এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • হেদুয়ার ধারে - ৭৭ 

    Anjan Banerjee লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৬ জানুয়ারি ২০২৪ | ২৮০ বার পঠিত
  • আজ পনেরই আগস্ট। স্বাধীনতার পর এক যুগ কেটে গেল। অনেক বাড়ির ছাদে বা বারান্দায় ভারতের তিন রঙা পতাকা লাগানো হয়েছে।
    আজ বেশ রোদ ঝলমলে দিন। সকালবেলায় বেশ ফিরফির করে হাওয়া দিচ্ছে। পাড়ার দুটো ক্লাবের প্রভাতফেরি বেরল সকাল ঠিক ছ'টায়, একটা বিডন স্ট্রিট ধরে সার্কুলার রোডের দিকে, আর একটা হেদুয়া থেকে হাতিবাগানের দিকে। ড্রাম আর বাঁশিতে বাজতে লাগল, চল চল চল .... উর্দ্ধ গগনে বাজে মাদল, নিম্নে উতলা ধরণীতল...
    ভোরবেলায় আড়ামোড়া ভাঙছে কর্ণওয়ালিস স্ট্রিট। ... হাতিবাগানের মোড়ে একটা লোক দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁত মাজতে মাজতে নীচের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ অফিস ছুটি। ট্রাম লাইন ধরে নেতাজি স্পোর্টিং-এর প্রভাতফেরি যাচ্ছে ভোরের অমল হাওয়া মেখে। নীরব পরিপার্শ্ব চোখ মেলছে ক্রমে ক্রমে। কিশোর কিশোরীরা গাইছে .... উঠ গো ভারতলক্ষী... উঠ আদি জগৎজন পূজ্যা ... দুঃখ দৈন্য সব নাশি, কর দূরিত ভারত লজ্জা ...
    ড্রাম বাজছে তালে তালে, বাঁশি বাজছে সুরে সুরে। আজ স্বাধীনতার দিন।
    কবির আর্তি পাক খাচ্ছে হাওয়ায় .... স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় রে, কে বাঁচিতে চায় .... দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায়ে রে, কে পরিবে পায়ে ... রঙ্গলাল কবি লিখেছিলেন সেই কবে।
    মানদা তিনটে বালতি নিয়ে রাস্তার কলে গিয়ে দাঁড়াল সকাল সকাল। বেলা বেড়ে গেলে লাইন পড়ে যাবে। আজ বাবুদের বাড়ি একটু দেরি করে গেলেও চলবে। সুরেশ্বর মল্লিক ছাদে দানা খাওয়াচ্ছে পায়রাদের। পায়রাগুলো ছটফটে পায়ে ঘুরে ফিরে দানা ঠোকরাচ্ছে।
    পঞ্চমীর মা দরজায় তালা লাগিয়ে মাথায় হাত ঠেকিয়ে দুগ্গা দুগ্গা বলে কাজে বেরল। সে কার মুখে যেন শুনতে পেল, আজ নাকি স্বাধীনতা দিবস। সবার ছুটি আজকে। সে ভাবল, বাবুদের মতো তারও ছুটি থাকলে ভাল হত। বিবেকানন্দ রোডের মোড়ে এক কোণে মাচা বেঁধে পথ সভা হচ্ছে। সমবেত কন্ঠে একটা গান হল ... হও ধরমেতে ধীর, হও করমেতে বীর ... হও উন্নত শির নাহি ভয় ...
    সকাল নটা নাগাদ এক নেতা এসে পতাকা উত্তোলন করলেন। তারপর বক্তৃতা শুরু হল। ওখানে পতিতপাবনবাবুকে দেখা গেল। ওনাকে খানিক পরে শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়েও দেখা গেল। ওখানেও তিন রঙা পতাকা তুলে লেকচার শুরু হল দশটা নাগাদ। পতিতপাবনবাবুও বেশ আবেগমন্ডিত দু চার কথা বললেন সাজিয়ে গুছিয়ে। তিনি খেয়াল করলেন না সাগর মন্ডল ঠিক সেই সময়ে মঞ্চের সামনে দিয়ে সাইকেল চালিয়ে বেলগাছিয়ার দিকে গেল।
    সাগর সাইকেল চালাতে চালাতে মনে মনে বলল,
    ' আজ স্বাধীনতা দিবস ... '।

    গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটা নিয়ে মহা আতান্তরে পড়েছেন মাণিকলালবাবুরা। এর একটা সুরাহা হওয়া দরকার। আর কিছু ঘটেনি অবশ্য, কিন্তু রোজ রাত্তিরে ভয়ে ভয়ে থাকা, আবার কবে কি হয়। ঘড়িবাবু নরেন পাল এসেছেন সকাল এগারোটা নাগাদ। একটু পরে কাঞ্চন এল ওপরে। তারা চারজনে মিলে শলা পরামর্শ করতে লাগল।
    নরেন পাল বললেন, ' বুঝতে পারছি এটা আপনাদের একটা আবেগের জায়গা, কিন্তু আপনাদের পরিবারে এর একটা অন্য রকম প্রভাব পড়ছে। তাই বলছি .... '
    ----- ' হ্যাঁ বল না নরেন ... ' সৌদামিনী বললেন।
    ----- ' ঘড়িটা এ বাড়িতে আর না রাখাই ভাল ... ' নরেনবাবু স্পষ্টাস্পষ্টি বললেন।
    কাঞ্চন সঙ্গে সঙ্গে মতৈক্য প্রকাশ করল, ' হ্যাঁ ... একদম খাঁটি কথা বলেছেন। আমি যদিও ওসব ভুতুড়ে ব্যাপার স্যাপারে বিশ্বাস করিনা, এটা একটা যন্ত্র মাত্র। তবু একটা মনস্তাত্বিক ব্যাপার তো আছেই, এত যুগের একটা অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। তারই একটা সাইকোলজিক্যাল প্রভাব হয়ত পড়ছে। এটাকে সরিয়ে দিয়ে দেখা যাক না এই বদ হাওয়াটা কাটে কিনা ... অকারণে মায়া বাড়িয়ে লাভ কি ? '
    ----- ' হ্যাঁ কথাটা ঠিকই ... সরিয়ে দিয়ে দেখা যেতে পারে ... তাছাড়া আর উপায় কি ? মা ... তুমি কি বল ? ' মাণিকলাল বললেন।
    ----- ' দেখ, তোরা যা ভাল বুঝিস ... আমি কিছু ভেবে পাচ্ছি না। এতদিনের সঙ্গী একজন ... আমার বিয়ের পর থেকে ওকে দেখছি এ ঘরে ... সে সব বাদ দাও, তোমরা যা ভাল মনে হয় কর ...'
    কাঞ্চন বলল, ' যাক, একটা ডিসিশানে আসা গেছে .... নরেনকাকা আপনি তা'লে একটা ব্যবস্থা করুন ... কোথায় নিয়ে যাবেন কিছু ঠিক
    করেছেন ? '
    গ্র্যান্ডফাদার ক্লক নিথর নিস্পন্দ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাঁচের আলমারির ভিতরে। দেখে হঠাৎ চমকে উঠলেন মানিকলালবাবু। তার মনে হল, কাঁচের পিছন থেকে প্রাচীন দেয়ালঘড়িটার বারোটা চোখ স্থির দৃষ্টিতে কাঞ্চনের দিকে তাকিয়ে আছে। সে দৃষ্টিতে রোষের চিহ্ন স্পষ্ট।
    মাণিকবাবুর অস্ফূটস্বর নিজের অজান্তেই বেরিয়ে এল, ' না না ... এ হয় না ... কি সব দেখছি ... '
    নরেনবাবু মাণিকলালের দিকে তাকিয়ে রইলেন ভ্রু কুঁচকে।
    কাঞ্চন বলল, ' কি হল রে দাদা .... কি হল ? '
    মাণিকবাবু নিজের চোখেমুখে বার কয়েক হাত বুলিয়ে বললেন, ' না .... কিছু না ... নরেনকাকা বলুন ... কি ঠিক করলেন তা'লে। এর একটা শেষ হওয়ার দরকার ... '
    ----- ' ঠিক আছে, আমি ঘড়িটা আপাতত আমার বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি। তারপর দরকার হলে অন্য কোথাও রাখার ব্যবস্থা করব ... '
    মাণিকবাবু এবং সৌদামিনী চুপ করে বসে রইলেন।
    কাঞ্চন বলল, ' আচ্ছা ... ঠিক আছে ঠিক আছে ...'

    রাত আড়াইটে বাজে। সবাই অঘোরে ঘুমোচ্ছে।
    কাঞ্চনের ঘরে আলো নেভানো। সে এবং তার স্ত্রী করুণা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। মাথার ওপর পাখা ঘুরছে বনবন করে। রাস্তার দিকে ঘরের দুটো জানলাই খোলা। জানলা দিয়ে ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলো এসে পড়ছে ঘরে।
    সেই আলোয় কাঞ্চন দেখল গ্র্যান্ডফাদার ক্লক দাঁড়িয়ে আছে। তার বারোটা চোখ যেন মিটিমিটি হাসছে। কাঞ্চনের হাত পা অসাড় হয়ে গেল। বোবায় ধরল। মুখ দিয়ে আওয়াজ বার করার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। কিন্তু গলা বুজে যাচ্ছে। ভয়ে নড়াচড়াও করতে পারছে না। শরীর অনড় পাথরের মতো পড়ে আছে। শ্বাস প্রশ্বাসে কে যেন পাথর চাপা দিল। গ্র্যান্ডফাদার ক্লক ঝুঁকে পড়ল কাঞ্চনের ওপর। কাঞ্চনের হাত পা অচল। উদ্ভিদের মতো আটকে আছে। ঘড়িটা কাঞ্চনের ওপর উপুড় হয়ে পড়ল আড়াআড়ি। তার বুকে চাপ পড়ছে। সে বাঁচবার জন্য হাঁসফাঁস করতে লাগল। হাত পা নাড়ানোর চেষ্টা করতে লাগল প্রাণপনে। তার শরীরটা কোনরকমে ছটফট করে উঠল একবার। তার একটা হাত ছিটকে গিয়ে লাগল ডান পাশে তার ঘুমন্ত বৌ করুণা ওপর। করুণার ঘুম ভেঙে গেল। সে কয়েক সেকেন্ডে সামলে নিল ঘুমের ঘোর। হঠাৎ চোখে পড়ল কাঞ্চন কেমন ছটফট করছে। চোখ মুখ কুঁচকে গেছে। জোরে জোরে শ্বাস পড়ছে। সে ভয় পেয়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে ঘরের আলো জ্বালল। তারপর কাঞ্চনের বুকে হাত দিয়ে নাড়া দিতে লাগল, ' ওগো ... শুনছ ... শুনছ ... কি হয়েছে তোমার ... '

    সকাল সাতটা নাগাদ কালীময় ডাক্তার এলেন আবার ব্যাগপত্তর নিয়ে। আজ স্বাধীনতা দিবসের পরের দিন।

    ( চলবে )
    ********************************************
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : [email protected]


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন