• বুলবুলভাজা  কাব্য  শুক্রবার

  • অন্য ভাষার কবিতারা

    ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ
    কাব্য | ০৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ৩০৪ বার পঠিত | ২ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার


  • ইয়ে কঁহা কি দোস্তি হ্যায় কে বনেঁ হ্যাঁয় দোস্ত নাসেহ
    কোয়ি চারাসায হোতা কোয়ি গমগুযার হোতা।

    সব থেকে আগে, একটি কথা। বাংলায় J বা Z লেখার উপায় একটাই, জ। এর ফলে হয় কি, আমরা পড়ে বুঝতে পারি না, যে আসল অক্ষরটি J না Z। সেইটে দূর করতে, J বোঝাতে জ আর Z বোঝাতে য লিখছি। এতে মুল শেরটি আসল উচ্চারণে পড়া যাবে বলেই আমার বিশ্বাস। অর্থাৎ, শব্দটি charasaaz, ওটি charasaaj নয়। একই কথা গমগুযার এর ক্ষেত্রেও বলা রইলো।

    গালিবের খুব বিখ্যাত গযলগুলির মধ্যে অবশ্যই থাকবে "ইয়ে না থি হমারি কিসমত"। সেই গযল থেকে নেওয়া এই শেরটি কি অনায়াসে ব্যক্ত করেছে আমাদের আজকের নিঃসঙ্গতা।

    নাসেহ অর্থ উপদেশ দানকারী, মনে রাখার সহজ উপায় বলে দিই, নসিহত জানেন তো? উপদেশ? তো, যে নসিহত দেয়, সে নাসেহ।
    চারাসায হল গিয়ে যে উপায় বলে দেয়, রাস্তা দেখিয়ে দেয়, সমাধান করে দেয়।
    গমগুযার মানে যে দুঃখের দিনে সাথ দেয়। এরকমই আরেকটি শব্দ কেউ কেউ শুনে থাকতে পারেন, রাহগুযার, অর্থ ধরে ফেলবেন নিশ্চয়ই এবারে, যে পাশে হেঁটে যাচ্ছে। উর্দু কবিতায় বহুল ব্যবহৃত, রাস্তা যেখানে জীবনের প্রতীক।

    আসলে জীবনের অনেকগুলো সংজ্ঞার মধ্যে একটি হল, ভুল করে যাওয়ার এক সিলসিলা, নিরবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া, তারেই কয় জীবন। প্রত্যেকে পিছনে ফিরে তাকান, দেখতে পাবেন জীবনের সেই ভুলগুলো, যেগুলো কেন করেছিলেন, ভেবে নিজেই আকুল হবেন, নিজেকে গালাগালি করবেন। কি না দিতে রাজী আপনি সেই সময়ে ফিরে যাওয়ার জন্য, নিজেকে সেই ভুল থেকে বিরত রাখার জন্য। কিন্তু সময় যে একমুখী! সে ফেরত যেতে দিতে নারাজ, সে ভবিষ্যৎ জানিয়ে দিতে নারাজ। আজ যা করছেন, কালকেই সেটা ভুল বলে প্রতীয়মান হবে না, তার জন্য আপনি পরশু আফসোস করবেন না, এমন গ্যারান্টি কে দেবে? আমাদের হাতে শুধু রইল বর্তমান, আর করার জন্য শুধু আক্ষেপ, only if I knew...

    এখানে দাঁড়িয়ে আপনি কি চান না, কেউ একটু পাশে দাঁড়াবে, কাঁধে হাত রেখে বলবে, ধুর, ভুল সবাই করে, তুই করে ফেলেছিস না বুঝে, আয়, চল, get up, get going, জীবন অনেক লম্বা, আরো অনেক কিছু বাকী আছে। আপনি চাইবেন, সেই নির্জনে বসে যখন আপনি একা কাঁদছেন, একটি কাঁধ থাকতো বেশ, যেখানে ক্লান্ত মাথাটা আপনি রেখে দুদণ্ড শান্তি পেতেন। যখন অন্ধকারে ডুবে বসে আছেন, তখন একটা হাত আসবে, যেটার স্পর্শ থেকেই আপনি চিনতে পারবেন কে এসেছে, যে এসে বুকে হাত রাখবে, আপনার বিষজ্বালা কমবে।

    কিন্তু কি পাই আমরা? আমরা পাই সারগর্ভ উপদেশ, জ্ঞানের ফুলঝুরি, আমাদের কি করা উচিত ছিল, তার লম্বা ফিরিস্তি, ভবিষ্যতে কি শিক্ষা নেওয়া উচিত, নিজেকে কেমনভাবে পাল্টে নেওয়া উচিত, কি করলে এমনটা ঘটতো না। এ জেনে আমার কি লাভ? আমি কি পালটে ফেলবো এসব জেনে? আমি বিষ খেয়েছি, জেনে বা না জেনে, কিন্তু তোমার কাছে আমি শুধু একটু উপশম চাই। তার বদলে আমরা পাই, পুকুরে ডুবতে থাকা আপনাকে না বাঁচিয়ে, সাঁতার না জেনে আপনার পুকুরে নামা খুব অন্যায় হয়েছে, সেই মতামত, পুকুরের পাড়ে সাবধানে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেদের থেকে। আর তারা কে? তারা বলে তারা আপনার বন্ধু। বলে, আমরা তোমার বন্ধু না হলে কি দরকার ছিল আমাদের সময় নষ্ট করে এইসব বলার। কিন্তু আপনি কি চান, আপনার কি দরকার, সেটা কেউ শুনেছে তাদের মধ্যে?

    বোধহয়, কোন কালেই কেউ শোনেনি, কবিদের কথা তো আরো শোনেনি, কারণ তাদের কথা অস্পষ্ট, তাদের দাবী আমাদের থেকে আরো আলাদা।

    তাই চাচা বলছেন,

    এ কোন বন্ধুর দল আমার, যারা দেয় শুধু উপদেশ
    কোন উপশমকারী কি নেই, কোন দুঃখের সাথী কি নেই?

    কিন্তু এ কথা কি আমাদের সবার উপর খেটে যায় না? এ কথা কি আপনার আমার বুকের কান্না নয়?



    ~~~~



    একটা গল্প দিয়ে শুরু করি? ইরানের কবিশ্রেষ্ঠ রুমী সাহেবের লেখা মাসনভী বই থেকে টুকছি। এক মুচি একবার ভগবৎপ্রেমে পাগলপারা হয়ে গিয়ে নির্জন প্রান্তরে গিয়ে আকুল প্রার্থনা করছে, ঈশ্বর, আমি তোমাকে পাগলের মত ভালোবেসে ফেলেছি। তুমি একবার দেখা দাও, আমি তোমাকে নরম হরিণ চামড়ার জুতো বানিয়ে দেব। আমি নিজে তোমার পা গোলাপ জলে ধুইয়ে দেব। আমি নিজে তোমায় সেই জুতো পরিয়ে দেব। তুমি শুধু একটিবার আমাকে দেখা দাও।

    সেই সময় সেখান দিয়ে যাচ্ছিলেন নবী মূসা, যাকে অনেকে ইহুদী ধর্মের প্রবর্তক মোজেস নামেও চেনেন। যাহাই টেগোর তাহাই ঠাকুর গোছের ব্যাপার। তিনি এই উন্মাদ প্রার্থনা শুনে ভারী রেগে গেলেন। তাকে গিয়ে কান ধরে বলেন, ইয়ার্কি পেয়েছিস? ঈশ্বরকে তুই জুতো পরিয়ে দিবি? ফাজলামির জায়গা পায়নি? এক চড়ে তোমার কান লাল করে দেব, গবেট কোথাকার।

    দৈববাণী হল, হে মুসা, আমার ও আমার প্রেমিকের মাঝে তুমি এসো না। আমি যা জানি, তুমি তা জানো না।

    কোথায় গালিবের
    হাঁ য়ো নেহি খুদাপরস্ত, যাও য়ো বেওয়াফা সহি
    জিসকো হো দ্বীন ও দিল আযীয, উসকি গলি মে যায়ে কিঁউ

    আর কোথায় এই গল্প। আপনারা খেপে যাচ্ছেন, বুঝতে পারছি।

    প্রথমে, মুশকিল শব্দাবলীর অর্থসমূহ নেট থেকে টুকে দিই?
    পরস্ত মানে যে পছন্দ করে, ভালোবাসে। অর্থাৎ, খুদাপরস্ত মানে গিয়ে দাঁড়ালো ঈশ্বরপ্রেমী। বা, ঈশ্বরভীরুও বলতে পারেন, অর্থটা বুঝে গেছেন যখন তখন আর চুল চিরে করবোটা কি, এমনিতেই আমার মাথায় চুল মোট সতেরোটি (যারা আগের লেখায় ১২টি পড়েছিলেন, তাদের উদ্দেশ্যে জানাই, নতুন সেন্সাসে দেখা গেছে, নতুন পাঁচটি চুল গজিয়েছে), তেমনি ভাবে, ওয়তনপরস্ত মানে দেশপ্রেমী, ইত্যাদি।
    দ্বীন মানে মোটেও দীনজন নয়, ধর্ম।
    আযীয মানে প্রিয়।

    যে প্রেমে সব দেওয়া হয় না, সব হারানো হয় না, সে প্রেম হয়ত সম্পূর্ণ নয়। নিজেকে বিলীন না করে দিলে, একীভূত না হলে, প্রেমের সর্বচ্চ প্রকাশ হবে কি করে, সে অতীন্দ্রিয় অনুভূতি আসবে কোত্থেকে? প্রেমের একটা সংজ্ঞা কি, নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে আরেকজনের অস্তিত্বে মিশে যাওয়া নয়? সব বাঁচিয়ে প্রেম করব, সে যেন সেই হবির মত যা সপ্তাহান্তে সময় পেলে, অফিস, বাজার, ঘরের কাজ সামলে, রবিবার বিকেলে কোন দাওয়াত নেমন্তন্ন না থাকলে হারমোনিয়নের ধুলো ঝেড়ে পনেরো মিনিট রবি ঠাকুরকে নিয়ে টানাটানি করা। অমন করে কি আর রবি ঠাকুরের গান 'তোলা' যায়? সেভাবেই, যদি প্রেম করতে হয়, সম্পুর্ণটুকু দিয়ে করতে হয়, ঘর বাঁচাবো আবার প্রেমের তুফানেও নাইবো, সে করলে যে হয় না।

    আর, যাকে ভালোবেসেছি, তার সবটুকুকে ভালোবেসেছি, সে যেমন তাকে সেই রূপে ভালবেসেছি, তাকে আমি নিজের পছন্দের ধাঁচে গড়ে নিতে চেষ্টা করিনি। চেষ্টা করিনি যে সে আমাকে ভালবাসার পরে পাল্টে যাক আমার রুচি অনুযায়ী, কারণ আমি তো তাকে ভালবেসেছি, নিজেকে নয়। তার গুণকে ভালবেসেছি, তার দোষকেও সমান ভাবে ভালবেসেছি, সে ঐ দোষ আর ঐ গুণগুলির সমাহার, আর সেই মিশেলটাই আমার পছন্দ, ঐ মিশেলটিই দুনিয়ায় তাকে য়ুনিক বানিয়েছে, তাকে আমার প্রেমাস্পদ বানিয়েছে। দুনিয়ায় ঐ দোষগুণের সমহার অন্য কোথাও পেলে, আমি তো তাকেও ভালবাসতে পারতুম।

    আমি জানি দেবদ্বিজে তার ভক্তি নেই, আমি জানি সে কথা দিয়ে কথা রাখেনা, তোমার ঈশ্বরভক্তি তোমার মূল্যবান হৃদয় তোমাকে মুবারক, কিন্তু উনি যে এমনই!
    এক কাজ করো, তুমি ঈশ্বর আর তোমার কীমতি হৃদয় সামলে বসে থাকো, তার ঘরের সামনে ঘুরঘুর করা ছেড়ে দাও। আমি তাকে ওই চরিত্রের পরেও ভালোবেসেছি, তুমি পারোনি, তুমি চাও সে পাল্টে যাক যাতে তুমি তাকে ভালোবাসতে পারো। একে ভালবাসা বলে না, বলে না, বলে না।

    সেই প্রথমের গল্পে ফিরে যাই? আমার ও আমার প্রেয়সীর মাঝে কিচ্ছু আসতে পারবে না, ধর্ম নয়, চরিত্র নয়, কারণ আমি তাকে ভালবাসি পাগলের মত, যত ভালো ঈশ্বরকে বেসেছিল মাসনভীর সেই মুচী।

    তাই

    নেই তার দেবদ্বিজের ভয়, জানি সে রাখে না কোন কথা
    যদি হয় ও দুটো দামী, তার গলিতে পা আর রেখো না

    সহজ সরল উপদেশ সাবধানী প্রেমিকদের প্রতি, প্রেমিকশ্রেষ্ঠ মীর্যা আসাদ উল্লাহ খান গালিবের তরফ থেকে।


  • বিভাগ : কাব্য | ০৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ৩০৪ বার পঠিত | ২ জন)
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন