হোমারের অডিসি অবলম্বনে বানানো সিনেমা, আলাদা করে স্পয়লার আছে লিখে দিতে হবে? লিখে দিতে হলে দিলাম লিখে যে স্পয়লার আছে!
সিনেমায় যাওয়ার আগে একটু বলি - অডিসিয়াস কিন্তু আমাদের পরিচিত না। আমাদের পরিচিত নাম হচ্ছে ইউলিসিস। গ্রীক থেকে যখন রোমানরা ল্যাটিন ভাষায় ইলিয়াড, অডিসি অনুবাদ করে তখন তারা নিজেদের মত করে অডিসিয়াসের নাম দেয় ইউলিসিস! ল্যাটিন থেকে ইংরেজিতেও ইউলিসিসই প্রচলিত হয়। আমাদের এদিকেও ইউলিসিস বেশি পরিচিত। ইউলিসিসের স্বদেশ যাত্রা একটা বইও আছে সম্ভবত। ইংরেজিতে ইউলিসিস এতই জনপ্রিয় যে জেমস জয়েস তার বিখ্যাত উপন্যাসের নাম রাখেন ইউলিসিস। এগুলাও পরে জানা আমার। আমাদের বা আমাদের বড় ভাই বোনদের পাঠ্য ছিল সম্ভবত ইউলিসিসের স্বদেশ যাত্রা, মোবারক হোসেন খানের লেখা। তখন থেকেই ইউলিসিসিই মাথায় রয়ে গেছে। অনেক পরে ইলিয়াড অডিসি যখন পড়ি তখন মূল নাম জানি অডিসিয়াস!
যাই হোক, সিনেমার গল্পে ফিরে যাই। অডিসি আমাকে মুগ্ধ করেছে। এইটা হচ্ছে প্রথম কথা। এরপরের কথা হচ্ছে কিছু জায়গায় কি অন্য রকম করা যেত? যাইত। নোলান তো নোলানই, সে সব সময়ই নিজের তৈরি পথে হাঁটে। এখানেও তাই করেছেন তিনি। যেহেতু রিভিউ লিখতে বসেছি তাই এই নিয়ে দুই একটা কথা না বললেই না।
নোলান গল্পটাকে নিজের মত করে বলেছে। বহুল পঠিত অডিসির মূল ভাবটাই তিনি পরিবর্তন করে দিয়েছেন বলে আমার মনে হয়েছে। এখানে আমরা যে অডিসিয়াসকে ইলিয়াড, অডিসি থেকে চিনি সেই অডিসিয়াসকে পাওয়া যায় না। এখানে তিনি অনেক মহান, ট্রয় যুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাস তাকে তাড়া করে ফিরছে। অমন একটা যুদ্ধের বিভীষিকা সে কাটায় উঠতে পারে নাই। কিন্তু অডিসিতে আমরা এই অডিসিয়াসকে দেখি নাই। সে সেখানে সাহসী যোদ্ধা, একটু ধূর্ত, এত নীতি নৈতিকতা সম্ভবত ছিল না। ( সম্ভবত লিখলাম কারণ অনেক দিন আগে পড়া, যতখানি মনে আছে এমনই ছিল) নোলান এখানে পুরো সিনেমার দৃষ্টিভঙ্গিই পরিবর্তন করে ফেলেছেন। এখানে পেনোলপির চরিত্রকে যতখানি দৃঢ় শক্তিশালী দেখানো হয়েছে, মূল অডিসিতে তেমন তিনি ছিলেন না। পুরুষতান্ত্রিক থেকে বের করে এনে নোলান একটু নারী শক্তির জয় দেখাতে চেয়েছেন। আমার কাছে ভালো লেগেছে বিষয়টা।
অনেকের আপত্তি ছিল হেলেনকে নিয়ে। কেন হেলেন কৃষ্ণাঙ্গ লুপিতা? যে হেলেনের রূপের জন্য এত কিছু সে কীভাবে কৃষ্ণাঙ্গ হয়? ইতিহাস তো সমর্থন করে না। মূল অডিসি তো করেই না। অডিসিতে তো হেলেনের রূপের বর্ণনাও দেওয়া আছে, তাহলে? নোলান এখানে একটা ধাক্কা দিতে চেয়েছে আমার ধারণা। মূল অডিসিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে আগামেনোনের ট্রয় জয় করার ইচ্ছা, বাণিজ্যপথ পাওয়াটাই ছিল যুদ্ধের মূল কারণ, হেলেন ছিল একটা অছিলা, যার জন্য যুদ্ধটা শুরু করা গেছে। কিন্তু এরপরেও আজ পর্যন্ত মানুষ বলার সময় বলে নারীর কারণে ট্রয় ধ্বংস হয়েছে, যুদ্ধ হয়েছে। ও সম্পূর্ণ বিপরীত একটা চেহারা সামনে এনে দেখাতে চেয়েছে হেলেনের রূপ সৌন্দর্য এখানে মুখ্য না। যুদ্ধটার জন্য দরকার ছিল একটা ক্লিক, সেই ক্লিকটা এনে দিয়েছিল হেলেন, আর কিছু না। আর হোমার যেমন রূপ বর্ণনা করেছেন তেমনই আরও অনেক কিছুই বলেছেন, হেলেন আসলে রাজহাঁসের ডিম থেকে হয়েছেন! হেলেন অফ ট্রয় তাই আক্ষরিক অর্থে নেওয়ার কোন মানেই নাই। তাই এই কাস্টিং নিয়ে আমার তেমন আপত্তি নাই।
নোলান অডিসিয়াসের নাবিকদের মধ্যেও কৃষ্ণাঙ্গ দেখাইছে, ওইটা নিয়া মানুষের তেমন আলাপ দেখলাম না। সব দোষ লুপিতার! নাবিকদের মধ্যে চাইনিজ টাইপেরও মনে হয় একজনকে দেখছি!
অত বড় একটা গল্প অডিসি, স্বাভাবিক ভাবেই নানা জায়গায় কাটছাঁট হয়েছে। বাড়ি ফেরার পথে যে নানান প্রতিকুল পরিস্থিতিতে পড়েছে অডিসিয়াস সেগুলো যেন বড্ড তাড়াহুড়ো করে করেছে। সাইক্লোপ, সার্সি, সর্বশেষ ক্যালিপসো, শার্লিজ থেরন যে চরিত্রে অভিনয় করেছে সেখানে নোলান বই থেকে পুরো বের হয়ে গেছে। এখানে দেখানো হয়েছে অডিসিয়াসের মনে নাই, সে ক্যালিপসোর সাথে থাকে। মূল বইয়ে এমন ছিল না।
নোলানের অডিসি অনেকটাই মানবিক, বাস্তববাদী মনে হয়েছে। এক অ্যাথেনা ছাড়া আর কোন দেব দেবীকে আমরা দেখ নাই সিনেমাতে। কিন্তু মূল গল্পে আমরা জানি পুরো যুদ্ধ এবং যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে অডিসিয়াসের বাড়ি ফেরার পথে দেবতাদের নানা ভূমিকা ছিল। মাউন্ট অলিম্পাসে ম্যালা মিটিং হইছে এই যুদ্ধ নিয়ে। এখানে তেমন কিচ্ছু ছিল না। জিউসের শুধু জিউস ল ছিল। বারবার করে আসছে জিউস ল- এর কথা। জিউস ল, তুমি কারো ক্ষতি করতে পারবা না, কেউ তোমার হুদাই ক্ষতি করলে সে জিউস ল -এ ধরা খাবে, তার শাস্তি হবে। এই লয়েই একের পর এক বিপদে পড়তে থাকে সবাই। জানে জিউস ল ভঙ্গ হচ্ছে তবুও চলতেই থাকে মানুষের জীবন!
আমার কাছে গল্পের নানা পরিবর্তনসহ পুরো সিনেমাটাই দারুণ লেগেছে। শুধু একটা খটকা আমি মিলাতে পারি নাই। তা হচ্ছে নোলান কেন একবারের জন্যও একিলিসের প্রসঙ্গ আনল না? মৃত্যুপুরীতে একিলিসের সাথে অডিসিয়াসের যে কথোপকথন তা অসাধারণ না? এখানে শিনোন নামে একটা চরিত্রকে দিয়ে সেই কথোপকথন দেখানো হয়েছে। কেন? এমন না অডিসি দেখে এখানে ইলিয়াডের কিছুই দেখানো হয় নাই, দেখানো হয়েছে। প্রায়ই ফ্ল্যাশব্যাকে ট্রয় যুদ্ধ দেখানো হয়েছে। ট্রোজান হর্স থেকে শুরু করে ট্রয়ের পতন সবই এখান হয়েছে অথচ ট্রয় যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বীরের নাম উহ্য? কেন? হোমারের এই বিখ্যাত দুইটা সৃষ্টির মধ্যে আমার কাছে তো সেরাই লাগছে অডিসিয়াস আর একিলিসের এই আলাপটা। অডিসিয়াস একিলিসকে মৃত্যু নিয়ে গর্বিত হওয়ার কথা বলে, জবাবে একিলিস প্রতিবাদ করে বলে এরচেয়ে পৃথিবীতে সামান্য কৃষক হয়ে বেঁচে থাকতে চায় ও। মৃতদের এই ছায়াঘেরা রাজ্যে রাজা হওয়ার চেয়ে জীবিত থেকে পৃথিবীর কোনো দরিদ্র কৃষকের অধীনে বা দিনমজুর হিসেবে দাসত্ব করাও শ্রেয়। ট্রয়ের যুদ্ধের সেই অন্ধ ও নিষ্ফল গৌরব এবং রক্তক্ষয়ী অহংকার তাকে আর টানে না, দুনিয়ায় বেঁচে থেকে নিঃশ্বাস নেওয়া সাধারণ জীবনই তার কাছে সর্ব সেরা। এই জিনিস কেন থাকবে না অডিসি সিনেমায়? এখানে তো নোলানের সিনেমার যে মূল ভাব, যুদ্ধের চেয়ে, বীরত্বের গৌরবগাথা না হয়ে যুদ্ধের মানসিক ক্ষত আর অপরাধবোধ নিয়েই সিনেমা। সেখানে একিলিসের এই কথোপকথন বাড়তি মাত্রা যোগ করত না?
সিনন চরিত্রটা নিয়ে একটু বলি। এই চরিত্রে অভিনয় করেছে এলিয়ট পেজ। এই অভিনেতা কিছুদিন আগে লিঙ্গ পরিবর্তন করে মেয়ে থেকে ছেলে হয়েছে। গুজব ছড়ায় পড়ল এলিয়ট পেজ একিলিস চরিত্রে অভিনয় করেছে! মানুষ ২০০৪ সালের ট্রয় সিনেমার একিলিস চরিত্রে অভিনয় করা ব্র্যাড পিটের ছবি আর এলিয়ট পেজের ছবি নিয়ে সেই মজা নিতে থাকল। দেখ নোলানের কাণ্ড, একটা ট্রান্সকে এনে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বীরের চরিত্রে অভিনয় করাইছে! শেষ হয়ে গেল সব! আমি এইটা দেখে একটু ধাক্কা খেয়েছিলাম। ট্রান্স আমার সমস্যা না, সে যদি অভিনয় করতে পারে তাহলেই হল। আমি একিলিস এলিয়ট পেজ করতে পারল কি না তাই ভাবতেছিলাম। এলিয়ট পেজকে চিনি নেটফ্লিক্সের আমব্রেলা একাডেমী থেকে। সিনেমায় তাকে দেখে আমি বুঝতেছিলাম না এইটা একিলিস কেমনে? এর মধ্যে সিনন চরিত্রটাই অডিসিতে নাই। তাই চরিত্রটাই চিনতেছিলাম না। পরে বাড়ি ফিরে ক্লডকে জিজ্ঞাস করলাম ইজ্জত তো শেষ, এই চরিত্রকে আমি চিনলাম না কেন? ক্লড বলল এই জিনিস অডিসিতে নাই, ভার্জিলের এনিড থেকে নোলান এনেছে। সেখানে বর্ণনা আছে সিনন কীভাবে নিজেকে অডিসিয়াসের কথার ফাঁদে পড়ে কাঠের ঘোড়ার সামনে দাঁড়ায় থাকে ট্রয়ের সৈন্যদের জন্য। এই বর্ণনা অডিসিতে নাই! আমি মূর্খ ভার্জিলও যে এই কাহিনী নিয়ে লিখে গেছে তাই তো জানি না! মানুষ এইটা নিয়ে কিছু বলে না কেন? নাকি সবার ভার্জিল পড়া? সবাই জানে আমিই জানি না শুধু!
সিনেমায় আসি। দুর্দান্ত কাস্টিং করা হয়েছে সিনেমায়। ম্যাট ডেমন খুবই ভালো অভিনয় করেছেন। আনা হ্যাথওয়ে চোখে লেগে থাকার মত অভিনয় করেছেন। জন লেগুইজামো আর সামান্থা মর্টনের অভিনয়ও আলাদা করে বলার মত। জন লেগুইজামো পার্শ্ব চরিত্রের জন্য অস্কার নিয়ে টানাটানি করবে আমার ধারণা। সিনেমাটোগ্রাফি আহামরি কিছু মনে হয় নাই। যে পরিমাণ হাইপ তোলা হয়েছে সেই তুলনায় আসলে তেমন কিছু মনে হয় নাই আমার কাছে। এইটা পুরো সিনেমা আইএমএএক্স ক্যামেরায় শুট না করে নরমাল করলে ক্ষতি বা করেই কী লাভ হয়েছে আমি বুঝি নাই। আবহসঙ্গীতও খুব মনে রাখার মত মনে হয় নাই। হ্যান্স জিমারের বিজিএম শোনার জন্য ডুন থ্রির জন্য এখন থেকেই অপেক্ষা করছি। মজাটা হচ্ছে নোলান এই সিনেমায় গ্রাফিক্সের কাজ পর্যায় করেই নাই। নোলানের মুনশিয়ানাটা এখানেই ভালমত বুঝা গেছে। এমন সময়ে এসে এমন সব দুরহ শট নেওয়া। যা সহজেই গ্রাফিক্স দিয়ে করা যেত তা না করে ক্যামেরার জাদু আর নিজের মহাজাদু ব্যবহার করে সিনেমা বানানো, এইটা যে কত বড় ব্যাপার তা আসলে বলে বুঝানো সম্ভব না। এইটার জন্য স্যালুট প্রাপ্য নোলান।
নোলানের সিনেমাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সহজবোধ্য সাধাসিধে সিনেমা হিসেবে অডিসি থাকবে। আর যেহেতু সহজবোধ্য তাই মানুষের আগ্রহ বেশি। মানুষ সিনেমা দেখে তৃপ্তি পাচ্ছে। এই জন্যই দুনিয়া জুড়ে জয় জয়কার চলছে এই সিনেমা নিয়ে। সময় সুযোগ থাকলে অবশ্যই সবার দেখা উচিত এই সিনেমা। আমার ব্যাক্তগত রেটিং - ৮/১০!