এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বুট পালিশ

    আফতাব হোসেন লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৬ জুলাই ২০২৬ | ১১ বার পঠিত
  • নতুন আর পুরানো প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে লোকটা বসতো । ফিটফাট, পরিপাটি জামাকাপড়, ক্লিন শেভড বরাবর। পেয়ারা দোকানটার যে পাশে লোকটার টেম্পোরারি ফুটপাতের দোকান খুলতো, তার আগে জায়গাটা ভালো করে ঝাঁট দিয়ে পরিষ্কার করে একটা গ্লাসে অল্প করে বালি ভরে তার মাঝে দুটো ধূপ জ্বালিয়ে সামনে সাজিয়ে রাখতো তার সব সরঞ্জাম। আর পাশে একটা ছোট্ট টুল, পা রাখার জন্য নরম গদির একটা বালিশ, সাথে একটা পাটের সুতোয় একদিকে আগুন লাগিয়ে ঝোলানো। নাম জিজ্ঞাসা করিনি কোনদিনই।

    বিদেশে বিভুয়ে চাকরি পাবার পরই নাকি আমি ডিপ্রেসড, লোক বলতো। আমি জানি, আমি ভীতু। নেপাল ভূমিকম্পে বেঁচে ফেরার পর থেকেই বড় কিছু, উঁচু কিছু দেখলেই আমার ডিপ্রেশন শুরু হয়। ভয় আসে মনে। ফেসবুক ভিডিওতে দেখেছি, নোংরা পরিষ্কার করলে নাকি ডিপ্রেশন কমে। বিদেশের বাগান পরিষ্কার থেকে দেশের নোংরা, বাসস্ট্যান্ডের লোকের কানের ময়লা পরিষ্কার থেকে শুরু করে নিজের হলুদ রঙের স্কুটি, রোজ জল দিতে ধুয়ে তকতকে ঝকঝকে করলে মন হালকা লাগে খানিক। ডাক্তার বন্ধু পইপই করে বলে পরিষ্কার থাকবি নিজে সবসময়, তাইলেই দেখবি মন ফুরফুরে।

    লোকটার সঙ্গে পরিচয় সেই সূত্রেই। আমার দেশ বাড়ির থেকে পেট ভাতার দেশে যাওয়ার মাঝে যে ইন্টার স্টেশন টাইম রেস্ট, তার মাঝে তিন ঘণ্টার সিগারেট গ্যাপে একদিন আলাপ লোকটার সঙ্গে। নিজে থেকেই আমার ডুপ্লিকেট লেদার জুতোর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেছিল একদিন - দাদা জুতো মেজে দেব ?

    জুতো মাজা প্রথম শুনেছিলাম, সেই শুরু। প্রতিবার যাবার আগে আমার লোকাল মেড ডুপ্লিকেট লেদার জুতোজোড়া খুলে, নিজের ফাটা মোজা পরা পা গুলো নরম বালিশে রেখে, পাট কাঠির আগা থেকে গোল্ড ফ্লেক ধরিয়ে, ছোট টুলে বসে নিজের জুতো মাজা দেখাকেই সবচেয়ে বড় এন্টিডিপ্রেশন মেডিসিন মনে হত। টানা দশ বছর। একই রুটিং। কতকিছু জানলাম। ডিপ্রেশন কমেছিল খানিক।

    জানলাম,
    জুতো নোংরা মানে শুধু অভাব নয়, খেটে খাওয়া হয়।
    জানলাম, জুতো যত পুরোনো, গল্প তত নতুন।
    শুনলাম, জুতোর দাম নয়, কোথায় নিয়ে যায় সেটাই আসল। বুঝলাম, জুতো দেখে মানুষ নয়, কিন্তু মানুষ দেখে জুতো অনেক কিছু শিখে।

    বছর চারেক আর দেখা হয় নি, নিজের দেশে ফিরে আসার পর। অবশ্য, উন্নয়নের বুলডোজারে সে দোকানও নেই। সব ঝকঝকে তকতকে রাখতো লোকটা তাও ভাঙ্গা পড়লো সব। কখনো ওদিকে গেলে একবার মনে পড়ে লোকটাকে। মনের অজান্তেই নিজের জুতোর দিকে চোখ যায়। বুঝি পে কমিশনে বেতন বেড়েছে হয়ত।

    আজ দেখা হল। অনেকদিন পর। দেখলাম মোটাসোটা হয়েছে খানিক। অনেক গল্প হতে পারতো। হল কই। ট্রেন টাইম বাধা দিল। তাও অনেক কষ্টে চিনতে পেরে জিজ্ঞাসা ছিল কি করো এখন ? ফেরি করে জুতো মাজো নাকি ?

    বললো, মাষ্টার, লোকের পায়ের দিকে তাকাও। দেখো নোংরা পাও কিনা ?

    দেখলাম সত্যি হাজারে হাজারে লোক স্টেশনে, অথচ সবার জুতো জোড়া চকচকে, নিজেরটাও।

    বললাম, নাহ্, নাই এখন আর নোংরা কেউ। তোমার ব্যবসা গেল তাহলে।

    হাসলো লোকটা, বললো মাষ্টার, তুই চিরকুটের সিওর। নোংরা আবার যায়। আরশোলা দেখিসনি কত।

    যাবার আগে প্যাকেট ধরালো একখান। কুড়ি টাকা মাত্র। শুনলাম নতুন ব্যবসা। ভালো চলছে। আগের থেকেও।

    ঘরে এসে, প্যাকেট খুলে বসেছি লোকটার,

    কুড়ি টাকার প্যাকেট। একটা ছোট্ট আয়না, একটা জিভ ছুলনি। সেই আয়নায় দেখছি নিজের জিভে কত কালো।

    এখন বুঝছি, স্টেশনে হাজার হাজার লোকের জুতো এত পরিষ্কার কেন। এখন বুঝছি এত আরশোলা কেন। এখন বুঝছি লোকটার ব্যবসা বেড়েছে কেন।
    সালা, আমিই সত্যিই চিরকুটের মাষ্টার।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন