বিনোদ ডাক্তারের দাওয়াখানা।
“ শোন্ বাপু, অত তড়বড়ানি করলে মোটেই চলবে না। শরীরে রোগ বাঁধিয়ে এসেছিস সে খেয়াল আছে? বুঝতে পারছি, শরীরে ঠিক জুৎ পাচ্ছিসনা, কিন্তু আমিই বা কি করি বল? সুঁই না ফোটালে তোর ঐ বিষিয়ে ওঠা পায়ের ব্যথা কমবে না। ” কথাগুলো যার উদ্দেশ্যে বলা সেই মানুষটির নাম নফর চাঁদ, এ তল্লাটে তার ভারি নামডাক ওস্তাদ ঘরামি হিসেবে। আর যিনি বলছেন তিনি হলেন বিনোদ ডাক্তার। কুসুমপুর গেরামে তাঁর দাওয়া খানাতেই চলছে এমন কথোপকথন। আমার এই কাহিনির অনেকটাই থাকবে এঁদের দখলে। তাই গোড়াতেই এদের কথা সেরে নিই।
শুরুটা বরং করি নফর চাঁদের কথা দিয়েই। ওস্তাদ ঘরামি। বাঁশ,দরমা,মাটি,কাঠ,শন দিয়ে বাহারি বাড়ি তৈরির কাজে তার জুড়ি নেই। কুসুমপুরের শরীরে যেহেতু এখনও শহুরে আচকান চেপে বসেনি, তাই গায়ে গতরে তার এখনো গাঁ গাঁ গন্ধ। ফলে গেরামের বেবাক খড়ের ছাউনি দেওয়া মাটির ঘরবাড়ি এখনও এই নফর ঘরামির নজরবন্দি। সারা দিনমান সে টেঙস্ টেঙস্ করে হেঁটে হেঁটে চরকি কাটছে গোটা গেরাম জুড়ে। কারও ঘরের চাল থেকে একটা কি দুটো খড় দমকা হাওয়ায় নড়েচড়ে খসে পড়ার জোগাড় হয়েছে কি হয়নি, কিংবা মাটির পুরুষ্টু দেওয়ালের কোথাও একটু হয়তো চটে গেছে, অমনি নফর চাঁদ হাজির। নিজের চাঁদবদনে একরাশ খিল্লি তুলে বলবে - “ও বজেশ্বর দাদা! ছাউনীখান যে খসে পড়ার জোগাড় হলো, দেওয়ালেও দেখছি মাটি খসে ধসে যায়। বলছি কি বজেশ্বর দাদা, এবেলা কাজের চাপ কম আছে, মেরামত করে দিয়ে যাই। এখন অল্পে অল্পে হয়ে যাবে। যত দেরি করবে তত খরচ বাড়বে। যা মাগ্গিগণ্ডার বাজার ! আরে বাপু! বেথাই ভাবছো,মালপত্তরের জোগাড় তো তোমায় করতি হবেনা, নাসিরুদ্দিনকে বলে দেব, কয়েক পণ খড় আর বাঁশ পাইঠে দেবে। পয়সা কড়িরও চিন্তা তেমন কিছু নেই। যতটা পারবে এখন দেবে। বাকিটা রয়েসয়ে দিওখনে। আরে বাপু, অত দোনোমনায় ভুগতে নেই। ওই যে গো শাস্তরে বলেছে না–শুভকাজ কর তাড়াতাড়ি, না হলে জেন, পস্তাবে ভারি!”
নফর চাঁদের মুখে নাগাড়ে এতো কথা শুনে ব্রজেশ্বর হয়তো খানিকটা ফিক্ করে হেসে উঠেছে, ব্যস হয়ে গেল! অজগর সাপ যেমন প্যাঁচে প্যাঁচে পয়জার করে শিকারকে বিবশ করে,
নফর চাঁদ ঘরামিরও যে তেমনটাই দস্তুর। সাপের হাসি চেনে বেদে, আর মানুষের হাসি দেখে তার মন পড়তে জুড়ি নেই এই
নফর চাঁদের। থেমে যাওয়া রেকর্ড আবার চালাতে শুরু করবে। “শোনোগো দাদা, খোদা কসম। নফর চাঁদ কখনও মিথ্যে বলেনা। যা ল্যাজ্য তাই বলে। সেই পাঁচ সণ আগে আমাদের ফুলু রাণীর বে র সময় শেষবারের মতো তোমার এই ঘর ছেয়ে ছিলাম, তারপর তো আর হাতই দিতে হয়নি। মালমশলা খাঁটি হবার এই হলো সুবিধে, কোনো সমিস্যি থাকে না। ইদের সময়ের এক ফালি চাঁদের মতো তোমার ওই গম্ভীর মুখের এক চিলতে হাসিটাকে একটু বড়ো করে মেলে ধরো, তাহলেই আমার শুকনো পেরানে খুশির লহর উঠবে। ঘাড়ডারে একটু কায়দা মতো নাড়তো দিখি। কাল থেকেই লেগে পড়ি। দিন তিনেক তো লাগবেই।” ভাষণের দ্বিতীয় পর্ব শেষ করে এবার একটু জিরিয়ে নেবে নফর।
এরমধ্যেই হয়তো নফরের বাক্যিবাণে বিবশ হয়ে নিজের অজান্তেই সম্মতি দিয়েছে ব্রজেশ্বর, মানে তাকে একরকম বাধ্য করেছে ঘরামি নফর চাঁদ। এবার হাসতে হাসতেই ব্রজেশ্বর বলে ওঠে, তোর্ নাম নফর চাঁদ না হয়ে নাছোড় চাঁদ রাখা উচিত ছিল। আমি এখন থেকে তোকে নাছোড় চাঁদ বলেই ডাকব। কি গোঁসা হবে না তো?” আবারও একগাল হেসে নফর বলে উঠবে, “কি যে বলো বজেশ্বর দাদা, তুমি হলে গেরামের মান্যিগণ্যি বুজরুগ মানুষ, তোমার কথায় রাগ করলি চলবে কেন? আর এই কথায় কথায় গোঁসা করা আমার বাপু তেমন ধাতে সয় না। তাছাড়া গোলাপেরে তুমি যে নামেই ডাকো না কেন, তার সুবাসে কি আর ঘাটতি পড়ে? ও, তুমি আমারে নফর বলো আর নাছোড় বলো, মানুষটার তো তাতে কোন হেরফের হবেনি, তুমি ওই নতুন নামেই আমারে ডেকো”। আপাতত সাঙ্গ হলো বাবু নফর চাঁদ থুড়ি নাছোড় চাঁদ অপেরা প্রযোজিত, পরিচালিত এবং অভিনীত – “ শ্রী বজেশ্বর বধ পালা”।
মেঘ ডাকাডাকির পর্ব সমাপ্ত হয়ে একটু একটু করে হাওয়া বদলের আভাস মিলতেই রোগ ব্যাধির প্রকোপ বাড়তে থাকে হু হু করে। এমন সময় বিনোদ ডাক্তারের ব্যস্ততাও বাড়ে খুব। সব তাঁকে একা হাতেই সামলাতে হয় –রোগী দেখা, তার ওষুধ তৈয়ের করা, কখন কোনটা খাবে তা ঠিকমতো বুঝিয়ে দেওয়া বেবাক কাজ একাই সামলে নেয় বিনোদ ডাক্তার। তবে এতো করেও সেভাবে লক্ষ্মীর আশীর্বাদ বর্ষায় না। তাতে যে খুব আক্ষেপ আছে বিনোদের তাও একদমই নয়। মানুষের পাশে থাকার জন্য সবসময় যেন ঢেঙা শরীর আর চাঙ্গা মন নিয়ে মুখিয়ে আছে মানুষটা। লোকজন কি আর সাধে গদগদ হয়ে বলে – “বিনোদ ডাক্তার হলো স্বয়ং ধণ্বন্তরী, একবার অসুস্থ শরীলডারে টেনে হিঁচড়ে তেনার দোরে হাজির হলেই হলো, সব আদি ব্যাধি নিমেষেই পগাড় পার।”
বিনোদ অবশ্য নিজের বড়াই কখনোই করেনা, বরং ইনিয়ে বিনিয়ে কেউ তেমন কথা বলতে শুরু করলেই একগাল হাসি হেসে বলবে, “কি গো কানাইয়ের মা, আমিতো তোমাকে গাল দিইনি কখনও, তাহলে চোত মাসের গাজনের ঢাকের মতো ড্যাঙ ড্যাঙ করে কথা কইছো কেন? ও বুঝতে পেরেছি, আজ বুঝি শাড়ির আঁচলে নুড়ি পাথর বেঁধে আননি? না এনেছো, বাপু বেশ করেছো। আজ ওষুধ দিয়ে দিচ্ছি, বুঝেশুনে খেতে হবে। পরশুর মধ্যেই বিলকুল ঠিক হয়ে যাবে। খাড়া হবার খবরটা মনে করে দিয়ে যেও বাপু,না হলে সুঁই ফোটাতে হবে, মনে রেখো।” বিনোদ জানে সুঁই ফোটানোর কথা বললেই কানাইয়ের মায়ের শরীরের রোগ আধখানা কমে যাবে। সব সমস্যার সমাধান ঐ বাঁধা ফর্মুলার ওষুধে হয়না। বিনোদ ডাক্তার একথা বিলক্ষণ জানে। একগাল হাসি হেসে কানাইয়ের মা বাড়ির পথ ধরে।
কানাইয়ের মার বয়স হচ্ছে তার ওপর সারাদিন আঁচ জ্বেলে মুড়ি ভাজবে শাশুড়ি আর বৌমা মিলে। সেই মুড়ি বস্তায় ভরে সাইকেলের পেছনে বেঁধে নিয়ে কানাই যাবে সেই দূরের গঞ্জে, বেচতে। বুড়ির হাতের যাদুতে মুড়ি হয়ে ওঠে মুচমুচে, তাজা। কানাইয়ের বৌ, সোহাগীও মাঝে মাঝেই আসে বিনোদ ডাক্তারের কাছে নানারকম পরামর্শ চাইতে। এমন ক্ষেত্রে একাই চলে আসে, সন্ধের দিকে। এই সময়টাতে ডাক্তারবাবু একটু কম চাপে থাকে।
আজও এসেছে। একলাই। বিনোদ কিছু কাগজপত্র নাড়াচাড়া করছিল। চেম্বারের সামনে সোহাগী দাঁড়াতেই একগাল হেসে বিনোদ বলে ওঠে – “এসো মা লক্ষ্মী, আজ হঠাৎ কি মনে করে?” “ বাপের কাছে মেয়ে আসবে, তার জন্য আবার আগাম দরখাস্ত করতে হবে না কি গো ? আজ একটু ফুরসৎ পেলাম তাই ই!”সোহাগীর উত্তর। সোহাগীর এই কথাগুলো মনে ধরে বিনোদের। সেও হেসে বলে, “মেয়ে আমার বেশ রসিয়ে কষিয়ে কথা বলতে পারে দেখছি। তাইতো তোমার কথাখানি মধুর মতো কানে বাজলো, না হলে সারাদিনতো কাটে অকেজো দেহ যন্ত্রের কটকটানি শুনে শুনে। বল মা বল। তোর সমস্যার কথা বল।”
“সমস্যার কি আর অন্ত আছে গো কাকা?” গুরুপদর চায়ের দোকানে বসে গরম চায়ের গেলাসে বেশ আয়েশ করে চুমুক চড়াতে চড়াতে কথাগুলো বলে কানাই। তার বেজায় চায়ের নেশা, তবে সোহাগীর অবশ্য চায়ের তেমন নেশা নেই। ভোরবেলায় উঠোনে ঝাড়ু দিতে দিতে এক ফাঁকে জনতা স্টোভে জল চড়িয়ে দেয় সোহাগী। ততক্ষণে কানাইও উঠে পড়েছে। জল গরম হলে সেই চা টা বানিয়ে ফেলে। এ আর তেমন হ্যাপার কাজ কি! কাশি হলে নিজেই যেমন খানকতক বাসকপাতা, তুলসি পাতা আর আদা মিশিয়ে জম্পেশ করে একটা পাচন বানিয়ে নিয়ে ঢকঢক করে গলায় ঢেলে ফেলে, চা তৈরি করাতো তেমনি ব্যাপার না কি! মাপমতো চিনি মেশানোটাই যা একটু ভেবে চিন্তে করতে হয়। কয়েকদিন অবশ্য শরীরটা একটু যেন বেসুরো লাগছে তার। হয়তো হাওয়া বদলের প্রভাব। তবে কানাই জানে, তার শরীর অকেজো হয়ে পড়া মানেই হলো তিনজনের এই সংসারে টলমল হয়ে পড়া।
গুরুপদর সঙ্গে অনেক দিনের সম্পর্ক কানাইয়ের। একটা চায়ের দোকান চালায় গুরুপদ। সেটি একেবারে বাস গুমটির লাগোয়া, ফলে সারাদিন ধরেই রকমারি মানুষের ব্যস্ততা লেগেই থাকে, কথা বলার ফুরসৎ পাওয়াটাই সমস্যা। তবুও কানাইয়ের জন্য কিছুটা সময় বের করে নেয় গুরুপদ। আসলে কানাইকে সে পছন্দ করে। গল্পের মধ্যে রস না থাকলে সে গল্প শ্রোতাকে ধরে রাখতে পারেনা। তাই নানান চুটকির মিশেল দিতে হয় থেকে থেকে। আজও তেমন চটকদারি চালে কথা শুরু করে গুরুপদ।
“ বুঝলে কানাই ! খবর পেলাম ক্যানেলের ধারের ঐ বড় জমিতে নাকি হাসপাতাল হবে। এখন জমির মাপজোক চলছে। শহরের বাবুরা এসে নাকি সব দেখেশুনে গেছে। তেনাদের বেশ পছন্দ হয়েছে জায়গাটা । এখন চৌধুরীবাবুদের শরিক সাঙাতদের সঙ্গে দরদাম নিয়ে কথাবার্তা চলছে। এখানে হাসপাতাল হলে আমাদের এই জায়গাটার দর বেড়ে যাবে তরতরিয়ে।” গুরুপদ তার ভাঁড়ার থেকে এই গোপন খবর শুনিয়ে দেয় কানাইকে। হাসপাতালের কথায় কানাইয়ের মনে নতুন কিছু ভাবনা ঢেউ তোলে। সে মনে মনে ভাবে তেমন হলে একবার সোহাগীকে দেখাতে নিয়ে আসবে। চার বছর হতে চললো, সোহাগী তার ঘরে এসেছে, অথচ এখনও তার কোল ভরেনি। এনিয়ে গেরামের লোকজন নানারকম কথা বলে। মা নিজের মুখে কিছু না বললেও কানাই বোঝে যে মোক্ষদাও এসব নিয়ে একটা চাপা চাপ অনুভব করে। সোহাগী অবশ্য এখনো এমন কথায় কান সেভাবে দেয়না। এই নিয়ে কথা তুললেই বলে উঠবে,-- “ও সব আমার আর তোমার ভাবনায় হবেনি। গোবিন্দের ওপর ভরসা রাখো”। তবে কানাই ভাবে সত্যিটা তাকেও বোধহয় ভেতরে ভেতরে কুড়ে কুড়ে খায়। বড় ভালো মেয়ে সোহাগী।
সোহাগীর কথা মনে পড়তেই হঠাৎ করে ব্যস্ত হয়ে পড়ে কানাই। গেলাসে পড়ে থাকা চায়ে দ্রুত চুমুক দিতে দিতে সে গুরুপদকে বলে – “আজ যে কিছু পয়সা পেলে ভালো হয়। কিছু কেনাকাটা করতে হবে।” গুরুপদ কানাই আর তার মুড়ির ব্যাপারে একেবারে দরাজহস্ত। না করেনা। দোকানের ভেতর থেকে টাকা এনে দেয়। দুজনেই জানে যে কোনো সম্পর্কে পারস্পরিক বিশ্বাসই হলো সবথেকে বড় পুঁজি। বিকেল গড়াতেই গিরিজা উনুনে তেল চড়িয়ে চপ ভাজতে শুরু করেছে। গন্ধে গন্ধে চারে ভেড়া মাছের মতো ভিড় করে খদ্দেররা। টাকা কটা প্যান্টালুনের পকেটে ঢুকিয়ে নিয়ে সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেয় কানাই। বেশ খানিকটা পথ পাড়ি দিতে হবে তাকে।
চারদিকে অন্ধকার থাকতেই রওনা দিয়েছে নাসিরউদ্দিন। তাই আলো ফুটতে না ফুটতেই সাবেকি গরুর গাড়িতে নধর চেহারার কিছু বাঁশ আর কয়েক কাহন খড় এনে হাজির করে ব্রজেশ্বরের উঠোনে। পৌছেই নাসিরউদ্দিন হাঁক দেয়, – “ও মা ঠাকুরণ! নাসির মোল্লা হাজির হয়েছে গো! সময়মতো জলপাণির ব্যবস্থা করো। অনেক দিন পর এলেম তোমাদের দুয়ারে। আমি এদিকের ফাঁকা জায়গায় সব নামিয়ে রাখছি। নফর চাঁদ এই এলো বলে। নফরের জন্যও দানাপানির জোগাড় রেখ”।
যাকে উদ্দেশ্য করে নসু মিঞার এমন হেঁকে ডেকে কথা কওয়া, সেই মা ঠাকুরণ সিদ্ধেশ্বরী এতক্ষণে আবির্ভূতা হন। এতো সকালেই তার কলঘরের কাজ সারা হয়ে গিয়েছে। নাসিরউদ্দিনকে দেখে একটু আদুরে রাগ দেখিয়ে বলেন,-- “যেমন তোরা, তেমন তোদের কর্তা মশাই। বলা নেই কওয়া নেই এসে হাজির হলেই হলো। এখন এই হ্যাপা সামাল দেবে কে? আমার কি আর সেই আগের মতো গায়ে গতরে বল আছে নাকি? কতবার করে তো তেনাকে বললাম – বাপু হে, অনেক কাল হলো। এবার এই কাঁচা বাড়ির মায়া ছেড়ে একটা নতুন পাকা বাড়ি কর। কে শোনে কার কথা? বলে, গিন্নি! এটা বাপ পিতামর ভিটেবাড়ি। রাতারাতি এটাকে বদলে ফেলার হক আমার নেই। থাকো এই খোড়ো বাড়ির বাসিন্দা হয়ে।” সিদ্ধেশ্বরীর এবারের রাগে আর আদর নেই। নাসিরউদ্দিন এ কথার জবাব দেয় না, সে নিজে এক ভিটে হারানো যাযাবর। তাই তার কাছে ভিটে হারানোর যন্ত্রণা অন্য অনুভূতি জাগায়।
“বুঝলি রে মা, আমাদের শরীর হচ্ছে একটা জটিল যন্ত্র। বাইরে থেকে দেখে ভেতরের সবটা বুঝতে পারা যায় না। এখনই অত ধৈর্য্য হারিয়ে ফেললে চলবেনা। একটু অপেক্ষা করে থাকতে হবে। তবে আমি হাল ছাড়ছিনা। আর এই ফুল ফোটানোর সব দায় তো তোমার একার নয়। এতে যে কানাইয়েরও একটা বড়ো ভূমিকা রয়েছে।” দাওয়াখানার আলোআঁধারিতে সোহাগীর মুখোমুখি বসে বিনোদ ডাক্তার, ঢাকা মিটফোর্ডের প্রাক্তনী, কথাগুলো বলে কন্যাসমা সোহাগীকে। এই কথার মাঝেই হন্তদন্ত হয়ে কানাই ঢোকে। কানাইকেও বুঝিয়ে বলেন সব। নিজের প্যাডে খসখস করে একটা চিঠি লিখে কানাইয়ের হাতে দেন। “ শোনো কানাই, এই চিঠিটা নাও। সদরে গিয়ে কয়েকটা পরীক্ষা করে আনতে হবে। অত চিন্তার কিছু নেই। সদর হাসপাতালে ডঃ প্রভঞ্জন বোসের সঙ্গে দেখা করে এই চিঠিটা তাঁকে দিও। ও আমার ছাত্র। ওই সব ব্যবস্থা করে দেবে। রিপোর্টগুলো পেলে তারপরের চিকিৎসাটা না হয় আমিই করবো। তার জন্য চিন্তা করতে হবেনা। ” বিনোদের চারপাশে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে এক অপার্থিব আলো। সেই আলোর ছটা সোহাগী দেখতে পায়। সে জানে এই আলো বহুযুগের ওপার থেকে আসা কোনো এক অজানা নক্ষত্রের আলো। এ আলো একালে হারিয়ে গেছে।
নিজের বাড়ির বারান্দায় একলাই বসে আছে বিনোদ ডাক্তার। সুনন্দা ঘরের ভেতরে টুকটাক কাজ নিয়ে হয়তো ব্যস্ত রয়েছে। ছেলেটা চলে যাবার পর একা একাই এতোগুলো বছর পার করে দিল দুজনে। নিজে ডাক্তার হয়েও অসুস্থ ছেলেটাকে রক্ষা করতে না পারার গভীর যন্ত্রণা ঘুন পোকার মতো কুড়ে কুড়ে খায় তাঁকে। অন্ধকারের আবছায়ায় চরাচর কেমন রহস্যময় মনে হয়। চোখ বুজে অনেক অনেক পুরনো কথা ভাবতে থাকে বিনোদ। মনে পড়ে ঢাকা মিটফোর্ডের দিনগুলোর কথা। বিপ্লবী বিনয় বসু ছিলেন তাঁর বাবার সহপাঠী। সে সব গল্প শুনতে শুনতেই বড় হয়ে ওঠা। দেশ ভাগের সময় বিনোদ মিটফোর্ডের ইন্টার্ন। দেশ ছেড়ে, ভিটে ছেড়ে সীমানা পেরিয়ে এপারে চলে আসা। সেই থেকেই কুসুমপুরে ঠাঁই নেওয়া। কুসুমপুর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে মন চায়নি বিনোদ ডাক্তারের। যতবার ভেবেছে ততবারই যেন কুসুমপুর অভিমানিনী মেয়ের মতো তাঁকে আটকে রেখেছে। বিনোদ জানে, এঁরা বড়ো অসহায়। ওদের ছেড়ে যাওয়া মানেই হলো এতোগুলো মানুষকে এক অসহায় অবস্থায় ফেলে রেখে যাওয়া।
সন্ধে উতড়ে গেছে অনেকক্ষণ। থানার দেউড়িতে ঢং ঢং করে সাতটার ঘন্টা বাজে। মুনিয়া চা নিয়ে হাজির হয়। এই অনাথ মেয়েটাই এখন সুনন্দার সবসময়ের সঙ্গী।
– হ্যাঁরে মুনিয়া, দিদি কোথায়?
– দিদিতো এখন উল কাঁটা নিয়ে তোমার জন্য মাফলার বুনছে।
– দিদিকে বল, আমি ডাকছি। ঘর থেকে বরং বেতের চেয়ারটা এনে দে। এখানে বসে চা খাক্।
সুনন্দা এসে পাশে বসে। দূরের গাছের আড়াল থেকে উঁকি দেয় শুক্লা দ্বাদশীর চাঁদ। বিনোদ সুনন্দার হাতে হাত রেখে বলে, সু একটা গান গাও। তোমার গলায় গান শুনলে মনের সব শূন্যতা ভরে যায়। সুনন্দা কথা বলেনা। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে শুরু করে তাঁর প্রিয় একটা গান।
বাহির পথে বিবাগি হিয়া কিসের খোঁজে গেলি,
আয় রে ফিরে আয়।
পুরানো ঘরে দুয়ার দিয়া ছেঁড়া আসন মেলি
বসিবি নিরালায়।
………………
তবু তো আছে আঁধার কোণে ধ্যানের ধনগুলি —
একেলা বসি আপন- মনে মুছিবি তার ধূলি,
গাঁথিবি তারে রতনহারে, বুকেতে নিবি তুলি মধুর বেদনায়..
চারিদিকের গভীর নিরালা নীরবতাকে ক্ষণিকের জন্য ছিন্ন করে দুটি ব্যাকুল হৃদয়ের নিভৃত বেদনার সুর ছড়িয়ে পড়ে দূর থেকে দূরান্তে…..
কুসুমপুর আর নিরালা রইলো না। একটু একটু করে সময়ের হাত ধরে কুসুমপুরের আকাশ, বাতাস, নদী নালা,খাল বিল, জমি জিরেত, বাগ বাগিচা মায় মানুষগুলো পর্যন্ত অন্যরকম হয়ে গেল। কিছু মানুষ যেমন কানাইয়ের মা, শিউলি ফজলুল চাচা, গোলাপী দাসী - যাঁর লীলা কীর্তন গান আর পাঠ শুনতে জমা হতো হাজার হাজার শ্রোতা, হারান হাজরা সবসময় যে মানুষটার কথা মাথায় রেখে যাত্রাপালা লেখা হতো, বিনোদ ডাক্তারের এতো দিনের সঙ্গীনি সুনন্দাও চলে গেছে এই বদলে যাওয়া পটভূমিতে তাঁর একান্ত আপনজন ডাক্তারবাবুকে একলা ফেলে রেখে। বিনোদ ডাক্তার এখনও অভ্যাস বশত চেম্বারে এসে বসেন সন্ধেবেলায়। দু চারজন খুব পুরোনো লোকজন মাঝেমধ্যে এসে খানিকক্ষণ সঙ্গ দিয়ে যায়। কুসুমপুরে এখন নতুন নতুন ডাক্তারদের আনাগোনা, শহর থেকে গাড়ি হাঁকিয়ে এসে কেউ দেখেন চোখ, কেউ কান, কেউ দাঁত, কেউ হয়তো হৃদয় – মানুষের শরীরটাকে এখন খণ্ড খণ্ড করে দেখাটাই নাকি দস্তুর। নব্বই পার করে দেওয়া একজন মানুষের চোখে এসময়ের দুনিয়া একদম আলাদা, একদম। বিনোদ ডাক্তার জানেন এমন পৃথিবীতে তিনি নিতান্তই বেমানান, অচল। এসব নিয়ে তাঁর বিন্দুমাত্র আক্ষেপ বা অনুযোগ নেই। কার কাছে অনুযোগ করবে সে!
কিন্তু অনুযোগ আছে অনেকের। হঠাৎ করে বদলে যাওয়া সামাজিক অর্থনৈতিক পটভূমিতে দিশেহারা হয়ে পড়েছে অনেক অনেক মানুষ। গ্রামের খোলশ ছেড়ে শহরের মলাটে সবকিছুকে মুড়ে নিতে গিয়ে আজ বিসর্জনের বাজনা বেজেছে তাদের ঘরে। এসব কথা বিনোদ ডাক্তারের মনে তুফান তোলে কিন্তু তিনি জানেন একে রোখা যাবেনা। শহুরে হাওয়ায় হয়তো উপড়ে যাবে এত দিনের শেকড়ের সব বাঁধন। বড় একা মনে হয় নিজেকে।
কাল রাতে ঘুমাতে পারেনি বিনোদ। হাজার চিন্তা মাথার মধ্যে জট পাকিয়ে আছে। তাই আজ ভোরেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছেন। এই সময়টাতে নদীর পাড়ে হাঁটতে খুব ভালো লাগে। নদীর বুক চিরে সূর্য ওঠার সময় সমাগত। নতুন
একটা সকাল,নতুন একটা দিনের সূচনা হতে চলেছে। প্রতিদিনের চেনা অংশুমালি সূর্যদেবকেও হঠাৎ কেমন অচেনা মনে হয় বিনোদ ডাক্তারের। একটা কচি হাত এসে বিনোদের হাত ধরে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন মুনিয়ার ছেলে বীরসা। খানিক তফাতে মুনিয়া আর সুষেণও দাঁড়িয়ে আছে। বিনোদ কোনো কথা বলেন না। জোরে, আরও জোরে খালি চেপে ধরেন ছোট্ট বীরসার হাত, কুসুমপুরের ভবিষ্যতের হাত। নতুন সুর্যের আলো এসে পড়ে ওদের ওপর।
সোমনাথ মুখোপাধ্যায়
জুলাই,০২, ২০২৬.
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।