এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • কথার কথা  দুই

    হীরেন সিংহরায় লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১৭ জুলাই ২০২৬ | ২১ বার পঠিত
  • কথার কথা

    দুই

    ফ্রেজ ইডিয়ম

    উচ্চ মাধ্যমিকের সিলেবাসে বাংলা প্রবাদ, ইংরেজি ফ্রেজ ইডিয়ম এবং তার প্রয়োগ অবশ্য পাঠ্য ছিল। ‘ তুমি যে ডুমুরের ফুল ‘লিখলেই হবে না, তাকে মাত্র কখনো সখনো দেখা যায় বলেই যে সে এই কৌলীন্য অর্জন করেছে বাক্যের মধ্যে সেটি বোঝাতে হবে। নইলে মাথায় দুটি চাঁটি অবধারিত। বাংলা ইংরেজির প্রবাদ প্রচলনে জানা গেল কিছু বাক্যাংশ দু ভাষাতেই মেলে, একটু অন্য চেহারায় যেমন ‘ নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা ‘ আর ‘ এ ব্যাড ওয়ার্ক ম্যান কোয়ারলস উইথ হিজ টুলস’, যেমন ‘ অমাবস্যার চাঁদ’ আর ‘ ব্লু মুন’। ব্যতিক্রমও পেলাম – ইংল্যান্ডের কভেন্ট্রি নামক শহরে কেউ যেতে চাইতেই পারে কিন্তু জানতে হয়েছে কোনো মানুষকে সেখানে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া মানে তাকে দূর করে দেওয়া ( সেন্ড হিম টু কভেন্ট্রি )। এমন শ খানেক ফ্রেজ ইডিয়ম মুখস্ত করে দুরুস্ত হয়ে তবেই না এই দ্বীপে পা দিয়েছি। ক্রমশ জানলাম, এতো সহজ নয়, সেখানেও হার্ডল রেস; পদে পদে বেড়া টপকানোর পালা।

    হয়তো আধেক শিখেছি গো, আধেকের বেশি আছে বাকি !

    হোয়েন রাবার হিটস দি রোড

    সবে কাজ শুরু করেছি লন্ডনে ; আমার চিফ জো ম্যাকিয়েভিতস চেনাচ্ছেন সিটি ব্যাঙ্ক। তিনি বলেছিলেন, ব্যাঙ্ক বদল করেছ, কিন্তু নতুন করে ব্যাঙ্কিং শিখতে হবে না। তবে ব্যবসা এক হলেও দু ব্যাঙ্কে কর্ম পদ্ধতি আলাদা হতেই পারে, সেটা চিনে নেওয়া দরকার। আগের ব্যাঙ্কে আমরা এটা এইভাবে করতাম, ওটা ঐ ভাবে করতাম এমন বলতে থাকলে তুমি সিটি ব্যাঙ্কে কেবল শত্রু সংখ্যা বৃদ্ধি করবে। আশা করি তুমি এখানে টিকবে অনেক দিন; আপাতত আমার দফতর নয়, নানা ডিপার্টমেন্টে পাঠাবো, যাও দেখো কোথায় কে কোন কম্ম করে, ভবিষ্যতে কাজে লাগবে। সেই প্রস্তুতি পূর্ণ করে যখন মাঠে নামবে, হোয়েন রাবার হিটস দি রোড, কোন অসুবিধে হবে না।

    প্রখর অ্যাংলোফাইল স্ত্রী শুনে বললেন রাবার হিটস দি রোড ? কখনো শুনি নি। মানে কি ?

    ধরে নেওয়া যাক এটি একটি চিত্রকল্প -মোটর গাড়িতে রাবারের টায়ার লাগানো হয়েছে কিন্তু সেটি কতটা বা আদৌ কর্মক্ষম কিনা সেটি বোঝা যাবে যখন সে গাড়ি পথে নামবে। গুজরাতিতে বলে নতুন বউ খোঁড়া বলে বাজে লোকে গুজব রটাচ্ছে, বহু জব চলে তো জানিও। অর্থান্তরে, এতদিন কি শিখলে, এবারে কাজে করে দেখাও। পথে নামো সাথি, অ্যাকশন !

    হিট দি গ্রাউনড রানিং

    সিটি ব্যাঙ্কের লুইশাম ট্রেনিং সেন্টারের প্রধান জন ম্যাকডোনালড নবীনতম কর্মীদের একটি ক্লাস নিচ্ছিলেন, শেষে তিনি বললেন, নাউ ইউ ক্যান হিট দি গ্রাউনড রানিং। মানে কি ? লাঞ্চ ব্রেকে অন্য শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রসঙ্গটা উঠলো। এতক্ষণ কি আমরা নির্জীব হয়ে কোথাও বসে ছিলাম বা শূন্যে বা স্বপ্নে দৌড় দিচ্ছিলাম, এবার মাটিতে পা ফেলে ? পরে জেনেছি বক্তার উদ্দেশ্য অন্য, তিনি বলতে চাইছেন বিদ্যা অর্জন করেছ, তোমরা এবারে প্রস্তুত, জিন দিয়ে ঘোড়ায় চড়েছো, দৌড় লাগাও, জান প্রাণ দিয়ে কাজে লাগো।

    এর অর্থ যে সহজবোধ্য নয় সেটা পরে একদিন ফরচুন ম্যাগাজিনে পড়লাম। এক পারসোনেল ম্যানেজার লিখেছেন তাঁর দফতরে কয়েকজন নব নিযুক্ত কর্মী এসে বলেছিলেন, এই যে সি ই ও তাঁর সম্বোধনী ভাষণে বললেন হিট দি গ্রাউনড রানিং। মানে কি আমরা অত্যন্ত অলস, এবারে দৌড় দিতে হবে ? পারসোনেল ম্যানেজার বোঝালেন সি ই ও বলতে চাইছেন তৎপর হয়ে কাজ করো !

    সংস্কৃতে যেমন বলেছে, উত্তিষ্ঠত, জাগ্রত !

    ইফ ইট সাউনডস টু গুড টু বি ট্রু, ইট অফন ইজ / হ্যাভ আই গট এ ডিল ফর ইউ

    লন্ডনে কাজের প্রথম বছর বষ্টনের জো ম্যাকিইয়েভিতস এক পক্ষী শাবকের মতন আমাকে আগলে রেখেছিলেন। তাঁর কাছে শুধু কাজ নয়, সিটি ব্যাঙ্কের গলি ঘুঁজিতে, অন্ধকারে পথ খুঁজে পেয়েছি, চিনেছি অজস্র আমেরিকানিজম। জো বলতেন আমরা সবাই দু পয়সা রোজগারের ধান্দায় আছি, ছুটছি, কখনো ক্লান্ত হয়ে পড়ি। এমন সময়ে কেউ একটা লোভনীয় ডিল নিয়ে এলো, হাতে মোয়া পেলাম ( ম্যানা ফ্রম হেভেন ) না চাইতেই জল ; ব্যাঙ্কের ঝুঁকি কম, ফি বেশি, পয়সা হি পয়সা। সেই উত্তেজনা শিকেয় তুলে ঠাণ্ডা মাথায় খুঁটিয়ে দেখো- যেখানে কেবল লাভই চোখে পড়ছে কোন রিস্ক নয়, খবর করো তার পিছনে কোন গলদ আছে কিনা। সন্দেহের মার নেই ।

    বাংলায় অতি ভালো ভালো নয়।

    বরো এ ব্রেন

    বিলীয়মান আইরিশ অ্যারিস্টোক্রেসির অন্যতম শেষ প্রতিভূ নিল পাইককে প্রভু হিসেবে পাওয়ার দুর্ভাগ্য ঘটেছিল আমার মতো জনা বারো নিরপরাধ ব্যাঙ্ককর্মীর। নিল পাইকের আচরণ এমন উদ্ধত ছিল, এক সময়ে পারসোনেল ডিপার্টমেন্ট তাঁকে মনে করিয়ে দেয় কেউ গুড মর্নিং বললে তার উত্তরে গুড মর্নিং বলতে হয়।

    ডমিনিক লেমেয়ার নামের এক আমেরিকান যুবক ছিল আমাদের সহকর্মী, ইংরেজি ও ফরাসি দুই ভাষাতে সমান স্বচ্ছন্দ, কিন্তু কোন অজ্ঞাত কারণে নিলের অপছন্দের খাতায় তার নাম উঠে গিয়েছিল। তার বুদ্ধি শুদ্ধির ব্যাপারে নিল প্রায়শ গভীর সংশয় প্রকাশ করতেন।। একদিন এক কাস্টমার মিটিঙে যাবো দুজনে। আমাদের প্রি মিটিং আলোচনা হচ্ছে নিলের অফিসে দাঁড়িয়ে ( কখনো বসতে বলতেন না ) কোন কোন বিষয় কভার করা দরকার। এক সময়ে ডমিনিক বললে, আর কিছু নিল ? নিল পাইক অবলীলাক্রমে বললেন, ও ইয়েস, বরো এ ব্রেন।

    এটি নিছক বক্রোক্তি। কখনো কৌতুকের ছলে, বেশির ভাগ নিন্দার্থে ব্যবহৃত।

    ইউ ক্যান নট বি সিরিয়াস

    পরপর পাঁচ বারের উইম্বলডন টেনিস বিজয়ী বিওরন বর্গকে তাঁর ধারাবাহিক ষষ্ঠ ফাইনালে ( ১৯৮১) তাঁকে হারিয়ে ধূমকেতুর মতন উদিত হয়েছেন জন ম্যাকেনরো। দুনিয়া জুড়ে টেনিস কোর্ট দাবড়ে বেড়াচ্ছেন, সেই সঙ্গে টেনিসের ব্যাড বয়েজের ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন।তাঁর র‍্যাকেট এবং মুখ দুইয়ের আক্রমণ ভীতিজনক। আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে তিনি ঘোর অনিচ্ছা প্রকাশ করে থাকেন। ইলেক্ট্রনিক মাপক যন্ত্র বহু দূরে তখন, নেটের অনেকটা ওপরে চেয়ারে বসা আম্পায়ার বেস লাইনে দাঁড়ানো লাইন জাজের মত মেনে নিয়ে অথবা ওভাররুল করে হয়তো বললেন বলটা আউট । ম্যাকেনরো মনে করেন তাঁর বল কিছুতে আউট হতে পারে না, চকখড়ির লাইনের ভেতরেই পড়েছিল। প্রায় করজোড়ে কিন্তু উচ্চস্বরে তিনি আম্পায়ারকে বলতেন, কাম অন, ইউ ক্যান নট বি সিরিয়াস। পরবর্তী কালে জেফ টারাংগো বা নিক কিরগিওসের মতন অ্যাংগ্রি ইয়াং মেন আম্পায়ারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্টাইলকে অন্য লেভেল নিয়ে গেলেও কারো কথা বা প্রস্তাব পছন্দ না হলে সেই আপত্তি জানাতে জন ম্যাকেনরোর, ‘ইউ ক্যান নট বি সিরিয়াস ‘ আমাদের বাচন ভঙ্গির অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।

    হু পেজ ইওর বোনাস /হু ডু ইউ রিপোর্ট টু?

    বাজারের তুলনায় আমরা একটু বেশি ফি দাবি করছি না কি ? কিংবা হয়তো সুদের হারটা একটু কমানো যেতে পারে ? উত্তরে জো বলেন, কে তোমার বোনাস দেয় ? কার চাকরি করো ?

    সবার উপরে বস সত্য, তাহার উপরে নাই।

    যদি ভুল করেও তাঁর নির্দেশ অমান্য করি বা তাঁর মতের বিপক্ষে কথা বলার ধৃষ্টতা দেখাই, তিনি মনে করিয়ে দেন আমার জান মালের মালিক তিনিই। তিনি আমার প্রভু, আমাকে পদচ্যুত করতে পারেন এবং তিনিই সাম্মানিক দক্ষিণা দিতে পারেন যার পোশাকি নাম বোনাস। বিশেষ করে সিটি ব্যাঙ্কে এটি অনেকবার শুনতে হয়েছে।

    অ্যানাদার ডে অ্যানাদার ডলার/ এ ডে টু লং , এ ডলার টু শর্ট

    জাহাজি নাবিকের অভিজ্ঞতা থেকে জোসেফ কনরাড ( হার্ট অফ ডার্কনেস -একশ চল্লিশ পাতার বইটি অবশ্য পড়বেন, কঙ্গোর নির্মম ছবি ) লিখেছিলেন, সে সময়ে দিনের কাজের শেষে নাবিকরা হাতে দৈনিক মজুরি পেতেন এক ডলার ; দিন আনি দিন খাই ! দিনগত পাপক্ষয়, দিনগত ডলার আয়, ক্লান্তিকর পুনরাবৃত্তি। চাকা ঘুরতেই থাকে। ব্যাঙ্কের ট্রেডিং ডেস্কে অ্যানাদার ডে অ্যানাদার ডলার খানিকটা অন্য অর্থ বহন করে। কালকের প্রফিট ভুলে যাও, ইউ আর অ্যাজ গুড অ্যাজ ইয়োর নেক্সট ট্রেড। আমাদের দেশের ভাষায় ড্রাইভার কি জিন্দগি গাড়ি কি চাল পর, কারেন্সি, মানি, শেয়ার ট্রেডারের জিন্দগি আগলি ট্রেড কি মুনাফা পর ! আগের দিনটা হিস্টরি, পুরানা কিসসা মাত্র, নতুন দিনে চাই নতুন লাভ, অ্যানাদার ডলার। ক্ষণজীবী দৃষ্টিকোণ।

    জাপান সোনি কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা আকিও মোরিতা সিটি ব্যাঙ্ক নিউ ইয়র্কে আমন্ত্রিত হয়েছেন, ব্যাঙ্কের নানান বিভাগে ঘুরছেন। কারেন্সি ডেস্কে এক ট্রেডারকে জিজ্ঞেস করলেন, ডলার/ ইয়েন বিনিময় দর কোনদিকে যাবে বলে তিনি মনে করেন। উত্তরে ট্রেডার বলেন, ৩৫০। মোরিতা জানতে চান এটা কতদিনের জন্য ধরে নেওয়া যায় ? ট্রেডার বলেন, আজকের লাঞ্চ অবধি। আকিও মোরিতা তাঁর আত্মজীবনীতে ( মেড ইন জাপান ) লিখেছেন জাপানে আমরা এতোটা স্বল্প মেয়াদি চিন্তা করি না !

    সবেরই অর্থ বিস্তার হয়। জো ফিট নাম্নী এক ইংরেজ তরুণী কিছুকাল আমার জন্য কাজ করেছে, তার বয় ফ্রেন্ড ছিল ষ্টক ট্রেডার। সে বলতো , যদি জানতে চাও কেমন আছি, তাহলে বলব - এ ডে টু লং, এ ডলার টু শর্ট ! ব্যবসা খারাপ, আরেকদিন কেটে গেলো, আরেকটা ডলার এলো না !

    স্টাম্প আপ দি ক্যাশ

    মাল ছাড়ো, টাকা ঢালো।

    সিটি ব্যাঙ্কের সহকর্মী অ্যানড্রু গার্ডেনের বাস ছিল ব্রিটেনের একমাত্র প্ল্যানড টাউন মিলটন কিনসের অদূরে ক্লিফটন রেইনস গ্রামে। মিলটন কিনসের বোলে জুলাই মাসে মিউজিক ফেস্টিভাল হতো, ঐন্দ্রিলাকে সেখানে পৌঁছে অ্যানড্রুর বাড়ি গেছি, অনুষ্ঠান শেষে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছি। অ্যানড্রু এম সি সির ফুল মেম্বার। বড়ো ম্যাচে তার টিকিট বাঁধা কিন্তু আমাদের মতন আম আদমির কপালে কি জোটে ? ১৯৮৬ সালে ইংল্যান্ড বনাম ভারতের লরডস টেস্টের টিকিট খুঁজছি। অ্যানড্রু বললে সে বিশ্বস্ত কাউকে জানে, টিকিট পাওয়া যাবে তবে আগে ভাগে ইউ হ্যাভ টু স্টাম্প আপ দি ক্যাশ।

    ক্রিকেট খেলার স্টাম্প জানি, এর সঙ্গে নগদ নারায়ণের কি সম্পর্ক ?

    আমেরিকার ওয়াইল্ড ওয়েস্টের পশু মেলায় ঘোড়া কেনা বেচা শুরুর আগেই ক্রেতা তার ক্যাশটি এক খুঁটিতে ( স্টাম্প ) বেঁধে জানিয়ে দিতো তার দৌড় কতদূর, জুয়োর ভাষায় শো অফ হ্যান্ড । এবার দরাদরি। কালক্রমে এই অভিব্যক্তি দীর্ঘায়িত হয়ে ঘোড়ার ব্যবসা থেকে অর্থের ব্যবসায় ঢুকে পড়ল – স্টাম্প আপের সঙ্গে যোগ হল ক্যাশ। অরিজিনাল যুক্তিতে খদ্দের স্টাম্প আপ করেছে, ক্যাশ দেখিয়েছে হয়তো অধিকন্তু ন দোষায় বলে দি ক্যাশ যোগ হয়েছে।

    সাক ইট অ্যান্ড সি

    স্টিভেন পারট্রিজ -হিক্সকে আমাদের লন্ডনে অফিসের চিরস্থায়ী অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড প্রফেসর বলা হতো। নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্কের দারুণ ডিগ্রিধারী স্টিভেন জটিল অঙ্ক কষে ইনভেস্টমেন্ট স্ট্র্যাটেজি বানাতো। তার কাজটা এমনি রিফাইন্ড স্টেজে পৌঁছে যায় যে নির্জনে গোপনে রিসার্চ করার সুবিধের জন্য তাকে স্ট্র্যানড অফিসের সাত তলায় আলাদা অফিস দেওয়া হয়। সেখানে ঢুকতে পাসওয়ার্ড লাগতো, সেই ১৯৮৬ সালেই ! তার কঠিন অঙ্কের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে যখনই কেউ বলত এটা ঠিক কীভাবে কাজ করে, স্টিভ ? তার উত্তর হতো – সাক ইট অ্যান্ড সি। যেমন আইসক্রিম চুষেই বোঝা যায় সেটা ভালো কিনা, তেমনই তার থিওরি কাজে লাগালেই তার গুণবত্তা বোঝা যাবে। আমাদের মহিলা সহকর্মীরা প্রথম দিকে এই ব্যাখ্যা শুনে বেশ অসন্তুষ্ট হতেন মনে আছে।

    দিস ডিসকাশন হ্যাজ নট টেকন প্লেস / ইউ নেভার হার্ড ইট ফ্রম মি /বিটউইন ইউ অ্যান্ড মি

    গুপ্তকথা মন্দ নয় গোছের এই লাইনটি যে কতবার শোনা গেছে ; বক্তা কোন গুজব অথবা আসন্ন কোন অঘটনের সংবাদ দেবার আগে এই মুখড়াটি করেন। বাংলায় আমরা বলি, কাউকে বোলো না যেন,শুধু তোমাকে বলে বলছি। এক্ষেত্রে অমুক লোক তমুক জায়গায় বদলি হবেন, ঐ জনের কাজ গেল, টম বিশাল বোনাস পাচ্ছে অথবা বরখাস্ত হবে এই খবরটি যিনি দিচ্ছেন তিনি গোড়াতেই একটি চেতাবনি দিয়ে রাখলেন, আমাকে ফাঁসিও না, এ খবর আমি তোমাকে দিই নি। এ রকম কোন আলোচনাই কখনো হয় নি, আমার কাছে শোনো নি। সবশেষে, ব্যাপারটা তোমার আমার মধ্যেই থাকুক, পাঁচ কান যেন না হয়।

    অস্ট্রিয়ান ব্যাঙ্ক ক্রেডিট আনস্টালট ব্যাঙ্কের মিকলস পালফি আমাকে একটি ট্রেড ডিলে ট্যাক্স বাঁচানোর রাস্তা বাতলে দিয়ে বলেছিলেন, এটা আমি আপনাকে বলিনি। অর্থাৎ বিনা স্বার্থে কোন অস্ট্রিয়ান ব্যাঙ্কের পক্ষে এক আমেরিকান ব্যাঙ্কের ব্যবসায় সুবিধে করে দেওয়াটা তার বসেরা ভালো চোখে দেখবেন না। অতএব আমি যেন সেটা প্রচার না করি, দিস ডিসকাশন হ্যাজ নট টেকন প্লেস।

    লিভ টু ফাইট অ্যানাদার ডে

    লাইনটা কবি অলিভার গোল্ডস্মিথের

    হি হু ফাইটস অ্যান্ড রানস অ্যাওয়ে
    লিভস টু ফাইট অ্যানাদার ডে

    আজকে হার মেনে নেওয়া সই, আপনি বাঁচলে আরেকদিন লড়াই হবে! ১৯৪০ সালের মে -জুন মাসের দশ দিনে ডানকার্ক থেকে ব্রিটিশ এক্সপিডিশনারি ফোরসের গৌরবময় পশ্চাপদসরণ এমনি একটি উদাহরণ। সেই দশ দিনে প্রায় চার লক্ষ ব্রিটিশ সৈন্য জার্মান সেনা বাহিনীর মুখোমুখি না হয়ে পলায়ন করলেন; ইংরেজ তার নাম দিয়েছে গ্লোরিয়াস রিট্রিট। তবে একে কি নিছক লেজ তুলে পালানো বলা যায় ? চার বছর বাদে নরমান্দি ল্যান্ডিঙে এঁরাই আরেকবার সুযোগ পেলেন জার্মানদের পালটা মার দেওয়ার! একটা ডিল হারালেই সব কিছু শেষ হয়ে যায় না, আমার টিম মিটিঙে অনেক বার বলেছি, ক্ষতি নেই, বেঁচে যখন আছি, আবার লড়ব ! উই লিভ টু ফাইট অ্যানাদার ডে !

    হোয়ার ডু আই সাইন

    মানে ডিল এতো ভালো, আর কিছু দেখার দরকার নেই, প্রশ্ন নেই। সই করে ফেলি।

    সাধু ব্যক্তি এক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করে থাকেন! জার্মানে বলে বিশ্বাস করা ভালো, পড়ে দেখে নেওয়াটা আরেকটু বেশি ভালো।

    গেটিং দেয়ার , স্লোলি

    যখন লন্ডনে আসি, ব্রিটিশ রেল ছিল সরকারি মালিকানায়। ট্যাগ লাইন কথাটা তখন চালু হয় নি, তাই বলা যাক ব্রিটিশ রেলের স্লোগান ছিল – গেটিং দেয়ার। কেমন করে জানি না, পাবলিকের কথা বার্তায় এটি অসম্ভব ব্যবহার হতো – কাজটা শেষ হল ? উত্তর গেটিং দেয়ার, নতুন বাড়ি খুঁজছিলেন এতদিন, পেলেন ? গেটিং দেয়ার।

    ক্রমশ দেখা গেল ব্রিটিশ রেলের সময়ানুবর্তীতা এমনি খারাপ, কোন ট্রেন কোথাও সময়ে পৌঁছয় না। কুলোকে জুড়ে দিল গেটিং দেয়ার,স্লোলি ! অফিসে এমন উত্তর শুনেছি, কাজটা হল ? ইয়েস, গেটিং দেয়ার, স্লোলি !

    ওয়ান স্টপ শপ

    আজকের গ্লোবালাইজেশনের যুগে পৌঁছে বলতেই হয় এর পুরোধা, পাইওনিয়ার ছিল সিটি ব্যাঙ্ক। ১৯৮৫ সালে যে সিটি ব্যাঙ্কে যোগ দিয়েছি সেটি ছিল চার আই এর জন্য বিখ্যাত – ইনডিভিজুয়াল ব্যাঙ্ক ( আপনার আমার সেভিংসের খাতা, ক্রেডিট কার্ড ),ইনসটিটিউশনাল ব্যাঙ্ক (আজকের কর্পোরেট ), ইনভেস্টমেন্ট ব্যাঙ্ক এবং ইন্সিউরেন্স। কোন কোম্পানিকে টাকা ধার দেওয়া, তার শেয়ার ট্রেডিং, সি ই ওর গোল্ড কার্ড, নানান প্রকারের ইন্সিউরেন্স- মানে একবার কেউ ব্যাঙ্কে পদার্পণ করলে তার আর ছাড় নেই – পাঁচটা প্রোডাক্ট তাকে ধরিয়ে দেওয়া হবে – বচকে রহনা ! যদিও ওয়ান স্টপ শপের সোল কপি রাইট আমরা দাবি করতে পারি না এটি আমাদের প্রেজেন্টেশনে আকছার ব্যবহার করেছি।

    আজকের একমেবাদ্বিতিয়ম ওয়ান স্টপ শপের নাম – আমাজন !

    দ্যাট ওয়াজ দি লঙ্গেষ্ট ফাইভ মিনিটস

    মাইকের সঙ্গে মিটিং দশটায়, পথে স্লো ট্রাফিক। ফোন করে বললাম, পাঁচ মিনিটে হাজির হব। আধ ঘণ্টা বাদে পৌঁছুলে মাইক বললেন ওয়েল, দ্যাট ওয়াজ দি লংগেষ্ট ফাইভ মিনিটস।

    হেলিকপটার ভিউ / টেন থাউজেনড ফিট ভিউ

    বেয়ার স্ট্যার্ণ থেকে এসেছিলেন লেনি ( লেওনারড ) ফেদার ; এক সময়ে ইকুইটি ট্রেডিং করতেন। পরে আমাদের ব্যাঙ্কে ফাইনানশিয়াল মার্কেটসের চিফ হয়েছিলেন, যার অধীনে সতেরোটা বিভিন্ন ব্যবসা। তাঁর পক্ষে সবগুলিকে খুঁটিয়ে চেনা জানা সম্ভব নয়। তিনি জানতে চান সব মিলিয়ে কেমন চলছে মানে ধরুন আকাশ থেকে দেখছেন একটা র‍্যাঞ্চ, তার আকার, রেভেনিউ সাইজ কতো বড়ো সেটা জানতে চান ; কোন ঘরে দশ বুশেল গম আছে কোন ঘরে একশ মুরগি সেটা নয়। খুঁটি নাটি বা নাট বলটু নয়, গোটা মেশিনের চেহারা। আমরা সবাই এমন অনেক বস পেয়েছি যারা ঐ ‘ মোটা মোটা ‘ কত হবে তাই জানতে চান, ডিটেলসে যেতে অনিচ্ছুক। সেটা জানালেও বুঝবেন না।

    জারগন

    ফরাসি শব্দ জারগোঁ থেকে আমরা পেয়েছি জারগন ; পাখির কিচির মিচির, টুইট, যার শব্দ আছে অর্থ নেই, হায়ারোগ্লিফিকের মতো দুষ্পাঠ্য। ক্রমে মানুষের অস্পষ্ট অর্ধ উচ্চারিত সাঙ্কেতিক কিছু শব্দকে জারগন, আখ্যা দেওয়া হল; যার কোন ব্যাকরণ সম্মত অর্থ নেই। এটির ব্যবহার তবে কোথায় ? খুঁজে দেখুন জারগন আছে সর্বত্র, আমাদের তিসরা কোলিয়ারির বাড়িতে একটি অন্ধকার ঘরের নাম ছিল চোর কুঠুরি, সেটি কুঠুরি বটে কিন্তু চোর থাকত না সেখানে। আমার বাল্য বন্ধু চিন্ময়ের আলু পোস্তা থেকে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া সব জায়গাতেই দেখেছি অনেক নাম বা শব্দ ব্যবহৃত হয় যেগুলির নিহিত অর্থ শুধু ঘরের লোকেরা জানেন, সিক্রেট সোসাইটির যেমন থাকে কোড ওয়ার্ড ! জারগন তাই প্রতিষ্ঠানের ভেতরে পারস্পরিক বাক বিনিময়ের মর্স কোড – গোপন কথাটি রবে গোপনে। ট্রামে বাসে টিউবে ব্যাঙ্কের বিজনেস নিয়ে আলোচনা করতে পারি এমন ভাবে যে পাশের কেউ সেটা বুঝবে না। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, কনটিনেনটাল ইলিনয়, সিটি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড – যেখানেই কাজ করেছি, পেয়েছি এমনি কিছু সাঙ্কেতিক শব্দবন্ধ। স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়াতে কলকাতার হেড অফিসের বাতানুকুলিত আরাম থেকে রাজাভাতখাওয়া বা খেজুরিয়া ব্রাঞ্চে বনবাসে পাঠানোর প্রক্রিয়ার নাম ছিল লাইন অ্যাসাইনমেন্ট- এই লাইনটি কি সে প্রশ্ন করে লাভ নেই। কনটিনেনটাল ইলিনয়তে তাদের নাম টি সি এন ( থার্ড কান্ট্রি ন্যাশনাল ), আমাকে ফ্রাঙ্কফুর্ট থেকে ব্রাসেলসে বদলি করলে আমার পরিচয় হতো তৃতীয় দেশ বাসী। আজ বলতে পারি সিটি ব্যাঙ্কের জারগন সঞ্চয় অন্য সব প্রতিষ্ঠানকে ছাপিয়ে গিয়েছিল বহুগুণে, লন্ডনে আমার শিক্ষানবিশির বিপুল অংশ কেটেছে জারগন চিনতে এবং যথাবিধি প্রয়োগ করতে। জারগন চিনতে জানতে হয়, নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়! যদিও অনেক বছর কেটে গেছে, চারজন সি ই ও বদলেছে তবুও নিউক্লিয়ার কোডের মতন সিটির গুঢ় গোপন রহস্য হাটে বাজারে ফাঁস করা সমীচীন হবে কিনা জানি না। সামান্য কিছুর উল্লেখ হয়তো করা যায়: যেমন অ্যাক্রোনিম বানানোয় সিটি ব্যাঙ্কের জুড়ি ছিল না। আপাত দৃষ্টিতে সহজবোধ্য একটা টার্ম - এম আই এস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) , যা দিয়ে কর্তা ব্যক্তিরা চলতি আয় ব্যয়ের ওপরে চোখ রাখতে পারেন। কিন্তু এর প্রয়োগ অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়ে যখন বলি লন্ডনের একটি ডিলের আয়ের তিনভাগের একভাগ এম আই এস করে আরেক দেশের সিটি ব্যাঙ্ক ব্রাঞ্চে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এই এম আই এস কোন অন লাইন মানি ট্রান্সফার নয়, এর অস্তিত্ব একমাত্র কল্পনায় এবং আমার বার্ষিক বাজেটে। ক্রস বর্ডার মানে সীমান্ত পেরুনো নয়, বিদেশি রিস্ক ; ফাস্ট (এফ এ এস টি ) মানে দ্রুত নয় – ফরেন অ্যাসাইনমেনট শর্ট টার্ম, ও ইউ সি – অরিজিনেশন ইউনিট কোড ঠিক কোন দফতর থেকে কোন বাণিজ্য হয়েছে তার মার্কা - এটিকে ঠিকমত ম্যানেজ করতে না পারলে আমার বিজনেসের আয় অন্য কেউ খেয়ে নিতে পারে। সিটি স্পিক নামের একটি আভ্যন্তরীণ বাক প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছিল। যারা স্কুল বা কলেজের গণ্ডি পেরিয়েই সিটিতে ঢুকেছেন তাঁরা এই বাচন ভঙ্গিতে সিদ্ধবাক, কিন্তু আমার মতন যারা বিলম্বে ( মিড ক্যারিয়ার হায়ার ) এই অট্টালিকায় প্রবেশ করেন তাদের মনে হয়েছে তোমার ভাষা বোঝার আশায় দিয়েছি জলাঞ্জলি ! মনে আছে লন্ডনের একটি ককটেল রিসেপশনে লয়েডস ব্যাঙ্কের ইয়ান ফিটজেরাল্ড বলেছিলেন, তোমাদের জারগন এতো জটিল কেন ? পাছে বাইরের কেউ তোমাদের ব্যবসার ঘাঁত ঘোঁত ধরে ফেলে সেই ভয়ে কি সিটির এই কাঁটাতারের বেড়া? আমার মনে হয় ব্যাঙ্কের ভেতরেও হয়তো সবাই সেগুলো বুঝে ওঠে না !

    শব্দজব্দ

    ইনফরমেশন টেকনোলজি এবং শব্দের সুনামি

    বিলেতের কর্ম জীবনে নানান টার্ন অফ ফ্রেজ শুনি। সে শুধু কথার মার প্যাঁচ নয়, তার মধ্যে আছে সুপ্ত কৌতুকের আভাস। একটি কথাকে অন্যভাবে বলা, তার অর্থকে নিয়ে খেলা করাটা বুদ্ধির মধুর ব্যায়াম। কিন্তু তারও ভোল বদলাতে থাকল নয়ের দশকে। ইন্টারনেট টেকনোলজি কেবল এক নতুন যুগের সূচনা করে নি, তার প্রয়োগশালা অ্যাংলো কলা কৌশল সম্বলিত বাচন যার ভেতরে অনেক চেষ্টা করেও কোন বুদ্ধিদীপ্ত ভাবনার ইঙ্গিত খুঁজে পাই নি। কিছু নামি সি ই ও যেমন কালো টারটল নেক পরা স্টিভ জবস, অনেক মাথা মুণ্ডুর মালিক, ইনহিউমান রিসোর্সের সঞ্চালকবৃন্দ এমন স্টাইলিস্ট কেতায় তার যথেচ্ছ ব্যবহার করলেন যে অনুগামীবর্গ,, প্রেস, পাঠক এবং বৃহত্তর কর্ম জগত নির্দ্বিধায় তাকে মেনে নিলো। আহা বেশ, এই বুঝি নতুন বিজনেস ল্যাঙ্গুয়েজ, এই তব নব মেঘদূত ! অপূর্ব অদ্ভুত ! অন লাইনে চলিয়াছে অলক্ষ্যের পানে। এতাবৎ আমরা যে ভাষায় ব্যবসার কথা বলেছি, তা নিতান্ত ওল্ড ফ্যাশনড। আমি নিজে ওল্ড, আমার ফ্যাশনটা ওলডার। উপায় ছিল না বলে এই নির্মম নির্বোধ ভাষার নিপীড়নে অভ্যস্ত হতে হয়েছে, কিন্তু আমার নিজের টিম মিটিং বা পাবলিক স্পিকিঙ্গে আন্তরিক প্রচেষ্টায় তাকে এড়িয়ে গেছি। আমার নিজস্ব অপছন্দ শব্দের তালিকা দীর্ঘ ; আজ মাত্র কয়েকটি বেছে নিলাম। পাঠক অনায়াসে আপন পছন্দের অপছন্দের শব্দাবলী যোগ করতে পারেন।

    ব্যান্ডউইডথ

    আক্ষরিক অর্থে কতটা ডেটা কোনো এক সময়ে নেট ওয়ার্কে পাঠানো যায় তাকে বলে ব্যান্ডউইডথ কিন্তু রূপক অর্থে ব্যান্ডউইডথ বোঝাল আমার বা আমার গ্রুপের কাজ করার সময় বা এলেম কতোটা। যেমন একদিন প্রভু বললেন, সকলের ব্যান্ডউইডথ অনুযায়ী কাজের বণ্টন করা প্রয়োজন। বলা যেতে পারতো না কার হাতে কতটা সময় বা কাকে দিয়ে কাজ হবে সেই বুঝে ?

    আনপ্যাক দ্যাট

    কথাটা খুবই দুর্বিনীত এবং অহংকারী শোনাবে এ কথা মনে রেখেই বলি এম বি এ এবং দুনিয়ার তাবৎ কনসালটেনটের প্রতি আমার বহু দিনের অনীহা আছে ; কোন কিছুই নিজের হাতে না করেও সে বিষয়ে জ্ঞান দিতে এঁদের জুড়ি নেই। এই দুই জগতের কোন মানুষকে আমি কখনো কাজে রাখি নি। একমাত্র কনসালটেনটকে বলতে শুনেছি ব্যাগটা খুলুন, এখুনি। একটা ব্যাগ বা বাকসোর ভেতরের সব জিনিস পত্তর উজাড় করে ফেলুন, অদ্য এই অকুস্থলে।

    বাংলায় ঝেড়ে কাশুন ? কণ্ঠ ছাড়ো জোরে ?

    সোশিয়ালাইজ

    কেউ একটা নতুন আইডিয়া পেশ করেছেন, বস হাঁ না কোনটাই বলতে চান না, তাঁর সে মুরোদ নেই। খানিক ভেবে দাড়ি চুলকে বললেন, দারুণ আইডিয়া। লেট মি সোশিয়ালাইজ ইট। তার অর্থ আপিসে বড়ো কর্তাদের কাছে এটা একটু বাজিয়ে দেখি, তারা কি ভাবেন বুঝে নিই। সোজা বাংলায় বলটা ওপর দিকে ছুঁড়ে দিয়ে দেখি কেউ ধরেন কিনা। তাঁর নিজের কি মত সেটি জানালেন না। শেষ অবধি বললেন, না হে,, তোমার এই দারুণ আইডিয়া কেউ পছন্দ করেছেন না।

    পলাতকের গানের মতন

    কার কাছে রাখিলাম রিপোর্ট, কার কাছে যে মত চাই গো,
    দোষ দিও না আমায় বন্ধু, আমার কোন যে দোষ নাই !

    স্পেস

    এককালে জানতাম স্পেস মানে মহাশূন্য। ইউরোপ তথা পশ্চিমে চারটে এলিমেন্ট – বায়ু অগ্নি বাতাস পৃথিবী আমরা তার সঙ্গে যোগ করেছি স্পেস, মহাশূন্যকে। কিন্তু আমার মতে আজ এটি অস্থানে কুস্থানে সর্বাধিক অপব্যবহৃত শব্দ। রীতিমত অস্বস্তি হয় যখন শুনি ইকুইটি স্পেস, রিটেল স্পেস, ফেস বিউটি স্পেস, হেলথ স্পেস – বলতে পারেন না এগুলি আসলে সেক্টর, বিভিন্ন ব্যবসা, স্পেস নয়? চার্লস করবেট আমার জন্যে কাজ করতো – আমাকে বলেছিল আমাদের টিম মিটিঙে দয়া করে স্পেস শব্দটা উচ্চারণ করবেন না, আই ফিল সিক। আমি বলেছিলাম, আমমো। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ; তবে আজকাল এর ধার কমে গেছে ভেবে স্বস্তি পাই।

    টেক ইট অফ লাইন

    কথা হচ্ছে পাঁচ বা দশ জনের মিটিঙে। আমি একটি বিষয় উত্থাপন করলাম ; বস বললেন, ওটা আমরা অফ লাইনে আলোচনা করে নেব। এটি একটি বহুল ব্যবহৃত অভিব্যক্তি; আমার মতে তার কারণ দ্বিবিধ ; আমার বস এ বিষয়ে মিটিঙে, সর্বসমক্ষে কিছু বলতে চান না, পরে আড়ালে আবডালে সেটি আমাকে জানাবেন অথবা এই আলোচনা ক্রমশ গরম হয়ে উঠছে, তর্ক বিতর্ক বাড়ছে, এটার আপাত বিনাশ করা হোক। সিধে বাংলায়, ও প্রসঙ্গ এখন থাক। এই হাটে না তোলাই ভালো।
    আগে কহ আর।

    সারকল ব্যাক

    বাজারে বেজায় চালু। এক নয়, নানান অর্থ আছে, অবস্থান বুঝে !

    বস বললেন, এখন আলোচনার সময় কম, এ কথাটা পরে হবে, উইল সারকল ব্যাক টু ইউ।

    জানতে চাইলাম কেনিয়ায় ট্রেড ফাইনান্স ব্যবসা থেকে কতো ফি পাওয়া গেল গত কোয়ারটারে, তার উত্তর হল, একটু সময় লাগবে দেখে নিয়ে ‘আই উইল সারকল ব্যাক টু ইউ ‘। আগে বলতাম বা শুনতাম, একটু চেক করে বলছি, এখানে বৃত্ত এলো কোথা হতে ?

    ফিরে এসো চাকা।

    ডাবল চেক এবং ক্রস চেক দুটোই অবশ্য ভীষণ চালু আছে এ বাজারে।

    বার বার দেখো, হজার বার দেখো।

    রিচ আউট

    সুপ্রিয় গুপ্ত সাহেব বলতেন যান তো একবার নিমাই বাবুর কাছে গিয়ে জেনে নিন কেলভিন জুটের ষ্টক ভ্যালু কত দেখাচ্ছে। জো হলে বলতেন, ক্যান ইউ ফাইনড ইট আউট ? আজকের বড়ো সাহেব বলেন, রিচ আউট টু জন অ্যান্ড দেন সারকল ব্যাক টু মি !

    ক্রুশ বিদ্ধ যিশু প্রভু এদের কথা ভেবেই হয়তো বলেছিলেন, ফাদার ফরগিভ।

    মুভ দি নিডল

    বাড়িতে ইলেকট্রিকের বা গ্যাসের মিটার, গাড়ির মিটার চলে আইন মাফিক। সেই কাঁটার হেরাফেরি করাটা হারগিজ বেআইনি যদিও সেকেন্ড হ্যান্ড গাড়ির ওডোমিটারের কাঁটা ঘুরিয়ে মাইলেজ কম দেখানোর চোরামির কায়দা বেশ পুরনো। কিন্তু কি আশ্চর্য, আজ মুভ দি নিডল ঠিক সেই অর্থ বহন করে, কাঁটা ঘোরাও, দক্ষতা, উৎপাদন বাড়াও। সত্যিকারের না শুধু কাগজে কলমে ? পূর্ব ইউরোপের কমিউনিস্ট দেশগুলিতে যেমন রোমানিয়াতে গমের উৎপাদন দেখানো হল গত বছরের দুশো গুণ বেশি, সবটাই কাগজি কারবাই। অতো গম হয়ে থাকলে তা রাখার জায়গা অকুলান হতো।

    কাঁটা ঘোরানোর খেলা।

    ডিপ ডাইভ

    গভীরে যাও, আরও গভীরে যাও
    এই বুঝি তল পেলে, ফের হারালে

    ডিপ ডাইভ শুনলে বাইশে শ্রাবণের গানটি অনিবার্য ভাবেই মনে পড়ে যায়। কোনো বিজনেস প্রোপোজাল, তদন্ত রিপোর্ট, ব্যাল্যান্স শিট – সেগুলি যত্নের সঙ্গে পড়া, দেখে শুনে বিচার বিমর্ষ করা, এদিক ওদিক, আশ পাশ, বাজারের চল চলন এগুলো বোঝার কোন প্রয়োজন নেই ? কিছু না দেখে একেবারেই ডুব ? নাকি তলিয়ে যাবার আগে অসম্ভব খুঁটিয়ে দেখা ?

    নেগেটিভ গ্রোথ

    দেশে থাকতে একটি কার্টুন দেখেছিলাম – সেলস ম্যানেজার বোর্ডে বিগত তিন কোয়ার্টারের সেলস ফিগারের গ্রাফ দেখাচ্ছেন, সেটি ক্রমশ নিম্নগামী। ক্রুদ্ধ বোর্ড ডিরেক্টর প্রশ্ন করলেন, সেলস তো ক্রমশ নিচেই নেমে যাচ্ছে, কি করতে চান, কি প্ল্যান আপনার ? সেলস ম্যানেজার বললেন বেস লাইনের নিচে আরেকটা কাগজ জুড়ে দিতে পারি।

    লন্ডন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাঙ্কে ম্যানেজার ডেভিড মরগানের অফিসে গ্রুপ মিটিং হতো মাসে একবার; সকল ডিপার্টমেন্টের কর্তারা খানিকটা কল্পনা এবং অতি অল্প তথ্য সহযোগে সেখানে আপন বিজনেসের হাল হকিকত বয়ান করতেন। স্ট্রাকচারড ট্রেড দফতরের কর্তা পল শ্যাম্পেনের ইংরেজি, সুটের বাহার, সালভাতোরে ফেরাগামো টাইয়ের নট, শব্দ চয়ন সকলকে চমৎকৃত করার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তাঁর ব্যবসার জৌলুস এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে। পলের রেভেনিউ নাম্বার শুনে ডেভিড মরগান বললেন, পল, এটা ভালো ঠেকছে না।

    পল ভ্রুকম্প না করে একই সুরে বললেন, পারহাপস উই আর একসপিরিইয়েন্সিং এ নেগেটিভ গ্রোথ।

    ইংরেজি বড়োই মনোহর ভাষা।

    ক্রমশ
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ১৭ জুলাই ২০২৬ | ২১ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন