• বুলবুলভাজা  কাব্য  শুক্রবার

  • আমার যেদিন ভেসে গ্যাছে

    সোমনাথ রায়
    কাব্য | ০৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ২৮১ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • আমার যেদিন ভেসে গ্যাছে

    (১)

    কী গভীর ঘ্রাণ
    স্বেদগ্রন্থি থেকে অনস্তিত্ব চুঁইয়ে পড়েছে
    পিচের গলনরেখা চিনে নিয়েছিলো তাকে
    স্নায়ুতন্ত্রে মিলিত আজান
    খর বর্ষণে
    চাঁদশরীরেও ক্রমে মৃত মাংস ক্রমগ্যাংগ্রিণ
    পিঁপড়ের লালদাগ ধ'রে ধ'রে মুর্দাফরাস
    ভাসান দিয়েছে শেষে, অহিদংশনে
    ট্রেনে কোলাহলে
    ছাপিয়ে যাচ্ছে সব উচ্ছ্বাস, শেষ ক্রন্দনও
    এবার স্টেশন আর, বিপণিতে আমার যেদিন
    ভেসে গ্যাছে চোখেরও জলে

    (২)

    আমাদের আসলে কোনও বর্ষাকাল নেই
    আমাদের সবই মধুমাস
    কথার ফিরতি টোনে মিশে থাকা চৈত্রাভ্যাস
    নক্ষত্রের থেকে টানে
    অথবা ম্যাজিক হয়ে ফিরে আসে মায়ার উজানে
    আমাদের কোনও ভাটি নেই
    নিকানো দাওয়ায় বসে দুচারটে মুড়ি ছড়াবেই
    এরকম স্কোপ নেই কোনও
    অথবা কাজের দিনে ভন্ডুল অকালবর্ষণও
    এইখানে কখনও কি ছিলে?
    কেবল জড়োয়া থেকে সোনারং আলোর মিছিলে
    তুবড়ির মতো কথা বলে
    বর্শাফলা, যেদিন ভেসে গ্যাছে চোখেরও জলে

    (৩)

    ছায়ায় দেখেছি তাকে, পথমাঝে
    সূর্যের নিচে তার অহমিকা বটের বিরাজে
    শান্তি নামিয়ে আনে, ঘুম আসে
    ও গ্রাম আমার, ওইখানে ঘাসে
    শিশির জড়িয়ে ধরে প্রত্যুষ পায়ের মোরামে
    বিকেল তখন তুমি ডাকছিলে? বৃষ্টি ও নামে?
    এইখানে সব হয়, ঠিক যেন আদরের মত
    আঙুল ছুঁয়েছে তার পোড়া দাগ, কষ্ট ও ক্ষত
    এখানে পাতার শীষে রোদ পড়ে, হিরে হয়ে জ্বলে
    আমার যে দিন ভেসে গ্যাছে- চোখেরও জলে
    ~~~~


    নোনাডাঙা

    মানুষের ঘরবাড়ি বিস্তীর্ণ অগ্নিতে গড়া
    ছাইয়ের বাহারি রঙে ফুটে ওঠে দেওয়ালের কাজ
    হাওয়া দিলে জানলায়, আগুনেরই মত
    শীতলতা দাগ রেখে দ্যায়
    মানুষের ঘরবাড়ি প্রতিরোধে ঘন হয়ে থাকে
    বাঁশের খুঁটিকে রোদ মুঠো করে ধরে
    আলকাতরার দাগ ত্রিপলের ভাঁজ থেকে
    পরম স্নেহের আবরণে, ভালোবাসা দ্যায়
    মানুষের ঘরবাড়ি অদ্ভুত ভাবে ভালো বাসা
    উপশিরা ফুটে ওঠে শীর্ণ পেশির কালো ভাঁজে
    বৈশাখ-রোদ্দুরে ঘামের বিন্দু থেকে সোনা
    ঘরে মেঝেতে পড়ে- বিস্তীর্ণ অগ্নির দেশে
    সংসার কুসুমিত হয়

    --- নোনাডাঙায় উচ্ছেদ হওয়া বাসিন্দারা বস্তি পুনর্গঠন করছিলেন তখন।
    ~~~~


    সৃষ্টিতত্ত্ব

    চূর্ণ চূর্ণ এই ব্যর্থতা রৌদ্রে উড়িয়ে দ্যায় কেউ
    কেউ বলে ঈশ্বর কারুণিক
    উপত্যকার মাঝে বয়ে যায় তিরিতিরে নদী
    শীত নামে
    পাহাড়ে শান্তি নেমে আসে
    কুয়াশা আড়াল দিলে পর্দায় ছবি আঁকে কেউ
    কূয়াশা সরালে দেখে কিছু নেই, সমতলে আসে
    ঈশ্বর সেইখানে রচনা করেছেন রৌদ্র, অস্থির
    যন্ত্রণা নিয়ে পতঙ্গের মত ছুটে যেতে হয়
    রাত্রির আরও কিছু কাছে
    প্রবাহ থামলে দেখি, সেখানে এসেছে
    আগামীও
    ~~~~


    গন্ধক

    এখন বৃষ্টি হয়ে নামে
    এখন কুয়াশা, অখণ্ডমন্ডল থেকে দূরে
    আরও দূরে, অচেনা হোটেল
    প্রেতের মুজরা থেকে স্বর ভেসে আসে
    এত দূর, এত গাঢ় পথ
    আলিঙ্গন সূর্যের এত সন্নিকটে
    অথবা সূর্যের পরে অজস্র নক্ষত্র পেরিয়ে-
    অসংখ্য ভরবেগ, অসহ্য হীরকদ্যুতি
    হে মুরশিদ, অন্ধত্ব দোহাই তোমার
    এই আলো, গন্ধকের গলিত অঙ্গুলি
    ভয় করে বড়ো।
    অথচ কীসের ভয়?
    যূপকাষ্ঠে গলা রেখে প্রাণী কি কখনো ভাবে তার
    মৃত্যু আসন্ন?
    নাকি সেই মুহূর্তখানি
    দীর্ঘায়িত হতে থাকে, ঘুম পায় ভারি
    এলার্ম বাজেনা- পুরোনও মাটির দিন ফিরে আসে
    পুরোনো বটের মূল, পাহাড়, ধুলোমাখা গ্রাম
    সংকেত রেখে যায় সেই ঘুমে
    স্বপ্নে, হাঁড়িকাঠে
    এবং সেসবই সংকেতমাত্র
    মূঢ়মানব মাত্রেই জানে সংকেত চিনে চিনে কালযাত্রা অসম্ভবপর,
    তাই ভয় করে, ফাঁসিঘরে যাবার আগেই
    এবং নিজেই জানি, সমস্ত জন্ম ধরে
    এই পাপ নির্মাণ করেছি
    এবং নিজেই জানি, সমস্ত জন্ম ধরে
    এই মৃত্যু কামনা করেছি
    কামনা নির্মাণ করি, সশব্দে ছেড়ে দিই তাকে
    হর্ণের মতো
    গাড়ি থেকে গাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে
    বাড়ি থেকে বাড়িতে ছোঁয়াচ লাগায়
    গন্ধকের বৃষ্টি নামে।
    দ্যাখো, ওরা সকলে ভিজছে, পুড়ছে, গু্টিয়ে ছোট হতে হতে মরে যাচ্ছে একেবারে একদিন
    দ্যাখো, ওরা জ্বালিয়ে দিচ্ছে ফুলের বাগান
    শুকিয়ে ফেলছে পুষ্করিণী, ক্ষেত, শাল-অশোকের বন
    তারপর হা অন্ন হা অন্ন করে মরে যাচ্ছে
    সেই কবে থেকে--
    জাতকের পর জাতক, তুমিও মরছো
    আর যূপকাষ্ঠে আমি
    অখণ্ডমন্ডল থেকে দূরে
    অন্য কোনও সৌরগ্রহ নেই
    মৃত পৃথিবীর লাশ নিয়ে
    এক এক করে ওরা পৌঁছে যাচ্ছে বিস্মরণে
    সেইখানে থেমে যাচ্ছি?
    নাকি আরও কিছু দূর যেতে হবে?
    আরও কিছু দূরে সরে যেতে হবে?
    সূর্যের অপর পিঠের উষ্ণতা, ক্ষুদ্রতম স্কেলটিতে ঢুকে
    দারুণ প্রদাহ দেবে সর্বত্রে?
    সর্ব হতে ত্রাণ করে কে?
    সর্পভয়? মৃত্যুভয়? পরাজয়?
    সত্যি মৃত্যু আছে?
    সত্যি তো মুরশিদ?
    নাকি দারুণ বিস্মরণ আর কীটজন্ম নিয়তির মতো
    ক্রমাগত ঠেলে দেবে অখণ্ডমন্ডল থেকে দূরে--
    আরও দূরে
    আরও আরো দূরে
    মৃত পৃথিবীর লাশ পিঠে
    মরুগ্রহে, মরুতর গ্রহে?
    ~~~~


    জন্মদিনের কবিতা

    সন্ধ্যার ম্লান বিবমিষা, দশকে প্রাচীন রূপ
    হাওয়া ভ’রে দিলে তাকে নিয়ে উড়ে যায় দংশন
    আর, তাকে নাম দিই – ইতিহাস?
    যা কিনা এমনই শুরু, যা কিনা এমনই জমি, ঘাস,
    খালপথে বান ঢুকে পড়ে-
    ডুবে যায় কুমারী গাছ শস্যের শেষ হাসি সহ
    উল্কাপাতে প্রত্যহ মরে যায় পৃথিবীর মতই কত প্রাণবন্ত গ্রহ
    ~~~~


    লক্ষ্মীপুজোর সনেট

    ফকিরপাড়ার ভূত উঠে আসে আলো নিভে গেলে
    তখনও বাঁশের গায়ে টিউবের হোল্ডার, চোক;
    পালক ঝরিয়ে পাখি ঢুকে যায় ক্রমশঃ বিকেলে
    এলানো ছায়ায় ডুবে, মাইকেরা, নতমস্তক-
    ফকিরপাড়ার ভূত শালুকের থেকে ধানক্ষেতে
    হেঁটে যায়, চাঁদ যেই ভরে দ্যায় নিড়ানো উঠোন
    আদিম ধোঁয়ার ঘ্রাণে মাটির সমীপে হাত পেতে
    চেয়ে নেয় বেঁচে থাকা,শস্য ও কুয়াশার কোণ।
    ফকিরপাড়ার ভূত, অচেনা সিমেন্ট বাঁধা মেঝে
    দেখেছে কি- সেইখানে পুকুরের বাঁধাঘাট ছিল,
    হয়তো বা নৌকোটি কোজাগর জ্যোৎস্নায় সেজে...
    বাঁধানো সড়কে গাড়ি হর্নে আকাশ ছিঁড়ে নিল-

    বিষাদ শিউরে ওঠে বিদেশের ফ্ল্যাটে, রাস্তাতে
    ফকিরপাড়ার ভূত মরে যায় ফকিরপাড়াতে।
    ~~~~


    দেওয়ালি সনেট

    এসো শ্যামা, আজ তোমাকে আহার করি
    জিহ্বায়, দংশনে, ছুঁয়ে যাই বক্ষ তোমার
    শ্বাপদের ঈশ্বর জেগে আছে শিরোপরি,
    সুইচে আলোর দ্যুতি ঘাতক বোমার-
    মৃৎপাত্রে ক্ষুধাসম খিচুড়ির ভোগ
    সকলই মিশেছে তাতেঃ মৃতদেহ, আঁচ-
    ভদকার জাম্বো পেগ, ক্ষত, মনোরোগ,
    গিলে ফ্যালা পুকুর আর কেটে নেয়া গাছ।
    দেওয়ালে, প্রাচীরগাত্রে, উজ্জ্বল পথে
    আলোকসজ্জা জুড়ে পিশাচ গতিতে
    পোকার মৃত্যু ঘটে, পূর্ণ মনোরথে
    আহার্য মিশে যায় মাংসে, পেশীতে;
    আহার্য, দ্যাখো শ্যামা, বেড়েছে অদ্যপি।
    আলোর উল্লাসে বাড়ো আলো, এনট্রপি...
    ~~~~


    পিয়ানো

    পিয়ানোয় স্বয়ং ঈশ্বর
    করুণা উথলে ওঠে মেঘের আড়াল থেকে
    আলোর মতন অহমিকা
    ভেসে যায় জলের শহর
    বৃষ্টির রূপক আর ফুটপাথ
    সকলেই গান হয়ে যায়
    রেলিং-এর থেকে চুঁয়ে প’ড়ে
    ওভারব্রিজের মুখে লাল নীল সিগনালে
    থেমে যায় আমার সময়
    অনন্ত গঙ্গার মত শব্দের স্রোতে পাড় ভাঙে
    পলি পড়ে, গড়ে ওঠে নতুন আবাদ
    তিনখানি গ্রাম জুড়ে গিয়ে
    নতুন হয় কলকাতা
    নতুন হয় আলোর মিছিল
    বৃষ্টির বাসস্টপে, অভিমানী ধ্বনির মায়ায়
    সকলেই গান, বয়ে যায়-
  • বিভাগ : কাব্য | ০৪ ডিসেম্বর ২০২০ | ২৮১ বার পঠিত
  • পছন্দ
    জমিয়ে রাখুন পুনঃপ্রচার
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার খেরোর খাতা, লিখতে থাকুন, বানান নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]
মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত


পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে প্রতিক্রিয়া দিন