এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ধারাবাহিক  স্মৃতিকথা  শনিবারবেলা

  • মধুবাতা ঋতায়তে

    শারদা মণ্ডল
    ধারাবাহিক | স্মৃতিকথা | ২৫ জুলাই ২০২৬ | ৫৫ বার পঠিত
  • ছবি - Imagen 3


    মেয়েদের প্রস্তুতির ফাঁকে বড় মাতাজী জিজ্ঞেস করলেন - ‘তুমি কি উঠবে ভাবছ?’ বললুম - ‘হ্যাঁ মাতাজী।’ কলেজে এমনিতেই সবাই আমাকে ছিনে জোঁক হিসেবে চেনে, কোন সমস্যা সামনে এলে তার শেষ না দেখে ছাড়িনা। তাই এখানে কোন ছাড়ান ছুড়িনের প্রশ্ন নেই। সুযোগের সদব্যবহার করতেই হবে। বড় মাতাজী আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠলেন, ‘তাহলে আমিও উঠবো।’ উঠতে হবে আগের মতই চার হাত পা কাজে লাগিয়ে। পাহাড়ের মাথায় ট্রেনারদের একটি দল দড়ি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, দড়ির অন্য প্রান্তটা ধরে আছেন নিচে যে প্রশিক্ষকেরা রয়েছেন, তাঁরা। মাঝখানে সেই হারনেস আর ক্যারাবিনারের গল্প। তবে গল্পটা আগের দিনের জাল বাওয়ার থেকে কিছুটা আলাদা। মুখ্য প্রশিক্ষক বিভুজিৎ মুখোটির কয়েকটি কথা কানে গমগমিয়ে উঠলো আমার। তিনি বললেন, পাহাড়কে তোমরা যতই ভালোবাসো, মনে রাখবে আরোহণের সময়ে ও একটা obstacle and an obstacle should not be negotiated, it should be overcome. শুনে চমকে উঠলাম, মনে মনে কয়েকবার আবৃত্তি করে নিলাম বাক্যটি। সত্যিই তো নেগোশিয়েশন আর কম্প্রোমাইজের কম প্রলোভন তো এলনা জীবনে। একবার পা পিছলে গেলে পতন ও মৃত্যুই ভবিতব্য - সে কথা সব ক্ষেত্রেই খাটে - তা সে পর্বতারোহণ বা জীবন নির্বাহ যাই হোক না কেন। এইরকম জীবনের পরীক্ষা যতবার এসেছে সামনে, ততবার মন্ত্র জপেছি একতানমনে - ‘সত্যের জন্য সব ত্যাগ করা যায়, কিন্তু কোন কিছুর জন্যই সত্যকে ত্যাগ করা যায়না।’ ক্ষণিকের জন্য আনমনা হয়ে গিয়েছিলাম। সম্বিত ফিরল সম্মিলিত হাঁকডাকে। জীবনে যাই হয়ে থাক, এখন এই মাঠা পাহাড়কে ওভারকাম করি কেমনে।

    বিভুজিৎ বাবুর নির্দেশগুলি মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করি। চার হাত পায়ে পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠার সময়ে শিরদাঁড়া থাকে ঢালের সমান্তরালে, কিন্তু শরীর ঢালের থেকে যতটা সম্ভব দূরে রাখার চেষ্টা করতে হবে। ভালোবেসে পাহাড়ের দিকে ঘনিষ্ঠ হবার চেষ্টা করলে, ভারসাম্য হারিয়ে পপাত চ, মমার চ, হতে এক পলও দেরি হবেনা। আবার নামার সময়ে মেরুদন্ড থাকবে ঢালের সঙ্গে উল্লম্ব। মুখ থাকবে শিখরের দিকে। পিছনে হেঁটে নেমে আসতে হবে। তখন ডান হাত থাকবে কোমরের সামনের দিকে - এই হাতই এখন পা-গাড়ির স্টিয়ারিং। বাঁ হাত থাকবে কোমরের পিছনে, সেই হাত ব্রেকের মত কাজ করবে। বাঁ হাত দিয়ে দড়ি টেনে যোগান দিলে তবেই সামনের দড়ির অংশ বাড়বে আর আমি নামতে পারব। বাঁ হাত লক করে দিলে আটকে যাব, আর এগোতে পারবোনা। এই কৌশলের নাম হল র‍্যাপলিং। আসলে ওঠার সময়ে শিরদাঁড়া ঢালের সমান্তরালে রাখলে শরীরের ভরকেন্দ্র (Center of Mass) নিয়ন্ত্রণে থাকবে। শরীর পাহাড়ের কাছাকাছি এলে ভরকেন্দ্র পিছলে গিয়ে ভারসাম্য নষ্ট হবে। আর নামার সময়ে দড়ি, ক্যারাবিনার, কোমর আর হাত ছন্দোবদ্ধ ভাবে ঘর্ষণ বল (Friction force) তৈরি করে। আমরা যদি শুধু হাত দিয়ে দড়ি ধরে নামতে যেতাম, তবে হাতের চামড়া ছড়ে যেত অথবা আমি সোজা নিচে গিয়ে পড়তাম। কিন্তু ক্যারাবিনার, হারনেস, দড়ি এবং দুই হাতের অবস্থান—এই পুরো সিস্টেমটা মিলে একটা হিউম্যান-মেকানিক্যাল ফ্রিকশন ব্রেক (Human-Mechanical Friction Brake) হিসেবে কাজ করে।

    আমি শেষ পর্যন্ত নিয়ম মেনে উঠে আবার নেমে আসতে সফল হলাম। ওপরে ওঠার পর মনে হচ্ছিল বুকের খাঁচাটা বুঝি ফেটে যাবে। কিছুক্ষণ সেখানে শান্ত হয়ে বসে ধীরে ধীরে চোখ মেললাম। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই বিস্তৃত বনরাজি, মাঝে মাঝে মেঠো পথ, সেই লাল জমিনের প্যাটার্ন, দূরে দূরে বিক্ষিপ্ত গ্রাম, মাঝে কিছু চাষবাস - সব মিলিয়ে পুরুলিয়ার বন্য সৌন্দর্য বিহগ দৃশ্যে আমার চোখের সামনে ঝলমলিয়ে উঠলো। যেন আমি বঙ্কিমের আর এক নবকুমার যে ‘তালতমালীবনরাজিনীলার’ রূপে মুগ্ধ হয়েছে।

    তবে এই নেমে আসার পর মুহূর্তেই একটা ঘটনা ঘটল। অনেক ছোটবেলায় জুল ভার্নের টোয়েন্টি থাউজ্যান্ড লীগস আন্ডার দ্য সী এর বাংলা অনুবাদ পড়েছিলাম - সেখানে এক জায়গায় সমুদ্রের গভীরে সাবমেরিন নটিলাস আটকে যাওয়ায় বিজ্ঞানী পিয়ের, ক্যাপ্টেন নিমোকে জিজ্ঞেস করেন - ক্যাপ্টেন, নটিলাসের কি কোন দুর্ঘটনা ঘটেছে? নিমো উত্তর দেন, না প্রফেসর, নটিলাসকে আপনি চেনেননা, একটা ঘটনা ঘটেছে মাত্র। গল্পটা মনে ভেসে উঠলো, তার কারণ আমাদের ঘটনাটা দুর্ঘটনা হতেই পারতো, কিন্তু হলনা। আসলে আমাদের সঙ্গে দুটি এমন মেয়ে ছিল, যাদের হার্টে বাইপাস সার্জারি হয়েছে। ট্রেনাররা ভরসা দিয়েছিলেন, যে কিচ্ছু সমস্যা হবেনা। হয়ওনি। মাঠার ঐ ঢালে নেমে এসে একটা সংকীর্ণ পথ দিয়ে আবার মেয়েদের জটলার মধ্যে ফিরে আসতে হচ্ছিল। আমি নেমে আসার পর, ঐ সার্জারি হওয়া একটি মেয়ের ওঠার কথা। আমি যখন ঐ অপরিসর পথে সাবধানে হেঁটে ফিরছি, ততক্ষণে ঢালে পা রেখে পজিশন নিয়ে ঐ ছাত্রীটির কোমরে ক্যারাবিনার বাঁধা হয়ে গেছে। কিন্তু মনের টেনশন চাপতে না পেরে ও পিছন ফিরে বন্ধুদের দিকে তাকাতে গেল। ব্যাস, পা ফস্কে ঘুরে আমার পিঠের ওপর পুরো ওজন নিয়ে পড়ল। আমি তো ওর দিকে পিছু ফিরে, কিছু দেখিনি। কিছু বোঝার আগেই সেকেন্ডের ভগ্নাংশে আমি ছিটকে নিচের গর্তে পড়ে গেলাম, মানে অগভীর একটা খাদ, যার জন্য ঐ জায়গাটা অপরিসর। ভিতরে ঝোপ ঝাড় ছিল। শীতের ভোরে রক ক্লাইম্বিং-এ বেরিয়েছি, সোয়েটার, জ্যাকেট, নী গার্ড, কাঁটালো জুতো - হেন তেন প্রোটেকশন সব পরাই ছিল আমার। ঝোপগুলো পুরো গদির মত কাজ করেছে। কিন্তু হাতের পাতা, চোখমুখ এগুলো তো খোলা ছিল। যাই হোক টেনে তোলার পর দেখা গেল, অবিশ্বাস্য ভাবে আমার কোন ইনজুরি হয়নি। কাটা ছড়াটুকুও নেই। হাড়ে ব্যাথা, মচকানোও নেই। আর আমার ওপরে পড়ার ফলে মেয়েটিরও কিচ্ছুটি হয়নি। যেভাবে পড়েছি, দলের কেউ বিশ্বাস করতে পারছেনা যে আমার কিছু হয়নি। একলা বসে ভাবি, যতই বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকুক, সব কিছু পজিটিভ ফ্যাক্টর একসঙ্গে কাজ করা - কোন ইনজুরি না হওয়া - এটা এমনই ব্যাপার, সহজ বুদ্ধিতে যার ব্যাখ্যা মেলেনা। জীবনে আরও কয়েকবার ফিল্ডে এমন ন্যারো এসকেপ হয়েছিল আমার। না - আসলে আমার না বলে আমাদের বলা ভালো। আর একবার তো বলা যেতে পারে একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল।

    যদিও গল্প শুনতে শুনতে বেলাইনে যাওয়া মানে ডিসট্র্যাকশন আমি পছন্দ করিনা মোটে, তবুও এই পাকাচুলো বুড়ির মনে যখন কোন কথা উথলে ওঠে, তখন না বললে শান্তি হয়না।

    অনেক বছর আগের কথা। যৌবন তখনও শরীর ছেড়ে যায়নি। সেবার আমরা হাওড়া থেকে ট্রেনে উঠেছিলাম, গন্তব্য লখনৌ হয়ে কাঠগোদাম স্টেশন। সেখান থেকে নৈনিতাল, রানিক্ষেত, কৌশানি। সবার মনে খুশির হাওয়া। কিন্তু একটি ছাত্র এসে পৌঁছতে পারলোনা। ট্রেন যখন ছেড়ে দিয়েছে, অন্য ছাত্ররা বলে উঠলো, ঐ দেখুন ম্যাডাম, ও পাগলের মত প্ল্যাটফর্মে দৌড়চ্ছে। কী হবে ছেলেটার!! অজানা আশংকায় আমরা যে যেখানে পারলাম চেন টানলাম। কিন্তু আমরা তো আইন জানতাম না, যাত্রাপথের মাঝখানে বিপদ ঘটলে চেন টানা যায়, কিন্তু শুরুতে নয়, ওটা দন্ডনীয় অপরাধ। আর পি এফ এসে, আমাদের এত বড় দল, সহজেই আইডেন্টিফাই করল, কারা করেছে এই কাজ, আর সঙ্গে সঙ্গে বল্লরীদি, আর মধুসূদনকে নামিয়ে নিয়ে চলে গেল। তারপর ঘটনা শুনে মেয়ে বলে বল্লরীদিকে ছেড়ে দিল, কিন্তু মধুসূদনকে ছাড়লোনা। এদিকে বল্লরীদি ট্রেনে ওঠার আগেই ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। তখন আমাদের তরুণ বয়স তো, ও ছুটতে ছুটতে চলন্ত ট্রেনে আমাদের কামরার পা দানিটা ধরে ফেলল। আর আমি সেই দরজায় দাঁড়িয়ে কীকরে যে ওকে টেনে তুলেছি, বা ও উঠতে পেরেছে, ফস্কায়নি - আমরা দুজনেই জানিনা। কারণ ট্রেন ততক্ষণে স্পীড নিয়ে নিয়েছে। আমরা তো আর হিন্দি সিনেমার শাহরুক, কাজল ছিলাম না, বাস্তবটা ভয়াবহ। ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়, কী হয়ে যেত সেদিন। তারপর আর কী - কলেজ থেকে সহকর্মীদের দৌড়, বাড়ি থেকে পরিবারের সদস্যদের দৌড় - অবশেষে সেই রাতেই মধুসূদনের ছাড়া পাওয়া - রেলের কোটায়, রেলের আধিকারিকেরাই টিকিট বুক করে দিলেন। আমরা লখনৌ পৌঁছেছি ভোরে, আর মধুসূদন এসে যোগ দিল বিকেল সন্ধের মুখে।

    আর একবার হলদিয়া ডকে আমরা ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে জাহাজ দেখছিলাম। ডকে ঘোরার অফিসিয়াল পারমিশন ছিল। তখন কলেজে যোগ দিয়েছি, হয়তো বছর দুয়েক হবে। হঠাৎ দলের এক সদস্য একটা বিদেশি জাহাজের ডেকে দাঁড়ানো কর্মীকে জিজ্ঞেস করল - ভেতরটা দেখা যাবে? সে বলল - অবশ্যই, ওয়েলকাম। এতে যে কোন সমস্যা হতে পারে, আমাদের ধারণায় আসেনি। বয়সটা তিরিশে পৌঁছয়নি তখনও। একটা সরু লোহার সিঁড়ি বেয়ে ছেলেমেয়েরা যেই উঠতে শুরু করেছে, সঙ্গে সঙ্গে আর্মি ছুটে এসে আমাদের নামিয়ে দিল। তারপর টিচার হিসেবে আমরা তাঁদের কাছে খুবই বকুনি খেলাম, নিজেরাও মরমে মরে গেলাম। ঘটনা হচ্ছে, আমরা তো জানিনা যে, ডকে দাঁড়ানো জাহাজের ভেতরে আমাদের দেশের আইন কানুন খাটেনা। যে দেশের জাহাজ - সেই দেশের আইন চলে। ফ্ল্যাগ স্টেট জুরিসডিকশন ও টেরিটোরিয়াল ওয়াটার্স - এই আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী, কোনো দেশের বন্দরে আন্তর্জাতিক জাহাজ দাঁড়িয়ে থাকলেও, জাহাজের ডেভিস বা ভেতরের অংশটি সংশ্লিষ্ট যে দেশের পতাকা বহন করছে, সেই দেশের সার্বভৌম ভূখণ্ড বলে গণ্য হয়। মাসের পর মাস জলে থাকা নাবিকেরা যদি আমাদের নামতে না দেয়, আমরা তো সরকারের অনুমতি নিইনি - সরকার তো জানবেওনা আমরা কোথায় গেলাম। আর্মিকে আজও আমি মনে মনে ধন্যবাদ জানাই।

    পাহাড় থেকে নিরাপদে নামার জন্য যেমন বায়োমেকানিক্স বা ‘হিউম্যান-মেকানিক্যাল ফ্রিকশন ব্রেক’-এর কারিগরি দক্ষতা শিখে রাখাটা দরকার, ঠিক তেমনই আমরা যে সমাজে এবং রাষ্ট্রে বাস করছি, করে কম্মে খাচ্ছি, তার আইনগত পরিধি সম্পর্কে সচেতন থাকাটাও ভৌগোলিকের জন্য সমান জরুরি। প্রাকৃতিক নিয়ম বা প্রকৃতির তৈরি আইন মানায় ত্রুটি হলে যেমন প্রকৃতি ক্ষমা করে না, তেমনই রাষ্ট্রের আইন না মানলে সমাজ ক্ষমা করে না। দুটি ক্ষেত্রেই ল্যাটিন প্রবাদটি সত্যি - ‘Ignorantia juris non excusat’ "আইন সম্পর্কে অজ্ঞতা কোনো অজুহাত নয়"।

    পরের ঘটনা যেটা বলতে যাচ্ছি, সেটা হল দীঘা ফিল্ডে, আর সেইবারই সাইট সীয়িংয়ে গিয়ে উড়িষ্যার তালসারিতে। তখন সবে আগের বছর আমি আর বল্লরীদি এক মাস আগে পরে কলেজে যোগ দিয়েছি - হরিহর আত্মা। বাংলার বর্ষীয়ান অধ্যাপক শ্যামল বাবু শারদা, বল্লরী আলাদা না বলে একসঙ্গে দুজনকে শাল্লরী বলে ডাকতেন।

    সেবারে আমাদের সার্ভে গ্রামের নাম ছিল গোবিন্দবসান। নির্ধারিত দিনে মৌজা ম্যাপ দেখে দেখে এগিয়ে চললাম সার্ভে করতে। অর্ধেক রাস্তা গিয়ে দেখি সামনে উত্তুঙ্গ বালির পাহাড় - মানে বেশ বড়সড় একটা বালিয়াড়ি, কিন্তু সেটা ম্যাপে নেই। মানে আছে কিন্তু ঠিক সেই জায়গায় নেই। ব্যাপারটা কী দেখতে হচ্ছে। কিছুক্ষণ চেষ্টা চরিত্র করে সেই ঝুরঝুরে বালির পাহাড়ের মাথায় যেই না চড়েছি, একটা ভেজা দমকা নোনা বাতাসের ধাক্কা লাগল চোখে মুখে। ওমা! সামনে নীল সাগরের ঊর্মিমালা। কিন্তু ম্যাপে দেখাচ্ছে গ্রামের জমি আরও অনেকটা বিস্তৃত, সমুদ্র বেশ দূরে। আসলে ইংরেজ আমলে মানচিত্র তৈরির সময় যেমন ছিল সেটাই আঁকা রয়েছে। কিন্তু এখন ২০০০ সালে সেটা নেই। গ্রাম ছোট হয়ে গেছে। চোখের সামনে সিভিয়ার কোস্টাল ইরোশন দেখে সবাই হতবাক। আমরা তখন যদিওবা টীচার, স্টুডেন্টদের থেকে খুব বেশি বয়সে বড় তো নই - আর সেই আমাদের অত বড় আবিষ্কার! শাল্লরীর মন তখন ডানা মেলে উড়ছে। সী ফেসিংয়ে বালিয়াড়ি ভেঙে ভেঙে জায়গায় জায়গায় ভিতরের গঠন বেরিয়ে পড়েছে। মানে যে সময়ে যেমনভাবে বাতাস বয়েছে, সেভাবে বালি এসে জমেছে। কোথাও প্যারালাল স্ট্রাকচার, কোথাও ক্রিসক্রস বা ক্রস বেডিং দেখা যাচ্ছে। ছেলেমেয়েরা মহানন্দে সেগুলো খুঁজে বেড়াতে লাগলো, আর রিজ লাইন বরাবর আমরা দুজন এগিয়ে গেলাম একটু দূরে। একটা জায়গায় পাথর দিয়ে নিচু দেয়ালের মত সাজানো, মনে হচ্ছে ভিউ পয়েন্ট। সেখানে পৌঁছে দেখি জায়গাটা বেরিয়ে আসা স্পার, ঝুলন্ত বারান্দার মত, তলায় আন্ডারকাট আছে, মানে তলার বালি খেয়ে গেছে। হয়তো যখন পাথর সাজানো হয়েছিল, তখন বালির ঢালটা উল্লম্ব ছিল, এখন নেগেটিভ ঢাল হয়ে গেছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক যেটা, সেটা হল অনেক নিচে সমুদ্রের ঢেউগুলো এত জোরে আছড়াচ্ছে আর ঘুরপাক খাচ্ছে, যে জলের ছিটে আমাদের গায়ে লাগছে। একবার নিচে তাকিয়ে মনে হল - এ যেন যমুনার জলে হওয়া এক অবিরাম যুদ্ধ যাতে কালীয় নাগের ফণাগুলো আক্রোশে ফোঁসফোঁস করে চলেছে। আমরা সেই বালি - ছাদের পাথুরে আলসের পাশে দাঁড়িয়ে অলস গল্প জুড়লাম, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, আমার বামপাশে সমুদ্র, বল্লরীদির ডানপাশে। ক্ষণিকের মধ্যে পলক ফেলার আগেই মনে হল বাঁপাশে একটা বিশাল কালো অন্ধকার ধেয়ে আসছে, মস্তিষ্ক সময় পায়নি, সুষুম্না ক্রিয়া মানে পরিবর্ত ক্রিয়ায় আমি একটা বিশাল লাফ দিলাম ডানপাশে। এর আগে কখনও অমন লাফাইনি, পরে তো প্রশ্নই ওঠেনা। বাঁকাধে যেন একটা ভয়ানক জোরে থাপ্পড় এসে পড়ল, আমি তো পুরো বেসামাল। সম্বিৎ ফিরলে বুঝতে পারলাম, যে বিশাল একটা ঢেউ এসে আমাদের আক্রমণ করেছিল। এত ওপরে যে ঢেউ উঠতে পারবে, সেটা আমরা কল্পনা করতে পারিনি। নিজের সম্বিৎ ফিরে পাবার পর বল্লরীদির কী হল এই ভেবে কেঁপে গেলাম, দেখলাম বল্লরীদি যেখানে ছিল সেখানেই ভিজে চুপচুপে হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেন একটা মূর্তি - বিশাল ঢেউটা ওর মাথার ওপর দিয়ে চলে গেছে। আমি কোনরকমে ছুটে গিয়ে ওকে দুহাতে ধরে ঝাঁকিয়ে দিয়েছি। তারপরে দেখি নড়ে উঠলো। আমি বললাম তুমি তখন দাঁড়িয়ে রইলে কেন? সরে যাবে তো! বল্লরীদি বলল, আমি ভেবেছি - আমি তো লম্বা, ঢেউয়ে কিছু হবেনা। আমি তো তাজ্জব, বললাম, তুমি নিজেকে সমুদ্রের চেয়ে লম্বা কীকরে ভাবলে? এইখানে কাহিনী মে কুছ টুইস্ট হ্যায় - মানে কুছ হিস্টোরিকাল ফ্যাক্ট হ্যায়। বল্লরীদি সত্যিই বাঙালি মেয়ের গড় থেকে মাথায় অনেকটাই বেশি উঁচু, এদিকে আমি উল্টো - খর্বকায়। নিজেরাই নিজেদের নাম নিয়েছিলাম পেনসিল - রবার। আর স্টুডেন্টরা আরও এক কাঠি সরেস। তারা হেসে হেসে বলেছিল, ম্যাডাম, আপনাদের আমরা নাম দিয়েছি এল. এম. আর বি. এম. - মানে হচ্ছে বল্লরী ম্যাম হলেন ল্যান্ড মার্ক আর শারদা ম্যাম হলেন বেঞ্চ মার্ক। এক্কেরে সাচ্চা ভূগোলের ছাত্র - আমরা তো হেসে খুন। তবে ফিল্ড উজিয়ে এই গল্প যখন কলেজের স্টাফ রুমে এল, তখন বিপদের আশঙ্কা, আমাদের অবিমৃশ্যকারিতা সব বাদ দিয়ে ‘বল্লরী সমুদ্রের চেয়ে লম্বা’ - এই তথ্যই মুখ্য হয়ে উঠলো। অট্টহাসির ঢেউ উঠতে লাগলো। আজ সিকি শতাব্দী পরেও আর্জি আসে - অ্যাই শারদা - ‘সমুদ্রের চেয়ে লম্বা’ টা প্লিজ বলো। আমার আবার একটু হাত পা নেড়ে, অভিব্যক্তি দিয়ে গল্প বলায় নামডাক আছে। হাজারো বার শোনা গল্প আবার শোনাই। বল্লরীদি রেগে যায়। এবার যে এই গল্পটা আমি স্টাফরুমের বাইরে ফাঁস করলাম, বল্লরীদির সজোর চাঁটি থেকে কেউ আমাকে বাঁচাতে মনে হয় পারবেনা।

    কিন্তু হাসি মজার আড়ালে একটি গভীর সত্য আছে - যার প্রভাবে দীঘার নোনা জলে ভেজা বালুকাবেলা আর রোদ্দুরে পোড়া মাঠা পাহাড়ের নেড়া ঢাল পাশাপাশি একই মঞ্চে দাঁড়াতে বাধ্য হয়। গ্রামবাসীরা শুনিয়েছিলেন সেই কাহিনী - মাঠে ঘাটে হাটে বাটে পাওয়া সেইসব জ্ঞান না পেলে, পুঁথির মুক্তো ফেলে ঝিলিক ঝিলিক ঝিনুক না কুড়োলে আজ আমাদের ভৌগোলিক হওয়া হতনা।



    চলবে...
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ধারাবাহিক | ২৫ জুলাই ২০২৬ | ৫৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে মতামত দিন