এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হেদুয়ার ধারে - ২২ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ২৮২ বার পঠিত
  • বিভূতিবাবুর ঘরে জোরদার রিহার্সাল শুরু হয়ে গেল। দুটো নারী চরিত্র আছে বটে। তবে তাদের মুখে ডায়লগ রাখা হল না। সেটা স্টেজ রিহার্সালের সময় পাড়ার মধ্যে থেকেই দুজনকে ঠিক করে নিতে হবে। অসিতই সকলের প্রচ্ছন্ন অনুমোদনে এ নাটকের পরিচালক হয়ে গেল। যতই ছোটখাট ব্যাপার হোক একজন পরিচালক তো চাই। অসিত অবশ্য একটা ফিমেল রোলে, সংলাপহীন যদিও, শ্রীলেখাকে ভেবে রেখেছে। তা দেখা গেল পাড়ায় নাট্যপ্রতিভার অভাব নেই। ব্যাপারটা জানাজানি হবার পর অনেকেই, এমনকি সমীরণের বাবা এবং বৃদ্ধ সংসারনাথবাবু পর্যন্ত অভিনেতাদের তালিকায় নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করলেন। এদের অনেকেরই বিশ্বাস, উপযুক্ত সুযোগ এবং পরিবেশ পেলে তারা নিশ্চিতভাবে অ্যাকটিং-এ কেউকেটা হয়ে দাঁড়াতেন অ্যাদ্দিনে।

    নাটকের বিষয়বস্তু বেশ সিরিয়াস। কিন্তু দেখা গেল সম্ভাব্য কুশীলবরাও তাদের কাজে বেশ সিরিয়াস। মহড়া চলতে লাগল মসৃনভাবে সপ্তাহে দুদিন করে। হয়ত পুজোর ঠিক পরেই নাটক মঞ্চস্থ হবে, তা সে ছাদেই হোক বা অন্য কোথাও হোক। বিভূতিবাবুর প্রস্তাব ছিল, গোয়াবাগানের কাছে ওই ছোট হলটায় করার জন্য। কিন্তু এখন ভাবলেন, বেশি বাড়াবাড়ি না করাই ভাল। পয়সাকড়ির ব্যাপার আছে। বিশ্বরূপা, রঙমহলের ঘূর্ণমান মঞ্চ দেখে আজও কেমন বিস্ময়ে আবিষ্ট হয়ে যান বিভূতিবাবু। একবার এক অফিস ক্লাবের নাটকে তার রঙমহলের গ্রীনরুম থেকে সবকিছু দেখার সুযোগ হয়েছিল। কি মায়াবী জগৎ এই গ্রীনরুম, আহা ...।

    কাবেরী কলেজে নৈঋত-এর দশ কপি নিয়ে এসেছে, খুব সম্ভবত অমিতাভর মন রাখতে। বেশ সংকোচ এবং অস্বস্তির সঙ্গে পত্রিকাগুলো বার করল ক্লাসে ম্যাডাম ঢোকার আগে।
    বেঞ্চের ওপর চার পাঁচটা রেখে বলল, ' এই ... একটা ম্যাগাজিন বেরিয়েছে ... দেখ, ভাল বেশ ... '
    কাবেরী একটু পরেই বুঝতে পারল তার এত সংকোচের কোন কারণ ছিল না। তিনটে মেয়ে সঙ্গে সঙ্গে একটা করে নৈঋত তুলে নিয়ে দেখতে লাগল। একজন প্রচ্ছদের দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। বলল, ' বাহ্ ... '। কাবেরী দেখল আরও চার পাঁচ জন কৌতূহলবশত বেঞ্চের ওপর ঝুঁকে পড়েছে। সে বাকি কপিগুলো বার করে ফেলল ঝোলা থেকে। সেগুলো তুলে নিল মেয়েরা। পাতা উল্টে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগল। সুমনাও বাদ গেল না, যদিও তাকে একটা কপি আগেই দিয়েছে কাবেরী। কাবেরী এবার সাহস করে বলে ফেলল, ' দাম বেশি না ... পঁচিশ পয়সা... '।
    কাবেরীকে অবাক করে দিয়ে দশ কপির মধ্যে আট কপি বিক্রি হয়ে গেল নিমেষে। দুকপি ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখল কাবেরী, মাধবী ম্যাডামকে দেবে বলে।
    সঞ্চারী দাশ বলল, ' তোর চেনা গ্রুপ ? '
    ----- ' হ্যাঁ ... তা বলতে পারিস ... '
    ----- ' এই শোন না... আমার জ্যাঠতুতো দাদা খুব ভাল কবিতা লেখে। একটু বলে দেখিস তো পরের ইস্যুতে একটা কবিতা দেওয়া যায় কিনা ... '
    ----- ' হ্যাঁ ... হ্যাঁ আমাকে দিস দু তিনটে কবিতা। আমি ওদের দিয়ে দেব ... '
    কাবেরী অনুভব করল হঠাৎ যেন তার গুরুত্ব বেড়ে গেছে।
    পল্লবী সান্যাল বলল, ' ওঃ .... দারুণ দেখ ... এই কবিতাটা দেখ। বলে পড়ে শোনাতে লাগল ...

    যাযাবর নাবিক
    সুনীল হাজরা
    ***********
    রঙ বেরঙের ধুরন্ধর ফেরেব্বাজির ডামাডোলেও
    ফাল্গুন ঠিক এসে হাজির, চৈতি দিনের
    মদালসা দিনও এল বুঝি বৎসরান্তে ঘরে ফেরা
    দূরান্তগামী যাযাবর নাবিকের মতো।
    ভরদুপুরে মন বড় উসখুস করে
    মায়াবী স্মৃতির শুকনো পাতারা এলোমেলো গড়াগড়ি খায়,
    দিকশূন্যপুরের ছমছমে মাঠে
    উন্মদ বাতাসের হাপর টানে।

    আসলে একটা পৃথিবীর মধ্যে অনেক পৃথিবী,
    অর্বুদ মানুষের তিল তিল করে তাল পাকানো
    জগৎ এফোঁড় ওফোঁড় করা ব্যথার শলাকা
    বিনা নোটিসে হামলা চালায়, কত না নিরালা ঘরদোর সংসারে,
    আহা …. কত মানুষ কাঁদছে,
    কাতরায় অহর্নিশি একান্তে …. আদ্যপান্তে।

    জানলা দিয়ে ঢুকে আসা আচম্বিত বসন্ত তাই
    দ্বিধায় ফেলে বড়,
    কলকাতার কোথাও কোথাও ইতি উতি চুপি চুপি পড়ে থাকা
    নিপাট মাটিতে ফাগুনের হাত ধরে নিবিড় ঘন আঁধারে
    স্নেহের দিয়া জ্বেলে পলাশ, শিমূল, চেরি ব্লসমের
    অনাদিকালের যাত্রীদল ফুটে থাকে
    যীশু প্রভুর অপার করুণাঘন নয়নের মতো।
    যন্ত্রণার এ ধরণীতে চোত ফাগুন তাই ঘুরে ঘুরে আসুক
    শুষে নিতে ভারা ভারা বেদনা।

    ----- ' কি দারুন... না ? ' পল্লবী বলল।
    সঞ্চারী বলল, ' হমম্ ... '

    ছুটির পরে কাবেরী বলল, ' বাড়ি যাবি তো, না দিদিদের জন্য ওয়েট করবি ... চন্দনাদির তো দেরি হবে, একটা অনার্স ক্লাস বাকি। বন্দনাদিদেরও তো বোধহয় একটা স্পেশাল ক্লাস হবে। কি করবি বল ... '
    ----- ' ঠিক আছে ... তুই আয়। আমি ওয়েট করছি দিদিদের জন্য ... '
    কাবেরী চলে গেল। হেদোর দিকে তাকালোও না। সুমনা একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। কেন কে জানে।

    সুমনা কলেজের গেটের একপাশে দাঁড়িয়ে হেদুয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। চোখের সামনে দিয়ে ঘরঘর করতে করতে ট্রাম যাচ্ছে। বাস যাচ্ছে দুপাশে। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পরমানন্দবাবু আর তার ভাগ্নের কথা মনে পড়ল। ওর নাম কি কে জানে। ওদের সমস্যাটা কি জানা হয়নি এখনও। বাপি যদি জিজ্ঞাসা করে মামা ভাগ্নেকে সে চিনল কি করে, ঠিক কি বলা উচিত এখনও ঠিক করে উঠতে পারেনি। তার বাপি তাকে কেন কিছুই জিজ্ঞাসা করছে না এ ব্যাপারে সেটাও সুমনার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তো বটেই, তার চেয়ে বড় চিন্তা হল উকিলমশাই কেন এ ব্যাপারে তাকে কিছুই জিজ্ঞাসা করছে না। তারপর মনে হল, এই সব সামান্য ব্যাপার তার বাপির মতো ব্যস্ত মানুষের মনে থাকার কথা না। তিনি নিশ্চয়ই এসব নিয়ে মাথাই ঘামাচ্ছেন না।

    সে যাই হোক, তার মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে গায়ে পড়ে ওসব না করতে গেলেই ভাল হত। তাদের ব্যাপার তারা বুঝে নিত। তার নাক গলাবার দরকার কি ছিল। সুমনা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এইসব আগডুম বাগডুম চিন্তা করতে লাগল। বেলা চারটে বাজে। কটা কাক কোন গাছে বসে তারস্বরে ডাকতে শুরু করল। বিকেলবেলার শারদীয় আলো আকাশছুট হয়ে রাধাচূড়ার হলুদ শরীরে এসে পড়েছে। রূপোলি আলো এসে পড়েছে হেদুয়ার সবজে জলে।

    একজন কাবুলিওয়ালা ওদিক থেকে রাস্তা পার হয়ে রামদুলাল সরকার স্ট্রিটে ঢুকল। হিং ... সূর্মা....আখরোট ... হিং... সূর্মা .... পেস্তা ... হিং ... সুরেলা গমকে অপরাহ্ণবেলায় নীরব পাড়ায় তরঙ্গ তুলতে তুলতে পশ্চিম দিকে হেঁটে যাচ্ছে সে। সেই সুকিয়া স্ট্রিট থেকে হাঁটতে হাঁটতে মানিকতলা ঘুরে চালতা বাগান, বিবেকানন্দ রোড হয়ে রামদুলালে এসে পড়েছে সে।
    সুমনা ভাবল, দিদিদের তো এখন ক্লাস চলছে। হেদুয়ায় এক রাউন্ড মেরে আসলে কেমন হয়। বলা তো যায় না কিছু ...।
    সে দ্বিধাগ্রস্ত মনে আনমনা চরণে রাস্তা পার হয়ে হেদুয়ার দিকে এল।
    সুমনা একটা নয়, দুটো বেড় দিল হেদোর চারপাশ ঘিরে। কিন্তু কেউ কোথাও নেই। মানে, সুমনার চোখ যাকে খুঁজছিল সে নেই।

    ( চলবে )
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন