এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ডিম্মিডিয়া বনাম রিল

    সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়
    ২৫ জুলাই ২০২৬ | ১১ বার পঠিত
  • মোদি আবার রিল বানিয়েছেন। কাগজে পড়লাম, উনি বাকি মন্ত্রীদেরও রিল বানিয়ে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংযোগস্থাপন করতে বলেছেন। ভাবুন, তেলমন্ত্রী নীতিন গদকরি রিল বানিয়ে বলছেন, ফ্রেন্ডস দেখো এই আমার নতুন বিএমডাব্লু। কিংবা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান রিল করে বলছেন, শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব। কী যে কেলোর কীর্তি হবে ভাবা যায়না। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকেই ধরুন। কালকেই মহামিছিল হয়েছে কলকাতায়। সেটা দেখে মাথায় পাগড়ি পরে কালই বিচিত্র হিন্দিতে ক্যামেরার বলেছেন, 'দেশমে আজাদি মিল গিয়া হ্যায় নাইন্টিন ফর্টিসেভেন। আজাদি আজাদি করেগা, উল্টাসিধা করেগা, এ সব নেহি চলেগা।' তারপর আরেক জায়গায় বললেন, গতকাল মিছিলে যা গোলমাল হয়েছে, সে সব শুক্কুরবারী কারবার। ইনি যদি রিল বানান, কী হবে? প্রথমটা তবু ঠিক আছে, ছাত্ররা বুঝতে পারবে ইনি অন্তত কঙ্গনা রানাউত না, যিনি বলেছিলেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে ২০১৪ সালে, অন্তত স্বাধীনতার সালটা জানেন। কিন্তু পরেরটা? ওটা রিল করে বললে তো সেই নিয়ে কমেন্টে খিল্লি হবে, যারা খিল্লি করবে তাদের আবার উনি জেলে পুরবেন, তাতে আবার বিক্ষোভ হবে। এইসব ঝামেলা এড়ানোর জন্যই তো ধর্মেন্দ্র প্রধানকে অপসারণের দাবী। সেটা না করে এঁদেরকেই রিল বানাতে বলার কী মানে? ব্যান্ডেড লাগিয়ে কি আর পেটের অপারেশন করা যায়? ম্যালেরিয়ার জীবাণুকে রিল বানাতে বললে সে তো ম্যালেরিয়ার পক্ষেই নেচে নেচে বলবে। তার চেয়ে বাপু যার যা কাজ সে তাই করুক না। কচিকাঁচারা রিল করুক, আপনারা হম্বিতম্বি করে একে জেলে পুরছি তাকে দেশবিরোধী বলছি না করে দেশে গণতন্ত্র ফেরানোর একটু চেষ্টা করুন না।

    ওদিকে ডিম্মিডিয়া পড়েছে ঝামেলায়। মন্ত্রীরা যদি রিল করেন, তাহলে বাইট দেবে কে। এমনিতেই উনি মনকি বাত না করে সামনে মোবাইল ধরে রোজ শর্ট ভিডিও বানাচ্ছেন। সংবাদমাধ্যম হিসেবে তাদের স্বীকৃতি যায় যায়। তাই তারা এখন সংবাদমাধ্যমের গায়ে হাত নিয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছে। গতকাল মিছিলে কে বা কারা নাকি সাংবাদিকদের ঠেঙিয়েছে। আমি যদিও এদের কোনো কথাই বিশ্বাস করিনা, কিন্তু ঠ্যাঙানো হলে সেটা সমর্থন করার কোনো কারণ নেই। খুবই নিন্দনীয় ব্যাপার। ওটা সমর্থন করতে হলে ডিম মারাও সমর্থন করতে হয়। ডিম্মিডিয়া অবশ্য ডিম-ছোঁড়াকে মোটের উপর সমর্থনই করেছে, কিন্তু উহারা অধম বলিয়া আমরা উত্তম হইব না কেন।

    কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়। এঁদেরকে হঠাৎ সাংবাদিক বলতে হবে কেন বুঝতে পারছিনা। কালকেই রিপাবলিক টিভির ময়ূখরঞ্জন ফেসবুকে লিখেছেন, "এক সপ্তাহ ফেসবুকে মাকু-সেকুদের monetization সাসপেন্ড করিয়ে দিন। বাইট- ইন্টারভিউ দেখানো বন্ধ করুন। ডিবেটে ডাকা- পোর্টাল পডকাস্ট থামিয়ে দিন। দেখবেন সেকু- মাকুরা বাপ বাপ করে পায়ে পড়বে। এটাই এক মাস করলে, খোদ লেলিন চলে আসবে ক্ষমা চাইতে। এদের অক্সিজেন ফুটেজ খাওয়া। বাজারি মিডিয়া বাজার থেকে এদের ঘাড় ধাক্কা দিলেই দেখবেন দম্ভ বেরিয়ে গেছে।" এটা কোনো সাংবাদিকের ভাষা না। ভাষ্যও না। এটা রাজনৈতিক মুখপাত্রের ভাষা। এবং লেনিন বানানটাও ভুল। ওঁরা তো সাংবাদিক না, এইগুলোই করেন, একবার না, বারবার করেন, করেই চলেন, ফলে ওঁদের খামোখা সাংবাদিক বলার কোনো মানে নেই। বিজেপির ফড়েদের বিজেপির ফড়ে নামেই ডাকতে হবে।

    হ্যাঁ, যাঁরা গ্রাউন্ডে ছিলেন, তাঁরা ময়ূখরঞ্জন না। তাঁরা চ্যানেলের নীতিও ঠিক করেননা। তাঁরা নেহাৎই কর্মী। চ্যানেল খারাপ, ওঁরা ভালো, হতেই পারে। কিন্তু তাই যদি হয়, সেই চ্যানেলই যখন ওঁদের সংবাদের শিরোনাম করছে, সেটা তিলকে বাড়িয়ে হরিপাল করা হচ্ছে কিনা বোঝার কোনো উপায় নেই। তার চেয়েও বড় কথা, এই কর্মীদেরই বহুক্ষেত্রে দেখেছি 'আপনি কি অনুপ্রবেশকারী?' কিংবা 'উত্তর দেবেন না কেন? ভয় পাচ্ছেন?' বলে অনিচ্ছুক মানুষের পিছনে পিছনে বুম হাতে তেড়ে যেতে। এই অসভ্যতা দিনের পর দিন চলেছে, সেটাকে কাজে লাগিয়ে বিষ ছড়ানো হয়েছে। তারপর রাস্তার বুমধারীকে দেখেছি প্রোমোশন পেয়ে সঞ্চালক হয়ে বিষ ছড়াতে। এবং আরও প্রোমোশন পেয়ে তিলক কেটে বিধায়ক হয়ে যেতে। সবই কি নেহাৎই অনিচ্ছায়? এই যে কদিন আগে ইন্ডিপেন্ডেন্ট কিছু সাংবাদিককে জেলে পোরা হল, তখন একজন কর্মীকেও তো মুখ খুলতে দেখলাম না। সেও কি নেহাৎই চাপে? হতেই পারে। কিন্তু এতটাই যদি হয়, তো তাহলে তো তাঁদের নেহাৎই ওই বিরাট যন্ত্রের নাটবল্টু ছাড়া আর কিছু বলার নেই। সংবাদমাধ্যমে তো নিরাপত্তারক্ষী থেকে শুরু করে ঝাড়ুদার পর্যন্ত বহু মানুষ কাজ করেন। সকলেই সম্মাননীয় এবং নাটবল্টু। কিন্তু তাঁরা তো সাংবাদিক না।

    কিন্তু সাংবাদিক না বললেও গায়ে হাত দেওয়া বেআইনী, অনৈতিক, নিন্দনীয়। যদি হয়ে থাকে। যদি লিখলাম, কারণ, আগেই বলেছি, এদের কোনো 'খবর'ই বিশ্বাস করিনা। কিন্তু সঙ্গে এটাও বিশ্বাস করি, ময়ূখের যা ইচ্ছে উনি বলতেই পারেন, যত আপত্তিকরই হোক, সেটা গণতান্ত্রিক অধিকার। তার জন্য বলপ্রয়োগ করা অগণতান্ত্রিক। আর ডিম্মিডিয়া কর্মীরা তো ময়ূখের মতো কিছু বলেনও নি। এবং শুধু ওঁরা কেন, যদি কোনো নেতাও ভুল করে বিপক্ষের কোনো মিছিলে চলে আসেন, তাঁর সঙ্গেও অসভ্যতা করা যায়না। হ্যাঁ, একটি দল ডিম ছোঁড়ে, অসভ্যতা করে, এইসব হিংস্রতার উদযাপন করে, ডিম্মিডিয়া সোল্লাসে সেসব সমর্থন করে, কিন্তু তার জবাব এগুলো না। এই সংস্কৃতি বদলানোর জন্যই তো এত কথা। অবশ্যই বয়কট করা যেতে পারে, স্লোগানও দেওয়া যেতেই পারে। শুধু পারে, না করা উচিতও। তার চেয়েও ভালো হয়, ময়ূখের চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করলে। সেকু-মাকুরা জাস্ট গোদি মিডিয়ায় যাওয়া বন্ধ করে দিন। খবর শেয়ার করা বন্ধ করে দিন। অন্য ছোটো মিডিয়ায় আসুন। তারপর কার আসলে কত দম বোঝা যাবে। কক্রোচ জনতা পার্টিকে তো এরা দেখায়নি, কিছু ক্ষতি হয়েছে? ব্যক্তিগতভাবে আমিও বলতে পারি, স্বেচ্ছায় গোদি-মিডিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার পর আমার কিচ্ছু ক্ষতি হয়নি। খবরর কাগজে যখন লিখতাম তখন যত লোক পড়তেন, এখন তার চেয়ে অনেক বেশি পড়েন। এই সেলিব্রিটি-ডিম্মিডিয়া-গ্ল্যামার এটা একটা গোলচক্কর। একটা ফাঁদ। এবং অবশ্য মনের মধ্যে তৈরি করে দেওয়া আধিপত্য বা হেজিমনি। এদেরকে ছুঁড়ে ফেলুন, নিজের দলের নেতাদের ছুঁড়ে ফেলতে বলুন। ডিম্মিডিয়ার আয়ু এমনিই বেশিদিন নয়। শেষদিনটা একটু উদ্যোগ নিয়ে ত্বরান্বিত করুন। ইতিহাস আপনাদের মনে রাখবে।

    পুঃ ডিম্মিডিয়ায় ভরসা না রাখা কেন দরকার, তার একাধিক হাতেগরম উদাহরণ আছে। বিহার এখন উত্তাল। বিহার বন্ধের ডাক দেওয়া হয়েছে। আর ঠিক তার আগেই জেহানাবাদে গুলি চলেছে। এবং আইসার নেতাদের রাজ্যজুড়ে ধরপাকড় করা হচ্ছে। এ ছাড়াও আরও একট মিছিল আছে আজ কলকাতায়। পদ্মপুকুর মৌলালিতে। দুপুর দুটোয়। এইসব খবর আপনি ডিম্মিডিয়ায় পাবেন না। তারা ঠিক যা দেখানোর দরকার মনে করবে, সেইটুকুই দেখাবে, বাকি সব বাদ। ঠিক এই জন্যই বয়কট প্রয়োজন।এবং এই খবরটাগুলোও ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন