জনৈক অধ্যাপকের আলোচনায় কলেজের হালচাল।
আগ্রহী হলে পড়তে পারেন।
একটি মেরুদণ্ডহীন সমাজের এটাই প্রাপ্য।
----------------------------------------------------------------------
ক্লাসে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় পড়াচ্ছি। দরজা ঈষৎ ভেজানো। কোনও একটা মুহূর্তে যথারীতি বলেছি : ‘জাপপুষ্পকে ঝরে ফুলঝুরি, জ্বলে হ্যাঙ্কাও/কমরেড, আজ বজ্রে কঠিন বন্ধুতা চাও’—পঙক্তিদ্বয় উচ্চারণের প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই দরজায় টোকা; দরজায় দাঁড়িয়ে আছে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের কয়েকজন কর্মী। ওদের মধ্যে একজন আমার প্রত্যক্ষ ছাত্র, থার্ড ইয়ার, মিনমিন করে বলেছিল : ‘স্যার, ওসব কমরেড-ফমরেড বলবেন না।’ তার পাশে দাঁড়িয়ে তৎকালীন এবং হয়তো, কে জানে, আজকের-তারিখেও-বর্তমান এক ছাত্রনেতা। পুরোনো কোনও-কোনও স্যার-ম্যাডামকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ছেলেটি কোন সাবজেক্টের স্টুডেন্ট? কেউই কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি।
আমার সেই থার্ড ইয়ারের ছাত্রের মুখে ওই কথা শুনে বলেছিলাম : ‘সিলেবাসে যা থাকবে, তাই তো পড়াব। তার চেয়ে বরং এক কাজ কর, তোদের সরকার, শিক্ষামন্ত্রী তোদের, বলেকয়ে সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে বাদ দিয়ে দে।’
এবার সেই সুদর্শন, জীবনানন্দীয় সুদর্শন, ছাত্রনেতা মুখ খোলে : ‘আপসে সলা নেহি মাঙ্গে। যো বোলা গ্যায়া, ওহি করনা পড়েগা।’
কথোপকথন এরপরও চলেছিল, যেখানে একটা সময় আমি নিছকই মজা করে বলেছিলাম : ‘শিক্ষামন্ত্রীর নাটক বা মুখ্যমন্ত্রীর কবিতা সিলেবাসে থাকলে তাই পড়াতাম!’ বুঝিনি, এটা সিরিয়াসলি নিয়ে নিতে পারে কেউ। যদিও তারপর থেকে যখনই-যা ঘেরাও হত, অন্যান্য পার্টটাইম বা গেস্ট ফ্যাকাল্টিদের ছেড়ে দেওয়া হলেও আমায় আটকে থাকতে হত।
কলেজ স্ট্রিটের সেই কলেজে ঢুকলেই ইউনিয়ন রুম। কোন টিচার কখন বেরোয়, কখন ঢোকে—সেই ছাত্রনেতার অনুগামীরা পুঙ্খানুপুঙ্খ নজর রাখত। পরপর দুটো পিরিয়ড অফ থাকলে আমি খেতে যেতাম : পকেটে পয়সা থাকলে রমানাথ মজুমদার স্ট্রিটে মহল, নতুবা ইউনিভার্সিটিতে রাখালদার ক্যান্টিন। উল্লেখ থাক, তখনও ইউনিভার্সিটির ইউনিয়ন রুমের দখল নিতে টিএমসিপি-র আরও কয়েক মাস দেরি; শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হয়ে সেজে উঠতে, দেয়ালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি প্লাস্টারসমেত সেঁটে দিতে তারও বেশি। পরে যে-ঘরে জুতো খুলে ঢোকার রেওয়াজ চালু ছিল বেশ কয়েক বছর।
ক্যান্টিনহীন সেই কলেজ থেকে একদিন এমনই খেতে বেরোচ্ছি, ইউনিয়ন রুম থেকে একটি মেয়ে বেরিয়ে এসে বলে, দাদা ডাকছে। মেয়েটিকে বলেছিলাম, ছাত্রদের ইউনিয়ন রুমে এইভাবে কোনও শিক্ষকের যাওয়াটা উচিত নয়; তোমার দাদার প্রয়োজন হলে সে এসে কথা বলতে পারে, অথবা টিচার্সরুমে দেখা করতে পারে।
কলেজ স্ট্রিটের পারিপার্শ্বিক থেকে উপর্যুপরি জল-হাওয়া-সার পেয়ে এর কী ফল ফলেছিল এপ্রিলের দশ তারিখে, তা একা আমার কেন, আপনাদেরও অনেকের জানা।
সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ঘটনা দেখার পর থেকে ক্রমাগত মনে হচ্ছে, আশেপাশের ইউনিয়ন রুমগুলোর চাকচিক্য কবে দেখতে পাব? অনেকে অনেক কথা বলছেন, কেউ বলছেন টাকাগুলোর কথা ভুলে গিয়েছিল সরাতে; আমার যদিও তা মনে হয় না। কসবা ল কলেজের ঘটনার পর হাইকোর্ট যখন ছাত্র সংসদ নির্বাচন না-হওয়া পর্যন্ত ইউনিয়ন রুমগুলো বন্ধের নিদান দেন, অনেকেই ভেবে নিয়েছিল—পুলিশ তো তাদের, ইউনিয়ন রুম খোলা থাকল না বন্ধ, কী যায়-আসে! আপনাদের মনে পড়বে, সেই সময় এসএফআই জমায়েত করে, ডেপুটেশন দিয়ে বহু কলেজের ইউনিয়ন রুমে তালা ঝুলিয়েছিল। এই পুরো প্রক্রিয়াটিই ছিল টিএমসিপি-র ভাবনার বাইরে, ফলে তল্পিতল্পা-লটবহর যা ছিল, সব রেখেই উদ্বাস্তু হতে হয়েছিল তাদের। বহুকিছুই, ফলত, রয়ে গেছে যেমন-কে-তেমন।
প্যান্ডোরা, আর কী আছে তোমার পেটিকায়?