এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • শপিং মল: একটি সমাজতাত্ত্বিক আলোচনা

    Tapti Bose লেখকের গ্রাহক হোন
    ০১ জুলাই ২০২৬ | ১৮ বার পঠিত
  •  
    শপিং মল বলতে আমরা সাধারণত কোন একটি বিস্তৃত আয়তনের বহুতল বিক্রয় কেন্দ্র বুঝি যেখানে একই ছাদের তলায় বিভিন্ন রকমের দোকান থাকে। ভারতবর্ষের বিভিন্ন শহরে শপিং মল সম্ভবত ১৯৯০ এর লিবারেলাইজেশনের পর থেকেই স্থাপিত হতে আরম্ভ করেছে। কলকাতা শহরে ব্রিটিশ আমলে ১৮৭৪ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত বিখ্যাত হগ মার্কেট যাকে এখন নিউমার্কেট বলা হয় অনেকটা আধুনিক শপিং মলের পূর্বসূরী বলা যেতে পারে। স্বাধীনতা পরবর্তী কলকাতায় নির্মিত হয়েছে বিভিন্ন মার্কেট যেমন এসি মার্কেট, বরদান মার্কেট, শ্রীরাম আরকেড, গড়িয়াহাট এসি মার্কেট। এই ধরনের মার্কেটগুলো বা বাণিজ্যিক বিক্রয় কেন্দ্রগুলি শীততাপ নিয়ন্ত্রিত কিন্তু এখানে প্রধান বিক্রেতা অবাঙালি হোক বা বাঙালি এরা স্থানীয় বিক্রেতা এবং ব্র্যান্ড বর্জিত। এখানে যেকোনো সাধারণ বাজারের মতন লোকেরা স্বাচ্ছন্দে দরদাম করতে পারে। পুজোর সময় এইসব জায়গায় প্রচুর ভিড় হয়। অনেক সময় এখানে দোকানদারেরা ক্রেতাদের আকর্ষিত করার জন্য এই বলে যে কিছু কিনতে হবে না ‘আপনি শুধু একটু দেখে যান পছন্দ হলেই কিনবেন’ এরকম থাকে তাদের কথাবার্তা। তারপরে দোকানে প্রবেশের পর বিক্রেতা একের পর এক এমন জামা কাপড় পোষাক দেখাতে থাকেন যে আমরা একটি বা দুটি কিনে তবে সেই দোকান থেকে বেরই। তারপরে বেরিয়ে অনেক সময় ক্রেতারা হয়ত রোলের দোকানে রোল বা চাট খেয়ে অটো বাস বা ট্যাক্সিতে বাড়ি ফেরেন। কিন্তু এই মার্কেট গুলিকে সেই ভাবে শপিংমল বলা যেতে পারে না।
     
    শপিংমল শুধু মাত্র কোন বাজার বা হাটের মত একটি ক্রয় বিক্রয় কেন্দ্র নয়। শপিং মল শহরের মধ্যে একটি এলিট স্পেস বা অভিজাত পরিসর যা শহরের অভিজাত শ্রেণিদের তাদের সমাজের অন্যান্যদের থেকে পৃথকীকরণ করে। সাউথ সিটি মল, এক্রপোলিস মল, কোয়েস্ট মল, আক্সিস মল অথবা মানি স্কোয়ারকে কলকাতায় আধুনিক শপিং মল বলা যেতে পারে। এইখানে বেশিরভাগ দোকানে ডিজাইনার বা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডেড জামা কাপড়, কসমেটিক্স, পারফিউম জুতো বা ইলেকট্রনিক্স পাওয়া যায়। এই জাতীয় শপিং মল গুলো শুধু বিক্রয় কেন্দ্র নয় বরঞ্চ এতে সিনেমা হল গাড়ি পার্কিং এবং ফুড কোর্ট বা অভিজাত রেস্তোরাঁ থাকে। এই শপিংমল গুলিতে যেকোন অভিজাত পরিসরের মতন কিছু কোড অফ বিহেভিয়ার থাকে। সুসজ্জিত উচ্চবিত্ত মানুষ শীততাপ নিয়ন্ত্রিত শপিং মল গুলিতে গাড়ি করে আসে ইংরেজিতে কথা বলে এবং কার্ডে পেমেন্ট করে।
     
    সেই কোন যুগে প্লেটো তার ‘ The Republic’ এ প্রথম বলেছেন একটি ওলিগার্কিক শহরের বর্ণনা দিতে গিয়ে যে শহর সব সময় ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বিভক্ত থাকে। তারপরে সমাজতাত্ত্বিকরা বিভিন্নভাবে এই শহরের ধনী দরিদ্রের শ্রেণীবিন্যাস কে সংজ্ঞায়িত করেছেন। আধুনিক শহরের আদর্শ বলতে যেটা বুঝি সেটা তাই লন্ডনও হতে পারে বা সিঙ্গাপুর হতে পারে। আমাদের সামনে কোন নিজস্ব মডেল হয়ত নেই তবে নিশ্চয়ই এমন একটি শহর যেখানে আছে ফ্লাইওভার বহুতল পরিষ্কার প্রশস্ত রাস্তা। এই আদর্শ শহরে এই শপিংমল অন্তর্গত। এখানে নেই ঘাম রোদ বৃষ্টি নেই যেখানে সিঁড়ি ভেঙ্গেও উঠতে হয় না তাই এই শপিংমল গুলো তো সবসময় এলিভেটার বা চলন্ত সিঁড়ি থাকে। মনে পড়ে যায় থিওডোর ড্রেজার এর বিখ্যাত উপন্যাস ‘সিস্টার ক্যারি’ (Sister Carrie) যেখানে লেখক এমন একটি শহরের মধ্যে শহরকে ‘the walled city’ বলেছেন অর্থাৎ প্রাচীর ঘেরা শহর। এই শহরের মধ্যে শহরকে আমরা দৃশ্যমান মনে করি। বাকিটা শহর হয়ত ‘ঘিঞ্জি’ সেখানে জল জমে যেখানে মানুষরা গাড়িতে নয় ভিড় পরিবহনে ঝুলে যায় যেখানে আছে অলিগলি পাড়াপল্লী বস্তি চিৎকার চেঁচামেচি সেই শহরের বাইরের শহর অদৃশ্য থাকলে আধুনিক সমাজ স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। আর এই অদৃশ্য শহরের মানুষেরা সেই দৃশ্যমান শহরের অংশ হতে মরিয়া থাকে। শহরের স্থাপত্য নাগরিকদের উপর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব বিস্তর করে। শহরের কোন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শপিংমল মানুষের অর্থনৈতিক চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষা বাড়িয়ে দেয় তাদের মানসিক পরিবর্তন করে। তাই মানুষের জীবনের লক্ষ্য হয়ে যায় সেই অভিজাত পরিসরের ভাগ্যদ্রব্য ক্রয় করার জন্য সেই অর্থনৈতিক ক্ষমতা অর্জন করা। ‘সিস্টার ক্যারি’ উপন্যাসের নায়িকা সেই শহরের মধ্যে শহরে প্রবেশ করলেন কিন্তু নায়ক হার্স্টউডের কপালে রইল তার বিষয় সম্পত্তি হারিয়ে সেই অদৃশ্যমান শহরে হারিয়ে মৃত্যু বরণ করা। যেন আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাতে এই দুটি পথই মানুষের কাছে আছে নয় দৃশ্যমান শহরে প্রবেশ করা নয় অদৃশ্যমান শহরে হারিয়ে যাওয়া।
     
    আর এই শপিং মলে প্রবেশ করে মানুষ করেই কি? ইংরেজি শব্দে তার ও কিছু নমুনা আছে। যেমন ‘chill’ করে বা ‘freak out’ করে। ‘Chill’ অর্থাৎ মানসিকভাবে আলগা হওয়া আর ‘freak out’ করা অর্থাৎ অত্যাধিক উত্তেজনা অনুভব করা। এই জাতীয় শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ আছে কিনা জানা নেই তবে নিশ্চয়ই এই শব্দগুলি একটি মানসিক অবস্থা বোঝায় যেখানে মানুষ হয়ত সপ্তাহের কাজের পর এই শপিং মল গুলিতে গিয়ে ‘হাইপ্রেশার’ চাপের বা ‘রুটিন’ একঘেয়েমির জীবন থেকে কিছুটা স্বস্তি পায়। এটা কে অনেকে ‘retail therapy’ বলে। যখন ‘পারচেজিং পাওয়ার’ বা ক্রয় ক্ষমতাই মানুষের জীবনের মাপকাঠি, আমাদের অবসর সময় হয়ত আমরা ইনস্টাগ্রামে রিলে আনবক্সিং দেখি বা শপিংমলে ‘উইন্ডো শপিং’ করি। তাই আমাদের অবসর সময়ও কাটে ‘প্যাসিভ কনজামশনে’। এটাই হয়ে যায় মানুষের জীবনের সাফল্য।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। পড়তে পড়তে মতামত দিন