

পুরুলিয়া, বীরভূম, বাঁকুড়া এই জেলাগুলি বহু ভাবে আমাকে ঋদ্ধ করেছে। শাল পিয়ালের ছায়াঘেরা পথে হাঁটতে হাঁটতে একবার খোঁজ পেয়েছিলাম এক ধনভাণ্ডারের - শালতোড়ার জঙ্গল পেরিয়ে, দ্বারকেশ্বর নদের কোলে শুশুনিয়া পাহাড়ের আড়ালে এক আশ্চর্য ইস্কুল, যেখানে আমের মুকুলের ছাতার তলায় ছোট ছোট কুঁড়ির মনে অ আ ক খ, বর্ণপরিচয় আর সহজ পাঠের স্বপ্ন বোনা হয়। বাঁকুড়ার ঝন্টিপাহাড়ী গ্রামে ছাঁচনপুর এলাকায় লক্ষ্মী মুর্মু স্মৃতি শিশু বিদ্যালয় - ব্লক ছাতনা। ছাঁচনপুর, পাকা রাস্তার নাগালের বাইরে, গুগল বাবাও যার খোঁজ পায়না: যেখানে জেদ আর ভালোবাসা হাত ধরাধরি করে চলে। দুই নারী লক্ষ্মী মুর্মু আর রেবা মুর্মু - তাঁদের অদম্য লড়াই দেখে চমকে উঠেছিলাম। জন্ম থেকেই অকুতোভয় লক্ষ্মী - গ্রামের আর পাঁচটা মেয়ের পথে না চলে গ্রাম থেকে দূরে হাই ইস্কুলে পড়তে গেলেন। পাড়ার মোড়লেরা সেটা ভালো ভাবে নিতে পারেননি। তখন তিনি ষষ্ঠ শ্রেণী - তখন কৈশোর, ইস্কুলের হোস্টেল থেকে ছুটিতে বাড়ি এলেন, আর পাঁচটা শহরে বা গ্রামে ছেলে মেয়েরা যেমন আসে। কিন্তু লক্ষ্মীর গাঁয়ে ব্যাপারটা সহজ হলনা। একদিন সেই লক্ষ্মী মেয়ে ভিডিও শো দেখে ঘরে ফিরছিল দুই বন্ধুর সঙ্গে। কিন্তু নাঃ সুস্থ দেহে ফেরা আর হলনা। উদ্ধার হল সংজ্ঞাহীন দেহ - কি ভাগ্যি প্রাণটুকু কীভাবে যেন টিঁকে গিয়েছিল খাঁচার ভেতর। তবে পরের ঘটনাপ্রবাহও বাঁধা গতে চললোনা। লাগলো অবশ্য বেশ কয়েক বছর - হাল ছেড়ে দেবার জন্য সময়টা যথেষ্ট লম্বা। কিন্তু হাল ছেড়ে দেবার পাত্রী আমাদের লক্ষ্মী মেয়ে ছিলেননা। শেষ পর্যন্ত ষোলো জন অভিযুক্তের দুজন ছিল ফেরার, আর বাকি চোদ্দ জনের বারো বছর জেল হল। তবে এই ফলাফলের মাঝখানে ভয় দেখানো, বাড়ি ছাড়া করা, কাজ থেকে ছাড়িয়ে দেওয়া, একঘরে করা সব চলেছে। শুধু দমানো যায়নি লক্ষ্মী মেয়েকে। পাশে ছিল এক জুনিয়র বান্ধবী রেবা। লক্ষ্মী চলে গেছেন ক্যানসারে। রেবা রয়েছেন তাঁর সব কাজের ভার কাঁধে নিয়ে। দুজনে মিলে তৈরি করেছেন গ্রামে গ্রামে স্বনির্ভর গোষ্ঠী। গ্রামে মাদকের ঠেক বন্ধ করেছেন। গড়ে তুলেছেন ‘ছাচনপুর মহিলা কল্যাণ সমিতি’, মায়েদের বাচ্চা রাখার ক্রেশ। এলাকার লোকেদের বুঝিয়ে তাদের বাচ্ছাদের নিয়ে শুরু করেছেন ইস্কুল। লক্ষ্মীকে চোখে দেখার সৌভাগ্য হলনা। শার্ট প্যান্ট পরা আটপৌরে রেবা মুর্মুকে দেখে আমি তো বাকরুদ্ধ। ছোট খাটো চেহারাটি - অতি সাধারণ সুতীর শার্ট প্যান্টের আড়ালে পেশির শক্তি বোঝা যায়। একেবারে ছোট করে ছাঁটা চুল, মুখের রেখায় জীবনের বহু ঝড় ঝাপটা পেরোনোর মানচিত্র। কিন্তু দু চোখের দৃষ্টিতে যেন করুণার ফল্গুধারা, আর মুখের হাসিতে এক আকাশ সারল্য। অল্প বয়স থেকে মানুষ চরিয়ে খাই। এই রুক্ষ প্রাকৃতিক পরিবেশে এমন অদম্য প্রাণশক্তির দেখা পেয়ে আমি ধন্য হয়েছি।
গিয়ে দেখলাম গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে রোদ্দুরের ঝিলিমিলি। আর সেই পরিবেশে আলাদা আলাদা ইঁটের গাঁথুনির শ্রেণীঘর, যেন এক একটি কুটীর - কাছে গিয়ে দেখি শুধু পিলার আর মেঝে পাকা, মাথায় করোগেটেড ছাউনি, দেয়াল হয়নি পয়সার অভাবে, হয়তো হবে ভবিষ্যতে। কিন্তু সেই পিলারের গায়ে গায়ে বাংলার মনীষীদের ছবি আঁকা। মেঝেতে কচিকাঁচার দল হাসিতে উচ্ছল। নামতা, সহজ পাঠ সব একেবারে ঠোটস্থ। একবার সুইচ টিপে দিলেই ব্যাস - সুর করে তারস্বরে শেষ অবধি তারা বলবেই। ঘন্টা পড়তেই, নিজের নিজের থালা ধুয়ে এনে খেতে বসল সব। খাবার পর আবার নিজের থালা মেজে আনলো। দিকে দিকে বাচ্চারা আর শিক্ষকেরা মিলে নানারকম চাষ আবাদ করেছেন দেখলাম। মাঠে দোলনাও আছে। ইসকুলে লাইব্রেরিও আছে। ছবি দেখলাম, কখনও বন মহোৎসব হচ্ছে, কখনও সাপে কামড়ানোর ব্যাপারে সাবধানতা শেখানো হচ্ছে, হাতের কাজ শিখছে বাচ্চারা। পড়াশোনার সঙ্গে চলেছে জীবন গড়ার পাঠ। সমস্যা হল ২০১৫ থেকে শত চেষ্টা করেও এখনও সরকারি খাতায় ইস্কুলের নাম ওঠেনি। কেউ কখনও খবর পেয়ে সেখানে যান, কিছু সাহায্য দিয়ে আসেন, বই-খাতা, স্কুল ব্যাগ, পেনসিল, কলম, রং তুলি। এভাবেই চলছে। তবে এখানকার বাচ্চাদের মৌলিক চাহিদা হল পোশাক, ব্যাগ ও জুতো, এবং অবশ্যই দুপুরের নিশ্চিত খাবার। ছোটদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য চাই গ্রন্থাগারের জন্য নতুন বই ও নিয়মিত চিকিৎসা পরিষেবা। এর সঙ্গে দরকার অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিঃস্বার্থ সময় ও মমতা। পুরুষ মহিলা মিলে চারজন শিক্ষককে দেখলাম। নামমাত্র সাম্মানিকে কাছে পিঠের গ্রাম থেকে ভালোবাসার টানে আসেন। ইশকুলটা সরকারি হয়ে গেলে শিক্ষকদের মাইনের চাপটা কমে, কিন্তু অন্য আর একটা বিপদও আছে। বাইরে থেকে চাকরির জন্য চাকরির মানসিকতা নিয়ে এখানে লোক এলে মান ধরে রাখা মুশকিল হবে। আজ এখানে তেমন কোনো ব্যবসায়িক স্বার্থ নেই, আছে কেবল মানুষ গড়ার সংকল্প।
তাত্ত্বিক ভূগোলের আলোয় ছাঁচন পুরের এই ইশকুলকে যদি বিচার করি, তবে দেখি এ এক অদ্ভুত বিকল্প ক্ষমতার সমীকরণ। লক্ষ্মী আর রেবা - এঁদেরকে যদি আমি ফেমিনিস্ট বা নারীবাদী ভাবি, তাহলে বলব এঁরা দুজনেই ‘স্পেস’ (Space) বা স্থান এবং ‘পাওয়ার’ (Power) বা ক্ষমতার সমীকরণ যে লিঙ্গভিত্তিক সামাজিক কাঠামোর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, তাকে পুনর্নির্মাণ করেছেন। একটু বুঝিয়ে বলি আমার ভাবনা। আসলে প্রথাগত গ্রামীণ সমাজে ‘স্পেস’ বা স্থান ভাগ করা থাকে। বাড়ির ভেতরটা নারীর, আর বাইরের জগৎ, পঞ্চায়েত, মোড়লতন্ত্র বা হাইস্কুলের পথটি পুরুষের—এই হল অলিখিত নিয়ম। লক্ষ্মী মুর্মু যখন গ্রামের সীমানা পেরিয়ে দূরের হাইস্কুলে পড়তে গেলেন, তখন তিনি আসলে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের তৈরি সেই ‘স্থানিক সীমানা’ (Spatial Boundary) লঙ্ঘন করেছিলেন। মোড়লদের ক্ষোভ কেবল শিক্ষার বিরুদ্ধে ছিল না, ছিল একজন আদিবাসী মেয়ের এই স্থানিক স্বাধীনতা বা 'Spatial Mobility'-র বিরুদ্ধে। সামাজিক কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করলে বিশ্ব জুড়ে এই যে নৃশংস অত্যাচারের প্র্যাকটিস, তা আসলে নারীর শরীরকে একটি ‘রণক্ষেত্র’ (war -territory) বানিয়ে ক্ষমতা প্রদর্শনের পুরুষতান্ত্রিক অপচেষ্টা অথবা বলা যেতে পারে একধরণের ফিয়ারস্কেপ তৈরি করা। যখন গ্রামে এই ঘটনাটি ঘটল, তখন চারপাশের চেনা ভূগোলটাই (যেমন- হাইস্কুলের রাস্তা, জঙ্গল, বিকেলের নির্জন পথ) আদিবাসী মেয়েদের জন্য একটি 'ভীতিপ্রদ স্থান' বা Fearscape-এ পরিণত হলো। ভূগোলবিদ জিল ভ্যালেন্টাইন (Gill Valentine) রেচেল পেইন (Rachel Pain) বা গিলিয়ান রোজের মতো নারীবাদী ভূগোলবিদরা এই বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন - ভূগোলের এই শাখাটির নাম দেওয়া হয়েছে জিওগ্রাফি অফ ফিয়ার। মোড়লতন্ত্র আসলে এই ভয়ের ভূগোলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল যাতে অন্য কোনো মেয়ে আর গ্রামের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বাইরে যাওয়ার সাহস না পায়। সমাজে এই পরিস্থিতিতে ভয় কেবল একটা মানসিক অনুভূতি থাকেনা, ভৌগোলিক ভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। একঘরে করা, কাজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া—এগুলো সবই হলো সামাজিক ও ভৌগোলিক স্পেস থেকে একজন মানুষকে উচ্ছেদ করার প্রক্রিয়া। এতে একজন মানুষকে ইনসাইডার থেকে জোর করে আউটসাইডার বানিয়ে তার আত্মবিশ্বাস ভেঙে ফেলা হয়।
কিন্তু সাজা ঘোষণা এবং ঘরে বাইরে দুরন্ত লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে লক্ষ্মী ও রেবা সেই ভয়ের ভূগোলকে ‘প্রতিরোধের ভূগোল’ (Geography of Resistance)-এ রূপান্তরিত করেছেন। এই আখ্যানের সবচেয়ে জাদুকরী এবং ঐতিহাসিক দিকটি এখানেই। লক্ষ্মী দেবী এবং রেবা দেবী কেবল ভয়ের শিকার হয়ে বেঁচে থাকেননি; তাঁরা সেই ফেনোমেনোলজিক্যাল ট্রমা বা ব্যক্তিগত ভয়ের অভিজ্ঞতাকে একটি সমষ্টিগত সামাজিক স্পেসে (Spatial Resistance) রূপান্তরিত করেছেন। লক্ষ্মী দেবী নিজের শরীরের এবং ব্যক্তিগত অস্তিত্বের সেই গভীর ক্ষত ও ভয়কে এক অদ্ভুত দার্শনিক উত্তরণের মাধ্যমে সবার প্রতি ‘সহমর্মিতা’ বা Empathy-তে রূপান্তর করলেন যা সবাই পারেনা। রেবা দেবীকে সাথে নিয়ে তিনি যখন গ্রামে গ্রামে স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও সেই দেয়ালহীন স্কুলটি গড়লেন, তখন তাঁরা আসলে সেই পুরনো ‘ভয়ের ভূগোল’ বা Fearscape-টিকে মুছে দিলেন। যে পথ দিয়ে হাঁটতে মেয়েরা ভয় পেত, আজ সেই পথ দিয়েই শিশুরা সুর করে নামতা বলতে বলতে স্কুলে যায়। এটাকেই বলে স্থানের পুনর্নির্মাণ বা ‘পাবলিক’ আর ‘প্রাইভেট’ স্পেসকে মিলিয়ে দেওয়া। নারীবাদী ভূগোলের অন্যতম উদ্দেশ্য হল এই দুটো স্পেসের বিভাজন রেখা মুছে ফেলা। রেবা ও লক্ষ্মী যখন গ্রামে গ্রামে স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করলেন এবং ‘ছাঁচনপুর মহিলা কল্যাণ সমিতি’র মাধ্যমে একটি ক্রেশ বা মায়েদের বাচ্চা রাখার জায়গা গড়লেন তখন যে মায়েরা ঘরের কাজের জন্য বাইরে বেরোতে পারতেন না, তাঁরা অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ‘পাবলিক স্পেস’-এ অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেন। গৃহস্থালির শ্রমের বোঝা ভাগ করে নিয়ে তাঁরাও কিছুটা স্থানিক ক্ষমতা (Spatial Empowerment) অর্জন করলেন।
নারীবাদী ভূগোলে বডি স্পেস বা ‘শরীর’ নিজেই একটি ক্ষুদ্রতম ভৌগোলিক স্কেল - সাইট। রেবাকে যেমন দেখলাম - সেই সুতীর আটপৌরে শার্ট-প্যান্ট, ছাঁটা চুল, পোশাকের আড়ালে পেশির শক্তি—তা প্রথাগত ‘নারীসুলভ’ শরীরের ভৌগোলিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। রুক্ষ প্রাকৃতিক পরিবেশের আর প্রতিকূল সমাজের সঙ্গে লড়াই করতে করতে তাঁর শরীর নিজেই একটি প্রতিরোধের প্রতীক বা ‘Site of Resistance’ হয়ে উঠেছে।
হিউম্যানিস্টিক বা মানবিক ভূগোলের সবচেয়ে মৌলিক তত্ত্ব হলো শূন্য স্থান বা ‘Space’ কীভাবে মানুষের আবেগ দিয়ে একটি চেনা জায়গা বা ‘Place’-এ পরিণত হয়। গুগল ম্যাপে কিন্তু ছাঁচনপুরের ওই বিন্দুর কোনো অস্তিত্ব নেই। সেটি গুগল বাবার কাছে একটি নামহীন, অবহেলিত ‘Space’। কিন্তু লক্ষ্মী ও রেবা মুর্মু তাঁদের ভালোবাসা, শ্রম এবং শিশুদের কলকাকলি দিয়ে সেই শূন্যস্থানকে একটি ‘Place’ (স্থান)-এ রূপান্তরিত করেছেন। যে স্বচক্ষে ইশকুলটা দেখেছে তার কাছে জায়গাটা আর শুধু অক্ষাংশ - দ্রাঘিমাংশের হিসেবে আটকে নেই; এটি এখন প্রান্তিক শিশুদের স্বপ্ন, আবেগ আর ভরসার এক ভৌগোলিক ঠিকানা। দার্শনিক ই-ফু-তুয়ানের ভাষা ধার করে বলা যায় ছাঁচনপুরের ইশকুল হল ঐ এলাকার শিশুদের জন্য এক পারফেক্ট টোপোফিলিয়া। ই-ফু তুয়ান বলেছিলেন, মানুষের জন্মের সময় মানচিত্রে কোনো একটি জায়গা কেবলই একটা শূন্য স্থান বা জ্যামিতিক বিন্দু থাকে, যাকে আমরা বলি ‘Space’। কিন্তু মানুষ যখন সেখানে বাস করতে শুরু করে, তার স্মৃতি, অভিজ্ঞতা, আনন্দ এবং কান্নাকে সেই জায়গার সাথে জড়িয়ে ফেলে, তখন সেই জড় ‘Space’ রূপান্তরিত হয় একটি জীবন্ত ‘Place’ বা ‘স্থান’-এ।
এই ‘Place’-এর প্রতি মানুষের মনের ভেতর যে ভালোবাসার ফল্গুধারা বইতে থাকে, তা-ই হলো টোপোফিলিয়া। মানবিক ভূগোলে বলা হয়, টোপোফিলিয়া মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। শিশুরা নিজেরা শিক্ষকদের সাথে মিলে চাষআবাদ করছে, মাঠের দোলনায় খেলছে, সাপের কামড় থেকে বাঁচার বাস্তব পাঠ নিচ্ছে। এর ফলে ওই রুক্ষ প্রকৃতির রুক্ষতাটুকু চলে গিয়ে শিশুদের মনে ওই মাটির প্রতি, ওই বিদ্যালয়-ক্ষেত্রের প্রতি এক গভীর আত্মিক টান বা টোপোফিলিয়া তৈরি হচ্ছে। মানুষ যখন তার চারপাশের পরিবেশকে ভালোবাসতে শেখে (টোপোফিলিয়া), তখন তার মধ্যে এক ধরণের ‘Belongingness’ বা ‘আমি এই জায়গারই একজন’—এই বোধটা জাগে। এই বোধটাই মানুষকে ছদ্ম-হীনম্মন্যতা থেকে বাঁচায়। আমরা সেই জিনিসটাকেই রক্ষা করি, যাকে আমরা ভালোবাসি। ছাঁচনপুরের শিশুরা আজ যেভাবে ওই মাটির টানে, রেবা মুর্মুর স্নেহের টানে সেখানে পড়াশোনা আর জীবন গড়ার পাঠ নিচ্ছে — আশা করা যায় বড় হয়ে তারা ওই অঞ্চলের পরিবেশ ও সমাজকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেবে।
চাকরি জীবনের প্রথম দিকে আমি দেখেছি এমন ছাত্রকে যে সব সময়ে লাস্ট বেঞ্চে মাথা লুকিয়ে বসে থাকতো, কাছে ডাকলেও আসতোনা। কিন্তু মুর্শিদাবাদে ফিল্ডে গিয়ে সে হোটেলের খাটের ছত্রি ধরে ঝুলে ছত্রি ভেঙে ফেলল। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম, সাত চড়ে রা নেই, কিছুতে কোন মতামত নেই - ও খাট ভাঙল? এখন আমি বুঝেছি, সাধারণ স্কুলে ফার্স্ট জেনারেশন লার্নার বলে একটা শিশুর যে অবহেলা জোটে, তা তার আত্ম-মূল্যায়নকে ধ্বংস করে দেয়। সে নিজে নিজেই নিজেকে আউটসাইডার ভেবে নেয়। স্কুল পেরিয়ে কলেজে এই অবদমন আরও বাড়ে, হয়তো সব পড়া আলোচনা বুঝতেও পারেনা, জিজ্ঞেস করতে পারেনা। শ্রেণীকক্ষের চারটে দেওয়ালে এক ধরণের টোপোফোবিয়া তৈরি হয়। এই অবদমন ভেতরে ভেতরে এক জমাটবদ্ধ ক্ষোভ বা 'Aggression'-এ রূপ নেয়। যখনই তারা প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারির বাইরে কোনো মুক্ত বা বিশৃঙ্খল পরিবেশ পায়, তখন সেই অবদমিত শক্তি কোনো ধ্বংসাত্মক কাজের মাধ্যমে নিজের অস্তিত্ব জাহির করে। এ হল অসহায়ত্ব ও ক্ষোভের এক বিকৃত বহিঃপ্রকাশ।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাওয়া আত্মবিশ্বাস মানুষকে কেবল চাকরি পাওয়ার যোগ্য করে না; সেই প্রত্যয় মানুষকে নিজের জীবনের বা সমাজের অন্ধকার অধ্যায়গুলোর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাসিমুখে লড়াই করার এবং বিজয়ী হওয়ার দার্শনিক অস্ত্র দেয়। সাধারণ ইশকুল কলেজে সেই অস্ত্র ছাত্রছাত্রীর হাতে তুলে দেওয়া সব সময়ে সম্ভব হয়না।
শুশুনিয়ার সেই লালমাটির রুক্ষতা, শাল-পিয়ালের জঙ্গল আর তার মাঝখান থেকে উঠে আসা লক্ষ্মী মুর্মু ও রেবা মুর্মুর এই যে রূপকথা-সম লড়াই—তা কেবল একটা স্কুলের গল্প নয়, তা আসলে মানুষের অপরাজেয় চেতনার এক জীবন্ত দলিল। গুগল ম্যাপে যে ছাঁচনপুরকে খুঁজে পাওয়া যায়না, সেই প্রত্যন্ত কোণে বসে এই দুই নারী যা তৈরি করেছেন, তা শুধু ইঁটের দেয়ালহীন কিছু শ্রেণীকক্ষ নয়; তাঁরা আসলে প্রান্তিক শিশুদের জন্য তৈরি করেছেন এক "আত্মবিশ্বাসের অভয়ারণ্য"।