এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  শিক্ষা

  • গা-জোয়ারি কারবার?

    নরেশ জানা
    আলোচনা | শিক্ষা | ২২ জুন ২০২৪ | ২৬২ বার পঠিত
  • একেই বোধহয় বলে মামদোবাজি। একেবারে গা-জোয়ারি কারবার। যেমনটা ঘটে চলেছে যোগেন্দ্র যাদব আর সুহাস পলশিকররের সংগে। এখন তো যোগেন্দ্র যাদব কে সারা বিশ্ব চিনে গেছে বিশেষ করে অষ্টাদশ লোকসভা নির্বাচনে গোদি মিডিয়ার এগজ়িট পোলের দফারফা করার পর। আমরা যদিও তাঁকে একজন সমাজকর্মী ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার হিসেবেই সচরাচর জেনে থাকি কিন্তু তার বাইরেও মানুষটির আরও বড় পরিচয় আছে। যোগেন্দ্র যাদব একাধারে শিক্ষাবিদ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানীও বটে। আর ডঃ সুহাস পলশিকর কে যাঁরা চেনেন না তাঁদের জন্য সংক্ষেপে বলা এই যে ‘স্টাডিজ ইন ইন্ডিয়ান পলিটিক্স’ জার্নালের প্রধান সম্পাদক সুহাস পলশিকরও একজন প্রতিথযশি শিক্ষাবিদ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানী। ‘বদলতা ভারত’ শীর্ষক সাড়া ফেলে দেওয়া পুস্তকের লেখক। তিনি সাবিত্রীবাই ফুলে পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি ও জনপ্রশাসন বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক। কিন্তু আমি আপনি কাউকে শিক্ষাবিদ কিংবা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলে দিলে তো হবেনা। তার মান্যতা কোথায়?

    সেই প্রসঙ্গে বলা যে এই দু’জনকেই এনসিইআরটি অর্থাৎ ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং নামক দেশের যে সংস্থাটি জাতীয় স্তরে নবম-দশম কিংবা একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণীর পড়ুয়াদের জন্য পাঠ্য সিলেবাস এবং পুস্তক তৈরি করে থাকে তাদের উপদেষ্টা মণ্ডলীতে রাখা হয়েছে ওই দু’জনকে।

    এবার বলুন তো এনসিইআরটি নামটা চেনা চেনা মনে হচ্ছেনা? ঠিক ধরেছেন! ভারত সরকারের মানব সম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক কিংবা সরাসরি বলা ভালো শিক্ষা মন্ত্রক এই স্বয়ংশাসিত সংস্থাটিকে ঠিকা দিয়ে রেখেছে পাঠ্যসূচিতে রদবদল ঘটানোর এবং তারা তা মন দিয়ে করছেনও। আজ ইতিহাস বই থেকে মুঘল যুগের ইতিহাস মুছে দিচ্ছেন তো কাল জরুরি অবস্থা জারি কিংবা গুজরাট দাঙ্গার ইতিহাস তুলে দিচ্ছেন। আর সম্প্রতি ইতিহাস থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে ‘বাবরি মসজিদ’ নামটাও বদলে লেখা হয়েছে ‘তিন গম্বুজের কাঠামো!’ যা নিয়ে শুরু হয়েছে দেশ জুড়ে বিতর্ক।

    সংশোধিত নতুন সংস্করণে লেখা হয়েছে, রাম মন্দিরকে ঘিরে হিন্দুদের আবেগ এবং পরবর্তীতে বিতর্ক নিষ্পত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের বিশদ রায়। লেখা হয়েছে, "শ্রীরামের জন্মভূমির জায়গায় ১৫২৮ সালে নির্মাণ করা হয়েছিল তিন গম্বুজের কাঠামো।” এতদিন ইতিহাস বইতে বাবরি মসজিদ প্রসঙ্গে লেখা ছিল, ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বিজেপি'র শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনা বাদ দেওয়া হয়েছে। বাদ দেওয়া হয়েছে সেসময় উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী কল্যাণ সিংকে সুপ্রিম কোর্টের ভর্ৎসনা এবং সৌধ রক্ষায় ব্যর্থতার জন্য আদালত অবমাননার দায়ে তাঁর একদিনের কারাবাসের ঘটনাও। এসব ঝেড়েঝুড়ে ফেলা হয়েছে।

    সে যাইহোক, খোদ সরকার যাঁদের ঠিকা দিয়েছে দেশের প্রকৃত ইতিহাস বই থেকে মুছে ফেলার তাঁরা তা করবেন এতে আমরা বড় জোর চিৎকার করতে পারি তার বেশি কিছু নয় কিন্তু যোগেন্দ্র যাদব ও সুহাস পলশিকর পড়েছেন অন্য সমস্যায়। গত এক বছর ধরে তাঁরা এনসিইআরটি কে বলে আসছেন যে পাঠ্যপুস্তকের উপদেষ্টা মণ্ডলী থেকে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হোক কিন্তু এনসিইআরটি তা শুনতে নারাজ। যোগেন্দ্র যাদব ও সুহাস পালশিকর বলছেন, পাঠ্যপুস্তকের এই গুরুত্বপূর্ণ রদবদলে তাঁদের সঙ্গে কোন আলোচনাই করা হয়না অথচ বইতে তাঁদের নাম উপদেষ্টা হিসেবে ফলাও করে ছাপা থাকে। যাতে মানুষকে এই ধোঁকা টা দেওয়া যায় যে পাঠ্যপুস্তকের রদবদলে ওঁরাও আছেন। অতঃপর যোগেন্দ্র যাদব ও সুহাস পালশিকর এনসিইআরটি-র ডিরেক্টরকে এই বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে তাঁদের যদি ওই তালিকা থেকে নাম প্রত্যাহার করা হয় এবং তাঁদের নাম রয়েছে এমন পাঠ্যপুস্তকগুলি বাজার থেকে তুলে না নেওয়া হয় তবে এনসিইআরটি-র বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করবেন তাঁরা।

    জানা গেছে গত বছরও এই দুজন এনসিইআরটিকে একই অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু এনসিইআরটি বলেছিল যে পাঠ্যপুস্তক উন্নয়ন কমিটির সদস্য হিসাবে কোনও ব্যক্তির নাম প্রত্যাহার করার কোনও প্রশ্নই আসে না। যোগেন্দ্র যাদব বলেছেন, "এক বছর আগে আমাদের অনুরোধ সত্ত্বেও, এনসিইআরটি বিকৃত পাঠ্যপুস্তকে আমাদের নাম প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেগুলির সাথে আমরা যুক্ত হতে চাই না।"

    চলতি সপ্তাহের সোমবার যোগেন্দ্র যাদব একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানিয়েছেন, "পলশিকর সুহাস এবং আমি এনসিইআরটি-কে লিখেছি যে তারা যদি এই বইগুলি প্রত্যাহার না করে এবং আমাদের নামগুলি না সরিয়ে দেয় তবে আমাদের আইনি ব্যবস্থা নিতে হতে পারে।" সোমবারই এনসিইআরটি ডিরেক্টর ডিপি সাকলানিকে সম্বোধন করা একটি চিঠিতে, দু'জন জানিয়েছেন যে তাঁরা এটা "আবিষ্কার করে হতবাক" যে এক বছরেরও বেশি সময় পরে তারা পাঠ্যপুস্তক থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছিলেন এবং সংস্থাকে তাদের নাম মুছে ফেলার অনুরোধ করেছিলেন কিন্তু এনসিইআরটি আবারও তাঁদের নাম উল্লেখ করেছে।

    যোগেন্দ্র যাদব এবং সুহাস পলশিকর আরও বলেছেন যে, নির্বাচিত অংশ মুছে ফেলার পাশাপাশি ওই স্বায়ত্তশাসিত শিক্ষা সংস্থা যে "উল্লেখযোগ্য সংযোজন এবং পুনর্লিখন" পদ্ধতি অবলম্বন করেছে যা মূল পাঠ্যপুস্তকের চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। চিঠিতে বলা হয়েছে,"এনসিইআরটি-এর কোন নৈতিক বা আইনগত অধিকার নেই যে আমাদের সাথে পরামর্শ না করে এই পাঠ্যপুস্তকগুলিকে বিকৃত করার এবং আমাদের স্পষ্ট প্রত্যাখ্যান সত্ত্বেও আমাদের নামে এগুলি প্রকাশ করার," ওই চিঠিতে আরও বলা হয়েছে যে, কোন প্রদত্ত কাজের লেখক হিসেবে কারো দাবি সম্পর্কে তর্ক- বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু এটা আশ্চর্যের যে, যে লেখক এবং সম্পাদকরা তাদের নাম এমন একটি কাজের সাথে যুক্ত করতে বাধ্য হন যা তাঁরা তাঁদের নিজেদের কাজ বলেই চিহ্নিত করতে পারেন না।"

    যোগেন্দ্র যাদব এবং সুহাস পলশিকর পরিষ্কার জানিয়েছেন যে তাঁরা চান না যে এনসিইআরটি তাঁদের কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ছাত্রদের কাছে "রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নামে এমন পাঠ্যপুস্তক তৈরি করছে যেগুলোকে আমরা রাজনৈতিক ভাবে পক্ষপাতদুষ্ট, তত্ত্বগত ভাবে অসমর্থন যোগ্য এবং শিক্ষাগতভাবে অকার্যকরী বলেই মনে করি।”

    সূত্রনির্দেশ:


    1. "Palshikar, Yogendra write to NCERT chief: We’ll sue if you don’t remove our names from textbook", Ritika Chopra, Indian Express, June 18, 2024
    2. "Babri Masjid's Name Deleted, Referred as 'Three-dome Structure' in Revised NCERT Textbook", The Wire Staff, 16/Jun/2024


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ২২ জুন ২০২৪ | ২৬২ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অরিন | ২৩ জুন ২০২৪ ০৬:১০533633
  • নাম সরাতে বলছেন ভাল কথা। তাহলেও যাদব ও পলশিকর NCERT উপদেষ্টা কমিটি থেকে নাম সরিয়ে নিলে এটা তো প্রমাণিত হয় না যে ইতিহাস বিকৃত করার সিদ্ধান্তের তাঁরা প্রতিবাদ করেছিলেন। 
  • Suvasri Roy | ২৯ জুন ২০২৪ ১০:৫৯533863
  • পড়লাম। এরকম ব্যাপার সত্যিই মেনে নেওয়া যায় না। 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লুকিয়ে না থেকে মতামত দিন