এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬! 

    মুহাম্মদ সাদেকুজ্জামান শরীফ লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১৯ জুলাই ২০২৬ | ৪৭ বার পঠিত
  • ঘটনাবহুল বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ শেষ হচ্ছে আজকে। ফুটবল বিশ্বকাপ সব সময়ই অন্য এক আমেজ। এই ভূগোলকে এর সাথে তুলনা হয় এমন আর কিছুই সম্ভবত নাই। পুরো বিশ্ব এক সময়ে, এক দিকে তাকিয়ে থেকে কাঙ্ক্ষিত দলের জয় কামনা করে। এ এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড না? আমাদের ছোট্ট শহর শেরপুর, এখানে এই মধ্য রাতে খেলা দেখার কত আয়োজন! বিশাল বড় স্ক্রিন লাগানো হয়েছে। যার যার দলের সমর্থকেরা এসে হাজির হচ্ছে। খেলা দেখতে গিয়ে তুমুল ঝগড়াও হচ্ছে। সব কিছু মিলিয়ে এক এক বিশাল আয়োজন। ঢাকার আয়োজন তো ইতিমধ্যেই সারা পৃথিবীর বুকে আলোড়ন তৈরি করেছে। আর্জেন্টিনা থেকে আর্জেন্টিনাবাসি আসছে ঢাকায় খেলা দেখার জন্য! অবিশ্বাস্য না? ব্রাজিলের চ্যানেল লাইভ করছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির মাঠ থেকে। সবাই অবাক হয়ে দেখছে এ কেমন উম্মাদনা! গতকাল দেখলাম এক আর্জেন্টাইন টুরিস্ট কাপল থাইল্যান্ড ঘুরতে আসছিল। সেখান থেকে বাংলাদেশ দূতাবাসে গেছে ভিসার জন্য, ফাইনালটা তারা ঢাকায় দেখতে চায়!  এই সবই বিশ্বকাপ ফুটবলকে এমন এক মাত্রা দেয় যা অন্য কোনকিছু দ্বারা সম্ভবই না। 

    ৩২ বছর আগে যে বিশ্বকাপ হয়েছিল তার সাথে এবারের বিশ্বকাপ আমেজের মিল হওয়ার কথা না? প্রায় একই ভেনু।  কিন্তু কী বিস্তর ফারাক!

    খুব বেশি কিছু মনে নাই সেই সময়ের খেলার। ঘুম ঘুম চোখের আবছা আবছা যা মনে আছে তা হচ্ছে রাত জেগে খেলা দেখাটাকে একটা উৎসব তৈরি করে ফেলেছিল সবাই। সম্ভবত মেজো মামাদের একটা টিভি ছিল, লাল রঙের সাদাকালো নিপ্পন টিভি, ১৪ ইঞ্চি। এইটাতেই দেখা হয়েছে সব খেলা। মুরুব্বিরা সব খেলা দেখার জন্য সব কাজ শেষ করে হাজির হওয়া শুরু করত। চা, মুড়ি চানাচুর চলত খেলা দেখা উপলক্ষে। হয়ত পুরো শেরপুরে কয়টা টিভি আছে তা তখন গুণে বলে দেওয়া যেত। একটা মহল্লায়, একটা গ্রামে দুই চারজনের বাড়িতেই টিভি ছিল। তাই স্বাভাবিক ভাবেই এক জায়গায় জামায়েত হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না কোনো।

    আমাদের বাড়িতে সম্ভবত টিভি কেনা হয় ৯৮ বিশ্বকাপে। তখন টিভি বিশ্বকাপ উপলক্ষেই কেনা হত। ততদিনে জ্যোতিরা মানে বকুল খালারা আমাদের এখানে চলে আসছে। খালার উদ্যোগেই কেনা হল ১৪ ইঞ্চি ন্যাশনাল টেলিভিশন! রঙ্গিন টিভি আসার আগ পর্যন্ত এইটাই ছিল আমাদের টিভি!

    এখন একটা জাম্প দিয়ে বর্তমানে আসি। প্রযুক্তির উৎকর্ষে বাস করছি আমরা। যে রাতে খেলা তখন ছিল আশীর্বাদের মত সেই রাতের খেলা এখন অনেকের জন্য দুঃস্বপ্ন! সকালে অফিস, ব্যবসা, স্কুল, কলেজ, ক্লাস খেলা দেখব কীভাবে? জীবনযাত্রার অভূতপূর্ব পরিবর্তন হয়ে গেছে আমাদের। সবাই মিলে একটা খেলা দেখব এইটা এখন একটু কষ্টসাধ্য ব্যাপারই। আয়োজন করে এক হতে হবে, নাহ হলে সম্ভব না। তখন আয়োজন একটাই, টিভি এখানে, মানে আর কিছুর দরকার নাই!

    এখন পুরাই ডিজিটাল দুনিয়ায় আমরা। মানুষ মোবাইলে, ল্যাপটপে খেলা দেখছে। আমার ভাইগ্না ডিসকর্ড নামে একটা প্লাটফর্মে খেলা দেখে, ওইখানে সব বন্ধুরা এক সাথে অনলাইনে খেলা দেখে, সবাই অনলাইনে যুক্ত, পাশাপাশি বসে খেলা দেখলে যেমন ভাইব অনেকটা এমনই। আমরা বন্ধুরা আমাদের মত করে একটা ডিসকর্ড বানায় নিছি। সবাই টিভিতে খেলা দেখছি, আবার মেসেঞ্জার গ্রুপে চ্যাট চলছে! একটু হলেও এক সাথে থাকার চেষ্টা! 

    ২ 

    আমি ব্যাক্তিগত ভাবে বেলজিয়াম সমর্থক। ২০১১-১২ সালের দিকে হুট করেই আমার নজরে আসে অদ্ভুত একটা দলের - বেলজিয়াম। নজরে আসে মানে খেয়াল করি মূলত যে ইউরোপের বড় বড় দলগুলোর কী প্লেয়ার গুলো বেলজিয়ামের। দেখলাম আমার মত অনেকেই তা জানে এবং এই দলকে রীতিমত বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্ম বলা শুরু করে দিয়েছে মানুষ। কেভিন ডি ব্রুইনা, ইডেন হ্যাজার্ড, রোমেলু লুকাকু, থিবো কোর্তোয়া, ভিন্সেন্ট কোম্পানি! এরপরের সারিতেই আক্সেল উইটসেল, মারুয়ান ফেলাইনি, জান ভের্টংহেন, টবি অল্ডারউইরেল্ড, টমাস ভার্মেলেন! এর মধ্যে কোম্পানি অধিনায়ক হিসেবে প্রশ্নাতীত ভাবেই অসাধারণ। আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম, আমি ১৪ বিশ্বকাপে বেলজিয়ামকে সমর্থন দেওয়া শুরু করলাম।

    ১৪ সালে কোয়াটার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছ হার। কিন্তু বেলজিয়াম একটা নতুন শক্তি এইটা সবাই তখন বুঝতে পারে। আমার মনে আছে আমি বেলজিয়াম সমর্থন করি এইটা অনেকের মাথাতেই ঢুকত না তখন। ভাবত ইয়ার্কি মারছি না হলে ব্রাজিল আর্জেন্টিনা কিছু একটা করি, ওইটা বলতে চাচ্ছি না বলে এগুলা বলতেছি। বেলজিয়াম তার আসল খেলা খেলে ১৮ সালের বিশ্বকাপে। এইটাই ছিল বেলজিয়ামের কাপ নেওয়ার বছর! এই বিশ্বকাপেই জাপানের সাথে ৩-২ গোলের একটা ম্যাচ হয় যা বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ। ব্রাজিলকে হারিয়ে বেলজিয়াম সেমি খেলে, ১৮ বিশ্বকাপ জয়ী ফ্রান্সের কাছে হেরে, পরে ইংল্যান্ডকে তৃতীয় স্থান নির্ধারণই ম্যাচে হারিয়ে তৃতীয় হয়ে শেষ করে বিশ্বকাপ। ফ্রান্স যদিও সেই ম্যাচে চ্যাম্পিয়ন দলের মত খেলে নাই। ম্যাচ শেষে কর্তোয়া বলছিল এই জঘন্য খেলার চেয়ে ব্রাজিলের কাছে হারলেও তৃপ্তি পাওয়া যেত! যাই হোক, দীর্ঘদিন এক নাম্বার র‍্যাংকিং, তৃতীয় স্থান অর্জন করা এই ছিল এই দলের কাগজে কলমে অর্জন। কিন্তু এইটাই যে শেষ না তা ফুটবল খেলা বুঝে যারা তারা অন্তত জানে। অবিশ্বাস্য প্রতিভা নিয়ে এই দলটা এর চেয়ে বেশি কিছু দিতে পারল না।

    বেলজিয়াম বড় দল না। এই বড় দল আর ছোট দল কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপে অনেক বড় বিষয়। পুরো দুনিয়া সব সময় ছোট দলের সাথে থাকে। যদি একটা আপনার পছন্দের দল হয় তা হলে ভিন্ন কথা আর তা না হলে  মানুষ মনে প্রাণে চায় ছোট দলটা জিতে যাক। নাম না জানা দেশ, তবুও অকুণ্ঠ সমর্থন। ওরা জিতুক, ওরা দেখিয়ে দিক সবাইকে। সবাই এসে পাশে দাঁড়ায় ছোট দলের। বড় দল জিতেও স্বস্তি পায় না এখানে। নানা তর্ক এসে জমা হয়। ছোট দল দেখে রেফারি বাঁশি বাজাল না বা বাজাল! রূপকথার মত ফলাফল চাই আমরা। কাঠুরের ছেলে রাজা হয়ে যাক। জিতে নিক সোনার মুকুক, ছিনিয়ে নিক রাজকন্যাকে। বড় দলের দুর্দান্ত মানসিক জোর কিংবা ফুটবলের অসাধারণ দক্ষতায় রূপকথা কদাচিৎ লেখা হয়। বাকি সব সময়ই বাস্তবতাই জিতে। যে দুই একবার রূপকথা তৈরি হয় সেই কয়বারের গল্প মানুষ বলে বেড়ায় প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম। ১৯৯০ সালের ক্যামেরুন, ৯৮ বিশ্বকাপের ক্রোয়েশিয়া, ২০০২ সালে কোরিয়া মানুষকে এই উত্তেজনা দিয়েছিল। মনে করিয়ে ছিল সম্ভব, ছোটদের পক্ষেও সম্ভব।  কিন্তু ফুটবল এক আশ্চর্য খেলা। এখানে শেষ পর্যন্ত কাপ জিতে সেই দলটাই যে সবচেয়ে বেশি যোগ্য। দুই একটা ব্যাতিক্রম না থাকলে বরাবরই এই হয়ে আসছে। অঘটন দুই একটা ম্যাচে ঘটে কিন্তু কাপ নেওয়ার ক্ষেত্রে ঘটে না। তারপরেও মানুষ সব সময় তার স্বভাবের জন্যই ছোট দলের পক্ষে থাকে। 

    এবার বিশ্বকাপেও তাই হয়েছে। মানুষ অবাক হয়ে কেপ ভার্দের খেলা দেখেছে। আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা ছাড়া পুরো বিশ্ব লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল তাদের পক্ষে। এখানে আর্জেন্টিনার বিরোধী মূল বিষয় না, এখানে ছিল সেই আগের সূত্র, আমরা ছোট দলের পক্ষে থাকব। তাই মনে প্রাণে চাইছে সবাই জিতুক কেপ ভার্দে। ব্রোজিনহা নামক অবিশ্বাস্য গোলকিপারটা মানুষকে বিশ্বাস করিয়েই ফেলেছিল যে সে কোন কিছুতেই পরাজিত হবে না! শুধু এই ম্যাচ না। ব্রাজিল মরক্কোর সাথেও একই রকম হয়েছে। যদিও এখন আর মরক্কোকে ছোট দল বলার সুযোগ আছে বলে আমার মনে হয় না। সামনের বিশ্বকাপের আয়োজক হতে যাচ্ছে তারা। গত বিশ্বকাপ থেকেই নিজেদের জাত চেনানো শুরু করেছে মরক্কো। এসবের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে ইরান! ইরান যেন কোন কিছুতেই হারবে না বলে জিদ করে এসেছিল। যেখানে বর্তমান সময়ের ফুটবলাররা ঠিকঠাক বিশ্রামের জন্য সব কিছু করতে রাজি। ইংলিশ ক্লাব গুলো চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে স্প্যানিশ দলগুলোর চেয়ে কম ভালো করে, এর পিছনে সবচেয়ে জোরাল যুক্তি হচ্ছে ইংলিশ ক্লাবগুলো বিশ্রাম কম পায়! বিশ্রাম যে কত গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল খেলায় এইটা বুঝানোর জন্য এই উদাহরণটা দিলাম। বিশ্রাম ছাড়া খেলা প্রায় অসম্ভব বলে ধরে নেওয়া হয় সেখানে ইরান প্রতি ম্যাচ বিমান দিয়ে উড়ে এসে খেল আবার ফিরে গেছে মেক্সিকো! এবং কী দারুণই না খেলল তারা। সবার সমর্থন পেয়ে গেছিল ইরান। ইরান টুর্নামেন্টে টিকে থাক, এইটাই চাওয়া ছিল। 

    আমরা তো হাজার মেইল দূরে টেলিভিশনের সামনে ধুর, এই ছোট দল গুলো পারেই না বলে উঠে চলে যাই। কিন্তু খেলোয়াড় গুলো? তারা আমৃত্যু এই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকে। পাসটা যদি দিতে পারতাম। একটু আগে যদি দৌড় দিতাম, একটু জোরে যদি কিক নিতাম এমন শতশত যদি কিন্তু তাদেরকে তাড়া করে ফিরবে না? এইটা অবশ্য ছোট বড় দল না, চ্যাম্পিয়ন দল বাদে সবারই একই রকম হবে। আমৃত্যু অবাক হয়ে ভাববে রবার্তো বেজ্জিও, বলটা জালে রাখা খুব কঠিন ছিল? ইস, উফ করে করেই যায় সবাই। সবাই বললাম কারণ শেষ পর্যন্ত পরাজিতের সংখ্যাই তো বেশি। একশ বছর হতে চলল বিশ্বকাপের, কাপ জিতেছে মাত্র ৮টা দেশ। বাকি সবাইই তো এই ইস আর উফ করে করেই গেছে। পরাজিতের সংখ্যা বেশি বলেই হয়ত আমরা পরাজিতের দলে। নিজেরা নিজেদের জীবনে উঠতে বসতে হারি বলেই মনে হয় এই যে আমাদের পক্ষ থেকে কেউ জিতছে...  তুই জিতে যা ভাই, জিতে দেখায় দে! যা রোজার মিলা, যা হাকান শুকুর, গ্রানিত শাকা, জের্দান শাকিরি আরও জোরে ছুট, পাপ বুবা দিওপ কই? গোল দে ভাই! লাফ দে ব্রোজিনহা, বলটা আটকা...! 

    ৩ 

    বিশ্বকাপ আসলে আরেকটা তর্ক জমে উঠে। এইটা বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে। কে সেরা, কে সর্বকালের সেরা!  সেরার তর্ক গুলো আমার কাছে খুব ফালতু লাগে। সর্বকালের সেরা, এইটা আরেক মহা বিতর্ক। সর্ব কাল তো সব সময় এক না, কাল তো প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। তাহলে একজনকে সর্বকালের সেরা আমারা কী দিয়ে হিসাব করব? একটা পর্যায় পর্যন্ত ঠিক আছে, এরপরে আসলে কোন খেলোয়াড়কে নিয়ে বিতর্ক করাটা উল্টা সেই খেলোয়াড়কেই অসম্মান করা হয়। মেসির কথাই ধরেন, ও যদি গোল না করত এবার, হ্যাট্রিক না করত তাহলে মেসির গ্রেটনেস একটুও কমে যেত? আমার কাছে মেসি গতবার বিশ্বকাপ না জিতলেও মেসির গ্রেটনেস একটুও কমত না। ও যা তার প্রমাণ আগেই দিছে, যারা জানার তারা জানে। একই কথা রোনাল্ডোর জন্যও প্রযোজ্য। ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ গোল কয়টা? ৮টা তো? ম্যারাডোনা কোন লেবেলের খেলোয়াড় ছিল কল্পনা করতে পারবেন? ক্লোসা ম্যারাডোনার আশেপাশেও পৌঁছাতে পারবে কোনদিন? 

    মেসি রোনাল্ডোর এই তর্ক সমর্থকদের মধ্যে যত কুৎসিত আমার ধরনা তাদের মধ্যে এত ক্ষুদ্রতা নাই। আমরা টেনে আমাদের মাপে আনতে চাই তাদেরকে। একবার চিন্তা করেন মেসি রোনাল্ডোর এই দ্বৈরথটা যারা আগে দেখেছে তারা বর্তমান সময়ে, এই শেষ মুহূর্তে এসে এই সব তর্কে মজা নিতে পারবে? আমি যদি ভুইল না করে থাকি, ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এই দুইজন ফুটবল বিশ্বকে যা দিয়েছে তা আগের আর কারো দ্বারাই সম্ভব হয় নাই। এই দুইজনের অসম্ভব মাত্রার খেলার জন্য, তাদের চেয়ে একটু কম যোগ্যতার, যারা অন্য যুগে জন্ম নিলে হয়ত গ্রেট হিসেবে ইতিহাসে জায়গা নিয়ে নিত তারা এখন আলোচনাতেই নাই। শুধুমাত্র এরা বারটা এত উঁচুতে সেট করেছে যে বাকিদের মামুলি মনে হয়। বিশ্বকাপ জিতে নাই বলে রোনাল্ডোকে ট্রল করে মানুষ, অথচ ২২ সালের  আগে মেসিরও কাপ ছিল না। ঘটনা হচ্ছে সব দলের লক্ষ এক না। রোনাল্ডো তার ক্যারিয়ারের শেষ দিকে এসে একটা ভালো মানের দল পেয়েছে। এর আগ পর্যন্ত পর্তুগালকে বিশ্বকাপে নিয়ে যাওয়াই ছিল বিশ্বকাপ জয়ের মত। ওইটা রোনাল্ডো করে গেছে। 

    এই দুইজনের যে প্রতিযোগিতা তা দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা বলে আমি মনে করি। লা লিগায় মেসি এক সিজনে গোল করল ৫০টা! অতিমানবীয় কারবার, সেবার রোনাল্ডো করছিল কয়টা? ৪৬ গোল! ( ২০১১-১২ মৌসুমে?) এইটা ফুটবল বিশ্ব আগে পরে কোনদিন দেখেছে? মেসি এ সিজনে গোল করল ৯১টা! রোনাল্ডো চ্যাম্পিয়নস লীগের এক সিজনে গোল করল ১৭টা! দুইটাই এখন পর্যন্ত, এত এত গোল মেশিন আসার পরেও টিকেই আছে। রোনাল্ডোর ইংল্যান্ড, স্পেন, ইতালি — তিনটি ভিন্ন লিগে টপ স্কোরার হওয়া, এবং প্রতিটি জায়গায় শিরোপা জেতা, এটা তার অবিশ্বাস্য অভিযোজন ক্ষমতার প্রমাণ না? আর কারো আছে? এ ছাড়া এক ম্যাচে মেসির হ্যাট্রিক অন্য ম্যাচে রোনাল্ডোর হ্যাট্রিক এগুলা ওই সময় যারা দেখছে তারা এক বাক্যে মেনে নিবে যে কেউ কারো চেয়ে কম না। বরং একজন ছিল বলেই আরেকজন এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পেয়েছে। এখানে একজনকে বড় করতে গিয়ে আরেকজনকে ছোট করতে হবে কেন?   

    তবে আমি সত্যিই মনে করি আগের খেলা আর এখনকার খেলার রেকর্ড আলাদা করে হিসাব করা উচিত। এখন প্রযুক্তির যে সাহায্য তার ছিটেফোঁটাও আগের খেলায় কল্পনা করতে পারবে না কেউ। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি খেলার মজা নষ্ট করছে হয়ত কিন্তু কেউ আউল ফাউল কিছু করে চলে যাবে এইটা হবে না। অনেকেই পেলের সময়ের খেলা নিয়ে দেখি নানান আজাইরা আলাপ করে। আপনে যত পিছনের দিকে যাবেন তত খেলা কঠিন ছিল, এইটা হচ্ছে শেষ কথা। পেলের আমলে কার্ড ছিল না, খেলোয়াড় পরিবর্তন করা যাইত না। এক পেলের মেরে তক্তা বানায় দেওয়ার ইতিহাস আছে। ৬৬ সালের বিশ্বকাপে পেলের হাঁটু লক্ষ করে মেরে তাঁকে ম্যাচের বাহিরে পাঠিয়ে দেয়। ব্যান্ডেজ বেঁধে মাঠে নামেন তিনি। আহত হাঁটু লক্ষ করেই আবার মারা হয়! শুধু পেলে না, ম্যারাডোনা তার সময়ে কম মার খেয়েছে? শেষ ঝলক যে বিশ্বকাপ, ৯০ সালের, সেখানে গোড়ালি দুমড়ে মুচড়ে গেছিল ম্যারাডোনার। অমনেই খেলে গেছে। তাই আগের খেলা সহজ, অমুক নিয়ম নাই, তমুক এগুলা বলার যুক্তি নাই। 

    বিশ্বকাপ দিয়ে সেরা বিচার করতে যাওয়াটা বোকামি না? বিশ্বকাপ তো জিতে নাই অনেকেই আবার জিতেছেও অনেকেই, এতে কী প্রমাণ হয়? পুশকাশ, দি স্তেফানো, ইয়োহান ক্রুইফ, জর্জ বেস্ট, ইউসেবিও, জিকো, ফন বাস্তেন কেউ জিতে নাই কাপ। তো? আবার ফ্রান্সের অলিভিয়ে জিরু কাপ জিতে বসে আছে? তো? এগুলা কেমন খেলো যুক্তি না? 

    যে কোন কিছুতেই আমরা তুলনা করে মজা পাই। তুলনা চলে কি না এইটাও ভাবি না। কত দেখি কে বড় কবি? রবীন্দ্রনাথ না নজরুল? জীবনানন্দ? মানে মনে হয় একটা প্রতিযোগিতা হচ্ছে, কে সেরা, কবিতা লিখে দেখাও! বুঝি না কেন প্রতিটা মানুষের জার্নি আলাদা। তার জার্নিতে, তার হিসেবে তিনিই শ্রেষ্ঠ, এখানে তুলনার কিছু নাই। শেষ পর্যন্ত এইটা একটা বিনোদন ছাড়া কিছু না। তাই শুধুই মজাটা উপভোগ করতে সমস্যা কই? 

    ৪ 

    রাতে ফাইনাল। খোলা মাঠে খেলার দেখার পরিকল্পনা আমার। তাই মনে হল বিশ্বকাপ নিয়ে লেখাটা এখনই লিখে ফেলি। কাপ তো একজন জিতবেই। আর্জেন্টিনা জিতে চারটা করবে না হয় স্পেনের দ্বিতীয় স্টার প্রাপ্তি হবে। দুর্দান্ত একটা খেলা হবে এমনই আশা আমার। গত বিশ্বকাপের ফাইনাল যেমন আমরা, আমাদের প্রজন্ম আমৃত্যু বলে যাব, তেমন একটা ফাইনালই তো দেখতে চাই। ফুটবল দর্শক হিসেবে এইটা তো বেশি কিছু চাওয়া না, তাই না?
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ১৯ জুলাই ২০২৬ | ৪৭ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন