এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • আইনের শাসন

    সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়
    ১৭ জুন ২০২৬ | ২৮ বার পঠিত
  • দুজনেই প্রবীর। পুরকায়স্থ এবং বিশ্বাস। দুজনের মধ্যে অমিল অনেক। একজন সিপিএম, অন্যজন তৃণমূল। একজন দিল্লিতে থাকেন, অন্যজন পশ্চিমবঙ্গে। কিন্তু মূল মিল একটাই। দুজনেই সাংবাদিক এবং দুজনকেই বিজেপি সরকারের পুলিশ গ্রেপ্তার করে রেখেছিল। প্রবীর পুরকায়স্থ নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন কয়েকদিন আগে। প্রবীর বিশ্বাস কয়েকদিন আগে একটা হাস্যকর অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে এখনও কারান্তরালে। এটুকুই না, আরও মিল আছে। এই গ্রেপ্তারিগুলো ঘিরে এত নীরবতা, যে বাকস্বাধীনতায় এগুলো যে বড় আঘাত, বোঝাই যায়নি। কলকাতার বড় সাংবাদিকরা কার্যত মূলত মুখে কুলুপ এঁটেছেন। প্রবীর বিশ্বাসকে নিয়ে তৃণমূলেরও কাউকে বিশেষ মুখ খুলতে দেখিনি। প্রবীর পুরকায়স্থকে নিয়ে বহুকাল আগে একটা বিবৃতি হয়েছিল, তাতে বেশি লোকে যেন সই করে না ফেলে এই দিকেই বাম সংগঠকদের বেশি মন ছিল। বিশেষ করে আমি যেন না করে ফেলি, এই দিকে তীক্ষ্ণ নজর ছিল, মনে আছে। সব মিলিয়ে যা হয়েছিল, সেটা না হবার মতোই।

    এবং এটা এই দুজনের ক্ষেত্রেই শুধু না। গত এক-দেড় মাসে পশ্চিমবঙ্গে টপাটপ গ্রেপ্তার হয়ে গেল, স্রেফ মত প্রকাশ বা খবর করার জন্য। এক্রামূল বাগানি, ফরিদুল দুজনের কেউই অপরিচিত কেউ না। এখন জামিন পেয়েছেন, কিন্তু নীরবতার চোটে এঁরা গ্রেপ্তার হয়েছিলেন বলেই মনে হয়নি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, বাংলার সারস্বত সমাজ কীকরম স্প্রিংয়ের মতো গুটিয়ে গিয়েছিলেন। মমতাশঙ্করের একটা ভুলভাল মন্তব্যে সমাজমাধ্যম ফেটে যেত কদিন আগে পর্যন্ত, কিন্তু এখন কেমন চারদিক চমৎকার নিঃঝুম। ঠিকই, এর মধ্যে কেউকেউ অতিভক্ত হয়েছেন, কেউ কেউ সঙ্গত কারণেই ভয় পেয়েছেন। কেউ কেউ নরম মাটি দেখলে তবেই সিংহবিক্রমে আঁচড়াতে পারেন। কিন্তু পুরোটাই কি তাই? দশ-বারো বছর আগে একটা ফালতু অভিযোগে তরুণ তেজপালকে যখন গ্রেপ্তার করা হল, তখন ওঁকে জেলের ঘানি টানানোর জন্য বঙ্গীয় এবং সর্বভারতীয় বুদ্ধিজীবীকুলের যে বিপুল উৎসাহ দেখেছিলাম, তার কণামাত্র এইসব সত্যিকারের বাক-স্বাধীনতা-লুণ্ঠণে যে দেখা যায়না, তার একটা বড় কারণ হল, ওটা গোদি-মিডিয়ার অ্যাজেন্ডা ছিল, এগুলো নয়। এমনকি শূন্য দশকেও লোকে অন্য সুরে কথা বলত, কিন্তু এখন হাতে-হাতে-ফোন, সমাজমাধ্যমে ছবি আর কবিতার বন্যা, কিন্তু তার মধ্যেও চিন্তার জগতে গোদি-মিডিয়া একচেটিয়া কায়েম করে ফেলেছে।

    এটাই অবশ্য একমাত্র কারণ নাও হতে পারে। কিন্তু রাজ্য-খারাপ আর কেন্দ্র-ভালো, গোদি-মিডিয়া যা বলে তাই ধ্রুবসত্য, এইসব অ্যাজেন্ডায় এত হাওয়া দেওয়া হয়েছে, যে সেটা এখন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে দাঁড়িয়েছে, এতে বিশেষ ভুল নেই।




    গতকালই লিখেছিলাম, ফলতায় জাহাঙ্গীর খানের সঙ্গে যে অমানবিক এবং বেআইনী আচরণ হয়েছে, তার বিরুদ্ধে পথে নেমেছেন মহিলারা। আজ সেই বিক্ষোভ আরও ছড়িয়েছে। জায়গায় জায়গায় বিক্ষোভ হয়েছে। ভিডিও দেখে যা বুঝলাম, এটাও মূলত মহিলাদের বিক্ষোভ, কিন্তু কিছু পুরুষও ছিলেন। পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী লাঠি চালিয়েছে। এক জায়গায় অনেকে লাঠি থেকে বাঁচতে পুকুরে ঝাঁপ দিয়েছেন, এটাও দেখা গেল। ভাবুন, কী ভয়ানক অত্যাচারী এই জাহাঙ্গীর খান। তিনি নিজে জেলে। পুরুষরা নামতে সাহস পাচ্ছেন না। রাজনৈতিক নেতারা হাওয়া। কিন্তু তাতেও মহিলারা বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। জাহাঙ্গীরের ভয়েই হবে।

    এতে মিডিয়া পড়েছে ফাঁপরে। এটা না দেখিয়ে উপায় নেই। একটা মিডিয়া দেখলাম হেডলাইন করেছে, "জাহাঙ্গীরকে ছাড়াতে স্ত্রীর নেতৃত্বে হামলা। কেন্দ্রীয় বাহিনীর লাঠি খেয়ে ঝাঁপ পুকুরে।" ভাবুন, জাহাঙ্গীরের পক্ষে কিছু হলেই হামলা। স্ত্রী, মহিলাদের নিয়ে গিয়ে, অস্ত্রধারী কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপর "হামলা" করছিলেন। সুইসাইড স্কোয়াড বলা হয়নি এই ঢের। আরেকটা টিভি চ্যানেলে দেখলাম, আরও মজা। সঞ্চালক চিল চিৎকার করছেন, নেতাকে ছাড়াতে থানায় হামলা? এ তো আমরা দক্ষিণী সিনেমায় দেখি। ক্ষমতায় না থাকতেই এই, তাহলে থাকতে কী হত ভাবুন। এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল, কিন্তু তারপরই তাঁর গ্রাউন্ডের রিপোর্টারই উত্তেজনায় সম্পূর্ণ জল ঢেলে তাঁকে বললেন, বিক্ষোভ নানা জায়গায় হচ্ছে, কিন্তু থানার কাছে তেমন না। যে বিক্ষোভ থানার কাছেই হয়না, সেটা থানায় হামলা কীকরে বোঝা শিবের অসাধ্য। তিনি আরও যেটা বললেন, যে, জাহাঙ্গীরের সঙ্গে যে অমানবিক আচরণ চলছে, তার বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ। ছাড়িয়ে নিয়ে যাবেন বলে হামলা-টামলা না। সব মিলিয়ে এই মিডিয়ার যা অবস্থা, তাতে মাথা ঢাকতে পশ্চাদ্দেশ বেরিয়ে যাবার উপক্রম। বিশ্বাস না হলে লিংকটা নিচে দিয়ে দেব দেখে নেবেন।

    কিন্তু জিনিসটা হাস্যকর হলেও হাসির না। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির, প্রাক্তন বা বর্তমান যাই হোন, অনায়াসে মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে, সেটা বুক বাজিয়ে বলা হবে, এবং প্রতিবাদকে বলা হবে হামলা, ভয়ে বা ভক্তিতে আস্ত নাগরিক সমাজ চুপ মেরে বসে থাকবেন, এ তো কোনো সভ্য পৃথিবীতে চলে না। নিশ্চয়ই অপরাধ করলে শাস্তি হওয়া দরকার। কিন্তু টিভিতে কাউকে গুন্ডা, প্রতিবাদকে হামলা বলে দাগানো অনৈতিক। এবং একই সঙ্গে, কোমরে দড়ি পরিয়ে ঘোরানো ইত্যাদি যা করা হয়েছে, সেটা বেআইনী, পুলিশ এবং বাহিনীর পক্ষ থেকে যাঁরা করিয়েছেন, তাঁদের শাস্তি হওয়া দরকার। সেটাই আইনের শাসন।

    কদিন আগে বিজেপির রাজ্য সভাপতি আইনের শাসন নিয়ে একটি গুরুগম্ভীর ভাষণ দিয়েছেন। তারপর এই ঘটনার চলাকালীন তাঁর আর কোনো বিবৃতি দেখিনি। নেটে দেখলাম তাঁর অস্ত্রোপচার হয়েছে। খুব সম্ভবত সেই কারণেই এইসব দিকে নজর দিতে পারেননি। আশা করব, এবার আইনরক্ষী এবং তাঁর দলের কেউ যদি এসবে জড়িয়ে থাকেন, ব্যবস্থা নেবেন। নইলে, কথাগুলোর কোনো মানে থাকেনা।

    পুঃ শ্রদ্ধেয় দিলীপ ঘোষ বলেছেন, যে জাহাঙ্গীর খানের হয়ে পথে নামবে, সেও জেলে যাবে। সব বাংলাদেশ পাঠাব খুঁজে খুঁজে। উনি মন্ত্রী হলেও শমীকবাবুর দলেরই লোক তো। ওঁর ব্যাপারটাও একটু দেখার অনুরোধ।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খারাপ-ভাল মতামত দিন