পরিবর্তনের জোয়ার : শাসকের কালো হাতলেখক : শংকর হালদার শৈলবালা
রচনাকাল : ৩১ মে, ২০২৬
হুগলি জেলার অঞ্চলের এক শান্ত, নিভৃত গ্রাম কান্তপুর। গ্রামটির বুক চিরে পিচঢালা মস্ত বড় প্রধান সড়কটি সোজা চলে গিয়েছে মহকুমা শহরের দিকে। এই সড়কের ধারেই নিজের পৈতৃক ভিটের একফালি জমিতে গত দুই বছর ধরে একটু একটু করে ইট-বালি জমিয়ে নিজের স্বপ্নের বাড়িটি তুলছিল শৈলেন্দ্রনাথ হালদার। রাজ্য সরকারি দপ্তরের অবসরপ্রাপ্ত এক সামান্য কেরানি সে। চাকুরিজীবনের শেষলগ্নে প্রভিডেন্ট ফান্ড আর গ্র্যাচুইটির যেটুকু সঞ্চয় অবশিষ্ট ছিল, তার শেষবিন্দুটি ঢেলে দিয়ে এই শেষ বয়সে মাথার ওপর একটু পাকা ছাদ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিল। আজ মে মাসের তপ্ত দুপুরে রাজমিস্ত্রি ভুবন যখন বাড়ির শেষলগ্নের সীমানা প্রাচীর বা বাউন্ডারি ওয়ালের জন্য সুতো ধরে ইটের গাঁথনি তুলছিল, ঠিক তখনই যেন এক কালবৈশাখীর কালো মেঘ ঘনিয়ে এল শৈলেন্দ্রের জীবনে।
ঠিক এই সময়েই সমগ্র বঙ্গ রাজ্যের রাজনৈতিক আকাশে বইছে এক বিশাল ওলটপালটের হাওয়া, চারদিকে শুধু এক বহুল প্রচারিত ‘পরিবর্তনের ঢেউ’। দূর রাজধানীতে বসে থাকা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কাঁচঘেরা ঘরের নরম সোফায় হেলান দিয়ে, চড়া মেকআপে ঢাকা বড় বড় নেত্রী ও স্থানীয় প্রথম সারির এলিট রাজনৈতিক ব্যক্তিগণ টেলিভিশনের পর্দার সামনে এসে হাত নেড়ে বড় বড় মুখে বলেন— "আমাদের এই নতুন জমানায় রাজ্যে সম্পূর্ণ শান্তি বজায় রাখা হবে। সাধারণ মানুষের ওপর কোনো জুলুম বা অশান্তি আমরা বরদাস্ত করব না।" কিন্তু ক্ষমতার সেই ওপরতলার তথাকথিত ‘শীতল রাজনীতি’ আর এসি ঘরের চটকদার প্রতিশ্রুতির সাথে গ্রামীণ প্রান্তিকের এই তপ্ত দুপুরের রূঢ় বাস্তবতার আকাশ-পাতাল তফাত। বাস্তবে গ্রামীণ স্তরে সাধারণ মানুষের কপালে জোটে এক উষ্ণ, নির্মম ও ক্ষমতার দাপটমাখা নৈরাজ্যের রাস্তা।
ইট গাঁথার খটখট শব্দের মাঝে শৈলেন্দ্র কপালে হাত দিয়ে চশমাটা ঠিক করতে করতে ভুবন মিস্ত্রিকে বলল— "হ্যাঁ রে ভুবন, পাঁচিলটা যেন একেবারে সোজা হয়। রাস্তার ধারের জমি তো, একটুও যেন এদিক-ওদিক না হয়। বেশি বাইরে চলে গেলে আবার সরকারি পি.ডব্লিউ.ডি (P.W.D) দপ্তরের লোক এসে ঝামেলা করতে পারে।"
ভুবন মিস্ত্রি হাতে ওলন্দা দড়িটা দোলাতে দোলাতে একগাল হেসে উত্তর দিল— "আপনি কোনো চিন্তা করবেন না হালদারবাবু। এই ভুবন মিস্ত্রি তিরিশ বছর ধরে গাঁথনির কাজ করছে। তবে হ্যাঁ, রাস্তার ধার বলে কথা, এই পরিবর্তনের বাজারে নতুন নতুন চুনোপুঁটি নেতাদের চোখ বড় ত্যাড়ছা বাবু। আইন কানুনের ভয় দেখিয়ে কখন যে কে এসে বাগড়া দেবে, তা বলা বড় কঠিন!"
ভুবনের এই কথার রেশ কাটতে না কাটতেই প্রধান সড়কের মোড় থেকে একটা তীব্র মোটরবাইকের হর্নের আওয়াজ শোনা গেল। ধুলো উড়িয়ে তিনটি দামি বাইক এসে সজোরে ব্রেক কষল শৈলেন্দ্রের নির্মীয়মাণ পাঁচিলের ঠিক সামনে। বাইক থেকে নেমে এল কয়েকজন যুবক, যাদের চোখে কালো চশমা আর পরনে এই তপ্ত রোদেও দামি কুর্তা। তাদের চোখে-মুখে এক অদ্ভুত ক্ষমতার অহংকার। গ্রামীণ স্তরের এই উষ্ণ শাসনের আগ্রাসী রূপ দেখে শৈলেন্দ্রের বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল।
আসলে ভুবন মিস্ত্রির আশঙ্কাই সত্যি হতে চলেছিল। শৈলেন্দ্রনাথ বাবু সরকারি চাকরি করলেও, নিজের শেষ বয়সের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুকে একটু বড় করার লোভে অসাবধানতাবশত হোক কিংবা মনে মনে কিছুটা ইচ্ছাকৃতভাবেই হোক—প্রধান সড়কের পি.ডব্লিউ.ডি-র (P.W.D) সরকারি খাস জায়গার প্রায় তিন-চার ফুট নিজের বাউন্ডারির মধ্যে ঢুকিয়ে পাঁচিলটা তুলছিলেন। ভেবেছিলেন মফস্বলের এই প্রত্যন্ত প্রান্তে কে আর মাপজোখ করতে আসছে! কিন্তু সরকারি আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ইটের ওপর ইট গেঁথে যখন পাঁচিলটা তরতরিয়ে উঠছিল, ঠিক তখনই সেখানে বাইকের গর্জন তুলে ঝড়ের বেগে উপস্থিত হলো এলাকার সেই যুবকেরা। এরা আর কেউ নয়, বঙ্গ রাজ্যের পরিবর্তনের নতুন জোয়ারে সদ্য বিপুল ভোটে জয়ী শাসকদলের কয়েকজন প্রভাবশালী গ্রাম্য নেতা ও তাদের অনুগামী দলবল।
বাইক থেকে নেমেই দলের মেজোজী তথা স্থানীয় নেতা বলাই মন্ডল একমুখ পান চিবোতে চিবোতে মিস্ত্রিদের দিকে তাকিয়ে চড়া গলায় চিৎকার করে উঠল— "এই! হাত নামা! কাজ বন্ধ কর বলছি! কার হুকুমে এখানে সরকারি জায়গা দখল করে রাজপ্রাসাদ বানানো হচ্ছে, শুনি?"
বলাইয়ের হুঙ্কারে ভুবন মিস্ত্রি হাতের কর্নিকটা খসিয়ে নামিয়ে রাখল। শৈলেন্দ্রবাবু বুক ঢিপঢিপানি চেপে ধরে আমতা আমতা করে এগিয়ে এলেন— "কী হয়েছে বলাই ভাই? অমন চেঁচাচ্ছ কেন? আমি তো আমার নিজের জমিতেই পাঁচিল দিচ্ছি..."
"নিজের জমি মানে? ইয়ার্কি মারার জায়গা পাওনি হালদারবাবু?" এবার খেঁকিয়ে উঠল বলাইয়ের ডানহাত বলে পরিচিত ছোকরা কার্তিক। সে পকেট থেকে একটা খেরো খাতা বের করে ইটের দেওয়ালে চড় মেরে বলল— "নকশা বলছে এটা পি.ডব্লিউ.ডি-র মেইন রোড। তুমি গায়ের জোরে সরকারি রাস্তা তিন ফুট চেপে দিয়েছ। পরিবর্তনের জমানায় এসব বেআইনি দাদাগিরি আর চলবে না। কাজ এক্ষুনি বন্ধ, না হলে এই গাঁথনি আমরা হাত দিয়ে ধাক্কা মেরে ফেলে দেব!"
শৈলেন্দ্রবাবু হাতজোড় করে বোঝানোর চেষ্টা করলেন— "দেখো বাপু, ভুলত্রুটি মানুষ মাত্রেরই হয়। আমি একজন সামান্য রিটায়ার্ড সরকারি কর্মচারী। একটু না হয় এদিক-ওদিক..."
"আইন সবার জন্য সমান, হালদারবাবু!" বলাই মন্ডল গাম্ভীর্য দেখিয়ে পানের পিক ফেলে বলল— "আমাদের ওপরে বড় বড় নেত্রীদের নির্দেশ আছে—রাজ্যে কোনো দুর্নীতি বা অবৈধ দখলদারি বরদাস্ত করা হবে না। আপনার মতো শিক্ষিত মানুষ যদি আইনকে বুড়ো আঙুল দেখায়, তবে সাধারণ মানুষ কী শিখবে? কার্তিক, পঞ্চায়েত প্রধানকে ফোন লাগা তো, সরকারি জমি উদ্ধারের নোটিশ পাঠাতে বল!"
আইন, আদালত আর নোটিশের ভয় দেখিয়ে মুহূর্তের মধ্যে শৈলেন্দ্রের সাথে সেই গ্রাম্য নেতাদের তুমুল তর্ক-বিতর্ক ও বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়ে গেল। চারপাশের হট্টগোল আর নেতাদের চড়া গলা ও হুমকির মুখে শৈলেন্দ্রের সারাজীবনের উপার্জনে গড়া স্বপ্নের দেওয়ালে যেন আইনি ফাটল ধরার উপক্রম হলো। রাজমিস্ত্রি আর জোগাড়েরা ভয়ে একপাশে জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
বেশ কিছুক্ষণ ধরে এই চিলচিৎকার, চোখ রাঙানি আর আইনি ভয় দেখানোর নাটক চলার পর, আশপাশের দু-চারজন গ্রামবাসী যখন ভিড় জমাতে শুরু করল, তখন পরিবেশটা একটু থিতিয়ে আনার জন্য বলাই মন্ডল নিজেই উদ্যোগী হলো। সে কার্তিককে চোখ দিয়ে ইশারা করে ভিড়টা সরাতে বলল। তারপর মুখে এক কৃত্রিম সৌজন্যের অমায়িক হাসি ফুটিয়ে শৈলেন্দ্রের কাঁধে একটা ভারী হাত রাখল। সেই হাতের স্পর্শে কোনো আন্তরিকতা ছিল না, ছিল এক ঠান্ডা চক্রান্তের চাপ। বলাই অত্যন্ত চতুর ভঙ্গিতে শৈলেন্দ্রকে বলল— "আসুন হালদারবাবু, রোদের মধ্যে বুড়ো মানুষ অমন হাঁপিয়ে উঠছেন কেন? ওদিকে আমগাছের ছায়াটায় গিয়ে একটু ঠাণ্ডা মাথায় কথা বলি।" এই বলে সে শৈলেন্দ্রকে বাকিদের চোখের আড়ালে, পাঁচিলের পেছনের একটা নির্জন ও নিভৃত জায়গায় ডেকে নিয়ে গেল।
আমগাছের সুশীতল ছায়ায় এসে দাঁড়াতেই বলাই মন্ডলের এতক্ষণের সেই কড়া আইনি রূপ আর সততার মুখোশটা যেন এক নিমেষে খসে পড়ল। চারপাশের তপ্ত রোদের মাঝে সেই ছায়াটুকুতে জায়গা করে নিল এক কুৎসিত, অন্ধকার আপসের চক্রান্ত। বলাই পকেট থেকে একটা রুমাল বের করে ঘাড়ের ঘামটা মুছল, তারপর চতুর শিয়ালের মতো চারিদিকে একবার সতর্ক চোখ বুলিয়ে নিশ্চিত হয়ে নিল যে কাছাকাছি কোনো গ্রামবাসী বা বাইরের লোক দাঁড়িয়ে নেই তো
!
এরপর সে শৈলেন্দ্রের আরও একটু গা ঘেঁষে এল। তার গলার চড়া সুর এক ধাক্কায় নেমে গেল একদম খাদ স্তরে। অত্যন্ত নিচু, ফিসফিসানি অথচ এক চরম শাসানির স্বরে শৈলেন্দ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল— "দেখো শৈলেন্দ্রবাবু, আমরা হলাম গিয়ে এই মাটির লোক। আইন দেখালে তো তোমার এই পুরো বাউন্ডারি ওয়াল আজই আমাদের ছেলেরা হাতুড়ি মেরে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে পারে। উপরতলার নির্দেশ তো জানোই—সরকারি জমি উচ্ছেদ! পুলিশ-প্রশাসন ডাকলে বুড়ো বয়সে কোর্ট-কাছারি করে জান কয়লা হয়ে যাবে।"
শৈলেন্দ্রবাবুর কপাল বেয়ে তখন ভয়ের ঠান্ডা ঘাম ঝরছে। সে কাঁপানো গলায় বলল— "বলাই ভাই, আমি তো ইচ্ছা করে করিনি। এখন এই দেওয়াল ভাঙতে গেলে তো আমার হাজার হাজার টাকার ইট-বালি সব নষ্ট হয়ে যাবে। রাজমিস্ত্রিদের মজুরিটাও জলে যাবে। দয়া করে একটা উপায় বলো না!"
বলাই মন্ডল তখন ঠোঁটের কোণে এক কুটিল হাসি ফুটিয়ে শৈলেন্দ্রের পিঠ চাপড়ে দিল। বলল— "আরে তুমি হলে গিয়ে আমাদের গ্রামের মানী লোক, রিটায়ার্ড অফিসার। আমরা থাকতে তোমার এতটা ক্ষতি চোখের সামনে হতে দেব নাকি? আমরা কি আর অত নিষ্ঠুর? তবে কি জানো হালদারবাবু, দল চালাতে গেলে ছেলেদের একটু চা-মিষ্টি খাওয়ার খরচ তো দিতে হয়। তাই বলছি, আইনি ঝামেলা এড়িয়ে যদি শান্তিতে ঘর তুলতে চাও, তবে একটা ছোটখাটো রফা করতে হবে। বেশি কিছু নয়, আমাদের ছেলেদের হাতে নগদ দশ হাজার টাকা তুলে দিতে হবে।"
"দশ হাজার টাকা!" শৈলেন্দ্রবাবু যেন আকাশ থেকে পড়লেন। তিনি চোখ বড় বড় করে বললেন— "বলাই ভাই, এই সামান্য কয়েক ফুট জায়গার জন্য এতগুলো টাকা? আমি পেনশনের সামান্য কটা টাকায় এই শেষ বয়সে হাত দিয়েছি। এত টাকা আমি হুট করে কোথায় পাবো?"
বলাইয়ের মুখের সেই কৃত্রিম সৌজন্যের ভাবটা এবার কর্পূরের মতো উড়ে গেল। তার চোখ দুটো আবার সরীসৃপের মতো ঠান্ডা ও ক্রূর হয়ে উঠল। সে শৈলেন্দ্রের বুকের খুব কাছে নিজের তর্জনী আঙুলটা উঁচিয়ে শাসানোর ভঙ্গিতে বলল— "দেখো হালদারবাবু, গলার আওয়াজটা একটু নামাও। পরিষ্কার কথা শুনে নাও—যদি এই দশ হাজার টাকাটা আজ সন্ধ্যার মধ্যে আমাদের হাত অব্দি না পৌঁছায়, তবে পি.ডব্লিউ.ডি-র জায়গায় এক ইঞ্চিও প্রাচীর আমরা তুলতে দেব না। কাল সকালেই সরকারি বুলডোজার এনে দেওয়াল গুঁড়িয়ে দেব। আর যদি টাকাটা দিয়ে দাও, তবে আমি বলাই মন্ডল কথা দিচ্ছি—সরকারি আমিন বা পি.ডব্লিউ.ডি-র বড়বাবু, কেউ কোনোদিন এই রাস্তার দিকে চোখ তুলে তাকাবে না। এবার লাভ-ক্ষতির হিসেবটা তোমার নিজের শিক্ষিত মাথায় করে নাও।"
বলাইয়ের এই ঠান্ডা হুমকির সামনে শৈলেন্দ্রবাবু কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। ক্ষমতার এই গ্রামীণ অলিগলিতে আইনের নামে কীভাবে এক কুৎসিত তোলাবাজির জাল পাতা থাকে, তা ভেবে তার সমস্ত শরীর এক গভীর অপমানে ও নিরুপায়তায় রি রি করে উঠল।
আমগাছের সেই নিভৃত ছায়া থেকে যখন শৈলেন্দ্রবাবু রোদের মধ্যে ফিরে এলেন, তখন তার পা দুটো যেন আর চলছিল না। বলাই মন্ডল আর তার সাঙ্গোপাঙ্গদের এই নগ্ন তোলাবাজি, আইনি ভয় আর ক্ষমতার নগ্ন দাপটের সামনে এই মফস্বল গ্রামের বুকে একাকী, নিঃসঙ্গ শৈলেন্দ্রর আর কিছুই করার ছিল না। তিনি খুব ভালো করেই বুঝতে পারলেন, এই দলদাস গ্রামীণ চক্রে পড়ে যদি তিনি এখন সততা আর প্রতিবাদের রাস্তায় হাঁটতে যান, তবে আইনি জটিলতার বেড়াজালে পড়ে তার সারাজীবনের উপার্জনে গড়া এই সাধের স্বপ্নের বাড়িটাই হয়তো একদিন মাটির সাথে মিশে যাবে। ক্ষমতার এই দানবীয় চাকার নিচে পিষে যাওয়ার চেয়ে মাথা নিচু করে মেনে নেওয়াই যেন এই জমানার অলিখিত নিয়ম।
শৈলেন্দ্রবাবু ধীর পায়ে তার পুরোনো ঘরের ভেতরে গেলেন। আলমারি খুলে কাঁপা কাঁপা হাতে বের করে আনলেন জরুরি খরচের জন্য রাখা দশটি এক হাজার টাকার মচমচে নোট। এক বুক তীব্র ক্ষোভ, আত্মগ্লানি আর চরম নিরুপায়তা চেপে ধরে তিনি আবার রোদে এসে দাঁড়ালেন। বলাই মন্ডল তখন বাইকের ওপর পা দুলিয়ে মোবাইলে কার সাথে যেন হাসিমুখে কথা বলছিল। শৈলেন্দ্রবাবুকে আসতে দেখে সে ফোনটা পকেটে পুরে এক কুটিল তৃপ্তির হাসি হাসল।
শৈলেন্দ্রবাবু নোটের তাড়াটা বাড়িয়ে দিয়ে অত্যন্ত ক্ষুণ্ণ ও ভাঙা গলায় বললেন— "এই নাও বলাই ভাই, তোমাদের দাবিমতো নগদ দশ হাজার টাকা। আমার এই শেষ বয়সের মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকুকে তোমরা আর ভেঙে দিও না বাপু।"
বলাই মন্ডল অত্যন্ত চটজলদি হাত বাড়িয়ে টাকাটা লুফে নিল। নোটগুলো বুড়ো আঙুল দিয়ে একঝলক গুনে নিয়ে সে কার্তিকের দিকে তাকিয়ে চোখ মারল। তারপর টাকাটা নিজের কুর্তার পকেটে পুরে ভুবন মিস্ত্রির দিকে তাকিয়ে চড়া গলায় বলল— "কী রে ভুবন! হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? কাজ শুরু কর! হালদারবাবু আমাদের নিজেদের লোক, উনার পাঁচিল যেন খুব মজবুত হয়। আর শোন, কোনো বাইরের লোক যদি এসে ঝামেলা করতে চায়, সোজা আমার নাম নিবি।"
টাকাটা পকেটে পুরে বলাই মন্ডল আর তার দলবল যখন বাইক স্টার্ট দিয়ে, ধুলো উড়িয়ে হাসতে হাসতে এক পরম বিজয়ীর বেশে চলে গেল, তখন চারদিক আবার নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। দুপুরের তপ্ত বাতাস যেন শৈলেন্দ্রবাবুর মুখের ওপর এসে এক চরম উপহাসের ধাক্কা দিয়ে গেল। শৈলেন্দ্রবাবু অপলক ও শূন্য চোখে সেই ধুলো ওড়া রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তিনি মনে মনে ভাবলেন—রাজধানীর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে টেলিভিশনের পর্দায় যে বড় বড় নেত্রীরা বুক ফুলিয়ে সততা, আইন আর শান্তির বাণী শোনান, তার আসল রূপ তো এই গ্রামীণ পথের ধুলোয় মিশে আছে। আইন আর শান্তির চটকদার আড়ালে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত এভাবে লুটেপুটে খাওয়ার এই নির্মম দলীয় দাদাগিরি আর তোষামোদের সংস্কৃতিই নাকি বর্তমান বঙ্গ রাজ্যের বহুল প্রচারিত ও বহুল প্রশংসিত 'পরিবর্তনের জোয়ার'। শৈলেন্দ্রের একটা দীর্ঘশ্বাস যেন সেই নির্মীয়মাণ পাঁচিলের ইটের খাঁজে খাঁজে এক নীরব প্রতিবাদের মতো জমা হয়ে রইল।
বলাই মন্ডলরা চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ কেটে গেল। দুপুরের কড়া রোদ মরে গিয়ে পশ্চিম আকাশে অলস বিকেলের ম্লান আলো ফুটে উঠেছে। ভুবন মিস্ত্রি আর তার জোগাড়ে ছেলেরা আবার নতুন করে সিমেন্ট-বালির মশলা মেখে দেওয়াল তোলার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ইটের ওপর কর্নিকের সেই চেনা ঠকঠক শব্দ চারপাশের নিস্তব্ধতাকে ভাঙার চেষ্টা করলেও শৈলেন্দ্রবাবুর মনের ভেতরের নিস্তব্ধতা যেন আরও ঘনীভূত হচ্ছিল। তিনি বাড়ির উঠোনে রাখা একটা কাঠের চেয়ারে এসে ধপ করে বসে পড়লেন। তাঁর চোখের সামনে ভাসছিল বলাই মন্ডলদের সেই লোভী চাউনি আর কুর্তার পকেটে টাকাটা পুরে নেওয়ার সেই চেনা দৃশ্য।
চেয়ারে হেলান দিয়ে শৈলেন্দ্রবাবু স্মৃতির অলিগলিতে ডুব দিলেন। তাঁর মনে পড়ে গেল এই বঙ্গ রাজ্যের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসের কথা। তিনি মনে মনে ভাবলেন—"এই বাংলার বুকে একসময় একটানা পঁয়ত্রিশ বছরের একচ্ছত্র শাসন ছিল। সেই দীর্ঘ শাসনের অত্যাচার, স্থবিরতা আর দাদাগিরির বিরুদ্ধে এ রাজ্যের মানুষ একদিন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া লড়াই লড়েছিল। কত আশা, কত স্বপ্ন নিয়ে মানুষ সেদিন একটা বড় পরিবর্তন এনেছিল, নতুন সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। তারপর সাধারণ মানুষ দেখল সেই নতুন সরকারেরও দীর্ঘ পনেরো বছরের শাসনকাল।"
শৈলেন্দ্রবাবুর ঠোঁটের কোণে এক বিষণ্ণ ও তিক্ত হাসির রেখা ফুটে উঠল। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বলতে লাগলেন—"ইতিহাসের কী অদ্ভুত পুনরাবৃত্তি! সেই পনেরো বছরের শাসনকে হটিয়ে, মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে আবার এক নতুন পরিবর্তনের জোয়ারে এ রাজ্যে নতুন সরকার গঠন হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার এই রদবদলে আসলে সাধারণ মানুষের ভাগ্যের কী পরিবর্তন হলো? পরিবর্তন তো কেবল হলো বিজ্ঞাপনের রঙে আর ব্যানারের ভাষায়; পরিবর্তন হলো না এই লোভী নেতা আর তাদের কাটমানি খাওয়া নেতৃত্বের!"
তিনি নিজের চারপাশের বাস্তবতার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট উপলব্ধি করলেন, ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষগুলো আসলে কতটা চতুর। সরকার যখনই বদল হয়, এই সুযোগ সন্ধানী মানুষগুলো দিব্যি নিজেদের খোলস আর দলীয় পতাকাটা পাল্টে ফেলে। গতকাল পর্যন্ত যারা অন্য দলের হয়ে চ্যাঁচাত, আজ তারা নতুন শাসকদলের সাদা কুর্তা আর উত্তরীয় গায়ে চাপিয়ে বুক ফুলিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়। এই পরিবর্তনের জোয়ারে তারা খুব সহজেই নিজেদের গা এলিয়ে দিয়েছে।
শৈলেন্দ্রবাবু চশমাটা খুলে চোখ দুটো মুছলেন। তাঁর প্রবীণ ও অভিজ্ঞ মন আজ চিৎকার করে বলতে চাইল—"সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে শাসনব্যবস্থার এই পুরনো আমলের নোংরা মানসিকতা, তোষামোদ আর তোলাবাজির মতো সবকিছুই গোড়া থেকে পরিবর্তনের দরকার ছিল। কিন্তু তা তো হলোই না! বরং দেখা গেল সেই পুরনো লোভী লোকগুলোই আজ নতুন চটকদার জামা গায়ে পড়ে, নতুন দলের তকমা লাগিয়ে আবার সমাজে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর তাদেরই সেই পুরনো, বিষাক্ত ও শোষণের হাতগুলো ক্ষমতার নতুন লাইসেন্স পেয়ে আবার সাধারণ মানুষের পকেটে থাবা বসাতে সজাগ হয়ে উঠছে।"
বিকেলের ম্লান আলোয় নিজের নির্মীয়মাণ পাঁচিলটার দিকে তাকিয়ে শৈলেন্দ্রবাবুর মনে হলো, এই পাঁচিলটা আসলে শুধু ইটের দেওয়াল নয়—এ যেন এ রাজ্যের কোটি কোটি সাধারণ মানুষের অসহায়তা আর ক্ষমতার চিরন্তন শোষণের এক জীবন্ত দলিল।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।