এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  ইতিহাস

  • উচ্ছেদের শহর, কমিউনের আগুন

    সুধাংশু শেখর লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | ইতিহাস | ০১ জুন ২০২৬ | ৩০৬ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)

  • Avenue de l'Opéra নির্মাণের জন্য Butte des Moulins পাড়া ভাঙা হচ্ছে, ১৮৭০। ১৮৭৬ সাল নাগাদ এই একটি রাস্তার জন্য মোট নির্মাণ ব্যয় হয়েছিল ৯৮ লক্ষ ডলার এবং ধ্বংস হয়েছিল ১৬৮টি বাড়ি। সূত্র: Brown University Library / Wikimedia Commons।

    ১৮৪৮ সাল। ইউরোপ জুড়ে সংকট। বেকার শ্রমিক আর উদ্বৃত্ত পুঁজি দুই জমে জমে পূঞ্জীভূত হয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেলেছে একটা - ফল প্যারিসে বিপ্লব। শ্রমিক আর বুর্জোয়া ইউটোপিয়ানরা একসাথে রাস্তায় নামলেন সামাজিক প্রজাতন্ত্রের স্বপ্ন নিয়ে যা পুঁজিবাদী অসাম্যের বিকল্প হবে। রিপাবলিকান বুর্জোয়া সেই বিপ্লব দমন করল, অত্যন্ত সহিংসভাবে। কিন্তু সংকটের সমাধান হলো না। সেই ভ্যাকুয়ামেই উঠে এলেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট — ১৮৫১ সালে অভ্যুত্থান, ১৮৫২ সালে সম্রাট ঘোষণা করলেন নিজেকে।

    নেপোলিয়ন বিচক্ষণ মানুষ, তিনি গদিতে বসার আগেই হয়তো জানতেন যে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে হলে দুটো কাজ একসাথে করতে হবে। এক, রাজনৈতিক বিরোধ দমন। দুই, উদ্বৃত্ত পুঁজি আর বেকার শ্রমিক সমস্যার একটি সমাধান খুঁজে বের করা। দুটো সমস্যা আলাদা নয়, একটাই সমাধান হতে পারে: বিশাল আকারের নির্মাণকাজ। পুঁজি বিনিয়োগ হবে, শ্রমিক কাজ পাবে, এবং শহর বদলে যাবে এমনভাবে যাতে ভবিষ্যতে আর বিপ্লব সহজ না হয়।

    ঠিক এই লক্ষ্যেই, ১৮৫৩ সালে জর্জ-ইউজিন হাউসমানকে প্যারিসের প্রিফেক্ট নিযুক্ত করা হলো।

    হাউসমান কিন্তু তথাকথিত আর্কিটেক্ট ছিলেন না, ছিলেন একজন প্রশাসক। কিন্তু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তথাকথিত আর্কিটেকটদের চেয়ে অনেকটাই বেশি অ্যাম্বিশাস। শোনা যায় হিতর্ফ তাঁকে ৪০ মিটার চওড়া একটি নতুন বুলেভার্ডের পরিকল্পনা দেখালে, হাউসমান সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলেছিলেন: " not wide enough…you have it 40 meters wide and I want it 120." … মোদ্দা কথায়, হাউসম্যান খুচরোখাচরা সংস্কার নয়, পুরো শহরকে হোলসেল ভোল পাল্টে দেওয়ার প্ল্যান করছিলেন।

    পরের দেড় দশকে হাউসমান যা যা করলেন তা ইতিহাসে অভূতপূর্ব বললেও কম বলা হয়। লে আলে-র মতো গোটা পাড়া ভেঙে দেওয়া হলো। সরু, আঁকাবাঁকা মধ্যযুগীয় গলির জায়গায় এলো চওড়া, সোজা বুলেভার্ড, সে বুলেভার্ড এত চওড়া যে ব্যারিকেড তোলা কঠিন, সেনাবাহিনীর গোলন্দাজ বাহিনী সহজে ঢুকতে পারে। শহরের উপকণ্ঠ জুড়ে দেওয়া হলো। নতুন আর্থিক প্রতিষ্ঠান তৈরি হলো - ক্রেডিট মোবিলিয়ে, ক্রেডিট ইমোবিলিয়ের - ঋণের উপর দাঁড়িয়ে এই পুরো মহাযজ্ঞ। হাউসমান বুঝেছিলেন তাঁর কাজ আসলে একটি কেইনসীয় পরিকল্পনা: ঋণ-নির্ভর পরিকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত পুঁজির নিকাশ।

    শ্রমিক শ্রেণিকে ঠেলে দেওয়া হলো শহরের বাইরে, উপকণ্ঠে। তাদের পাড়া গেল, তাদের বাজার গেল, তাদের রাস্তা গেল। তার জায়গায় এলো ক্যাফে, ডিপার্টমেন্ট স্টোর, ফ্যাশন শিল্প, গ্র্যান্ড এক্সপোজিশন। প্যারিস সেই হয়ে উঠল ‘The City of Light’ … ‘আলোর শহর; পর্যটন, ভোগ, উৎসবের কেন্দ্র। হেমিংওয়ের কথা মনে করুন, “Paris is a moveable feast” … সেই শুরু।
    যারা এই বৈভব উপভোগ করতে পারলেন না, অর্থাৎ, ঐতিহ্যবাদী (মতান্তরে প্রাচীনপন্থী) কারিগর থেকে শুরু করে বেতনহীন শ্রমিক, তাদের আপত্তি গণনায় আসেনি। সে আর কোথায়-ই বা আসে?

    পনেরো বছর ধরে এই ব্যবস্থা চললো।

    ইতিহাসের পাতা ওল্টালেই এর পর ১৮৬৮। ঋণের কাঠামো ভেঙে পড়ল। ফটকাবাজি আর ঋণের উপর দাঁড়ানো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধসে গেল। হাউসমানকে বিদায় নিতে হলো। সংকটকালে রাজা-রাজড়ারা যুদ্ধু বাঁধান এ তো জানা কথাই। নেপোলিয়ন-ও সংকট থেকে মনোযোগ সরাতে বিসমার্কের প্রুশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। সেটাই কাল হলো। ১৮৭০ সালে সেডানের যুদ্ধে ফ্রান্স সম্পূর্ণ পরাজিত হলো, নেপোলিয়ন তৃতীয় বন্দী হলেন। বিসমার্কের সেনা প্যারিস অবরোধ করল।

    সেই অবরোধের মধ্যে, সেই শূন্যতায়, ১৮৭১ সালের মার্চ মাসে জন্ম নিল প্যারিস কমিউন, পারী কমিউন।


    Place Vendôme-এ ভেঙে পড়া Napoleon-এর স্তম্ভের সামনে Communard-দের ছবি, Bruno Braquehais তোলা, ১৮৭১। সাম্রাজ্যের প্রতীক মাটিতে

    সেই কমিউন গড়লেন কারা? মূলত হাউসমান শহর থেকে উচ্ছেদ করেছিলেন যাদের, যাদের পাড়া ভেঙে বুলেভার্ড হয়েছিল, যারা সেই উজ্জ্বল সিটি অফ লাইটসের রোশনাইয়ে-চাকচিক্যের কোনো অংশ পাননি। ১৮৪৮-এর স্মৃতি বেঁচে ছিলো তাদের মধ্যে, যেমন স্মৃতি রয়ে যায় ক্ষমতান্ধ আর ক্ষমতাহীনের মাঝে। সামাজিক প্রজাতন্ত্রের স্মৃতি অথবা স্বপ্ন যা দমন হয়েছিল, কিন্তু উবে যায় নি, হয়তো মাটি চাপা পড়েছিল বীজের মত। তার সাথে অনুঘটকের কাজ করলো হাউসমানের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। পারী কমিউনের মানুষ তাদের শহর ফিরে পেতে চেয়েছিলেন বই কী।

    ইতিহাস আমরা জানি - কমিউন মাত্র ৭২ দিন টিকেছিল। ভার্সাই থেকে আসা সরকারি বাহিনী রক্তে ডুবিয়ে কমিউনের শেষ প্রহর লিখলো। কিন্তু সেই ৭২ দিনে যা ঘটেছিল, সেই শ্রমিকদের স্বশাসন, নারীদের অংশগ্রহণ, কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বনাম বিকেন্দ্রীভূত গণতন্ত্রের বিতর্ক - পরবর্তী দেড়শো বছরের বামপন্থী রাজনীতির ভাষা গড়ে দিয়েছে।

    হাউসমানের প্যারিস থেকে পারী কমিউনের ইতিহাস আমাদের একটাই কথা বলে: যখন কোনো শহর থেকে তার অসুবিধাজনক মানুষগুলোকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তারা কোথাও যায় না। তারা জমা হয়। ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে ফিরে আসে। চওড়া রাস্তা ব্যারিকেড ঠেকাতে পারে। সেনাবাহিনী কমিউন ভাঙতে পারে। কিন্তু উচ্ছেদের স্মৃতি, এবং ন্যায্যতার দাবি, মুছে দেওয়া যায় না।

    সদ্য-মসনদে বসা বাংলার শাসকরা কী সে কথা জানেন?
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ০১ জুন ২০২৬ | ৩০৬ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    উনুন - upal mukhopadhyay
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • r2h | 165.*.*.* | ০১ জুন ২০২৬ ১৭:৫৫740951
  • অত্যন্ত ভালো লাগলো। সময়োপযোগী ইত্যাদি ইত্যাদি।

    "... যখন ... অসুবিধাজনক মানুষগুলোকে সরিয়ে দেওয়া হয়, তারা কোথাও যায় না। তারা জমা হয়। ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে ফিরে আসে। ... উচ্ছেদের স্মৃতি, এবং ন্যায্যতার দাবি, মুছে দেওয়া যায় না।"
    ঠিক এই জিনিসটা ভাবছিলাম। রুজি রোজগারের পথ, মাথার ওপর চাল ভেঙে দিলেও মানুষগুলি তো থাকবে।
    এবার তারা কীভাবে রিঅ্যাক্ট করবে, প্রতিক্রিয়ার অনুঘটক কী হবে- সেসব হল দেখার।

    একটা জিনিস- এটা কি টাইপো হল?
    "হাউসমান বুঝেছিলেন তাঁর কাজ আসলে একটি কেইনসীয় পরিকল্পনা: ঋণ-নির্ভর পরিকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত পুঁজির নিকাশ"
  • সুধাংশু শেখর | ০১ জুন ২০২৬ ২৩:১৩740955
  • ধন্যবাদ r2h.
     
    Yes, capital surplus disposal problem এর বাংলা অনুবাদ করার চেষটা। "What he did in effect was to help resolve the capital surplus disposal problem by setting up a Keynesian-like system of debt-financed infrastructural urban improvements." ("The right to the city" by David Harvey)
  • r2h | 165.*.*.* | ০২ জুন ২০২৬ ০০:৩৯740961
  • ও আচ্ছা, বুঝলাম।
  • | ০২ জুন ২০২৬ ১৩:৫৬740967
  • ভারী ভালো লেখা।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন