এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  দেখেছি পথে যেতে

  • হিমাচলের ইতি উতি - ৯

    লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | দেখেছি পথে যেতে | ০২ জুলাই ২০২৬ | ৬৫ বার পঠিত

  • পার্বতী লেক - পার্বতী ড্যাম

    পুলগা ৭২৫০ ফিট উচ্চতায় আরেকটা ছোট্ট সুন্দর গ্রাম। রাস্তা থেকে গাড়ি সরাসরি পৌঁছাতে না পারলেও কিছু কিছু বাইক অফরোডিং করে উঠে যায়। ফলে পরিবেশ একেবারে কলুষমুক্ত বলা যায় না। নরেশজি বলেছিলেন বারশৈনি বাসস্ট্যান্ড থেকে একটু এগিয়ে একটা পায়ে চলা পাকদন্ডী আছে। সেটা ধরে উঠে গেলে পাইনবনের মধ্যে দিয়ে ছায়ায় ছায়ায় আধঘন্টায় পুলগা পৌঁছে যাওয়া যায়। তা গাড়িতেও মোটামুটি ওই আধঘন্টা চল্লিশ মিনিট মতই লাগল।


    মানুষের ঘরবাড়ি - পুলগা

    পার্বতী ড্যাম পেরিয়ে পাহাড়ী রাস্তায় খানিকদূর এঁকেবেঁকে গিয়ে একটা মস্ত গাছের নীচে আরো খান দশবারো গাড়ির পাশে দাঁড় করিয়ে নরেশজি বললেন ওই দেখো সিঁড়ি, ওইকটা উঠলেই পুলগা গ্রাম। তা নেমে দেখলাম ঠিক ওই কটা নয় মোটামুটি তিনভাগে মোট পঁচিশটার মত সিঁড়ি। তবে কোথাও মাটি কোথাও পাথরে পরিস্কার ধাপ কাটা। মাটির ধাপগুলোর একধার ঘোড়ার বর্জ্যে রীতিমত পিছল। সেসব এড়িয়ে গ্রামে পৌঁছে দেখি চারিদিক শুনশান।


    এখানে জানলার কাচে ধরা দেয় বরফচুড়া

    এই গলি সেই গলি খানিক হেঁটে এক জায়গায় দেখি রাস্তাটা শেষ হয়েছে পাহাড়ের কিনারায়, প্রায় হাজার খানেক ফুট নীচে পার্বতী চলেছে। আর নেমে যাওয়া ঢালের গায়ে আপেলবাগান। বাগান না বলে বন বলাই ভাল, খুব খেয়াল করলে সরু পাকদন্ডী দেখা যায়। গলির দুধারের বাড়িগুলোর দরজা জানলা বন্ধ। ওই রাস্তা যেখানে শেষ তার ঠিক আগে একটা ছড়ানো উঠোনে কজন মহিলা বসে কিছুর দানা বাছছিলেন। দানাগুলো দেখতে রাজমা আর লোভিয়ার মাঝামাঝি।


    এর মাঝেই পথ গিয়েছে

    জিজ্ঞাসা করে জানলাম ওগুলো রাজমাই বটে। ‘'কড়ক ঠান্ড'এর প্রস্তুতি চলছে। ফসল তোলা শেষ হয়েছে গত সপ্তাহে। এখন ঝেড়ে বেছে তুলে রাখা হবে, আগামী এক বছরের সঞ্চয়। এতক্ষণে মানুষের দেখা পেয়ে তাড়াতাড়ি জিজ্ঞাসা করি পরীবনএর রাস্তা। পুলগায় আমার আসার মুখ্য কারণই হল পরীবন বা Fairy Forest দেখা। ওই মহিলাদের মধ্যে একজন মোটামুটি হিন্দী বলতে পারেন। বাকীরা কিছুটা বুঝলেও হিমাচলি ছাড়া আর কিছু বলতে পারেন না।

    তিনিই বলেন ওইদিকে গিয়ে একটু হাঁটলেই দেখবে মন্দির। ওটা পেরিয়ে আরেকটু হাঁটলেই খেতি আসবে, খেতি পেরোলেই পরীবন। আবার গলি বরাবর চলি। হিমাচলি কাঠের কাজকরা জানলা, দরজা, কাঠের বাড়ি। কিছু বাড়ি দেখেই বোঝা যায় এগুলো হোমস্টে, সে নামের বোর্ড থাকুক বা নাই থাকুক। তবে হোমস্টে না হলেও হিমাচলের এই সব গ্রামে এসে থাকতে চাইলে দুএকরাত গ্রামবাসীরাই কেউ না কেউ থাকতে দেন। হয়ত একবাড়িতে থাকা কারণ তার এক্সট্রা বালিশ কম্বল আছে, আর একবাড়িতে খাওয়া কারণ তার কাছে অতিরিক্ত একটা কি দুটো পেট ভরানোর সংস্থান আছে।

    পুলগা যা দেখলাম ইংরিজিতে যাকে বলে dreamy hamlet, একেবারে তাই। খানিক এগিয়ে মন্দির পৌঁছে দেখি দরজা বন্ধ। নারায়ণ মন্দির, গ্রামের লোকজন মনে করে স্বয়ং নারায়ণ গ্রামবাসীকে সর্বদা চোখে চোখে রাখেন, বিপদ থেকে রক্ষা করেন। স্থানীয় ভাষায় অবশ্য নারাইন বলেন এঁরা। চত্বরে চার পাঁচজন যুবক বসে গল্প করছিলেন, আমাকে এগোতে দেখেই সাবধান করেন মন্দিরের দেওয়ালে যেন হাত না দিই। চাইলে দূর থেকে সিঁড়ির ধাপে প্রণাম করতে পারি, কিন্তু সর্বোচ্চ ধাপে যেন পা বা হাত না দিই।


    নারাইন মন্দির - পুলগা

    জানা গেল সপ্তাহে একদিন পুরোহিত এসে দরজা খোলেন, পুজো করেন। বহিরাগতরা চাইলে সেদিন নির্দিষ্ট প্রণামী দিয়ে দর্শন প্রণাম ইত্যাদি করতে পারে। আমার প্রণাম ফনামের বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও ছিল না, তবে এরা আমায় একা মহিলা দেখে মুরগি করল কিনা এই খটকাটা ছিল। পরে নরেশজি বললেন অনেক বেশী ট্যুরিস্ট এলে ওসব অত খেয়াল রাখে না, তবে অল্প লোক থাকলে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকে বটে। ওরাই দেখিয়ে দিল পরীবনের পথ।


    পরীবন পরীবন

    পরীবন নামখানা সার্থক। পাইন আর দেওদার একদম ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে এমনভাবে মাথা তুলেছে যে আলো আর ছায়া কখনো কাটাকুটি খেলছে তো কখনো লুকোচুরি। পাইনের গাঢ় গন্ধ, দেওদারের ঘন বোতলসবুজ রঙ, আলোছায়ার চিকিমিকি আর হঠাৎ নেমে যাওয়া তাপমাত্রায় গায়ে শিরশিরানি ধরানো ঠান্ডায় ঘোর লাগে। মনে হয় ওই তো কুয়াশারঙা পরী ফুরুৎ করে ভেসে গেল। ওই ওওই যে পরীর ঝিকমিকে ডানাজোড়া নীচের আপেলবাগানের দিকে উড়াল দিল বুঝি বা।


    ঘোর লাগানো নেশা ধরানো পরীবন

    সকালে প্রথম সূর্য্যের আলোয় পরীবনকে নাকি এই জগতের বাইরের কোন অলৌকিক জায়গা মনে হয়। অপরূপ সেই আলোছায়ায় হেঁটে বেড়াতে দূর দুরান্ত থেকে মানুষ আসেন এখানে, বিদেশীই বেশী। কেউ কেউ রাত্রেও থেকে যান যদিও থাকার নিয়ম নেই। ঘটে দুর্ঘটনাও। গোটা পার্বতী উপত্যকায় হঠাৎ হারিয়ে যাওয়া বিদেশীর সং্খ্যা প্রচুর। সেসব ঘটনাকে ঘিরে সত্য মিথ্যায় মেশানো মিথও প্রচুর। মালানার দিকেই বেশী হলেও পরীবনের দিকেও কিছু আছে। ওই মন্দিরের সামনে বসা যুবকরাই জানিয়েছিলেন।


    পুঁচকে জলপ্রপাত

    বোধহয় ২ কিলোমিটার মত হাঁটার পরে একটা পুঁচকে জলপ্রপাতের সাথে দেখা হয়। প্রপাত বলে বোসো না একটু চুপটি করে, দেখো কেমন ঠান্ডা জল আমার। আমি বলি তুমি তো এইটুকুনি পুঁচকে। এগিয়ে দেখি আট্টু বড় কাউকে পাই কিনা। প্রপাত অভিমান করে বলে যাও না দেখো সেখানে কেমন গভীইর জঙ্গল। অনেকেই পথ চিনে ফিরতে পারে না, ভুলো হাওয়া তাদের এদিক ওদিক ঘুরিয়ে নিয়ে যায়, পরীরা তাদের লুকিয়ে রাখে। তা বটে কোত্থাও একটা মানুষ নেই আর মোবাইল নেটওয়ার্ক তো নেইই।

    খানিকক্ষণ বসে ওই পুঁচকে প্রপাতের সাথে খেলা করে ফেরার পথ ধরি। প্রপাত বলে আবার এসো সকাল সকাল, আমার ভাইবোনদের সাথে দেখা করে যেও। আর সাবধানে যাও এখানে অনেক বিছুটি গাছ। সত্যিই তো, আসার সময় খেয়াল করি নি এখন দেখি বনতল বিছুটিময়। কয়েকটার আবার রীতিমত কাঁটা কাঁটা পাতা। এই অঞ্চলে বিছুটিপাতার চাটনিও খায়। সুযোগ পেলে চেখে দেখতে হবে। পুলগা কালগা আর টুলগা তিন বোনের মধ্যে একজনের সাথেই দেখা হল সবে। এবারে যাই বাকী দুজনের খোঁজে।

    https://youtube.com/shorts/9FcSiAJj_k4?si=QECmYgg-BchZ1VAj
    কালগার পথ

    কালগা গ্রামে পৌঁছানোর সিঁড়ি সেই পার্বতী ড্যামের কাছে। প্রথম যে সিঁড়ির কাছে গেলাম সেখান দিয়ে তখন ওঠা সম্ভব নয়। টুপটাপ দুমদাম করে পাথর পড়ছে একটু ওপরে। রাস্তা থেকে তা দেখা যাচ্ছে না, মাঝে মাঝে আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। আর একজন গ্রামবাসী রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছেন সবাইকে সাবধান করে অন্য পথে পাঠানোর জন্য। আর একটু এগিয়ে একদম ড্যামের মুখটাতেই আরেকটা সিঁড়ি। ওই মাটিতে ধাপ কাটা, তবে বেশ সরু। পাশাপাশি দুজন যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

    বাঁধের পাশের বোর্ডে যদিও লেখা পার্বতী ড্যাম এন্ড হাইড্রো ইলেকট্রিক পাওয়ার তবে স্থানীয় লোকজন একে বারশৈনী ড্যামও বলেন। ক্ষীরগঙ্গা ট্রেকের শুরু এখান থেকেই হয়। মানে মোটরচালিত যান সে গাড়িই হোক কি বাইক এই পর্যন্তই আসে। এই সিঁড়ি থেকেই হাঁটা শুরু হয়। তোশ থেকেও রুদ্রনাগ জলপ্রপাত হয়ে ক্ষীরগঙ্গা যাবার একটা রাস্তা আছে, তবে সেটা অনেকটা লম্বা আর বেশিরভাগ পথেই গাছের ছায়া বিশেষ নেই। কালগা থেকে যে পথ যায় সেটা অপেক্ষাকৃত কম, পাইন দেওদারের জঙ্গলের বন্য সৌন্দর্য্যের মধ্য দিয়ে যাত্রাপথ।

    অমন চপলা চঞ্চলা পার্বতীকে বাঁধের বাঁধনে স্থির স্রোতহীন এক নিষ্প্রাণ সবুজ পাথরের মত পড়ে থাকতে দেখে বড় কষ্ট হল। ৮০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার এই কেন্দ্রের ৯ ১২% বিদ্যুৎ হিমাচল প্রদেশেই থাকে। বাকীটা গ্রিডের মাধ্যমে দেশের অন্যত্র যায়। হিমাচল মস্ত বড় রাজ্য, কতটুকুই বা স্থানীয় লোকজন পায়। অবশ্য বাঁধের অন্য উপযোগীতা যেটা, জলসেচ, সেটা এই বাঁধ প্রায় ২৪০০০ হেক্টর জমিতে করে। তাতে এলাকাবাসীর লাভ হয় বৈ কি। কি জানি পার্বতীকে না বেঁধে বা ছোট বাঁধ দিয়ে সোলার প্যানেল বসালে কি বেশী ভাল হত? এটা তো ঘটনা যে এত বাঁধের ফলেই হিমাচলে এত ধ্বস আর বিধ্বংসী বন্যা হয় এখন।

    এইসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতেই দেখি দুজন ভৌমশাই এসে আমাকে ভাল করে শুঁকছেন। একজন তো পারলে তখুনি গায়ে চড়ে পড়েন। রাস্তার পাশেই একটা ছোট চায়ের দোকান। দোকানি বলেন এদিকেও পাথর পড়ছিল এখন একঘন্টা বন্ধ আছে, এইবেলা ঝটপট উঠে যান। ক্ষীরগঙ্গা যাবেন তো কাল সকালে? বলি না না এমনিই বেড়াতে এসেছি। উঠব কিনা ভাবছি। আসলে একটু একটু ভয় করছিল। যদিও গ্রামের লোকজন জিনিষপত্র পিঠে নিয়ে দিব্বি উঠে যাচ্ছেন।

    দোকানি হাঁক দিয়ে বলেন এ কাল্লুবাবা দিদিকো গাঁও পৌঁছা দে। ওমা কালোসাদা ভৌবাবু উঠে এগিয়ে এসে প্যান্ট কামড়ে ধরেন আলতো করে। তিনি উচ্চতায় আমার পেট ছাড়িয়ে প্রায় বুকের কাছাকাছি। আমি চমকে সরে যাই খানিকটা। কাল্লুবাবা এবারে মুখোমুখী দাঁড়িয়ে আমায় দেখেন, চোখ মিটমিট করে, জিভ বেরিয়ে আসে অ্যাত্তখানি যেন হাসছেন। কি অপমান দ্যাখো দিকি! আমি ব্যাজার মুখে সিঁড়ির দিকে এগোই। কাল্লুবাবা মহা উৎসাহে পাশের ঢাল বেয়ে দৌড়ে গিয়ে আমার তিন ধাপ আগে আগে চলতে থাকেন।


    কাল্লুবাআবাআ

    এরপরে তো ওই হিমালয়ের সর্বত্রই ভৌমশাইরা যেমন করে, পথ দেখিয়ে চলা আর মাঝে মাঝে পেছন ফিরে দেখা আসছি কিনা। দাঁড়িয়ে গেলে পাশে এসে দাঁড়ানো বা বসে পড়া। তবে কাল্লুবাবা কোথাও আমায় ১ মিনিটের বেশী দাঁড়াতে দেন নি। অবশ্য গ্রাম পৌঁছাতে কুড়ি মিনিটের বেশী লাগেও নি। পুলগার মত ঘুমন্ত নয় কালগা। বেশ চনমনে, অজস্র হোমস্টে, বেশ কিছু ক্যাফে, খাবার দোকান, মুদিখানার দোকান, ভ্যারাইটি স্টোর্স। এখানেও গ্রামের গায়ে ঢাল বরাবর প্রচুর আপেলগাছ আর পাইনবন। সম্পূর্ণ মোটরযানমুক্ত হওয়ায় টাটকা তরতাজা পরিবেশ।


    কালগা

    ৮০০০ ফিট উচ্চতার কালগা থেকে ক্ষীরগঙ্গা ছাড়াও আরো বেশ কিছু ট্রেক শুরু হয় দেখলাম। বুনবুনি পাস ট্রেক (এটা বেশ চ্যালেঞ্জিং), সার পাস ট্রেক, পিন-পার্বতী পাস ট্রেক(এটাও কঠিন), তেওলা গ্লেসিয়ার হাইক, মানতালাই লেক ট্রেক। এর মধ্যে সার পাস ট্রেকটা নাকি গ্রাহাণ সার্কিটে পড়ে। গ্রাহাণে আমার আগামীকাল যাবার কথা। হোস্টেলে ফিরে ম্যাপটা দেখতে হবে তো। ট্রেক করানোর বেশ কিছু সংস্থাও দোকান সাজিয়ে উপস্থিত। সবমিলিয়ে কালগা বেশ জমজমাট।


    আপেল বাগান (নভেম্বরে এত সবুজ গাছ খুবই আশ্চর্য্যের ব্যপার)

    স্থানীয় এক মহিলা বলেন চলো চলো তোমায় জলপ্রপাত দেখিয়ে আনি। শুনলাম অবসর সময়ে এঁরা সকলেই লোকাল গাইডের কাজ করেন। চললাম তাঁর সঙ্গে। উনি দু:খ করে বলেন দ্যাখো তো এত দেরী করে এসেছ সব আপেল শেষ হয়ে গেছে। এখানকার আপেলের যা স্বাদ না, ও তুমি তোমাদের সমতলে পাবে না। কালগা গ্রামটার একটা মজা হল এত দোকান ক্যাফে ঘরবাড়ি সত্ত্বেও এদিক ওদিক করে খানিক এগিয়ে গেলেই একদম শান্ত নির্জন জনশুন্য এলাকা পাওয়া যায়। ওই জলপ্রপাতের কাছটাই যেমন, এক্কেবারে অন্য পৃথিবী।


    ওওই যে সেই কাঠের ব্রিজ

    কিন্তু জলপ্রপাত অবধি যেতে পারি না। জলপ্রপাতের জল বয়ে আনা নালাটা পেরোবার ব্যবস্থা হল একটা কাঠের ব্রিজ। আর সে ব্রিজটা ওই একমানুষ কি বড়জোর দেড়মানুষ চওড়া হবে। আর তার না আছে রেলিং না আছে নালার দুইপাশে কোন পিলার জাতীয় শক্তপোক্ত কিছু। দূর থেকে দেখেই মাথা বাঁই করে ঘুরে যায়। এ আমি একা পেরোতেই পারবো না, ভার্টিগো ট্রিগার করবেই করবে। দোরমাদিদি হাইকিং স্টিক দেখিয়ে বলে চলে এসো ওইটে ঠুকে ঠুকে এগিয়ে এসো, কুছ নেহি হোগা। না: থাক বাপু। এই বেশ আছি, চল ফিরি।


    হিমাচলি কাঠের কাজ করা হনুমান মন্দির - কালগা

    তিনবোনের তৃতীয়জন টুলগা গ্রাম ৭৯০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত খুব শান্ত প্রায় বিচ্ছিন্ন একটা গ্রাম। দোরমাদিদি বললেন পুলগা থেকে ৫ -৭ মিনিটের ছোট্ট একটা চড়াই চড়লেই টুলগা পৌঁছে যাওয়া যায়। কালগা থেকে টুলগার রাস্তাটা একটু দীর্ঘ, প্রায় ১৫ - ২০ মিনিট লাগবে। আমি মনে মনে হিসাব করে বুঝি পুলগা থেকে চড়াইটা খাড়াই হবে, বরং কালগা থেকে সামান্য উৎরাই বা পুরোটাই একই লেভেলে হবার কথা। কাজেই কালগা থেকে সহজ। কিন্তু আমার আজকে আর হাঁটতে ইচ্ছে করছে না। এবারে ফিরি।

    দোরমাদিদি অবশ্য বলছিলেন টুলগায় গিয়ে আজ রাত্তিরটা থেকে কাল সকালে আরেকটু ঘুরে ফিরে ফিরতে। টুলগায় হোমস্টে পাওয়া যায় ৫০০ টাকাতেই, রাতের খাওয়া সমেত। দিদি কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলেন এখন এই অফ সিজনে গিয়ে একটু বললেই ৩০০ টাকাতেও পেয়ে যাবো। খুবই লোভনীয় অফার নি:সন্দেহে। শীগগিরই আবার আসবো, কয়েকদিন থাকবো বলে নামার পথে এগোই। কাল্লুবাবা কোত্থেকে দৌড়ে এসে হাঁটুতে মাথা ঘষে ল্যাজ ট্যাজ নেড়ে একমুখ হাসি নিয়ে ঠিক তিন ধাপ আগে আগে নামতে শুরু করেন।

    রাস্তায় নেমে চায়ের দোকানে বসে চা আর মোমো দিতে বলি। কাল্লুবাবা এসে গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। দোকানী কুন্ঠিত হয়ে বলেন শুধু চিকেন মোমো হবে, ভেজ নেই। সে তো খুবই ভাল কথা। নরেশজিকে ডাকতে তিনি এসে জানান ইতোমধ্যেই ৩ কাপ চা খাওয়া হয়ে গেছে আর ভেজমোমোর শেষ প্লেটটা উনিই খেয়ে ফেলেছেন। দোকানীকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি কাল্লুবাবাকে ওঁরা সবাই মিলে কিছুটা ট্রেনিং দিয়েছেন, তবে সে সামান্যই। নিজের বুদ্ধিতেই ও ট্যুরিস্টদের গাইড করে নিয়ে যায় নিয়ে আসে।

    ফেরার সময় বাঁধ এলাকা ছাড়াতেই পার্বতী আবারো একেবারে নাচতে নাচতে, শেষবেলার সূর্য্যের সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলতে খেলতে চলল সঙ্গে সঙ্গে। নরেশজিকে জিজ্ঞাসা করি এই গ্রামগুলোতে মানুষের সিরিয়াস অসুখ বিসুখ হলে কী করে? বললেন বেশীরভাগ ‘'বৈদ্যজি'র কাছে জড়িবুটি, আয়ুর্বেদ চিকিৎসা করায়। খুব সিরিয়াস কিছু হলে চেয়ারে বসিয়ে বা মোটা কম্বলে শুইয়ে চারপাঁচজন মিলে নামিয়ে আনে গাড়ির রাস্তা পর্যন্ত।

    তারপর নিয়ে যায় মণিকরণ বা কুলুতে। এমনকি কাসোলেও কোন হাসপাতাল নেই। নরেশজির মেয়ের পা ভেঙেছিল দুই বছর আগে। এক্সরে থেকে প্লাস্টার করা, অপারেশান, প্লাস্টার কাটা সবই কুলুতে নিয়ে করাতে হয়েছে। আমি স্পিতি ঘুরেছি শুনে বলেন আরেকবার চলো আমার অল্টোয় চড়ে স্পিতি ঘুরে আসবে। হেসে বলি নিশ্চয়ই। বাপরে কুঞ্জুম পাস আর গ্রাম্ফু থেকে বাতাল অল্টোয় চড়ে পেরোচ্ছি ভেবেই গা হাত পা ব্যথা করতে থাকে। ওসব হবে না সে তো উনিও জানেন আমিও জানি।


    কাসোলে গোধুলি

    হোস্টেল থেকে রাত সাড়ে আটটা নাগাদ বেরোই রাতের খাবার খেতে। ইচ্ছে ছিল মুনড্যান্স ক্যাফে, কিন্তু জব্বর ঠান্ডা তাই সামনেই একটা বড়সড় পাঞ্জাবী রেস্তঁরা দেখে ঢুকে পড়ি। তন্দুরি রুটি আর চিকেনের একটা পাঞ্জাবী প্রিপারেশান খেয়ে শীতটা কমে। শুনশান রাস্তায় একটু হাঁটাহাঁটি করে হোস্টেল। সামনের উঠোনে একটা ড্রামের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে হাত সেঁকছে নিট্টুরা সবাই। ঘরে ফিরে ছবি ভিডিওগুলো দেখি। পরীবন ছেয়ে যায় সমস্ত চেতনা জুড়ে। ধীরে ধীরে ভিডিও, কিছু ছবি ডিলিট করি একসাথে। টিক টিক টিক টিক ডিলিট। থাক কিছু কিছু জায়গা, কিছু মুহূর্ত্ত শুধু স্মৃতিতেই থাক।

    কাল যাবো গ্রাহাণ।

    (পরের পর্বে সমাপ্ত)
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ভ্রমণ | ০২ জুলাই ২০২৬ | ৬৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে মতামত দিন