এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  গপ্পো  summer24

  • হন্য

    সৈয়দ তৌশিফ আহমেদ
    গপ্পো | ১৯ এপ্রিল ২০২৪ | ৪০৩ বার পঠিত

  • ছবি: রমিত চট্টোপাধ্যায়



    খুব সম্ভবত খুন হব আমি।

    মারণাঘাত আজই হানবে ঘাতক, একথা জোর দিয়ে বলা না গেলেও, খুন হওয়াটা একরকমের নিশ্চিত। মৃত্যু নিয়ে ইদানীং হয়তো আমার আর তেমন উৎকণ্ঠা নেই, তবে দীর্ঘ যন্ত্রণায় প্রবল আতঙ্ক আছে। মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণে রাজি, যন্ত্রণা থেকে অব্যাহতি চাই শুধু। ঘুমের ভিতর আরও গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলে মন্দ কী, তবে সেরকম আরামদায়ক মৃত্যুর বরণডালা সাজিয়ে আততায়ী কি অভ্যর্থনা দেবে আমাকে? জানা নেই!

    যন্ত্রণাহীন মৃত্যুর সৌভাগ্য বোধহয় আমার কপালে নেই।

    অবশ্য, মরতে আমাকে হবেই। বাড়ির চেনা চৌহদ্দিতে হোক, কি বিপুলা পৃথিবীর কোন নির্জন কোণায়। খোলা আকাশের নীচে কিংবা দুর্ভেদ্য গুমঘরের খাঁচায়। পৃথিবীর প্রতিটা ইঞ্চিই আমার কাছে এখন যমের দক্ষিণ দুয়ার! তাতে অবশ্য কিছু যায় আসে না আর! মৃত্যুই যখন অবধারিত সেখানে এসব সৌখিনতা নেহাতই অবান্তর, বাড়তি। আমার প্রাণপাখি ডানা মেলে শরীর ছাড়লে যে দীর্ঘ অবশ অন্ধকার নামবে তা নিয়ে আমার তেমন দুশ্চিন্তা না থাকলেও, মৃত্যু যন্ত্রণার দীর্ঘ কাতরানিতে ঘোর ভীতি আছে।

    প্রশ্নটা হল, কিভাবে নিকেশ করবে আমায় ? গলা টিপে শ্বাসরোধের সাবেকি পন্থায়? আমার কুতকুতে চোখগুলো কি তখন বল্লমে গাঁথা শুয়োরের মতো ঠিকরে বেড়িয়ে আসবে ? মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও বিস্ফারিত দৃষ্টি প্রাণপণে ধরে রাখতে চাইবে আততায়ীর শেষ ছবি? নাকি মরবো খাদ্যে বিষক্রিয়ার মতো দীর্ঘ যন্ত্রণাময় কদর্য কায়দায়? কাটা পাঁঠার মতো জগঝম্প জুড়ে, শ্বেত পাথরের তেলা মেঝেয় বমি -পায়খানায় একাকার হয়ে ? আর নাকি প্রকাশ্য রাস্তায় পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জের গরম বুলেট ফুঁড়ে দিয়ে যাবে মগজ? কিছু রক্তমাখা ঘিলু ছিটকে গিয়ে লাগবে কি কোন বেনামী ল্যাম্পপোস্টের গায়ে? কে জানে হয়তো দু একটা অশ্লীল স্মৃতিও তখন গড়িয়ে নামলো পোস্টের গা থেকে। আমার পড়ে থাকা নিথর লাশের দিকে চেয়ে রাস্তার লোক কি চমকাবে খুব? খুব ? বোধহয় পুরনো প্রফেসিকে সমর্থন জানিয়ে বলে উঠবে, – এ তো জানাই ছিল! আজ নয়তো কাল এটা হওয়ারই কথা! বেশ হয়েছে শালা!

    আমি আক্রান্ত হতে পারি যে কোনও দিন, এ খবরটা বাসি হলেও খুনের সম্ভাবনাটা একেবারে হালের অগ্রগতি, ব্রেকিং নিউজটি কাকপক্ষীতেও টের পায়নি এখনো। খুনটা হবার পরেও সত্যের নাগাল পাবে মানুষ, তারই বা গ্যারান্টি কোথায়। বরং লটকে থাকা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বসে আমারই কোনও টাটকা কলঙ্কের দাগকে হয়ত রং চড়িয়ে আরেকটু চওড়া বানাবে! আমার বিরুদ্ধ শিবিরে চাওর হওয়া কোনও সাবেকী ঝাল, পুষে রাখা কোনও প্রাচীন বৈরিতায় নির্ঘাত জল মেশাবে আরও দু’দাগ। খুনটা হতে দেরি, মোড়ের জটলায় পুরনো কেচ্ছার রগরগে খেঁউড় চলবে, তা কি আর বলে দিতে হবে। তবে, আসল অপরাধীর টিকিটিও ধরতে পারবে না কোনও মামু। কারণ, আমিই জানতে দেবো না কে এবং কেন আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র রচেছে। ইচ্ছেটা একান্ত ব্যক্তিগত। ইচ্ছে হলে ঝেড়ে কাশবো পরে, না হলে এটুকু মগজ খাটিয়ে বুঝে নিতে হবে।

    তাতে মানুষের একরকম খুশিই থাকার কথা। এমনিতেই বিবেক-কাতর জনগণের বহু প্রতীক্ষিত আকাঙ্ক্ষা,কেউ আমাকে অন্তত দু চার ঘা দিক। প্যাঁচে ফেলে হেনস্থা করুক। আমার রেওয়াজি কেচ্ছা কেলেঙ্কারি নিয়ে কেউ অন্তত এবার একটা বোমা ফাটাক সজোরে। সঙ্গত কারণেই আমাকে নিয়ে সকলের তীব্র ক্ষোভ, তাদের কলরবের পিছনে হাজারটা কারণ নেহাত যুক্তিহীনও নয়। এত বছরের এত খুচরো পাপ নিয়েও আমি পার পেয়ে যাচ্ছি কোন অন্যায্য যুক্তিতে! আর কীভাবে? শয়তানের আরাধনায়, নাকি ঈশ্বরের উপেক্ষায়?

    “তবে পেটি অপরাধ নয়, খুন হব একেবারে অন্য কারণে!”, বোধহয় মুখ ফসকে আলগোছে বেরিয়ে এসেছে কথাটা, তাও আবার বিপজ্জনক ‘খুন’ শব্দটাই।

    পেল্লায় সসপেনে মুঠোভরা চিনি ছুঁড়ে দিয়ে আমার দিকে অবাক চোখে তাকিয়েছে জগদ্দল, - কোথায় খুন হয়েছে?

    দীর্ঘ সময় চারদেয়ালে নিজেকে বন্দি রাখার পর সবে কটাদিন চৌকাঠ ডিঙিয়ে সদর সংলগ্ন রাস্তায় পায়চারি করছি। এযাবৎ আমার চলাফেরা সীমাবদ্ধ থাকছিল সদর থেকে সামনের ল্যাম্পপোস্টের মাপাজোপা দূরত্ব টুকুতেই। আজ দেখছি ভাবনার পাকদণ্ডিতে খেই হারিয়ে অন্যমনস্ক হেঁটে মোড়ের চায়ের দোকান অবধি এসে পৌঁছেছি।

    জগদ্দলের প্রশ্নে পলকের জন্য গুম হয়ে যাই। পরক্ষণেই সামলে নিয়ে অবাক হওয়ার ভান করি, - আ্যঁ!

    - কে খুন হয়েছে?

    আমার নির্লিপ্ত জবাব, - খুন! কই, তেমন কেউ না তো! কাগজে দেখছিলাম তখন। বলে ফাঁকা বেঞ্চে বসতেই খবরের কাগজের পিছন থেকে একটা মাথা উঁকি দিয়েছে। ষণ্ডামার্কা চেহারা। অচেনা মুখ। এ তল্লাটে দেখেছি বলে তো মনে পড়ে না। প্রখর চাউনি। ঘন ভুরু জুড়ে গিয়ে চেহারায় একটা বিজাতীয় কাঠিন্য। আততায়ী হবার যোগ্য দাবিবার সন্দেহ নেই। নতুন মুখ দেখলেই আজকাল আমার উদ্বেগের পারদ চড়ে যায়। বিশেষ করে এরকম মুখ। এই লোকটাই অন্ধকারে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে, কদিন থেকে আমার জানালার দিকে ঠাই চেয়ে থাকে? অসম্ভব নয়। একটু মুখ চেনা ঠেকছে যেন।

    পাড়ার মোড়ে জগদ্দলের চায়ের টঙ। মুখোমুখি জোড়া বেঞ্চ পাতা। সামনেই সংলগ্ন পিচ রাস্তা। পিছনে ঝাঁকড়া হয়ে থাকা দেশী শিমুল। গাঢ় সন্ধে নামছে ভুসো কালি ছড়িয়ে। এপ্রিল মাস, তাও এখন থেকেই যেন বাতাসে একটা জোলো ভাব। কদিন আগে একটা আনসান ধুলোর ঝড় এসেছিল, দু একবার গর্জে সেই যে চুপ করেছে আকাশ, আর কোনও উচ্চবাচ্য নেই। গাছের পাতায় মৃদু কাঁপন পর্যন্ত গায়েব।
    সোমবার বলেই আজ জগদ্দলের দোকানে খদ্দেরের বায়নাক্কা নেই, তাই কিছুক্ষণ বসলেও লোকজনের প্রশ্নে জেরবার হতে হবে না। তাছাড়া মুখের উপর কাগজ তুলে রাখা এই লোকটা পট্টিবাজ কিনা, জানতে কৌতূহল হচ্ছে বড্ড।

    দেবীপুর অঞ্চলের সবচেয়ে বর্ধিষ্ণু পাড়া এই নবপল্লী। জগদ্দলের টঙ ছাড়িয়ে পিচ রাস্তা ধরে মিনিট খানেক হাঁটলে একটা অকেজো আখাম্বা ল্যাম্পপোস্ট, সেই ল্যাম্পপোস্টের উল্টো দিকে কিছুটা এগিয়েই আমার সদর। আর ঠিক ওই ল্যাম্পপোস্টের নিচেই এক বা একাধিক ছায়ামূর্তির আনাগোনা আজকাল। সন্ধ্যার পর সামনের রাস্তায় পায়চারি সেরে আমি বাড়ি ঢোকা মাত্র তাদের গতিবিধি শুরু হয়ে যায়, আশেপাশেই নির্ঘাত ডেরা আছে কোথাও। করে না কিছুই, পোষা পেয়াদার মতো দাঁড়িয়ে থাকে, ক্রমান্বয়ে সিগারেট পোড়ায়। তীক্ষ্ণ চোখে নজর রাখে জানালায়। খবরের কাগজের পিছনের এই ভীষণ চেহারাটি কি সেই দলেরই পাণ্ডা! এই কি তবে সেই আততায়ী! মুগুরের মতো তার কব্জি দেখে আমাকে টুটি টিপে মারার একটা ছবি মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। নিজের ডান হাতটা কখন যে গলায় চলে গেছে, সে খেয়ালই নেই, নিজের অজান্তেই একটু চাপও দিচ্ছিলাম হয়তো টুঁটি সংলগ্ন অঞ্চলে।

    জগদ্দল চা ছেঁকে ফ্লাস্কে ভরে আমার দিকে আড়চোখে চাইতেই তার ভ্রু কুঁচকে গেছে, - গলায় কী হয়েছে?

    হাত সরিয়ে নিয়ে বিরক্তি চেপে বলি, - না রে ভাই! হবে আর কী! ওই ঠাণ্ডা গরম।

    সামনের ষণ্ডামার্কাটি কাগজের পাতা ওলটাতে ওলটাতে খর দৃষ্টিতে মুহূর্তক্ষণ আমাকে জরিপ করে ফের কাগজে মুখ গুঁজে দিয়েছে। ঝলকে উঠেছে তার লোমশ ডান হাতের পুরু সোনালী ব্যান্ড। এই যদি আমার যমদূত হয় তাহলে দুর্ভোগ আছে কপালে। সহজে আমার আত্মারামকে এ লোক খাঁচাছাড়া হতে দেবে কি? মনে তো হয় না। আমার মেরুদণ্ড বেয়ে আতঙ্কের একটা চোরা স্রোত নেমে গেল। মাথার ভিতরে, বুকের গভীরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা বোধ করছিলাম। লোকটা কে আমাকে তা জানতেই হবে। কিন্তু কীভাবে? সরাসরি প্রশ্ন করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করবো কি? হ্যাঁ, করাই যায়। ভদ্রতার পাঠ এমনিতেই আমার নেই, তায় যমদূত।

    - শুনছেন, নড়বড়ে স্বরে প্রশ্ন করলাম, আপনি কি পাড়ায় নতুন এলেন?

    কাগজের মাথা ছুঁয়ে সেই কঠিন দৃষ্টি আমার দিকে স্থির, - আমাকে কিছু বলছেন কি? বাপরে! কী নিরেট কণ্ঠস্বর। শব্দগুলো যেন কাঁচের বয়ামে মুখ ঢুকিয়ে ধীরেসুস্থে এক এক করে উচ্চারণ করল কেউ। কণ্ঠস্বরটা বৈকালিক নিস্তব্ধতার গায়ে একটা স্থায়ী উল্কি টেনে দিয়ে গেল। উচ্চারণের প্রতিধ্বনি আমার কানে বাজছে এখনো।

    সাহস সঞ্চয় করে কিছু বলতে গিয়েও জিভ আড়ষ্ট হয়ে গেছে আমার, ঢোঁক গিলে বললাম, - আপনাকে না। জগদ্দলকে চায়ের কথা বলছিলাম।

    ঠিক সময় মতই সাড়া দিয়েছে জগদ্দল, - একটু রোসো, হয়েই এসেছে।

    আর কত রোসবো রে ভাই! খোঁয়াড়ি ভেঙে দেখছি জীবনের রং তামাশা সব নিকড়ে ছিবড়ে হয়ে আছে। বুকভরা হিচককিয় সাসপেন্স নিয়ে রোসেই তো আছি বাপ। পেটের ভিতর একটানা গুরগুরানি, বুকের গভীরে আস্ত জিওল মাছের খলবলানি। মৃত্যু ভাবনায় শরীরের মধ্যে এত রহস্যময় খেলা চলবে কে জানত! এ যেন প্রথম যৌনতার পূর্ববর্তী অধ্যায়, শরীরের প্রতিটা রোমকূপই টানটান প্রস্তুত, কবে হবে, হলেই মোক্ষলাভ। শুনেছি মানুষ গলায় দড়ি দিলে নাকি বীর্য নিঃসরণ হয়। এ লোক আমার গলা টিপলে আমারও তাই হতে পারে। সেটা কি যন্ত্রণায়, নাকি উত্তেজনায়? কে জানে রে বাবা!

    জগদ্দল চা ধরিয়ে গেল।

    এককালে জগদ্দলের এই চায়ের গুমটিতেই বসত আমার সান্ধ্য আড্ডার মজলিশ। ছিল তখন দু চারটে তাঁবেদার, চামচা, গোলাম। একটা দুটো বান্ধবী। আমার লোহালক্কড়ের ব্যবসাটাও দাঁড়িয়েছে সদ্য। এলাকার তাবৎ মিস্ত্রীদের হাত করাতে খদ্দেরের লম্বা লাইন লেগেই থাকে। সাথে বরাবরের পৈতৃক চালের আড়ত থেকেও মুনাফা উঠছিল দুরন্ত। প্রথম স্ত্রীকে জোরজবরদস্তি ডিভোর্সে রাজি করিয়েছি। মৈথিলীর সঙ্গে নতুন সম্পর্কের তুরীয় নেশায় তখন বুঁদ। যাওয়ার জায়গা রয়েছে আরও দু একটা। পারলে যেন একটা হারেম খুলেই বসি। সেই সময় সান্ধ্যআসরের মধ্যমণিটি হয়ে আমাকে এখানে দেখা যেত প্রায়ই।

    এখন অবশ্য সবই ভোগে গেছে। মৈথিলী, ব্যবসা,আড্ডা এবং চামচাকুল। সে নিয়ে অবশ্য আমার গ্লানি, ধিক্কার, আফসোসের কোনটাই নেই। জীবনে কোনও নীতির কাছে নত না হলেও, একটি উপদেশের সামনে আমি হাঁটু মুড়ে বসেছি, আজ আছে কাল নেই, সুতরাং যতটুকু যা জুটছে তা নির্দ্বিধায় ভোগ করে যাও, পরে হা পিত্যেশ করো না।

    শব্দ করে চায়ে চুমুক দিলাম।

    জগদ্দল বললো, - আপনাকে অনেকদিন দেখিনি যে! শরীর গতিক সব ঠিক তো?

    মনে মনে না হেসে পারি না। যে মানুষ সারাজীবন শারীরিক হয়েই কাটালো, প্লেটোনিক চিনলই না, তার আবার শরীরে কী হবে!

    হুঁ! চিন্তায় যেন ঘুম উড়ে গিয়েছিল সকলের। শালা! জগদ্দলের কথাই ধরা যাক, থাকে তো আমার বাড়ি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে। এতই যদি উতলা, তাহলে কৈ, সদরে কড়া নাড়লি না যে বড়! ব্যাটা, তোর দোকানের এই রমরমা, সে তো এককালে আমার দৌলতেই। হতে পারে বেশ ক’বার লোকাল কাউন্সিলরের দলবল এনে তোর দোকানে ফোকটে মজা মেরে গেছি, তাতেও আমার কন্ট্রিবিউশনটা কি মিথ্যে হয়ে গেছে? চড়া সুদে হলেও, দিয়েছিলাম তো ধার! আগে হলে এমনটাই ভাবতাম হয়তো, শুনিয়েও দিতাম মনের সুখে, এই কটা দিন মনে আর ঠাঁই দিচ্ছি না এসব। বৈরাগ্য বলবো না, বলা চলে ক্লান্তি, নিঃস্পৃহতা। পুরনো বাদ্যযন্ত্র পড়ে থাকলে যেমন ডিটিউন হয়ে যায়, আমার ভিতরের আস্ত শয়তানটাও ঠিক সেরকমই বেসুরো ঠেকছে আজকাল। তেড়েফুঁড়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার সেই প্রণোদনা আমাকে ছেড়ে কোথায় যে পাড়ি জমালো। সময় ফুরিয়ে এলে মানুষ তবে কি চেনা পথ ভুলে বেপথু হয় এভাবেই? অচেনা লাগে রোজকার আকাশ? এই কি তবে বৈরাগ্য? নাকি ভয়ে জুজু? এতদিনের বুনো ওল কি তবে পড়েছে বাঘা তেঁতুলের পাল্লায়? আর তাতেই কমছে চুলকানির ধাত?

    বললাম, - না, শরীরে কিছু নয়। কদিন একটু বাড়ির কাজে মেতে ছিলাম।

    উত্তরটা বিশ্বাসযোগ্য মনে না হওয়াটাই স্বাভাবিক, অবিশ্বাসী চোখে একপলক তাকিয়ে রইল জগদ্দল,তারপর আফসোসের ভঙ্গিতে প্রশ্ন করল, - ব্যবসাটা কি একেবারেই তুলে দিলেন?

    আমার কপালে ভাঁজ পড়েছে তৎক্ষণাৎ, - কেন বলতো?

    থতমত খেয়ে গেছে জগদ্দল, - না, আসলে এত বড় ব্যবসা, উঠিয়ে দিলেন?

    – উঠিয়ে দিয়েছি কে বলল, বন্ধ রেখেছি কিছুদিন।

    – আমরাও তাই বলাবলি করছি … এত বড় ব্যবসা… এত টাকার লেনদেন…

    কষ্ট করে হাসলাম। শিমুল গাছের পাতলা অন্ধকারের দিকে তাকাতেই বুক বেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস উঠে এল।

    – বৌদি ভালো আছেন?

    ন্যাকা! জানে না যেন। উত্তর না দিয়ে হাসিটা ধরে রাখলাম ঠোঁটে।

    কাঁচুমাচু মুখে প্রসঙ্গ পাল্টালো জগদ্দল, - জানি রাগ করবেন, তাও জিজ্ঞেস করা, ভালো দাম পেলে খালের পাড়ের জায়গাটা বেচবেন নাকি? ভালো খদ্দের ছিল একটা।

    মাস কয়েক আগে হলে এই প্রস্তাবে আমি স্তম্ভিত হতাম, রুদ্রমূর্তি ধারণ করে প্যাঁচ কষতাম কীভাবে জব্দ করা যায় আহাম্মককে। এখন অবশ্য শুকনো হাসলাম, - হ্যাঁ, বেচলেই হয়। পড়েই তো আছে।

    এই উত্তর শুধু অপ্রত্যাশিত নয়, অভূতপূর্বও বটে।

    জগদ্দলের অবাক হওয়ার চেয়েও, আমার নিজেরই বিস্মিত হওয়াটাই এক্ষেত্রে নজর করার মতো। খালের পাড়ের ওই জায়গাটা করায়ত্ত করতে এককালে রায় পরিবারের উপর দেদার সন্ত্রাস চালিয়েছি আমি। লোকাল এমএলের সাথে গাঁটছড়া বেঁধেও কাজটা সারতে লেগেছিল পাক্কা দেড়টা বছর। ঠিক ওখানেই ছোট্ট একটা অর্গানিক ফার্ম করার সাধকে লালন করছি আজ অনেকগুলো বছর। সে জায়গা অন্য কাউকে বেচার কথা উচ্চারণ করতে পারি, এ আমারই কল্পনা বহির্ভূত। মৃত্যু কাছে এলে অবশ্য অনেক আশ্চর্য কল্পনাই সাদামাটা বাস্তব বলে প্রতিপন্ন হয়। তাই তো দেখছি।

    জগদ্দল অবাক চোখে আবার শুধোলো, - বেচবেন?

    - হ্যাঁ।

    - সত্যি বলছেন? উত্তেজনায় সে এগিয়ে এসেছে কিছুটা।

    - হ্যাঁ, সত্যি নয়তো মিথ্যে নাকি। তুমি কথা বলে জানিও আমাকে। আমি রাজি।

    না! এখানে আর এক মুহূর্ত বসা যাবে না, জগদ্দল জেরবার করে দেবে।

    খবরের কাগজের দিকে একবার চোরা চোখে চেয়ে উঠে দাঁড়ালাম। যে যা পারবি কর, মারবি সে তো জানি, শুধু বলে দে কীভাবে, মনকে খানিক বশে আনি।

    সন্ধের প্রায়ান্ধকারে রাস্তায় নেমে গেলাম। বাড়িমুখো নয়, উল্টো পথ ধরেছি। একবার সীতারাম'দার কাছে যাওয়া যাক। কাঁহাতক আর গর্তে ঢুকে দিন কাটানো যায়। ভয় নয়, বুক খামচে ধরছে একাকীত্ব। এর নখ আরও ধারালো। সীতারামদা আমার এককালের গুরু। একটা লোকাল নিউজ পেপার চালাতেন এককালে, সেই সূত্রেই আলাপ। এখন সেসব উঠে গেছে যদিও। কী যেন করেন টরেন আজকাল। যোগাযোগ নেই বহুদিন। এই একটি লোকই এখন আমার সহায়, কিছু একটা পথ যদি বাতলে দেন, যার সাথে আলাপের সান্নিধ্য, চলাফেরার অনুগ্রহ পেয়ে আমি কৃতার্থ হতাম এককালে। মানুষটির জীবনযাপন আমার মধ্যে একটা অপরাধবোধের সঞ্চার করত। কখনো সখনো মনে হত, অলস পায়ে সমভূমি বরাবর হেঁটে যাওয়ার কাজটা সহজ, কিন্তু পাহাড় ডিঙনোর শপথ যারা নিয়েছে, কী পাচ্ছে তাঁরা সেই দমছুট পরিশ্রমে? এর মধ্যেও নিশ্চয় আরও একটা বৃহৎ জীবন রয়েছে, মহৎ বেঁচে থাকা রয়েছে, যার খোঁজ আমি জানি না। একটা এডভেঞ্চার, যা শরীরের এডভেঞ্চারের চেয়েও জোরালো, স্থায়ী। সীতারামদার কাছে দুদণ্ড বসলেই এসব উল্টোপাল্টা ভাবনা ভিড় করত মাথায়। এই একটি মানুষ আমাকে কক্ষনো মাপেন নি আলো অন্ধকারের বিচারে। হয়ত তাই আজ আবার সীতারামদাকে মনে পড়ছে।

    সীতারামদার কথা বাদ দিলে, অন্যান্য মানুষ অবশ্য আমাকে সচরাচর পরিমাপ করেছে স্বার্থপরতা, এবং শয়তানির এককে। লাম্পট্য এবং চরিত্রহীনতার নিরিখে। জানে লোকটা একলষেঁড়ে, মিথ্যুক, ধান্দাবাজ, লম্পট, জোচ্চোর, সর্বোপরি দুশ্চরিত্র। নিদারুণ এক ক্ষতিকারক জীব। এর প্রতিটাই অবশ্য পৃথিবীর প্রত্যেক গড় মানুষের জন্যই অল্পবিস্তর প্রযোজ্য, আমার ক্ষেত্রে সামান্য বেশি হতে পারে ফ্যাক্টরগুলো এই যা। তবে মূল রাগের কারণটা, আমাকে নিয়ে তাদের নিষ্কলুষ মনে তৈরি হওয়া প্রবল যৌন ঈর্ষা। সব অপরাধ ক্ষমা ঘেন্না করলেও আমার এককালের একাধিক অবৈধ সম্পর্ক, যতই সে চুকেবুকে যাক, তারা মেনে নিতে পারেন নি আজও। তাদের যাবতীয় ক্ষোভের উৎসমুখ যেন ওখানেই। আমার বহুগামিতা নিয়ে তাদের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং দুর্ভাবনার রেশ কাটেনি আজও। পুরনো কথার কাসুন্দি ঘেঁটে, গেল গেল রব সম্ভবত আজও ধ্বনিত হয় এ তল্লাটের আনাচকানাচে।

    সে নিয়ে অবশ্য আমি প্রতিবাদ করবো না,তর্কেও যাবো না। মুহুর্মুহু দীর্ঘশ্বাস ফেলতে থাকা একগামী, আপাদমস্তক বহুগামির বিরুদ্ধে লোক খ্যাপাবে এ আর নতুন কথা কী! লোকের কথা থাক। আমি বরং আমার কথাই বলি শুধু, একথা মেনে নিয়ে যে, আমার বিরুদ্ধে ক্ষেপে ওঠার পর্যাপ্ত কারণ হয়তো তাদের রয়েছে। মানুষের ধারণা, যতরকম ক্ষতিসাধন একটা মানুষের দ্বারা সম্ভব, তার বেশিরভাগই আমার অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জড় হয়েছে এক এক করে।

    হ্যাঁ, স্বীকার করছি, আমার সাথে ন্যায়পন্থার সখ্যতা হয় নি কোনোদিনই। নীতির ধার আমি ধারিনি এ জন্মে। সততার পাঠে আমার হাই উঠেছে ঘনঘন। স্কুল জীবনে দুর্বলদের বুলি করেছি, কলেজ জীবনে মেয়েদের উত্যক্ত। কর্মজীবনে শোষণ করেছি অধস্তনদের। মানুষ অকারণেই নাজেহাল হয়েছে আমার হাতে। খুচরো ফায়দা তুলতে দেদার লোক ঠকিয়েছি। সবাই ভাবে, এসব পরিকল্পিত শয়তানি। তবে এসব যে খুব ছক কষে, প্ল্যান ফেঁদে ঘটিয়েছি এমনটা কিন্তু নয়। সুযোগ এসে গেছে একের পর এক। যা করেছি তার সবটাই ঘটেছে আমার পুরনো ধাত থেকে। মানুষের দুর্বলতাগুলো যেন আমার সামনে এলেই হাট হয়ে খুলে গেছে। আর আমিও লেগে গেছি স্বভাবসিদ্ধ কাজে, তৎক্ষণাৎ। মানুষের দুর্বলতা দেখা মাত্রই সেটাকে খুঁচিয়ে দগদগে ঘা করে দেওয়ার স্বর্গীয় সুখের মায়াবী হাতছানি থেকে নিজেকে সংবরণ করতে পারি নি।

    কী আর বলি, সত্যিটা হল, দুর্বলকে পিষে দেওয়ায় ঝোঁক আমার রক্তের উপাদানেই। আমার বাবাও নেহাত অকারণেই, ছুতো খুঁজে মানুষকে চিরকাল হেনস্থা করতেন। তাঁর স্যাডিস্টিক মস্তিষ্ক ছেলেবেলায় আমাকে যে সব পাশবিক শাস্তির বিধান দিয়েছে, তা শুনলে আচ্ছা আচ্ছা নওজোয়ানের কাপড়ে চোপড়ে হয়ে যাবে। একবার মুখ বেঁধে আমাকে একটা ট্রাঙ্কে ঘণ্টা দুয়েক আটকে রাখা হয়, ছাড়া পাবার পরেও পুরো সপ্তাহ জুড়ে আমি বিকারগ্রস্তদের মতো আচরণ করেছিলাম। আর একবার, স্কুল পালানোর অপরাধে ক্লাস সেভেনে আমাকে সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে বাড়ির রোয়াকে একটা বেলা দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এই ছিল তাঁর শাস্তি বিধানের কিছু আটপৌরে নমুনা। এর প্রতিহিংসা স্বরূপ আমিও এমন কিছু নৃশংস আচরণ করতাম, যা শুনলে মানুষের মনে আমার মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। বাবার প্রিয় বেড়াল জিমি’র দুটো চোখ স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে খুঁচিয়ে প্রথমে আমি তাকে অন্ধ করি, তারপর পিছনের দু পা দড়ি বেঁধে ফেলে দিই পরিত্যক্ত কুয়োতে।

    বাবার ক্ষেত্রে অবশ্য একটা সুবিধে ছিল, চারিত্রিক দিক দিয়ে তিনি টলেন নি কখনো। নেশার ধুনকিতে বউ পেটালে বা ছেলেকে চুরুটের ছ্যাঁকা দিলেও, কখনো বারমুখো হননি তো, তাই দুর্নামটা সেভাবে বাজারজাত হয়নি। সতীপনার খুব দাম বাজারে। আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা হয়েছে উল্টো। আমার টালমাটাল চরিত্রের দরুন কৃতকর্মের বিবর্ধিত অনুনাদ রটেছে বাজারে। যৌন ঈর্ষায় কাতর মানুষের চোখও টাটিয়েছে পাল্লা দিয়ে।

    দোষ আমারই, মানছি। কিন্তু একথাও বলতে হয়,মানুষের বোকামিই আমাকে উদ্বুদ্ধ করেছে আরেকটু অনৈতিক হতে। অন্যের অযাচিত ভালোমানুষি আমাকে প্রলোভন এবং আস্কারা জুগিয়েছে রেওয়াজি প্রতারক বনতে। যেমন কলেজে পড়াকালীন একটি মেয়েকে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমি তার বোনের সাথে যৌনতা করি। দিদির প্রেমিকের উপর নজর আছে যে বোনের, সে কথা বোঝার পরও, সেই বোনকেই প্রেমিকের বাড়িতে সামান্য নোটসের জন্য ভরদুপুরে ফাঁকা বাড়িতে কেউ পাঠায়! ফলে যা হবার তাই হয়েছিল। এখানে আমার অপরাধের চেয়ে সেই মেয়েটির সরলতাকেই আমি দায়ী করবো ষোলআনা। একথা বললে মানুষ যদিও আমার ছাল গুটিয়ে নেবে। নিক! খুনটা হয়ে গেলে এমনিতেই আমি নাগালের বাইরে। বলা কওয়ার অনেক ঊর্ধ্বে।

    যাই হোক, পরবর্তীকালে সেই মেয়েটি গর্ভবতী হলে আমি তাকে ফেলে চম্পট দিই অন্য শহরে। এতে অবশ্য আমার বাবার সায় ছিল। কেলেঙ্কারির ভয়ে, তিনিই আমাকে পার্সেল করে দেন পশ্চিম ভারতের এক শহরে। সেই বাবাকেই অবশ্য আমি সরকারি হাসপাতালে ফেলে রেখে পচিয়ে মারি। এবং বাপটা ফৌত হতেই সামান্য জায়গা জমি নিয়ে গলাধাক্কা দিই নিরীহ দাদাকে। যে যে প্রতিবেশী নৈতিকতার কোটেশন আউড়াত এই সময়, পরবর্তীকালে এক ইঞ্চি জায়গার জন্য আইনি বাঁশ কেটে তাদের জীবনে আমি নরক নামিয়ে এনেছি। এ তালিকা শেষ হওয়ার নয়। সকলেই জানে সবটা। দেখে, শোনে, আলোচনা করতে করতে নিষ্ফল আক্রোশে দাঁতে দাঁত পেষে। এদের প্রত্যেককেই আমি সরাসরি নাজেহাল করিনি যদিও, তবে তারা চায় কেউ এই সামগ্রিক অপরাধের একটা বিহিত করুক। যেভাবে হিন্দি ছবিতে ভিলেন প্যাঁদায় নায়ক, সেভাবে কেউ এসে আমার সাথে একটু ভায়োলেন্সের চু কিতকিত খেলুক। অবশ্য খুনের খবরটা জানেনা কেউই, জানলে কে আমার বিরুদ্ধে সুপারি কিলার নিযুক্ত করবে, সেই নিয়ে ‘পাঁচ কা দশ’ লাগিয়ে দিত।

    হ্যাঁ, খুন আমাকে হতেই হবে। তবে সেটা এসব পেটি কারণে নয়। লোকের সাধ যতই হোক, কোনও পুরনো ভিক্টিম দশম অবতারের রূপে আবির্ভূত হবেন না। আমি মরবো আমারই কেটে রাখা খালের পাঁকে ডুবে। ঠিক যেমন অন্যের দুর্বলতায় আমি আঙ্গুল দিয়েছি এতকাল, আমার দুর্বলতায় এবার সেই আঙুলগুলোই বোধহয় কড়া পাঞ্চ হয়ে বিলো দ্য বেল্টের স্পর্শকাতর এলাকায় ঘুঁসোবে।এবং এর মূল হোতা, আর কেউ নয়, মৈথিলী- আমারই বর্তমান স্ত্রী। হ্যাঁ, বন্ধুবর। লজ্জার কথা কী আর বলি। যে মেয়েকে বিয়ে করবো বলে আগের বউয়ের মগজধোলাই করে ছেলেপুলে সমেত ছেঁটে ফেললাম, সেই মেয়েই যে আমাকে লটকাতে, পরপুরুষকে দিয়ে ফাঁসির ফান্দা বানাচ্ছে, তা আমি জানবো কী করে।

    সহজ কথায় বললে, আমি খুব দ্রুত না মরলে, আমার স্ত্রীর বেঁচে থাকার রাস্তাটা ঠিক সুগম হচ্ছে না। বাঘ যেমন ঘাড় মটকে রক্তের স্বাদ পায়, তেমনি আমার স্ত্রীও এত বছর পর অবদমনের ঘাড় মটকে বেঁচে থাকার স্বাদ চেখে ফেলেছে। আমাদের দুজনের ক্ষেত্রে তাই বাঁচা মরাটা এখন মিউচুয়ালি এক্সক্লুসিভ বিষয়। দুই যাত্রী, তবে আসন একটিই। কিছুতেই আঁটবে না একসাথে। একজন থাকলে, অন্য জনকে সরতেই হবে। আমি টিকে যেতাম হয়তো, কিন্তু অপরাধের খুচখাচ পাঁচমিশালী পদে হাত পাকলেও, খুনের মতো গুরুপাক রান্নায় এখনো আমি হাত লাগাতে পারিনি। মার্ডার করার মতো না তো আমার কলজের জোর আছে, আর না পশ্চাতে দম। আমার প্রতিপক্ষও বেশ তাগড়াই। কাজেই দণ্ড অনিবার্য।

    এককালে মৈথিলীর শরীর দেখেই তার প্রেমে পড়ি। প্রেম শব্দটা বলতে কেমন লাগছে, কাম বললে খুব ভুল হবে কি? পাতলা দিঘল গড়নের যুবতী, যেমন ক্ষীণকটি, তেমনি উন্নত বুক। প্রেম টেম নয়, শরীর দেখে মাথা ঘুরে গিয়েছিল। চোখেমুখে কেমন এক বিদ্যুৎ চমকানো জৌলুষ। শরীরে মাতাল করা বুনো স্বেদগন্ধ। আমার তো পাগলপ্রায় অবস্থা। খেলিয়ে তুলতে সময় লেগেছিল। সহজে কি আর রাজি হয়! বহু সাধ্য সাধনার ফল! সময় এবং অর্থের বছরভরের যুগপৎ খেল। তারপর পাখি পোষ মানল। মানল তবে খাঁচায় থাকতে আপত্তি, বিয়েতে অসম্মতি, যদিও বা নিমরাজি, আমার বসত বাড়িতে উঠে আসতে খুঁতখুঁতানি। আমি তখন তার উরুমূলের ভেজা অন্ধকারে দুবেলা নিজেকে উজাড় করে না দিতে পারলে নিজেকেই যেন ক্ষমা করতে পারছি না।
    মৈথিলী ঘোষণা করল, - আমি কিন্তু চাকরি ছাড়ব না!

    আমি আশ্বাস দিলাম, - কী যে বলো! এই কথা!

    প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে বড় মজা এবং সুবিধা হল, ভাঙা যায় যখন খুশি। অস্বীকার করলেই বা প্রমাণ কোথায়।

    আমি নিজেকে যতটুকু বুঝেছি তাতে আমার চরিত্র দুই চরমপন্থী মেরুর যোগফল। অনেকটা পেন্ডুলামের সরল দোলগতির মতো। সময়ে সময়ে দুদিকের চরম বিন্দুকেই ছুঁয়ে দেখে। সম্পর্কের শুরুতে আমি উদার গণতান্ত্রিক, সাচ্চা মুক্তমনা, তারপর সম্পর্কে যেই না মরচে ধরল অমনি আমি পেশাদার ডিক্টেটর, পাঁড় রক্ষণশীল।

    চাকরি থেকে মৈথিলীকে জোরজবরদস্তি ছাড়িয়েই দিলাম। প্রথমটায় কেমন যেন হয়ে গেল সে। অসহায় ক্ষোভের সঙ্গে অপমান মিশে তার বুকে তখন ধস নেমেছে। খারাপ লাগছিল, কিন্তু উপায় কী! স্বাধীনচেতা মেয়েদের নিয়ে বড় ভয় আমার, কোথায় যে কী বাধিয়ে ফেলে। মৈথিলীর ধারেপাশে ছেলেবন্ধু দেখলেই আমার ভুরু কুঁচকে যেত। বাঘের পাশে পোষা ছাগল ছানাটিকে রাখতে আমি রাজি নই। মোবাইলে স্পাইওয়্যার রেখে সমস্ত গতিবিধির উপর নজর রাখতাম। বাড়ি থেকে হুটহাট বেরোনোর উপরও লাগু হল নিষেধাজ্ঞা। বেরোলেও পিছনে লেগে থাকত আমারই ফিট করা ফেউ।

    পরে অবশ্য বাড়ির চৌহদ্দিতে থেকেই তার নিজস্ব অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার একটা উপায় আমি বের করে দিয়েছিলাম। তবে তার পুরোটাই আমার তত্ত্বাবধানে। একটা মন বোঝানো ব্যাপার আর কি। মৈথিলী তাতে সন্তুষ্ট হল না।

    বললাম, - এক কাজ করো, বাচ্চা নিয়ে নাও।

    রাজি হল না। বলল, - কিছুদিন পর।

    আমিও নাছোড়বান্দা। নিজস্ব সম্পত্তির উপর বিছানায় জোরজবরদস্তি করাটা কী আর এমন অন্যায়ের!

    যদিও, ক্যালেন্ডার মিলিয়ে ডাক্তারের পরামর্শ মেনেও গর্ভসঞ্চারটা হচ্ছিল না। মহা সমস্যা! এদিকে পুকুরে ঢিল পড়লে ঢেউয়ের পর ঢেউ উঠেও শেষমেশ যেমন স্তব্ধ হয়ে যায়, আমার অবস্থাও তাই। আগের মতন আর মুখিয়ে থাকি না। একই শরীর ঘাঁটতে বিরক্তই লাগে বরং। শরীর যে কেন একঘেয়ে হয়, এককালে যতটা উদগ্রীব, পরবর্তীতে ততটাই অনাসক্তি। এদিকে মৈথিলীর বুনো রক্তে সব যেন নদীর মাতন লেগেছে। আনকোরা ঝাঁপ খুলে ফেলে ভিতরের শঙ্খচূড় মাথা তুলছে। শরীর নিয়ে সে রোজই নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা চালায়। আমার সক্রিয় সহযোগিতা না পেলে পলকে ফণা তোলে। যৌন সুখ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে, খিস্তিখেউড়ে উসকায়। আমি কেমন সংকুচিত হয়ে থাকি, বিপন্ন বোধ করি, মেয়েমানুষের মুখে খিস্তি শুনে মাঝেসাঝে লজ্জাও করে মাইরি! আমার বোলবোলা চুপসে যেতে থাকে। মনে মনে বলি, নারী হবে অবলা, আমি তার সাথে যথেচ্ছাচার করবো, সে থাকবে কুঁকড়ে, আমি তাকে আদেশ করবো, অথচ সে কিনা আমাকে চালনা করছে বিছানায়, কী কাণ্ড! আমি যদি শীৎকারে সম্মতি দিই, তবেই, নচেৎ সে স্পিকটি নট। মৈথিলীর এত বিছানা প্রীতিতে আমার মেজাজ খাপ্পা হয়ে থাকে। দেখেশুনে দুর্ভাবনা বেড়ে যায় মাইরি, প্রমাদ গুনি, উপেক্ষা অবহেলা পেলে, আর এ মেয়েমানুষকে চৌকাঠ টপকাতে দিলে কী কাণ্ডটাই না বেধে যেতে পারে। ব্যাপারটা আঁচ করে নজরদারির পাল্লা আরও বাড়িয়ে দিই।

    আমার শরীরও আর কথা বলছিল না তার নিজস্ব ভাষায়, রোদ না পাওয়া পাতার মতো স্যাঁতস্যাঁতে বিবর্ণ দশা, পর্যাপ্ত ইন্ধন জোগালেও পুরুষাঙ্গ সাড়া দেয় না চট করে। কাঁহাতক আর অভিনয়টা চালিয়ে যাবো। উড়ুক্কু মন অর্গল খুলে দেখতে চায় বাহারি দুনিয়ার রঙিন দৃশ্যাবলী। নিষিদ্ধ রোমাঞ্চ। পুরনো বান্ধবীদের কাছে কাঁদুনি গাইছি নিয়ম করে। ডবকা ছুঁড়ি হোক বা আলগা প্রৌঢ়া, রাস্তায় নামলেও চোখের কল্পনায় আশ্লেষে, চুম্বনে, গাঢ় কণ্ঠের ঝংকারে ভোগ করছি; সেই আবার আগের মতন। পুরুষ জনমের যন্ত্রণা বোঝা নারীর অসাধ্য। পুরুষ শালা আজন্ম ক্ষুধার্ত, আর তারই হাতের নাগালে সুস্বাদু, মুখে জল আনা মাংসপিণ্ডের ছড়াছড়ি। নারীর উর্বর পিচ্ছিলতায় এলোপাথাড়ি তুরপুন চালানোটা পুরুষের প্রাকৃতিক প্রোগ্রামিংয়েরই অংশ। সেই ক্ষুধা প্রবৃত্তি দমন করতে সভ্যতা, শিক্ষা এবং প্রবল ইচ্ছাশক্তির নিরন্তর অভ্যেস লাগে। সেই পরিমিত সংস্কৃতি আমার চায়ের পেয়ালা নয়। অপরাধ বোধ হলে, দোষখণ্ডন করতে আলেকালে এসব গা জোয়ারি আত্মপক্ষ সমর্থন উগড়ে দিতাম। সেসব শুনে অবশ্য ধুয়ে কাপড় পরিয়ে দিত মৈথিলী। বরাবরই।

    শুধু শরীর নই, যুক্তি বিচার ভাবনা সাহস এবং আধুনিকতা এর কোনটাতেই আমি মৈথিলীর সাথে এঁটে উঠতে পারিনি কোনকালেই। শরীরে প্রজ্বলিত আগুনশিখার তেজ কমে আসতেই এসব বিষয় যেন আরও বেশি করে আঁতে ঘা মারছিল আমার। মৈথিলী আমার সব সীমাবদ্ধতা মেনে নিলেও, আমি ওর এই উজ্জ্বল উপস্থিতি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। অবশ্য ওর থাকা নিয়ে বাইরে জুটেও গিয়েছিল দু চারটে। রাঁড়বাজি করেই উড়িয়ে দিচ্ছিলাম সর্বস্ব।

    মৈথিলী একদিন বলল, - তুমি যে অন্যত্র যাতায়াত করো, তা আমি জানি।

    ধরা পড়তেই আমার শরীরের সমস্ত রোঁয়া ফুলে উঠল রাগে। কোণঠাসা হয়ে তড়পে উঠলাম।

    - আমার আপত্তি নেই, তবে আমিও পার্টিসিপেট করতে চাই। আমার খিদেও আছে, এক্সপেরিমেন্ট করার ইচ্ছেও। ওর কণ্ঠস্বর বরফ শীতল।

    শুনেই সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল। পাগলের মত চিৎকার করে উঠলাম।

    মৈথিলীর মধ্যে তাতে অবশ্য বিন্দুমাত্র উদ্বেগ লক্ষ্য করা গেল না। সে নির্বিকার বলে গেল, - শোনো শরীর নিয়ে আমার কোন শুচিতা নেই। আমি তোমাদের সাথে যাবো, তুমি আমাদের সাথে। তোমার জন্য যা প্রযোজ্য, তা আমার জন্যও হবে না কেন!

    ‘আমাদের’! মাথায় বাজ পড়ল আমার। রাগে ভাষা হারালাম।

    বিদ্রোহ মাথা চাড়া দিচ্ছিল রোজই। যুক্তি তর্কে ল্যাজেগোবরে হয়ে আমার অবস্থাও বেশ সঙ্গিন। নিশ্ছিদ্র কারাগারের ঘুপচি ঘরে পারলে আটকে রাখতাম মাগিকে, ইচ্ছে করছিল বিষদাঁতগুলো নোড়া দিয়ে ভেঙে দিই, মুখে সেলোটেপ লাগিয়ে মুখ হাত পা বেঁধে ফেলে রাখি বিছানায়, কিন্তু কোথাও যেন একটা নৈতিক পরাজয় ঘটছে আমার, ভাবনাটা মাথায় এলেই গলা পর্যন্ত মদ ঢেলে নিই। তারপরই বুকের ভেতরটা সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে যায়, মাথায় ধোঁয়াটে অবসন্নতা। মেলা ভেঙে গেলে ফাঁকা মাঠে অবসানের যে নির্জনতা, আমার বুক জুড়ে তেমনই এক নির্জনতা থমথম করে প্রতিনিয়ত। মন বলছিল, একে আর আটকানো যাবে না হয়তো।

    সমস্ত রকম সতর্কতা জারি রেখেও মৈথিলীকে সত্যিই আটকানো গেল না, আমার আত্মবিশ্বাসকে সম্পূর্ণ তছনছ করবে বলেই নিজের পাওনা গণ্ডা বুঝে নিয়ে খাঁচার খিল খুলে একদিন চম্পট দিল পাখি। কষ্ট হয়েছিল যতটা, মানে লেগেছিল তার চেয়ে বেশি, অপমানবোধে ভিতরে একটা ছ্যাঁদা হয়ে রইল।

    আমারও রোখ চড়ে গেল। ভিতরের সেই দামাল নচ্ছার পুরুষটা তখনো কিন্তু একেবারে ফুরিয়ে যায় নি। সে অভিমানে কাতর হবে, ব্যর্থতার ক্ষীণ সুরে কথা বলবে, এমন ম্যাদামারা শিক্ষা আমিও তাকে দিইনি। যেখানে যাবি যা, এই বৈভব, এই ঐশ্বর্য, এই রাজকীয় আয়েশ, কে দেবে তোকে শালি! ফিরে তোকে আসতেই হবে। আমার বিছানায় রাত কাটিয়েছ, যতই তুমি উগ্র আধুনিকা হও, পরপুরুষের সামনে কাপড় খুলতে তোমার সাহসে কুলোবে না, সে আমি জানি। তাছাড়া কার এত হিম্মত আমার বিয়ে করা বউয়ের সাথে ভালোবাসা মাখবে।

    আমার এই প্রত্যাশা অবশ্য হাস্যকর প্রমাণিত হল। বাজারে হিম্মতওয়ালা পুরুষের কমতি নেই। বাপেরও বাপ থাকে। চিরকালই ছিল।

    সেই বাপের বাপই আমাকে বধ করবে। করুক। হাল ছেড়ে দিয়েছি, রণেভঙ্গ। এই গেরিলা যুদ্ধে এঁটে ওঠা আমার কম্ম নয়। তাছাড়া, মরতে আমার আর অতটাও ভয় নেই, তবে যন্ত্রণায় হাড়হিম ত্রাস রয়েছে। আমি যে খুন হতে পারি, এই ভাবনা আচমকাই যেদিন সম্ভাবনা রূপে প্রকট হয়েছিল, তার পর থেকে অবশ্য কটাদিন মাথা জুড়ে ছিল শুধু বেবাক অন্ধকার। আমি থাকবো না, তার পরেও রয়ে যাবে এ ধরণী, এই ভাবনাটাই অসুস্থ করে দেওয়ার পক্ষে কিছু কম নয়। অনেক সময়, যাকে ভয় পাই, তার চেয়ে ভয়ের চিন্তাটাই বড় হয়ে দাঁড়ায়। আমি অবশ্য বোধহয় জীবনকেই ভয় পেয়ে এসেছি এতকাল, না হলে তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখলাম কেন।

    মৈথিলী চলে যাবার মাসখানেক পরের ঘটনা, গিয়েছিলাম ইভনিং ওয়াকে। মদ খেয়ে যা চর্বি জমে, সন্ধের পর দৌড়াদৌড়ি করে তা ঝরিয়ে ফেলি। এ আমার বরাবরের অভ্যেস। সেদিন কী মরতে, ছুটতে ছুটতে গিয়ে পৌঁছলাম একেবারে এক বিজন প্রান্তরে। চওড়া রাস্তা পীরের মাজারে বাঁক নিয়ে উঠেছে খোলা মাঠে। দু পাশে ক্ষেত, মধ্যিখানে মোরাম বিছানো পথ, ধার বরাবর কিছু ছাড়া ছাড়া গাছপালা। আশেপাশে লোকালয় নেই বললেই চলে। আকাশে নধর চাঁদ, ফুরফুরে দখিনা বাতাস। দূরের মাঠঘাটে পাতলা কুয়াশার ছোপ। চমৎকার লাগছিল।

    কিছু সময় পর খেয়াল হল, একটা গাড়ির হেডলাইট আঁকাবাঁকা পথ বেয়ে এগিয়ে আসছে, এবং যেন একটু বেশিই সময় নিচ্ছে আমাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতে। একবার পিছন ঘুরে দেখলামও। তারপর রাস্তার আরও প্রান্ত বরাবর দৌড়তে লাগলাম। দামী গাড়ি, ইঞ্জিন শিকারি নিশাচরের মতো নিঃশব্দ। একেবারে কাছে এসে পড়ছে না, একটু দূরত্ব বজায় রেখেই গতি কমিয়ে অনুসরণ করছে। আর যেন সুবিধার ঠেকছিল না ব্যাপারটা। গতি বাড়ালাম। গাড়ির গতিও বাড়ল সমানুপাতে। ঠিক যখন ভাবছি, মাঠের আলপথে নেমে যাবো, গাড়িটা একটা আগ্রাসী জন্তুর মতো সাঁ করে এসে আমার গায়ের কাছে ব্রেক কষল, সামলানোর চেষ্টা করেও টাল খেয়ে পড়েছি পাশের জমিতে।

    অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় নেমে এসেছে এক দৃঢ়দেহী। একটা দানবিক হাত আমার গলাটা সাঁড়াশির মতো শক্ত হাতে চেপে ধরে পুরো শরীরটাকেই টেনে তুলে মুচড়ে গাড়ির পিছনের সিটে ঠেলে দিল। শব্দ করে বন্ধ হল দরজা। ধুধু করে জ্বলছে চোখমুখ। জিভে নোনতা স্বাদ।

    কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলাম না। কান মাথা ঝাঁ ঝাঁ করছে। স্নায়ু অবশ। কী হচ্ছে সে বিষয়ে তখনো সম্যক ধারনা নেই। চিরশত্রু আর শত্রুপক্ষের ছবিগুলো ঝলক দিচ্ছে মাথায়। কিন্তু কার এত সাহস! কোনক্রমে বলতে পারলাম, - কী চান কি আপনারা?

    কোন প্রত্যুত্তর নেই। কেবল শব্দ করে হাসলেন সামনের সিটে বসা চওড়া কাঁধের এক ভদ্রলোক। কৌতুক আর হেঁয়ালি ভরা হাসি। গাড়ির ভিতরের নিস্তেজ আলো আর উগ্র পারফিউমের গন্ধে মাথা ঝিমঝিম করছিল। কী মনে হতে, দরজার হাতলে চাপ দিলাম। খুলল না।

    আবার সেই গা জ্বালানো হাসি। শুনলেই মাথায় খুন চড়ে যায়।

    - খুব ভুল করছেন কিন্তু! ফ্যাসফ্যাসে গলাতেই এবার চেঁচিয়ে উঠলাম, - কী চান আপনারা?

    লোকটা আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে গর্জে উঠল, - চোপ শালা! একদম চোপ। কী দিতে পারবি তুই একটা সই ছাড়া?

    - মানে! কে আপনি?

    - তোর যম।

    - আপনাদের সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি। সব কটাকে পুলিসে দেবো আমি। কার সাথে লাগতে এসেছেন জানেন না!

    লোকটার কণ্ঠে সেই একই বেহায়ার হাসি। হাসিটা ধরে রেখেই তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, - পুলিশ! আমার নাম শুনলে পুলিশ মুতে ফেলে রে প্যান্টে। আর তুই যাদের পা চাটিস, তারাই আমার চটি সেলাই করে আনে।

    অন্ধকারে চোখটা সয়ে এসেছে আরেকটু। মাথাটাও সাফ হচ্ছে ক্রমশ। কে হতে পারে সেটা স্পষ্ট বুঝতে না পারলেও, সই এর কথাটা শোনা ইস্তক সন্দেহ হচ্ছিল। মৈথিলী? যাওয়ার কিছুদিন পর থেকেই সে ডিভোর্সের পীড়াপীড়ি জুড়েছে। যোগাযোগ হলেই একই কথার পাখিপড়া আবৃত্তি। আমি সোজা হাঁকিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু এত সাহস কি ওর হবে? এতটা সাহস? এই লোকটা কে, আর কেউ বা পাঠিয়েছে একে?

    আমার প্রশ্নগুলো যেন জিভের গোড়া থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে লোকটা। রুক্ষস্বরে বলল, - আমি কে, সে কথা শুনে তোর কোন লাভ নেই, শুধু এটুকু জেনে রাখ, ডিভোর্সের সই তোকে করতেই হবে।

    আশ্চর্য ছোটলোক তো। সমানে তুই তোকারি করে যাচ্ছে। আমার কেন জানি না মনে হচ্ছে এর পিছনে অন্য কোন উদ্দেশ্য রয়েছে।

    - আসল কথাটা বলুন, কী চাই আপনাদের? টাকা?

    - তুই দিবি টাকা! তোর মতো ছারপোকাকে টিপলে কত আসে? কোটি? বলেই হাসির ছররা ছোটাল সে। তারপর গলার স্বরটা ঝপ করে খাদে নামিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলছে, - বাঁচতে চাইলে মন দিয়ে শোন। মৈথিলী তোর মতন হাড় হারামির সাথে ওর নামটা আর জুড়ে রাখতে চায় না। আমি ওকে বিয়ে করবো। ভবিষ্যতে ইউরোপে সেটেল হব। কিছু আইনি জটিলতার জন্য বিয়েটা এখান থেকেই সেরে যেতে হবে। তোর হাতে দুটো অপশন। হয় ডিভোর্সে সাইন করবি, আর নয়তো অকালে মরবি। দুটো ক্ষেত্রেই তোর সাথে ওর নামটা আর জুড়ে থাকবে না।

    সম্পূর্ণ আকাশটাই যেন ভেঙে পড়ছিল মাথায়। পুরো অস্তিত্বই ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেছে। যথাসম্ভব স্বর অচঞ্চল রেখে বললাম, - ডিভোর্স! অসম্ভব! কিছুতেই দেবো না।
    লোকটা ক্রোধে ফেটে পড়ে জ্বলন্ত মুখ ঘুরিয়ে গলার নলি ছিঁড়ে চিৎকার করল, - তোর বাপ দেবে তো তুই কোন ছার। আর না হলে মরবি।

    আমার চেতনা জুড়ে তীব্র আশঙ্কা লাফিয়ে উঠছিল বারবার, তাও কড়া গলায় জানিয়ে দিলাম, - বেশ দেখা যাবে।

    একটা ইশারা মাত্র। বাইরের সেই দানব আমার চুলের মুঠি ধরে টেনে বের করে আমাকে ছুঁড়ে দিল বাইরে।

    চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করেছিলাম। না করেও উপায় ছিল না, আমার বিয়ে করা বউকে নিয়ে যাবে পরপুরুষে, আর সেটা দেখবো দাঁড়িয়ে, তাহলে আমি কেমন বীর্যবান! হেরে যাওয়ার ভয় থেকেই জন্ম নেয় ক্ষমতা প্রদর্শনের নিদারুণ ইচ্ছে, তাই কিছু একটা করতে না পারলে আমি যেন তিষ্ঠতে পারছিলাম না। হারার ভয়ই আমাকে ক্ষিপ্ত রাখছিল, তাড়িয়ে মারছিল প্রতিটা মুহূর্তে। মৈথিলীর সাথে যোগাযোগের লাগাতার চেষ্টা সত্ত্বেও বরফ গলল না। বরং ওর তরফ থেকে লোক মারফত জানিয়ে দেওয়া হল, আমার দিক থেকে কোনরকম বাড়াবাড়ি করলে তার ফল ভালো হবে না। একমাত্র, ডিভোর্সের সইয়ের জন্য প্রস্তুত হলে তখনই যেন যোগাযোগ করা হয়। নচেৎ বধূ নির্যাতনে ফাঁসতে পারি। আচ্ছা খ্যাঁচাকলে পড়েছি।

    এদিকে উপদ্রব থামছিল না। মোবাইলে লাগাতার মেসেজ আসছে অচেনা নাম্বার থেকে। পুলিশকে জানিয়েও লাভ হল না বিশেষ। এ যেন একটা ঘোস্টের পিছু ধাওয়া করা। কল ট্রেস করবে কি, সব নাম্বারই নাকি ভুয়ো।

    তাও আমার মন বলছিল, হয়তো সামলে নিতে পারব এ যাত্রা। যতটা গর্জেছে, ততটা বর্ষাবে বলে মনে হয় না। যতদূর মনে হয় ওটা শো-অফ, ফ্লুক। কিন্তু আবারো ভুল প্রমাণিত হতে হবে আমাকে। সদরের লক ভেঙে, গভীর রাতে হানা দিল আততায়ী। জানালা দিয়ে মেলাটোনিনের মতো কোনও ঘুমের ওষুধ স্প্রে করেছিল। সকালে কাজের লোক আমাকে নগ্ন অবস্থায় মেঝেতে আবিষ্কার করে। আমার টেবিলে রাখা ছিল ইঁদুর মারার বিষ, সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছিল গলায় দেওয়ার মতো একটা মোটাসোটা রশি, আর রান্নাঘরের একগুচ্ছ ছুরি-চপার ছড়ানো ছিল আমারই বিছানায়। খবরটা বাইরে চাউর হতে পারে, এই আশঙ্কায় কিছু টাকা পয়সা দিয়ে কাজের লোকের মুখ বন্ধ রাখতে হয়।

    একবার নয়, এ ঘটনা ঘটল আরও কয়েকবার। আমার অবস্থা যে কতখানি ভালনারেবেল, প্রায় অসহায়ই বলা চলে, সেটাই বুঝিয়ে দিচ্ছিল ওরা। ইচ্ছে করলে একবার নয়, আমাকে খুন করতে পারে রাতের পর রাত, এই ভাবনাটাই নিঝুম ও ম্রিয়মাণ করে দেওয়ার পক্ষে ছিল যথেষ্ট। প্রায় সময়ই দেখছিলাম মৃত্যুচিন্তা দখল করে রাখছে আমায়। প্যারানয়েডের মতো আচরণ করছি। সব মিলিয়ে প্রতিকূল আবহাওয়া আমার সাহসে অনেকটাই ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে ততদিনে।

    অথচ লোকটা অধরা, কে সেটাই জানি না। কোন আন্দাজও লাগাতে পারি না। পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে ঘোরতর। আমার যোগাযোগে সবচেয়ে প্রভাবশালী যিনি, সেই এমএলএ সাহেবকেই গোপনে সবটা খুলে বলতে তিনি আশ্বাস দিলেন সাহায্য করবেন। উপযাচক হয়ে মৈথিলীর সাথে তাঁর লোক যোগাযোগের চেষ্টা করতেই, এমএলএর বাড়িতে ভিজিলেন্সের লোক হানা দেয়। এই দুই ঘটনার মধ্যে যোগসাজশ ছিল কিনা আমার জানা নেই, তবে এর পর থেকেই খুব অদ্ভুত ভাবে আমাকে তিনি এড়িয়ে গেছেন বারবার। লোকাল নেতাদের ধরে করেও তেমন উপকার পাই নি। কেউ যে এক সাথে অনেকগুলো কলকাঠি নাড়ছে অদৃশ্য সুতোর টানে তা ধরতে পারছিলাম, কিন্তু নিজেকে উদ্ধারের একটা ট্যাঁরাব্যাঁকা রাস্তাও নজরে ঠেকছিল না। এই দুর্দিনে কে সাহায্য করবে ? সবাই এতদিন আমার শিকার ছিল, এবার আমি শিকার হব, সেটাই সবাই তালি বাজিয়ে দেখবে। উপায় ছিল একটা - কিন্তু ডিভোর্স যে আমি দেবো না। এই কট্টর সিদ্ধান্ত থেকে এক ইঞ্চিও পিছু হটব না। অহংকার, পৌরুষ, মুর্খামি, গোঁয়ার্তুমি, আত্মহনন - যাই হোক না কেন, এই ছিল আমার সিদ্ধান্ত।

    সুইসাইড নোট! লেখাই যায়। আমাকে যদি খুনও হতে হয়, তাহলে কর্তৃপক্ষ জানতে পারবে কে বা কারা আমার মৃত্যুর জন্য দায়ী। কিন্তু তারা খুনের শাস্তি পাবে কি? আমি তো তখন বয়ান অনুযায়ী আত্মহত্যা করেছি। তাহলে জবানবন্দী লিখব? আমি খুন হতে পারি এই মর্মে। নাকি সোজা থানায় গিয়ে পুলিশ প্রোটেকশন চাইব? কিন্তু এ বড় কঠিন ঘাট, সেই পুলিশই যে চোরাগোপ্তা ঘাতক, তারই বা কী গ্যারান্টি!

    এই সময়টাতে শুধু মৃত্যুচিন্তা নয়, নিঃসঙ্গতাও পেয়ে বসছিল আমাকে। ভেবে দেখলাম আমার কোথাও যাওয়ার নেই, দিন পার করে দেওয়া ছাড়া বেঁচে থাকার কোন যথাযথ কারণ নেই। আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে। বন্ধুদের সাথে দূরত্ব। দু একজন চামচা যাও বা ছিল, কটা মাসে তাদের সাথেও আলগা হয়েছে সখ্যতা। আর পাড়াতুতোরা তো এমনিতেই নাক সিটকোয়। ব্যবসাপাতি লাটে ওঠার অবস্থা। সুতরাং খদ্দেরের সাথেও চোখ চাওয়া-চাওয়ি নেই। এত একা, এতখানি বিচ্ছিন্নতা, তাও মনে হচ্ছিল, ভয়, নিঃসঙ্গতা, অবসাদ - এই তিনটে একযোগে আমার জীবনে চিরস্থায়ী হয়ে গেলেও হয়তো আমি মরতে চাইব না তখনো।

    আমার ডিফেন্স মেকানিজম কয়েকটা মাস আমাকে কুঁকড়ে রাখল, আটকে দিল ঘরের চার দেওয়ালে। চেষ্টাও করলাম হাজার একটা উপায়ে বেঁচেবর্তে থাকার। জল কিনে খেলাম। রাঁধলাম নিজ হাতে। চব্বিশ ঘণ্টার জন্য ফিট রইল মুশকো বিশ্বস্ত পাহারাদার। বাইরের দেওয়ালে গাঁথা হল সিসি ক্যামেরা। তারপর, এও যেন আরেক রেভিলিসন,আমি বেঁচে আছি একথা যেন অনুভব করছিলাম এই প্রথম, তাও আবার মৃত্যু আমার শিয়রে দাঁড়িয়েছে বলেই। এত অন্যমনস্ক হয়ে বেঁচে থেকেই বা কি প্রাপ্তি তাহলে! মৃত্যু ভয় না থাকলে, আমি কি আবার ফিরে যাবো সেই ‘খাওয়া-শোয়ার’ যাচ্ছেতাই ছাঁচে। আনমনা দিন বইয়ে দেওয়াট যুক্তিহীন ক্লান্তিকর, যদি না সে জীবনে মোটা দাগেরও একখান তাৎপর্য থাকে - এসব ভাবনাও আমার মনের অনুর্বর জমিতে আজকাল শিকড় মিলছে। জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি মৃত্যু কি, নাকি উদ্দেশ্যহীনতা! আমার কেমন যেন সব গুলিয়ে যাচ্ছে। কিছু মানুষ লক্ষ্যহীনতাকে পাখির চোখ করে তির মারে এবং লেগেও যায় সেই তির। আমি তাদের দলে। নিরাপত্তা আমার জীবনের অগ্রাধিকার এখন, এবং সে জীবন অতিশয়, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাপন করেও যা পড়ে থাকছে তা তীব্র বিবমিষা এবং দীর্ঘশ্বাসের যোগফল।

    তাছাড়া, আমার অনুপস্থিতি কেউ লক্ষ্য করবে বলে তো মনে হয় না। আমার মৃত্যু কারোর কাছে দুঃসংবাদ হয়ে পৌঁছবে, এমন মানুষ তো আমি খুঁজে পেলাম না এই কমাসে। অপরাধবোধ বা অনুশোচনা থেকে অনুধাবন নয়, এ নেহাতই অপ্রয়োজনীয় বা বাড়তি বলে নিজেকে চিনতে শেখা। কোথাও যেন হাল ছেড়ে দিয়েছি আমি, রক্তে মন্থররা চলে এসেছে, ঝিমিয়ে পড়ছে স্নায়ু। নিয়তির সীমারেখায় পৌঁছে এই ছক্কা পাঞ্জাকে মেনে নেওয়াটাই আমার কাছে এখন স্বাভাবিক। তাই খুনখারাপি নিয়ে এখন আমার আর তেমন মাথাব্যথা নেই, তবে সেই একই কথা, মৃত্যু যন্ত্রণায় অনীহা রয়েছে। আর আপত্তি আছে ডিভোর্স পেপারে সইসাবুদে। মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণে রাজি, তবে মৈথিলীর বয়ফ্রেন্ডের হুঁশিয়ারির সামনে মাথা নোয়াতে নারাজ। তাতে যা হবে হোক।

    সীতারামদাকে পাওয়া গেল না। ভরসন্ধ্যায় বাড়িতে থাকার মানুষ উনি নন। মিটিং, মিছিল, শিবির এবং সমাবেশ - একটা কোথাও আছেন নিশ্চয়! ওঁর জীবনে ল্যাঠা এবং আঠা এই দুইয়েরই যুগপৎ ব্যস্ততা। পরিবার এবং পরিজনে ডুবে থাকা পরোপকারী মানুষ। আমারই উচিৎ ছিল খবর দিয়ে আসা।

    সীতারামদা না থাকলে কী করবো, ভেবে দেখিনি এতক্ষণ। গেটের সামনে বোকার মতন দাঁড়িয়ে রইলাম কয়েকটা মুহূর্ত। মাথার মধ্যে বিচ্ছিন্ন চিন্তার অনর্গল প্রবাহ। এবং সেই চিন্তার মধ্যে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে মৃত্যু। মৃত্যু, যা আদপে আমাকে বাদ দিয়ে জীবনেরই একটা ধারাবাহিকতা মাত্র। আমি থাকবো না, বাকিরা থাকবে – এই দ্বিচারিতার মানে কী ?

    বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করছে না, কিন্তু যাই কোথায়? যাওয়ার গন্তব্যগুলো কবে যে এক এক করে মনের ম্যাপ থেকে মুছে গেল! তবে পা বাড়ালে, কোথাও একটা পৌঁছনটা নিশ্চিত। বাড়ির চেনা ঘেরাটোপের উদ্দেশ্যহীনতার জগতে ফিরলেই একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতার মতো শব্দগুলো ছেঁকে ধরবে।

    কিন্তু রাস্তায় রাস্তায় সন্ধ্যারাতে টহল দেওয়াটাও কি খুব কাজের কথা হবে? তাতে কী! মৃত্যুর চৌকাঠে বসে ঢুলছি, এখন আর প্রতিরোধের সময় নয়, বরং ঘুমের ঘোরে, ভিতরে গিয়ে হাত পা ছড়িয়ে শরীর শিথিল করাটা আবশ্যক। নচেৎ যন্ত্রণা হয়ে উঠবে আরও বিভীষিকাময়। বিপদকে উপড়ে ফেলতে না পারি, ভয়টাকে কিছুক্ষণের জন্য অবশ করে রাখি, তাতে সুবিধা সব দিকেই। যতটুকু জীবন পড়ে আছে, মৃত্যুভয়ে সেটাকেই বা অবজ্ঞা করবো কেন।

    এক আচ্ছা গ্যাঁড়াকলে পড়েছি! এত দীর্ঘ সময় বেঁচেও, মারা যেতে হবে একবারেই, কোনও কিস্তির গল্প নেই সেখানে। কী নাছোড়বান্দা নিয়ম।

    একটা গভীর শূন্যতার দিকে তলিয়ে যেতে যেতেই বেশ কিছুক্ষণ হাঁটতে শুরু করেছিলাম, জলতরঙ্গের মতো হাসির শব্দে মুখ তুলে তাকিয়েছি। চেনা বাড়ি। রমিতদের উপরতলা থেকেই শব্দটা ভাসছে। উপরের জানালায় তাকিয়ে রইলাম এক পলক। লাল নীল আলোর ঝালর নেমেছে বারান্দা বেয়ে। পায়ের গতি শ্লথ হচ্ছে আমার। দাঁড়ালাম। ভিতরে একটা খুশির বাতাবরণ, কোন অনুষ্ঠান চলছে। এককালে এ বাড়িতে খুব যাতায়াত ছিল। রমিতের সাথে পার্টনারশিপে একটা ব্যবসা শুরু করি। বছরখানেকের মধ্যেই ভরাডুবি হয় তাতে। আমি খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হইনি যদিও, লোকসানের পুরো ওজনটাই ওর ঘাড়ে নামিয়ে দিয়ে সময়মত সরে পড়েছিলাম। আমি যেন কেমন! ঘটনাক্রমে, আজ এই বাড়ির বাতাবরণে হাসির শব্দ শুনে ভালো লাগছে।

    শুধুই ভালোলাগা নয়, একেবারে অচেনা এক অনুভূতি। অস্তিত্ব লঘু হওয়ার তাগিদ, এমন কিছু যা আমি আগে কখনো অনুভব করিনি, মনে হচ্ছে আমার জীবনেও শব্দকল্লোল আছড়ে পড়বে, তবে তার সবটা জুড়ে শুধুই নীরবতা। কারণ, পরিপূর্ণ নীরবতা আসলে মৃত্যুরই শব্দ।

    সাপ যেমন আচমকা দংশায়, নিয়তি তেমনি আচমকা দংশেছে আমার সময়কে। প্রতিষেধক কী, জানা নেই। আছে কি আদৌ?

    মফঃস্বলের শেষ মাথায় একটা লেক। দোনামনা করেও ওদিকেই পা চালাচ্ছিলাম। আজ আমি বেপরোয়া। রাস্তার এক একটা বাঁকে, ঘাড় ঘুরিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে দেখে নিচ্ছিলাম সম্ভাব্য বিপদকে, তেমন কিছু সন্দেহজনক ঠেকলে লোকালয়ের দিকে সরে যাবো। মনে তো হয় না কেউ পিছু নিয়েছে, তবে এত মানুষ, কার যে কী মতলব, তার ঠাওর করাটা কি আর চাট্টিখানি ব্যাপার, নেহাতই অসম্ভব।

    প্রায় পুরো লেক চক্কর দিয়ে, পশ্চিম পাড়ের একটা অন্ধকার বেঞ্চে ঝুম হয়ে বসে রইলাম। সিদ্ধান্তটা হঠকারী হল কি? হলে হবে। নিজের গতিবিধির উপর সেন্সরশিপটা যেন অসহ্য লাগছিল আজ।

    লেকের অন্য দিকগুলো যদিও বিক্ষিপ্ত খণ্ড অন্ধকার, এখান থেকে সাদাকালো স্বপ্ন দৃশ্যের মতো মনে হয়। বায়ুচঞ্চল লেক থেকে হাওয়া উঠে আসছে ধীর লয়ে। সন্ধ্যার পর থেকেই এই দিকটায় অসহ্য নির্জনতা। রাতের পাখিরা মাঝেসাঝে খদ্দের ধরে শরীর মেলে দেয় বেঞ্চে। কিছু পাতা খোরদেরও সমাগম হয়ে থাকে। এ তল্লাটে বিপদ হলেও কেউ বাঁচাবার নেই। মোবাইলও নেই সাথে। পাড় বরাবর হিজল গাছের কালো গুঁড়িগুলো অন্ধকারে এক একটা অদ্ভুত চেহারা নিয়েছে। আলকুশি বীজের মতন নিবিড় অন্ধকার এদিকটায়। নিয়ন আলোর কিছু দুরন্ত রেখা লেকের জলে থিরিথিরি নাচছে।

    ওই আলো, আমার এই জম্পেশ অন্ধকারকে ছিঁড়তে পারছে না, পারবেও না। সেই যে বিড়ালকে ফাঁসিতে চড়ানোর কথা বলেছিলাম, মনে আছে? শিশুর মধ্যে যে সহজাত নৃশংসতা, সেটা এই বয়সে পৌঁছেও আমার ভিতর থেকে যায় নি বোধহয়, বরং সদর্পে বিরাজ করেছে। উই যেমন পাতি কাঠকে কুড়ে কুড়ে খায়, নির্বিবেক আমিটাকে তেমনি ঝাঁঝরা করে দিয়েছে আমার স্বভাব এবং চরিত্রদোষ। ক্ষুদ্র অন্ধকার খুঁজতে গিয়ে প্রকাণ্ড আলোর উৎস থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছি।

    নাহ! এখন দার্শনিক আত্মসমীক্ষা করেও আসন্ন বিপদকে আর টলানো যাবে না! তার চেয়ে ওঠা যাক। বেশ রাত হয়েছে। কি জানি বাড়ির সামনে গিয়ে আজ হয়তো সেই পাহারাদারের মুখোমুখি হতে হবে। হোক! মনে জোর আনতে হবে। আমার কিসের ভয়, নিজের পাড়ায় লাশ ফেলবে, চালাকি নাকি! সিগারেটটা প্রায় শেষ করে এসেছি, এবার উঠবো, এমন সময় কে যেন খুক করে কাশল। বুকের ভিতরে একটা হিমের ঢিল গড়িয়ে গেল। কে? কে আর হবে, দেখতে হবে না, সাক্ষাৎ যমদূত।

    এখানে আর একটা মুহূর্তও নয়, চটির গ্রিপ পায়ের আঙুলে শক্ত করে আঁকড়ে দ্রুত লম্বা পদক্ষেপে হাঁটা দিলাম। লেকের দু পাশে সারসার গাছপালা। সারা প্রাঙ্গণে ঝরা পাতার রাশি। খসখস শব্দ হচ্ছিল, কুকুর বিড়াল হলে বাঁচোয়া, মানুষেই বিপদ। পিছন ফিরে তাকাতেই মনে হল একটা ছায়ামূর্তি অসম্ভব ক্ষিপ্রতায় সরে গেল।

    লেক ছাড়িয়ে সামনের রাস্তাতে নেমেই ভেবেছিলাম একটা টোটো অন্তত পেয়ে যাবো। কপাল খারাপ, রাস্তা শুনশান। আজ অবশ্য রবিবার, আইপিলের ফাইনাল চলছে, অন্যবার হলে আমিও জুয়ায় টাকা লাগাতাম। এ বছর অবশ্য জীবনটাকেই জুয়াতে লাগিয়ে দিয়েছি।

    একটা টোটো হেলতে দুলতে আসছে, - এই চালাও! ঝাঁপিয়ে উঠে পড়েছি।

    - কোথায়?

    - থানায়।

    টোটো সামান্য এগিয়েছি কি একটু সাহস করে মুখ ফেরাতে দেখি, লেকের মূল ফটক থেকে একটা দশাসই মূর্তি এদিকেই তাকিয়ে। শিট! এগোতে শুরু করেছে লোকটা, ঠিক এদিকেই।

    আতঙ্কের গলায় বললাম, - এই ভাই! একটু জোরে চালাও। এর থেকে তো হেঁটে যাওয়া ভালো।

    - জোর চলবে না। চার্জ নেই। তাড়া থাকলে নেমে যান।

    আমি নামছি না! একা রাস্তায় মরার চেয়ে, টোটোয় বসে থাকা ঢের নিরাপদের। তাছাড়া এই মাত্র মনে পড়ল, আমার পকেটে কানাকড়ি নেই। পাঞ্জাবির পকেটে একটাই দশ টাকার নোট ছিল, চায়ের দোকানে দিয়ে ফেলেছি।

    ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার আর সাহস পাচ্ছি না, পিছু ধাওয়া যে করছে, সেটা না তাকিয়েও বলা যায়। বাজারের কোলাহলে পৌঁছতে এখনো কিছুটা সময় লাগবে। গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে রাস্তার আলো ছিটিয়ে পড়লেও, বাজারহাট বন্ধ বলে অন্য দিনের তুলনায় আজ একটু আলোআঁধারি।

    টোটোর স্পিড আরও নেমে এলো। জবাব দেবে মনে হচ্ছে। ছোকরা ড্রাইভার হুকুম ছুঁড়ল, - নেমে যান। চার্জ শেষ।

    - আগে বলবে তো! কী গাড্ডায় ফেললে বলো তো! অসহায় আস্ফালনে মাথা ঝাঁকাই।

    - পিছনে আরেকটা আসছে!

    কী করে বোঝায় এ শালাকে, ওটাতে চড়ে কালান্তক যম আসছে নির্ঘাত। শালা আচ্ছা ফাঁসলাম। নেমে যাওয়াটাই কী বুদ্ধিমানের কাজ হবে? সামনেই একটা অন্ধকার গলি। কিছুটা এগিয়ে কোথাও ঘাপটি মেরে থাকলে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কম। তাছাড়া এই টোটোর ছোঁড়া ওদেরই লোক নয়, তাই বা কী মালুম। কথাটা মাথায় টোকা দিতেই বুক চমকে উঠল। উপায় নেই, নামতেই হবে। ছোকরাকে নামার আগে আমার পকেটের অবস্থা জানাতেই ধমকে উঠেছে সে, - টোটোতে উঠেছেন পকেট খালি রেখে! যত্তসব!

    আগুপিছু না ভেবে গলির অন্ধকারে ঢুকে গেলাম। ঘাপটি মেরে আছি, যদি দেখি, পিছনের টোটো থেকে সত্যিই তেমন কেউ ওখানে নামছে কিংবা এই গলির দিকে ওই ছোকরা আঙুল দেখাচ্ছে, তাহলে প্রাণপণে দৌড় লাগিয়ে পগারপার, তারপর কোথাও একটা গা ঢাকা দিয়ে কিছুটা সময় কাটিয়ে দেওয়া। তবেই বাঁচলাম এ যাত্রা।

    বাঁচা কি এতই সহজ! যে প্লট রচনা হচ্ছে অলক্ষ্যে, আমার বাপ এলেও তা খণ্ডাতে পারবে না। দশাসই লোকটা শুধু নামেই নি, নিঃশব্দে গলির দিকেই এগিয়ে আসছে। ছ ফুট তিন চার ইঞ্চি তো হবেই, জলহস্তীর মতো অতিকায় অবয়ব, সাক্ষাৎ মনস্টার। আমার মাথাটা দু হাতে চেপে ধরলে ঘিলু কারোটি সমেত তাল-তোবড়া হয়ে যেতে পারে। আমার জানু দুটো কিছুক্ষণের জন্য পাষাণ হয়ে গিয়েছিল, সম্বিৎ ফিরতেই দৌড় দিলাম। কিন্তু যাবো কোথায়! কোন দিকটা মৃত্যুর আর কোনটাই বা জীবনের! আমার জন্য অবশ্য দুটোই এখন অন্ধকার। প্রভু আলো দাও! আর যদি তা না দাও, তাহলে যন্ত্রণাহীন মৃত্যু দিও।

    দৌড়ে কোথায় এসে উঠলাম কে জানে, এদিকটায় সব নতুন ঘরবাড়ি, আধুনিক মহল্লা। যেখানেই গিয়ে পৌঁছই, মনে হয় এখানটা নিরাপদ নয়, আরেকটু এগিয়ে যাই। এগোচ্ছি, তবে আততায়ীর থেকে দূরত্ব বাড়ছে না কমছে, তা আমার নিয়তিই বলতে পারে। পুরো পৃথিবীটাই আমার জন্য এখন আর নিরাপদ নয়। অবশ্য মানুষ বলেছে, আমিই নাকি পৃথিবীটার জন্য নিরাপদ ছিলাম না। একটা বসত বাড়ির খোলা প্রাঙ্গণে একটা ঝুপসি গাছের তলায় গুটিসুটি বসে রইলাম। ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত। শরীর অবসন্ন, তবে স্নায়ু টানটান। চোখ এবং কান দুইয়েরই পাল্লা বেড়ে গেছে যেন আচমকাই।

    অবিরাম ঢেঁকির পাড় পড়ছে বুকে। ভয়েরও কতরকম নমুনা। সবে গরম পড়ছে,সাপ খোপের বড় বেশি উপদ্রব এই সময়টাতে। তবে সাপের বিষে আমার মরণ নেই, এর চেয়েও বিষধর জিনিস কাটবে আমায়। প্রতিষেধক ছিল, একটা সই করলেই মামলা চুকেবুকে যেত, কিন্তু সে রাস্তায় আমি ঢেঁড়া কেটে দিয়েছি।

    ‘আউট’ বলে কেউ যেন হুঙ্কার ছাড়ল। পিলে চমকে উঠেছে। সাথে সাথেই জনাকয়েকের উল্লসিত কোরাস চিৎকার। সমবেত করতালি। গেল কেউ। কী মিল! আমিও আউট হয়ে গেছি জীবনের খেলা থেকে। মরা পিচ ছিল, সবাই সহজ শট খেলে সেঞ্চুরি হাঁকাল, আমি ট্যাড়া শটে ক্লিন বোল্ড। আম্পায়ারের দিকে তাকিয়ে আছি, যদি কোনভাবে নো বল হয়, তবে সে চান্স খুবই কম।

    একটা ঘোরের মধ্যে কতক্ষণ ওভাবে বসে ছিলাম হিসেব নেই। একটু আগেই দু চোখ জুড়ে শ্রান্তি নেমে আসছিল। চটকা যখন ভাঙছে আকাশে তখন আতশবাজির ঝলকানি। বুনো ফুলের গন্ধ রাতের ভেজা বাতাসে মিশে বুকের মধ্যে পাক দিয়ে যাচ্ছে।

    অবসন্নতার সংক্রমণ ছড়িয়ে যাচ্ছে মন থেকে শরীরে। তাও এবার উঠতেই হবে। লাইন এতক্ষণে ক্লিয়ার হয়ে যাওয়ারই কথা। তবে যে পাল্লায় পড়েছি লাইনের ফিশপ্লেট খুলে রেখে গাড়ি উল্টে দিলেও অবাক হব না! এত সংকল্প এবং প্রত্যয় নিয়ে নামলে মানুষ ঈশ্বরকেও হনন করে ফেলবে তো আমি কোন ছাড়।

    গলি এবং তস্যগলির গোলকধাঁধা টপকে মোড়ের মাথায় এসে দাঁড়িয়ে বুক ভরে শ্বাস নিলাম। একটা মিষ্টি হাওয়া ছেড়েছে। এক পশলা এসে লাগল চোখেমুখে। দূরে কোথাও বৃষ্টি হল এইমাত্র। এভাবে একটা বৃষ্টি এসে যদি ধুয়ে দিত আমার গ্লানি। বুকের ভিতরে একটা নির্ভরতার বাতাস যদি বয়ে যেত এভাবেই। জীবন থেকে এরকমও প্রত্যাশা ছিল আমার?

    আশ্চর্য!

    বড় রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষজন দেখে কিছুটা হলেও ফিরে পাচ্ছিলাম নিজেকে। ভিতরের চাপা উত্তেজনাটা আর যেন গুড়গুড় করে জানান দিচ্ছে না তার অস্তিত্ব। এই তো আমার চেনা পৃথিবী, এত প্রাণের চিহ্ন, এখান থেকে আজ আমাকে এই মুহূর্তে মুছে ফেলা সহজ হবে না। অন্তত আজকের রাতটা …আজকের রাতটাও যদি …পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটে ফেলেছি, দেশলাই বের করবো…ঠিক তখনই একটা ভৌতিক কণ্ঠস্বর ঘাড়ের কাছে শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে বলে উঠল -, লেকের ওই দিকটায় বসতে বেশ লাগে বলুন!

    শিরদাঁড়ায় একটা ভারী কিছুর অস্তিত্ব। ধাতব নলের স্পর্শ বোধয়। কাঠ হয়ে যাচ্ছি। বুকটা শূন্য। একটা ভয়ের বুদবুদ অস্তিত্বের নাভিমূল থেকে বুজকুড়ি কেটে উঠে আসছে। পিছনে তাকাব না আমি, কিছুতেই না। ওই যে কিছু পথচলতি মানুষজন, ওরাই এখন আমার স্বজন- আত্মীয়, আমার ত্রাতা ভরসা। শরীরের সর্বস্ব খরচ করে আমি ওদের মাঝেই ঝাঁপিয়ে পড়ব। চেতনার জড়তা সরে গেল করজোড়ে আর্জি জানাব, - মৃত্যুদূত সব বন্ধন থেকে আমার অস্তিত্বকে ছুটি দিতে চাইছে, আজকেই। আজকের রাতটা অন্তত আমাকে অনুগ্রহ করো তোমরা … অন্তত আজকের এই রাতে আমি খুন হতে চাই না। আজ অন্তত না। আমি কি পাবো তোমাদের সমবেত করুণা?
    একটি রাতের জন্যও?


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • গপ্পো | ১৯ এপ্রিল ২০২৪ | ৪০৩ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ২১ এপ্রিল ২০২৪ ১৩:০৬530849
  • দমবন্ধ করা গল্প।  কিন্তু পড়া শেষ হবার পরে কেমন হতাশ লাগল। 
  • Rashmita Sanyal | 2a0b:f4c2::21 | ০২ মে ২০২৪ ১৪:০৭531310
  •  এত নেগেটিভ গল্প লাখ খে কি হয়? ভাল লাগে নি।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন