ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  স্মৃতিচারণ  নস্টালজিয়া

  • চেনা মানুষ অজানা কথা - ৬

    সুকান্ত ঘোষ লেখকের গ্রাহক হোন
    স্মৃতিচারণ | নস্টালজিয়া | ০১ মার্চ ২০২২ | ৭৪১ বার পঠিত | রেটিং ৪.৩ (৪ জন)
  • আর কয়েকদিন পরেই আই পি এল শুরু হবে – এবারেও ওয়েষ্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটার আন্দ্রে রাসেল-কে কোলকাতা নাইট রাইডার্স দলে রেখে দিয়েছে।  বেশ কয়েক বছর এই টিমে খেলে রাসেল তো কোলকাতার প্রায় ঘরের লোক হয়ে উঠেছে! তবে অনেকের একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে – অনেকেই ভাবেন যে আই পি এল খেলা থেকেই রাসেলের সাথে কোলকাতার সম্পর্ক শুরু! এটা পুরোপুরি সত্যি নয় – আই পি এল খেলার অনেক বছর আগে থেকেই রাসেলের কোলকাতা প্রীতি শুরু।  আজকে সেই গল্পটাই বলি –

    সেবারে ওয়েষ্ট ইন্ডিজ আন্ডার-১৯ ক্রিকেট টিমের সাথে ভারতে খেলতে এসেছিল রাসেল।  ট্যুরের প্রথম দিকের ক্যাম্প এবং পরের শুরুর ম্যাচ হয় ইডেনে।  সেই প্রথম রাসেলের ভারতে আসা।  আজকাল ক্রিকেটাররা বেশীর ভাগই তাজ বেঙ্গলে ওঠে, কিন্তু তখনও ধর্মতলার গ্র্যান্ড হোটেল বেশ জনপ্রিয় ছিল।  আর তা ছাড়া আন্ডার-১৯ টিমের ক্রিকেটারদের কেউ চেনেই না তেমন – তাই গ্র্যান্ড হোটেলের বাইরে বেরুলেই যে পাবলিক ঘিরে ধরবে এমন অবস্থা ছিল না।  ওয়েষ্ট ইন্ডিজ টিম সেবার ছিল এই হোটেলেই।
       
    এমনিতে ওয়েষ্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট টিমের আগের দিনের বিখ্যাত খেলোয়াড়রা কেউই খাবার সময় ডায়াট, বা আধুনিক পদ্ধতিতে ট্রেনিং এই সবের ধার ধারে নি। কিন্তু আজকাল দিন বদলেছে – তাই রাসেল-দের ডায়াট চার্ট ছিল খুব স্ট্রিক্ট।  একদম মেপে জুপে খাওয়া – কিন্তু এক আঠেরো বছরের ছেলে প্রথম বারের জন্য কোলকাতা এসে ধর্মতলায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর আশে পাশের কোন খাবার দ্বারা প্রলুব্ধ হচ্ছে না, এমন হলে এক বিষ্ময়কর ব্যাপার হবে!

    হোটেলের রেষ্টুরান্টের বোরিং মাপাজোপা খাবার খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে এই ভাবেই একদিন ধর্মতলার ছোলে-বাটোরা-র প্রেমে পড়ে গেল রাসেল। হয়েছে কি একদিন বিকেলে প্র্যাক্টিস থেকে ফিরে হোটেলের বাইরে একটু ঘুরতে বেরিয়েছে, একটা দোকানে দেখে লোকজন বিশাল ফুলো ফুলো বান্-এর মতন কি খাচ্ছে! ইন্টারেষ্ট লেগে গেল রাসেলের – জয় মা বলে ঢুকে পড়ল দোকানে, আঙুল দিয়ে দেখালো যে ওই খাবার তার চাই।  দোকানে যে ক্যাশে বসেছিল সে অনেক কষ্টে ভাঙা ভাঙা ইংরাজীতে জানালো যে ওই খাবারের নাম “ছোলে-বাটোরে”।  ব্যাস, সেই খাবার খেয়ে রাসেল ফিদা! নামটা মুখস্ত করে নিল কয়েকবার আউড়ে নিজের মনে মনেই।

    এর দু-দিন পরের কথা।  আগের দিন ম্যাচ শেষ হয়েছে বলে সেদিন সকালে প্র্যাক্টিসের ছুটি।  টিমের সবাই বেশ বেলা পর্যন্ত ঘুমাচ্ছে – বেলা মানে বেশ বেলা, টিপিক্যাল ওয়েষ্ট ইন্ডিয়ান বেলা।  রাসেলের সকাল সকাল ঘুম ভেঙে গেছে।  ব্রেকফাষ্ট আজ কবে হবে ঠিক নেই – জনতার যা মতি গতি মনে হচ্ছে একেবারেই লাঞ্চ হবে।  রাসেল ভাবলো এই সুযোগে বাইরে গিয়ে “ছোলে-বাটোরে” খেয়ে আসা যাক।  যেমন ভাবা তেমন কাজ – কিন্তু সেদিন হোটেলের গেট থেকে বেরিয়ে ডান দিকে টার্ণ নিয়েছে কি একটি লোক হাতে গাদা বই, কাঁধের ব্যাগে বই ইত্যাদি নিয়ে রাসেলের কাছে এসে ‘প্লীজ – বাই ওয়ান’, ‘প্লীজ – বাই ওয়ান’ এমনটা বলতে লাগলো।  রাসেল ইংরাজীতে বলে যাচ্ছে বই কেনা নিয়ে তার কোন ইন্টারেষ্ট নেই – কিন্তু সেই লোক মনে হয় কেবল দু একটা কথাই জানে ইংরাজীতে।  রাসেলের খারাপ লাগলো – পকেট থেকে একটা একশো টাকার নোট বের করে তাকে দিয়ে এগিয়ে যেতে গেল। কিন্তু সেই লোক পিছন ছাড়ে না! “নো বেগার, নো বেগার” বলতে বলতে পিছুতে আসে। আর হাতের বইগুলি বারিয়ে দিয়ে বলে “টেক এনি, টেক এনি”।  রাসেল ব্যাপারটা বুঝতে পারে যে এই লোকটির সম্মান বোধ প্রবল – বই না নিলে টাকা ফেরত দিয়ে দেবে।  তাই তাকে গেল্প করার জন্যই বলতে গেলে হাতের কাছে যে বইটি পেলো তুলে নিয়ে বলল ‘থ্যাঙ্কস’।

    আর একটু এগিয়ে গিয়ে আগের দিনে দোকানেই ঢুকে অর্ডার দিল ‘ছোলে – বাটোরে’ আর বলল ‘কুইক’।  কোচ ঘুম থেকে ওঠার আগেই খেয়ে নিয়ে হোটেলে ফিরতে হবে না হলে ঝাড় দেবে কোচ খুব! ক্যাশের লোকটা বলল – “ফাইভ মিনিটস্”।  রাসেল ভাবলো বাহ খুব তাড়াতাড়ি খাওয়া হবে যাবে! সেই প্রথম কোলকাতার রেষ্টুরান্টের ‘পাঁচ মিনিটের’ সাথে পরিচয় রাসেলের। 

    খাবারের জন্য ওয়েট করতে করতে হাতের বইটা নাড়াচাড়া করতে লাগলো সে।  বইটির নাম “দ্যা টেল অফ হাঁসুলি টার্ণ” (TheTale of Hansuli Turn)  – কিন্তু লেখকের নামটা রাসেল উচ্চারণ করতে পারলো না, কভার পেজের এপ্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত পর্যন্ত বড় লেখকের নাম।  রাসেল এবার সমস্যায় পড়ে গেল নামের মর্মোদ্ধার করতে – সে পড়ছে ‘হানসুলি’, কিন্তু এই শব্দের মানে কিছুই বুঝতে পারছে না! তাই অনুসন্ধিৎসু হয়ে বইয়ের পাতা উল্টাতে লাগলো।  কয়েক পাতা পড়েই ঢুবে গেল যেন – সময়ের খেয়াল নেই।  কোলকাতার বাইরের অন্য এক জগতের কথা যেন – ভেসে উঠলো নিজের দেশে জামাইকার ভিতরের দিকে কিছু কিছু গ্রামের স্মৃতি।  ওদিকে রেষ্টুরান্টের পাঁচ মিনিট শেষ হলে কুড়ি মিনিট পরে এল ছোলে-বাটোরে।  চেটে পুটে খেয়ে নিল রাসেল – ততদিনে হাতে করে খাওয়া শিখেছে সে।  খেয়ে দেয়ে হাতটা জাষ্ট ধুতে গেল বেসিনের দিকে পিছনের দিকের দরজাটিয়ে বেরিয়ে, বইটি টেবিলেই ছিল উপুড় করা যে পাতা পর্যন্ত পড়া হয়েছে সেটা মাঝে রেখে।  হাত ধুয়ে ফিরে এসে রাসেল দেখে টেবিল থেকে সেই বই হাওয়া! পরে আই পি এল খেলতে এসে ক্রমে ক্রমে রাসেল শিখে নেবে যে ধর্মতলায় আন-অ্যাটেন্ডেড অবস্থায় নাক পোঁছা রুমালও রাখতে নেই!  

    বই হারিয়ে হোটেলে ফিরে দ্যাখে টিমের তখনো কেউ ওঠে নি ঘুম থেকে, রুম মেট ঘুমাচ্ছে অঘোরে।  রাসেলের মনের মধ্যে তখনো ঘুরছে বইটির কথা – কিন্তু নামটি মনে আসছে না, শুধু ‘হানসুলি টার্ণ’।  হোটেলের রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘হানসুলি টার্ণ’ বইটি কোথায় পাওয়া যাবে! রিসেপশনের যে ছেলে এবং মেয়েটি ছিল তারা তো ঘাবড়ে গেছে! এদিকে প্রেষ্টিজের ব্যাপার – কোলকাতা কালচারাল সিটি, সেখানে বইয়ের নাম বুঝতে পারছে না, হালকা টেনশন।  ১৮ বছরের ছেলে হলে কি হবে, রাসেলের চেহারা তো আর বাঙালী ১৮ বছরের মতন নয়! রিসেপশন থেকে বলা হল, “স্যার, ফাইভ মিনিটস্‌ প্লিজ। ইউ ওয়েট ইন দ্যাট সোফা”। 

    রিসেপশনের মহুয়া বলল, “অ্যাই সুরজিৎ, কি করবি এবার? হানসুলি টার্ণ কোথায় পাবি? কলেজ স্ট্রিটে পাঠাবো কাউকে?” সুরজিৎ বলল, “সে তো পাঠাতে হবেই, কিন্তু তার আগে বইটার নামটা ঠিক ঠাক জান! এ তো বলছে আগে নামি আরো শব্দ ছিল। লেখকও তো বলতে পারছে না”।   কি করা যায় ভাবছে রিসেপশন খুব।  এখন হয় কি খবরের কাগজের সাংবাদিকেরা হোটেলের এমন সব কিছু লোকের সাথে যোগাযোগ রাখে খবরের বা গোপন সব ঘটনার ইনক্ল্যুসিভ স্কুপ পাবার জন্য। তো সেই হিসেবে আনন্দবাজারের গৌতম-বাবুর ফোন নাম্বার এদের কাছে ছিল – সেটা মনে পড়তেই সুরজিৎ বলল মহুয়াকে –

    - তাহলে কি একবার গৌতম-দাকে ফোন করব?
    - বইয়ের ব্যাপারে গৌতম-দা কি করবে?
    - না আসলে বইয়ের নামে ‘টার্ণ’ ফার্ণ লেখা আছে, কোন ক্রিকেটারের আত্মজীবনী হলে গৌতম-দা ঠিক বলতে পারবে
    - এটা তুই দারুণ বলেছিস, শিগগিরি ফোন লাগা

    গৌতম-দা ফোন করে বেসিক ব্যাকগ্রাউন্ড দেওয়া হল এই বলে যে একজন ওয়েষ্ট ইন্ডিজের ক্রিকেটার বই খুঁজছে যার টাইটেলে ‘টার্ণ’ শব্দটি আছে।  রিসেপশনের ছেলেটি বলছে 

    - গৌতমদা, এই ‘হানসুলি টার্ণ’ নাম দিয়ে বইটি সুভাষ গুপ্তে, দিলীপ দোশি বা চন্দ্রশেখর এদের কারো নয় তো!
    - না রে বাবা, এদের কারো নয়
    - তাহলে বেদী বা প্রসন্ন?
    - আচ্ছে তোদের কি ও বলেছে যে বইটি ক্রিকেট নিয়েই!
    - না, তেমন তো বলে নি!
    - কি ছেলে মাইরি তোরা! একবার জিজ্ঞেস করে দেখিস নি বইয়ের সাবজেক্ট কি!
    - অ্যাই রে, প্লীজ একটু হোল্ড করো। জেনে বলছি তোমায়

    রাসেল-কে এবার জিজ্ঞেস করা হল বইটা ক্রিকেট নিয়ে কিনা! সে গেল অবাক হয়ে – সজোরে মাথা নেড়ে বলল সে বই ক্রিকেট নিয়ে নয় বরং বেঙ্গলেই শহরের বাইরের জঙ্গলের ধারে গ্রাম ইত্যাদি নিয়ে।  সেই শুনে গৌতম বাবুকে বলা হল –

    - গৌতমদা, এতো বলছে গ্রাম বাঙলার বিষয় নিয়ে বই!
    - দেখেছিস, যা ভেবেছিলাম তাই! শুধু শুধুই তোরা ন্যাজটা তুলে না দেখেই এঁড়ে বলে লাফাচ্ছিস। ঠিক আছে দাঁড়া, আমি মতি-দাকে ফোন করে দেখছি পাত্তা করতে পারি কিনা। কল ব্যাক করব
    গৌতম বাবু এর পর ফোনালেন মতি নন্দী-কে।  সেখানেও সংক্ষেপে বললেন ব্যাকগ্রাউন্ড

    - মতিদা, তোমার কি মনে পড়ছে ‘হানসুলি’ নামে কোন বই আছে কিনা? বাংলা থেকে অনুবাদ মনে হচ্ছে
    - কি বললি নামটা আর একবার স্লো করে বল
    - হানসুলি টার্ণ
    - হ্যাঁরে, হানসুলি বলছিস বটে – কিন্তু এটা হাঁসুলি উচ্চারণে নয়তো!
    - হাঁসুলি মানে?
    - আরে তারাশঙ্কর বাবুর বইটি, ‘হাঁসুলি বাঁকের উপকথা’ ওটা তো শুনেছিলাম ‘দ্যা টেল অব হাঁসুলি টার্ণ’ নামেই অনুবাদ হয়েছিল!
    - বলো কি! তাই হবে মনে হচ্ছে! বাঁচালে মতিদা

    মতিদা সেই বারে উদ্ধার করলেন – রাসেল-কে ডেকে পুরো বইটার নাম শোনাতেই সে ‘ইয়েস, ইয়েস’ করে উঠলো।  এরপরে কলেজ স্ট্রীটে লোক পাঠিয়ে সেই বই আনা হল।  

    প্লেনে ফেরার সময় বইটি পুরোটা পড়ে ফেলে রাসেল। এবং তার পরে আরো অনেক বার। এবং ঠিক করে নেয় যে আবার কোলকাতায় যাবার সুযোগ হলে গ্রাম বাঙলা দেখে আসবেই।  এর পর প্রায় দেড় বছর কেটে গেছে – এবার আন্ডার-২১ সফরে কোলকাতায় খেলতে এল রাসেল – সেবারেও গ্র্যান্ড হোটেল।  একটা ট্যুর ম্যাচে ভালো রেজাল্টের জন্য পরের দিন প্র্যাক্টিসে ছুটি দিয়ে দিল কোচ – সন্ধ্যের দিকে রাসেল ঠিক করল যে পরের দিন একটা গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে আসবে শহরের বাইরে। রিসেপশনে গিয়ে সেই রিকোয়েষ্ট করল – কিন্তু অত বেলার দিকে রিকোয়েষ্ট এসেছে বলে ঠিক ঠাক ট্যুর অ্যারেঞ্জ করাও চাপের। তখনো রিসেপশনে মহুয়া আর সুরজিৎ - তফাত একটাই যে এখন ওদের আঙটি বদল হয়ে গেছে, ফলতঃ লোকের সামনে এখন তুমি বলে একে ওকে – ওদের মনে আছে রাসেলের দেড় বছর আগের বই নিয়ে ব্যাপারটা –

    - মহুয়া, কি করা যায় বলোতো? এ ছেলে বাংলা না দেখে ছাড়বে না মনে হচ্ছে!
    - আচ্ছা আমাদের হোটেলের গাড়ি এক্সর্টা থাকলে দেখবো
    - কিন্তু গাইড?
    - গাইড আবার কি? হাউসিং স্টাফ আছে গৌর, বীরভূমের দিকে বাড়ি। একটু আধটু ইংরাজী বলতে পারে। বলে দিচ্ছি যে গাড়ি নিয়ে সোজা দুর্গাপুর এক্সপ্রেস দিয়ে চলে যেতে – শান্তিনিকেতন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলে ভালো, না হলে তার থেকেই রিটার্ণ করতে। মোট কথা ডিনারের আগে হোটেলে ফিরতে হবে

    এই মত ঠিক হল – রাসেল-কে নিয়ে বেরুলো গ্রাম দেখাতে গৌর। গৌরের ইংরাজীর দৌড় খুব বেশী না, ফলে রাসেলের বেশীর ভাগ কথাই সে বুঝতে পারছে না! বুঝতে পারলে ধরতে পারত যে রাসেল গাড়িতে ওঠার খানিক পর থেকেই ‘ছোলে-বাটোরে’ খাবে বলে বলে যাচ্ছে।  নিজের মনের ভাব প্রকাশে ব্যর্থ হয়ে বাধ্য হয়ে রাসেল পেটে হাত বুলিয়ে ‘ফুড’, ‘ফুড’ বলতে লাগলো।  এবার গৌর বুঝতে পারলো কেস – কিন্তু বুঝতে পারলেই তো হবে না, রাস্তার মাঝে যুতসই ধাবা পাবে কোথায়! খানিক আগেই ‘হোটেল হিন্দুস্তান’ পেরিয়ে এসেছে। তাই বুদ্ধি করে ঠিক করল যে একেবারে গিয়ে শক্তিগড়ের ল্যাংচা হাবে গাড়ি থামাবে।

    শক্তিগড়ে গিয়ে গাড়ি থামানো হল – আন্ডার-২১ এর রাসেলকে কেউ চেনে না, তাই পাত্তা পাওয়াও গেল না কারো কাছ থেকে। লাইন দিয়ে খেতে ঢুকতে হল একটা জায়গায় – সেখানে সকালের দিকে কি কি পাওয়া যায় বোর্ডে ছবিতে বোঝানো আছে। ছবিতে স্কেলের উল্লেখ নেই বলে রাসেল কচুরির ছবি দেখে তাকে ‘বাটোরে’ ঠাওড়ালো! সেই মত অর্ডার দেওয়া হল –

    টেবিলে বসে বসে রাসেল চারিদিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখছে ব্যাপারস্যাপার। হঠাৎ চোখ চলে গেল দেওয়ালে আটকানো সৌরভ গাঙ্গুলির ছবিতে! গৌর-কে বলল, “ইজ্‌ দাদা স্টিল সো পপুলার”? গৌর প্রশ্ন বুঝতে না পেরে – রাসেলের হাত টেনে নিয়ে গিয়ে সামনের গামলায় রাখা ল্যাঙচার সামনে নিয়ে গিয়ে বলতে লাগলো, “দাদার ফেবারিট – সুইটস - দিস শপ, দিস শপ”।  রাসেল কি বুঝলো কে জানে! যদিও মিষ্টি খায় না তেমন - বলল একটা তাহলে ট্রাই করবে।  আটটা কচুরি খেয়ে তারপর একটা ক্ষীরের ল্যাঙচা নিল রাসেল।  একটা খেয়ে বিশাল ভালো লেগে গেল – আর তা ছাড়া বাঁধা গরু ছাড়া পেয়েছে – সুযোগ পেয়ে গুণে গুণে এগারোটা বড় সাইজের ক্ষীরের ল্যাঙচা খেল সে!

    দোকান থেকে এরপর যখন বেরুলো রাসেলের হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছে – এত খেয়েছে! গৌর-কে বলল, “আই ওয়ান্ট টু ওয়াক এ বিট”।  এটাও ঠিক বুঝতে না পারলেও গৌর আন্দাজ করে নিল যে খেয়ে দেয়ে হজম করার জন্য একটু হাঁটা হাঁটি করতে চায় সাহেব। কিন্তু এই হাইরোডের ধারে কিভাবে হাঁটা যাবে ভালো করে! এই রাস্তা খুব ভালো করে চেনা হবার জন্য গৌর জানে যে সামনে খানিকটা এগিয়ে গেলে গাংপুরের পাশে একটা রাস্তার ধারেই খেলার মাঠ আছে।  সেখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে হাঁটা হাঁটি হবে এমন প্ল্যান করে এগুলো গেল –

    সেই মাঠের কাছে গিয়ে দেখা গেল যে সেদিন ওখানে ছয় ওভারের ক্রিকেট টুর্ণামেন্ট চলছে! মনে রাখতে হবে যে ততদিনে আমাদের দিকে ফুটবল টুর্ণামেন্টে মাঝে মাঝেই নাইজেরিয়ানরা খেপ খেলতে আসছে।  রাসেলের গায়ের রঙ দেখে মাঠের দর্শক ধরে নিল যে এ ছেলে নাইজেরিয়ান – একজন বলে উঠলো

    - দেখেছিস, টুর্ণামেন্ট দেখেই চলে এসেছে! আরে মালটাকে বল যে এটা ক্রিকেট খেলা, ফুটবল নয়!  

    ওদিকে রাসেলের পেট এত ফুলে আছে যে শুধু হেঁটে কিছু হচ্ছে না।  একটা ম্যাচ শুরুর আগে পাশে কিছু ছেলে বোলিং প্র্যাক্টিশ করছিল – রাসেল ভাবলো যে একটু হাত ঘুরিয়ে বোলিং করে ল্যাঙচা হজম করা যাক।  সেই মত টেনিস বলটা চেয়ে নিয়ে বোলিং করা শুরু করল! বলের জোর দেখে তো পাবলিক হুব্বা! সেই টিমের সাথে প্র্যাক্টিস করছিল তাদের কর্মকর্তা দেখলো এতো বিশাল চান্স – পাশে ডেকে নিয়ে গেল গৌর-কে

    - দাদা, এ কি ক্রিকেট খেলে?
    - হ্যাঁ খেলে তো, আমি দেখেছি – বেশ ভালো খেলে [হোটেলে কাজ করার জন্য কনফিডেন্সিয়াল ব্যাপার হ্যান্ডেল করতে জানতো গৌর, তাই আর আসল পরিচয় মানে আন্ডার-২১ খেলোয়াড় এই নিয়ে কিছু বলল না]
    - দারুণ বোলিং করছে তো! দাদা কি খেপ খেলে? কত নেবে টুর্ণামেন্টটা খেললে? আসলে এটাতে তেমন পয়সা নেই – সেমিফাইনালে উঠলে ডিম ভাত, ফাইনালে মুরগীর মাংস, আর ম্যান অব দ্যা টুর্ণামেন্ট হলে একটা কিলো আটেকের খাসি আছে প্রাইজ।
    - এ সব শুনে আমি কি করব! আমরা শান্তিনিকেতন যাচ্ছি কাজে। এখন ক্রিকেট খেলার সময় নেই
    - তবুও একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন না

    ওদিকে হয়েছে কি সেই টিমের একটা ছেলে প্র্যাকটিশের সময় রাসেলের বোলিং দুটো বড় বড় ছয় হাঁকিয়েছে! বল পাশের আলুজমির মাঝখানে! সেই ছয় খেয়ে রাসেল ফুঁসছে।  গৌর কাছে গেলে বলল –

    - আই ওয়ান্ট টু প্লে হিয়ার    

    গৌর দেখল কেস গোলমেলে – রাসেলের গোঁ দেখে শান্তিনিকেতনের প্ল্যান বাতিল! গৌর দেখল খেলবেই যখন তখন আর একবার ট্রাই করে দেখা যাক খেপ খেলার জন্য কিছু ক্যাশ দেয় কিনা।  সেই কর্মকর্তা-কে গিয়ে বলল – 

    - খেলবে বলছে। কিন্তু কিছুই ক্যাশ দেবেন না?
    - কিচ্ছু করতে পারবো না আজকে দাদা। যা বাড়তি ক্যাশ ছিল সব গ্যাঁড়া বাপি-কে হায়ার করতেই চলে গেছে
    - গ্যাঁড়া বাপি কে?
    - ও যে দুটো ছয় হাঁকালো!

    ওদিকে তখন রাসেলের বোলিং দেখতে লোক জড়ো হয়ে গেছে।  এই টিমের কর্মকর্তা গিয়ে রাসেলের নাম টিম লিষ্টে ঢোকাবে বলে জানতে চাইলো কি নাম? রাসেল বলল, “আন্দ্রে”।  আন্দ্রে শুনে ঠিক বুঝতে পারলো না, আবার জিজ্ঞেস করেও ক্লীয়ার হল না।  তা ছাড়া আন্দ্রে বানান লেখাও চাপের – পাশ থেকে কেউ বলে উঠলো, “ওরে, ‘এদো’ লিখে দে”। 

    তা সেদিন রাসেল ‘এদো’ নামেই খেলল টুর্ণামেন্ট। যত বেলা বাড়ছে শুধু বোলিং নয়, ব্যাটেও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে রাসেল। মাঠের চারিদিকে আওয়াজ উঠছে “এদো-দা, এদো-দা”।  গ্যাঁড়া বাপি আর এদো-দার জন্য সেই টিম জিতেও গেল টুর্ণামেন্ট! আর হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন ম্যান অব দ্যা টুর্ণামেন্ট হল ‘এদো-দা’ ই। 

    আট কিলো খাসি কেটে রাতে ফিষ্টি করার জন্য সবাই ঝুলোঝুলি করতে লাগলো রাসেল-কে। কিন্তু গৌর জানে যে রাতের ডিনারের আগে না ফিরলে তার চাকুরী থাকবে না।  তাই রাতের ফিষ্টির প্রস্তাব নাকচ করে গাড়িতে উঠলো।  রাসেল তখনো কোলে আট কিলো খাসি-টা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গাড়িতে ওঠার আগে সেই খাসি-টা টিমকে দিয়ে দিতে গেল। কিন্তু তারা কিছুতেই নিল না – বলল, এদো-দা ফিষ্টিতে থাকলে না হয় এটা নেওয়া যেত। কিন্তু দাদা যখন নিজেই থাকছেন তখন আমরা খাসিটা নিতে পারবো না।

    আন্দ্রে রাসেলের কোলকাতা প্রীতির শুরু এখান থেকে – আই পি এল অনেক পরের কথা।  সন্ধ্যে হয়ে গেছে – ইনোভার পিছনের সীটে রাসেল বসে আছে খাসি কোলে করে, কোলকাতা এখনো বেশ কিছু দূরে।
  • | রেটিং ৪.৩ (৪ জন) | বিভাগ : স্মৃতিচারণ | ০১ মার্চ ২০২২ | ৭৪১ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • প্রত্যয় ভুক্ত | ০১ মার্চ ২০২২ ২১:৩৮504522
  • উফ,উরে বাবারে ,উরে বাবারে ,উরে বাপরে বাপ!পড়ে হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে গেল,Lmaorofl
  • প্রত্যয় ভুক্ত | ০১ মার্চ ২০২২ ২১:৩৯504523
  • এই সিরিজটা দারুণ হচ্ছে ,চলুক চলুক,আরো গপ্পো চাই <3 :))))
  • | ০১ মার্চ ২০২২ ২২:০০504525
  • এদিকে আমি ভাবছিলাম আন্দ্রে গিয়ে নিমোতে খেলতে শুরু করবে। 
  • dc | 122.164.197.237 | ০২ মার্চ ২০২২ ০৭:২৫504527
  • অসাধারন! 
     
    তবে আমার পুরনো দিনের গল্পগুলো বেশী ভালো লেগেছে, তার কারন বোধায় আমার অল্ট হিস্টরি ভালো লাগে বলে। (এটা একেবারেই পার্সোনাল প্রেফারেন্স) 
  • Ranjan Roy | ০৩ মার্চ ২০২২ ২০:৩৩504554
  • ক্ষী কান্ড! আমি দেখছি দ এবং ডিসি, দুজনের সঙ্গেই একমত। কিন্তু লেখাটা একঘর। হানসুলি টার্ন অনেকদিন মনে থাকবে।
  • Jaydip | ০৭ এপ্রিল ২০২২ ১৪:৩৬506111
  • ফাটাফাটি 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে প্রতিক্রিয়া দিন