এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হেদুয়ার ধারে - ৭৮

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৭ জানুয়ারি ২০২৪ | ১৯৪ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • কালীময় ভট্টাচার্য প্রাথমিকভাবে সবকিছু পরীক্ষার পর বললেন, ' জেনারেল প্যারামিটার তো সব ঠিকই আছে মনে হচ্ছে। শুধু ব্লাড প্রেসারটা একটু হাই আছে ... একশ পঞ্চাশ বাই পঁচাশি। সেটা হয়ত টেমপোরারি কোন স্ট্রেস থেকে হতে পারে। ভয় পাবার কিছু নেই। আর স্বপ্ন টপ্নর কথা তো ওনার কিছু মনেও নেই। ও হ্যাঁ .... সাইকিয়াট্রিস্ট গোবিন্দ সেনের সঙ্গে কনট্যাক্ট করেছিলেন নাকি ? '
    ------ ' ন্না ... করা হয়নি। আসলে এর মধ্যে তো আর ওরকম কিছু ঘটেনি ... তাই ... ডক্টর সেন কোথায় বসেন যেন বললেন ? ' মাণিকবাবু বললেন।
    ------ ' ওই তো ...ভূপেন বোসে, শ্যাম পার্কের কাছে। বাড়িতেই চেম্বার ... '
    ----- ' আচ্ছা, ঠিক আছে, দেখছি ... একটা অ্যাডভাইস নেওয়া যেতে পারে ... এরকম অদ্ভুত ব্যাপার কেন হবে। '

    গোবিন্দ সেনের চেম্বারে মাণিকলাল এবং কাঞ্চন দুজনেই গেল। দুজন একসঙ্গেই চেম্বারে ঢুকল। ডাক্তারবাবু আগাগোড়া বৃত্তান্ত শুনে বললেন, ' এক ধরণের অবসেসিভ পার্সোনাল ডিসঅর্ডার হয়েছে আপনাদের। একটা অ্যান্টি
    ডিপ্রেস্যান্ট ট্যাবলেট দিচ্ছি। কিন্তু এই উইকনেসটা ওষুধ দিয়ে বাইরে থেকে ঠিক করা যাবে না। এটা ভেতর থেকে ঠিক করতে হবে পেশেন্টকে নিজেকেই। '
    ----- ' মানে ? '
    ----- ' আপনারা বুঝতে না পারলেও, ক্লকটা আপনাদের সাবকনশাস মাইন্ডে মানে অবচেতনে এগজিস্ট করছে। অবচেতনের থট ওয়েভ ঘুমের সময়েই অ্যাক্টিভ হয়, যখন কনশাস মাইন্ড ডরম্যান্ট এবং ইনঅ্যাক্টিভ স্টেজে থাকে। মানে, মনের তলায় থিতিয়ে পড়ে। এখন, এ ধরণের প্রবলেমে যেটা করার দরকার ... সাবকনশাসের মরবিড থট ওয়েভগুলো অন্য কোন চিন্তা ভাবনা দিয়ে রিপ্লেস এবং রিমুভ করতে হবে। কিন্তু সমস্যা হল, অবচেতন স্তরে কোন কোন থট ওয়েভ বাসা বেঁধে থাকবে, সেটা আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ওটা আমরা ফিজিক্যালি মোবাইল থাকার সময় কিছু জানতেও পারি না, আগে থেকে বুঝতেও পারি না। '
    ----- ' তাহলে কি হবে ডাক্তারবাবু ? ' কাঞ্চন উৎকন্ঠিত প্রশ্ন করে।
    ----- ' ঘড়িটা এখন কোথায় ? ' গোবিন্দ সেন জিজ্ঞাসা করলেন।
    ----- ' ওটা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের ঘড়িবাবু ওটা নিয়ে গেছে। ' মাণিকলাল বললেন।
    ----- ' ও আচ্ছা ...। ঘড়িটা আবার ফিরিয়ে আনুন এবং যেখানে ছিল খারাপ হওয়ার আগে সেখানে আবার লাগিয়ে দিন। '
    ----- ' এতে সুবিধে হতে পারে বলছেন ? '
    ----- ' হ্যাঁ পারে। ওটাকে সবসময় ওখানেই দেখতে থাকুন। ঘড়িটার আপনাদের ইনফ্লুয়েন্স করার কোন ক্ষমতা নেই। ওটা একটা নিষ্প্রাণ যন্ত্র মাত্র, তাও আবার এখন ডিফাংক্ট।
    অ্যাজ এ ম্যাটার অফ ফ্যাক্ট, আপনারা নিজেরাই নিজেদের ইনফ্লুয়েন্স করছেন। ঘড়িটাকে আপনাদের সাবকনশাস স্টেট থেকে কনশাস স্টেটে নিয়ে আসতে হবে বাই মেনটেনিং পারপিচুয়াল অ্যাসোসিয়েশন উইথ দা ক্লক, যাতে ঘুমন্ত অবস্থায় কোন হ্যালুসিনেশান উঠে না আসে সাবকনশাস লেভেল থেকে। বোঝাতে পারলাম কি ? '
    ----- ' হ্যাঁ বুঝেছি মোটামুটি ডাক্তারবাবু ... তা হলে মোদ্দা কথা হল, ঘড়িটাকে আবার যথাস্থানে পুনপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে, তার কোন কাজ থাকুক আর না থাকুক, শুধু চোখের দেখা দেখার জন্য। ' কাঞ্চন বলে উঠল।
    ----- ' ইয়েস ... শিওর শিওর... এর ফলে ঘড়িটা আপনাদের অবচেতন থেকে চেতনস্তরে উঠে আসতে পারে। এতে আপনাদের পজেজিভ ডিসঅর্ডার রিমুভড হবে আশা করি। এতে কাজ না হলে অন্য উপায় ভাবতে হবে। '
    ----- 'ও আচ্ছা ... দেখি কি হয় ... ঘড়িটা বাড়িতে ফেরত আনি তা'লে ... ' মাণিকবাবু বললেন।
    ----- ' ইয়েস ... শিওর শিওর ... ' ডাক্তারবাবু আবার বললেন।

    দুপুর বারোটা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে জন্মেজয়বাবু গঙ্গাপদর দোকানের বেঞ্চে গিয়ে বসলেন। গঙ্গার সঙ্গে তার বেশ একটা আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। এখানে বসে বসে চায়ের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে নানা সাধারণ লোকের আনাগোনা, বেচা কেনা দেখতে বেশ লাগে তার।
    গঙ্গা পাল্লায় মুগের ডালের মাপতে মাপতে বলল,
    ' মেশোমশাইকে এ ক'দিন দেখতে পেলাম না যে ... কোথাও গিয়েছিলেন নাকি ? '
    ----- ' আরে না না ... কোথায় আবার যাব ... বাড়িতেই সিলাম। শরীলডা ক'দিন ধরে ভাল নাই। তেমন জুত লাগতাসে না। আর ... বয়স তো কম হইল না ... সেদিন নিতাইবাবুর বাড়িতে পিকনিকেও যেতে পারলাম না ... '
    ----- ' তাই নাকি ... শরীর খারাপ ? অবহেলা করবেন না ... কালীময় ভটচাজকে দেখিয়ে নিন একবার। বিডন স্ট্রিটে বসে ... খুব ভাল ডাক্তার।'
    ----- ' আরে না না ... ডাক্তার দেখাইতে লাগব না ...একটু ঘুসঘুসা জ্বরের মতো ... এখন ঠিক আছি। কথায় কথায় ডাক্তার দেখানোর বিলাসিতা কি আমাদের সাজে ... অখিলের উপুরেই তো পুরা সংসার। কি করে পেরে উঠব ছ্যামরা ... আমার পিছনে টাকা ঢাইল্যা আর লাভ নাই... আমি এখন ভালয় ভালয় গেলেই ভাল ... বুঝলা ... '
    ----- ' না না ... মেশোমশাই, ও কথা বলবেন না। আপনাদের মতো লোক চলে গেলে আমরা কাদের নিয়ে থাকব। আপনি, বিভূতিবাবু, নিতাইবাবু ... এসব লোক আর পাব কোথায় ? এখনকার লোক তো সব ... কি আর বলব ... চা খাবেন তো ? '
    ----- ' হ্যাঁ তা ... '
    ----- ' আনাচ্ছি বসুন ... কাল তো স্বাধীনতা দিবস গেল ... '
    জন্মেজয়বাবু উদাস দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ' হুমম্ ... এক যুগ কোথা দিয়া কাইট্যা গেল ... আমি এখন কপর্দকশূন্য... '
    তার একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল।
    ----- ' দুঃখ করবেন না মেশোমশাই .... সুদিন আবার ফিরবে। ধাক্কা সবার জীবনেই আসে। '
    ----- ' আমার আর সুদিন ! আর ক'দিনই বা আসি।
    সন্তান সন্ততিরা যদি একটু সুখে থাকে এইটুকুই ইসসা। আর কিসু আশা করি না ... '
    দু গ্লাস চা এল। একটা গঙ্গা নিল, আর একটা জন্মেজয়ের দিকে এগিয়ে ধরে বলল, ' নিন মেশোমশাই ... '
    দোকানে খদ্দের এসে দাঁড়িয়েছে। চায়ে একটা চুমুক দিয়ে গ্লাসটা নামিয়ে রেখে খদ্দেরের দিকে মন দিল গঙ্গা। জন্মেজয়বাবু চা খেতে লাগলেন রাস্তার দিকে তাকিয়ে।
    সাড়ে বারোটা বাজতে চলল।
    খদ্দের পাতলা হলে জন্মেজয়বাবু আবার বললেন, ' সবই কপাল, বুঝলে গঙ্গা ... সবই কপাল। নাহলে এই অবস্থা হয়। ইনডিপেনডেন্স ডে এলেই আমার যেন বুক কাঁপতে থাকে। নেতারা মিলে কি যে করল ... হায় ! আমাদের মতো লোকের কথা একটু চিন্তা করল না। কি সব মার দাঙ্গা দেখসি, সে সব তোমরা চিন্তাও করতে পারবা না...
    তাও তো এতদিন মানায়ে নিয়া সিলাম ... কিন্তু আর পারা গেল না ... নাহলে শখ কইরা কেউ দেশ গাঁ, ভিটেমাটি সাড়ে .... কপাল, সবই কপাল ... '
    জন্মেজয়বাবুর সঙ্গে পরিচয় হওয়া ইস্তক গঙ্গাপদ তার মুখে বহুবার এই কথাগুলো শুনেছে। কিন্তু সে বারবার একই কথা শুনেও বিরক্ত বোধ করে না। তার বয়স কম হলেও সে অনুভব করতে পারে যে বৃদ্ধ জন্মেজয়বাবুর হৃদয়ের গভীর অন্তস্তল থেকে বিরামহীন মনোবেদনার শলা বিদ্ধ হয়ে পাক খেয়ে খেয়ে বারে বারে উঠে আসছে কথাগুলো। এসব একঘেয়ে কথা শোনার লোক বেশি নেই।
    গঙ্গাপদর মতো সহ্যশীল শ্রোতা পেয়ে জন্মেজয়বাবু তার মনের আগল খুলে দেন।

    গঙ্গার এ বেলার মতো দোকান বন্ধ করার সময় হল। সে বলল, ' আপনাদের পরিবারের সবাই সামনের রবিবার আমার বাড়িতে আসুন না .... দুপুরবেলায় গরীবের বাড়িতে চাট্টি ডাল ভাত খাবেন ... হেঁ হেঁ ... দোকানের পেছনেই আমার বাড়ি ... জানেন তো মেশোমশাই ? '
    ----- ' হ্যাঁ, তা জানি ... '

    ( চলবে )

    ********************************************
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত প্রতিক্রিয়া দিন