এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বনের পথে ঠেলে দেওয়া এক রাজপুত্র

    albert banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ৩০ জুন ২০২৬ | ১১৪ বার পঠিত
  • 01
    আমি সেই যে দেয়ালের ফাটল দিয়ে দেখে, কান পেতে শোনে, নাক দিয়ে টের পায় মিথ্যার গন্ধ, যা শ্বাসের সাথে মিশে যায়, রক্তে দ্রবীভূত হয়, আমাকে আরও ক্ষুধার্ত করে তোলে। আজ রাতে প্রাসাদের অন্তঃপুরে জমা হয়েছে ছায়ারা, তারা ফিসফিস করে, তাদের ঠোঁট নড়ে, কিন্তু শব্দ বেরোয় না, শুধু বাতাসের কম্পন, যা আমার কানে পৌঁছায়, আমার মস্তিষ্কে অনুবাদ হয়, একটি পরিকল্পনার আকারে – সেই পরিকল্পনা যার কেন্দ্রে সে, যাকে বনে যেতে হবে, নইলে কয়েকজন মানুষ তাকে হত্যা করবে, গোপনে, নিঃশব্দে, ছুরির আঘাতে, বিষের ফোঁটায়, শ্বাসরোধের দড়িতে।

    আমি তাদের দেখি। তারা মোমবাতির আলোয় দাঁড়িয়ে, তাদের মুখ অর্ধেক আলোকিত, অর্ধেক অন্ধকারে ঢাকা, যেন তারা নিজেরাও জানে না তারা ভালো নাকি মন্দ, তারা শুধু জানে তারা চায় তাকে সরিয়ে দিতে, তাকে দূরে পাঠাতে, তাকে অদৃশ্য করে দিতে, যাতে সিংহাসন খালি হয়, যাতে তাদের নিজের ছায়া বড় হয়, যাতে তারা নিতে পারে যা চায় – ক্ষমতা, সম্পদ, নিয়ন্ত্রণ, সেই নিয়ন্ত্রণ যা দিয়ে তারা খেলতে পারে মানুষের জীবন, মানুষের মৃত্যু, মানুষের ধর্ম, মানুষের বিশ্বাস।

    প্রথম ছায়া বলে, “তাকে বনে পাঠাতেই হবে। পিতার বাক্য, মাতার আদেশ, ভ্রাতার শপথ – সব মিলিয়ে একটি সুতো বুনব, সেই সুতো টেনে তাকে নিয়ে যাব দূরের জঙ্গলে, যেখানে কোনো রাজ্য নেই, কোনো সিংহাসন নেই, শুধু আছে গাছ, পশু, নদী, আর সেই নদীর ধারে সে কাটাবে চৌদ্দ বছর, আর আমরা এখানে তৈরি করব নতুন ইতিহাস, যেখানে তার নাম থাকবে না, বা থাকলেও হবে একটি গল্প, একটি মিথ্যা, একটি উপকথা, যা আমরা লিখব আমাদের মতো করে।”

    দ্বিতীয় ছায়া বলে, “যদি সে রাজি না হয়? যদি সে বলে, ‘আমি যাব না, আমি এখানেই থাকব, আমি রাজা হব, আমি শাসন করব ন্যায়ের সাথে’? তখন কী? তখন আমরা কী করব? আমরা কি তাকে বলব, ‘তুমি যাও, নইলে আমরা তোমাকে হত্যা করব’? আমরা কি তার বুকে ছুরি বসাব? আমরা কি তার খাবারে বিষ মেশাব? আমরা কি তার শয্যায় সাপ ঢুকিয়ে দেব? আমরা কি তাকে ঘুমের মধ্যে শ্বাসরোধ করব? আমরা কি তাকে প্রাসাদের বারান্দা থেকে ঠেলে দেব নিচের প্রস্তরময় উঠোনে?”

    তৃতীয় ছায়া হাসে, তার হাসি ভাঙা কাঁচের শব্দ করে, সেই শব্দে আমি চিনি আমার নিজের হাসি, কারণ তিনিও অভিশপ্ত, তিনিও চুষেছেন রক্ত, খেয়েছেন মাংস, চিবিয়েছেন হাড়। সে বলে, “যদি রাজি না হয়, তাহলে গুপ্ত হত্যা। গোপনে। নিঃশব্দে। এমনভাবে যেন কেউ জানতে না পারে, যেন কেউ সন্দেহও না করে, যেন সবাই ভাবে সে স্বেচ্ছায় গিয়েছে, ত্যাগী হয়ে, রাজপুত্র হয়ে, ধর্মের পথে। তার মৃতদেহ আমরা পুড়িয়ে দেব বনের গভীরে। ছাই উড়িয়ে দেব নদীতে। সাগরে। সাগরের লবণ খাবে মানুষ। জানবে না তারা খাচ্ছে এক রাজার হাড়। এক রাজার মাংস। এক রাজার স্বপ্ন। যা আমরা চূর্ণ করেছি, পিষে দিয়েছি, শেষ করে দিয়েছি, শুধু রেখেছি একটি ফাঁকা সিংহাসন, যার ওপর বসব আমরা, আমাদের ছায়া, আমাদের ষড়যন্ত্র, আমাদের বিজয়।”

    আমি ফিসফিস করি, কিন্তু তারা শোনে না, কারণ আমি দেয়ালের আড়ালে, আমি অদৃশ্য, আমি সেই গন্ধ যা তারা টের পায় না, আমি সেই স্পর্শ যা তারা অনুভব করে না, আমি সেই রক্ত যা তাদের শিরায় প্রবাহিত হয়, কিন্তু তারা জানে না সেই রক্তে আমার দাঁতের চিহ্ন আছে, আমার জিভের ছাপ আছে, আমার অভিশাপের বীজ বপন করা আছে, যা একদিন অঙ্কুরিত হবে, ফুল ফোটাবে রক্তগন্ধা, সেই ফুলের গন্ধে তারা পাগল হবে।

    আমি দেয়াল ছেড়ে পিছিয়ে যাই। আমার কাজ এখনও শেষ হয়নি। আমাকে খুঁজতে হবে তাকে, আমাকে সতর্ক করতে হবে তাকে, আমাকে বলতে হবে, “যাও, বনে যাও, পালাও, বাঁচো, কারণ এখানে থাকলে তারা তোমাকে মারবে, গোপনে, নিঃশব্দে, ছুরি দিয়ে, বিষ দিয়ে, দড়ি দিয়ে, আমি তোমাকে বাঁচাতে পারব না, কিন্তু যাব তোমার সাথে কারণ আমিও তাদের একজন, আমিও ষড়যন্ত্রের অংশ যে হরণ হবে। আমিও চাই তোমাকে সরিয়ে দেওয়া, কিন্তু আমি চাই না তোমার মৃত্যু, আমি চাই তোমার বনবাস, কারণ বনে তুমি বাঁচবে, এখানে থাকলে মরবে, আর মৃত্যুর চেয়ে বনবাস ভালো, জীবনের চেয়ে স্মৃতি ভালো, স্মৃতির চেয়ে গল্প ভালো, আর গল্পের চেয়ে নীরবতা ভালো, কারণ নীরবতা হলো একমাত্র সত্য, যা কেউ বদলাতে পারে না, যা কেউ লিখতে পারে না, যা কেউ পড়তে পারে না, শুধু আমি জানি, বাপের বাড়ির লাঙ্গলের ফলার মেয়ে আমি। আমি হৃতা হবো যাতে সে মরে।

    “যাও। বনে যাও। এখনই যাও। সময় নেই। তারা আসছে। তারা তোমাকে মারবে। আমি তোমাকে পথ দেখাবো। এই পথ ধরে যাও, নদী পেরিয়ে, পাহাড় ডিঙিয়ে, জঙ্গলে ঢুকে পড়ো, সেখানে কেটে যাবে তোমার বছর, তোমার যুগ, তোমার যাত্রা, আর আমি ওখান থেকে দেখব, শুনব, ফিসফিস করব, অপেক্ষা করব তোমার ফেরার, যে ফেরা আসবে। ফেরা মানে আমি শেষ। দাগ মিলিয়ে যায় তা জলের হোক বা লাঙলের।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    01
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে প্রতিক্রিয়া দিন