এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • জোছনায় তোমার সঙ্গে ভিজবো বলে

    ছুটি রায়চৌধুরী
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৮ জুলাই ২০২৬ | ১০ বার পঠিত
  • জুলাই ২৭- ২০২৬
    ছবিঃ ঈপ্সিতা পাল ভৌমিক


    *১*

    মঞ্জু তোমার ফোন নম্বর চাইছিল।
    — কে?
    — কৃষ্ণনগরের মঞ্জু। দেবো?
    — ও কোথায় আছে যেন?
    — দমদমে থাকে। খুব সমস্যার মধ্যে আছে। যদি তুমি কোনও সাহায্য করতে পারো।
    — সমস্যা ছাড়াও কি লোকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে চায়? সে ঠিক বোঝে না। লোকে বোধহয় তাকে ভবঘুরে ছাড়াও পাগলও ভাবে। জানে, ওর তো কোনও কাজ নেই। ডাকলেই আসবে। খানিকটা পেট-ভাতে পেট-ভাতে ব্যাপার। কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্প।

    মঞ্জুর সঙ্গে তার শেষ দেখা বারো বছর আগে। আসাননগরে লালন মেলায়। একটা দলের সঙ্গে ঘুরছি। হঠাৎ দেখে মঞ্জু।
    — স্যার, আপনি এখানে?
    — এই তো লালনের গান শুনতে। বাংলাদেশের ছেউড়িয়া থেকেও বহু সাধক এসেছেন। তাঁদের গান শুনতেই বিশেষ করে আসা।

    মঞ্জুর কথা শোনায় বেশি আগ্রহ ছিল না। সে ব্যস্ত পায়ের ধুলো নিতে।
    সে আমি ধমকে উঠলাম —
    — কী শিখিয়েছি এতদিন? মাথা নিচু করতে বারণ করেছি না?
    — সব কথা শুনতে নেই স্যার। আপনি আমাদের কাছে ভগবানের মতো।

    সে নিজে ভগবান মানে না। কিন্তু কিছু ছেলে-মেয়ে যে কেন তাকে ভগবান বলে মনে করে!
    আর মঞ্জুর কাছে তো সে একেবারে ভগবান সাজতে চায় না।

    মঞ্জুর দিকে তাকালাম। অতলশ্যাম কালো। কাটা কাটা নাক-চোখ-মুখ। একেবারে সুন্দরী সাঁওতাল রমণী। ফর্সা হলে ওই মেয়ের জন্য লাইন পড়ে যেত। কিন্তু ভালো বলে বোধহয় কোনও প্রেমিক নেই মঞ্জুর।

    — আমাদের বাড়ি একবার যেতে হবে স্যার।
    — কোথায় তোমার বাড়ি?
    — বেশি দূর না। হেঁটে বড়জোর কুড়ি মিনিট।

    কুড়ি মিনিট মানে অনেকটা পথ। সঙ্গে আছে কলকাতার ছেলে-মেয়েরা। প্রেসিডেন্সির ছাত্র-ছাত্রীরা। সব মিলিয়ে তেরো জন। এত জনকে নিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। মুখ দেখে কী বুঝল কে জানে! মঞ্জু বলল, সবাই মিলে আসবেন।
    — দেখি।
    — দেখি নয়, স্যার। আসতেই হবে।
    — হবে না মনে হয়।

    ভাবছি গরিব ঘরের মেয়ে। তেরো জনকে শুধু চা খাওয়াতেও কষ্ট হবে। কলকাতার লোকদের মতো তো এক গ্লাস জল নামিয়ে বলতে পারবে না। ‘চা খাবেন’?

    মঞ্জুরা তা পারবে না। তাই না যাওয়াই ভালো। শুধু শুধু বেচারির বাবা-মাকে কষ্ট দেওয়া। অন্য একদিন আসব মঞ্জু। আজ মনে হয় হবে না।
    মঞ্জুর চোখের কোণে জল এসে গেল।
    দেখে মনটা নরম হলেও ঠিক করলাম যাবো না।
    ও বাচ্চা মেয়ে। বাবা-মার সমস্যা বুঝতে এখনও শেখেনি।

    *২*

    সব মিলিয়ে আঠারোটা মঞ্চ। বিপ্লব বলেছিল, আসুন না ইমুদা। এমন বাউল গানের আসর এই বাংলায় কোথাও পাবেন না।
    — ‘বলো কী?’ জয়দেব-কেন্দুলি, কল্যাণীর সতীমার মেলা—এ সব আছে না?
    — আছে কিন্তু, আমাদেরটা একবার দেখুন। একেবারে আলাদা।

    বিপ্লবের কথায় নেচে ওঠা। অবশ্য নাচাটা রক্তে আছে। মার মুখে শুনেছে, বাপ যে কোথায় কোথায় চলে যেত যাত্রা আর গান শুনতে। পাঁচ-সাতদিন পর ফিরত। চোখ বসা। মুখে রুগ্ন রুগ্ন দাড়ি। বাপের স্বভাব পেয়েছে। বাউণ্ডুলে, ভবঘুরে ভাব।

    ছেলে-মেয়েদের বললাম, সবাই কি একসঙ্গে থাকতে চাও? না ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গান শুনতে চাও, ইচ্ছে মতো।

    দলে ভোলার একটু ইচ্ছে ছিল, চূর্ণীর সঙ্গে আলাদা হওয়ার। ভোলার ভালো নাম অর্ণ। অর্ণ মানে কী? অর্ণ নিজেও জানে কি না সন্দেহ। কিন্তু অর্ণ নাম চলেনি। প্রেসিডেন্সির অদীন একবার বেড়াতে গেছিল ওদের বাড়ি। গিয়ে শোনে, অর্ণর ঠাকুরদা ডাকছেন। ভোলা। ভোলা।

    অদীন ভেবেছে ভোলা ওদের চাকরের নাম। কিন্তু অর্ণকে বলতে শোনে,
    — বলছি না, বাইরের লোকের সামনে আমাকে ভোলা বলে ডাকবে না।
    ঠাকুরদা বলেন, কী বলব তবে, ভোলানাথ?

    কিছু বিষয় থাকে একান্তই ব্যক্তিগত। ব্যক্তিগত পরিসরে প্রকাশ্যে নানা মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক অপরাধ। অথচ ওই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার কোনও বিধান নেই। উল্টে এরা সমাদৃত হয়। পরদোষ অন্বেষক সমাজে এরা কেউ কেউ তালেবর হয়ে যান।

    অদীনও সেদিন পেল হিরোর সম্মান। কলেজের ক্যান্টিনে বসে সে অর্ণকে ডাকল, ভোলা, এই ভোলা। ক্যান্টিনে কাজ করত ভোলা নামের একটি লোক। সে তো অবাক। বাপের বয়সীকে নাম ধরে ডাকছে। এ কোন শিক্ষিত ছেলেরে বাবা!

    বন্ধুদের হাসির সমবেত হুল্লোড়ে আর অর্ণর বিব্রত হাসি বোঝাল, ভোলা নামের একজনের উদয় হয়েছে ইংরেজি বিভাগে।

    ভোলা ভালো ছবি আঁকে। গান গায়। সে প্রেমে পড়েছে চূর্ণীর।
    চূর্ণীকে ডেকে সে বলল—
    — চল না, আমরা বাউলানিদের গান শুনি।
    — না, বাবা আমি দলছুট হতে রাজি নই।
    চূর্ণীর অসম্মতিতে ভোলার চোখের আলো নিভে গেল।

    *৩*

    জীবন ছাইড়্যা যেও না মোরে
    তুমি গেলে বাঁচবো কেমন করে,
    জীবন জীবন রে…….

    গান গাইছিল সম্বিতি। বারাসতে বাড়ি। থাকে নৈহাটিতে। বরের সঙ্গে থাকে না। গুরুর ঘরেই বাস। গুরুর সংসার আছে। কিন্তু গুরু ও গুরুপত্নী দু-জনের সঙ্গে মিলেমিশে রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে ফিরে যায় বরের বাড়ি। ছেলে-মেয়ে আছে। একটা ক্লাস নাইনে আর একটা ইলেভেনে। ছেলে মা গেলে রাগ করে। বলে, মা, তুমি আর এসো না।

    সম্বিতির সম্বিৎ ফেরে ছেলের কথায়।
    — কেন তোরা কি লজ্জা পাস?
    — লজ্জা না, মা তুমি এলেই পাঁচ কথা ওঠে, বাবাকে টিটকিরি দেয়। আমাদের দেখলে লোকের কথা বন্ধ হয়ে যায়।

    মেয়ে থামাতে যায় দাদাকে। দাদা অপরূপ বড়। তার মুখ অবিকল মায়ের মতো। মা-মুখী ছেলেরা দুঃখী হয় তো? সম্বিতি ভাবে। ভাবে। তাই দুঃখ পায়।
    দুঃখ চায় না তাই গানে ডুবে যেতে চায়। ছবি বাউল স্বপ্ন দেখায়, সম্বিতি তার সঙ্গে বাংলাদেশ যাবে। নিজের বাপের ভিটেয় বসে বাউল গান শোনাবে। যে ভিটে সে ছেড়ে এসেছে ১০ বছর বয়সে।
    কিন্তু কবে হবে সে যাত্রা, সম্বিতি জানে না!
    আর জানে না বলেই সে ডুব দেয় গানের অতলে,

    জীবন জীবন রে……

    চূর্ণীর সে গান শুনে খুব কান্না পেল। অরিত্র তাকে চেয়েছিল। সে চায়নি। বয়সে ছোট। মামার ছেলে, ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ত। দিঘায় মদ খেয়ে স্নান করতে ডুবে যায়। সবাই জানে, এটা অঘটন, দুর্ঘটনা। চূর্ণী জানে, এটা আত্মহত্যা।

    মারা যাওয়ার ১০ মিনিট আগে সে মেসেজ করেছিল,
    — চূর্ণী, শেষ জিজ্ঞাসা—হ্যাঁ বলবি? (দিদি বলত না, নাম ধরেই ডাকত।)
    উত্তর না দিলে এই শেষ বার্তা—
    শেষ আলো দেখা পৃথিবীর!

    অরিত্র মোবাইল সমেত ডুবে গিয়েছিল সমুদ্রে। অরিত্রর এই মোবাইলটার নম্বর সে আর চূর্ণী ছাড়া কেউ জানত না।

    তাই চূর্ণী ছাড়া কেউ জানেনি। কেউ জানবেও না। সম্বিতির গান তাই কাঁদাবেই চূর্ণীকে। চূর্ণী একা একা কাঁদবে বলে উঠে এল। ভোলাও আসছিল পিছু পিছু। কঠিন চোখে তাকাল চূর্ণী।
    না, তার জীবনের সঙ্গে আর কাউকে জড়াতে দেবে না, চূর্ণী। না পাওয়া নিয়ে চলে গেছে অরিত্র।
    সে-ও নিজের জীবনে কোনও কিছুর নতুন স্বাদ নেবে না।


    ক্রমশঃ
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
    জুলাই ২৭- ২০২৬
  • ধারাবাহিক | ২৮ জুলাই ২০২৬ | ১০ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন