

অলংকরণ: রমিত
আমাদের ছোটবেলায় নিয়ম ছিল পুজোর ছুটির পরে স্কুল খুললে আর নো ফ্যান। মার্চের পনেরো তারিখ অবধি ফ্যানের অ্যানুয়াল লিভ। আর এখন ? গত বছর তো ডিসেম্বর মাসের শেষেও আমার পশ্চিম-মুখী ঘরে ফ্যান চলেছে। আর মার্চ মাস অবধি অপেক্ষা সম্ভবই না, জানুয়ারির শেষেই ফ্যান চলবে কি চলবে না সেই নিয়ে এখন ঘোর দাম্পত্য কলহ শুরু হয়ে যায়।
বিশ্ব জুড়ে উষ্ণায়নের জোয়ার এসেছে। কাজেই আমার রাজ্যই বা আর বাদ পড়ে কেন? জুন মাসের এক রাতে এই লেখাটা যখন লিখতে বসেছি, দেখছি কলকাতার তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি। কিন্তু সে শুধুই থার্মোমিটারের পারদ কতটা উঠেছে তার মাপ। তাই দিয়ে কিন্তু পুরো গল্পটা বোঝা যায় না। বাতাসের তাপমাত্রার সঙ্গে স্থানীয় আর্দ্রতা, বাতাসের গতিবেগ, আকাশে কতটা মেঘ করে আছে বা সূর্যের তাপ সরাসরি শরীরে কতটা পড়ছে – সব কিছু মিলিয়ে নির্ধারিত হয় যে এই পরিবেশে শরীরের তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখতে গেলে শরীরকে কতটা পরিশ্রম করতে হবে। একটি আদর্শ পরিবেশের তাপমাত্রা কত হলে মানবশরীরে সেই একই পরিমাণ তাপীয় চাপ অনুভূত হবে সেটাই মূল হিসেব। আর একেই বলে ফিজিওলজিক্যালি ইক্যুইভ্যালেন্ট টেম্পারেচার বা PET। এই মাপের উপর নির্ভর করে মানুষ কোথাও কেমন থাকবে। এই যেমন এই মুহূর্তে বাতাসের তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি বলে আনন্দ পাওয়ার কিছুই নেই। কারণ এখন “ফিলস লাইক ৩৯ ডিগ্রি” – বেশ “ত্রাহি ত্রাহি” আবহাওয়া।
নিজে গরমে খুব কষ্ট পাই বলেই জানতে ইচ্ছে হয়েছিল, ভবিষ্যতের বাংলায় আমাদের সন্ততিরা কেমন থাকবে? কিছুটা আভাস মিলল সৌরভ বল ও ইংগো কির্খনারের ২০২৩ সালের পেপার থেকে। সৌরভরা কলকাতার জন্য ধরেছেন যে ২৭.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৩৫.৭ ডিগ্রি অবধি স্লাইটলি ওয়ার্ম (সামান্য গরম বলি?), ৩৫.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৪৩.৮৩ ডিগ্রি অবধি ওয়ার্ম (গরম) আর PET ৪৩.৮৩ ডিগ্রি ছাড়ালে সেটা হট (অসহ্য গরম বলি একে?)। ওঁরা বলেছেন যে পশ্চিমবঙ্গের ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ বাড়া মানে PET এর তার প্রভার পড়বে দ্বিগুণ। বিভিন্ন ক্লাইমেট মডেল ধরে ওঁরা হিসেব করেছেন যে বর্তমানের উচ্চমাত্রার গ্রীনহাউস গ্যাস নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে, এই শতাব্দীর শেষভাগে ২০৮০-২০৯৯ সালে শ্রীনিকেতন, আসানসোল, বীরভূম, মালদার মানুষদের বছরে ১০–১২.৫% (অর্থাৎ ৩৬ থেকে ৪৬ দিন) কাটবে অসহ্য গরমে। কলকাতা, দমদম, খড়গপুর, শিলিগুড়ির ক্ষেত্রে এই প্রখর দগ্ধকাল চলবে বছরে ২৩-৩২ দিন। তাঁরা আরও বলেছেন, যে শতাব্দীর শেষে শীতের শেষে ও বসন্তে (জানুয়ারি–এপ্রিল) গড় PET ৫–৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে। এমনকি বিপজ্জনক গ্যাসের নিঃসরণ যদি সবাই মিলে চেষ্টা করে নামিয়েও আনা যায়, তাহলেও জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের PET বাড়বে ২.৪ ডিগ্রি থেকে ৪.৮ ডিগ্রি। মধুর বসন্ত রইবে শুধু কবির কাব্যে। বাস্তব শুধুই দীর্ঘ দগ্ধ দিনের। আর আমাদের শরীরকে ক্রমাগত সহনমাত্রার উপরে টিকে থাকার পরীক্ষা দিতে হবে।
ভবিষ্যৎ নাহয় বাদই দিলাম, বর্তমানের চেহারা কেমন? প্রখর তপন তাপে, আকাশ তৃষায় কাঁপে – শব্দগুচ্ছ এর থেকে ভালভাবে অনুধাবন করার এর থেকে ভাল সময় আর হয় না। গোটা বঙ্গের অবস্থাই ভীতিপ্রদ, কলকাতার অবস্থা যেন আরও বিপজ্জনক। Landsat-8 স্যাটেলাইটের তথ্য ব্যবহার করে কলকাতার ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা মেপেছেন মোহিত কুমার ও স্বাধীনা কোলে। তাঁরা দেখেছেন যে কলকাতার উত্তর-পূর্ব ও মধ্য-পশ্চিম অংশ সবচেয়ে বেশি গরম। কেন্দ্রীয় ও পূর্বাঞ্চল তুলনামূলক ভাবে ঠান্ডা — কারণ সেখানে গাছপালা ও জলাশয় বেশি। তাঁরা জানিয়েছেন যে ২০২৪ সালের মে মাসে কলকাতার ৭-২৯ ও ৩৭-৪৭ নং ওয়ার্ডের ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি ছাড়িয়েছে। নারকেলডাঙ্গা, ট্যাংরা, তিলজলা, মেটিয়াবুরুজ, খিদিরপুর, চিতপুর, কাশিপুরের মতন ঘন জন বসতি পূর্ণ এলাকাগুলোতে তাঁরা হটস্পট চিহ্নিত করেছেন। অয়ন চক্রবর্তী, শুভম লিমায়ে এবং আত্রেয় পাল ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের কলকাতা মেট্রোপলিটান এলাকার ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে ২০১৬ থেকে ২০২৪ এর মধ্যে এই এলাকার সর্বোচ্চ ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৪০.৮১ ডিগ্রি থেকে বেড়ে ৪১.৪৯ ডিগ্রি হয়েছে। মাত্র আট বছরেই এই পার্থক্য হলে, আগামীর ছবিটা ঠিক কেমন? তাঁদের হিসেবে যেখানে NDBI (Normalized Difference Built-up Index) এর মাত্রা বেশি, আর NDVI (Normalized Difference Vegetation Index) ও NDWI (Normalized Difference Water Index) এর মাপ কম, সেখানেই উষ্ণতা বেশি। তৈরি হচ্ছে আরবান হিট আইল্যান্ড। প্রসঙ্গত এটাও অবশ্য বলে রাখা ভাল যে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা আর বাতাসের তাপমাত্রা কিন্ত এক জিনিস না। সাধারণভাবে সিমেন্ট, কংক্রিট বা পীচ বাতাসের তুলনায় তাপ শোষণ করে বেশি, ফলে বেশি গরম হয়ে ওঠে। এলাকায় বায়ু চলাচল ভাল হলে, বা অনেক গাছ পালা বা জলাশয় থাকলে, বাতাস তুলনায় কম গরম হয়। তবে সেসব কিছুই না থাকলে, তখন বাতাসের তাপ মাটির তাপের খুব কাছেই পৌঁছায়। এ অবশ্য কলকাতার বাসিন্দাদের রোজের অভিজ্ঞতা। ইঁট কাঠ বালির কাঠামোর মাঝে একটু সবুজের ও জলের ছায়া থাকলে জীবন যে অনেকটাই সহনীয় হয়, সেটা তাঁরা ভাল ভাবেই জানেন। খালি কথা হল, সকল অর্থনৈতিক স্তরের বাসিন্দাদের কী এই সবুজ বিলাসিতা আছে? আমার বড় হওয়া উত্তর শহরতলীর যে পাড়াতে, সেই পাতি মধ্যবিত্ত এলাকায় আমার যাতায়াতের পথে চোখে কটা বৃক্ষ পড়ত, সে বোধহয় এক হাতের আঙুলেই গোনা যায়।
অবশ্য এই তাপমাত্রা বাড়ার সমস্যা আমরা যারা এসি বাড়িতে বাস করি, এসি গাড়িতে যাতায়াত করি, এসি অফিসে কাজ করি, তাদের ততটা নয়। অন্তত যতক্ষণ বিদ্যুতের বিলের যোগান দিতে পারা যাবে। যে কোন জলবায়ু বিপর্যয়ের মতোই এই চাপ প্রবল ভাবে গিয়ে পড়বে শহরাঞ্চলে মূলতঃ দুই শ্রেণীর মানুষের ঘাড়ে – এক, যারা শীত গ্রীষ্ম বর্ষা সব সময়েই গণপরিষেবা দিতে নিয়োজিত, যেমন পুলিশ বাহিনী আর দুই নিম্নবিত্ত যারা পেটের টানে খোলা আকাশের নীচে কাজ করেন। অবশ্য মোকাবিলা করবেন আরেক দল মানুষ, নিম্নবিত্ত মেয়েরা, যারা বস্তিতে সামান্য জায়গায় জলের অভাব, স্যানিটেশনের অভাব নিয়ে সংসার করেন। ছোট্ট ঘরে, আগুন-তাতে তাদের রোজের কাজ করতে হয়, আবার স্রেফ মেয়ে হওয়ার দরুণ যাঁদের মধ্যে কারোর কারোর ঘরের বাইরে গিয়ে শরীর জুড়ানোর অধিকার থাকে না। বয়স্ক ও শিশুদের যেহেতু শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কম থাকে, তাই তাদের উপর প্রভাব পড়বে আরও বেশি। এছাড়া শহরাঞ্চলের বাইরেও যে দাবদাহ চলছে, আগামী দিনেও চলবে, ওই যে শ্রীনিকেতন, আসানসোল, বীরভূম, মালদার কথা সৌরভেরা তাদের পেপারে বলেছেন, তার প্রভাব পড়বে কৃষিজীবি থেকে শুরু করে সকলের উপরেই। এঁদের সকলকেই শারীরিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে - প্রচণ্ড গরমে পেশিতে টান ধরা থেকে হিট স্ট্রোক অবধি সব কিছুর মোকাবিলা করতে হবে। প্রচণ্ড তাপীয় চাপে কিডনির উপর চাপ পড়বে, হৃদপিন্ডের কার্যক্ষমতা কমবে, ঘুমের মান কমবে। সব মিলিয়ে জীবন যাপন বিঘ্নিত হবে। গোদের উপর বিষফোঁড়া যে নিম্নবিত্তের বা নিম্ন-মধ্যবিত্তের চিকিৎসা করানোর ক্ষমতা থাকবে কতদিন?
দেশের অর্থনীতিতেও কি কোন প্রভাব পড়বে না? Kjellstrom ২০০৯ সালে দেখিয়েছিলেন দিল্লির মে মাসের আবহাওয়ার দুপুরের তীব্র রোদে একজন ভারী কাজ করা শ্রমিকের কর্মক্ষমতা (Work Capacity) কমে মাত্র ২০%-এ দাঁড়ায়। অবশ্যই রাতের বেলা কাজ করা একটা সমাধান, কিন্তু হায় সব কাজকেই যদি রাতের কাজে বদলে দেওয়া যেত!
সব কিছু মিলিয়ে ভবিষ্যৎটা কতটা মধুর হতে যাচ্ছে, সেটাই আসল প্রশ্ন। তবে এই জিনিসটা মোটামুটি নিশ্চিত যে প্রজন্মের জন্ম হবে ২০৬০ সালের পরের পশ্চিমবঙ্গে, তারা হয়ত মিউজিয়ামে গিয়ে খালি লেপ কম্বল দেখবে, আর দাদু-দিদার কাছে গল্প শুনবে যে তারা তাদের ছোটবেলায় ওই সব গায়ে দিয়ে ঘুমাতো। তারা অবাক হয়ে যাবে!
পুনশ্চ – এই অবধি লিখেই ক্ষান্ত দেব ভেবেছিলাম। কিন্তু তারপর মনে হল, শুধুই একটা অন্ধকার ছবি দিয়ে শেষ করব? নাহ যে দেশে সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারক মন্তব্য করেন যে “Show us even a single project in this country where these alleged environmental activists have said that we welcome this project. Country is progressing well, we welcome this project. Everything you drag to the court,” সে দেশে উন্নয়নের নামে জঙ্গল ধ্বংস, জলাভূমি বোজানো ইত্যাদির বিরুদ্ধে কথা বলে লাভ নেই। আর বিশ্বজুড়ে ক্ষতিকর গ্যাসের সার্বিক নিঃসরণ কমানো পুরোটা আমাদের হাতেও না। তাই সমস্যার সমাধান আমাদের আয়ত্বের বাইরে।
সত্যি কথা বলতে কি, ব্যক্তিমানুষ হিসেবেও করার তালিকা খুবই সীমিত। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া জিনিস কেনা বন্ধ করাটা একটা দীর্ঘমেয়াদী যাপন বদলের উপায়। যদিও সে নিয়ে একটা বহুব্যাপী আন্দোলন হয়ে ওঠার পথটাও সহজ না। আমাদের চারপাশের ভোগবাদী সমাজ সেটা সহজে মেনে নেবে কেন? তাছাড়া যেগুলো হাতে থাকে, সেগুলো সংকট নিরসনের না, সংকটে শুশ্রূষার ব্যবস্থা। নিজের বাড়িটিকে পরিবেশবান্ধব হিসেবে তৈরি করা, বাড়িতে-পাড়ায় গাছ লাগানো, বাড়ির ছাদে প্রতিফলক রং (যা রোদ বা তাপ শোষণ না করে ফিরিয়ে দেয়) লাগানো, জলাশয় রক্ষা করতে এগিয়ে যাওয়া – এই সব ছোট ছোট কাজ করা যায়। তবে ব্যক্তির দৌড় আর কতটা! আজকের দিনে শহরের চৌহদ্দিতে বাড়ি করার জমিই দুর্লভ, তার উপর বিকল্প পদ্ধতিতে পরিবেশবান্ধব বাড়ি বানাতে চাইলেও সেটা আম-জনতা পেরে উঠবে না। তার জন্য উপযুক্ত জ্ঞান ভান্ডার, তৈরির মালমসলা, রক্ষণাবেক্ষণের স্কিল সকলের আয়ত্বে নয়। ছোট ছোট বদ্ধকূপের মত দশ ফুট বাই দশ ফুটের দুটি ঘর আর এক চিলতে বারান্দা এই তো এমনকি মধ্যবিত্তেরও বরাদ্দ। সে বারান্দায় লাগানো দেড় খানা পাতাবাহার আর এক খানা বেলি ফুলের গাছ দিয়ে তো আর প্রখর তপনতাপের মোকাবিলা করা যায় না। আর মধ্যবিত্তের এই হাল হলে, নিম্নবিত্তের পক্ষে কি আর তা আদৌ সম্ভব? আর রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিপ্রতীপতার দরুণ পাড়ায় বৃক্ষরোপন বা জলাশয় রক্ষা সত্যিই কতটা বাস্তবে সম্ভব, সে নিয়েও সন্দেহ থাকে।
সত্যিকারের শুশ্রূষা দিতে পারে একমাত্র সরকারই। কলকাতায় কিছু কিছু এলাকায় বনসৃজনের কাজ হচ্ছে বটে, কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা অতি অল্প। আর হটস্পট এলাকাগুলোর তাতে কি আদৌ কোন উপকার হচ্ছে? দরকার তো সমস্যা সমাধানের জন্য মানবিক ও দরদী নগর পরিকল্পনা। এলাকায় এলাকায় বনসৃজন, পুকুর খোঁড়া। তবে জীবিকার চাপে যে দেশে ফুটপাথ অবধি ঢাকা পরে যায়, আর সরকার কাজের মধ্যে কাজ করে পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ, সে দেশে এইসব ভাবনার কোন মানে আছে কি? জায়গায় জায়গায় তাপমাত্রা ৪৫ ডিগ্রি ছুঁয়ে ফেলছে, এখন আশু প্রয়োজন হিট একশন প্ল্যানের। আহমেদাবাদ কিন্তু ২০১৩ সালে হিট একশন প্ল্যান চালু করেছে। লোকের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো, তাপমাত্রা বাড়তে থাকলে লোকদের সতর্ক করা, যারা বাইরে কাজ করেন বা বস্তিবাসী বা অন্যান্য অরক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য সাময়িক ছায়াশীতল জায়গার বন্দোবস্ত করা – এসব এই দেশেই করা গেছে। আমরা পারি না?
অরিন্দম | 119.*.*.* | ০৬ জুন ২০২৬ ০৩:৩৬741040
kk | 2607:*:*:*:*:*:*:* | ০৬ জুন ২০২৬ ০৩:৩৮741041
স্বাতী রায় | ০৬ জুন ২০২৬ ১১:২০741046