এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • রাউলাট

    সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়
    ১৪ জুলাই ২০২৬ | ৮৮ বার পঠিত
  • "৩৪ বছরের সিপিএম হার্মাদ আর ১৫ বছরের তৃণমূলী গুন্ডা। এদের জব্দ করার জন্য এই আইনের খুব প্রয়োজন ছিল।"-- বলেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, গুন্ডাদমন আইন প্রসঙ্গে।

    প্রসঙ্গত, প্রায় একই রকম চরিত্রের সুবিখ্যাত রাউলাট আইনের পক্ষে পাঞ্জাবের লেফটেনান্ট গভর্নর ও'ডায়ার বলেছিলেন, "গদর চক্রান্তের রাক্ষসের মতো অনেকগুলো মুখ। যদিও আমরা রুখে দিয়েছি, কিন্তু বিপ্লবী নৈরাজ্যের বীজ মানুষের মনে গভীরভাবে গেঁথে রয়েছে। আর যারা কোনো দেশের আইনকেই তোয়াক্কা করে না, সাধারণ আইন দিয়ে তাদের কাবু করা অসম্ভব।"

    এর কিছুদিনের মধ্যেই এই ও'ডায়ারের রাজত্বকালেই জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড ঘটে। আরও কিছুদিন পরে তদন্ত কমিশন বসে। তারা কার্যত ডায়ারকে অবসর নিতে বাধ্য করে। তিনি ইংল্যান্ড ফিরে যান। উধম সিং নামের এক পাঞ্জাবী আরও পরে ডায়ারকে হত্যা করেন। এই অপরাধে ১৯৪০ সালে উধম সিং এর ফাঁসি হয়। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সুভাষ চন্দ্র বসু তাঁর অন্তিম যাত্রায় রওনা হতে চলেছেন। কংগ্রেস ভারত-ছাড়ো আন্দোলনের ডাক দেবে এর কিছুদিন পরে। আর হিন্দু মহাসভা সর্বশক্তি দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বৃটিশকে সাহায্য করার পক্ষে দাঁড়াবে।

    রাউলাট আইনের পর সারা দেশ উত্তাল হয়েছিল। জনপ্রিয় স্লোগান ছিলঃ "নো দলিল, নো অকিল, নো আপিল"। গান্ধি এবং জিন্না অর্থাৎ সেকু এবং মোল্লারা একযোগে প্রতিবাদে নেমেছিলেন। গান্ধি দেশব্যাপী হরতাল আর সত্যাগ্রহের ডাক দেন। আর জিন্না ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিল থেকে পদত্যাগ করেন। ভাইসরয়কে লেখা তাঁর পদত্যাগপত্রে জিন্না লিখেছিলেনঃ ​​​​​​​"যে সরকার শান্তির সময়েও এই ধরনের আইন পাস বা অনুমোদন করে, তারা নিজেদের একটি সভ্য সরকার হিসেবে দাবি করার অধিকার হারিয়ে ফেলে।"

    পরবর্তীকালে এই সেকু, মানে সুভাষ-গান্ধিকে দেশদ্রোহী বলতেও কসুর করেননি হিন্দুবীররা। ওঁরাও এইসব আক্রমণের তোয়াক্কা করতেন না। সেইজন্যই একজন মহাত্মা, একজন দেশনায়ক নেতাজি। আর অন্য একজনকে পাম্প দিয়ে ফুলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের জনক বানাতে হয় পশ্চিমবঙ্গ জন্মানোর ৮০ বছর পরে। এখন অবশ্য প্রতিবাদের জোরও অনেক কম। সেকু-মাকুরাও ভোটের অঙ্ক কষেন, কোথায় ক-ইঞ্চি লাভ, ক-ইঞ্চি ক্ষতি। ডিম্মিডিয়া দেখে জনমতের হিসেব করেন। এসব করে লাভ অবশ্য হয় ঘন্টা। সত্যি সত্যিই এই বাজারে সত্যি সত্যিই চওড়া বুকের সুভাষ বোসের অন্তত চার-আনা মাপের কোনো রাজনৈতিক নেতাকে দরকার ছিল।




    লাহেক আলিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই নিয়ে সুজন চক্রবর্তীর বক্তব্য শুনলাম। স্পষ্ট করে বলেছেন, যে, হিংসার ঘটনা ঘটার পরে লাহেক ওখানে পৌঁছেছিলেন। এবং পুলিশের সঙ্গে মূলত সহযোগিতা করছিলেন। তারপরেও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

    এটা কিন্তু প্রথম না। এর চিহ্ন বহু আগেই দেখা গিয়েছিল। এই তো মাস তিনেক আগের কথা। ১লা এপ্রিল মালদার সুজাপুর আর কালিয়াচকে এসআইআর বিরোধী বিক্ষোভ চলছিল। রাজ্যে তখন নির্বাচন কমিশনের রাজত্ব। গাড়ির মাথায় উঠে বক্তৃতা করছিলেন এক আইনজীবী। তিনিও, শোনা গিয়েছিল পুলিশের সঙ্গে মধ্যস্থতা করছিলেন। তাঁর নাম মোফাক্কেরুল ইসলাম। দুদিন পরে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বাগডোগরায়। ডিম্মিডিয়া দাবী করে, তিনি পালাচ্ছিলেন। অজস্র রোমহর্ষক গপ্পো লেখা হয়েছিল সে সময়। তারপর থেকে তিনি এনআইএর খপ্পরে। এখনও ছাড়া পেয়েছেন বলে শুনিনি। একটা লোক গাড়ির মাথায় উঠে বক্তৃতা দিয়ে কী দোষ করেছিল, তাও জানা যায়নি।

    তারপরেই গ্রেপ্তার হন ইনসাফ বাংলার বাগানি। তারপর গর্গ। কতগুলো যে গ্রেপ্তার হল, আর হিসেব রাখিনা। সমস্যা হল, যাঁরা গ্রেপ্তার হচ্ছিলেন, সবাই ছিলেন ইন্ডিভিজুয়াল। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত না। ফলে হইচই কিস্যু হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো করার প্রয়োজন মনে করেনি। কেন করেনি, আমার কাছে রহস্য। প্রথমে ওরা এসেছিল ওমুককে মারতে, তখন আমি কিছু বলিনি, তারপর যখন আমাকে মারতে এল, তখন বলার কেউ ছিলনা, এইসব তো সব্বাইকেই আওড়াতে শোনা যায়। ফলে জানেন না তা নয়, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ নেই।

    এখনও দেখছি, কেউ কেউ লিখে চলেছেন, ডিম্মিডিয়ার শুনে কিনা বলতে পারবনা, সরকার বদলায় কিন্তু নীতি বদলায়না। কথাটা শুনতে ভালই। কিন্তু আসলে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বিজেপিকে সমর্থন করে চলা। কারণ, বিষয়টাই আমূল বদলে গেছে। আর সব বাদ দিন, রাউলাট আইন শখানেক বছর ধরে কোনো সরকারের আমলেই বাংলায় ছিলনা। কার্যত এটা ওয়েস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন চলছে। সরকার একটা আছে বটে, কিন্তু সন্দেহ হয় তারা খুচরো মনসবদার মাত্র। পুরো সুতোটাই দিল্লির হাতে। আগ্রাসন এখন ঘোরতর বাস্তব।

    অথচ এই নিয়ে খুব একটা সচেতনতা আছে, সে কথা ভীষণ দুর্জনেও বলতে পারবেনা। আজ থেকে নয়, বহুকাল আগে থেকে। এই সম্ভাবনা বলার জন্য তৃণমূলের কেউ না হয়েও, চটিচাটা ইত্যাদি কত শুনতে হয়েছে, সেসব রাজনৈতিক প্রসঙ্গ বাদই দিলাম। একটা ছোট্টো উপন্যাস লিখেছিলাম, বেশ কবছর আগে, যার নাম নুনু যখন শনাক্তকরণের চিহ্ন। তার কেউ নিন্দে করেছেন, কেউ প্রশংসা, কিন্তু অব্যর্থভাবেই দেখেছি লেখাটাকে ডিসটোপিয়া বলেছেন প্রায় সক্কলেই। যেন অলীক কিছু দুঃস্বপ্নের গল্প বলা হয়েছে। আরে ভাই, অলীক না, সত্যিই এগুলো ঘটছে। ঘোরতর বাস্তব, এবং ঘটছে আপনার চারপাশে। ঘুম ভেঙে দেখুন। নইলে আপনার জন্যও বলার কেউ থাকবেনা।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • অয়নেশ | ১৪ জুলাই ২০২৬ ২১:০৬741741
  • প্রসূন আচার্যর থেকে শুনলাম মোফাক্কেরুল ইসলাম সম্প্রতি জামিন পেয়েছেন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন