

ছবি: রমিত
একটা প্রকান্ড বরইগাছের তলায় দাঁড়ানো দোতলা টিনের ঘর। বহুদিনের রোদজলে টিনগুলোতে জং ধরা সময় এমনভাবে গেঁড়েগুড়ে বসে থাকতো যে তাকাতেই বহুবছরি জীবনের গল্প একদম রাখঢাক না করেই বলে দিতো বিনাদ্বিধায়। পিচঢালা পথ ছেড়ে কম করে হলে শ’কদম। মাটির, ছায়াঢাকা পথ। সে পথের দু’পাশে দেবদারু গাছের সবুজ প্রহরা। একটু কসরত করলেই ডানেবামে সেই নিছিদ্র প্রহরা অতিক্রম করে চোখ চলে যায় তাঁতঘরে। তবে সেসব তাঁতঘরে মাকুর আওয়াজ কমতে শুরু করে দিয়েছিলো ততদিনে।
হাতে টানা তাঁতমাকুর নিরবচ্ছিন্ন ‘খটাস খটাস’ শব্দ বুজে আসা শুরু হলেও ভেতর বাড়ির উঠোনে তখনও অবশিষ্ট বনেদিয়ানা বিদ্যমান। উঠোনের রোদে তিল তিসির যুগলবন্ধন, ঢেঁকিপাড়ে তুলসীমালা চালের গুঁড়ো গুঁড়ো সময় আর কারণে অকারণে উনুনে পরবের পদ—সবই আসলে পুরোনোকে বহাল রাখার যথাযোগ্য চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।
তবে সময়ের গতি তো একমুখী। তাই পুরোনো যতই ধুয়েমুছে যত্ন করে রাখো না কেন নতুনের আছড়ে পড়া ঢেউকেও যে আপন করে নিতে হয়, এটা মনে হয় জীবনের স্বত:সিদ্ধ বোঝাপড়া।
তাই উঠোনের অন্যপাশে প্রাচীন কতগুলো সারাবছরি আম গাছের বিসর্জন কালেই বাজনা বেজে উঠেছিলো ইমারত বোধনের। দিনক্ষণ দেখে সাহাপাড়ার গোবিন্দ মন্দিরের পুরোহিত তেল সিঁদুর মাখানো নারায়ণ শিলা যেদিন তুলসীতলায় রাখলো ঠিক সেদিনই উলুযোগারের আওয়াজে স্পষ্ট হয়েছিলো বাড়িতে লক্ষ্মীবরণের প্রস্তুতিও চলছে।
তিনখানা সিমেন্টের ঘর। হালকা হলুদ রঙের দেওয়াল। নতুন আসবাব। শ্রাবণের মেঘে উড়ে এসেছিলো বারতা। বাঘকাকুর বিয়ে। পাশের পাড়ার সুতনূ কিশোরী আমার ছোট বৌমা হয়ে আসছে।
সময়টা আশির প্রথমভাগ। দাদুর রেডিও তখনও কাঠের টেবিলে নিত্য পরিসেবারত।
তবে ওই যে যুগের হাওয়া, যার টোকায় একটু একটু করে সামনে এগিয়ে যাবার নামই তো জীবন!
ছোট বৌমা বাড়িতে এলো শ্রাবণের এক সন্ধ্যায়। আর তাকে বৌভাতের দিনে স্বয়ং বাঘকাকু উপহার দিলো নতুন এক অবাক বাকশো। সে বাকশো বাড়িতে ঢুকতেই সকলের ভেতর অস্ফুট শোরগোল।
দত্ত স্টুডিও থেকে সাটার টানা ক্যামেরাও বাড়িতে এলো সময়কে কালো রিলে বন্দি করবে বলে।
ঝলমলে ছোটবৌমা গা ভর্তি গহনা পড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো সেই অবাক বাকশোর পাশে।
ক্লিক…ক্লিক…ক্লিক…
রিলে টানা সময়ের চালচিত্রে শুরু হলো বাড়ির উঠোনের এক নতুন গল্প।
যদিও গল্পের মধ্যমণি যথারীতি সেই অবাক বাকশো। বিশ ইঞ্চির এক বড়সড় বাকশো। সামনে কাঁচ লাগানো আর কতগুলো রুপালী রঙের নব। সেসব নব ঘুরালে প্রথমে কাঁচের দেয়ালে সাদাকালো ঝিরঝির। এরপর উঠোনে বাঁশের মাথায় লাগানো এন্টেনার মাথা এদিক ওদিক ঘোরালে আস্তে আস্তে স্পষ্ট ছবি।
সে ছবি হাসে, কাঁদে, গল্প বলে।
আমাদের একান্ন উঠোনকে মাঝখানে রেখে চারপাশের ঘরগুলোর মধ্যে বড়ঘরই ছিল আমাদের অঘোষিত বৈঠকখানা। কেতাবিয়ানা ছিল না তাতে মোটেও। ঘরের মেঝেয় নেহাতই পাটি পেতে সকাল-সন্ধ্যায় চা মুড়ি খাওয়া অথবা জরুরি কোনো আলোচনার আটপৌরে আয়োজনে সে ঘরই ছিল আমাদের অব্যর্থ গন্তব্য। একখানা কালো রঙের নকশি কাঠের খাট, খুব সাধারণ একখানা টেবিলক্লথে ঢাকা টেবিল আর মাত্র একটা চেয়ার। সেই চেয়ার অবশ্য বাড়ির যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একমাত্র দাদুর দখলে থাকতো দায়িত্বশীলতার একমাত্র বাহক হয়ে।
আর ছিল বারো ব্যান্ডের রেডিওখানা। যে সন্ধ্যা থেকে কুনকুন সুরে কখনো গাইতো কখনো গুরুগম্ভীর হয়ে পড়ে যেতো সন্ধ্যা সাতটার সংবাদ। তবুও বৈঠকখানার সাধারণ সংজ্ঞা হয়ে বড়ঘরই ছিল আমাদের সকল বিনোদনের একমাত্র অনুষঙ্গ।
কিন্তু সেই অবাক বাকশো আমাদের বাড়িতে আসতে না আসতেই বদলে গেলো সন্ধ্যার সকল চিরচেনা হিসেবনিকেশ। একান্ন উঠোনের পশ্চিমপাশে তখন একহারা তিনটা ইটের ঘর। সদ্য মাথা তোলা সেই ঘরগুলোর একটিতে মহাসমারোহে স্থাপিত হয়েছিলো সেই বাকশো। বিকেল হতেই বাড়ির উনুন নিভে যেতো। মা বৌমারা গা ধুয়ে মাড় দেওয়া কড়কড়ে শাড়ি পড়ে যখন কপালে সিঁদুর আঁকতে বসতো তখন মনিপিসি ঘড়ি দেখে ঠিক পাঁচটায় পৌঁছে যেতো অদ্ভুত সেই বাকশের সামনে।
নব ঘুরিয়ে এন্টেনা এদিকওদিক নাড়িয়ে নানা কসরতে যখন বাকশোতে ছবি স্পষ্ট করতো তখন সেখানে নেহাতই কোনো এক গুরুগম্ভীর আলোচনা কিংবা হাটেমাঠে কৃষি নিয়ে জরুরী কোনো বার্তালাপ। তবে এসবের মাঝেও মন খুশি হয়ে উঠতো যখন নিটোল মুখের অঞ্জলি মোস্তফা ঘোষণা করতো 'বি জে এন্ড দ্যা বিয়ার' উপস্থাপনার, তখন বেশ গেঁড়েগুড়ে বসতাম আমি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার আশেপাশে আস্তে আস্তে ভিড় বাড়তো। মা কাকিদের কেউ কেউ সন্ধ্যার চায়ের পালা শেষ করেই এসে বসতো সেই অবাক বাকশের সামনে।
তবে সপ্তাহের কোনো একদিন যখন রাত ন'টার পর সকাল-সন্ধ্যা নাটকের প্রারম্ভিক সুর বেজে উঠতো তখন বলতে গেলে সারা পাড়া হয়ে উঠতো আমাদের কুটুম। ঘর ছাড়িয়ে বারান্দা উঠোন থেকেও তখন একনিষ্ঠ নিবদ্ধ অসংখ্য চোখ সেই অবাক বাকশে।
এরপর রাত পোহালেও সপ্তাহজুড়ে মা কাকিদের গল্পে থেকে যেতো সেই শিমু ভাবি কিংবা বুবলি।
গল্প বদলে যায় বাড়ির। বদলে যায় বাড়ির সন্ধ্যা। মাটির কোলে, যদি কিছু মনে না করেন, এইসব দিনরাত্রি, ছায়াছন্দ, পূর্ণ দৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি, দ্যা বিল কসবি শো, মাটি ও মানুষ---আমরা বড়ঘরকে পেছনে ফেলে একটু একটু করে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিলাম সেই অবাক সাদাকালো বাকশে। বড়ঘরের লালমেঝেয় পাতা পাটিকে একলা করে আমাদের চায়ের আড্ডা সীমিত হয়ে আসছিলো ঘড়ির কাঁটা সাতটার ঘরে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই।
সাদাকালো অবাক বাকশো বদলে দিচ্ছিলো আমাদের বাড়ির একান্ন সময়ের গল্প।
তবে সেই অবাক বাকশের সকল আকর্ষণ উপেক্ষা করে কাঠের টেবিলে কুনকুন করে বেজে চলা রেডিও তখনও দাদুর সামনে একাই বলিষ্ঠ হয়ে বলে চলতো,
সন্ধ্যা সাতটা, আপনারা শুনছেন ভয়েস অফ আমেরিকা…
দাদু ঘাড় গুঁজে মনোযোগ দিয়ে সেই রেডিওর সামনে বসে থাকতো রাত অবধি। কখনো ভাবগম্ভীর চেহারা কখনও উচ্ছল। আর কখনও গুনগুন সুর,
চারিপাশে মোর উড়িছে কেবল
শুকনো পাতা মলিন ফুল-দল
বৃথাই কেন হায় তব আঁখিজল
ছিটাও অবিরল দিবস-যামী
হারানো হিয়ার নিকুঞ্জপথে…
আশির আউনিবাউনি তাই সেই শোলোক যা আওড়াতে আওড়াতে আমরা শুধু বড়ই হই না, বদলেও যাই একান্ন উঠোনের এক্কাদোক্কা সময়কে পাশ কাটিয়ে। আর সেই বদলই আমাদের হাত ধরে নিয়ে যায় কোনো এক একলা দিনের গান শোনাতে।