এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হেদুয়ার ধারে - ১০৭

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৪ মার্চ ২০২৪ | ১৭৬ বার পঠিত
  • সাগর এর আগে একদিন রাত্রির পাশাপাশি হেঁটেছিল। সেই তাদের প্রথম সাক্ষাতের দিন। পটলের দোকান থেকে রূপবাণীর মোড় পর্যন্ত। মনে হচ্ছিল রূপবাণীর মোড় যেন দূরে সরে সরে যায়। বেশ লাগছিল চারপাশের লোকজন, রাস্তাঘাট, দোকানপাট, বাস ট্রাম। সবকিছুর ওপর একটা সোনালী আলো এসে পড়ছিল আকাশ থেকে এসে। তবে মনে কোন ভার ছিল না। একটু নাটুকে ভাষায় বললে আকাশ বাতাস সবই মধুর লাগছিল, কিন্তু চৈত্রমাসের ঝিরিঝিরি বাতাসের মতো।
    কিন্তু আজ একটু অন্যরকম। শ্রাবণদিনের দিনের মায়াবী ছায়ার মতো। ভারী জলদ মেঘের মতো।
    কিছু কথা ঘনিয়ে ওঠে বুকের ভিতর। কিন্তু বলা যায় না কিছুতেই।
    দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল সার্কুলার রোডের দিকে। সাগরের বুকের উঠোনে আলো আর ছায়া আবার খেলা শুরু করল।
    রাত্রি এই মুহুর্তে ঠিক কি চিন্তা করছে বোঝা যাচ্ছে না। টুকটাক কথা বলছে মাঝে মাঝে এবং খুব সহজভাবে।
    যেমন, ' আমরা মাঝে মাঝে ভীষণ দ্বন্দ্বে পড়ে যাই ... কিছুতেই ডিসিশান নিতে পারি না ... তাই না ? '
    সাগরের কোন তৈরি উত্তর ছিল না।
    সে অনিশ্চিত ভঙ্গীমায় বলল, ' হ্যাঁ ... সে তো বটেই... সে তো বটেই ... '
    হাঁটছে দুজনে পাশাপাশি। সাগর খান্নার মোড় পর্যন্ত এগিয়ে দেবে রাত্রিকে।
    রাত্রি আবার বলল, ' ঠিকঠাক কিছুই করতে পারছি না। এক একটা জিনিস করব ভাবছি। তারপর দুদিন বাদে আবার অন্য কিছু ভাবছি। এরকম দোলাচল তো ভাল নয় না ... '
    সাগর আশা করল কথাটার বোধহয় কোন গূঢ় অর্থ আছে।
    সে বলল, ' কিরকম কিরকম ? '
    ------ ' না ... এই এক একবার ভাবছি এম এ পাশ করার পর এম ফিল করব। আবার এক একবার ভাবছি স্কুলে বা কলেজে চাকরির জন্য অ্যাপ্লাই করব ... এই রকম আর কি ... '
    এ সমস্যাগুলো সাগরের কাছে সম্পূর্ণ অনাবিষ্কৃত কোন দ্বীপের মতো অজানা।
    সে দায়সারা স্বরে বলল, ' ও আচ্ছা ... ভালভাবে ভেবে ডিসিশান নিতে হবে ... '
    ----- ' বাবারও রিটায়ারমেন্টের সময় এগিয়ে আসছে। শরীরও ভাল না ... চিন্তা হয় মাঝে মাঝে ... '
    ----- ' তাই তো ...। না না চিন্তা করার দরকার নেই। আমরা সবাই তো আছি ... '
    বলতে পারলে ভাল হত ---- 'আমি তো আছি ... '
    কিন্তু কথাটা ঠিক মুখ দিয়ে বেরল না।
    সার্কুলার রোড এগিয়ে আসছে ক্রমশ।
    রাত্রির কোন হেলদোল নেই সে নিশ্চিন্তমনে নানা কথা বলে চলেছে।
    ------ ' তাও তো আপনি আছেন বলে অনেক ভরসা। যা হোক, প্রয়োজনে সাহায্য তো পাচ্ছি। এরকম সুযোগই বা ক'জন পায় ... এই তো আমার এক বন্ধু বেলেঘাটায় থাকে। আমাদের মতোই ঝামেলায় পড়েছিল, থানা পুলিশ করে জেরবার হচ্ছে ... কি করবে ... সব জায়গায় তো আর সাগর মন্ডল নেই ... '
    ----- ' ঠিকানাটা একটু দেবেন তো ... বেলেঘাটায় আমার লোক আছে ... '
    ----- ' আচ্ছা দেব'খন পরে ... '
    রাত্রি খুব একটা গুরুত্ব দিল না ব্যাপারটায়।
    বলল, ' আপনার সব জায়গায় না জড়ালেও চলবে। অত ঝুঁকি নেওয়া ঠিক না। আপনার মা বেঁচে আছেন এখনও ... '
    সাগর কথাটা কিভাবে নেবে বুঝতে পারল না। সে বললে ফেলল, ' আপনি কি আমার এ লাইন ছেড়ে দিতে বলছেন ? ' মা তো এতদিন ধরে এসব দেখে আসছে ... এখন আর নতুন করে কি হবে ? মার এসব গা সওয়া হয়ে গেছে। যদি আর কেউ থাকত, নয় চিন্তা ভাবনা করা যেত ... কিন্তু আমার আছেটা কে যে আমার জন্য চিন্তা করবে ?'
    ----- ' বলেন কি ? কত লোক আপনাকে নিয়ে ভাবে হাসপাতালে দেখেননি। এ ছাড়া আরও কত লোক আছে। আমিও তো আছি তার মধ্যে ... '

    এ কথায় সাগরের মনে কিন্তু কোন দোলা লাগল না। 'আরও কত লোকের মতো' চোখে রাত্রিও তাকে দেখে এ কথাটা তাকে কিছুটা বিমর্ষ করে দিল।
    একটা ছোট স্টেশনারি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গেল রাত্রি। বলল, ' চিউয়িং গাম খাবেন নাকি ? আমি মাঝেমাঝে খাই। খুব ভাল লাগে ... '
    ওরা দাঁড়িয়ে গেল। সাগর বলল, ' আমিও চিবোই মাঝে মাঝে। টেনশান কমে যায় ... বেশ একটা এনার্জি পাওয়া যায় ... '
    ------ ' ও বাবা ... আপনারও টেনশান হয় ! আপনার তো ওসব আছে বলে মনে হয় না ... '
    রাত্রি দুটো চিউয়িং গাম কিনে একটা সাগরকে দিল।
    বলল, 'চলুন ... '
    সাগর এই সময়ে একটা কার্যকরী কথা বলার সুযোগ পেল।
    মোটামুটি গুছিয়ে বলল, ' কার মনের ভিতর কি চলছে, সেটা কি আর অন্য কেউ বুঝতে পারে ? '
    রাত্রির গাম চিবোনো মুখ থেকে সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর এল, ' এগজ্যাক্টলি। একদমই বুঝতে পারে না। আর সব কথা সবাইকে খুলে বলাও যায় না ... ব্যাপারটা আনবিয়ারেবল হয়ে যায় এক এক সময় ... '
    সাগরের মনের বারান্দায় একটা লাগোয়া অশথ গাছের পাতার ছায়া পড়ে তিরতির করে কাঁপতে লাগল। আনবিয়ারেবল মানে অসহ্য সেটা সে জানে।
    সে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, ' আপনার মনে, মানে ... কি সমস্যা ... যদি অসুবিধে না থাকে ... '
    ঠিক এই সময় শিয়ালদা রুটের একটা বেপরোয়া বাস হুশশ্ করে আচমকা এসে পড়ল রাস্তার দিক ধরে হাঁটা আনমনা সাগরের পিছনে।
    ' এ...ই এ..ই ... ' বলে সাগরের হাত ধরে টান মেরে সরিয়ে আনল রাস্তার ডানপাশে নিজের দিকে।
    ----- ' উঃ কি সর্বনাশ হতে যাচ্ছিল এক্ষুণি ! উফফ্ ... পুলিশে কমপ্লেনট করা উচিত এদের এগেনস্টে ... ' বলে রাত্রি রুদ্ধশ্বাসে সাগরের মুখের দিকে তাকিয়ে।
    সাগর ভাবল, ' বাসের ড্রাইভার তাকে ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত যেভাবেই হোক ওড়াতে চাওয়ার সম্ভাবনাটা তার পক্ষেই গেল, যেভাবে উল্টোডাঙায় গুলি খাওয়ার ঘটনাটা গিয়েছিল। দুটো ঘটনাই রাত্রিকে তার একেবারে পাশে এনে দিল দু দুবার। হয়ত ঘটনাগুলো মারাত্মক এবং প্রাণঘাতি কিন্তু সাগরের মনে কে জানে কেন তেমন রাগের ঢেউ তুলতে পারল না।
    সে গতানুগতিকভাবে বলল, ' এঃহে ... আনাড়ি একেবারে ... কোন কান্ডজ্ঞান নেই ... '
    এর বেশি কিছু বলতে পারল না কারণ ততক্ষণে তার হাতে লাগা রাত্রির স্পর্শ সারা স্নায়ুকোষে সঞ্চারিত হয়ে অবশ অনুভূতির সৃষ্টি করেছে।
    দুজনে দাঁড়িয়ে পড়েছিল রাস্তার একপাশে।
    রাত্রি বলল, ' চলুন ... চলুন ... ওই তো ওই মোড় অব্দি পৌঁছে দিলেই আপনার ছুটি ... হাঃ হাঃ ... '
    আবার হাঁটা শুরু হল। এইসময়ে সাগর একটা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলল ---
    ' অনেকে বলে ভগবান বলে কিছু নেই ... আমিও তাই ভাবি। কিন্তু একটা কথা বলুন তো ... ভগবান যদি নাই থাকবে তাহলে ওই বাসটায় ড্রাইভারের রূপ ধরে তা'লে কে বসেছিল ? সেই তো কিছু দিয়ে গেল ... '
    রাত্রি এরকম বিচিত্র সংলাপ শুনে একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। কিন্তু কোন ঠাট্টা তামাশা করল না।
    সে বলল, ' সেই তো ... কে যে কখন নিজের অজান্তেই কাউকে কিছু দিয়ে বসে তা কেউ বলতে পারে না .... '
    খান্নার মোড় এসে গেল।
    রাত্রি বলল, ' এবার আমি চলে যেতে পারব। আর এগোনর দরকার নেই... '
    ----- ' না না আমি আর এগোব না ... কিন্তু খুব ভয় লাগে ... '
    আশ্চর্যের ব্যাপার রাত্রি জিজ্ঞাসা করল না যে সাগরের কেন ভয় লাগে।
    সে বলল, ' ভয় কিন্তু আমারও লাগে। একটা কথা জোর দিয়ে বলতে পারি আমরা কখনও দুজন দুদিকে অনেক দূরে চলে গেলেও আমি আপনাকে কোনদিন ভুলে যাব না ... এখন আসি ... সাবধানে ফিরবেন কিন্তু ... ভগবান স্যার কিন্তু বারবার রেসপনসিবিলিটি নেবে না ... '
    রাত্রি চলে গেল।
    হঠাৎ সাগরের কানে এল ' দাদা ... ও সাগরদা ... '
    সাগর মুখ তুলে দেখল রাস্তার ওপাশের গল্লা থেকে
    বিড়ি বাঁধতে বাঁধতে গণেশ পাত্র হাত নেড়ে নেড়ে তাকে ডাকছে। সাগরও হাত তুলল। তারপর রাস্তা পেরিয়ে ফিরতে লাগল তার নিজের দুনিয়ায়। গণেশ অপেক্ষা করে আছে তার জন্য।

    ( চলবে )

    ********************************************
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন