এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হেদুয়ার ধারে - ১৬ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৮ আগস্ট ২০২৩ | ৪০৪ বার পঠিত
  • সকাল ছটা বাজল। একতলার তিনদিকে বারান্দা। আর একদিকে দেয়াল। মাঝখানে ছোট্ট শান বাঁধানো উঠোন। তোলা উনুনে কয়লার আঁচ ধরিয়ে উঠোনের মাঝখানে বসিয়ে দিয়েছে অঞ্জলি। গলগল করে ধোঁয়া উড়ে যাচ্ছে ওপর দিকে। রোজই যায়। মিনিট দশেকের জন্য চোখ জ্বালা জ্বালা করলেও কিছু করার নেই। সব বাড়িতেই চুলোয় আঁচ ধরানো হয়েছে। উনুন ধোঁয়া উগরে দিচ্ছে গলগল করে। সবাই এতে অভ্যস্ত। যে বাড়িতে আপিসবাবু নেই সেখানে একটু বেলার দিকে রয়েসয়ে আঁচ ধরবে। এ হল কলকাতার গেরস্থর বারোমাস্যা।

    নিতাইবাবু কলতলায় গিয়ে দাঁত মেজে এলেন। উনুন ধরে গেলে অঞ্জলি চা বসাবে। নিতাইবাবু চা খেয়ে বাজারে যাবেন। পৌনে দশটা নাগাদ অফিসে বেরোন তিনি। একটু আগে পরে ছেলেমেয়েরা স্কুলে বেরিয়ে যায়। কাল সন্ধেবেলা নিবারণ সাহা এসেছিল বাঙুরের কাছে একটা জমির খবর নিয়ে। সামনের রবিবার দেখাতে নিয়ে যাবে।

    অফিসে শরৎ ঘোষাল কাল বললেন, ' বাঙুর বড্ড জলা জায়গা। ওর পাশে অবশ্য লেকটাউন বলে একটা জায়গা হয়েছে। বেশ ডেভালাপ করেছে। ওখানে জমির দাম বেশ ভালই হবে। যাক তুমি বাঙুরেই দেখ না। বাঙুর বা কালিন্দী। ওখানেও মনে হয় তাড়াতাড়িই ডেভালাপ করবে। গভর্নমেন্ট তো দেখছে ... '।
    ----- ' দেখি কি হয় ... হেদুয়ার ও পাড়া ছেড়ে কোথাও যেতে মন চায় না ... ছেলে মেয়েরাও যেতে চায় না ... কিন্তু উপায় নেই ... ভবিষ্যতের কথা ভেবে .... কি যে করি ... ' , নিতাইবাবু বলেন।
    ----- ' আরে অত চিন্তা কর না .... আগে জমিটা তো কেন। বাড়ি নয় পরে করবে। টাকাটা কিন্তু বুঝেসুঝে খরচ কোর ... তোমার তো আবার মেয়ের বিয়েও দিতে হবে। খুব সামলে চল। বেশি ফালতু চিন্তা কোর না ... '
    ----- ' হ্যাঁ ... ঠিকই। বেশি চিন্তা করে লাভ নেই। আগে জমি তো ঠিক হোক ... '

    নিতাইবাবু ভাবলেন শ্রীলেখার অঙ্কের মাস্টারের মাইনেটা আজকে দিতে হবে। মাসের পাঁচ তারিখ হয়ে গেল ... মাস্টারমশাই কি ভাবছে কে জানে ... আশ্বিন মাস পড়ে গেছে। শেষ রাতের দিকে হিম পড়ছে। ফ্যানের হাওয়া ঠান্ডা ঠান্ডা লাগে। গায়ে একটা চাদর টেনে নিতে হয়।
    বিডন স্ট্রীট আর সিমলা ব্যায়াম সমিতির পুজোর প্যান্ডেলের বাঁশ বাঁধা হচ্ছে।
    নিতাইবাবুর মনে পড়ল ছোটবেলায় এইসময়ে বাগবাজারের কুমোরটুলিতে গিয়ে ঠাকুর গড়া দেখতেন তারা ক'জন বন্ধু মিলে সকালের দিকে। তারপর গঙ্গায় সবাই মিলে সাঁতার কেটে দুপুরবেলা বাড়ি ফিরতেন। তখন অবশ্য রামদুলাল সরকার স্ট্রীটে থাকতেন না। তখন নিতাইবাবুরা থাকতেন গিরিশ এভিনিউয়ের ধারে বলরাম মন্দিরের কাছে। ওর দুহাত দূরে নিবেদিতা লেন। ওটাই গঙ্গার বটতলা ঘাটে যাবার সোজা রাস্তা ছিল নিতাইবাবুদের। নিতাইবাবু বিয়ের পর হেদুয়ার ধারে বিভূতিবাবুর বাড়ি চলে এলেন। বাবা মা ওই বলরাম মন্দিরের কাছেই রইলেন। বাগবাজারের ওই ছোট বাড়িতে জায়গা হচ্ছিল না। একে ছোট বাড়ি, তারপর এস জন বস জন লেগেই থাকত। বোন ভগ্নীপতি তো আছেই, আরও কত জ্ঞাতগুষ্টি ... আসা যাওয়া লেগেই থাকত। বছর দুয়েকের মধ্যে নিতাইবাবুর বাবা মা দুজনেই দেহ রাখলেন। ওই বাড়ি ছেড়ে দেওয়া হল। নিতাইবাবু হেদুয়ার ধারে পুরোপুরি থিতু হয়ে গেলেন।

    আঁচের আগুন রোজকার মতো ক্রমশ উনুনের ওপর দিকের কয়লায় উঠে এল। অঞ্জলি উনুন তুলে নিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল। নিতাইবাবু চায়ের জন্য বসে আছেন। চা খেয়ে বাজারে যাবেন।

    কমন রুমে বসে সুমনা কাবেরীকে বলল, ' কিরে ... কফি হাউসে কি হল ? '
    ----- ' আর বলিস না ... ওঃ অসহ্য ... '
    ----- ' কেন, কি হল ? '
    ----- ' যত্তসব আঁতলামো ... জাস্ট নেওয়া যায় না ...আমার তো ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি অবস্থা ... '
    সুমনা চুপ করে শুনছিল কাবেরীর মুখের দিকে তাকিয়ে।
    কাবেরী আবার বলল, ' এমনিতে ওরা ভাল। খারাপ কিছু না। কিন্তু ওরা কি সব ম্যাগাজিন ট্যাগাজিন বার করবে ওতে ইনভলড হওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। ওসব আমার দ্বারা হবে না। যতসব অবস্কিওর ব্যাপার। আমি ওসব বুঝি না .... '
    ------ ' তুই কবিতাটা নিলি যে .... '
    ------ ' তাতে কি হয়েছে? সুপ্রীতির ঝোলাঝুলির জন্য তো ব্যাপারটা হল। অমিতাভ বলে ছেলেটা একরকম বাধ্য হয়েই ... আর আমার দিক থেকে তো কোন প্রশ্নই নেই ... কবিতাটা অবশ্য ভাল ছিল ... যাকগে, ওসব বাদ দে। অনেকদিন হেদুয়ায় রাউন্ড মারিনি। চল আজ অফ পিরিয়ডে ... তিনটের সময় ... '
    সুমনা কেমন যেন আনমনা হয়ে গেল। কোন অজানা কারণে তার মনে হেদুয়া সম্পর্কে ঔদাসীন্য দেখা দিল। এটাও হতে পারে কাবেরীর সঙ্গে হেদুয়ায় ঢুকতে একটা আবছা অনীহা জন্ম নিয়েছে।
    সে বলল, ' নাঃ আজ থাক ... শরীরটা ভাল লাগছে না। আজ একটু রেস্টে থাকব। ঘোরাঘুরি করতে ভাল লাগছে না ... '
    ------ ' ও আচ্ছা .... ঠিক আছে, আজ তা'লে ছেড়ে দে। সাবধানে থাকিস ... সিজন চেঞ্জ হচ্ছে ... '
    সুমনা বলল, ' চল ক্লাসে চল ... '

    নিতাইবাবু কর্ণওয়ালিস স্ট্রীটে ওপারে গিয়ে দাঁড়ালেন অফিসের বাস ধরার জন্য। শ্রীলেখা আর অনিমেষ ভাত খেতে বসেছে। ভাত খেয়ে ইস্কুলে যাবে।
    ওদিকে কোন রাস্তার বাড়ির ছাদে মাইক লাগিয়েছে। অষ্টপ্রহর নাম সংকীর্তন হচ্ছে সারা পাড়া মাতিয়ে। একদল কীর্তনীয়া ক্রমাগত গেয়ে চলেছে --- হরি হরায় নম কৃষ্ণ যাদবায় নম/ যাদবায় মাধবায় কেশবায় নম .... গোপাল গোবিন্দ নাম শ্রী মধুসূদন .... বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। মাধব কর্মকারের মা মারা গেছেন। আজ পারলৌকিক অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন হচ্ছে।

    একটা ঘুড়ি কেটে গিয়ে বাতাসে দুলে দুলে নেমে আসছে। ধাবমান জনা পাঁচ ছয় ছেলেপুলেকে হতাশ করে কাটা ঘুড়িটা ক্রমশ হেদোর জলের দিকে নেমে আসতে লাগল।

    রামদুলাল সরকার স্ট্রীট দিয়ে হেঁটো ধুতি পরা মাথায় গামছা বাঁধা ঝোলা গোঁফওয়ালা একটা আধবুড়ো রোগাটে লোক যাচ্ছে গিরীশ পার্কের দিকে সকাল এগারোটার রোদ্দুর গায়ে মেখে মেখে।
    যেতে যেতে হাঁক পাড়ছে ---- শি..ল কাটা..ও শিই.. ইল কাটা... শি..ল ..কাটাও ....
    অঞ্জলি হাতের কাজ ফেলে তড়িঘড়ি বাইরে এল।
    ----- ' ও .... শিলকাটা .... ও শিলকাটা ... এই যে ... এদিকে ... এদিকে ... '

    ( চলবে )

    ********************************************
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন