ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  স্মৃতিচারণ  নস্টালজিয়া

  • চেনা মানুষ অজানা কথা - ১১  

    সুকান্ত ঘোষ লেখকের গ্রাহক হোন
    স্মৃতিচারণ | নস্টালজিয়া | ৩০ এপ্রিল ২০২২ | ৩৯০ বার পঠিত | রেটিং ৪ (২ জন)
  • বাঙালীরা আত্মবিস্মৃত জাতি সেই নিয়ে নতুন করে আর আক্ষেপ করতে চাইছি না – এ জিনিস এখন প্রমাণিত পুরোপুরি।  আমাদের আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের বেঙ্গল কেমিক্যাল ইত্যাদি নিয়ে অবদান তো আমরা প্রায় ভুলতে বসেছি! সেই নিয়ে তবুও কিছু আলোচনা হয় – কিন্তু কখনো তলিয়ে দেখেছেন কি যে প্রফুল্ল রায়ের সাথে পৃথিবী বিখ্যাত (এই আজকের দিনেও) নানা জিনিসের কি কি জড়িয়ে থাকা সম্পর্ক আছে? মানে এমনও বলা যেতে পারে যে প্রফুল্ল রায় না থাকলে ওই কোম্পানী বা প্রোডাক্টগুলি এত জনপ্রিয় হত না।  তেমন কিছুই পুরানো ঘটনা লেখার ইচ্ছে আছে – আজকের পর্ব থাকবে প্রফুল্ল রায়ের থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েই কিভাবে শ্যানেল কোম্পানী পারফিউম জগতে বিপ্লব ঘটিয়ে শ্রেষ্ঠ আসনটি দখল করে নিয়েছিল একসময়।    

    আর্নেষ্ট বো তখন হন্য হয়ে খুঁজছেন একটু অন্য ভাবে বানানো যায় এমন পারফিউম।  রাশিয়া থেকে বেরিয়ে এসে নিজের পিতৃভূমি ফ্রান্সে নিজের নাম কুড়িয়ে নিতে চাইছেন পারফিউম ডিজাইনার হিসাবে। কিন্তু নাম করতে হলে তো আগে এমন কিছু করে দেখাতে হবে যা অন্য কেউ দেখে নি!

    বিশেষত ফারফিউম মার্কেট যখন ফরাসী দেশে খুবই কম্পিটিশনের।  সবাই চেষ্টা করে যাচ্ছে নতুন কিছু বানাবার – নতুন ফুলের গন্ধ, নতুন ফলের সুবাস ইত্যাদি। মনে রাখতে হবে বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে তখনো কেমিক্যাল সিন্থেসিস করে পারফিউম বানানোর পদ্ধতি তেমন ভাবে জনপ্রিয় হয় নি। অনেক টেকনিক্যাল ডিফিকাল্টি ছিল – তাই মূলত ভেষজ ব্যাপার স্যাপার দিয়েই পারফিউম বানানোর কাজকর্ম সারা হত।  পারফিউম বানাতে তখন মূলত ব্যবহৃত হত ল্যাভেন্ডার, জেসমিন, চন্দন, নাটমেগ, দারুচিনি এই সব।  পারফিউমে প্রায় ৭৮ থেলে ৯৫ ভাগ থাকে ইথাইল অ্যালকোহল। আর বাকিটা থাকে ওই নানা সুগন্ধী এসেনসিয়াল ওয়েল।  সিন্থেটিক ক্যেমিক্যাল তখনো বাজার গ্রাস করে নি, যেটা আগেই লিখেছি – প্রায় সব কিছুই অর্গানিক উপায়ে বানানো হত। 

    যাঁরা পারফিউম নিয়ে বিশেষ নাড়াচাড়া করেন নি, তাঁদের জন্য জানিয়ে দেওয়া যাক, পারফিউম সাধারণত ডিজাইন করা হয় তিনটি নোট দিয়ে।  প্রথমেরটা হল ‘টপ’ নোট – এই নোটে পারফিউমে মিশে থাকা সুগন্ধ সবচেয়ে তাড়াতাড়ি বাষ্পীভূত হয়, এর পরে আছে ‘হার্ট’ নোট – এই পর্বে সুগন্ধ বাষ্পীভূত হয় পরের কিছু ঘন্টা ধারে, আর সবশেষে আসে ‘বেস’ নোট, এই নোটের সুগন্ধ সারাদিন থেকে যাবে। সেই অর্থে বলা যায়, বেস নোটই ঠিক করে দেয় পারফিউমের স্থায়ীত্ব এবং হয়তবা জাতও।  ভালো বেস নোটের পারফিউমের দামও অনেক।    

    আর্নেষ্ট বো একটা সমীক্ষার কথা ভাবলেন।  এতো আর মডার্ণ দিন নয় যে ইন্টারনেটে সমীক্ষা ছেড়ে দিলেন। তখনকার দিনে সমীক্ষা মানে ‘লেগওয়ার্ক’ যাকে বলে। নিজেকে (বা নিজের দল থাকলে) খেটে খুঁজে নিতে হবে।  বো তখন রাশিয়ায় থাকতেন – উনার টিম বলে তেমন কিছু ছিল না। তাছাড়া এই সব টপ সিক্রেট ব্যাপার – কে ভিতর থেকে খবর ফাঁস করে দেবে, তখন রিসার্চটাই মাটি! বো তাই নিজেই সমীক্ষা চালাবেন ঠিক করলেন।  উনার ইচ্ছে ছিল যে মেয়েদের জন্য কিছু পারফিউম বানাবেন যা একেবারে নতুন, ফুল – মৃদু – এই সব প্রচলিত ছকের থেকে একদম বাইরে।  তাই ঠিক করলেন এক পুরুষালি পারফিউম বানাবেন যা মেয়েরা পছন্দ করবে। কিন্তু পুরুষালি গন্ধ মানে ঠিক কি?
    তখন বছর পনেরো হল আইফেল টাওয়ারের উদ্বোধন হয়ে বিশাল জনপ্রিয় হয়েছে। নানা দেশে থেকে লোকজন ভেঙে পড়ছে আইফেল টাওয়ারের প্রাঙ্গণে।  বো ভাবলেন এইখানে ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে সমীক্ষা চালাবেন – কিন্তু সম্ভ্রান্ত মহিলাদের কাছে তো আর দুম করে অ্যাপ্রোচ করা যায় না এই জিজ্ঞেস করতে যে, “কেমন পুরুষালি গন্ধ আপনাদের পছন্দ”! তবু বো কিছু কিছু সাফল্য পেলেন সমীক্ষায় – কিন্তু সেগুলো এনাফ ডাটা নয়। বো তখন ঠিক করলেন যে প্যারিসের নিষিদ্ধ পল্লীর মেয়েদের কাছে গিয়ে সমীক্ষা চালাবেন।  এখান থেকে পেলেন অনেক ডাটা – প্রায় একমাসের সমীক্ষা শেষে তিনি প্রাপ্ত উত্তরগুলি বিশ্লেষণ করে এক ট্রেন্ড লক্ষ্য করলেন।  অনেক মেয়েই বলেছেন ছেলেদের গায়ের ঘেমো গন্ধ-তে তারা নাকি আকৃষ্ট হয়! এত গন্ধ থাকতে ঘেমো গন্ধ কেন? আরো গভীরে সাইকো অ্যানালিসিস করে বো দেখলেন যে প্যারিসে বছরের বেশীর ভাগ সময়ই এমন আবহাওয়া যে গায়ের ঘাম হবার প্রশ্নই নেই! একদম ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব – তাই সেই ভাবে দেখতে গেলে ঘামের গন্ধ বেশ দুষ্প্রাপ্য জিনিস।

    ব্যাস ঠিক করে ফেললেন বো যে কি বানাবেন - ঘেমো গন্ধের ফারফিউম।  কিন্তু কোন প্রাকৃতিক ফুল বা ভেষজ থেকে এমন জিনিস নিষ্কাষণ করা যাবে তা জানা ছিল না।  প্যারিস থেকে রাশিয়া ফিরে গিয়ে গোপনে নিজের বাড়ির ছোট্ট রিসার্চ ল্যাবে পরীক্ষা চালাতে লাগলেন বো।  দুই বছর টানা কাজ করেও কিচ্ছু এগুতে পারলেন না।  ক্রমশঃ তিনি অ্যালকোহলে আসক্ত হয়ে গেলেন – এমন সময় বোর এর সাথে আলাপ হয়ে যায় অন্য এক ইউরোপিয়ান মহিলা তেমনই এক পাবে বসে। সেই মহিলার কি নাম সেই নিয়ে আর ভেবে লাভ নেই এখন – সেই মেয়ে অনেক ভাষায় পারদর্শী।  বো-এর কাছে সে পরিচয় দিয়েছিল স্কটল্যান্ডের মেয়ে বলে – তার বাড়ি নাকি এডিনবারা! পরে দেখা যায় এই সবই ভুয়ো তথ্য! এবং সেই মেয়ে আসলে এক গুপ্তচর – কেন সে বো-এর পিছনে লেগেছিল, তারও একটা ব্যাখ্যা পাওয়া গিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কালে – কিন্তু সেই গল্পের জায়গা এই লেখা নয়। অন্য কোন সময় এই নিয়ে লেখা যাবে – এটুকু হিন্টস দিয়ে রাখি, যেই মেয়ে পারফিউম মেকার বো-র পিছনে লাগে নি।  সে সন্ধানে ছিল ‘কেমিষ্ট’ বো-এর।  কেমিষ্ট্রি নলেজ দিয়ে শুধু পারফিউম-ই বানানো যায় তাই নয়, ‘বোমা’ বলে আরো একটি জিনিসও বানানো যায়!

    যাই হোক, বো-এর তখন পাগল পাগল অবস্থা।  কিছুদিন পরে জীবন থেকে একদম হাপিস হয়ে যায় মেয়ে – তাকে খুঁজতেই স্কটল্যান্ডের এডিনবারা শহরে হাজির হন আর্নেষ্ট বো ১৯১২ সালে।   আপনারা অনেকে ভাগ্যের- ব্যাপারটা হয়ত বিশ্বাস করেন না।  কিন্তু আমাদের অন্তরালে থেকে নিশ্চয়ই কেউ কিছু করছেন – নাহলে ভাবুন বো এই ভাবে এডিনবারা শহরে হাজির না হলে না হত তাঁর সাথে প্রফুল্ল রায়ের দেখা, আর না আসত পারফিউম জগতের রূপান্তর। 

    প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এর জীবনী আর নতুন করে বাঙালীর কাছে কি বলব – সে মায়ের কাছে মাসির গল্প হয়ে যাবে! তবু হালকা খেই ধরিয়ে দেবার জন্য বলি প্রফুল্ল রায় ১৮৮৩ সালে এডিনবারা (এডিনব্রা বা এডিনবার্গ বলেও চালাতে পারেন) বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিষ্ট্রি নিয়ে পড়ার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন ‘গিলক্রীষ্ট’ স্কলারশিপ নিয়ে।  ১৮৮৭ সালে তিনি পান ডি-এস-সি (D.Sc.) ডিগ্রী সাথে ‘হোপ প্রাইজ’, ‘ফ্যারাডে মেডেল’ সহ নানাবিধ নামকরা পুরষ্কার।   তারপর দেশে ফিরে রিসার্চ টিসার্চ করে তো এলাহী ব্যাপার।  নাইট্রেট সল্ট নিয়ে রিসার্চ করে তিনি এত বিখ্যাত হয়ে গেলেন যে তাঁর নাম দেওয়া হল “মাষ্টার অফ নাইট্রেট”।  তবে অনেকেই যেটা জানেন না তা হল, খাবার দাবারের উপরে প্রফুল্ল রায়ের দুর্বলতা।  ১৮৯৩ সালে তিনি লিখেছিলেন ভারতের মধ্যে খাবার দাবার নিয়ে প্রথম রিসার্চ পেপার “On the Chemical Examinationof Certain Indian Food Stuffs; Part-I— Fats and Oils” । 

    বেশী ডিটেলসে ঢুকতে চাইছি না, কিন্তু জাষ্ট বলে নিই, উপরের উল্লিখিত পেপারের সাথে জড়িয়ে আছে প্যারামাউন্ট সরবতের বেশ কিছুটা ইতিহাস।  কলেজ স্ট্রিটের প্যারামাউন্ট দোকানটির পরিচয় আপনাদের নতুন করে কিছু দেবার নেই – আজ প্রায় ১০৫ বছর ধরে এ টিকে আছে! এখনো সমান জনপ্রিয় এদের ডাবের সরবত, রোজ, স্ট্রবেরী, ম্যাঙ্গো সহ নানাবিধ সরবত।  কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি কখনো যে শুধু সরবত বেচে একশো বছরের বেশী সময় ধরে টিকে থাকার রহস্যটা কি এদের? জিজ্ঞেস করে দেখতে পারেন দোকানে যাঁরা বসে থাকেন বা চালান তাঁদের – একগাল হাসি ছাড়া কিছু পাবেন না! আপনি কি ভাবছেন ডাবের বা আমের সরবত যেটা খাচ্ছেন সেটা শুধুই ডাব আর আম থেকে পাওয়া! কিছুই আলাদা করে মেশানো হয় না! অবশ্যই মেশানো হয় – আর যেটা মেশানো হয় সেটাই সিক্রেট, সেটাই আলাদা করে প্যারামাউন্ট থেকে অন্য সরবতের দোকান-কে। সেই সব সিক্রেট কেমিক্যাল যা  মেশানো হয় তা সবই প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের ফর্মুলেশন।  বাঙালীর ব্যবসা নিয়ে প্রফুল্ল রায়ের অবশেসন আপনারা সবাই জানেন – তা সেই হেতু বন্ধুকে ব্যবসায় হেলপ করতে গিয়ে প্রফুল্ল রায় বানিয়ে দেন এই সব সিক্রেট রেসিপি।  বন্ধুও ভুলে যান নি প্রফুল্ল রায়ের অবদান – আজকের দিনে যেটা রাজাবাজার সায়েন্স কলেজ, সেই আমলে প্রফুল্ল রায়ের সেখানকার অফিসে ঠিক দুপুরে পৌঁছে যেত দুই গ্লাস করে সরবত – একটা সেই ডাবের সরবত মাষ্ট, অন্যটা সিজিন্যাল।    

    যাই হোক ১৯১২ সালের কথায় ফিরে আসা যাক।  সেবারে তৃতীয় বারের জন্য ইংল্যান্ড যান প্রফুল্ল রায়।  এডিনবাবা ইউনিভার্সিটি-তে কি সব সেমিনার এবং আলোচনা ছিল।  সেদিন কাজ শেষ করে বেরিয়ে খুব চা তেষ্টা পেয়ে গেল প্রফুল্ল রায়ের।  এডিনবারাতে শুধু চায়ের দোকান পাওয়া খুব চাপের – সামনের এক বার-এ ঢুকে জিজ্ঞেস করলেন সেখানে কফি সার্ভ করে কিনা ওরা।  হ্যাঁ বললে, তিনি তখন জিজ্ঞেস করলেন কফি পাওয়া গেলে, চা-ও পাওয়া যাবে কিনা? ইংল্যান্ডে তখন চা পান বেশ বেশ জনপ্রিয় হয়ে গেছে। প্রফুল্ল রায়কে অবাক করে এই পাব মালিক বলল চা পাওয়া যাবে।  পাবে বসে প্রফুল্ল রায় তাঁর ব্যাগ থেকে বের করলেন ড্যানিয়্যাল অলিভারের ১৮৬৯ সালে লেখা বই “ফার্ষ্ট বুক অফ ইন্ডিয়ান বোটানি” – কারণ তিনি তখন হাত দিয়েছেন ভারতীয় ভেষজ ইত্যাদি নিয়ে কিছু গবেষণায়।  একমনে পড়তে পড়তে চা-য়ে চুমুক দিচ্ছেন, এমন সময় শুনলেন এক সাহেব জিজ্ঞেস করছে, “উড ইউ মাইন্ড ইফ আই জয়েন ইউ”।  সেই সাহেবই হলেন বো।

    সেই পাবে পাশের টেবিলে বসে বো বিয়ার পান করছিলেন।  আগে যেমন লিখেছি, কোন ভেষজ থেকে ঘেমো গন্ধ বের করা যেতে পারে সেই সমস্যার সমাধান তিনি করতে পারেন নি।  পাশের টেবিলে প্রফুল্ল রায়-কে ভারতের গাছাপালা নিয়ে বইটা খুলতে দেখে বো বেশ উৎসুক হয়ে পড়েন।  তারপর টেবিলে বসে আলাপ করে বো তো খুবই খুশী – বুঝতে পারলেন যদি কেউ হেল্প করতে পারে তাহলে এই ভদ্রলোকই। সেই থেকেই তিনি প্রফুল্ল রায়-কে ডাকতে শুরু করেন ‘রে-স্যার’ বলে। 

    বো তাঁর পারফিউম রিসার্চের ব্যাপারটা খুলে বললেন প্রফুল্ল রায়কে – এবং সাথে এও জানালেন ঘেমো গন্ধ নিয়ে তাঁর স্ট্রাগলের কথা। আর জানতে চাইলেন এমন কোন ভারতীয় ভেষজের কথা জানা আছে কিনা যেখান থেকে ঘেমো গন্ধ নিষ্কাষণ করা যাবে?

    প্রফুল্ল রায় বললেন, “দেখো মানুষের ঘামের গন্ধের হবে এমন কোন ভেষজ তো আমার জানা নেই। কিন্তু আমাদের দেশে ‘অশ্বগন্ধা’ বলে একটা গাছ আছে যার পাতা সেদ্ধ করলে ঘোড়ার মূত্রের মতো গন্ধ বেরোয়।  এই গাছের বিজ্ঞান সম্মত নাম “উইথানিয়া সোমনিফেরা (এল) ডুনাল”।  তুমি এখান থেকে একট্রাক্ট বের করে ডায়ালিউট করে দেখতে পারো। 

    বো তো বিশাল উৎসাহী হয়ে পড়লেন – প্রফুল্ল রায়-কে জিজ্ঞেস করলেন,
     
    - রে-স্যার, তাহলে এই গাছ ভারত ছাড়া আমাদের এদিকে কি পাওয়া যাবে?
    - দ্যাখো, সূর্যালোক ও আংশিক ছায়া জায়গায় শুষ্ক পাথুরে মাটিতে অশ্বগন্ধার উৎপাদন ভালো হয়। আমার জানামতে ভারত ছাড়া নেপাল, চীন এবং ইয়েমেন এ পাওয়া যায়।

    তখন প্রায় গোটা আফ্রিকাটাই ফরাসীদের দখলে – সেই আফ্রিকার উত্তর পূর্ব দিকে নৌকা করে টুক করে পেরিয়ে গেলেই ইয়েমেন।  বো ব্যবস্থা করে ইয়েমেন থেকে নিয়ে এলেন অশ্বগন্ধার চারা।  নিয়ে এসে ফরাসী দেশের দক্ষিণ দিকে যেখানে রোদ, গরম আছে তেমন জায়গায় চাষ করলেই সেই গাছ নিজেই বাগান করে।   
     
    মনে রাখতে হবে বো তখনো রাশিয়ায় কাজ করছেন, কিন্তু তলে তলে ফ্রান্সের মার্কেট বুঝে চমক লাগিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন।  ১৯১৩ সালে অশ্বগন্ধা গাছ হাতে পেয়ে বো চালু করলেন তাঁর গবেষণা আবার পুরোদমে।  সমস্যা হলেই চিঠি পাঠাতেন প্রফুল্ল রায়-কে, তিনি দিতেন পরামর্শ।  প্রথমত অশ্বগন্ধা গাছগুলি বিদেশী আবাহাওয়ার সাথে পুরোপুরি মানাতে করতে পারছিল না, তাদের পুষ্টির অভাব হচ্ছিল।  প্রফুল্ল রায় পরামর্শ দিলেন গোবর সার ব্যবহার করতে – সেই পরামর্শ কাজে দিল।  প্রথম অশ্বগন্ধা গাছ নিষ্কাশনে বো যা পেলেন তাতে প্রচুর মুতের গন্ধ।  চিঠিতে জানালে প্রফুল্ল রায় উত্তর দিলেন, “তোমাকে তো বলেছিলামই যে পুরো ঘোড়ার মুতের মত গন্ধ হবে! তুমি এক কাজ করো, পাঁচ ফোল্ড মতন ডায়ালিউট করো (মানে এক ভাগ খাঁটি অশ্বগন্ধা নিষ্কাশন নিয়ে বাকি চার ভাগ জল), আর সাথে কিছু দারুচিনি, এলাচ আর কিছুটা মারকিউরাস নাইট্রেট মিশিয়ে দাও”।  দারুচিনি, এলাচের বা মারকিউরাস নাইট্রেট পরিমাণ ঠিক বলে দেন নি প্রফুল্ল রায়।  বো-এবার রিসার্চে বসলেন – পাঁচ ভাগ ঘনত্ব মাপটা ঠিক রেখে তিনি দারুচিনি, এলাচের আর মারকিউরাস নাইট্রেট পরিমাণটা ব্যালেন্স করলেন।  এইভাবে একদিন যখন তাঁর মনে হল ঠিক ঠাক দাঁড়িয়েছে  - আবার ফিরে গেলেন প্যারিসের নিষিদ্ধ পল্লীর সেই মেয়ে গুলির কাছে। তাদের জিজ্ঞেস করলেন এই নতুন পারফিউম কেমন লাগছে তোমাদের – তারা তো প্রায় পাগল সেই গন্ধ শুঁকে।  বো বুঝতে পারলেন যে তিনি পেয়ে গেছেন যা খুঁজছিলেন এতদিন!   

    ১৯২০ সালে অবশেষে আর্নেষ্ট বো সুযোগ পেলেন ক্যান শহরে গ্যাব্রিয়েল কোকো শ্যানেলের সাথে সাক্ষাতের।  সেখানে গোটা ঘটনাটা কোকো শ্যানেল-কে খুলে বললেন বো।  সাথে করে আনা স্যাম্পেল ও একটু শোঁকালেন কোকো শ্যানেল-কে।  শ্যানেল তাঁর তীক্ষ্ম ব্যবসা বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারলেন যে এ জিনিস আগে কেউ কখনো দেখেনি বা শোঁকেনি।  ভিতরে ভিতরে তিনি প্রবল উত্তেজিত হলেও মুখে প্রকাশ করলেন না।  শুধু বললেন, পুরোপুরি কমার্শিয়াল ভাবে এই পারফিউম লঞ্চ করার আগে তিনি তাঁর সেরা ক্লায়েন্টদের কাছে এটা প্রচার করে দেখতে চান তাঁদের ফীডব্যাক কেমন।  সবাই প্রবল প্রশংসা করল সেই পারফিউমের।  এবার কোকো শ্যানেল জিজ্ঞেস করলেন যে বো কি নাম রাখতে চান পারফিউমের।

    বো অকৃতজ্ঞ ছিলেন না – তিনি চেয়েছিলেন পারফিউমের নামের সাথে যে প্রফুল্ল রায়ের ছোঁয়া লেগে থাকে।  কিন্তু তার আগে প্রফুল্ল রায়ের পারমিশন নেওয়া প্রয়োজন। তাই বো কয়েক মাস সময় চেয়েনিলেন কোকো শ্যানেলের কাছে। ভারতে চিঠি লিখে তার উত্তর পেতে কিছু সময় তো লাগবেই! কিন্তু প্রফুল্ল রায় রাজী হলেন না – তিনি বললেন, “আমি শুধু তোমাকে আইডিয়া দিয়েছি।  খেটেছো তুমি। তাই আমার নাম জড়াতে হবে না।  এ আসলে রসায়নের জইয়। তাই আমার মতে তুমি এমন নাম রাখো যাতে রসায়নের কোন ছোঁয়া থাকে সেই পারফিউমে।  যেহেতু অশগন্ধা পাঁচ ফোল্ড ডায়ালিউশন দিয়ে তুমি এই ফর্মুলেশনটা বানিয়েছো, তাই নামে পারলে পাঁচ নম্বরটা রেখে দাও”।

    বো সেই ভাবে “D 5” (এখানে D মানে ডায়ালিউশন) নাম  ঠিক করে নিয়ে গেলেন কোকো শ্যানেল এর কাছে। এমন নামকরণের পিছনের কারণ জিজ্ঞেস করলে বো ব্যাখা করলেন।  সব শুনে শ্যানেল বললেন যে, “দ্যাখো কেমেষ্ট্রী দিয়ে পারফিউম মার্কেটিং করা খুব চাপের।  তার থেকে ভালো হয় এক গল্প তৈরী করতে পারলে।  এই “D 5” বদলে বরং আমরা নাম রাখি N°5 ।  আমি বলব যে তুমি যে ছয়টা ফর্মুলেশন নিয়ে আমাকে অ্যাপ্রোচ করেছিলে তার মধ্যে পাঁচ নম্বরটা আমার পছন্দ হয়েছিলেন, আর সেই থেকেই এই নাম”।

    তো সেই হল – প্রবল ঘটা করে ১৯২১ সালে উন্মোচিত হল অশ্বগন্ধা গাছের নির্যাস দিয়ে বানানো শ্যানেলের সেই বিখ্যাত পারফিউম ।  শ্যানেল নম্বর ৫ পারফিউমকেই সেই তকমা দেওয়া হয় যেটা বানাতে প্রথম সিন্থেটিক ফরমুলেশন (মারকিউরাস নাইট্রেট) ব্যবহার করা হয়েছিল।   

    এর পরের ঘটনা আর নতুন করে লেখার কিছু নেই। শ্যানেলের পারফিউমের জয়যাত্রা সেই শুরু – এখনো পৃথিবীর প্রথম সারির পারফিউম বিক্রেতা হিসেবে এদের নাম।  প্রফুল্ল রায় একদিন ডাকযোগে হাতে পেয়েছিলেন CHANEL N°5 এর একটি বোতল। কিন্তু এর গন্ধের ইতিহাস জেনে আর সেই বোতল খোলার সাহস পান নি!  

  • | রেটিং ৪ (২ জন) | বিভাগ : স্মৃতিচারণ | ৩০ এপ্রিল ২০২২ | ৩৯০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • শিবাংশু | ০১ মে ২০২২ ০৮:৩৪507050
  • আরে বাহ, 
    এতো রীতিমতো রিসার্চ পেপার ...
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন