এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  দেখেছি পথে যেতে

  • হিমাচলের ইতি উতি - ৮

    লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | দেখেছি পথে যেতে | ১৪ জুন ২০২৬ | ৫০ বার পঠিত

  • মণিকরণ

    মণিকরণ আমি এসেছিলাম ১৯৮৯ সালে। মা ভাই আর আমি সেবার সেজমামা, সেজমাইমা আর মামাতো বোনের সাথে কুলু মানালি বেড়াতে এসেছিলাম। মানালি থেকেই HRTCর বাসে মণিকরণ এসে ঘুরেফিরে ঘন্টাখানেক বাদে সেই বাসেই ফেরত। তখন আমরা গাড়ি ভাড়া করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারতাম না। ফরিদাবাদ থেকে এসেছিলাম বাসে বাসেই। হরিয়ানা রোডওয়েজের বাসে দিল্লি ISBT গিয়ে সেখান থেকে HRTCর বাসে কুলু। একরাত থেকে আবার বাস ধরে মানালি।

    তখন কাসোলের নামও জানতাম না। বাস সম্ভবত কাসোল পেরিয়েই এসেছিল। মনে আছে দুপাশে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা, যত এগোই তত শিরশিরে ঠান্ডা থেকে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া ঘিরে ধরে। ঘন জঙ্গল, অজানা পাখিদের ডাক, অসম্ভব নীল আকাশ আর একপাশে নদীর গর্জন। নদী যে পার্বতী সেও তখন জানতাম না। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম এ বিপাশাই হবে, মানালি থেকেই সঙ্গে সঙ্গে এসেছে।


    স্বচ্ছতোয়া পার্বতী

    মণিকরণে পৌঁছে উষ্ণ প্রস্রবণের পাশে কিছুক্ষণ কাটিয়ে গুরুদ্বোয়ারায় মোটা মোটা ঘি চপচপে পুরি আর ঘি গড়ানো সুজির হালুয়া খেয়ে ফেরত। ওখানে তখন একখানাও মন্দির দেখি নি। এখন নতুন ব্রিজ পেরিয়ে গুরুদ্বোয়ারার দিকে যেতে গেলে তিন তিনখানা মন্দির পেরোতে হয়। এর মধ্যে শিবমন্দির আর রামমন্দির বেশ নতুন, তবে নয়না ভগবতী মন্দির বেশ পুরোন। সম্ভবত পুরোন ব্রিজ পেরিয়ে যাওয়া আসায় এবং এই মন্দিরের কথা জানা না থাকায় সেই সময় আমরা আর এপাশে এসে এই মন্দিরটা দেখি নি।


    মণিকরণ এত্ত ঘিঞ্জি হয়ে গেছে এহ!

    তা সেই চালাল থেকে হোস্টেলে ফিরে ঘন্টাখানেক জিরিয়ে আবার বেরোলাম। ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে গিয়ে মনিকরণ সাহিবের একটা গাড়ি নিয়ে রওনা দিলাম বিকেল সোয়া চারটে নাগাদ। সারথী কুণাল ছেত্রী। বেশ গোপ্পে ছেলে। কথায় কথায় জানাল দার্জিলিঙের কোন এক গ্রামে বাড়ি, ১৬-১৭ বছর বয়সে কাজের খোঁজে হিমাচলে এসে মানালিতে কিছুদিন এক এজেন্সির গাড়ি চালিয়ে শেষে কাসোলে এসে থেকে যায়। এখন রীতিমত নিজেই একটা কার রেন্টাল এজেন্সির মালিক। তিন চার বছর পরে একবার করে গ্রামে যায়, বাবা মা দাদু ঠাকুমা সবাই সেখানেই থাকে কিনা।


    রামমন্দিরের সিঁড়ির খিলান ও সিলিঙে কাঠের কাজ

    মণিকরণ পৌঁছাতে সময় লাগে কুড়ি পঁচিশ মিনিট। নতুন ব্রীজের পাশেই মস্ত পার্কিং লট। সূর্য বাড়ির পথে রওনা দিয়েছে, আলো তার পিছু পিছু দৌড়াচ্ছে। ব্রীজ পেরিয়ে প্রথমেই রামমন্দির। কাঠের কাজ তবে বিশেষ পুরোন নয় সে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কয়েক পা এগিয়েই নয়না ভগবতী মন্দির। কাঠের অপূর্ব কুনিকাজ করা দেওয়াল খিলান ছাদ। পৌরাণিক গল্প অনুযায়ী নদীতে স্নান করতে নেমে দেবী পার্বতীর কর্ণাভরণ থেকে একটা মণি খুলে জলে পড়ে হারিয়ে যায়।


    নয়না ভগবতী মন্দির

    মণিটি জলে পড়ামাত্র তার ঔজ্জ্বল্যে মুগ্ধ হয়ে সর্পরাজ শেষনাগ সেটি হস্তগত করে পাতালে ডুব দেন। এদিকে মণি হারিয়ে পার্বতী অতি বিচলিত, দু:খিত, খুঁজে দিতে না পেরে বিরক্ত ক্রুদ্ধ শিবের তৃতীয় নয়ন খুলে যায়, সেই নয়ন থেকেই সৃষ্টি হয় নয়না ভগবতী দেবীর। তিনি শেষনাগকে বাধ্য করেন মণিটা ফেরত দিতে। মণি পেয়ে পার্বতী খুশী, কাজেই শিবও খুশী। জায়গার নাম হয় মণিকরণ আর শিবঠাকুরের স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড নয়না ভগবতীদেবীর পুজোও শুরু হয় ওই জায়গায়।


    মন্দিরের দালানের সিলিং। ছবিটা Nittu Trippyর থেকে পাওয়া।

    এর পরে বেশ খানিকটা এগিয়ে ঠিক বাজার শুরু হবার আগে একটা শিবের মন্দির। এইটাও নতুন। ১৯৮৯ এ এই এলাকাটা আমরা ঘুরেছিলাম, তখন বাজার বা মন্দির কিছুই ছিল না। অল্প দুএকজন কাঁধে পিঠে বোঁচকা নিয়ে মাফলার শাল ইত্যাদি বিক্রির জন্য ঘুরছিলেন। পরে ভাই বলল ওখানে একটা বড় গাছের নীচে পাথরের সামনে দুটো ছোট ছোট ষাঁড়ের মূর্তি (নন্দী ভৃঙ্গী?) ছিল, সেইটাই এখন আস্ত শিবমন্দির হয়ে গেছে। জুতো খোলার চক্করে অবশ্য কোন মন্দিরেই ঢুকি নি।


    শিবমন্দির মণিকরণ

    বাজারের ভিতর দিয়ে গিয়ে উষ্ণকুন্ড আর তার পাশেই গুরুদ্বোয়ারা। আগেরবার দেখেছিলাম কিছু লোক কাপড়ে পুঁটলি করে চাল আলু বেঁধে উষ্ণকুন্ডে ডুবিয়ে সেদ্ধ করে নিচ্ছে। এবারে আর সেসব নেই, সবাই নামছে ভক্তিভরে জল মাথায় ঠেকাচ্ছে কপালে মাখছে তারপর উঠে আসছে। লাদাখে পানামিকের শান্ত নির্জন উষ্ণকুন্ডের কথা মনে পড়ল। কতক্ষণ হাত ডুবিয়ে বসেছিলাম ওখানে। এত ভীড়ে আর নামতে ইচ্ছে হল না। এখানকার আমসত্ত্ব বেশ ভাল খেতে। আম দিয়েই বানানো, কুমড়ো দিয়ে নয়।

    বাজার থেকে খানিকটা আমসত্ত্ব কিনে ফেরার পথ ধরি। সকালেই ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে শুনেছিলাম ধ্বস নামার জন্য তোশ, টুলগা পুলগার রাস্তা বন্ধ আছে, আগামীকাল খুলতে পারে। কুণাল বলে ওকে সকালে ফোন করলেই ও গাড়ি নিয়ে হোস্টেলে হাজির হয়ে যাবে। কাল এই জায়গাগুলোতে নিয়ে পরশু অন্য জায়গায় নিয়ে যাবে। তারপর ১৩ তারিখে একেবারে দিল্লি পৌঁছে দেবে। ও না গেলেও ওর এজেন্সির গাড়ি দিয়ে দেবে। বেশ ভাল কথা।


    কাসোল সন্ধ্যে নামার আগে (বাঁদিকে মুস্কিল আসান ট্যাক্সি ইউনিয়ানের অফিস)

    সারাদিনের হাঁটাহাঁটি ঘোরাঘুরিতে বেজায় ক্লান্ত থাকলেও ওই গাঁজার গন্ধওলা ক্যান্টিনে যেতে ইচ্ছে হল না। কাজেই রাত সাড়ে আটটা নাগাদ বেরোলাম নৈশাহারের সব্ধানে। ওডিন হোস্টেল থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে পঞ্চাশ মিটার মত হাঁটলে মূল সড়কের উপরেই ‘লিটল ইটালি ইন’। একতলায় বেকারি, দোতলায় রেস্টুরেন্ট, আর তার উপরে দেড় কি দুইতলায় থাকার ব্যবস্থা। রেস্টুরেন্টে পৌঁছে দেখি আমি একাই খদ্দের। এদের ইজরায়েলি খাবার দাবারের মোটামুটি সুনাম আছে। বেছেবুছে অর্ডার দেওয়া গেল Chicken Schnitzel with Pita Bread. খাবারের স্বাদ বেশ ভাল।


    দিব্বি খাসা খেতে।

    খেয়েদেয়ে ফাঁকা রাস্তায় খানিক হাঁটাহাঁটি করে ডর্মে ফিরে ঘুমোতে গিয়ে দেখি বেদম ঠান্ডা লাগছে। এখানে নেটওয়ার্কের কোন সমস্যা নেই, তাই ওয়েদার অ্যাপ অন করে তো চক্ষু চড়কগাছ। তাপমাত্রা -১২ ফিলস লাইক -১৫। বলে কি রে! নভেম্বরের প্রায় মাঝামাঝি কাসোলে এত ঠান্ডা কী করে হতে পারে? নির্ঘাৎ কোথাও কিছু ভুলভাল দেখছি। এদিকে চোখ খুলে রাখা আর সম্ভব হচ্ছেই না। অগত্যা গ্লাভস জ্যাকেট ইত্যাদি সব পরে টরেই কম্বলের তলায় ঢুকলাম।


    অ্যাঁ!!

    সকালে উঠে তৈরী হয়ে আবার ওয়েদার অ্যাপ খুলে দেখি তাপমাত্রা আরো নেমে গেছে। সকাল পোনে নটায় -১৯ তবে রোদ্দুর উঠে গেছে বলে ফিলস লাইক -১৪। কিরে বাবা দিব্বি তো স্নান টান করলাম। ভাল করে খেয়াল করে দেখি জায়গার নাম দেখাচ্ছে সোজান। টেনেটুনে কাসোল করলে তখন তাপমাত্রা -২ ফিলস লাইক ১ডিগ্রি। হ্যাঁ এইটা ঠিক আছে। ফিরে এসে ম্যাপে দেখতে হবে সোজান জায়গাটা কোথায়। আজ বেরিয়ে অন্য একটা ক্যাফেতে কফি আর বাটার টোস্ট নিয়ে বসি।


    ভ্যাট! ভুলভাল।

    খেতে খেতেই কুণালের ফোন আসে। আজ তোশের রাস্তা খুলেছে, ও মানালি বেরিয়ে গেছে অন্য গাড়ি পাঠাবে। তোশ, কালগা পুলগা দেখিয়ে কাল সেই গাড়িই আমাকে নাগগর আর মানালি নিয়ে যাবে। যাব্বাবা খামোখা মানালি যাবো কী করতে? আর নাগগর এদিক থেকে এতটা উজিয়ে যাবো কেন? ও তো নানা জায়গায় যেতে আসতে মানালি থামা হয়, সেখান থেকেই টুক করে ঘুরে আসা যায়। কুণাল বলে তাহলে কাল ওদিকে যাবে না? নাহ বিলকুল না, কাল আমি গ্রাহাণ যাবো। বলে ঠিক আছে তুমি ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে ফোন করো।

    ক্যাফে থেকে বেরিয়ে ফোন করতে ছেত্রীমশাইয়ের গলায় অন্য সুর। নাহ আবার পাথর পড়ছে আজ তোশ যাওয়া যাবে না, আজ তুমি লোকালেই ঘোরো কাল রাস্তা খুললে কাল তোশের গাড়ি পাঠাবো। বুঝলাম ওই লম্বা জার্নিটায় রাজী না হওয়ায় এ এই ছোট ছোট জার্নিগুলো যেতে চাইছে না। গুটি গুটি পায়ে ট্যাক্সি ইউনিয়ানের অফিস। যা ভেবেছি, তোশের রাস্তা দিব্বি খোলা, গাড়িও যাচ্ছে। এখানে ট্যাক্সিদের সিরিয়াল নম্বর অনুযায়ী পর পর যাত্রীদের বরাদ্দ করে। সারথী নরেশ ঠাকুর তাঁর আল্টো নিয়ে এলেন আমার জন্য।

    রাস্তার যে অংশে ধ্বস নামার জন্য গত দুদিন গাড়ি চলাচল বন্ধ ছিল সেখানে এখনো থেকে থেকেই বড় ছোট আলগা পাথর গড়িয়ে পড়ছে। রাস্তা আটকে একটা আর্থ মুভার পাথর সরাচ্ছিল। মিনিট দশেক বাদে ছাড়ল। ছোট একটা মাটি পাথরের ফালি, রাস্তা প্রায় নেইই। আমাদের গাড়ির সামনে আর একটা ছোট গাড়ি ছিল, স্যুইফট। সে আর কিছুতেই পেরোতে পারে না। তার চাকা একপাক ঘোরে তো তিরিশ সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে। বোঝাই যাচ্ছে সে গাড়ির চালক সাহস পাচ্ছেন না।

    মহা মুশকিল, ঝটপট না পেরোলে আবার পাথর পড়া শুরু হতে পারে যে কোন মুহূর্তে। এখানে হর্ন দেবার চল নেই, সব গাড়ি পর পর অপেক্ষা করছে। নরেশজি নেমে গিয়ে সাহায্য করতে চাইছিলেন, কিন্তু উপস্থিত সেনাবাহিনীর সেপাইরা মানা করলেন। শুনলাম এত বড় বড় পাথর পড়েছিল যে তা সরাতে সেনাবাহিনীকে ডাকতে হয়েছে। প্রায় আড়াই মিনিটের চেষ্টায় সামনের জন ওই কুড়ি মিটার পেরোলেন। সামনের গাড়ি বেরিয়ে যেতেই নরেশজি বোঁ বোঁ করে ওই বিপজ্জনক ফালিটা পেরিয়ে একটু এগিয়ে সাইড করলেন।

    এখানে রাস্তা আর পাহাড়ের মাঝে বেশ খানিকটা এবড়ো খেবড়ো জমি, সম্ভবত ধ্বস পরিস্কার করা হয়েছে তাই ফাঁকা। সেখানেই সেই আগের গাড়িটা সাইড করে চালক বাইরে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে বোতল থেকে জল নিয়ে ঘাড়ে মাথায় দিচ্ছেন। আর একজন ভদ্রমহিলা বনেট ধরে মাথা নীচু করে দাঁড়িতে আছেন। নরেশজি গিয়ে কথা বলে পিঠ চাপড়ে দিয়ে এলেন। শুনলাম এঁরা রোহতকের বাসিন্দা। পাহাড়ে গাড়ি চালানোর অল্পস্বল্প অভিজ্ঞতা আছে তবে এত সরু নড়বড়ে রাস্তায় এই প্রথম।

    আমরা চলেছি, ডানপাশে অনেকটা নীচে পার্বতী চলেছে ঝমর ঝাঁপর করে নাচতে নাচতে। HRTCর বাস আসে কুলু থেকে বারসৈনি পর্যন্ত। বারসৈনী থেকেই ক্ষীরগঙ্গা ট্রেক শুরু হয়। বাসে এলে বারসৈনী নেমে ঘন্টাখানেক হাঁটলে তোশ গ্রাম। তোশ, কালগা, পুলগা, টুলগা এই গ্রামগুলো সবকটাই পার্বতীর ডানদিকের পারে পাহাড়ের উপরে অবস্থিত। এই গ্রামগুলোর কোনোটাতেই সরাসরি গাড়ি যায় না। গাড়ি চলার রাস্তা মূলত পার্বতীর বাঁ পারে।


    তোশ যদি নাই পৌঁছাতে পারি এঁকে দেখেই তো চোখ ফেরে না

    তবে পার্বতী বাঁধের কাছে ডানদিকের তীরে অল্প কিছুটা কালগা আর পুলগা গ্রামের পাশে গাড়ি চলার পাকা রাস্তা আছে। সেখানেও গাড়ি রেখে পাথরে ধাপকাটা এবড়ো খেবড়ো সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গ্রামে পৌঁছাতে হয়। কাসোল থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে ৭৯০০ ফিট উচ্চতায় তোশ এক অপূর্ব সুন্দর শান্ত পাহাড়ি গ্রাম। চারিদিকে বরফে মোড়া পর্বতশৃঙ্গ আর অনেকটা নীচে কলস্বনা পার্বতী, গাড়ি না চলায় অসম্ভব পরিস্কার রৌদ্রকরোজ্জ্বল আকাশ, টাটকা বাতাস আর কনকনে ঠান্ডা সবমিলিয়ে তোশ যেন পরিশ্রান্ত স্নায়ুতন্ত্রের উপরে আলতো আদরের হাত বুলিয়ে দেয়।


    ওইই দেখা যায় তোশ

    এক জায়গায় গাড়ি সাইড করে নরেশজি বলেন গাড়ি আর যাবে না, এখান থেকে হেঁটে গিয়ে কাঠের পুল পাবে। ওইটে পেরিয়ে তোশে ঢুকে ঘুরে ফিরে ঘন্টাখানেকের মধ্যে ফেরত এসো। ধারে নানা সাইজের গাড়ি টেম্পো ট্রাভেলার, ছোটা হাতি ইত্যাদি পরপর দাঁড়িয়ে আছে। খানিক এগিয়ে আরো কটা গাড়ি আর বাইকের পরে সামনে একটা ইয়াম্মোটা লোহার পাইপ বেঁকিয়ে আড়াআড়ি রাস্তা জুড়ে রাখা যাতে গাড়ি বা বাইক আর এগোতে না পারে। কিন্তু কাঠের পুল কৈ?


    কাঠের পুল খুঁজতে গিয়ে ক্যামেরা এখানেই আটকে গেছে

    পাইপ টপকে এগিয়ে দেখি মাটি আর বালি মেশানো রাস্তাগোছের কিছু একটা নদীগর্ভের দিকে নেমে গেছে। লোকজন ঘাড়ে পিঠে বোঁচকা বুঁচকি নিয়ে সেদিকে নেমে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। যাচ্চলে! এটা তো সিলেবাসে ছিল না! বাঁপাশে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একটা বেশ উঁচু মাটিলেপা চওড়া ধাপ, বাঁশের খুঁটি মাথায় টিনের চাল। ভেতরে একটা পাথরের বেঞ্চমতও আছে। বোধহয় চায়ের দোকান ছিল বা এমনিই বিশ্রামস্থল, আপাতত পরিত্যক্ত।

    সেখানে উঠে দেখি ওই নদীগর্ভের দিকে নেমে যাওয়া রাস্তাগোছের ব্যপারটা আসলে মানুষের পায়ের চাপে তৈরী হওয়া একটা সাময়িক পথ। বেশ খানিকটা নেমে আবার বাঁ দিকে উঠেছে তারপর আরো খানিকটা সরু ফালিমত পথ গিয়ে তোশের পাকা রাস্তায় উঠেছে। মানুষের পায়ে পায়েই ধাপে ধাপে সিঁড়ির মত তৈরী হয়েছে। কয়েকজন স্থানীয় মহিলা, কারো পিঠে কাঠকুটোর মস্ত বোঝা, কেউ বা পিঠের ঝুড়িতে মুদী দোকানের সামগ্রি নিয়ে যাচ্ছিলেন। দিব্বি তরতরিয়ে নেমে যাচ্ছেন।


    ভাঙাপথের যাত্রীরা
    (ভিডিওতে যেটা ক্ষীরগঙ্গা গ্লেসিয়ার বলেছি ওটা ভুল।)


    ওঁদের থামিয়ে কাঠের ব্রিজের কথা জিজ্ঞাসা করায় জানলাম সেপ্টেম্বরের বন্যার সময় ব্রিজ ভেঙে ভেসে গেছে। এখনো নতুন ব্রিজ তৈরী হয় নি, এইভাবেই নেমে উঠে যেতে হবে। বোঝো কান্ড! ভাল করে দেখে বুঝলাম একখানা হাইকিং স্টিকের ভরসায় আমি এখান দিয়ে নামতে পারবো না। দুখানা স্টিক থাকলে মাটিতে গেঁথে গেঁথে নেমে যেতে পারতাম। কিন্তু কোনোভাবে নামতে পারলে ওইদিকে উঠতে পারবো আর এদিকেও ফেরার সময় উঠে আসতে পারবো।

    খানিকক্ষণ ছবি ভিডিও তুলে এগোলাম। এর মধ্যে কিছু মানুষজন রীতিমত বড়সড় ব্যাগ স্যুটকেস নিয়েও ওইখান দিয়ে নেমে যাচ্ছেন। এঁরা তোশে থাকবেন একদিন বা দুদিন। কাউকে কাউকে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে চলে যাচ্ছে। কেউ কেউ আবার বারসৈনী থেকে হিচ হাইক করে এসেছেন। কাসোলকে মিনি ইজরায়েল বলা হয় বটে তবে তোশও কিছু পিছিয়ে নেই। অজস্র ইজরায়েলি মানুষজন তোশ, গ্রাহাণ, মালানা অঞ্চলেও আসেন। কাসোল যথেস্ট দামী জায়গা হওয়ায় দীর্ঘদিন থাকার জন্য তোশ অনেক পর্যটকেরই বেশী প্রিয়।

    একটু দাঁড়িয়ে হাত বাড়ালেই কেউ না কেউ ধরে নামিয়ে দিতেন ঠিকই কিন্তু আমি ভাবলাম দেখিই না একেবারে একা একা যেতে পারি কিনা। চোখের জন্মগত ত্রুটির (নিস্ট্যাগমাস) জন্য এসব ক্ষেত্রে আমি দূরত্ব বা উচ্চতা ঠিকঠাক বুঝতে পারি না। চোখের ফোকাল লেংথ ফিক্সড হয় না বলে আমি দেখেশুনে যেখানে পা ফেলি সেটা আসলে ঠিক জায়গার থেকে কয়েক মিলিমিটার এদিক ওদিক। ফলে ভারসাম্য নষ্ট হয়, পড়ে যাবার সম্ভাবনাও খুব বেশী। দুহাতে দুটো স্টিক থাকলে ওরাই চোখের বদলে ঠিক জায়গা বুঝিয়ে দেয়।


    পা ফস্কে গড়ালেই সোওজা ওইখানে

    তো একহাতের স্টিক দিয়ে চেষ্টা করে বুঝলাম হবে না, ব্যালান্স হারিয়ে গড়িয়ে যাবার চান্স খুব বেশী। কাজেই ওই রাস্তা বা সিঁড়ি বা হোয়াটেভার, ওটার ধারে থ্যাপাস করে থেবড়ে বসে পড়লাম। তারপর বসে বসে ঘষে ঘষে মিনিট তিনেকের চেষ্টায় নেমে গেলাম। প্যান্টের সাড়ে দেড়টা বাজল বটে তবে কাদা বা নোংরা নেই, স্রেফ ধুলোমাটি। ও ভাল করে ঝেড়েমুছে নিলেই চলবে। নেমে এমন ফুর্তি হল যে দিব্বি গটগটিয়ে ওপাশ দিয়ে উঠে হনহনিয়ে হেঁটে একেবারে তোশ গ্রামের ভেতরে ঢুকে একটা ক্যাফের সামনে গিয়ে থামলাম।


    শান্ত সুন্দর তোশ

    ভারতের অন্যত্র থেকে প্রায় মুছে যাওয়া হিপি কালচার এই অঞ্চলে এখনো রমরমিয়ে চলছে। যেখানে সেখানে মেয়ে পুরুষ গাঁজায় (বা অন্য কিছুতে) দম দিয়ে ঝিম হয়ে বসে আছে। অথবা একসাথে গিটার নিয়ে বসে গান গাইছে। তবে এইসব ক্যালোরব্যালোর সত্ত্বেও জায়গাটা অদ্ভুত শান্ত সুন্দর। ধওলাধর আর পিরপাঞ্জাল রেঞ্জের শৃঙ্গগুলো কে জানে কতশো বছরের বরফ মাথায় নিয়ে সূর্য্যের আলোয় সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে। নদীর ওইদিকে অনেক উপরে একটা হিমালয়ান গ্রিফন চক্কর কাটছে।

    হোয়াইট সেইল, পাপাসুর, দেওচান, কুটলা আর আংডুরি এই কটা শৃঙ্গ একদম কাছে মনে হয় যেন একটু দৌড়ালেই পাঁচটার মধ্যে যে কোন একটার নীচে পৌঁছানো যাবে। তোশগ্রামের ঠিক উল্টোদিকের পর্বতশৃঙ্গের উপরের হিমবাহ দেখিয়ে নরেশজি বলেছিলেন ক্ষীরগঙ্গা হিমবাহ। গ্রামের মধ্যের মামুষজন কিন্তু জানালেন না ক্ষীরগঙ্গা হিমবাহ তোশ থেকে সরাসরি দেখা যায় না।

    ওঁরাই ওই শৃঙ্গগুলোর নাম বলে ভেতরে আরেকটু গিয়ে একটা চড়াই চড়তে বললেন। সেখান থেকে তোশ হিমবাহ ও নীচে তোশ - নাল্লা উপত্যকার অপূর্ব ভিউ পাওয়া যায়। একঘন্টা প্রায় হয়ে এলো, ওদিকে কালগা আর পুলগাতেও যেতে হবে। তাই আর চড়াই চড়ার চেষ্টা না করে ফেরার পথ ধরলাম। ক্ষীরগঙ্গা ট্রেকে যদি আসতে পারি তাহলে তোশে এসে দু একদিন থেকে যাবো। ততদিনে কাঠের ব্রিজটা তৈরী হয়ে যাবে আশা করি। আবার সেই নেমে উঠে ফেরা, তবে এবার তেমন সমস্যা হল না। দিব্বি হাঁচোর পাঁচোর করে উঠে এলাম। নরেশজি বলেন চল প্রথমে পুলগা যাই, ওখানে প্রায় সমতল। বেশ তাই যাই তাহলে।

    (চলবে)

    * তোশের এন্ট্রি পয়েন্টের যাতায়াতটা বিস্তারিত লিখে রাখলাম নিজের জন্য। আমার জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পাঠক এত অনর্থক ডিটেলসে বিরক্ত হতে পারেন। সেক্ষেত্রে ওইটুকু স্কিপ করে যাবেন।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ভ্রমণ | ১৪ জুন ২০২৬ | ৫০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। চটপট মতামত দিন