রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন শুধু সংসদ বা বিধানসভার আসনের হিসাবে সীমাবদ্ধ থাকে না। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রকৃত আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় সুপারস্ট্রাকচার-এর মধ্য দিয়ে: বিশ্ববিদ্যালয়, পাঠ্যপুস্তক, বুদ্ধিজীবী সমাজ, সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠান এবং দৈনন্দিন সাধারণ মানুষের চেতনায়। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) দীর্ঘদিন ধরে এই গ্রামশিয়ান কৌশল সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন। কেন্দ্রে ক্ষমতায় থেকে তারা আইসিএআর, ইউজিসি, এনসিইআরটি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির উপাচার্য নিয়োগ পর্যন্ত — প্রতিটি স্তরে একটি সুচিন্তিত সাংস্কৃতিক হেজেমনি প্রতিষ্ঠার প্রকল্প চালিয়ে গেছে এবং সামাজিক গণমাধ্যমে নিজস্ব বয়ান নির্মাণকে একটি অন্য স্তরে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ যে এতদিন এই প্রকল্পের বাইরে ছিল — এইরকম টা মনে করবার কোন কারণ আর অন্তত আছে বলে মনে হয় না। কিন্তু,৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসন এবং পরবর্তী তৃণমূল সরকারের আমলে বাংলার সাংস্কৃতিক জমি, চিন্তার জগৎ, বৌদ্ধিক পরিসর বা বিশ্ববিদ্যালয়ের করিডর— সবকিছুতেই একটি বাম-উদারনৈতিক সংস্কৃতির আধিপত্য বজায় ছিল। তৃণমূল ক্ষমতায় থেকে বাম দলগুলির সাথে নানা রকম নিপীড়নমূলক কাজ কারবার করে থাকলেও এই বাম ঘেঁষা সংস্কৃতিকে একপ্রকার নিজের মতন থাকতে দিয়েছিল।সর্বভারতীয় মিডিয়াগুলির একমুখী প্রচার, গণমাধ্যমের এক তরফা উগ্র জাতীয়তাবাদী বয়ান,হিংসানির্ভর সিনেমা, কংগ্রেস মুক্ত রাজনীতি এসব কিছুর ভারেও বাংলার নাগরিক মননে সেই ঝোঁক রয়েই গেছে বেশ কিছুটা। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচন পরবর্তী প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে, এই চিত্র ক্রমশ বদলাবার আয়োজন চলছে — এবং এই বদলের একটি কেন্দ্রীয় হাতিয়ার হয়ে উঠছেন ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
শ্যামাপ্রসাদবাবুকে কেন্দ্রে রেখে একটি নতুন শিক্ষা-এজেন্ডা তৈরি হচ্ছে। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী (২৩ জুন) এবং জন্মবার্ষিকী (৬ জুলাই) উপলক্ষে রাষ্ট্রীয় ছুটি ঘোষণা, তাঁর নামে স্কুল-কলেজে প্রচার, সেমিনার আয়োজন, পাঠ্যক্রমে তাঁর অন্তর্ভুক্তি — এই সমস্তকিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলি একটি সুসংগত হেজেমোনিক প্রকল্পের অংশ। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সরাসরি রাজনৈতিক উপস্থিতি — এবং কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে রাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা — একটি বহুস্তরীয় শিক্ষা-রাজনীতির নমুনা উপস্থাপন করতে চলেছে। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়, আইআইটি, আইআইএম প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে যে ধারণাগত পরিবর্তন হয়েছে বা হচ্ছে গত কয়েক বছর ধরে, তারই ছায়া বাংলার উচ্চশিক্ষায়ও পড়তে চলেছে এ কথা বলাই যায়।
কোন একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ একটি প্রতীকী রাজনীতির অংশ। নতুন দিল্লির শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় স্কুল থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামকরণ — এবং সম্প্রতি ফিউচার এডুকেশন সংস্থার মাধ্যমে "২৫ বছরের শিক্ষাগত উৎকর্ষ" উদযাপনে শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুবার্ষিকীর উপর জোর দেওয়া — এই সামগ্রিক প্রবণতার দিকে ইঙ্গিত করে। রাজনৈতিক সমাজতাত্ত্বিক পার্থ চ্যাটার্জি তাঁর The Nation and Its Fragments গ্রন্থে দেখিয়েছেন কীভাবে উপনিবেশোত্তর ভারতে জাতীয়তাবাদ একটি "বাহ্যিক" বা material domain এবং একটি "অভ্যন্তরীণ" বা spiritual domain-এর মধ্যে বিভক্ত। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি সুচতুরভাবে এই দ্বিতীয় ক্ষেত্রটিকে — অর্থাৎ সংস্কৃতি, ধর্ম, শিক্ষা — নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছে বিগত প্রায় এক শতক ধরেই, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তাদের এই প্রকল্প একটি নির্দিষ্ট সাংগঠনিক কায়দায় এগিয়েছে। তারা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে, গ্রামে গঞ্জে, মফস্বলে মূলত ধর্ম এবং ভারতীয় সংস্কৃতি র মোড়কে একটি নির্দিষ্ট চিন্তাধারার ভেতর সংখ্যাগরিষ্ঠ কে আটকাতে পেরেছে এ কথা স্বীকার না করে উপায় নেই। বর্তমানে বাংলায় শ্যামাপ্রসাদের ব্যক্তিত্বকে সেই প্রকল্পের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে, এক্ষেত্রে সুবিধের জায়গাটি হল তিনি একজন শিক্ষাবিদ, প্রাক্তন কংগ্রেস সদস্য এবং মুসলিম লীগের বিরোধী হিসেবে পরিচিত, পশ্চিমবঙ্গীয় বাংলা ভাষা এবং পৃথক রাজ্যের দাবির ক্ষেত্রে তিনি অগ্রগণ্য ছিলেন তাও সত্য— ফলে তাঁকে একটি মধ্যপন্থী ও গ্রহণযোগ্য মুখ হিসেবে উপস্থাপন করা সহজ, এবং কোলকাতা কেন্দ্রিক যে উত্তর ঔপনিবেশিক এলিট মনন সেখানে প্রবেশ করাও খানিকটা সুবিধাজনক প্রতিপন্ন হবার সুযোগ আছে।
ইতিমধ্যেই এনসিইআরটি পাঠ্যপুস্তকে যে সমস্ত পরিবর্তনগুলি হয়েছে যেমন, মুঘল ইতিহাসের সংক্ষেপণ, হিন্দু সভ্যতার গৌরবায়ন, দেশভাগের একতরফা বয়ান কিংবা অতি সম্প্রতি রুশ বা ফরাসি বিপ্লবের অপসারণ - এই সমস্তকিছু একটি বৃহত্তর হিস্টোরিওগ্রাফিক প্রকল্পের অংশ। বাংলার প্রেক্ষাপটে, এই প্রকল্পে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকাকে অতিরঞ্জিত ও একমাত্রিক করে উপস্থাপনের প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। পশ্চিমবঙ্গ স্বাধীনতার ইতিহাস এবং দেশভাগের ইতিহাসে শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আছে। হিন্দু মহাসভার সাথে তাঁর যোগাযোগ, বাংলা ভাগের প্রশ্নে তাঁর অবস্থান, এবং পরবর্তীতে জনসংঘ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ভূমিকা — এই প্রতিটি বিষয়ে ঐতিহাসিক গবেষণার বহু সূক্ষ্মতা আছে যা হিন্দুত্ববাদী বয়ানে উপেক্ষিত থাকে। শ্যামাপ্রসাদ এর ভূমিকা অস্বীকার করবার কোন কারণ নেই, তা থাকা উচিতও নয়, কিন্তু তাতে বেশ কিছু অস্বস্থিও সমভাবে উপস্থিত যা এড়িয়ে যাবার কারণ নেই।
নতুন হেজেমনিক প্রকল্পের মূল বক্তব্যগুলি নিম্নরূপ:
প্রথমত, শ্যামাপ্রসাদকে বাংলার "রক্ষাকর্তা" হিসেবে উপস্থাপন — বিশেষত অবিভক্ত বাংলায় মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার পরিপ্রেক্ষিতে হিন্দু স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে।
দ্বিতীয়ত, তাঁর শিক্ষাগত অবদানকে — কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণতম উপাচার্য হিসেবে তাঁর কার্যকাল — হিন্দু শিক্ষাদর্শের প্রতীক হিসেবে নির্মাণ করা।
তৃতীয়ত, কাশ্মীর প্রশ্নে তাঁর মৃত্যুকে "আত্মবলিদান" হিসেবে উপস্থাপন করে একটি শহীদ-আখ্যান তৈরি করা।
চতুর্থত, এই আখ্যানকে বিশ্ববিদ্যালয় সেমিনার, পাঠ্যবই এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিকতা দেওয়া।
কলকাতার বুদ্ধিজীবী মহল তথা শিক্ষা প্ৰতিষ্ঠান এবং তৎ সম্পর্কিত যে ডিসকোর্স, সেটিই বলা বাহুল্য হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য। কারণ যতদিন কোলকাতা, যাদবপুর বা প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক চর্চা এবং আনন্দবাজার-এর মতো মিডিয়া প্রতিষ্ঠান বামপন্থী ও উদারনৈতিক বয়ানের পক্ষে থাকবে, ততদিন বাংলায় হেজেমনির লড়াই অসম্পূর্ণ থাকবে। কাজেই একটু একটু করে এই বয়ানকে যত প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো যাবে, ততই হিন্দুত্ব ভাবনাকে শহুরে মননে একটি প্রতি চেতনা হিসেবে দাঁড় করানো যাবে। শ্যামাপ্রসাদ কে সামনে রেখে এই চেতনা নির্মাণের প্রকল্পটিকেই শুরু করা হচ্ছে বলে মানতে অসুবিধা থাকার কথা নয়। সত্যি বলতে, রাজনৈতিক ক্ষমতার যে সোপানে এই মুহূর্তে এই শক্তি দাঁড়িয়ে আছে, তাতে খুব বেশি বাধার সম্মুখীন হওয়াও কল্পনীয় নয়। খুব উল্লেখযোগ্য ভাবে ইতিমিধ্যেই কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলে শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে বই এর চাহিদা কিংবা কোলকাতা বইমেলা কেন্দ্রিক নতুন কিছু প্রস্তাব – সেই দিকেই ইঙ্গিত রাখে। এখন প্রশ্ন হল- এই অবস্থার মোকাবিলা কিভাবে করা যেতে পারে? প্রথমত দীর্ঘ একটি সামাজিক অবস্থানের ফলে আপনা থেকেই কিছু প্ৰতিরোধ এর বিরুদ্ধে তৈরী হচ্ছে বা হবে বলে মনে করা যেতে পারে, কিন্তু কিছু মৌলিক বদল বা চিন্তার অবকাশ অবশ্যই থাকছে।
বিনায়ক দামোদর সাভারকার ১৯২৩ সালে তাঁর Hindutva: Who Is a Hindu? পুস্তিকায় "হিন্দুত্ব"-এর যে সংজ্ঞা দিয়েছিলেন, সেটি মূলত একটি রাজনৈতিক-ভৌগোলিক পরিচয় — ধর্মীয় নয়। সাভারকার নিজে ঘোষিত নাস্তিক ছিলেন। তাঁর "হিন্দু" ধারণায় প্রধান মানদণ্ড ছিল: ভারতকে পিতৃভূমি (fatherland) এবং পুণ্যভূমি (holy land) উভয়ই মনে করা। এই সংজ্ঞানুযায়ী মুসলিম ও খ্রিস্টানরা স্বতঃই বাদ পড়েন কারণ তাদের "পুণ্যভূমি" ভারতের বাইরে। এই ধারণাটি মূলত ইউরোপীয় জাতিবাদী আন্দোলন — বিশেষত জার্মান রাষ্ট্রবাদ এবং ইতালীয় ফ্যাসিবাদ — থেকে অনুপ্রাণিত। এম এস গোলওয়ালকার তাঁর We or Our Nationhood Defined (১৯৩৯) গ্রন্থে নাৎসি জার্মানির "জাতিশুদ্ধি"-র প্রশংসা করেছিলেন। এই ঐতিহাসিক তথ্য অস্বীকারযোগ্য নয়। হিন্দুত্ব তাই হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধি নয় — এটি একটি আধুনিক রাজনৈতিক আদর্শ যা ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের ছাঁচে ভারতীয় ধর্মীয় পরিচয়কে ঢেলে সাজিয়েছে।
ভারতীয় দর্শন-ঐতিহ্যে "হিন্দু ধর্ম" বলে কোনো একক, একশাসিত ধর্মব্যবস্থা কখনো ছিল না। সনাতন ধর্মের যে বহুত্ববাদী কাঠামো, তা মূলত বিভিন্ন দর্শন-সম্প্রদায়ের একটি বিচিত্র সমাহার:
- সাংখ্য দর্শন — প্রকৃতি ও পুরুষের দ্বৈততা, জগতের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার প্রবণতা
- মীমাংসা — বেদের কর্মকাণ্ডের যুক্তিসিদ্ধ ব্যাখ্যা, ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা
- চার্বাক — ভারতীয় বস্তুবাদ, প্রত্যক্ষকে একমাত্র প্রমাণ বলে মানা
- বৌদ্ধ ঐতিহ্য — যা বৈদিক কর্তৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে
- অদ্বৈত বেদান্ত — শঙ্করাচার্যের মায়াবাদ, যেখানে ব্যক্তি ও ব্রহ্মের অভিন্নতা
- বিশিষ্টাদ্বৈত ও দ্বৈত — রামানুজ ও মধ্বাচার্যের ভিন্ন পথ
মহাভারতের বিখ্যাত উক্তি: "নাহং জানামি কেবলম্" — "আমি একা জানি না" — এই বাক্যটিই ভারতীয় জ্ঞানঐতিহ্যের মূল মনোভঙ্গির প্রতিফলন। পুরাণগুলি পরস্পরবিরোধী আখ্যানে পরিপূর্ণ। বিষ্ণু পুরাণ, শিব পুরাণ এবং দেবী পুরাণের মধ্যে কোনো একক মতবাদগত ঐক্য নেই — এবং সেটাই এই ঐতিহ্যের শক্তি। হিন্দুত্ব এই বহুত্বকে মুছে দিয়ে একটি একমাত্রিক, একশাসিত ধর্মীয়-রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করতে চায়। এটি হিন্দু সনাতন ধর্মের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতিনিধিত্ব নয়। এই জায়গাটিকে অনুধাবন করে একটি প্রতি আঘাত এই মুহূর্তে ভীষণ জরুরি নাগরিক পরিসর থেকে, বিশেষ করে গৌড় বঙ্গে চৈতন্য দেবের ধারার সাথে যদি এই আলোচনাকে সংযুক্ত করা যায়।
পাশাপাশি আরএসএস এবং হিন্দুত্ববাদীরা স্বামী বিবেকানন্দকে তাদের "আদর্শ পুরুষ" হিসেবে দাবি করেন। কিন্তু বিবেকানন্দের প্রকৃত দর্শনের সাথে হিন্দুত্বের মূলগত বিরোধ অনস্বীকার্য। স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৩ সালে শিকাগোর ধর্ম সংসদে বলেছিলেন: "আমি সেই ধর্মের প্রতিনিধি যা বিশ্বকে সহিষ্ণুতা এবং সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা শিখিয়েছে।" তিনি বলেছিলেন: "যে কেউ যেকোনো পথে ঈশ্বরের কাছে পৌঁছাতে পারে।" তাঁর বিখ্যাত উক্তি: "দরিদ্র নারায়ণের সেবাই ঈশ্বরের সেবা" — এই দৃষ্টিভঙ্গি মূলত একটি সামাজিক ন্যায়বিচারের দর্শন, যা বর্ণ-বৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে। তিনি ব্রাহ্মণ্যবাদী কর্তৃত্বকে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন এবং বলেছিলেন ভারতের মুক্তি আসবে নিচের মানুষদের উত্থানের মাধ্যমে। বিবেকানন্দ একজন ব্যাপক ভ্রমণকারী ছিলেন — আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান, শ্রীলঙ্কা — এবং তিনি বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতি ও চিন্তার সাথে সংলাপে আগ্রহী ছিলেন। তাঁর দর্শন ছিল উন্মুক্ত, বিশ্বজনীন এবং সামাজিক পরিবর্তনমুখী। আরএসএসের হিন্দুত্ব যেখানে বিভাজন এবং সংকীর্ণ পরিচয় তৈরি করে, বিবেকানন্দ সেখানে সংযোগ এবং বিশ্বমানবতার কথা বলেছেন। এই দুটি মনোভঙ্গি মূলগতভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া তিনি মূলত শঙ্করের অদ্বৈত বেদান্তের উপর কাজ করেছেন, এবং যে জ্ঞানযোগের ধারণা রেখেছেন তা সুস্পষ্টভাবে রাষ্ট্রীয় হিন্দুত্বকে আটকে দেয়, এই বৈপরীত্য কে তুলে আনতে হবে জনসমক্ষে।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকেও হিন্দুত্ববাদীরা নিজেদের করে নিতে চান। কিন্তু নেতাজির রাজনৈতিক দর্শন হিন্দু মহাসভা বা আরএসএসের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।নেতাজি ছিলেন একজন ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী যিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মিতে হিন্দু, মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান — সকল ধর্মের মানুষকে একত্রিত করেছিলেন। আইএনএর যুদ্ধ-স্লোগান "জয় হিন্দ" কোনো ধর্মীয় বার্তা বহন করে না — এটি একটি ভারতমাতার প্রতি ধর্মনিরপেক্ষ আবেদন। নেতাজি ১৯৪০ এ ফরোয়ার্ড ব্লকের সাথে মুসলিম লীগের সংযুক্ত ফ্রন্ট তৈরিতে আগ্রহী হন, যা হিন্দু মহাসভার কট্টর বিরোধিতার সম্মুখীন হয়, আব্দুর রহমান সিদ্দিকী মেয়র নির্বাচিত হন এই ফ্রন্টের দ্বারাই, ইতিহাসের সেই মহুর্তে তিনি বুঝতে পারেন যে হিন্দু মুসলিম যৌথ অংশগ্রহন অনেক বেশি জরুরি ব্রিটিশ দের বিপক্ষে। এছাড়া, ১৯৩০ নাগাদ তার নিজের মেয়র থাকাকালীন সময়ে তিনি যে ধরণের কর্মসূচি নিয়েছিলেন তা সরাসরি সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার মডেলের দিকও ইঙ্গিত করে, তাঁর ভবিষ্যৎ ভারতের পরিকল্পনায় সুস্পষ্টভাবে সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনা অর্থনীতির কথা ছিল। নেতাজির ইউরোপ-প্রবাস এবং জার্মানি-জাপানের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ককে অনেকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, কিন্তু তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল সাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্তি — ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নয়। এই মূলগত পার্থক্যটি স্থাপন করা আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত জরুরি। নেতাজি এবং সাভারকার — উভয়ই ব্রিটিশ বিরোধী ছিলেন, কিন্তু দুজনের ভারত-দর্শন ছিল মৌলিকভাবে ভিন্ন। সাভারকার যেখানে একটি হিন্দু রাষ্ট্র চাইতেন, নেতাজি চাইতেন একটি সার্বভৌম ধর্মনিরপেক্ষ ভারত যেখানে প্রতিটি নাগরিক সমান।
বাংলার বামপন্থী রাজনৈতিক পরিসরকে এই ব্যাপারগুলি নিয়ে ভাবতে হবে, তারা দীর্ঘদিন ধরে একটি মৌলিক সংকটে ভুগছে — যাকে আমরা আদর্শগত আউটসোর্সিং বলতে পারি। রাশিয়া, চীন বা পশ্চিম ইউরোপের মার্কসবাদী তত্ত্বকে যান্ত্রিকভাবে ভারতীয় বাস্তবতায় প্রয়োগ করার এই প্রবণতা বামপন্থাকে ভারতীয় সমাজের গভীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে, এ সমালোচনা নতুন নয়, আজকেরও নয়। কিন্তু আজকের নিরিখে যে বদল প্রয়োজন তার কতটা কাছাকাছি তারা আসতে পারছেন বলা মুশকিল। বেশ কিছু বদল দেখা যাচ্ছে,কিন্তু গণ কর্মসূচির মধ্যে সেগুলো আসছে না।
সমস্যাগুলি নির্দিষ্ট করে বলা যাক:
প্রথমত, ধর্মের প্রতি সরলীকৃত দৃষ্টিভঙ্গি- মার্কসের "ধর্ম হল আফিম" উক্তিটির প্রেক্ষাপট ছিল ইউরোপীয় ক্যাথলিক চার্চের শ্রেণিগত ভূমিকা। কিন্তু ভারতীয় ধর্মীয় ঐতিহ্য — ভক্তি আন্দোলন, কবির, রবিদাস, মীরাবাই — বহুক্ষেত্রেই সামাজিক বিদ্রোহের ভাষা হিসেবে ধর্মকে ব্যবহার করেছে। কবির যখন বলেন: "মন না রঙ্গায়ে, রঙ্গায়ে জোগী কপড়া" — তিনি একটি গভীর সামাজিক সমালোচনা করছেন। ভারতীয় বামপন্থা এই সূক্ষ্মতা বুঝতে ব্যর্থ হয়েছে।তাদের ধর্মের এই ক্ষেত্রটিকে চিহ্নিত করতে হবে এবং লাগাতার প্ৰচার করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পরব সংস্কৃতির সাথে সংযোগের অভাব- ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনে পশ্চিমবঙ্গের ভূমি সংস্কার এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থার মতো বাস্তব অর্জন থাকলেও, উৎসব সংস্কৃতির প্রশ্নে বামপন্থা প্রায়শই একটি "উপর থেকে আরোপিত" অনুভূতি দিয়েছে। সাধারণ মানুষের দুর্গাপূজা, কালীপূজা, মহরম পালনের সাথে বামদলের সম্পর্ক কখনো পারস্পরিক এবং সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠেনি। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন পর্ব পালা অনুষ্ঠান, বিবিধ উৎসব বহু বছর ধরে হয়ে আসছে, এই পরিসরগুলিতে একেবারেই কোন রাজনীতি নেই বা রাজনৈতিক বোধ বা চেতনা নেই এই গোঁড়ামি একান্তভাবে বর্জনীয়, বরং এই পরিসরকে ছদ্ম হিন্দুত্ত্ববাদ থেকে কিকরে আগলানো যায় তা ভাবতে হবে। কেবল পুজোর মণ্ডপের বাইরে স্টলকেন্দ্রিক ভাবনা দিয়ে চলবেনা
তৃতীয়ত, শ্রেণি-বিশ্লেষণের একমাত্রিকতা। ভারতীয় সমাজে শ্রেণি ও জাত প্রশ্ন অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত। কিন্তু বাংলার বামপন্থা জাতের প্রশ্নকে শ্রেণির মধ্যে দ্রবীভূত করে দেখার ভুল করেছে। দলিত আন্দোলন, আদিবাসী অধিকার — এই প্রশ্নগুলিতে বামপন্থার অবস্থান প্রায়ই অস্পষ্ট ছিল। এই নিয়ে একটি সম্পূর্ন দীর্ঘ আলোচনা দরকার- সেই দিকে না গিয়েও বলা যায় যে, একটি সংখ্যালঘু শিক্ষিত চাকরিজীবী বর্গের বাইরে যে বিপুল মধ্যম বর্গ রয়েছে গ্রাম মফস্বলে তাদের সমস্যা নিয়ে ভাবতে হবে, তাদের ভেতর থেকে নেতা তৈরি করতে হবে এবং তাদের মধ্যে দিয়েই দেশীয় চিন্তা চেতনাকে নিম্ন স্তরে নিয়ে যেতে হবে। এই বর্গের মানুষের শহুরে এলিট কালচারের প্রতি যে ক্ষোভ রয়েছে প্রথমত তাকে সম্মানের সাথে বুঝতে হবে। যে ধরণের নেতৃত্ব এই বিভাজনকে উস্কে দিতে পারে তাদের পরিহার করতে হবে।
চতুর্থত, তাত্ত্বিক জড়তা। লেনিন, মাও বা গ্রামশির পাঠ গুরুত্বপূর্ণ — কিন্তু ভারতীয় বাস্তবতায় কার্যকর বাম-তত্ত্বের জন্য ভারতীয় চিন্তক ও ঐতিহ্যের সাথে গভীর সংলাপ অপরিহার্য। এমন বহু ব্যক্তিত্ব আছেন যাঁরা একই সাথে গভীরভাবে ভারতীয় এবং সামাজিকভাবে প্রগতিশীল। বাম নাগরিক পরিসরের জরুরি প্রয়োজন এই ব্যক্তিত্বদের নতুনভাবে আবিষ্কার করা এবং তাদের চিন্তাকে বর্তমান প্রাসঙ্গিকতায় উপস্থাপন করা:
- ভগত সিং — কমিউনিস্ট ছিলেন, কিন্তু একজন ভারতীয় কমিউনিস্ট। তাঁর Why I Am an Atheist প্রবন্ধটি ভারতীয় যুক্তিবাদী ঐতিহ্যের সাথে সংলাপে লেখা। তিনি একই সাথে জালিয়ানওয়ালা বাগের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছিলেন এবং বর্ণব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিলেন।
- আম্বেদকর — বামপন্থা আম্বেদকরের সাথে তার সম্পর্ক নতুনভাবে নির্মাণ না করলে দলিত-বহুজন সমাজের সাথে সংযোগ অসম্ভব। আম্বেদকরের বৌদ্ধ-দর্শনের অনুপ্রেরণা এবং তাঁর সাংবিধানিক প্রজ্ঞা — দুটিই ভারতীয় বামপন্থার জন্য অমূল্য সম্পদ।
- পেরিয়ার — দক্ষিণ ভারতের এই মহান যুক্তিবাদী ঐতিহ্য বাংলার বামপন্থায় যথেষ্ট চর্চিত নয়।
- বিরসা মুন্ডা — আদিবাসী মুক্তিসংগ্রামের এই মহান নায়ক "ধরতি আবা" (পৃথিবীর পিতা) হিসেবে পরিচিত। তাঁর আন্দোলন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও জমিদারি উভয়ের বিরুদ্ধে ছিল — এটি বাংলার বাম-আন্দোলনে কতটা উপস্থিত?
- তিতুমীর এবং সিধো-কানহু — বাংলার নিজস্ব বিদ্রোহের ইতিহাস। তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা শুধু ব্রিটিশবিরোধী নয়, জমিদার-বিরোধীও ছিল। সাঁওতাল বিদ্রোহ — (১৮৫৫)— শ্রেণি, জাতি এবং উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে একটি ত্রিমুখী লড়াই।
সর্বোপরি, গৌতম বুদ্ধ, যিনি নিজে ব্রাহ্মণ্যবাদের বিপরীতে হিংসার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছিলেন, যার ভারতীয় ঐতিহ্য নিয়ে আজকের হিন্দুত্ববাদীরা শ্লাঘা বোধ করতে চান। এছাড়া রয়েছেন বিংশ শতকেরই অগণিত ভারতীয় চিন্তক, যেমন ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত, ব্রজেন্দ্রনাথ শীল, ক্ষিতিমোহন সেন কিংবা স্বামী লোকেশ্বরানন্দ যারা হিন্দু ধর্মের ওপর সবিস্তার আলোচনা করেছেন একাধিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, যা হিন্দুত্ত্ববাদী চিন্তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষত রবীন্দ্রনাথের নেশন বিরোধী চিন্তা, যা অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এই মুহূর্তে।
হিন্দুত্বের নতুন আধিপত্যের মুখে বামপন্থার জন্য কিছু পরিষ্কার সতর্কবার্তা:
- প্রতিক্রিয়াশীল হওয়া চলবে না- শ্যামাপ্রসাদকে শুধু খারিজ করা বা হিন্দু প্রতীককে আক্রমণ করা বামপন্থাকে "হিন্দু-বিরোধী" তকমা পেতে সাহায্য করবে — যা হিন্দুত্ববাদীরাই চায়। হিন্দু ধর্মকে অন্যভাবে উপস্থাপন করাই এর কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
- অতীতের আদর্শিক কাঠামোর পুনরাবৃত্তি চলবে না- ১৯৬৮-৬৯ সালের প্রেসিডেন্সি কলেজ পত্রিকায় "ইয়াঙ্কি সংস্কৃতি ধ্বংস করো" — এই ভাষা ও মনোভঙ্গি আজকের সমাজে অকার্যকর, আন্তর্জাতিক অবস্থান অবশ্যই জরুরি কিন্তু তার ভাষা এবং উপস্থাপনা নিয়ে ভাবতে হবে। ৯০ পরবর্তী সময়েও যা বাস্তব ছিল, আজকের সমাজমাধ্যম নির্ভরতার দিনে আর তা বাস্তব প্রতিরোধের বয়ান নয়। সাম্প্রতিক ভারতে বেশ কিছু নতুন রেটরিক উঠে আসছে যুব আন্দোলনের ভেতর থেকে, সেগুলিকে নিয়ে ভাবতে হবে গভীরতার সাথে।
- পরিচয়-রাজনীতির ফাঁদে পড়া চলবে না - হিন্দুত্বের সাথে "মুসলিম পরিচয়"-এর বিপরীত মেরু হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করলে বাংলার হিন্দু কৃষক ও মধ্যবিত্ত থেকে বামপন্থা আরও দূরে সরে যাবে। শহরের ও আধা শহরের একটি বিরাট অংশের মানুষ হিন্দুত্ত্ববাদী প্রচারে ইতিমধ্যেই নিমজ্জিত, কেবল সংখ্যালঘু অধিকারের বয়ান একেবারেই অপ্রয়োজনীয় এবং পরিত্যাজ্য তাদের কাছে। বরং এই মেরুকরণের পরেও হিন্দু সমাজের প্রান্তিক বা মধ্যবিত্তের অবস্থার যে কোন বদলই হচ্ছেনা – এটিকে সামনে আনা কার্যকর হলেও হতে পারে।
বাম বুদ্ধিজীবিতার একটি বড় দুর্বলতা হল ভারতীয় দর্শনের সাথে তার দূরত্ব। এই দূরত্ব কমাতে হবে — এবং দেখাতে হবে যে ভারতীয় দার্শনিক ঐতিহ্যের মধ্যেই এমন উপাদান আছে যা সামাজিক সাম্যের পক্ষে:
- চার্বাক ও লোকায়ত দর্শন — ভারতের সবচেয়ে পুরনো বস্তুবাদী দার্শনিক ঐতিহ্য। "প্রত্যক্ষমেকং প্রমাণম্" — প্রত্যক্ষই একমাত্র প্রমাণ — এই দার্শনিক অবস্থান আধুনিক বৈজ্ঞানিক মনোভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
- ভক্তি আন্দোলন — কবির, রবিদাস, মীরা, নামদেব — এঁরা সবাই বর্ণ-শ্রেণির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন ধর্মের ভাষায়। ভারতীয় বামপন্থা যদি এই ঐতিহ্যকে নিজেদের করে নিতে পারে, তাহলে ধর্মীয় অনুভূতিকে প্রগতিশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে ব্যবহার করা কঠিন হবে।
- বাউল-ফকির ঐতিহ্য — বাংলার এই অসাধারণ সম্পদ হিন্দু-মুসলিম বিভেদের বাইরে একটি মানবতাবাদী আধ্যাত্মিকতার কথা বলে। লালন ফকির বলেছেন: "সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে" — জাতি-ধর্মের সমস্ত বিভাজনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন তিনি।
- রবীন্দ্রনাথের মানবতাবাদ — রবীন্দ্রনাথ না বামপন্থী ছিলেন, না হিন্দুত্ববাদী। তাঁর জাতীয়তাবাদ-সমালোচনা (Nationalism, ১৯১৭), তাঁর গান্ধী-সমালোচনা, তাঁর রাশিয়া-ভ্রমণের অভিজ্ঞতা — এই সবকিছু মিলিয়ে একটি স্বতন্ত্র ভারতীয় মানবতাবাদের প্রকল্প। বামপন্থা রবীন্দ্রনাথকে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে।
- এক্ষেত্রে আর একটি বিরাট ভূমিকা নিতে পারে মহাভারত। বহুস্বরী, বহুমাত্রিক মহাকাব্য এটি— কোনো মনোলিথিক "হিন্দু আদর্শের" পাঠ্যপুস্তক নয়। এতে রয়েছে:
- শান্তিপর্ব — যেখানে রাজনীতি, নীতি ও ন্যায়বিচার নিয়ে গভীর আলোচনা আছে
- কর্ণের আখ্যান — বর্ণব্যবস্থার শিকার একজন যোদ্ধার ট্র্যাজেডি
- দ্রৌপদীর কণ্ঠস্বর — যিনি পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন
- একলব্যের গল্প — বর্ণীয় শিক্ষাব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি অসাধারণ সাক্ষ্য
ইরাবতী কর্ভে তাঁর গ্রন্থে মহাভারতকে একটি মানবিক ট্র্যাজেডি হিসেবে পড়েছেন — দেবতার মহিমাগাথা হিসেবে নয়। এই ধরনের পাঠ বামপন্থার জন্য মূল্যবান সম্পদ। বেদ এবং উপনিষদেও এমন উপাদান আছে যা হিন্দুত্বের সংকীর্ণ ব্যাখ্যার বাইরে। "সর্বে ভবন্তু সুখিনঃ, সর্বে সন্তু নিরাময়াঃ" — "সকলে সুখী হোক, সকলে নিরোগ হোক" — এই উপনিষদিক উচ্চারণের সাথে সামাজিক ন্যায়বিচারের সংযোগ স্থাপন করা কঠিন নয়।
পাশাপাশি, হিন্দুত্ববাদী শিক্ষা-প্রকল্পের মোকাবিলায় বামপন্থাকে নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল তৈরি করতে হবে:
- পাঠ্যক্রম বিকল্প: মুক্তিসংগ্রামের বহুকণ্ঠস্বর ইতিহাস — হিন্দু, মুসলিম, দলিত, আদিবাসী সবার অংশগ্রহণ — পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তুলতে হবে। এনসিইআরটি পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একাডেমিক প্রতিরোধ সংগঠিত করতে হবে।
- গবেষণা অগ্রাধিকার: সাবলটার্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বাংলার ইতিহাস পুনর্লিখন — তিতুমীর, সিধো-কানহু, নামশূদ্র আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন — এই বিষয়গুলিতে নতুন গবেষণা জরুরি। পাশাপাশি প্রয়োজন, ভারতীয় ধর্ম, বেদান্ত, মীমাংসা, চার্বাক কে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা।
- সেমিনার ও প্রকাশনা: হিন্দুত্ববাদী সেমিনারের বিরুদ্ধে বিকল্প একাডেমিক পরিসর তৈরি করতে হবে — যেখানে বাংলার বহুত্ববাদী ঐতিহ্য এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মূলগত চরিত্র কে সামনে আনতে হবে।
কলকাতার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য — গণনাট্য, কফিহাউসের আলোচনা, লিটল ম্যাগাজিন, রবীন্দ্রসংগীত থেকে বাউল — এই সবকিছুকে পুনরায় সক্রিয় করতে হবে। হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি-প্রকল্প মূলত একটি একঘেয়েমির সংস্কৃতি — সেই একঘেয়েমির বিরুদ্ধে বাংলার বহুবর্ণ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
তবে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা একটি নিশ্চয়ই দিয়ে রাখা প্রয়োজন: ভারতীয়করণের নামে বামপন্থা যেন ধর্মীয় পরিচয়-রাজনীতির দিকে ঝুঁকে না পড়ে। লক্ষ্য হবে ধর্মীয় ঐতিহ্যের মানবতাবাদী ও সামাজিক ন্যায়বিচারের উপাদান গ্রহণ করা — ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি নয়। বাংলার বাম উদারনৈতিক পরিসরের সামনে পরিস্থিতি কঠিন — কিন্তু সম্পদ আছে, ঐতিহ্য আছে, এবং সবচেয়ে বড় কথা, মানুষের দৈনন্দিন লড়াই আছে। বাংলায় হিন্দুত্বের শিক্ষা-প্রকল্প — শ্যামাপ্রসাদকে কেন্দ্র করে বিনির্মিত — একটি সুচিন্তিত গ্রামশিয়ান কৌশলের অংশ। এই কৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, পাঠ্যপুস্তক, সেমিনার এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি নতুন হেজেমনি প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তবে হিন্দু ধর্মের বহুত্ববাদী ঐতিহ্য হিন্দুত্বের একচেটিয়া দাবির চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ এবং অনেক বেশি প্রগতিশীল। সেই সমৃদ্ধিকে চিনতে পারা এবং তার সাথে সংলাপ করতে পারাই বামপন্থার আজকের সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ। যে দ্বিজাতি তত্ত্বর ভুত চাপানোর চেষ্টা চলছে ও চলবে বাঙালির উপর মনে রাখতে হবে যে, তা সুচিন্তিত কিন্তু আর বিরাট মজবুত কিছু নয়। দুটি পৃথক রাষ্ট্রের এতদিনের অভিজ্ঞতার পর নতুন করে এই বিভাজনের উপর একটি জাতিকে প্রভাবিত করা অত সহজও হবেনা, দীর্ঘদিনের যে চিন্তা পরিসর বা জ্ঞানতাত্বিক কাঠামোয় পশ্চিমবাংলা লালিত, তার উপর ভরসা রেখে আরো বেশি দেশীয় এবং নিজস্ব ইতিহাসের চর্চা করলে ইতিবাচক ফল আসবে বলে আশা করাই যায়।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।