এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হেদুয়ার ধারে - ৬৫ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১১ ডিসেম্বর ২০২৩ | ৩২৩ বার পঠিত | রেটিং ৪ (১ জন)
  • ইউনিফর্ম পরা সেন্ট মার্গারেটের মেয়েরা ঢুকছে স্কুলের ভিতরে। বাইরে কিছু ছাত্রীর মায়েরা তাদের মেয়েদের লেখাপড়া সংক্রান্ত ব্যাপারে গুরুগম্ভীর আলোচনা করছে। দুটো রিক্শাওয়ালা রিক্শা নিয়ে বসে আছে। আইসক্রিম, কামরাঙা,আমড়া, হজমিগুলি এবং ঝালমুড়িওয়ালাদের এখনও বসার সময় হয়নি। দুপুর একটার আগে ওদের দেখা পাওয়া যাবে না।

    কাল রাতে অসহ্য গরম ছিল। গাছের পাতা নড়ছে না। ফ্যানের হাওয়া যেন গায়েই লাগছে না। তারপর মাথায় কিলবিল করছে দুশ্চিন্তার সরীসৃপ। বিমলবাবু সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারেননি। কতবার যে উঠে উঠে এক ঢোক দু ঢোক করে জল খেয়েছেন তার ঠিক নেই। ভোরের দিকে চোখের পাতা একটু লেগে এসেছিল। তাতেও স্বস্তি নেই। নানারকম জট পাকানো উদ্বেগজনক দুঃস্বপ্ন পাক খেতে লাগল হাল্কা ঘুমের মধ্যে। ধোঁয়াটে শরীরের কারা যেন তার বাড়ি ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। এদিকে ওদিকে পড়ে আছে হাতুড়ি, শাবল, গাঁইতি। একটু দূরে একটা চেয়ারের ওপর বসে আছেন বংশীলালবাবু। তার পাশে সেদিনের সেই আবছা আবছা চেহারার লোকটা মাথায় একটা পাগড়ি জড়িয়ে যাচ্ছে। জড়িয়েই যাচ্ছে, জড়িয়েই যাচ্ছে। বাউন্ডারি ওয়ালের ওপর একটা ধবধবে সাদা বিড়াল বসে বংশীলালবাবুর দিকে হাসিমুখে তাকিয়ে আছে।

    তিনজন মিস্ত্রি নিয়ে পান্নালাল সরকার মানিকতলার দিক থেকে আসছে। সঙ্গে পেটানো চেহারার আরও দুজন রয়েছে। বাদল কর্মকার আর মহেন্দ্র আঢ্যি, বংশীলালের দুই চামচা। পান্নালাল বিমলবাবুর দিকে দাঁত বার করে হেসে যাচ্ছে। হঠাৎ মিস্ত্রিদের দিকে তাকিয়ে বলল --- নে চালা ....। বিমলবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। তার বুকের ভিতর কে মুগুর পিটছে। তার স্ত্রী সুচরিতা তার একটা হাত জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সুচরিতা জড়িয়ে জড়িয়ে কি একটা বলল মনে হল --- যাও না ওদের মার না ...। এই কথা শুনে ধোঁয়াটে চেহারার বাদল কর্মকার আর মহেন্দ্র আঢ্যি লাফ দিয়ে উড়ে উড়ে বিমলবাবুদের দিকে আসছে। বিমলবাবুর ছেলেমেয়েরা অনেক দূরে একটা জায়গায় একটা চৌকিতে বসে কাঁদছে। তাদের আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে।
    বাদল আর মহেন্দ্র উড়ে উড়ে আসছে বিমলবাবুর ওপর ঝাঁপ মারার জন্য। ভয়ে বিমলবাবুর মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না। দম আটকে আসছে। তিনি প্রাণপণে কিছু বলার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তার মুখ দিয়ে গোঙানি ছাড়া আর কিছু বেরোচ্ছে না। অঁ অঁ অঁ করে ছটফট করতে লাগলেন।
    কে যেন তার বুকে হাত দিয়ে ডাকছে ---- শুনছ ... শুনছ ... ওঠ ... কে একজন ডাকছে তোমাকে ... এত হাঁফাচ্ছ কেন ... স্বপ্ন দেখছিলে নাকি? '
    বিমলবাবু চোখ মেলে দেখলেন সুচরিতা তাকে ডাকাডাকি করছে। তিনি ধড়মড় করে উঠে বসলেন।
    ------' অ্যাঁ ... কি .. কি হল? '
    ----- ' কিছু হয়নি। অনেক বেলা হয়ে গেল তো ... রাত্রে ঘুম হয়নি নাকি? কে একজন ডাকছে তোমাকে ... '
    ----- ' কে ... কে ... কোথায়? '
    ----- বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। বলল যে, বলুন কানু এসেছে ... '
    নামটা শুনে নানা সম্ভাবনার কথা মাথায় নিয়ে বিমলবাবু বাইরে গেলেন।
    দেখলেন কানু একটা ঠোঙা থেকে হাতে ঢেলে নিশ্চিন্তে মুড়ি চিবোচ্ছে।
    সে বিমলবাবুকে দেখে বলল, ' এঃহে ... ঘুম ভাঙিয়ে দিলাম বোধহয় ... আসলে আমি সকাল সকাল একটু ঘুরে গেলাম। সাগরদা একটু পরে আসবে। সাগরদা বলেছিল একটু দেখে নিতে ... তাই ...। তারপর কাল রাত্রে কোন হুজ্জুতি হয়নি তো? '
    ------ ' না, তা হয়নি। কিন্তু আজ সকালেই তো ... '
    ------ ' সে ঠিক আছে ... আসতে দিন ... একটু পরেই সাগরদা আসবে ... সেঁকে দেবে ... '
    ----- ' মানে? '
    ----- ' মানে ... ওই আর কি ... বুঝে নিন ... ঠিক আছে আপনি ভেতরে যান .... আমি চা খেয়ে আসছি ... '
    বলে মুড়ির শেষ অংশটুকু মুখে চালান করে ঠোঙাটা দলা পাকিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিল।
    বিমলবাবু কি একটা বলতে যাচ্ছিলেন, বোধহয় ওই চা খাবার ব্যাপারে ---- ' চা ... না হয় এখানে ... এক্ষুণি হবে ... ওই ... '
    ------ ' না না ... দরকার নেই... ওই ভোলার দোকানে যাব ... আপনার বাড়িতে পরে চা খাব ... ' বলে প্যান্টের পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে হেলেদুলে হাঁটতে হাঁটতে কানু চলে গেল।
    বিমলবাবু ভাবলেন প্রতিদিন কত শত্রুর মোকাবিলা করতে হয় এদের। তবু কি নিশ্চিন্ত হাবভাব।

    বেলা সওয়া দশটা নাগাদ সেন্ট মার্গারেট স্কুল তখন স্পন্দনময়, স্কুলের সামনে দুটো লোক আর তিনজন নীরিহদর্শন মিস্ত্রি এসে দাঁড়াল। লোকদুটো হল পান্নালাল, বংশীলালের চাচাতো ভাই, বংশীলালের কাজ বা অকাজ এখন সেই সামলায় আর বাদল কর্মকার, এদের সাকরেদ।
    তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে বিমলবাবুর বাড়ির দিকে যেতে লাগল।
    জানলা দিয়ে সুচরিতার নজরে পড়ল হঠাৎ। তার বুকটা ধড়াস করে উঠল। বিমলবাবু অন্যমনস্কভাবে খবরের কাগজে চোখ বোলাচ্ছিলেন। সুচরিতা বললেন, ' এই... শুনছ ... ওই দেখ ... '
    বিমলবাবুর হৃৎস্পন্দন আচমকা বেড়ে গেল।
    বলেন, ' কই .. ক্কে.. ক্কে !'
    ------ ' ওই যে ওয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে আছে ওরা .... দাঁড়াও ভয় পেয় না ... সাগর মন্ডল তো আসবে বলেছে ... '
    বিমলবাবু কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, ' আসবে তো বলেছিল ... কিন্তু এখনও তো ... '
    ওই লোকগুলো এদিকে ফিতে বার করে কি সব মাপজোক করছে। বিমলবাবুর বাড়ির পিছনদিকের ঘরটার দিকে হাত দেখিয়ে কি সব বলছে। পান্নালাল হাত নেড়ে নেড়ে মিস্ত্রিগুলোকে কি সব বোঝাচ্ছে। মিস্ত্রি তিনজন ঘনঘন মাথা নাড়ছে।
    এই সময়ে উল্টোফুটে মানিকতলা মেন রোডের দিক থেকে কে যেন বলল, ' ভদ্রলোকের বাড়ির সামনে এখানে কিসের হিসেব চলছে দাদারা? '
    লোকগুলো ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল একটা লোক ওদিকের একটা সেলুনের সামনে একটা চেয়ারে পায়ের ওপর পা তুলে বসে বিড়ি খাচ্ছে। বিমলবাবু পাশের জানলার দিকে গিয়ে ডিঙি মেরে
    দেখলেন, বিড়িতে একটা টান মেরে ফুরফুর করে ধোঁয়া ছেড়ে পান্নালালের দিকে তাকিয়ে ডানহাত নেড়ে বলল, ' এই যে দাদা এদিকে শুনুন ... '

    ( চলবে )

    ********************************************
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • যোষিতা | ১১ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৭:৫৮526842
  • সাগর মণ্ডলের রোলে আজগের দিনে হলে শাশ্বতকে মানাবে, আগের টাইমের বেস্ট ফিট অজিতেশ ব্যানার্জি।
  • যোষিতা | ১১ ডিসেম্বর ২০২৩ ১৮:০৮526843
  • তবে হালকা মেজাজের বই হলে, সাগরের রোলে বুম্বাদার বিকল্প নেই। একাই একশো স্টাইলে উড়ে উড়ে ক্যালাবে। সেন্ট মার্গারেট থেকে বেরিয়ে পাশের গলিতে স্কটিশের বিএড কলেজের সামনে , যেদিকটা পুরো ফাঁকা শুনশান, কুকুরের হাগা ছাড়া রাস্তায় কিচ্ছুটি থাকে না, ঐ লোকেশনে ঘামাসান কেলাকেলি ডিম্যান্ড করবে জনতা, মানে দর্শক। বিটি কলেজের লেকচারার ইন চার্জ (যাঁকে বাংলার মা বলা হতো, গান্ধিটুপি মাথায় ঘোর কংগ্রেসী) মেইন গেট দিয়ে উঁকি মরে সাগরকে হুংকার দিতে গিয়েও থমকে যাবেন। কেলাকেলিতে সস্নেহ প্রশ্রয় দেবেন। ওঁর রোলে ছায়াদেবী।
  • Anjan Banerjee | ১১ ডিসেম্বর ২০২৩ ২২:৪১526852
  • বেশ বেশ 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ক্যাবাত বা দুচ্ছাই মতামত দিন