

মূল ছবি: লেখিকা
আট বছর আগের কথা। জীবনে প্রথমবার উত্তর আমেরিকায় পা দিতে চলেছি। ভিতরে উত্তেজনার গুরুগুরু রব। মহাদেশটি আমেরিকা হলেও গন্তব্য আমাদের কানাডা।
দিল্লি থেকে চড়ে বসেছি বিমানে। সে পক্ষীরাজ ননস্টপ ষোল ঘন্টা উড়ান শেষে আমাদের নিয়ে গিয়ে ফেলবে কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে। সেখান থেকে দ্বিতীয় এক পক্ষীরাজ পৌঁছে দেবে আমাদের ফাইন্যাল গন্তব্যে।
ভোর ছটায় দুগ্গা দুগ্গা করে দিল্লি থেকে শুরু হলো উড়ান। প্লেনে উঠে জানলার ধারে বসতে না পেলে আকাশে ওড়াই মাটি হয় আমার। ফলে টিকিট কাটার সময় আলাদা পয়সা গুণে জানলার ধারের সিট বাগিয়েছি। সেখানে গুছিয়ে বসে চোখ সেঁটে দিই জানলায়।
প্লেন ছাড়লে কয়েক মিনিটের মধ্যেই দিল্লি দূর অস্ত হয়ে গেল। প্লেন ঢুকে গেল মেঘের রাজ্যে। এইখানে পৌঁছে গেলে বেশিরভাগ মানুষ জানলা থেকে মুখ ফিরিয়ে সামনে রাখা টিভি স্ক্রিনে মন দেয়। আমার উলটোটা হয়। জানলায় মনযোগ তখন আরও বাড়ে আমার। জানলার বাইরের সাদা মেঘের রাজ্যটাকে দেখে মনে হয় রূপকথার দুধসাগর। আর নিজেকে লিটল মারমেইড। হ্যাঁ, পঞ্চাশ পেরিয়েও এই ফ্যান্টাসিটুকু ধরে রাখতে পেরেছি বলে নিজেই নিজের পিঠ চাপড়াই।
পক্ষীরাজ স্বদেশের সীমা পার হলেন উত্তর-পশ্চিম দিকে মুখ করে। তারপর পাকিস্তানকে বাঁদিকে রেখে, আফগানিস্তানের সীমানা ছুঁয়ে, তাজিকস্তান আর কিরিঘিজস্তান নামের ছোট ছোট দুটো দেশকে টপকে পড়লেন তিনি কাজাখস্তানের আকাশে। বলছি বটে, এটা পার হলেন, ওটা টপকালেন, তবে সেসব চোখে দেখে বুঝিনি। টিভির মনিটরে যাত্রাপথের ম্যাপ খুলে রেখেছি বলে জানতে পারছি।
ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকলে দুধসমুদ্র একসময় হাপিস হয়ে যায়। চারদিকে তখন শুধুই নির্মেঘ আকাশ আর মহাশূণ্যের গাঢ় নীলিমা। নিচে তাকালে পঁয়ত্রিশ চল্লিশ হাজার ফুট নিচে পৃথিবীর বহুবর্ণ পৃষ্ঠপট। আমাদের যাত্রার দিনে দেখার ভাগ্য বড় ভালো ছিল। নিচে তাকিয়ে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম ‘পৃথিবীর ছাদ’ পামিরকে। আকাশ থেকে পামির গ্রন্থিকে এমন স্পষ্ট দেখতে পাওয়া এক লাইফটাইম অভিজ্ঞতা। তবে সে দৃশ্যের বর্ণনা করে এখন ফোকাস-চ্যুত হতে চাই না। আজ অন্য এক জিনিসের কথা বলতে এসেছি।
কাজাখস্তান বড় দেশ, আয়তনে ভারতেরই মতো। তাকেও দু-আড়াই ঘন্টায় পার হয়ে পক্ষীরাজ এবার চললেন সাইবেরিয়ার ওপর দিয়ে। কখনো না গিয়েও সাইবেরিয়া বড় চেনা জায়গা আমার। আমাদের ছেলেবেলায় সোভিয়েত দেশের (আজকের রাশিয়া) নানান বই আর পত্রিকার অনুবাদ কী করে যেন অঢেল হাতে আসত আমাদের। দামে সস্তা, অথচ ছবিতে-লেখাতে অসাধারণ সেই সব বইয়ের কল্যাণে সাইবেরিয়া বড্ড পরিচিত হয়ে গেছিল আমার। সেই সাইবেরিয়ার ওপর দিয়ে উড়ে চলেছি ভেবে ওই বয়সেও গায়ে কাঁটা দিয়েছিল।
একসময় সাইবেরিয়াকেও পার হয়ে পক্ষীরাজ, পা দিলেন আর্কটিক সার্কল বা উত্তর মেরুবৃত্তে। নিচে তখন আর্কটিক ওশান বা সুমেরু সাগর। যাত্রা শুরুর পর আট-দশ ঘন্টা কেটে গেছে তখন। এই সময়েই দেখা পেয়েছিলাম সেই আল্পনার, যার কথা আজ বলতে বসেছি।
সুমেরু সাগর যখন পার হচ্ছি তখন চারিদিকে ‘চোখ যায় যদ্দূর, সোনা সোনা রোদ্দুর...’। নাহ, একটু ভুল হল, আসলে রুপো রুপো রোদ্দুর। ঝকঝকে নীলাকাশ থেকে ঠিকরে আসা রজতবর্ণ আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে চরাচর। বিমানের ডবল কাচের জানলা চুইয়ে সে আলোর বন্যা ঢুকে যাচ্ছে বিমানের অন্তঃস্থলেও, যেখানে তখন সুষুপ্তির রাজ্য। সেই রাজ্যে আলো এক উপদ্রব। লম্বা ফ্লাইটের যাত্রীরা সাধারণত বিমানযাত্রার সময়টুকুর সদব্যবহার করে নেন নিদ্রা দিয়ে। যাদের নিতান্ত ঘুম আসে না তারা চোখের ওপর ‘আই মাস্ক’টি বেঁধে কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করার পর ‘ধুত্তোরি’ বলে উঠে পড়ে নিজস্ব টিভি মনিটরটি খুলে বসে। সেখানে বেড়ে রাখা থাকে পঞ্চাশ ব্যঞ্জনের সম্ভার। তার কোনও একটাকে ধরে ‘খেতে’ থাকলেই কেটে যায় সময়।
বাইরের তীব্র আলোর বন্যা যাত্রীদের সুষুপ্তির ব্যাঘাত ঘটায় বলে জানলার শাটার ফেলে রাখে সকলে। কিছু কিছু ‘হাইফান্ডা’র প্লেনে শাটারের বদলে জানলার নীচে থাকে একটা বোতাম, যেটাকে টিপে কাচটাকে প্রয়োজন মত হালকা থেকে গাঢ় নীল করে নেওয়া যায়। এতে করে বাইরেটা খানিকটা দেখাও যায় আবার বিমানে বেশি আলো ঢুকে পড়াটাও আটকানো যায়।
কিন্তু আমার মত একজন ‘অকেশনাল ফ্লায়ার’, দুচোখে যার সর্বগ্রাসী খিদে, তার অমন ‘কম্প্রোমাইজড দেখা’য় চলবে কেন? যেটার যে রঙ তাকে সেই রঙেই তো দেখতে হবে আমাকে। অতএব জানলার কাচ নীল করি না আমি। বিমানবালারা বার তিনেক এসে ‘অনুরোধ’ করে নীল করে দিয়ে যায় জানলা। কিন্তু নীল কাচের মধ্যে দিয়ে বাইরেটা দেখে সুখ হচ্ছে না বলে প্রতিবারই আমি কাচের রঙ ফের সাদা করে দিই। মনে মনে ঘুমন্ত লোকগুলোকে বলি, আর কত ঘুমুবি বাপু? ওঠ না এবার। মাটিতে থাকলে এখন তো কাজের জায়গায় নাকে দড়ি দিয়ে দৌড়তিস।
বারকয়েক বিমানবালাদের সঙ্গে জানলা নীল সাদা করার লুকোচুরি খেলার পর দেখি আমার জানলা আর সাদা হচ্ছে না। বুঝলাম মুখের কথায় কাজ হচ্ছে না দেখে এবার তাঁরা অন্যভাবে টাইট দিলেন আমায়। এ জিনিস কন্ট্রোল করার একটা মাস্টার সুইচ নিশ্চয় আছে তাদের কাছে, সেখানেই কলকাঠিটি নেড়েছেন তাঁরা। অতএব উপায়ান্তর না দেখে নীল জানলা নিয়েই অগত্যা খুশি থাকতে হয় আমার দুখী মনুয়াকে।
বিমানবালাদের দোষ দিই না আমি। সবাই চায় নিজের কাজ কমাতে। লোকে পড়ে পড়ে ঘুমুলে ‘চা খাব, জল খাব’ বলে জ্বালায় কম। অতএব আমার মত একটি দুষ্টু মধ্যবয়সিনীকে ঢিট করার জন্য ওটুকু ভদ্র চেষ্টা তারা করবেই।
নীলকাচ সাদাকাচ নিয়ে এত ব্যাখ্যান কেন দিতে গেলাম, এবার সেই কথায় আসি।
বিমানবালাদের প্যাঁচে পড়ে নীল কাচের মধ্যে দিয়েই বাইরেটা দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখি নিচে পৃথিবীর বুকে বিরাট এক আলপনা! নিচে তো সমুদ্র, সেখানে আলপনা দেবে কে! চশমার কাচ মুছে টুছে আবার দেখি। নাঃ, আলপনাই তো বটে!
কাকে শুধোই? সঙ্গীটিকেই ঠেলে তুলি। তারপর দুজনে মিলে অনেকক্ষণ ধরে দেখি, তারপর বুঝি ওগুলো আলপনা নয়, ওগুলো বরফ। সমুদ্রে ভাসমান বরফ। গাঢ় নীল সাগরজলে ভাসছে সাদা সাদা বরফের ডেলা। হয়ত স্রোতের কারণে কিংবা বাতাসের প্রভাবে অথবা ওদের মধ্যে দিয়ে চলে যাওয়া জাহাজের কারণে সমুদ্রে তৈরি হয়েছে ওইসব ‘আলপনা’।
ওই আলপনার শোভা দেখতে গিয়ে, আর জিনিসটা কী বুঝতে গিয়ে এমন একাগ্র ছিলাম যে ছবি তোলার কথাটাই মাথায় খেলল না। অবশেষে যখন খেলল, তখন নীল কাচের জানলার ওপর হুমড়ি খেয়ে যতটুকু পারলাম ছবি তুললাম ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে বহু ভাল ভাল আলপনা পেছনে ফেলে চলে এসেছি।
এইবার ওই ভাসমান বরফ, যাকে অভিহিত করা হয় ‘সী আইস’ নামে, তার বিষয়ে কয়েকটি কথা।
অবস্থানগত বিশিষ্টতার জন্য সুমেরু সাগর বছরের অনেকটা সময় বরফের ‘সরে’ ঢাকা থাকে। বরফের সেই সরই হল - সী আইস। এ সরের বেধ সাধারণত দু থেকে চার মিটার হয়ে থাকে। সুমেরুতে যখন ‘সামার’, অর্থাৎ জুন থেকে সেপ্টেম্বর, তখন সী আইস একটু একটু করে গলে গিয়ে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। সেই ভাঙা টুকরোগুলো ভেলার মত ভাসতে থাকে সমুদ্রে। ভাসমান এই সী আইস কিন্তু আইসবার্গ নয়। আইসবার্গ বা হিমশৈল সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস।
মেরুপ্রদেশে জমে থাকা বরফের পাহাড় থেকে একটা চাঙড় কোনও কারণে ভেঙে সাগরের জলে ভাসতে থাকলে সেটা আইসবার্গ। আইসবার্গের খুব কম অংশ সমুদ্রের ওপর জেগে থাকে, বেশিরভাগটাই ডুবে থাকে সমুদ্রের নিচে। এই কারণেই বহু প্রচলিত প্রবাদবাক্যটির জন্ম, ‘এ আর কী দেখছ? এ তো জাস্ট ‘টিপ অব দা আইসবার্গ’’। অর্থাৎ বিপদের খুব অল্পই দেখতে পাচ্ছ, আসল বিপদ আরও অনেক বেশি ইত্যাদি। টাইটানিক ফিল্মের দৌলতে আইসবার্গ আজ আমাদের খুব চেনা নাম, কিন্তু সী আইস ততটা নয়।
সী আইস সুমেরু সাগর বাস্তুতন্ত্রের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের এই বরফ আস্তরণ আসলে একটা আয়নার মত। সে আয়না খুব বড় একটা কাজ করে। সূর্যের তাপকে সে প্রতিফলিত করে ফেরত পাঠিয়ে দেয় মহাশূণ্যে। ফলে সুমেরুসাগরের জল ততটা তেতে উঠতে পারে না, যতটা সে তেতে উঠত এই তাপ সেজাসুজি সাগরের জলে পড়লে। তাছাড়া গরমকালে এগুলো যখন ভেঙে ভেঙে ভাসতে থাকে কিংবা গলে সমুদ্রে মিশতে থাকে তখন সমুদ্র স্রোতের নিয়ন্ত্রণেও এর ব্যাপক হাত থাকে। ভূমিকা থাকে মেরু ভল্লুক, সীল মাছ, ওয়ালরাসদের মতো প্রাণীদের জীবনযাত্রা স্বাভাবিক রাখার ব্যাপারেও। এই ভাসমান বরফের তলায় একধরণের শ্যাওলা জন্মায়, যা এই বাস্তুতন্ত্রের আর এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কিন্তু সেই সী আইসে এখন ঘুণ ধরেছে। তার কারণ, বহুশ্রুত আর ‘ক্লিশে’ হয়ে যাওয়া এক শব্দবন্ধ - ‘বিশ্ব উষ্ণায়ন’। এই শব্দবন্ধ কারও কাছে আজ আর অচেনা নয়, বরং অতি ব্যবহারে জীর্ণ। যত ধারালোই হোক, হাজার ব্যবহারে যে কোনও জিনিসের ধার কমে। এই শব্দেরও হয়েছে সেই দশা। শুনে শুনে কানে এমন ঘ্যাঁটা পড়ে গেছে যে বুকে আর ধাক্কা মারে না। কিন্তু বুকে ধাক্কা মারুক বা না মারুক, বিপর্যয় যা ঘটার তা ঘটেই চলেছে নীরবে নিভৃতে। বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে সুমেরু মহাসাগরের সী আইসের পরিমান শুধু যে কমে চলেছে তা নয়, তৈরিও তা কম হচ্ছে। শীতকালে যেটুকু তৈরি হচ্ছে গরমে তা সম্পূর্ণ গলে যাচ্ছে। ফলে ‘মাল্টিলেয়ার’ বরফ সর তৈরি হওয়ার অবকাশ পাচ্ছে না। স্যাটেলাইট প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে যখন থেকে সুমেরু সাগর ও মেরু অঞ্চলগুলোর বরফের ওপর নজর রাখা শুরু হয়েছে, (গত শতাব্দীর সাতের দশক থেকে) তার ভিত্তিতে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ২০১৬-২০২৬ এর দশকটিতে সী আইস তৈরি হয়েছে সবথেকে কম। সী আইসের ঢাল সরে যাওয়ায় ক্রমাগত উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হয়ে উঠছে মেরু সাগরগুলো। ফলে মেরুপ্রকৃতির হাল আজ অত্যন্ত বিপজ্জনক। বরফ ক্ষয়জনিত এই বিপর্যয় শুধুমাত্র মেরু অঞ্চলে আটকে থাকবে, একথা ভাবলে খুব ভুল করা হবে। এর ফল ভোগ করবে সমস্ত বিশ্ব।
তাই এ বড় সুখের সময় নয়। ভয়ঙ্কর এ ভবিতব্য আটকানোও সহজ কাজ নয়। যাঁরা চেষ্টা করলে এ বিপর্যয় তবু খানিকটা কমাতে পারতেন, অর্থাৎ যাঁদের হাতে এই মুহূর্তে পৃথিবীর রাশ, তাঁরা কেউ এখনও নড়েচড়ে বসছেন না। কেন বসছেন না সে উত্তর খুঁজতে বসলে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোবার সম্ভাবনা। অতএব ও প্রসঙ্গ থাক। রাজনীতিকদের মাথা ঘামানোর বিষয়ের তালিকায় ‘পরিবেশ’ সবসময়েই যে একেবারে শেষের সারিতে থাকে এটা বুঝতে বুদ্ধিমান হতে হয় না। গ্রেটা থুনবার্গেরাই কেবল গলা ফাটিয়ে মরে।
জানি না আজ আবার যদি পক্ষীরাজের পিঠে চেপে জুন মাসে সুমেরুসাগর পেরোতে যাই, সমুদ্রের বুকের সেই চোখজুড়োনো আলপনা আবার চোখে পড়বে কিনা, কিংবা পড়লে কতটা পড়বে।



স্বাতী রায় | ০৫ জুন ২০২৬ ২১:১৩741032
kk | 2607:*:*:*:*:*:*:* | ০৫ জুন ২০২৬ ২২:১০741036
dc | 2402:*:*:*:*:*:*:* | ০৫ জুন ২০২৬ ২৩:১৬741038
dc | 2402:*:*:*:*:*:*:* | ০৫ জুন ২০২৬ ২৩:২০741039