এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • টইপত্তর  প্রবন্ধ

  • গ্রেট নিকোবর: একটি সবুজ দ্বীপের ভাগ্য, একটি সভ্যতার প্রশ্ন

    সিংগল k
    প্রবন্ধ | ১৬ জুন ২০২৬ | ৬১ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • গ্রেট নিকোবর: একটি দ্বীপের ভাগ্য, একটি সভ্যতার প্রশ্ন

    ভূমিকা: এই গল্প শুধু একটি দ্বীপের নয়
    আমাজনের কথা মনে আছে? ব্রাজিলের সেই অপার সবুজ — পৃথিবীর ফুসফুস — যেটাকে কয়েক দশক ধরে কেটে সাফ করা হচ্ছে? কখনো রাস্তার নামে, কখনো কৃষির নামে, কখনো উন্নয়নের নামে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট কুবিচেক ১৯৫০-এর দশকে রাজধানী সরিয়ে ব্রাসিলিয়া বানালেন, সেই সূত্রে একটা হাইওয়ে গেল আমাজনের ভেতর দিয়ে, সেই হাইওয়ে ধরে মানুষ গেল, তারপর গেল কাঠ ব্যবসায়ীরা, তারপর রাঞ্চার্স, তারপর খনি কোম্পানি। প্রতিটা পদক্ষেপ আলাদা আলাদাভাবে যুক্তিসঙ্গত মনে হয়েছিল। কিন্তু মিলিয়ে দেখলে? একটা মহাবিপর্যয়।
    সোভিয়েত ইউনিয়ন — যারা পুঁজিবাদের ঘোর বিরোধী ছিল — তারা তুলো চাষের জন্য আরল সাগরের জল সরিয়ে নিল। একসময়ের পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম হ্রদ আজ মরুভূমি। কঙ্গোর কোবাল্ট, ইন্দোনেশিয়ার পাম অয়েল, আমেরিকার পুরনো বনভূমি — গল্পটা সব জায়গায় এক। শুধু অভিনেতা বদলায়, চিত্রনাট্য বদলায় না।
    তাহলে প্রশ্নটা মতাদর্শের নয়। পুঁজিবাদ বা সমাজতন্ত্র — কোনোটাই এই প্রলোভন থেকে মুক্ত নয়। প্রশ্নটা হলো ক্ষমতা আর জবাবদিহিতার। যখন ক্ষমতা একদিকে কেন্দ্রীভূত হয় আর প্রকৃতি ও মানুষ দুর্বল থাকে — তখন যা হওয়ার তাই হয়।
    এই প্রেক্ষাপটে আসুন কথা বলি গ্রেট নিকোবর দ্বীপের কথা। এটা শুধু একটি দ্বীপ বাঁচানো বা না বাঁচানোর গল্প নয়। এটা একটা সভ্যতার প্রশ্ন — আমরা কীভাবে সিদ্ধান্ত নিই, কার জন্য নিই, আর কে সেই সিদ্ধান্তের মূল্য চোকায়।

    প্রথম পর্ব: দ্বীপটা আসলে কী?
    আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের একদম দক্ষিণে, ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার দূরে — গ্রেট নিকোবর। মাত্র ৮৬৫ বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপে বাস করে মাত্র আট হাজার মানুষ। কিন্তু এই ছোট্ট দ্বীপটি পৃথিবীর অন্যতম বিরল জীববৈচিত্র্যের আধার।
    এখানে আছে লেদারব্যাক কচ্ছপ — পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কচ্ছপ, যারা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে এই সৈকতে ডিম পাড়তে আসে। আছে নিকোবর মেগাপড — এমন একটি পাখি যে মাটিতে গর্ত করে ডিম পাড়ে এবং সূর্যের তাপেই সেই ডিম ফোটে। আছে নোনা জলের কুমির। আছে এমন অনেক প্রজাতির গাছ ও প্রাণী যারা শুধু এই দ্বীপেই পাওয়া যায় — পৃথিবীর আর কোথাও নয়।
    আর আছে শম্পেন উপজাতি। ভারতের সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির একটি। বাইরের পৃথিবীর সাথে তাদের যোগাযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। তারা এই বনেই বেঁচে আছে — হাজার হাজার বছর ধরে।
    এই দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থানও অসাধারণ। মালাক্কা প্রণালীর মুখে — পৃথিবীর সবচেয়ে ব্যস্ত সমুদ্রপথের একটির ঠিক কিনারায়। প্রতি বছর যে পরিমাণ সামুদ্রিক বাণিজ্য এই পথে হয়, তার পরিমাণ কল্পনাতীত।
    এই দ্বীপে ভারত সরকার ৮১,০০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ঘোষণা করেছে।

    দ্বিতীয় পর্ব: প্রকল্পটা আসলে কী — এবং সেটা কি আদৌ নিশ্চিত?
    ২০২১ সালে ঘোষিত এই প্রকল্পে আছে —
    একটি আন্তর্জাতিক ট্রান্সশিপমেন্ট বন্দর। একটি বিমানবন্দর। সাড়ে তিন লক্ষ মানুষের জন্য একটি শহর। একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। এটি বাস্তবায়ন করবে ANIIDCO — আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ সমন্বিত উন্নয়ন নিগম।
    এখানেই প্রথম প্রশ্ন জাগে।
    বর্তমানে গোটা আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ চলে ডিজেল জেনারেটরে। বিদ্যুতের এই দুর্বল পরিকাঠামোয় একটি বিশাল আন্তর্জাতিক বন্দর আর শহর চালাবে কীভাবে? সরকার বলছে সৌর, বায়ু আর তরঙ্গশক্তিতে — নবায়নযোগ্য শক্তিতে।
    কিন্তু একটু ভাবুন। একটি ২৪ ঘণ্টা চলা আন্তর্জাতিক বন্দর এবং বিমানবন্দরের জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ চাই। সৌর বা বায়ুশক্তি প্রকৃতির মর্জির উপর নির্ভরশীল — রাতে সূর্য নেই, ঝড়ে বায়ুকল বন্ধ হয়। এই অঞ্চলে ভূমিকম্প আর সুনামির ইতিহাস আছে। তাহলে এই শক্তি পরিকল্পনা কি আদৌ বাস্তবসম্মত?
    অথচ ভারত রাশিয়া থেকে ভাসমান পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রযুক্তি পেতে পারত। রাশিয়ার আকাদেমিক লোমোনোসভ ২০১৯ সাল থেকে সফলভাবে চলছে। এই প্রযুক্তি এই ধরনের প্রত্যন্ত দ্বীপের জন্য আদর্শ। কিন্তু সেটা বেছে নেওয়া হয়নি।
    কেন? হয়তো কারণ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র "সবুজ উন্নয়ন"-এর গল্পে মানায় না। আর "সবুজ" তকমাটা দরকার — বিরোধিতা ঠেকাতে।

    তৃতীয় পর্ব: কার অনুমতি নিয়ে?
    ২০২২ সালে পরিবেশ ছাড়পত্র দেওয়া হলো। কিন্তু কীভাবে?
    বন অধিকার আইন ২০০৬ বলে — যেকোনো বনভূমি অধিগ্রহণের আগে সেখানকার আদিবাসী ও বনবাসীদের গ্রামসভার সম্মতি বাধ্যতামূলক। এই আইনটি কে তৈরি করেছিলেন? মীনা গুপ্তা — তৎকালীন উপজাতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব।
    এই মীনা গুপ্তাই এখন কলকাতা হাইকোর্টে PIL করেছেন। কারণ তিনি অভিযোগ করেছেন যে তাঁর নিজের লেখা আইনটিই ভাঙা হয়েছে।
    অভিযোগ কী?
    যে গ্রামসভাগুলি বনভূমি হস্তান্তরের অনুমতি দিয়েছে, সেগুলি আসলে অ-আদিবাসী বসতি স্থাপনকারীদের পঞ্চায়েত — শম্পেন বা নিকোবরী আদিবাসীদের বৈধ প্রতিনিধি নয়। আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় বন অধিকার কমিটি গঠনের কোনো নথি নেই। কোরাম পূর্ণ হয়নি। আর যে উপজাতীয় কাউন্সিলের চেয়ারম্যানের সম্মতি নেওয়া হয়েছিল — সেই কাউন্সিল পরে নভেম্বর ২০২২-এ সেই সম্মতি প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
    সরকার সেই প্রত্যাহার উপেক্ষা করে এগিয়ে গেছে।
    মীনা গুপ্তা কে? শুধু একজন অবসরপ্রাপ্ত আমলা নন। তিনি বন অধিকার আইনের স্রষ্টা। তিনি ওড়িশার নিয়ামগিরি পাহাড়ে বেদান্ত কোম্পানির বক্সাইট খনির বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিয়েছিলেন — সেই মামলায় আদিবাসীরা জিতেছিল। তিনি শৈশবের একাংশ কাটিয়েছেন আন্দামান-নিকোবর দ্বীপে।
    সরকারের আইনজীবী আদালতে তাঁকে "হায়দ্রাবাদের বাসিন্দা, এই মামলায় কী স্বার্থ?" বলে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
    কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতিরা সেই আপত্তি নাকচ করে দিয়েছেন।

    চতুর্থ পর্ব: বাংলার সাথে এই মামলার যোগ
    এখানেই বাংলার পাঠকের একটু সরাসরি সম্পর্ক আছে।
    আন্দামান-নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের বিচার বিভাগ কলকাতা হাইকোর্টের অধীনে। পোর্ট ব্লেয়ারে কলকাতা হাইকোর্টের একটি সার্কিট বেঞ্চ আছে।
    মীনা গুপ্তার PIL-এর বিচার করছেন প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল ও বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ। মামলাটি চূড়ান্ত শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত — ২৩ জুন ২০২৬।
    মাত্র কদিন পরে।
    মে মাসে আদালত স্পষ্ট বলেছে — "জাতীয় গুরুত্ব আছে মানেই কোনো প্রকল্প আইনের ঊর্ধ্বে নয়।" শম্পেন ও নিকোবরী জনগোষ্ঠীকে আদালত বলেছে "অত্যন্ত ভঙ্গুর" — এবং PIL গ্রহণ করেছে।
    সরকার এই PIL বারবার আটকানোর চেষ্টা করেছে। প্রতিবার ব্যর্থ হয়েছে।
    এবার একটু থামুন। পশ্চিমবঙ্গে এখন বিজেপি সরকার। কেন্দ্রেও বিজেপি। কলকাতা হাইকোর্ট যদি ২৩ জুন গ্রেট নিকোবর প্রকল্পের বিরুদ্ধে কোনো রায় দেয় বা স্থগিতাদেশ জারি করে — তাহলে কী হতে পারে?
    ইতিহাস বলে — যখন কোনো প্রতিষ্ঠান অসুবিধাজনক হয়ে ওঠে, সেই প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠিত হয়।
    আন্দামান-নিকোবরের জন্য একটি আলাদা হাইকোর্ট তৈরি করা সাংবিধানিকভাবে সম্পূর্ণ সম্ভব। পোর্ট ব্লেয়ারে কোর্টের পরিকাঠামো আছে। সেটাকে "স্বাধীন হাইকোর্ট"-এ রূপান্তর করতে শুধু একটি সংসদীয় সিদ্ধান্ত দরকার। এবং প্রশাসনিক সুবিধার নামে এটি ঘোষণা হলে কেউ আপত্তি করার সুযোগ পাবে না।
    বাংলার সাথে আন্দামানের সম্পর্ক শুধু প্রশাসনিক নয়। সেলুলার জেলে যে বাঙালি বিপ্লবীরা নির্বাসিত হয়েছিলেন — বারীন্দ্র ঘোষ, বটুকেশ্বর দত্ত — তাঁদের রক্তে ভেজা সেই মাটির বিচার এখনো কলকাতার হাতে। ২৩ জুনের পর হয়তো থাকবে না।

    পঞ্চম পর্ব: তেলের গল্প — থ্রিলারের মোড়
    এতক্ষণ যা পড়লেন সেটা তো ছিল পরিচিত গল্প — বন কাটা, আদিবাসী উচ্ছেদ, আদালতের লড়াই। এবার একটু অন্যরকম মোড়।
    ২০২০ সালে — গ্রেট নিকোবর প্রকল্প ঘোষণার ঠিক আগে — ভারত সরকার প্রায় তিন দশকের বিরতির পর আন্দামান সাগরে সমুদ্র-তলের জরিপ (seismic survey) শুরু করে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে এল ব্ল্যাকফোর্ড ডলফিন — একটি ৫২ বছর পুরনো সেমি-সাবমার্সিবল তেল-অনুসন্ধান রিগ। নরওয়েজিয়ান কোম্পানির এই রিগটি উত্তর সাগর থেকে শুরু করে গানা, ব্রাজিল, মেক্সিকো ঘুরে এসেছে।
    ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রী ঘোষণা করলেন — শ্রী বিজয়াপুরম-২ কূপে প্রাকৃতিক গ্যাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
    এবং তারপর এলো সেই ঘোষণা যা সবাইকে চমকে দিল — "ভারত হয়তো আন্দামান সাগরে গায়ানার মতো বিশাল তেলক্ষেত্র আবিষ্কার করতে চলেছে।"
    গায়ানা! দক্ষিণ আমেরিকার সেই ছোট্ট দেশ যেখানে এক্সনমোবিল ৪০টি কূপ খুঁড়ে ১১ বিলিয়ন ব্যারেল তেল পেয়েছে — যা রাতারাতি দেশটির ভাগ্য বদলে দিয়েছে।
    কিন্তু একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবুন।
    রিগ এলো অক্টোবর ২০২৪-এ। গ্যাসের ঘোষণা সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ। মাত্র ১১ মাস। বিশেষজ্ঞরা বলছেন একটি অনুসন্ধান কূপ থেকে মাঠের আকার নির্ধারণ করতে কয়েক বছর লাগে। গায়ানাতে ২০১৫ সালে প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল — উৎপাদন শুরু হয়েছে ২০১৯-এ, চারটি বছর পর, ৪০টি কূপের পর।
    আর প্রথম কূপটি — শ্রী বিজয়াপুরম-১ — কিন্তু শুকনো। কোনো গ্যাস নেই। এই তথ্যটি কোনো সরকারি ঘোষণায় আসেনি। এটি জানা গেছে দ্বিতীয় কূপের ঘোষণায় লুকিয়ে থাকা একটি বাক্য থেকে।
    ONGC-র দুটি আল্ট্রা-ডিপওয়াটার কূপেও কোনো ঘোষণা নেই — শিল্পমহলে নীরবতা সাধারণত শুকনো কূপের ইঙ্গিত।
    তৃতীয় কূপের ঘোষণা এলো ৫ জুন ২০২৬-এ — ২৩ জুনের PIL শুনানির ঠিক আঠারো দিন আগে।
    কাকতালীয়?

    ষষ্ঠ পর্ব: কে লাভবান হবে?
    এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন — এই সবকিছুতে কার লাভ?
    প্রথম স্তর — গাছ কাটার ঠিকাদার। প্রথম পর্যায়েই সাত লক্ষ এগারো হাজার গাছ কাটা হবে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রেইনফরেস্টের সেগুন, পদৌক, গুরজান কাঠের বাজারমূল্য বিপুল। এই কাঠের ঠিকা পেলে রাতারাতি কোটিপতি হওয়া যায়। বন্দর সফল হোক বা না হোক — গাছ তো কাটা হয়ে যাবেই।
    দ্বিতীয় স্তর — নির্মাণ কোম্পানি। ৮১,০০০ কোটি টাকার প্রকল্প। ৩০ বছরের নির্মাণ। L&T, Afcons, JSW — এরা ইতিমধ্যে আগ্রহপত্র জমা দিয়েছে।
    তৃতীয় স্তর — বন্দর পরিচালক। আদানি পোর্টস-এর নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে। প্রস্তাবিত মডেল হলো — সরকার ৭০% নির্মাণ খরচ বহন করবে, বেসরকারি কোম্পানি ৩০% বিনিয়োগ করবে, কিন্তু পরিচালনার সম্পূর্ণ অধিকার পাবে। আরও আছে — প্রথম সুযোগের অধিকার (Right of First Refusal) যা ভবিষ্যতে দ্বীপে আর কোনো প্রতিযোগী আসতে পারবে না।
    চতুর্থ স্তর — জমি ফটকাবাজ। পোর্ট ব্লেয়ারে ইতিমধ্যে গ্রেট নিকোবরের জমি কেনার বিজ্ঞাপন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাসছে। সাড়ে তিন লক্ষ মানুষের শহর হলে জমির দাম যা হবে — সেটা এখনই কেউ কেউ বুঝে গেছেন।
    পঞ্চম স্তর — তেল কোম্পানি। গ্রেট নিকোবরের বন্দর, বিমানবন্দর, শহর — এই পুরো পরিকাঠামো ভবিষ্যতে আন্দামান সাগরের অফশোর তেল উত্তোলনের লজিস্টিক ঘাঁটি হিসেবেও কাজ করতে পারে। সরকারের টাকায় বানানো পরিকাঠামো, তেল কোম্পানির সুবিধায়।
    সবচেয়ে অদৃশ্য স্তর — আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ৮১,০০০ কোটি টাকা মানে বিশাল ব্যাংক ঋণ, বন্ড, বিমা, পরামর্শ ফি। এই স্তরটি কখনো খবরে আসে না।

    সপ্তম পর্ব: সরকার নিজেই বিভ্রান্ত?
    এখানে একটি অদ্ভুত তথ্য।
    ২০২৪ সালের আগস্টে অর্থ মন্ত্রণালয়ের Public Investment Board জানিয়েছে — এই প্রকল্পের কোনো স্পষ্ট কৌশলগত উদ্দেশ্য নেই।
    তারপর ২০২৫ সালের আগস্টে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় একই প্রকল্পকে "কৌশলগত" বলে ঘোষণা করল।
    একই প্রকল্প, একই দ্বীপ, একই পরিকল্পনা। এক বছরের মধ্যে "কৌশলগত উদ্দেশ্যহীন" থেকে "জাতীয় নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য" হয়ে গেল।
    কৌশলগত তকমার সুবিধা? তথ্য জানার অধিকার আইন (RTI) প্রযোজ্য নয়। সংসদে প্রশ্ন করা কঠিন হয়ে যায়।
    সমালোচকরা বলছেন — সামরিক অংশ আসলে মোট প্রকল্প এলাকার মাত্র ৫%। বাকি ১৬০ বর্গকিলোমিটার বাণিজ্যিক। এই বাণিজ্যিক প্রকল্পকে সামরিক বলা কতটা সৎ?

    শেষ কথা: পাথর গড়িয়ে দেওয়ার সময়

    আমরা কি শুধু দর্শক?
    বাংলার সাথে আন্দামানের সম্পর্ক ঐতিহাসিক, আবেগের, সাংস্কৃতিক। সেলুলার জেলের কথা আমরা ভুলিনি। সেই দ্বীপের বিচারের দায়িত্ব এখনো কলকাতার হাতে।
    ২৩ জুন — ঠিক আর কদিন পরে — কলকাতা হাইকোর্টের বেঞ্চ হয়তো একটি ঐতিহাসিক রায় দেবে। অথবা দেবে না। কিন্তু বাংলার মানুষ যদি এই মুহূর্তে জানেন — তাহলে অন্তত জবাবদিহিতার একটা চাপ থাকে।
    গ্রেট নিকোবরের লেদারব্যাক কচ্ছপ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সেই সৈকতে ডিম পেড়েছে। শম্পেনরা হাজার হাজার বছর সেই বনে বেঁচেছে। সেই গল্পটা কি এখানেই শেষ হয়ে যাবে?
    সেটা ঠিক করার একটু সুযোগ হয়তো আছে — এখনো।
    _______________________________________________________________________
    তথ্যসূত্র: Mongabay India, The Wire, The India Forum, Time Magazine (জুন ২০২৬), LiveLaw, Bar and Bench, ONGC ও Oil India-র সরকারি ঘোষণা, কলকাতা হাইকোর্টের আদেশ (মে ২০২৬)
    এই লেখাটি কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। এটি অনুসন্ধানমূলক প্রবন্ধমাত্র — পাঠক নিজেই বিচার করুন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • k | ১৬ জুন ২০২৬ ০৯:২৯747713
  • আমি এই প্রবন্ধ ডিফেন্ড করতে যাব না। কোনো মতামত বা মতভেদ থাকলে সরাসরি এআই ক্লড সাহেবকে জিজ্ঞেস করে নিন। গুরুচণ্ডা৯ তে প্রকাশিত নিকোবরের প্রবন্ধ বললেই উনি বুঝে যাবেন এবং ঝুলি থেকে যা বার করবেন তাতে আপনারা চমকে যেতেও পারেন।
    ভাল করে সবকিছুর ক্রনোলজি বুঝবেন। আপনারা ভালই জানেন তার প্রয়োজনীয়তা কতটা।
    মামলাটি সম্পর্কে অবশ্যই বিস্তারিত জানতে চাইবেন।এখানে তার বিতর্কিত অংশ কিছুই বলা নেই। মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারন তার ওপর ভবিষ্যতের অনেককিছু নির্ভর করছে।
    মনে রাখবেন সবকিছু ঠিকঠাক চললে রায়দান আগামী ২৩ শে জুন ২০২৬।
  • অরিন | ১৬ জুন ২০২৬ ০৯:৪৭747714
  • "গ্রেট নিকোবরের লেদারব্যাক কচ্ছপ লক্ষ লক্ষ বছর ধরে সেই সৈকতে ডিম পেড়েছে। শম্পেনরা হাজার হাজার বছর সেই বনে বেঁচেছে। সেই গল্পটা কি এখানেই শেষ হয়ে যাবে?"
     
    সেটা তো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়।
    তার সঙ্গে এটাও মাথায় রাখতে হবে যে নিকোবারের ঐ জায়গাটি ভূমিকম্প প্রবণ, ফলে জনবসতি গড়ে উঠলে ভূমিকম্প প্রবণতার একটা প্রভাব থাকবেই। আরো একটা বিষয় মাত্রাতিরিক্ত development হতে গেলে ভাবতে হয় সে জায়গার carrying capacityর কথা। নিরোবারের ঐ অঞ্চল নিয়ে এ বিষয়ে কি তথ‍্য Claude দিচ্ছে?
  • | ১৬ জুন ২০২৬ ১০:২১747716
  • আদানি এখন পর্যন্ত অনেক কিছু পেয়েছে, জঙ্গল, পোর্ট, গুদাম, রাস্তা, জমি আরো কী কী ! একটা গোটা দ্বীপ পায়নি না ?
  • | ১৬ জুন ২০২৬ ১০:২৩747717
  • থ্যাঙ্কিউ কেলোদাদা। কথা হবে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন