এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • প্রস্তর যুগ

    Nirmalya Nag লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ১৪ জুলাই ২০২৬ | ২৯ বার পঠিত
  • “আজকে তোমার একটা জরুরী মিটিং আছে না?” বেডরুমের দরজায় এসে জিজ্ঞাসা করল রিমা।

    দেওয়ালে টাঙানো ঘড়ির দিকে চোখ গেল জয়দীপের; ন’টা প্রায় বাজে, ট্রেনটা মিস হয়ে না যায়। অফিস যাওয়ার জন্য রেডি হয়ে তিন বছরের মেয়ের সঙ্গে বকবক করছিল সে। সদ্য জ্বর সেরে ওঠা রিয়া বাবার হাত চেপে ধরল। ধীরে ধীরে মেয়ের আঙুলগুলো ছাড়িয়ে নিল জয়দীপ, দু-গালে হামি খেয়ে টাটা বলে উঠে পড়ল। রিয়ার আয়া ঝর্ণাদিও এসে গেছে; জয়দীপ তাড়াতাড়ি মায়ের ঘরে গিয়ে “আসছি” বলে ছুটল বাইরের বারান্দার দিকে।

    খুব দেরি হয়ে গেছে, অন্য দিনের তুলনায় সাত-আট মিনিট বেশি সময় কাটিয়েছে রিয়ার সঙ্গে আজ। বিয়ের প্রায় আট বছর পরে তাদের জীবনে এসেছে মেয়ে, বড্ড বেশি আদর পায় সে বাবার কাছে।

    তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে বারান্দার দরজার চৌকাঠে ডান পায়ের বুড়ো আঙুলে জোর ধাক্কা লাগল জয়দীপের। দরজার ফ্রেমটা ধরে ব্যালান্স রাখল জয়দীপ, গলায় আসা চিৎকারটা গিলে নিয়ে পায়ের দিকে তাকালো। নখের ঠিক নিচে খানিকটা কেটে গেছে নিশ্চয়, রক্ত বেরিয়ে মোজার একটু জায়গা ভিজে যাচ্ছে। যন্ত্রনাটা পা বেয়ে ওপরে উঠে আসছে যেন, মুখটা বিকৃত হয়ে গেল জয়দীপের।

    “ভাগ্যিস রিমা দেখতে পায়নি; তাহলে এখনই বরফ টরফ লাগাতে বলতো, আর আরও দেরি হয়ে যেত।” বারান্দায় এল জয়দীপ, খেয়াল রাখল যাতে না খোঁড়ায়; রিমা এখনই এসে যাবে।
    বারান্দার এক পাশে একটা জুতোর র‍্যাক আর তার পাশে একটা প্লাস্টিকের টুল রাখা। টুলে বসতে না বসতেই রিমা এসে দাঁড়াল পিছনে। র‍্যাকের একটা পাল্লা খুলে ভিতরে তাকাল জয়দীপ, তার জন্য বরাদ্দ তাকেরত সামনেই রাখা আছে পুরনো ব্রাউন রঙের লেদার স্নিকারটা, সেটাই এক ঝটকায় টেনে বার করে ডান পা’টা আগে জুতোয় গলালো সে, তারপর বাঁ পা।
    “আবার সেই পুরনোটা…নতুনটা পরো,” ৩৯-বছরের স্বামীকে বলল রিমা।
    “সময় নেই, ট্রেন মিস হবে…,” ফিতে বাঁধা শেষ করে উঠে দাঁড়ালো জয়দীপ। “আসি,” বেরিয়ে পরল জয়দীপ।
    “সাবধানে যেও,” বলে দরজা বন্ধ করল রিমা, আর এক ঘণ্টার মধ্যে তাকেও বেড়োতে হবে। বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটা স্কুলে পড়ায় সে।

    গলি দিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটতে লাগল জয়দীপ, এই জুতোটা একটু ভারি, পায়ে লাগছে বেশ, আগের মত সুরক্ষা মনে হয় আর দিতে পারছে না; নতুনটা প’রে এলেই হত। ওই সিন্থেটিক হালকা জুতো জোড়া গত জন্মদিনে তাকে উপহার দিয়েছিল রিমা। র‍্যাকের মধ্যে পুরনোটার পাশেই নতুনটা রাখা থাকে, দ্বিতীয় পাল্লাটা খুললেই ‘পা-লোক’কে পাওয়া যেত। ছোট থেকেই নানা জিনিসের নামকরণের বাতিক আছে জয়দীপের। নিজের বাড়ির নাম দিয়েছে ‘সুবোধ বালক’, অফিস হল ‘মাস-ও-হারা’। আগের জুতোটাকে ডাকে ‘চর্মসহচরী’, সেখান থেকে ছোট করে ‘সহচরী’;আর নতুনটার নাম ‘পা-লোক’।

    মিনিট দুয়েক পরেই জশোর রোডে এসে পড়ল জয়দীপ, বাঁদিকে ঘুরে ভাঙাচোড়া ফুটপাথ দিয়ে হাঁটতে শুরু করল বেলগাছিয়া মেট্রো স্টেশনের দিকে।

    সোমবারের অফিস টাইমে যশোর রোড পুরো জমজমাট; গাড়ির ধোঁয়ার গন্ধ, ট্রাফিকের শব্দ, বাস কন্ডাক্টর আর অটোচালকদের হাঁকাহাঁকির মধ্যে দিয়ে দ্রুত চলতে গিয়ে ঘেমে গেল জয়দীপ। বর্ষাকাল প্রায় শেষ হয়ে এল, আবহাওয়া বেশ আর্দ্র; আজ সন্ধ্যার দিকে বৃষ্টি হতে পারে মোবাইলে দেখেছে সে।

    পায়ের ব্যাথাটা ভালই জানান দিচ্ছে; আস্তে আস্তে হাঁটারও উপায় নেই। ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নামল জয়দীপ – সারি সারি বাস, প্রাইভেট গাড়ি, হলুদ ট্যাক্সি, সাদা ক্যাব, টু-হুইলার, অটো আর সাইকেলের মধ্যে দিয়ে কোনও রকমে রাস্তার অন্য দিকে এল সে। পৌঁছে গেল মেট্রো স্টেশনে।

    ট্রেনটা মিনিট দুই দেরি করে এল, তাই পেয়ে গেল জয়দীপ। ভিড়ের মধ্যে গোঁটাগুঁতি করে এগোবার চেষ্টা করল সে, খান তিনেক স্টেশন পেরোবার পর জায়গাও পেয়ে গেল। ভালই হল, একটু আগে একজন পা মাড়িয়ে দেওয়াতে ব্যাথাটা বেড়ে গেছে, দপদপ করছে আঙুলটা।

    সামনে একটু ঝুঁকে পায়ের দিকে তাকাল জয়দীপ; জুতোটার অবস্থা সত্যিই খারাপ হয়ে গেছে – চামড়ার গায়ে ঘষা দাগ, হিলের একটা দিক ক্ষয়ে গেছে, লেসও যেন বেশি টান পড়লেই ছিঁড়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। পালিশও করা হয়নি কিছুদিন। ‘সহচরীর’ আশেপাশে এখন অনেকগুলো নতুন আর পুরনো ডার্বি, ফ্লোটার, অক্সফোর্ড, স্নিকার আর স্যান্ডাল; তাদের নানা ব্র্যাণ্ড, নানা রঙ, নানা দাম। তাদের মালিকদের কথাবার্তা, ফোনালাপ আর বিরক্তিকর রিলের আওয়াজের মাঝে একটু ঝিমুনি এল জয়দীপের।

    হঠাৎ কানে এল কারও গলা; তারুণ্যে ভরা স্বর, তাতে কিছুটা যেন বিদ্রূপ মেশানো; সে বলছে, “তোমাকে দিয়ে আর বেশি দিন চলবে না।”
    এর উত্তরে কেউ বলল, “কাউকে দিয়েই চির দিন চলে না; তবে যার যা কাজ তাকে সেটা শেষ পর্যন্ত করেই যেতে হয়।” এই গলার মালিক মনে হয় বয়স্ক।
    কারা কথা বলছে বুঝতে পারল না জয়দীপ, এদিক ওদিক তাকাল। খুব কাছ থেকেই শোনা গেল দুটো গলা, কিন্তু এই মুহুর্তে তো কাছাকাছি কেউই কথা বলছে না। ট্রেনে ঘোষণা হল এসপ্ল্যানেড স্টেশন আসছে। আবার চোখটা বুজে এল তার।

    প্রথম গলাটা ফের শোনা গেল,”তোমার চামড়া, তোমার রাবার সোল – সব গেছে। গত সপ্তাহে স্লিপ করেছ, আর একবার তো পেস্টিং খুলে যাচ্ছিল আর একটু হলেই। সময় হয়েছে, এবার সরে যাও। তুমি এখন লায়াবিলিটি।”
    দ্বিতীয় জনের স্বর এবার গম্ভীর। “সময়? অনেক কঠিন সময় পেরিয়ে এসেছি। হিলটা ক্ষয়ে গেছে কেন? সাত-আট বছর ধরে ঘোরাঘুরি ক’রে; এই ডাক্তার থেকে ওই ডাক্তার; এই টেস্ট থেকে সেই টেস্ট, অনেক হতাশার ভার বয়ে তবে আজ রিয়া এসেছে। বাঁ দিকের ওই স্ক্র্যাচটা? রূপকুণ্ড ট্রেক করার সময়ে পাথরে পা আটকে গিয়েছিল একটা বিপজ্জনক জায়গায়। টাকা দিয়ে আমার মূল্য বিচার করতে যেও না।”
    আদালতের সওয়াল জবাবের মত এই কথোপকথন কারা করছে এইবার জয়দীপের কাছে পরিস্কার হয়ে গেল -- সহচরী আর পা-লোক।
    নতুন জুতো আক্রমণ চালিয়ে গেলঃ “সেন্টিমেন্ট দিয়ে জীবন চলে না; সময়কে মেনে নিতে হয়। আবার বলছি, তুমি এখন লায়াবিলিটি।”

    লোকজনের হুড়োহুড়িতে চোখ খুলল জয়দীপ; পার্ক স্ট্রিট স্টেশনে দরজা খুলছে। তাড়াতাড়ি করে প্ল্যাটফর্মে নেমে অন্য অফিসযাত্রীদের ভিড়ে মিশে গেল সে; হাঁটতে গিয়ে টের পেল পা-টা আবার ব্যথা করছে। রাস্তায় এসে অফিসের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তার মনে হল পা-লোকের যুক্তিগুলো এড়িয়ে যাওয়া যায় না; আবার সহচরী যা বলেছে সেগুলোও ঠিক। গ্র্যান্ড হোটেল আর্কেডের একটা দোকান থেকে ১৫ বছর আগে সহচরীকে সংগ্রহ করেছিল সে, সেই সময়ের সাধ্যের কিছুটা বাইরে গিয়েই কিনেছিল। সে দিনের ঝকঝকে জুতোটা আজ জীর্ণ হয়েছে। পা-লোককে কিনেছিল অনলাইনে, অনেক দেখাশোনা রিসার্চ টিসার্চ করে; রিমা বলেছিল, “তুমি কিনে নাও, টাকা আমি দেবো।”

    আজকের মিটিংটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট, তবে পা-টাকেও একটু দেখতে হবে। একটা স্প্রে বা জেল টেল কিছু লাগালে আরাম হবে মনে হয়। আপাততঃ নিচু হয়ে জুতোর ফিতেটা টাইট করে বেঁধে নিল জয়দীপ; পা বাড়ালো ‘মাস-ও-হারার’ দিকে।
    এক ঘন্টার মিটিং ভালো ভাবেই চলল। কিছু অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হল জয়দীপকে; এবার প্রায় স্পষ্ট হয়ে গেল পরের প্রমোশন আসছে, এর জন্য দু’ বছর অপেক্ষা করে আছে সে। তৃপ্ত মনে এবার পায়ের দিকে নজর দিল সে।

    একজন অফিস অ্যাসিসট্যান্টকে দিয়ে ফার্স্ট এড বক্সটা আনালো জয়দীপ। ডান পায়ের জুতোটা খুলে দেখল রক্ত শুকিয়ে মোজাটা আটকে আছে বুড়ো আঙুলের কেটে যাওয়া জায়গাটায়। সাবধানে মোজা খুলল সে, ফুলে গেছে বুড়ো আঙুলটা, কাটা জায়গায় কালচে লাল শুকনো রক্ত। ডেটল দিয়ে ক্ষতর জায়গাটা পরিস্কার করে একটা ব্যান্ড এড লাগালো সে, পেন কিলার স্প্রে করল, ব্যাথাটা কমল কিছুটা। জুতোটা পরার সময়ে খেয়াল করল সোলের কাছটা আলগা হয়ে এসেছে; অন্যটা দেখল, সেটারও একই অবস্থা।

    আজকের বিশেষ দিনে লাঞ্চের সময়ে পার্থর কাছ থেকে একটা সিগারেট চেয়ে খেল সে, যদিও ধূমপান সে কদাচিত করে। পার্থ আবার অফিসের প্রচুর গোপন খবর রাখে, বলল কোম্পানি সম্ভবত অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্টের ঝা-জীকে আর রাখবে না। নানা শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত ঝা-জী এখন খুব ছুটি নেন, আরও বছর চারেক চাকরি ছিল ওনার।

    সন্ধ্যা হওয়ার আগেই আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেল, যে কোনও সময়ে বৃষ্টি আসবে। পায়ের ব্যাথাটা আবার ফিরে এসেছে, অফিস ছুটির পর জয়দীপের ইচ্ছে হল না মেট্রো অবধি যাওয়ার; একটা ক্যাব বুক করল সে।

    ক্যাবে উঠলে এসি চালিয়ে দিল ড্রাইভার, গাড়ি চলতে শুরু করল বেলগাছিয়ার দিকে। ব্যাকপ্যাকটা পাশেই সিটের ওপর রেখে আরাম করে বসল জয়দীপ। মাথাটা হেলিয়ে দিল পিছনের দিকে, একটা বড় নিঃশ্বাস ফেলে ভাবতে লাগল যে নতুন দায়িত্ব অফিস দিয়েছে সেগুলো কী ভাবে ঠিক মতো করা যাবে। লেনিন সরনীর মোড় পেরিয়ে যাওয়ার পর পা দুটো একটু সরাতে গেল সে। চোখ গেল সহচরীর দিকে। কোন যুগ থেকে এই জুতোটা আছে তার কাছে। সহচরী তার সম্পর্কে যা জানে, ততটা হয়তো রিমাও জানে না।

    গাড়ির কাঁচ আর ছাদের ওপর বৃষ্টি পড়া শুরু হল, প্রথমে আস্তে, তার একটু পরেই বেশ জোরে।
    “ভালো বৃষ্টি হবে স্যার, সকাল থেকেই মেঘলা রয়েছে,” বলল ড্রাইভার। জয়দীপ শুধু “হুমমম” বলে থেমে গেল; ড্রাইভার বুঝল তার প্যাসেঞ্জারের কথা বলার ইচ্ছে নেই।

    একটু ঝিমুনি এসেছে জয়দীপের। তার মধ্যেই শুনতে পেল পা-লোকের গলা, “এই যে স্যার, তোমার মত টুটাফুটা চিজকে ইনি কেন এত পছন্দ করে বলো তো?”
    সহচরীর উত্তরে কি একটু আবেগের ছোঁয়া পাওয়া গেল? “মহাফেজখানা কাকে বলে জানো? আমি হলাম তাই। ওর জীবনের হাজারো দামী সময়ের সাক্ষী ছিলাম আমি। রিমার বাবা-মা ওর সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজী ছিল না; ও রিমার বাড়ি যেদিন যায় আর সফল হয়ে বেরিয়ে আসে সেদিন আমি ছিলাম। সেটা ছিল বৃহস্পতিবারের সন্ধ্যা। রিয়া হওয়ার সময়ে খুব সমস্যা হয়েছিল; হাসপাতালের করিডোরে আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে পায়চারি করেছি প্রায় সারা রাত, একটা মঙ্গলবারের রাত। সেই শুক্রবারের বিকেলে যখন ওর বাবা মারা যান, আর ও অফিস থেকে ফিরে আসে সেদিনও আমি ছিলাম।”
    পা-লোক বলল, “ইতিহাসের সাল তারিখ কোন কাজে লাগবে? এই দিয়ে কি তোমার ক্ষয়ে যাওয়া সোল নতুন হবে, না আলগা হওয়া পেস্টিং শক্ত হবে? এবার তোমার সাম্রাজ্যের পতনের সময়।”
    হাসির শব্দ কানে জয়দীপের; দীর্ঘ নির্মল হাসি। “সময়কে একটু সময় দাও, তারপর দেখ। গুড লাক।”
    “হাসির আবার কী হল?” জিজ্ঞাসা করল পা-লোক। সহচরীর কাছে থেকে কোনও উত্তর এল না। জয়দীপের মনে পড়ল না ওই জুতোর মধ্যে নারীসুলভ কিছু না থাকা সত্ত্বেও কেন ‘সহচরী’ নাম দিয়েছিল সে।

    বিদ্যুতের চমকে আকাশ ফালাফালা হয়ে যাওয়ার পরেই প্রচন্ড আওয়াজ করে বাজ পড়ল। আজকাল বাজ পড়ছে খুব বেশি, কেন কে জানে। বৃষ্টিও এখন বেশ জোরে পড়ছে, ট্রাফিকের স্পিড কমে গেছে। কপাল ভালো জয়দীপের, শ্যমবাজার পাঁচমাথার মোড়ে সিগন্যাল খোলা পেল সে, নইলে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হত কে জানে! আর জি কর হাসপাতাল পেরোবার সময়ে মোবাইল বেজে উঠল; রিমা। জিজ্ঞাসা করল কোথায় আছে ও, প্রচণ্ড বৃষ্টি পড়ছে বাড়ির কাছে। আর জানালো রিয়া এখন অনেকটা ভালো আছে।

    ফোন রেখে সামনে তাকালো জয়দীপ; উইন্ডস্ক্রিনের ওপর অঝোরে জল পড়ছে, ওয়াইপার এদিক ওদিক করছে ফুল স্পিডে। পাশের দিকে তাকালো সে, জলে পুরো ভেজা দু-একটা লোক ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, এই বৃষ্টিতে ছাতা কোনও কাজেই লাগবে না। বেশ কয়েকজন আশ্রয় নিয়েছে দোকানের সামনে। গাড়ির চাকার ধাক্কায় রাস্তার জল ছোটখাটো ঢেউ-এর মত ধাক্কা মারছে ফুটপাথের পাথরে। কারেন্ট যায়নি এই বাঁচোয়া।

    ব্যাকপ্যাক থেকে নিজের জন্য ফোল্ডিং ছাতা আর ব্যাগের জন্য রেন কভার বার করল জয়দীপ; আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাড়ি ঢুকে যাবে সে।
    ক্যাবটা হঠাৎ দাঁড়িয়ে গেল; ড্রাইভার চাবি ঘোরালো বার দুই, গাড়িটা ঝাঁকুনি দিয়ে সামান্য এগিয়ে ফের থেমে গেল। ড্রাইভার বিড়বিড় করে গাল দিচ্ছে বুঝতে পারল জয়দীপ। গিয়ার, ক্লাচ আর চাবি নিয়ে আরও কয়েকবার চেষ্টা করল ড্রাইভার, গাড়ি এগোল না। পিছন থেকে ড্রাইভাররা হর্ন দিতে আরম্ভ করেছে, তারপর জল জমা ট্রাফিকে ভরা রাস্তায় বেশ কষ্ট করেই গাড়ি ঘুরিয়ে এগিয়ে যেতে শুরু করল।

    “কী হয়েছে?” বিরক্তি আর উদ্বেগ নিয়ে জিজ্ঞাসা করল জয়দীপ। “ব্যাটারি গেছে স্যার,” উত্তর দিল ড্রাইভার, তার গলায় অসাহয়তা। “দেখে বেরোন না কেন? কী করব এখন?” বলল জয়দীপ। “সরি স্যার; এই বৃষ্টির মধ্যে কিছু করার নেই।”

    এসি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বদ্ধ গাড়ির মধ্যে গরম লাগতে শুরু করেছে জয়দীপের; বাইরের দিকে আবার তাকালো সে - ঘোলাটে জলের স্রোত বয়ে চলেছে রাস্তা দিয়ে। বাড়ির গলির মুখটা এখনও একটু দূরে; হেঁটে গেলে পাঁচ-ছয় মিনিটের মধ্যে বাড়ি পোঁছে যাওয়া যাবে। সহচরীর কথা একবার ভাবল সে… খুলে ফেলবে? নাহ, পায়ের কাটার জন্য সেটা ভালো হবে না; গাড়ির মধ্যে বসে থাকারও কোনও মানে নেই। রেন কভারটা ব্যাকপ্যাকে আটকে পিঠে নিয়ে নিল জয়দীপ, প্যান্টটা একটু গুটিয়ে নিল, ড্রাইভারকে টাকা দিয়ে বেরিয়ে এল বাইরে।

    কাদাগোলা ঠান্ডা জল জুতোয় ঢুকে এল সঙ্গে সঙ্গে, ছাতা খোলার আগেই মাথা, জামা আর প্যান্টের বেশ কিছুটা ভিজে গেল। ফুটপাথে উঠে গেলে জল একটু কমবে; নোংরায় আটকে থাকা গালিপিটের দিকে দ্রুত ধেয়ে যাওয়া জল এড়িয়ে ফুটপাথে উঠল সে। গলিটা এখনও প্রায় ২০০ মিটার দূরে, জোরে পা চালালো সে। বৃষ্টির জন্য ভালো দেখা যাচ্ছে না, তার ওপর জয়দীপের ছাতাটাও একটু বড়। ঠিক এই জায়গাটায় কোনও দোকান নেই; উল্টো দিক থেকে এক জন মহিলা আসছেন, তাঁকে জায়গা দেওয়ার জন্য একটু বাঁ দিকে সরে গেল জয়দীপ, আর তার পরেই বাঁ পা-টা জোর ধাক্কা খেল একটা জমে যাওয়া সিমেন্টের বস্তায়।

    দাঁত চিপে যন্ত্রণাটা সহ্য করল সে, দাঁড়িয়ে গেল মিনিট খানেকের জন্য। এবার তার একটা পায়ে ক্ষত আর অন্যটায় চোট, দুটোই সহচরীর ফিতেয় বাঁধা।
    হঠাতই জয়দীপের মনে হল পা-লোকের গলা শোনা যাচ্ছে… “জল আর কাদায় পুরনো লেদার বডি ভারি হয়ে গেছে, ও আর চলবে না।” সহচরীর দিক থেকে কোনও উত্তর এল না।

    দুই পায়েই সমস্যা নিয়ে চলতে অসুবিধে হচ্ছে জয়দীপের, ধীরে ধীরে এগোতে লাগলো সে, গলির মুখে এসে দেখে ভেতরটা অন্ধকার, রাস্তার আলোগুলো জ্বলেনি। এখান থেকে বাড়ি যেতে স্বাভাবিক দিনে দুই থেকে তিন মিনিট লাগে, তবে আজকের কথা আলাদা।

    মজুমদার বাবুর বাড়ি এসে গেল, বছর তিনেক আগে উনি মারা যাওয়ার পর থেকে বাড়িটা বন্ধ হয়েই পড়ে আছে। বাউণ্ডারি ওয়ালের নিচের একটা গর্ত দিয়ে ভলকে ভলকে জল বেড়িয়ে আসছে বাড়ির ভেতর থেকে, গলির এক পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে বড় রাস্তার দিকে।

    মজুমদার বাবুর বাড়িতে আলো জ্বলছে না বলে ওখানটা আরও বেশি অন্ধকার, বৃষ্টি পড়ছে আর তার ওপর রয়েছে বড় ছাতা। বন্ধ গ্রিল গেটের কাছটায় জঞ্জাল জমে ছিল, খেয়াল করেনি জয়দীপ, তার ওপর দিয়ে হাঁটতে যেতেই বাঁ পা-টা আটকে গেল। টেনে বার করতে গিয়ে লাভ হল না। বোঝা গেল জঞ্জালের নিচে কোনও কিছুতে পা আটকে গেছে। বেশ বিরক্ত হয়ে ফের হ্যাঁচকা টান দিল সে, এবার পা-টা একটু নড়ল; তৃতীয় টান আরও জোরে, এবার কাজ হল, পা খুলে এল।

    ব্যালান্স সামলে নিয়ে পায়ের দিকে তাকালো জয়দীপ। সহচরীর বাঁ দিকের সোল আর বডির মধ্যে আর যোগ নেই, সামনের দিকটা আলগা হয়ে ঝুলছে। বাঁ পা-টা ঝাড়া দিল জয়দীপ, টুটাফুটা জিনিসটা প্রবল ঝটকা খেল, তবুও পায়ে আটকেই রইল।
    “আর আই পি,” তারুণ্যে ভরা গলা শুনতে পেল সে।

    প্রায় অন্ধকার গলিতে একা দাঁড়িয়ে রইল জয়দীপ; ঠান্ডা জলের স্রোত বয়ে যাচ্ছে খোলা পা আর ছেঁড়া জুতোর ওপর দিয়ে, সহচরীর গায়ে লেগে থাকা ময়লায় যেন কিছুটা পরিস্কার হল। ডান পায়ের জুতোটা এখন কোনও কাজের নয়।

    একটু সরে এসে ছাতা সামলে এক হাঁটু গেড়ে বসল জয়দীপ; কষ্ট করে খুলে ফেলল বাঁ পায়ের জুতোর ভিজে যাওয়া ফিতে, পা থেকে ছাড়িয়ে ফেলল সেটা। তার পর ডান পায়েরটাও।
    জুতো জোড়া হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল জয়দীপ, কয়েক পা এগিয়ে জলের স্রোতের ঠিক মাঝখানে বসিয়ে দিল সে দুটো। স্রোতের ধাক্কায় একটু একটু করে পিছিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ ভলকে জল এল, এক পাটি পড়ে গেল পাশের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে জলের টানে গলির অন্ধকারে হারিয়ে গেল সহচরী।
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • গপ্পো | ১৪ জুলাই ২০২৬ | ২৯ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    লাল রঙ - Nirmalya Nag
    আরও পড়ুন
    উনুন - upal mukhopadhyay
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন