এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হেদুয়ার ধারে - ৩১ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৫ অক্টোবর ২০২৩ | ৩৫৮ বার পঠিত
  • বিসর্জনের দিন রামদুলাল সরকার স্ট্রিটের এক পরিবারে সত্যিই বিসর্জনের বাজনা বেজে উঠল।
    সপ্তমীর দিন বাগবাজার সার্বজনীনের মাঠে অনিমেষের বলা ' ওরকম বলিস না ... কোন কথাটা যে লেগে যায় কেউ বলতে পারে না ... ' একদম অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল। পাড়ার বয়স্ক বাসিন্দা সংসারনাথ মুখোপাধ্যায় অকস্মাৎ ইহলোক ত্যাগ করলেন ভোরের বেলায় বিনা নোটিসে হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে। বেথুনের গীর্জার পাশে তখন ভূষণ সিং-এর ছড়ানো গমের দানা খুঁটে খুঁটে খাচ্ছে ছটফটে এক ঝাঁক পায়রা। প্রায় মাঝরাত পর্যন্ত স্বরবিতানের পর এখন ঘুমোচ্ছে মাইকগুলো।
    সকাল সাতটার মধ্যে সারা পাড়া জেনে গেল। অনিমেষ দাঁত ব্রাশ করতে করতে খবরটা পেল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সংসার জেঠুর গোগ্রাসে তেলেভাজা খাওয়ার দৃশ্য। তিনি তো জানতেনই না, তিনি পুজোর পরে আর থাকবেন না। বিভূতিবাবু গায়ে পাঞ্জাবী গলাতে গলাতে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন। বেরোবার মুখে হাঁক পেড়ে গেলেন ---- ' নিতাইবাবু .... খবর শুনেছেন তো .... '
    নিতাইবাবু বললেন, ' হ্যাঁ ... শুনেছি শুনেছি ... আপনি এগোন ... আমি এই যাচ্ছি ... '

    মানুষ চলে গেলে নানা কথা মনে পড়তে থাকে, যেসব কথাগুলোকে প্রাপ্য গুরুত্বই দেওয়া হয়নি কখনও। কোন কথা কাটাকাটি বা মনোমালিন্যের স্মৃতি আফশোষ জাগিয়ে তোলে মনে। কখনও অনুতাপের কাঁটা খচখচ করতে থাকে। মনে হয়, কিছু কিছু কথা না বললেই ভাল হত। কিন্তু জীবন ওরকম নিখাদ নির্ভুল হয় না। হতেই পারে না। স্বেচ্ছায় বা অজ্ঞাতে, বুঝে বা না বুঝে মানুষ বারংবার ভুল করে যেতে থাকে। যখন চেতনা ফেরে তখন আর ফিরে আসার কোন রাস্তা নেই।
    সংসারনাথবাবু নিজের জীবনের অনেক দুঃখ সযত্নে চাপা দিয়ে রাখতেন এ কথা অনেকেই জানে। কিন্তু কেউই কখনও যত্নশীল হয়নি সে কষ্টে প্রলেপ দেওয়ার, বরং আড়ালে ব্যাঙ্গ বিদ্রূপের সহজ পাত্র ছিলেন সংসারনাথ। তাদের কারো কারো মনে এখন গোপন অনুতাপ মাথা চাড়া দিল। এর মধ্যে তার নিজের পরিবার পরিজনও আছে। নিজের কাছ থেকে তো আর নিজে পালানো যায় না। কাজেই কৃতকর্মের জন্য অনুতাপে পুড়তে হয় একা একা।
    নিমতলাঘাট শ্মশানে পাড়া থেকে অনেক লোক গেল। অনিমেষ আর সমীরণও শ্মশানযাত্রী হল। নিতাইবাবু,বিভূতিবাবু গেলেন না। তারা সংসারনাথের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তারা একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন সংসারনাথের এ সংসার থেকে প্রস্থানপথের দিকে। সকাল প্রায় দশটা এখন।
    সন্ধেবেলায় বিবেকানন্দ স্পোর্টিং-এর ঠাকুর বেরোল ভাসানের জন্য। আগে আগে চলেছে হল্লাবোল তাসা পার্টি। হালে এদের খুব রমরমা হয়েছে কলকাতায়। তার সাথে চলছে উন্মত্ত ধুনুচি নাচ। ধোঁয়ায় ধোঁয়াকার আশপাশ। চোখ জ্বালা
    করছে। গোল করে লোক দাঁড়িয়ে আছে। এ বছরের জন্য মহোৎসবে ইতি পড়ল। স্কুল পড়ুয়াদের বড্ড মন খারাপ এখন। একে তো দেদার ফুর্তির দিন ক'টা মাদুর গুটিয়ে নিল। তার
    ওপর এবার অ্যানুয়াল পরীক্ষার খাঁড়া ঝুলতে আরম্ভ করবে। কালিপুজোর পর্ব মিটে গেলেই স্কুলে স্কুলে হাড় হিম করা অ্যানুয়াল পরীক্ষার সাইরেন বাজবে।
    সমীরণ দেবসাহিত্য কুটিরের পূজাবার্ষিকীটা কিনেছে। সমীরণের বাবা পাঁচ টাকা দিয়েছিল সমীরণকে। ওই একটা বই তিন বন্ধু পালা করে করে পড়বে। ঘনাদার কি গল্প এল এবার সেই নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই।
    আনন্দের স্রোতটা কালিপুজো অব্দি বেশ বয়ে চলে। লক্ষীপুজোর পরেই পাড়ায় পাড়ায় রাতজাগা জলসার ঢেউ উঠবে। অখিলবন্ধু ঘোষ, সুবীর সেন, নির্মলেন্দু চৌধুরী, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, নির্মলা মিশ্রদের ব্যস্ততা বাড়বে চতুর্গুণ। ভোরবেলায় নিভে যাবে জলসার দীপ। ঘুমের মতো কোলাহলহীন হয়ে যাবে পাড়াখানা। তখন হয়তো দিনের প্রথম ট্রাম ডিপো ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে আড়ামোড়া ভাঙতে ভাঙতে। ব্যাপারীরা সবে মাল নামাচ্ছে আধঘুমন্ত বাজারগুলোয়। চাপাকলের জল দিয়ে হোসপাইপে ধোয়া হচ্ছে কলকাতার শুনশান রাস্তাগুলো।

    বিভূতিবাবু মাথা নীচু করে নীচু স্বরে বললেন, ' জীবন তা'লে খালি হতে শুরু করল এ জন্মের মতো ... কি বলেন ? '
    নিতাইবাবু বললেন, ' সে আর বলতে। ছোট হয়ে এল বেলা ... বুইলেন বিভূতিবাবু ... '
    ---- ' হমম্ ... তবে সংসারনাথবাবু আরও ক'টা দিন হয়ত বাঁচতেন .... কিন্তু .... '
    ----- ' বাঁচানোর লোকই ছিল না যে .... '

    পরমানন্দবাবু হৃষ্টচিত্তে একটা গানের কলি গুনগুন করতে করতে বাড়ি ঢুকলেন। হাতে একটা ছোট ব্যাগে নবলব্ধ দলিল দস্তাবেজ।
    তিনি সোজা প্রতিবিম্বর ছোট ঘরটায় গেলেন। প্রতিবিম্ব বিছানায় বসে পড়াশোনা করছিল। পরমানন্দ ঘরে ঢুকে বললেন, ' কিরে ... কি করছিস ? স্যারের কাছে পড়তে যাসনি ? '
    ----- ' হ্যাঁ গিয়েছিলাম। একটু আগে ফিরেছি। তারপর বল, কি হল ওখানে ... '
    ----- ' আরে কি বলব ... আমি চিন্তাই করতে পারিনি .... মিস্টার মিত্র এর মধ্যেই সমস্ত কিছু রেডি করে ফেলেছেন। আমাকে সব দিয়ে দিলেন ... এই যে ... ', বলে পরমানন্দবাবু তার ব্যাগ থেকে কাগজপত্র বার করতে যাচ্ছিলেন ভাগ্নেকে দেখাবার জন্য।
    প্রতিবিম্ব বলল, ' মামা থাক থাক ... পরে দেখব'খন ... '
    ------ ' আর, কি বলব .... দেবতুল্য মানুষ একেবারে .... '
    ------' কিরকম ?
    ----- ' একটি পয়সা নিলেন না .... '
    ------ ' সেকি ! কেন ... কেন ? '
    ------ ' কি জানি, সেটাই তো ঠিক বুঝতে পারলাম না .... বললেন, কিছু বলা তো যায় না ...'
    ----- ' কি বলা যায় না ? '
    ------ ' বললেন, আপনার সঙ্গে হয়তো একটা পাকা সম্পর্ক হয়ে গেল .... আমার মাথায় আসছে না আমার মতো একটা ছাপোষা লোকের সঙ্গে ওনার মতো লোকের সম্পর্ক হবেটা কি করে ! '
    ------ ' তুমি কিছু জানতে চাইলে না ? '
    ----- ' না, তা ঠিক চাইনি .... তবে বলেছিলাম, আমরা গরীব মানুষ ... '
    -----' তখন কি বললেন ? '
    ------ ' ও..ই যে .... কি যেন ... পৃথিবীর সবকিছু নাকি টাকা দিয়ে কেনা যায় না ... এমন কোন জিনিস আছে নাকি রে ? '
    প্রতিবিম্ব মাথা নীচু করে বইয়ের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল, ' ঠিকমতো জানতে পারিনি এখনো ... জানতে পারলে নিশ্চয়ই তোমায় জানাব ... '

    ( চলবে )
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে প্রতিক্রিয়া দিন