
১৯ মে ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত সরকারি বিজ্ঞপ্তি, আবেদন ফর্ম এবং অগ্নিমিত্রা পালের ফেসবুক পোস্টের বক্তব্যের ভিত্তিতে লেখা।
২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে চালু হয় লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প (১)। দু-বছরের মধ্যেই, ২০২৩ সালের টাইমস অফ ইণ্ডিয়ার প্রতিবেদন (৪) অনুযায়ী, রাজ্যের ২ কোটিরও বেশি মহিলার কাছে পৌঁছেছিল এই প্রকল্প। অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গের ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রতি চারজন মহিলার মধ্যে প্রায় তিনজন এই প্রকল্পের সুবিধা পেতেন — প্রতি মাসে সরাসরি তাঁদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ১,০০০–১,২০০ টাকা জমা পড়ত।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর এই প্রকল্প বন্ধ করে তার জায়গায় আনা হচ্ছে অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার (২)। এতে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। ১৯ মে ২০২৬ তারিখে সরকারি বিজ্ঞপ্তি (বিজ্ঞপ্তি নং ২৪১১-WCD/O/AB-4/2026) এবং আবেদন ফর্ম প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পলের Facebook পোস্টে (৩) বেশ কিছু অতিরিক্ত যোগ্যতার মানদণ্ড প্রকাশিত হয়েছে যা সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে ছিল না।
বর্ধিত অনুদানের পরিমাণ নিয়ে সর্বত্র উৎসাহ, খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু যাঁরা সবচেয়ে বেশি পুরনো প্রকল্পের উপর নির্ভরশীল ছিলেন, নতুন যোগ্যতার মানদণ্ড তাঁদের কী বাদ দেবে? এই প্রশ্নটি এখনও অনেকটাই অনালোচিত। অগ্নিমিত্রা পলের ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী (বানান অপরিবর্তিত),
“অন্নপূর্ণা যোজনা কারা পাবেন না?
* ২৫ বছরের নিচে ও ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে মহিলারা পাবেন না
* স্থায়ী সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীরা পাবেন না
* যেসব শিশুর সরকারি অনুমোদন বা নথিভুক্তি নেই, তাদের মায়েরা অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাবেন না
* সরকারি স্কুলে পড়া ছাত্রছাত্রীরা - তাদের অভিভাবকরা - অনাপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাবেন না
* সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুল/কলেজের শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মীরা - শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত বেতন পান, তারা পাবেন না
* আয়কর প্রদানকারী মহিলা পাবেন না
* SIR ভোটার তালিকা যাচাইয়ে মৃত, স্থানান্তরিত বা স্থায়ীভাবে নাম বাদ পড়া ব্যক্তিরা পাবেন না
* একাধিক বিবাহ বা একাধিক পরিবারের তথ্য গোপন করলে সুবিধা বাতিল হতে পারে
* বেআইনি পরিচয়ে আবেদনকারীদের আবেদন গ্রহণ করা হবে না”
এ ছাড়া আছে ১১ পাতার ফর্ম। এগারোটি অনুচ্ছেদ, পঞ্চাশটিরও বেশি তথ্যক্ষেত্র: কেবল আবেদনকারীর নয়, পরিবারের প্রতিটি সদস্যের। Section D-তে চাওয়া হচ্ছে: পরিবারের সবার PAN নম্বর, GST নম্বর, পেশার ধরন (আলাদাভাবে পরিযায়ী শ্রমিক টিক-বাক্স), পরিবারের মোট বার্ষিক আয়। Section E-তে: প্রতিটি সদস্যের CAA আবেদনের স্ট্যাটাস; কেউ SIR-এ বাদ পড়লে সেই মামলা ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন কি না। Section G-তে: পরিবারের প্রতিটি সদস্য কোন কোন সরকারি DBT প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন। এই সব তথ্যের ভিত্তিতে Section H-তে যাচাইকারী কর্মকর্তা সুপারিশ করবেন কেউ পাবেন না পাবেন না, অনুমোদন না প্রত্যাখ্যান। তবে, কোন তথ্যের ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করা যাবে তা স্পষ্ট করে নেই। ফর্মে শুধু লেখা: "Please mention relevant Section and point." ও হ্যাঁ, ফর্মের সংজ্ঞা অনুযায়ী "পরিবার" মানে যারা একই রান্নাঘরে খাওয়াদাওয়া করেন (**Note: ‘Family’ is defined as a group of persons who normally live together and take their meals from a common kitchen.”)।
অর্থাৎ, একজন মহিলার যোগ্যতা এখন তাঁর স্বামীর GST নম্বর, তাঁর পুত্রের PAN, পরিবারের কারো CAA আবেদন, এবং বাড়ির কেউ SIR-এ বাদ পড়েছেন কি না, এই সব কিছুর উপর নির্ভর করতেই পারে। টাইমসের একটি প্রতিবেদনেও (৫) এই আশঙ্কার কথাই লেখা - "The nature and volume of information being sought has alarmed many beneficiaries, particularly poor and rural women."। মন্ত্রীরা বলেছেন ফর্মে শুধু ডেটা কালেক্ট করা হচ্ছে আর কিছু না, যদিও সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠবে এতো সেনসিটিভ ও গোপনীয় ডেটা এইভাবে কালেক্ট করলে কোথাও বড়সড় জালিয়াতি বা তথ্য-চুরি হলে আটকাবে কে? আজকালের রিপোর্ট অনুযায়ী, ইতোমধ্যেই ভুয়ো পোর্টাল তৈরি হয়েছে ফর্ম ফিলাপের ছলে তথ্য-চুরি করার (১২)। তাছাড়া ওয়েলফেয়ার চাইলে কী প্রাইভেসির আর মূল্য থাকে না?
এই সব কটি তথ্যের ভিত্তিতে আপাতত একটা প্রাথমিক বিশ্লেষণ করা যায়, যাকে ইংরেজিতে বলে “ব্যাক অফ দ্য আনভেলপ ক্যালকুলেশন”। আলোচনার মূল ফোকাস খতিয়ে দেখা যে বেশ কিছু পরস্পরসংলগ্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাদ পড়তে পারেন কী না? এই লেখাটির উদ্দেশ্য সেই প্রক্রিয়ার উপর সামান্য আলো ফেলা, অথবা কিছু প্রশ্ন তোলা, যার উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।
যে কোনো সমাজকল্যাণ প্রকল্পের যোগ্যতার মানদণ্ড বোঝার আগে বোঝা দরকার প্রকল্পটি আসলে কাদের জন্য। মহিলাদের ব্যক্তিগত কর্মসংস্থানের চিত্রটি কেমন? পারিবারিক আয়ের পাশাপাশি রাখলে কোথায় দাঁড়িয়ে তাঁরা?
অভিষেক ওয়াঘমারের পিরিওডিক লেবার ফোর্স সার্ভে (PLFS)-র ভিত্তিতে করা বিশ্লেষণ অনুযায়ী (৮), ভারতে পুরুষদের লেবার ফোর্স পার্টিসিপেশনের হার (LFPR) সবসময়েই মহিলাদের প্রায় দ্বিগুণ। ২০২৪ সালে গ্রামীণ পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রায় ৮০%, যেখানে গ্রামীণ মহিলাদের ক্ষেত্রে প্রায় ৪৭%। গ্রামীণ মহিলাদের LFPR ২০০৫ সালে প্রায় ৪৯% থেকে ২০১৮-১৯ সালে নেমে আসে মাত্র ২৫%-এ, এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে আবার বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪ সালে প্রায় ৪৭%-এ পৌঁছেছে। সঙ্গের ছবিটি দেখুন।

কিন্তু এই বৃদ্ধির চরিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ: ২০২৪ সালে গ্রামীণ মহিলা শ্রমিকদের মধ্যে মাত্র ৮% নিয়মিত বেতনভুক্ত কর্মী, ৪২% অবৈতনিক সহায়ক হিসেবে পারিবারিক কাজে নিযুক্ত, এবং ৩১% স্ব-নিযুক্ত, অর্থাৎ বিশাল অংশ হয় কোনো মজুরি পান না, অথবা অনিয়মিত ও স্বল্প আয়ে কাজ করেন (৮)। নিচের ছবিতে এই বদলের চরিত্রটি দেখতে পাবেন।

PLFS ২০২৩-২৪ অনুযায়ী গ্রামাঞ্চলের ৯১% এবং শহরাঞ্চলের ৬৪% কর্মরত মহিলা মাসে ৯,০০০ টাকার কম উপার্জন করেন (৭)। অর্থাৎ লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধাভোগী অধিকাংশ মহিলার নিজস্ব কোনো স্থায়ী আয় ছিল না। তাঁরা পরিবারের উপর নির্ভরশীল। অর্থাত, ওয়েলফেয়ার স্টেটের চোখে পারিবারিক আয় ও ব্যক্তিগত আয় এই দুটো জিনিষ মূলগতভাবেই আলাদা, এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এমন সমস্ত রাজ্যে যেখানে মহিলাদের আর্থিক নির্ভরশীলতা ব্যতিক্রম নয়, বরং কাঠামোগত বাস্তবতা।
উল্লেখ্য, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের যোগ্যতার মানদণ্ড এই বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল: কোনো মহিলা বাদ পড়তেন কেবল যদি তিনি নিজে সরকারি বা আধা-সরকারি সংস্থা থেকে নিয়মিত বেতন বা পেনশন পেতেন। শর্তটি ছিল তাঁর নিজের কর্মসংস্থানের উপর ভিত্তি করে (১)।
অগ্নিমিত্রা পালের ফেসবুক পোস্ট বাদ দিলে, অন্নপূর্ণা যোজনার সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে যোগ্যতার শর্ত তিনটি: বয়স ২৫-৬০; সরকারি চাকরি বা পেনশন নেই; ব্যক্তিগতভাবে আয়কর দেন না। এইটুকু লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতোই। কিন্তু একই দিনে প্রকাশিত আবেদন ফর্মের Section D-তে (৩) চাওয়া হচ্ছে পরিবারের প্রতিটি সদস্যের PAN নম্বর, পরিবারের কেউ GST-নথিভুক্ত কি না, এবং পরিবারের মোট বার্ষিক আয়। এই তথ্যগুলো সংগ্রহের কারণ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট নয়।
ব্যক্তিগতভাবে আয়কর দেওয়ার মাপকাঠিটিকে এবার একটু দেখা যাক। লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধাভোগী “অধিকাংশ” মহিলার নিজস্ব কোনো স্বাধীন আয় ছিল না বললেই চলে। কিন্তু তাঁদের পরিবারে এমন স্বামী, পুত্র বা শ্বশুর থাকতেই পারেন যিনি আয়কর রিটার্ন দাখিল করেন বা জিএসটি-নথিভুক্ত ছোট ব্যবসা চালান।
এই বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত কী বলে? ২০২৪-২৫ মূল্যায়ন বর্ষে পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৫৩ লক্ষ আয়কর রিটার্ন দাখিল হয়েছে (৬)। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী রাজ্যে ২,০৩,০৯,৮৭২ অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি পরিবার ছিল, ২০২৬-এ আনুমানিক ২.২ কোটি (১০)। যেহেতু ITR দাখিলকারীরা সমানভাবে ছড়িয়ে নেই বরং নির্দিষ্ট পরিবারগুলিতে কেন্দ্রীভূত, রক্ষণশীল অনুমানেও রাজ্যের প্রায় ২৪% পরিবারে অন্তত একজন আয়করদাতা আছেন। GST নথিভুক্তি এর উপর আরেকটি স্তর যোগ করে: জিএসটি-নথিভুক্ত ছোট ব্যবসায়ী, ঠিকাদার বা পরিষেবাদাতা, যারা হয়তো অনিয়মিত ও সামান্য উপার্জন করে, তেমন পরিবারও এই তথ্যসংগ্রহের আওতায় পড়বে। যদি ভবিষ্যতে পারিবারিক আয় বা GST যোগ্যতার মানদণ্ড হয়, তাহলে ৩০–৪৫ লক্ষ বর্তমান লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সুবিধাভোগী নতুনভাবে অযোগ্য হতে পারেন, কেবল এই কারণে যে পরিবারের অন্য কেউ কর দেন। এটি এখনও আশঙ্কা, প্রমাণিত সত্য নয়। কিন্তু ফর্মে এই তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে, এবং, আগেই বলা হয়েছে, Section H-তে যাচাইকারী কর্মকর্তা ফর্মের যেকোনো অংশের ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যানের সুপারিশ করতে পারেন। কোন তথ্যের ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করা যাবে তার কোনো লিখিত নির্দেশ আমাদের কাছে নেই। ফর্মে শুধু লেখা: "Please mention relevant Section and point."
এবার চোখ ফেরাই সমস্যাগুলির দিকে।
প্রথমত, আবেদন ফর্মটি ১১ পাতার। একজন তথাকথিত শিক্ষিত রিসোর্সফুল মানুষের কাছেও এই তালিকা তৈরি করা সময়সাপেক্ষ, ভুল হওয়াও বিচিত্র নয়। গ্রামীণ বাংলার একজন প্রান্তিক মহিলার পক্ষে, যাঁর নিজের আয় নেই, যিনি হয়তো পুরোপুরি সাক্ষর নন, এটি কার্যত অসাধ্য। অর্থাত, এই ফর্ম-ফিল-আপের হয়রানি ও দুশ্চিন্তার বোঝা সবচেয়ে বেশি পড়বে যাঁদের উপর, তাঁরাই এই প্রকল্পের সবচেয়ে প্রকৃত সুবিধাভোগী।
দ্বিতীয়ত, মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পলের সরকারি ফেসবুক পোস্টে (৩) কিছু নতুন মাপকাঠি প্রকাশিত হয়েছে যা এত দিন জানা ছিলো না। এই শর্তগুলি সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে নেই, তাই সত্যি-মিথ্যা বলা শক্ত – তবে, এগুলোর ভিত্তি না থাকলে সম্ভবত অফিশিয়াল হ্যাণ্ডেল থেকে পোস্ট করা হত না।
প্রথমটি: যেসব শিশুর সরকারি অনুমোদন বা নথিভুক্তি নেই, তাদের মায়েরা অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাবেন না। এই শর্তটি সেই পরিবারগুলিকে বিপন্ন করবে যাদের নথিপত্রের সংকট সবচেয়ে গভীর। প্রান্তিক পরিবার, পরিযায়ী শ্রমিকের সন্তান, সংখ্যালঘু পরিবারে প্রায়শই দেখা যায় জন্মনিবন্ধন অনিয়মিত। এই মহিলারা নিজেরা হয়তো সমস্ত যোগ্যতা পূরণ করেন, তবু তাঁদের সন্তানের নথি না থাকার কারণে তাঁরা বাদ পড়বেন।
দ্বিতীয়টি আরও বিস্ময়কর: সরকারি স্কুলে পড়া ছাত্রছাত্রীদের অভিভাবকরা এই প্রকল্পে অযোগ্য। এই শর্তটি কল্যাণ প্রকল্পের যুক্তির সরাসরি বিপরীতে দাঁড়িয়ে। সরকারি স্কুলে সন্তান পাঠানো মানে পরিবার সচ্ছল নয়, বরং উল্টো। বেসরকারি স্কুলের খরচ বহন করতে না পারার কারণেই সরকারি স্কুলে পড়ানো হয়। এর ফলে দারিদ্র্যের একটি সুস্পষ্ট লক্ষণ হয়ে দাঁড়ালো অযোগ্যতার মাপকাঠি। যে পরিবার সরকারের বিনামূল্যের শিক্ষাব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল, সেই পরিবারের মহিলাই সরকারের নগদ হস্তান্তর প্রকল্প থেকে বাদ পড়বেন —এর চেয়ে বড় স্ববিরোধিতা কমই দেখা যায়।
এ ছাড়াও, যে শর্তটি আগেও ছিলো, সেটি সাম্প্রতিক রাজনীতির সবথেকে বিতর্কিত টুল – এস আই আর। সরকারি বিজ্ঞপ্তির তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের সুবিধাভোগীরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অন্নপূর্ণা যোজনায় স্থানান্তরিত হবেন, কিন্তু কেবল যাঁরা এস-আই-আর-পরবর্তী ২০২৬-এর ভোটার তালিকায় আছেন। এস-আই-আরের ASDD অর্থাৎ "মৃত, স্থানান্তরিত, বাদ পড়া বা অনুপস্থিত" হিসেবে চিহ্নিত, অথবা নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইনের অধীনে আবেদনকারী, তাঁরা এই প্রকল্পের বাইরে। এবং, এহ বাহ্য, আবেদন ফর্মের Section E.3-এ পরিবারের প্রতিটি সদস্যের জন্য আলাদাভাবে জানাতে হবে তারা এস-আই-আরে বাদ পড়েছেন কি না। পরিবারের অন্য একজন মানুষের লজিক্যাল ডিসক্রিপ্যান্সির দায় কেন একজন মহিলার হবে সে কথা জানা নেই।
যা জানা আছে তা হলো এই যে, এস-আই-আরে বাদ পড়েছেন ২৭ লক্ষ মানুষ। এবং একাধিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংখ্যালঘু মানুষ, সামাজিক সুবিধাবঞ্চিত, প্রান্তিক অথবা নিরক্ষর মানুষ, অথবা পরিযায়ী শ্রমিকের জনঘনত্ব যেসব অঞ্চলে সবথেকে বেশি সেই সমস্ত অঞ্চলেই বিচারাধীন ও বাদ পড়ার হার সবথেকে বেশি (১১)। এর কারণ সহজেই অনুমেয়, এবং ইতোমধ্যে বহুল-আলোচিত। নথিপত্রের সংকট সবসময়েই প্রান্তিক মানুষের-ই বেশি। এবার সেই সঙ্কটের বোঝা বাড়লো, মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা আর কাকে বলে? এরা ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন একবার, এখন ওয়েলফেয়ার স্টেটের তালিকা থেকেও বাদ।
প্রতিপ্রশ্ন
এই বিশ্লেষণের বিপরীতে একটি যুক্তি প্রায়ই শোনা যায়: লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে অনেক সচ্ছল পরিবারের মহিলারাও সুবিধা পেয়েছেন, কারণ পরিবারে সরকারি চাকরিজীবী না থাকলে বাদ পড়ার কোনো নিয়ম ছিল না। পারিবারিক আয়ের মানদণ্ড চালু করলে এই অনিয়ম বন্ধ হবে। এর উত্তর হিসেবে কয়েকটা কথা বলা সমীচীন। প্রথমত, এই বেনিয়ম অথবা অপব্যবহারের প্রকৃত মাত্রা অজানা – ঐ ২.২ কোটি সুবিধাভোগীর মধ্যে কতজন আসলে অযোগ্য ছিলেন এ নিয়ে কোনো প্রকাশিত নিরীক্ষা বা প্রশাসনিক তথ্য নেই। দ্বিতীয়ত, অন্তর্ভুক্তির ত্রুটি আছে যদি ধরেও নিই, তাহলে সেটা ঠিক করার জন্য একটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের কাঠামো ভেঙে ফেলা সম্ভবত অপ্রয়োজনীয়। আধার-সংযুক্ত ডেটাবেস ব্যবহার করে নির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়া-ভিত্তিক যাচাই অনেক কম ক্ষতিতে একই লক্ষ্যে পৌঁছনো যেত। সত্যি বলতে, আগের প্রকল্পের কাঠামো না ভেঙে, শুধু অর্থের পরিমাণ বাড়িয়ে দিলেই কী হতো না? তাতে কিছু প্রশাসনিক মাথাব্যথাও তো কমত। মানুষের হয়রানিও কম হত।
রাশিবিজ্ঞানের ভাষায় বললে, কল্যাণ প্রকল্পে দুই রকম ভুল হতে পারে: যোগ্যকে বাদ দেওয়া, অথবা অযোগ্যকে অন্তর্ভুক্ত করা। এই দুটো ভুল কিন্তু সমান নয়। মাসে ১,০০০ টাকার প্রকল্পে অযোগ্য প্রাপকের খরচ সীমিত ও পুনরুদ্ধারযোগ্য; কিন্তু যোগ্য প্রাপককে বাদ দেওয়ার ক্ষতি তাঁর কাছে অপূরণীয়। আমাদের মনে রাখা উচিত যে, সমাজকল্যাণ প্রকল্পের মূলে একটি মৌলিক নীতি আছে: যোগ্য প্রাপককে বাদ দেওয়ার ভুল, অযোগ্য প্রাপককে অন্তর্ভুক্ত করার ভুলের চেয়ে সামাজিকভাবে অনেক বেশি ক্ষতিকর — বিশেষত যখন মাসিক হস্তান্তরের পরিমাণ খুব বেশি নয়।
বাদ দেওয়ার রাজনীতি – বাদ দেওয়াই রাজনীতি
এই সবকটি প্রক্রিয়া একসাথে বিবেচনা করলে এবং বর্তমানে যাচাইযোগ্য তথ্য হিসেবে প্রায় ২.১–২.২ কোটি লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সুবিধাভোগীর সংখ্যা ধরে, কতজন বাদ পড়বেন তার একটি মোটামুটি হিসাব করা যায়। এস-আই-আর থেকে বাদ পড়া ২৭ লক্ষের মধ্যে আনুমানিক ৮-১০ লক্ষ প্রকৃত সুবিধাভোগী মহিলা। নতুন ব্যক্তিগত আয়কর শর্তে আরও ২-৫ লক্ষ, ধরে মোট ১০-১৫ লক্ষ মহিলা নিশ্চিতভাবে বাদ পড়বেন। মন্ত্রীমহোদয়ার বক্তব্যের নতুন শর্তগুলো (সরকারি স্কুলের অভিভাবক এবং নথিহীন শিশুর মা) ইমপ্লিমেন্টেড হলে এই সংখ্যা ৩০-৪৫ লক্ষ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, অর্থাৎ বর্তমান সুবিধাভোগীদের ১৫-২০ শতাংশ। লেখার শুরুতেই যা বলেছিলাম, আবার-ও বলি, এই ধরণের পূর্বাভাস সুনির্দিষ্ট নয়, খুবই খসড়া আনুমানিক হিসাব। প্রকৃত প্রস্তাবে কতজন বাদ পড়লেন, সেটা নির্ভর করবে চূড়ান্ত বিজ্ঞপ্তির ভাষা, প্রয়োগ-পদ্ধতি অর্থাৎ ইমপ্লিমেন্টেশনের উপর।
কিন্তু গোটা পদ্ধতির দিক-নির্দেশ নিয়ে সন্দেহ নেই, এবং এইখানে নিখুঁত সংখ্যাতত্ত্বের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো বঞ্চনার চরিত্র। যেমন তিনটে নতুন শর্তের একটাও কোনো মহিলাকে তাঁর নিজের আয় বা সম্পদের ভিত্তিতে বাদ দেয় না। বাদ দেওয়ার মাপকাঠি তাঁর স্বামী অথবা সন্তান। যে প্রকল্প দাবি করছে মহিলাদের আর্থিক নির্ভরশীলতা কমাবে, সেই প্রকল্পটি তার বঞ্চনার শর্তগুলো গড়ে তুলেছে তাদের পরিবারের আর্থসামাজিক জীবনকে ঘিরে। এইখানেই কী একটা গোড়ায় গলদ নেই?
মাসে ৩,০০০ টাকার অনুদান লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের তুলনায় বেশি – সন্দেহ নেই। কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে বেশি অনুদানের কোনো মূল্য নেই সেই মহিলার কাছে যিনি আর যোগ্যই নন। হয়তো আরও কিছু দিন বা মাস পরে বোঝা যাবে এই উদ্বেগগুলো কতটা প্রাসঙ্গিক। ততক্ষণ পর্যন্ত, যেটুকু বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে তার ভিত্তিতে এই আশঙ্কা অমূলক নয় যে এই আপাত ঔদার্যের আড়ালে বহু মহিলারা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, বাদ পড়বেন, তাঁদের স্বনির্ভরতার পথ রুদ্ধ হবে, এবং এই সব-ই আমরা, যারা প্রিভিলেজড মধ্যবিত্ত মানুষ, তারা খেয়াল-ও করবো না।


dc | 2401:*:*:*:*:*:*:* | ০২ জুন ২০২৬ ১৯:৫০740976
বাসুদেব | 115.*.*.* | ০৩ জুন ২০২৬ ১১:৫০740983
dc | 2401:*:*:*:*:*:*:* | ০৩ জুন ২০২৬ ১২:১৪740985
dc | 2401:*:*:*:*:*:*:* | ০৩ জুন ২০২৬ ১২:১৮740986
dc | 2401:*:*:*:*:*:*:* | ০৩ জুন ২০২৬ ১৮:২৩740992
বাসুদেব | 115.*.*.* | ০৩ জুন ২০২৬ ১৮:৫২740993