বিভাব পত্রিকার ১৯৭৭ সালের একটি সংখ্যায়, “বিদেশী কবিতা” শিরোনামে একগুচ্ছে তাদেউশ রুজেভিচের (Tadeusz Różewicz) কবিতার অনুবাদ করেছিলেন মানবেন্দ্র। এবং সেই সঙ্গে অত্যন্ত সুলিখিত “রুজেভিচ সম্বন্ধে অনুবাদকের টীকা”। যে কবিতাটির কথা ভাস্কর বলেছেন সেইটির ছবি সঙ্গে রইলো। আর টীকার টেক্সট যথাসম্ভব ওসিআর করে উদ্ধার করে রইলো নিচে। রুজেভিচের বয়ানে এই কথাগুলোই আমার-ও কথা বলতে ইচ্ছে করে, তবে, আমার মনে হয় আর কোনোই কথা নেই।
যাইহোক, টীকাটির ৩/৪ অংশ নিচে।
“ধর্মের মতো কবিতাও এক বিপুল ধাপ্পা, তাদেউশ রুজেভিচ বলেন। না-হ'লে কেন হ'লো উপনিবেশগুলো, কেন পুঁজিবাদ ও শোষণ, কেন যুদ্ধ আর কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প? টোমাস মান স্তম্ভিতভাবে একবার বলেছিলেন কী ক'রে হিটলারের জার্মানিতে মস্ত প্রেক্ষাগৃহ ভিড় লোকের সামনে চমৎকারভাবে বাজানো হচ্ছিলো বেটোফেনের 'এরোইকা', যার বিষয়বস্তু নির্মম শ্লেষের মতো ছিলো স্বাধীনতা। কিন্তু মান তখন ছিলেন মার্কিন মুলুকে, নিরাপদে। আর রুজেভিচ? যুদ্ধ যখন বাঁধলো তাঁর বয়েস মাত্র আঠারো (তাদেউশ রুজেভিচ-এর জন্ম পোলান্ডের রাদোমস্কতে ১৯২১ সালে), লেখাপড়ায় এক হ্যাঁচকা টানে ইতি পড়েছিলো তাঁর অনেক সহযোগী লেখকদের মতোই, আর যুদ্ধের ঠিক এক বছর আগেই কিনা রুজেভিচের প্রথম কবিতাগুলো বেরুতে শুরু ক'রে দিয়েছিলো। তাঁর সমবয়েসী কবিদের মধ্যে বাচিনস্কি আর গাইৎসি মারা গিয়েছিলেন ভার্শাভা অভ্যুথানের সময়, ঝেইনিশ আর বেহারোভিশ ছিলেন কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে, আর জ্বিগিনিয়েভ হেরবের্ত প্রতিরোধ বাহিনীর ছদ্য কাজ করা ছাড়া কিছুই আর করেননি।
যুদ্ধের সময় যা-যা হয়, সব ঘটেছিলো রুজেভিচের সেই সদ্য যৌবনে। নিছক বেঁচে থাকবার জন্য কুলির কাজ করেছেন, গুপ্ত সামরিক স্কুলে পাশ করেছেন পরীক্ষায়, প্রতিরোধে অংশ নিয়েছেন। চোরাগোপ্তা ভাঙাচোরা হাতে-বিন্যাস-করা প্রতিরোধ মুদ্রণালয় থেকে ছাপিয়েছেন তাঁর কবিতা। অবশেষে ১৯৪৫এ ভর্তি হয়েছেন ক্রাকুভ বিশ্ববিদ্যালয়ে, পাঠবিষয় আর্ট হিস্ট্রি। আর শিল্প-সংস্কৃতির ইতিহাস পড়বার পর তাঁর বিশ্বাস আরো বদ্ধমূল হয়েছে যে 'শিল্প' চূড়ান্তভাবে মানুষের দুঃখবেদনাকে টিটকিরি দেয়, অপমান করে, অসম্মান করে।
আর এই জন্যেই তিনি তৈরি ক'রে নিয়েছেন তাঁর নিজস্ব এক 'প্রতি-কবিতা,' 'অ্যান্টিপোয়েম'—কাব্যকবিতার সব কৌশলকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে যা একান্তভাবেই নগ্ন, কৃশকায়, ও অসহায় আর নির্মমভাবে সৎ; এই প্রতি-কবিতার অব্যবহিত দাবি ও আঘাত আর আভান্তরীণ হিংস্রতা কেবল এক অসংবরণীয় দয়া ও মায়া দিয়েই শামাল দেয়া। এই বিশৃঙ্খলা ও দুর্বিপাকের মধ্যেও কী ক'রে লোক তথাকথিত সহজ স্বাভাবিক জীবনযাপন করে—এটাই তাঁর আঘাতের লক্ষ্য—অর্থাৎ তথাকথিত সভ্যতাই তাঁর দ্বারা অভিযুক্ত, দায়রায় সোপর্দ। আর আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য তিনি এই পশ্চিমী সভ্যতাকে কোনো ছলচাতুরীরই সুযোগ নিতে দেননি। আপোষ তাঁর ধাতে নেই। এদিক দিয়ে অন্য যাঁরা নানা দেশে প্রতি-কবিতার প্রতি উন্মুখ, তাদের সঙ্গেই তাঁর মিল। যেমন চিলির নিকানোর পার্রা, জার্মানির হান্স মাগনুস এনৎসেনসবের্গের, চেকোস্লোভাকিয়ার মিরোস্লাভ হোলুব, ইউগোস্লাভিয়ার ভাস্কো পোপা—আর পোলান্ডে তাঁর সহযোগী জ্বিগিনিয়েভ হেরবের্ত ও আরো তরুণ ইয়েশি হারাসিমোভিচ। নিকানোর পার্রা তরুণ কবিদের উদ্দেশ ক'রে বলেছিলেনঃ
“যা খুশি তোমার, লেখো
যে-শৈলীতে তোমার রুচি তাতেই
সেতুর তলা দিয়ে বড়ো বেশি পরিমাণ রক্ত ব'য়ে গেছে
এই বিশ্বাস নিয়েই
যে কেবল একটা পথই নির্ভুল”
মানবেন্দ্রর টীকা শেষ হচ্ছে এই বলে,
“অন্য প্রতি-কবিতার লেখকদের সঙ্গে তাঁর তফাৎও আছে। অন্য অনেকের অবলম্বন ব্যঙ্গ, শ্লেষ, তীক্ষ্ণ-তির্যক আঘাত; রুজেভিচ এমনকি ব্যঙ্গও বাদ দিয়েছেন, কারণ হয়তো ব্যঙ্গ আর শ্লেষ খানিকটা ক্ষমা ক'রে দেয় ব্যাঙ্গের বস্তুকে। রুজেভিচ ক্ষমা করতে চান না। সভ্যতাকে না, কবিতাকেও না।“
মাঝে মাঝে আমার-ও অনুরূপ ভ্রম হয়। আমিও জানি না, আমরা ক্ষমা করতে পারবো কী না সভ্যতাকে, কিংবা কবিতাকে, কিংবা আরও পাঁচটা সুমহান ধাপ্পাকে।

