এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • সাত্ত্বিক খাবার

    সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়
    ২৫ জুন ২০২৬ | ৭১ বার পঠিত
  • বিজেপির রাজ্যসভাপতি মাননীয় শমীক ভট্টাচার্য তাঁর ব্যারিটোন গলায় জানিয়েছেন, "এটা কোনো দলের কর্মসূচি হতে পারেনা, যে, একটা মানুষকে দেখে আমি পচা ডিম ছুঁড়ে দেব। কিন্তু ছোঁড়া হচ্ছে। এটা পশ্চিমবঙ্গ নয়।" এই ব্যাপারটা অভিনব। এর থেকে দুটো জিনিস বোঝা যাচ্ছে, এক, এটা পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি নয়, দুই, বিজেপি নির্ঘাত কোনো দল নয়, অন্য কিছু। হয়তো দেবদূতদের দঙ্গল, কিংবা জলদস্যুদের জলসা, কিন্তু দল না। শমীকবাবুই তার মাথায় বসে আছেন। কিন্তু সেটা ঠিকই আছে। মাও-সে-তুং এই অবস্থাতে পড়েই 'সদর দপ্তরে কামান দাগো" স্লোগান দিয়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিতে শমীকবাবু অবশ্য সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ডাক দেবেন কিনা বোঝা যাচ্ছেনা।

    ওদিকে, শুধু ডিম না, পড়লাম, বর্তমান পত্রিকাকে নোটিস দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিক প্রসূন আচার্য লিখেছেন, "২৩ জুন বর্তমানের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে। বলা হয়েছে, তিন দিনের মধ্যে জবাব দিতে না পারলে লিজের চুক্তি ভঙ্গ করার জন্য বহুতল বাড়ি সমেত জমি নিয়ে নেওয়া হবে।" এই ব্যাপারটাও অভূতপূর্ব। এর আগে সাংবাদিকদের গ্রেপ্তারের কথা জানা গেছে, বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করে বাগে আনার চেষ্টার কথা শোনা গেছে। কিন্তু বাড়ি সমেত জমি নিয়ে নেওয়া টা নতুন। সেটাও ঠিকই আছে। কারণ তৃণমূল সিপিএম ক্ষমতায় এলে কী হত ভাবতে পারবেন না। এবিপির আপিস চুরি করে মসজিদ বানিয়ে দিত। কাটমানির টাকা চলে যেত সুরিনামে। আর সিপিএম এলে এক-হাজার ফুট লম্বা লেনিনের মূর্তি বানাত। সেসব আটকানোর জন্যই এগুলো জরুরি। ওই জন্যই দেখবেন, সাংবাদিকরা, সবকিছুতে যাঁরা জ্বলে ওঠেন, এখন একটু চুপ করে আছেন।

    তারপর বিধানসভায় দেখলাম, মাননীয় অধ্যক্ষ মহাশয়, মাননীয় কুনাল ঘোষকে বলছেন, ওয়াশিং মেশিন শব্দটা ব্যবহার না করতে। এটাও নতুন। সেটাও ঠিকই আছে। সেকু-মাকুদের আমলে ইচ্ছে করেই অসংসদীয় শব্দের তালিকায় এসব ঢোকানো হয়নি। আমি প্রস্তাব করছি, একটা নতুন তালিকা হোক। ওয়াশিং-মেশিন, আদানি-আম্বানি, ক্রোনি ক্যাপিটালিজম এই শব্দগুলো আর বলা যাবেনা। বিধানসভায় বললে কার্যবিবরণী থেকে বাদ। কাগজে লিখলে বাড়ি নিয়ে নেওয়া হবে। আর রাস্তায় বললেই ডিম।

    এবং সবশেষে দেখি, সিপিএমের সবেধন নীলমনি বিধায়ক মাননীয় মুস্তাফিজুর রহমান বললেন, অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের পুশব্যাক হোক। এবং বিগত সরকারের আমলে ভুল পুশব্যাক হয়েছে। এটাও সম্পূর্ণ ঠিক। কে না জানে, ভুল পুশব্যাক করেছে বিগত রাজ্যসরকার। এসআইআরও তাদেরই অপকর্মের ফল। বিএসএফ বা নির্বাচন কমিশনকে এর দায় দেওয়া একেবারেই বেঠিক। এবং অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের পুশব্যাক হোক, না বললে, হয়তো ডিম খেতে হতে পারে। রাজ্য এখন ভালো-তৃণমূল এবং ভালো-সিপিএম চায়। বেফাঁস কথা একদম না।




    সবাই ডিম-ডিম করে মাথা খারাপ করে দিচ্ছে, তাই ইসকন কী খাবার দেয়, সেটা একটু কৌতুহলী হয়ে দেখতে গেলাম। জানা গেল, তাদের ভোগে ইসকন দেয়, সাত্ত্বিক খাবার। ইসকনডিজায়ারট্রির 'কিচেন স্ট্যান্ডার্ড"এ লেখা আছে, "সাধারণ নিষিদ্ধ খাবারের মধ্যে রয়েছে মাংস, মাছ, ডিম, পেঁয়াজ, রসুন, মাশরুম, মসুর ডাল, পোড়া ভাত, সাদা বেগুন, গাঁজা, লেবুজাতীয় ফল, গাছের রস (আগে না ফুটিয়ে নিলে), মহিষ ও ছাগলের দুধের তৈরি পণ্য এবং লবণাক্ত দুধ।"

    খেয়াল করবেন, এই "সাত্ত্বিক" মাপকাঠিতে শুধু ডিম-মাছ-মাংস না, পেঁয়াজ-রসুন-মসুর ডাল সবই বারণ। এর মধ্যে সাদা-বেগুন আর গাঁজা কোথা থেকে এল জানিনা। সে থাক, কারণ, কোনো সম্প্রদায়ের নিজস্ব বিশ্বাসের জন্য হলে ব্যাপারটা ঠিকই আছে। কিন্তু জাতি হিসেবে এইটা বাঙালির খাবার নয়। এই "সাত্ত্বিক" মেনু, দুশো বছর আগে কেবলমাত্র বাঙালি বিধবাদের খাবারের মাপকাঠি ছিল। "শরীর গরম হয়" এমন কিছু তাঁদের খেতে দেওয়া হতনা। এখন সর্বসম্মতিক্রমে সেটা মোটের উপর উঠে গেছে। এখন এমনকি পেঁয়াজ-রসুনহীন নিরামিষও বাঙালি খায়না, সেক্ষেত্রে বাঙালি বাচ্চারা খাবে কেন?

    বাচ্চাদের মেনুতে অবশ্য নিরামিষের কথাটা সর্বত্র পাচ্ছি, কিন্তু পেঁয়াজ-রসুন আলাদা করে লেখা নেই। বিশ্বাস না হওয়ায় আরেকটু খুঁজলাম। নিউজ ক্লিক এবং নিউজ গ্রামের প্রতিবেদনে দেখলাম, সত্যি সত্যিই ইসকন তার খাবার থেকে পেঁয়াজ-রসুন বাদ দেওয়ায় সে নিয়ে এর আগে ঝামেলাও হয়েছে কর্নাটকে। উড়িষ্যায় হয়েছে ডিম নিয়ে। ইসকনের সর্বভারতীয় মেনু খুবই সাত্ত্বিক এবং সেখানে পেঁয়াজ-রসুন সবই বাদ। ঝামেলার পরে সেসব ফিরে এসেছে বলে দেখিনি। মিড-ডে মিলের বাচ্চাদের নিয়ে কেই বা অনন্তকাল মাথা ঘামাবে। ফলে বাঙালির বাচ্চাদের মেনুও নির্ঘাত এইরকমই হবে, সেটা ভাবার যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে।

    অনেকেই "ধুর বাংলায় এসব হবেনা" মোড থেকে এখন সয়াবিনের পুষ্টিগুণের হিসেব করছেন। সে করুন। কিন্তু পেঁয়াজ-রসুনহীন খাবার নিজেরা কতদিন খেতে পারবেন, সেটাও সঙ্গে ভাববেন। নিজেদের খাদ্যাভ্যাস ছেড়ে অন্য জিনিস ধরতে হবেই বা কেন? ফ্রিতে হলে একরকম কথা ছিল। কিন্তু বাজেটে বরাদ্দ বেড়েছে, সেটা তো ইসকনের কাছেই যাবে।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অরিন | ২৫ জুন ২০২৬ ১৩:৩৬741366
  • "খেয়াল করবেন, এই "সাত্ত্বিক" মাপকাঠিতে শুধু ডিম-মাছ-মাংস না, পেঁয়াজ-রসুন-মসুর ডাল সবই বারণ। এর মধ্যে সাদা-বেগুন আর গাঁজা কোথা থেকে এল জানিনা।"
     
    শ্রীমদ সনাতন গোস্বামী / গোপাল ভট্ট বিরচিত হরিভক্তিবিলাস বই থেকে, এই বইটি গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ভক্তরা, বিশেষ করে ইসকনে মনে হয় অনুসরণ করেন মনে হয়। তো সেখানে রয়েছে
    বৃন্তকং জালিকাশাকং কুসুমভাশ্মন্তকং তথা।।
    পলাণ্ডুং লশুনং শুক্লম নির্যাসং চৈব বর্জয়েত। ।
     
    বৃন্তকং বলতে মনে হয় সবরকমের বেগুনই না খাওয়া উচিত, বেছে বেছে কেন সাদা বা সবুজ বেগুন বাদ দেবার কথা পলা হয়েছে বোধগম্য নয়। তবে শুক্লম নির্যাসম বাদ দিতে হবে বলেই নির্ঘাত গাঁজা বাদ দিতে বলা হয়েছে। আন্দাজ করছি আরো একটা কারণ থাকতে পারে যে শাক্ত এবং শৈব সম্প্রদায়ের সঙ্গে বৈষ্ণবদের বিরোধিতা এবং সঙ্ঘাত হয়ত এর পেছনে থাকতে পারে।
     
    এখানে যে কথাটা আলোচনা করা যেতে পারে, ইসকনের মতন একটি সম্প্রদায়ের দায়িত্বে মিড ডে মিল তুলে দিলে এবং তারা যদি তাদের বৈষ্ণবিয় বা প্রসাদ হিসেবে যা দেওয়া যেতে পারে তার ভিত্তিতে খাবার রান্না করে বিতরণ করে, সেটা শিশু বা কিশোরদের কতটা পুষ্টি প্রদান করতে পারে তাই নিয়ে চর্চা এবং evidence দেখার প্রয়োজন রয়েছে। কেনই বা একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মঠে যে ধরণের খাবার প্রচলিত তাকে সার্বজনীন খাবারের অঙ্গ হিসেবে শিশু/কিশোরদের মিড ডে মিলে আনা হবে এ নিয়ে প্রশ্ন তোলা উচিত ছিল। মুখ্যমন্ত্রী বলছেন খাবার স্বাস্থ্যসম্মত ভাবে রান্না করা হবে এবং সুস্বাদু হবে। এ নিয়ে সন্দেহ নেই, কারণ ইসকনের রান্না করা খাবার খুবই ভাল এবং রীতিমতন restaurant quality র। তবে তাতেও পুষ্টির প্রশ্নটা থেকেই যায়, আর অতটা carbohydrate heavy খাবাার বাচ্চাদের দেওয়া কতটা স্বাস্থ্যসম্মত এ নিয়ে আলোচনার প্রভূত অবকাশ আছে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে প্রতিক্রিয়া দিন