এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  প্রবন্ধ

  • বিমানের ওভারবুকিং, এক জেদি অর্থনীতিবিদ, আর যাত্রীর মনের গোপন হিসেব

    সুকান্ত ঘোষ লেখকের গ্রাহক হোন
    প্রবন্ধ | ২৫ জুলাই ২০২৬ | ৫ বার পঠিত
  • সেবারে নিউ ইয়র্ক্কের জে এফ কে এয়ারপোর্ট দিয়ে কানেক্টিং ফ্লাইট ছিল। আমষ্টারডাম থেকে নিউ ইয়র্ক হয়ে নিউ অর্লিন্স যাব। বিকেল প্রায় পাঁচটা বাজছে তখন, বোর্ডিং গেটের সামনে বসে আছি। পাবলিকের অবস্থা যেমন হয়, তেমনি আর কি। লোকজন হাঁটু মুড়ে বসে আছে, কেউ ফোনে মুখ গুঁজে, কেউ ঝিমোচ্ছে, কারও কোলে ঘুমিয়ে পড়া বাচ্চা। এমন সময় গেটের মাইকে ভেসে এল সেই ঘোষণা, যা মার্কিন মুলুকে বেশ পরিচিত - “আজকের এই ফ্লাইটে আসনের তুলনায় যাত্রী কিছু বেশি হয়ে গেছে। কেউ যদি স্বেচ্ছায় পরের ফ্লাইটে যেতে রাজি থাকেন, আমরা তাঁকে দু-শো ডলারের ভাউচার দেব।” একটু থেমে ভদ্রমহিলা যোগ করলেন, রাতটুকু থাকার হোটেল আর খাওয়াও এয়ারলাইন্সের তরফে। আমি একটু দূরে বসে, কফির কাপ হাতে, তামাশা দেখার আশায় নড়েচড়ে বসলাম। নিজে যাচ্ছি অফিসের কাজে, তাই ভাউচারের চক্করে যাবার প্রশ্নই নেই।

    দু-শো ডলারে কেউ নড়ল না। মিনিট পাঁচেক বাদে সংখ্যাটা হল চারশো। তারপর ছশো, তারপর আটশো। মজার ব্যাপার হল, আটশো ডলারেও গেটের সামনে যেন কারও কিছু এসে গেল না। মনে মনে ভাবি - আটশো ডলার তো কম টাকা নয়, ভারতীয় ছেড়ে দিন, আমেরিকার মতো মধ্যবিত্ত হিসেবি লোকের কাছেও আটশো ডলার অনেকটাই টাকা। অথচ কেউ লাইন দিয়ে দৌড়ে এসে হাত তুলছে না। সংখ্যাটা যখন এক হাজার ছাড়াল, তখন একজন যুবক আলস্য করে হাত তুলল বটে, কিন্তু বাকিরা তখনও নির্বিকার। শেষমেশ পনেরো-শো পেরিয়ে যখন ব্যাপারটা প্রায় দু-হাজারের ঘরে পৌঁছল, তখন গুটিকয় লোক এগিয়ে এল। আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম - এ কেমন বাজার, যেখানে দোকানি দাম বাড়াচ্ছে, আর খদ্দের হাত গুটিয়ে বসে আছে?

    এই দৃশ্যটা আমাকে বহুদিন ধরে ভাবায়। কারণ সেই প্রথম বার দেখছি এমন ঘটনা এমন নয়। বরং উল্টো – আমি নিজেও সেই ছাত্র অবস্থা থেকে এই ওভারবুকিং এর সুযোগ পেয়েছি বা নিয়েছি অনেকবার যখন ব্যক্তিগত এয়াত ট্রাভেল করতে হত। মনে আছে প্রথম বার লণ্ডনের হিথরো থেকে ব্রিটিশ এয়ারওয়াজের কাছ থেকে চারশো পাউন্ড আর রাতে হোটেলের থাকা পেয়ে সে কি আনন্দ! তখন ছাত্র অবস্থায় চারশো পাউন্ড অনেক টাকা, তার উপর রাতে লন্ডনে হোটেল ফ্রী! আর কি চাই! পরের বার থেকে মনে মনে প্রত্যাশা বেড়ে গিয়েছিল ওভারবুকিং সুবিধা পাব কিনা সেই নিয়ে!

    তাহলে সেদিন নিউ ইয়র্কে প্রথম থেকেই কেউ এগিয়ে এল না কেন? আসলে ব্যাপারটা যতটা সহজ মনে হয়, ততটা সহজ নয়। এর পিছনে আসলে দুটো আলাদা গল্প লুকিয়ে আছে। এক নম্বর গল্পটা হল অঙ্কের আর অর্থনীতির - এয়ারলাইন্স আদৌ আসনের চেয়ে বেশি টিকিট বেচে কেন, আর সেই ঝুঁকির হিসেবটা তারা কষে কীভাবে। আর দু-নম্বর গল্পটা হল নিটোল মনস্তত্ত্বের - আটশো, হাজার, পনেরো-শো ডলার সামনে ঝোলানো সত্ত্বেও মানুষ কেন হাত গুটিয়ে থাকে, আবার ঠিক কোন জায়গায় গিয়ে তার মন গলে যায়। তো এই দুটো সুতো ধরেই আজ একটু টানাটানি করা যাক - কারণ এর ভিতরে এক জেদি অর্থনীতিবিদ আছেন, গোলাপ ফুল আছে, একজন ডাক্তারের ভাঙা দাঁত আছে, আর আমার-আপনার সময়ের অলিখিত দাম তো আছেই।
     

    খালি আসনের অর্থনীতি

    প্রথমে খালি আসনের সমস্যাটা বুঝে নেওয়া দরকার। IATA যখন গম্ভীর মুখে বলে ওভারবুকিং ‘রোজগারের ক্ষতি আটকায়’, কথাটা নমনীয় টিকিটের বেলায় সত্যি, কিন্তু সস্তা ফেরত-না-হওয়া টিকিটের বেলায় খানিকটা কথার কারিকুরি। সোজা বাংলায়, ‘প্রতিটি খালি আসন মানেই হারানো টাকা’ - এই চালু বুলিটা আসলে আধখানা সত্যি, পুরোটা নয়। একটু তাহলে তলিয়ে দেখা যাক ব্যাপারটা।

    খালি আসন মানেই এয়ারলাইন্সের লোকসান, এই দাবি শুনে অনেকের মনে একটা সোজাসাপ্টা প্রশ্ন জাগে, সেটা হল - বিমানের টিকিট তো লোকে আগেভাগেই পয়সা দিয়ে কেটে রাখে; কেউ শেষমেশ না এলে তার টাকাটা তো এয়ারলাইন্সের ঘরেই থেকে গেল - তাহলে লোকসানটা হল কোথায়? কথাটা ফেলনা নয়। সাধারণ সস্তা টিকিট, যেগুলোর টাকা ফেরত পাওয়া যায় না। সেই টিকিটের যাত্রী যদি প্লেন না ধরেন, ভাড়াটা এয়ারলাইন্সের পকেটেই থেকে যায়। উলটে ওই যাত্রীকে আকাশে বইতে গিয়ে যেটুকু জ্বালানি আর খাবারের খরচ হত, সেটাও বাঁচল। মানে এই ধরনের ‘নো-শো’ এয়ারলাইন্সের কাছে লোকসান তো নয়ই, বরং খানিক বাড়তি লাভ।

    তাহলে সত্যিকারের টাকা গলে যাবার রাস্তাটা কোথায় এয়ারলাইন্সের হাত থেকে? গোটা রহস্যের চাবি লুকিয়ে টিকিটের ধরনে। মোটা দাগে দু-রকম টিকিট। একরকম হল সস্তা, আগে-কাটা, শর্তে-বাঁধা - যেগুলোয় টাকা ফেরত নেই; যাত্রী না এলে পুরো ভাড়াটাই মাটি প্যাসেঞ্জারের, আরেকরকম হল গিয়ে পুরো দামের, ফ্লেক্সিবল টিকিট, যেগুলোয় বাতিল করলে টাকা ফেরত পাওয়া যায়; এই দলে পড়ে বেশিরভাগ বিজনেস আর ফার্স্ট ক্লাস, আর দামি ইকনমি। এয়ারলাইনের আসল সমস্যা এই দ্বিতীয় দলে যেখানে যাত্রী টিকিটের বেশীর ভাগ দামটা ফেরত নিয়ে চলে যান, অথচ আসনটা খালি উড়ে যায়। কারণ সেই ক্যানসেলেশন গুলো এত শেষ মুহূর্তে এসে পড়ে যে আসনটা আর নতুন করে বেচার সময়টুকুও মেলে না। মজার কথা, খোদ এয়ারলাইন্সদের সংগঠন IATA-ও কিন্তু ঘুরিয়ে এই দুটো ক্ষেত্রকেই ‘আসল’ লোকসান বলে মেনে নেয়। আপনার-আমার কাছে প্রথম ক্ষেত্রের ব্যাপারটা একদমই এয়ারলাইনের লোকসান নয়, কারণ প্যাসেজঙার তো টাকা আগেই মিটিয়ে দিয়েছে।

    সংখ্যায় ফেললে ব্যাপারটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। ধরুন একশো আসনের প্লেন, প্রতি টিকিট দুশো ডলার, আর অভিজ্ঞতা বলছে গড়ে দশজন আসেন না। প্রথমে সস্তা, ফেরত-না-হওয়া টিকিটের কথা ভাবুন। এয়ারলাইন্স যদি ঠিক একশোটা টিকিটই বেচে, তাহলে দশজন না এলেও ঘরে ঢোকা কুড়ি হাজার ডলার পুরোটাই থাকল - নব্বইজন উড়লেন, দশটা আসন খালি গেল, কিন্তু একটা পয়সাও লোকসান হল না। এবার ধরুন তারা সাহস করে একশো দশটা টিকিট বেচল - ঘরে এল বাইশ হাজার, দশজন এলেন না, একশোজন উড়লেন। বাড়তি দু-হাজার ডলার সোজা লাভ। খেয়াল করুন, এটা কিন্তু লোকসান পুষিয়ে নেওয়া নয় - এটা একই আসন কার্যত দু-বার বেচে বাড়তি রোজগার।

    এবার উলটোদিকটা দেখুন - ফেরতযোগ্য দামি টিকিট। এয়ারলাইন্স একশোটা বেচল, কিন্তু দশজন শেষ মুহূর্তে বাতিল করে টাকা ফেরত নিয়ে নিলেন (সরল করার জন্য ক্যান্সেলেসন ফি টা ধরছি না)। এবার সত্যি সত্যি দু-হাজার ডলার বেরিয়ে গেল, দশটা আসনও খালি - একমাত্র এইখানেই সবজিওয়ালার গল্পটা অক্ষরে অক্ষরে খাটে। আর তারা যদি এই ক্ষেত্রেও একশো দশটা বেচে রাখত, তাহলে ওই ফেরত-যাওয়া টাকাটা ঠিক পুষিয়ে যেত। মোদ্দা কথা দাঁড়াল - দু-ক্ষেত্রেই ওভারবুকিং আয় বাড়ায়, কিন্তু আক্ষরিক ‘লোকসান’ বলতে যা বোঝায়, তা ঘটে কেবল ওই ফেরতযোগ্য টিকিটের বেলায়।

    এখানে একটা সূক্ষ্ম কিন্তু জরুরি কথা মনে রাখা দরকার। একটা ফ্লাইট একবার ঠিক হয়ে গেলে তার খরচের প্রায় গোটাটাই বাঁধা - জ্বালানি, পাইলট-ক্রু, ল্যান্ডিং ফি, এসব একজন যাত্রী বেশি না কম হলে বিশেষ বদলায় না। বাড়তি একজনকে বওয়ার খরচ নেহাতই সামান্য। ফলে এই কারবারে ‘লোকসান’ মানে পকেট থেকে বেরিয়ে যাওয়া নগদ নয়; ‘লোকসান’ মানে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া রোজগারের সুযোগ। আর তাই একটা ফেরত-না-হওয়া নো-শো তখনই সত্যিকারের লোকসান, যখন ওই আসনটা অন্য কাউকে বেচা যেত - মানে চাহিদা ছিল, কাউকে হয়তো ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, বা স্ট্যান্ডবাই লাইনে কেউ দাঁড়িয়ে ছিলেন। অর্ধেক ফাঁকা প্লেনে ওই একই নো-শোতে এয়ারলাইন্সের কানাকড়িও যায় না, উলটে সিকি-আধুলি জ্বালানিই বাঁচে।


    ওভারবুকিং কীসের জন্য - লোকসান, না লোভ?

    এবার সোজা প্রশ্নের সোজা উত্তর। ওভারবুকিং মূলত বেশি রোজগারের ধান্দা - লোকসান ঠেকানোর কোনও মহানুভবতা নয়। টিকিট বিক্রির গোটা সময়টা জুড়ে একই আসন বারবার বেচে, একটা আন্দাজ-করা অংশ যে শেষমেশ আসবে না সেই বাজি ধরে, এয়ারলাইন্স আয়টাকে যতদূর সম্ভব টেনে তোলে। IATA যখন গম্ভীর মুখে বলে ওভারবুকিং ‘রোজগারের ক্ষতি আটকায়’, কথাটা নমনীয় টিকিটের বেলায় সত্যি, কিন্তু সস্তা ফেরত-না-হওয়া টিকিটের বেলায় খানিকটা কথার কারিকুরি।

    অর্থাৎ যাঁরা সন্দেহ করেন যে গোটাটা আসলে লোকসানের কান্না নয়, বরং বেশি মুনাফার কৌশল, তাঁরা মোটের উপর ঠিকই ধরেছেন। তবে ব্যাপারটাকে নিছক এয়ারলাইন-বিদ্বেষ দিয়েও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফেরতযোগ্য টিকিটের বাতিলে আর অবিক্রিত-থেকে-যাওয়া শেষ-মুহূর্তের বাতিলে সত্যিই টাকা গলে যায়, ওভারবুকিং সেই গলে যাবার পথটা বন্ধ করে। আবার প্লেন ভরে উড়লে ওই বাঁধা খরচটা বেশি লোকের ঘাড়ে ভাগ হয়ে গড়পড়তা ভাড়াও খানিক কমে আসতে পারে। তাই এ হল মুনাফা-খোঁজা কৌশল, যা ঘুরপথে যাত্রীরও কিছুটা উপকার করে - দুটো কথাই একসঙ্গে সত্যি। সোজা বাংলায়, ‘প্রতিটি খালি আসন মানেই হারানো টাকা’ — এই চালু বুলিটা আসলে আধখানা সত্যি, পুরোটা নয়।


    বিজনেস ক্লাস বনাম ইকনমি - আসল ফারাকটা এখানেই

    এবার সেই জায়গা, যেখানে ছবিটা সবচেয়ে চোখে পড়ে। টিকিটের শর্ত ক্লাস অনুযায়ী আকাশ-পাতাল আলাদা। বিজনেস, ফার্স্ট আর পুরো-দামের ইকনমি সাধারণত ফেরতযোগ্য, সহজে বদলানো যায়, কাটাও হয় দেরিতে - আর এঁদের পরিকল্পনাই সবচেয়ে গোলমেলে। মিটিং পিছোয়, ডিল ভাঙে, ফিরতি সূচি ওলটপালট হয়। মানে ঠিক এই টিকিটগুলোর বাতিলই সবচেয়ে বেশি ওই ‘টাকা-ফেরত-দেওয়া খালি আসনের’ লোকসান বানায়। উলটোদিকে ছুটিতে-বেড়াতে-যাওয়া লোকের সস্তা ইকনমি টিকিট ফেরত হয় না, কাটা হয় আগেভাগে - বাতিল করলে ভাড়া মাটি, তাই এয়ারলাইন্সের গায়ে আঁচড়টুকুও লাগে না। ফলে সত্যিকারের রোজগার গলে যাবার ঝুঁকিটা মূলত প্লেনের সামনের সারিতে আর দামি ইকনমিতে জমাট বাঁধে।

    তবে সাবধান, ছবিটা একমুখী নয়। একজন রোজকার ব্যবসায়ী যাত্রী হয়তো তাঁর সকাল আটটার বাঁধা ফ্লাইটে দিব্যি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ - তিনি হয়তো কমই নো-শো করেন। কিন্তু তাঁর পরিকল্পনা বদলালে ফেরতযোগ্য টিকিট তাঁকে বিনা ঝামেলায় বাতিল বা রিবুক করতে দেয়, আর সেখানেই টাকা গলে - যা একটা বাজেয়াপ্ত সস্তা টিকিটে প্রায় হয়ই না। দুটো আলাদা জিনিস গুলিয়ে ফেললে চলবে না - কে বেশি নো-শো করেন, আর কার নো-শোতে এয়ারলাইন্সের টাকা ফেরত যায়।

    এই কারণেই রেভিনিউ ম্যানেজমেন্টের গবেষকরা বাতিল, নো-শো আর ফেরতকে ক্লাস ধরে ধরে আলাদা করে হিসেব করেন। সুব্রামানিয়ান, স্টিডহ্যাম আর লাউটেনবাখারের ১৯৯৯ সালের এক নামকরা গবেষণায় তো দেখানো হয়েছে, ফেরতের নিয়ম আলাদা বলে কখনও কখনও কম-দামের একটা টিকিট নিয়ে বেশি-দামের একটা টিকিট ফিরিয়ে দেওয়াও এয়ারলাইন্সের পক্ষে লাভের হতে পারে — শুনতে উলটো ঠেকলেও অঙ্কে ঠিক। তাই ওভারবুকিং কতটা করা হবে, সেটাও এক-এক ক্লাসের জন্য এক-এক রকম, কোনও ঢালাও সংখ্যা নয়। আর একটা হালফিলের কথা: ২০২০ সালের পর মার্কিন বড় এয়ারলাইন্সগুলো সাধারণ ইকনমিতে টিকিট বদলের ফি অনেকটাই তুলে দিয়েছে (তবে একদম তলার ‘বেসিক ইকনমি’-তে নয়)। ফলে সাধারণ ইকনমির নো-শো যাত্রী পরে অন্য ফ্লাইটে রিবুক করলে টাকাটা ক্রেডিট হয়ে এয়ারলাইন্সের ঘরেই থাকে - তবু লোকসান নয়। দুই ধারে পড়ে থাকে কেবল বেসিক ইকনমির পুরো-বাজেয়াপ্ত, আর নমনীয় টিকিটের পুরো-ফেরত।


    ওভারবুকিং এর সার-কথা

    সব মিলিয়ে গোড়ার ভিত্তিটা তাহলে এই রকম দাঁড়ায় - ওভারবুকিং আসলে নো-শো-তে হারানো টাকা উদ্ধারের গল্প নয়; কারণ ফেরত-না-হওয়া নো-শোতে এয়ারলাইন্সের কিছুই যায় না, ভাড়া তাদের পকেটেই থাকে, উলটে সামান্য খরচ বাঁচে। এটা আসলে যতটা সম্ভব বেশি আয় তোলার কৌশল। আসন পচনশীল, ফ্লাইটের খরচ বাঁধা, তাই এয়ারলাইন্স একই আসন কার্যত বারবার বেচে দেয় এই বাজি ধরে যে টিকিটধারীদের একটা আন্দাজ-করা অংশ, বিশেষ করে বিজনেস আর প্রিমিয়াম কেবিনে জমে থাকা ওই পরিকল্পনা-নমনীয় ফেরতযোগ্য টিকিটের যাত্রীরা, শেষমেশ আসনটা কাজে লাগাবেন না। সত্যিকারের রোজগার হাতছাড়া আসে ফেরতযোগ্য বাতিল আর অবিক্রিত শেষ-মুহূর্তের বাতিল থেকে। ওভারবুকিং সেই হাতছাড়া বন্ধ করে, আবার বাড়তি বিক্রিও ঘরে তোলে। গোটা ভারসাম্যটা রাখতে হয় সেই খরচের সঙ্গে, যা বেশি লোক এসে পড়লে কাউকে বসিয়ে দিয়ে ক্ষতিপূরণ দিতে গিয়ে লাগে, আর সেখান থেকেই তো জন্ম নেয় গেটের সামনের সেই নিলাম।

    এয়ারলাইন্স যতজ ওভারবুকিং এ থাকা পাবলিককে সেই ফ্লাইটে জায়গা দিতে পারবে না সেই সামলাতে গিয়ে গুনতে হবে মোটা ক্ষতিপূরণ। গোটা খেলাটাই তাই দাঁড়িয়ে আছে একটাই প্রশ্নের উপর - ঝুঁকিটা ঠিক কতখানি নেওয়া নিরাপদ? কোনও নির্দিষ্ট ফ্লাইটে ঠিক কতজন আসবেন না, তা কেউ আগে থেকে নিশ্চিত জানে না - সংখ্যাটা একটা সম্ভাবনার বণ্টন মেনে ওঠানামা করে। ফলে এয়ারলাইন্সকে একটা বেশ ফাইন মার্জিনের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হয়। বেশি রক্ষণশীল হলে আসন খালি যাবে (একে বলে ‘স্পয়েল্ড সিট’), আর বেশি লোভী হলে গেটে গিয়ে যাত্রী উপচে পড়বে। আগে এই হিসেব হত সরল ভাবে - পুরোনো ফ্লাইটের গড় দেখে। এখন প্রতিটি ফ্লাইটের জন্য আলাদা করে নো-শো আঁচ করা হয় মেশিন লার্নিং দিয়ে - কোন রুট, কোন দিন, কোন মরসুম, টিকিটের দাম, যাত্রীর অতীত অভ্যেস, এমনকি আবহাওয়া। কারিগরি যত উন্নত হয়েছে, যাত্রী ফেলে যাওয়ার হারও তত কমেছে। কিন্তু হিসেব উলটে যাওয়ার দিন আজও আসে - আর ঠিক তখনই জন্ম নেয় সেই গেটের সামনের নাটক।


    দাড়ি কামাতে কামাতে এক আইডিয়া

    এবার আমাদের গল্পের আসল মানুষটির কথায় আসা যাক। ভদ্রলোকের নাম জুলিয়ান সাইমন - ইনি কিন্তু গোদা, বাঁধা-ছকের অর্থনীতিবিদ ছিলেন না। নিজেকে বলতেন ‘অপ্রথাগত অর্থনীতিবিদ’, আর মজা করে স্বীকার করতেন যে জীবনে ডেমোগ্রাফির একটাও ক্লাস করেননি, আর অর্থনীতির ক্লাস করেছেন সাকুল্যে দুটো! স্নাতক স্তরে তাঁর বিষয় ছিল মনোবিজ্ঞান, ডক্টরেট বিজনেস অ্যাডমিনিষ্ট্রেশনে। নিউ ইয়র্কে খানিকদিন বিজ্ঞাপনের ব্যবসা, তারপর ডাকযোগে জিনিসপত্র বেচার (মেল-অর্ডার) কারবার চালিয়ে শেষে তিনি এসে পড়েছিলেন অধ্যাপনায়। এই এলোমেলো, নানা-লাইনে-ঘোরা জীবনটাই বোধহয় তাঁকে বাঁধা ছকের বাইরে ভাবতে শিখিয়েছিল। বাজার আর মানুষের আচরণ - এই দুটো তিনি বুঝতেন বেশ ভালো ভাবে।
    সময়টা ষাটের দশকের মাঝামাঝি, ১৯৬৫ কি ১৯৬৬। এক পার্টিতে সাইমন কারও মুখে একটা দুঃখের কাহিনি শুনছিলেন - কীভাবে ভদ্রলোককে হঠাৎ প্লেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আর তার ফলে কী দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছিল। সেই আমলে ব্যাপারটা এমনই ছিল - প্লেনে বেশি লোক হয়ে গেলে এয়ারলাইন্স নিজের খেয়ালখুশি মতো কিছু যাত্রীকে বেছে নিয়ে বলত, “আপনি আজ যেতে পারবেন না।” কোনও দর-দাম নেই, কোনও রফা নেই - নেহাত কপাল খারাপ। পরদিন সকালে দাড়ি কামাতে কামাতে সাইমনের মাথায় হঠাৎ একটা কথা খেলে গেল - এর চেয়ে ভালো উপায় নিশ্চয়ই আছে। জোর করে কাউকে নামানোর দরকারটাই বা কী? এমন একটা বাজার তো বসানো যায়, যেখানে অপেক্ষা করতে যাঁর সবচেয়ে কম আপত্তি, তিনিই স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়াবেন।

    সাইমনের সমাধানটা ছিল আশ্চর্য সরল। ধরা যাক প্লেনে দু-জন যাত্রী বেশি হয়ে গেছে। গেটের কর্মী প্রত্যেক যাত্রীর হাতে একটা করে খাম আর কাগজ ধরিয়ে বলবেন - “আপনি লিখুন, ন্যূনতম কত টাকা পেলে আপনি খুশিমনে পরের ফ্লাইটে যেতে রাজি আছেন।” সবাই নিজের নিজের সংখ্যা লিখে দেবেন। যিনি সবচেয়ে কম টাকা চাইলেন, তাঁকে সেই টাকা নগদে দিয়ে পরের ফ্লাইটের টিকিট ধরিয়ে দেওয়া হবে। বাকি সবাই নিশ্চিন্তে প্লেনে উঠে গন্তব্যে পৌঁছবেন। কেউ ঠকল না, সবাই লাভবান হল - যাঁর তাড়া বেশি, তিনি নিজের আসন রাখলেন; আর যাঁর তাড়া কম, তিনি খানিকটা টাকা কামিয়ে নিলেন। এই ধরনের নিলামকে বলা হয় ‘উলটো নিলাম’ বা ‘রিভার্স অকশন’ - সাধারণ নিলামে দাম উপরে ওঠে, এখানে সবচেয়ে কম দর হাঁকা মানুষটিই জেতেন।

    ১৯৬৮ সালে সাইমন এই ভাবনাটা দু-পাতার এক ছোট্ট প্রবন্ধে লিখে ফেললেন - ‘জার্নাল অফ ট্রান্সপোর্ট ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিসি’-তে। প্রবন্ধের নামটাও তাঁর রসবোধের পরিচয় দেয়, ‘অ্যান অলমোস্ট-প্র্যাকটিক্যাল সলিউশন টু এয়ারলাইন ওভারবুকিং’, অর্থাৎ ‘বিমান ওভারবুকিং-এর একটি প্রায়-বাস্তবসম্মত সমাধান’। এবার লক্ষ্য করুন, নামের মধ্যে ওই ‘প্রায়’ শব্দটা কিন্তু সাইমন এমনি এমনি বসাননি। তিনি নিজেই জানতেন, কাগজে-কলমে ঝকঝকে এই আইডিয়াটা বাস্তবে চালাতে গেলে খুচখাচ ঝামেলা আছে - লোকে দর লিখতে গিয়ে ইতস্তত করবে, দু-একজন চালাকির চেষ্টা করবে, গেটে খানিক সময় লাগবে। তাই নির্লজ্জ ভাবে ‘সমাধান’ না বলে তিনি সততার সঙ্গে লিখলেন ‘প্রায়-সমাধান’। এই বিনয় আর আত্ম-পরিহাসটুকুই লোকটার আসল পরিচয়।


    স্টিগলার, ফ্রিডম্যান আর বারো বছরের গোঁ

    এখন ভাববেন না, এত সুন্দর আইডিয়া, নিশ্চয়ই সবাই লুফে নিল। বাস্তবে হল ঠিক উলটোটা। প্রবন্ধটা ছাপাতেই সাইমনকে কালঘাম ছোটাতে হয়েছিল, বেশ কয়েক জায়গায় প্রত্যাখ্যাত হয়ে শেষমেশ এক অখ্যাত জার্নালে জায়গা পেল। এরপর তিনি বড় বড় এয়ারলাইন্সের দরজায় দরজায় ঘুরলেন, সবাই নাক সিঁটকে ফিরিয়ে দিল, কেউ কেউ রীতিমতো তাচ্ছিল্য করে। শুধু কি এয়ারলাইন্স? খোদ অর্থনীতিবিদদের মহলেও প্রস্তাবটা উড়িয়ে দেওয়া হল।

    আর যাঁরা উড়িয়ে দিয়েছিলেন, তাঁরা যে-সে লোক নন। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ জর্জ স্টিগলার একে বলেছিলেন ‘প্রশাসনিক ভাবে অসম্ভব’ আর সাবধান করেছিলেন, ভেবে দেখো, চল্লিশজন বেকার লোক যদি দল বেঁধে এসে সিস্টেমটাকে জ্যাম করে দেয়, তখন কী হবে? মানে, লোকে সিস্টেমটা নিয়ে চালাকি করবে, এই ছিল দুশ্চিন্তা। আরেক নোবেলজয়ী মিলটন ফ্রিডম্যান আবার উলটো দিক থেকে খোঁচা দিলেন, প্ল্যানটা যদি সত্যিই এত ভালো হয়, তাহলে একটাও এয়ারলাইন কেন পরীক্ষা করে দেখছে না, সেটাই তো আমার মাথায় ঢুকছে না! দুই দিকপাল দু-রকম সংশয় জানালেন, কিন্তু সাইমন হাল ছাড়লেন না। বছরের পর বছর তিনি লিখে গেলেন, তর্ক করে গেলেন - ১৯৭০, ১৯৭২, ১৯৭৭, প্রবন্ধের পর প্রবন্ধে নিজের যুক্তি শানিয়ে গেলেন।

    গল্পের মোড় ঘুরল প্রায় বারো-তেরো বছর পর। সত্তরের দশকের শেষে আরেকজন অর্থনীতিবিদ, আলফ্রেড কান, প্রেসিডেন্ট কার্টারের আমলে মার্কিন ‘সিভিল এরোনটিক্স বোর্ড’-এর চেয়ারম্যান হলেন। কান তখন গোটা বিমান শিল্পটাকে সরকারি নিয়ন্ত্রণের জাল থেকে মুক্ত করার কাজে ব্যস্ত, যাকে বলে ‘ডিরেগুলেশন’। সেই সুযোগে সাইমন তাঁর পুরোনো প্রস্তাবটা নিয়ে আরেকবার হত্যে দিলেন। আর এবার এত বছরের প্রত্যাখ্যানের পর কান রাজি হয়ে গেলেন। ১৯৭৮-৭৯ সাল নাগাদ এয়ারলাইন্সকে অনুমতি দেওয়া হল সাইমনের পথ ধরে হাঁটার - জোর করে নয়, স্বেচ্ছাসেবক ডেকে, টাকা দিয়ে আসন ছাড়ানোর ব্যবস্থা।

    আনন্দে আত্মহারা সাইমন কী করলেন জানেন? আলফ্রেড কানকে এক ডজন গোলাপ পাঠিয়ে দিলেন। আর সবচেয়ে বড় কথা, এই আইডিয়াটা তিনি বিনি পয়সায় বিলিয়ে দিয়েছিলেন, এর থেকে একটি টাকাও কামাননি। ১৯৯৮ সালে পঁয়ষট্টি বছর বয়সে সাইমন মারা যান। মজার ব্যাপার, দুনিয়া তাঁকে মনে রেখেছে অন্য একটা কারণে - জনসংখ্যা আর সম্পদ নিয়ে তাঁর আশাবাদী তত্ত্বের জন্য, পৃথিবী ফুরিয়ে যাচ্ছে না বরং সমৃদ্ধ হচ্ছে, এই তর্কের জন্য। কিন্তু আমার-আপনার রোজকার জীবনে তাঁর সবচেয়ে সরাসরি ছোঁয়াটা রয়ে গেছে ওই বিমানবন্দরের গেটে যেখানে আজও একটা দাড়ি কামানোর সময়ের ভাবনা নিঃশব্দে কাজ করে চলেছে।


    একই সমস্যা, দুই ঘরানা

    সাইমনের গল্পটা যত রোমাঞ্চকর, ততটাই জরুরি একটা কথা এখানে বলে রাখা - ওভারবুকিং নিয়ে মাথা ঘামানো তিনি একা করেননি, তাঁর আগেও বহু চৌকস লোক করেছেন। কিন্তু আসল মজাটা হল, এই এক সমস্যা নিয়ে দুটো একেবারে আলাদা ঘরানার গবেষণা পাশাপাশি বয়ে চলেছিল, যারা আদতে দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিল। একটাকে বলি অঙ্কের ঘরানা, অন্যটাকে বাজারের ঘরানা।

    অঙ্কের ঘরানা, অর্থাৎ অপারেশনস রিসার্চের লোকজন, মাথা ঘামাচ্ছিলেন একটাই প্রশ্নে - ঠিক কতগুলো বাড়তি টিকিট বেচা নিরাপদ? এঁদের কাজ সাইমনের অনেক আগে থেকেই শুরু। সেই ১৯৬০ সালে নেদারল্যান্ডসের ডেল্‌ফ্‌ট বিশ্ববিদ্যালয়ের লেন্ডার্ট কোস্টেন প্রথম দিকের একজন, যিনি সমস্যাটাকে গুছিয়ে একটা সাধারণ গাণিতিক মডেলে বাঁধেন। তার আগে, ১৯৫৮ সালে, মার্টিন বেকম্যান বের করেছিলেন ওভারবুকিং-এর প্রথম প্রকাশিত মডেল, খালি আসনের লোকসান আর বাড়তি যাত্রীর ক্ষতিপূরণ, এই দুইয়ের ভারসাম্য কষে। এঁদের হাতেই জন্ম নেয় সেই ধারা, যা আজও চলছে।

    কিন্তু এই ঘরানার সবচেয়ে রঙিন চরিত্র সম্ভবত মার্ভিন রথস্টাইন। ১৯৬০ সালে তিনি আমেরিকান এয়ারলাইন্সে সিস্টেম অ্যানালিসিসের ম্যানেজার হয়ে যোগ দিয়ে এক মজার জিনিস আবিষ্কার করেন যে কোম্পানির ভিতরেই কর্তাব্যক্তিরা একমত নন যে তাঁরা আদৌ ওভারবুকিং করেন কি না! কেউ কেউ সাফ বলতেন, ‘না না, আমরা এসব করি না’; আবার কেউ কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলতেন, ‘আরে, এ তো গোটা সিস্টেম জুড়েই হচ্ছে’। রথস্টাইন প্রমাণ জোগাড় করে দেখালেন, দ্বিতীয় দলই ঠিক। এরপর তিনি ওই সমস্যাকে গণিতের ভাষায় বাঁধলেন, ‘মার্কভ সিকোয়েন্সিয়াল ডিসিশন প্রসেস’ আর ডাইনামিক প্রোগ্রামিং দিয়ে, ১৯৭১ সালে বেরোল তাঁর বিখ্যাত ‘অ্যান এয়ারলাইন ওভারবুকিং মডেল’। পরে ১৯৮৫ সালে তিনি গোটা ইতিহাসটাই লিখে গেছেন এক দীর্ঘ প্রবন্ধে।

    এই ঘরানারই আরেক মাইলফলক ব্রিটেনের কেন লিটলউড। ১৯৭২ সালে, ব্রিটিশ ওভারসিজ এয়ারওয়েজ কর্পোরেশনের (পরে যা হবে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ) অপারেশনস রিসার্চ দলে বসে তিনি এক মোক্ষম প্রশ্ন তুললেন, এতদিন সবাই ভাবছিল কেমন করে বেশি সংখ্যক যাত্রী বওয়া যায়; কিন্তু লক্ষ্যটা তো নিছক যাত্রীসংখ্যা নয়, লক্ষ্য হওয়া উচিত আয়। সস্তা টিকিটের যাত্রী দিয়ে গোটা প্লেন ভরিয়ে ফেললে, শেষ মুহূর্তের চড়া দামের যাত্রীর জন্য আর আসন থাকবে না - তাহলে তো লাভই কমল। কোন দামের কতগুলো আসন আটকে রাখতে হবে, সেই হিসেব কষে তিনি দিলেন ‘লিটলউডের সূত্র’, যা আজও রেভিনিউ ম্যানেজমেন্টের ভিত।

    এরপর ১৯৮৭ সালে পিটার বেলোবাবা লিটলউডের সূত্রকে বাড়িয়ে নানা দামের শ্রেণীর জন্য বানালেন ‘EMSR’ কৌশল। আর এই সবকিছু মিলিয়ে আশির দশকে আমেরিকান এয়ারলাইন্স ঘটিয়ে ফেলল যাকে বলা হয় ‘রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট বিপ্লব’ - কম্পিউটারে ঠাসা এক বিশাল ব্যবস্থা, যার মূল কথা ছিল দুটো: আসন হল পচনশীল জিনিস, আর সব খদ্দের সমান নয়। ফল? কোম্পানির নিজের হিসেবেই, মাত্র তিন বছরে এই কৌশল তাদের এনে দিয়েছিল প্রায় একশো চল্লিশ কোটি ডলার বাড়তি আয়। এই ঘরানার হাত ধরেই বিমানযাত্রা সস্তা হয়েছে, সাধারণ মানুষের নাগালে এসেছে - এঁরা বলে দেন, কত বেচব।

    আর সাইমনের ঘরানা করছিল একেবারে অন্য প্রশ্ন - ধরেই নিলাম বেশি লোক হয়ে গেছে, এবার কাকে নামাব, আর কীভাবে নামালে কারও গায়ে লাগবে না? প্রথম ঘরানা বলে ‘কত’, দ্বিতীয় ঘরানা বলে ‘কাকে ও কীভাবে’। কিন্তু ফারাকটা আরও গভীরে। অঙ্কের ঘরানা গোটা ভিড়টাকে দেখে এক পরিসংখ্যানের স্তূপ হিসেবে, কত শতাংশ নো-শো করবে, কোন শ্রেণীর চাহিদা কেমন আর সেই তথ্য ব্যবহার করে এয়ারলাইন্স নিজের সুবিধেমতো সিদ্ধান্ত নেয়। উপর থেকে, কেন্দ্র থেকে, গোটা জনতাকে একটা গড় হিসেবে দেখে।

    কিন্তু যে তথ্য এয়ারলাইন্স হাজার কম্পিউটার চালিয়েও কোনোদিন বের করতে পারবে না সেটা হল, আপনি ঠিক কতখানি মূল্য দেন আপনার আজকের এই একটা ঘণ্টাকে। ওই সংখ্যাটা কেবল আপনার মাথার ভিতরেই লেখা আছে, আর কোথাও নেই কোথাও (যদি না আপনি ইন্টারনেটের বা সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনদিন সেটা টাইপ করে না ফেলেন! তাহলে সেটা জেনে ফেলেছে ওরা)। সাইমনের নিলামের আসল সৌন্দর্য এইখানেই, সে জোর করে ভিড়ের গড় আন্দাজ করার চেষ্টা করে না, বরং একটা দাম সামনে ঝুলিয়ে দিয়ে প্রত্যেককে নিজের ভিতরের ওই গোপন সংখ্যাটা নিজের মুখে বলিয়ে নেয়। অঙ্কের ঘরানা তথ্য জোগাড় করে উপর থেকে; সাইমনের ঘরানা তথ্য টেনে বের করে নীচ থেকে, মানে প্রত্যেকের মন থেকে। একটা কেন্দ্রীভূত, অন্যটা ছড়ানো। তাই এরা প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং একই যন্ত্রের দুটো চাকা - একটা ঠিক করে গতি, অন্যটা সামলায় বিপদের বাঁক।

    মজার ব্যাপার, দুই ঘরানার দুই প্রধান চরিত্রও ছিলেন দুই মেরুর মানুষ। রথস্টাইন ছিলেন খাঁটি ভিতরের লোক, আমেরিকান এয়ারলাইন্সের ম্যানেজার, যাঁর মডেল কোম্পানি সাদরে গ্রহণ করেছে, যাঁকে পেশার জগৎ সম্মান জানিয়েছে। আর সাইমন ছিলেন বাইরের লোক যাঁকে এয়ারলাইন্স প্রত্যাখান করেছে, নোবেলজয়ীরা উড়িয়ে দিয়েছেন, যাঁকে অখ্যাত জার্নালে ছাপতে হয়েছে। একই শিল্পের এক সমস্যা, অথচ দুই সমাধান এল দুই একেবারে আলাদা স্বভাবের মানুষের হাত ধরে - একজন প্রতিষ্ঠানের ভিতর থেকে অঙ্ক কষে, আরেকজন প্রতিষ্ঠানের দরজায় ধাক্কা মেরে।

    সাইমনের ওই ‘সবচেয়ে কম দর যিনি হাঁকবেন তিনিই জিতবেন’ ধরনের সিলড-বিড নিলাম অবশ্য একেবারে আকাশ থেকে পড়া নয়। অর্থনীতিবিদ উইলিয়াম ভিকরে যিনি পরে ১৯৯৬ সালে নোবেল পান, তিনি ঠিক এমন সিলড-বিড নিলামের তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিলেন ষাটের দশকের গোড়াতেই। তাই সাইমনের কৃতিত্ব তত্ত্ব আবিষ্কারে নয়; তাঁর কৃতিত্ব হল, এই বিমূর্ত নিলাম-তত্ত্বকে তিনি টেনে নামিয়ে এনেছিলেন এক্কেবারে মাটির সমস্যায়, বিমানবন্দরের গেটে। অর্থনীতিবিদরা আজকাল যাকে গালভরা নাম দিয়েছেন ‘মার্কেট ডিজাইন’, বাস্তবের সমস্যা মেটাতে নিয়ম-কানুন সমেত আস্ত একটা বাজার নকশা করে দেওয়া - সাইমনের এই আইডিয়াটা ছিল তার এক আদি ও সফল উদাহরণ।

    এইখানে ইতিহাসের এক মজার প্যাঁচ আছে যা প্রায়ই ইতিহাস থ্রো করে, পরে যাতে ‘ইতিহাসে এই হয়েছিল’ ব্যাপারটা শোনা যায়। এই দুই ঘরানা, যারা এতদিন আলাদা পথে হাঁটছিল, তারা দুজনেই কিন্তু হঠাৎ ডানা মেলল একই দরজা খুলে যাওয়ায়। সেই দরজার নাম ১৯৭৮-এর ডিরেগুলেশন, যার কারিগর সেই আলফ্রেড কান। সরকারি নিয়ন্ত্রণ উঠে যেতেই এয়ারলাইন্স নিজের খুশিমতো নানা দামের টিকিট বানাতে পারল আর ঠিক তখনই লিটলউড-বেলোবাবার রেভিনিউ ম্যানেজমেন্ট বিপ্লব তেড়েফুঁড়ে উঠল। আবার সেই কান-ই সাইমনের বহু-প্রত্যাখ্যাত নিলাম-প্রস্তাবে সিলমোহর দিলেন। মানে, একটাই ঐতিহাসিক মুহূর্ত দুই আলাদা ঘরানাকেই বাস্তবের মাটিতে নামিয়ে আনল!

    সাইমন অবশ্য নেহাত কথার কথা বলে থামেননি, ১৯৭৭ সালে সহকর্মী গণেশন বিশ্বভারতীর সঙ্গে লেখা এক প্রবন্ধে তিনি বাস্তবের সংখ্যা দিয়ে দেখিয়েছিলেন, নিলাম-ব্যবস্থা যেখানে পরখ করা হয়েছে, তথ্য সেখানে তত্ত্বের সঙ্গে দিব্যি মিলে গেছে। প্রবন্ধের নামটাই ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরা, ‘দ্য ডেটা ফিট দ্য থিওরি’, তথ্যই তত্ত্বকে সমর্থন করছে। স্টিগলার-ফ্রিডম্যানের সংশয়ের জবাব তিনি দিয়েছিলেন তর্ক দিয়ে নয়, সংখ্যা দিয়ে। মোদ্দা কথায়, দুই ঘরানা মিলেই গড়ে তুলেছে আজকের বিমানযাত্রা। অঙ্কের ঘরানা সস্তা করেছে টিকিট (আসন ভরিয়ে, দাম সাজিয়ে), আর সাইমনের ঘরানা বাড়তি ভিড়টাকে করেছে খানিক মানবিক (জোরাজুরির বদলে দর-কষাকষি)। দুটোই চলে নিঃশব্দে, পর্দার আড়ালে। আপনি যখন মাস তিনেক আগে সস্তায় টিকিট কেটে ফেলেন, সেটা এক ঘরানার নিঃশব্দ কীর্তি; আর গেটে দাঁড়িয়ে যখন ওই বাম্প-অফারের নাটক দেখেন, সেটা অন্য ঘরানার।


    নিলাম যেভাবে চলে

    সাইমনের মূল ভাবনাটা আজও নানা রূপে চালু আছে। কোনও কোনও এয়ারলাইন্স, যেমন ধরুণ ডেল্টা, কাজটা করে একদম নিঃশব্দ ‘অন্ধ নিলামে’। আপনি যখন অনলাইনে বা কিয়স্কে চেক-ইন করছেন, স্ক্রিনে হয়তো প্রশ্ন ভেসে উঠবে, “এই ফ্লাইটে বেশি যাত্রী হয়ে গেলে, কত ডলারের ভাউচার পেলে আপনি আসন ছাড়তে রাজি?” সঙ্গে নীচে ছোট করে টিপ দেওয়া থাকে, মনে রাখবেন, কম দর আগে গ্রহণ করা হয়। মানে আপনি একটা সংখ্যা লিখে দিলেন, আর অন্য যাত্রীরা কে কত লিখলেন তা আপনি জানেন না। দরকার পড়লে এয়ারলাইন্স সবচেয়ে কম দর হাঁকা লোকজনকে বেছে নেবে। এতে গেটের সামনে হইচই কমে, আর কোম্পানিরও পয়সা বাঁচে কারণ কিছু সরল লোক হয়তো একশো ডলারেই খুশিমনে আসন ছেড়ে দেন।

    কিন্তু আসল মজাটা তখনই জমে, যখন গেটের সামনে খোলাখুলি দর হাঁকা শুরু হয় ঠিক আমার দেখা সেই নিউ ইয়র্কের দৃশ্যের মতো। এয়ারলাইন্স কর্মীদের সাধারণত নির্দেশ দেওয়া থাকে কম টাকা থেকে শুরু করো, দরকার হলে আস্তে আস্তে বাড়াও। এতে কোম্পানির সবচেয়ে কম খরচে কাজ হাসিল হয়। কিন্তু যাত্রীরাও তো বোকা নন! তাঁরা টের পান যে দোকানি দাম বাড়িয়েই চলবে, যতক্ষণ না দরকারি সংখ্যক লোক রাজি হচ্ছে। ফলে অনেকেই কৌশল করে অপেক্ষা করেন, দেখা যাক না, আরেকটু বাড়ে কি না! এই ‘দেখি না কতদূর ওঠে’ মনোভাবই সেই রহস্যের চাবিকাঠি কেন আটশো বা হাজার ডলারেও কেউ নড়েন না।

    একটা বাস্তব ঘটনা বলি, যাতে ব্যাপারটা জলের মতো পরিষ্কার হবে। কিছু বছর আগে সিয়াটেল থেকে পাম স্প্রিংস-গামী ডেল্টার এক ফ্লাইটে আসনের চেয়ে যাত্রী বেশি হয়ে গিয়েছিল, দরকার ছিল পাঁচজন স্বেচ্ছাসেবক। এই রুটে দিনে একটাই মাত্র ফ্লাইট, মানে রাজি হলে পরদিন যেতে হবে। গেটের কর্মী শুরু করলেন এক হাজার ডলার আর হোটেল দিয়ে। কেউ নড়ল না। বাড়িয়ে করা হল পনেরো-শো, তাতেও সাড়া নেই। বোর্ডিং শুরু হয়ে যাওয়ার পরেও দর হেঁকে যাচ্ছেন কর্মী। অবশেষে সংখ্যাটা যখন বাইশ-শো ডলারে পৌঁছল, দু-জন রাজি হলেন। পঁচিশ-শো-তে তৃতীয় জন। আর শেষমেশ আঠাশ-শো ডলারে এক বয়স্ক দম্পতি হাত তুললেন, পাঁচজন পূর্ণ হল। মজার ব্যাপার, শেষ পর্যন্ত পাঁচজনই কিন্তু ওই সর্বোচ্চ আঠাশ-শো ডলার করে পেলেন। সেই বয়স্ক দম্পতি নাকি হেসে বলেছিলেন, এই টাকায় তাঁদের গাড়ির কিস্তি শোধ হয়ে গেল।


    কেন কেউ আগে হাত তোলে না

    এবার আসল প্রশ্নে ফেরা যাক, মানুষ কেন পনেরো-শো ডলারেও হাত গোটায়? এখানে অর্থনীতির শুকনো অঙ্ক দিয়ে পুরোটা বোঝা যায় না, ঢুকে পড়তে হয় মনস্তত্ত্বের গলিতে। প্রথম কারণটা হল আসনটা এই মুহূর্তে আপনার ‘নিজের’। টিকিট কেটে, লাইনে দাঁড়িয়ে, বোর্ডিং পাস হাতে নিয়ে আপনি ইতিমধ্যেই মনে মনে ওই আসনে বসে পড়েছেন, মনে মনে গন্তব্যেও পৌঁছে গেছেন। যে জিনিস একবার ‘আমার’ হয়ে গেছে, তা ছেড়ে দিতে মানুষের ভীষণ কষ্ট - মনস্তত্ত্বে একে বলে ‘এনডাওমেন্ট এফেক্ট’। বিখ্যাত এক পরীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, একটা কফি-মগ যখন কারও হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলা হয় ‘এটা এখন তোমার’, তখন সেটা বেচতে সে যত দাম চায়, ঠিক সেই মগটাই কিনতে অন্য কেউ তার চেয়ে অনেক কম দাম দিতে রাজি হয়। মালিকানার এই আঠা বড় সাংঘাতিক জিনিস।

    এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও গভীর একটা প্রবণতা - ‘লস অ্যাভার্সন’ বা ক্ষতির প্রতি আমাদের অস্বাভাবিক ভীতি। মনোবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল কানেম্যান আর আমোস টুভার্স্কি তাঁদের বিখ্যাত ‘প্রসপেক্ট থিওরি’-তে দেখিয়েছিলেন, একই পরিমাণ জিনিস পাওয়ার আনন্দের চেয়ে হারানোর যন্ত্রণা মানুষের কাছে প্রায় দ্বিগুণ তীব্র। কথাটা তাঁরা বলেছিলেন সংক্ষেপে, ক্ষতি সবসময় লাভের চেয়ে বড় দেখায়। ফলে আসন ছেড়ে দেওয়াটাকে আমাদের মন নিছক ‘পনেরো-শো ডলার লাভ’ হিসেবে দেখে না; দেখে ‘পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়া, দেরিতে পৌঁছনো, রাতে অচেনা হোটেলে থাকা’ এই সব হারানোর যন্ত্রণা হিসেবে। আর সেই হারানোর পাল্লাটা মনের নিক্তিতে এত ভারী যে, পনেরো-শো ডলার তার সামনে হালকা মনে হয়।

    তৃতীয় কারণটা সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত, আর এইটেই আমার কাছে সবচেয়ে মজার। প্রত্যেক যাত্রীর মনের গভীরে একটা গোপন সংখ্যা থাকে, অর্থনীতিবিদরা যাকে বলেন ‘রিজার্ভেশন প্রাইস’, অর্থাৎ ঠিক যত টাকা পেলে তিনি রাজি হয়ে যাবেন, তার এক পয়সা কম হলে নয়। মজার কথা, এই সংখ্যাটা একেকজনের একেক রকম, আর তার মূলে আছে সময়ের দাম। যে ব্যবসায়ীর কাল সকালে জরুরি মিটিং, বা যে মায়ের বাড়িতে ছোট বাচ্চা অপেক্ষা করছে, তাঁর কাছে একটা রাত দেরির দাম আকাশছোঁয়া - দশ হাজার ডলারেও হয়ত তিনি নড়বেন না। আবার যে ছাত্রটির হাতে অঢেল সময়, ছুটিতে বাড়ি ফিরছে, তার কাছে একটা রাত মানে সামান্য ব্যাপার, সে চারশো ডলারেই লাফিয়ে উঠবে। গেটের সামনের ওই নিলামটা আসলে চুপিসারে মেপে নেয়, আমরা প্রত্যেকে নিজের একটা ঘণ্টার দাম কত বসাই।

    এইখানেই ঢুকে পড়ে জুয়ার উপাদান। যিনি অপেক্ষা করছেন, ‘দেখি না, আরেকটু বাড়ে কি না’, তিনি আসলে এক ঝুঁকি নিচ্ছেন। কারণ অন্য কেউ যদি তাঁর আগে হাত তুলে ফেলেন, তাহলে দরকারি সংখ্যক লোক পূর্ণ হয়ে যাবে, আর তাঁর বাড়তি টাকা পাওয়ার সুযোগটাই হাতছাড়া হয়ে যাবে। তাই প্রতিটি যাত্রীকে মনে মনে একটা হিসেব কষতে হয়, এখন হাত তুলব, নাকি আরেকটু অপেক্ষা করে বেশি টাকার আশায় সবটুকু খোয়ানোর ঝুঁকি নেব? এই টানাপোড়েনটাই গেটের সামনের নীরবতার আসল কারণ।

    এর সঙ্গে জুড়ে আছে আরেকটা মজার মানবিক দুর্বলতা, কেউ প্রথমে হাত তুলতে চায় না! ভিড়ের মধ্যে সবার আগে নড়ে ওঠা মানে যেন নিজের অস্থিরতা, নিজের ‘তাড়া নেই’ ভাবটা সবার সামনে ফাঁস করে দেওয়া। তার উপর মনে একটা খচখচানি, আমি যদি এখনই আটশো-তে রাজি হয়ে যাই, আর পরক্ষণেই দর যদি দু-হাজারে ওঠে, তাহলে তো নিজেকে বোকা মনে হবে! এই ‘পাছে ঠকে যাই’ ভয়টা মানুষকে চুপ করিয়ে রাখে। তাই সবাই আড়চোখে সবাইকে দেখে, কেউ নড়ে না যতক্ষণ না একজন সাহসী হাত তোলেন। আর একজন উঠলেই দেখবেন, যেন বাঁধ ভাঙল, গুটিগুটি আরও কয়েকটা হাত উঠে যায়। ভিড়ের এই নিঃশব্দ ইশারার খেলা যে কোনও বাঙালি বিয়েবাড়ির বুফে-লাইনেও দেখতে পাবেন - কেউ আগে প্লেট হাতে এগোতে চায় না, একজন এগোলেই বাকিরা।


    যেদিন নিলাম ভেঙে পড়ে

    তবে একটা মোক্ষম প্যাঁচ আছে যা গোটা নিলামটাকে ভেস্তে দিতে পারে, সেটা হল ‘দিনের শেষ ফ্লাইট’। আপনি খেয়াল করবেন, কিছু আগে লেখা সেই সিয়াটল-পাম স্প্রিংস রুটে দিনে একটাই ফ্লাইট ছিল, তাই আসন ছাড়ার মানে ছিল গোটা একটা দিন খোয়ানো, সেইজন্যই দর অত চড়েছিল। যখন পরের ফ্লাইট কয়েক ঘণ্টা পরেই, তখন লোকে সহজে রাজি হয়। কিন্তু আসন ছাড়লে যদি রাতটা অচেনা শহরে কাটাতে হয়, তখন কারও রিজার্ভেশন প্রাইস আর সহজে মেলে না - টাকা যতই বাড়ুক, স্বেচ্ছাসেবক পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আর ঠিক এইখানে গোটা ব্যবস্থাটা ভেঙে পড়ে, এবং জন্ম নেয় এক দুঃস্বপ্ন - যার নাম, বাধ্যতামূলক ভাবে যাত্রী নামানো।

    এই দুঃস্বপ্নটাই ২০১৭ সালের এপ্রিলে গোটা পৃথিবীর সামনে বিশ্রী ভাবে দেখা দিয়েছিল। শিকাগোর ও'হেয়ার থেকে কেন্টাকির লুইভিল-গামী ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ৩৪১১ নম্বর ফ্লাইট। আসনের চেয়ে যাত্রী বেশি, তবে এবার নো-শো-র ভুল হিসেবের জন্য নয়, বরং এয়ারলাইন্সের নিজেরই চারজন কর্মীকে জরুরি ভিত্তিতে লুইভিল পৌঁছে দিতে হবে বলে। কর্মী শুরু করলেন চারশো ডলার দিয়ে, তারপর আটশো কিন্তু কেউ রাজি হলেন না, কারণ সেটাই ছিল ওই দিনের শেষ ফ্লাইট। স্বেচ্ছাসেবক না মেলায়, কম্পিউটার এলোমেলো ভাবে চারজন যাত্রীকে বেছে নিয়ে বলল, আপনাদের নামতে হবে।

    বেছে নেওয়া যাত্রীদের একজন ছিলেন ঊনসত্তর বছরের এক চিকিৎসক, ডেভিড ডাও। পরদিন তাঁর রোগী দেখার কথা, তাই তিনি নামতে অস্বীকার করলেন। এরপর যা ঘটল, তা বিমান-ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। বিমানবন্দরের নিরাপত্তারক্ষীরা এসে ডাক্তারকে টেনেহিঁচড়ে আসন থেকে তুললেন, ধস্তাধস্তিতে তাঁর মুখ আছড়ে পড়ল সামনের আসনের হাতলে, নাক ভাঙল, দাঁত ভাঙল, মাথায় চোট লাগল। রক্তাক্ত, আধা-অচেতন ডাক্তারকে টানতে টানতে প্লেনের করিডর দিয়ে নামিয়ে আনা হল। সহযাত্রীরা গোটাটা ফোনে তুলে রাখলেন, আর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়ল দুনিয়াজুড়ে।

    এরপর কোম্পানির কর্ণধার একটা বিবৃতিতে যাত্রীকে ‘পুনরায় ব্যবস্থা করা’ (re-accommodate) বলে ব্যাপারটা লঘু করতে গিয়ে আগুনে ঘি ঢাললেন। জনরোষে ইউনাইটেডের শেয়ারের দাম হুড়মুড়িয়ে পড়ল, কর্ণধারকে কংগ্রেসের সামনে জবাবদিহি করতে হল। শেষমেশ কোম্পানি ডাক্তারের সঙ্গে এক গোপন রফায় পৌঁছল, দুই নিরাপত্তারক্ষীর চাকরি গেল। সবচেয়ে বড় শিক্ষাটা হল এই গোটা কাণ্ডটাই এড়ানো যেত, যদি সাইমনের নিলাম-ব্যবস্থাটা ঠিকঠাক চলতে দেওয়া হত, অর্থাৎ যদি টাকার অঙ্কটা যথেষ্ট বাড়িয়ে স্বেচ্ছাসেবক জোগাড় করা হত। জোর করে টেনে নামানোর দরকারই পড়ত না।

    এই ঘটনার পর গোটা মার্কিন বিমান শিল্প নড়েচড়ে বসল। ইউনাইটেড স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ এক লাফে বাড়িয়ে দশ হাজার ডলার করল, ডেল্টা করল প্রায় দশ হাজার। সাউথওয়েস্ট এয়ারলাইন্স তো ঘোষণাই করে দিল, তারা আর ওভারবুকিং করবে না। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসে একজন জনপ্রতিনিধি একটি বিল আনলেন, যার মোদ্দা কথা বোর্ডিং-এর পর জোর করে কাউকে নামানো চলবে না, আর নামানোর আগে সর্বোচ্চ ক্ষতিপূরণ সাধতে হবে স্বেচ্ছাসেবকদের। মজার কথা, এত বড় সংখ্যাগুলো ঝোলানোর মূল উদ্দেশ্য কিন্তু সত্যিই দশ হাজার ডলার বিলিয়ে দেওয়া নয়, উদ্দেশ্য হল, দর এত উঁচুতে তোলার ক্ষমতা কর্মীদের হাতে থাকলে জোর করে কাউকে নামানোর পরিস্থিতিটাই আর তৈরি হবে না। মানে ঘুরেফিরে সেই সাইমনেরই দর্শন - জোরাজুরি নয়, দর-কষাকষি।


    আজ যেখানে দাঁড়িয়ে

    তাহলে আজকের দিনে ব্যবস্থাটা কেমন চলছে? সংখ্যাগুলো দেখলে বোঝা যায়, সাইমনের সেই দাড়ি কামানোর সময়ের ভাবনাটা মোটের উপর দিব্যি কাজ করছে। মার্কিন পরিবহণ দপ্তরের হিসেব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সব মিলিয়ে প্রায় তিন লক্ষ ষোলো হাজার যাত্রীকে আসন ছাড়তে হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় দু-লক্ষ নব্বই হাজার অর্থাৎ বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বেচ্ছায় টাকা নিয়ে সরে দাঁড়িয়েছেন। জোর করে নামানো হয়েছে মাত্র সাড়ে পঁচিশ হাজার জনকে। মানে দশজন আসন-ছাড়া যাত্রীর মধ্যে ন-জনই খুশিমনে, স্বেচ্ছায় সরেছেন। ওই সাড়ে পঁচিশ হাজার হল সেই দুর্ভাগা সংখ্যালঘু, যাঁদের ক্ষেত্রে নিলামটা কোনও কারণে ভেঙে পড়েছে।

    স্বেচ্ছায় সরা আর জোর করে নামানোর মধ্যে একটা বড় ফারাক আছে ক্ষতিপূরণের দিক থেকেও। স্বেচ্ছায় সরলে টাকার অঙ্কটা দর-কষাকষির ব্যাপার, যাত্রী আর এয়ারলাইন্স রফা করে ঠিক করেন। কিন্তু জোর করে নামানো হলে সেটা আইনে বাঁধা, টিকিটের দাম আর দেরির পরিমাণ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ছক মেনে ক্ষতিপূরণ দিতে হয়, যার একটা ঊর্ধ্বসীমাও আছে। আর ২০২৪ সালে একটা নতুন নিয়ম চালু হয়েছে যে জোর করে নামানো যাত্রীকে এখন ভাউচার বা পরে-ব্যবহার-করার-ক্রেডিট নয়, নগদ টাকা দিতে হবে। ব্যবস্থাটা যাত্রীর পক্ষে ক্রমশ আরও পোক্ত হচ্ছে।
    এবার আপনি হয়তো ভাবছেন এ তো সবই সাহেবদের দেশের গপ্পো, আমাদের এখানে তো এমন নিলাম-টিলাম চোখে পড়ে না! কথাটা খানিক সত্যি। ভারতে বা এই উপমহাদেশে ওভারবুকিং হয় বৈকি, কিন্তু গেটের সামনে খোলাখুলি দর হাঁকার সেই নাটক এখানে তেমন দেখা যায় না। এখানে ব্যাপারটা অনেকটাই ঘটে পর্দার আড়ালে, কাউন্টারে চুপিচুপি রফা করে। তার নানা কারণ, আলাদা আইনি কাঠামো, আলাদা যাত্রী-সংস্কৃতি, ক্ষতিপূরণের আলাদা রেওয়াজ। কিন্তু মূল অর্থনীতিটা এক - খালি আসন মানেই লোকসান, তাই বাড়তি টিকিট, তাই কখনও-সখনও গেটে গিয়ে টানাটানি। পরেরবার বিদেশযাত্রার সময় গেটের সামনে ওই ঘোষণাটা কানে এলে, একটু দাঁড়িয়ে নাটকটা উপভোগ করবেন, জানবেন, চোখের সামনে জ্যান্ত অর্থনীতির ক্লাস চলছে, বিনি পয়সায়।


    শেষ কথা

    সেই বিকেলে নিউ ইয়র্কের এয়ারপোর্টের গেটে বসে কফির শেষ চুমুকটা দিতে দিতে আমার একটা কথা মনে হয়েছিল। আমরা ভাবি, টাকার অঙ্কটাই বুঝি সব, দু-শো, আটশো, দু-হাজার। কিন্তু ওই নিলামটা আসলে টাকার নয়, সময়ের। ওখানে দাঁড়িয়ে প্রত্যেক যাত্রী নিঃশব্দে ঘোষণা করছিলেন, তাঁর জীবনের একটা রাত, একটা সকাল, একটা অপেক্ষার ঠিক কত দাম। কারও কাছে সেই রাতের দাম চারশো, কারও কাছে দশ হাজারেও অপরিসীম কারণ ওপ্রান্তে হয়তো কেউ পথ চেয়ে আছে। একই সংখ্যা, অথচ একেক মানুষের কাছে তার মানে একেবারে আলাদা।
    জুলিয়ান সাইমনের কৃতিত্ব শুধু এই নয় যে তিনি এয়ারলাইন্সের কিছু টাকা বাঁচিয়েছিলেন, বা যাত্রীদের হেনস্থা কমিয়েছিলেন। তাঁর আসল কৃতিত্ব হল, জোরাজুরির জায়গায় তিনি বসিয়ে দিয়েছিলেন একটা ভদ্র প্রশ্ন “আপনি কি রাজি? কত পেলে রাজি?” মানুষকে বেছে নেওয়ার স্বাধীনতাটুকু ফিরিয়ে দেওয়া, এই তো। স্টিগলার বলেছিলেন অসম্ভব, ফ্রিডম্যান অবাক হয়েছিলেন, এয়ারলাইন্স তাচ্ছিল্য করেছিল কিন্তু এক জেদি লোক বারো বছর ধরে লেগে থেকে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, সরল একটা আইডিয়া কেমন করে কোটি মানুষের যাত্রা একটু সহজ করে দিতে পারে। পরেরবার এয়ারপোর্টে ওই ঘোষণাটা শুনলে, হাত তোলার আগে নিজেকে একবার জিজ্ঞেস করবেন আপনার আজকের রাতটার দাম ঠিক কত? উত্তরটা ভাবতে গিয়ে দেখবেন, এ শুধু ভাউচারের অঙ্ক নয়; এ আসলে আপনার তাড়া, আপনার দায়, আর ওপ্রান্তে অপেক্ষা করা মুখগুলোর হিসেব। আমরা সবাই রোজই কোনও না কোনও নিলামে বসে আছি, শুধু গেটের সামনে দাঁড়ালে সংখ্যাটা চোখে পড়ে, এই যা!

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • প্রবন্ধ | ২৫ জুলাই ২০২৬ | ৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক প্রতিক্রিয়া দিন