ধরে নিই, জল। লোকটা দেখে যে শংকর ট্যাঙ্কের মুখে মুখ দিয়ে ট্যাঙ্কের জলের ভিতরে কিছু দেখে। অনেকক্ষণ। রোদ ও মেঘ, আলো ও ছায়া, ভিনভিনে মাছি ও কাঁচা নর্দমার পরিচিত প্রেক্ষাপটে একটি অপরিচিত ফ্রিজশট বা স্থিতাবস্থা তৈরি হয়।

    লোকটা শুধুমাত্র ট্যাঙ্ক বা শংকরকে নয়, শংকরের ট্যাঙ্ক দেখাটাকে, দেখে। লোকটার দেখা এভাবে শংকরের দেখার সংগে গূঢ়বন্ধনে জুড়ে যায়। পেট-গুড়গুড় খিটসকল কিলবিলাতে থাকে। শংকর কি দেখে? কেন দেখে? কেনই বা দেখে? কেন দেখেই বা? উত্তর পাওয়া যায় না। দিনের ওপরে দিনের সর পড়ে। গোধূলিসন্ধ্যায় হাজার ব্যাং ডাকে। রোদে পিঠ ঝামা হয়ে যায়। শংকর দেখতে থাকে। দেখতেই থাকে। লোকটাও। ঘামাচি, আঁচিল কিম্বা কিরমির লাহান, পাজি খিটেরা কুটকুটায়। কেন শংকর, কেন ট্যাঙ্ক, কেন দেখা, কি দেখা? কেন? কেন? কি?

    হগ্গল উত্তর পাওয়া যায় না, যায় নি, যাবে না। অবশ্য, মৌলিক স্বতঃসিদ্ধের থেকে হুড়দড়াম কান্নিক মেরে বেশিদূর যাওয়া না গেলেও, ভটকে হুয়ে ঢিল, যাকে ধরে শংকর, ট্যাঙ্ক ও বারান্দায় বসে থাকা লোকটার দেখা ও দেখার অনিবার্য কাহিনীতে পৌঁছনো গেছিলো, তাকে কক্ষপথে নিয্যস ফিরিয়ে আনা যায়। আনতেই হবে, কেননা নচেৎ ঢিলের গতিপথের আড়াআড়ি যে রেললাইন, তার বাম ও ডান ধারে যে বেমক্কা স্টেশন, তার অস্তিত্বের অন্ত্রে ও শিরাউপশিরায় ঢোকা যাবে না। প্রশ্ন উঠতে পারে, স্টেশন কেন? কথা হচ্ছিলো শংকরট্যাঙ্ক, বারান্দায় বসা লোক এবং দেখা নিয়ে। সেখান থেকে হঠাৎ স্টেশন কেন? এটা কি পরিকল্পিত মাদাছেনালি নয়? অথবা/এবং, এই অবসিন গাঁড়মাজাকির মানেটা কি? কোন প্রকৃত কহানিতে এরূপ উদভ্রান্ত লাট খাওয়া এলাউড নয়, দ্বিতীয়ত এতে নিতান্তই দিশি সবভর্শনের কুচক্রান্ত, যেন লোকাল ট্রেনের কুনুইখেঁচা বডিক্যালটানো ভিড়ে ভুরভুর পাদগন্ধ, টের পাওয়া যাচ্ছে নিকটেই মার্ডার ঘটিতেছে অথচ খুনী কে বোঝবার জো নেই। এর উত্তরে বলতে হয়, হতে পারে। কিছুই উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়, অতএব, সবভর্শনের তত্বটিকে উপযুক্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। কিন্তু সেক্ষেত্রেও দুটি কথা থাকে। এক, সব কহানিই যে চারবেলা গালফোলা তৃপ্ত হুলো বেড়ালের মতো পররররর করবে, এমন কোন কথা নেই। দ্বিতীয়ত, স্থিতিস্থাপকতা, মানে ইলাস্টিসিটি। মানে, রেখা কোণ বৃত্ত উপবৃত্ত যাই থাকুক না কেন, যে জ্যামিতি ফলো করে কাহিনী গড়াচ্ছে বা দৌড়োচ্ছে, তা প্রকৃতার্থে ইলাস্টিকযথা, এই এখানে আছে, এই তড়াক করে বেড়ে গিয়ে ওখান চলে গেলো, আবার চপাৎ করে ফিরে এলো। আসল কায়দাটা ওই ফিরে আসায়।

    চিত্রনাট্য

    যাই হোক। তলিয়ে দেখতে গেলে, স্টেশনটা রূপকও বটে। শংকরট্যাঙ্ক ও বারান্দালোকের, সর্বোপরি, ‘দেখা’র যে গপ্পোটি বড় কায়দায় ফাঁদবার চেষ্টা করা হচ্ছে, তাতে স্টেশনটা দরকারি। যেমন পূর্বেই ধরে নেওয়া হয়েছে, তা একাধারে পৃষ্ঠভূমি, পরিপ্রেক্ষিত ও পরিবেশ, বা তার অংশ তো বটেই। এ ভিন্ন, স্টেশন যদি না থাকে, ট্যাঙ্কশংকর, লোকবারান্দা, ও ‘দেখা’ মিলিয়ে যে আদ্যপলিয় স্থিতাবস্থা তৈরি হয়, তা ভাঙে না। অথবা ভিন্নতর চিত্রকল্প দিয়ে বলা যায়, কুকুরের ন্যাজ যেমন টেনে বাড়ানো যায় না, তিন মিনিটের ফুটেজকেও দশ মিনিট করা যায় না। করলে যা দাঁড়ায়, মোটেই সুবিধার নয়। উদাহরণস্বরূপ, নিম্নলিখিত:

    সিকোয়েন্স ১, দৃশ্য ১
    ১। একটি বাড়ি। দেখা যায় বারান্দা।
    ২। বারান্দায় একটা লোক বসে
    ৩। ক্লোজ আপ। লোকটার মুখ।
    ৪। বিগ ক্লোজ আপ। লোকটার চোখ।
    ৫। কাট। ছাদ। ছাদে ট্যাঙ্ক।
    ৬। লং শট। শংকর ছাদের দরজা খুলে ঢুকছে।
    ৭। মিড লং। শংকর ট্যাঙ্কের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
    ৮। ক্লোজ। শংকর পায়ের পাতায় ভর করে উঁচু হবার চেষ্টা করে।
    ৯। মিড লং শট। লোকটার পারস্পেক্টিভ। শংকর ট্যাঙ্কের মুখ খুলছে।
    ১০। মিড লং শট। ট্যাঙ্কের মুখে মুখ দিয়ে শংকর দাঁড়িয়ে আছে।
    ১১। ক্লোজ। ট্যাঙ্কের মুখে শংকরের মুখ, ব্যাক টু ক্যামেরা।
    ১২। মিড লং। লোকটার পারস্পেক্টিভ। ট্যাঙ্কের মুখে মুখ দিয়ে শংকর দাঁড়িয়ে আছে।
    ১৩। ক্লোজ। লোকটার মুখ, চোখ। লোকটা দেখে।
    ১৪। ক্লোজ। শংকর দেখে।
    ১৫। ক্লোজ। লোকটা দেখে।
    ১৬। ক্লোজ। শংকর।
    ১৭। ক্লোজ।লোকটা।
    ১৮। শংকর।
    ৪৫। লোকটা।
    ১১১। শংকর।
    ২৫৬। শংকর ধীর পায়ে হেঁটে ছাদের দরজার কাছে যায়, দরজা খোলে। মিড লং। লোকটার পারস্পেক্টিভ।
    ২৫৭। দরজা বন্ধ হয়।
    ২৫৮। ক্লোজ। লোকটা দেখে।
    ৩০২-১০। মিড লং, লং, ক্লোজ। লোকটা দেখে, দেখে, দেখে।

    সিকোয়েনস ১, দৃশ্য ২
    আকাশে মেঘ।

    ১। একটি বাড়ি। দেখা যায় বারান্দা।
    ২। বারান্দায় একটা লোক বসে
    ৩। ক্লোজ আপ। লোকটার মুখ।
    ৪। বিগ ক্লোজ আপ। লোকটার চোখ।
    ৫। কাট। ছাদ। ছাদে ট্যাঙ্ক।
    ৬। লং শট। শংকর ছাদের দরজা খুলে ঢুকছে।
    ৭। মিড লং। শংকর ট্যাঙ্কের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
    ৮। ক্লোজ। শংকর পায়ের পাতায় ভর করে উঁচু হবার চেষ্টা করে।
    ৯। মিড লং শট। লোকটার পারস্পেক্টিভ। শংকর ট্যাঙ্কের মুখ খুলছে।
    ১০। মিড লং শট। ট্যাঙ্কের মুখে মুখ দিয়ে শংকর দাঁড়িয়ে আছে।
    ১১। ক্লোজ। ট্যাঙ্কের মুখে শংকরের মুখ, ব্যাক টু ক্যামেরা।
    ১২। মিড লং। লোকটার পারস্পেক্টিভ। ট্যাঙ্কের মুখে মুখ দিয়ে শংকর দাঁড়িয়ে আছে।
    ১৩। ক্লোজ। লোকটার মুখ, চোখ। লোকটা দেখে।
    ১৪। ক্লোজ। শংকর দেখে।
    ১৫। ক্লোজ। লোকটা দেখে।
    ১৬। ক্লোজ। শংকর।
    ১৭। ক্লোজ।লোকটা।
    ১৮। শংকর।
    ৪৫। লোকটা।
    ১১১। শংকর।
    ২৫৬। শংকর ধীর পায়ে হেঁটে ছাদের দরজার কাছে যায়, দরজা খোলে। মিড লং। লোকটার পারস্পেক্টিভ।
    ২৫৭। দরজা বন্ধ হয়।
    ২৫৮। ক্লোজ। লোকটা দেখে।
    ৩০২-১০। মিড লং, লং, ক্লোজ। লোকটা দেখে, দেখে, দেখে।

    সিকোয়েনস ১, দৃশ্য ৩
    আকাশে রোদ।
    বাকি ঐ।

    সিকোয়েনস ১, দৃশ্য ৪
    বৃষ্টি হচ্ছে।
    বাকি ঐ। শুধু শংকরের মাথায় ছাতা।

    সিকোয়েনস ২-৫, ঐ, ঐ, ঐ, ঐ।

    উপরোক্ত চিত্রনাট্যসকল থেকে বর্তমানেরটি পৃথক, বোঝাই যায়। যদিচ বলা যায় যে উপরোক্ত চিত্রনাট্যগুচ্ছ জীবন বা বাস্তবধর্মী, অর্থাৎ লোক, লোকি, ছেলে, মেয়ে, বুড়ি বুড়ো, মহিষ মানুষ ছাগল বাছুর কুকুর ভোঁদড় টিকটিকি গিরগিটি সবাই প্রত্যেকদিন হাগে, মোতে, খায়, শোয়, পচাকপচ মৈথুন করে, মৈথুনপরবর্তীতে মোতে, হাগে, শোয়, মোতে, খায়। পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে( স্বনামধন্য কে সি পাল মশাই অবশ্য অন্য বলেছিলেন), চাঁদ পৃথিবীর। যেখেনেই যাও, যাই করো, এক ছক। অংক, জ্যামিতি, ভূগোল, বিজ্ঞান। ১, ২, ৩, ৪। ৪, ৩, ২, ১, বড়জোর ০.৫। দুনিয়া যে এক শূন্য/শূন্য এক/ শূন্য শূন্য/এক একের অমোঘ দ্বিত্বে বাঁধা সে তো আর অমনি অমনি হয়নি। কড়া নিয়ম আছে। এতদসত্বেও, কাহিনী ও চিত্রনাট্যের প্রয়োজনে নিয়মভঙ্গ করে হলেও, জান কবুল মারসাল্লা, টুইস্ট মারতেই হবে, অর্থাৎ স্টেশনে ঢুকতে হবেই। এছাড়া, যেমন বলা হয়েছে, স্থিতিস্থাপকতার ম্যাটারটাও ভুললে চলবে না।

    স্টেশন

    সুতরাং অতএব, কহানি এবার ইলাস্টিকসুলভ ব্যাং লাফায়। লাফিয়ে প্রাকল্পিক ঢিলের তলায় যে আসল রেললাইন, তার সামনে পিছনে ডাইনে বাঁয়ে যে থিকথিকে পচপচে আলুগাঁদানো ভিড়, তার ভিতরে যে ছ্যাতলা-হলুদ, মরচে-লাল ও মফসসল-ধূসর স্টেশনটি বেমক্কা (অথবা প্রয়োজনীয় পৌষ্টিক তন্ত্রের মতো--কিসে কি হয় কে বলতে পারে?) সেঁধিয়ে থাকে, সেখানে চলে যায়। যায়, যায়ই যখন, পাইন্ট লোট কিয়া যায়, এ নিয়ে আর কথা ওঠানো চলবে না। সুতরাং, (৩৬২), বারান্দালোক ও শংকরট্যাঙ্ক বিষয়ক পুরো ডিসকোর্সটা স্যাট করে স্টেশনে এসে পড়ে। শুধু আসে না, তার তামাম খোলনলচে, দানাবেদানা, কোষেকেন্দ্রীনে সার্বিক প্যারাডাইম বদলও আসে। লোকটা(যেহেতু সে এখন বারান্দায় নেই, স্টেশনে আছে, তাকে আর বারান্দালোক বলা চলবে না) ও শংকরট্যাঙ্ক(তুলনায়, শংকরের সঙ্গে ট্যাঙ্ক বিষয়টার যোগাযোগ অনেক বেশি অর্গানিক, যে কথা পূর্বেই বলা হয়েছে) এতক্ষণ, এতাবৎ, দেখা মারফত যুক্ত ছিলো। এই দানে, সেই প্রাথমিক কিন্তু মৌলিক ঐতিহাসিক যোগাযোগ আরো শিকড়বাকড়ঘন হয়, এবং, তা চারাবট বা বুড়ো অশ্বত্থের মতো সবুজ ডালপালা ছড়িয়ে স্টেশনের নৈর্ব্যক্তিক, ভ্যাদভেদে ও মরামাস অস্তিত্বের দেয়ালে সরু ও মোটা ফাটল ধরায়। এক অর্থে, স্টেশনের পানসে কাহিনীতে লোকটা ও শংকরট্যাঙ্ক যুগপৎ ঝটাকসে ঢুকে আসে, তাদের কিস্যাটি লোল চেরা জিভ বার করে স্টেশনকাহিনীকে চাটে, কালক্রমে গিলে নেয়। ফলত, স্টেশনটা থাকে, কিন্তু থাকেও না আবার। স্টেশনের ছ্যাতলাহলুদ দেয়াল, মরচেলাল টিনের ছাদ, আধ-খাওয়া ও ফুটোফাটা ঢ্যাঙা প্ল্যাটফর্ম(১ ও ২) ও পাঁশুটে, ঝিমনিরাসক্ত, মূলত ব্যাজার টিকিটজানলা, এবং তৎসলগ্ন চাতাল ও ওভারঅল চত্বর, যেখানে জ্যান্ত/মরা কুত্তা, ছাড়া-গরু ও স্বাধীন-ষাঁড়, আনগিনত পেচ্ছাপরেখা, অকেশনাল মাতাল, বাইপোলারে ভোগা পাগলি/পাগল এবং দিব্যাঙ্গ ও অন্যান্য ভিকিরিরা, অসংখ্য বাদামখোসা চিপসের প্যাকেট সহ অন্যান্য পলিপ্যাক ভচকানো ব্যবহৃত কন্ডোম কোলা ও অন্যান্য খালি প্লাস্টিক বোতলের সঙ্গে, লেপ্টালেপ্টি করে শুয়ে থাকে এবং যা পেরিয়ে ডিঙিয়ে মাড়িয়ে, কালোলাল পিঁপড়ের মতো পিলপিলে মহিলাপুংতৃতীয়লিঙ্গ সাধারণ ও বিশেষ গ্যালপিং রেলগাড়ি ধরে বড় শহর যায়, এসবের ঘুন সুপ্রাচীন জটলার মধ্যে লোকটা ও শংকরট্যাঙ্কের যুগলদেখা, কথা ও কথোপকথন হয়, হয়ে রঙ ছড়ায়--হোলি হ্যায়, ছ্যারারারা, এয়েচি ওগো এইয়েছি। চৈত্রহাওয়ায় ধূলো পলিথিন বাদামখোসা ওড়ে, রেলগাড়ি আসে, থামে, যায়, মরচেবাদামি টিনের চালে বৃষ্টির দানা গড়িয়ে যায়, কুকুরগরুছাগলমানুষ ভেজে, গা চুলকায়, জন্মায়, জন্মায় না, মরে যায়। এই ইস্পেসে লোকটা ও শংকরট্যাঙ্ককে ভেবে নিতে, তার চাইতেও ভালো, ধরে নিতে(৫৭৮) হয়।

    ভরবেগ

    ধরে নিতে থাকা যাক। লোকটা বারান্দা থেকে উঠে, হাতমুখ ধুয়ে, চা বিস্কুট খেয়ে, হিসিহাগুস্নান করে, বাইরে খানিক ঘুরেঘারে, খানিক ভাতমাছ ঝপাঝপ মেরে দিয়ে, তার আগে আবার বাথরুমে গিয়ে হিসি হাগু স্নান(যদি আগে না হয়ে থাকে) সেরে, পাট করে চুল আঁচড়ে, পানাপুকুর/মজা ডোবা/কচুবন ও পাইখানা-হলুদ/ ফিকে-বেগনি/বোদা নীল/মেটে-লাল-তাতে-কেলটে-ছোপ/ইঁট-বার-করা/ছাদের-উপর-খোঁচাখাবলা-রড বাড়ির গায়ে বাড়ির গায়ে বাড়ি, মোড়ের বিমর্ষ ১/২ শহীদ বেদি, এমন সব স্থান-ভরানো দৃশ্যের মধ্য দিয়ে যথাক্রমে ইঁট-বসানো ও পিচ-ওঠা গলি ও রাস্তা দিয়ে আধা হেঁটে আধা দৌড়ে কুকুর/ছাগল/গরু/মহিষ/ ধম্মের ষাঁড়/অধম্মের-ও-ধম্মের-মানুষ/হলুদ ট্যাকসি/বিজবিজে সাইকেল ও রিক্সা/ )অটো বাস বাইক/ ইঁটরডবস্তা-ভর্তি-মালটানা-রিক্সাভ্যান/ঐ ঠেলাগাড়ি/ঐ ডালায় কমলালালনীলকালো শিবঠাকুর ও ফুলপাখিঝর্ণার অনুপম চিত্ররাজি তৎসহ দেখবি আর জ্বলবি লুচির মতো ফুলবি(অথবা বন্ধু দূরে থাকো বুরে নজরওয়ালে তেরা মুহ কালা দেখলে হবে খর্চা আছে) লেখা ছোট ও ঐ বড় ট্রাক তাদের ভোক ভোপ প্যাঁক প্যাঁক প্যা-আ-আ-আ হরন(হর্নের প্রকারভেদ)/রেলগাড়ির গররররর চিঁইইইইইই ভচাক ঘটাং ঘ্যাঙ, এসবের ঠাসময়দা ধামাকার মধ্যে কুনুই ও ঠ্যাং চালিয়ে, সাইড কেটে ও সিধা, স্টেশন চত্বরের মধ্যে সহজাত দক্ষতায় ঢুকে যায় ও দেখে পরবর্তী গাড়ি যেটা ধরে তার শহরে যাবার কথা তা ঝাঁঝাঁ করে দূর দিগন্তে হারিয়ে যাচ্ছে। যে ভরবেগ মানে মোমেন্টাম তাকে বাড়ি থেকে স্টেশন অবধি নিয়ে আসে তৎবলে বলীয়ান লোকটা ট্রেনের পিছনে খানিক দৌড়োয়, তার আগে পরে আরো অনেকেই দৌড়োয়। রোদ বাড়ে এবং চোখা, গোবদা, বিজবিজে, কুটকুটে গরম যাবতীয় দৌড়বাজদের চামড়া জ্বালিয়ে ফাটিয়ে একসা করতে থাকে। লোকটা, তার সঙ্গে অন্য লোকেরা, তার পিছনে যে দুচ্চার রেসিডেন্ট স্টেশনকুত্তা একসঙ্গে ছুটছিলো, সবার জিভ বেরিয়ে পড়ে, কারুরটা দেখা যায় কারুর যায় না, কেউ ঘামে কেউ হ্যাহ্যা করে। লোকের ঠ্যাং কুকুরের ঠ্যাং জড়িয়ে গেলে কুকুর ঘ্যাক করে লোক লাথি ছোড়ে লাথি ছোড়া ও না ছোড়া লোকেরা ঘ্যাক ও না-ঘ্যাক লক্ষ্মী কুকুরদের দূর বাঁড়া যা না বলে অথবা নিঃশব্দে এটাসেটা গালি দেয় কিম্বা দেয় না। মোদ্দা, এই প্যান্ডিমনিয়াম, কিম্বা গতিজাড্যর প্রাকৃতিক ফুরিয়ে যাওয়া কিম্বা নিয়তিবাদ(যা হবার হবে দৌড়ে কি লাভ ও কেনই বা দো----র), ইত্যাকার কারণবশত দৌড় সাময়িক বন্ধ হয়। আবার চালু হবে পরের গাড়ির সময়, কিন্তু সে প্রসঙ্গে ঢুকলেই উপরোক্ত চিত্রনাট্যের মধ্যে বাধ্যতামূলক ঢুকে পড়তে হবে। উটি করা যাব্যেক লাই, ফলত ৭৭১ লোকেরা দৌড় বন্ধ করে হেঁটে রিক্সা রিক্সাভ্যান অটো বাস এসব ধরে যে যেখানে যাবার কিম্বা অন্যত্র গেছে, সে যাক গে, এসব ফালতু ক্যাচড়া যত সাফ হয় তত মঙ্গল, আসল পয়েন্টে কথা বলা যাবে।

    হাফবেঞ্চি

    আসল পয়েন্ট হলো, লোকটা অর্থাৎ পূর্বের বারান্দালোক এখন শুধু লোক--সেই লোক যে এই পুরো চক্রান্তজাল ছিন্ন করে অপ্রতিরোধ্য বাড়তে হুয়ে কহানির একটা পোল/খাম্বা/মেরু/স্তম্ভ--জিভ বার করে ও না করে কোনরকমে বাষ্পীভবনজনিত ভারসাম্য রক্ষা করে ১নং প্ল্যাটফর্মের টিনের তলায় এসে হাফবেঞ্চিতে(বেঞ্চির সিটের চারটি তক্তামধ্যে দুটি নাই, সেকারণে হাফ, ফুল বেঞ্চি যা আছে হয় ২ নম্বরে নয় রোদসেঁকা, সেকারণে অপ্রাসঙ্গিক) এসে কেৎরে পড়ে। এরপরের গাড়ি ঘন্টাখানেক পরে, লেট হলে আরো বেশি। হাফবেঞ্চি যেখানে সেখান থেকে ডাইনে টেরিয়ে তাকালে টিকিটঘরের দেয়াল ও টিকিটজানলা তৎসহ নিচের চাতাল দেখা যায়। টিকিটজানলার মাথায় একটা ঘড়ি। ঘড়ির ওপরে এক কি দুই হোৎকা টিকটিকি বিভিন্ন প্রয়োজনে বিচরণ করে। লোকটা টিকিটঘর, টিকিটজানলা, ঘড়ি ও টিকটিকিদ্বয়কে দেখতে থাকে। যা জানা যায় না কিন্তু সম্ভবত দৈবের মতো অগোচরে থেকে অতিরিক্ত জ্যামিতিজাল ছড়ায়, টিকিটজানলার ওধারে কোন এক টিকিটবাবু, লিংগভেদে টিকিটদিদিমণি, বসে থেকে থেকে এই দেখা দেখেন। কালক্রমে, টিকিটঘরের দেয়ালে ও ১ ও ২ প্ল্যাটফর্মে নজরক্যামেরা বসে, তদ্বারা যা থাকে, থাকে না, হতে পারে, সব দেখা যায়, দেখা যেতেই থাকে। যাই হোক, লোকটা হাফবেঞ্চিতে বসে বসে দেখছে, মাঝে মাঝে ধাঁইধামসানো একটা ছিটরুমাল বার করে মুখের আর গলার ঘাম মুছছে। অফিসটাইম পার হয়ে গেছে বলে স্টেশনচত্বর, রেসিডেন্ট ভিকিরি কুকুর ছাগল গরু ও দু এক পিস বাইপোলার বাদ দিলে, অনাবিষ্কৃত--সেকারণে মানচিত্রহীন--কোন মহাদেশ কিম্বা বন্ধ সিনিমাহলের মতো ফাঁকা। ফাঁকা বলেই, বলা যেতে পারে, বিপুল সম্ভাবনাময়। কত কি যে হতে পারে সাঁঝা রঙ্গমঞ্চে। ষন্ডাগুন্ডা ষাঁড় ফস করে প্ল্যাটফর্মে ঢুকে গুররঝাঁই চিপসপ্যাকেট চিবুতে পারে। বেপাড়ার খুনী কুত্তা লাইন টপকে রেসিডেন্ট লালুভুলুদের ঘরররঘ্যাক ভোকভেয়াও বলে তাড়া দিতে পারে। ও সুভাষ(নেতাজি) নাইয়া রইলা তুমি কোন সে দেশে যাইয়া গাইতে গাইতে একটি অন্ধ কিম্বা তত অন্ধ নয় ট্রেনভিকিরি এ হাতে তুবড়োনো য়্যালুমিনিয়াম বাটি ও হাতে লাঠি ধরে প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে। একটি ছলবলে সদ্য কলেজ পড়ুয়া বালিকা যে কিনা যে কোন উদ্দেশ্যে ভর কাকঝলসানো দুপুরে বেড়িয়ে পড়েছে, তার পিছন পিছন গুটিকয় বদ চ্যাংড়া সিগ্রেট ফুঁকতে ফুঁকতে ও ঝারি দিতে দিতে চলে আসতে পারে। হঠাৎ দমকা হাওয়া এসে ওই নূতনের কেতন উড়িয়ে জনগণকে জয়ধ্বনি করায় প্রলুব্ধ করত তৎসহ টন টন ধুলোবালি প্লাস্টিক উড়িয়েঝুড়িয়ে তাফাল করে দিতে পারে। তারপরই, মন্দ্র (গরজনে ওগো ঘনশ্যাম) মেঘ আকাশ থেকে স্টেশনচাতাল ও খোয়া ওঠা প্ল্যাটফর্মে টুপটুপ ঝমাঝম রিমঝিম বৃষ্টি কি মিষ্টি ডেকে এনে তামাম তপ্ত দুনিয়া ও জিভ বার করা কুকুরমানুষকুলের ওপর বারিসিঞ্চন করতে পারে, ইত্যাদি প্রভৃতি যা যা হতে পারে সেসবের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া যাবে না।

    মোদ্দা, স্থান যা খালি, ভরাতে হবে। সেকারণে হাফবেঞ্চির ওপর বসে থাকা আগে বারান্দা এখন স্টেশনলোকটার পাশে ট্যাঙ্কশংকরকে এনে বসাতেই হবে। অর্থাৎ, ইলাস্টিক লম্বা হয়ে কোথাও একটা ভটকে যাচ্ছিলো, তাকে পাকড়ে ফেলে টোয়াং করে যথাস্থানে ফেরাতে হবে, সূত্র লঙ্ঘন করা যাবে না। সুতরাং মধ্যিখানে স্টেশনমেশন কুকুরগরু মানুষছাগল নিয়ে যে ব্যাপক নৈরাজ্য তৈরি হচ্ছিলো, তাকে আর বাড়তে দেওয়া যায় না। এখন থেকে এই গপ্পে শংকরট্যাঙ্ক ও লোকটা, লোকটা ও ট্যাঙ্কশংকর ছাড়া অন্য কোন ভেজাল একদম ঢুকবে না। কোন অস্থির ডাইগ্রেসন, অর্ন্তঘাতমূলক ষড়যন্ত্র বা কামাতুর কুনুই চালান ও টেবিলতলায় পা চিমটি, কঠোরভাবে আরশুলা মারার মতো দমন করা হবে। বিষয়টা মাথায় তো রাখতে হবেই, বিচিতেও রাখতে হবে। নো মোর ভটকানো। ঢের হয়েছে, এনাফ ইজ এনাফ ইজ এনাফ।

    হাফবেঞ্চি ২

    সুতরাং লোকটা হাফবেঞ্চিতে বসে থাকে। ট্রেন আসে না(ডাউন গাড়ি আধ ঘন্টা দেরিতে আসিবে)। কিন্তু শংকরট্যাঙ্ক আসে। বারান্দা থেকে লোকটার স্টেশন পর্যন্ত আসাটাকে বিশদে ট্রেস করা হয়েছে বটে, কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে এক্ষেত্রে নাশকতামূলক চেষ্টা ছিলো। সুতরাং, শংকর আসবে, মানে জাস্ট আসবে। যে ট্যাঙ্কে ছাদ বা যে ছাদে ট্যাঙ্ক, ছাদের তলায় যে বাড়ি সেখানে শংকর থাকে কিনা, খায় কিনা, হাগুহিসি করে কিনা, সেসব প্রশ্নে কালক্ষেপ করা হবে না। যেভাবে দ্রিঘাংচু, চেশায়ার বিল্লি, জাদুকর ম্যান্ড্রেক ও অশরিরী ভূতপিশাচেরা ঝুপ করে আসে, যেভাবে জম্পেশ স্পেশাল এফেক্ট দ্বারা স্থানকাল দুমড়েমুচড়ে ইভেন্ট হরাইজন তৈরি করে ইধার কা মাল উধার করা হয় অক্লেশে, সেভাবেই শংকরট্যাঙ্ক আসে, এসে হাফবেঞ্চিতে বসে। একটা বারান্দা, একটা লোক, একটা ট্যাঙ্ক, একটা শংকর, ছিলো। একটা স্টেশন, একটা হাফবেঞ্চি, একটা ট্যাঙ্কশংকর, একটা লোক, হলো। ব্যাস। কোনরূপ চ্যালেঞ্জ নেওয়া হবে না।

    লোকটা হাফবেঞ্চিতে বসে বসে ব্যাপক ঘামছিলো। তার সাদার ওপর খয়েরি সরু ডোরা কাটা পলিয়েস্টার জামার বুকপকেটের বা ঘিয়েরঙ গ্যাবার্ডিন(যদিচ এই মহাকাহিনী স্থানকাল মানে স্পেসটাইম অনুবর্তী নয়, ১০৯৮, যে সময়ের কথা হইতেছে সেইকালে মোবাইল ফোন আবিষ্কৃত হয় নাই, কাপাস তুলা হইতে প্রাপ্ত সুতিকাপড় নেহাৎ হা-গরীব ও নিতান্তই গরীব গান্ধীবাদী খাদিক্যালানে ভিন্ন বড় একটা কেউ পরিধান করিত না এবং বিশেষত নব্যযুবাগণ টেরিলিন টেরিকটন পলিয়েস্টার আদি তন্তুতে নির্মিত চকচকে বসন পছন্দ করিত বলিয়া খবর আছে) প্যান্টের পকেটের ধাঁইধামসানো ছিট সুতিরুমাল, ঘাম টানতে টানতে তেলামতো হয়ে গিয়েছিলো, ফলে তা দিয়ে আর ঘাম মোছা যাচ্ছিলো না, রুমালের উপরিতল দিয়ে কচুপাতায় জল যথা ঘাম হড়কে যাচ্ছিলো। ফলে ঘামতে ঘামতে লোকটা যখন কুঁজো কুঁজো ঠান্ডা জল, বরফকুঁচি দেওয়া সরবত, দার্জিলিং, বড় ও তীক্ষ্ণ বুকওলা মেয়েমানুষ এবং আজ মাঝরাতে সাঁই-বিপ্লব হয়ে গেলে পরের সকাল থেকে দেশ সাইবেরিয়াঠান্ডা ও ক্রেমলিনলাল সোভিয়েত হয়ে যাবে নাকি, এসব প্রাণজুড়োনো সাতসতেরো ভাবছিলো এবং খুব মন দিয়ে নখ খুঁটছিলো, হঠাৎ তার ঠিক পাশেই শংকরট্যাঙ্ক আবির্ভুত হলো। আবির্ভাব কথাটি জানবুঝকর ব্যবহৃত হলো--ঠিক যে কায়দায় শংকরট্যাঙ্ক ঝুপুস করে ১ নং প্ল্যাটফর্মের হাফবেঞ্চিতে প্রস্ফুটিত হয়, তাতে নিঘঘাত শিব, শ্রীহরি নিদেন শেতলা ঠাকুরের লীলে অথবা জাদুটোনা কিম্বা হাড়হিম করা ব্ল্যাক ম্যাজিক আছে, ভাববার পর্যাপ্ত কারণ ছিলো। লোকটা রীতিমতো চমকে গিয়েছিলো। চমকানোর কথাও। এই স্টেশন, এই হাফবেঞ্চি, এই দুটি কাক একটি কুকুর টুকটাক ডাকিতেছে, এই ধূধূ পিচগরম দুপুর, এবং দিকচিহ্নহীন অপার সুনসানতা, তার মধ্যে এটা কি হলো শালা? এটা কে, কোত্থেকে, কেন, কিভাবে এলো? এতক্ষণে নিশ্চয়ই বোঝা গেছে, লোকটার নিয়ন্ত্রণহীন ও লিবিডোধুঁয়াধার বদকৌতুহল বর্তমান কহানির মধ্যে ঢুকে পড়ে সামগ্রিক নাশকতাছকের অংশ হয়ে উঠছে। কিন্তু কিছু করার নেই। এই ফাঁকা হাফবেঞ্চি, এই হাফবেঞ্চিতে শংকরট্যাঙ্ক, এরকম তো হয় না হে। এই রুমাল, এই বিড়াল, এরকম হতে পারে, হয়তো হয়ও। তা বলে ফাঁকা হাফবেঞ্চি শংকরট্যাঙ্কভর্তি হাফবেঞ্চি হয়ে যাবে, এটা কি করে মেনে নেওয়া যায়? ফলত লোকটা খুব ঘাবড়ে গেলো। তা ভিন্ন, পরিচয়ের সঙ্কট মানে আইডেন্টিটি ক্রাইসিসও আছে। এবং দেখা মানে আসলে কি, সেই খিটও। শংকরট্যাঙ্ককে লোকটা দেখেছিলো বারান্দা থেকে। শংকর ও ট্যাঙ্ক, পরবর্তীতে ট্যাঙ্কশংকর, উভয়েই ছাদে ছিলো। বারান্দা ও ছাদের মাঝখানে রেখা, ঢিল, বাড়ি, পানাপুকুর ইত্যাদি গজল্লা ছিলো। অর্থাৎ, দেখা বিষয়টা টেরেইন ও ভূগোল নির্ভর। যে টেরেইনের যা। বারান্দা থেকে দেখা যায় ছাদে একটা একমুখ-কুটকুটে-হুব্বাদাড়ি-লুঙ্গি-ও-ছিটজামা-পরা-কোলকুঁজো লোক ট্যাঙ্কের ভিতর উঁকি দিচ্ছে। কে ছাদে যায়? শংকর। কে ট্যাঙ্কের ঢাকনি খুলে উঁকি মারে? শংকর। কে লুঙ্গি ও ছিটজামা পরে ছাদে যায়, ট্যাঙ্ক দেখে? পুনঃ শংকর। ছাদে, ট্যাঙ্কদেখা হুব্বাদাড়িওলা লোকটা কে? শংকর। এসব তো লোকজ্ঞান, সবাই জানে। কিন্তু হাফবেঞ্চিতে ঝুপুস করে এসে বসা একমুখ-কুটকুটে-হুব্বাদাড়ি-লুঙ্গি-ও-ছিটজামা-পরা লোকটাও যে শংকর, শুধু শংকর নয়, ‘সেই’-ই শংকর বা শংকরট্যাঙ্ক স্বয়ং, তদ্বারা প্রমাণিত হয় না। সুতরাং, লোকটা হাঁ করে আর একটা অসনাক্ত সুতরাং সন্দেহজনক লোকের দিকে তাকিয়েই থাকলো। বেশ কিছুক্ষণ দেখার পর, বোধহয় টেরেইনবিহ্বলতা এবং জাদুটোনার ঘোর কাটার পর, লোকটা হাফবেঞ্চিতে তার পাশে বসে থাকা উটকো লোকটার সঙ্গে শংকরট্যাঙ্ককে নিশ্চিতভাবে মেলাতে সক্ষম হয়। এতে করে (প্রথম) লোকটার মাথা আরো গুলিয়ে যায়। শংকরট্যাঙ্ক তো বটে, কিন্তু এখানে, এরকম, এভাবে কেন? দুই, আরো যা ঝামেলার, এরপর কি করণীয়? ট্যাঙ্কের মুখে মুখ রেখে শংকর কি দেখে সে রহস্যের সমাধান অবশ্যই দরকার। কিন্তু সে সমাধান আবার লোকটার দেখার সঙ্গে সম্পর্কিত, মানে, লোকটা যখন বারান্দালোক, মানে যখন সে বারান্দায় বসে বসে শংকরের ট্যাঙ্ক দেখাটাকে দেখে, রহস্যটা সেসময়েই তৈরি হয়। অনুসিদ্ধান্ত, সমাধানটাও ওই পরিসরে প্রাপ্তব্য, গরমঘাঁটা ভরদুপুরে হাফবেঞ্চিতে নয়। তাহলে কি করা? ইতিমধ্যে ১নং-এর টিনের চালে আরো বালতি বালতি রোদ উপুড় হয়ে পড়ে, লোকটার কপালমুখবুকপেটহাতপা দিয়ে কাঁচা ঘাম অঝোরে গড়ায়, তৎসহ নচ্ছার জাঙিয়া কুঁচকি কেটে বসতে থাকে, উপস কি চুলকায়, আরো দু এক পিস কাককুকুর ইতিউতি ডাকে, রিক্সা ও বাসের পিংপ্যাঁক ভেঁপু শোনা যায়। লোকটার খুব রাগ হতে থাকে। বিশ্বসংসারের ওপর তো বটেই, পাশে হাফবেঞ্চির অর্ধেক দখল করে বসে থাকা উড়ে এসে জুড়ে বসা উটকো আলটপকা শংকরের ওপরও। ঘামতে ঘামতে চুলকাতে চুলকাতে সে নিঃশব্দে মেলা গাল দিতে থাকে। তুই এখানে কেন বাল? তুই বাঁড়া এখানে কেন? ট্যাঙ্কিতে গুলি মার, এই যে কোত্থাও কিস্যু নেই ঝুপুস করে এখানে এসে বসলি, কি মতলবে রে হারামি? ফোট শালা, নইলে ক্যালাবো। লোকটার এত রাগ হয় যে বলবার নয়। রাগে গরগর করতে করতে সে ভুলে যায় যে ১ নং প্ল্যাটফর্মের হাফবেঞ্চিতে বসে থাকা স্বয়ম শ্রী শংকরট্যাঙ্ক, তামামখিটদুনিয়ার ব্যয়তাজ বাদশা, এবং এই যে তাকে গায়ের পাশে এত নিবিড় ছুঙ্কু প্রক্সিমিটিতে পাওয়া যাচ্ছে সেটি এমনি এমনি ঘটে নাই, ইহার পিছনে গভীর গোপন অমোঘ জ্যামিতির খেল রহিয়াছে। রাগ দেখানোর জন্য লোকটা শংকরের দিকে তাকায় অবধি না। ফলে, সে দেখতে পায় না শংকরও তার দিকে তাকাচ্ছে না, বরং সমাধিনির্লিপ্ত উদাসীনতায় উল্টোদিকের ২নং প্ল্যাটফর্মে বিচরণমান দুটি যথাক্রমে সাদা ও কালোর-ওপর-সাদা-ছিট তরলমতি চপল ছাগলছানা ও তদীয় মাছাগী, যারা যৌথভাবে ও ব্যক্তিউদ্যোগে ওই অঞ্চলে প্রাপ্ত বিভিন্ন বেওয়ারিশ খুচরো কাগজ, প্লাস্টিক, ভচকানো কন্ডোম এবং দু চার খন্ড পাতাটাতা চিবুচ্ছিলো ও খাচ্ছিলো, তাদের দেখছিলো। কালক্রমে তাদেরও অন্যরা খাবে, নাকি খাদ্যশৃংখলের মহাচেইন রেলে কাটা পড়ে বেঘোরে ছেত্রে যাবে, এসব তত্বচিন্তা সে করছিলো কি না তা জানা যায় নাই। লোকটা আর দুবার মনে মনে বাল, বাল, বা----ল বলে বেঞ্চি ছেড়ে উঠে প্ল্যাটফর্মের এমাথা ওমাথা কয়েকবার হেঁটে এলো। শেষবার, ফিরে আসবার সময় শংকরকে সে দেখলো, বা দেখতে বাধ্য হলো। এর আগে পর্যন্ত মূলত সেও লাইনের ওপারের ২নং এ বিচরণশীল ছাগযুথ, তৎসহ উবু হয়ে বসে থাকা একটি মাঝবয়সী ঝালমুড়িওলা এবং নিদ্রারত একটি বালক ভিকিরি, তা বাদে পিছনের গুটিকয় অত্যন্ত কুচ্ছিত(লোকটা রেগে ছিলো বলে) খোঁচাচ্যাপ্টা ইঁটবারকরা বাড়ি এবং তাদের মধ্যিখানে ততোধিক কুচ্ছিত একটা ডোবা, এসব দেখছিলো। গরমে হাঁটা যায় না, এবং পূর্বেই বিবৃত ১নং-এ এক বই দুটি হাফবেঞ্চি নেই, লোকটাকে একরকম নাচার হয়েই তার নিজস্ব ডেরাডান্ডা যে হাফবেঞ্চি যেখানে এখন বালশংকর অত্যন্ত অন্যায়ভাবে বসে আছে, সেদিকে ফিরতে হলো। কেলোপরি কেলো, ফিরতে ফিরতে বালশংকরের বিশ্রী গাছহারামী থোবড়ের দিকে লোকটা একবার তাকিয়ে ফেললো। এবং মোর মোর কেলো, বালশংকর তার দিকে সোজা তাকিয়ে, একগাল গদগদে অন্তরঙ্গ হাসি দিয়ে বললো, একটা বিড়ি হবে? কাছ থেকে দেখলে মালটা একদম বিষথোবড়া। একমুখ হুব্বাদাড়ি শুধু নয়, নাকটা ফোলা, কানগুলোয় চুল, ঠোঁটের নীচে দু দুটো আঁচিল ও হাসার ফলে দেখা গেলো দাঁতগুলো আধভাঙা, কালো ও ছাতাপড়া হলদে। সহ্য করাই যায় না জাস্ট। তথাপি নিয়তি কেন বাধ্যতে, এবং বালশংকর, যে আসলে খিটদার ট্যাঙ্কশংকর, তাকে এবং লোকটাকে যে দীর্ঘ কথোপকথন ও আলাপচারিতার মধ্যে ঢুকতেই হবে, তার শুরু কোথাও না কোথাও হবারই ছিলো, ফলে লোকটা খামোখা নরম হয়ে গেলো। শুধু তাই-ই নয়, তার মনে পড়ে গেলো বারান্দা, ছাদ ও ট্যাঙ্কের পূর্বাপর ইতিবৃত্ত। ছিছি, আরে এ তো চেনা লোক, পাড়ার লোক, পড়শি। কতদিন দেখা হয়েছে। আহা, বিড়িই তো চাইছে একটা, দিই, হাফবেঞ্চিতে একটু বসি, বেশিক্ষন তো নয়, ট্রেন এই চলে এলো বলে। লোকটা বিড়ি বার করে দিলো, একটু হাসিহাসি মুখও করলো। শংকর বিড়িটা নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলো, আঙুলে পাকিয়ে বুঝে নিলো ভিতরে মসলা আছে কিনা। তারপরে মুখে দিলো। লোকটাও একটা বিড়ি বার করে ধরালো, শংকরকে আগুন দিলো। নো এবং লাভ ইয়োর নেবার, শাস্ত্রে বলেছে, তাছাড়া এ ব্রাদারহুড অব মেন, কমরেডশিপ বলে একটা কথা তো আছেই। তারপর, যেটা মূল বিষয়, সেটাও বুঝতে হবে। ট্যাঙ্কের মুখ খুলে কি দেখা হয়, কেন? না না, বালশংকর নয়, ট্যাঙ্ক, ভালো শংকর, কমরেড শংকর, ট্যাঙ্কশংকর। লোকটা আর ট্যাঙ্কশংকর দুজনে মিলে হাফবেঞ্চিতে বসে বিড়ি খায়। যে বেরাদরি ভিন্ন এই কাহিনীতে কোন রস রঙ মোচড় মাংস কিচ্ছু থাকতো না, এতদ্বারা তার ঐতিহাসিক ও শুভ শুরুয়াত হয়ে যায়, ওম মনিপদ্মে শ্রীহরিরামলালা, আল্লা রসুল, আমেন, ওয়া গুরু ফতে। ইনকিলাব জিন্দাবাদ হাম সব এক হ্যায় লড়াই লড়াই লড়াই চাই। ট্যাঙ্কশংকর ও স্টেশনলোক ঐক্য অমর রহে, অমর রহে। যারা কাঠি করে তাহাদের জিন্দা দাফন করা হব্যেক।

    হাফবেঞ্চিতে বসে লোকটা বিড়ি খাচ্ছে, শংকরট্যাঙ্কও খাচ্ছে। ট্রেন আসে নি। আসবেও কিনা তা এরপর থেকে আদৌ বিবেচ্য হবে না। এলে আসবে, না এলে না। আসুক বা না আসুক, উভয় ক্ষেত্রেই লোকটা ও শংকরট্যাঙ্কের যে নবলব্ধ বিড়িবন্ধু সৌহার্দ্য হাফবেঞ্চির সিটের তক্তায় তক্তায় পল্লবিত হচ্ছে, তাকে কোনভাবে ঘাঁটা চলবে না। ফলে যখন বিড়ি খেতে খেতে শংকরট্যাঙ্ক লুঙ্গিটাকে হাঁটুর ওপর তুলে কষে বাঁধলো ও কালো ও হলুদ ছাতাপড়া আধভাঙা দাঁত ও আদাশুকনো মাড়ি বার করে হাই তুললো, লোকটা বিড়ি খেতে খেতেই সেটা মন দিয়ে দেখলো। হাইটাই তুলে ট্যাঙ্কশংকর লোকটার দিকে তাকিয়ে বললো, বিড়িটা ভালো। খুব ভালো। লোকটা বললো, হ্যাঁ। ট্যাঙ্কশংকর বললো, দম আছে। বলে জোরে বিড়িতে টান দিতে গিয়ে দেখলো, বিড়িটা নিভে গেছে। লোকটা তাই দেখে আবার দেশলাই বাড়িয়ে দিলো। ট্যাঙ্কশংকর নিলো না। আধপোড়া বিড়িটা কানের পিছনে গুঁজে রাখলো। লোকটা দেখলো। গরম ক্রমে বাড়িতেছে, আকাশ শুঁটকি ঢ্যাড়শের ন্যায় ধস খাওয়া, চরাচর সার্বিকভাবে ব্যাজার। কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকবার পর ট্যাঙ্কশংকর পুনরায় হাই তুললো, কাশলো ও হাফবেঞ্চির সামনেই প্ল্যাটফর্মে একতাল থুতু ফেললো। থুতুটা গিয়ে একটা ক্ষীনকায়/কায়া শিশু গুবরে পোকার ওপর পড়লো, তাতে পোকাটা হড়হড় করে খানিকটা দূরে যেখানে ছিটকে গেলো, সেখানে কার্যপলক্ষে বেশ কিছু লাল ডেয়ো পিঁপড়ে জটলা পাকাচ্ছিলো, তারা ছত্রাখান হয়ে গেলো। লোকটা এসব দেখে টেখে যারপরনাই বোর হয়ে গেলো। ঠিক তখনই, শংকরট্যাঙ্ক, থাইয়ের মাঝামাঝি থেকে কালো, লোমওলা ও ফড়িংসরু দুই ঠ্যাংয়ে হাত বোলাতে বোলাতে ও ঠ্যাং নাচাতে নাচাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললো, না। আবার বললো, না। তারপর বললো না না। বলে চুপ মেরে গেলো। তখন লোকটা বললো কি না? ট্যাঙ্কশংকর আকাশ থেকে চোখ না নামিয়েই বললো, উঁ? কিছু বললেন? লোকটা বললো, খুব গরম। ট্যাঙ্কশংকর বললো, বলছিলাম কি, দিনকাল খুব খারাপ। ঘামতে ঘামতে লোকটা বললো, হুঁ, তা ঠিক। ট্রেনটা যে কখন আসবে কে জানে? ১২টা ২৪টা পেলাম না। খুব মুশকিল। ট্যাঙ্কশংকর বললো, ঠিক। মুশকিল। একদম ঠিক। বলেই আকাশ থেকে চোখ নামিয়ে কিন্তু পা নাচাতে নাচাতেই সোজা লোকটার দিকে দেখলো। লোকটা তেলা রুমালটা মুখের ওপর ধরে ঘাম মুছবার চেষ্টা করছিলো। ট্যাঙ্কশংকর অনেকক্ষণ ধরে দেখলো। তারপর ফিসফিসে চাপা গলায় বললো, যা কলা! ঠিক নয়, একদম ঠিক নয়। লোকটা উত্তর দেবার আগেই আরো ফিসফিসে আরো চাপা গলায় বললো, যা হচ্ছে একদম ঠিক নয়। লোকটা বললো মানে জিগ্গেস করলো, ইয়ে, কি ঠিক নয়? শংকরট্যাঙ্ক লোকটার মুখের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললো, একটা গোপন কথা কি বলা যাবে? শংকরট্যাঙ্কের মুখ থেকে অনেকদিন দাঁত না মাজা যে শুঁটকি দুর্গন্ধ বেরুচ্ছিলো, তাতে লোকটা খুব অস্বস্তি বোধ করছিলো। কিন্তু ‘গোপন’ শব্দটি শুনে উৎসাহিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো, ট্যাঙ্ক? মানে ট্যাঙ্কের কেসটা? ‘ট্যাঙ্ক’ শোনামাত্র শংকর অত্যন্ত গম্ভীর হয়ে লোকটার মুখ থেকে মুখ সরিয়ে নিয়ে পা নাচানো বন্ধ করে কাঠ বসে রইলো মিনিটটাক। তারপর, সাতিশয় সন্দিগ্ধ দৃষ্টিতে লোকটাকে দেখতে দেখতে বিড়বিড় করে বললো, কামরাঙা গাছ, কামরাঙা গাছ, লাসা খুকিদের মেলা। বলে থেমে থাকলো। তারপর আবার বিড়বিড় করে বললো, বালের নীচে অনেক বাওয়াল, ভজকট ঝামেলা। লোকটা হতভম্ব মতো হয়ে গেলো। কেসকি? যেমন শোনা যায় তেমন হাফছিট নয়, এ তো শালা পুরো বাইপোলার। ভাবতে ভাবতেই ট্যাঙ্কশংকর লোকটার দিকে তাকিয়ে ফুল ব্লোন দাঁত খিঁচোলো, তাতে লোকটা আরো ঘাবড়ে গেলো। হাফবেঞ্চি ছেড়ে ট্রেন আসুক না আসুক দৌড় লাগাবে কিনা ভাবতে ভাবতে ট্যাঙ্কশংকর অমায়িক হেসে কান থেকে বিড়িটা নামিয়ে লোকটাকে বললো, বলছিলাম কি, ম্যাচিসটা দেওয়া যাবে নাকি একবার? লোকটা দিলো। বিড়ি ধরিয়ে ঝটাপট কয়েকটা টান মেরে ট্যাঙ্কশংকর সেটা ফেলে দিলো। শুধু ফেলে দিলোই না, উঠে দাঁড়িয়ে লাথি মারতে মারতে রেললাইনে নামিয়েও দিলো। প্ল্যাটফর্মের একেবারে ধারে, ২নং প্ল্যাটফর্মের বন্ধ চা দোকান ও নিদ্রারত বালভিকিরিদের(ছাগলছানারা ও মা ছাগল ততক্ষণে সটকে পড়েছিলো কিম্বা মাংস হয়ে গিয়েছিলো, টেইক ইওর পিক) ঠিক বিপরীতে দাঁড়িয়ে ট্যাঙ্কশংকর কালো লোমওলা সরু ঠ্যাং চুলকোলো। তারপর হাত মুঠো করে বললো, চলবে না চলবে না। তারপর বললো, দিচ্ছি না দেবো না। হাফবেঞ্চিতে বসে বসে লোকটা শুনলো। আশৈশব হাত মুঠো করে স্লোগান দিতে দিতে লোকটার মগজের আঠালো থকথকে গভীরে স্লোগানদানা ও স্লোগানগুঁড়ো গেঁথে বসে গিয়েছিলো, ফলত সে সর্বক্ষণ এমনিতেই, অর্থাৎ স্নান করতে করতে হাগতে হাগতে পেচ্ছাপ করতে করতে খেতে খেতে হাত ও কুনুই মারতে মারতে এমনকি সর্বোপরি বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে শংকরট্যাঙ্ককে দেখতে দেখতেও, স্লোগান গুনগুন করতো। কেউ ধারেকাছে ল বললেই তার পিছনে ড়াই জুড়ে নিয়ে লোকটা বলতো লড়াই। কেউ চ বললেই লোকটা বলতো চলছে চলবে, কিম্বা চলছে না, চলবে না। দি বললেই ভেবে নিতো দিচ্ছি না দেব না। হ বললেই ভাবতো হাত, কালো হাত, ভেঙে দাও। গ বললে গুঁড়িয়ে দাও। এইরকম। মোদ্দা, লোকটা স্লোগান ছাড়া থাকতে পারতো না। থাকার কথাও নয়, হয় চেয়ারম্যানের চীন আক্রান্ত হতে পারে, কমরেডস বিপ্লবের কাজ ত্বরান্বিত করুন, কিম্বা বামফ্রন্ট সরকার সংগ্রামের হাতিয়ার, তাকে চোখের মণির ন্যায় রক্ষা করতে কমরেড, গড়ে তোলো গড়ে তোলো ব্যারিকেড। এসবের কিছুই স্লোগান ছাড়া হয় না। মোদ্দা, ১ নং প্ল্যাটফর্মের ঘামঘন দুর্বার দুপুরে হাফবেঞ্চিতে বসে বসে ট্যাঙ্কশংকরকে দেখতে দেখতে ও তদীয় স্লোগান(ট্যাঙ্কশংকর অবশ্য প্রগাঢ় উদ্দীপনার সঙ্গে নয়, একদম ট্যিপিক্যাল ঝিমচোদা বিড়বিড়ানিতে বলছিলো দিচ্ছি না দেব না চলছে না চলবে না দিচ্ছি না দেব না দি না চ দ ন) শুনে লোকটা খামোখা বেমতলব বাড় খেয়ে গেলো। লাইনের ধারে দাঁড়িয়ে ট্যাঙ্কশংকর বিড়বিড়াচ্ছে, দুধারে সিগন্যাল সমূহ টকটকে লাল, স্টেশনের সামনে পিছনে ডাইনে বাঁয়ে নিরন্তর এক ভেঙে দুই ও ঐতিহাসিক ও দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ(লৌহপুরুষ কমরেড স্তালিন) অনুসৃত হচ্ছে ফলে বিপ্লব এলো বলে, এই পরিপ্রেক্ষিতে লোকটা টপাস করে উঠে পড়ে বললো, লাল বাংলার লাল দুপুরে আমাদের লড়াই চলছে চলবে। শংকরট্যাঙ্ক মুখ ফিরিয়ে শুনছে বলে তারপর বললো লাল বাংলার লাল দুপুর, আমাদের ঠোঁটে গানের সুর। তারপর বললো, কমরেড শংকরট্যাঙ্ক, ইয়ে শংকর কমরেড জিন্দাবাদ। ট্যাঙ্ক এবং শংকর শব্দদ্বয় শুনে শংকর লাইন ছেড়ে লোকটার পাশে এসে হাফবেঞ্চিতে বসে পড়ে সন্দিগ্ধতর চোখে লোকটাকে মাপতে থাকলো। লোকটা ততক্ষণে মিছিলচাগা চেগে গেছে। তার স্লোগান সে নিজে, ট্যাঙ্কশংকর, ট্যাঙ্কশংকরের থুতুতে বিপর্যস্ত ছত্রাখান ডেও পিঁপড়ে ও শিশু গুবরে ছাড়া আর কেউ শোনেনি, তাতে কি যায় আসে, কোন স্লোগান কোনকালে মিছিলধারের পাবলিক শোনে? সুতরাং, একটা উত্তেজিত অগ্নিময় বিড়ি সাঁই করে ধরিয়ে ফেলে আবার স্লোগান দিতে গিয়ে লোকটা দেখে, ট্যাঙ্কশংকর হাত বাড়িয়ে বসে। তাকে বিড়ি ও আগুন যথাবিহিত দিয়ে লোকটা হাত মুঠো করে ওপরে তুলে আবার বললো লাল বাংলার লাল দুপুরে লাল জনগণ এক হো। ট্রেন কেন লেট করে কেন্দ্র তুমি জবাব দাও। লাল বাংলা জবাব চায়, কেন্দ্র তুমি জবাব দাও। জবাব চায় জবাব দাও। জবাব চাই জবাব দাও। এই পর্যন্ত বলে ট্যাঙ্কশংকরের দিকে তাকিয়ে দেখলো ট্যাঙ্কশংকর মন দিয়ে বিড়ি খাচ্ছে, স্লোগান দিচ্ছে না। এতে লোকটা খুব আহত হলো এবং ট্যাঙ্কশংকরের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বললো, কি হচ্ছে কি কমরেড, স্লোগান দিন, স্লোগান। বলুন জবাব চাই! ট্যাঙ্কশংকর চেতিয়ে উঠে বললো, জবাব দাও। লোকটা ফুকোর পাগলতত্ব পড়েনি, দালির নাম শুনেছে কিন্তু বিপ্লবী পাগলামো বা ক্রিটিক্যাল প্যারানোইয়া বলতে কি বোঝায় জানে না, তৎসত্বেও এমনকি বাইপোলার জনগণের মধ্যেও বিপ্লবী গণচৈতন্যের এই জ্বালাময় প্রকাশ দেখে ব্যাপক উদ্বুদ্ধ হলো। হয়ে বেশ জোরে চেঁচিয়ে উঠলো, লাল বাংলার লাল দুপুরে লাল সিগন্যাল মানছি না মানবো না। রেল তুমি হুঁশিয়ার। ট্যাঙ্কশংকর বললো হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার। লোকটা আবার বললো লাল বাংলার লাল দুপুর রেল তুমি চুদুর্বুদুর। ট্যাঙ্কশংকর বললো চুদুর্বুদুর চুদুর্বুদুর। স্লোগানটা দিয়ে লোকটা প্রচুর উৎসাহ পেলো, আবার দিলো। এরকম বার কয়েক চলার পর টের পেলো কোথাও একটা গন্ডগোল হচ্ছে। ট্যাঙ্কশংকর ঠিক ধরতাই নিচ্ছে না, ঝোলাচ্ছে। মন দিয়ে শুনে লোকটা বুঝতে পারলো হেভভি প্রতিক্রিয়াশীল চক্রান্ত চলছে আর জানেঅনজানে ট্যাঙ্কশংকর সে চক্রান্তের শরিক। কেননা লোকটা যখন বলছে লাল বাংলার লাল দুপুর, ট্যাঙ্কশংকর বলছে লাল বাংলার বাল দুপুর, না না বাল বাংলার বাল দুপুর। কি ঘোরতর অপসংস্কৃতি। সহ্য করা যায় না। এইজন্যই লাল সন্ত্রাসের প্রয়োজন, লোকটা বেশ বুঝতে পারলো। কিন্তু একে লোকটা বিপ্লবী হলে কি হয় রামভিতু তায় ট্যাঙ্কশংকরটা একে প্রতিবিপ্লবী এজেন্ট তায় এই সবে দাঁত খিঁচিয়েছে বেশি কিছু বললে কামড়ে দিতে পারে। উনিশবিশ ভেবে লোকটা রণকুশল পশ্চাৎপসারণের সিদ্ধান্ত নিলো। তাছাড়া হতেও পারে যে ট্যাঙ্কশংকর আসলে কনফিউজড মাল, লুম্পেন প্রলেতারিয়াতরা যেমন হয়ে থাকে আরকি, তাকে ঠিক দিশা দেখাতে পারলে লাভ বই ক্ষতি নেই। তবু অপসংস্কৃতির ও বিচ্যুতির একটা কেস ছিলোই, একটু সেন্সরের প্রয়োজন, সুতরাং লোকটা খুব কড়া করে আসামী অর্থাৎ ট্যাঙ্কশংকরকে মাপলো। মেপেটেপে বললো, কমরেড, যেখানে সেখানে খিস্তি করাটা কিন্তু অপসংস্কৃতি। বিষয়টা খেয়াল রাখতে হবে। তাতে ট্যাঙ্কশংকর লোকটাকে অবাক করে দিয়ে বললো, চুদুর্বুদুর। লোকটা রেগে উঠতে যাচ্ছিলো কিন্তু তার মনে পড়ে গেলো অতিবাম হঠকারি উৎসাহবশত স্লোগান দিতে গিয়ে চুদুর্বুদুর কথাটা সেই বলেছিলো, বিষয়টা ঠিক হয়নি। ভবিষ্যতে সাবধান হতে হবে। সুতরাং সাবধানতা অবলম্বন করেও প্রতিবাদী প্রক্রিয়াটি কি করে চালিয়ে যাওয়া যাবে সেটা নিয়ে গভীর ভাবনার প্রয়োজনও অনস্বীকার্য। ফলত আপাতত স্লোগান না দিয়ে হাফবেঞ্চিতে বসে বিড়ি ধরানো কর্তব্য। কিম্বা একটা সিগারেট। বেশি বিড়ি খেলে মুখটা তেতো হয়ে যায়। লোকটা তার প্যান্টের পকেটে রাখা সিগারেট প্যাকেটটা বের করতে গিয়ে দেখলো, সেটা কেমন ভিজে ভিজে ল্যাবড়ানো মতো হয়ে গেছে। প্যান্টের পকেটে জল এলো কি করে ভাবতে লোকটা বুঝলো ওটা আসলে জল নয় ঘাম, রুমালটা ওই পকেটে গোঁজা ছিলো বলে রুমাল থেকে ঘাম সিগারেট প্যাকেটে লেগেছে। যাকগে, কি করা যাবে, এছাড়াও ঘাম মানে আদতে পসিনা, মানে খুনপসিনা, রক্তঘাম, স্বেদরক্ত, তাকে দুচ্ছাই করাটা এভিডেন্ট শ্রেণীবিচ্যুতি। সুতরাং ল্যাবড়ানো প্যাকেটটা সন্তর্পণে খুলে লোকটা সাবধানে সিগারেটগুলোকে নেড়েচেড়ে দেখলো। পাঁচটার মধ্যে দুটো পুরো ভেজা, সেঁক না দিলে খাওয়া যাবে না। বাকি থাকে তিনটে, তার মধ্যে একটা আধভেজা, দুটো একটু একটু। এই দুটোর মধ্যে একটা তুলে নিয়ে লোকটা প্যাকেটটাকে কাঁধের ব্যাগে চালান করলো। করে একটু ভেজা সিগারেটটাকে দেশলাই জ্বালিয়ে সেঁকতে গিয়ে দেখলো, ট্যাঙ্কশংকর সেদিকে হাড়হাভাতের মতো জুলজুল করে তাকিয়ে আছে। লোকটার আবার রাগ হলো। বেটা নিশ্চয় ভাগ চাইবে। সবই ভাগ করে খাওয়া উচিত, ঠিক, বন্টনের সুসাম্য না থাকলে সামাজিক সাম্য আসে না সেটাও ঠিক। কিন্তু তার সঙ্গে সঙ্গে মনে রাখতে হবে সাম্যবাদ এখনো অনেক দূর, সবে এখন সমাজতন্ত্রের পথে পা পড়েছে কি পড়েনি, কথা নেই বার্তা নেই সাম্য সাম্য বলে চিল্লালেই কি সমস্যা মিটবে? তাছাড়া লেনিন, ভি. আই কি স্বয়ং বলেননি, প্রত্যেককে তার কাজ অনুসারে। ট্যাঙ্কশংকর মালটা একে সাসপেক্টেড বাইপোলার তায় কোন কম্মের নয়, স্লোগান দিতে গিয়ে অপসংস্কৃতি করে, সে কি আদৌ সমবন্টনের ফর্মুলায় পড়বে? হারগিস নয়। ওকে আস্ত বা হাফ সিগারেট দেওয়া নেই, খুব কাঁইকিচির করলে বা নোলা দেখালে শেষদিকে বড়জোর দুটো টান দেওয়া যেতে পারে। এইসব তত্বচিন্তা করতে করতে লোকটা জ্বলন্ত দেশলাইয়ের ছ্যাঁকা খেলো, সিগারেটের মাথাটাও পোড়া পোড়া মতো হয়ে গেলো। তাতে ট্যাঙ্কশংকরের ওপর লোকটার রাগ আরো বেড়ে গেলো। সিগারেট জ্বালিয়ে লোকটা ভাবতে থাকলো মেহনতি জনগণের এখনো অনেক শিক্ষার দরকার এছাড়া এই বাঁড়া বালের ট্রেনটা আসে না কেন? ট্যাঙ্কশংকর যখন বুঝতে পারলো লোকটা একটা আস্ত সিগারেট কিছুতেই দেবে না, সে আবার উদাসীন হয়ে গেলো। কিছুক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে ধোঁয়া, ধূলো, কতিপয় অপুষ্ট গেঁড়িগেন্ডি মেঘবাচ্চা ও গুটিকত উড়ন্ত কাক ইত্যাদি দেখে তার সম্ভবত মনে পড়ে গেলো দ্বিতীয় বিড়িটার আধখানা এখনো কানের পাশে গোঁজা। যা পাওয়া যায়, সেটাকেই ছাইটাই ঝেড়ে সে মুখে দিলো, দিয়ে লোকটার কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো, আগুন! এত জোরে এবং চেঁচিয়ে আগুন কথাটা এলো যে লোকটা ভীষণ চমকে হাফবেঞ্চি থেকে লাফিয়ে উঠলো। কি আগুন কোথায় আগুন কি মুশকিল। চাদ্দিকে তাকিয়ে আগুন-টাগুন না দেখতে পেয়ে সে ট্যাঙ্কশংকরের দিকে অত্যন্ত বিরক্তিপূর্বক তাকালো। শালা চায়টা কি? ট্যাঙ্কশংকর ফিক করে হেসে ও এবারে ফিসফিস করে বললো, বলছিলাম কি, একটু আগুন হবে? লোকটা দিলো। দিয়ে আবার বসতে যাবে, ট্যাঙ্কশংকর আবার কানের কাছে মুখ এনে বললো, সেই যে গোপন কথাটা। লোকটা ব্যাজার হয়ে বললো, এক্ষুণি গাড়ি ঢুকবে। ট্যাঙ্কশংকর বললো, গাড়ি? না না। বলে সুর করে দুলে দুলে বলতে থাকলো, না না না না, গাড়ি আসে না না। তারপরে বললো গাড়ি গাড়ি গাড়িটাড়ি আসে আসে আসে না। বলে দুলতেই থাকলো। লোকটা তাতে ক্ষেপে গিয়ে হাফবেঞ্চি থেকে উঠে গিয়ে টিকিটঘরের ও টিকিটজানলার মধ্যে গলা বাড়িয়ে খেঁকুরে গলায় জিজ্ঞেস করলো, গাড়ি আসবে কি না? উত্তর না আসায়, লোকটা আরো ক্ষেপে গিয়ে জানলার চৌখুপিতে মুখ পুরো সাঁটিয়ে টিকিটঘরের মধ্যে কি ঘটছে সেটা বুঝবার চেষ্টা করলো। টিকিটঘরের ভিতরে ঝুলপড়া আদিম অন্ধকার, খোপে খোপে থাক থাক পিজবোর্ডের টিকিট, বিস্তর হোৎকা টিকটিকি বা বিস্তর না হোক দু পাঁচটা তো হবেই বা এমনও হতে পারে বাইরের টিকটিকিগুলো ভিতরে ঢুকে এসেছে। মোদ্দা, ঝুলপড়া টিকটিকিঅধ্যুষিত যাচ্ছেতাই বাজে অন্ধকার। লোকটা দারুন খাপ্পা হয়ে চেঁচালো, বলছি, ১টা ২০ আসবে না আসবে না? অন্ধকারের গভীর থেকে চাঁপাফুলের মৃদু পাঁপড়ির খসখসের মতো হাল্কা আওয়াজ এলো, বলা যাচ্ছে না। লোকটা ভয়ংকর চটে গিয়ে বললো বলা যাচ্ছে না মানে? গরমের মধ্যে দেড় ঘন্টার ওপর বসে আছি, আর আপনি বলছেন বলা যাচ্ছে না? এটা কি ধরণের ইয়ার্কি হচ্ছে? ভিতর থেকে চকাৎচক জল খাবার আওয়াজ, গলা খাঁকারি। তারপর, ইয়ার্কি নয়। তাহলে? আসবে না আসবে না? এলে দেখতে পাবেন। হাই। আবার হাই। লোকটা আরো কিছুক্ষণ জানলাসই থেকে, ফিরে এলো। এইজন্য লোকে ক্ষ্যাপে, ভাঙচুর করে, টিকিটওলাদের ক্যালায়। বেশ করে। বাঁড়া বোকাচোদা। জনগণের টাকায় জনগণকে শোষণ। ক্যালাও শালাদের। উদোম ক্যালাও। ক্যালাও আর ভাঙো। ভাঙো। ভা। ভ। ভ বলতেই লোকটা আবার লাইনে ফিরে এলো। ডিরেইল্ড হওয়া যাবে না। ভ মানেই ভেঙে দাও পুড়িয়ে দাও। ভ এর পর জনগণের জ। জ এ জ্বালা। আগুন জ্বালো। জ্বালিয়ে দাও পুড়িয়ে দাও। ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা জ্বালিয়ে দাও পুড়িয়ে দাও। না না, আবর্জনা বললে চলবে না, আবর্জনা পরিষ্কার করতে হবে। জনগণের শত্রু টিকিটঘর জ্বালিয়ে দাও পুড়িয়ে দাও। এই উদ্দেশ্যে লাল বাংলার লাল জনগণ জোট বাঁধো তৈরি হও। জয় বাংলা নয়, লাল। লাল বাংলার লাল জনগণ, রেল আমাদের দুশ-দুশমন। আরো ভালো, লাল জনগণ দিচ্ছে ডাক, টিকিটরেল পুড়ে খাক। এই পর্যন্ত বলে এদিক ওদিক তাকিয়ে পুড়ে থাক পুড়ে খাক খ্যাকখ্যাক খাক খাক বলার মতো কাউকে দেখতে পেলো না বলে লোকটা গনগনে রাগ নিয়ে হাফবেঞ্চির আস্তানায় ফিরে গেলো। সেখানে শংকরট্যাঙ্ক তখন পা নাচাচ্ছিলো ও শিস দিয়ে মেরে সপনো কি রানী কভি আয়েগি তু গাইছিলো। তাতে বেধড়ক খচে যেতে যেতে লোকটা সামলে নিলো। হাফবেঞ্চির ডানদিকে বাঁদিকে নির্মম রেললাইন গোঁ গোঁ করতে করতে দূর দেরাদুন কিম্বা দিল্লি চলে গেছে। রোদ, বাইপোলার এবং হোৎকা টিকটিকিদের মতো পৃথিবীময় অত্যাচার অবিচার শোষণ বাড়ছে। চলবে না। চলতে পারে না। সব কিছুর জবাব হবে। জবাব চাই জবাব দাও। লোকটাকে অবাক করে দিয়ে শংকরট্যাঙ্ক বললো জবাব চাই জবাব দাও। লোকটা বললো রেল কেন লেট করে জবাব তোমায় দিতেই হবে। শংকরট্যাঙ্ক বললো, দিতে হবে দিতে হবে। লোকটা বললো, আজ জনগণ দিচ্ছে ডাক, টিকটিকটিকি নিপাত যাক। শংকরট্যাঙ্ক বললো, যাক যাক যাক যাক। বলেই বললো না না না না। আবার বললো যাক যাক যাক যাক। বলতে বলতে শংকরট্যাঙ্কের ওপর ভর হলো, সে ক্রমান্বয়ে দুলতে, গোল হয়ে ঘুরতে ও হাত ওপরে তুলে নাচতে থাকলো। যাক যাক যাক যাক। থাক থাক চাক চাক। মৌচাক মৌচাক। টিকটিকি মধু খাক। চেটে খাক চুষে খাক। টিপেটুপে চুষে খাক। খাক ফাক খাক ফাক। লোকটা হাঁ করে এই গদ্দারি বেলেল্লাপনা বা ধর্ম জনগণের আফিং দেখতে থাকলো। এমন সময় য়্যানাউন্সমেন্ট হলো। ২নং এ ডাউন ট্রেন আসছে, ১নং দিয়ে মালগাড়ি যাবে, যাহারা ডাউন ট্রেন ধরিতে ইচ্ছুক তাহারা অবিলম্বে ১ নং প্ল্যাটফর্মের দিকে যান। শুনে লোকটা ভরগ্রস্ত শংকরট্যাঙ্ককে ফেলে রেখে পাঁইপাঁই ওভারব্রিজের দিকে দৌড়োলো। শংকরট্যাঙ্ক নাচছে গাইছে দুলছে ও লোকটা ট্রেন ধরবে বলে ২নং এর দিকে দৌড়োচ্ছে। সঙ্গে আরো কিছু লোক দৌড়োচ্ছে। দূরে ডাউনগাড়ির আলো দেখা দিয়াছে, ট্রেন ঢুকিলো বলে। টিকিটঘরে টিকিটবাবু টিকিট দিতেছেন। টিকটিকিকুল চরিতেছে ঘুরিতেছে মওকামতো পোকাটোকা পাইলে টপাস-টপ মুখে পুরিতেছে। পৃথিবী সূর্যের ও চান্দ পৃথিবীর চারিদিকে ঘুরিতেছে। ছাগলেরা পাতা প্লাস্টিক ও কাগজ খাইতেছে। কুকুরেরা বালভিকিরি ও বেপাড়ার কুত্তাকে তাড়া করিতেছে। ২নং এর উলটাবাগে ১নং, সেখানে ট্যাঙ্কশংকর লুঙ্গি প্রায় কোমর অবধি তুলিয়া নাচিতেছে। প্রলয় নাচন নাচলে বলে হে নটরাজ। ট্যাঙ্কশংকরের শংকর ভগমান হিসাবে আত্মপ্রকাশ এখন যে খুব স্বল্প টাইমের ভিতরে ঘটতে পারে তা নিয়ে কুনই সন্দেহ নাই।


    ক্রমশ

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    মেনকার মেয়ের মাগ্গদশ্শক  | যদি এই জীবনের বন্দরে নানাদেশী তরী এসে নোঙর করে | ঘোড়ামারা দ্বীপ | দ্বিষো জহি | কবি যখন পাহাড় হয়ে যায় | ট্রফি | ফকিরি | বাংলা ভাষার গঠন নিয়ে চর্চা ও কিছু প্রস্তাব | কাঠের মানুষ | তাজ ও মাহোল | কবিতাগুচ্ছ | কোন নাম নেই | টিফিনবেলার গান | সান্দ্র ধাতবসঙ্গীত | মশা-ই | গুনাহ! গুনাহ! | রেনেসাঁস থেকে রসগোল্লা সবই কলোনিয়াল | সু-পাত্রের সন্ধান দেবে অঙ্ক | যদি বল প্রেম | যশপতির একদিন | চোদ্দপিদিম | গভীর জল | লেখা-সাক্ষাৎ | ব্ল্যাকআউট ডাইনিং - পর্ব ১ | কন্যাকুমারী | সিন্ধুতট | ট্যাঙ্কশংকর, লোকটা ও এক সম্ভাব্য/অসমাপ্ত মহাজাগতিক কিস্যা-১ | ট্যাঙ্কশংকর, লোকটা ও এক সম্ভাব্য/অসমাপ্ত মহাজাগতিক কিস্যা-২ | আনন্দ মঠ – ইতিহাসের সন্তান, ইতিহাসের জননী | ব্ল্যাকআউট ডাইনিং -- পর্ব ২ | অর্গ্যাজম | কবি-কাহিনি | ব্ল্যাকআউট ডাইনিং -- পর্ব ৩ | কমরেড গঙ্গাপদ | বিপজ্জনক খেলা | বেলার বেতার | গভীর অসুখে নিমজ্জিত মণিপুর | আবোল তাবোল | শিউলিরা | বিসর্জন | এক রাজা, দুই কবিরাজ | হাওয়া হাওয়া | ভোলবদল | ধৃতরাষ্ট্র ও দশরথঃ মহাকাব্যের দুই পিতা ও তাদের রাজধর্ম | মারীকথা | দামামা | হাওয়া মোরগের জীবন | পলায়নবাদীর সঞ্জীবনী বটিকা | নিত্যগতি | তিনটি কবিতা | চিত্রকর | যাবার কথা
  • গপ্পো | ০৪ নভেম্বর ২০২৩ | ৮৬৫ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    গল্প  - Debasis Sarkar
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সিএস | 103.99.156.98 | ১৬ নভেম্বর ২০২৩ ১৩:৫২526138
  • চতুর্দিকের ছক মেলানো গল্প, ছোটগল্প, প্যাথোজ, অনুভুতি ইত্যাদির মধ্যেই এই লেখাটি (দুই পর্ব মিলিয়ে্‌) বেশ আখাম্বা পাঠক ইরিটেটিং লেখা হয়েছে। গপ্প - চরিত্র - রিয়েলেটি - তত্ত্ব - লেখা নিয়ে লেখা, লেখার খেলা, এই সব মিলিয়ে আর শব্দ আর বাক্যের স্রোতের মধ্যে ফেলে হাবুডুবু খাওয়ানোর মত লেখা হয়েছে এটি। মনে হয় না ল্যাপটপ অথবা ফোন তো দূরস্থান, সেসবে এ লেখা পড়ে ওঠা যায়, ছাপা কাগজ দাবী করে এই লেখাটি, অন্তত আমার কাছে।
  • Soumitra Ghosh | ১৬ নভেম্বর ২০২৩ ১৬:৩৭526141
  • আজ্ঞে, যথার্থ বলেছেন। মানে ওই ছাপাবার কথাটা। আসলে, এই মাল ছাপতে পারে, এমন ছাপা কাগজের কথা ভেবে উঠতে পারিনি।  
     
    আপনার মতামতের জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ। 
  • সিএস  | 103.99.156.98 | ১৬ নভেম্বর ২০২৩ ১৭:২৫526142
  • মধ্যবর্তী পত্রিকাটা দেখতে পারেন, বহরমপুর থেকে বেরোয়, বছরে তিন - চারটে সংখ্যা। জানেন হয়ত। বেশ ট্যারাব্যাঁকা লেখা ছাপায়, দেখেছিলাম এবারের পুজোসংখ্যার জন্য কবিতা চেয়েছিল কিন্তু সেসব যেন কবিতা না হয়, সেরকম !
  • Soumitra Ghosh | ১৬ নভেম্বর ২০২৩ ১৭:৪৭526143
  • ধন্যবাদ। অবশ্য দেখবো।
  • ট্যারাব্যাঁকা লেখা | 162.245.239.130 | ১৭ নভেম্বর ২০২৩ ০০:২৮526158
  • বাংলাতে ট্যারাব্যাঁকা লেখার সাইট আর হোল না। এখানে লিখতে ইচ্ছে করেনা। নেকা-নেকা লেখায় আহাউহু কমেন্ট পড়ে, এরকম ট্যারাব্যাঁকা লেখার জাস্ট কোন পাঠক নেই।
  • খিক্ষিক | 2405:8100:8000:5ca1::50:1306 | ১৭ নভেম্বর ২০২৩ ০৩:১৬526169
  • যদিও ট্যারাব্যাঁকা গদ্য লিখবো তবু কিন্তু আহাউহু কমেন্টও চাই।  আমি হলুম হটকে পাঠক কিন্তু গদগদ হতেই হবে। কেউ কি খুব সাধছে লেখার জন্য?
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন