আচ্ছা আপনারা কেউ কি এমন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন যেখানে, মানে সে ইন্টারভিউ হোক বা ওই জাতীয় কিছু যেখানে আপনাকে একটি মেয়ের যোগ্যতা বিচার করতে হবে, সেখানে মেয়েটির খুব ভালো ইন্টারভিউ দেবার সত্ত্বেও সবশেষে ইন্টারভিউ প্যানেলের কেউ একজন ফট করে বললেন, "মেয়েটি ভালো, কিন্তু ঠিক... ঠিক সিরিয়াস লাগল না, তাই নয় কি?"
যদি বলেন হন নি, তাহলে খুব ভালো কথা – পজিটিভ দিকে এগুচ্ছি আমরা। কিন্তু অনেক মানুষ আছেন যাঁরা এমন অবস্থার সম্মুখীন হয়েছেন, অন্তত এক দশক আগে পর্যন্ত। হ্যাঁ, কোথায়, কি পরিস্থিতিতে, সেই সবের পার্থক্য ছিল – অর্থাৎ ‘ওয়ান সাইজ ফিটস অল’ এমন ব্যাপার নয়, কিন্তু একজনও যদি এটার সম্মুখীন হয়ে থাকেন তাহলে সেটা সমাজ হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা। বিশেষ করে “কিভাবে আপনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে মেয়েটি সিরিয়াস নয়?” এই প্রশ্নের ব্যাখ্যার সাথে যখন জড়িয়ে থাকে মেয়েটি কি পরে ইন্টারভিউ দিচ্ছিল তার যোগসূত্র।
এবার আপনি ভাবতে পারেন এতে খুব বেশী অস্বাভাবিক কি আছে, এটা অনেকটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। এমনটা আমিও ভাবতাম অনেকদিন আগে – কিন্তু পরে এই নিয়ে পড়াশুনা করে জানতে পারি যে পোষাকের সাথে যোগ্যতা মিশিয়ে দেখার ব্যাপারটা ব্যক্তিগত নয়। ওটা প্রায় একটা ল্যাবরেটরি-প্রমাণিত ফেনোমেনন। গত পঞ্চাশ বছর ধরে দুনিয়ার নানা প্রান্তের সমাজ-মনস্তত্ত্ববিদরা এই জিনিসটা বারবার মেপে দেখেছেন, আর প্রতিবারই কাঁটা প্রায় একই জায়গায় গিয়ে থেমেছে।
যা সুন্দর, তা-ই ভালো - এবং তার বাজারদর
একটু পিছনের দিকে গল্পটা শুরু করা যাক তাহলে। ১৯৭২ সালে ক্যারেন ডিওন, এলেন বার্শাইড আর ইলেন ওয়ালস্টার একটা গবেষণাপত্র লিখলেন, যার শিরোনামটাই পরের অর্ধশতাব্দীর জন্য একটা প্রবাদ হয়ে গেল, "হোয়াট ইজ বিউটিফুল ইজ গুড"। মানে যা সুন্দর, তা-ই ভালো। ছবি দেখিয়ে অচেনা মানুষ সম্পর্কে মতামত চাইলে আমরা সুন্দর মুখের মানুষটিকে বেশি বুদ্ধিমান, বেশি সৎ, বেশি সফল, এমনকি বেশি সুখী বলে ধরে নিই। মনস্তত্ত্বের পরিভাষায় একে বলে 'হ্যালো এফেক্ট' - একটা ভালো গুণ দেখলে বাকি সব গুণ আমরা বিনা প্রমাণে ধার দিয়ে দিই বলতে গেলে তেমন ভাবে দেখতে গেলে।
জুডিথ ল্যাংলোয়া আর তাঁর সহকর্মীরা ২০০০ সালে শ'খানেক গবেষণার মেটা-অ্যানালিসিস করে দেখালেন, ব্যাপারটা কোনো ছোটখাটো ল্যাবের কারিকুরি নয় - শিশু থেকে বৃদ্ধ, প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সুন্দর মানুষ বাড়তি সুবিধে পান। আর অর্থনীতিবিদরা তো একেবারে টাকার অঙ্কে হিসেব কষে ফেললেন। ড্যানিয়েল হ্যামারমেশ আর জেফ বিডল ১৯৯৪ সালে আমেরিকান ইকনমিক রিভিউ-তে "বিউটি অ্যান্ড দ্য লেবার মার্কেট" নামে যে কাজটি ছাপালেন, সেখানে তাঁরা দেখালেন যে শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, সব ধরে-বেঁধে সমান করার পরেও যাঁদের চেহারা 'সাদামাটা' বলে চিহ্নিত, তাঁদের রোজগার গড়পড়তা চেহারার লোকের চেয়ে পাঁচ থেকে দশ শতাংশ কম। উল্টো দিকে সুন্দরদের জন্য একটা 'বিউটি প্রিমিয়াম'।
এবার বলতে পারেন অতি সরলীকরণ করে, তাহলে তো ভাই ল্যাঠা চুকেই গেল! সুন্দর হও (যদিও বললেই কি আর সুন্দর হওয়া যায়!), সাজো, চাকরি পাবে, মাইনে বাড়বে। ফেয়ারনেস ক্রিমের বিজ্ঞাপনওয়ালারা তো ঠিক এই কথাটাই তিরিশ বছর ধরে আমাদের কানে ঢেলে যাচ্ছেন।
কিন্তু গল্পের এখানেই একটা হলকা মোচড় এসে যাবে আশির দশকের হিন্দী সিনেমার মত।
যখন সৌন্দর্যই হিংস্র হয়ে ওঠে
১৯৭৯ সালে ম্যাডেলিন হেইলম্যান আর লোইস সারুওয়াতারি একটা কাজ করলেন যার ফলাফল দেখে অনেকেরই চোখ কপালে উঠে গিয়েছিল! তাঁরা দেখলেন, ম্যানেজারিয়াল পদের জন্য দরখাস্ত করলে সুন্দরী মহিলা প্রার্থীরা কম সুন্দরী প্রার্থীদের চেয়ে খারাপ মূল্যায়ন পাচ্ছেন। পুরুষদের বেলায় ঠিক উল্টো - সুন্দর পুরুষ সব পদেই সুবিধে পাচ্ছেন। এই ব্যাপারটার নাম হয়ে গেল 'বিউটি ইজ বিস্টলি', সৌন্দর্যই হিংস্র! পরে স্টেফানি জনসন আর তাঁর সহকর্মীরা আরও পরিষ্কার করে দেখালেন, সুন্দরী মহিলারা বিপদে পড়েন বিশেষত সেইসব চাকরির ক্ষেত্রে যেগুলো সমাজের চোখে 'পুরুষালি' এবং তখন তাঁদের ঘাড়ে চাপানো হয় একগুচ্ছ বিদঘুটে বিশেষণ: ধূর্ত, স্বার্থপর, ঝগড়াটে, ছলনাময়ী। তাহলে দাঁড়ালো গিয়ে সৌন্দর্য একই সঙ্গে কোথাও ঢোকার টিকিট আবার ফাঁদ! কোন দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন, তার ওপর নির্ভর করে ঠিক হবে ওটা আপনাকে ঢুকতে দেবে নাকি ঠেলে বার করে দেবে।
কিন্তু এখানে একটা ‘ফাইনার ডিটেলস’ এর ব্যাপার আছে যেটা বুঝতে গবেষকদের আরও পঁচিশ বছর লেগেছিল। 'সুন্দর' আর 'সেক্সি' - এই দুটো এক জিনিস নয়। বেশির ভাগ পুরনো পরীক্ষায় ব্যবহার করা হত মুখ আর কাঁধের ছবি, পাসপোর্ট সাইজ। ওতে সৌন্দর্য মাপা যায়, কিন্তু যৌনতা প্রকাশের ভঙ্গিটা মাপা যায় না। জামার গলা কতটা নামানো, স্কার্টের ঝুল কতটা উঠেছে, ঠোঁটের লিপস্টিক কতটা গাঢ়, ওসব ছবির বাইরে থেকে যায়।
একই মেয়ে, দুই পোশাক, দুই রায়
২০০৫ সালে পিটার গ্লিক এবং তাঁর তিন সহকর্মী সাডি লার্সেন, ক্যাথরিন জনসন আর হেদার ব্র্যানস্টিটার, লরেন্স ইউনিভার্সিটিতে এমন একটা পরীক্ষা করলেন যা এই বিষয়ের গবেষণার মেরুদন্ডের মত হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁরা একজন মহিলাকে ভিডিওতে রেকর্ড করলেন, একই মহিলা, একই কথা বলছেন, একই ভঙ্গিতে। শুধু দু'রকম সাজে। একবার ব্যবসায়িক পোশাকে, মানে কালো ট্রাউজার, ব্লেজার, মানে মাপা সাজ যাকে বলে। আরেকবার 'সেক্সি' সাজে - ছোট স্কার্ট, গলা-কাটা টপ, উঁচু হিল, গাঢ় মেকআপ। খেয়াল রাখা হয়েছিল যাতে তাঁকে দু'ক্ষেত্রেই সমান সুন্দরী দেখায় এবং ম্যানিপুলেশন চেক করে দেখা গেল সেটা হয়েছেও। দর্শকরা দ্বিতীয় ভিডিওর মহিলাকে বেশি 'সেক্সি' বলেছেন, কিন্তু বেশি 'সুন্দরী' বলেননি!
এবার দেওয়া হল আসল চাল। ভিডিও দেখানোর আগে অংশগ্রহণকারীদের হাতে এক টুকরো কাগজ ধরানো হল, যাতে লেখা মহিলাটির পেশা। অর্ধেককে বলা হল তিনি একজন ম্যানেজার। বাকি অর্ধেককে বলা হল তিনি একজন রিসেপশনিস্ট। ফল যা দাঁড়াল, তা রীতিমতো বিস্ময়কর।
রিসেপশনিস্ট বলে পরিচয় দেওয়া হলে দেখা গেল পোশাক বদলে কিস্যু আসে-যায় না। সেক্সি সাজেও তিনি যতটা যোগ্য, ব্যবসায়িক সাজেও ততটাই। সাত-পয়েন্টের স্কেলে যোগ্যতার নম্বর ঘোরাফেরা করছে চার দশমিক আট আর পাঁচ দশমিক দুইয়ের আশেপাশে — পার্থক্য নগণ্য। কিন্তু ঠিক একই মহিলাকে যখন ম্যানেজার বলা হল? ব্যবসায়িক পোশাকে তাঁর যোগ্যতার নম্বর পাঁচ দশমিক চার দুই। আর সেক্সি পোশাকে? চার দশমিক এক তিন। মানে দেড় পয়েন্টের কাছাকাছি কম নম্বর। শুধু তা-ই নয়, তাঁর অনুমিত বুদ্ধিমত্তাও কমে গেল। অংশগ্রহণকারীদের আন্দাজ করতে বলা হয়েছিল, ইনি কলেজে কেমন গ্রেড পেতেন, কতটা ভালো কলেজে পড়তেন। সেক্সি ম্যানেজারের গ্রেড আন্দাজ করা হল স্পষ্টতই কম। একই মুখ, একই কথা, একই বুদ্ধি - শুধু পোশাক বদলে গেছে বলে তাঁর কলেজের রেজাল্টও নাকি খারাপ ছিল!
গ্লিক ও সহকর্মীরা আরও এক ধাপ এগিয়ে দেখলেন, এই যোগ্যতা-হারানোর ব্যাপারটা কীসের মধ্যে দিয়ে ঘটছে। দেখা গেল এর মূলে আছে আবেগ। সেক্সি ম্যানেজারকে দেখে মানুষের মনে বিরক্তি, বিতৃষ্ণা, এমনকি এক ধরনের লজ্জা জাগছে আর সেই নেতিবাচক আবেগটাই যোগ্যতার নম্বরকে টেনে নামাচ্ছে। পরিসংখ্যানের ভাষায়, আবেগের প্রভাবটা হিসেবে ধরে নিলে পোশাকের প্রভাব শূন্য হয়ে যায়। অর্থাৎ মানুষ ভেবেচিন্তে বিচার করছে না, প্রথমে চটে যাচ্ছে আর তারপর সেই চটে যাওয়াটাকে "ও তো অযোগ্য" বলে ব্যাখ্যা দিচ্ছে।
এবার দিলেন গবেষকরা একটা খোঁচা টাইপের। তাঁরা আলাদা করে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ওই সেক্সি পোশাকটা চাকরির পক্ষে কতটা মানানসই? সবাই বলেছেন একদমই মানানসই নয়। ম্যানেজারের জন্যও নয়, রিসেপশনিস্টের জন্যও নয়। দুটো ক্ষেত্রেই সমান বেমানান। তবু শাস্তি পেলেন কেবল ম্যানেজার। কারণটা "পোশাক অফিসের উপযুক্ত নয়" এই ভদ্রলোকি যুক্তি নয়। কারণটা হল, আমাদের মাথার ভেতর 'সেক্সি মেয়ে' আর 'কেরিয়ার মেয়ে' দুটো আলাদা খোপ, এবং সেই খোপ দুটো একসঙ্গে বসতে চায় না!
মাথার ভেতরের খোপগুলো
এই 'খোপ' ব্যাপারটা নিয়ে এবার দু'কথা বলা দরকার, কারণ সেক্সি-যোগ্যতা এগুলো মিশিয়ে ফেলে কেস ভজকট করে তোলার পিছনে ‘খোপ’ এর অবদান বিশাল। এমনকি অনেকে বলে থাকেন পিকচার নাকি ওখানে থেকেই শুরু!
কেট ডো এবং তাঁর সহকর্মীরা আশির দশকে দেখিয়েছিলেন, আমরা 'নারী' বলে কোনো একটামাত্র ছাঁচ মাথায় রাখি না। রাখি কয়েকটা উপ-ছাঁচ। মোটামুটি তিনটে ভাব যার, সাবেকি (গৃহিণী), অ-সাবেকি (কেরিয়ার-মহিলা), আর সেক্সি। মজার ব্যাপার এটাই যে মাথার ভেতরে 'সেক্সি মহিলা' আর 'কেরিয়ার-মহিলা' খোপ দুটোর মধ্যে যতটা দূরত্ব, 'গৃহিণী' আর 'কেরিয়ার-মহিলা'-র মধ্যেও প্রায় ততটাই। মানে অফিসের বসের চেয়ারে বসার যোগ্য বলে যাঁকে ভাবা হয়, তাঁর থেকে সেক্সি মহিলা মানসিক মানচিত্রে যোজন যোজন দূরে।
আর পুরুষদের বেলায়? পুরুষদের বেলায় এই খোপগুলোই নেই। একজন পুরুষ একই সঙ্গে বাবা, ক্রিকেট-পাগল, ভালো বন্ধু এবং কোম্পানির সিইও হতে পারেন - কোনো বিরোধ নেই। কেউ তাঁর টাইট জিনস দেখে বলে না, "ছেলেটা ঠিক ম্যানেজার মেটিরিয়াল নয়"। সৌন্দর্য পুরুষের ক্ষেত্রে একটা অলঙ্কার; আর মেয়ের ক্ষেত্রে সেটা একটা শ্রেণীবিন্যাস। এটা আমি আবেগ থেকে বলছি না, বলছে রিসার্চ!
একটা বোতাম, পাঁচটি সেকেন্ড
এমন একটা চমকপ্রদ ফল বেরোলে বিজ্ঞানের নিয়ম হচ্ছে অন্য কেউ সেটা আবার করে দেখবে। ২০০৯ সালে মেলিসা উকি, নেল গ্রেভস আর জে. কোরি বাটলার ঠিক তা-ই করলেন। বড় নমুনা, ভিডিওর বদলে ছবি, অন্য চাকরির নাম, অন্য প্রশ্নপত্র। ফল সেই একই, উঁচু পদের সেক্সি পোশাক পরা মহিলাদের যোগ্যতার নম্বর কম। তবে তাঁরা একটা ইঙ্গিতও পেলেন যে নিচু পদের সেক্সি পোশাক পরা মহিলাকে বরং বেশি 'সামাজিক দক্ষতা'সম্পন্ন মনে করা হচ্ছে। অর্থাৎ ক্ষমতাহীন জায়গায় যৌনতা একটা 'গুণ', ক্ষমতার জায়গায় সেটাই 'দোষ'।
এবার আপনি বলতেই পারেন, ঠিক আছে, মিনি স্কার্ট আর গলাকাটা টপ পরে বোর্ডরুমে গেলে লোকে তো একটু ভুরু কোঁচকাবেই। ওরকম চরম উদাহরণ দিয়ে কী প্রমাণ হয়?
উত্তরটা দিয়েছেন নীল হাউলেট, ক্যারেন পাইন আর তাঁদের সহযোগীরা, ২০১৫ সালে, সেক্স রোলস পত্রিকায়। তাঁদের পরীক্ষায় কোনো মিনি স্কার্ট ছিল না, ছিল সাধারণ, রক্ষণশীল অফিস-পোশাক। শুধু দু'টো জিনিস অল্প অল্প করে বদলানো হয়েছিল, স্কার্টের ঝুল হাঁটুর একটু ওপরে না একটু নিচে, আর ব্লাউজের ওপরের বোতাম একটা খোলা না দুটো খোলা। ছবিগুলোতে মুখই ছিল না, ছিল মুণ্ডুহীন ধড়। দর্শকদের ছবি দেখতে দেওয়া হয়েছিল সর্বোচ্চ পাঁচ সেকেন্ড।
তাহলে দাঁড়ালো কি? পাঁচ সেকেন্ড - একটা মুখহীন ছবি - আর একটা বোতাম।
তাতেই সিনিয়র ম্যানেজার বলে পরিচয় দেওয়া মহিলার বুদ্ধি, আত্মবিশ্বাস, বিশ্বাসযোগ্যতা, দায়িত্ববোধ সব কিছুর নম্বর নেমে গেল। রিসেপশনিস্টের বেলায় নামল না। আর হ্যাঁ, একটা কথা ভুললে চলবে না যে এই বিচারকরা সবাই ছিলেন মহিলা। শুধু তাই নয় যাঁরা চাকরি করেন, তাঁরা ছাত্রীদের চেয়েও কড়া নম্বর দিয়েছিলেন।
পরে অন্যেরাও আমেরিকায় এই কাজটা আবার করে একই জিনিস পেয়েছেন। অর্থাৎ এটা কোনো "পুরুষরা মেয়েদের দেখলে ভুলে যায়" জাতীয় সরল গল্প নয়। মেয়েরা মেয়েদের বিচার করছেন এবং একই মাপকাঠিতে।
চোখ কোথায় গেল, রায় কি হল
তাহলে ঠিক কী ঘটছে মাথার ভেতরে? এই প্রশ্নের সবচেয়ে অস্বস্তিকর উত্তরটা এসেছে ২০১৮ সালে, জুলিয়া স্মিথ, মিরিয়াম লিস, মিন্ডি এরচাল আর তাঁদের সহকর্মীদের কাজ থেকে। তাঁরা একটা কলেজের ছাত্র-সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট বানালেন। একজন মহিলা প্রার্থী, তাঁর নির্বাচনী ইস্তাহার, তাঁর যোগ্যতার বিবরণ - সব এক। শুধু ছবিতে তাঁর পোশাক দু'রকম, রক্ষণশীল, আর খানিকটা খোলামেলা। ১৯১ জন ছাত্রছাত্রীকে বসানো হল আই-ট্র্যাকার মেশিনের সামনে, যা মিলিসেকেন্ডের হিসেবে বলে দেয় চোখ ঠিক কোথায় কতক্ষণ আটকে থাকল।
ফল কি হল? নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছেন? খোলামেলা পোশাকের ছবিতে দর্শকদের চোখ প্রার্থীর বুকে আর স্কার্টের ঝুলে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশিক্ষণ আটকে থাকল। লেখার তুলনায় শরীরের দিকে তাকানোর অনুপাত বেড়ে গেল কয়েক গুণ। এবং সেই একই প্রার্থীকে তখন মনে করা হল কম সৎ, কম বিশ্বাসযোগ্য, কম যোগ্য, এবং কম নির্বাচনযোগ্য।
কিন্তু এখানে গবেষকরা একটা চতুর পরীক্ষা করেছিলেন। তাঁরা পরে জিজ্ঞেস করলেন, প্রার্থীর ইস্তাহারে কী কী লেখা ছিল, মনে আছে? দুই দলই সমানভাবে মনে রাখতে পেরেছিল। মানে দর্শকরা 'অন্যমনস্ক' হয়ে পড়েননি, তথ্য মিস করেননি। তথ্য তাঁরা ঠিকই পড়েছেন। তারপর সেই তথ্য জেনেশুনেই তাঁকে কম যোগ্য বলে রায় দিয়েছেন।
তহলে মধ্যিখানের সেতুটা কী? গবেষকদের মিডিয়েশন বিশ্লেষণ বলছে, সততা। খোলামেলা পোশাক → শরীরের দিকে তাকানো → "এই মহিলা তেমন সৎ বা বিশ্বাসযোগ্য নন" → "অতএব ইনি অযোগ্য"। ভেবে দেখুন ব্যাপারটা। ব্লাউজের গলার মাপ থেকে কেউ চরিত্রের সার্টিফিকেট বার করে ফেলছে। আর করছে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে, সমানভাবে।
পোশাকেরও দরকার নেই, নজরটাই যথেষ্ট
তাহলে কি পোশাকই একমাত্র অপরাধী? না। নেথান হেফলিক আর জেমি গোল্ডেনবার্গ ২০০৯ সালে দেখালেন, পোশাকেরও দরকার নেই, শুধু মনোযোগটা চেহারার দিকে ঘুরিয়ে দিলেই যথেষ্ট। ২০০৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক আগে তাঁরা ১৩৩ জন ছাত্রছাত্রীকে দু'ভাগে ভাগ করলেন। একদলকে বলা হল, রিপাবলিকান ভাইস-প্রেসিডেন্ট প্রার্থী সারা পেলিন সম্পর্কে যা মনে আসে লিখতে। অন্য দলকে বলা হল, তাঁর চেহারা সম্পর্কে লিখতে। ব্যস, এইটুকুই।
যাঁরা চেহারা নিয়ে লিখলেন, তাঁরা পেলিনকে কম যোগ্য মনে করলেন। শুধু তাই নয়, তাঁরা তাঁকে খানিকটা কম 'হিউম্যান নেচার'-এর বলেও মনে করলেন। এটাই সবচেয়ে চমকপ্রদ দেখা গেল যে ম্যাককেইন-পেলিন টিকিটে ভোট দেওয়ার ইচ্ছেটাও তাঁদের কমে গেল। একই পরীক্ষা অ্যাঞ্জেলিনা জোলিকে নিয়ে করেও একই ফল।
মানে, একটি মহিলার চেহারার দিকে আপনার নজর ঘুরিয়ে দিলে আপনি তাঁকে খানিকটা বস্তু বানিয়ে ফেলেন, আর বস্তুর তো বুদ্ধি থাকে না।
নার্সিং পড়লে নিয়ম আরও কড়া
এবার আর একটা মোচড়। ২০০৮ সালে উইসকনসিন-লা ক্রস বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই স্নাতক ছাত্রী, টিফানি জিল-নাউফ আর রেচেল মিটাগ, ১৭১ জন ছাত্রছাত্রীকে দিয়ে একটি মহিলার ছবি বিচার করালেন। এবার পোশাকের সঙ্গে আরেকটা জিনিস বদলানো হল, মেয়েটির বিষয় কী। কখনো বলা হল তিনি এমন বিষয়ে পড়েন যেখানে ছেলেরাই বেশি (ধরুন ইঞ্জিনিয়ারিং), কখনো বলা হল যেখানে মেয়েরাই বেশি (ধরুন নার্সিং বা শিক্ষকতা)।
সবাই ভেবেছিলেন 'পুরুষালি' বিষয়ে খোলামেলা পোশাক পরলেই বেশি মার খাবেন। ফল হল উল্টো। মেয়েলি বিষয়ে খোলামেলা পোশাক পরা মেয়েটিকেই সবচেয়ে কম বুদ্ধিমতী মনে করা হল। গবেষকরা ব্যাখ্যা দিলেন যে মেয়েলি পেশাগুলোতে 'ভালো মেয়ে' হয়ে থাকার চাপটা আরও বেশি, ওখানে নিয়ম ভাঙলে ছাড় নেই। যেন প্রতিটা পেশার নিজস্ব একটা অলিখিত ড্রেস কোড আছে, আর সেটা কোথাও লেখা নেই, কিন্তু ভাঙলে জরিমানা আছে।
শুধু অযোগ্য নয়, অসৎও
স্পেনের আলমেরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসাবেল কুয়াদ্রাদো আর তাঁর দল ২০২১ সালে এই গল্পে আরেকটা স্তর যোগ করলেন, সেই স্তরটাই বোধহয় ভারতীয় প্রক্ষাপটে সবচেয়ে চেনা লাগবে আমাদের কাছে। তাঁরা ২০১ জন অংশগ্রহণকারীকে দিয়ে দু'ধরনের মহিলার মূল্যায়ন করালেন, একজন 'পেশাদার', একজন 'সেক্সি'। মাপা হল তিনটে জিনিস - যোগ্যতা, সামাজিকতা, আর নৈতিকতা। পেশাদার মহিলার সবচেয়ে বড় গুণ হিসেবে উঠে এল যোগ্যতা। আর সেক্সি মহিলার সবচেয়ে বড় 'অভাব' হিসেবে উঠে এল নৈতিকতা। ইনি নাকি কম সৎ, কম বিশ্বাসযোগ্য, কম আন্তরিক!
শুধু বিচার করেই তাঁরা থামেননি। গবেষকরা মেপেছেন 'সাহায্য করার প্রবণতা' - অফিসে আপনি কাকে সুপারিশ করবেন, কাকে প্রোমোশনের জন্য এগিয়ে দেবেন, কার হয়ে ভালো কথা বলবেন। ফলাফলে দেখা গেল সেক্সি বলে চিহ্নিত মহিলার জন্য মানুষ কম হাত বাড়ান। গবেষকরা নিজেরাই লিখেছেন, এর ফলে এই মহিলারা নিচু পদে, কম গুরুত্বপূর্ণ কাজে আটকে থেকে যান এবং সেখানে থেকে নিজের যোগ্যতা দেখানোর সুযোগটাই তাঁরা পান না।
এইখানে আমাদের সাইকোলজিক্যাল চক্রটা লক্ষ্য করুন। আপনাকে অযোগ্য ভাবা হল, তাই আপনাকে বড় কাজ দেওয়া হল না, তাই আপনি যোগ্যতা প্রমাণ করার সুযোগ পেলেন না, তাই আপনাকে অযোগ্য ভাবাটা 'প্রমাণিত' হয়ে গেল। একে দুষ্টচক্র বলবেন না তো কাকে বলবেন!
একই স্পেনীয় গবেষকদের আরেকটা কাজ, ক্রিস্টিনা গার্সিয়া-আয়েল, কুয়াদ্রাদো আর ফের্নান্দো মোলেরো-র ২০১৮ সালে, এবার আর ছাত্রছাত্রী নয়, ১০৯৮ জন সত্যিকারের কর্মী নিয়ে। তাঁ রা দেখালেন, অফিসে কাউকে সাহায্য করব কি করব না, সেটা ঠিক করে দেয় আমাদের আবেগ - প্রশংসা না ঈর্ষা, শ্রদ্ধা না বিরক্তি। যুক্তি অনেক পরে এসে দাঁড়ায় লাইনে।
ইতালির স্তেফানো তার্তাল্লিয়া আর কিয়ারা রোল্লেরো (২০১৫) ৪৭৬ জনকে দিয়ে ব্যক্তিত্বের 'বিগ ফাইভ' (বহির্মুখিতা, অমায়িকতা, আবেগীয় অস্থিরতা, বিবেকবুদ্ধি ও অভিজ্ঞতার প্রতি উন্মুক্ততা) মাপিয়ে দেখলেন 'সুন্দর মানেই ভালো' নিয়মটা কাজ করছে ঠিকই, কিন্তু পুরুষদের ক্ষেত্রে জোরালোভাবে বেশি। তাঁদের ব্যাখ্যা ছিল মোটামুটি সোজাসাপ্টা, পশ্চিমা সমাজে মেয়েদের সৌন্দর্য খুব সহজেই যৌনতায় গিয়ে ঠেকে, পুরুষদেরটা ঠেকে না। পুরুষের সৌন্দর্য একটা বাড়তি সুবিধে; মেয়ের সৌন্দর্য একটা বাড়তি ঝুঁকি।
সুন্দরী হওয়ার বিপদ-তালিকা
স্টেফানি জনসন, ক্সেনিয়া কেপলিঙ্গার আর তাঁদের সহলেখকরা ২০১৮-তে "দ্য পেরিলস অফ প্রিটি" নামে একটা প্রবন্ধে গোটা কেরিয়ারের রেখচিত্র ধরে এই ঝুঁকির তালিকা বানিয়েছেন। যা সংক্ষেপে তালিকা করতে গেলে এমন দাঁড়াবেঃ
এক, সুন্দরী মহিলারা 'পুরুষালি' চাকরির জন্য আবেদন করলে একটু পিছিনে থাকেন।
দুই, সুন্দরী মহিলারা অন্য মহিলাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার লক্ষ্য হন। গবেষণা বলছে, মানুষ সমলিঙ্গের সুন্দর প্রতিদ্বন্দ্বীর সাফল্যকে যোগ্যতার বদলে ভাগ্যের ঘাড়ে চাপাতে বেশি পছন্দ করে।
তিন, সুন্দরী মহিলারা বেশি 'অবজেক্টিফাই' হন এবং ক্রমশ নিজেরাই নিজেদের চেহারার আয়নায় বিচার করতে শুরু করেন, যাকে বলে 'সেল্ফ-অবজেক্টিফিকেশন'।
চার, যৌন হয়রানির ঝুঁকি বেশি।
আর তাঁদের সুপারিশগুলোর মধ্যে একটা খুবই সরল, চাকরির আবেদনপত্রে ছবি লাগানো বন্ধ করে দিন। ব্যস।
কেলসি ইয়ন্স তাঁর স্মিথ কলেজের গবেষণা-প্রবন্ধে (২০১৪) ব্যাপারটাকে অন্য নাম দিয়েছেন, 'অ্যাট্রাক্টিভনেস প্রিভিলেজ'। মানে সৌন্দর্য একটা 'বিশেষাধিকার', যেমন জাতি বা শ্রেণী বা বর্ণের বিশেষাধিকার, অর্জিত নয়, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া, এবং সেটা যাঁর আছে তিনি টেরই পান না যে আছে। ইয়ন্সের যুক্তিটা আরও একটু এগিয়ে যায়, সৌন্দর্যের এই মাপকাঠিটা কে ঠিক করে? বেশ খানিকটা ঠিক করে সেই শিল্প, যার লাভ হয় মাপকাঠিটা টিকে থাকলে। বিজ্ঞাপন আপনাকে বলে আপনি যথেষ্ট সুন্দর নন, তারপর সেই ঘাটতি মেটানোর ক্রিমটাও সে-ই বিক্রি করে। ব্যবসাটা বেশ নিখুঁত ছকে - চাহিদা আর জোগান একই কারখানায় তৈরি।
উল্টো দিকের কথাটাও শোনা যাক
এবার একটু ব্যালেন্স করা যাক অন্যদিকের গবেষণা কিছু আছে কিনা দেখে। মানে এটা দেখার চেষ্টা যে সব গবেষণাই কি এক সুরে গায়? নাকি আমি সেগুলিকেই বেছে নিচ্ছে যেগুলো আমার খাড়া করতে চাওয়ার থিওরিকে সমর্থনে করছে?
ক্যাথরিন হ্যাকিম নামে লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স-এর এক সমাজবিজ্ঞানী ২০১১ সালে "ইরোটিক ক্যাপিটাল" নামে একটা বই লিখে রীতিমতো হইচই ফেলে দিয়েছিলেন। এই বইয়ের মাধ্যমে সমাজবিজ্ঞানে একটি সম্পূর্ণ নতুন এবং তুমুল বিতর্কিত ধারণার জন্ম দেন তিনি, যা হলো ‘ইরোটিক ক্যাপিটাল’ বা ‘যৌন পুঁজি’। অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক পুঁজির ধারণাকে আরও প্রসারিত করে হ্যাকিম যুক্তি দেন যে, মানুষের জীবনে সাফল্য পাওয়ার ক্ষেত্রে চতুর্থ আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পুঁজি রয়েছে, যা এতদিন সমাজবিজ্ঞানীরা উপেক্ষা করে গেছেন। তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী, ইরোটিক ক্যাপিটাল হলো মূলত ছয়টি উপাদানের একটি সমন্বিত রূপ, ১) শারীরিক সৌন্দর্য, ২) যৌন আবেদন, ৩) সামাজিক দক্ষতা, ৪) প্রাণবন্ততা, ৫) উপস্থাপনা বা স্টাইল এবং ৬) যৌন সক্ষমতা ও কল্পনা
হ্যাকিমের মূল যুক্তি হচ্ছে সৌন্দর্য, আকর্ষণ, সামাজিক লাবণ্য - এগুলো টাকা বা ডিগ্রির মতোই একরকম পুঁজি, এবং মেয়েদের উচিত এই পুঁজি খাটানো, লজ্জা পাওয়া নয়। তাঁর মতে, পুরুষরা এই পুঁজির অস্তিত্বই অস্বীকার করে, কারণ এই একটা জায়গায় মেয়েদের হাতে বেশি তাস আছে।
বইটা প্রচুর গালাগাল খেয়েছে, এবং বেশ কিছু জায়গায় ন্যায্যভাবেই হয়ত! হ্যাকিমের 'ইরোটিক ক্যাপিটাল' ধারণাটা এত টেনে-বাড়ানো যে কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ বোঝা মুশকিল, শ্রেণী-বর্ণ-বয়সের প্রশ্নগুলো তিনি প্রায় ছুঁয়েও দেখেননি, আর তাঁর বইয়ে অভিজ্ঞতালব্ধ তথ্যের চেয়ে জোরালো দাবির পরিমাণই বেশি। তবু কথাটা একেবারে ফেলনা নয় যদি আবেগহীন ভাবে রেগে না গিয়ে দেখেন - বাস্তবে বহু জায়গায় বহু মেয়ে চেহারাকে সম্পদ হিসেবেই ব্যবহার করেন, এবং লাভও পান। এই লেখাগুলোর সঙ্গে গ্লিক-হাউলেটদের গবেষণার বিরোধ ততটা নেই যতটা মনে হয়, কারণ সবটাই নির্ভর করছে জায়গার ওপর। বিক্রয়কর্মীর টেবিলে যা সম্পদ, বোর্ডরুমের টেবিলে সেটাই দায়।
আরেকটা কথা বলা দরকার। ল্যাবরেটরিতে পাঁচ সেকেন্ডে একটা ছবি দেখে যে বিচার মানুষ করে, বাস্তব অফিসে তিন বছর একসঙ্গে কাজ করার পর সেই বিচার টেকে না। সানিয়া উসমানি ২০২০ সালে করাচির ব্যাঙ্ক আর কোম্পানিগুলোতে নিয়োগকর্তাদের নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন, সাক্ষাৎকারে তাঁরা যা বলেছেন, এবং পরীক্ষায় তাঁরা যা করেছেন, দু'ক্ষেত্রেই আত্মবিশ্বাস, যোগ্যতা, যোগাযোগের দক্ষতা আর সিভির স্বচ্ছতাই বেশি ওজন পেয়েছে; নিছক মুখশ্রী নয়।
ভারতের ক্ষেত্রে একটা আরও কৌতূহলোদ্দীপক ফলাফল আছে। রম্যা বিজয়া আর তাঁর সহযোগীরা একটা পরীক্ষা করেছিলেন - একই সিভির সঙ্গে ছবি জুড়ে দেওয়া হল, শুধু ছবিতে গায়ের রং বদলে দেওয়া হল ফোটোশপে। তাঁরা ভেবেছিলেন ফর্সা প্রার্থীরা বেশি নম্বর পাবেন। কিন্তু পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য কোনো পক্ষপাত তাঁরা পাননি। তাঁদের সিদ্ধান্ত এই ছিল যে ভারতে গায়ের রঙের বৈষম্য অস্বীকার করা যায় না, কিন্তু সেটা নিয়োগের টেবিলে সরাসরি ধরা পড়ে না - সেটা কাজ করে আরও অনেক আগে, আরও অনেক গভীরে। মেয়েটি সেই চাকরিতে আবেদনই করেন না!
এই কথাটা মনে রাখা জরুরি যে বৈষম্য সবসময় শেষ দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে না। অনেক সময় সে বহু আগেই রাস্তা ঘুরিয়ে দিয়েছে!
শাড়ি, বিএমআই আর ফেয়ারনেস ক্রিমের দেশ
লেখা শেষের দিকে এসে যাচ্ছে, একটু ঘরের কথা হয়ে যাক তাহলে এবার। ভারতে এই গোটা আলোচনাটা আরও একটা জটিল প্যাঁচে ঢুকে যায়, কারণ এখানে মেয়েদের পোশাক কেবল রুচির প্রশ্ন নয়, চরিত্রের সার্টিফিকেটও বটে! স্মিথ ও সহকর্মীরা আই-ট্র্যাকার দিয়ে যে জিনিসটা কষ্ট করে প্রমাণ করলেন - খোলামেলা পোশাক থেকে মানুষ 'কম সৎ' সিদ্ধান্তে পৌঁছয়, সেটা ভারতীয় সমাজে প্রমাণ করার দরকারই পড়ে না। ওটা এখানে বিনা প্রমাণে স্বতঃসিদ্ধ।
উদাহরণ চাই? বিমান সংস্থার কথাই ধরুন। ২০১৫ সালে এয়ার ইন্ডিয়া ১২৫ জনের বেশি কেবিন ক্রু-কে ওজন বেশি হওয়ার কারণে বিমান থেকে নামিয়ে দিয়েছিল। নিয়ামক সংস্থা ডিজিসিএ-র নির্দেশিকা অনুযায়ী মহিলা ক্রু-দের বিএমআই থাকতে হবে ১৮ থেকে ২২-এর মধ্যে, পুরুষদের ১৮ থেকে ২৫। খেয়াল করুন, পুরুষদের ছাড় বেশি - একই বিমান, একই জরুরি নির্গমন দরজা, কিন্তু ওজনের মাপকাঠি আলাদা।
তার আগে-পরে আরও আছে। ২০০৮-এ কয়েকজন এয়ার হোস্টেসকে ছাঁটাই, আদালতে দীর্ঘ লড়াই। সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় বিচারপতি এয়ার ইন্ডিয়ার আইনজীবীদের বলেছিলেন, ওজন যোগ্যতা নির্ধারণের মাপকাঠি হতে পারে না। কথাটা সোনার অক্ষরে বাঁধিয়ে রাখার মতো, কিন্তু বাস্তবে নিয়ম বদলায়নি।
আর ২০১৫ সালেই এয়ার ইন্ডিয়ার শাখা সংস্থা অ্যালায়েন্স এয়ার কেবিন ক্রু নিয়োগের যে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, তাতে শর্ত ছিল অবিবাহিত হতে হবে, ত্বক পরিষ্কার হতে হবে, কোনো দাগ, জড়ুল, ট্যাটু বা বড়সড় ব্রণর দাগ চলবে না, দাঁত হতে হবে সমান, আর কথা বলার সময় জিভ জড়ালে হবে না। একটা প্লেনের এয়ারহোষ্টেস হতে হলে নাকি এইসব লাগে।
২০২২ সালে আরেক কাণ্ড। এয়ার ইন্ডিয়া ঠিক করল, ফ্লাইটে ওঠার আগে 'গ্রুমিং অ্যাসোসিয়েট' নামে কিছু কর্মী ক্রু-দের ওজন আর বিএমআই দেখে নেবেন। ক্রু ইউনিয়ন প্রতিবাদ করে চিঠি দিল - ডাক্তারি পরীক্ষা ডাক্তারই করুন, ক্লিনিকের গোপনীয়তার মধ্যে; এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে ওজন মাপার এই ব্যাপারটা অসম্মানজনক, এবং উড়ানের ঠিক আগে ক্রু-দের মানসিক প্রস্তুতি নষ্ট করে দেয় - যেটা আদতে নিরাপত্তার প্রশ্ন।
তারপর ধরুন গায়ের রং। ফেয়ারনেস ক্রিমের বাজারটা ভারতে কত বড়, সেটা আপনারা জানেন। সিন্থিয়া সিমস আর মালার হিরুদয়রাজ ২০১৬ সালে দেখিয়েছেন, ভারতে কালো মেয়েরা কেবল বৈষম্যের শিকারই হন না, তাঁরা নিজেরাই কিছু কিছু পেশায়, বিশেষত যেখানে খদ্দেরের সামনে যেতে হয়, আবেদন করতেই ভয় পান। ২০২০ সালে বিশ্বজোড়া প্রতিবাদের চাপে হিন্দুস্তান ইউনিলিভার তাদের বিখ্যাত ক্রিমটির নাম থেকে 'ফেয়ার' শব্দটা তুলে দিল। নাম বদলাল। বাজার বদলাল কি?
আর নিছক শাড়ি-সালোয়ারের ঝগড়া? আমাদের বাংলাতেই তার নমুনা ভুরি ভুরি। ১৯৯৯ সালে বহরমপুর গার্লস কলেজের ফটকে বোর্ড ঝুলল - শাড়ি ছাড়া ঢোকা নিষেধ; কর্তৃপক্ষের যুক্তি, ১৯৪৭ সাল থেকে এই নিয়ম চলে আসছে। ২০০৬ সালে বাখরাহাট গার্লস হাই স্কুলের পরিচালন সমিতি ঠিক করল, শিক্ষিকাদের শাড়ি পরে আসতেই হবে - যদিও রাজ্য সরকার বা কলকাতা হাইকোর্ট কেউই সালোয়ার-কামিজে আপত্তি করেনি। ত্রিশজন শিক্ষিকার মধ্যে আটজন অনড় রইলেন, এবং শেষ পর্যন্ত জিতলেন। আর ১৯৯৭ সালে ব্যাঙ্গালোরের ক্রাইস্ট কলেজ মেয়েদের জিনস আর ছোট স্কার্ট নিষিদ্ধ করল 'অশালীন' বলে - ছেলেদের জিনসে কোনো আপত্তি ছিল না, তা সে যত আঁটোসাঁটোই হোক।
ভারতীয় মেয়েদের সমস্যাটা তাই দ্বিমুখী। খুব সাবেকি সাজলে আপনি 'ব্যাকডেটেড', প্রোমোশনের যোগ্য নন, ক্লায়েন্টের সামনে পাঠানো যাবে না। আর একটু পশ্চিমী সাজলে আপনি 'ফাস্ট', 'সিরিয়াস নন', 'ক্যারেক্টার ঠিক নেই'। মাঝখানের সরু রেখাটা কোথায়, সেটা কেউ কোনোদিন লিখে দেয়নি - কিন্তু সবাই জানে আপনি সেটা পেরিয়ে গেলে।
পুরুষদের এই ঝামেলা নেই। একটা ফরমাল শার্ট, একটা ট্রাউজার, দরকার হলে একটা ব্লেজার - ব্যস, ইউনিফর্ম রেডি। স্মিথ ও সহকর্মীরা তাঁদের গবেষণাপত্রের একেবারে প্রথম বাক্যেই কথাটা বলেছেন, মেয়েদের কোনো নির্দিষ্ট 'স্যুট' নেই। তাই প্রতিদিন সকালে আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে তাঁদের একটা করে ঝুঁকির হিসেব কষতে হয়, যেটা পুরুষ সহকর্মীটিকে কখনো কষতে হয় না।
আমার এক চেনা কথাচ্ছলে বলেও ছিলেন ক্লায়েন্ট মিটিং থাকলে তিনি আগের রাতে কুড়ি মিনিট ধরে ঠিক করেন কী পরবেন। কারণ কুর্তা পরলে "ও তো ব্যাক-অফিসের মেয়ে", ট্রাউজার-শার্ট পরলে "একটু বেশি আঁটোসাঁটো হয়ে গেল না?", শাড়ি পরলে "বাব্বা, আজ কী ব্যাপার!" — কোনো একটা মন্তব্য আসবেই। আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমি কতক্ষণ ভাবি। আমি সত্যি কথাই বলেছিলাম — শূন্য মিনিট। যেটা মনে হয় এবং সামনে আসে সেটাই পরি।
সেই কুড়ি মিনিট বনাম শূন্য মিনিট - এটাই সম্ভবত এই যে গোটা গবেষণা ভিত্তিক প্রবন্ধটা লেখার চেষ্টা করলাম তার সারাংশ। এই কুড়ি মিনিট প্রতিদিন, তিরিশ বছর ধরে। যোগ করলে দাঁড়ায় প্রায় চার মাস - যে চার মাস সহকর্মীটি অন্য কিছু ভাবতে পারতেন।
তাহলে দোষটা আসলে কার?
তাহলে উপসংহারটা কী দাঁড়াল? "মেয়েরা, ঢেকেঢুকে অফিসে যান, প্রোমোশন পাবেন" – এমন কি?
অবশ্যই না! এবং এইখানেই আসল কথাটা।
স্মিথ আর তাঁর সহলেখকরা তাঁদের গবেষণাপত্রে একটা লাইন লিখেছিলেন যেটা আমার বেশ জুতসই লেগেছে, তাঁরা বলেছেন, এই গভীরে ঢুকে তলিয়ে দেখার উদ্দেশ্য মেয়েদের পোশাক নিয়ে লজ্জা দেওয়া বা দোষ চাপানো নয়। উদ্দেশ্য হল, আমাদের পছন্দগুলো অন্যের মাথায় কী ছবি আঁকছে, সেটা জানা।
আর সেখানেই ধাক্কাটা। কারণ এই সমস্ত গবেষণার আসল আবিষ্কারটা কিন্তু ওই মেয়েটিকে নিয়ে নয় – আবিষ্কার আমাদের নিয়ে। মানে আমরা যাঁরা বিচার করছি, তাঁদের নিয়ে।
খেয়াল করুন গ্লিকের ফলাফলটা আরেকবার। যোগ্যতার নম্বর কমেছে আবেগের কারণে। আমরা প্রথমে বিরক্ত হয়েছি, তারপর সেই বিরক্তির একটা সম্মানজনক নাম খুঁজেছি - "ইনি অযোগ্য" নামটা হাতের কাছে তো ছিলই। খেয়াল করুন স্মিথের ফলাফল, দর্শকরা ইস্তাহারটা ঠিকই পড়েছিলেন, তথ্য ঠিকই মনে রেখেছিলেন, তবু রায় দিয়েছেন উল্টো। মানে আমাদের 'যুক্তি' জিনিসটা আসলে অনেক সময় পূর্বনির্ধারিত রায়ের জন্য বানানো ওকালতনামা।
আরও খেয়াল করুন হাউলেটের ফলাফল, বিচারকরা সবাই মহিলা ছিলেন, এবং কর্মরত মহিলারাই সবচেয়ে কড়া ছিলেন। এটা "পুরুষতন্ত্র বনাম নারী" নামের সোজাসাপ্টা গল্প নয়। এটা এমন একটা মাপকাঠি যেটা আমরা সবাই - ছেলে, মেয়ে, বাবা, মেয়ের বাবা, বসের বস - শৈশব থেকে গিলে ফেলেছি, আর এখন নিরপেক্ষ বিচারবুদ্ধি বলে চালাচ্ছি!
তাহলে কি আমাদের কিছুই করার নেই? গবেষকদের পরামর্শগুলো আশ্চর্যরকম সাদামাটা, হয়ত সেটাই সবচেয়ে ভালো খবর - সিভি থেকে ছবি তুলে দিন। ইন্টারভিউয়ে গঠনবদ্ধ, আগে থেকে ঠিক করা প্রশ্ন রাখুন, যাতে "মেয়েটাকে ঠিক সিরিয়াস লাগল না" জাতীয় কথা লেখার জায়গাটাই কমে আসে। মূল্যায়ন কমিটিতে একাধিক মানুষ রাখুন, নম্বর দেওয়ার আগে প্রত্যেককে আলাদা করে লিখতে বলুন। প্রোমোশনের সময় কে কাকে 'সুপারিশ' করছেন, সেই অদৃশ্য সুতোটার দিকে নজর দিন – কারণ কুয়াদ্রাদোর গবেষণা বলছে, ওখানেই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়।
আর নিজের জন্য? পরের বার যখন কারও সম্পর্কে "ঠিক সিরিয়াস লাগল না" গোছের একটা অনুভূতি হবে, তখন দশ সেকেন্ড থেমে নিজেকে জিজ্ঞেস করবেন - ঠিক কোন উত্তরটা, কোন কাজটা, কোন সংখ্যাটা দেখে এই কথাটা মনে হল? যদি উত্তর খুঁজে না পান, তাহলে সম্ভবত আপনার মাথার ভেতরে সেই সব ধারণা এখনো গেঁথে আছে যাদের কথা আমি এতক্ষণ শোনালাম। মানে আপনার মাথার মধ্যে যিনি “... ঠিক সিরিয়াস লাগল না” বলার জন্য চেয়ার গেড়ে বসে আছেন তাঁকে চেয়ার থেকে তুলুন।
যদি কারো মাথার মধ্যে “... ঠিক সিরিয়াস লাগল না” বলার জন্য চেয়ার গেড়ে কেউ বসে থাকে আর সেই ব্যক্তি যদি একাই ইন্টারভিউ নেন বা শেষ কথা বলার এক্তিয়ার রাখেন, তাহলে সেদিন কী হয়? সেদিন তো কেউ প্রশ্নটাই করে না!
আর ঠিক সেই কারণেই ব্লাউজের একটা খোলা বোতাম নিয়ে এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের এতগুলো গবেষণাগারে এত পরীক্ষা হয়েছে। বোতামটা আসলে কারও জামার নয়। বোতামটা আমাদের মাথায়, বোতামটা আমাদের মাথার।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।