
মোট ১০ টা বিধানসভা কেন্দ্রের ৪০০০ ইভিএম পুড়ে গেল আলিপুরে। গুণে-গেঁথে ঠিক ৪০০০টাই ছিল কীকরে জানা গেল? জানা নেই। তবে নবনিযুক্ত দমকল মন্ত্রী কৌশিক চক্রবর্তী বলেছেন, ৩ এবং ৪ তলায় আগুন লাগে। সেখানে ইভিএম ছিলনা। তারপর সেই আগুন লাফিয়ে চলে যায়, ৭ এবং ৮ তলায়। সেখানেই ছিল ইভিএম। মাঝের কোনো তলায় কোনো আগুনের চিহ্ন নেই। আগুন কীকরে হনুমানের মতো লাফাল জানা নেই। কিন্তু সব ইভিএমই পুড়ে গেছে এটা জানা গেছে। মন্ত্রী বলেছেন।
মন্ত্রী আরও বলেছেন, ব্যাপারটা খুব রহস্যজনক। কিন্তু খুব গরম হওয়ায় ফরেনসিক এখনও ঢুকতে পারেনি, তাই কিছু বলতে পারবেন না। আমাদেরও কারও কারো আপাতদৃষ্টিতে তাইই মনে হচ্ছে। কারণ ভোটের পরেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছিলেন, গণনাকেন্দ্রে গা-জোয়ারি এবং জালিয়াতি হয়েছে বলে। মামলা করবেনও বলেছিলেন। তারপর তো তাঁর পার্টিই লুঠ হয়ে গেল। মামলা করলে কিছু হত কিনা কেউ জানেনা, কিন্তু করার আগেই ৪০০০ ইভিএম পুড়ে গেল। আগুন যখন লাফাচ্ছিল, তখন নতুন প্রশাসনের দমকল কী করছিল জানা নেই। ঘটনাচক্রে নির্বাচন কমিশনের তৎকালীন মাথাই এখন মুখ্যসচিব। ওদিকে বাংলার সুবিখ্যাত সংবাদমাধ্যম, যারা তিল দেখতে না পেলেও তালগাছ বানিয়ে ফেলে থাকে, এই ভয়ানক ঘটনার বিবরণ, তাদের পাতায় বা পর্দায় খুঁজতে গেলে মাইক্রোস্কোপ, টেলিস্কোপ দুইই লাগবে। এবং কদিন বাদে হয়তো জানা যেতে পারে, গণনার ফুটেজও আইন মেনে মুছে দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে বেশ সন্দেহজনক লাগলেও, মনে রাখবেন, নতুন জমানা এসে গেছে। তাই পুরোটাই নিছকই দুর্ঘটনা, আর নেহাৎই কাকতালীয়ই হবে।
এরকম কাকতালীয় ঘটনা অবশ্য একটা না। ঘটেই চলেছে। মীনাক্ষী নটরাজন এই দিনকতক আগে কংগ্রেসের হয়ে রাজ্যসভায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে গিয়েছিলেন মধ্যপ্রদেশে। মনোনয়ন গেল বাতিল হয়ে। বিজেপির দিক থেকে অভিযোগ ছিল, হলফনামায় তিনি তাঁর সম্পর্কে একটা এফআইআর বা কেস নাকি উল্লেখ করেননি। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ওটা কোনো ক্রিমিনাল কেস ছিলনা, কেবলই একটা আইনী নোটিস পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু রিটার্নিং অফিসার সে কথায় কান দেননি। মীনাক্ষী সুপ্রিম কোর্টেও গিয়েছিলেন, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, এসব নির্বাচন কমিশনের আওতায়, তাদের এক্তিয়ারে না। সব মিলিয়ে বিজেপি তিনটি রাজ্যসভা আসনই জিতে নিয়েছে ওই রাজ্য থেকে। একটা, সংখ্যার হিসেবে তাদের জেতার কথা ছিলনা। ঘোড়া কেনাবেচা হতে পারে, এই আশঙ্কায় কংগ্রেস বিধায়কদের বেঙ্গালুরুতে নিয়ে গিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল, তাতে বিজেপিকে আটকানো যায়না। এই যে, ঠিক সময়েই মীনাক্ষীর "ভুল" হল, মনোনয়ন বাতিল হল, এ সবই কাকতালীয় ঘটনা।
এরও আগে সংসদে রাঘব চাড্ডা, অশোক মিত্তাল পাঞ্জাবে আআপ সাংসদরা সদলবলে যোগ দিয়েছিলেন বিজেপিতে। আপএর দুই-তৃতীয়াংশ নিয়েই যোগদান হয়েছিল, সম্পূর্ণ আইনসঙ্গতভাবে। এবং তার আগে অশোক মিত্তালের সম্পত্তিতে ইডি হানা হয়েছিল। সেটাও সম্পূর্ণ কাকতালীয়। তারপর, একদম সাম্প্রতিককালে তৃণমূলের অনেকেই নাকি বিদ্রোহী হয়েছেন শোনা যাচ্ছে। তাঁরা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন কিনা জানা নেই। এর আগে ট্রাইবুনালে ৩৫ লক্ষ নামকে ঝুলিয়ে রেখে পশ্চিমবঙ্গে অবাধ নির্বাচন হয়েছে, তাতে বিজেপি জিতেছে। তারপর তৃণমূল সাংসদ কীর্তি আজাদ অভিযোগ করেছেন, পুরোনো সাংসদদের চাপ দেওয়া হয়েছে নানাভাবে। এই সবই কাকতালীয়।
এই সব কাকতালীয় ঘটনা যোগ করলে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি নির্বাচনে সংখালঘু থাকলেও নির্বাচনোত্তরপর্বে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে। একবার হয়ে গেলে ডিলিমিটেশন সহ যা যা পাশ করাতে চায়, সবই টপাটপ পাশ করিয়ে ফেলতে পারবে। আপাতদৃষ্টিতে ব্যাপারটা বেশ সন্দেহজনক। কিন্তু আসলে তা নয়। আসল কথা হল, আচ্ছে-দিন টপকে এখন অমৃতকাল এসে গেছে। এইসব সময়ে এইসব কাকতালীয় ঘটনা ঘটে থাকে। নইলে তো সন্ধ্যেবেলার ঘন্টাখানেক মাছের বাজারে চুলচেরা বিশ্লেষণ দেখতে পেতেন, নাকি?