নেপোলিয়ন বিচক্ষণ মানুষ, তিনি গদিতে বসার আগেই হয়তো জানতেন যে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হলে দুটো কাজ একসাথে করতে হবে। এক, রাজনৈতিক বিরোধ দমন। দুই, উদ্বৃত্ত পুঁজি আর বেকার শ্রমিক সমস্যার একটি সমাধান খুঁজে বের করা। দুটো সমস্যা আলাদা নয়, একটাই সমাধান হতে পারে: বিশাল আকারের নির্মাণকাজ। পুঁজি বিনিয়োগ হবে, শ্রমিক কাজ পাবে, এবং শহর বদলে যাবে এমনভাবে যাতে ভবিষ্যতে আর বিপ্লব সহজ না হয়।
ঠিক এই লক্ষ্যেই, ১৮৫৩ সালে জর্জ-ইউজিন হাউসমানকে প্যারিসের প্রিফেক্ট নিযুক্ত করা হলো।
হাউসমান কিন্তু তথাকথিত আর্কিটেক্ট ছিলেন না, ছিলেন একজন প্রশাসক। কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তথাকথিত আর্কিটেকটদের চেয়ে অনেকটাই বেশি অ্যাম্বিশাস। শোনা যায় হিতর্ফ তাঁকে ৪০ মিটার চওড়া একটি নতুন বুলেভার্ডের পরিকল্পনা দেখালে, হাউসমান সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলেছিলেন: " not wide enough…you have it 40 meters wide and I want it 120." … মোদ্দা কথায়, হাউসম্যান খুচরোখাচরা সংস্কার নয়, পুরো শহরকে হোলসেল ভোল পাল্টে দেওয়ার প্ল্যান করছিলেন।
পরের দেড় দশকে হাউসমান যা যা করলেন তা ইতিহাসে অভূতপূর্ব বললেও কম বলা হয়। লে আলে-র মতো গোটা পাড়া ভেঙে দেওয়া হলো। সরু, আঁকাবাঁকা মধ্যযুগীয় গলির জায়গায় এলো চওড়া, সোজা বুলেভার্ড, সে বুলেভার্ড এত চওড়া যে ব্যারিকেড তোলা কঠিন, সেনাবাহিনীর গোলন্দাজ বাহিনী সহজে ঢুকতে পারে। শহরের উপকণ্ঠ জুড়ে দেওয়া হলো। নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হলো - ক্রেডিট মোবিলিয়ে, ক্রেডিট ইমোবিলিয়ের - ঋণের উপর দাঁড়িয়ে এই পুরো মহাযজ্ঞ। হাউসমান বুঝেছিলেন তাঁর কাজ আসলে একটি কেইনসীয় পরিকল্পনা: ঋণ-নির্ভর পরিকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত পুঁজির নিকাশ।
শ্রমিক শ্রেণিকে ঠেলে দেওয়া হলো শহরের বাইরে, উপকণ্ঠে। তাদের পাড়া গেল, তাদের বাজার গেল, তাদের রাস্তা গেল। তার জায়গায় এলো ক্যাফে, ডিপার্টমেন্ট স্টোর, ফ্যাশন শিল্প, গ্র্যান্ড এক্সপোজিশন। প্যারিস সেই হয়ে উঠল ‘The City of Light’ … ‘আলোর শহর; পর্যটন, ভোগ, উৎসবের কেন্দ্র। হেমিংওয়ের কথা মনে করুন, “Paris is a moveable feast” … সেই শুরু।
যারা এই বৈভব উপভোগ করতে পারলেন না, অর্থাৎ, ঐতিহ্যবাদী (মতান্তরে প্রাচীনপন্থী) কারিগর থেকে শুরু করে বেতনহীন শ্রমিক, তাদের আপত্তি গণনায় আসেনি। সে আর কোথায়-ই বা আসে?
পনেরো বছর ধরে এই ব্যবস্থা চললো।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই এর পর ১৮৬৮। ঋণের কাঠামো ভেঙে পড়ল। ফটকাবাজি আর ঋণের উপর দাঁড়ানো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধসে গেল। হাউসমানকে বিদায় নিতে হলো। সংকটকালে রাজা-রাজড়ারা যুদ্ধু বাঁধান এ তো জানা কথাই। নেপোলিয়ন-ও সংকট থেকে মনোযোগ সরাতে বিসমার্কের প্রুশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। সেটাই কাল হলো। ১৮৭০ সালে সেডানের যুদ্ধে ফ্রান্স সম্পূর্ণ পরাজিত হলো, নেপোলিয়ন তৃতীয় বন্দী হলেন। বিসমার্কের সেনা প্যারিস অবরোধ করল।
সেই অবরোধের মধ্যে, সেই শূন্যতায়, ১৮৭১ সালের মার্চ মাসে জন্ম নিল প্যারিস কমিউন, পারী কমিউন।
Place Vendôme-এ ভেঙে পড়া Napoleon-এর স্তম্ভের সামনে Communard-দের ছবি, Bruno Braquehais তোলা, ১৮৭১। সাম্রাজ্যের প্রতীক মাটিতেসেই কমিউন গড়লেন কারা? মূলত হাউসমান শহর থেকে উচ্ছেদ করেছিলেন যাদের, যাদের পাড়া ভেঙে বুলেভার্ড হয়েছিল, যারা সেই উজ্জ্বল সিটি অফ লাইটসের রোশনাইয়ে-চাকচিক্যের কোনো অংশ পাননি। ১৮৪৮-এর স্মৃতি বেঁচে ছিলো তাদের মধ্যে, যেমন স্মৃতি রয়ে যায় ক্ষমতান্ধ আর ক্ষমতাহীনের মাঝে। সামাজিক প্রজাতন্ত্রের স্মৃতি অথবা স্বপ্ন যা দমন হয়েছিল, কিন্তু উবে যায় নি, হয়তো মাটি চাপা পড়েছিল বীজের মত। তার সাথে অনুঘটকের কাজ করলো হাউসমানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। পারী কমিউনের মানুষ তাদের শহর ফিরে পেতে চেয়েছিলেন বই কী।
ইতিহাস আমরা জানি - কমিউন মাত্র ৭২ দিন টিকেছিল। ভার্সাই থেকে আসা সরকারি বাহিনী রক্তে ডুবিয়ে কমিউনের শেষ প্রহর লিখলো। কিন্তু সেই ৭২ দিনে যা ঘটেছিল, সেই শ্রমিকদের স্বশাসন, নারীদের অংশগ্রহণ, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বনাম বিকেন্দ্রীভূত গণতন্ত্রের বিতর্ক - পরবর্তী দেড়শো বছরের বামপন্থী রাজনীতির ভাষা গড়ে দিয়েছে।
হাউসমানের প্যারিস থেকে পারী কমিউনের ইতিহাস আমাদের একটাই কথা বলে: যখন কোনো শহর থেকে তার অসুবিধাজনক মানুষগুলোকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তারা কোথাও যায় না। তারা জমা হয়। ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে ফিরে আসে। চওড়া রাস্তা ব্যারিকেড ঠেকাতে পারে। সেনাবাহিনী কমিউন ভাঙতে পারে। কিন্তু উচ্ছেদের স্মৃতি, এবং ন্যায্যতার দাবি, মুছে দেওয়া যায় না।
সদ্য-মসনদে বসা বাংলার শাসকরা কী সে কথা জানেন?