বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সবকিছু বেশ শান্ত, স্বস্তিদায়ক। কিন্তু একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই বুঝবেন, থিয়েটারের পর্দাটা আসলে অন্য কারোর ইশারায় উঠছে আর নামছে। বিশ্ব রাজনীতির একটা অলিখিত নিয়ম আছে—যে দেশ মাথা তুলে দাঁড়াতে চাইবে, তার পায়ে ল্যাং মারার জন্য গ্লোবাল মোড়লরা সবসময় তৈরি। আজকে যে 'ভারত ভাগ করার চেষ্টা' বা দেশকে ভিতর থেকে ভেঙে টুকরো করার একটা সুক্ষ্ম চক্রান্ত চলছে, সেটা কোনো সস্তার হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড নয়, এটা পিওর ভূরাজনীতি বা জিওপলিটিক্স। বাঙালির চায়ের আড্ডার আঁতলামি মার্কা নিরপেক্ষতা বজায় রাখার চক্করে আমরা আসল বিপদটা দেখতেই পাচ্ছি না। একদিকে ওয়াশিংটনের থিংক ট্যাংক, অন্যদিকে বেজিংয়ের নীরব আগ্রাসন—দুটি মহাশক্তিই একটা বিষয়ে একমত: ভারতকে সাইজে রাখতে হবে। আর এই নোংরা খেলায় সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো আমাদের দেশেরই কিছু অতি-শিক্ষিত 'উপকারী' বোকা এবং ক্ষমতার লোভে অন্ধ রাজনৈতিক কারবারিরা। আমাদের এই সাধের গণতন্ত্রের ভেতরে বসে যারা নিয়মিত কলকাঠি নাড়ছে, তাদের চেনার সময় এসেছে।
চলুন শুরু করা যাক লাদাখের বরফাবৃত পাহাড় থেকে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সোনম ওয়াংচুকের অনশন আর পরিবেশ দরদ দেখে অনেকেরই চোখে জল চলে আসে, বুকটা কেঁদে ওঠে। কিন্তু ল্যাবরেটরির সায়েন্স প্রজেক্ট আর আন্তর্জাতিক রাজনীতির জটিল মারপ্যাঁচ যে সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস, সেটা বোঝার মতো মগজ কি আমাদের আমজনতার আছে? এই যে তথাকথিত পরিবেশবাদী আন্দোলন বা ছদ্ম-বিজ্ঞানচর্চার গালভরা হেঁয়ালি, এর আসল উদ্দেশ্যটা কী? লাদাখের মতো একটা অতি-সংবেদনশীল স্ট্র্যাটেজিক সীমান্ত অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি করা কার স্বার্থে কাজ করছে, সেটা বুঝতে রকেট সায়েন্টিস্ট হতে হয় না। যখন ওয়েস্টার্ন মিডিয়া হঠাৎ কোনো একটা আঞ্চলিক আন্দোলনকে মাথায় তুলে নাচে, তখন বুঝতে হবে সুতোটা অন্য কোথাও বাঁধা আছে। ঠিক একই লাইনে কাজ করছেন অভিজিৎ দিপকের মতো সোশ্যালাইজড অ্যাক্টিভিস্টরা। এদের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল আর সুচিন্তিত বয়ানগুলো লক্ষ্য করলে দেখবেন, এরা যেন এক একটা গ্লোবাল টুলকিটের পেইড কর্মী। সমাজসেবার মোড়কে দেশীয় সুরক্ষাতন্ত্রকে দুর্বল করার এই যে প্রক্সি ওয়ার, এটা নতুন কিছু নয়, বরং অত্যন্ত পরিকল্পিত মগজধোলাই।
এবার আসা যাক আসল মাস্টারমাইন্ডদের প্রসঙ্গে, যারা দেশের শাসনদণ্ড হাতে পাওয়ার জন্য ছটফট করছেন। কংগ্রেস, আম আদমি পার্টি (আপ), মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কিংবা সমাজবাদী পার্টির মতো বিরোধী দলগুলোর ভূমিকা এখানে ঠিক কী? তারা কি সত্যিই গ্লোবাল পলিটিক্সের এই গভীর চালটা বোঝে না, নাকি জেনেবুঝেই নিজেদের আখের গোছাতে এই ফাঁদে পা দিচ্ছে? রাজনীতির ময়দানে ক্ষমতা দখলের লড়াই থাকবেই, সেটা সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ। কিন্তু যখন সেই লড়াই দেশের অখণ্ডতাকে বাজি রেখে হয়, তখন তাকে আর রাজনীতি বলা যায় না, ওটা স্রেফ ক্ষমতার নির্লজ্জ কারবারি। ভোটব্যাঙ্কের অঙ্কে মেতে থাকা এই দলগুলোর কাছে দেশের মানচিত্রটা স্রেফ একটা ভোটের খতিয়ান বই আর কিছুই নয়। এই দলগুলো ক্ষমতার জন্য এতটাই মরিয়া যে, তারা ওয়াশিংটন বা বেজিংয়ের তৈরি করা ভারত-বিরোধী বয়ানগুলোকে হুবহু গিলছে এবং দেশের ভেতরে উগরে দিচ্ছে। জাতিগত বিভেদ তৈরি করা, উত্তর-দক্ষিণের দেওয়াল তোলা, আঞ্চলিকতাবাদ উসকে দেওয়া—এগুলো সবই তো সেই চেনা স্ক্রিপ্ট। যখন কোনো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বা জাতীয় স্তরের নেতা কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে পরোক্ষে ভারতের সার্বভৌমত্বকে আঘাত করেন, তখন বেজিংয়ের দপ্তরে বসে থাকা কমরেডরা মুচকি হাসেন আর ওয়াশিংটনের লবিস্টরা শ্যাম্পেনের বোতল খোলেন। ক্ষমতার লোভে এরা এতটাই অন্ধ যে, নিজেরা কখন গ্লোবাল ম্যাপে ঘুঁটি হয়ে গেছেন, তা নিজেরাই টের পাচ্ছেন না।
এখানেই খেলার শেষ নয়, বরং টুইস্টটা অন্য জায়গায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'ডিপ স্টেট' এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টি হয়তো আদর্শগতভাবে একে অপরের পরম শত্রু, কিন্তু ভারতের অর্থনৈতিক ও সামরিক উত্থান রুখতে তারা গোপনে একই লাইনে ঘুঁটি চালছে। ডলার আর ইউয়ানের যুগলবন্দীতে যে ফাণ্ডিংয়ের খেলা চলছে, তার সুবাস দিল্লি থেকে কলকাতা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। চীন আমাদের সীমান্তে সামরিক চাপ বাড়াচ্ছে, আর আমেরিকা হিউম্যান রাইটস বা ধর্মীয় স্বাধীনতার ভুয়ো প্রেসক্রিপশন দিয়ে ভারতকে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে ব্যাকফুটে রাখার চেষ্টা করছে। আর এই আন্তর্জাতিক চক্রান্তকে ভারতের মাটিতে সফল করতে একদল ফ্রি-ল্যান্সার হিসেবে কাজ করছে এই অ্যাক্টিভিস্ট ও ছদ্ম-বুদ্ধিজীবীদের দল। তারা প্রতিনিয়ত এমন একটা বিষাক্ত আবহ তৈরি করতে চায়, যেখানে মনে হবে ভারত একটা অচল, টুকরো হতে চলা এক অত্যাচারী রাষ্ট্র। এটা কোনো সাধারণ সরকার বিরোধী সমালোচনা নয়, এটা হলো একটা সুসংগঠিত হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার, যার শেষ লক্ষ্য ভারতকে টুকরো টুকরো করে দুর্বল করে দেওয়া।
তাহলে শেষ পর্যন্ত হচ্ছেটা কী? আমরা কি সত্যিই এক অদৃশ্য বিভাজনের দিকে হেঁটে চলেছি? দেশটাকে বাঁচাতে হলে এখন দরকার এক তীব্র, আপসহীন দেশাত্মবোধক সতর্কতা। সস্তা ইমোশন আর থ্রি-ইডিয়টস মার্কা রোমান্টিক অ্যাক্টিভিজমের দিন এবার শেষ করতে হবে। এখন সময় এসেছে পর্দার পেছনের আসল কুশীলবদের কলার ধরে টান মারার। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো যখন ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাচ্ছে, আর দেশের ভেতরের কিছু মানুষ যখন তাদের হয়ে প্রকাশ্য দালালি করছে, তখন চুপ থাকাটাও এক ধরণের ঐতিহাসিক অপরাধ। এই ছদ্ম-বিজ্ঞানী, সোশ্যাল মিডিয়া টুলকিট গ্যাং আর সুবিধাবাদী রাজনৈতিক জোটের মুখোশটা টেনে খোলা অত্যন্ত জরুরি। ভারত ভাগ করার এই আন্তর্জাতিক চক্রান্তকে রুখতে হলে সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে, গ্লোবাল দাবার বোর্ডে তারা যেন কোনোভাবেই কিস্তিমাত হওয়ার বোকা ঘুঁটি না হয়ে যান। সময় কিন্তু বড্ড কম, আর শত্রুরা অলরেডি আমাদের ঘরের দরজায় কড়া নাড়ছে। এবার যদি আমরা চোখ না খুলি, তবে ইতিহাস আমাদের কোনোদিন ক্ষমা করবে না।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।