এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  • মাটি  (গল্প)  

    রানা সরকার লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ২০ জুন ২০২৬ | ২৮ বার পঠিত
  • “এবছর দূর্গাপুজো ঘটেই করতে হবে রে, বুঝলি?”। সন্ধ্যাবেলায় মুখার্জীবাড়ির বড়কর্তার এই কথায় বাকি শরিকরা কেঁপে উঠলেন।

    প্রতি বছরের মতো এই বছরও মিটিং-এ শরিকরা এসে উপস্থিত হয়েছেন। উপস্থিত হয়েছে ওদের ছেলেমেয়েরাও। আসেননি শুধু ছোট আর মেজ শরিকের এক ছেলে আর এক মেয়ে। ওরা যথাক্রমে একজন আছেন জার্মানী আর একজন অ্যামেরিকায়। অনলাইন হতে পারতেন, তবে বলে দিয়েছেন যে অন্যান্য শরিকেরা যা সিদ্ধান্ত নেবেন তাতেই তারা সিলমোহর দেবেন।

    নাতি-নাতনিরাও কেউ আসেন নি এই মিটিং-এ। তারাও ব্যস্ত তাদের নিজেদের নিজেদের কাজে।

    বড়কর্তার এই কথা শুনে মেজকর্তা বলে উঠলেন, “বলছো কি দাদা! প্রায় ১২৭ বছরের পুরনো আমাদের এই পুজো! বারকয়েক এমন হয়েছিল শুনেছিলুম…, কিন্তু…, তখন তো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভালো ছিল না!”

    “ঠিক, মেজদা। ঠাকুমার মুখে শুনেছিলাম। বঙ্গভঙ্গ, অসহযোগ আর ভারতছাড়ো আন্দোলন…। আমাদের গাঁয়ের কতজন শহীদ হলেন। দেশভাগ…”, ছোটকর্তা বললেন। বললেন, “যেবার তেভাগা, তেলেঙ্গানা আন্দোলনে আমাদের এক জামাই শহীদ হয়েছিল, সেইবারেও…। বিল্টুর বাবা…”।

    “হুম”।

    “তারপর বিপ্লবী মাষ্টারদা, বিনয়-বাদল-দীনেশ, যতীন্দ্রনাথ বাঘা যতীন – শহীদ হলেন, সেই সেই বছরও তো…। যদিও ২০০০ নাগাদ কোথায় যেন আন্দোলন করতে গিয়ে আমাদের বড়বোনের ছোট ছেলেটা …”, বলেই চুপ করে গেলেন ছোটকর্তা।

    বাকিরাও চুপ করে গেলেন।

    সেই ছেলে অবশ্য বেঁচে থাকলে আজ ওর বয়স হত ৪৬-৪৭।বড় বোন একসময় প্রায়ই চোখের জল ফেলতেন। তবে তার বড় ছেলেও আর ইহজগতে নেই। নাতিপুতি নিয়ে বুড়ি এখনও দিব্যি চালিয়ে যাচ্ছেন।

    এই জঙ্গলডোবার মুখার্জীরা ৩ ভাই আর ২ বোন। জায়গাটা হুগলীতে। কলকাতা থেকে সড়কপথে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ভেতরে। ওদের দাদু ছিলেন এই গ্রামের জামাই। প্রপিতামহের ছিল দুই মেয়ে আর এক ছেলে। ছেলে কলকাতায় একটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাওয়ার পর আর দুই মেয়েকে কাছ ছাড়া করেননি তিনি। তারপর বড় মেয়ে অকাল বিধবা হয়ে কাশীবাসিনী হলেও, ছোট মেয়ের বরই জমিদারি দেখাশোনা থেকে শুরু করে সমস্ত দায়িত্ব একার কাঁধে নিয়ে মুখার্জী পরিবারকে আগলে আগলে রেখেছিলেন।

    তবে তাদের এই পুজো যেহেতু বহু পুরনো, কথিত আছে একসময় নরবলি পর্যন্ত হয়েছিল। তারপরে মোষ, পাঁঠা হলেও, গত পঞ্চাশ বছর ধরে চালকুমড়োই বলি দিয়ে আসছেন তারা।

    আর পুজোর এই ক’টা দিন বাড়ির সমস্ত শরিক আর তাদের ছেলেমেয়েরা নাতিনাতনিরা মাতিয়ে রাখেন। দারুণ সব হইচই, খাওয়া-দাওয়া, হরেক কিসিমের মজা – স্বপ্নের মতো কেটে যায় ক’টা দিন।

    এদিকে বড়, মেজ আর ছোটকর্তার বয়েস হয়েছে প্রায় যথাক্রমে ৭০, ৬৬ আর ৬৪ বছর। বড় বোন ৬২ আর ছোটবোন ৬০। ওদের ছেলেমেয়েরাই অনেকে প্রায় ৪৫ ছুঁইছুঁই হয়ে গেছে। কারুর কারুর নাতি-নাতনির আবার বিয়েও গেছে হয়ে।

    জমিদারীর অবশ্য কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। অনেক জমি দান করে দেওয়া হয়েছিল। তাতে স্কুল হয়েছে; কলেজ হয়েছে। হয়েছে স্বাস্থ্যকেন্দ্র; পাঠাগার আর দাতব্য চিকিৎসালয়।

    তবে জমিদারি না থাকলেও মেজাজ খানিকটা গেছে রয়ে। ছেলেমেয়েরা অবশ্য পড়াশোনা আর ব্যবসা করে স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কলকাতা আর শহরতলির বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকেন তারা। আর পুজোর ক’টা দিন চলে আসেন জঙ্গলডোবায়। এখানের বাড়ি আর লাগোয়া সামান্য জমি দেখাশোনা করেন গ্রামের দুইভাই। নাম ভোলা আর মহাদেব। ওদেরও প্রায় ৬০-৬৫ বয়স হয়ে গেল।

    বড়দার মুখে এই কথা শুনে দুই বোন বড়দার দিকে তাকিয়ে প্রায় একসঙ্গেই বললেন, “এ কি অলুক্ষুনে কতা বলচ গো বড়দা? ঘটে পুজো কেন?”

    “মাটি! মাটি। রাজ্যে মাটির বড় অভাব। ভোলাকে কুমোরটুলি পাঠিয়েছিলুম। কাগজে পড়িস নি? প্রথমে কুমোরটুলিতে মাটি আসত উলুবেড়ে থেকে। নদীর পাড় কেটে বাগবাজার পটুয়াপাড়ায় সরবরাহ করা হত। পরে নদীর ভাঙন রুখতে সেসব বন্ধ হল”।

    “তারপর?”, জিজ্ঞাসা করলেন ছোট বোন।

    “তারপর…, মাটি আসত ডায়মন্ডহারবার থেকে। এই মাটি নিয়েও চলত দুর্নীতি। আগের জমানায় মাটি চুরির অভিযোগ উঠেছিল, তাই এই সরকার মাটি কাটা এখনও পর্যন্ত বন্ধ রেখেছেন। তদন্ত হবে হয়তো…”

    “তাই নাকি! বলো কি গো বড়দা!”, মেজকর্তা বললেন।

    “হ্যাঁ। কুমোরটুলিতেও মাটি আসছে না। ওদিকে সামনের অক্টোবরে পুজো। খড় বেঁধে মাটির প্রলেপ দেওয়ার সময় এখন”।

    “কেন? কিছু বলেছে?”

    “হ্যাঁ। বললুম যে, প্রশাসনের অর্ডার ছাড়া মাটি কাটা যাচ্ছে না। সাউথ-চব্বিশ পরগনার কে এক মাটি মাফিয়া…, বলছে নাকি কোটি কোটি টাকার মাটি পাচার করেছে!”

    “বলো কি হে?”

    “হ্যাঁ। কাগজে…, টিভিতেও দেখাচ্ছিল”।

    “কিন্তু পুজোর আর বাকি ১০০ দিনের কিছু বেশি। কত বারোইয়ারী পুজো! তারপর আমাদের মতো কত্ত বাড়ির পুজো…!”

    “তোমরা আর বদলালে না”, এবার কথা বলল বড়কর্তার ছেলে। বলল, “পরিবেশ বলে একটা বস্তু আছে, জানো তো? আর আমরা হলাম সেই পরিবেশের, সেই প্রকৃতির সন্তান। একদিকে তো সারা দেশে ভেজাল উন্নয়নের নামে নির্বিচারে চলছে পরিবেশ ধ্বংসের কাজ…”

    “সেইই। আর আমরা যদি সারাটা ভারতবর্ষ জুড়ে উন্নয়নের মিথ্যা বুলি কপচে কপচে নির্বিচারে পরিবেশ ধ্বংস করি, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কি আর কিছু পড়ে থাকবে?”, মেজকর্তার মেয়ে প্রশ্ন তুলল।

    “এদিকে মাত্র ৫০ বছরে জনসংখ্যা করে ফেলেছি ডবল। আর তার ওপর পুঁজিপতিদের, ক্রোনি ক্যাপিটালিস্টের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে দেশের বেশিরভাগ সম্পদ; জনগণের সম্পদ। আজ গ্যাস, তেল আর পেট্রোলের দাম কত বেড়ে গেছে। ভোজ্য তেল; ওষুধপত্র। ওদিকে লোকের কাজ নেই; শান্তি নেই। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে সব যাবে কোথায়? যেভাবে হকার তুলে দিল! ভাগ্যিস কোর্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দিয়েছে। পুজো মানে ওদের সারা বছরের ইনকাম। সংসার পরিবার ছেলে মেয়ে নিয়ে যাবেন কোথায় তারা? ”

    “ওদিকে দেখ, চীন কেমন সামলাচ্ছে। জনসংখ্যা একটা সমস্যা, সত্যিই সমস্যা, কিন্তু দেশের বেশিরভাগ নেতা দুর্নীতিগ্রস্ত হলে তুমি কি করবে?”

    “তার ওপর আছে চেতনাহীন মানুষ। সামনে দিয়ে সূঁচ চুরি করলে হাঁই হাঁই করে উঠছেন, কিন্তু পেছন দিয়ে হাতি চুরি করলে, বুঝতে বুঝতে আর ধরতে ধরতে এতো সময় লেগে যায় যে …”

    “আর শাসক হলেই যেন দূর্নীতি করার লাইসেন্স পেয়ে গেলাম। বাঃ! আর মানুষ তো একদিনে দুর্নীতিগ্রস্ত হয় নি। ওপর তলার দেখে দেখে শিখেছে। হোয়েন দ্য আপার হায়ারার্কি বিকাম্‌স কোরাপ্ট…”

    “আহ! বাদ দে না… বদ্দা। মেজদি। বড়দের একটা কথা বলি”, এবার বলে উঠল ছোটকর্তার বড় মেয়ে।

    জেঠুরা আর পিসিরা বললেন, “বল। এখন তোরাই সব। এবার থেকে তোরাই …, সব সামলাতে হবে…তো”।

    “বলছিলাম, আগে যেমন আমরা গুল কয়লায় রান্না করতাম। বা কয়লায়। এখন কি করি?”

    “নাহ্‌। তবে গ্যাস সরবরাহের যা অবস্থা তাতে করে…, যুদ্ধ!”।

    “বেশ। আগে আমরা কাঠ দিয়ে খাট বানাতাম। এখন বেশিরভাগ জায়গায় রট আয়রণ। রাইট?”

    “ঠিক”।

    “আগে রেডিও আর ছিল কাগজ। সেসব এখনও আছে, কিন্তু টিভি, মোবাইল…। সব ডিজিটাল। একসময় ইঞ্জিন বলে কোনও বস্তুও ছিল না…”।

    “সে তো ইলেকট্রিকও ছিল না। তুই ঠিক কী বলতে চাইছিস?”, এবার জানতে চাইলেন ছোটকর্তা মানে ওর বাবা।

    “আমি বলতে চাইছি, পৃথিবী জুড়ে পরিবেশ তো তছনছ হয়ে যাচ্ছে। কিয়োটো প্রোটোকল টোটোকল সব লোভের গমকলে ভাঙিয়ে ফেলেছে…”

    “মেক ইট শর্ট, বোনু”, বলল বড়কর্তার ছেলে।

    সেই সময় ভোলাদাদু আর মহাদেবদাদুর দুই বউ, মঙ্গলা দিদিমা আর টগর দিদিমা মুড়ি, নারকেল আর বাড়িতে ভাজা চপ নিয়ে হাজির হলেন। বাটি বাটি সবাইকে এক এক করে দিলেন বেড়ে। এক গাল মুড়ি, বাড়ির গাছের নারকোল আর চপ কামড়ে আবার সবাই কথা বলতে থাকলেন।

    ছোটকর্তার বড় মেয়ে যেখানে থেমেছিল সেখান থেকেই শুরু করল। বলল, “শোনো, যুগের সঙ্গে সঙ্গে আমাদেরও কিন্তু পাল্টাতে হবে। একদিকে মঙ্গলে মহাকাশ যান পাঠিয়ে ফেলল, আর একদল মানুষ মঙ্গলের জন্য প্রবাল পরছেন। জাস্ট ইমাজিন…, একদিনে ডি.এন.এ., আর.এন.এ., জিন আর অন্যদিকে ধর্ম; ধর্ম আর ধর্ম। আমি সব প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের কথাই বলছি…। সারা দুনিয়া জুড়ে ধর্মের এই ধ্বংস, কবে যে শেষ হবে!”।

    “ও হবে না। তুই এই কথা বলছিস তো? তাহলে শোন…”, এবার বলতে শুরু করল বড়কর্তার ছোটছেলে। মুড়ি চেবোতে চেবাতে বলল, “আমি একবার পাড়ার ক্লাবে, এই কয়েক বছর আগে, পুজোর মিটিং-এ একটা সাজেশন দিয়েছিলাম। বলেছিলাম যে কাছাকাছি ৩-৪টে পুজোকে যদি মার্জ করা যায়…”।

    “একটু এক্সপ্লেইন কর।”

    “ধর, একটা পঞ্চায়েত বা মিউনিসিপ্যালিটির দুটো ওয়ার্ড মিলিয়ে পাঁচ বা ছ’টা পুজো হয়। ক, খ, গ, ঘ, ঙ, চ। ক্লিয়ার?”

    “জলের মতো”।

    “বেশ। এবার ধর এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, যে এই পাঁচ বা ছ’টা পুজোর জায়গায় পুজো হবে একটা। যেমন ধর, একবার পুজো হল ক-তে। তার পরের বছর খ-তে। তারপর পর পর বছর গ, ঘ, ঙ, চ…, এইভাবে”।

    “তাতে কী হবে?”

    “অনেক উপকার হবে। প্রথমত, পাঁচটা বা ছ’টা পুজোর জায়গায় একটা পুজো করলে খরচ কমে যাবে। ইলেকট্রিক, ফুল-বেলপাতা। শব্দ দূষণ কম হবে…”

    “তারপর?”

    “মানুষকে কম চাঁদা দিলেই চলবে। রাস্তায় রাস্তায় জ্যাম জট হবে কম। আধিকারিকরাও রোটেশনে ছুটি পাবেন। তাদের কাজের চাপ কমে যাবে। তারাও পরিবার নিয়ে পুজো দেখতে বেরবেন”।

    “বেশ। তারপর?”

    “তবে সবচেয়ে যেটা ইম্পর্ট্যান্ট, ঐ পাঁচ ছ’টা পুজোর মানুষজন, যারা ভাগ ভাগ হয়ে পুজো কাটাতেন বা কাটাচ্ছিলেন, তারা ক’টা দিন একসঙ্গে মিলেমিশে…। এক হয়ে গল্প গুজব, হইচই করে, খাওয়া-দাওয়া করে কাটাতে পারবেন। এতে মানুষে মানুষে বিভেদ কমবে। প্রতিযোগিতা কমবে। মানুষ এক হতে পারবেন”।

    “বুঝলাম। কিন্তু ঐ পাঁচ ছটা পুজোর ঢাকি, পুরুত? যারা থিমের প্যান্ডেল করেন, তারা? – একজন বাদে বাকিদের তো কাজ গেল? ফুটুস?”

    “একদম না”।

    “মানে?”

    “বাকিরাও একসঙ্গে ঢাক বাজাবেন; পুজো করবেন। প্যান্ডেল বানাবেন। আসলে আমি চাইছিলাম যে মানুষ এক হোক। একতা বাড়ুক। আর খরচ কমুক। সঙ্গে পরিবেশ বাঁচুক”।

    “বাঃ! তোর ভাবনাটা তো বেশ ভালো রে!”, বড় কর্তা বলে উঠলেন। মেজ আর ছোটও মাথা নাড়লেন। বড়কর্তা বললেন, “তারপর? এই প্রস্তাব রাখবার পর কী বলল?”

    “তেড়ে এলো। বলল, তুই ব্যাটা কে রে এতো জ্ঞান দেওয়ার! নিজের বাড়িতে গিয়ে জ্ঞান দে! বলল, পুজো অর্গানাইজ করলে বুঝতিস তার ঠেলা। দু’পাতা বই পড়ে হনু গেছিস, না? ফালতু জ্ঞান দিতে আসবি না। আর ঐভাবে পুজো করা যায় না। যা ভেঙে যায় তা আর জোড়া লাগে না, বুঝলি”।

    “হুম। বোঝা গেল যে পুজোকে ঘিরে বেশিরভাগ কর্মকর্তার এলাকায় একটা কর্তালি করবার মানসিকতা…। আবার টু’পাইস ইনকাম। দেখা যাবে এলাকায় এক সময় একটাই পুজো হত। তারপর ইগোতে ইগোতে…। একান্নবর্তী সংসারই ভেঙে গেল। তারপর, নতুন কারখানা কোথায়? আগে, এই বিশ ত্রিশ বছর আগেও কেমন বিশ্বকর্মা পুজো হত সব কারখানা কারখানায়। আর এখন? ঐ অটো, টোটো আর রিক্সো স্ট্যান্ড। তারপর আবার ইউনেস্কো নিয়ে কীসব কেলেঙ্কারি আবার শুনছি…, ইসস!”

    “সবই তো বুঝলুম, এবার মাটির কী হবে?”, এবার জানতে চাইলেন ছোটবোন।

    সকালের দিয়ে যাওয়া কাগজটা দেখিয়ে মহাদেবদাদু বললেন, “দেকুন দাদা, একানে কী লিকচে। পটুয়াপাড়া অ্যাসোসিয়েসন, লিকচে মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি দিছে”।

    “নিশ্চয়ই একটা কিছু হবে। তবে বর্ষার আগেই অনেক শিল্পী কাজ এগিয়ে রাখেন তো। রোদে শুকোনোর ব্যাপার আছে তো…”।

    “বিধায়কের সঙ্গে কতাও বলচেন সবাই”।

    “দেখো জেঠু, মনে যদি ভক্তি থাকে, তাহলে অনেক কিছুই মেনে নেওয়া যায়। কথায় বলে, যদি হও সুজন তেঁতুল পাতায় নজন। প্রতিমা বড় না ভক্তি বড়? থিম, জাঁক বড় না ভক্তি বড়? প্রতিযোগিতা বড় না ভক্তি বড়?”, এবার প্রশ্নটা তুলল ছোটকর্তার ছোট মেয়ে।

    “কিন্তু সংস্কার?”

    “আর সংস্কার। এই সংস্কার তো চাপিয়ে দেওয়া। আমাদের পুজোর মধ্যেকার এসেন্সটা কী?”

    “কী?”

    “অ্যাগ্রেরিয়ান ইকোনমি। কৃষিকাজ। সেই কৃষিজ ফসল কাটবার আনন্দের উদযাপন। আগে বসন্তে ছিল; পরে আশ্বিনে। অকাল বোধন। এই যে নবপত্রিকা পূজা, শষ্য আর উর্বরতার দেবী হিসেবে পূজিতা হন মহামায়া। পদ্মফুল; কৃষিজাত নৈবেদ্য…, তাহলে?”।

    “হুম”।

    “তারপর বিদেশে তো ফাইবারের প্রতিমা মূর্তি যায়। সংরক্ষণ করলেই হল। বিজ্ঞানে তো সংরক্ষণ নিয়ে একটা গোটা চ্যাপ্টার আছে, তাই না? পরিবেশ সংরক্ষণ করতে না পারলে…”।

    “তাহলে তোরা কী বলছিস?”

    “আমার মনে হয় বদ্দা, ক’টা দিন দেখি। সরকার কী স্টেপ নিচ্ছেন দেখি। তারপর না হয় একটা…”, মেজকর্তা বললেন।

    “ঠিক আছে। তাহলে, আজকের মিটিং এইখানেই ভঙ্গ হইলো”।

    রাতে খাওয়া-দাওয়া করে সবাই শুয়ে পড়লেন। কেউ আগে; কেউ বা পরে।

    পরদিন ভোরবেলায় ভোলাদাদু এসে ডাকাডাকি শুরু করে দিলেন। হাঁক পেড়ে বললেন, “কই গো সবাই? কই গো, ঘুম কাটেনে দেগচি!”।

    ছোট আর মেজকর্তার আবার ভোর ভোর উঠে জপতপ করার অভ্যাস আছে। ভোলাদাদুর এই হাঁকডাক শুনে দুই কর্তা বেরিয়ে এলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, “ব্যাপার কী হে? এতো সকাল সকাল?”

    “ভালো একডা খপর আচে। আফনেরা যদি চান…”, বলেই চুপ করে গেলেন ভোলা।

    “কী বলবি তো?”

    “শোনেন, হাকিমপাড়ার মন্সুর মিঞা বলচিলেন, তার জমি থেকে মাডি দেবেন”।

    “মন্সুর মিঞা! ঐ যার ছোট মেয়েটা গত বছর আম পাড়তে গিয়ে বাজ পড়ে মারা গেল? আহা! ফুলের মতো…! আহা গো! পুজোর সময় কত আসত এখানে…”।

    “হ্যাঁ, দাদা…। কত খেলা করত। মজা করত”।

    “দেখো, আমাদের আবার বুঝতেই পারছ, বড়দাকে জিজ্ঞাসা না করে। তবে উনি শুনেছি বামমনস্ক মানুষ”।

    “বাচ্ছাদের জন্যি অবৈতনিক ইস্কুল করিচেন। বলেন, শিক্ষিত না হলি মানুষ হবে না। শিক্ষাই মানুষের মেরুদন্ড…”

    “সঠিক বলেছেন। তা চাষবাস কে করেন?”

    “লোক আচে”।

    সেইসময় বাড়ির বড়কর্তা ঘুম থেকে উঠে এসে হাজির হলেন দাওয়ায়। একটা প্রকান্ড হাই তুলে জানতে চাইলেন, “কী ব্যাপার ভোলা? এতো সকাল সকাল!”

    ভোলাদাদু সব কথা খুলে বললেন। তাতে বড়কর্তা চুপ করে একবার আকাশের দিকে তাকালেন। ভোরের আকাশ। লালচে আভা দেখা দিয়েছে। কিছু পাখী উড়ে যাচ্ছে। মুখ দেখে মনে হল কাকে যেন প্রশ্ন করছেন। তারপর গাছগুলোর দিকে তাকালেন। শেষে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেজ আর ছোটভাইদের দিয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোরা কী বলিস?”

    “সমস্যা কোথায়? বাজারে যে জিনিস কিনি, দোকান থেকে যে খাবার কিনি, জামাকাপড় কিনি, এমনকি রক্ত, এমারজেন্সিতে রক্ত…, তখন কি আর…”, ছোটকর্তা বললেন।

    “ঠিক বলেছিস। ঠিক। মাটির আবার প্রাতিষ্ঠানিক ধম্ম! হু! মাটির ধম্ম হল সৃষ্টি। ভোলা, তুমি মন্সুরকে বলে দাও। তবে আমরা কিন্তু কিনে নেবো…”।

    “হ্যাঁ। কদটুকুই বা লাগবে। এক ছাইয়া…”

    ভোলা মাথা নেড়ে প্রফুল্ল চিত্তে চলে গেলেন। ঘন্টা তিন পরে মুখার্জী বাড়ির সবাই একে একে জানতে পারলেন যে মাটির বন্দোবস্ত হয়ে গেছে। ধীরে ধীরে একটা স্বস্তির আবহাওয়া বিরাজ করতে থাকল। ছোটকর্তার মেয়ে গান ধরল – “আলোয় আলোকময় করে হে এলে আলোর আলো…”। ওদিকে রান্নাঘরে চলছে জল খাবারের আয়োজন।

    সেইসময় বাইকে করে ভোলা আর মন্সুর মিঞা এসে হাজির। প্রাথমিক অভিবাদনের পর মন্সুর ভাই বললেন, “আমার একটা আর্জি আছে দাদা”।

    মন্সুর মিঞাকে আপ্যায়ন করে কর্তারা বসালেন। হাঁক মেরে বললেন, “কই গো, চা বিস্কুট দিয়ে যাও”।

    একটা চেয়ারে মন্সুর মিঞা বসবার পর ওদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “টাকা আমি নিতে পারবো না দাদা। না। উৎসবের ক’টা দিন রুখসানা মা এখানে এসে কত্ত মজা…”, চোখের জল সামলে নিলেন মন্সুর মিঞা। বললেন, “তাও তো আগে মেলা বসত। নাটক গান হত; ম্যাজিক শো…। দুটো মেয়েই আসত। খেত দেত। খেলত…”। আবার উদাস হয়ে বোবা দৃষ্টিতে সামনে দিকে তাকালেন মন্সুর মিঞা। বললেন, “টাকা আমি নিতে পারবো না দাদা। তবে চাইলে আপনারা আমার পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন…”।

    ছোটবোন এসে সবাইকে চা বিস্কুট দিয়ে গেলেন। ভোলাদাদু আর মন্সুর মিঞাকে বললেন, “লুচি না খেয়ে কিন্তু যাবেন না”।

    বড়কর্তা একবার ছোট আর একবার মেজোর দিকে তাকালেন। তারপর মাথা নেড়ে সায় দিলেন। বললেন, “সেই একটা গান ছিল না?”

    “কোন গান গো বদ্দা?”, ভোলাদাদু জানতে চাইলেন।

    “কবর দাও বা চিতায় পোড়াও, মরলে সবাই মাটি…”

    “ওফ! ঠিক বলেছেন। দারুণ লিরিক”, মন্সুর মিঞা হেসে উঠে চা-এ চুমুক দিলেন। বললেন, “আমি হলাম শিবনারায়ণ রায়ের লোক। র‍্যাডিকাল হিউম্যানিস্ট। সমাজে আর ধর্মে সংস্কার না হলে সেই সমাজ, সেই ধম্ম ক্রমশ আবর্জনা হয়ে যায়। আমি সব ধম্ম আর সমাজের কথাই বলছি”।

    “ঠিক। একেবারে আগাছা হয়ে যায়”, বললেন মেজকর্তা।

    ভোলাদাদু আর কর্তারা চা পান শুরু করলেন। বড়কর্তা কী যেন একটা ভাবছিলেন। সেটা লক্ষ্য করে মন্সুর মিঞা জিজ্ঞাসা করলেন, “কিছু কি বলবেন?”

    “হ্যাঁ। তোমার রুখসানা মায়ের একটা ছবি দিয়ে যেও না…। আছে তো?”

    “বেশ”।

    এরপর কেটে গেল ক’টা মাস। তারপর আশ্বিনের শারদ প্রভাতে বেজে উঠল আলোর বেনু।

    মহালয়ার দিন গ্রামের লোকজন মাতৃপ্রতিমার মুখ দেখতে এসে অবাক হয়ে গেলেন। তারা দেখলেন প্রতিমার মুখটা একেবারে রুখসানার মতো। মন্সুর মিঞার ছোট মেয়ে রুখসানা, যে গত বছর বজ্রাঘাতে মারা গেছে।


    ==================================================================

    পুনশ্চঃ গত মাসে একটি বাংলা দৈনিকে খবর দেখে গল্পের আইডিয়াটা আসে। ধন্যবাদ।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • গপ্পো | ২০ জুন ২০২৬ | ২৮ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    উনুন - upal mukhopadhyay
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন