

ছবি: রমিত
আমি এখন যতটা বেঁটে, ছোটবেলায় তো তার চেয়েও বেঁটে ছিলাম, তাই নদীর সাদাটে হলুদ বালি পেরিয়ে যে লাল কাকরের টিলাগুলো ঢেউ এর মত ওঠানামা করতে করতে নীল আকাশের দিকে রওনা হত, সেগুলির উপর উঠতে পারতামনা। চড়ুইভাতির দাদারা কেউ না কেউ পিঠে নিত। ওগুলি মাথায় দাঁড়ালে দূরে নীল আকাশের গায়ে সাদা হলুদ ছোট ছোট বাড়ী, ইলেকট্রিকের পোস্ট,টানা চলে যাওয়া তার, তারের উপর বিন্দু বিন্দু কালো পাখি দেখা যেতো। খুব ঘন করে আসা মেঘের দিনে তো চড়ুই ভাতি হতোনা, তখন যদি বেড়াতে যাওয়া হত তারের উপরে গাছের উপরে সাদা সাদা বিন্দু দেখা যেত। হঠাৎ তারা একসাথে ঝপ করে ঘন নীল মেঘের গায়ে ভেসে উঠত। আকাশে উড়িছে বক পাতি। শ্যামলী দি ইস্কুলে ‘নীল অঞ্জন ঘন পুঞ্জ ছায়ায়’ শিখিয়েছিলেন। টিলার উপর দাঁড়িয়ে দু-হাত ছড়িয়ে নাচ করতে ইচ্ছে হত।
এখন আর সেই টিলাগুলো তেমন উঁচু দেখায় না। আমি মাথায় একটু, আর চওড়ায় বেশ অনেকটা ছড়িয়েছি বলে নয়, সেগুলি কাটা পড়েছে বলে। রাস্তা আর বাড়ী-ঘর তৈরিতে ওরা ধীরে ধীরে মাটিতে মিশে গেছে। ওদিকে রিং রোড হয়েছে। শান্তিনিকেতনের মত এখানেও এখন হাট বসছে। কিছু মাটির গয়না,গামছার সাথে চীনদেশের প্লাস্টিকের সস্তা পুতুল,গাড়ি, মাথার ক্লিপ ও পাওয়া যায়। জিলিপির পাশেই মস্ত বড় চিপসের প্যাকেটে র মালা ঝোলে। মোটর গাড়ি, মোটর সাইকেলে চড়ে অনবরত মানুষ ছুটে আসে ফি শনিবার। পথের ধারে বুনো ফুলের গন্ধ আর তাই তেমন পাওয়া যায়না। লাল ধুলোয় থার্মোকলের গুঁড়ি, ছেঁড়া প্লাস্টিকের টুকরো মিশে থাকে। ওদিকে নদীর ধারটি আলিশান সাদা পাথরে বাঁধিয়ে আলোর মালায় সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেখানে গঙ্গা আরতি শুরু হবে কদিন পরেই--- যদিও নদীটি গঙ্গা নয়। তার মাসতুতো বোনও নয়। শহরের মোড়ে, রাস্তায় আলোচনা চলে এ নিয়ে। এই উন্নতি নিয়ে। তাহলে জাতে উঠল এ শহর --- উন্নয়নের পথে।
নদীর ধারে ঝুপড়ি ঘরের মানুষগুলি আর মাছ ধরেনা তেমন, গান টান ও তেমন ভেসে আসেনা ওদিক থেকে সন্ধ্যার পর। পাকা বাড়ি উঠেছে নদীর বাঁধানো পাড়ের একটা দিক জুড়ে গায়ে গায়েই। ওদিকের ছেলেমেয়েরা এখন ডেলিভারি বয় এর কাজ করে অনেকেই। রাত দিনের ফারাক ঘুচেছে। রিল বানায় পাশাপাশি। টাকা আসে ভালো।
নদী শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকে ধুধু করা কালচে লাল পাথুরে জমি আর দেখায় যায়না। দেখা যায় না তাকে ভেদ করে যাওয়া কু- ঝিকঝিক রেলগাড়ির আলো। ফ্ল্যাটবাড়ি উঠেছে অনেক, রিসর্ট হয়েছে একটা – রিভার ভিউ। সুইমিংপুল আছে। পাথরের ফাঁকে ফাঁকে তির তির করে যে জলের ধারাগুলিতে আমরা মেঘলা দুপুরে বসে বসে আঙুল ছোঁয়াতাম, সেই ভূমিজল হারিয়ে গেছে কবেই। নদীতে নামতে ভয় হয়। বালি চোরেরা না জানি কোথায় মরণ কুয়ো খুঁড়ে রেখেছে! এইতো সেদিন, ষোলো বছরের নওল কিশোর মামাবাড়ি এসে নদীতে নামলে, তারপর গিয়ে পড়লে সেই মরণকূপে! হায়!
আমরা আর আমাদের অনেক পরে জন্ম নেওয়া ওই ‘ওরা’ একই শহরের ঠিকানা লিখি। ঠিকানায় রাস্তা, বাড়ী, শহর, জেলা, পিন কোড লিখতে হয়। কিন্তু, তাতেও কি পুরো ঠিকানা বোঝা যায়? সময়? সে যদি বাদ পড়ে তাহলে কি সত্যি সত্যি পুরো ঠিকানা হলো? যে রাস্তায় আমরা ইস্কুলের,পাড়ার বন্ধুরা খেলা করেছি সেই রাস্তার নামটি লিখে দিলেই সে কি একই থাকে বছরের পর বছর? না। থাকেনা। এই না থাকার কতকটা ভালো দিক আছে। কাঁচা নর্দমা, কাঁচা রাস্তা, রাতে অন্ধকার মোটেও ভালনা। চওড়া সুন্দর রাস্তাগুলি, উন্নত পয়ঃপ্রণালী দেখেই তো আমরা সিন্ধু দেশের সেই কবেকার জীবনকে উন্নত সভ্যতা বলে এখনো মানছি। কিন্তু পাড়ার মাঠটি যদি হারিয়ে যায়? যদি মস্ত বড় সেই বটেশ্বর লুটিয়ে পড়ে কোনো আসমান ছোঁয়া হোটেলকে জায়গা করে দিতে? যদি পাশের বাড়ির আম কাঁঠাল ছাওয়া বাড়িটি ভেঙে এমন এক ফ্ল্যাটবাড়ী ওঠে যে আমার জানলার উপর হামলে পড়ে এসে এক বিন্দু সবুজকেও জায়গা না দিয়ে? যদি বাড়ির দাম ঠিক হয় কেবল বর্গফুটের হিসেবে? তাহলে কোনো পাড়ার, তার রাস্তাঘাটের প্রকৃতি, পরিবেশ কি একই থাকে? হারিয়ে যাওয়া মাঠ, বটেশ্বরের সাথে সাথে যদি ছোটদের বিকেলের খেলা, নিজেদের ঝগড়া ঝাঁটি ভাব ভালোবাসার জগতটাও হারিয়ে যায় শ্রেষ্ঠ হবার অসম্ভব নেশায়? থাকে কি তখনও তাদের একই ঠিকানা? ঠিকানা আর মন দুটোরই প্রকৃতির পরিবর্তন হয়না কি? সে রাস্তায় তো আর শিশু রইলোনা – বোকা, চালাক, হিংসুটে, হাসকুটে, শান্ত, মারকুটে – যারা হাসে, কাঁদে, চেঁচায়, মন মরা হয়, ঝগড়া করে নিজেদের মর্জিমত? কই তারা? সেই তারা, যারা ইস্কুলে ক্লাসঘরের জানালা দিয়ে হাঁ করে বাইরে তাকিয়ে থাকত কোনও এক আশ্চর্য পাখি দেখে, যারা পথের পাশের পুকুরটিতে সোনা ব্যাংদের খেলা দেখতো অবাক হয়ে, মাঠে চরে বেড়ানো নাদুস নুদুস কালো ছাগলের কুচি কুচি ছানা জন্মানোর দৃশ্য দেখে বিস্ময়, ভয় আর আনন্দের এক জগাখিচুড়ি অনুভূতিতে কেঁপে কেঁপে উঠত? চনমনে গাছপালা, তড়বড়ে জীবজন্তু, কিলবিলে পোকা মাকড়ের সাথে চলতে ফিরতে গল্প করতে করতে জীবনের খেলাকে গ্রহণ করত সহজ ঔদাসীন্য আর ভালোবাসায়? একটি ঠিকানা কি কেবল একটা রাস্তা, একটা বাড়ি, একটা শহর একটা দেশ মাত্র? তার প্রকৃতির রং নয়? শিশুর রং নয়? বাড়ির রং নয়?
হয়তো নয়। কিম্বা আবার হয়তো। কিছু কিছু ঠিকানা, শিশুর রং, বাড়ির রং পাড়ার রং এর কথা বলে তো! তবে সে রং স্বাভাবিক, সাবলীল জীবন যাপন থেকেই যে সবসময় উঠে আসবে- এমন ভাবলে ঠকতে হবে! সে রঙ বিষাদের। কত কত দেশ, শহর, রাস্তার ঠিকানা খুঁজতে গিয়ে তুমি গিয়ে দাঁড়াবে ধ্বংস স্তূপের সামনে। সেখানে শিশুরা রাস্তায় বাগানে ছুটে বেড়ায় না, রক্তাক্ত ব্যান্ডেজে ঘা ঢেকে চোখে জল, হাতে বাটি আর এক পেট খিদে নিয়ে এসে দাঁড়ায় ত্রাণের গাড়ির সামনে। যারা খুব বড় বড় হোমরা চোমরা মানুষ, যারা প্রকৃতি নিয়ে সম্মেলনে উঁচু চেয়ারটিতে গিয়ে বসে, তারা জানে ওই চেয়ারটা ধরে রাখতে গেলেও বাহুবল সবচেয়ে দরকারী --- প্রাকৃতিক সম্পদ, মানব সম্পদকে নিজের কব্জায় আনতে। আর তাই নিজের স্বাভাবিক ঠিকানাতে কোনো কোনো জায়গা আর তার মানুষ জনকে আর ধরা যায়না! ইউটিউবে তাদের ‘একদা’ হিসেবে মন খারাপ করে খুঁজতে হয়। আফগানিস্তান, সিরিয়া, প্যালেস্তাইন…কত কত ঠিকানা আর কতই না সব ভূ-রাজনীতি!
হয়তো আমরা কোনোদিন খুঁজতে যাবো এভাবেই গ্রেট নিকোবরের ঠিকানা! কত কী না হবে সেখানে! আচ্ছা, কাদের জন্য হবে ? সেখানের মানুষদের জন্য? কি সুন্দর ছিল গাড়ওয়ালের সেই শহরটা- তেহরি। ভাগীরথী আর ভিলাঙ্গনা ঘিরে রেখেছিল তাকে। ইস্কুল, কলেজ, ঘড়িঘর -তার বাজার,দোকান! সব গিলে খেলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। চোখে জল নিয়ে বাড়িঘর আর জীবনকে ডুবে যেতে দেখলে মানুষ, একটু দূরের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে। তাদের পুনর্বাসন হল নিউ তেহরিতে। সে ঠিকানা আর পুরোনো তেহরির ঠিকানা কি এক হয়? হয়েছে এমন কোনোদিন? তেহরি লেকে জেগে ওঠে ঘড়িঘরের চূড়া। কাপ্তাই লেকের তল থেকে মাঝে মাঝে উঁকি মারে পুরোনো চাকমা রাজার বাড়ির মাথা খানি। তেহরি বা কাপ্তাই লেকে বোটিং করতে করতে কারুর কারুর হয়তো মন খারাপ হয়।
তবে সব মানুষ নিজেদের ছেড়ে দেয়না খড়গধারী উন্নয়নের হাতে। তারা কখনো ‘চিপকে’ ধরে তাদের গাছপালাকে, প্রাণ ও দেয় কত জনা – সেই যে সতেরশো তিরিশ সালে বিষ্ণোইদের মত। তারা জানে সাধারণ মানুষের জীবন- জীবিকা, আচার- বিচার, ভাষা, জ্ঞানভান্ডার আর সর্বোপরি তাদের খুশি কেড়ে নিয়ে সত্যি কোনো উন্নয়ন হয়না। যেটা হয় সেটা অন্য কারো আরাম আর খুশির স্বার্থে বলিদান। যেমন দিল্লিতে আরও বিদ্যুৎ দিতে গিয়ে ঘর ছাড়া হল তেহরির মানুষ। কর্ণফুলীর উপর বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ বানাতে ঘর ছাড়া হোল চাকমারা। এ ট্র্যাডিশন তো সেই কবে থেকেই চলছে! সেই যে গ্রাম আর অরণ্যের মধ্যে একটা বিভাজন করে দেওয়া হলো! ‘গ্রাম’ মানে উন্নত, শিষ্ট লোকের আবাদ। আর ‘অরণ্য’ মানে যাকে রণে জয় করা যায়না, ‘সভ্যতার’ হাতের বাইরে, অন্ধকার অশিষ্ট লোকের আড্ডা। তাই খান্ডব দহনে অরণ্যের পশুপাখি, সাথে সাথে বনের মানুষ গুলো পুড়ে মরলেও সেটা নিতান্তই স্বাভাবিক ঘটনা। জতুগৃহে পঞ্চ পাণ্ডব পুড়ে মরেনি শুনে আমরা খুশি, ‘অন্য’ কারা পুড়ে মরলো - তাই নিয়ে কে আর চোখের জল ফেলে? আসলে প্রকৃতির প্রতি প্রভুর মনোভাব, প্রকৃতি আঁকড়ে থাকা মানুষের প্রতি মনোভাবেও নিজেকে বুঝি বিস্তার করে। অরণ্যের অধিকার তাদের নয়, অরণ্যের সম্পদ তাদের নয়! নদী- সমুদ্র আমরা যেমন খুশি ব্যবহার করব, তাতে নদীর ধারের, সাগর পাড়ের মানুষের কী ক্ষতি হল, বা, এ নিয়ে তারা কী ভাবে – তা জানতে আমাদের ক্ষমতাধারীদের বয়েই গেছে! সাহেবরা তো রেলপথ আর নানান লাভজনক কাজে আমাদের বনগুলি উজাড় করে ফেললে। আবার বন সংরক্ষনের নামে আইনও চালু করলে- বনের মানুষের অভিজ্ঞতা বা মতামতের ধার না ধরে! উল্টে আবার কেবল বনের ফলমূল,পশুপাখির উপর নির্ভর করে থাকা শবরদের মত বনবাসী কিছু গোষ্ঠীকে ‘জন্ম অপরাধী’ বলে দাগিয়ে দেওয়াও হোল। কাজ তাতে আরও ভালো এগোলো! যে গাছ যে উপায়ে লাগিয়ে বন সাজালে তারা, তার সাথে এতদিন ধরে চলে আসা প্রকৃতি- মানুষের জীবনচক্রের যোগ তেমন কই? দেশ স্বাধীন হলেও সেই মনোভাবই কাজ করতে থাকলো। বনের মানুষ উচ্ছেদ হল সংরক্ষণের নামে, এদিকে চোরা শিকারির লুণ্ঠন ও চলতে থাকলো। উন্নয়নের স্বার্থে গাছ লাগানো থেকে নদীর জল ব্যবহার -কোনোটাই তেমন স্থানীয় প্রকৃতি-মানুষ নির্ভর জীবন আর জীবিকার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগালোনা। সেই মানুষদের ‘পবিত্র অরণ্য’ বা ‘পবিত্র জলাভূমি’ আগের জমানার মত স্বাধীন জমানার হর্তা কর্তাদের কাছেও অশিক্ষিতের প্রাচীন সংস্কার হয়েই রয়ে গেল। ধান গমের নানান দেশীয় রকম কেমন ভাবে হারিয়ে গেলো, সাথে সাথে হারিয়ে গেলো সেই লম্বা লম্বা খড়, যা দিয়ে ছাওয়া মাটির বাড়ি শীতে গরম আর গরমে ঠান্ডা থাকে – তার গল্প ও তো মুখে মুখে ফেরে। এদিকে বাজার ভরানো সস্তা কাপড় চোপড় তৈরির নেশায় দূষিত হল জল, হারালো মাছ আর জেলেদের জীবন! ওদিকে যারা জীবনে লাঙল ছোঁয়নি সেই শবরদের ইটের খুপরিতে তুলে এনে হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো চাষবাসের সরঞ্জাম! গল্প কি একটা? ধুনো, ধূপ আর রূপটানের ভেষজ উৎপাদনের কারখানাগুলিতে সরবরাহ করতে গিয়ে যথেচ্ছ ভাবে লুন্ঠন চলল অরণ্য সম্পদের। আমরা ভেবে বসলাম আমরা খুব- খুব- প্রকৃতিকে মর্যাদা দিচ্ছি হার্বাল মেখে, আর মাটির উপর হিউমাসের চাদর এলো পাতলা হয়ে। এর উপরে জন্ম নেওয়া ছত্রাক আর ব্যাং এর ছাতা --- যা বনের মানুষকে সহজ পুষ্টির জোগান দিত তারা আর ফুটবে কোথায়? ছোট, ছোট প্রাণীগুলো মরতে থাকলো চোরা শিকারীর হাতে। মুশকিল হল গরিব মানুষের প্রোটিনের চাহিদা মেটানো। কখন কোন গাছ থেকে কী সংগ্রহ করলে তাদের ক্ষতি হয়না, বা খাদ্যের জন্য কোন পশু কখন মারা যায় আর কোনটা যায়না -সে নিযে প্রকৃতির কাছাকাছি থাকা মানুষদের জ্ঞান ভাণ্ডার কাজে লাগলো কই?
প্রকৃতির সাথে জড়িয়ে মড়িয়ে বাঁচা মানুষ প্রকৃতিকে কাজে লাগায় ঠিক তেমনি ভাবে, যেমন করে আমাদের কাজে লাগে নিকট আত্মীয়রা। এ সম্পর্ক দমনের নয়। অধিকার স্থাপনের নয়। কে না জানে অধিকার করে সব কিছু পাওয়া যায়না? প্রকৃতি, নারী কাউকেই না। বরং ভয় থাকে সেখানে- কোনোদিন সে হয়তো প্রতিশোধ নেবে! তাই বুঝি বারে বারেই উঠে আসে আমাদের সৃজনশীল সত্তাটির প্রসঙ্গ। সে নিজের প্রয়োজন মেটাতে নতজানু হয়ে বসে প্রকৃতির সামনে, বলগায় বাঁধে সেই প্রয়োজনকেও। প্রকৃতির অনুমতি নিয়ে, তার সাথে পরামর্শ করেই সে এগোয় নিজের বিকাশে।
অরণ্য, পাহাড়, নদী, সাগর, পশু, পাখি এবং ‘অপর’ মানুষ- এদের কেবল বিচ্ছিন্ন গবেষণার স্পিসিস হিসাবে দেখার পথটি যে ভুল পথ, বরং আমার ‘আমি’- টার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা আর অর্থ যে অনেকটা তাদের সাপেক্ষেই উঠে আসে- সেই আদিম কৌম ভাবনাটিকেও ফিরে দেখার সময় এসেছে। পশ্চিমী বিজ্ঞান চর্চার নিস্পৃহতা-বিলাসী কাঠামো প্রান্তবাসী মানুষকে তার নিজস্ব অবস্থান ও নিজস্ব উদ্দেশ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে নিজের কাঠামোয় রেখে দেখতে চেয়েছে। সেই প্রকৃতির সাথে জড়িয়ে বাঁচা মানুষদের যে একটা নিজস্ব অবস্থান আর সেই অবস্থান থেকে নিজস্ব উদ্দেশ্য আছে, সেই জায়গা থেকে তাদের যে নিজস্ব বিশেষ জ্ঞান-প্রণালী বা দেখার, ভাবার চোখ তৈরি হয়েছে -তাকে মন থেকে সে স্বীকৃতি দিতে পারেনি। প্রকৃতি ও জীবনকে এই ‘অপর’ মানুষেরা দেখে তাদের মত করে – একের সাথে অপরকে জড়িয়ে। তাদের গাছপালা, পশুপাখির শ্রেণী বিন্যাস তাই পশ্চিমী ঢঙে পরস্পর বিচ্ছিন্ন আকার বা অঙ্গসংস্থানগত নয়। কে কী ভাবে কার প্রয়োজনে লাগতে পারে – অনেকটা সেই হিসেবেই তার শ্রেণী-সাজ। নিজেদের তৈরি করা মাপকাঠি দিয়ে তাদের যুক্ত করতে গিয়ে তাই আধুনিক বিজ্ঞান মাঝ মাঝেই পিছিয়ে পড়েছে! আর তাদের সেই পুরনো পথেই তাই ‘অপর’ কে দেগে দিয়েছে ‘অবোধ্য’ বলে। ঠিক যেমন নারীর জীবন থেকে উঠে আসা তার নিজস্ব জ্ঞান-প্রণালীকে পাত্তা দেয়নি তথাকথিত মূল ধারার পিতৃতান্ত্রিক ভাবনা। আধুনিক পাশ্চাত্য বিজ্ঞান চর্চা মেয়েদের যুক্ত করতে চেয়েছে, কিন্তু খোঁজ নেয়নি তাদের বিশেষ দৃষ্টিকোণ ও তার থেকে উঠে আসা উপাত্ত ও উপলব্ধিকে! কোনটা প্রয়োজনীয়, কোনটা অপ্রয়োজনীয় আর কোনটা বিপজ্জনক তাই গুলিয়ে গিয়েছে বারে বারেই -জীবন থেকে আলাদা করে প্রকৃতি চর্চায়। উন্নয়ন ও উন্নতির প্রসঙ্গ তাই বুঝি আজ সুস্থিতিহীন এক নিরানন্দ দৌড় হয়ে উঠেছে! এই দৌড়ে নীতি নির্ধারক হয়ে উঠেছে পুঁজি! আমরা প্রতি নিয়ত হারিয়ে ফেলছি আমাদের ঠিকানা!
কেমন করে বাঁচবো আমরা ঠিকানাহীন হয়ে? শুধু বন থেকে, পাহাড় থেকে, নদী আর সমুদ্রের ধার থেকে উচ্ছেদ হয়েই বুঝি মানুষ ঠিকানা হারাচ্ছে? আমরা, যারা নিজেদের মূল ধারার বলে মনে করে নিশ্চিন্ত -তারাও তো হারিয়ে ফেলছি নিজেদের। শুধু খামখেয়ালি প্রকৃতির দাপটে হারিয়ে যাওয়া নয়, শরীরে বেঁচে থেকেও তরুহীন, পাখপাখালিহীন, বন্ধুহীন, আবেগহীন আত্মউন্নতির যে অসুস্থ পরিকল্পনা –তার প্রতিস্পর্ধী কোনো পরিকল্পনা তেমন দাপটের সাথে দাঁড় করাতে পারছি কই? হয়তো এতদিন যাদের ‘অপর’ বলে ভাবতে শেখানো হয়েছিল -সেই সভ্যতার পুঁজিহীন মানুষরাই আমাদের মসীহা হয়ে উঠবে। উৎকট উন্নয়নের দাপটের আঁচ তাদের সরাসরি আঘাত করে কোণঠাসা করছে, আর তাই দেওয়ালে পিঠ থেকে যাওয়া মানুষেরা বাধ্য হয়েছে সরাসরি লড়াইয়ে নামতে! লড়াই দেওয়া ছাড়া আর যে অন্য কিছু করার নেই তাদের! ওড়িশার নিয়মগিরি পাহাড়ে নিয়মরাজার অধিষ্ঠান ভাঙতে গিয়ে তাই বেদান্তের মত কর্পোরেট সংস্থাকে হার মানতে হয়। ভাইজাক হাইপার স্কেল ডেটা সেন্টার প্রকল্প, রাজস্থানের অবৈধ খনি মাফিয়া, নদীর বালি মাফিয়াদের বিরুদ্ধে এ ভাবেই হয়তো দানা বাঁধতে থাকবে আন্দোলন। অন্য স্বর সরব হবে গ্রেট নিকবরেও! আমরা পাড়ার বটগাছটি, থর্মোকল আর অন্য আবর্জনার দাপটে হারিয়ে যেতে থাকা পুকুরগুলি, খেলার মাঠ ফিরিয়ে আনতে কি চেষ্টা করবোনা? আমাদের হারিয়ে যাওয়া ঠিকানাগুলি নতুন করে ফিরিয়ে দিতে পারিনা সন্তানদের? যাতে আমরাও না হারিয়ে যাই?
. | ০৫ জুন ২০২৬ ১৭:৩৪741028
kk | 2607:*:*:*:*:*:*:* | ০৫ জুন ২০২৬ ২২:০২741034
kk | 2607:*:*:*:*:*:*:* | ০৫ জুন ২০২৬ ২২:০৪741035