এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হেদুয়ার ধারে - ৮৮

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ২৭ জানুয়ারি ২০২৪ | ১৫৯ বার পঠিত
  • মাণিকলালবাবুর বাড়ির দেওয়াল ঘড়িটা ঠিক ঠিক চলছে, কিন্তু ওদের চিন্তা যায়নি এখনও। সৌদামিনীদেবী মাঝে মাঝে হাঁ করে তাকিয়ে থাকেন বুড়ো ঘড়িটার দিকে। অবাক হয়ে ভাবেন
    ঘড়িটা মরে গিয়ে বেঁচে উঠল কি করে। বেঁচে থাকবে তো ? ঘড়িবাবু নরেন পাল এর মধ্যে দুদিন ঘুরে গেছেন। তিনি বললেন, ' এখনও পনেরদিন চাবি দেবার দরকার নেই। তারপর দেখা যাবে। মনে হচ্ছে ঘড়িটা আবার আপনাআপনি চালু গেল। এ ঘড়িগুলোয় এরকম হয়। আগেও দেখা গেছে। আর খারাপ হওয়ার সময়ের টাইমটা মনে হয় আপনারা ঠিক খেয়াল করতে পারছেন না।
    মাণিকবাবু খুব টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে যাচ্ছেন। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে তিনি হয়ত ভুল বলছেন। আবার পরক্ষণেই মনে হচ্ছে কাঁটা দুটোর শেষ অবস্থানটা তার পরিষ্কার মনে আছে। কাঞ্চনও মাঝে মাঝে এসে দেখে যায়। যাই হোক, সব আবার আগের মতোই চলছে। এর মধ্যে কোন কোন ভুতুড়ে ব্যাপার আছে বলে মনে হচ্ছে না। মনোবিদ ডাক্তার গোবিন্দ সেনের চেতন অবচেতনের তত্ত্বই ঠিক বলে মনে হচ্ছে। ঘড়িটা অষ্টপ্রহর চোখের সামনে রাখাই শ্রেয়। গ্র্যান্ডফাদার ক্লক ঘন্টায় ঘন্টায় যুগ যুগান্তের সুরেলা গম্ভীর শব্দ স্পন্দনে বাড়ি ভরিয়ে রাখছে।
    সৌদামিনী বললেন, ' যাক আপাতত বাঁচা গেল। আবার না কোনদিন বিগড়োয়। বুড়ো বয়সে এসব হ্যাপা আর ভাল লাগে না। এবার কিছু হলে মিস্ত্রি ডেকে কলকব্জা খুলে ফেলতে হবে। আর ওসব নয় ... অনেক হয়েছে ... '
    মাণিকলাল বললেন, ' হুঁ হুঁ ... '
    গ্র্যান্ডফাদার ক্লকে ভরাট আওয়াজ উঠল ... টং ...।
    মাণিকবাবু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন বেলা সাড়ে বারোটা।

    কাবেরী নিয়মিত নিখিল ব্যানার্জীর কোচিং-এ যাচ্ছে সপ্তাহে দুদিন করে। সিলেবাসের অঙ্কও চলছে, আবার অন্য ধারার কথাও চলছে নিয়মিত। সব কিছু না বুঝলেও শুনতে খুব ভাল লাগে। সুমনাও স্যারের কাছে পড়বে বলেছে, যদি তার মাকে রাজি করাতে পারে। অমিতাভর সঙ্গে অনেকদিন দেখা হয়নি। সে বোধহয় নৈঋত-এর পরের ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত। অমিতাভর সঙ্গে তার সম্পর্কটা কোন দিকে গড়াচ্ছে কে জানে। অমিতাভর জন্য তার টান ঠিক কতটা সে নিজেই বুঝতে পারে না। পার্থপ্রতিমের কথা মনে পড়ে মাঝে মাঝে। ভাবে, ওর সঙ্গে তার ব্যবহারটা বোধহয় ঠিক ছিল না। সে কেন যে এমন করল, ভেবে পায় না। সে বুঝতে পারে তার এরকম যখন তখন 'মুড সুইং' অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু সে নিজেকে প্রায়শই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে না। তার এরকম অস্থিরচিত্ততা সত্ত্বেও সুমনার মতো দু একজন তাকে ভীষণ ভালবাসে। কিন্তু বেশির ভাগ লোকই তাকে অপছন্দ করে। সে ব্যাপারে কাবেরী ওয়াকিবহাল।
    আজ কি জানি কি কারণে নিখিলবাবু স্যার কাবেরীকে বললেন, ' কাবেরী তোমার বুঝতে কোন অসুবিধে হচ্ছে নাতো ? অসুবিধে হলে বোল কিন্তু ... নাহলে আমি তো জানতে পারব না ... '
    বলে স্মিত হেসে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। কাবেরী বড় অস্থিরচিত্ত। তার মনে হল, শরৎকালে
    কাশের বনে হাওয়া খেলে যাচ্ছে।
    সে লাজুকভাবে বলল, ' না স্যার ... ঠিক আছে ... বলব স্যার ... '
    ----- ' হ্যাঁ ... ঠিক, বোল বোল ... '
    বলে, আবার একবার সিলেবাসের বাইরে চলে গেলেন।
    ----- ' বলাটা যেমন দরকার, শোনাটাও দরকার। কিন্তু শুধু শুনে নিয়ে আহা উহু করে সান্ত্বনা দিয়ে কোন কাজের কাজ হবে না। ফিজিক্যালি পাশে দাঁড়াতে হবে .... বুঝলে ... অ্যাকটিভ কোঅপারেশান চাই ... সাবস্ট্যানশিয়াল কমপ্যাশান চাই ... বুঝলে ... সাবস্ট্যানশিয়াল কমপ্যাশান ... শিয়ার ইমোশনাল কমপ্যাশান ডাজন্ট ক্যারি এনি ভ্যালু ... '
    ছাত্রীরা চুপচাপ বসে আছে। স্যারের কথা কিছুই মাথায় ঢুকছে না।
    কাবেরী বলে উঠল, ' ঠিক বুঝলাম না স্যার ... '
    নিখিল ব্যানার্জী তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীমায় কোন উত্তর না দিয়ে একটা পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ' তোমরা কেউ সাগর মন্ডলকে চেন ? '
    সকলেই নেতিবাচকভাবে ঘাড় নাড়ল।
    নিখিল স্যার হেসে বললেন, ' চেনবার কথাও নয়।
    গুন্ডাদের তো চেনবার কথা নয় ভদ্রলোকেদের।
    রাষ্ট্র এদের অস্তিত্ব অনুমোদন করে না। কিন্তু কমনাররা অনেকেই মনে মনে এদের পাশে আছে।
    বিধিবদ্ধ সমর্থন নয়, গোপন সমর্থন ... কিন্তু তারও তো বিপুল সদর্থক প্রয়োজনীয়তা আছে ... '
    সেখানে উপস্থিত পড়ুয়ারা সকলে হাঁ করে তাকিয়ে রইল। স্যারের কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছে না। কাবেরীর মনে হল, অমিতাভ, পার্থপ্রতিম বা নৈঋত-এর অন্যান্যেরা শুনলে হয়ত বুঝতে পারত। সে এসব কথা ঠিক ধরতে পারে না। সাগর, না কার কথা বলছেন স্যার ... সে যে কে কাবেরী জানে না। একদিন কফি হাউসে গিয়ে ওদের জিজ্ঞেস করতে হবে ... ওরা এসব জানে বোঝে ভাল।
    নিখিলবাবু স্যার একটু পরেই ফের সিলেবাসে ফিরলেন। পড়ুয়ারাও লেখাপড়ায় মন দিল।

    ভোরবেলায় ঘুম ভেঙে শুয়ে আছে সাগর। সরযূদেবী অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে আসায় একটা স্বস্তি ফিরে এসেছে তার শ্বাস প্রশ্বাসে। জানলার বাইরে একটা অযত্নলালিত শিউলি ফুলের গাছ গা ভরা শ্বেতপুষ্প নিয়ে ভোরের শিশির মেখে দাঁড়িয়ে আছে। সাগরের মনে হল এক কোমল লাবণ্য ঢালা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে হল, শিউলি গাছটা হয়ত অনেক বছর ধরে এমনি করেই তার ঘরে উঁকি দিচ্ছে ভোরবেলায়, কিন্তু সে কখনও তাকিয়েও দেখেনি। আজ যেন বিলকুল অন্য এক ভোর আকাশ থেকে নেমে এসে শুভ্র শিউলি শিশুদের সঙ্গে মনোরম খেলা খেলতে লাগল। তাদের সঙ্গে জড়াজড়ি করে ঝরে পড়তে লাগল মাটিতে। কাঁধে ব্যান্ডেজ বাঁধা সাগর মন্ডল শুয়ে শুয়ে ভোরের আকাশের নীচে শিউলি ফুলের গাছের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মনে মনে কে বলতে লাগল, কেউ অবশ্যই আসবে। সে ভোরবেলা থেকেই অপেক্ষা করতে শুরু করল শীতল স্নিগ্ধ আকাশের দিকে তাকিয়ে। সহসা তার চোখ দিয়ে কি জানি কেন কয়েক বিন্দু উষ্ণ তরল চুঁইয়ে পড়ল মাথার বালিশে।

    রাত্রি তার কথা রাখল। সে সকাল আটটা নাগাদ সাগরের বাড়িতে হাজির হয়ে গেল। সরযূদেবী বললেন, ' তুমি কি মা ... সাগরের যত্ন করতে এসেছ ? '
    ----- ' হ্যাঁ মাসীমা... আমার নাম রাত্রি রায় ... '

    রাত্রি ঘরে ঢুকে সাগরের বিছানার ধারে গিয়ে হাসপাতালের নার্সদের মার্কামারা স্টাইলে জিজ্ঞাসা করল, ' কি .... এখন কেমন ফিল করছেন ? '
    সাগর কোন উত্তর না দিয়ে স্থির দৃষ্টিতে রাত্রির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
    রাত্রি বলল, ' কি হল ...কিছু বলুন ... এখন ব্যথাটা একটু কম আছে ? '
    ডাকাবুকো সাগর মন্ডল মিয়োনো স্বরে বলল, ' ঠিক বুঝতে পারছি না ম্যাডাম ... '
    জানলার বাইরে শেফালি ঝরে যাচ্ছে এখনও।

    ( চলবে )
    ********************************************
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন